Monday, May 12, 2025

ঘড়ি কোন হাতে পরিধান করা সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী

 প্রশ্ন: ঘড়ি কোন হাতে পরিধান করা সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী। ডান হাতে নাকি বাম হাতে? একটি ভারসাম্যপূর্ণ পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬❂✿❂▬▬▬▬▬▬
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর ঘড়ি কোন হাতে পরিধান করা উত্তম এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কিংবা সাহাবায়ে কেরামের পক্ষ থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো স্পষ্ট দলিল প্রমাণিত হয়নি। কারণ, ঘড়ি একটি আধুনিক আবিষ্কার যা নবীজির যুগে ছিল না। ফলে এই বিষয়টি একটি ইজতিহাদী মাসআলা হিসেবে বিবেচিত। এই ইজতিহাদী মাসআলায় ইমামগণ সাধারণত আংটি পরিধান সংক্রান্ত হাদীসগুলোর উপর কিয়াস করে বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন। সেই পরিপ্রেক্ষিতে ‘ঘড়ি কোন হাতে পরিধান করা সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী এই বিষয়ে মোটামুটি তিনটি মত পাওয়া যায়।
.
▪️(১). একদল আলেমদের মতে ঘড়ি ডান হাতে পরিধান করা সুন্নত। এই মতের পক্ষে থাকা আলেমগণ: শাফেঈ মাজহাবের কিছু আলেম, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] শাইখ আব্দুল কারীম আল-খুদাইর, শাইখ ওয়ালিদ বিন রাশিদ আস-সাঈদান (হাফিজাহুল্লাহ)সহ আরো অনেকে। ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সিলসিলাতুল হুদা ওয়ান নূরে এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এই মতের আলেমদের পক্ষে দলিল হচ্ছে:
.
(ক).ইসলাম আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচারের পরিপূর্ণ নির্দেশনা দেয়। শরিয়তের অন্যতম মৌলিক নীতিমালা হলো সম্মানিত ও পবিত্র কাজসমূহ ডান হাত দিয়ে সম্পাদন করা এবং অশুচি বা হীন কাজসমূহ বাম হাত দিয়ে সম্পাদন করা, যাতে ডান দিকের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র ও উত্তম কাজগুলোয় ডান দিককে বিশেষভাবে পছন্দ করতেন এবং সেদিকেই অগ্রাধিকার দিতেন। যেমন:আম্মাজান আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُعْجِبُهُ التَّيَمُّنُ فِيْ تَنَعُّلِهِ وَتَرَجُّلِهِ وَطُهُوْرِهِ وَفِيْ شَأْنِهِ كُلِّهِ ‘নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জুতা পরিধান, চুল আঁচড়ানো এবং পবিত্রতা অর্জন করা তথা প্রত্যেক কাজই ডান দিক হতে আরম্ভ করতে পছন্দ করতেন”।(সহীহ বুখারী, হা/১৬৮)।
.
(খ).তাঁরা আরও বলেন, ডান হাতে ঘড়ি পরা কুফরীদের থেকে মুসলিমদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার একটি মাধ্যম কারণ অধিকাংশ কাফের বাম হাতে ঘড়ি পরিধান করে। আর রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে ইয়াহূদী ও নাসারাদের বিরোধিতা করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদের অনুকরণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।”রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত’(আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১; মিশকাত, হা/৪৩৪৭)
এটি প্রমাণ করে কা-ফের-মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করা খুবই মারাত্মক বিষয়, সেটা কথার মাধ্যমে সাদৃশ্য হোক কিংবা কর্মের মাধ্যমে, পোশাকের মাধ্যমে হোক কিংবা অভ্যাস, অনুষ্ঠান বা উৎসবের মাধ্যমে।
.
(গ).তারা আংটির ক্ষেত্রে কিয়াস করে থাকেন যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত ডান হাতে আংটি পরতেন, তাই তাঁরা ডান হাতেই ঘরি পরিধানকে অগ্রাধিকার দেন; যদিও কিছু হাদিসে বাম হাতে পরার উল্লেখও পাওয়া যায়।” আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত; রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ডান হাতে রূপার একটি আংটি পরিধান করেছেন। তাতে হাবশী মোহর ছিল। তিনি এর মোহরটি হাতের তালুর দিকে রাখতেন। (সহীহ মুসলিম হা/৫৩৮০) আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ডান হাতে আংটি পরতেন। (আহমাদ আল-মুসনাদ; ৩/২৬৫)। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন,নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আংটি ছিল এ আঙ্গুলে- এ কথা বলে তিনি বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলের দিকে ইঙ্গিত করেন।”(সহীহ মুসলিম হা/৫৩৮২) তবে অধিকাংশ হাদিস ডান হাতের পক্ষে।
.
(ঘ).ঘড়ি কেবল সময়ের পরিমাপই নয়, এটি পরিধানকারীর মর্যাদা, রুচি ও সৌন্দর্যবোধেরও প্রতীক। তাই যখন ঘড়িটি ডান হাতে পরিধান করা হয়, তখন তা বাহ্যিক সৌন্দর্যকে আরও পরিপূর্ণ করে তোলে। রাসূল (ﷺ) নিজেও সম্মানজনক ও পরিচ্ছন্নতার কাজগুলিতে ডান দিককে অগ্রাধিকার দিতেন, যা পূর্বে উল্লেখিত হয়েছে।”
.
(ঙ).তারা আরও বলেন, বাম হাতে ঘড়ি পরার ফলে এটি অজুর সময় বা পবিত্রতা রক্ষার ক্ষেত্রে নাপাকির সংস্পর্শে আসতে পারে, যা তহারাতের শুদ্ধতা ও সৌন্দর্যকে ব্যাহত করতে পারে। অথচ পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিধান। যেমন আবূ মালেক আল-আশআরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,”পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক”(সহীহ মুসলিম, হা/২২৩; মিশকাত, হা/২৮১)
.
▪️(২).অপর একদল আলেমের মতে, ঘড়ি বাঁ হাতে পরাই অধিক উত্তম। এ অভিমতের পক্ষে রয়েছেন ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) এবং কিছু মালিকি ফিকহবিদ। তাঁদের মতে, ডান হাতে আংটি পরা মাকরূহ; সুতরাং বাম হাতই শ্রেয়। ইবনু রজব হাম্বলি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য থেকেও স্পষ্ট হয় যে, তিনি বাঁ হাতে আংটি পরাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁদের দলিল—ডান হাতে আংটি পরার প্রচলন সাহাবাদের যুগে খুব বেশি ছিল না,বরং বাঁ হাতেই পরার নজির বেশি পাওয়া যায়। তাছাড়া, ডান হাত দিয়ে অন্যকে কিছু প্রদান করা ও গ্রহণ করা সুন্নাত; এই আদব রক্ষা করার স্বার্থেই ঘড়ি পরিধানে বাঁ হাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া যুক্তিসঙ্গত বলে তাঁরা মনে করেন।(বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৩৯৫৪০)।
.
▪️(৩).অন্য একদল আলেম বলেছেন, ঘড়ি পরার ক্ষেত্রে ডান বা বাম উভয় হাতই বৈধ। একজন ব্যক্তি নিজ সুবিধা ও স্বাচ্ছন্দ্যের ভিত্তিতে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে পারে। শরিয়তে এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা নেই, সুতরাং এ বিষয়ে কোনোটাই সুন্নাহর পরিপন্থী নয়।এই মতের পক্ষে রয়েছেন:সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা), বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ),ইমাম বিন বায,ইমাম ‘আব্দুল মুহসিন আল-‘আব্বাদ আল-বাদর,শাইখ বকর আবু যায়েদ তিনি ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ফাতওয়ার সমালোচনা করেন,এবং ইসলামিক প্রশ্নোত্তর সাইট (islamqa.info) তাদের দলিলসমূহ:
(১).আংটির উপর কিয়াস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ডান ও বাঁম উভয় হাতে আংটি পরেছেন, তাই ঘড়ি পরিধানের ক্ষেত্রে কোন একটি হাতকে নির্দিষ্ট করার কোন দলিল কিংবা নির্দিষ্ট কোন ফজিলত নেই।
.
(২).বাস্তবতা ও সুবিধার কথা বিবেচনা করলে, ডান হাতে ঘড়ি পরলে কাজ করার ক্ষেত্রে কিছু অসুবিধা হতে পারে অথবা ঘড়ি ভাঙার আশঙ্কা থাকতে পারে। অধিকাংশ ঘড়ির নকশা বাঁ হাতে পরার উপযোগী, কারণ এর সুইচ বা রিল সাধারণত ডান পাশেই থাকে। এছাড়া, ডান হাতে খাওয়ার সময় সময় দেখার জন্য বাঁ হাতটি বেশি সুবিধাজনক।”
.
(৩).ডান দিককে অগ্রাধিকার দেওয়ার হাদীসের প্রাসঙ্গিকতা সব কাজে নয়; বরং তা মূলত শুরু ও সমাপ্তির মতো নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ।”
.
(৪).অনেক কাফেরও ডান হাতে ঘড়ি পরেন তাই এটিকে কাফেরদের বিরোধিতার মানদণ্ডে বিবেচনা করা সঙ্গত নয়।” এই মতের পক্ষে কয়েকটি ফাতওয়া হল।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল; পুরুষদের জন্য ডান বা বাম হাতে ঘড়ি পরিধান বৈধ কিনা?
জবাবে স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেছেন, الأمر في ذلك واسع،فيجوز لبسها في اليمنى أو اليسرى للرجال والنساء كالخاتم.”এ বিষয়ে প্রশস্ততা রয়েছে, সুতরাং আংটির ন্যায় ঘড়িও নারী পুরুষ উভয়ের জন্য ডানহাতে কিংবা বামহাতে পরিধান করাতে কোন আপত্তি নেই”।(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ২৪; পৃষ্ঠা: ৮০: ফাতওয়া নং-৯৫৮৪)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,لا حرج في لبس الساعة في اليد اليمنى أو اليسرى،كالخاتم، وقد ثبت عن النبي ﷺ أنه لبس الخاتم في اليمنى واليسرى.» انتهى.”আংটির মত ঘড়ি ডানহাতে কিংবা বামহাতে পরতে কোন আপত্তি নেই। নবী ﷺ থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি ডানহাতে ও বামহাতে আংটি পরেছেন।”(ফাতাওয়া ইসলামিয়্যা, খন্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ২৫৫)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:وضع الساعة في اليد اليمنى ليس أفضل من وضعها في اليد اليسرى؛لأن الساعة أشبه ما تكون بالخاتم،فلا فرق بين أن تضع الساعة في اليمين أو اليسار،لكن لا شك أن وضعها في اليسار أيسر للإنسان،من ناحية التعبئة،ومن ناحية النظر إليها أيضاً،ثم هي أسلم في الغالب؛لأن اليمنى أكثر حركة فهي أخطر.والأمر في هذا واسع،فلا يقال:إن السنة أن تلبسها باليمين؛لأن السنة جاءت في اليمين واليسار في الخاتم، والساعة أشبه شيء به»انتهى.”ডানহাতে ঘড়ি পরা বামহাতে ঘড়ি পরার চেয়ে উত্তম নয়।কেননা ঘড়ির বিষয়টি আংটির কাছাকাছি। এ কারণে ঘড়ি ডানহাতে পরা কিংবা বামহাতে পরার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কিন্তু নিঃসন্দেহে বামহাতে পরা মানুষের জন্য সহজতর পরার দিক থেকে এবং ঘড়ি দেখার দিক থেকে। তাছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বামহাতে ঘড়ি পরাটা অধিক নিরাপদ।কেননা ডানহাতে বেশি কাজ করা হয়। তাই সেটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিষয়টিতে প্রশস্ততা রয়েছে।তাই এ কথা বলা যাবে না যে,ডানহাতে পরা সুন্নত।কেননা হাদিসে ডানহাতে ও বামহাতে আংটি পরার বিষয়টি উদ্ধৃত হয়েছে।ঘড়ি আংটির সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ।”(ইমাম উসামীন আশ-শারহুল মুমতি‘, আলা জাদিল মুস্তাকনি খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ১১০)
.
▪️এখন প্রশ্ন হচ্ছে উপরোক্ত তিনটি মতের মধ্যে কোনটি সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী?
.
জবাবে বলা যায় তিনটি মতের মধ্যে সুন্নাহ’র অধিক নিকটবর্তী হচ্ছে, ডান হাতে গড়ি পরিধান করা যেমনটি
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] ব্যাখ্যা করেছেন। ডান হাতে ঘড়ি পরিধান করা সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী বলে গণ্য হয়, কারণ এটি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে প্রমাণিত সকল ভালো কাজে ডান দিককে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। এতে রয়েছে অধিকাংশ কাফিরদের বিরোধিতা, আংটির মত ডান হাতে ব্যবহারের অনুরূপতা,এবং অপবিত্রতা থেকে পরিপূর্ণভাবে মুক্ত থাকার একটি মাধ্যম হিসেবেও ডান হাত ব্যবহারের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যদিও ঘড়ি পরার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বিধি-নিষেধ নেই, তবে যখন সুযোগ থাকে, ডান হাতে পরা উত্তম। তবে, যদি এমন কোনো পরিস্থিতি থাকে যেখানে ডান হাতে ঘড়ি পরলে তা ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেক্ষেত্রে বাঁ হাতে পরা বৈধ এবং এমনকি অনেক সময় সেটাও উত্তম হতে পারে।
.
বর্তমান সৌদি আরবের আক্বীদার অন্যতম আলেম শাইখ ওয়ালিদ বিন রাশিদ আস-সাঈদান (হাফিজাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: ঘড়ি ও আংটি কোন হাতে পরা উত্তম ডান হাতে, না বাম হাতে?
উত্তরে শাইখ বলেন:
الأمر في ذلك واسع، فأما الخاتم فقد ثبت أن النبي ? لبسه في اليمين تارة وفي شماله تارة، فيجوز هذا وهذا، وأما الساعة فلا نص فيها؛ لأنها واقعة جديدة ولنا فيها تخريجان: الأول: أن تقاس على الخاتم فيجوز لبسها في اليمين أو في الشمال فالأمر واحد. والثاني: أن تلبس في اليمين، وذلك لثلاثة أمور: أحدها: أنها من باب الكرامة والتجمل والتزين، ذلك لأن الإنسان لا يقصد بشرائها مجرد مراعاة الوقت فقط، بل يقصد منها أيضًا النواحي الجمالية، وقد تقرر أن ما كان من باب التكريم والتزيين فتقدم فيه اليمين.
الثاني: أن لبسها في اليسار هي العادة السائدة عند الكفار على مختلف طوائفهم ومن المعلوم أن المسلمين أخذوا هذه العادة منهم تقليدًا لهم في ذلك (1)، ومخالفة الكفار فيما هو من عاداتهم وعبادتهم مقصد من مقاصد الشريعة حتى وإن كان في الأشياء اليسيرة كفرق الشعر؛ لأنهم يسدلون، وحف الشارب؛ لأنهم لا يحفون، والصلاة في النعل؛ لأنهم لا يصلون فيها، وكراهة اشتمال الصماء فقيل إنها لبسة اليهود، وتحريم شد الزنار، وغيرها كثيرة فمخالفة الكفار عمومًا واليهود والنصارى خصوصًا مقصد من مقاصد الشريعة فإذا كان من عادتهم لبس الساعة في اليسار فنحن نخالفهم ونلبسها في اليمين وينوي الإنسان بذلك مخالفتهم فيثاب عليه.
الثالث: أن اليد اليسار هي آلة إزالة النجاسات والأشياء المستقذرة فيخشى عند لبسها في اليسار أن يتسرب لها شيء من النجاسات وخصوصًا إذا كانت واسعة وهذا مما يغلب على الظن وغلبة الظن منزلة منزلة اليقين فدرءاً لذلك تلبس في اليمين التي لا تعلق لها بإزالة شيء من ذلك، والنفس تطمئن للتخريج الثاني لكن الأمر واسع ولا أظن العاقل ينكر على من لبسها في هذه أو لبسها في هذه؛ لأن مسائل الاجتهاد لا إنكار فيها وهذه منها
“আমি বলি, এই ব্যাপারে ইসলামে ব্যাপকতা রয়েছে, অর্থাৎ এতে কোনো সংকীর্ণতা বা কঠোরতা নেই। আংটির ক্ষেত্রে, প্রমাণ রয়েছে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো ডান হাতে আংটি পরেছেন, আবার কখনো বাম হাতে। ফলে, উভয়ভাবে পরা বৈধ। আর ঘড়ির বিষয়ে এটি নতুন আবিষ্কৃত একটি বিষয়, যার বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট দলীল নেই। তবে আমরা এতে দুটি ব্যাখ্যার দিক নিতে পারি:
প্রথম ব্যাখ্যা হলো এটি আংটির উপর কিয়াস করে বলা যায়। যেহেতু আংটি দুই হাতে পরা যায়, ঘড়িও তেমনি ডান বা বাম যেকোনো হাতে পরা বৈধ। এতে কোনো সংকীর্ণতা নেই।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যা হলো ঘড়ি ডান হাতে পরা উচিত। এর তিনটি কারণ রয়েছে:
(১).এটি সৌন্দর্য, শোভা ও সম্মানের বস্তু হিসেবে গণ্য হয়। মানুষ কেবল সময় দেখার জন্যই ঘড়ি পরে না, বরং এটি অলঙ্কার হিসেবেও পরে। শরিয়তে যা কিছু সৌন্দর্য ও সম্মানের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, সেসব ক্ষেত্রে ডান হাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
(২).বাম হাতে ঘড়ি পরা হচ্ছে কা-ফিরদের সাধারণ অভ্যাস তাদের বিভিন্ন গোষ্ঠীতেই এটি প্রচলিত। মুসলিমরা মূলত তাদের অনুসরণ করেই এটি গ্রহণ করেছে। অথচ শরিয়তের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য হলো কা-ফিরদের অনুকরণ না করা, তা যত সামান্য বিষয়েই হোক না কেন। যেমন: চুল মাঝখান দিয়ে ভাগ করা কারণ তারা চুল ঝুলিয়ে রাখে; গোঁফ ছেঁটে রাখা কারণ তারা তা করে না; জুতা পায়ে নামায পড়া কারণ তারা তা করে না; ‘ইত্তিবা’ (চাদর একদিকে মোড়ানো) অপছন্দনীয়, কারণ এটি ইহুদিদের পোশাক বলা হয়; ‘যুননার’ (অবিশ্বাসীদের ধর্মীয় বেল্ট) পরা হারাম এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। সুতরাং, কা-ফিরদের বিশেষ করে ই-হুদি ও খ্রি-স্টানদের ভিন্নরূপ হওয়া শরিয়তের একটি উদ্দেশ্য। যদি তাদের রীতি হয় বাম হাতে ঘড়ি পরা, তবে আমরা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করব, ডান হাতে পরব; আর এই নিয়তে পরলে এতে সাওয়াবও পাওয়া যাবে।
(৩). বাম হাত সাধারণত অপবিত্রতা ও অশুচি জিনিস দূর করার কাজে ব্যবহৃত হয়। ফলে, যদি ঘড়ি বাম হাতে পরা হয়, বিশেষত যদি তা ঢিলা হয়, তবে অপবিত্রতা লাগার সম্ভাবনা থাকে। আর প্রবল ধারণাকে শরিয়তে নিশ্চিততার মর্যাদা দেওয়া হয়। তাই এই সম্ভাবনা থেকে বাঁচতে ডান হাতে ঘড়ি পরাই নিরাপদ ও উত্তম।
আমার ব্যক্তিগত অভিমত হল দ্বিতীয় ব্যাখ্যাই অধিক প্রশান্তিদায়ক। তবে বিষয়টি উন্মুক্ত (ব্যাপকতা রয়েছে), এতে কোনো কঠোরতা নেই। আমি মনে করি না কোনো বিবেকবান ব্যক্তি কাউকে দোষারোপ করবে সে ডান হাতে পরুক বা বাম হাতে। কারণ এটি ইজতিহাদি (ব্যক্তিগত মতভেদযোগ্য) বিষয়, আর ইজতিহাদি বিষয়ে দোষারোপ করা যায় না।” (তালকীহুল আফহাম আল-উলিয়্যাহ, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৭৬) (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
রচনাকাল: ভোর ৪টা ৪৯ মিনিট।
রোজ বুধবার।
৯ই জিলকদ, ১৪৪৬ হিজরি।
২৪শে বৈশাখ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ।
৭ই মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ।

জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে

 প্রশ্ন: জাতীয়তাবাদ (Nationalism) কী? জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে ইসলাম কী বলে?

▬▬▬▬▬▬▬▬◆◯◆▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’আলার জন্য। দুরুদ বর্ষিত হোক প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর। অতঃপর ইংরেজি Nationalism শব্দের বাংলা পরিভাষা হচ্ছে,জাতীয়তাবাদ।(Nationalism) হলো এমন একটি মতবাদ ও চিন্তাধারা, যার মাধ্যমে একটি জাতি তার স্বতন্ত্রতা, ঐক্য, সংস্কৃতি, ভাষা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সচেতন হয় এবং তা অর্জনের জন্য সংগ্রাম করে। অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ হল এমন একটি আদর্শ যেখানে জাতিকে মানব সমাজের কেন্দ্রীয় অবস্থানে স্থাপন করা হয় এবং অন্যান্য সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শকে জাতিগত আদর্শের পরে স্থান দেয়া হয়। জাতীয়তাবাদের সংজ্ঞায় অক্সফোর্ড ডিকশনারীতে বলা হয়েছে: Nationalism is the desire by a group of people who share the same race, culture, language etc. to form an independent country.” অর্থাৎ ‘জাতীয়তাবাদ হচ্ছে একই ভাষা, সংস্কৃতি, জাতি, গোষ্ঠী ইত্যাদির অংশীদার একদল মানুষের একটি স্বাধীন দেশ গঠনের আকাঙ্ক্ষা’।কার্ল্টন হেইস (Carleton Hayes) বলেন, জাতীয়তার সাংস্কৃতিক ভিত্তি হল, একই ভাষা এবং একই ঐতিহ্য। যখন এগুলো কোন শিক্ষা পদ্ধতির মাধ্যমে আবেগ তাড়িত দেশত্ববোধে পরিণত হয়, তখনই জন্ম নেয় জাতীয়তাবাদ।এই মতবাদের মৌলিক উপাদান ৬টি। (১) বংশ (২) অঞ্চল, (৩) ভাষা, (৪) বর্ণ, (৫) অর্থনৈতিক ঐক্য এবং (৬) শাসনতান্ত্রিক ঐক্য।উক্ত ছয়টি উপাদানের মধ্যে ধর্মকে স্থান দেয়া হয়নি। জাতীয়তাবাদ ধর্মকে নস্যাৎ করার প্রথম কোন বিজাতীয় মতবাদ। একই স্বার্থ ও ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে একটি জাতি বলে। আর ‘জাতি’ ভিত্তিক মতবাদকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে।(দেখুন: C. J. Hayes, Nationalism : A Religion (New York : Mcmillan, 1960 AD), p. 6.; ড.তাহির আমিন, জাতীয়তাবাদ ও আন্তর্জাতিকতাবাদ (ঢাকা : বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থ্যট, জুলাই ২০০৮ খৃ.),পৃষ্ঠা: ৩২ আল ইখলাস)
.
❑ জাতীয়তাবাদের উত্থান ও পতনের সময়কাল:
জাতীয়তাবাদ একটি আধুনিক ধারণা। গবেষকদের দৃষ্টিতে ফরাসী বিপ্লবের কিছু পূর্বে অর্থাৎ ১৭৮৯ খ্রীস্টাব্দের পূর্বে জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব ঘটে। ১৭৮৯ থেকে ১৯১৪ খ্রি. পর্যন্ত এর দ্বিতীয় যুগ। মানবতা বিধ্বংসী এই মতবাদের প্রবক্তা ছিলেন ইটালির ম্যাকিয়াভেলি (Machiavelli) এবং জার্মানির ফ্যাসিবাদের উদ্যোক্তা রক্ত পিপাসু হিটলার। এদেরকেই আধুনিক জাতীয়তাবাদের জনক বলা হয়।তবে ইংরেজরা জাতীয়তাবাদ বা জাতি সত্তার পথিকৃৎ।(source: bcssolutionbd) ১৮ শতক হল,জাতীয়তাবাদের উত্থানের যুগ। কিন্তু মতবাদটি এর অন্তর্নিহিত অর্থের কারণে ১৯১৪ সালের পর থেকে নেতিবাচক রূপ লাভ করে। গ্লেন্ডা স্লুগা বলেন, ২০শ শতাব্দী হল জাতীয়তাবাদের মোহমুক্তি এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের উন্মেষের সময়।(দেখুন/Glenda Sluga, Internationalism in the Age of Nationalism (University of Pennsylvania Press, 2013) ch 1]
.
❑ জাতীয়তাবাদ এর প্রকারভেদ:
.
জাতীয়তাবাদ (Nationalism) একটি বহুস্তরবিশিষ্ট ধারণা, যা ভিন্ন ভিন্ন ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি রূপ হলো:
(১). ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ: যখন ভাষা একটি জাতির প্রধান পরিচায়ক হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ—বাঙালি জাতীয়তাবাদ, আরব জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি।
.
(২). ভৌগোলিক বা রাষ্ট্রভিত্তিক জাতীয়তাবাদ: যখন নির্দিষ্ট ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য জাতীয়তাবাদের ভিত্তি হয়। যেমন—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি।
.
(৩). বর্ণভিত্তিক জাতীয়তাবাদ: জাতিগোষ্ঠী বা বর্ণের ওপর ভিত্তি করে গঠিত জাতীয়তাবাদ। যেমন কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদ, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ।
.
(৪). লিঙ্গভিত্তিক জাতীয়তাবাদ: যখন একটি লিঙ্গ বিশেষের অভিজ্ঞতা ও অধিকারকে জাতিসত্তার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। যেমন নারীবাদী বা পুরুষবাদী জাতীয়তাবাদ।
.
(৫).জাতিগোষ্ঠী বা নৃতাত্ত্বিক ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ: নির্দিষ্ট জাতিগোষ্ঠীর স্বকীয়তা, সংস্কৃতি ও অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জাতীয়তাবাদ। যেমন কুর্দি জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি।
.
❑ ইসলামি শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে জাতীয়তাবাদ:
.
জাতীয়তাবাদ ও এজাতীয় অন্যান্য মানবসৃষ্ট মতবাদ ইসলামের মৌলিক আক্বীদা বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক মানব-রচিত কুফরি মতবাদ,এগুলো ইসলামের মৌলিক আক্বীদা বিশ্বাস ও আদর্শের পরিপন্থী। এ দর্শন আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও আল্লাহর জন্য শত্রুতা পোষণের (‘আল-হুব্বু ফিল্লাহ ওয়াল-বুগযু ফিল্লাহ’) মত গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদার ভিত্তি ভেঙে দেয়। এতে করে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের বদলে জাতি, ভূখণ্ড ও ভাষার ভিত্তিতে বিভাজন সৃষ্টি হয়। ফলস্বরূপ, একজন কাফির জাতীয়ভাবে আপন হলেও, ঈমানদার ভিনদেশি মুসলিমের চেয়ে প্রিয় হয়ে ওঠে যা ‘আল-ওয়ালা ওয়াল-বারা’ নীতির স্পষ্ট লঙ্ঘন। এ দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিম সমাজে বিভ্রান্তি, বিভাজন ও আকীদাগত দুর্বলতার জন্ম দেয়। তাছাড়া মহান আল্লাহ তা’আলা মানবজাতির পথনির্দেশক হিসেবে একমাত্র সত্য ও পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলামকে মনোনীত করেছেন। এটি কোনো মানুষের চিন্তা-নির্ভর নয়; বরং তা খোদ বিশ্বজগতের স্রষ্টার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ চূড়ান্ত জীবনবিধান।সুতরাং ইসলাম ব্যতীত যেসব মতবাদ ও দর্শনের প্রচলন ঘটেছে—যেমন জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র প্রভৃতি—সেগুলো আল্লাহর দেওয়া দ্বীনের বিকল্প হতে পারে না এবং মুসলিমদের জন্য তা গ্রহণযোগ্য নয়। এসব মতবাদ ইসলামি আকিদা ও তাওহিদের পরিপন্থী হওয়ায়, কোনো মুসলিমের জন্য এসব বিশ্বাস করা বা অনুসরণ করা শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নয়।আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে ইরশাদ করেছেন:”ومن يبتغ غير الإسلام دينا فلن يقبل منه وهو في الآخرة من الخاسرين “যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো জীবনব্যবস্থা অনুসরণ করতে চায়, তা কখনোই গ্রহণযোগ্য হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।”(সূরা আলে ইমরান: ৮৫)এছাড়াও জাতীয়তাবাদ মূলত জাহেলী যুগে প্রচলিত গোত্র ও গোষ্ঠী ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার আধুনিক সংস্করণ। অথচ আল্লাহ তা‘আলা জাহেলী সভ্যতার দিকে ফিরে যেতে নিষেধ করেছেন (সূরা আল-মায়িদাহ:৫০)। রাসূল (ﷺ) যাবতীয় জাহেলী কর্মকাণ্ডকে কবর দিয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামী শাসনের সূচনা করেছেন।(সহীহ মুসলিম, পৃষ্ঠা: ৩৫৫, হা/১২১৮)
.
জাতীয়তাবাদী কবি ফখরী আল-বারুদী বলেছিলেন:
بلادُ العرب أوطاني من الشام لبغـدانِ
ومن نجدٍ إلى يَمَـنٍ إلى مصرَ فتَطوان
فلا حدٌّ يُباعدنــا ولا دينٌ يُفرِّقنــا
لسانُ الضاد يجمعنا بغسّانٍ وعدنــانِ
আরবদের দেশ আমার স্বদেশ
শাম থেকে বাগদাদ পর্যন্ত,
নাজদ থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত,
মিশর থেকে তেতুয়ান পর্যন্ত।
কোনো সীমান্ত আমাদের আলাদা করতে পারে না,
আর কোনো ধর্ম আমাদের বিভক্ত করতে পারে না।”(ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৯৭৭৩২)
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন:كل ما خرج عن دعوى الإسلام والقرآن من نسب أو بلد أو جنس أو مذهب أو طريقة: فهو من عزاء الجاهلية، بل لما اختصم مهاجري وأنصاري فقال المهاجري: يا للمهاجرين، وقال الأنصاري: يا للأنصار، قال النبي صلى الله عليه وسلم: «أبدعوى الجاهلية وأنا بين أظهركم وغضب لذلك غضبا شديدا» “ইসলাম এবং কুরআনের আহ্বানের বাইরে সকল বংশীয়, দেশ, জাতি, মাজহাব ও তরিকার আহ্বান জাহিলিয়াতের সাথে সম্পৃক্ত। একবার এক মুহাজির এবং এক আনসার সাহাবি বিবাদে লিপ্ত হলে মুহাজির ডাক দিয়ে বললেন, হে মুহাজিররা, তোমরা কে কোথায় আছো, জলদি ছুটে আসো-সাহায্য করো।” তখন আনসারি সাহাবীও ডেকে বললেন, হে আনসাররা, তোমাদের কে কোথায় আছো, জলদি ছুটে আসো-সাহায্য করো” তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,“জাহিলিয়াতের আহ্বান! অথচ আমি এখনো তোমাদের মাঝে বিদ্যমান আছি।” এতে তিনি প্রচণ্ড ক্রোধান্বিত হয়েছিলেন”।(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২৮; পৃষ্ঠা: ৩২৮; বিন বায; ইসলাম ও বাস্তবতার আলোকে আরব জাতীয়তাবাদের সমালোচনা; পৃষ্ঠা: ১৭)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: আপনার দৃষ্টিতে সে জাতীয়তাবাদী দাওয়াত সম্পর্কে কী মত, যারা মনে করে যে বংশগত বা ভাষাগত পরিচয় ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? অর্থাৎ যারা জাতীয়তাকে দ্বীনের ওপর অগ্রাধিকার দেয়?
তিনি উত্তর দিলেন:
هذه دعوة جاهلية ، لا يجوز الانتساب إليها ، ولا تشجيع القائمين بها , بل يجب القضاء عليها ؛ لأن الشريعة الإسلامية جاءت بمحاربتها والتنفير منها , وتفنيد شبههم ومزاعمهم والرد عليها بما يوضح الحقيقة لطالبها ؛ لأن الإسلام وحده هو الذي يخلد العروبة لغة ، وأدباً ، وخلقاً , وأن التنكر لهذا الدين معناه القضاء الحقيقي على العروبة في لغتها ، وأدبها ، وخلقها , ولذلك يجب على الدعاة أن يستميتوا في إبراز الدعوة إلى الإسلام بقدر ما يستميت الاستعمار في إخفائه .
ومن المعلوم من دين الإسلام بالضرورة أن الدعوة إلى القومية العربية أو غيرها من القوميات دعوة باطلة ، وخطأ عظيم ، ومنكر ظاهر ، وجاهلية نكراء ، وكيد للإسلام وأهله , وذلك لوجوه قد أوضحناها في كتاب مستقل سميته : ” نقد القومية العربية على ضوء الإسلام والواقع ” .
“এটি এক প্রকার জাহিলি (অজ্ঞতামূলক) দাওয়াত এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়া, সমর্থন জানানো কিংবা উৎসাহ দেওয়া কোনোভাবেই বৈধ নয়; বরং এটি মুছে ফেলা একান্ত জরুরি। কারণ ইসলামী শরিয়ত এসেছে এই ধরনের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষকে তা থেকে দূরে রাখার জন্য, তাদের সন্দেহ ও ভ্রান্ত যুক্তিগুলো খণ্ডন করে এবং সত্যকে স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করার জন্য যাতে সত্য অনুসরণকারীরা তা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। ইসলামই একমাত্র শক্তি যা আরবত্বকে এর ভাষা, সাহিত্য ও নৈতিক মূল্যবোধসহ টিকিয়ে রেখেছে এবং অমর করেছে। ফলে যে কেউ ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করে, সে প্রকৃতপক্ষে আরবত্বেরই বিরোধিতা করছে এর ভাষা, সাহিত্য ও চরিত্রের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিচ্ছে।এ কারণেই এক একজন দাঈ বা ইসলাম প্রচারকের উচিত, এমন নিষ্ঠা ও আত্মোৎসর্গের সঙ্গে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া, যেমনভাবে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো ইসলামের বিরুদ্ধাচরণে তাদের সামর্থ্য ব্যয় করেছে ও এখনো করে যাচ্ছে। এই বিষয়টি ইসলামের অন্যতম মৌলিক ও অপরিহার্য বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত বিষয় যে,আরব জাতীয়তাবাদ কিংবা যেকোনো জাতীয়তাবাদে দাওয়াত দেওয়া একটি বাতিল পথে আহ্বান, ভয়াবহ গোমরাহি, স্পষ্ট গুনাহ ও জঘন্য জাহিলিয়াতের প্রতিফলন। এটি ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ।এই বিষয়ে আমি একটি স্বতন্ত্র গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি, যার নাম: ‘ইসলাম ও বাস্তবতার আলোকে আরব জাতীয়তাবাদের সমালোচনা’।(ফাতাওয়া ইবনে বায, খণ্ড ৪, পৃ. ১৭৩; বিস্তারিত আলোচনা: খণ্ড ১, পৃ. ২৮০-৩১৮ পর্যন্ত।
.
শাইখ (রহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন:
إن من أعظم الظلم ، وأسفه السفه , أن يقارن بين الإسلام وبين القومية العربية , وهل للقومية المجردة من الإسلام من المزايا ما تستحق به أن تجعل في صف الإسلام , وأن يقارن بينها وبينه ؟ لا شك أن هذا من أعظم الهضم للإسلام ، والتنكر لمبادئه ، وتعاليمه الرشيدة , وكيف يليق في عقل عاقل أن يقارن بين قومية لو كان أبو جهل , وعتبة بن ربيعة , وشيبة بن ربيعة وأضرابهم من أعداء الإسلام أحياء لكانوا هم صناديدها وأعظم دعاتها , وبين دين كريم صالح لكل زمان ومكان , دعاته وأنصاره هم : محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم ، وأبو بكر الصديق , وعمر ابن الخطاب , وعثمان بن عفان , وعلي بن أبي طالب , وغيرهم من الصحابة ، صناديد الإسلام ، وحماته الأبطال , ومن سلك سبيلهم من الأخيار؟ لا يستسيغ المقارنة بين قومية هذا شأنها , وهؤلاء رجالها ، وبين دين هذا شأنه ، وهؤلاء أنصاره ودعاته , إلا مصاب في عقله , أو مقلد أعمى , أو عدو لدود للإسلام ، ومن جاء به ، وما مثل هؤلاء في هذه المقارنة إلا مثل من قارن بين البعر والدر , أو بين الرسل والشياطين , ومن تأمل هذا المقام من ذوي البصائر , وسبر الحقائق والنتائج : ظهر له أن المقارنة بين القومية والإسلام : أخطر على الإسلام من المقارنة بين ما ذكر آنفا ، ثم كيف تصح المقارنة بين قومية غاية من مات عليها النار , وبين دين غاية من مات عليه الفوز بجوار الرب الكريم , في دار الكرامة والمقام الأمين ؟ .اللهم اهدنا وقومنا سواء السبيل , إنك على كل شيء قدير .
“নিঃসন্দেহে সর্বপ্রকার জুলুমের মধ্যে এটি অন্যতম বড় জুলুম এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের মূর্খতা হলো ইসলামকে আরব জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তুলনা করা। একবার ভাবুন, ইসলামবিহীন জাতীয়তাবাদের এমন কী গুণ আছে, যা তাকে ইসলামের সমকক্ষ করে তোলে? (ইসলাম এবং জাতীয়তাবাদ) এই দুইয়ের মধ্যে কি আদৌ কোনো তুলনার অবকাশ আছে? এটা নিঃসন্দেহে ইসলামের প্রতি চরম অবিচার এবং তার মহান নীতিমালা ও জ্ঞানপূর্ণ শিক্ষার প্রকাশ্য অস্বীকৃতি। কোনো সুস্থ বিবেকবান মানুষ কীভাবে জাতীয়তাবাদ ও ইসলামের তুলনা করতে পারে? যখন আমরা দেখি, আবু জাহল, উতবা ও শায়বা ইবনু রাবি’আ এবং ইসলামবিরোধী এবং অন্যান্য কাফের ও ইসলামবিদ্বেষীরা যদি আজ বেঁচে থাকত, তবে তারাই হতো জাতীয়তাবাদের অগ্রগণ্য প্রচারক ও নেতৃত্বদানকারী। অপরদিকে, ইসলামের ধারক ও বাহক ছিলেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ মানব, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, এবং তাঁর অনুগত সাহাবীগণ আবু বকর সিদ্দীক, উমর ইবনুল খাত্তাব, উসমান ইবনু আফফান, আলী ইবনু আবি তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী সকল সৎকর্মপরায়ণ মানুষ। তাহলে কীভাবে কোনো বিবেকবান ব্যক্তি এমন একটি মতাদর্শ জাতীয়তাবাদের সঙ্গে তুলনা করতে পারে এমন একটি দ্বীনের, যার অনুসারীরা হলেন আল্লাহর প্রদত্ত আলোয় পথ চলা নবী, সাহাবা ও মুত্তাকিগণ? যে ব্যক্তি এই দুইয়ের মধ্যে তুলনা করে,সে হয় মস্তিষ্কবিকৃত,
অথবা অন্ধ অনুকরণকারী,অথবা ইসলামের দুশমন। এমন এক তুলনার উদাহরণ যা এমন, যেমন কেউ মুক্তার সঙ্গে কংকর তুলনা করে, অথবা নবীদের সঙ্গে শয়তানদের তুলনা করে।সুতরাং যে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, সে যদি চিন্তা করে ও সত্যের অনুসন্ধান করে, সে এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝতে পারবে—ইসলাম এবং জাতীয়তাবাদ কখনোই তুলনার উপযুক্ত নয়। এটি সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, জাতীয়তাবাদ ও ইসলামের মধ্যে তুলনা করা, পূর্বোক্ত তুলনার চেয়েও (মুক্তা ও কংকর, রাসূল ও শয়তান) ইসলামের জন্য আরও বিপজ্জনক।তারপর কিভাবে সঠিক হতে পারে এমন একটি তুলনা,যেখানে জাতীয়তাবাদের পরিণতি হলো: যে কেউ এই ধারণা নিয়ে মৃত্যুবরণ করে, তার গন্তব্য জাহান্নাম।আর ইসলামের পরিণতি হলো: যে এতে মৃত্যু বরণ করে, সে পৌঁছে যায় মহান প্রতিপালকের সান্নিধ্যে, মর্যাদার ঘরে, নিরাপদ আবাসে বা স্থানে। হে আল্লাহ! আমাদের হিদায়াত দাও এবং আমাদেরকে সরল পথে প্রতিষ্ঠিত রাখো, নিশ্চয়ই তুমি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাশালী।”(ফাতাওয়ে শায়েখ বিন বার খন্ড: ১ পৃষ্ঠা: ৩২০-৩২১)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! ইমাম বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) কর্তৃক প্রদত্ত ফাতওয়া দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী, যেখানে তিনি আরব জাতীয়তাবাদ এবং ইসলামের মধ্যে তুলনা করার বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। দ্বিতীয় ফাতওয়া তিনি ঐ ব্যক্তির হুকুম বর্ণনা করেছেন,যে ব্যক্তি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামের তুলনা করে। তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন এমন ব্যক্তি হয় বিকৃত মস্তিষ্কের অধিকারী, অন্ধ অনুকরণকারী, অথবা ইসলামের কঠিন শত্রু। যে ব্যক্তি জাতীয়তাবাদের প্রকৃতি জানে না, তার ক্ষেত্রে ওজরের সম্ভাবনা থাকতে পারে এবং সে হয়তো মাফযোগ্য ইনশাআল্লাহ। তবে যে ব্যক্তি ইসলামের প্রকৃতি জানে এবং তবুও বিশ্বাস করে যে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্ম, ব্যবস্থা বা মতবাদ শ্রেষ্ঠতর তাহলে সে নিঃসন্দেহে কা-ফির, এতে কোনো সংশয়ের অবকাশ নেই। মহান আল্লাহর কাছে দু’আ করছি তিনি যেন আমাদেরকে একমাত্র ইসলামী জীবন আদর্শকে আমাদের ব্যক্তি, পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, বিচার, প্রশাসন, শিক্ষানীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক ইত্যাদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে লালন এবং বাস্তবায়ন করার তৌফিক দান করেন এবং সব ধরণের ভ্রান্ত চিন্তাভাবনা, মানব রচিত মতবাদ ও মতাদর্শ থেকে রক্ষা করেন। আল্লাহুম্মা আমীন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◆◆▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি ।

Saturday, May 10, 2025

জিলকদ মাসের বৈশিষ্ট্য এবং এ মাসের সুন্নতি আমল

 হিজরি ক্যালেন্ডারের ১১ তম মাস হল, জিলকদ মাস। এর পরের মাসই জিলহজ মাস-যাতে ঐতিহাসিক আরাফার ময়দানে মুসলিম বিশ্বের সর্ব বৃহৎ গণ জমায়েত এবং ইসলামের ৫ম স্তম্ভ হজ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু হজের প্রস্তুতি শুরু হয় আরও বহু আগে থেকে। যাহোক, এ মাসটি ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদায় সমুজ্জ্বল। নিম্নে এ বিষয়ে অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল:

وبالله التوفيق وهو المستعان
❑ জিলকদ মাসের তিনটি অনন্য বৈশিষ্ট্য:
◈ ১. এ মাসের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল, এটি হজের তিনটি মাসের মধ্যে অন্যতম। আশহুরুল হজ বা হজের মাস হল, তিনটি। যথা:
ক. শাওয়াল,
খ. জিলকদ
গ. ও জিলহজ।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُومَاتٌ
“হজ অনুষ্ঠিত হয়, সুপরিচিত কয়েকটি মাসে।” [সূরা বাকারা: ১৯৭]
ইবনে উমর রা. বলেন,
” أَشْهُرُ الحَجِّ: شَوَّالٌ، وَذُو القَعْدَةِ، وَعَشْرٌ مِنْ ذِي الحَجَّةِ”
“হজের মাস হল, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজের দশ দিন।”
ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
” مِنَ السُّنَّةِ: أَنْ لاَ يُحْرِمَ بِالحَجِّ إِلَّا فِي أَشْهُرِ الحَجِّ”
” সুন্নত হল, হজের মাস ছাড়া অন্য মাসে হজের ইহরাম না বাধা।” [সহিহ বুখারি]
◈ ২. এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এটি চারটি হারাম (সম্মানিত ও নিষিদ্ধ মাস) মাসের মধ্যে একটি।
হারাম চারটি মাস হল:
ক. জিলকদ
খ. জিলহজ
গ. মুহাররম
ঘ. রজব
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ
“নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি হল, হারাম (সম্মানিত ও নিষিদ্ধ)। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম (পাপাচার) করো না।” [সূরা তওবা: ৩৬]
প্রখ্যাত সাহাবি আবু বাকরা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,
إن الزَّمَان قَدْ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللَّهُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ، السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلاَثَةٌ مُتَوَالِيَاتٌ: ذُو القَعْدَةِ وَذُو الحِجَّةِ وَالمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ، الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ” (رواه البخاري ومسلم).
“আল্লাহ তাআলা আসমান সমূহ এবং জমিন সৃষ্টির দিন যে আকৃতিতে সময়কে সৃষ্টি করেছিলেন সেটা আবার তার নিজস্ব আকৃতিতে ফিরে এসেছে। বারো মাসে এক বছর। তম্মধ্যে চারটি মাস হল, হারাম (অতি সম্মানিত ও নিষিদ্ধ)। তিনটি মাস ধারাবাহিক। সেগুলো হল: জিলকদ, জিলহজ এবং মুহররম এবং আরেকটি হল মুযার সম্প্রদায়ের রজব মাস যা জুমাদাল ঊলা এবং শাবানের মধ্যখানে রয়েছে।” [বুখারি ও মুসলিম]
❑ এ মাসগুলো হারাম হওয়ার কারণ:
ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
اختص الله أربعة أشهر جعلهن حرمًا، وعظَّم حرماتهن، وجعل الذنب فيهن أعظم، وجعل العمل الصالح والأجر أعظم
“আল্লাহ তাআলা বারো মাসের মধ্যে বিশেষভাবে চার মাসকে হারাম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং সেগুলোর বিশাল মর্যাদা দিয়েছেন, এগুলোতে পাপাচার করাকে আরও বেশি ভয়ানক করেছেন এবং নেক আমলের বিশাল প্রতিদানও নির্ধারণ করেছেন।” [তাফসিরে ইবনে কাসির]
◈ ৩. এ মাসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের পরে মোট চারটি ওমরা আদায় করেছেন। সেগুলোর মধ্যে হজের সাথে যে ওমরা করেছেন সেটি ছাড়া বাকি সবগুলোই আদায় করেছেন জিলকদ মাসে।
কাতাদা রা. হতে বর্ণিত, আনাস রা. তাকে এ তথ্য দিয়েছেন যে,
اعْتَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَرْبَعَ عُمَرٍ كُلُّهُنَّ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، إِلاَّ الَّتِي كَانَتْ مَعَ حَجَّتِهِ‏.‏ عُمْرَةً مِنَ الْحُدَيْبِيَةِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، وَعُمْرَةً مِنَ الْعَامِ الْمُقْبِلِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، وَعُمْرَةً مِنَ الْجِعْرَانَةِ حَيْثُ قَسَمَ غَنَائِمَ حُنَيْنٍ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، وَعُمْرَةً مَعَ حَجَّتِهِ‏.‏
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি ওমরা পালন করেছেন। তিনি হজের সাথে যে ওমরাটি পালন করেছিলেন সেটি ব্যতীত সবকটিই জিলকদ মাসে পালন করেছেন।
– হুদায়বিয়া নামক স্থানে যে ওমরাটি পালন করেছিলেন সেটি ছিল জিলকদ মাসে,
– তার পরের মাসে যে ওমরা পালন করেছেন সেটাও জিলকদ মাসে
– এবং হুনাইনের গনিমত (যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ) যে জিরানা নামক স্থানে বণ্টন করেছিলেন, সেখান থেকে যে ওমরাটি করা হয়েছিল তাও ছিল জিলকদ মাসে।
– আর তিনি হজের সাথে একটি ওমরা পালন করেন।”
[সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৫১/ মাগাযী (যুদ্ধ-অভিযান), পরিচ্ছেদ: ২১৯৯. হুদায়বিয়ার যুদ্ধ। মহান আল্লাহর বাণী: لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ “মুমিনগণ যখন গাছের নিচে আপনার নিকট বয়াত গ্রহণ করল তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন…।” [সূরা আল ফাতহ: ১৮]
◍ জিলকদ মাসে ওমরা করার কারণ কী?
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজের সাথে যে ওমরা আদায় করেছেন সেটা ছাড়া বাকি ৩টি ওমরা আদায় করেছেন জিলকদ মাসে। এর কারণ হিসেবে আলেমগণ বলেছেন, ইসলাম পূর্ব জাহেলি যুগে এ মাসে ওমরা করাকে খুবই গুনাহের কাজ মনে করা হত। তাই তিনি এ মাসে একাধিক ওমরা করার মাধ্যমে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছেন যে, জাহেলি যুগের ধারণা ভ্রান্ত-বাতিল এবং এ মাসে ওমরা করা জায়েজ।
وقال النووي :
قال العلماء : وإنما اعتمر النبي صلى الله عليه وسلم هذه العُمَر في ذي القعدة لفضيلة هذا الشهر ولمخالفة الجاهلية في ذلك فإنهم كانوا يرونه ( أي الإعتمار في ذي القعدة ) من أفجر الفجور كما سبق ففعله صلى الله عليه وسلم مرات في هذه الأشهر ليكون أبلغ في بيان جوازه فيها وأبلغ في إبطال ما كانت الجاهلية عليه ، والله أعلم .
” شرح مسلم ” ( 8 / 235 ) .
◍ জিলকদ মাসে ওমরা করা কি সুন্নত?
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক এ মাসে একাধিক ওমরা করার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। সে কারণে অনেক আলেম জিলকদ মাসে ওমরা করাকে সুন্নত বলেছেন। যদিও তা যে কোনও সময় করা জায়েজ।
– শাইখ বিন বায রাহ. বলেন, সবচেয়ে মর্যাদা পূর্ণ রোজা হল, রমজান মাসে রোজা করা। কেননা তা হজের সমান। এর পরেই জিলকদ মাসে ওমরা করা উত্তম।
فضل زمان تؤدي فيه العمرة شهر رمضان؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم “عمرة في رمضان تعدل حجة”. متفق على صحته، وفي رواية أخرى في البخاري “تقضي حجة معي”، وفي مسلم “تقضي حجة أو حجة معي” ــ هكذا بالشك ــ يعني معه عليه الصلاة والسلام، ثم بعد ذلك العمرة في ذي القعدة؛ لأن عمره كلها، صلى الله عليه وسلم، وقعت في ذي القعدة، وقد قال الله سبحانه (لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة). وبالله التوفيق
– আল্লামা উসাইমিন, হজের মাসগুলোতে ওমরা করাকে সুন্নত বলেছেন।
وتسن أيضاً في أشهر الحج، وهي شوال وذو القعدة وذو الحجة؛ لأن النبي صلّى الله عليه وسلّم خصها بالعمرة.
আল্লাহু আলাম।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

Sunday, May 4, 2025

জিলকদ মাসের বৈশিষ্ট্য এবং এ মাসের সুন্নতি আমল

 হিজরি ক্যালেন্ডারের ১১ তম মাস হল, জিলকদ মাস। এর পরের মাসই জিলহজ মাস-যাতে ঐতিহাসিক আরাফার ময়দানে মুসলিম বিশ্বের সর্ব বৃহৎ গণ জমায়েত এবং ইসলামের ৫ম স্তম্ভ হজ অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু হজের প্রস্তুতি শুরু হয় আরও বহু আগে থেকে। যাহোক, এ মাসটি ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদায় সমুজ্জ্বল। নিম্নে এ বিষয়ে অতি সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল:

وبالله التوفيق وهو المستعان
❑ জিলকদ মাসের তিনটি অনন্য বৈশিষ্ট্য:
◈ ১. এ মাসের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হল, এটি হজের তিনটি মাসের মধ্যে অন্যতম। আশহুরুল হজ বা হজের মাস হল, তিনটি। যথা:
ক. শাওয়াল,
খ. জিলকদ
গ. ও জিলহজ।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
الْحَجُّ أَشْهُرٌ مَعْلُومَاتٌ
“হজ অনুষ্ঠিত হয়, সুপরিচিত কয়েকটি মাসে।” [সূরা বাকারা: ১৯৭]
ইবনে উমর রা. বলেন,
” أَشْهُرُ الحَجِّ: شَوَّالٌ، وَذُو القَعْدَةِ، وَعَشْرٌ مِنْ ذِي الحَجَّةِ”
“হজের মাস হল, শাওয়াল, জিলকদ ও জিলহজের দশ দিন।”
ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
” مِنَ السُّنَّةِ: أَنْ لاَ يُحْرِمَ بِالحَجِّ إِلَّا فِي أَشْهُرِ الحَجِّ”
” সুন্নত হল, হজের মাস ছাড়া অন্য মাসে হজের ইহরাম না বাধা।” [সহিহ বুখারি]
◈ ২. এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এটি চারটি হারাম (সম্মানিত ও নিষিদ্ধ মাস) মাসের মধ্যে একটি।
হারাম চারটি মাস হল:
ক. জিলকদ
খ. জিলহজ
গ. মুহাররম
ঘ. রজব
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ
“নিশ্চয় আল্লাহর বিধান ও গণনায় মাস বারটি, আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকে। তন্মধ্যে চারটি হল, হারাম (সম্মানিত ও নিষিদ্ধ)। এটিই সুপ্রতিষ্ঠিত বিধান। সুতরাং এর মধ্যে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম (পাপাচার) করো না।” [সূরা তওবা: ৩৬]
প্রখ্যাত সাহাবি আবু বাকরা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,
إن الزَّمَان قَدْ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللَّهُ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضَ، السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلاَثَةٌ مُتَوَالِيَاتٌ: ذُو القَعْدَةِ وَذُو الحِجَّةِ وَالمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ، الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ” (رواه البخاري ومسلم).
“আল্লাহ তাআলা আসমান সমূহ এবং জমিন সৃষ্টির দিন যে আকৃতিতে সময়কে সৃষ্টি করেছিলেন সেটা আবার তার নিজস্ব আকৃতিতে ফিরে এসেছে। বারো মাসে এক বছর। তম্মধ্যে চারটি মাস হল, হারাম (অতি সম্মানিত ও নিষিদ্ধ)। তিনটি মাস ধারাবাহিক। সেগুলো হল: জিলকদ, জিলহজ এবং মুহররম এবং আরেকটি হল মুযার সম্প্রদায়ের রজব মাস যা জুমাদাল ঊলা এবং শাবানের মধ্যখানে রয়েছে।” [বুখারি ও মুসলিম]
❑ এ মাসগুলো হারাম হওয়ার কারণ:
ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
اختص الله أربعة أشهر جعلهن حرمًا، وعظَّم حرماتهن، وجعل الذنب فيهن أعظم، وجعل العمل الصالح والأجر أعظم
“আল্লাহ তাআলা বারো মাসের মধ্যে বিশেষভাবে চার মাসকে হারাম হিসেবে নির্ধারণ করেছেন এবং সেগুলোর বিশাল মর্যাদা দিয়েছেন, এগুলোতে পাপাচার করাকে আরও বেশি ভয়ানক করেছেন এবং নেক আমলের বিশাল প্রতিদানও নির্ধারণ করেছেন।” [তাফসিরে ইবনে কাসির]
◈ ৩. এ মাসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের পরে মোট চারটি ওমরা আদায় করেছেন। সেগুলোর মধ্যে হজের সাথে যে ওমরা করেছেন সেটি ছাড়া বাকি সবগুলোই আদায় করেছেন জিলকদ মাসে।
কাতাদা রা. হতে বর্ণিত, আনাস রা. তাকে এ তথ্য দিয়েছেন যে,
اعْتَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَرْبَعَ عُمَرٍ كُلُّهُنَّ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، إِلاَّ الَّتِي كَانَتْ مَعَ حَجَّتِهِ‏.‏ عُمْرَةً مِنَ الْحُدَيْبِيَةِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، وَعُمْرَةً مِنَ الْعَامِ الْمُقْبِلِ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، وَعُمْرَةً مِنَ الْجِعْرَانَةِ حَيْثُ قَسَمَ غَنَائِمَ حُنَيْنٍ فِي ذِي الْقَعْدَةِ، وَعُمْرَةً مَعَ حَجَّتِهِ‏.‏
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চারটি ওমরা পালন করেছেন। তিনি হজের সাথে যে ওমরাটি পালন করেছিলেন সেটি ব্যতীত সবকটিই জিলকদ মাসে পালন করেছেন।
– হুদায়বিয়া নামক স্থানে যে ওমরাটি পালন করেছিলেন সেটি ছিল জিলকদ মাসে,
– তার পরের মাসে যে ওমরা পালন করেছেন সেটাও জিলকদ মাসে
– এবং হুনাইনের গনিমত (যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ) যে জিরানা নামক স্থানে বণ্টন করেছিলেন, সেখান থেকে যে ওমরাটি করা হয়েছিল তাও ছিল জিলকদ মাসে।
– আর তিনি হজের সাথে একটি ওমরা পালন করেন।”
[সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৫১/ মাগাযী (যুদ্ধ-অভিযান), পরিচ্ছেদ: ২১৯৯. হুদায়বিয়ার যুদ্ধ। মহান আল্লাহর বাণী: لَّقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ “মুমিনগণ যখন গাছের নিচে আপনার নিকট বয়াত গ্রহণ করল তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেন…।” [সূরা আল ফাতহ: ১৮]
◍ জিলকদ মাসে ওমরা করার কারণ কী?
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজের সাথে যে ওমরা আদায় করেছেন সেটা ছাড়া বাকি ৩টি ওমরা আদায় করেছেন জিলকদ মাসে। এর কারণ হিসেবে আলেমগণ বলেছেন, ইসলাম পূর্ব জাহেলি যুগে এ মাসে ওমরা করাকে খুবই গুনাহের কাজ মনে করা হত। তাই তিনি এ মাসে একাধিক ওমরা করার মাধ্যমে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছেন যে, জাহেলি যুগের ধারণা ভ্রান্ত-বাতিল এবং এ মাসে ওমরা করা জায়েজ।
وقال النووي :
قال العلماء : وإنما اعتمر النبي صلى الله عليه وسلم هذه العُمَر في ذي القعدة لفضيلة هذا الشهر ولمخالفة الجاهلية في ذلك فإنهم كانوا يرونه ( أي الإعتمار في ذي القعدة ) من أفجر الفجور كما سبق ففعله صلى الله عليه وسلم مرات في هذه الأشهر ليكون أبلغ في بيان جوازه فيها وأبلغ في إبطال ما كانت الجاهلية عليه ، والله أعلم .
” شرح مسلم ” ( 8 / 235 ) .
◍ জিলকদ মাসে ওমরা করা কি সুন্নত?
আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক এ মাসে একাধিক ওমরা করার বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। সে কারণে অনেক আলেম জিলকদ মাসে ওমরা করাকে সুন্নত বলেছেন। যদিও তা যে কোনও সময় করা জায়েজ।
– শাইখ বিন বায রাহ. বলেন, সবচেয়ে মর্যাদা পূর্ণ রোজা হল, রমজান মাসে রোজা করা। কেননা তা হজের সমান। এর পরেই জিলকদ মাসে ওমরা করা উত্তম।
فضل زمان تؤدي فيه العمرة شهر رمضان؛ لقول النبي صلى الله عليه وسلم “عمرة في رمضان تعدل حجة”. متفق على صحته، وفي رواية أخرى في البخاري “تقضي حجة معي”، وفي مسلم “تقضي حجة أو حجة معي” ــ هكذا بالشك ــ يعني معه عليه الصلاة والسلام، ثم بعد ذلك العمرة في ذي القعدة؛ لأن عمره كلها، صلى الله عليه وسلم، وقعت في ذي القعدة، وقد قال الله سبحانه (لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة). وبالله التوفيق
– আল্লামা উসাইমিন, হজের মাসগুলোতে ওমরা করাকে সুন্নত বলেছেন।
وتسن أيضاً في أشهر الحج، وهي شوال وذو القعدة وذو الحجة؛ لأن النبي صلّى الله عليه وسلّم خصها بالعمرة.
আল্লাহু আলাম।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

Monday, April 21, 2025

নির্দিষ্ট করে কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামী বলা যাবে কি

 প্রশ্ন: নির্দিষ্ট করে কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামী বলা যাবে কি? এই বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আক্বীদা কি?

▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর নিদিষ্ট করে কাউকে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলার ক্ষেত্রে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বক্তব্য বা মূলনীতি হলো, মহান আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল (ﷺ) যাদের সম্পর্কে জান্নাতী অথবা জাহান্নামী হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ঘোষণা করেছেন শুধু তাদেরকেই জান্নাতী অথবা জাহান্নামী বলা যাবে, এর বাহিরে অন্য কাউকে নয়। কারন এগুলো আক্বীদার বিষয় যা কুরআন সুন্নাহর দলিল নির্ভর হতে হবে, এ ব্যাপারে কোনো যুক্তি বা ইজতিহাদের অবকাশ নেই। তাছাড়া কেউ জান্নাতের কাজ করলেই তাকে জান্নাতী এবং জাহান্নামের কাজ করলেই তাকে জাহান্নামী মনে করা ঠিক নয়। হতে পারে সে মরণের পূর্বে অথবা আল্লাহর কাছে তার বিপরীত হতে পারে যার একাধিক প্রমাণ হাদিসে রয়েছে। সুতরাং ইসলামি শরীয়তের (কুরআন ও সুন্নাহ) দলিলের ভিত্তিতে যাদের জান্নাতী বা জাহান্নামী বলে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে, আমরা কেবল তাদের ক্ষেত্রেই সে রকম সিদ্ধান্ত দিতে পারি। এর বাইরে সাধারণ মানুষ সম্পর্কে নিশ্চিত করে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলা আমাদের জন্য জায়েজ নয়। বরং যারা ঈমান ও সৎকর্মে জীবনযাপন করে তাদের জন্য আমরা আল্লাহর কাছে জান্নাতের আশা রাখি ইন শাহ্ আল্লাহ। আর যারা পাপে নিমগ্ন তাদের ব্যাপারে আল্লাহর শাস্তির ভয় করি। কেননা সকল মানুষের শেষ পরিণতি সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: বিন বায: মাজমূঊ ফাতাওয়া: খণ্ড: ২৫; পৃষ্ঠা: ১২১; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব,ফাতওয়া নং-৭৩১)।
.
শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে কাউকে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলে ঘোষণা করা দু-ধরনের হয়ে থাকে।

(১) সাধারণ গুণ বা কর্মের ভিত্তিতে সাধারণভাবে জান্নাতি কিংবা জাহান্নামী বলা: এ ধরনের বর্ণনায় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য না করে সাধারণভাবে বলা হয়ে থাকে। যেমন “যে ব্যক্তি ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে,সে জান্নাতের অধিকারী হবে” অথবা “যে ব্যক্তি কুফরি বা শিরক করে, তার পরিণতি জাহান্নাম” অর্থাৎ যে ব্যক্তি বড় শিরকে জড়িয়ে পড়ে, সে নিঃসন্দেহে ইসলাম থেকে বিচ্যুত হয়ে কাফের হিসেবে গণ্য হয়। ফলে তওবা ব্যতীত মৃত্যুবরণ করলে কুরআন ও সুন্নাহের অকাট্য প্রমাণ অনুযায়ী তার গন্তব্যস্থল হবে জাহান্নাম। অনুরূপভাবে আমরা জানি যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় রমাদান মাসে রোযা রাখে তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়। আবার যে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজ্জ সম্পাদন করে তার জন্য প্রতিদান হলো জান্নাত। সুতরাং নির্দিষ্ট কিছু বিশ্বাস ও কর্মের উপর ভিত্তি করে কুরআন ও সুন্নাহয় এমন বহু প্রমাণ রয়েছে, যা জান্নাত ও জাহান্নামের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করে।

উদাহরণস্বরূপ: যদি কেউ প্রশ্ন করে এক ব্যক্তি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কারো নিকট দোয়া করে, সাহায্য চায়, তাহলে সে জান্নাতী নাকি জাহান্নামী? উত্তরে বলা হবে কেউ যদি আল্লাহকে ছেড়ে অন্য কারো নিকট দোয়া করে বা সাহায্য প্রার্থনা করে তাহলে সে এক মহাপাপে লিপ্ত হয়েছে, যা তাওহীদের স্পষ্ট বিরোধিতা। যদি সে এই শিরক থেকে তাওবা না করে মৃত্যুবরণ করে, তবে সে কুফরীর অবস্থায় মারা যাবে এবং তার পরিণাম ভয়াবহ জাহান্নাম। কারণ, সে আল্লাহর একত্ববাদের পরিপন্থী এক গুরুতর গোনাহে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অটল ছিল। অন্যদিকে, যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে হজ্ব পালন করে এবং হজের সময় নিজেকে অশ্লীলতা, গুনাহ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে, অতঃপর সে মৃত্যু বরণ করে ইন শাহ্ আল্লাহ তাহলে আমরা আমভাবে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছে জান্নাতের আশা করতে পারি এবং তাদের জন্য জান্নাত লাভের দোয়া করতে পারি। অথবা যে ব্যক্তি মৃত্যুর সময় “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” উচ্চারণ করে তাওহীদের সাক্ষ্য দিয়ে বিদায় নেয়, তার জন্যেও জান্নাতের সুসংবাদ রয়েছে। এসব বক্তব্য ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়, বরং তাদের কর্ম, আকীদা ও শেষ অবস্থার ভিত্তিতে সাধারণ নীতির আলোকে বলা হয়। কেবল আল্লাহই নির্ধারিত ভাবে জানেন কে জান্নাতী আর কে জাহান্নামী।
.

(২) নির্দিষ্ট ব্যক্তি সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলা: এই ধরণের ঘোষণা কেবলমাত্র যাদের ব্যাপারে কুরআন বা সহীহ হাদীসে স্পষ্টভাবে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলা হয়েছে, শুধু তাদের ক্ষেত্রেই করা যায়। যেমন কুরআন সুন্নাহের বিভিন্ন বর্ননায় রাসূল (ﷺ) যাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন তাদেরকে “জান্নাতী” বলা যাবে। আবার যেসব কাফিরদের সম্পর্কে কুরআনে কিংবা সহীহ হাদিসে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে, তাদেরকে “জাহান্নামী” বলা যাবে।
.
উদাহরণস্বরূপ: দুনিয়াতেই যারা জান্নাতের সুসংবাদ পেয়েছেন, তাঁদেরকে জান্নাতী বলে সম্বোধন করতে কোন সমস্যা নেই। রাসূল (ﷺ), একটি হাদীসে আবূ বকর, উমার, উসমান, আলী, ত্বালহা, যুবায়র ইবনুল আওয়াম, সা‘দ ইবনু মালিক, আব্দুর রাহমান ইবনু আওফ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁরা সকলেই জান্নাতী বলে ঘোষণা দিয়েছেন (আবূ দাঊদ, হা/৪৬৪৯; তিরমিযী, হা/৩৭৪৭, ৩৭৪৮, ৩৭৫৭; ইবনু মাজাহ, হা/১৩৩ সহীহুল জামি‘, হা/৫০, ৪০১০)। এছাড়াও বিভিন্ন হাদীসে আরো বহু সাহাবীকে রাসূল ﷺ দুনিয়াতেই জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তাদের মাঝে আছেন (১) উক্কাশাহ বিন মিহশান (রা.) (বু. মু. মিশকাত হা/৫২৯৬)। (২) ইয়াসির (৩) ‘আম্মার (৪) সুমাইয়া (হাকেম হা/৫৬৬৬) (৫) বেলাল বিন রাবাহ (তিরমিযী হা/৩৬৮৯) (৬) উসায়রিম ‘আমর বিন সাবেত (আহমাদ হা/২৩৬৮৪) (৭) সাবেত বিন ক্বায়েস (মুসলিম হা/১১৯) (৮) হারেসাহ বিন সুরাক্বাহ (বুখারী হা/২৮০৯) (৯) হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (মুসলিম হা/১৭৮৮) (১০) যায়েদ বিন হারেসাহ (১১) আব্দুল্লাহ বিন রওয়াহা (আহমাদ হা/২২৬০৪; ইবনু হিববান হা/৭০৪৮) (১২) সা‘দ বিন মু‘আয (মুসলিম হা/২৪৬৮) (১৩) সালমান ফারেসী (তিরমিযী হা/৩৭৯৭) (১৪) আব্দুল্লাহ বিন সালাম (বুখারী হা/৩৮১২) (১৫) জাবের (রা.)-এর পিতা আব্দুল্লাহ বিন ‘আমর (তিরমিযী হা/৩০১০) (১৬) আবুদ্দাহদাহ আনসারী (মুসলিম হা/৯৬৫) (১৭) রুমায়সা বিনতে মিলহান (বুখারী হা/৩৬৭৯) (১৮) উম্মে যুমার হাবাশীয়া (বুখারী হা/৫৬৫২; মুসলিম হা/২৫৭৬) প্রমুখ।
.
পক্ষান্তরে যারা দুনিয়াতেই জাহান্নামের দুঃসংবাদ পেয়েছে, তাদের মধ্যে রয়েছে যেমন: (১) ফিরআউন। মহান আল্লাহ তার সম্বন্ধে বলেছেন,يَقْدُمُ قَوْمَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَأَوْرَدَهُمُ النَّارَ ۖ وَبِئْسَ الْوِرْدُ الْمَوْرُودُ অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন সে নিজ সম্প্রদায়ের অগ্রভাগে থাকবে, অতঃপর তাদেরকে উপনীত করবে দোযখে। আর তা অতি নিকৃষ্ট স্থান যাতে তারা উপনীত হবে। (সূরা হূদ ৯৮) (২) নূহ ও লূত (আলাইহিমাস সালাম)-এর স্ত্রী ও মহান আল্লাহ তাদের সম্বন্ধে বলেন, আর আল্লাহ অবিশ্বাসীদের জন্য নূহ ও লুতের স্ত্রীর দৃষ্টান্ত উপস্থিত করেছেন। তারা ছিল আমার দাসদের মধ্যে দুই সৎকর্মপরায়ণ দাসের অধীন। কিন্তু তারা তাদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, ফলে তারা (নূহ ও লূত) তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি হতে রক্ষা করতে পারল না এবং তাদেরকে বলা হল, ‘জাহান্নামে প্রবেশকারীদের সাথে তোমরাও তাতে প্রবেশ কর। (সূরা তাহরীম ১০) এখানে খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা বলতে দাম্পত্যের খিয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা উদ্দেশ্য নয়। কেননা, এ ব্যাপারে সকলে একমত যে, কোনো নবীর স্ত্রী ব্যভিচারিণী ছিলেন না। (ফাতহুল কাদীর) খিয়ানত বলতে বুঝানো হয়েছে, এরা তাদের স্বামীদের উপর ঈমান আনেনি। তারা মুনাফিক্বী ও কপটতায় লিপ্ত ছিল এবং নিজেদের কাফের জাতির প্রতি তারা সমবেদনা পোষণ করত। যেমন, নূহ (আ.)-এর স্ত্রী নূহ (আ.)-এর ব্যাপারে লোকদেরকে বলে বেড়াত যে, এ একজন পাগল। আর লূত (আ.)-এর স্ত্রী তার গোত্রের লোকদেরকে নিজ বাড়ীতে আগত অতিথির সংবাদ পৌছে দিত। কেউ কেউ বলেন, এরা উভয়ই তাদের জাতির লোকদের মাঝে নিজ নিজ স্বামীর চুগলি করে বেড়াত। নূহ (আ.) এবং লূত (আ.) তাঁরা উভয়েই ছিলেন আল্লাহর পয়গম্বর, আর পয়গম্বররা আল্লাহর অতি নিকটতম বান্দাদের মধ্যে গণ্য হন, তা সত্ত্বেও তাঁরা তাঁদের স্ত্রীদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাতে পারবেন না।

(৩) আবূ লাহাব ও তার স্ত্রী। মহান আল্লাহ বলেন, ধ্বংস হোক আবু লাহাবের হস্তদ্বয় এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন উপকারে আসবে না। অচিরেই সে শিখা বিশিষ্ট (জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে এবং তার স্ত্রীও; যে ইন্ধন বহন করে। তার গলদেশে থাকবে খেজুর আঁশের পাকানো রশি (সূরা আল-লাহাব ৩-৪)।

(৪) আমর বিন আমের আল-খুযায়ী। আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আমি ‘আম্‌র ইব্‌নু ‘আমির খুয‘আইকে তার বহির্গত নাড়ি-ভুঁড়ি নিয়ে জাহান্নামের আগুনে চলাফেলা করতে দেখেছি। সেই প্রথম ব্যক্তি যে সাইবা উৎসর্গ করার প্রথা প্রচলন করে। (বুখারী পর্ব ৬১ অধ্যায় ৯ হাদীস নং ৩৫২১; মুসলিম ২৮৫৬ আর লুলু ওয়াল মারজান হা/১৮১৬)
(৫) আবূ ত্বালিব, আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত:‘আব্বাস ইবনু আবদুল মুত্তালিব (রা.) বলেন, আমি একদিন নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি আপনার চাচা আবূ ত্বালিবের কী উপকার করলেন অথচ তিনি আপনাকে দুশমনের সকল আক্রমণ ও ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে তিনি খুব ক্ষুব্ধ হতেন। তিনি বললেন, সে জাহান্নামে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত আগুনে আছে। যদি আমি না হতাম তাহলে সে জাহান্নামের একেবারে নিম্ন স্তরে থাকত। (সহীহ বুখারী পর্ব ৬৩ /৪০ হা. ৩৮৮৩, মুসলিম ১/৯০, হা. নং ২০৯ আল লু’লু ওয়াল মারজান,হা/ ১২৫) (৬) আম্মার (রা.)-এর ঘাতক ও তার ব্যাপারে মহানবী (ﷺ) বলেছেন,“সে জাহান্নামী।”(সহীহুল জামে’ ৪১৭০) কিন্তু যাদের ব্যাপারে ঘোষণা নেই, তাদেরকে নিশ্চিতরূপে জান্নাতী অথবা জাহান্নামী বলা জায়েয নয় (মাজমূঊ ফাতাওয়া ইবনু বায, ২৫/১২১ পৃ. ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-৭৩১)। যেমন, সাহ্‌ল ইবনু সা‘দ আস্ সা‘ইদী (রা.) থেকে বর্ণিত: তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: কোনো ব্যক্তি জনসাধারণের সামনে প্রকাশিত ‘আমলের বিবেচনায় জান্নাতীদের ‘আমলের ন্যায় ‘আমল করবে; অথচ সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভূক্ত। আর কোনো ব্যক্তি জনসাধারণের সামনে প্রকাশিত ‘আমলের বিবেচনায় জাহান্নামীদের ‘আমলের ন্যায় ‘আমল করবে, অথচ সে জান্নাতীদের অন্তর্ভূক্ত। (সহিহ মুসলিম হা/ ৬৬৩৪ ই.ফা হা/ ৬৫০০)।
.
অতএব কুরআন-সুন্নাহ সুস্পষ্ট দলিলের বাহিরে কোনো ব্যক্তিকে জান্নাতী কিংবা জাহান্নামী বলে সার্টিফিকেট দেওয়া যাবে না, এমন কি কোনো মুসলিম ব্যাক্তি মারা গেলেও তার ক্ষেত্রে রহমতপ্রাপ্ত বেহেশতবাসী’ উদ্দেশ্য করে মরহুম শব্দ ব্যবহার করাও জায়েয নয়। এবার একজন মুসলিম সে যত সৎকর্মই করুক না কেন তাকে যেমন জান্নাতী বলে ঘোষণা দিতে পারি না। অনুরূপভাবে কোন মুসলিম যত মন্দ কাজই করুক না কেন তাকে জাহান্নামী বলেও ঘোষণা দিতে পারি না। কারণ কাউকে জান্নাতী বা জাহান্নামী সাব্যস্ত করা একমাত্র আল্লাহরই কর্তৃত্বাধীন।আমরা যদি কয়েকটি উদাহরণ লক্ষ করি তাহলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। যেমন:

(১) আম্মিজান ‘আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহা) [মৃত: ৫৭/৫৮ হি.] থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, একদা একজন আনসারীর বাচ্চার জানাযার সলাত আদায়ের জন্য রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ডাকা হল। আমি (‘আয়েশা) বললাম, হে আল্লাহর রসূল! এ বাচ্চার কি সৌভাগ্য, সে তো জান্নাতের চড়ুই পাখিদের মধ্যে একটি চড়ুই। সে তো কোন গুনাহ করেনি বা গুনাহ করার বয়সও পায়নি। তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এছাড়া অন্য কিছু কি হতে পারে না হে ‘আয়েশা! আল্লাহ তা’আলা একদল লোককে জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করে রেখেছেন, যখন তারা তাদের পিতার মেরুদণ্ডে ছিল। এভাবে জাহান্নামের জন্যেও একদল লোক সৃষ্টি করে রেখেছেন অথচ তখন তারা তাদের পিতার মেরুদণ্ডে ছিল।(সহীহ মুসলিম ২৬৬২, নাসায়ী ১৯৪৭,ইবনু মাজাহ ৮২,আহমাদ ২৫৭৪২, সহীহ ইবনু হিব্বান ৬১৭৩)। রাসূল (ﷺ) বলেন, ‘যদি কেউ কাউকে কাফের বলে, আর সে যদি কাফের না হয়, তাহ’লে কথাটি তার উপরেই ফিরে আসবে।(সহীহ বুখারী হা/৬০৪৫; মিশকাত হা/৪৮১৬)। অপর আরেকটি বর্ননায় এসেছে খারিজাহ ইবনু যায়দ ইবনু সাবিত (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত,…উম্মুল ‘আলা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, অতঃপর উসমান ইবনু মায‘উন (রাযিয়াল্লাহু আনহু) আমাদের এখানে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আমি তাঁর সেবা শুশ্রাষা করলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁর মৃত্যু হয়ে গেল। আমরা কাফনের কাপড় পরিয়ে দিলাম। তারপর নবী (ﷺ) আমাদের এখানে আসলেন। ঐ সময় আমি ‘উসমান ইবনু মাযউন (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে লক্ষ্য করে বলছিলাম। হে আবূ সায়িব! তোমার উপর আল্লাহ রহম করুন। তোমার সম্পর্কে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ নিশ্চয় তোমাকে সম্মানিত করেছেন। তখন নবী (ﷺ) আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি কেমন করে জানলে যে, আল্লাহ তাকে সম্মানিত করেছেন? আমি বললাম, আমার মাতা-পিতা আপনার উপর কুরবান হোক হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি তো জানি না। তাহলে আপনি বলে দিন কাকে আল্লাহ সম্মানিত করবেন? নবী (ﷺ) বললেন, আল্লাহর শপথ! ‘উসমানের মৃত্যু হয়ে গেছে। আল্লাহর কসম! আমি তার সম্পর্কে কল্যাণের আশা পোষণ করছি। আল্লাহর কসম, আমি আল্লাহর রাসূল হওয়া সত্ত্বেও জানি না আল্লাহ আমার সাথে কী ব্যবহার করবেন। উম্মুল ‘আলা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, আল্লাহর শপথ, আমি এ কথা শুনার পর আর কাউকে পূত-পবিত্র বলব না…(সহীহ বুখারী, হা/১২৪৩)।
.
কাউকে জাহান্নামী সাব্যস্ত করার শাস্তি কতটা ভয়াবহ হ’তে পারে নিম্নোক্ত হাদীসটি তার বাস্তব উদাহরণ। আবূ হুরায়রা (রা.) হ’তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, বনী ইসরাঈলের মধ্যে দু’জন ব্যক্তি ছিল। তাদের একজন পাপ কাজ করত এবং অন্যজন সর্বদা ইবাদতে লিপ্ত থাকত। যখনই ইবাদতরত ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে দেখত, তখনই তাকে খারাপ কাজ পরিহার করতে বলত। একদিন সে তাকে পাপ কাজে লিপ্ত দেখে বলল, তুমি এমন কাজ থেকে বিরত থাক। পাপী ব্যক্তি বলল, আমাকে আমার রবের উপর ছেড়ে দাও! তোমাকে কি আমার উপর পাহারাদার করে পাঠানো হয়েছে? সে বলল, আল্লাহর কসম! আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না, অথবা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন না।অতঃপর দু’জনকেই মৃত্যু দিয়ে আল্লাহর নিকট উপস্থিত করা হ’ল। আল্লাহ ইবাদতগুযার ব্যক্তিকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কি আমার সম্পর্কে জানতে? অথবা তুমি কি আমার হাতে যা আছে তার উপর ক্ষমতাবান ছিলে? আর পাপীকে বললেন, তুমি চলে যাও এবং আমার রহমতে জান্নাতে প্রবেশ কর। আর অপর ব্যক্তির ব্যাপারে তিনি বললেন, তোমরা একে জাহান্নামে নিয়ে যাও। আবূ হুরায়রাহ (রা.) বলেন, সেই মহান সত্তার কসম! যার হাতে আমার জীবন! সে (ইবাদতগুযার ব্যক্তি) এমন উক্তি করেছে, যার ফলে তার দুনিয়া ও আখেরাত উভয়েই বরবাদ হয়ে গেছে’ (আবূ দাঊদ হা/৪৯০১; সহীহুল জামে‘ হা/৪৪৫৫; সনদ সহীহ)। এই হাদীসটি প্রমাণ করে যে, কাউকে সরাসরি জান্নাতী বা জাহান্নামী বলা যাবে না। কেননা কে জান্নাতে যাবে, আর কে জাহান্নামে যাবে, আল্লাহ কাকে ক্ষমা করবেন এবং কাকে ক্ষমা করবেন না- সেটা কেবল আল্লাহই জানেন। কেননা তিনিই কেবল অদৃশ্যের খবর রাখেন। তিনিই ‘আলিমুল গায়েব। সুতরাং ইলমুল গায়েবের দাবী করা সীমালংঘন ও কুফরী। এজন্য আল্লাহ সেই ইবাদতগুযার বান্দাকে বলেছেন, তুমি কি আমার হাতে যা আছে তার উপর ক্ষমতাবান ছিলে? আল্লাহ বলেন, ‘আর গায়েবের চাবিকাঠি তাঁর কাছেই রয়েছে। তিনি ব্যতীত কেউই তা জানে না। স্থলভাগে ও সমুদ্রভাগে যা কিছু আছে, সবই তিনি জানেন। গাছের একটি পাতা ঝরলেও সেটা তিনি জানেন। মাটিতে লুক্কায়িত এমন কোন শস্যদানা নেই বা সেখানে পতিত এমন কোন সরস বা শুষ্ক ফল নেই, যা (আল্লাহর) সুস্পষ্ট কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই’ (সূরা আন‘আম ৬/৫৯)। আল্লাহ মহা ক্ষমাশীল। তিনি অনেক বড় পাপীকেও ক্ষমা করে জান্নাত প্রদান করতে পারেন। আবার তিনি শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর। ফলে ইবাদতগুযারকেও কঠিন শাস্তির সম্মুখীন করতে পারেন।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:كل إنسان يشهد له النبي صلى الله عليه وسلم بأنه في الجنة فهو في الجنة، وكل إنسان يشهد أنه في النار فهو في النار، وأما من لم يشهد له الرسول فنشهد له بالعموم، نقول: كل مؤمن في الجنة، وكل كافر في النار، ولا نشهد لشخص معين بأنه من أهل النار، أو من أهل الجنة، إلا بما شهد له الله ورسوله”যেসব ব্যক্তিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাতী বলেছেন, তারা জান্নাতী। আর যাদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন যে তারা জাহান্নামী, তারা হবে জাহান্নামী। তবে যাদের সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট দলিল নেই, তাদের ব্যাপারে আমরা বলি—সকল ঈমানদার জান্নাতের অধিকারী এবং সকল কাফির জাহান্নামের অধিবাসী। কিন্তু কাউকে নির্দিষ্ট করে জান্নাতী বা জাহান্নামী‌ বলবো না, যতক্ষণ না আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তাদের ব্যাপারে তা নির্ধারণ করে দেন।”(ইবনু উসাইমীন,তাফসীর সূরা আল-হুজরাত; পৃষ্ঠা: ১৮)।
.
অপর ফাতওয়ায় সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ ও মুহাদ্দিস, শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন:মৃতদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত শব্দাবলির বিশুদ্ধতা কী? যেমন আমরা এরকম কথা শুনে থাকি যে, অমুক ‘মাগফূর লাহু’ অথবা ‘মরহুম’। এই পরিভাষাগুলো কি বিশুদ্ধ? আপনি এ ব্যাপারে মানুষকে কীভাবে দিকনির্দেশনা দিবেন?”

উত্তরে শাইখ বলেন:
الواجب في هذا أن يقال: غفر الله له، رحمه الله، ولا يجزم بالمغفور له والمرحوم، هذا هو الذي ذكره أهل العلم، وكان أهل السنة والجماعة يقولون: لا يجوز الشهادة لمعين بجنة أو نار، إلا من شهد له الرسول ﷺ، أو شهد الله له في كتابه وإلا فلا، فممن شهد الله له في الكتاب العزيز بالنار أبو لهب ، شهد الله له بالنار، وهكذا من شهد له الرسول ﷺ بالجنة كـأبي بكر الصديق وعمر وعثمان وعلي وبقية العشرة وغيرهم ممن شهد لهم الرسول ﷺ، أو بالنار، هذا يشهد له.أما من لم يشهد له الله ولا رسوله لا بجنة ولا بنار فإنا لا نشهد له بذلك لا هذا ولا هذا، ولكن أهل السنة يرجون للمحسن ويخافون على المسيء.
والذي يظهر أن قول القائل: المرحوم فلان، والمغفور له فلان في معنى الشهادة، في معنى الشهادة بالجنة والنار؛ لأن المرحوم والمغفور له معناه أنه في الجنة؛ لأن كل إنسان مرحوم ومغفور له فهو من أهل الجنة، هذا فيه جرأة وعدم تورع، فالذي ينبغي في مثل هذا أن يقول: رحمه الله، غفر الله له، هذا هو الذي ينبغي في هذا المقام. نعم.
“এই বিষয়ে যা করণীয় তা হলো ‘গাফারাল্লাহু লাহু (আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন)’, ‘রাহিমাহুল্লাহ (আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন)’ প্রভৃতি বলা জরুরি। দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ‘মাগফূর লাহু (ক্ষমাপ্রাপ্ত)’, ‘মরহুম (রহমতপ্রাপ্ত)’ প্রভৃতি বলা যাবে না। ‘আলিমগণ এমনটিই বলেছেন।আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ বলে কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ব্যাপারে জান্নাতি বা জাহান্নামী হওয়ার সাক্ষ্য দেওয়া বৈধ নয়, শুধুমাত্র যাদের ব্যাপারে রাসূল ﷺ সাক্ষ্য দিয়েছেন, অথবা যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাঁর কিতাবে সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাদের ব্যাপারে করা যাবে। যেমন আল্লাহ যাকে কুরআনে জাহান্নামী বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন তাদের একজন হলো আবূ লাহাব। আল্লাহ তাকে জাহান্নামী বলেই সাক্ষ্য দিয়েছেন। একইভাবে যাদের ব্যাপারে রাসূল ﷺ জান্নাতি বলে সাক্ষ্য দিয়েছেন, যেমন আবূ বকর আস-সিদ্দীক, ‘উমার, ‘উসমান, ‘আলী এবং আশারায়ে মুবাশশারাহ-র অন্যান্য সাহাবীগণ, অথবা যাদেরকে রাসূল ﷺ জাহান্নামী বলেছেন তাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেওয়া যাবে। কিন্তু যাদের ব্যাপারে না আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন, না রাসূল ﷺ, তাদের ব্যাপারে আমরা জান্নাতি বা জাহান্নামী বলে কোনো সাক্ষ্য দেব না।কিন্তু আহলুস সুন্নাহ সৎকর্মশীল বান্দার জন্য কল্যাণের আশা করে, আর পাপী বান্দার ব্যাপারে অকল্যাণের আশঙ্কা করে।আর মানুষের বলা অমুক ‘মরহুম’, অমুক ‘মাগফূর লাহু’ এই কথাগুলো জান্নাত ও জাহান্নামের সার্টিফিকেট দেওয়ার নামান্তর। কেননা মরহুম (রহমতপ্রাপ্ত), মাগফূর লাহু (ক্ষমাপ্রাপ্ত) কথা দুটির অর্থ হলো, উক্ত ব্যক্তি জান্নাতে রয়েছে। কেননা প্রত্যেক মরহুম ও মাগফূর লাহু ব্যক্তি জান্নাতীদের অন্তর্ভুক্ত। এই কথার মধ্যে রয়েছে স্পর্ধা ও তাক্বওয়া-শূন্যতা। তাই এসব ক্ষেত্রে ‘রাহিমাহুল্লাহ’, ‘গাফারাল্লাহু লাহু’ প্রভৃতি বলাই বাঞ্ছনীয়। এক্ষেত্রে এটাই বাঞ্ছনীয়। না‘আম।”(ইমাম ইবনু বাযের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট এর আর্টিকেল নং-৬৪৭১) তবে হা!কেউ যদি মরহুম বলার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির জন্য রহমতের দু‘আ উদ্দেশ্য করে, তাহলে মরহুম বলা জায়েজ। উল্লেখ্য যে, ‘রহমতপ্রাপ্ত’ হলো মরহুম শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ। কিন্তু মরহুম শব্দের আরেকটি প্রসিদ্ধ অর্থ আছে। আর তা হলো মৃত, প্রয়াত, লোকান্তরিত, পরলোকগত প্রভৃতি। যেমনটি বিভিন্ন আরবি অভিধানে এসেছে।
.
পরিশেষে উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথাই পরিষ্কার যে, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা’আতের আকিদা হলো তারা কোনো ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট করে জান্নাতী বা জাহান্নামী ঘোষণা করে না, যতক্ষণ না তার সম্পর্কে স্পষ্টভাবে কুরআন বা হাদীসে সুস্পষ্ট দলিল থাকে। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাদের জান্নাতী বা জাহান্নামী ঘোষণা করেছেন, তারা তা-ই। তবে এ ছাড়া অন্যদের ব্যাপারে তারা নির্দিষ্ট করে কিছু বলেন না। তবে তারা নেককার ও আনুগত্যশীল ব্যক্তিদের জন্য জান্নাতের আশা পোষণ করে এবং গোনাহগার ও অবাধ্য ব্যক্তিদের জন্য জাহান্নামের আশঙ্কা করে। এভাবে তারা সাধারণভাবে বলে আল্লাহর আনুগত্যশীলরা জান্নাতের উপযুক্ত এবং তাঁর অবাধ্যরা জাহান্নামের উপযুক্ত, কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে নাম ধরে নির্দিষ্ট করে জান্নাতী বা জাহান্নামী বলে না।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬💠💠▬▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ইব্রাহিম বিন হাসান (হাফিযাহুল্লাহ)
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Translate