Sunday, April 21, 2024

প্রবাসীরা কি তাদের ফিতরা দেশে দিতে পারবে এবং দিতে পারলে কীভাবে দিবে

 উত্তর: প্রবাসীরা যদি প্রবাসে দুস্থ ও অসহায় মানুষ পায় তাহলে সেখানে ফিতরা দিবে। এটাই উত্তম। একজন মানুষ যেখানে বসবাস করে এবং আয়-উপার্জন করে সেখানকার গরিব-অসহায় মানুষরা ফিতরা পাওয়ার বেশি হকদার। কিন্তু যদি মনে হয়, সে দেশের চেয়ে নিজ দেশে বা অন্য কোথাও সঙ্কট ও অভাব-অনটন বেশি তাহলে সেখানে ফিতরা প্রেরণ করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে প্রবাসে যে পরিমাণ ফিতরা দিতে হতো অন্যত্র দিলে সে পরিমাণটা ঠিক রাখা উত্তম। (তবে তা যেন আড়াই বা তিন কেজির কম না হয়)।

◆ উদাহরণ: যে সব বাংলাদেশী মধ্যপ্রাচ্য বা ইউরোপ-আমেরিকায় বসবাস করে তারা সে দেশে সাধারণত: যে মানের চাল খেয়ে থাকে সে মানের আড়াই বা তিন কেজি পরিমাণ চালের মূল্য বাংলাদেশে প্রেরণ করে সেখানে তার পরিবার অথবা অন্য বিশ্বস্ত কাউকে দায়িত্ব দিবে যেন, উক্ত অর্থ সমপরিমাণ চাল ক্রয় করে এলাকার গরিব-অসহায় মানুষের মাঝে বণ্টন করে দেয়। এ ক্ষেত্রে বিদেশের তুলনায় বাংলাদেশে চালের দাম তুলনা মূলক কম হওয়ায় চালের পরিমাণে হয়ত কিছু বেশি হবে। এতে গরিবরা একটু বেশি উপকৃত হবে আশা করা যায়। যদিও দেশের হিসেবে তিন কেজি দিলেও আদায় হয়ে যাবে।

উল্লেখ্য যে, হাদিসে যেহেতু খাদ্য দ্রব্য দেওয়ার কথা বলা হয়েছে তাই সুন্নত অনুসরণ করতে চাইলে খাদ্য দ্রব্য (নিজ এলাকার প্রধান খাদ্যদ্রব্য যেমন: চাল) দিতে হবে। একান্ত অপরিহার্য পরিস্থিতি না হলে মূল্য বা টাকা দ্বারা ফিতরা দেয়া সুন্নত পরিপন্থী।

✪ সৌদি আরবের স্থায়ীয় ফতোয়া বোর্ড বলেছে:

“مقدار زكاة الفطر صاع من تمر أو شعير أو زبيب أو أقط أو طعام..، وتعطى فقراء المسلمين في بلد مخرجها، ويجوز نقلها إلى فقراء بلد أخرى أهلها أشد حاجة…، ‌وليس ‌قدرها ‌تابعا ‌للتضخم ‌المالي، بل حدها
الشرع بصاع” فتاوى اللجنة الدائمة/ م1″ (9/ 369).

“জাকাতুল ফিতরের পরিমাণ হল, এক সা খেজুর, যব, কিশমিশ, পনির অথবা খাদ্য। ফিতরা দাতার দেশের দরিদ্রদেরকে তা দিতে হবে। তবে যে দেশে অভাব আরও বেশি প্রকট সে দেশের অভাবী মানুষের উদ্দেশ্যে তা স্থানান্তরিত করা জায়েজ আছে।” [ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমা (সৌদি ফতোয়া বোর্ড) ৯/৩৬৯]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে প্রচলিত কুসংস্কার এবং আমাদের করণীয়

 প্রশ্ন: আমাদের সমাজে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের সময় গর্ভবতী মাকে অনেক নিয়ম পালন করতে বলা হয় এবং অনেক কিছুতে বাধা দেয়া হয়। অন্যথায় গর্ভস্থ সন্তানের নাকি ক্ষতি হয়। এ বিষয়টি কুরআন-হাদিসের আলোকে কতটুকু সঠিক? এবং চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ কালে আমাদের কী করা উচিত?

উত্তর: নি:সন্দেহে চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণ মহান আল্লাহর সৃষ্টি জগত ও মহাবিশ্বের মধ্যে দুটি বিশাল প্রাকৃতিক পরিবর্তন-যা মহান আল্লাহর অসীম শক্তিমত্তার পরিচয় বহন করে। বিজ্ঞান বলে, চাঁদ যখন পরিভ্রমণ অবস্থায় কিছুক্ষণের জন্য পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখন পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে কিছু সময়ের জন্য সূর্য আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাই সূর্যগ্রহণ (Solar eclipse) বা কুসুফ। আর পৃথিবী যখন তার পরিভ্রমণ অবস্থায় চাঁদ ও সূর্যের মাঝখানে এসে পড়ে, তখনই পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে চাঁদ কিছুক্ষণের জন্য অদৃশ্য হয়ে যায়। এটাই চন্দ্রগ্রহণ (Lunar eclipse) বা খুসুফ।

🌀 সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণের সময় করণীয়:

এ সময় সকল মুসলিমদের জন্য করণীয় হল, সালাতুল কুসুফ/খুসুফ বা চন্দ্রগ্রহণ/সূর্যগ্রহণের সালাত আদায় করা, আল্লাহর কাছে নিজেদের পাপাচারের জন্য ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাকবির পাঠ করা, আল্লাহর নিকট দুআ করা, দান-সদকা করা এবং এত বড় নিদর্শন দেখে মহান আল্লাহর প্রতি মনে ভয়-ভীতি জাগ্রত করা। এগুলো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মুসলিমের জন্য প্রযোজ্য-এমনকি একজন গর্ভবতী নারীর জন্য। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহধর্মিণী মা জননী আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ مِنْ آيَاتِ اللهِ، وَإِنَّهُمَا لَا يَنْخَسِفَانِ لِمَوْتِ أَحَدٍ، وَلَا لِحَيَاتِهِ، فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُمَا فَكَبِّرُوا، وَادْعُوا اللهَ وَصَلُّوا وَتَصَدَّقُوا،
”সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর কুদর (ক্ষমতার) বিশেষ নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে সূর্যগ্রহণ হয় না। অত:এব যখন তোমরা সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ দেখতে পাও, তখন তাকবীর বলো, আল্লাহর নিকট দু’আ করো, সালাত আদায় করো এবং দান-সদকা করো।” [সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: [1964], অধ্যায়: ১১/ সালাতুল কুসূফ (كتاب الكسوف) ইসলামিক ফাউন্ডেশন]

🌀 সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত নানা কুসংস্কার:

সূর্য ও চন্দ্রগ্রহণ নিয়ে আমাদের সমাজে (বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের বিষয়ে) অনেক কুসংস্কার ও ভুল বিশ্বাস প্রচলিত আছে। যেমন:
– এ সময় কোন কিছু খেতে নেই। বলা হয়, সূর্যগ্রহণের ১২ ঘণ্টা এবং চন্দ্রগ্রহণের ৯ ঘণ্টা আগে থেকে খাবার গ্রহণ করা বারণ!
– এ সময় তৈরি করা খাবার ফেলে দিতে হবে!
– এ সময় যৌন সংসর্গ করা যাবে না!
– গর্ভবতী মায়েরা এ সময় যা করে, তার প্রভাব সন্তানের ওপর পড়বে!
– সূর্যগ্রহণে গর্ভবতী মায়েদের কাত হয়ে শুতে বারণ নইলে নাকি গর্ভের শিশু বিকলাঙ্গ হয়!
– সূর্যগ্রহণের সময় জন্ম নেওয়া শিশুদের ব্যাপারে দুই ধরনের গপ্প শুনতে পাওয়া যায়। এক, শিশুটি অসুস্থ হবে এবং দুই, শিশুটি চালাক হবে!
– প্রসূতি মা সূর্যগ্রহণ দেখলে তার অনাগত সন্তানের বিকলঙ্গ হবে!
– চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণের সময় যদি গর্ভবতী নারী কিছু কাটাকাটি করেন, তাহলে গর্ভস্থ সন্তানের ক্ষতি হয় এ গুলো সবই কুসংস্কার ও ভুল বিশ্বাস।
– এ সময় কোনো নারীকে ঘুম বা পানাহার থেকে বারণ করাও অন্যায়।
এছাড়া গর্ভবতী নারীর করণীয়-বর্জনীয় বিষয়ে সমাজে বহু কিছু প্রচলিত রয়েছে সেগুলো সব কুসংস্কার এবং ভ্রান্ত ধারণা।আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমীন। ইসলামী শরিয়াহ ও বাস্তবতার সঙ্গে এগুলোর কোনো মিল নেই এবং বৈজ্ঞানিকভাবেও গ্রহণযোগ্য নয়। জাহেলি যুগেও এ ধরণের কিছু ধারণা প্রচলিত ছিল। সেকালে মানুষ ধারণা করত যে, চন্দ্রগ্রহণ কিংবা সূর্যগ্রহণ হলে অচিরেই দুর্যোগ বা দুর্ভিক্ষ হবে। চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণ পৃথিবীতে কোনো মহাপুরুষের জন্ম বা মৃত্যুর বার্তাও বহন করে বলে তারা মনে করত। বিশ্বমানবতার পরম বন্ধু, মহান সংস্কারক, প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেগুলোকে ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রত্যাখ্যান করেছেন।

মুগিরা ইবনে শুবা রা. বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পুত্র ইবরাহিমের মৃত্যুর দিনটিতেই সূর্যগ্রহণ হলে আমরা বলাবলি করছিলাম যে, নবী পুত্রের মৃত্যুর কারণেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে। এসব কথা শুনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহ তাআলার অগণিত নিদর্শনের দুটি। কারো মৃত্যু বা জন্মের কারণে চন্দ্রগ্রহণ বা সূর্যগ্রহণ হয় না।” [সহিহ বুখারি: ১০৪৩] সুতরাং চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ লোকদের মাঝে যে সকল কুসংস্কার ও ভ্রান্ত বিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে সেগুলো দূর করার জন্য দ্বীনের বিশুদ্ধ জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে হবে এবং এ সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পক্ষ থেকে উম্মতকে যে নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে সেগুলো পালনে সচেষ্ট হতে হবে। আল্লাহ তাওফিক দান করুন।
والله أعلم بالصواب
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

যাকাত বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর

 ◆ ১. প্রশ্ন: আমার যদি ১০ ভরি স্বর্ণ থাকে তাহলে আমি কি ৭.৫ ভরি (নিসাব) বাদ দিয়ে বাকি ২.৫ ভরির জাকাত দিবো নাকি পুরো ১০ ভরির জাকাত দিবো?

উত্তর: পুরো ১০ ভরি স্বর্ণের জাকাত দিবেন। কেননা কারও কাছে জাকাতের নিসাব পরিমাণ অর্থ এক বছর জমা থাকলে পুরো নিসাব থেকে শত করা আড়াই (২.৫%) টাকা হারে জাকাত দিতে হয়।

◆ ২. প্রশ্ন: আমি একজন আমেরিকা প্রবাসী মহিলা। আমার ৩টি বাসা-বাড়ি আছে। একটি ইসলামি ব্যাংক থেকে লোন করে কেনা। লোনের টাকা পরিশোধ করার পর যে টাকা থাকে সেটা আমি নিজের খরচ চালাই। সেটা থেকে কোন টাকা সেভ হয় না। বাকি দুটো বাসার কোন লোন নেই। আমি গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হওয়ায় ক্ষতিপূরণ বাবদ কিছু টাকা পাই। সেই টাকা দিয়ে বাড়ি কিনেছি। পুরো টাকা পরিশোধ করা। আমি কোন চাকরি করি না। ফিতনা সম্ভাবনার কারণে ভবিষ্যতে চাকরিও করার কোন সম্ভাবনা নাই। এই বাসা ভাড়া আয় আমার আয়। বাসা একটি সম্পদ। এর বর্তমান মূল্য ধরে কি আমার জাকাত দিতে হবে? এবং ভাড়া থেকে খরচ করে যে টাকা এক বছর আমার কাছে থাকবে সে টাকার কি জাকাত দিতে হবে?
উত্তর: বসত বাড়ি বা ভাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত কৃত বাড়িতে জাকাত নেই। তবে বাড়ি ভাড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থ যদি জাকাতের নিসাব পরিমাণ হয় তাহলে তাতে জাকাত দিতে হবে।

◆ ৩. প্রশ্ন: ছয় লাখ টাকায় জাকাত কত আসবে?
উত্তর: 6,00000%2.5=15,000 TK

◆ ৪. প্রশ্ন: ৭ ভরি স্বর্ণের জাকাত কতটুকু দিতে হবে?
উত্তর: কারো নিকট সর্বনিম্ন ৭.৫০ (সাড়ে সাত) ভরি বা ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ এক বছর জমা থাকলে বছরান্তে তাতে ৪০ ভাগের এক ভাগ (২.৫০%) জাকাত দিতে হবে। এর কম থাকলে তাতে জাকাত ফরজ নয়। সুতরাং ৭ ভরি স্বর্ণে জাকাত ফরজ নয়। তবে যদি অন্যান্য জমা কৃত নগদ টাকা, ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্য ইত্যাদি সব মিলিয়ে ৭.৫০ স্বর্ণের মূল্যের সমপরিমাণ হয় তাহলে তাতে জাকাত আবশ্যক হবে।

◆ ৫. প্রশ্ন: আমার কোন টাকা নেই কিন্তু সাড়ে চার ভরি সোনার গয়না আছে। আমাকে কি জাকাত দিতে হবে?
উত্তর: নিসাব তথা ৭.৫ (৮৫ গ্রাম)-এর কম স্বর্ণ থাকলে তাতে জাকাত ফরজ নয়। সুতরাং ৪.৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কারে‌ জাকাত নেই‌।
উল্লেখ্য যে, ব্যবহারের জন্য সংরক্ষিত স্বর্ণালঙ্কারে জাকাত ফরজ কি না সে বিষয়ে দ্বিমত থাকলেও সতর্কতার স্বার্থে জাকাত দেওয়া অধিক নিরাপদ।

◆ ৬. প্রশ্ন: কারো কাছে কেবল ৫ ভরি স্বর্ণ থাকলে কি তাতে জাকাত দিতে হবে?
উত্তর: স্বর্ণ ৭.৫ ভরির কম থাকলে তাতে জাকাত ফরজ হয় না। সুতরাং কেবল ৫ ভরি স্বর্ণে জাকাত নেই।

◆ ৭. প্রশ্ন: বেতনের উপর জাকাতের হিসাবটা যদি একটু বলতেন তাহলে খুব উপকৃত হতাম।
উত্তর: বছর শেষে হিসাব করবেন যে, জাকাতের নিসাব পরিমাণ সম্পদের উপর এক বছর অতিবাহিত হয়েছে কিনা। (বেতন থেকে প্রাপ্ত অর্থ হোক অথবা অন্য কোন উৎস থেকে প্রাপ্ত হোক) যদি এক বছর অতিবাহিত হয়ে থাকে তাহলে জাকাত দিতে হবে। বেতনের যে টাকাটার ওপরে এক বছর অতিবাহিত হয়নি তার উপরে জাকাত আবশ্যক নয়। তবে ইচ্ছে করলে যেই সম্পদের উপরে এক বছর অতিবাহিত হয়েছে তার সাথে যে সম্পদের উপর এক বছর অতিবাহিত হয়নি সেটাকে যুক্ত করে জাকাত দেওয়া যাবে। এক্ষেত্রে যেটার উপরে এক বছর অতিবাহিত হয়নি সেটার অগ্রিম জাকাত হিসেবে গণ্য হবে।

◆ ৮. প্রশ্ন: আমার হাতে অল্প কিছু জাকাতের টাকা আছে। তা একজন আত্মীয়কে দিতে চাচ্ছি। কিন্তু জাকাতের টাকা বলে দিলে তাদের মন খারাপ হতে পারে। এক্ষেত্রে না বলে দেওয়া যাবে কি?
উত্তর: যাকে দিবেন সে যদি জাকাত পাওয়ার উপযুক্ত হয়ে থাকে তাহলে তাকে বলে দেওয়া জরুরি নয়। কিন্তু যদি তার অভ্যাস বা মানসিকতা থেকে জানা যায় যে, সে জাকাত গ্রহণ করে না তাহলে বলে দেওয়া উত্তম।

◆ ৯. প্রশ্ন: স্বামী যদি ফসলের জাকাত না দিতে চায় সে সে ক্ষেত্রে কি স্ত্রী স্বামীকে না জানায়ে ফসলের জাকাত দিতে পারবে?
উত্তর: যেহেতু ফসলের মালিক হচ্ছে স্বামী সেহেতু জাকাত দেওয়ার দায়িত্ব তার উপরে। অতএব স্ত্রী জন্য স্বামীর অজান্তে তার ফসলের জাকাত বের করা ঠিক হবে না। কিন্তু যদি স্বামীর কথাবার্তা ও আচরণ থেকে অনুভব করা যায় যে, সে আসলে অলসতা বশত: জাকাত বের করে না এবং স্ত্রী যদি তার পক্ষ থেকে জাকাত বের করে দেয় তাহলে সে মন খারাপ করবে না তাহলে স্ত্রী তা করতে পারে।

◆ ১০. প্রশ্ন: এক প্রতিবেশী আগে গরিব ছিল। জাকাতের টাকা খেতো। এখন তার দুই ছেলে ইনকাম করে। আর্থিক অবস্থা মোটামুটি ভালো। তাকে কিছু দিয়ে সাহায্য করলে সেটা কি দান বা সদকার অন্তর্ভুক্ত হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, তাকে জাকাত না দিয়ে সাধারণভাবে সাহায্য-সহযোগিতা ও দান-সদকা করবেন।‌ এতে সওয়াব পাওয়া যাবে ইনশাআল্লাহ।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ঈদের রাতের ফজিলত এবং এই রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার বিধান

 প্রশ্ন: ঈদের রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার ব্যাপারে ইসলামে কী দিকনির্দেশনা রয়েছে বা এ রাতের ফজিলত কী?

উত্তর: ঈদ মানেই প্রাণে প্রাণে আনন্দের হিল্লোল। ঈদ মানেই ঘরে ঘরে খুশির আমেজ। ঈদের আগমনে মুমিন হৃদয়গুলো আনন্দে উদ্বেলিত হয়। ঈমানদারগণ আল্লাহর প্রতি প্রফুল্ল চিত্তে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং তাকবির ধ্বনির মাধ্যমে তার শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ত্বের ঘোষণা দেয়। বিশেষ করে ঈদের রাত থেকেই শুরু হয় আগামীকাল একটি সুন্দর সকালে ঈদকে বরণ করার প্রস্তুতি। কিন্তু ঈদের রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করার ব্যাপারে কোন হাদিস বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়। বরং এই রাতে বিশেষভাবে কিয়ামুল লাইল করা সংক্রান্ত বর্ণিত হাদিসকে অনেক আলেম বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলেছেন। অনুরূপভাবে দুই ঈদের রাতে দুআ কবুল হওয়া প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসটিও বানোয়াট।

তাই এ রাতে তাকবির পাঠ ছাড়া বিশেষ কোনও নামাজ, ইবাদত-বন্দেগি বা অন্য কোনও আমল নেই। তবে যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত তারা যথারীতি তা পড়তে পারে।

শাইখ উসাইমিন রহ. বলেন, “দু ঈদের রাত জেগে ইবাদত করার ফজিলতের হাদিসগুলো জঈফ (দুর্বল)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো এ দু রাত জেগে ইবাদত করতেন না। তিনি সারা রাত জেগে ইবাদত করেছেন কেবল রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে-লাইলাতুল কদর (শবে কদর) পাওয়ার আশায়। যখনই শেষ দশক শুরু হত, তিনি সবগুলো রাত জেগে ইবাদত করতেন।”

◍ ঈদের রাতের ফজিলতে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ জাল/জঈফ বর্ণনা:

ঈদের রাত জেগে ইবাদতের ব্যাপারে যেসব হাদিস পেশ করা হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল,
مَنْ قَامَ لَيْلَتَيْ الْعِيدَيْنِ مُحْتَسِبًا لِلَّهِ لَمْ يَمُتْ قَلْبُهُ يَوْمَ تَمُوتُ الْقُلُوبُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দু ঈদের রাত জেগে ইবাদত করবে তার হৃদয় মারা যাবে না যেদিন সব হৃদয় মারা যাবে।” [ইবনে মাজাহ, হা/১৭৮২]

এ হাদিসটি সহিহ নয়।

● নওবী রহ. এ হাদিসটিকে মারফু ও মাওকুফ উভয় সূত্রে জইফ বলেছেন।

● হাফেজ ইরাকি, ইবনে হাজার প্রমুখ মুহাদ্দিসগণও এটিকে জইফ বলেছেন।
وقال الحافظ ابن حجر : هذا حديث غريب مضطرب الإِسناد . انظر : “الفتوحات الربانية” (4/235) .
● আলবানি এটিকে মাউযু (বানোয়াট) হাদিস বলে আখ্যায়িত করেছেন। [জইফ ইবনে মাজাহ]

◈ শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রহ. বলেন,
” الأَحَادِيثُ الَّتِي تُذْكَرُ فِي لَيْلَةِ الْعِيدَيْنِ كَذِبٌ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم” انتهى .
“দু ঈদের রাতের ব্যাপারে যে সব হাদিস পেশ করা সেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর মিথ্যাচার।”
মোটকথা, দু ঈদে সারা রাত জেগে বিশেষ কোনও সালাত, জিকির-আজকার, মিলাদ, করব জিয়ারত ইত্যাদি করার ব্যাপার শরিয়তে বিশুদ্ধ সূত্রে কোনও নির্দেশনা আসেনি। তবে অন্যান্য সময় যেমন ইবাদত-বন্দেগি, দুআ-জিকির, কবর জিয়ারত, কুরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদ সালাত আদায় ইত্যাদি করা জায়েজ তেমনি এ দু রাতেও সেগুলো জায়েজ। কিন্তু তা এ রাতের বিশেষ ফজিলত মনে করে করা শরিয়ত সম্মত নয়।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ঈদুল ফিতরের রাতের ফজিলত এবং এ রাতে করণীয়

 প্রশ্ন: ঈদুল ফিতরের রাতে করণীয় এবং এ রাত জেগে নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগি করার ফজিলত কি?

উত্তর: ঈদের চাঁদ (শাওয়াল মাসের নতুন চাঁদ) উদিত হলে রমজানের পরিসমাপ্তি ঘটে। এ রাত থেকে আর তারাববির সালাত নেই। সুতরাং যথারীতি রমজানের আগে যে সব সালাত ছিল সেগুলো আদায় করতে হবে। ইশার সালাত আদায় করা হবে সুন্নত ও বিতর সহ। এটাই হল, ঈদের রাত। পরের দিন প্রত্যুষে মুসলিমগণ (যদি ইতোপূর্বে ফিতরা বণ্টন না করা হয়ে থাকে তাহলে) গরিব-দুখীদের মাঝে ফিতরা বণ্টন প্রক্রিয়া সমাপ্ত করে গোসল করে এবং আতর-সুগন্ধি মেখে ঈদের মাঠে যাবে ঈদের সালাতের উদ্দেশ্যে।

◍ ঈদের রাতে করণীয়: তাকবীর পাঠ

আল্লাহ তাআলা রমজানের বিধিবিধান বর্ণনা করার পর বলেন,
لِتُكْمِلُوا الْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا اللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَاكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
“যাতে তোমরা (রমজান মাসের) সংখ্যা পূরণ কর এবং তোমাদেরকে সুপথ দেখানোর দরুন তাকবীর পাঠ (আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা) করো এবং কৃতজ্ঞতা আদায় কর।” [সূরা বাকারা: ১২৫] সুতরাং এ রাতের করণীয় হল, তাকবির পাঠ করা। পুরুষরা সন্ধ্যার পর থেকে বাড়িতে, মসজিদে, রাস্তায়, মাঠে-ঘাটে, বাজারে যে যেখানে থাকবে সেখানে উঁচু আওয়াজে তাকবির পাঠ করবে। আর মহিলারা নিচু স্বরে তাকবির পাঠ করবে।

◍ তাকবীর হল: “আল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার, লা-ইলা-হা ইল্লালা-হু ওয়াল্লা-হু আকবার, আল্লা-হু আকবার ওয়ালিল্লা-হিল হামদ।” (প্রথমে আল্লাহু আকবার তিন বার বলাও হাদিস সম্মত) শেষ রমজানের সূর্য ডোবার পর তথা ঈদের রাত থেকে আরম্ভ করে ঈদের নামাজ শুরু করা পর্যন্ত এ তাকবির পাঠ অব্যাহত থাকবে।

◍ ঈদের রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করা:

এ রাতে তাকবির পাঠ ছাড়া বিশেষ কোনও নামাজ, ইবাদত-বন্দেগি বা অন্য কোনও আমল নেই। এ ব্যাপারে কোনও সহিহ হাদিস সাব্যস্ত হয় নি। তবে যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাতে অভ্যস্ত তারা যথারীতি তা পড়তে পারে।

শাইখ উসাইমিন রহ. বলেন, “দু ঈদের রাত জেগে ইবাদত করার ফজিলতের হাদিসগুলো জঈফ (দুর্বল)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো এ দু রাত জেগে ইবাদত করতেন না। তিনি সারা রাত জেগে ইবাদত করেছেন কেবল রমজানের শেষ দশকের রাতগুলোতে-লাইলাতুল কদর (শবে কদর) পাওয়ার আশায়। যখনই শেষ দশক শুরু হত, তিনি সবগুলো রাত জেগে ইবাদত করতেন।”

◍ ঈদের রাতের ফজিলতে বর্ণিত একটি প্রসিদ্ধ জাল/জঈফ বর্ণনা:

ঈদের রাত জেগে ইবাদতের ব্যাপারে যেসব হাদিস পেশ করা হয় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল,
مَنْ قَامَ لَيْلَتَيْ الْعِيدَيْنِ مُحْتَسِبًا لِلَّهِ لَمْ يَمُتْ قَلْبُهُ يَوْمَ تَمُوتُ الْقُلُوبُ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দু ঈদের রাত জেগে ইবাদত করবে তার হৃদয় মারা যাবে না যেদিন সব হৃদয় মারা যাবে।” [ইবনে মাজাহ, হা/১৭৮২]

এ হাদিসটি সহিহ নয়।

● এ হাদিসটিকে নওবী এ হাদিসটিকে মারফু ও মাওকুফ উভয় সূত্রে জইফ বলেছেন।
● হাফেজ ইরাকি, ইবনে হাজার প্রমুখ মুহাদ্দিসগণও এটিকে জইফ বলেছেন।
وقال الحافظ ابن حجر : هذا حديث غريب مضطرب الإِسناد . انظر : “الفتوحات الربانية” (4/235) .
● আলবানি এটিকে মাউযু (বানোয়াট) হাদিস বলে আখ্যায়িত করেছেন। [জইফ ইবনে মাজাহ]

◈ শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রহঃ বলেন,
” الأَحَادِيثُ الَّتِي تُذْكَرُ فِي لَيْلَةِ الْعِيدَيْنِ كَذِبٌ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم” انتهى .
“দু ঈদের রাতের ব্যাপারে যে সব হাদিস পেশ করা সেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর মিথ্যাচার।”

মোটকথা, দু ঈদে সারা রাত জেগে বিশেষ কোনও সালাত, জিকির-আজকার, মিলাদ, কবর জিয়ারত ইত্যাদি করার ব্যাপার শরিয়তে বিশুদ্ধ সূত্রে কোনও নির্দেশনা আসে নি। তবে অন্যান্য সময় যেমন ইবাদত-বন্দেগি, দুআ-জিকির, কবর জিয়ারত, কুরআন তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদ সালাত আদায় ইত্যাদি করা জায়েজ তেমনি এ দু রাতেও সেগুলো জায়েজ। কিন্তু তা এ রাতের বিশেষ ফজিলত মনে করে করা শরিয়ত সম্মত নয়।
মহান আল্লাহ মুসলিম উম্মাহকে তাকবীর তথা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও বড়ত্বের বহিঃপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তাদের বছরের অন্যতম জাতীয় ঈদ উৎসব পালনের তওফিক দান করুন এবং ক্ষেত্রে সব ধরণের বিদআত, পাপাচার ও আল্লাহর নাফরমানি থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স, মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate