Saturday, February 22, 2025

কাউকে জাহান্নামি বলার ভয়াবহতা এবং স্বামী যদি স্ত্রীকে এমন কথা বলে তাহলে স্ত্রীর কী করণীয়

 প্রশ্ন: কোন স্ত্রী যদি সিয়াম পালন রত অবস্থায় হক কথা বলার কারণে তার স্বামী তাকে একাধিক বার বদদু্আ দেয় (তার অজ্ঞতার কারণে) “তুই জাহান্নামি”। তাহলে কি সত্যিই সে জাহান্নামে যাবে? জান্নাত-জাহান্নাম দেওয়ার একমাত্র মালিক তো শুধু আল্লাহ। বান্দা কে বলার? সে ক্ষেত্রে উক্ত স্ত্রীর কী করণীয় একটু বলবেন? উল্লেখ্য যে, উক্ত স্বামী তার স্ত্রীর মুখ নি:সৃত কোনও নসিহা কখন‌ই সহ্য করতে পারে না। আর স্ত্রীও হক কথা না বলে থাকতে পারে না।

উত্তর: একথা সঠিক যে, জান্নাত ও জাহান্নাম দেওয়ার একমাত্র মালিক আল্লাহ তাআলা। বান্দা কারও জন্য জান্নাত বা জাহান্নাম নিশ্চিত করতে পারে না। কোনও ব্যক্তি যদি “তুই জাহান্নামি” বলে বদদুআ করে তা কখনোই আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে না। অর্থাৎ এ কারণে স্ত্রী জাহান্নামি হয়ে যাবে-একথা সঠিক নয়। এটা অবশ্যই একটি দুঃখজনক কথা এবং খারাপ আচরণ।

❑ স্ত্রীর সাথে খারাপ আচরণ করা, তাকে গালি দেওয়া ও তাকে বদদুআ দেওয়া কতটা নিকৃষ্ট কাজ?

◈ ১. কারও প্রতি বদদুআ করা ইসলামি আচার-আচরণে শোভন নয়। এ ধরণের আচরণ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চরিত্র ও আদর্শ পরিপন্থী।

আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ لَعَّانًا وَلاَ سَبَّابًا

“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশালীন ভাষী, লানত কারী (অভিসম্পাত কারী) ও গালিবাজ ছিলেন না।” [সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়: ৭৮/ আচার-ব্যবহার, পরিচ্ছেদ: ৭৮/৪৪. গালি ও অভিশাপ দেওয়া নিষিদ্ধ]

◈ ২. বিশেষ স্ত্রীদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে এমন কথাবার্তা আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘণ এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শ পরিপন্থী বিষয়।

❂ আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ ۚ فَإِن كَرِهْتُمُوهُنَّ فَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَيَجْعَلَ اللَّـهُ فِيهِ خَيْرًا كَثِيرًا

“নারীদের সাথে সদ্ভাবে জীবন-যাপন কর। অতঃপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়ত তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছ, যাতে আল্লাহ, অনেক কল্যাণ রেখেছেন।” [সূরা নিসা: ১৯]

❂ রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

« لاَ يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً ( أي : لا يبغض و لا يكره ) إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِىَ مِنْهَا آخَرَ »

“কোন মুমিন পুরুষ কোনও মুমিন নারীকে ঘৃণা ও অপছন্দ করবে না; যদি সে তার কোনও স্বভাবকে অপছন্দ করেও, তাহলে সে তার অপর একটি স্বভাবকে পছন্দ করবে।” [সহিহ মুসলিম]

❂ তিনি আরও বলেন,

اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ ، فَإِنَّ المَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلاَهُ ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ

‘‘তোমরা স্ত্রীদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে। কেননা মহিলাকে বাম পাঁজরের হাড় হতে সৃষ্টি করা হয়েছে। আর পাঁজরের হাড় সবচেয়ে বাঁকা হয়। যদি তুমি তা সোজা করতে চেষ্টা কর তাহলে তা ভেঙ্গে যাবে। আর যদি সেভাবেই ছেড়ে দাও তাহলে সর্বদা বাঁকাই থাকবে। সুতরাং তাদের সাথে সৎ ব্যবহার করতে থাক।’’ [সহিহ বুখারি, হা/৩০৮৪]

❑ কাউকে ‘তুই জাহান্নামি’ বলা কবিরা গুনাহ:

‘আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না’, ‘আল্লাহ তোমার প্রতি দয়া করবেন না’, ‘তুই জান্নাতে যাবি না’, ‘তুই জাহান্নামে যাবি’ ‘তুই জাহান্নামি’ নির্দিষ্টভাবে কোনও ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে এ জাতীয় কথাবার্তা বলা কবিরা গুনাহ (বড় পাপ)। কেননা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর এটা উপর নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া এবং আল্লাহর ব্যাপারে অনধিকার চর্চার শামিল। তা ছাড়া এটি আল্লাহর দয়াশীলতা ও ক্ষমার প্রতি অজ্ঞতারও বহিঃপ্রকাশ।

হাদিসে এসেছে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

أنَّ رَجُلًا قالَ: واللَّهِ لا يَغْفِرُ اللَّهُ لِفُلانٍ، وإنَّ اللَّهَ تَعالَى قالَ: مَن ذا الذي يَتَأَلَّى عَلَيَّ أنْ لا أغْفِرَ لِفُلانٍ، فإنِّي قدْ غَفَرْتُ لِفُلانٍ، وأَحْبَطْتُ عَمَلَكَ، أوْ كما قالَ

“জনৈক ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করল, যে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবেন না। তার এ মন্তব্য শুনে আল্লাহ তাআলা বললেন, “এমন কে আছে যে আল্লাহর উপর আগ বাড়িয়ে কসম করে বলে যে, তিনি উমুককে ক্ষমা করবেন না। আমি ঐ ব্যক্তিকেই ক্ষমা করে দিলাম আর তোমার সমস্ত আমল বাতিল করে দিলাম।” [সহিহ মুসলিম]

❑ স্বামীর কর্তব্য:

◆ ১. স্ত্রী যদি তাকে কোনও ভালো উপদেশ, সৎ পরামর্শ বা ভুল সংশোধনী দেয় তাহলে তার কর্তব্য, স্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তা গ্রহণ করা। কেননা প্রকৃত বন্ধু ও কল্যাণকামী সেই যে আপনার ভুলগুলো ধরিয়ে দেয় এবং আপনার কল্যাণের জন্য সদুপদেশ দেয়।
মনে রাখতে হবে, কেউ যদি হক বা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তাহলে তা হলো, অহংকারের আলামত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الكِبْرُ : بَطَرُ الْـحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ

“অহংকার হল, সত্য প্রত্যাখ্যান করা এবং মানুষকে তুচ্ছজ্ঞান করা।” [সহিহ মুসলিম]

আর অহংকারের পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لاَ يَدْخُلُ الْـجَنَّةَ مَنْ كَانَ في قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ

“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” [সহিহ মুসলিম]

এ ছাড়াও কুরআনের অনেক আয়াত ও হাদিসে অহংকারীর ভয়াবহ পরিণতির কথা উল্লেখিত হয়েছে।

◆ ২. স্বামীর জন্য আরও করণীয় হলো, নিজের অসংলগ্ন আচরণ ও এমন জঘন্য কথা বলার কারণে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি স্ত্রীর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা। ভুল করার পর স্ত্রীর নিকট ক্ষমা চাইলে স্বামীর সম্মান ক্ষুণ্ণ হয় না বরং স্বামীর প্রতি স্ত্রীর ভালোবাসা, সম্মান ও আস্থা বৃদ্ধি পায়। এটা সুখ-শান্তিপূর্ণ দাম্পত্য এবং একটা সুন্দর পরিবারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

❑ স্বামীর এহেন আচরণে স্ত্রীর করণীয়:

❂ ১. সবর বা ধৈর্য ধারণ করা: স্ত্রীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো, স্বামীর খারাপ আচরণ এবং অশালীন শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া। স্বামীর কাছ থেকে এমন কথা শোনার পর, তার বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হওয়া বা প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে শান্ত থেকে পরিস্থিতি সামলানোটা গুরুত্বপূর্ণ।

মহান আল্লাহ সবর কারীকে অপরিসীম পুরষ্কারে ভূষিত করবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

“ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবে কোন হিসাব ছাড়াই।” [সূরা যুমার: ১০]

তিনি আরও বলেন,

وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

“আর তোমরা ধৈর্য ধর, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” [সূরা আনফাল: ৪৬]

তাছাড়া রাগ নিয়ন্ত্রণকারীদের সম্পর্কেও আল্লাহ প্রশংসা করেছেন। এটিকে তিনি মুত্তাকিদের বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দেখুন: সূরা আলে ইমরান-এর ১৩৪ নাম্বার আয়াতের ব্যাখ্যা।

❂ ২. স্বামীর পরিবর্তনের জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করা:

স্ত্রীর উচিত স্বামীর জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করা যেন, আল্লাহ তাকে হেদায়েত দেন এবং সংশোধন করে দেন। একজন ইমানদার স্ত্রী কখনও স্বামীর জন্য বদদুআ করবেন না বরং তাকে ভালোর দিকে ফিরিয়ে আনার জন্য দুআর পাশাপাশি চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। আল্লাহ মানুষের মনের নিয়ন্ত্রণ কারী। সুতরাং দুআর বরকতে হয়ত তিনি তার বক্র অন্তরকে পরিবর্তন করে দিবেন। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী।

❂ ৩. গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার সময় সতর্কতা অবলম্বন:

স্ত্রীর উচিত, এমন সময় হক কথা বলার চেষ্টা করা যখন স্বামী সুস্থ মস্তিষ্কে মনোযোগ দিয়ে কথা শুনতে প্রস্তুত থাকেন। যদি স্বামী নসিহা (উপদেশ) গ্রহণ করতে না চান তবে পরিস্থিতি ও সময় বুঝে নরম ভাষায় কথাগুলো বলার চেষ্টা করা উচিত। এ ছাড়া, মাঝে মাঝে সরাসরি না বলে এমন পন্থায় কথা বলা যেতে পারে যাতে তার কাছে সঠিক বার্তাটা পৌঁছানো যায় কিন্তু স্বামী ক্ষুব্ধ না হন।

৪. স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করা:

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক যত ভালো হবে, ততই সুন্দরভাবে হক কথা বলার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা যায়। তাই একে অপরের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা, পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ।

অবশ্য এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী উভয়ের পক্ষ থেকে চেষ্টা থাকা কর্তব্য।

পরিশেষে বলব, স্বামী যদি স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে ‘তুই জাহান্নামি’ বা ‘জান্নাত তোর জন্য হারাম’ কিংবা এ জাতীয় কথা বলে তাহলে তার এসব বদদুআ বা হারাম কথাবার্তার কারণে স্ত্রীর জীবনে কোনও প্রভাব ফেলবে না। কারণ আল্লাহই বান্দার শেষ পরিণতির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অধিকারী; কোনও মানুষ নয়। আল্লাহ কাকে ক্ষমা করবেন আর কাকে করবেন না-এটা একান্তই তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত। কোনও মানুষ তা জানে না কার পরিণতি কী হবে। বরং এ কারণে স্বামী নিজেই গুনাহগার বলে সাব্যস্ত হবে। তবে স্ত্রীর উচিত, তার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করা, সর্বোচ্চ ধৈর্যের সাথে শান্তিপূর্ণভাবে পারিবারিক বিষয়গুলো সমাধান করার চেষ্টা করা এবং স্বামীর হেদায়েতের জন্য দুআ করা। নিশ্চয় আল্লাহ হেদায়েতের মালিক। আল্লাহু আলাম।

▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

শাবান মাসে নফল রোজা রাখার সুন্নতি নিয়ম এবং অর্ধ শাবানের পর রোজা রাখা বিধান

 প্রশ্ন: শাবান মাসে নফল রোজা রাখার সুন্নতি নিয়ম কী? অর্ধ শাবানের পর কি রোজা রাখা নিষিদ্ধ?

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি পুরো শাবান মাসটাই রোজা রাখতেন?
উত্তর: নিম্নে এ দুটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:

❑ ক. শাবান মাসে নফল রোজা রাখার সুন্নতি নিয়ম:

শাবান মাসে অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখা মোস্তাহাব। পুরো শাবান মাস রাখা ঠিক নয়। অর্থাৎ শাবান মাসকে রোজা রাখার মাধ্যমে রমজানের সাথে যুক্ত করা উনুচিত।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আমল থেকে আমরা শাবান মাসে রোজা রাখার সুন্নতি পদ্ধতি পাই।

১. আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

لَمْ يَكُنْ النَّبِيُّ -صلى الله عليه وسلم- يَصُومُ شَهْرًا أَكْثَرَ مِنْ شَعْبَانَ، فَإِنَّهُ كَانَ يَصُومُ شَعْبَانَ كُلَّهُ، وَكَانَ يَقُولُ: خُذُوا مِنْ الْعَمَلِ مَا تُطِيقُونَ فَإِنَّ اللَّهَ لا يَمَلُّ حَتَّى تَمَلُّوا، وَأَحَبُّ الصَّلاةِ إِلَى النَّبِيِّ -صلى الله عليه وسلم- مَا دُووِمَ عَلَيْهِ وَإِنْ قَلَّتْ، وَكَانَ إِذَا صَلَّى صَلاةً دَاوَمَ عَلَيْهَا

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসের চেয়ে অধিক রোজা আর কোনও মাসে রাখতেন না। তিনি (প্রায়) পুরো শাবান মাস রোজা রাখতেন। তিনি বলতেন, “তোমরা এমন আমল গ্রহণ করো যা তোমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে। কারণ আল্লাহ তাআলা বিরক্ত হন না যতক্ষণ না তোমরা বিরক্ত হও।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এমন নামাজই পছন্দনীয় যা নিয়মিতভাবে আদায় করা হয় যদিও তা স্বল্প হয়। তাঁর নিয়ম ছিল, যখন তিনি কোনও নামাজ পড়তেন নিয়মিতভাবে তা পড়তেন। [বুখারি, কিতাবুস্‌ সাওম। মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম]

২. আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

كان رسول الله صلَّى الله عليه وسلَّم يصوم حتى نقولَ: لا يُفطر، ويُفطر حتى نقول: لا يَصوم، فما رأيتُ رسول الله صلَّى الله عليه وسلَّم استكملَ صِيامَ شهرٍ إلاَّ رمضان، وما رأيتُه أكثرَ صيامًا منه في شعبان

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন (নফল) রোজা রাখতে শুরু করতেন তখন আমরা বলতাম যে, তিনি রোজা রাখা আর বাদ দিবেন না। আবার যখন রোজা বাদ দিতেন তখন আমরা বলতাম যে, তিনি আর রোজা করবেন না। তবে তাঁকে রমজান ছাড়া পরিপূর্ণভাবে অন্য কোনও মাসে রোজা রাখতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে অন্য কোনও মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।” [বুখারি, কিতাবুস্‌ সাওম। মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম]

❂ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি পূরো শাবান মাস ব্যাপী রোজা রাখতেন?

উপরোক্ত হাদিসে রয়েছে, মা জননী আয়েশা রা. বলেছেন, “তাঁকে রমজান ছাড়া পরিপূর্ণভাবে অন্য কোনও মাসে রোজা রাখতে দেখিনি।” এ হাদিসের সমার্থবোধক আরেকটি হাদিসে এসেছে,

فَإِنَّهُ كَانَ يَصُومُ شَعْبَانَ كُلَّهُ

“রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরো শাবান রোজা রাখতেন।” [সহিহ বুখারি]

এর ব্যাখ্যা মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, এ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, প্রায় পুরো মাস। অর্থাৎ আরবি ভাষায় সামান্য বাকি থাকলেও তাকে ‘সম্পূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করার রীতি প্রসিদ্ধ। এ ব্যাখ্যাটিকে সমর্থন করে নিম্নোক্ত হাদিসটি:

বুখারি (১৯৭০) ও মুসলিম (১১৫৬) হাদিসে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,

انَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ شَعْبَانَ كُلَّهُ، يَصُومُ شَعْبَانَ إِلا قَلِيلا

“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুরো শাবান মাসই রোজা রাখতেন অল্প কিছু দিন ছাড়া।” (সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এই শব্দগুলো রয়েছে।)

ইমাম নওয়াবি রহ. বলেন, “আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর বক্তব্য ‘তিনি শাবান মাসে প্রায় পুরো মাসই রোজা রাখতেন’ এবং “তিনি শাবান মাসে অল্প কিছু দিন ছাড়া সব দিন রোজা রাখতেন”—এই দ্বিতীয় বক্তব্যটি প্রথম বক্তব্যের ব্যাখ্যা। এটি স্পষ্ট করে যে, ‘পুরো মাস’ বলতে তিনি মাসের বেশিরভাগ সময় বোঝাচ্ছেন।”

❑ প্রশ্ন: শাবান মাস অর্ধাংশ অতিবাহিত হওয়ার পর কি নফল রোজা রাখা নিষিদ্ধ?

উত্তর: আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

إِذَا انْتَصَفَ شَعْبَانُ فَلا تَصُومُو

“শাবান মাস অর্ধেক হয় গেলে তোমরা রোজা রাখিও না।” [মুসনাদ আহমদ (২/৪৪২), আবু দাউদ, অনুচ্ছেদে, এমনটি করা অর্থাৎ অবিচ্ছিন্নিভাবে শাবান ও রমজান দু মাস রোজা রাখা অনুচিত। শাইখ আলবানি হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। দ্রষ্টব্য: সহিহ তিরমিজি, হা/৫৯০]

এ হাদিসের অর্থ হল, যে ব্যক্তি শাবান মাসের প্রথম থেকে রোজা রাখেনি সে যেন অর্ধ শাবানের পর আর রোজা শুরু না করে করে। তবে যে ব্যক্তি শাবান মাসের শুরু থেকে রোজা রেখেছে সে রাখতে পারে।

অনুরূপভাবে যার উপর গত বছরের রোজা কাজা আছে অথবা যার প্রতি সোম ও বৃহ:বার রোজা রাখা অভ্যাস সেও পনের তারিখের পর রাখতে পারে। যেমন হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

‏ لاَ تَقَدَّمُوا الشَّهْرَ بِيَوْمٍ وَلاَ بِيَوْمَيْنِ إِلاَّ أَنْ يُوَافِقَ ذَلِكَ صَوْمًا كَانَ يَصُومُهُ أَحَدُكُمْ

“রমজান মাস আগমনের একদিন বা দুই দিন পূর্ব থেকে তোমরা (নফল) সিয়াম পালন করবে না। হ্যাঁ, যদি বা তোমাদের কারো পূর্ব (অভ্যাস অনুসারে) সিয়াম পালনের দিনে পড়ে যায় তবে সে দিনের সিয়াম পালন করতে পার।” [বুখারি ও মুসলিম]

তাছাড়া পূর্বোল্লিখিত হাদিসে বর্ণিত হয়েছে যে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রায় পুরো শাবান মাস রোজা পালন করতেন।

উল্লেখ্য যে, “শাবান মাস অর্ধেক হয় গেলে তোমরা রোজা রাখিও না।” অনেক মুহাদ্দিস এ হাদিসটিকে জইফ (দুর্বল) বলেছেন। যেমন: আহমদ বিন হাম্বল ও ইবনে মাইন বলেন, মুনকার। আর জইফ বলেছেন, বাইহাকি, তাহাবি প্রমূখ-যেমনটি উল্লেখ করেছেন ইবনে হাজার তার ফাতহুল বারি গ্রন্থে।

কিন্তু সহিহ ধরা হলেও সকল হাদিস সামনে রাখলে উপরোক্ত ব্যাখ্যার আলোকে অর্ধ শাবানের পরও রোজা রাখা জায়েজ প্রমাণিত হয়। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মাহরাম কাকে বলে এবং সৎ বাবা কি মাহরাম

 উত্তর: ইসলামে মাহরাম বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝায়,‌ যার সাথে চিরস্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম বা নিষিদ্ধ।

ফকিহগণ বলেন,

المحرَم للمرأة هو : كل مَن تحرم عليه على التأبيد لقرابة أو رضاع أو مصاهرة

“একজন মহিলার জন্য মাহরাম হলো, প্রত্যেক
ঐ ব্যক্তি যার সাথে স্থায়ীভাবে বিবাহ হারাম (নিষিদ্ধ) রক্তের সম্পর্ক, দুধ সম্পর্ক বা বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে।”
উদাহরণ:
– রক্তের সম্পর্ক: বাবা, ছেলে, ভাই, চাচা, মামা ইত্যাদি।
– দুধ সম্পর্ক: দুধ ভাই, দুধ বাবা ইত্যাদি।
– বৈবাহিক সম্পর্ক: শ্বশুর, স্বামীর ছেলে (অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত) ইত্যাদি।

এদের সাথে বিবাহ স্থায়ীভাবে হারাম।

🔸সৎ বাবা বলতে কী বোঝায়?

কোন মেয়ের জন্মদাতা পিতা যদি মারা যান বা তিনি তার মাকে তালাক দেন। অত:পর তার মা অন্য কোন পুরুষের সাথে বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন তাহলে মায়ের ২য় স্বামী হলো, ঐ মেয়ের সৎ বাবা।

🔸সৎ বাবার সাথে কখন বিয়ে নাজায়েজ আর কখন জায়েজ?

ক. মায়ের ২য় স্বামী (সৎ বাবা) মাহরাম হবে যদি তার মা এবং তার সৎ বাবা বিয়ের পর সহবাস করে বা তারা নির্জন ঘরে অবস্থান করে।
সুতরাং এ ক্ষেত্রে তাদের মাঝে কোন পর্দা রক্ষা করা আবশ্যক নয় এবং তার সাথে চিরকালের জন্য বিবাহ বন্ধন হারাম। (অর্থাৎ শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি তার জন্মদাতা পিতার অনুরূপ)

খ. কিন্তু সহবাস বা নির্জনে যাওয়ার পূর্বেই যদি সৎ বাবা কোন কারণে তার মাকে তালাক দিয়ে দেন অথবা তার মা মারা যান তাহলে সে ক্ষেত্রে এই মেয়ের সাথে উক্ত সৎ বাবার বিয়ে বৈধ।

এ মর্মে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَرَبَائِبُكُمُ اللَّاتِي فِي حُجُورِكُم مِّن نِّسَائِكُمُ اللَّاتِي دَخَلْتُم بِهِنَّ فَإِن لَّمْ تَكُونُوا دَخَلْتُم بِهِنَّ فَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ

“এবং (আরও বিয়ে করা হারাম) তোমরা যাদের সাথে সহবাস করেছ সে স্ত্রীদের কন্যাদেরকে যারা তোমাদের লালন-পালনে আছে। তবে যদি তাদের সাথে সহবাস না করে থাক, তবে এ বিবাহে তোমাদের কোন গুনাহ নেই।” [সূরা নিসা: ২৩]

▪️ইমাম ইবনে কাসির রহ. বলেন,

أما أم المرأة فإنها تحرم بمجرد العقد على ابنتها ، سواء دخل بها أو لم يدخل . وأما الربيبة وهي بنت المرأة فلا تحرم بمجرد العقد على أمها حتى يدخل

“একজন মহিলার মা কেবল তার মেয়ের সঙ্গে আকদ (বিয়ে) সম্পন্ন হলেই হারাম হয়ে যায়, সে স্ত্রী সহবাস করুক বা না করুক। কিন্তু সৎকন্যা (স্ত্রীর পূর্বের স্বামী থেকে জন্ম নেওয়া মেয়ে) কেবল তার মায়ের সঙ্গে আকদের মাধ্যমে হারাম হয় না যতক্ষণ না দুখুল (প্রবেশ) হয় (অর্থাৎ তারা সহবাসে লিপ্ত হয় কিংবা বা দুজন একলা ঘরে অবস্থান করে।)”

▪️ইমাম কুরতুবি রহ. বলেন,

جمهور السلف ذهبوا إلى أن الأم تحرم بالعقد على الابنة ، ولا تحرم الابنة إلا بالدخول بالأم ؛ وبهذا قول جميع أئمة الفتوى بالأمصار

“সালাফদের অধিকাংশের মতে, মায়ের হারাম হওয়া মেয়ের সঙ্গে কেবল আকদের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। কিন্তু মেয়ে (সৎকন্যা) হারাম হয় না যতক্ষণ না তার মায়ের সঙ্গে দুখুল (প্রবেশ) হয় (অর্থাৎ তারা সহবাসে লিপ্ত হয় কিংবা বা দুজন একলা ঘরে অবস্থান করে)। এটাই সমস্ত ফকিহগণের মত।”
الله أعلم
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

তাকদির বা অদৃষ্ট লিখনে বিশ্বাস ছাড়া মুসলিম দাবি করার সুযোগ নেই

 প্রশ্ন: আমার এক দ্বীনি ভাই নিজের ভাগ্যের প্রতি তেমন বিশ্বাস করতে চান না। সে বলে, নিজেদের কর্মদক্ষতার কারণেই সব সাফল্য আসে। এই ধরনের বিশ্বাস থাকলে ঈমান থাকবে কি?

উত্তর: তকদির বা ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস রাখা ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের একটি।রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

الإِيمَانُ أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَالْيَوْمِ الْآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ

“ঈমান হচ্ছে, তুমি আল্লাহ তায়ালা, তাঁর সকল ফেরেশতা, তাঁর যাবতীয় [আসমানি] কিতাব, তাঁর সমস্ত রসুল এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখবে। সাথে সাথে তকদির এবং এর ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান আনয়ন করবে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৮]

❂ এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন ছাড়া মুমিন দাবি করা সম্ভব নয়:

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন,

لَوْ كَانَ لِأَحَدِهِمْ مِثْلُ أُحُدٍ ذَهَبًا ثُمَّ أَنْفَقَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ مَا قَبِلَهُ اللَّهُ مِنْهُ حَتَّى يُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ

“সেই সত্তার কসম, যার হাতে ইবনে উমরের জীবন! তাদের (তকদির অস্বীকারকারীদের) কারও কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও থাকে, অতঃপর তা আল্লাহর রাস্তায় দান করে দেয়, তবুও আল্লাহ পাক উক্ত দান কবুল করবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তাকদিরের প্রতি ঈমান আনে।”
এরপর তিনি ঈমানের ছয়টি স্তম্ভ সম্পর্কিত হাদিস দ্বারা এ কথার পক্ষে দলিল পেশ করেন। [শরহুল আকিদা আত-তাহাবিয়া, শায়খ আব্দুল আজিজ আর-রাজিহি]

❂ তিনি আরও বলেন,

مَنْ مَاتَ عَلَى غَيْرِ الْإِيمَانِ بِالْقَدَرِ فَلَيْسَ مِنِّي

“যে ব্যক্তি তকদিরের উপর বিশ্বাস ব্যতীত মৃত্যুবরণ করল, সে আমার উম্মতের অন্তর্ভুক্ত নয়।” [সুনান আবি দাউদ, হাদিস নং ৪৭০০]

❂ ইবনু দাইলামী থেকে বর্ণিত আছে, কাতাদা (রাহ.) বলেন, “আমি উবাই ইবনে কা’বের কাছে গেলাম এবং তাকে বললাম, ‘তকদিরের ব্যাপারে আমার মনে কিছু সংশয় এসেছে। আপনি আমাকে তকদির সম্পর্কে উপদেশমূলক কিছু বলুন, যাতে আল্লাহ তা’আলা আমার অন্তর থেকে এ সংশয় দূর করে দেন।’

তখন তিনি বললেন,

لَوْ أَنَّ لَكَ مِثْلَ أُحُدٍ ذَهَبًا فَأَنْفَقْتَهُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ، مَا قَبِلَهُ اللَّهُ مِنْكَ حَتَّى تُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ، وَتَعْلَمَ أَنَّ مَا أَصَابَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُخْطِئَكَ، وَمَا أَخْطَأَكَ لَمْ يَكُنْ لِيُصِيبَكَ، وَلَوْ مُتَّ عَلَى غَيْرِ هَذَا لَدَخَلْتَ النَّارَ

“তুমি যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর রাস্তায় দান কর, আল্লাহ তোমার এ দান ততক্ষণ পর্যন্ত কবুল করবেন না, যতক্ষণ না তুমি তকদিরকে বিশ্বাস করবে। আর জেনে রাখ, তোমার জীবনে যা ঘটেছে, তা কখনো ব্যতিক্রম হত না। আর তোমার জীবনে যা ঘটার ছিল না, তা কখনো ঘটত না। যদি তুমি এ বিশ্বাস ছাড়া মারা যাও, তবে অবশ্যই তুমি জাহান্নামি হবে।’”

এরপর আমি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান এবং যায়েদ বিন সাবিত (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এর নিকট গেলাম। তাঁদের প্রত্যেকেই রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে অনুরূপ হাদিস উল্লেখ করলেন।

[সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৪৬৯৯; মুসনাদে আহমাদ, ৫/১৮৫, ১৮৯]

❑ যারা বলে, ‘নিজের যোগ্যতা বলেই সব কিছু হয়’— তাদের কথার অসারতা:

আমাদের যোগ্যতা দ্বারাই যদি সব কাজ হতো, তাহলে প্রতিটি দম্পতি বাবা-মা হতে পারত। কিন্তু অসংখ্য মানুষ সারা জীবন একটি সন্তানের মুখ দেখার জন্য হাহাকার করে কাটিয়ে দেয়। অথচ সন্তান গ্রহণের জন্য অন্যরা যা করে, তারাও তাই করেছে। কিন্তু তকদির বা ভাগ্যের লিখনের কারণে তারা ফল লাভ করতে পারেনি।

নিজস্ব যোগ্যতা দ্বারাই যদি সব কিছু হতো, তাহলে কৃষকরা চাষাবাদ করেও অনেক সময় ফসল ঘরে তুলতে পারত না কেন? বরং ঝড়-বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সব কিছু তছনছ হয়ে যায়। এটাই তকদির।

যোগ্যতা দ্বারাই যদি সব সাফল্য আসত, তাহলে মানুষ নিজেকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতে পারত। অথচ সাইক্লোন, ভূমিকম্প ও নানা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে সব কিছু ধ্বংস হয়ে যায়। তখন মানুষের কিছুই করার থাকে না। তকদির বা অদৃষ্ট লিখনের কাছে নিরুপায় আত্মসমর্পণ করা ছাড়া তার কোনো গতি থাকে না।

এমন আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।

সুতরাং ভাগ্যের লিখনে বিশ্বাস রেখে এবং আল্লাহর প্রতি আস্থা ও ভরসা সহকারে কাজ করতে হবে। সাফল্য দেওয়া বা না দেওয়া একমাত্র আল্লাহর হাতে। এ বিশ্বাস থেকে বের হয়ে গেলে মানুষ নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করার যোগ্যতা হারায়। আল্লাহ ক্ষমা করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।


Friday, February 21, 2025

যাদের দুআ কবুল হয় না

 যাদের দুআ কবুল হয় না—এই প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে বেশ কিছু কারণ ও শ্রেণির উল্লেখ রয়েছে। নিচে হাদিসের রেফারেন্সসহ বিষয়টি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

◈ ১. হারাম সম্পদ ভক্ষণকারী এবং হারাম পোশাক পরিধানকারীর দুআ কবুল হয় না:
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا، وَإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ، فَقَالَ: {يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ}، وَقَالَ: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ}، ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ، وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ، وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ، وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ، وَغُذِّيَ بِالْحَرَامِ، فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لَهُ؟”

“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি কেবল পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন। আল্লাহ মুমিনদের প্রতি ঐ একই নির্দেশ দিয়েছেন যা তিনি রসুলদের দিয়েছিলেন। আল্লাহ বলেন, “হে রসুলগণ, পবিত্র জিনিসগুলো খাও এবং সৎকর্ম কর। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর, সে বিষয়ে আমি ভালো করেই জানি।” [সূরা মুমিনুন: ৫১]। তিনি আরও বলেন, “হে ঈমানদারগণ, আমি তোমাদের যা রিজিক দিয়েছি, তার পবিত্র অংশ খাও।’” [সূরা বাকারা: ১৭২]

এরপর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে দীর্ঘ সফর করে, তার চুল এলোমেলো এবং শরীর ধুলায় ধূসরিত। সে আকাশের দিকে হাত তুলে আল্লাহকে ডাকে: ‘হে আমার রব! হে আমার রব!’ অথচ তার খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং তার পেট হারাম খাবার দ্বারা পূর্ণ। তাহলে কিভাবে তার দুআ কবুল হতে পারে?” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫]

◈ ২. যে ব্যক্তি দুআ কবুলের জন্য তাড়াহুড়া করে:

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“يُسْتَجَابُ لِأَحَدِكُمْ مَا لَمْ يَعْجَلْ، يَقُولُ: دَعَوْتُ فَلَمْ يُسْتَجَبْ لِي”

“তোমাদের দুআ কবুল করা হবে, যতক্ষণ না কেউ তাড়াহুড়া করে বলে ফেলে: ‘আমি দুআ করলাম, কিন্তু তা কবুল হলো না।’” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৪০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৩৫]

সুতরাং দুআ কবুলের জন্য তাড়াহুড়া করা যাবে না। বরং ধৈর্যের সাথে রবের দরবারে বারবার আকুতি-মিনতি সহকারে চাইতে হবে। দুআ কবুল হয় না এমন হতাশা থেকে দুআ বাদ দেওয়া যাবে না।

◈ ৩. উদাসীনতা ও অবহেলার সাথে দুআ করলে তা কবুল করা হয় না:

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ادْعُوا اللَّهَ وَأَنْتُمْ مُوقِنُونَ بِالإِجَابَةِ، وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ لَا يَسْتَجِيبُ دُعَاءً مِنْ قَلْبٍ غَافِلٍ لَاهٍ.”

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“তোমরা আল্লাহর কাছে দুআ করো, আর দুআ করার সময় তোমরা নিশ্চিত থাকো যে, তা কবুল হবে। এবং জেনে রাখো, আল্লাহ এমন দুআ কবুল করেন না, যা উদাসীন এবং অমনোযোগী হৃদয় থেকে আসে।” [তিরমিজি-ইমাম আলবানি এটিকে হাসান বলেছেন]

ব্যাখ্যা:

❂ মুমিনের বিশ্বাস: দুআ করার সময় পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ দুআ কবুল করবেন।
❂ দুআ করতে হবে আন্তরিকভাবে, এমন অবস্থায় যাতে অন্তর সচেতন ও উপস্থিত থাকে।
❂ উদাসীন হৃদয়ের দুআ প্রত্যাখ্যান: যে ব্যক্তি দুআ করে অথচ তার মনোযোগ আল্লাহর প্রতি থাকে না বা দুআর গুরুত্ব উপলব্ধি করে না, তার দুআ আল্লাহ কবুল করেন না।
❂ দুআর শর্তাবলী ও পরিবেশ: তুহফাতুল আহওয়াযি-তে বলা হয়েছে: “দুআ করার সময় এমন অবস্থায় থাকতে হবে যাতে তা কবুল হওয়ার উপযুক্ত হয়। অর্থাৎ ভালো কাজ করা, মন্দ কাজ এড়িয়ে চলা, দুআর শর্তগুলো পূরণ করা, হৃদয়ের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং বরকতময় সময় ও স্থানের সুযোগ গ্রহণ করা, যেমন সেজদার মুহূর্ত।”

❂ দৃঢ় সংকল্প ও আল্লাহর উদারতা: দুআ করার সময় দৃঢ়তার সাথে চাইতে হবে এবং আল্লাহর প্রতি বড় আশা রাখতে হবে। যেমন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

“ولكن ليعزم المسألة، وليعظم الرغبة، فإن الله لا يتعاظمه شيء أعطاه”

“তবে দুআ দৃঢ়তার সাথে করো এবং চাওয়ার মধ্যে বড় আশা রাখো। কারণ, আল্লাহর কাছে এমন কিছু নেই যা তিনি দিতে অক্ষম।” [সহিহ মুসলিম: ৬৯৮৮]

এখান থেকে যে সব শিক্ষা পাই সেগুলো হলো—
◆ ক. দুআ করার সময় বিশ্বাস রাখতে হবে যে, আল্লাহ তা কবুল করবেন।
◆ খ. মনোযোগ ও আন্তরিকতা ছাড়া দুআ কবুল হয় না।
◆ গ. দুআর শর্তগুলো পূরণ করা আবশ্যক।
◆ ঘ. আল্লাহর কাছ থেকে বড় কিছু চাইতেও দ্বিধা করা উচিত নয়।

◈ ৪. নিষিদ্ধ জিনিস বা পাপের জন্য দুআ করলে দুআ প্রত্যাখ্যাত হয়:

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“مَا مِنْ عَبْدٍ يَدْعُو اللَّهَ بِدُعَاءٍ إِلَّا آتَاهُ اللَّهُ إِيَّاهُ، أَوِ ادَّخَرَ لَهُ فِي الآخِرَةِ، مَا لَمْ يَدْعُ بِإِثْمٍ أَوْ قَطِيعَةِ رَحِمٍ”

“কোনও বান্দা আল্লাহর কাছে দুআ করলে আল্লাহ তাকে তিনটি জিনিসের একটিই দান করেন: হয় তার দুআ কবুল করেন, না হয় তা আখিরাতের জন্য সংরক্ষণ করেন, অথবা তার থেকে কোনও বিপদ দূর করেন। তবে শর্ত হলো, সে পাপ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার দুআ না করবে।” [তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৭৩]

◈ ৫. সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে বাধা দান ত্যাগ করা দুআ কবুল না হওয়ার অন্যতম কারণ:

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
والَّذي نَفسي بيدِهِ لتأمُرُنَّ بالمعروفِ ولتَنهوُنَّ عنِ المنكرِ أو ليوشِكَنَّ اللَّهُ أن يبعثَ عليكُم عقابًا منهُ ثُمَّ تَدْعُونَهُ فَلَا يُسْتَجَابُ لَكُمْ

“ঐ সত্তার শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই সৎ কাজের আদেশ দিবে এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে। অন্যথায়, আল্লাহ তোমাদের ওপর শাস্তি পাঠাবেন। এরপর তোমরা আল্লাহকে ডাকবে, কিন্তু তোমাদের দুআ কবুল করা হবে না।” [সহিহ তিরমিজি, হা/২১৬৯]

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে, দুআ কবুল না হওয়ার একটি কারণ হলো, মানুষ যদি সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা বন্ধ করে দেয়। যখন মানুষ অন্যায়কে সহ্য করে এবং তা সংশোধনের চেষ্টা করে না, তখন আল্লাহ তাদের ওপর শাস্তি নাজিল করেন এবং তাদের দুআ কবুল হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

◈ ৬. দুআকে শর্তযুক্ত করা:

দুআ করার সময় দুআতে শর্তারোপ করা (যেমন: “হে আল্লাহ, যদি আপনি চান তাহলে আমাকে ক্ষমা করুন”) এটি নিষিদ্ধ। বরং আল্লাহর কাছে দৃঢ়তার সাথে চাওয়া এবং আন্তরিকতা ও একাগ্রতার সাথে দুআ করা আবশ্যক।
لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي إِنْ شِئْتَ اللَّهُمَّ ارْحَمْنِي إِنْ شِئْتَ، لِيَعْزِمِ الْمَسْأَلَةَ فَإِنَّهُ لَا مُسْتَكْرِهَ لَهُ
“তোমাদের কেউ যেন না বলে: ‘হে আল্লাহ, যদি আপনি চান, আমাকে ক্ষমা করুন। হে আল্লাহ, যদি আপনি চান, আমার প্রতি রহম করুন।’ বরং দুআতে দৃঢ়ভাবে চাওয়া উচিত, কারণ আল্লাহকে কেউ বাধ্য করতে পারে না।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৩৩৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৭]

❂ এই হাদিস থেকে শিক্ষা:

ক. দুআতে দৃঢ়তা: দুআ করার সময় আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার ব্যাপারে পূর্ণ বিশ্বাস রাখা উচিত। শর্তযুক্ত শব্দ ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা দরকার।
খ. আল্লাহর ক্ষমতার প্রতি আস্থা: আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং কারো দ্বারা প্রভাবিত হন না। তিনি তাঁর বান্দার দুআ কবুল করেন যখন বান্দা আন্তরিকতা ও দৃঢ়তার সাথে তাঁর কাছে প্রার্থনা করে।
গ. আন্তরিক প্রচেষ্টা: দুআ করার সময় একাগ্রতা এবং অবিরাম অনুরোধ করতে হবে।
মোটকথা, দুআর মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আমাদের চাওয়া ইবাদতের অংশ। এটি দৃঢ়তার সঙ্গে এবং আন্তরিকভাবে করতে হবে, যেন আমরা আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস রাখতে পারি। আল্লাহ আমাদের দুআ কবুল করুন। আমিন।

◈ ৭. দুআ কবুলের শর্তাবলী অনুপস্থিত থাকা:

যাদের মধ্যে দুআ কবুলের শর্তাবলী অনুপস্থিত থাকবে তাদের দুআ কবুল হবে না। দুআ কবুলের শর্তাবলী হল, ইখলাস তথা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুআ করা, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পদ্ধতি অনুসারে দুআ করা এবং হালাল খাবার গ্রহণ করা।

উপরে বর্ণিত শর্তগুলো যার মধ্যে পাওয়া যাবে না তার দুআ আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না।

❑ বিশেষ তিন ব্যক্তির দুআ কবুল হবে না:

উপরোল্লিখিত কারণগুলো ছাড়াও আরও তিনজন ব্যক্তির কথা হাদিসে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে যাদের দুআ কবুল করা হবে না। তারা হল: রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
” ثلاثة يدعون فلا يستجاب لهم : رجل كانت تحته امرأة سيئة الخلق فلم يطلقها , و رجل كان له على رجل مال فلم يشهد عليه ، و رجل آتى سفيها ماله و قد قال الله: وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ
“তিন ব্যক্তি এমন যে তাদের দুআ কবুল করা হয় না। যথা:

— এক. যে ব্যক্তির অধীনে দুশ্চরিত্রা নারী আছে কিন্তু সে তাকে তালাক দেয় না।
— দুই. যে ব্যক্তি অন্য লোকের কাছে তার পাওনা আছে কিন্তু সে তার সাক্ষী রাখেনি।
— তিন. যে ব্যক্তি নির্বোধ ব্যক্তিকে সম্পদ দিয়ে দেয়। অথচ আল্লাহ বলেন,
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ
“তোমরা নির্বোধদেরকে তোমাদের সম্পদ দিও না।”

হাদিসটি ইমাম হাকিম তার মুস্তাদরাক কিতাবে উল্লেখ করে তাকে ইমাম বুখারি ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক সহিহ বলেছেন, আর ইমাম যাহাবি তাতে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি বলেন, এটি মাউকুফ বা সাহাবির উক্তি। আর ইমাম আলবানি বলেন, হাদিসটি সহিহ-মারফু বা রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উক্তি। [সিলসিলা সহীহা ৪/৪২০]

◈ হাদিসটির ব্যাখ্যা:

◆ এই হাদিসের অর্থ হল, কেউ যদি নিজের দুশ্চরিত্রা স্ত্রীর বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদুআ করে তাহলে তা গৃহীত হবে না। কারণ তার ক্ষমতা ছিল, তাকে তালাক দেওয়ার কিন্তু সে তা করেনি।

◆ কেউ যদি সাক্ষী এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে ঋণ দেয় এবং সে ঋণগ্রহীতা তা অস্বীকার করে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ঋণদাতা যদি আল্লাহর কাছে বদদুআ করে তাহলে গৃহীত হবে না। কারণ আল্লাহ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সে তা পালন করেনি।

◆ অনুরূপভাবে, কেউ যদি নির্বোধের হাতে তার অর্থ-সম্পদ তুলে দেয় ফলে সে তা আত্মসাৎ করে বা নষ্ট করে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে বদদুআ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। কারণ আল্লাহ নির্বোধদের হাতে সম্পদ তুলে দেওয়া বারণ করেছেন।

মোটকথা, এই ব্যক্তি আল্লাহর বিধান উপেক্ষা করে নিজের উপরে নিজেই শাস্তি চাপিয়ে নিয়েছে। যার ফলে এই সকল ক্ষেত্রে তার দুআ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। [ইমাম মুনাবি]
এই হাদিস দ্বারা এটা বোঝায় না যে, তার অন্য কোন দুআ কবুল হবে না। তার অন্যান্য দুআর ক্ষেত্রে এই হাদিস প্রয়োগ করা ঠিক নয়।

❑ আল্লাহ কেন দুনিয়াতেই আমাদের সব চাওয়া পূরণ করেন না?

আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তার অসীম ভবিষ্যৎ জ্ঞানের আলোকে জানেন, কোথায় আমাদের কল্যাণ আছে। কেননা তিনিই আমাদের তকদির লিপিবদ্ধ করেছেন। তিনি অবশ্যই আমাদের কল্যাণ চান। তিনি তার হেকমত অনুযায়ী আমাদের দুআতে সাড়া দিয়ে থাকেন। তাই কখনো কখনো বান্দার দুনিয়াবি চাওয়া পূরণ না করে এর বিনিময়ে তাকে অনাগত বিপদ থেকে রক্ষা করেন অথবা আখিরাতে তার জন্য অনন্ত পুরস্কার জমা রাখেন যা তার জন্য আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কখনো কখনো আমরা আল্লাহর প্রতি দৃঢ় ঈমানের অভাবে ও অজ্ঞতা বশত: দুনিয়াতেই সব চাওয়া-পাওয়া পূরণের জন্য অস্থির হয়ে যাই!
সুতরাং দুআতে হতাশ হওয়া যাবে না বা বিরক্ত হয়ে দুআ পরিত্যাগ করা যাবে না। বরং ধৈর্যের সাথে দুআ করে যেতে হবে।
আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate