Wednesday, April 16, 2025

সাফা ও মারওয়ায় সায়ির অতিরিক্ত চক্কর দেওয়ার বিধান

 ▪️সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি, আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রহ.

কে জনপ্রিয় ‘নূরুন আলাদ দারব’ শীর্ষক ইসলামি প্রশ্নোত্তর মূলক বেতার অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করা হয় যে,

আমাদের এক ভাই বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। আমি হজ ও ওমরা আদায় করেছি। কিন্তু আমি সাফা থেকে মারওয়ায় যেতাম এবং ফিরে আসতাম এটাকে এক চক্কর গণ্য করতাম। এভাবে আমি সাত চক্কর পূর্ণ করেছি। এই অতিরিক্ত অংশের কারণে কি কোনও সমস্যা হবে? দয়া করে আমাকে জানান। আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন।

উত্তর:

السعي صحيح والسبعة الزائدة لا تضرك، السعي المشروع من الصفا إلى المروة شوط والعودة من المروة إلى الصفا شوط ثاني وهكذا، فإذا سعى أربعة عشر فالمشروع منها سبعة والزائد لا يضره لأنه وقع خطأً منه وجهلًا منه فلا يضره

“আপনার সায়ি সহিহ হয়েছে এবং এই অতিরিক্ত সাত চক্কর আপনার কোনও ক্ষতি করবে না। শারিয়তের দৃষ্টিতে সঠিক পদ্ধতি হলো—সাফা থেকে মারওয়ায় যাওয়া এক চক্কর এবং মারওয়া থেকে সাফায় ফেরা আরেক চক্কর। এভাবে সাত চক্কর সম্পন্ন হয়। কিন্তু যদি কেউ ভুলবশত বা অজ্ঞতার কারণে চৌদ্দ চক্কর করে ফেলে, তাহলে তার কোনও ক্ষতি হবে না। কারণ এটি অনিচ্ছাকৃত ভুল।

উপস্থাপক: আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং কল্যাণ দান করুন।
[উৎস: binbaz–Org]

▪️ শাইখ ইবনে বাজ (রহিমাহুল্লাহ)-কে আরও জিজ্ঞাসা করা হয়,

আমি সাফা ও মারওয়ার মাঝে সায়ি করেছি। কিন্তু আমি সাফা থেকে সাফায় ফিরে আসাকে এক চক্কর হিসেবে গণ্য করেছি। এতে কি আমার কোনও সমস্যা হবে?

শাইখ উত্তরে বলেন:

هذه زيادة منك ، فقد سعيت أربعة عشر شوطا والواجب سبعة ، والسبعة الأخرى لا تجوز ؛ لأنها خلاف الشرع ، لكنك معذور بالجهل ، وعليك التوبة إلى الله من ذلك ، وعدم العود إلى مثلها إذا حججت أو اعتمرت ؛ لأن الذي حصل به المقصود سبعة من الصفا للمروة ثم من المروة للصفا ، تبدأ بالصفا وتختم بالمروة ، سبعة أشواط

“এটি আপনার পক্ষ থেকে একটি অতিরিক্ত কাজ হয়েছে। আপনি মোট চৌদ্দ চক্কর সম্পন্ন করেছেন। অথচ ওয়াজিব হলো সাতটি। অতিরিক্ত সাতটি বৈধ নয়। কারণ এটি শরিয়তের বিধানের বিপরীত। তবে আপনি এটি অজ্ঞতার কারণে করেছেন, তাই আপনি এই ভুলের জন্য ক্ষমার যোগ্য। আপনাকে আল্লাহর দরবারে তওবা করতে হবে এবং ভবিষ্যতে, যখন হজ বা ওমরাহ করবেন, তখন এ ধরনের ভুল পুনরায় করা যাবে না। কারণ যথাযথ পদ্ধতি হলো—সাফা থেকে মারওয়ায় যাওয়া এক চক্কর এবং মারওয়া থেকে সাফায় ফেরা আরেক চক্কর। এভাবে সাফা থেকে শুরু করে মারওয়ায় শেষ করে সাত চক্কর সম্পন্ন করতে হয়।”

[মাজমূ’ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৭/৩৪১-৩৪২]

উল্লেখ্য যে ইসলামে, শরিয়ত বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করা ফরজ করা হয়েছে। তাই যে কোন ইবাদতের পূর্বে অবশ্যই সে সম্পর্কে ভালোভাবে পড়াশোনা করতে হবে কিংবা আলেমদের থেকে জেনে নিতে হবে এবং জ্ঞানের উপরে ভিত্তি করে ইবাদত-বন্দেগি করতে হবে। আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।

❑ সাফা-মারওয়ার মাঝে সায়ি করার সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি:

ওমরা আদায়ের ক্ষেত্রে কাবা ঘরে সাত চক্করের মাধ্যমে তওয়াফ সমাপ্ত করার পর করণীয় হলো, দু রাকাত সালাত আদায় করা করা। তারপর সাফা এবং মারওয়া পাহাড় দ্বয়ের মাঝখানে সাত চক্কর দেওয়া। এটি ওয়াজিব।

নিম্নে এর সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো:

১. সর্বপ্রথম কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটি পাঠ করতে সাফা পাহাড়ে আরোহণ করা:

إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ

উচ্চারণ: “ইন্নাস সাফা ওয়াল মার্‌ওয়াতা মিন শাআয়িরিল্লাহি।”
অর্থ: “নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত।” [সূরা বাকারা: ১৫৮]

২. কিবলা মুখি হয়ে দাঁড়িয়ে তওহিদ, (লা-ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ), তাকবির (আল্লা-হু আকবার), তাহমিদ (আল হামদুলিল্লা-হ) ইত্যাদি পাঠ করা।
অতঃপর তিনবার বলবে:
لاَ إلَهَ إلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِيْ وَيُمِيْتُ وَهُوَ عَلىَ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ . لاَ إلَهَ إلاَّ اللهُ وَحْدَهُ أنْجَزَ وَعْدَهُ وَنَصَرَ عَبْدَهُ وهَزَمَ الأحْزاَبَ وَحْدَهُ
উচ্চারণ:
লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ইউহ্-ইয়ী ওয়া ইউমীতু, ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন ক্বদীর। লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহদাহু, আনজাযা ওয়াদাহু, ওয়া নাসারা আবদাহু, ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু।
অর্থ:
“আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ (উপাস্য) নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। তাঁর কোনো শরিক নেই। রাজত্ব কেবল তাঁরই। সমস্ত প্রশংসাও শুধুই তাঁর জন্য। তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দেন। আর তিনি সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান।
আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য কোন ইলাহ নেই। তিনি একক। তিনি তাঁর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করেছেন। তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং স্বীয় একক ক্ষমতাবলে শত্রুদের পরাজিত করেছেন।”
এরপর জানা যে কোন দুআ পাঠ করবে।
৩. সবুজ বাতি দ্বয়ের মধ্যবর্তী অংশে দৌড়ানো। (মহিলারা দৌড়াবে না।)
৪. সাফা-মারওয়া সায়ি করার সময় কোন দুআ নির্দিষ্ট না করে, জানা যে কোন দুআ পড়া।
৫. মারওয়া পাহাড়ে আরোহণ করা।
৬. সেখানেও সাফা পাহাড়ের ন্যায় দুআ করা।
৭. সাত বার সাফা-মারওয়া সাঈ করা। (রোকন)
৮. সাফা থেকে মারওয়া গমন ১ম চক্কর, মারওয়া থেকে সাফা প্রত্যাবর্তন ২য় চক্কর। এভাবে ৭ম চক্কর মারওয়ায় এসে শেষ করা।
প্রণয়নে: শাইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী বিন আব্দুল জলীল রাহ. কর্তৃক রচিত ‘সহজ উমরা নির্দেশিকা’

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

রমজান মাসের প্রথম অংশ রহমত ও মধ্য অংশ মাগফিরাত এবং শেষাংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি এ হাদিসটি কি সঠিক

 উত্তর: এই সংক্রান্ত হাদিসটি আমাদের সমাজে ব্যাপকভাবে পরিচিত। এই কথাটি সেহেরি-ইফতারের সময়সূচী, রোজা-রমজান বিষয়ক বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকার ইসলামি কলাম ইত্যাদিতে উল্লেখ করা হয়ে তাকে, অনেক মসজিদের ইমাম, খতিব এবং ইসলামি বক্তাদের মুখেও প্রায় শোনা যায় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তা ব্যাপকভাবে শেয়ার করা হয়।

কিন্তু হাদিস বিশারদগণের দৃষ্টিতে তা সনদগতভাবে জয়িফ (দুর্বল) হওয়ার পাশাপাশি এর মমার্থও সমস্যাপূর্ণ। কেননা পুরা রমজান ব্যাপী আল্লাহর রহমত ও বরকত নাজিল হয়। এবং রমজানের প্রতিটি রাত্রেই জাহান্নামের আগুন থেকে অসংখ্য মানুষকে মুক্ত ঘোষণা করা হয় যে বিষয়ে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
তাছাড়া রহমত, মাগফিরাত (ক্ষমা) ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি সবগুলোই একটি অপরটির সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। কারণ আল্লাহ সীমাহীন রহমত বা দয়ার কারণেই তিনি বান্দাদেরকে ক্ষমা করেন। আর যে তার ক্ষমা লাভ করে সেই জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করে। সুতরাং এভাবে রমজানকে ভাগ করা সমীচীন নয়।

অতএব এই হাদিস প্রচার করা ঠিক নয়। এর পরিবর্তে রমজানের ফজিলতে যে সকল বিশুদ্ধ হাদিস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো প্রচার করা উচিত।

ইসলাম অনলাইন (islamonline)-এ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। নিম্নে তা তুলে ধরা হলো:

◈ সালমান আল-ফারিসি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসের শেষ দিনে আমাদের খুতবা দেন এবং বলেন:

أَيُّهَا النَّاسُ، قَدْ أَظَلَّكُمْ شَهْرٌ عَظِيمٌ مُبَارَكٌ، شَهْرٌ فِيهِ لَيْلَةٌ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ، جَعَلَ اللهُ صِيَامَهُ فَرِيضَةً، وَقِيَامَ لَيْلِهِ تَطَوُّعًا، مَنْ تَقَرَّبَ فِيهِ بِخَصْلَةٍ مِنَ الْخَيْرِ كَانَ كَمَنْ أَدَّى فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَمَنْ أَدَّى فِيهِ فَرِيضَةً كَانَ كَمَنْ أَدَّى سَبْعِينَ فَرِيضَةً فِيمَا سِوَاهُ، وَهُوَ شَهْرٌ أَوَّلُهُ رَحْمَةٌ، وَأَوْسَطُهُ مَغْفِرَةٌ، وَآخِرُهُ عِتْقٌ مِنَ النَّارِ

‘হে মানুষ! তোমাদের ওপর ছায়া ফেলেছে এক মহান ও বরকতময় মাস। এ মাসে এক রাত আছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। আল্লাহ এ মাসের রোজাকে ফরজ করেছেন এবং এর রাতের কিয়ামকে নফল ইবাদত হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি এতে কোনও নেক আমল দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করবে, সে যেন অন্য সময় ফরজ আদায় করল। আর যে ব্যক্তি এতে ফরজ আদায় করবে, সে যেন অন্য সময় সত্তরটি ফরজ আদায় করল। এটি এমন এক মাস, যার প্রথম অংশ রহমত, মধ্য অংশ মাগফিরাত এবং শেষ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি…’”(হাদিসের সম্পূর্ণ অংশ এখানে উল্লেখ করা হয়নি।)

[বায়হাকির শুআবুল ইমানে হা/৩২১; কিতাবুদ দুয়াফা’ লিল উকাইলি: (২/১৬২); ‘আল-কামেল ফি দুয়াফায়ির রিজাল’ লি ইবনে আদি: (১/১৬৫); ‘কিতাবু ইলালিল হাদিস’ লি ইব্‌ন আবি হাতেম: (১/২৪৯); ‘সিলসিলাতিল আহাদিসুস দায়িফা ওয়াল মাওদুয়াহ’ হা/ ১৫৬৯]
________________________________________
◈ হাদিসের বিশুদ্ধতা:
এই হাদিসটি দীর্ঘ হাদিসের একটি অংশ, যা ইমাম ইবনে খুযাইমা, বায়হাকি ও তাবারানি রেওয়ায়ত করেছেন। তবে হাদিস বিশেষজ্ঞগণ এটিকে দুর্বল (ضعيف) বলেছেন।
________________________________________
◈ হাদিসটি কেন দুর্বল?

১. সনদের দুর্বলতা:

✅ এতে সাঈদ ইবনে মুসাইয়িব আছেন, যিনি সালমান ফারিসি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে সরাসরি বর্ণনা করেননি। অর্থাৎ এখানে সনদের (ইসনাদের) সমস্যা রয়েছে।
✅ এছাড়া আলী ইবনে যায়দ ইবনে জুদআন নামে একজন বর্ণনাকারী আছেন, যিনি দুর্বল (ضعيف) হিসেবে চিহ্নিত।
________________________________________
২. মুহাদ্দিসদের মতামত:
✅ হাফিজ ইবনে হজর, ইমাম আহমদ, ইবনে মাইন, নাসাঈ, ইবনে খুযাইমা, জাওযাজানি প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ এটিকে দুর্বল বলেছেন।
✅ আবু হাতিম রাযি, ইমাম আইনি ও শায়খ আলবানি এটিকে “মুনকার” (আপত্তিজনক এবং অগ্রহণযোগ্য) বলেছেন।
________________________________________
৩. বিষয়বস্তুর সমস্যা:

✅ হাদিসটিতে রমজানের রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির বিষয়টিকে তিন দশকে ভাগ করা হয়েছে। অথচ আল্লাহর রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তি সারা মাসব্যাপী বর্ষিত হয়।
✅ সহিহ হাদিস অনুসারে, রমজানের প্রথম রাত থেকেই জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ হয়ে যায় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়।
________________________________________
◈ সহিহ হাদিস থেকে প্রমাণ:

ইমাম তিরমিজি [হাসান] হাদিসে আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত:

إِذَا كَانَ أَوَّلُ لَيْلَةٍ مِنْ شَهْرِ رَمَضَانَ صُفِّدَتْ الشَّيَاطِينُ وَمَرَدَةُ الْجِنِّ ، وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ النَّارِ فَلَمْ يُفْتَحْ مِنْهَا بَابٌ ، وَفُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ فَلَمْ يُغْلَقْ مِنْهَا بَابٌ ، وَيُنَادِي مُنَادٍ يَا بَاغِيَ الْخَيْرِ أَقْبِلْ وَيَا بَاغِيَ الشَّرِّ أَقْصِرْ ، وَلِلَّهِ عُتَقَاءُ مِنْ النَّارِ وَذَلكَ كُلُّ لَيْلَةٍ

“যখন রমজানের প্রথম রাত হয়, শয়তান ও বিদ্রোহী জিনদের শৃঙ্খলিত করা হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং কোনও দরজা খোলা হয় না, জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং কোনও দরজা বন্ধ করা হয় না। একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা দেন: ‘হে কল্যাণ প্রত্যাশী! এগিয়ে আসো। হে মন্দ প্রত্যাশী! বিরত থাকো।’ এবং আল্লাহ অনেককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, যা প্রতি রাতেই ঘটে।” [তিরমিজি: ৬৮২, হাসান]

◈ সতর্কতা:

দাঈদের (প্রচারকদের) উচিত এই হাদিসের দুর্বলতার বিষয়টি জানা এবং আল্লাহর রহমতকে নির্দিষ্ট দশকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পুরো রমজান ব্যাপী আল্লাহর রহমত ও মুক্তির ব্যাপকতা তুলে ধরা।
সহিহ হাদিস অনুসারে, রমজানের শুরু থেকেই জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। তাই রমজানকে তিন ভাগে বিভক্ত করা যথার্থ নয়।

❑ আল্লামা শাইখ ফাউযান (হাফিযাহুল্লাহ):

বর্তমান জমানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ, আল্লামা শাইখ ফাউযান (হাফিযাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয়, কিছু মানুষ রমজান মাস এলে বলে থাকে: “রমজানের প্রথম অংশ রহমত, মধ্য অংশ মাগফিরাত আর শেষ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্তি।” এটি কি কোনও হাদিস বা আসার?

উত্তরে তিনি বলেন,

هذا أثر يُنسب إلى النبي صلى الله عليه وسلم، ولكنه ضعيف الإسناد. سمعت شيخنا، الشيخ ابن باز -رحمه الله- يقول: “رمضان كله تجتمع فيه هذه الثلاث: الرحمة، والمغفرة، والعتق من النار، من أوله إلى آخره، من غير هذا التفصيل.”

“এটি একটি আসার হিসেবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি সম্বন্ধ করা হয়। তবে এর সনদ দুর্বল। আমি আমাদের শ্রদ্ধেয় শাইখ, শাইখ ইবনে বাজ (রহিমাহুল্লাহ)-কে বলতে শুনেছি: “রমজানের সম্পূর্ণ মাস জুড়ে এই তিনটি (রহমত, মাগফিরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি) একত্রে বিদ্যমান থাকে কোনও নির্দিষ্ট বিভাজন ছাড়াই।” [শাইখ সালিহ বিন ফাওজান আল ফাওজান (হাফিযাহুল্লাহ)-এর ভিডিও থেকে অনুদিত]
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

উমরার মর্যাদা এবং উমরা সফরের পূর্বে প্রস্তুতিমূলক দশটি নির্দেশনা

 প্রশ্ন: উমরার গুরুত্ব কতটুকু? আমি উমরা আদায় করতে চাই। কিন্তু আমি জানি না, এখন থেকে কীভাবে কী আমল করব বা কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করব। তাই দয়া করে এ সম্পর্কে জানালে উপকৃত হব ইনশাআল্লাহ।

উত্তর: দুআ করি, আল্লাহ তাআলা যেন আপনার উমরা আদায়ের বিষয়টিকে সহজ করে দেন এবং তা কবুল করেন। আমিন।

🔶 উমরার গুরুত্ব ও ফজিলত:

➤ সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য হজ ও উমরা আদায় করা ফরজ:

ইবনে উমর (রা.) বলেন,

لَيْسَ أَحَدٌ إِلَّا وَعَلَيْهِ حَجَّةٌ وَعُمْرَةٌ وَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ إِنَّهَا لَقَرِينَتُهَا فِي كِتَابِ اللهِ {وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ}

“প্রত্যেক (সামর্থ্যবান ব্যক্তি)-এর জন্য হজ ও উমরা অবশ্য পালনীয়।”
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, কুরআনুল কারিমে হজের সাথেই উমরার উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ
“তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে হজ ও উমরা পূর্ণভাবে আদায় কর।” (সূরা বাকারা: ১৯৬)
[সহিহ বুখারি, অধ্যায়: ২৬, পরিচ্ছেদ: ১]

➤ উমরা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত এবং গুনাহ মোচনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম:

হাদিসে এসেছে:
আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
> الْعُمْرَةُ إِلَى الْعُمْرَةِ كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُمَا

“এক উমরা থেকে আরেক উমরা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মোচন হয়ে যায়।”
[সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৭৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৩৪৯]

➤ উমরা পালনকারীর জন্য বিশাল সুসংবাদ:
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

> مَنْ أَتَى هَذَا الْبَيْتَ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَمَا وَلَدَتْهُ أُمُّّهُ

“যে ব্যক্তি এই ঘরে এলো, অতঃপর যৌন-স্পর্শ রয়েছে এমন কাজ ও কথা থেকে বিরত থাকল এবং শরিয়ত-বহির্ভূত কাজ/পাপাচার থেকে বিরত থাকল, সে মায়ের গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিনের মতো (নিষ্পাপ) হয়ে ফিরে গেল।” [ফাতহুল বারি: ৩/৩৮২]

➤ রমজানের উমরা হজের সমতুল্য:
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

> إِنَّ عُمْرَةً فِي رَمَضَانَ حَجَّةٌ

“রমজানের একটি উমরা একটি হজের সমতুল্য।”
[সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৭৮২; সহিহ মুসলিম]

➤ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবনে চারবার উমরা আদায় করেছেন এবং তার কাছ থেকে হজ-উমরার নিয়ম শিখতে বলেছেন।
তাই এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি বিশুদ্ধভাবে আদায়ের চেষ্টা করা একান্ত জরুরি।

🔶 উমরা আদায়ের প্রস্তুতি হিসেবে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা ও করণীয়:

✪ ১. একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে উমরা আদায়ের নিয়ত করা। কারণ সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।

✪ ২. হালাল অর্থ দ্বারা উমরা করা এবং আয়-ইনকাম ও অর্থ-সম্পদকে হারামের স্পর্শমুক্ত করা।

✪ ৩. অতীত জীবনের ভুল-ত্রুটি ও গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে তওবা-ইস্তিগফার করা।

✪ ৪. উমরার বিধি-বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা।

✪ ৫. কারও সাথে মনোমালিন্য থাকলে উমরা সফরে যাওয়ার পূর্বে তার কাছে ক্ষমা চাওয়া বা সম্পর্ক ঠিক করা।

✪ ৬. কারও হক/অধিকার নষ্ট করে থাকলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা তার সাথে সমঝোতা করা।

✪ ৭. মানুষের সাথে আর্থিক লেনদেন থাকলে তা পরিষ্কার করা। ঋণ থাকলে পরিশোধ করা বা লিখিত স্বীকৃতি রেখে অনুমতি নেওয়া।

✪ ৮. সালাত আদায়ে যত্নবান হওয়া। কারণ সালাত ঠিক না থাকলে শতবার উমরা করেও কোনো লাভ নেই।

✪ ৯ শিরক ও বিদআতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা।

✪ ১০. আল্লাহ তাআলা যেন সুস্থতা ও নিরাপত্তার সাথে উমরার যাবতীয় কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করার তৌফিক দান করেন, সে জন্য দুআ করা। আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

কুরআন অর্থ না বুঝে পড়লে সওয়াব হবে

 কুরআন অর্থ না বুঝে পড়লে সওয়াব হবে কি?সরাসরি কুরআনের কপি থেকে পড়া আর মোবাইল অ্যাপ থেকে কুরআন পড়লে সওয়াবে ক্ষেত্রে কি কোনও পার্থক্য আছে?

প্রশ্ন: কুরআন যদি অনুবাদ ছাড়া অর্থ না বুঝে শুধু কুরআনের ভাষায় তেলাওয়াত করি তা হলে সওয়াব হবে?
উত্তর: আল কুরআন মহান আল্লাহর মর্যাদাপূর্ণ বাণী সমষ্টির এক অবিস্মরণীয় ও বিস্ময়কর গ্রন্থ। এটি এমন এক গ্রন্থ তা পাঠ করলে প্রতিটি অক্ষরে একটি করে সওয়াব লেখা হয় যা দশটির সমান।

যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللَّهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا لاَ أَقُولُ الم حَرْفٌ وَلَكِنْ أَلِفٌ حَرْفٌ وَلاَمٌ حَرْفٌ وَمِيمٌ حَرْفٌ

“যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করবে তার একটি সওয়াব হবে। আর একটি সওয়াব দশটি সওয়াবের অনুরূপ। আমি বলি না যে, “আলিফ-লাম-মীম” একটি হরফ; বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম আরেকটি হরফ। (অর্থাৎ তিনটি হরফে রয়েছে তিনটি সওয়াব যা ত্রিশটি সওয়াবের সমান)।” [সুনান তিরমিজী, হা/২৯১০, অনুচ্ছেদ: যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পড়বে তার সাওয়াব কী হবে? অধ্যায়: ৪৮/ কুরআনের ফযিলত -সনদ সহিহ]

সুতরাং যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করবে সে উক্ত সওয়াব লাভ করবে ইনশাআল্লাহ- চাই বুঝে পড়ুক অথবা না বুঝে পড়ুক, দেখে পড়ুক অথবা মুখস্থ পড়ুক, মুসহাফ দেখে পড়ুক অথবা মোবাইল, ল্যাপটপ ইত্যাদি ডিভাইস থেকে পড়ুক, নামাজের মধ্যে পড়ুক অথবা নামাজের বাইরে পড়ুক।

❑ অন্যান্য ফতোয়া:

সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি বিশ্ববরেণ্য আলেম আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বাজ রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়: কুরআন অর্থ না বুঝে পড়া জায়েজ হবে কী?

উত্তরে তিনি বলেন,

আলহামদুলিল্লাহ।

হ্যাঁ, কোনও মুমিন পুরুষ বা নারী কুরআন পড়তে পারে যদিও সে তার অর্থ না বোঝে। তবে তার জন্য উত্তম হল, কুরআনের আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা (তাদাব্বুর) করা এবং বোঝার চেষ্টা করা। যদি তার বোঝার সামর্থ্য থাকে তবে সে তাফসিরের কিতাব অধ্যয়ন করবে, আরবি ভাষার কিতাব পড়বে, যাতে সে এর দ্বারা উপকৃত হতে পারে। পাশাপাশি যদি কোনও বিষয় বোঝা কঠিন হয়ে যায় তবে জ্ঞানীদের (উলামাদের) থেকে তা জেনে নেওয়া উচিত।

মূল উদ্দেশ্য হল, তাদাব্বুর (গভীর চিন্তাভাবনা)। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ

“এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে এবং বোধসম্পন্ন ব্যক্তিরা শিক্ষা গ্রহণ করে।” [সূরা সোয়াদ: ২৯]

অতএব মুমিন ব্যক্তি যখন কুরআন পাঠ করবে তখন সে তাতে মনোযোগ দেবে, তার অর্থ নিয়ে ভাববে এবং বোঝার চেষ্টা করবে, যাতে সে এর মাধ্যমে উপকৃত হতে পারে। যদি সে পুরো অর্থ না-ও বোঝে তবুও সে অনেক বিষয় বুঝতে পারবে। তাই কুরআন তাদাব্বুর (গভীর চিন্তাভাবনা) সহ পড়া উচিত। নারী-পুরুষ সবার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য, যাতে তারা আল্লাহর বাণী থেকে শিক্ষা নিতে পারে, তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী আমল করতে পারে।

আল্লাহ আরও বলেন:

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا

“তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না, নাকি তাদের অন্তর তালাবন্ধ?” [সূরা মুহাম্মদ: ২৪]

সুতরাং আমাদের মহান রব আমাদেরকে তাঁর বাণী নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও গভীর অনুধাবনের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। তাই যখন কোনও মুমিন পুরুষ বা নারী কুরআন পাঠ করে তখন তার জন্য উত্তম হল তাতে মনোযোগী হওয়া, চিন্তা করা এবং বোঝার চেষ্টা করা, যাতে সে আল্লাহর বাণী থেকে প্রকৃত শিক্ষা লাভ করতে পারে, তা হৃদয়ঙ্গম করতে পারে এবং সে অনুযায়ী আমল করতে পারে।

এক্ষেত্রে মুসলিমদের উচিত প্রসিদ্ধ তাফসির গ্রন্থ যেমন—

✅ তাফসির ইবনে কাসির।
✅ তাফসির তাবারি।
✅ তাফসির বাগভি।
✅ তাফসির শাওকানি ইত্যাদি অধ্যয়ন করা।

এছাড়াও আরবি ভাষার জ্ঞান অর্জন করা এবং প্রসিদ্ধ আলেমদের থেকে জ্ঞান গ্রহণ করা উচিত, যাতে কোনও অস্পষ্ট বিষয় থাকলে তারা তা ব্যাখ্যা করে দিতে পারেন।

ফতোয়া প্রদানে: শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বাজ রাহ.
[ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব, ১/৩৩২]

❑ ইসলাম ওয়েবের ফতোয়া:

কুরআন তিলাওয়াত করা কিন্তু এর অর্থ না বোঝা।

প্রশ্ন: কেউ যদি কুরআন তিলাওয়াত করে কিন্তু এর অর্থ বুঝে না তাহলে কি সে এর জন্য সওয়াব পাবে? আর মোবাইল ফোনে পড়া এবং কুরআনের কপি থেকে পড়ার মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কি?
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং সালাত ও সালাম রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর, তার পরিবার এবং সাহাবিদের উপর। এরপর:

জেনে রাখুন, একজন মুসলিমের উচিত কুরআনের অর্থ সম্পর্কে চিন্তা করা এবং যা বুঝতে অসুবিধা হয় তা জিজ্ঞাসা করা।

❂ আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِّيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُوْلُوا الْأَلْبَابِ

“এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি নাযিল করেছি, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ অনুধাবন করে এবং বুদ্ধিমানরা যেন তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করে।” [সূরা সোয়াদ: ২৯]

❂ তিনি আরও বলেছেন:

أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا

“তারা কি কুরআন সম্পর্কে চিন্তা করে না, নাকি তাদের হৃদয় তালাবন্ধ?” [সূরা মুহাম্মদ: ২৪]
তবে যদি কেউ আয়াত পড়ে কিন্তু এর অর্থ বুঝে না, তবুও সে এর তিলাওয়াতের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে না। কারণ:

❂ তিরমিজির হাদিসে এসেছে: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

مَنْ قَرَأَ حَرْفًا مِنْ كِتَابِ اللهِ فَلَهُ بِهِ حَسَنَةٌ، وَالْحَسَنَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا

“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করে, সে এর জন্য একটি নেকি পাবে, এবং একটি নেকি দশটি নেকির সমতুল্য।” [সহিহ তিরমিজি, হা, ১৯১০]

❖ এ ক্ষেত্রে কুরআনের কপি থেকে পড়া এবং মোবাইল ফোন থেকে পড়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।” (ইসলাম ওয়েব)। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

স্বামীর নাম ধরে ডাকা কি জায়েজ

 উত্তর: বিষয়টি সামাজিক রীতিনীতি, ভদ্রতা এবং প্রচলনের উপর নির্ভরশীল। যে সমাজে এটিকে অসম্মানজনক মনে করা হয় না সেখানে তাতে আপত্তি নেই। কিন্তু যেখানে এটিকে সম্মানহানি ও বেয়াদবি মনে করা হয় সেখানে তা করা উচিত নয়।

আমাদের ভারত উপমহাদেশে সাধারণত স্বামীর নাম ধরে ডাকাকে অসম্মানজনক ও বেয়াদবি মনে করা হয়। সুতরাং এখানে স্বামীকে নাম ধরে ডাকা উচিত নয়। কেননা স্ত্রীর কর্তব্য, স্বামীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা এবং এমন আচরণ না করা যাতে তার সম্মানহানি হয়। অন্যথায় তাদের মাঝে মনোমালিন্য এবং দাম্পত্য জীবনে কুপ্রভাব পড়তে পারে।

তাছাড়া সাধারণ ভদ্রতা হল, মানুষকে এমন শব্দ প্রয়োগে সম্বোধন করা যাতে সে খুশি হয়। বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনে এটাই ভালবাসার দাবী এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

অবশ্য স্বামী যদি এতে মনে কষ্ট না পায় বা নিজের সম্মানহানি মনে না করে তাহলে নাম ধরে ডাকায় কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ।

যেমন বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে, যখন আল্লাহর রসুল ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর স্ত্রী হাজের এবং শিশু পুত্র ইসমাইল আলাইহিস সালামকে মক্কার জনমানবহীন প্রান্তরে রেখে চলে যাচ্ছিলেন তখন পেছন থেকে তার স্ত্রী তাকে ডাকলেন এভাবে:

يَا إِبْرَاهِيمُ أَيْنَ تَذْهَبُ وَتَتْرُكُنَا بِهَذَا الْوَادِي الَّذِي لَيْسَ فِيهِ إِنْسٌ وَلَا شَيْءٌ ؟

“হে ইবরাহিম, তুমি আমাদেরকে এমন জনমানবহীন উপত্যকায় রেখে কোথায় যাচ্ছ?” [সহিহ বুখারী]

এছাড়া বিভিন্ন দেশে স্বামীর নাম ধরে ডাকার প্রচলন রয়েছে।

সুতরাং এ বিষয়ে সামাজিক নিয়ম-নীতি, সম্মান ও ভদ্রতার প্রতি লক্ষ্য রাখা জরুরি।

কিন্তু আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোনও স্ত্রী রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একবারের জন্যও ‘হে আল্লাহর রসুল’, ’হে আল্লাহর নবী’ বা এ জাতীয় সম্মান জনক উপাধি ছাড়া ‘হে মুহাম্মদ’ বলে ডেকেছেন বলে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না।

তবে এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, তাঁদের কেউ কেউ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নাম উচ্চারণ করেছেন।

যেমন নিম্নোক্ত হাদিসটি:

إنِّي لَأَعْرِفُ غَضَبَكِ ورِضَاكِ قالَتْ: قُلتُ: وكيفَ تَعْرِفُ ذَاكَ يا رَسولَ اللَّهِ؟ قالَ: إنَّكِ إذَا كُنْتِ رَاضِيَةً قُلْتِ: بَلَى ورَبِّ مُحَمَّدٍ، وإذَا كُنْتِ سَاخِطَةً قُلْتِ: لا ورَبِّ إبْرَاهِيمَ قالَتْ: قُلتُ: أجَلْ، لَسْتُ أُهَاجِرُ إلَّا اسْمَكَ

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি তোমার রাগ ও খুশি—উভয়টাই বুঝতে পারি।”

‘আয়েশা রা. বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি তা কীভাবে বুঝেন, হে আল্লাহর রসুল?”

তিনি বললেন, “যখন তুমি খুশি থাক তখন তুমি বলো ‘হ্যাঁ, মুহাম্মদের প্রতিপালকের কসম!’ আর যখন তুমি রাগান্বিত হও, তখন তুমি বলে থাকো ‘না, ইবরাহিমের প্রতিপালকের কসম!’”

‘আয়েশা রা. বললেন, “আমি বললাম, “হ্যাঁ, আমি তো কেবল আপনার নামটি পরিহার করি।” [বুখারি]

❂ অনুরূপভাবে সাহাবিদের কোনও স্ত্রী তাদের স্বামীর নাম ধরে (হে আবু বকর, হে উমর, হে আলি, হে উসমান ইত্যাদি বলে) ডেকেছেন এমন কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে প্রয়োজন বশতঃ স্বামীর নাম উচ্চারণ করেছেন তা প্রমাণিত হয়েছে।

যেমন জয়নব রা. রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সামনে তাঁর স্বামী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর নাম ধরে কথা বলেছিলেন। [বুখারি, হা/১৪৬২]

আর নাম উচ্চারণ করা আর ডাকার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে।

❑ প্রশ্ন: কেউ যদি বিনা প্রয়োজনে স্বামীর নাম মুখে নিয়ে কারো সাথে গল্প করে তাহলে কি গুনাহ হবে?
উত্তর: যদি কোথাও স্বামীর নাম উল্লেখ করার প্রয়োজন দেখা দেয় তাহলে উচ্চারণ করতে কোন সমস্যা নেই। তবে বিনা প্রয়োজনে কারো সাথে গল্প করার সময় তার নাম নিলেও সম্মানের সাথে নেয়া কর্তব্য। বার বার নাম উচ্চারণের ফলে মানুষের নিকট যেন তার প্রতি আপনার শ্রদ্ধা হীনতা প্রকাশ না পায় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate