Sunday, May 25, 2025

সাণ্ডা ও গুইসাপ এর পরিচয় ও পার্থক্য এবং এ সংক্রান্ত শরিয়তের বিধি-বিধান

 প্রশ্ন: সাণ্ডা ও গুইসাপ কি এক‌ই প্রাণী? ইসলামের দৃষ্টিতে এই প্রাণীগুলো খাওয়া কি হালাল নাকি হারাম? দয়া করে জানাবেন ইনশাআল্লাহ। কারণ ফেসবুকে এই বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে অনেকেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রয়েছেন।

উত্তর: সাণ্ডা (الضب দব্ব, ইংরেজিতে Spiny-tailed lizard) এবং গুইসাপ (ইংরেজিতে Monitor lizard)—এই দুটি প্রাণী দেখতে কিছুটা মিল থাকলেও প্রকৃতি, বসবাস ও ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
নিম্নে অতি সংক্ষেপে সেগুলো তুলে ধরা হলো:
◈ ১. সাণ্ডা (الضب):
বৈজ্ঞানিক নাম: Uromastyx spp.
▪️পরিচয়:
– এটি মরুভূমির শুষ্ক এলাকায় বসবাস করে।
– শরীর মোটা ও লেজে কাঁটার মতো স্পাইক থাকে।
– সাধারণত গাছপালা, বীজ ও ঘাস খায় (শাকাহারী)।
▪️হুকুম:
সাণ্ডা খাওয়া হালাল। সুতরাং যার রুচি হয় সে খেতে পারে। কিন্তু কারো রুচি না হলে সে খাওয়া থেকে বিরত থাকবে।
তবে কিছু আলেম তা মাকরুহ বা অপছন্দনীয় বলেছেন। (যেমন: শাইখ আলবানি)
▪️সাণ্ডা বা الضب সম্পর্কে সহিহ হাদিস:
ইবন আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
«دخلت أنا وخالد بن الوليد مع رسول الله صلى الله عليه وسلم بيت ميمونة، فَأُتِيَ بِضَبٍّ مَحْنُوذٍ فَأَهْوَى إلَيْهِ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم بِيَدِهِ، فقال بعض النِّسْوَةِ في بيت ميمونة: أخبروا رسول الله بما يريد أن يأكل، فرفع رسول الله صلى الله عليه وسلم يده، فقلت: أَحَرَامٌ هُوَ يَا رَسُولَ الله؟ قَالَ: لا، وَلَكِنَّهُ لَمْ يَكُنْ بِأَرْضِ قَوْمِي، فَأَجِدُنِي أَعَافُهُ، قال خالد: فَاجْتَرَرْتُهُ، فَأَكَلْتُهُ، وَالنَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَنْظُرُ» [متفق عليه]
“আমি ও খালিদ ইবন ওয়ালিদ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে মায়মুনা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর ঘরে প্রবেশ করলাম।
তখন আমাদের সামনে একপ্রকার পুড়িয়ে রান্না করা সাণ্ডা (ضبّ) পেশ করা হলো।
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা খাওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন।
তখন মায়মুনার ঘরের কোনো একজন নারী বললেন, ‘রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জানিয়ে দিন তিনি যা খেতে যাচ্ছেন, সেটি কী!’
এরপর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাত সরিয়ে নিলেন।
আমি (ইবন আব্বাস রা.) বললাম: ‘হে আল্লাহর রসুল! এটি কি হারাম?’
তিনি বললেন: ‘না, তবে এটা আমার জাতির অঞ্চলে ছিল না। তাই আমার নিকট তা রুচিকর নয়।
খালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন:
‘তখন আমি সেটিকে টেনে নিলাম এবং খেতে লাগলাম আর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকিয়ে ছিলেন।’
[সহিহ, মুতাফাকুন আলাইহি: সহিহ বুখারি: ৫৩৮১, সহিহ মুসলিম: ১৯৪৬]
▪️এই হাদিসের শিক্ষা:
এই হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, সাণ্ডা (ضبّ) খাওয়া হারাম নয়। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে খেতে অপছন্দ করেছেন। কিন্তু নিষেধ করেননি।
সাহাবি খালিদ (রা.) তা খেয়েছেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে বাঁধা দেননি।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল সাণ্ডা হালাল হওয়ার পক্ষে।
▪️সাণ্ডা খাওয়ার ব্যাপারে কি হাদিসে কোন নিষেধাজ্ঞা এসেছে?
এ ব্যাপারে সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায রহ. বলেন,
ما ورد في النهي فهو ضعيف، والصواب أنه حلال كما ثبت في الصحيحين
“নিষেধ সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে (যেমন: সুনানে আবু দাউদে সাণ্ডা খাওয়া নিষেধ হওয়া প্রসঙ্গে একটি হাদিস উল্লেখিত হয়েছে) তা দুর্বল (ضعيف)। এবং সঠিক কথা হলো—এটি হালাল, যেমন সহিহ বুখারি ও মুসলিমে প্রমাণিত।”
◈ ২. গুইসাপ (Monitor Lizard)
– বৈজ্ঞানিক নাম: Varanus spp.
– নদী, বন বা জলাশয়ের আশেপাশে বাস করে।
– শরীর দীর্ঘ ও চঞ্চল; দাঁত ও নখ ধারালো।
– এটি মাংসাশী; মৃতপ্রাণী, সাপ, ব্যাঙ ইত্যাদি খায়।
▪️হুকুম:
গুইসাপ সম্পর্কে সরাসরি হাদিস না থাকলেও এটি একধরনের শিকারি ও নাপাক প্রাণী হিসেবে ধরা হয়।
খাদ্যে হালাল হারাম সম্পর্কিত উক্ত মূলনীতির আলোকে সম্মানিত ফকিহ ও ইসলামি স্কলারগণ একে হারাম বলেছেন।
তবে আবু দাউদে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত একটি হাদিসের আলোকে কিছু আলেম এটিকে মাকরুহ (অপছন্দনীয়) বলেছেন। তবে অধিকাংশ হাদিস বিশারদের মতে উক্ত হাদিসটি সহিহ নয়।
▪️উল্লেখ্য যে, আমাদের দেশে হাদিস অনুবাদ কারীদের কেউ কেউ আরবি الضب শব্দের অর্থ লিখেছেন, গুইসাপ। যার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। ‌অথচ এটি মারাত্মক ভুল। الضب অর্থ গুইসাপ নয় বরং সাণ্ডা। আর এই দুইটির মধ্যে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি। আল্লাহু আলম। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

মহিলাদের মাথার উপরে উঁচু করে চুলের ঝুঁটি বাঁধা হারাম হওয়ার বিধান কি ঘরে-বাইরে সর্বত্র প্রযোজ্য

 প্রশ্ন: মহিলাদের মাথার উপরে উঁচু করে চুলের ঝুঁটি বাঁধা হারাম হওয়ার বিধান কি ঘরে-বাইরে সর্বত্র প্রযোজ্য নাকি কেবল বাইরে প্রযোজ্য?

উত্তর: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণভাবে উটের কুঁজের মত করে মাথার উপরে উঁচু করে চুলের ঝুঁটি বাঁধতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং বাড়ির ভিতরে এবং বাইরে সর্বত্র একই বিধান। অর্থাৎ বাড়ির বাইরে যেমন তা হারাম বাড়ির ভিতরেও হারাম। কেননা বাড়িতে এমনটি করার অনুমতি বিষয়ে কোন হাদিস পাওয়া যায় না। সুতরাং সর্বক্ষেত্রে একই বিধান প্রযোজ্য হবে।
✅ ফতোয়া:
একজন মহিলা তার চুল জড়ো করে মাথার উপরে ঝুঁটি বাঁধার হুকুম কি যদি সে নিজ ঘরে থাকে?
প্রশ্ন: আমার প্রশ্ন হলো, একজন মহিলা তার চুল জড়ো করে মাথার উপর ঝুটি বেঁধে রাখলে তার কী হুকুম? আর যদি তাকে এতে নিষেধ করা হয়, সে বলে “নিষেধ তো তখনই যখন বাইরে বের হবে। কিন্তু ঘরের ভিতরে করলে তাতে কোনো সমস্যা নেই।” এ বিষয়ে আপনার মতামত কী, শাইখ? (আল্লাহ আপনাকে তাওফিক দিন)
উত্তর: হাদিসে এসেছে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«صنفان من أهل النار لم أرهما: قوم معهم سياطٌ كأذناب البقر يضربون بها الناس، ونساءٌ كاسياتٌ عارياتٌ مميلاتٌ مائلاتٌ، رؤوسهنَّ كأسنمة البُخت المائلة، لا يدخلنَ الجنة، ولا يجدنَ ريحها، وإن ريحها ليوجد من مسيرة كذا وكذا»
“জাহান্নামিদের মধ্যে এমন দুটি শ্রেণি আছে যাদের আমি এখনো দেখিনি:
– এক শ্রেণি: যাদের হাতে থাকবে গরুর লেজের মতো চাবুক। তারা সেসব দিয়ে মানুষকে মারবে‌।
– আর এক শ্রেণি হলো, এমন নারী, যারা পোশাক পরা হলেও যেন নগ্ন। তারা (পুরুষদেরকে) পথভ্রষ্ট করবে এবং নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে। তাদের মাথা হবে উটের কুঁজের মতো বাঁকা। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। এমনকি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ জান্নাতের ঘ্রাণ এত এত দূর থেকেও পাওয়া যায়।” [সহিহ মুসলিম: ২১২৮] সুতরাং যখন কোনো মহিলা তার চুলগুলো মাথার ওপরে জড়ো করে ঝুঁটি বাঁধে তখন তা উটের কুঁজের মতো হয়ে যায়। বিশেষ করে “বুখত” (البُخت) প্রজাতির উট যাদের দুটি কুঁজ থাকে: একটি মূল কুঁজ অপরটি তার পেছনে। অনুরূপভাবে নারীর মাথা ও তার পেছনের চুলের গাঁঠ সেই কুঁজ সদৃশ হয়ে যায়। ফলে সে এই হাদিসের আওতায় পড়ে। এটি কোনো অবস্থাতেই বৈধ নয়। সেই ব্যক্তির যে ভুল ধারণা আছে তা হলো: সে মনে করে, ঘরের ভিতরে এইভাবে চুল জড়ো করে রাখলে কোনো সমস্যা নেই! অথচ হারাম তো সব জায়গায়ই হারাম যদি না তা এমন কোনো বিষয়ের সঙ্গে জড়িত হয় যা কেবল বাইরের পরিবেশে প্রযোজ্য। যেমন: পর্দা বা বাইরে বের হওয়ার সময় সুগন্ধি ব্যবহার। এসব বিষয়ে যেমন পার্থক্য আছে (বাইরে নিষেধ, ঘরে বৈধ), কিন্তু চুল জড়ো করে উটের কুঁজের মতো করে রাখা এর অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা এটি এমন একটি বিষয়, যার ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ এসেছে:
يدخلنَ الجنة، ولا يجدنَ ريحها
“তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমনকি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।”
আল্লাহ আমাদেরকে আশ্রয় দিন। ইমাম মালেকের “মুওয়াত্তা” গ্রন্থে এমন একটি ইঙ্গিত এসেছে, যেখানে কিছু কাপড় (যেমন: লম্বা কাপড় পায়ের গোড়ালির নিচে ঝুলিয়ে পরিধান করা) যদি বাড়িতে থাকা অবস্থায় হয় এবং বাইরে পরিধান না করা হয় তবে তা পরা জায়েজ। কিন্তু এটা ইমাম মালেকের ইজতিহাদ (নিজস্ব গবেষণামূলক সিদ্ধান্ত অর্থাৎ এটি হাদিসে বর্ণিত আমভাবে টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করা হারাম হওয়ার বিধানের পরিপন্থী) সুতরাং উত্তম তো বটেই বরং অপরিহার্য হলো, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব বিষয়ে নিষেধ করেছেন সেগুলো থেকে পুরোপুরি বেঁচে থাকা। তাতেই মুক্তি নিহিত। আল্লাহু আলাম। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
ফতোয়া প্রদানে:
– শাইখ আব্দুল কারিম বিন আব্দুল্লাহ আল খুযাইর।
(সাবেক সৌদি, সিনিয়র ওলামা পরিষদ এবং স্থায়ী ফতোয়া ও গবেষণা বোর্ডের সদস্য)।
ফতোয়া অনুবাদক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

Monday, May 12, 2025

কবিরা গুনাহগারদের বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে তিনটি দল

 (১). খারেজি সম্প্রদায়: খারিজি’ শব্দটি আরবি ‘খুরুজ’ মূলধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ বাহির হওয়া বা সীমানা লঙ্ঘন করা। একবচনে বলা হয় ‘খারিজি’ এবং এর বহুবচন ‘খাওয়ারিজ’। আভিধানিক দৃষ্টিকোণে, ‘খারিজি’ বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়, যে তার সম্প্রদায়, গোত্র বা সমসাময়িকদের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায় এবং বিদ্রোহের পথে পা বাড়ায়। খারেজিদের আক্বীদা হচ্ছে,কবিরা গুনাহগার হলো কাফির, কবীরাগুনাহ বড় কুফরি। যা মিল্লাত (ইসলাম) থেকে বের করে দেয়। এরা বলে, যে কবীরাগুনাহ করবে, সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হবে। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ (মৃত: ৭২৮ হি.) বলেছেন, فَكانَ مِن أوَّلِ البِدَعِ والتَّفَرُّقِ الَّذِي وقَعَ فِي هَذِهِ الأُمَّةِ «بِدْعَةُ الخَوارِجِ» المُكَفِّرَةِ بِالذَّنْبِ “এই উম্মতের মধ্যে উদ্ভূত সর্বপ্রথম বিদআত ও বিভক্তি হলো খারেজিদের বিদআত; যারা (বড়ো কুফর নয় এমন) গুনাহের দরুন কাফির ফতোয়া দেয়।”(মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৪৭০)

.
(২). মুতাজিলা সম্প্রদায়: মু‘তাযিলা” (المعتزلة) শব্দটি এসেছে “ই‘তাযাল” (اعتزل) ক্রিয়াপদ থেকে, যার অর্থ বিচ্ছিন্ন হওয়া, আলাদা থাকা বা একাকীত্ব অবলম্বন করা। এই দার্শনিক মতবাদের উদ্ভব হয় হিজরী প্রথম শতকের শেষভাগ এবং দ্বিতীয় শতকের শুরুতে, যখন কিছু চিন্তাবিদ প্রচলিত ধারার চিন্তা থেকে সরে এসে স্বতন্ত্র মত প্রকাশ করেন। এদের আক্বীদা হচ্ছে, কবীরাগুনাহগার ব্যক্তি কাফির এবং মুমিন এই দুইয়ের মাঝখানে রয়েছে,এরা বলে,কবিরা গুনাহগার মুমিনও নয়, আবার কাফিরও নয়, বরং সে দুটো স্তরের মধ্যবর্তী স্তরের আওতাভুক্ত। আর এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে,এমনকি শাফা‘আতের মাধ্যমেও তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করা যাবে না। কারণ সে ঈমানহীনভাবে মৃত্যুবরণ করেছে। মু‘তাযিলা মতবাদের জনক ওয়াছিল বিন আতা বললেন,أنا لا أقول إن صاحب الكبيرة مؤمن مطلقا ولا كافر مطلقا بل هو في منزلة بين المنزلتين لا مؤمن ولا كافر “আমি কবীরাগুনাহকারীকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন বলব না এবং পূর্ণাঙ্গ কাফিরও বলব না। বরং তার অবস্থান উভয়ের মাঝামাঝি। না মুমিন না কাফির”(আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, ১ম খণ্ড, পৃ. ৪৫)
.
(৩). মুরজিয়া সম্প্রদায়: মুরজিয়া” (المرجئة) শব্দটি আরবি “إرجاء” ইরজা মূলধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো বিলম্ব করা, স্থগিত রাখা, বা পেছনে ঠেলে দেওয়া।যেমন: আল্লাহ তা’আলা বলেন, ফির’আউন বলেছিল, ‘আরিজহ ওয়া আখাহু’ [সূরা আল-আ’রাফ: ১১১] অর্থাৎ “মূসা ও তার ভাইকে একটু বিলম্ব করাও”। আর সে হিসেবে এদেরকে মুরজিয়া বলার কারণ তারা আমলকে ঈমানের সংজ্ঞায় প্রবেশ করায় না। তারা বলে, ঈমান হচ্ছে শুধু অন্তরে বিশ্বাসের নাম।এরা কবীরাগুনাহকে মুলতবি রাখে। এদের আক্বীদা হচ্ছে,কবিরা গুনাহগার পরিপূর্ণ ইমানওয়ালা মুমিন।কবীরাগুনাহ ঈমানের কোন ক্ষতি করে না। তার কোনো শাস্তি হবে না, এমনকি সে শাস্তির হকদারও হবে না। তাদের নিকট আমল ঈমানের রুকন নয়। সীমালঙ্ঘন বা পাপ কাজও ঈমানের কোন ক্ষতি করে না। যেমনভাবে কুফরী আনুগত্যের কোন ক্ষতি করতে পারে না। এরাই হল মুরজিয়া।।
.
পক্ষান্তরে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের মতে প্রতিদানপ্রাপ্তির দৃষ্টিকোণ থেকে কবিরা গুনাহগারের বিধান হচ্ছে কোনো ব্যক্তি যদি বড় গোনাহে লিপ্ত হয়, তবে সে তার গোনাহের কারণে সে আল্লাহর নির্ধারিত প্রতিদান তথা শাস্তির হকদার হবে। তবে এতে সে চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে না। বরং তার বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল আল্লাহ চাইলে ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে তাকে তার গোনাহ অনুযায়ী শাস্তি দেবেন,আবার তিনি চাইলে তাঁর অনুগ্রহে সম্পূর্ণ ক্ষমা করে দেবেন।”যেহেতু মহান আল্লাহ বলেছেন, إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ “নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরিক করা ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্য সব (গুনাহ) যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন।” [সুরা নিসা: ৪৮] এছাড়াও কুরআন সুন্নাহ’য় আরো বহু দলিল রয়েছে। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
______________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

সালাত আদায়ের সময় কোনো রুকন বা ওয়াজিব আদায় করেছেন কিনা এই বিষয়ে সন্দেহ হলে করণীয়

 প্রশ্ন: যদি কোনো ব্যক্তি সালাত আদায়ের সময় কোনো রুকন (আবশ্যিক অঙ্গ) বা ওয়াজিব (অবশ্য পালনীয় কাজ) আদায় করেছে কিনা এই বিষয়ে সন্দেহে পড়ে যায়, তাহলে সেই সন্দেহজনিত ভুল কীভাবে সংশোধন করবে?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর: সালাতে সন্দেহ হলো বৃদ্ধি ও কমতির মাঝে দ্বিধা। যেমন: কেউ যদি দ্বিধায় পড়ে যায় যে সে কি তিন রাকাআত সালাত পড়েছে; নাকি চার রাকাআত। এক্ষেত্রে তার দুই অবস্থা:
(১).হয়তো তার কাছে দুটির একটি প্রাধান্য পাবে: কমতি বা বৃদ্ধি; তাহলে তার কাছে যেটা প্রাধান্য পেয়েছে সেটার উপর ভিত্তি করে সে সালাত পূর্ণ করবে এবং সালাম ফেরানোর পর দুটি সাহু সিজদাহ দিবে।
.
(২).নতুবা তার কাছে দুটির কোনোটি প্রাধান্য পাবে না। তখন তার যতটুকুর উপর দৃঢ় বিশ্বাস আছে তথা কম সংখ্যা, ততটুকু ধরে নিয়ে সালাত পূর্ণ করবে এবং সালাম ফেরানোর আগে দুটি সাহু সিজদাহ দিবে।
উদাহরণস্বরূপ: এক ব্যক্তি যোহরের সালাত আদায় করছিল। সালাতের মাঝে তার সন্দেহ হল সে কি তৃতীয় রাকাআতে রয়েছে, নাকি চতুর্থ রাকাআতে? চিন্তা করে তার কাছে তৃতীয় রাকাআতের সম্ভাবনাই বেশি মনে হল। এক্ষেত্রে সে তৃতীয় রাকাআত ধরে নিয়ে আরও একটি রাকাআত আদায় করবে এবং সালামের পর দুটি সাহু সিজদাহ দিবে। অন্য একটি অবস্থা হচ্ছে যখন সন্দেহের দুটো দিকই সমান মনে হয়। যেমন কেউ যোহরের সালাতে রয়েছে এবং তার মনে হল সে কি তৃতীয় রাকাআতে আছে, না কি চতুর্থ? কিন্তু কোনটার দিকেই তার প্রবল ধারণা নেই; উভয়ের সম্ভাবনাই সমান মনে হচ্ছে। এই অবস্থায় তাকে একীনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থাৎ যে রাকাআত কম সেটাকেই একীন হিসেবে গ্রহণ করবে। ফলে সে তৃতীয় রাকাআত ধরে নিয়ে আরেকটি রাকাআত আদায় করবে এবং সালাম ফিরানোর পূর্বে দুটি সাহু সিজদাহ করবে তারপর সালাম ফিরিয়ে সালাত সম্পন্ন করবে।
.
এখন মনে করুন আপনি সালাতের সিজদা সংখ্যা নিয়ে সন্দেহে পড়েছেন; অর্থাৎ আপনি কি একটি সিজদা দিয়েছেন; না দুটি সিজদা দিয়েছেন এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে যান তাহলে আপনি একীনের (নিশ্চিত জ্ঞানের) উপর নির্ভর করবেন। একীন হচ্ছে ছোট সংখ্যাটি হিসাব করা। তাই আপনি শুধু একটি সিজদা দিয়েছেন ধরে নিয়ে দ্বিতীয় সিজদাটি আদায় করবেন। এরপর সালাম ফেরানোর আগে সহু সিজদা দিয়ে নেয়া উত্তম। এটি শাইখ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ)-এর অভিমত।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেন:
” أما إذا كان الشك في الصلاة ، فإنه يأتي بالسجدة ويبني على اليقين ، إذا شك هل سجد سجدة أو سجدتين يأتي بالسجدة الثانية سواء في الركعة الأولى أو الثانية أو الثالثة أو الرابعة ، ويسجد للسهو قبل السلام ، وإن سجد بعد السلام فلا بأس ، ولكن الأفضل قبل السلام “
“আর যদি সন্দেহটি সালাতের মধ্যে হয় তাহলে সে ব্যক্তি একীনের উপর নির্ভর করবে এবং সিজদাটি আদায় করবে। যদি সন্দেহ হয় এক সিজদা দিয়েছে, নাকি দুই সিজদা দিয়েছে তাহলে সে ব্যক্তি দ্বিতীয় সিজদাটি আদায় করবে। এটি প্রথম, কিংবা দ্বিতীয়, কিংবা তৃতীয় কিংবা চতুর্থ যে রাকাতের ক্ষেত্রে হোক না কেন। এরপর সালাম ফিরানোর পূর্বে সহু সিজদা দিবে; যদি সালাম ফিরানোর পরেও দেয় তাতে কোন অসুবিধা নেই। তবে আগে দেয়াই উত্তম”।(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১১; পৃষ্ঠা: ৩০)
.
কোনো কোনো আলেমের মতে সালাতের কোনো রুকন আদায়ে সন্দেহ হলে, তা সালাতের রাকাআতের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহের মতোই গণ্য হবে। যদি সন্দেহকারী নিশ্চিতভাবে বুঝতে না পারেন কোনটি সঠিক অর্থাৎ তার কাছে কোনো দিক প্রবল না মনে হয় তাহলে তাকে একীনের উপর নির্ভর করবে। একীন অর্থাৎ নিশ্চিত দিকটি, যা সাধারণত কম সংখ্যাটি হয়ে থাকে। এই অবস্থায় সে ব্যক্তি সালাম ফিরানোর পূর্বে সাহু সিজদা আদায় করবে। আর যদি তার কাছে কোনো একটি সম্ভাবনা প্রবল মনে হয়, তাহলে সে সেই প্রবল ধারণার ভিত্তিতে সালাত সম্পন্ন করবে এবং সালাম ফিরানোর পূর্বেই সাহু সিজদা আদায় করবে। যেমন:
মুরদাওয়ি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:قَوْلُهُ ( وَمَنْ شَكَّ فِي تَرْكِ رُكْنٍ : فَهُوَ كَتَرْكِهِ ) هَذَا الْمَذْهَبُ , وَعَلَيْهِ أَكْثَرُ الْأَصْحَابِ وَقَطَعَ بِهِ كَثِيرٌ مِنْهُمْ , وَقِيلَ : هُوَ كَتَرْكِ رَكْعَةٍ قِيَاسًا , فَيَتَحَرَّى ، وَيَعْمَلُ بِغَلَبَةِ الظَّنِّ“গ্রন্থকারের বক্তব্য: কারো কোনো একটি রুকন ছুটে গেছে সন্দেহ হওয়া সে রুকন আদৌ পালন না করার মতো , এটাই মাযহাবের অভিমত। মাযহাবের অধিকাংশ আলেম এ মতটি গ্রহণ করেছেন। তাদের অনেকে এ মতটিকে অকাট্য বলেছেন। কারো কারো মতে, এ মাসয়ালাটি কোনো একটি রাকাত ছেড়ে দেয়ার মাসায়ালার সাথে কিয়াসযোগ্য। তাই সে ব্যক্তি নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করবে এবং প্রবল ধারণার ভিত্তিতে আমল করবে।”
(আল-ইনসাফ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৫০)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]বলেন:
وإن شكَّ في تَرْكِ رُكن فكتركه أي : لو شَكَّ هل فَعَلَ الرُّكن أو تَرَكَه ، كان حكمه حكم مَنْ تركه .مثاله : قام إلى الرَّكعة الثانية ؛ فَشَكَّ هل سَجَدَ مرَّتين أم مرَّة واحدة ؟ … .وكان الشَّكُّ في تَرْكِ الرُّكن كالتَّرك ؛ لأن الأصل عدمُ فِعْله ، فإذا شَكَّ هل فَعَلَه ، لكن إذا غلب على ظَنِّه أنه فَعَلَه ؛ فعلى القول الرَّاجح وهو العمل بغلبة الظَّنِّ يكون فاعلاً له حكماً ، ولا يرجع ؛ لأننا ذكرنا إذا شَكَّ في عدد الركعات يبني على غالب ظَنِّهِ ، ولكن عليه سجود السَّهو بعد السلام
“যদি কারো কোনো একটি রুকন ছুটে গেছে সন্দেহ হয় সেটা কোনো রুকন ছেড়ে দেয়ার মতই”। অর্থাৎ সে ব্যক্তি যদি সন্দেহ করে যে, সে কি রুকনটি আদায় করেছে নাকি আদায় করেনি তার হুকুম হবে, যে ব্যক্তিটি আদৌ রুকনটি আদায় করেনি সে ব্যক্তির হুকুমের মতো। এর উদাহরণ হচ্ছে- কোনো মুসল্লি দ্বিতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর পর তার সন্দেহ হল সে কি সিজদা দুইটা দিয়েছে নাকি একটা দিয়েছে? কোনো কিছু আদায় না-করার সন্দেহ ঐ কাজটি আদৌ না-করার মতো। কারণ কোনো কিছু না-করা নিয়ে যখন সন্দেহ হয় তখন সে জিনিসের মূল অবস্থা হচ্ছে না-করা। কিন্তু তার যদি প্রবল ধারণা হয় যে, সে রুকনটি আদায় করেছে তাহলে অগ্রগণ্য মতানুযায়ী সে প্রবল ধারণার ভিত্তিতে নীতিগতভাবে সে রুকনটি আদায় করেছে ধরা হবে এবং তাকে এ রুকনটি পুনরায় আদায় করতে হবে না। কারণ আমরা ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, যদি কেউ সালাতের সংখ্যা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়ে তাহলে সে ব্যক্তি তার প্রবল ধারণার উপর নির্ভর করবে। তবে সালাম ফিরানোর পর তাকে সহু সিজদা দিতে হবে।”((ইবনু উসামীন, আশ-শারহুল মুমতি‘,আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৮৪)।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

কোন ভুলগুলোতে সাহু সিজদা দিতে হয় এবং কখন ও কোথায় দিতে হয়

 প্রশ্ন: সাহু সিজদার উদ্দেশ্য ও হিকমত কী? কোন ভুলগুলোতে এটি করা ওয়াজিব হয়? সাহু সিজদা কখন ও কোথায় আদায় করতে হয় এবং তাতে কী পড়া উচিত? কেউ যদি সাহু সিজদা না করেই সালাত শেষ করে, তবে তার সালাতের হুকুম কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর এখানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে আমরা প্রতিটি পয়েন্ট আলাদা আলাদা করে উল্লেখ করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
.
▪️প্রথমত: সাহু সিজদার উদ্দেশ্য ও হিকমত কী?
.
আল্লাহ তাআলার বান্দাদের প্রতি অপার রহমত ও এই পরিপূর্ণ দ্বীনের সৌন্দর্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো তিনি বান্দাদের ইবাদতে অনিবার্যভাবে ঘটে যাওয়া ত্রুটিগুলো পূরণ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। কেননা মানুষ ভুল-ভ্রান্তিমুক্ত নয়, আর এই ঘাটতি থেকে সম্পূর্ণরূপে রেহাই পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই আল্লাহ যেমন নফল ইবাদত, ক্ষমা প্রার্থনা এবং অনুরূপ বিভিন্ন উপায়ে এসব ঘাটতি পুষিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রেখেছেন, তেমনই, সালাতে সামান্য ভুল বা কমতি হলে তা পূরণের জন্য আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য ‘সাহু সিজদা’র বিধান দিয়েছেন। তবে এই বিধান সকল ভুলের জন্য নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু ভুল বা ঘাটতির ক্ষেত্রে এটি আরোপিত হয়েছে। প্রতিটি ভুল সাহু সিজদার মাধ্যমে পূরণযোগ্য নয়, আবার সব পরিস্থিতিতে সাহু সিজদা করা ওয়াজিবও নয়।
.
▪️দ্বিতীয়ত: সাহু সিজদার কারণসমূহ:
.
সাহু সিজদার কারণসমূহের ব্যাপারে শাইখ ইবনে উসাইমীন রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। তিনি উত্তর দেন: সাকুল্যে সালাতে সাহু সিজদার কারণ তিনটি:
.
(১). বৃদ্ধি:- অতিরিক্ত কিছু যোগ করা (বৃদ্ধি): এর উদাহরণ হলো কেউ যদি সালাতে একটি রুকু, একটি সিজদাহ, দাঁড়ানো বা বসার অতিরিক্ত কোনো অংশ করে ফেলে।
.
(২).কমতি:- কোনো কিছু বাদ দেওয়া (কমতি): এর উদাহরণ হলো সালাতের কোনো রুকন (অবশ্য করণীয় অংশ) বা ওয়াজিব (অবশ্য পালনীয় কাজ) কেউ ভুলক্রমে ফেলে দেয়।
.
(৩). সন্দেহ:- সন্দেহের উদাহরণ হলো: কোন ব্যক্তি সালাতের সংখ্যা নিয়ে দ্বিধা দ্বন্দ্বে পড়ে যাওয়া; যেমন কেউ রাকাআতের সংখ্যা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়; বুঝতে পারে না যে সে তিন রাকাত পড়েছে, নাকি চার।
.
▪️তৃতীয়ত: সাহু সিজদার স্থান এবং এতে কী পড়তে হয়?
.
সাহু সিজদার স্থান নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য মত হচ্ছে:
.
(ক).যদি সালাতে কোনো বৃদ্ধি (অর্থাৎ অতিরিক্ত কিছু করা) হয়ে যায়, তাহলে সালামের পর সাহু সিজদা দিতে হবে।
.
(খ).আর যদি কমতি হয় (অর্থাৎ কোনো ওয়াজিব বা সুন্নাত ছেড়ে যায়), তাহলে সালামের আগে সাহু সিজদা দিতে হবে।
.
(গ).আর যদি সন্দেহ সৃষ্টি হয়, তাহলে বিষয়টি কিছুটা বিশ্লেষণসাপেক্ষ। যদি দুটি সম্ভাবনার মধ্যে কোনোটিই স্পষ্টভাবে প্রাধান্য না পায়, তাহলে সালামের আগে সাহু সিজদা করবে। (দেখুন: ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ১৪-১৬)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন,
التشهد الأول في الصلاة واجب من واجباتها في أصح قولي العلماء ، لأن النبي صلى الله عليه وسلم كان يفعله ويقول : ( صلوا كما رأيتموني أصلي ) ، ولما تركه سهوا سجد للسهو ، فمن تركه عمدا بطلت صلاته ، ومن تركه سهوا جبره بسجود السهو قبل السلام
“আলেমদের দুই মতের মাঝে বিশুদ্ধ মত অনুসারে সালাতের প্রথম বৈঠকের তাশাহ্‌হুদ একটি ওয়াজিব। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটা করতেন এবং তিনি বলেছেন: “তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখছ সেভাবে সালাত আদায় করো।” এবং যেহেতু তিনি এটা ছেড়ে দেওয়ার প্রেক্ষিতে সাহু সিজদা দিয়েছিলেন। সুতরাং কেউ ইচ্ছাকৃত প্রথম বৈঠক ছাড়লে তার নামায বাতিল হয়ে যাবে। আর ভুল করে ছেড়ে দিলে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সালামের আগে সাহু সিজদা দিবে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৭; পৃষ্ঠা: ৮)
.
আর সাহু সিজদায় কি পড়তে হয় এই বিষয়ে কথা হচ্ছে, সালাতের সিজদার মতোই সাহু সিজদা আদায় করতে হয়। মুসল্লী সালাতের মতো করেই সাতটা হাড়ের উপর সাহু সিজদা আদায় করবে। ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আ‘লা’ এই পরিচিত যিকির পড়বে। দুই সিজদার মঝে ‘রাব্বিগফিরলি, রাব্বিগফিরলি’ পড়বে। সাহু সিজদার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো যিকির নেই। আলেমরা এটাই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। যেমন শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন;سُجُودُ السَّهْوِ سَجْدَتَانِ بَيْنَهُمَا جَلْسَةٌ , وَيُسَنُّ فِي هَيْئَتِهَا الافْتِرَاشُ ، وَيَتَوَرَّكُ بَعْدَهُمَا إلَى أَنْ يُسَلِّمَ , وَصِفَةُ السَّجْدَتَيْنِ فِي الْهَيْئَةِ وَالذِّكْرِ صِفَةُ سَجَدَاتِ الصَّلاةِ . وَاَللَّهُ أَعْلَمُ “ভুলজনিত সিজদা দুইটি। এ দুই সিজদার মাঝখানে একটি বৈঠক আছে। এই বৈঠকে ইফতিরাশ (ডান পা খাড়া রেখে, বাম পা বিছিয়ে এর উপর বসা) পদ্ধতিতে বসা এবং সিজদাদ্বয়ের পর সালাম ফিরানো পর্যন্ত তাওয়াররুক (ভূমির উপর নিতম্ব রেখে উভয় পা ডান দিকে বের করে বসা) পদ্ধতিতে বসা সুন্নত। এ সিজদাদ্বয়ের পদ্ধতি ও যিকির নামাযের সিজদাগুলোর মতো। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।”(নববী “আল-মাজমু” খণ্ড; ৪; পৃষ্ঠা: ৭২)
.
মারদাওয়ী তার ‘আল-ইনসাফ’ বইয়ে বলেন:سجود السهو وما يقول فيه وبعد الرفع منه كسجود الصلاة“সাহু সিজদায় যা পড়া হবে এবং এর থেকে ওঠার পর যা পড়া হবে সবই সালাতের সিজদার মতো।”(আল-ইনসাফ; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৫৯) রামলী তার ‘নিহায়াতুল মুহতাজ’ বইয়ে বলেন:وكيفيتهما ( يعني سجدتي السهو ) كسجود الصلاة في واجباته ومندوباته كوضع الجبهة والطمأنينة والافتراش في الجلوس بينهما“দুই সাহু সিজদার ধরন নামাযের সিজদার মতই; এর ওয়াজিব ও মুস্তাহাবগুলোর ক্ষেত্রে। যেমন: মাটিতে কপাল রাখা, স্থির হওয়া, ইফতিরাশ করা (দুই সিজদার মাঝখানে পায়ের উপর নিতম্ব রেখে বসা।)”(নিহায়াতুল মুহতাজ’ খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৮৮ থেকে সংক্ষেপে সমাপ্ত)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন:يقول الساجد في سجود السهو والتلاوة مثل ما يقول في سجوده في صلاته : ” سبحان ربي الأعلى ” والواجب في ذلك مرة واحدة ، وأدنى الكمال ثلاث مرات ، ويستحب الدعاء في السجود بما يسر الله من الأدعية الشرعية المهمة“ভুলজনিত সিজদা ও তেলাওয়াতের সিজদা দানকারী সালাতের সিজদাতে যা যা বলেন তাই বলবেন: سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلى (আমার সুউচ্চ প্রভুর পবিত্রতা ঘোষণা করছি)। একবার বলা ওয়াজিব। পরিপূর্ণ মাত্রা হচ্ছে: ন্যূনতম তিনবার বলা। সিজদাতে সাধ্যমত শরয়ী দোয়াগুলো পড়া মুস্তাহাব।”(”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৪৩)
.
উল্লেখ যে কিছু ফকীহ মনে করেন সাহু সিজদাতে
سُبْحَانَ مَنْ لَا يَسْهُوْ وَلَا يَنَامُ
(সুবহানা মান লা ইয়াসহু ওয়া-লা ইয়ানামু) অর্থ: আমি সেই সত্তার পবিত্রতা ঘোষণা করছি যিনি ঘুমান না এবং ভুলে যান না) পড়া মুস্তাহাব। কিন্তু এর পক্ষে কোনো দলীল নেই। সুতরাং সালাতের সিজদায় যা পড়া হয় তাতে সীমিত থাকায় শরয়ি বিধান; এছাড়া অন্য কোন যিকিরে ব্যক্তি অভ্যস্ত হবে না। এই বিষয়ে হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৭৩ হি: মৃত: ৮৫২ হি:] তার আত-তালখীস’ গ্রন্থে মন্তব্য করেছেন: আমি এর (পূর্বোক্ত দোয়ার) কোন ভিত্তি পাইনি।”(আত-তালখীস’;খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১২)
.
▪️চতুর্থত: কেউ যদি সাহু সিজদা না করেই সালাত শেষ করে, তবে তার সালাতের হুকুম কী?
.
আলেমগণ উল্লেখ করেছেন, ভুলক্রমে যে ব্যক্তির সাহু সিজদা ছুটে গেছে যদি খুব বেশি বিলম্ব না হয় তাহলে সে তখনি সেটা কাযা করে নিবে। আর যদি দীর্ঘ সময় বিলম্ব হয় তাহলে মুসল্লির উপর থেকে সাহু সিজদা আদায় করার দায়িত্ব বাদ যাবে এবং তার সালাত সহিহ হবে।
ইমাম আল-বুহুতি ((রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
( وَإِنْ نَسِيَهُ ) أَيْ : السُّجُودَ وَقَدْ نُدِبَ ( قَبْلَهُ ) أَيْ : السَّلَامُ ( قَضَاهُ ) وُجُوبًا إنْ وَجَبَ ( وَلَوْ ) كَانَ ( شُرِعَ فِي ) صَلَاةٍ ( أُخْرَى فَ ) يَقْضِيهِ ( إذَا سَلَّمَ ) مِنْهَا إنْ قَرُبَ الْفَصْلُ , وَلَمْ يُحْدِثْ , وَلَمْ يَخْرُجْ مِنْ الْمَسْجِدِ لِبَقَاءِ مَحَلِّهِ ( وَإِنْ طَالَ فَصْلٌ عُرْفًا , أَوْ أَحْدَثَ , أَوْ خَرَجَ مِنْ الْمَسْجِدِ لَمْ يَقْضِهِ ) أَيْ : السُّجُودَ لِفَوَاتِ مَحَلِّهِ ( وَصَحَّتْ ) صَلَاتُهُ , كَسَائِرِ الْوَاجِبَاتِ إذَا تَرَكَهَا سَهْوًا “
“কেউ যদি সালামের আগে আদায় করা মুস্তাহাব এমন কোন সাহু সিজদা দিতে ভুলে যায়; সে সাহু সিজদাটি যদি ওয়াজিব হয় তাহলে সে ব্যক্তি ওয়াজিব হিসেবে এটাকে কাযা করে নিবে। আর যদি অন্য কোনো সালাত শুরু করে দেয় তাহলে ঐ সালাতের সালাম ফিরানোর পর সাহু সিজদা কাযা করবে; যদি এর মধ্যে বেশি বিলম্ব না হয়; ওজু না ভাঙ্গে এবং মসজিদ থেকে বের না হয়। যেহেতু সিজদাটি আদায় করার সময় এখনো আছে। আর যদি প্রথা অনুযায়ী খুব দেরী হয়ে যায়, কিংবা ওজু ছুটে যায় কিংবা মসজিদ থেকে বেরিয়ে যায় তাহলে সাহু সিজদা আর কাযা করা যাবে না। যেহেতু এটি আদায় করার সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। তবে তার সালাত শুদ্ধ হবে। যেমন অন্য যে কোন ওয়াজিব ভুলক্রমে পরিত্যাগ করলেও সালাত শুদ্ধ হয়।”,(মুনতাহাল ইরাদাত; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ২৩৫)
.
যে ব্যক্তি এ মাসয়ালার বিধান জানে না এমন ব্যক্তি ও জেনে ভুলকারী উভয়ের জন্য হুকুম অভিন্ন। সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন: إذا كان تركه سجود السهو عمداً ، فصلاته باطلة وعليه إعادتها ، وإن كان تركه سهواً ، أو جهلاً ، فلا إعادة عليه وصلاته صحيحة “
যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে সাহু সিজদা ছেড়ে দেয় তাহলে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে এবং তাকে পুনরায় সালাত পড়তে হবে। আর যদি ভুলক্রমে কিংবা অজ্ঞতাবশত ছেড়ে দেয় তাহলে তাকে পুনরায় সালাত পড়তে হবে না। তার নামায সহিহ।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১০)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে,যদি কেউ নামাযের রাকাতে বেশি করে কিংবা কম করে এবং সাহু সিজদা না দেয় তাহলে তার সালাত কি বাতিল হয়ে যাবে?
তিনি জবাবে বলেন:
هذا فيه تفصيل : إذا كان عزم على ترك السجود وهو في الصلاة ، فهذا إذا تعمد ذلك ، وهو يعلم الحكم الشرعي : تبطل صلاته .أما إذا كان جاهلا أو ناسيا : ما تبطل ، وصلاته صحيحة …”
এক্ষেত্রে বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রয়োজন। যদি সে ব্যক্তি সাহু সিজদা দেয়ার হুকুম জানার পরও সালাতের মধ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে সাহু সিজদা না দেয় তাহলে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি অজ্ঞতাবশত কিংবা ভুলক্রমে সাহু সিজদা না দেয় তাহলে তার সালাত শুদ্ধ হবে।(বিন বায,ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব থেকে সংক্ষেপিত ও সমাপ্ত দেখুন শাইখের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ফাতওয়া নং-১০৮৬৬)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate