Wednesday, March 27, 2024

মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের জন্য করণীয় আমলসূমহ

 

maxresdefault
লেখকঃ হাবিবুল্লাহ মুহাম্মাদ ইকবাল | অনুবাদক : আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া | প্রকাশনায় : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ

إن الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد

মা-বাবা ছোট শব্দ, কিন্তু এ দুটি শব্দের সাথে কত যে আদর, স্নেহ, ভালবাসা রয়েছে  তা পৃথিবীর কোন মাপযন্ত্র দিয়ে নির্ণয় করা যাবে না। মা-বাবা কত না কষ্ট করেছেন, না খেয়ে থেকেছেন, অনেক সময় ভাল পোষাকও পরিধান করতে পারেন নি, কত না সময় বসে থাকতেন সন্তানের অপেক্ষায়। সেই মা বাবা যাদের চলে গিয়েছেন, তারাই বুঝেন মা বাবা কত বড় সম্পদ। যেদিন থেকে মা বাবা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন সেদিন থেকে মনে হয় কী যেন হারিয়ে গেল,তখন বুক কেঁপে উঠে, চোখ থেকে বৃষ্টির মত পানি ঝরে, কী শান্তনাই বা তাদেরকে দেয়া যায়!  সেই মা বাবা যাদের চলে গিয়েছে তারা কি মা-বাবার জন্য কিছুই করবে না?। এত কষ্ট করে আমাদের কে যে মা-বাবা লালন পালন করেছেন তাদের জন্য আমাদের কি কিছুই করার নেই? অবশ্যই আছে। আলোচ্য প্রবন্ধে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মৃত মা-বাবা জন্য কী ধরনের আমল করা যাবে এবং যে আমলের সওয়াব তাদের নিকট পৌছবে তা উল্লেখ করা হলো:

১. বেশী বেশী দু‘আ করা 

মা-বাবা দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর সন্তান মা-বাবার জন্য বেশী বেশী দু‘আ করবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কী দু‘আ করবো তাও শিক্ষা দিয়েছেন । আল-কুরআনে এসেছে,

 رَبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا ٢٤ ﴾ [الاسراء: ٢٤]

‘‘হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন’’ [সূরা বানী ইসরাঈলঃ ২৪]

رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ يَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡحِسَابُ ٤١﴾ [ابراهيم: ٤١]

‘‘হে আমাদের রব, রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন’’ [সুরা ইবরাহীমঃ৪১]

এছাড়া আলস্নাহ রাববুল আলামীন পিতা-মাতার জন্য দূ‘আ করার বিশেষ নিয়ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ

 رَّبِّ ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيۡتِيَ مُؤۡمِنٗا وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِۖ وَلَا تَزِدِ ٱلظَّٰلِمِينَ إِلَّا تَبَارَۢا ٢٨ ﴾ [نوح: ٢٨

‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি যালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না ’[সূরা নুহ: ২৮] ।

 

মা-বাবা এমন সন্তান রেখে যাবেন যারা তাদের জন্য দোয়া করবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

« إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ ».

অর্থ: মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩ টি আমল বন্ধ হয় না-১.সদকায়ে জারিয়া  ২. এমন জ্ঞান-যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় ৩. এমন নেক সন্তান- যে তার জন্য দু‘আ করে [সহিহ মুসলিম: ৪৩১০]

মূলত: জানাযার নামায প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ স্বরূপ।

২. দান-ছাদকাহ করা, বিশেষ করে সাদাকায়ে জারিয়াহ প্রদান করাঃ

মা-বাবা বেচে থাকতে দান-সাদকাহ করে যেতে পারেন নি বা বেচে থাকলে আরো দান-সদকাহ করতেন, সেজন্য তাদের পক্ষ থেকে  সন্তান দান-সদকাহ করতে পারে। হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمِّىَ افْتُلِتَتْ نَفْسَهَا وَلَمْ تُوصِ وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ أَفَلَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا قَالَ « نَعَمْ »

অর্থ: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ ‘‘জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমার মা হঠাৎ মৃতু বরণ করেছেন। তাই কোন অছিয়ত করতে পারেন নি। আমার ধারণা তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন তাহলে দান-ছাদকা করতেন। আমি তাঁর পক্ষ থেকে ছাদকা করলে তিনি কি এর ছাওয়াব পাবেন ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন।’’ [সহীহ মুসলিম:২৩৭৩]

তবে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে সাদাকায়ে জারিয়া বা প্রবাহমান ও চলমান সাদাকা প্রদান করা। যেমন পানির কুপ খনন করা, (নলকুপ বসানো, দ্বীনী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, কুরআন শিক্ষার জন্য মক্তব ও প্রতিষ্ঠান তৈরী করা, স্থায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ করা। ইত্যাদি।

৩. মা-বাবার পক্ষ থেকে সিয়াম  পালনঃ

মা-বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় যদি তাদের কোন মানতের সিয়াম কাযা থাকে, সন্তান তাদের পক্ষ থেকে সিয়াম পালন করলে তাদের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

«مَنْ مَاتَ  وَعَلَيْهِ صِيَامٌ صَامَ عَنْهُ وَلِيُّهُ»

অর্থ: ‘‘যে ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করল এমতাবস্থায় যে তার উপর রোজা ওয়াজিব ছিল। তবে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিসগণ রোজা রাখবে’’ [সহীহ বুখারী:১৯৫২]।

অধিকাংশ আলেমগণ এ হাদীসটি শুধুমাত্র ওয়াজিব রোযা বা মানতের রোযার বিধান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাদের পক্ষ থেকে নফল সিয়াম রাখার পক্ষে দলীল নাই।

৪. হজ্জ বা উমরাহ করাঃ

মা-বাবার পক্ষ থেকে হজ্জ বা উমরাহ করলে তা আদায় হবে এবং তারা  উপকৃত হবে। ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«أَنَّ امْرَأَةً مِنْ جُهَيْنَةَ جَاءَتْ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ إِنَّ أُمِّي نَذَرَتْ أَنْ تَحُجَّ فَلَمْ تَحُجَّ حَتَّى مَاتَتْ أَفَأَحُجُّ عَنْهَا قَالَ نَعَمْ حُجِّي عَنْهَا أَرَأَيْتِ لَوْ كَانَ عَلَى أُمِّكِ دَيْنٌ أَكُنْتِ قَاضِيَةً اقْضُوا اللَّهَ فَاللَّهُ أَحَقُّ بِالْوَفَاءِ»

অর্থ: ‘‘ জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আগমণ করে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা হজ্জ করার মানত করেছিলেন কিন্তু তিনি হজ্জ সম্পাদন না করেই মারা গেছেন। এখন আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করতে পারি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘তুমি তোমার মায়ের পক্ষ থেকে হজ্জ কর। তোমার কি ধারণা যদি তোমার মার উপর ঋণ থাকতো তবে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না ? সুতরাং আল্লাহর জন্য তা আদায় কর। কেননা আল্লাহর দাবী পরিশোধ করার অধিক উপযোগী’’ [সহীহ বুখারী: ১৮৫২]

তবে মা-বাবার পক্ষ থেকে যে লোক হজ্জ বা ওমরাহ করতে চায় তার জন্য শর্ত হলো সে আগে নিজের হজ্জ-ওমরাহ করতে হবে।

৫. মা-বাবার পক্ষ থেকে কুরবানী করাঃ

মা-বাবার পক্ষ থেকে কুরবানী করলে তার ছাওয়াব দ্বারা তারা উপকৃত হবে। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَمَرَ بِكَبْشٍ أَقْرَنَ يَطَأُ فِى سَوَادٍ وَيَبْرُكُ فِى سَوَادٍ وَيَنْظُرُ فِى سَوَادٍ فَأُتِىَ بِهِ لِيُضَحِّىَ بِهِ فَقَالَ لَهَا « يَا عَائِشَةُ هَلُمِّى الْمُدْيَةَ » ثُمَّ قَالَ « اشْحَذِيهَا بِحَجَرٍ ». فَفَعَلَتْ ثُمَّ أَخَذَهَا وَأَخَذَ الْكَبْشَ فَأَضْجَعَهُ ثُمَّ ذَبَحَهُ ثُمَّ قَالَ « بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ وَمِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ». ثُمَّ ضَحَّى بِهِ.

অর্থ: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি শিংযুক্ত দুম্বা উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন, যার পা কালো, চোখের চতুর্দিক কালো এবং পেট কালো। অতঃপর তা কুরবানীর জন্য আনা হলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, হে আয়েশা! ছুরি নিয়ে আস, তারপর বললেন, তুমি একটি পাথর নিয়ে তা দ্বারা এটাকে ধারালো কর। তিনি তাই করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুরি হাতে নিয়ে দুম্বাটিকে শুইয়ে দিলেন। পশুটি যবেহ্ করার সময় বললেন, বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ তুমি এটি মুহাম্মাদ, তাঁর বংশধর এবং সকল উম্মাতে মুহাম্মাদীর পক্ষ থেকে কবুল কর”। এভাবে তিনি তা দ্বারা কুরবানী করলেন। [ সহীহ মুসলিম:৫২০৩]

৬. মা-বাবার ওসিয়ত পূর্ণ করা

মা-বাবা শরীয়াহ সম্মত কোন ওসিয়ত করে গেলে তা পূর্ণ করা সন্তানদের উপর দায়িত্ব। রাশীদ ইবন সুয়াইদ আসসাকাফী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، إِنَّ أُمِّي أَوْصَتْ أَنْ نُعْتِقُ عَنْهَا رَقَبَةً ، وَعِنْدِي جَارِيَةٌ سَوْدَاءُ ، قَالَ : ادْعُ بِهَا ، فَجَاءَتْ ، فَقَالَ : مَنْ رَبُّكِ ؟ قَالَتِ : اللَّهُ ، قَالَ : مَنْ أَنَا ؟ قَالَتْ : رَسُولُ اللَّهِ ، قَالَ : أَعْتِقْهَا ، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ».

অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা একজন দাসমুক্ত করার জন্য ওসিয়ত করে গেছেন। আর আমার নিকট কালো একজন দাসী আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে ডাকো, সে আসল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেন, তোমার রব কে ? উত্তরে সে বলল, আমার রব আল্লাহ। আবার প্রশ্ন করলেন আমি কে ? উত্তরে সে বলল, আপনি আল্লাহর রাসুল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে মুক্ত করে দাও; কেন না সে মু’মিনা । [সহীহ ইবন হিববান :১৮৯]

৭. মা-বাবার বন্ধুদের সম্মান করা 

মা-বাবার বন্ধুদের সাথে ভাল ব্যবহার করা, সম্মান করা, তাদেরকে দেখতে যাওয়া,তাদেরকে হাদিয়া দেয়া। এ বিষয়ে হাদীসে উল্লেখ আছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَجُلاً مِنَ الأَعْرَابِ لَقِيَهُ بِطَرِيقِ مَكَّةَ فَسَلَّمَ عَلَيْهِ عَبْدُ اللَّهِ وَحَمَلَهُ عَلَى حِمَارٍ كَانَ يَرْكَبُهُ وَأَعْطَاهُ عِمَامَةً كَانَتْ عَلَى رَأْسِهِ فَقَالَ ابْنُ دِينَارٍ فَقُلْنَا لَهُ أَصْلَحَكَ اللَّهُ إِنَّهُمُ الأَعْرَابُ وَإِنَّهُمْ يَرْضَوْنَ بِالْيَسِيرِ. فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ إِنَّ أَبَا هَذَا كَانَ وُدًّا لِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ وَإِنِّى سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ « إِنَّ أَبَرَّ الْبِرِّ صِلَةُ الْوَلَدِ أَهْلَ وُدِّ أَبِيهِ ».

অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার রাদিয়াল্লাহু আনহু আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, একবার মক্কার পথে চলার সময় আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর এক বেদুঈন এর সাথে দেখা হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন এবং তাকে সে গাধায় চড়ালেন যে গাধায় আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা উপবিষ্ট ছিলেন এবং তাঁর (আব্দুল্লাহ) মাথায় যে পাগড়িটি পরা ছিলো তা তাকে প্রদান করলেন। আব্দুল্লাহ ইবান দীনার রাহেমাহুল্লাহ বললেন, তখন আমরা আব্দুল্লাহকে বললাম: আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক! এরা গ্রাম্য মানুষ: সামান্য কিছু পেলেই এরা সন্তুষ্ট হয়ে যায়-(এতসব করার কি প্রয়োজন ছিলো?) উত্তরে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তার পিতা, (আমার পিতা) উমার ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বন্ধু ছিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি “পুত্রের জন্য পিতার বন্ধু-বান্ধবের সাথে ভাল ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় সওয়াবের কাজ’’ [সহীহ মুসলিম:৬৬৭৭]।

মৃতদের বন্ধুদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলও আমাদেরকে উৎসাহিত করে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«إِذَا ذَبَحَ الشَّاةَ فَيَقُولُ « أَرْسِلُوا بِهَا إِلَى أَصْدِقَاءِ خَدِيجَةَ »

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোন বকরী যবেহ করতেন, তখনই তিনি বলতেন, এর কিছু অংশ খাদীজার বান্ধবীদের নিকট পাঠিয়ে দাও [সহীহ মুসলিম: ৬৪৩১]

৮. মা-বাবার আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা

সন্তান তার মা-বাবার আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَصِلَ أَبَاهُ فِي قَبْرِهِ ، فَلْيَصِلْ إِخْوَانَ أَبِيهِ بَعْدَهُ»

‘যে ব্যক্তি তার পিতার সাথে কবরে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ভালবাসে, সে যেন পিতার মৃত্যুর পর তার ভাইদের সাথে সু-সম্পর্ক রাখে’ [সহীহ ইবন হিববান:৪৩২]

৯. ঋণ পরিশোধ করা

মা-বাবার কোন ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধ করা সন্তানদের উপর বিশেষভাবে কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণের পরিশোধ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আবু হুরায়রা  রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهً حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ».

অর্থ: ‘‘মুমিন ব্যক্তির আত্মা তার ঋণের সাথে সম্পৃক্ত থেকে যায়; যতক্ষণ তা তা তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হয়”। [সুনান ইবন মাজাহ:২৪১৩]

ঋণ পরিশোধ না করার কারণে জান্নাতের যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়; এমনকি যদি আল্লাহর রাস্তায় শহীদও হয় । হাদীসে  আরো এসেছে,

«مَا دَخَلَ الْجَنَّةَ حَتَّى يُقْضَى دَيْنُهُ»

অর্থ: যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দার ঋণ পরিশোধ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। [নাসায়ী ৭/৩১৪; তাবরানী ফিল কাবীর ১৯/২৪৮; মুস্তাদরাকে হাকিম ২/২৯]

১০. কাফফারা আদায় করা   

মা-বাবার কোন শপথের কাফফারা,ভুলকৃত হত্যাসহ কোন কাফফারা বাকী থাকলে সন্তান তা পূরণ করবে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে,

﴿وَمَن قَتَلَ مُؤۡمِنًا خَطَ‍ٔٗا فَتَحۡرِيرُ رَقَبَةٖ مُّؤۡمِنَةٖ وَدِيَةٞ مُّسَلَّمَةٌ إِلَىٰٓ أَهۡلِهِۦٓ إِلَّآ أَن يَصَّدَّقُواْۚ ﴾ [النساء: ٩٢]

অর্থ: যে ব্যক্তি ভুলক্রমে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তাহলে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করতে হবে এবং দিয়াত (রক্ত পণ দিতে হবে) যা হস্তান্তর করা হবে তার পরিজনদের কাছে। তবে তারা যদি সদাকা (ক্ষমা) করে দেয় (তাহলে সেটা ভিন্ন কথা) [ সূরা আন-নিসা:৯২]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

« مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ فَرَأَى غَيْرَهَا خَيْرًا مِنْهَا فَلْيَأْتِهَا وَلْيُكَفِّرْ عَنْ يَمِينِهِ ».

অর্থ: ‘‘ যে ব্যক্তি কসম খেয়ে শপথ করার পর তার থেকে উত্তম কিছু করলেও তার কাফফারা অদায় করবে’’ [সহীহ মুসলিম: ৪৩৬০] ।

এ বিধান জীবিত ও মৃত সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। দুনিয়ার বুকে কেউ অন্যায় করলে তার কাফফারা দিতে হবে। অনুরূপভাবে কেউ অন্যায় করে মারা গেলে তার পরিবার-পরিজন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কাফফারা প্রদান করবেন।

১১. ক্ষমা প্রার্থনা করাঃ

মা-বাবার জন্য আল্লাহর নিকট বেশী বেশী ক্ষমা প্রার্থনা করা গুরুত্বপূর্ণ আমল। সন্তান মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। হাদীসে বলা হয়েছে,

«عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ : تُرْفَعُ لِلْمَيِّتِ بَعْدَ مَوْتِهِ دَرَجَتُهُ . فَيَقُولُ : أَيْ رَبِّ ، أَيُّ شَيْءٍ هَذِهِ ؟ فَيُقَالُ : وَلَدُكَ اسْتَغْفَرَ لَكَ»

অর্থ: আবু হুরায়রা  রাদিয়াল্লাহু আনহু  হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মৃত্যুর পর কোন বান্দাহর মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। তখন সে বলে হে আমার রব, আমি তো এতো মর্যাদার আমল করিনি, কীভাবে এ আমল আসলো ? তখন বলা হবে, তোমার সন্তান তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় এ মর্যাদা তুমি পেয়েছো’’ [আল-আদাবুল মুফরাদ:৩৬]।

মা-বাবা দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পর তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার বিষয়ে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«عَنْ عُثْمَانَ ، قَالَ : وَقَفَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى قَبْرِ رَجُلٍ وَهُوَ يُدْفَنُ فَلَمَّا فَرَغَ مِنْهُ قَالَ : اسْتَغْفِرُوا لأَخِيكُمْ وَسَلُوا اللَّهَ لَهُ بالثَّبَاتِ ؛ فَإِنَّهُ يُسْأَلُ الآنَ».

অর্থ: উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পার্শ্বে দাঁড়ালেন এবং বললেন ‘‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার জন্য ঈমানের উপর অবিচলতা ও দৃঢ়তা কামনা কর, কেননা এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে’’ [মুসনাদুল বাজ্জার :৪৪৫]।

তাই সুন্নাত হচ্ছে, মৃত ব্যক্তিকে কবরে দেয়ার পর তার কবরের পার্শ্বে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার জন্য প্রশ্নোত্তর সহজ করে দেয়া, প্রশ্নোত্তর দিতে সমর্থ হওয়ার জন্য দো‘আ করা।

১২. মান্নত পূরণ করা 

মা-বাবা কোন মান্নত করে গেলে সন্তান তার পক্ষ থেকে পূরণ করবে। ইবন আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«أَنَّ امْرَأَةً نَذَرَتْ أَنْ تَصُومَ شَهْرًا فَمَاتَتْ فَأَتَى أَخُوهَا النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ :« صُمْ عَنْهَا ».

অর্থ: কোন মহিলা রোজা রাখার মান্নত করেছিল, কিন্তু সে তা পূরণ করার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করল। এরপর তার ভাই এ বিষয়ে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বলরেন, তার পক্ষ থেকে সিয়াম পালন কর। [সহীহ ইবন হিববান:২৮০]

১৩. মা-বাবার ভাল কাজসমূহ জারী রাখা 

মা-বাবা যেসব ভাল কাজ অর্থাৎ মসজিদ তৈরী করা, মাদরাসা তৈরী করা, দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরীসহ যে কাজগুলো করে গিয়েছেন সন্তান হিসাবে তা যাতে অব্যাহত থাকে তার ব্যবস্থা করা। কেননা এসব ভাল কাজের সওয়াব তাদের আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে। হাদীসে এসেছে,

«مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ »

‘‘ভাল কাজের পথপ্রদর্শনকারী এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে’’। [সুনান আততিরমীযি : ২৬৭০]

«مَنْ سَنَّ فِى الإِسْلاَمِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَىْءٌ»

যে ব্যক্তির ইসলামের ভাল কাজ শুরু করল, সে এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে। অথচ তাদেও সওয়াব থেকে কোন কমতি হবে না’’ [সহীহ মুসলিম:২৩৯৮]।

১৪. কবর যিয়ারত করা  

সন্তান তার মা-বাবার কবর যিয়ারত করবে। এর মাধ্যমে সন্তান এবং মা-বাবা উভয়ই উপকৃত হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَقَدْ أُذِنَ لِمُحَمَّدٍ فِى زِيَارَةِ قَبْرِ أُمِّهِ فَزُورُوهَا فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الآخِرَةَ»

অর্থ: আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম,অত:পর মুহাম্মাদের মায়ের কবর যিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এখন তোমরা কবর যিয়রাত কর, কেননা তা আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় [সুনান তিরমীযি :১০৫৪]।

যিয়রাত কর, কেননা তা আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় [সুনান তিরমীযি :১০৫৪]।

কবর যিয়ারত কোন দিনকে নির্দিষ্ট করে করা যাবে না। কবর যিযারত করার সময় বলবে,

«السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لاَحِقُونَ ، نَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ».

অর্থ: কবরবাসী মুমিন-মুসলিম আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক । নিশ্চয় আমরা আপনাদের সাথে মিলিত হবো। আমরা আল্লাহর কাছে আপনাদের এবং আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। [সুনান ইবন মাজাহ :১৫৪৭]

১৫. ওয়াদা করে গেলে তা বাস্তবায়ন করা    

মা-বাবা কারো সাথে কোন ভাল কাজের ওয়াদা করে গেলে বা এমন ওয়াদা যা তারা বেচে থাকলে করে যেতেন, সন্তান যথাসম্ভব তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে,

وَأَوۡفُواْ بِٱلۡعَهۡدِۖ إِنَّ ٱلۡعَهۡدَ كَانَ مَسۡ‍ُٔولٗا ٣٤ ﴾ [الاسراء: ٣٤]

অর্থ: আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। [ সূরা বনী ইসরাঈল:৩৪]

১৬.কোন গুনাহের কাজ করে গেলে তা বন্ধ করা

মা-বাবা বেচে থাকতে কোন গুনাহের কাজের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে তা বন্ধ করবে বা শরীয়াহ সম্মতভাবে সংশোধন করে দিবে। কেননা আবু হুরায়রা  রাদিয়াল্লাহু আনহু  হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلاَلَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا ».

এবং যে মানুষকে গুনাহের দিকে আহবান করবে, এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ গুনাহ তার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। অথচ তাদের গুনাহ থেকে কোন কমতি হবে না’’ [সহীহ মুসলিম:৬৯৮০]।

১৭.মা-বাবার পক্ষ থেকে মাফ চাওয়া 

মা-বাবা বেচে থাকতে কারো সাথে খারাপ আচরণ করে থাকলে বা কারো উপর যুলুম করে থাকলে বা কাওকে কষ্ট দিয়ে থাকলে মা-বাবার পক্ষ থেকে তার কাছ থেকে মাফ মাফ চেয়ে নিবে অথবা ক্ষতি পূরণ দিয়ে দিবে।  কেননা হাদীসে এসেছে,

«عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسُ ؟ قَالُوا : الْمُفْلِسُ فِينَا يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ لاَ دِرْهَمَ لَهُ ، وَلاَ مَتَاعَ لَهُ ، فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : الْمُفْلِسُ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلاَتِهِ وَصِيَامِهِ وَزَكَاتِهِ ، فَيَأْتِي وَقَدْ شَتَمَ هَذَا ، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا ، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا ، فَيَقْعُدُ ، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُعْطِيَ مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ ، فَطُرِحَ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ».

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি জান নিঃস্ব ব্যক্তি কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে যার সম্পদ নাই সে হলো গরীব লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সে হলো গরীব যে, কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে অথচ সে অমুককে গালি দিয়েছে, অমুককে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে লোকের মাল খেয়েছে, সে লোকের রক্ত প্রবাহিত করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। কাজেই এসব নির্যাতিত ব্যক্তিদেরকে সেদিন তার নেক আমল নামা দিয়ে দেয়া হবে। এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [সুনান আততিরমিযি :২৪২৮]

সুতরাং এ ধরনের নিঃস্ব ব্যক্তিকে মুক্ত করার জন্য তার হকদারদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া সন্তানের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

অল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে মা বাবার জন্য আমলগুলো করার তাওফীক দিন। আমীন!

وصلى الله على نبينا محمد وعلي اله وأصحابه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين- وأخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين

 

Collected From quraneralo.com

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই — আল-বাক্বারাহ ১৫৫

 

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই — আল-বাক্বারাহ ১৫৫

কু’রআনে এমন  কিছু আয়াত রয়েছে যেগুলো আমাদেরকে জীবনের বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। কিছু আয়াত রয়েছে যা আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়: আমরা কীভাবে নিজেরাই নিজেদের জীবনটাকে কষ্টের মধ্যে ফেলে দিই। আর কিছু আয়াত রয়েছে যা আমাদেরকে জীবনের সব দুঃখ, কষ্ট, ভয় হাসিমুখে পার করার শক্তি যোগায়। এরকম একটি আয়াত হলো—

2_155_title

2_155

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই: মাঝে মধ্যে তোমাদেরকে বিপদের আতঙ্ক, ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে, সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। আর যারা কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, তাদেরকে সুখবর দাও। [আল-বাক্বারাহ ১৫৫]

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই

আল্লাহ ﷻ শুরু করছেন: وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَىْءٍ — আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে এই দুনিয়াতে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষা নেবেনই, নেবেন। এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি আরবিতে দুই বার জোর দিয়ে এ কথা বলেছেন। কারো বেলায় সেই পরীক্ষা হয়তো চাকরি হারিয়ে ফেলে অভাবে, কষ্টে জীবন পার করা। কারো বেলায় হয়তো বাবা-মা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তানদের জটিল অসুখের চিকিৎসায় দিনরাত সংগ্রাম করা। কারো বেলায় হয়তো নিজেরই নানা ধরনের জটিল অসুখ। কারো বেলায় আবার জমি-জমা, সম্পত্তি নিয়ে আত্মীয়স্বজনদের সাথে শত্রুতা, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার, দুশ্চরিত্র স্বামী, পরপুরুষে আসক্ত স্ত্রী, ড্রাগে আসক্ত ছেলে, পরিবারের মুখে কালিমা লেপে দেওয়া মেয়ে —কোনো না কোনো সমস্যায় আমরা পড়বোই। এই সমস্যাগুলো হচ্ছে আমাদের জন্য পরীক্ষা।

পৃথিবীতে আমরা এসেছি পরীক্ষা দিতে —এটা হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। হিন্দি সিরিয়াল, মিউজিক, ভিডিও গেম, রংবেরঙের পানীয়, হাজারো বিনোদন সবসময় আমাদেরকে চেষ্টা করে এই বাস্তবতাকে ভুলিয়ে দিতে। আমরা নিজেদেরকে প্রতিদিন নানা ধরনের বিনোদনে বুঁদ করে রেখে জীবনের কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করি। আমরা বিনোদনে যতই গা ভাসাই, ততই বিনোদনের প্রতি আসক্ত হয়ে যাই। যতক্ষণ বিনোদনে ডুবে থাকি, ততক্ষণ জীবনটা আনন্দময় মনে হয়। তারপর বিনোদন শেষ হয়ে গেলেই অবসাদ, বিরক্তি, একঘেয়েমি ঘিরে ধরে। ধীরে ধীরে একসময় আমরা জীবনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি। “কেন আমার নেই, কিন্তু ওর আছে?” “কেন আমারই বেলায় এরকম হয়, অন্যের কেন এরকম হয় না?” —এই সব অসুস্থ প্রশ্ন করে আমরা আমাদের মানসিক অশান্তিকে জ্বালানী যোগাই। এত যে অশান্তি, তার মূল কারণ হলো: আমরা যে এই জীবনে শুধু পরীক্ষা দিতে এসেছি —এই কঠিন বাস্তবতাটা ভুলে যাওয়া।

মাঝে মধ্যে তোমাদেরকে বিপদের আতঙ্ক, ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে, জান, মাল, ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে

আল্লাহ ﷻ আমাদের কীভাবে পরীক্ষা নেবেন, তার কিছু উদাহরণ তিনি আমাদেরকে দিয়ে দিয়েছেন। আমরা যদি ভালো করে বুঝে নিই পরীক্ষাগুলো কেমন হবে, তাহলে সেই পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আগে থেকেই আমরা তৈরি থাকবো। তারপর যখন পরীক্ষা শুরু হবে, তখন পরীক্ষা পার করা সহজ হয়ে যাবে। যারা জীবনে অনেকবার কঠিন বিপদে পড়েছেন, তারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে, যদি চিন্তা করে বের করা যায় কেন বিপদটা হয়েছে, কতদিন তা চলতে পারে এবং বিপদটা কীভাবে একসময় শেষ হয়ে যেতে পারে — তখন সেই বিপদটা ধৈর্য ধরে পার করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। একারণে পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে জীবনটা সহজ হয়ে যায়।

ভয়

এই আয়াতে আল্লাহ ﷻ ভয়ের জন্য خَوْف (খাউফ) ব্যবহার করেছেন। কু’রআনে বিভিন্ন ধরনের ভয়ের জন্য বারোটি আলাদা আলাদা শব্দ রয়েছে: خاف, خشي, خشع, اتقى, حذر, راع, اوجس, وجف, وجل, رهب, رعب, اشفق —যার মধ্যে এই আয়াতে বিশেষভাবে খাউফ ব্যবহার করা হয়েছে, যা একটি বিশেষ ধরনের ভয়: আমাদের জীবনে কোনো একটা বিপদ এগিয়ে আসছে বা এসে গেছে, এবং আমরা তা নিয়ে ভয়ে, আতঙ্কে আছি —এটা হচ্ছে খাউফ।

এই ভয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক, পারিবারিক যে কোনো বিপদের ভয় হতে পারে। দেশের সরকার মুসলিমদের ধরে ধরে মেরে ফেলছে। কেউ মুখ খুলতে পারছে না। সত্য কথা বললে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ভরা হচ্ছে, গুম করে ফেলা হচ্ছে। মুসলিমরা সবাই ভয়ে আছে। —এই ভয় হচ্ছে খাউফ। এটা একটা পরীক্ষা।

দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উজাড় হয়ে যাচ্ছে। মহামারি, দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ছে। চারিদিকে মানুষের অভাব, অনটন, যে কোনো সময় গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। খাবারের দাম বাড়তে বাড়তে কেনার সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে সামনেই অচিরেই পরিবার নিয়ে এক বেলা না খেয়ে দিন পার করতে হবে। —এই ভয় হচ্ছে খাউফ। এটা একটা পরীক্ষা।

ছেলে রাতের বেলা ঘরের দরজা বন্ধ করে কী জানি করে। মাঝে মধ্যে কোনো মেয়ের গলা শোনা যায়। দিনের বেলা বখাটে দেখতে কিছু বন্ধুর সাথে ঘোরাঘুরি করে। ছেলেটা নিশ্চয়ই একটা বাজে কিছুতে জড়িয়ে যাচ্ছে। কোনদিন না অসামাজিক কিছু করে ফেলে। লজ্জায় আর ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। মানুষ থু থু দেবে। —এই ভয় হচ্ছে খাউফ। এটা একটা পরীক্ষা।

ক্ষুধার কষ্ট

আরেকটি পরীক্ষা হচ্ছে ক্ষুধার কষ্ট। ক্ষুধার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য মানুষ এমন কিছু নেই যা করে না। একজন দিনমজুরের মাথায় সারাদিন একটা চিন্তাই ঘুরে, কালকে সে খাবার কেনার মতো যথেষ্ট টাকা অর্জন করতে পারবে কি? একজন চাকুরীজীবী সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকে: আমি মারা গেলে আমারা ছেলেমেয়েরা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারবে তো? একজন ব্যবসায়ীর মাথায় সবসময় হিসেব ঘুরতে থাকে: ব্যবসায় কতটা পর্যন্ত লোকসান হলে না-খেয়ে পথে বসতে হবে না। সকালে ঘুমের থেকে উঠে মাথায় চিন্তা আসে নাস্তায় কী খাবো, যা খেয়ে দুপুর পর্যন্ত ক্ষুধার কষ্ট লাগবে না। দুপুরে খাওয়ার সময় মাথায় চিন্তা আসে কত খেলে আর বিকেলে ক্ষুধার কষ্ট করতে হবে না, একবারে রাত পর্যন্ত থাকা যাবে। রাতে খাওয়ার সময় হিসেব চলে ফজরের সময় উঠলে আবার ক্ষুধা লেগে যাবে না তো?

খাবার কেনার মতো যথেষ্ট টাকা থাকবে কিনা –এই ভয়টা এতই কঠিন ভয় যে, ১৩-১৭ বছর বয়সীদের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে যে, ক্ষুধার কষ্টের ভয় তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যা জন্ম দেওয়ার একটি অন্যতম কারণ। যে সমস্ত পরিবারের উঠতিবয়সী যুবক-যুবতীরা ক্ষুধার কষ্ট করে, তিন বেলা খাবার জোগাড় করতে গিয়ে বাবা-মার কঠিন সংগ্রাম দেখে, মাঝে মধ্যেই এক-দুই বেলা না খেয়ে ক্ষুধার কষ্টে দিন বা রাত পার করে, তাদের মনের মধ্যে ক্ষুধার কষ্টের ভয় ঢুকে যায়। এই ভয় থেকে এক সময় তাদের মধ্যে অস্থিরতা এবং নানা ধরনের মানসিক ব্যাধি দেখা দেয়।[২৯৭]

যারা জীবনে এক সময় অনেক অভাবে পার করেছেন, প্রতিটি দিন সংগ্রাম করতেন কীভাবে মাস চলবে, কীভাবে বাচ্চাদের খাওয়াবেন, তারা যখন একসময় গিয়ে স্বচ্ছল হন, তারপরেও তাদের অনেকের ভেতরে আবার অভাবের জীবনে ফিরে যাওয়ার আতঙ্ক চলে যায় না। ব্যাংক ব্যালেন্সে একটা শূন্য কমে গেলে বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যায়। কোনো একমাসে আয় একটু কম হলে আতঙ্ক শুরু হয়ে যায়। যদিও তাদের খাওয়া, পড়ার কোনোই সমস্যা নেই, আল্লাহ ﷻ তাদেরকে কয়েক মাস বা বছর স্বচ্ছন্দে চলার মতো যথেষ্ট সম্পদ দিয়ে রেখেছেন, তারপরেও তাদের ভেতরে আগের সেই অভাবী জীবনের দুঃস্বপ্ন কাটে না। তারা চেষ্টা করলেও আল্লাহর ﷻ প্রতি পুরোপুরি কৃতজ্ঞ হয়ে, মন থেকে অশান্তি দূর করে, শান্তির সাথে জীবন পার করতে পারেন না। ক্ষুধার কষ্ট, অভাবের জীবনের ভয় তাদেরকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়।

 

অনিশ্চয়তা

ভয় এবং ক্ষুধা — এই দুটির মধ্যে একটি সাধারণ ব্যাপার রয়েছে, তা হলো অনিশ্চয়তা। মানুষ নিশ্চয়তা অর্জনের জন্য পাগল, অনিশ্চয়তাকে তার কাছে অসহ্য। সবসময় চেষ্টা করে কীভাবে বেতনের নিশ্চয়তা, সমাজে স্ট্যাটাসের নিশ্চয়তা, ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজের বাড়ির নিশ্চয়তা, নিরাপদে রাস্তায় চলার জন্য গাড়ির নিশ্চয়তা, লোন শোধ করার জন্য নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা —এই সব অনিশ্চয়তাকে সবসময় নিশ্চিত করে রাখার জন্য বাবা-মা, সন্তান, আত্মীয়, বন্ধু, যে কোনো সম্পর্ককে উপেক্ষা করে হলেও মানুষ দিনরাত খাটতে রাজি আছে। কিন্তু তার জীবনে নিশ্চয়তা চাই-ই চাই।

মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, তা অনিশ্চয়তা সহ্য করতে পারে না। যখনি মস্তিষ্ক কোনো অনিশ্চয়তা হতে যাচ্ছে এই উপলব্ধি করে বসে, সাথে সাথে সেটি সতর্ক অবস্থায় চলে যায়। তখন অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে সেই অনিশ্চয়তা কীভাবে দূর করা যায়, তা নিয়ে মস্তিষ্ক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মানুষের মস্তিষ্ক হচ্ছে একটা বিরাট জটিল যন্ত্র, যার একটা মূল কাজ হচ্ছে সামনে কী হতে যাচ্ছে, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা।[২৯১]

আমরা শুধু শুনি না, আমরা শুনি এবং একইসাথে চিন্তা করি সামনে কী শুনতে যাচ্ছি। আমরা শুধু দেখি না, আমরা দেখি এবং একইসাথে চিন্তা করি সামনে কী দেখতে যাচ্ছি। আমরা শুধুই পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে ভবিষ্যৎ বোঝার চেষ্টা করি না। আমাদের দেহ প্রায় ৪০টি পারিপার্শ্বিক উৎস থেকে সবসময় সিগনাল প্রসেস করে। অবচেতনভাবে প্রায় ২০ লক্ষ ব্যাপার নিয়ে আমরা সবসময় ভাবছি ভবিষ্যৎ আগে থেকেই নিশ্চিত করার জন্য। কল্পনাতিত পরিমাণের তথ্য আমাদের মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে প্রক্রিয়া করছে, কারণ আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় চেষ্টা করে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার। এটি অনিশ্চয়তা একেবারেই পছন্দ করে না।[২৯১]

তথ্য আসক্তি

আধুনিক যুগে এক নতুন সমস্যা শুরু হয়েছে — তথ্য-আসক্তি। মানুষ প্রতিনিয়ত শত শত তথ্য গোগ্রাসে গিলছে, যদিও তার সেগুলোর কোনোই দরকার নেই। এর মূল কারণ: মানুষ এভাবে অনিশ্চয়তা দূর করে।[২৯২]ফেইসবুকে কেউ আমাকে নিয়ে কিছু বলল কিনা, কেউ আমার পোস্টে কমেন্ট করলো কিনা, কেউ আমার ছবিতে লাইক দিল কিনা —এই অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য সে দিনের মধ্যে বহুবার ফেইসবুকে গিয়ে দেখে কিছু হলো না।

একইভাবে শেয়ার বাজারের দালাল, তথ্য প্রণেতারা ব্যাপক ব্যবসা করে নেয় আমাদের শেয়ার সম্পর্কে অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে। একটার পর একটা সংবাদ চ্যানেল, পত্রিকা চালু হচ্ছে কারণ আমরা অলিতে গলিতে, দেশে, বিদেশে, ডানপন্থী, বামপন্থী, শাসকদল, বিরোধী দল, নিরপেক্ষ দল সব দিকের সব রকম তথ্য জানতে চাই। অনেকে একটা পত্রিকা না রেখে দুটো-তিনটে পত্রিকা রাখেন, তিন-চারটা সংবাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে খবর পড়েন, পাছে কোনো একদিকের মত, কোনো একটা খবর তার অগোচরে থেকে যায়। একদিন রাতের খবর না দেখলে বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যায়, কী জানি হারিয়ে ফেললাম? এই তথ্য-আসক্তির মূল কারণ হলো অনিশ্চয়তা।

অনিশ্চয়তার নিশ্চয়তা

মানুষের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হাজারো ব্যবসা শুরু হয়েছে মানুষকে নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য। লাইফ ইনস্যুরেন্স, বাড়ির লোন, গাড়ির লোন, মোবাইল ফোনের প্যাকেজ, ব্রডব্যান্ড কানেকশন, ওয়ারান্টি, গ্যারান্টি —এরকম হাজারো ভাবে মানুষকে নিশ্চয়তার লোভ দেখানো হচ্ছে। মার্কেটিং কোম্পানিগুলো শিখে গেছে কীভাবে এই অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে তাদের পণ্যের বিক্রি বাড়ানো যায়। তাদের বিজ্ঞাপনে প্রথমে মানুষকে এক অজানা, অনিশ্চয়তার ভয় দেখানো হয়। তারপর বেশি দামে, চড়া সুদে নিশ্চয়তা বিক্রি করা হয়। বোকা মানুষ নিশ্চয়তার এই মিথ্যা ফাঁদে পা দিয়ে জীবন দুর্বিষহ করে ফেলে। নিশ্চয়তা কিনতে গিয়ে স্বাস্থ্য, সংসার, সন্তান, সুখ সব বিসর্জন দিয়ে দেয়।

আল্লাহ ﷻ মানুষকে এই আয়াতে সাবধান করে দিচ্ছে যে, তিনি মানুষকে অনিশ্চয়তা দিয়ে পরীক্ষা নেবেনই। সুতরাং অনিশ্চয়তাকে জয় করার জন্য হারাম পথে পা দিয়ে কোনো লাভ নেই। এক দিকে অনিশ্চয়তা দূর করলে আরেক দিকে আসবে। মাঝখান থেকে সব অনিশ্চয়তাকে জয় করার মিথ্যা স্বপ্ন যেন মানুষকে শেষ করে না দেয়।

সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানো

এরপর আল্লাহ ﷻ পরীক্ষা নেবেন সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। আমাদের পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু ইত্যাদি নানা সম্পর্কের ভেতরে মৃত্যু আসবেই। এটাই স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে কারো মৃত্যু হয়তো অল্প বয়সে হয়ে যায়। কারো হয়তো দুর্ঘটনা থেকে মৃত্যু হয়। আমরা তখন বলি ‘কপাল খারাপ’, ‘অকালে মৃত্যু’, ‘অপমৃত্যু’, ‘আহারে, বেচারা অল্প বয়সে মারা গেল’ ইত্যাদি —এগুলো সব ভীষণ রকমের ভুল কথা। মুসলিমদের কাছে কোনো ‘কপাল খারাপ’ নেই, ‘অকালে মৃত্যু’, ‘অপমৃত্যু’, ‘কম বয়সে’ মৃত্যু বলে কিছু নেই। এগুলো বিধর্মী এবং নাস্তিকদের ডিকশনারির শব্দ।

কারো কপাল কখনো খারাপ হয় না, আল্লাহ ﷻ তার জন্য ঠিক যে সব সমস্যা হওয়ার কথা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন, তার জীবনে ঠিক তাই ঘটে। কারো অকালে মৃত্যু হয় না, তার ঠিক যে সময় মৃত্যু হওয়ার কথা, ঠিক তখনি মৃত্যু হয়। কারো অপমৃত্যু হয় না, বরং মু’মিন অবস্থায় দুর্ঘটনায় মারা গেলে সে শহীদ হয়ে মরে। তখন এর চেয়ে বড় প্রাপ্য তার জন্য আর কিছু হতে পারে না। কারো অল্প বয়সে মৃত্যু হয় না, পৃথিবীতে তার আয়ু সেটুকুই নির্ধারণ করা ছিল। সে ঠিক সময়মতো মারা গেছে, আগেও না, পরেও না। —এই সত্যগুলো আমরা যদি উপলব্ধি করি, তাহলে আমরা নিজেদেরকে অপেক্ষাকৃত কম কষ্ট দেবো, অন্যের মাঝেও অপেক্ষাকৃত কম কষ্ট ছড়াবো।

এরপর আসবে সম্পদ, ফল, ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। স্টক মার্কেট ধ্বসে যাবে। কেউ লোনে জর্জরিত হয়ে যাবে। কেউ দেউলিয়া হয়ে যাবে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, বন্যায় ফসল ধ্বংস হয়ে যাবে। নদীর পাড় ভেঙ্গে বাড়ি, জমি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। —এই হচ্ছে জীবন। এগুলো সবই আল্লাহর ﷻ পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আমরা যদি উপলব্ধি করতে পারি যে, আমাদের জীবনের কঠিন সময়গুলো আসলে এক একটা পরীক্ষা এবং আমাদের কাজ হচ্ছে এই পরীক্ষায় ঈমান বজায় রেখে পাশ করা, তাহলে জীবনের কঠিন সময়গুলো পার করা যেমন সহজ হবে, তেমনি আমরা পরীক্ষায় পাশ করে বিরাট প্রতিদান পাবো।

আর যদি তা না করি, তাহলে জীবনটা অসহ্য হয়ে যাবে। ডিপ্রেশনের ওষুধ খেয়ে দিন পার করতে হবে। ঘুমের ওষুধ খেয়ে রাতে ঘুমাতে হবে। হাজার হাজার ওষুধ খেয়ে নষ্ট করা কিডনি নিয়ে ডায়ালাইসিস করতে করতে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেতে হবে। আর আখিরাতে থাকবে অপমান এবং শাস্তি।

 

আর যারা কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, তাদেরকে সুখবর দাও

প্রশ্ন আসে: কীসের সুখবর? মুমিনদের জন্য সুখবর একটাই: জান্নাতের নিশ্চয়তা। আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে এই আয়াতে বলে দিলেন: কী করলে আমাদের আর জান্নাত পাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না। আসুন আমরা আমাদের জীবনে ঘটে চলা পরীক্ষাগুলো বোঝার চেষ্টা করি। এই পরীক্ষাগুলো কীভাবে দিলে আমরা পরীক্ষায় পাশ করবো, তা চিন্তা করে বের করি। তারপর যথাসাধ্য চেষ্টা করি নিজেদের মধ্যে যা কিছু পরিবর্তন করতে হবে, তা করার। ঈমান বজায় রেখে প্রতিটি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে শেষ করি।

আল্লাহ ﷻ তখন আমাদেরকে কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বড় সুখবর দিয়ে দেবেন। সেদিন সেই সুখবর পেয়ে আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবো। পৃথিবীর জীবনটা তখন কয়েক মুহূর্তের দুঃস্বপ্ন মনে হবে। জান্নাতের সুখবর পেয়ে মুহূর্তের মধ্যেই আমরা ভুলে যাবো পৃথিবীতে কত কষ্ট, কত সংগ্রাম করেছিলাম, কত দুঃখ পেয়েছিলাম। সামনে যে এক নতুন অনন্ত জীবন শুরু হবে, শুধুই আনন্দ, সুখ, হাসি, তৃপ্তির জীবন, সেই জীবন নিয়ে আমরা তখন পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে যাবো। কখন জান্নাতে গিয়ে আল্লাহর ﷻ সাথে দেখা হবে, তাঁর কথা প্রথম বারের মতো নিজের কানে শুনতে পাবো, তাঁর সাথে মন উজাড় করে কথা বলতে পারবো –সেই তীব্র আনন্দে আমরা বাকি সবকিছু ভুলে যাবো।

এর পরের আয়াতে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে জানাবেন এই সুখবর যারা পাবে, তারা কেমন মানুষ। তারা কোনো সাধারণ মানুষ নন। তারা প্রচণ্ড রকমের ধৈর্যশীল। কু’রআনের শিক্ষাকে তারা তাদের কথা, কাজ, চিন্তায় আত্মস্থ করে ফেলেছেন। জীবনের বাস্তবতা কী, বিপদ কেন আসে, কীভাবে আসে, তারা তা খুব ভালভাবে উপলব্ধি করেন। কোনো ধরনের বিপদ তাদেরকে তাদের ইস্পাত দৃঢ় ঈমান থেকে টলাতে পারে না।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।
  • collected from http://quranerkotha.com/

Friday, March 15, 2024

স্বামী বা মাহরাম পুরুষ ছাড়া মহিলাদের হজ বা উমরা আদায়

 প্রশ্ন: আমি উমরা ও হজ আদায় করতে চাই। আমার মনে বারবার আল্লাহর ঘর দেখার তাড়না হচ্ছে। কিন্তু আমার মাহরাম কেউ রাজি নয়। আমার বাবা, ভাই, স্বামী কেউ যেতে চান না। আমার বোনের স্বামী ও বোন যাবে। বোন জীবিত অবস্থায় কি তার স্বামী আমার মাহরাম হিসেবে গণ্য হবে? আমার জন্য দুআ করবেন যাতে আমার স্বামী রাজি হয়ে যান।

উত্তর: দুআ করি, আল্লাহ তাআলা আপনার বায়তুল্লাহর জিয়ারতের স্বপ্ন পূরণ করুন। অতঃপর, ইসলামে স্বামী অথবা মাহরাম পুরুষ ব্যতিরেকে মহিলাদের জন্য দূরের সফর নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং স্বামী অথবা মাহরাম পুরুষ ব্যতিরেকে হজ/ওমরা সফরেও যাওয়া জায়েজ নয়।

এ মর্মে হাদিস হল:

◈ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

– لا يَحِلُّ لاِمْرَأَةٍ تُؤْمِنُ باللَّهِ وَالْيَومِ الآخِرِ، تُسَافِرُ مَسِيرَةَ يَومٍ وَلَيْلَةٍ إلَّا مع ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا
“যে নারী আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে জেনে রাখ! তার জন্য অনুমতি নেই যে, সে আপন স্বামী অথবা মাহরাম পুরুষ ছাড়া সফর সমান দূরত্বে একাকী ভ্রমণ করবে।” [সহীহ মুসলিম]

◈ কোন নারী হজের উদ্দেশ্যেও মক্কাতেও একাকী যেতে পারে না:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بامْرَأَةٍ إلَّا وَمعهَا ذُو مَحْرَمٍ، وَلَا تُسَافِرِ المَرْأَةُ إلَّا مع ذِي مَحْرَمٍ، فَقَامَ رَجُلٌ، فَقالَ: يا رَسولَ اللهِ، إنَّ امْرَأَتي خَرَجَتْ حَاجَّةً، وإنِّي اكْتُتِبْتُ في غَزْوَةِ كَذَا وَكَذَا، قالَ: انْطَلِقْ فَحُجَّ مع امْرَأَتِكَ

“কোন নারী নিজ মাহরাম সঙ্গী ছাড়া একাকী সফর করবে না। ”
তখন উপস্থিত এক সাহাবি আরজ করলেন, “আমি তো অমুক জিহাদে যাচ্ছি। আর এ দিকে আমার স্ত্রী হজে যেতে যাচ্ছে। (আমি কি করবো)?
জিহাদে বের হবো, নাকি স্ত্রীর সাথে হজের সফরে বের হব? কারণ আমি ছাড়া তার অন্য কোন মাহরারম সঙ্গী নেই।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তুমি জিহাদে না গিয়ে তোমার স্ত্রীর সাথে হজের সফরে যাও।” [সহীহ বুখারী]

❑ সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. বলেন,
لا يجوز للمسلمة أن تحج بدون محرم، النبي ﷺ قال: لا تسافر امرأة إلا مع ذي محرم وقد ذهب بعض العلماء إلى جواز الحج مع ثقات النساء بدون محرم ولكنه قول مرجوح، والصواب: ما قاله النبي ﷺ: لا تسافر امرأة إلا مع ذي محرم لكن لو حجت مع النساء صح حجها، وعليها التوبة إلى الله؛ لأنها أخطأت وأثمت فعليها التوبة إلى الله والندم وأن لا تعود إلى مثل هذا وحجها صحيح إن شاء الله؛ لأنها.. أدت مناسك الحج، فصح مع الإثم في مخالفتها السنة، في حجها بدون محرم، والله ولي التوفيق، وله سبحانه وتعالى الحكمة البالغة وعليها التوبة من ذلك.
“কোনও মুসলিম নারীর জন্য মাহরাম পুরুষ (যাদের সাথে স্থায়ীভাবে বিয়ে হারাম) ছাড়া হজ করা জায়েজ নাই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا تُسَافِرِ المَرْأَةُ إلَّا مع ذِي مَحْرَمٍ
“কোন মহিলা মাহরাম পুরুষ ছাড়া সফর করবে না।” [সহিহ মুসলিম]
কতিপয় আলেম মাহরাম পুরষ ছাড়া বিশ্বস্ত মহিলাদের সাথে হজ করা বৈধ বললেও তা গ্রাধিকারযোগ্য মত নয়। বরং সঠিক কথা হল, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন মহিলা মাহরাম পুরষ ছাড়া সফর করবে না।” তবে কেউ যদি একদল মহিলার সাথে হজ করে তাহলে তার হজ সহিহ হয়ে যাবে। কিন্তু সে ভুল কাজ করবে। এতে সে গুনাহগার হবে। তাই তার জন্য লজ্জিত অন্তরে তওবা করা আবশ্যক এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এমনটি করবে না। কিন্তু ইনশাআল্লাহ তার হজ বিশুদ্ধ হবে। কারণ সে হজের কার্যাবলী আদায় করেছে। সুতরাং মাহরাম পুরুষ ছাড়া হজ করার কারণে গুনাহ এবং সুন্নতের বিরুদ্ধাচরণ সহকারে তার হজ সঠিক হবে। আল্লাহ তওফিক দানকারী এবং সুনিপুণ কৌশলের অধিকারী। ওই মহিলার কর্তব্য, এ কাজের জন্য তওবা করা।” [সূত্র: binbaz. অর্গ]
◈ বোনের স্বামী আপনার জন্য মাহরাম নয়। কেননা আপনার বোন বেঁচে থাকা অবস্থায়ও তাকে তালাক দিয়ে আপনাকে বিয়ে করা তার জন্য জায়েয রয়েছে। সুতরাং আপনার বোন বেঁচে থাকা অবস্থায়ও সে আপনার জন্য মাহরাম নয়। অত:এব আপনার বোন ও তার স্বামীর সাথে আপনার সফর করা বৈধ হবে না। দুআ করি, আল্লাহ যেন আপনার স্বামীর অন্তরে আল্লাহর ঘর জিয়ারতের আগ্রহ সৃষ্টি করে দেন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

প্রথম রোজার সংবাদ দিলে জাহান্নামের আগুন হারাম মর্মে বর্ণিত হাদিসটি বানোয়াট ও জাল

 প্রশ্ন: “যে ব্যক্তি প্রথম রোজার সংবাদ দিবে তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম হয়ে যাবে” বর্তমানে ফেসবুকে এই কথাটা বেশ প্রচার হচ্ছে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে আপনার একটি পোস্ট চাই। যাতে করে সবাই সঠিকটা জানতে পারে।

উত্তর: এ কথা সত্য যে, রমজান ঘনিয়ে এলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এই জাতীয় হাদিসটি প্রচারের হিড়িক পড়ে যায়। প্রচার করা হয় যে, এ বছর অমুক তারিখ থেকে রমজান মাসের রোজা শুরু হবে। অথচ তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। অর্থাৎ এটি হাদিসের নামে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়। তাছাড়া রমজান মাসের সূচনা চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল-যা জানার জন্য সরকার নির্ধারিত চাঁদ দেখা কমিটি বা আদালতের ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হয় । সুতরাং তা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির হিসেবে অগ্রিম সংবাদ দেওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং কেউ যদি অনেক আগে থেকে এই ঘোষণা প্রচার করে তাহলে তা হবে আরেকটি মিথ্যাচার।

◆ এ প্রসঙ্গে বিশ্ব বিখ্যাত ফতোয়া বিষয়ক ওয়েবসাইট Islamqa-এ বলা হয়েছে,

لم يذكره من صنف في فضل رمضان من العلماء، ولو من باب التنبيه على عدم صحته، كما لم يذكره من صنف في الأحاديث الضعيفة والموضوعة؛ لذلك يبدو أنه وُضع حديثًا.

“যে সকল আলেমগণ রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বই লিখেছেন তাদের কেউ এই হাদিসটি উল্লেখ করেননি। এটি যে বিশুদ্ধ নয় সে ব্যাপারে সতর্ক করার জন্যও কেউ উল্লেখ করেননি। অনুরূপভাবে দুর্বল ও বানোয়াট হাদিস সংকলনকারীগণ ও তা (এ সংক্রান্ত কোনও গ্রন্থেই উল্লেখ করেননি।) এতেই প্রমাণিত হয় যে, এটি সাম্প্রতিক কালের বানানো হাদিস।”
এরপর আরও লেখা হয়েছে, “সুতরাং এর উপরে ভিত্তি করে বলবো, এই হাদিস প্রচার বা শেয়ার করা জায়েজ নেই মানুষকে এ বিষয়ে সতর্ক করার উদ্দেশ্য ছাড়া।”

◆ কারা এসব বানোয়াট হাদিস প্রচার করে? অজ্ঞতা বশত: কেউ তা করে থাকলে তার জন্য করণীয়:

প্রকৃতপক্ষে, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, যারা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় ও বিভিন্ন গ্রুপে মেসেজ ফরওয়ার্ড করে শর্টকাট পদ্ধতিতে জান্নাতে যেতে চায় এটি তাদের বানানো হাদিস। আর ধর্মীয় বিভিন্ন বক্তব্যের প্রতি মানুষের এক ধরণের দুর্বলতা রয়েছে। সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সস্তা লাইক-কমেন্ট কামানোর ধান্ধায় এসব কথা হাদিস বলে প্রচার করে এক শ্রেণির লোক। এভাবেই শয়তান দ্বীনের সঠিক জ্ঞান বঞ্চিত মানুষের সাথে ধর্মের নামে ধোঁকাবাজি করে চলেছে।

যাহোক কেউ যদি অজ্ঞতাবশত এই জাতীয় হাদিস ইতোপূর্বে প্রচার করে থাকে তাহলে তার জন্য আবশ্যক হলো, অনতিবিলম্বে তা ডিলিট করা এবং এটি যে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা সে বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা।

✪ আল্লাহর রসুলের নামে মিথ্যাচারে ভয়াবহতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় হাদিস প্রচারের পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন অপরিহার্য:

মনে রাখা কর্তব্য যে, মানুষের সাথে সাধারণ মিথ্যা কথা এবং আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামে মিথ্যা কথা এক নয়। সাধারণ মিথ্যা কথা হারাম, কবিরা গুনাহ এবং মুনাফেকির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু হাদিসের নামে মিথ্যাচার করার পরিণতি এর থেকেও ভয়াবহ। কেউ জেনে বুঝে তা করলে তার পরিণতি জাহান্নাম।

إنَّ كَذِبًا عَلَيَّ ليسَ كَكَذِبٍ علَى أَحَدٍ، مَن كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

“আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, আমার প্রতি মিথ্যারোপ করা তোমাদের কারো প্রতি মিথ্যারোপ করার মত নয়। যে ব্যক্তি জেনেশুনে ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার বাসস্থান নির্ধারণ করে নেয়।” [সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)। মুকাদ্দামাহ (ভূমিকা), পরিচ্ছেদ: ২. রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর মিথ্যারোপ গুরুতর অপরাধ]

কেননা এর মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা সমাজের ছড়িয়ে পড়ে এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে ইসলামে বিকৃতি সাধিত হয়।
তাই বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলাম বিষয়ে কোন কিছু প্রচারের আগে তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করা এবং তার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া হওয়া অপরিহার্য। অন্যথায় ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা প্রচার ও ইসলাম বিকৃতির অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পাশাপাশি তা প্রচারকারীর আমলনামায় গুনাহের জারিয়া বা প্রবহমান গুনাহ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে। যত মানুষ এর দ্বারা বিভ্রান্ত হবে তাদের সমপরিমাণ গুনাহ প্রচারকারীর আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হবে। সুতরাং এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করা আবশ্যক। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং ইসলাম সম্পর্কে সব ধরনের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

সাংগঠনিক জাহেলিয়াত এবং বিদআতি বাইয়াত

  প্রশ্ন-১: আমাদের গ্রামে একটা আহলে হাদিস মসজিদ আছে। এখানে এখন যারা মসজিদ কমিটিতে আছে তারা বলছে যে, সংগঠন করা বা না করা ব্যক্তিগত বিষয়। কেউ চাইলে সংগঠন করবে আর কেউ না চাইলে করবে না। এর জন্য বিভেদ করা যাবে না। মসজিদের ইমাম সংগঠন করেন কিন্তু তিনিও খুতবায় একই কথা বলেছেন। কিন্তু এক পক্ষ আছে, যারা আমির মানা ও সংগঠন করাকে ‘ফরজ’ বলছেন। তারা সংগঠনের কেন্দ্র থেকে নেতাদেরকে এনে নিজেদের মত করে দশ জনকে নিজেদের ইচ্ছে মত সাংগঠনিক পদ দিয়ে দিয়েছে-যাদের ভিতর এমন লোকও রয়েছে যারা আদতে নামাজই পড়ে না। এখন তারা বর্তমান মসজিদ কমিটিকে বাতিল করতে চাচ্ছে এবং বলছে, যারা সংগঠন করে না তারা যেন মসজিদে না আসে। কেউ সংগঠন না করলে সে মসজিদের কোনও দায়িত্বেও থাকতে পারবে না। এখন করণীয় কী? এ নিয়ে হয়তো বিশাল এক মারামারি হতে পারে। (আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন)

উত্তর: ব্যবস্থাপনার ভাষায়, বিশেষ কোনও লক্ষ্য অর্জনের জন্য যখন কিছু ব্যক্তি একত্রিত হয় এবং ধারাবাহিকভাবে সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত থাকে তাকে সংগঠন (organisation) বলে।”
সংগঠনের উদ্দেশ্য হল, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সংঘবদ্ধভাবে কোন লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা। সংগঠনের ফলে অনেক বড় বড় জটিল ও ব্যয়বহুল কাজ খুব সহজে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়। কারণ এখানে দক্ষ ও উপযুক্ত জনশক্তির মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয় এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সম্মিলিত শ্রম, দক্ষতা, জ্ঞান-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা, কলাকৌশল, অর্থ ইত্যাদি কাজে লাগানো হয়।

সুতরাং পরিবেশ ও প্রেক্ষাপট অনুযায়ী দাওয়াতি কাজের ক্ষেত্রে কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করা জায়েজ। বিজ্ঞ আলেমদের মতে, আল্লাহ ভীতি ও সৎ কর্মে পারস্পারিক সাহায্য-সহযোগিতা, মানুষের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে সংগঠন করা কল্যাণকর এবং এর পর্যাপ্ত উপকারিতা রয়েছে।

কিন্তু যারা সংগঠন করাকে ‘ফরজ’ বলেছেন তারা ভুলের উপরে প্রতিষ্ঠিত। তারা মুসলিমদের জামাআত এবং আমিরের আনুগত্য সংক্রান্ত হাদিসগুলোকে স্পষ্টই অপব্যাখ্যা করছে। কেননা হাদিসে বর্ণিত জামাআত দ্বারা উদ্দেশ্য, আল্লাহর কিতাব ও রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুসরণকারী এবং শরিয়তের পাবন্দ মুসলিমগণ। তারা পৃথিবীর যে প্রান্তেই অবস্থান করুক না কেন। তাদের সংখ্যা কম বা বেশি যাই হোক না কেন। এমনকি চতুর্দিকে ফিতনা-ফ্যাসাদের সময় একজন ব্যক্তিও যদি আল্লাহর দীনকে আঁকড়ে থাকে তাকেও ‘জামাআত’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

আর আমির দ্বারা উদ্দেশ্য মুসলিম শাসক এবং তার প্রতিনিধি; তথাকথিত সংগঠনের আমির নয়।

“যারা সংগঠন করবে না তারা মসজিদে যেন না আসে” এমন বক্তব্য মানুষকে আল্লাহর ঘর থেকে বাধা দেওয়ার নামান্তর-যা স্পষ্টতই জুলুম এবং হারাম। আল্লাহ বলেন,
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّن مَّنَعَ مَسَاجِدَ اللَّهِ أَن يُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ وَسَعَىٰ فِي خَرَابِهَا
“আর তার চাইতে কে বড় জালিম (অত্যাচারী) আর কে আছে যে, আল্লাহর মসজিদ সমূহে আল্লাহর নামের জিকির করতে বাধা প্রদান করে আর সেগুলোর ক্ষতি সাধনের চেষ্টা করে?” [সূরা: বাকারা: ১১৪]
আল্লাহ তাআলা মুসলিম সমাজে জাহেলদেরকে ‘সাংগঠনিক জাহেলিয়াত’ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

 প্রশ্ন-২ : কোন একটি ইসলামি সংগঠনের দীনী কর্মসূচী বাস্তবায়ন এবং ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কাজে সমর্থন ও সহায়তার উদ্দেশ্যে আল্লাহর নামে শপথ করে সেই দলের সাথে বাইয়াত গ্রহণ করা হয়। অত:পর জানা গেল যে, সেই দলের আকিদা-মানহাজ ত্রুটিপূর্ণ এবং তারা বিদআত ও ভ্রান্ত পথের অনুসারী। এমতাবস্থায় সেই দলের বাইয়াত ত্যাগ করে ফিরে আসলে কি আল্লাহর নামে কসম ভঙ্গের কাফফারা দেওয়া কি জরুরি?
উত্তর: কোনও কথিত ইসলামি সংগঠন (চাই সুন্নাহ পন্থী হোক বা বিদআত পন্থী হোক) অথবা পীরের হাতে বাইয়াত করা বিদআত। বিশেষ কোনও তরিকার পীরের নিকট বাইয়াত গ্রহণ হল, ভ্রান্ত সুফিবাদি বিদআতি বাইয়াত আর কথিত ইসলামি সংগঠনের আমির বা সংগঠনের কোনও দায়িত্বশীলের নিকট বাইয়াত নেওয়া হল, আধুনিক বিদআত।

কেউ অজ্ঞতা বশত তা করে থাকলে তার জন্য তা প্রত্যাখ্যান করা/ভঙ্গ করা জরুরি। কারণ বিদআতি কাজের উপরে স্থির থাকা জায়েজ নাই। কেননা ইসলামি শরিয়তে বাইয়াতের একমাত্র হকদার হচ্ছে, ওলিউল আমর তথা মুসলিম শাসক বা তার পক্ষ থেকে তার নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি।
সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রহ. বলেন, ওলিউল আমর (মুসলিম শাসক) ছাড়া আর কারও নিকট বাইয়াত নেওয়ার কোনও ভিত্তি আছে বলে আমাদের জানা নেই।
فلا نعلم أصلًا لهذه البيعة، إلا ما يحصل لولاة الأمور، فإن الله شرع سبحانه أن يبايع ولي الأمر على السمع والطاعة في المنشط والمكره والعسر واليسر، وفي الأثرة على المبايع، كما بايع الصحابة وأرضاهم نبينا -عليه الصلاة والسلام- فالبيعة تكون لولاة الأمور على مقتضى كتاب الله وسنة رسوله -عليه الصلاة والسلام- وأن يقولوا بالحق أينما كانوا، وألا ينازعوا الأمر أهله، إلا أن يروا كفرًا بواحًا عندهم من الله فيه برهان.
أما بيعة الصوفية بعضهم لبعض فلا أعلم لها أصلًا، وهذا قد يسبب مشاكل، فإن البيعة قد يظن المبايع أنه يلزم المبايع طاعته في كل شيء، حتى ولو قال بالخروج على ولاة الأمور، وهذا شيء، شيء منكر لا يجوز.
তবে যদি আল্লাহর নামে কসম করা হয়ে থাকে তাহলে কসম ভঙ্গ করার জন্য কাফফারা দেওয়া জরুরি। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬◈◍◈▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate