Monday, October 23, 2023

সময়কে গালমন্দ করা আল্লাহকে গালমন্দ করা ও তাঁকে কষ্ট দেওয়ার নামান্তর

 আল্লাহর এক অমোঘ নিয়মে রাতের পরে দিন ও দিনের পরে রাতের আবির্ভাব ঘটে। এভাবে দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী অবিরত ধারায় বয়ে চলেছে। এ সময় আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। তার নিজস্ব কোনও ইচ্ছা ও ক্ষমতা নেই। সময় তার নিজস্ব ইচ্ছা বলে কোনও কিছু করতে সক্ষম নয়। সে মানুষের জীবনে কল্যাণ বা অকল্যাণ কোনও কিছুই করতে পারে না। সময়ের গতি-প্রকৃতি পরিবর্তিত না হলেও সময়ের সাথে মানুষের প্রকৃতি, আচার-আচরণ ও রীতি-নীতি ইত্যাদি পাল্টে যায়। তাই মানুষ খারাপ হতে পারে; সময় নয়। সুতরাং সময় খারাপ, যুগ খারাপ, দিনটা খারাপ, রাতটা খারাপ ইত্যাদি বাক্য বলা কিংবা সময়কে লানত বা অভিশাপ দেওয়াও জায়েজ নয়।

আর যেহেতু সময় আল্লাহর নির্দেশক্রমে আবর্তিত হয় তাই সময়কে গালি দেওয়া আল্লাহকে গালি দেওয়ার নামান্তর। আর আল্লাহকে গালি দেওয়া মানে তাকে কষ্ট দেওয়া। সুতরাং তা হারাম।

❑ বহু হাদিসে সময়কে গালমন্দ করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন:

◆ ১. আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لاَ تَسُبُّوا الدَّهْرَ فَإِنَّ اللهَ هُوَ الدَّهْرُ

“তোমরা সময়কে গালমন্দ করো না। কারণ আল্লাহই সময়।” [সহিহ মুসলিম, হা/৬০০৩]

◆ ২. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেছেন,

قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ يَسُبُّ ابْنُ آدَمَ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ بِيَدِيَ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ

“আল্লাহ তাআলা বলেন (হাদিসে কুদসি), আদম সন্তান সময়কে গালমন্দ করে। অথচ আমি তো সময়। আমার হাতেই রাত ও দিন (এর বিবর্তন সাধিত হয়)।” [মুসলিম, হা/৬০০৩]

◆ ৩. হাদিসে কুদসিতে আরও বর্ণিত হয়েছে,

قَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ يُؤْذِينِي ابْنُ آدَمَ يَسُبُّ الدَّهْرَ وَأَنَا الدَّهْرُ أُقَلِّبُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ

“আল্লাহ বলেছেন, আদম সন্তান আমাকে কষ্ট দেয়। সে সময়কে গালি দেয় অথচ আমিই তো সময়। আমি রাত-দিন আমিই আবর্তিত করে থাকি।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৪২/ শব্দচয়ন ও শব্দ প্রয়োগে শিষ্টাচার, পরিচ্ছেদ: ১. সময় ও কালকে গালমন্দ করা নিষিদ্ধ]

◆ এর দিন-রাতের পরিবর্তন প্রসঙ্গে একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন বিষয়। মহাগ্রন্থ কুরআনে আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে বলেন,

يُقَلِّبُ اللَّهُ الَّيْلَ وَالنَّهَارَ ۚ إِنَّ فِى ذٰلِكَ لَعِبْرَةً لِّأُولِى الْأَبْصٰرِ

“আল্লাহ রাত ও দিনের আবর্তন ঘটান। নিশ্চয় এতে শিক্ষা রয়েছে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য।” [সূরা নূর: ৪৪]

তাফসিরে বিন সাদিতে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, “অর্থাৎ তিনি (আল্লাহ) ঠাণ্ডা থেকে গরম, আবার গরম থেকে ঠাণ্ডা, দিন থেকে রাত আবার রাত থেকে দিন তিনিই পরিবর্তন করেন। অনুরূপভাবে তিনিই বান্দাদের মধ্যে দিনগুলো ঘুরিয়ে আনেন। যারা সত্যিকার বান্দা, বুদ্ধি ও বিবেকবান, তারা এগুলোর প্রতি দৃষ্টি দিয়ে এগুলো কেন সৃষ্টি করা হয়েছে সেটা সহজেই বুঝতে পারে। কিন্তু তারা ব্যতিক্রম, যারা পশুদের মত এগুলোর দিকে তাকায়।” [তাফসিরে সাদী]

আর তাফসিরে আহসানুল বয়ানে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তাআলা কখনো দিন বড়, রাত ছোট, আবার কখনো এর বিপরীত করে থাকেন। অথবা কখনো দিনের উজ্জ্বলতাকে কালো মেঘের (ছায়ায়) অন্ধকার দিয়ে এবং রাতের অন্ধকারকে চাদের জ্যোৎস্না দিয়ে বদলে দেন।”

◍ জাহেলি যুগের আরব মুশরিকরা সময় সম্পর্কে বিরূপ কথা বলত এবং সময়কে গালমন্দ করত। তাদের বিশ্বাস ছিল যে, শুধু সময়ই তাদেরকে মৃত্যু দেয়:

◆ মহান আল্লাহ এ প্রসঙ্গে বলেন,

وَقَالُوا مَا هِيَ إِلَّا حَيَاتُنَا الدُّنْيَا نَمُوتُ وَنَحْيَا وَمَا يُهْلِكُنَا إِلَّا الدَّهْرُ ۚ وَمَا لَهُم بِذَٰلِكَ مِنْ عِلْمٍ ۖ إِنْ هُمْ إِلَّا يَظُنُّونَ

“তারা (কা ফের-মুশ রিকরা) বলে, শুধু পার্থিব জীবনই আমাদের জীবন। আমরা এখানেই মরি ও বাঁচি। সময় ছাড়া অন্যকিছুই আমাদেরকে ধ্বংস করতে পারে না। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে।” [সূরা জাসিয়া: ২৪]

অর্থাৎ তাদের বিশ্বাস ছিল, রাত-দিনের বিবর্তনে মানুষের বয়স শেষ হয়ে গেলে মানুষ এক সময় মরে যায়। অর্থাৎ মানুষের মৃত্যুর পেছনে একমাত্র অনুঘটক হল, সময়। আল্লাহ মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ন্ত্রণ করে না, মৃত্যুর পরবর্তী জীবন বা আখিরাত বলেও কিছু নেই। কিন্তু তা তাদের ভ্রান্ত ধারণা ছাড়া অন্য কিছু নয়। প্রকৃতপক্ষে সময়ের নিজস্ব কোনও শক্তি নেই। সে কারও উপকার করতে পারে না, কোনও ক্ষতি করতে পারে না। বরং এ বিশ্ব চরাচরের নিয়ন্ত্রণ, সময়ের এ গতিধারার নিয়ন্ত্রণ, মানুষে জীবন, মৃত্যু সব কিছু আল্লাহর হাতে ন্যস্ত। জীবনের উত্থান-পতন, ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটে সবই আল্লাহর আওতাধীন।

❑ সময়ের অবস্থা বর্ণনা করা জায়েজ; গালমন্দ করা জায়েজ নয়:

আনাস ইবনে মালিক রা. এর নিকট হাজ্জাজ কর্তৃক মানুষ যে জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছে সে সম্পর্কে অভিযোগ পেশ করা হলে তিনি বললেন,

اصْبِرُوا؛ فإنَّه لا يَأْتي علَيْكُم زَمَانٌ إلَّا الذي بَعْدَهُ شَرٌّ منه، حتَّى تَلْقَوْا رَبَّكُمْ. سَمِعْتُهُ مِن نَبِيِّكُمْ صَلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ

“ধৈর্য ধর। কেননা, মহান প্রতিপালকের সাথে মিলিত হবার পূর্ব পর্যন্ত (অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে) তোমাদের উপর এমন কোন যুগ অতীত হবে না, যার পরের যুগ তার চেয়েও বেশি খারাপ নয়। তিনি বলেন, এ কথাটি আমি তোমাদের নবী থেকে শুনেছি।” [সহিহুল বুখারি]

আল্লাহ তাআলা বলেন,
هَٰذَا يَوْمٌ عَصِيبٌ ‎
“আজ অত্যন্ত কঠিন দিন।” [সূরা হুদ: ৭৭]

তিনি আরও আরও বলেন,

إِنَّا أَرْسَلْنَا عَلَيْهِمْ رِيحًا صَرْصَرًا فِي يَوْمِ نَحْسٍ مُّسْتَمِرٍّ

“নিঃসন্দেহে আমরা তাদের উপরে এক চরম দুর্ভাগ্যের দিনে পাঠিয়েছিলাম এক প্রচণ্ড ঝড়-তুফান।” [সূরা কামার: ১৯]

❑ আল্লামা বিন বায রাহ. বলেন,

فلا يجوز للمسلم أن يسبَّ الدهر، ولكن يُجاهد نفسه في طاعة الله ورسوله، وترك ما نهى الله عنه ورسوله، فما أصابه من الأذى هو بأسباب أعماله السيئة، لا بأسباب الدهر، الدهر ما له تصرُّفٌ، لكن وصفه بالشدة لا يضرُّ، يقول: هذا زمان شديد، أو هذا زمان حارٌّ أو بارد، ما يضرُّ هذا.

“অত:এব কোনও মুসলিমের জন্য সময়কে গালি দেওয়া জায়েজ নাই। বরং তার কর্তব্য, আল্লাহর ও রসুলের আনুগত্যের ক্ষেত্রে প্রচুর চেষ্টা-সাধনা করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল যা নিষেধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা। সে যে সব কষ্ট-শ্লেষের সম্মুখীন হয় তা তার অপকর্মের কারণে; সময়ের কারণে নয়। সময়ের নিজস্ব কোনও কর্মক্ষমতা নেই। তবে সময়কে কঠিন বলায় সমস্যা নেই। যেমন: মানুষ বলে, সময়টা কঠিন বা সময়টা গরম বা ঠাণ্ডা। এতে কোনও ক্ষতি নেই।”

মোটকথা, সময় এবং কাল-মহাকাল মহান অধিপতি এক আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন। তার নিজস্ব কোনও শক্তি বা ইচ্ছা-অনিচ্ছা নেই। সময়ের প্রভাবে কারও কোনও উপকার বা ক্ষতি হয় না আল্লাহর হুকুম ছাড়া। তাই সময়কে গালমন্দ করা মানে আল্লাহকে গালমন্দ করা ও তাকে কষ্ট দেওয়ার নামান্তর। তাই তাওহিদপন্থী মুসলিমের জন্য আবশ্যক হল, কথাবার্তায় আরও সতর্কতা অবলম্বন করা, জীবনে কোনও বিপদাপদ নেমে এলে সে জন্য সময়কে দোষারোপ না করা বরং এ ক্ষেত্রে বিশ্বাস করা আবশ্যক যে, জীবনে ভালো-মন্দ যা কিছু ঘটুক সবই আল্লাহ নির্ধারিত তকদিরের আলোকেই ঘটে থাকে। এ বিশ্বাস ইমানের ৬টি স্তম্ভের মধ্যে অন্যতম। আল্লাহ আমাদেরকে তাওহিদ বিরোধী বিশ্বাস ও কথা ও কর্ম থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

প্রথম রোজার সংবাদ দিলে জাহান্নামের আগুন হারাম মর্মে বর্ণিত হাদিসটি বানোয়াট ও জাল

 প্রশ্ন: “যে ব্যক্তি প্রথম রোজার সংবাদ দিবে তার জন্য জাহান্নামের আগুন হারাম হয়ে যাবে” বর্তমানে ফেসবুকে এই কথাটা বেশ প্রচার হচ্ছে। কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে এ বিষয়ে আপনার একটি পোস্ট চাই। যাতে করে সবাই সঠিকটা জানতে পারে।

উত্তর: এ কথা সত্য যে, রমজান ঘনিয়ে এলেই সোশ্যাল মিডিয়ায় এই জাতীয় হাদিসটি প্রচারের হিড়িক পড়ে যায়। প্রচার করা হয় যে, এ বছর অমুক তারিখ থেকে রমজান মাসের রোজা শুরু হবে। অথচ তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট কথা। অর্থাৎ এটি হাদিসের নামে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়। তাছাড়া রমজান মাসের সূচনা চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল-যা জানার জন্য সরকার নির্ধারিত চাঁদ দেখা কমিটি বা আদালতের ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করতে হয় । সুতরাং তা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির হিসেবে অগ্রিম সংবাদ দেওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং কেউ যদি অনেক আগে থেকে এই ঘোষণা প্রচার করে তাহলে তা হবে আরেকটি মিথ্যাচার।

◆ এ প্রসঙ্গে বিশ্ব বিখ্যাত ফতোয়া বিষয়ক ওয়েবসাইট Islamqa-এ বলা হয়েছে,

لم يذكره من صنف في فضل رمضان من العلماء، ولو من باب التنبيه على عدم صحته، كما لم يذكره من صنف في الأحاديث الضعيفة والموضوعة؛ لذلك يبدو أنه وُضع حديثًا.

“যে সকল আলেমগণ রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বই লিখেছেন তাদের কেউ এই হাদিসটি উল্লেখ করেননি। এটি যে বিশুদ্ধ নয় সে ব্যাপারে সতর্ক করার জন্যও কেউ উল্লেখ করেননি। অনুরূপভাবে দুর্বল ও বানোয়াট হাদিস সংকলনকারীগণ ও তা (এ সংক্রান্ত কোনও গ্রন্থেই উল্লেখ করেননি।) এতেই প্রমাণিত হয় যে, এটি সাম্প্রতিক কালের বানানো হাদিস।”
এরপর আরও লেখা হয়েছে, “সুতরাং এর উপরে ভিত্তি করে বলবো, এই হাদিস প্রচার বা শেয়ার করা জায়েজ নেই মানুষকে এ বিষয়ে সতর্ক করার উদ্দেশ্য ছাড়া।”

◆ কারা এসব বানোয়াট হাদিস প্রচার করে? অজ্ঞতা বশত: কেউ তা করে থাকলে তার জন্য করণীয়:

প্রকৃতপক্ষে, খোঁজ নিলে দেখা যাবে, যারা শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় ও বিভিন্ন গ্রুপে মেসেজ ফরওয়ার্ড করে শর্টকাট পদ্ধতিতে জান্নাতে যেতে চায় এটি তাদের বানানো হাদিস। আর ধর্মীয় বিভিন্ন বক্তব্যের প্রতি মানুষের এক ধরণের দুর্বলতা রয়েছে। সেই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে সস্তা লাইক-কমেন্ট কামানোর ধান্ধায় এসব কথা হাদিস বলে প্রচার করে এক শ্রেণির লোক। এভাবেই শয়তান দ্বীনের সঠিক জ্ঞান বঞ্চিত মানুষের সাথে ধর্মের নামে ধোঁকাবাজি করে চলেছে।

যাহোক কেউ যদি অজ্ঞতাবশত এই জাতীয় হাদিস ইতোপূর্বে প্রচার করে থাকে তাহলে তার জন্য আবশ্যক হলো, অনতিবিলম্বে তা ডিলিট করা এবং এটি যে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন কথা সে বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা।

✪ আল্লাহর রসুলের নামে মিথ্যাচারে ভয়াবহতা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় হাদিস প্রচারের পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন অপরিহার্য:

মনে রাখা কর্তব্য যে, মানুষের সাথে সাধারণ মিথ্যা কথা এবং আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামে মিথ্যা কথা এক নয়। সাধারণ মিথ্যা কথা হারাম, কবিরা গুনাহ এবং মুনাফেকির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু হাদিসের নামে মিথ্যাচার করার পরিণতি এর থেকেও ভয়াবহ। কেউ জেনে বুঝে তা করলে তার পরিণতি জাহান্নাম।

إنَّ كَذِبًا عَلَيَّ ليسَ كَكَذِبٍ علَى أَحَدٍ، مَن كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

“আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, আমার প্রতি মিথ্যারোপ করা তোমাদের কারো প্রতি মিথ্যারোপ করার মত নয়। যে ব্যক্তি জেনেশুনে ইচ্ছাকৃত ভাবে আমার প্রতি মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার বাসস্থান নির্ধারণ করে নেয়।” [সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী)। মুকাদ্দামাহ (ভূমিকা), পরিচ্ছেদ: ২. রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর মিথ্যারোপ গুরুতর অপরাধ]

কেননা এর মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা সমাজের ছড়িয়ে পড়ে এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে ইসলামে বিকৃতি সাধিত হয়।
তাই বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইসলাম বিষয়ে কোন কিছু প্রচারের আগে তার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করা এবং তার বিশুদ্ধতার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া হওয়া অপরিহার্য। অন্যথায় ইসলাম সম্পর্কে ভুল বার্তা প্রচার ও ইসলাম বিকৃতির অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার পাশাপাশি তা প্রচারকারীর আমলনামায় গুনাহের জারিয়া বা প্রবহমান গুনাহ হিসেবে লিপিবদ্ধ হবে। যত মানুষ এর দ্বারা বিভ্রান্ত হবে তাদের সমপরিমাণ গুনাহ প্রচারকারীর আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হবে। সুতরাং এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সর্তকতা অবলম্বন করা আবশ্যক।

আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন এবং ইসলাম সম্পর্কে সব ধরনের বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর পরিবারের সেবার বিধান

 ইসলামের দৃষ্টিতে শ্বশুর-শাশুড়ি ও স্বামীর পরিবারের সেবার বিধান এবং সকল পরিবারের প্রতি বিশেষ বার্তা

প্রশ্ন: ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রীর জন্য কি শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা বাধ্যতামূলক?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ইসলামের দৃষ্টিতে স্ত্রী তার স্বামীর মা, বাবা, ভাই-বোন ইত্যাদির কারও সেবা করতে বাধ্য নয়। তবে শ্বশুর-শাশুড়ি এবং তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সেবা করা একদিকে যেমন স্বামীর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ অন্যদিকে নেকির কাজ তাতে কোন সন্দেহ নাই। কোন স্ত্রী যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তার শ্বশুর-শাশুড়ি বা তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের খেদমত করে তবে আল্লাহ তাকে আখিরাতে পুরষ্কার প্রদান করবেন ইনশাআল্লাহ। কারণ ইসলামের দৃষ্টিতে যে যত বেশি মানুষের উপকার করবে সে তত বেশি উত্তম। বিশেষ করে যখন রোগ-ব্যাধি, শারীরিক অক্ষমতা, বয়োঃবৃদ্ধ হওয়া ইত্যাদি কারণে শশুর-শাশুড়ির প্রতি যত্ন নেওয়ার বিশেষ প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন কারণে মানুষ একে অন্যের সেবা বা সহযোগিতার মুখাপেক্ষী হয়।

এক্ষেত্রে স্বামীদেরও উচিত,‌ আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় তার শ্বশুর-শাশুড়িদের প্রতি যথাসম্ভব সুদৃষ্টি রাখা এবং প্রয়োজন দেখা দিলে যথাসম্ভব তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা। এতে তিনিও আল্লাহর কাছে পুরস্কৃত হবেন ইনশাআল্লাহ।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ وَأَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللهِ تَعَالَى سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ أَوْ تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنًا أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ جُوعًا, وَلأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِ فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هٰذَا الْمَسْجِدِ – يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ – شَهْرًا وَمَنَ كَفَّ غَضَبَهُ سَتَرَ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ وَلَوْ شَاءَ أَنْ يُمْضِيَهُ أَمْضَاهُ مَلأَ اللهُ قَلْبَهُ رَجَاءً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ مَشَى مَعَ أَخِيهِ فِي حَاجَةٍ حَتّٰـى يُثْبِتَهَا لَهُ أَثْبَتَ اللهُ قَدَمَهُ يَوْمَ تَزُولُ الأَقْدَامِ وَإِنَّ سُوَّء الْخُلُقِ لَيُفْسِدُ الْعَمَلَ كَمَا يُفْسِدُ الْخَلّ الْعَسَل

“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হল সে ব্যক্তি যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হল, একজন মুসলিমের অন্তরে আনন্দ প্রবেশ করানো অথবা তার দুখ-কষ্ট লাঘব করা, অথবা তার পক্ষ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা ও তার ক্ষুধা নিবারণ করা। আর আমার এই মসজিদে (মদিনার মসজিদে নববীতে) একমাস ব্যাপী ইতিকাফ করার থেকে আমার একজন ভাইয়ের কোনও প্রয়োজন মেটানোর জন্য তার সাথে গমন করা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করবে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবেন। যে ব্যক্তি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করবে অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার অন্তরকে সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য তার সাথে গমন করবে এবং তা পূরণ করে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যে দিন মানুষের পাগুলো পিছলে যাবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে যেমন সিরকা (ভিনেগার) মধুকে নষ্ট করে দেয়।” [সহিহ তারগিব, হা/২০৯০, সিলসিলা সহীহা, হা/৯০৬, সহীহুল জামে, হা/১৭৬]
◆ আমাদের সমাজে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করাকে একজন নারীর প্রশংসনীয় দিক বিবেচনা করা হয়। তাই সামাজিক এই সুন্দর রীতিটি বজায় রাখার ব্যাপারে আমাদের সচেষ্ট হওয়া উচিৎ।

◆ তাছাড়া এটাও মনে রাখা দরকার যে, একজন মহিলার জীবনেও একদিন এমন সময় আসতে পারে যখন তার পুত্রবধূর সেবার প্রয়োজন দেখা দিবে। তাই সে যদি এখন সন্তুষ্ট চিত্তে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তার শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করে তবে সে যখন শাশুড়ি হবে তখন আশা করা যায়, তার পুত্রবধূরা তার সেবা করবে।

❑ সৌদি আরবের ফতোয়া বোর্ডকে শাশুড়িকে সহায়তা করার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন,

ليس في الشرع ما يدل على إلزام الزوجة أن تساعد أم الزوج ، إلا في حدود المعروف ، وقدر الطاقة ؛ إحساناً لعشرة زوجها ، وبرّاً بما يجب عليه بره

“শরিয়তে এমন কিছু নেই যা নির্দেশ করে যে, স্ত্রী স্বামীর মাকে সাহায্য করতে বাধ্য। তবে স্বামীর প্রতি ইহসান এবং তার প্রতি অত্যাবশ্যকীয় কর্তব্যপরায়ণতার স্বার্থে যতটুকু সামাজিকতার সীমার মধ্যে পড়ে সেটা ভিন্ন কথা।” [ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ, ১৯/২৬৪ ও ২৬৫]

❑ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়, স্ত্রীর উপর কি স্বামীর মা’র কোনও হক আছে?

তিনি উত্তরে বলেন,

لا ، أم الزوج ليس لها حق واجب على الزوجة بالنسبة للخدمة ؛ لكن لها حق مِن المعروف ، والإحسان ، وهذا مما يجلب مودة الزوج لزوجته ، أن تراعي أمه في مصالحها ، وتخدمها في الأمر اليسير ، وأن تزورها من حين لآخر ، وأن تستشيرها في بعض الأمور ، وأما وجوب الخدمة : فلا تجب ؛ لأن المعاشرة بالمعروف تكون بين الزوج والزوجة .

“না, খেদমতের ব্যাপারে স্ত্রীর ওপর স্বামীর মায়ের কোনও হক নেই সামাজিকতা ও ইহসানের হক ছাড়া। এ জিনিসটা স্ত্রীর প্রতি স্বামীর প্রেম-ভালোবাসা সৃষ্টি যে, সে তার মায়ের প্রতি যত্ন নেয়, সাধারণ ছোটখাটো বিষয়ে সেবা করে, সময়ে সময়ে তার সাথে দেখা করে এবং তার বিভিন্ন বিষয়ে তার নিকট পরামর্শ নেয়। কিন্তু খেদমত আবশ্যক হওয়ার ব্যাপারে কথা হল, তা আবশ্যক নয়। কারণ সততা ও কল্যাণের সাথে দাম্পত্য জীবন হবে কেবল স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে।” [লিকাআতুল বাবিল মাফতুহ, পৃষ্ঠা নং ৬৮, প্রশ্ন নং ১৪]

❂❂ আমাদের সামাজিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে পরিবারগুলোর প্রতি বিশেষ বার্তা:

যদি পুত্রবধূ তার শ্বশুর-শাশুড়ির এতটুকু সেবা করে বা কোনোভাবে তার উপকার করে তাহলে তাদের কর্তব্য, তার প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করা এবং তার কাজের মূল্যায়ন করা। স্বামীর কর্তব্য, স্ত্রীর এ কাজের জন্য কৃতজ্ঞতা আদায়ের পাশাপাশি তার প্রশংসা করা এবং তার প্রতি আরও বেশি আন্তরিকতা, যত্ন, সম্মান ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করা। মাঝে মধ্যে এ জন্য তাকে আলাদা উপহার দেওয়াও ভালো। এতে সে খুশি হবে এবং আরও বেশি সেবা দিতে উৎসাহ বোধ হবে। স্বামীদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَنْ لَم يَشْكُرِ اَلناسَ لَمْ يَشْكُرِ اللهِ

“যে ব্যক্তি (উপকারী) মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করল না, সে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করল না।” [আহমদ, হ/১১২৮০, তিরমিযী ১৯৫৫-সহিহ]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

تَهَادُوا تَحَابُّوا

“তোমরা উপহার বিনিময় কর তাহলে তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি হবে।’’ [বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ, হা/ ৫৯৪, সহীহুল জামে’, হা/ ৩০০৪]

কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজে শ্বশুর-শাশুড়ি সহ পরিবারের সকল সদস্যের প্রতি পুত্রবধূর পক্ষ থেকে সেবা পাওয়াকে ‘অধিকার’ মনে করা হয়। যার কারণে তার এহেন ত্যাগ ও সেবাকে যথার্থ মূল্যায়ন তো করা হয়ই না বরং তার কাজে সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতি হলে তার সাথে নানা অপমান সুলভ আচরণ করা হয়, তার প্রতি নানাভাবে জুলুম-অত্যাচার করা হয় ও কষ্ট দেওয়া হয়। যা সামাজিক ভাবে যেমন অমানবিক আচরণ তেমনি শরিয়তের দৃষ্টিতেও হারাম।

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

«الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَهُنَا» . وَيُشِير إِلَى صَدره ثَلَاث مرار بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ: دَمُهُ ومالهُ وَعرضه

“এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। কোনও মুসলিম অপর মুসলিমের ওপর অবিচার করবে না, তাকে অপদস্থ করবে না এবং অবজ্ঞা করবে না। আল্লাহ ভীতি এখানে! এ কথা বলে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজের বুকের দিকে তিনবার ইঙ্গিত করে বললেন, একজন মানুষের জন্য এতটুকু অন্যায়ই যথেষ্ট যে, সে নিজের মুসলিম ভাইকে হেয় জ্ঞান করবে। এক মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের রক্ত, ধন-সম্পদ ও মান-সম্মান হারাম।” [সহিহ মুসলিম]

❖ শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি অহংকার করা বা তাদের প্রতি কষ্ট দায়ক আচরণ করা হারাম:

এর বিপরীতেও আমাদের সমাজে আরেকটি কষ্ট দায়ক চিত্র দেখা যায়। তাহলো, কতিপয় মহিলা শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-যোগ্যতা, সৌন্দর্য বা বাবার বাড়ির অর্থ-সম্পদ বা বংশগত গৌরবের কারণে তার শ্বশুর-শাশুড়ি বা স্বামীর পরিবারকে অবজ্ঞা করে, তাদেরকে নানাভাবে অপমান সুলভ কথা বলে ও কষ্ট দেয়। এটিও হারাম।
অনুরূপভাবে অনেক স্বামীও তার শশুর-শাশুড়ির সাথে অসদাচরণ করে বা তাদেরকে অপমান-অপদস্থ করে। এটিও হারাম।

সর্বাবস্থায় শ্বশুর-শাশুড়ি সম্মান ও শ্রদ্ধা পাওয়া হকদার। কেননা তারা বয়সে বড়। আর বয়োঃবৃদ্ধ, মুরুব্বি বা বড়দেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করা ইসলামি শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ﻟَﻴْﺲَ ﻣِﻨَّﺎ ﻣَﻦْ ﻟَﻢْ ﻳَﺮْﺣَﻢْ ﺻَﻐِﻴﺮَﻧَﺎ ﻭَﻳُﻮَﻗِّﺮْ ﻛَﺒِﻴﺮَﻧَﺎ

“যে ছোটদেরকে দয়া এবং বড়দেরকে শ্রদ্ধা করেনা সে আমাদের দলভুক্ত নয়।“ [তিরমিযী, সহিহুল জামে, হা/৫৪৪৫]

সুতরাং প্রতিটি মহিলার জন্য তার শ্বশুর-শাশুড়ি ও তার স্বামীর পরিবারের বড়দের প্রতি যথার্থ সম্মান-শ্রদ্ধা করা এবং ছোটদের প্রতি দয়া ও স্নেহশীল আচরণ করা আবশ্যক। কোন অবস্থায় কাউকে হেয় বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা, অহংকার প্রদর্শন, অসম্মান জনক আচরণ করা বা কষ্ট দেওয়া জায়েজ নেই। নারী-পুরুষ সকলের জন্য একই কথা প্রযোজ্য।

▪️প্রশ্ন: পুত্র সন্তানকে জীবিকা অর্জনের জন্য বাইরে থাকতে হয়। কন্যা সন্তানও বিয়ের পরে শ্বশুর বাড়ি চলে যায়। এ অবস্থায় পুত্রবধূও যদি শ্বশুর-শাশুড়িকে দেখাশুনা না করে তাহলে বৃদ্ধ মানুষগুলোকে কে দেখাশুনা করবে?
উত্তর:
আল্লাহ তাআলা পিতামাতার সেবা করাকে তার সন্তানদের জন্য অপরিহার্য করেছেন; পুত্রবধূর জন্য নয়। সুতরাং স্বামী পিতামাতার সেবা এবং তার জীবন-জীবিকার মধ্যে সমন্বয় সাধন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে যদি তিনি তার এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে না পারেন তাহলে এ ক্ষেত্রে একজন ভালো মনের দ্বীনদার স্ত্রী তার স্বামীর অবস্থা বিবেচনা করে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং স্বামীকে সহায়তার স্বার্থে তার শ্বশুর-শাশুড়ির যথাসাধ্য সেবা দিবে। এতে আল্লাহ তাকে পুরস্কৃত করবেন ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক জ্ঞান ও বুঝ দান করুন এবং তাঁর নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালনার তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি পুত্রবধূ ও জামাইদের দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং শ্বশুর-শাশুড়িকে খুশি করার ১০ উপায়

নিম্নে শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি পুত্রবধূ এবং জামাইদের কর্তব্য সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হলো:

১. শ্বশুর-শাশুড়ি অত্যন্ত সম্মান এবং শ্রদ্ধার পাত্র। সুতরাং চাই স্বামী হোক বা স্ত্রী হোক-সকলের কর্তব্য, তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি যথার্থ সম্মান ও শ্রদ্ধার সাথে আচরণ করা। কারণ তারা বয়সে বড় বা বয়স্ক মুরুব্বি। আর হাদিসে বয়সে বড় ও মুরব্বিদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করার নির্দেশ এসেছে। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

ﻟَﻴْﺲَ ﻣِﻨَّﺎ ﻣَﻦْ ﻟَﻢْ ﻳَﺮْﺣَﻢْ ﺻَﻐِﻴﺮَﻧَﺎ ﻭَﻳُﻮَﻗِّﺮْ ﻛَﺒِﻴﺮَﻧَﺎ

“যে ছোটদেরকে দয়া এবং বড়দেরকে শ্রদ্ধা করে না সে আমাদের দলভুক্ত নয়।“ [তিরমিযী, সহিহুল জামে, হা/৫৪৪৫]।
যে পিতা-মাতার মাধ্যমে আপনি আপনার জীবন সঙ্গী অথবা সঙ্গিনীকে পেয়েছেন তাদেরকে ভালোবাসা এবং সম্মান ও শ্রদ্ধা করার মাধ্যমে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা আদায় করা হয়।
২. স্ত্রী যেভাবে স্বামীর পিতা-মাতাকে সম্মান-শ্রদ্ধা করে স্বামীরও কর্তব্য, স্ত্রীর পিতা-মাতাকে সম্মান এবং শ্রদ্ধা করা। এটি স্ত্রীর প্রতিও ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার শামিল।
৩. বয়সে বড় বা বয়োবৃদ্ধ-মুরব্বিদের সাথে উত্তম আচরণ করা একজন মুসলিমের উন্নত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। এর বিপরীতটা হল, নিতান্তই অসৎ চরিত্রের প্রমাণ।

৪. প্রতিটি মানুষের উচিৎ, তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে নরম ও সম্মানজনক ভাষায় কথা বলা। তাদের সাথে কর্কশ, কষ্টদায়ক ও অশালীন বাক্য সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য।
৫. আপনার কোন কথা বা আচরণে তারা কষ্ট পেলে তাদের নিকট ক্ষমা চাওয়া জরুরি। ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করা উভয়টি মানুষের মহত্ত্বের লক্ষণ।
৬. তারা কোনোভাবে কষ্ট দিলে সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া কর্তব্য। কারণ বয়োবৃদ্ধ অবস্থায় রোগ-ব্যাধি, ঘুম সমস্যা, জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে মানুষের ধৈর্য শক্তি হ্রাস পায় এবং মন-মানসিকতা কিছুটা খিটমিটে হয়ে যায়। তাই এ বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিৎ।
৭. বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক, হৃদ্‌রোগ, স্মৃতি ভ্রম, ক্যানসার ইত্যাদি রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই ছেলেমেয়েদের পাশাপাশি পুত্রবধূ বা জামাইদের উচিত, যথাসাধ্য তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

৮. বার্ধক্যে মানুষের রুচির পরিবর্তন ঘটে, দেখা দেয় হজমের সমস্যা। খাদ্য গ্রহণে অনীহা হয়। তাই তাদের রুচির প্রতি খেয়াল রেখে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার-দাবারের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা কর্তব্য।
৯. বয়স বাড়তে থাকলে মানুষের ঘুমের অসুবিধা দেখা দেয়। ঘুম কম হয় বা রাতে ঘুম আসে না। তাই তাদের আরাম দায়ক ঘুমের দিকটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

১০. তাদের পোশাক-আশাক, বিছানা, ঘর, ঘরের আসবাব-পত্র ইত্যাদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও সুন্দরভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা উচিত।

১১. তাদের একাকীত্ব কাটাতে তাদের সঙ্গ দেওয়া এবং তাদের পাশে বসে কিছু সময় দ্বীন ও দুনিয়াবি বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা বলা খুব গুরুত্বপূর্ণ।

১২. প্রয়োজন দেখা দিলে তাদের ওজু, গোসল ও ইবাদত-বন্দেগিতে সাহায্য করা কর্তব্য।
১৩. শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে জোরপূর্বক যৌতুক বা বিভিন্ন ধরনের উপহার-উপঢৌকন দাবি করা এবং তার না পেলে তাদের প্রতি অসদাচরণ করা শুধু হীন চরিত্রের পরিচায়ক নয় বরং তা প্রচলিত আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ এবং শরিয়তে দৃষ্টিতে হারাম।
১৪. কোন জামাই কিংবা পুত্রবধূর জন্য তার শ্বশুর-শাশুড়ির উপরে অহংকার প্রকাশ করা বা তাদেরকে কোনোভাবে খাটো করা জায়েজ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-গরিমা, বংশগত আভিজাত্য ও মর্যাদা ইত্যাদি কারণে অনেক পুত্রবধূ বা জামাই তাদের শ্বশুর-শাশুড়ির প্রতি উপরে অহংকার ও দাম্ভিকতা সুলভ আচরণ করে এবং নানাভাবে তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করে। যা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

১৫. সর্বোপরি তারা যদি আর্থিক, শারীরিক, মানসিক বা সামাজিক ইত্যাদি কোন ভাবে অশান্তি বা কষ্টে থাকে তাহলে তা লাঘব করার চেষ্টা করা এবং তাদেরকে খুশি রাখার চেষ্টা করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَحَبُّ النَّاسِ إِلَى اللهِ تَعَالَى أَنْفَعُهُمْ لِلنَّاسِ وَأَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللهِ تَعَالَى سُرُورٌ تُدْخِلُهُ عَلَى مُسْلِمٍ أَوْ تَكَشِفُ عَنْهُ كُرْبَةً أَوْ تَقْضِي عَنْهُ دَيْنًا أَوْ تَطْرُدُ عَنْهُ جُوعًا, وَلأَنْ أَمْشِيَ مَعَ أَخِ فِي حَاجَةٍ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ أَنْ أَعْتَكِفَ فِي هٰذَا الْمَسْجِدِ – يَعْنِي مَسْجِدَ الْمَدِينَةِ – شَهْرًا وَمَنَ كَفَّ غَضَبَهُ سَتَرَ اللهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ كَظَمَ غَيْظَهُ وَلَوْ شَاءَ أَنْ يُمْضِيَهُ أَمْضَاهُ مَلأَ اللهُ قَلْبَهُ رَجَاءً يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَمَنْ مَشَى مَعَ أَخِيهِ فِي حَاجَةٍ حَتّٰـى يُثْبِتَهَا لَهُ أَثْبَتَ اللهُ قَدَمَهُ يَوْمَ تَزُولُ الأَقْدَامِ وَإِنَّ سُوَّء الْخُلُقِ لَيُفْسِدُ الْعَمَلَ كَمَا يُفْسِدُ الْخَلّ الْعَسَل

“আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় মানুষ হল সে ব্যক্তি যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হল, একজন মুসলিমের অন্তরে আনন্দ প্রবেশ করানো অথবা তার দুখ-কষ্ট লাঘব করা, অথবা তার পক্ষ থেকে তার ঋণ পরিশোধ করা ও তার ক্ষুধা নিবারণ করা।
আর আমার এই মসজিদে (মদিনার মসজিদে নববীতে) একমাস ব্যাপী ইতিকাফ করার থেকে আমার একজন ভাইয়ের কোনও প্রয়োজন মেটানোর জন্য তার সাথে গমন করা আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়। যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সংবরণ করবে আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি গোপন করবেন। যে ব্যক্তি ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করবে অথচ সে ইচ্ছা করলে তা প্রয়োগ করতে পারত, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন তার অন্তরকে সন্তুষ্ট করবেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করার জন্য তার সাথে গমন করবে এবং তা পূরণ করে দেবে, আল্লাহ সেদিন তার পদযুগলকে সুদৃঢ় রাখবেন, যে দিন মানুষের পাগুলো পিছলে যাবে। আর মন্দ চরিত্র আমলকে নষ্ট করে যেমন সিরকা (ভিনেগার) মধুকে নষ্ট করে দেয়।” [সহিহ তারগিব, হা/২০৯০, সিলসিলা সহীহা, হা/৯০৬, সহীহুল জামে, হা/১৭৬]

১৬. এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, আজ যদি কেউ শ্বশুর-শাশুড়ির সাথে খারাপ ব্যবহার করে তাহলে সম্ভাবনা আছে, এর বদলা হিসেবে সে যদি ভবিষ্যতে শ্বশুর-শাশুড়ি হয় তাহলে তার জামাই/পুত্রবধূর পক্ষ থেকে খারাপ আচরণের শিকার হবে। যেমনটি বলা হয়,
كَمَا تَدِينُ تُدَانُ ، وَكَمَا تَزرَعُ تَحصُدُ
“যেমন কর্ম করবে তেমন ফল পাবে, যেমন চাষ করবে তেমন ফসল পাবে।” [ইকতিযাউল ইলমিল আমাল-খতিব বাগদাদি, পৃষ্ঠা নং ৯৮]
▪️বিশেষ দ্রষ্টব্য, ইসলামের দৃষ্টিতে সন্তানদের জন্য পিতা-মাতার সেবা-শুশ্রূষা, অর্থ খরচ করা ও দেখভাল করা ফরজ। কিন্তু পুত্রবধূ বা জামাইয়ের জন্য তা ফরজ না হলেও অত্যন্ত নেকির কাজ। ‌তাই তাদের কর্তব্য, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যথাসাধ্য শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা ও সাহায্য-সহযোগিতা করার মাধ্যমে অবারিত নেকি অর্জনের চেষ্টা করা।
আর শ্বশুর-শাশুড়ির কর্তব্য, যদি তাদের পুত্রবধূ বা জামাই তাদেরকে কোনভাবে সাহায্য-সহযোগিতা ও উপকার করে তাহলে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। কারণ যে মানুষের কৃতজ্ঞতা আদায় করে না সে আল্লাহরও কৃতজ্ঞতা আদায় করে না।
আল্লাহ তাআলা তওফিক দান করুন। আমিন।

🔸শ্বশুর-শাশুড়িকে খুশি করার ১০ উপায়:

প্রশ্ন: শ্বশুর-শ্বশুর-শাশুড়ির মন খুশি রাখতে কী করণীয়?
উত্তর:
১. মনে রাখা কর্তব্য যে, মানুষের সাথে সুন্দর আচরণ, নরম ভাষায় কথা বলা, ধৈর্যের সাথে সেবা ও সহযোগিতা করা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা, খারাপ আচরণের জবাব খারাপ আচরণের মাধ্যমে না দেওয়া-এগুলো হল, মানুষের মন জয় করার স্বীকৃত মূলমন্ত্র।
সুতরাং আপনি যদি আপনার শ্বশুর-শাশুড়িকে খুশি রাখতে চান তাহলে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এ সকল গুণ ও আচরণ প্র্যাকটিস করুন। এতে আপনি তাদের প্রিয় হয়ে উঠবেন।

২. তাদের পক্ষ থেকে খারাপ আচরণের সম্মুখীন হলে প্রতিশোধ পরায়ণ না হয়ে সর্বোচ্চ ধৈর্যের পরিচয় দিবেন এবং আল্লাহর নিকট তাদের হেদায়েতের জন্য দুআ করবেন।
৩. দূরে থাকলে তাদের সাথে নিয়মিত ফোনে যোগাযোগ রাখুন এবং খোঁজ-খবর নিন।
৪. বিভিন্ন বিষয়ে তার থেকে পরামর্শ নিন এবং বিশেষ ক্ষেত্রে তাদেরকে পরামর্শ দিন।
৫. তাদের সামনে অথবা তাদের অনুপস্থিতে তাদের জন্য আল্লাহর নিকট দুআ করুন।
৬. সম্ভব হলে, তাদেরকে অর্থিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি কিছু উপহার দিন। উপহার মানুষের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
৭. তাদের প্রশংসনীয় দিকগুলো তুলে ধরে তাদের প্রশংসা করুন।
৮. তারা আপনার কোনও উপকার করলে কৃতজ্ঞতা আদায় করুন।
৯. তাদের সুখে সুখী হোন এবং তাদের দুঃখে দুঃখী হন।
১০. মাঝেমধ্যে কিছু সময়ের জন্যে হলেও তাদের নিকট সময় কাটানো এবং তাদের সেবা-যত্ন করুন। এতে আল্লাহ আপনার উপর সন্তুষ্ট হবেন এবং আখিরাতে এর উত্তম বিনিময় দান করবেন। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব। 

Friday, October 20, 2023

হযরত শোয়াইব আঃ এর জীবনী

 হযরত শোআয়েব (আ:)১৩. হযরত শো‘আয়েব (আলাইহিসসালাম)সূচীপত্রহযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতকওমে শো‘আয়েব-এর ধর্মীয় ও সামাজিকঅবস্থা এবং দাওয়াতের সারমর্মশো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতের ফলশ্রুতিশিক্ষণীয় বিষয় সমূহআহলেমাদইয়ানের উপরে আপতিত গযবের বিবরণ।আল্লাহরগযবে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রধান ৬টি প্রাচীন জাতিরমধ্যেপঞ্চম জাতি হ’ল ‘আহলে মাদইয়ান’। ‘মাদইয়ান’হ’ল লূত সাগরের নিকটবর্তী সিরিয়া ও হিজাযেরসীমান্তবর্তী একটি জনপদের নাম। যা অদ্যাবধিপূর্ব জর্ডনের সামুদ্রিক বন্দর ‘মো‘আন’ ( ﻣﻌﺎﻥ )-এরঅদূরে বিদ্যমান রয়েছে। কুফরী করা ছাড়াও এইজনপদের লোকেরা ব্যবসায়ের ওযন ও মাপেকম দিত, রাহাজানি ও লুটপাট করত। অন্যায়পথেজনগণের মাল-সম্পদ ভক্ষণ করত।[1] ইয়াকূত হামাভী(মৃঃ ৬২৬/১২২৮খৃঃ) বলেন, ইবরাহীম-পুত্র মাদইয়ানেরনামে জনপদটি পরিচিত হয়েছে।[2] হযরতশো‘আয়েব(আঃ) এদের প্রতি প্রেরিতহয়েছিলেন। ইনি হযরত মূসা (আঃ)-এর শ্বশুর ছিলেন।কওমে লূত-এর ধ্বংসের অনতিকাল পরে কওমেমাদইয়ানের প্রতি তিনি প্রেরিত হন (হূদ ১১/৮৯)।চমৎকার বাগ্মিতার কারণে তিনি ( ﺧﻄﻴﺐ ﺍﻷﻧﺒﻴﺎﺀ )‘খাত্বীবুল আম্বিয়া’ (নবীগণের মধ্যে সেরাবাগ্মী) নামে খ্যাত ছিলেন।[3] আহলে মাদইয়ান-কে পবিত্র কুরআনে কোথাও কোথাও ‘আছহাবুলআইকাহ’ ( ﺍﺻﺤﺎﺏ ﺍﻷﻳﻜﺔ ) বলা হয়েছে। যার অর্থ‘জঙ্গলের বাসিন্দাগণ’। এটা বলার কারণ এই যে, এইঅবাধ্য জনগোষ্ঠী প্রচন্ড গরমে অতিষ্ট হয়েনিজেদের বসতি ছেড়ে জঙ্গলেআশ্রয় নিলেআল্লাহ তাদেরকে সেখানেই ধ্বংস করে দেন।এটাও বলা হয় যে, উক্ত জঙ্গলে ‘আইকা’ ( ﺍﻷﻳﻜﺔ )বলে একটা গাছকে তারা পূজা করত। যার আশপাশেজঙ্গল বেষ্টিত ছিল।মাদইয়ান ( ﻣﺪﻳﻦ ) ছিলেন হাজেরাওসারাহর মৃত্যুর পরে হযরত ইবরাহীমের আরববংশোদ্ভূত কেন‘আনী স্ত্রী ক্বানতূরাবিনতেইয়াক্বত্বিন ( ﻗﻨﻄﻮﺭﺍ ﺑﻨﺖ ﻳﻘﻄﻦ ) -এর ৬টি পুত্রসন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ পুত্র।[4]উল্লেখ্য যে,হযরত শো‘আয়েব (আঃ) সম্পর্কে পবিত্রকুরআনের ১০টি সূরায় ৫৩টি আয়াতে বর্ণিতহয়েছে।[5]হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এর দাওয়াত:ধ্বংসপ্রাপ্ত বিগত কওমগুলোর বড় বড় কিছু অন্যায়কর্ম ছিল। যার জন্য বিশেষভাবে সেখানে নবীপ্রেরিত হয়েছিলেন। শো‘আয়েব-এরকওমেরওতেমনি মারাত্মক কয়েকটি অন্যায় কর্ম ছিল, যেজন্যখাছ করে তাদের মধ্য থেকে তাদের নিকটেশো‘আয়েব (আঃ)-কে প্রেরণ করা হয়। তিনি তাঁরকওমকে যে দাওয়াত দেন, তার মধ্যেইবিষয়গুলোর উল্লেখ রয়েছে। যেমন আল্লাহবলেন, ﻭَﺇِﻟَﻰ ﻣَﺪْﻳَﻦَ ﺃَﺧَﺎﻫُﻢْ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﻋْﺒُﺪُﻭﺍﺍﻟﻠﻪَ ﻣَﺎ ﻟَﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﺇِﻟَـﻪٍ ﻏَﻴْﺮُﻩُ ﻗَﺪْ ﺟَﺎﺀﺗْﻜُﻢ ﺑَﻴِّﻨَﺔٌ ﻣِّﻦ ﺭَّﺑِّﻜُﻢْﻓَﺄَﻭْﻓُﻮﺍ ﺍﻟْﻜَﻴْﻞَ ﻭَﺍﻟْﻤِﻴﺰَﺍﻥَ ﻭَﻻَ ﺗَﺒْﺨَﺴُﻮﺍ ﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﺃَﺷْﻴَﺎﺀﻫُﻢْ ﻭَﻻَﺗُﻔْﺴِﺪُﻭﺍ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﺑَﻌْﺪَ ﺇِﺻْﻼَﺣِﻬَﺎ ﺫَﻟِﻜُﻢْ ﺧَﻴْﺮٌ ﻟَّﻜُﻢْ ﺇِﻥ ﻛُﻨﺘُﻢﻣُّﺆْﻣِﻨِﻴﻦَ- ﻭَﻻَ ﺗَﻘْﻌُﺪُﻭﺍ ﺑِﻜُﻞِّ ﺻِﺮَﺍﻁٍ ﺗُﻮﻋِﺪُﻭﻥَ ﻭَﺗَﺼُﺪُّﻭﻥَ ﻋَﻦﺳَﺒِﻴﻞِ ﺍﻟﻠﻪِ ﻣَﻦْ ﺁﻣَﻦَ ﺑِﻬِﻮَﺗَﺒْﻐُﻮﻧَﻬَﺎ ﻋِﻮَﺟﺎً ﻭَﺍﺫْﻛُﺮُﻭﺍ ﺇِﺫْ ﻛُﻨﺘُﻢْﻗَﻠِﻴﻼً ﻓَﻜَﺜَّﺮَﻛُﻢْ ﻭَﺍﻧﻈُﺮُﻭﺍ ﻛَﻴْﻒَ ﻛَﺎﻥَ ﻋَﺎﻗِﺒَﺔُ ﺍﻟْﻤُﻔْﺴِﺪِﻳﻦَ – ﻭَﺇِﻥْﻛَﺎﻥَ ﻃَﺂﺋِﻔَﺔٌ ﻣِّﻨﻜُﻢْ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﺑِﺎﻟَّﺬِﻱ ﺃُﺭْﺳِﻠْﺖُ ﺑِﻪِ ﻭَﻃَﺂﺋِﻔَﺔٌ ﻟَّﻢْﻳْﺆْﻣِﻨُﻮﺍ ﻓَﺎﺻْﺒِﺮُﻭﺍ ﺣَﺘَّﻰ ﻳَﺤْﻜُﻢَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﻫُﻮَ ﺧَﻴْﺮُﺍﻟْﺤَﺎﻛِﻤِﻴﻦَ – ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ৮৫-৮৭)-‘আমি মাদইয়ানের প্রতিতাদের ভাই শো‘আয়েবকে প্রেরণ করেছিলাম।সে তাদের বলল, হে আমারসম্প্রদায়! তোমরাআল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদেরকোন উপাস্য নেই। তোমাদের কাছেতোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হ’তে সুস্পষ্টপ্রমাণ এসে গেছে। অতএবতোমরা মাপ ও ওযনপূর্ণ কর। মানুষকে তাদের মালামাল কম দিয়োনা।ভূপৃষ্ঠে সংস্কার সাধনের পরতোমরা সেখানেঅনর্থ সৃষ্টি করো না। এটাই তোমাদের জন্যকল্যাণকর, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও’। ‘তোমরাপথে-ঘাটে এ কারণে বসে থেকো না যে,ঈমানদারদের হুমকি দেবে, আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টিকরবে ও তাতে বক্রতা অনুসন্ধান করবে। স্মরণকর, যখন তোমরা সংখ্যায় অল্প ছিলে, অতঃপরআল্লাহ তোমাদেরকে আধিক্য দান করেছেন এবংলক্ষ্য কর কিরূপ অশুভ পরিণতি হয়েছেঅনর্থকারীদের’। ‘আর যদি তোমাদের একদল ঐবিষয়ের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে যা নিয়ে আমিপ্রেরিত হয়েছি এবং আরেক দল বিশ্বাস স্থাপন নাকরে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর যে পর্যন্ত নাআল্লাহ আমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেন।কেননা তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়ছালাকারী’ (আ‘রাফ৭/৮৫-৮৭)।কওমে শো‘আয়েব-এর ধর্মীয় ওসামাজিক অবস্থা এবং দাওয়াতের সারমর্ম:উপরোক্তআয়াত সমূহে নিম্নোক্ত বিষয়গুলি প্রতীয়মান হয়।প্রথমতঃ তারা আল্লাহর হক ও বান্দার হক দু’টিই নষ্টকরেছিল। আল্লাহর হক হিসাবে তারা বিশ্বাসেরজগতে আল্লাহকে বাদ দিয়ে সৃষ্টির পূজায় লিপ্তহয়েছিল কিংবা আল্লাহর সঙ্গে অন্যকে শরীককরেছিল। তারা আল্লাহর ইবাদত ছেড়ে দিয়েছিল।দুনিয়াবী ধনৈশ্বর্যে ও বিলাস-ব্যসনে ডুবে গিয়েতারা আল্লাহরসত্তা ও গুণাবলী এবং তাঁর হক সম্পর্কেগাফেল হয়ে গিয়েছিল। সেই সাথে নিজেদেরপাপিষ্ঠ জীবনের মুক্তির জন্য বিভিন্ন সৃষ্টবস্ত্তকে শরীক সাব্যস্ত করে তাদের অসীলায়মুক্তি কামনাকরত। এভাবে তারা আল্লাহ ও তাঁর গযবেরব্যাপারে নিঃশংক হয়ে গিয়েছিল। সেকারণ সকলনবীর ন্যায় শো‘আয়েব (আঃ) সর্বপ্রথমআক্বীদা সংশোধনের জন্য ‘তাওহীদেইবাদত’-এর আহবান জানান। যাতে তারা সবদিক থেকে মুখফিরিয়ে স্রেফ আল্লাহর ইবাদত করে এবং সকলব্যাপারে স্রেফ আল্লাহর ও তাঁর নবীর আনুগত্যকরে। তিনি নিজের নবুঅতের প্রমাণ স্বরূপতাদেরকে মু‘জেযা প্রদর্শন করেন।যা স্বয়ংপ্রতিপালকের পক্ষ হ’তে ‘সুস্পষ্ট প্রমাণ’ রূপেতাঁরনিকটে আগমন করে।দ্বিতীয়তঃ তারা মাপ ওওযনে কম দিয়ে বান্দার হক নষ্ট করত। সেদিকেইঙ্গিত করে শো‘আয়েব (আঃ) বলেন, ‘তোমরামাপ ও ওযন পূর্ণ কর এবং মানুষের দ্রব্যাদিতে কমদিয়ে তাদের ক্ষতি করো না’ (আ‘রাফ ৭/৮৫)।আয়াতের প্রথমাংশে খাছভাবে মাপ ও ওযন পূর্ণ করারনির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং শেষাংশে সর্বপ্রকারহকে ত্রুটি করাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সে হকমানুষের ধন-সম্পদ, ইযযত-আবরূ বা যেকোনবস্ত্তর সাথে সম্পর্কযুক্ত হৌক না কেন। বস্ত্ততঃদ্রব্যাদির মাপ ও ওযনেকম দেওয়া যেমন মহাঅপরাধ, তেমনিকারু ইযযত-আবরূ নষ্ট করা, কারুপদমর্যাদা অনুযায়ী তাকে সম্মান না করা, যাদেরআনুগত্য করা যরূরী তাদের আনুগত্যে ত্রুটি করাঅথবা যাকে সম্মান করা ওয়াজিব তার সম্মানে ত্রুটিকরাইত্যাদি সবই এ অপরাধের অন্তর্ভুক্ত, যাশো‘আয়েব (আঃ)-এরসম্প্রদায় করত। সে সমাজেমানীরমান ছিল না বা গুণীর কদর ছিল না।তৃতীয়তঃ বলাহয়েছে, ‘তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করোনা, সেখানে সংস্কার সাধিত হওয়ার পর’ (আ‘রাফ ৭/৮৫)।অর্থাৎ আল্লাহ পৃথিবীকে যেভাবেআভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সবদিক দিয়ে সুন্দর ওসামঞ্জস্যশীল করে সৃষ্টি করেছেন, তোমরাতাতে ব্যত্যয় ঘটিয়ো না এবং কোনরূপ অনর্থ সৃষ্টিকরো না।চতুর্থতঃ তোমরা মানুষকে ভীতিপ্রদর্শন ও আল্লাহর পথে বাধা দানের উদ্দেশ্যেপথে-ঘাটে ওঁৎ পেতে থেকো না (আ‘রাফ৭/৮৬)। এর দ্বারা মাদইয়ান বাসীদের আরেকটিমারাত্মক দোষের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে যে,তারা রাস্তার মোড়ে চৌকি বসিয়ে লোকদের কাছথেকে অবৈধভাবে চাঁদাআদায় করত ও লুটপাট করত।সাথে সাথে তারা লোকদেরকে শো‘আয়েব(আঃ)-এর উপরে ঈমান আনতে নিষেধ করতও ভয়-ভীতি প্রদর্শন করত। তারা সর্বদা আল্লাহর পথেবক্রতার সন্ধান করত’ (আ‘রাফ ৭/৮৬) এবং কোথাওঅঙ্গুলি রাখার জায়গা পেলে আপত্তি ও সন্দেহেরঝড় তুলে মানুষকে সত্যধর্ম হ’তে বিমুখ করারচেষ্টায় থাকত।মাদইয়ানবাসীদের আরেকটি দুষ্কর্মছিল যে, তারা প্রচলিত স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রারপার্শ্বহ’তে সোনা ও রূপার কিছু অংশ কেটেরেখে সেগুলো বাজারে চালিয়ে দিত।শো‘আয়েব (আঃ) তাদেরকে একাজ থেকেনিষেধ করেন।[6]পঞ্চমতঃ তাদের অকৃতজ্ঞতারবিষয়ে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলাহয়েছে যে, ‘স্মরণকর তোমরা যখন সংখ্যায় কম ছিলে, অতঃপর আল্লাহতোমাদের বংশবৃদ্ধি করে তোমাদেরকে একটিবিরাট জাতিতে পরিণত করেছেন’ (আ‘রাফ ৭/৮৬)।তোমরা ধন-সম্পদে হীন ছিলে, অতঃপরআল্লাহতোমাদের প্রাচুর্য দান করেছেন। অথচ তোমরাআল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ না হয়ে নানাবিধ শিরক ওকুফরীতে লিপ্ত হয়েছ। অতএব তোমরা সাবধানহও এবং তোমাদের পূর্ববর্তী কওমে নূহ, ‘আদ,ছামূদ ও কওমে লূত-এর ধ্বংসলীলার কথা স্মরণ কর(আ‘রাফ ৭/৮৬)। তাদের মর্মান্তিক পরিণাম ওঅকল্পনীয় গযবের কথা মনে রেখে হিসাব-নিকাশকরে পা বাড়াও।ষষ্ঠতঃ মাদইয়ানবাসীদের উত্থাপিতএকটি সন্দেহের জবাব দেওয়া হয়েছে। তারা বলতযে, ঈমানদারগণ যদি ভাল ও সৎ হয়, আর আমরা কাফিররাযদি মন্দ ও পাপী হই, তাহ’লে আমাদের উভয়দলের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা একরূপ কেন?কাফিররা অপরাধী হ’লে নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদের শাস্তিদিতেন। এর উত্তরে নবী বলেন, ﻓَﺎﺻْﺒِﺮُﻭﺍ ﺣَﺘَّﻰﻳَﺤْﻜُﻢَ ﺍﻟﻠﻪُ ﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﻫُﻮَ ﺧَﻴْﺮُ ﺍﻟْﺤَﺎﻛِﻤِﻴﻦَ ، ‘অপেক্ষা করযতক্ষণ না আল্লাহ আমাদের মাঝে ফায়ছালা করেনবস্ত্ততঃ তিনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালাকারী’ (আ‘রাফ ৭/৮৭)।অর্থাৎ আললাহ স্বীয় সহনশীলতা ও কৃপাগুণেপাপীদের অবকাশ দিয়ে থাকেন। অতঃপর তারা যখনচূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায়, তখন সত্য ও মিথ্যার ফায়ছালানেমে আসে। তোমাদের অবস্থাও তদ্রূপ হবে।অবিশ্বাসী ও পাপীদের উপরে আল্লাহর চূড়ান্তগযব সত্বর নাযিল হয়ে যাবে। একই ধরনেরবক্তব্য উল্লেখিত হয়েছে সূরা হূদে (১১/৮৪-৮৬আয়াতে)।হযরত শো‘আয়েব (আঃ) একথাও বলেনযে,‘(আমার এ দাওয়াতের জন্য) আমি তোমাদেরকাছে কোন প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদানবিশ্বপালনকর্তাই দেবেন’ (শু‘আরা ২৬/১৮০)। তিনিবললেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও শেষদিবসের আশা রাখ। তোমরা পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টিকরো না’ (আনকাবূত ২৯/৩৬)।শো‘আয়েব (আঃ)-এরদাওয়াতের ফলশ্রুতি :হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এরনিঃস্বার্থ ও আন্তরিকতাপূর্ণ দাওয়াত তাঁর উদ্ধতকওমের নেতাদের হৃদয়ে রেখাপাত করল না।তারাবরং আরও উদ্ধত হয়ে তাঁর দরদ ভরা সুললিত বয়ান ওঅপূর্ব চিত্তহারী বাগ্মীতার জবাবে পূর্ববর্তীধ্বংসপ্রাপ্ত কওমের পাপিষ্ঠ নেতাদের ন্যায়নবীকে প্রত্যাখ্যান করল এবং ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ ওতাচ্ছিল্য করেবলল, ﺃَﺻَﻼَﺗُﻚَ ﺗَﺄْﻣُﺮُﻙَ ﺃَﻥْ ﻧَﺘْﺮُﻙَ ﻣَﺎ ﻳَﻌْﺒُﺪُﺁﺑَﺎﺅُﻧَﺎ ﺃَﻭْ ﺃَﻥْ ﻧَﻔْﻌَﻞَ ﻓِﻲ ﺃَﻣْﻮَﺍﻟِﻨَﺎﻣَﺎ ﻧَﺸَﺂﺀ ﺇِﻧَّﻚَ ﻟَﺄَﻧﺖَ ﺍﻟْﺤَﻠِﻴﻢُﺍﻟﺮَّﺷِﻴﺪُ – ‘তোমার ছালাত কি তোমাকে একথা শিখায়যে, আমরা আমাদের ঐসব উপাস্যের পূজা ছেড়েদিই, আমাদের পূর্ব পুরুষেরা যুগ যুগ ধরে যেসবের পূজা করে আসছে? আর আমাদের ধন-সম্পদে ইচ্ছামত আমরা যা কিছু করে থাকি, তা পরিত্যাগকরি? তুমি তো একজন সহনশীল ও সৎ ব্যক্তি’ (হূদ১১/৮৭)। অর্থাৎ তুমি একজন জ্ঞানী, দূরদর্শী ওসাধু ব্যক্তি হয়ে একথা কিভাবে বলতে পার যে,আমরা আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসাদেব-দেবীর পূজা ও শেরেকী প্রথা সমূহপরিত্যাগ করি এবং আমাদের আয়-উপাদানে ও রূযী-রোজগারে ইচ্ছামত চলা ছেড়ে দেই। আয়-ব্যয়ে কোন্টা হালাল কোন্টাহারাম তা তোমার কাছথেকে জেনে নিয়ে কাজ করতে হবে এটা কিকখনো সম্ভব হ’তে পারে? তাদের ধারণা মতেতাদের সকল কাজ চোখ বুঁজে সমর্থন করা ওতাতে বরকতের জন্য দো‘আ করাই হ’ল সৎ ও ভালমানুষদের কাজ। ঐসব কাজে শিরক ও তাওহীদ, হারামও হালালের প্রশ্ন তোলা কোন ধার্মিক (?) ব্যক্তিরকাজ নয়।দ্বিতীয়তঃ তারা ইবাদাত ও মু‘আমালাতকেপরস্পরের প্রভাবমুক্ত ভেবেছিল। ইবাদতকবুলের জন্য যে রূযী হালাল হওয়া যরূরী, একথাতাদের বুঝে আসেনি। সেজন্য তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে হালাল-হারামের বিধান মানতে রাযী ছিল না।যদিও ছালাত আদায়ে কোন আপত্তি তাদের ছিল না।কেননা দেব-দেবীর পূজা সত্ত্বেও সৃষ্টিকর্তাহিসাবে এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও স্বীকৃতি সবারইছিল (লোকমান ৩১/২৫)। তাদের আপত্তি ছিল কেবলএকখানে যে, সবকিছু ছেড়ে কেবলমাত্রআল্লাহর ইবাদত করতে হবে এবং দুনিয়াবীক্ষেত্রে আল্লাহ প্রদত্ত বিধি-নিষেধমেনেচলতে হবে। তারা ধর্মকে কতিপয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমিত মনে করত এবংব্যবহারিক জীবনে তার কোন দখল দিতেপ্রস্ত্তত ছিল না। শো‘আয়েব (আঃ) অধিকাংশ সময়ছালাত ও ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন বলে তাকেবিদ্রূপ করে কোন কোন মূর্খ নেতা এরূপ কথাওবলে ফেলে যে, তোমার ছালাত কি তোমাকেএসব আবোল-তাবোল কথা-বার্তা শিক্ষা দিচ্ছে?কওমের লোকদের এসব বিদ্রূপবান ও রূঢ় মন্তব্যসমূহে বিচলিত না হয়ে অতীব ধৈর্য ও দরদেরসাথে তিনি তাদের সম্বোধন করে বললেন, ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎﻗَﻮْﻡِ ﺃَﺭَﺃَﻳْﺘُﻢْ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖُ ﻋَﻠَﻰ ﺑَﻴِّﻨَﺔٍ ﻣِﻦ ﺭَّﺑِّﻲ ﻭَﺭَﺯَﻗَﻨِﻲ ﻣِﻨْﻪُﺭِﺯْﻗًﺎ ﺣَﺴَﻨًﺎ ﻭَﻣَﺎ ﺃُﺭِﻳْﺪُ ﺃَﻥْ ﺃُﺧَﺎﻟِﻔَﻜُﻢْ ﺇِﻟَﻰ ﻣَﺎ ﺃَﻧْﻬَﺎﻛُﻢْ ﻋَﻨْﻪُ ﺇِﻥْﺃُﺭِﻳْﺪُ ﺇِﻻَّ ﺍﻹِﺻْﻼَﺡَ ﻣَﺎ ﺍﺳْﺘَﻄَﻌْﺖُ ﻭَﻣَﺎ ﺗَﻮْﻓِﻴْﻘِﻲْ ﺇِﻻَّ ﺑِﺎﻟﻠﻪِ ﻋَﻠَﻴْﻪِﺗَﻮَﻛَّﻠْﺖُ ﻭَﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺃُﻧِﻴْﺐُ – ﻭَﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻻَ ﻳَﺠْﺮِﻣَﻨَّﻜُﻢْ ﺷِﻘَﺎﻗِﻲْ ﺃَﻥﻳُّﺼِﻴْﺒَﻜُﻢْ ﻣِﺜْﻞُ ﻣَﺎ ﺃَﺻَﺎﺏَ ﻗَﻮْﻡَ ﻧُﻮْﺡٍ ﺃَﻭْﻗَﻮْﻡَ ﻫُﻮْﺩٍ ﺃَﻭْ ﻗَﻮْﻡَﺻَﺎﻟِﺢٍ ﻭَﻣَﺎ ﻗَﻮْﻡُ ﻟُﻮْﻁٍ ﻣِﻨْﻜُﻢْ ﺑِﺒَﻌِﻴْﺪٍ- ﻭَﺍﺳْﺘَﻐْﻔِﺮُﻭﺍ ﺭَﺑَّﻜُﻢْﺛُﻤَّﺘُﻮْﺑُﻮْﺍ ﺇِﻟَﻴْﻪِ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲ ﺭَﺣِﻴْﻢٌ ﻭَﺩُﻭْﺩٌ – ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﻳَﺎ ﺷُﻌَﻴْﺐُ ﻣَﺎﻧَﻔْﻘَﻪُ ﻛَﺜِﻴﺮًﺍ ﻣِّﻤَّﺎ ﺗَﻘُﻮْﻝُ ﻭَﺇِﻧَّﺎ ﻟَﻨَﺮَﺍﻙَ ﻓِﻴْﻨَﺎ ﺿَﻌِﻴْﻔًﺎﻭَﻟَﻮْﻻَ ﺭَﻫْﻄُﻚَﻟَﺮَﺟَﻤْﻨَﺎﻙَ ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻧْﺖَ ﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﺑِﻌَﺰِﻳْﺰٍ- ﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺃَﺭَﻫْﻄِﻲْ ﺃَﻋَﺰُّﻋَﻠَﻴْﻜُﻢْ ﻣِﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻭَﺍﺗَّﺨَﺬْﺗُﻤُﻮْﻩُ ﻭَﺭَﺍﺀَﻛُﻢْ ﻇِﻬْﺮِﻳًّﺎ ﺇِﻥَّ ﺭَﺑِّﻲْ ﺑِﻤَﺎﺗَﻌْﻤَﻠُﻮْﻥَ ﻣُﺤِﻴْﻂٌ – ﻭَﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﺍﻋْﻤَﻠُﻮْﺍ ﻋَﻠَﻰ ﻣَﻜَﺎﻧَﺘِﻜُﻢْ ﺇِﻧِّﻲْﻋَﺎﻣِﻞٌ ﺳَﻮْﻑَ ﺗَﻌْﻠَﻤُﻮْﻥَ، ﻣَﻦ ﻳَّﺄْﺗِﻴﻪِ ﻋَﺬَﺍﺏٌ ﻳُّﺨْﺰِﻳْﻪِ ﻭَﻣَﻦْ ﻫُﻮَﻛَﺎﺫِﺏٌ ﻭَﺍﺭْﺗَﻘِﺒُﻮْﺍ ﺇِﻧِّﻲ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺭَﻗِﻴْﺐٌ – ‏( ﻫﻮﺩ ৮৮-৯৩)-‘হেআমার জাতি! তোমরা কি মনে কর আমি যদি আমারপালনকর্তার পক্ষ হ’তে সুস্পষ্ট দলীলের উপরেকায়েম থাকি, আর তিনি যদি নিজের তরফ থেকেআমাকে (দ্বীনী ও দুনিয়াবী) উত্তম রিযিক দানকরে থাকেন, (তবে আমি কি তাঁর হুকুম অমান্যকরতে পারি?)। আর আমি চাই না যে, আমিতোমাদেরকে যে বিষয়ে নিষেধ করি, পরেনিজেই সে কাজে লিপ্ত হই। আমি আমার সাধ্যমততোমাদের সংশোধন চাই মাত্র। আর আমার কোনইক্ষমতা নেই আল্লাহর সাহায্য ব্যতীত। আমি তাঁরউপরেইনির্ভর করি এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাই’ (৮৮)।‘হে আমার জাতি! আমার প্রতি হঠকারিতা করে তোমরানিজেদের উপরে নূহ, হূদ বা ছালেহ-এর কওমেরমত আযাব ডেকে এনো না। আর লূতের কওমেরঘটনা তো তোমাদের থেকে দূরে নয়’ (৮৯)।‘তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনাকর ও তাঁর দিকেই ফিরে এস। নিশ্চয়ই আমারপালনকর্তা অতীব দয়ালু ও প্রেমময়’ (৯০)। ‘তারাবলল, হে শো‘আয়েব! তোমার অত শত কথাআমরা বুঝি না। তোমাকে তো আমাদের মধ্যকারএকজন দুর্বল ব্যক্তি বলে আমরা মনে করি। যদিতোমার জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা না থাকত,তাহ’লে এতদিন আমরা তোমাকে পাথর মেরে চূর্ণকরে ফেলতাম। তুমি আমাদের উপরে মোটেইপ্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি নও’ (৯১)। ‘শো‘আয়েববলল, হে আমার কওম! আমার জ্ঞাতি-গোষ্ঠী কিতোমাদের নিকটে আল্লাহর চেয়ে অধিকক্ষমতাশালী? অথচ তোমরা তাঁকে পরিত্যাগ করেপিছনে ফেলে রেখেছ? মনে রেখতোমাদের সকল কার্যকলাপ আমার পালনকর্তারআয়ত্তাধীন’ (৯২)। ‘অতএব হে আমার জাতি!তোমরা তোমাদের স্থানে কাজ কর, আমিওকাজকরে যাই। অচিরেই তোমরা জানতে পারবেকার উপরে লজ্জাষ্কর আযাব নেমে আসে, আরকে মিথ্যাবাদী। তোমরা অপেক্ষায় থাক, আমিওঅপেক্ষায় রইলাম’ (হূদ ১১/৮৮-৯৩)।জবাবে ‘তাদেরদাম্ভিক নেতারা চূড়ান্তভাবে বলে দিল, ﻟَﻨُﺨْﺮِﺟَﻨَّﻚَ ﻳَﺎﺷُﻌَﻴْﺐُ ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮﺍ ﻣَﻌَﻚَ ﻣِﻦْ ﻗَﺮْﻳَﺘِﻨَﺎ ﺃَﻭْ ﻟَﺘَﻌُﻮﺩُﻥَّ ﻓِﻲﻣِﻠَّﺘِﻨَﺎ – ‘হে শো‘আয়েব! আমরা অবশ্যইতোমাকে ও তোমার সাথী ঈমানদারগণকে শহরথেকে বের করে দেব অথবা তোমরাআমাদের ধর্মে প্রত্যাবর্তন করবে’ (আ‘রাফ৭/৮৮)। তারা আরও বলল, ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﺃَﻧْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﻤُﺴَﺤَّﺮِﻳﻦَ- ﻭَﻣَﺎﺃَﻧْﺖَ ﺇِﻟَّﺎ ﺑَﺸَﺮٌ ﻣِﺜْﻠُﻨَﺎ ﻭَﺇِﻥْ ﻧَﻈُﻨُّﻚَ ﻟَﻤِﻦَ ﺍﻟْﻜَﺎﺫِﺑِﻴﻦَ – ﻓَﺄَﺳْﻘِﻂْﻋَﻠَﻴْﻨَﺎ ﻛِﺴَﻔًﺎ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺴَّﻤَﺎﺀِ ﺇِﻥْ ﻛُﻨْﺖَ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺼَّﺎﺩِﻗِﻴﻦَ – ‏( ﺍﻟﺸﻌﺮﺍﺀ187-185 )-‘নিঃসন্দেহে তুমি জাদুগ্রস্তদের অন্যতম’।‘তুমি আমাদের মত একজন মানুষ বৈ কিছুই নও।আমাদের ধারণা তুমি অবশ্যই মিথ্যাবাদীদেরঅন্তর্ভুক্ত’। ‘এক্ষণে যদি তুমি সত্যবাদী হও, তবেআকাশের কোন টুকরা আমাদের উপরে ফেলেদাও’ (শো‘আরা ২৬/১৮৫-১৮৭)। শো‘আয়েব (আঃ)তখন নিরাশ হয়ে প্রথমে কওমকে বললেন, ﻗَﺪِﺍﻓْﺘَﺮَﻳْﻨَﺎ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﻛَﺬِﺑﺎً ﺇِﻥْ ﻋُﺪْﻧَﺎ ﻓِﻲ ﻣِﻠَّﺘِﻜُﻢ ﺑَﻌْﺪَ ﺇِﺫْ ﻧَﺠَّﺎﻧَﺎﺍﻟﻠﻪُ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﻭَﻣَﺎ ﻳَﻜُﻮﻥُ ﻟَﻨَﺎ ﺃَﻥْ ﻧَﻌُﻮﺩَ ﻓِﻴﻬَﺎ ﺇِﻻَّ ﺃَﻥ ﻳَّﺸَﺂﺀَ ﺍﻟﻠﻪُﺭَﺑُّﻨَﺎ ﻭَﺳِﻊَ ﺭَﺑُّﻨَﺎ ﻛُﻞَّ ﺷَﻲْﺀٍ ﻋِﻠْﻤﺎً ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﻠﻪِ ﺗَﻮَﻛَّﻠْﻨَﺎ ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ৮৯)-‘আমরা আল্লাহর উপরে মিথ্যারোপকারী হয়েযাব যদি আমরা তোমাদের ধর্মে ফিরে যাই। অথচআল্লাহ আমাদেরকে তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন।ঐ ধর্মে ফিরে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়,তবে যদি আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ সেটা চান।আমাদের পালনকর্তা স্বীয় জ্ঞান দ্বারা প্রত্যেকবস্ত্তকে বেষ্টন করে আছেন। (অতএব)আল্লাহর উপরেই আমরাভরসা করলাম।’অতঃপর তিনিআল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে বললেন, ﺭَﺑَّﻨَﺎ ﺍﻓْﺘَﺢْﺑَﻴْﻨَﻨَﺎ ﻭَﺑَﻴْﻦَ ﻗَﻮْﻣِﻨَﺎ ﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻭَﺃَﻧﺖَ ﺧَﻴْﺮُ ﺍﻟْﻔَﺎﺗِﺤِﻴﻦَ – ‘হেআমাদের পালনকর্তা! আমাদের ও আমাদেরকওমের মধ্যে তুমি যথার্থ ফায়ছালা করে দাও। আরতুমিই তো শ্রেষ্ঠ ফায়ছালাকারী’ (৮৯)। ‘তখন তারকওমের কাফের নেতারা বলল, ﻭَﻗَﺎﻝَ ﺍﻟْﻤَﻸُ ﺍﻟَّﺬِﻳﻦَﻛَﻔَﺮُﻭﺍ ﻣِﻦْ ﻗَﻮْﻣِﻪِ ﻟَﺌِﻦِ ﺍﺗَّﺒَﻌْﺘُﻢْ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﺇِﻧَّﻜُﻢْ ﺇِﺫﺍً ﻟَّﺨَﺎﺳِﺮُﻭﻥَ -যদি তোমরা শো‘আয়েবের অনুসরণ কর, তবেতোমরা নিশ্চিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে’ (আ‘রাফ৭/৮৯-৯০)।অতঃপর শো‘আয়েব (আঃ) স্বীয়কওমের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। এ বিষয়েআল্লাহ বলেন, ﻓَﺘَﻮَﻟَّﻰ ﻋَﻨْﻬُﻢْ ﻭَﻗَﺎﻝَ ﻳَﺎ ﻗَﻮْﻡِ ﻟَﻘَﺪْ ﺃَﺑْﻠَﻐْﺘُﻜُﻢْﺭِﺳَﺎﻻَﺕِ ﺭَﺑِّﻲ ﻭَﻧَﺼَﺤْﺖُ ﻟَﻜُﻢْ ﻓَﻜَﻴْﻒَ ﺁﺳَﻰ ﻋَﻠَﻰ ﻗَﻮْﻡٍﻛَﺎﻓِﺮِﻳﻦَ – ‏(ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ৯৩)-‘অনন্তর তিনি তাদের কাছথেকে প্রস্থান করলেন এবং বললেন, হে আমারসম্প্রদায়! আমি তোমাদেরকেআমার প্রতিপালকেরপয়গাম পৌছে দিয়েছি এবং তোমাদের উপদেশদিয়েছি। এখন আমি কাফেরদের জন্যআর কিভাবেসহানুভূতি দেখাব’ (আ‘রাফ ৭/৯৩)।শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ:হযরত শো‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর কওমেরনেতাদের মধ্যকার উপরোক্ত কথোপকথনেরমধ্যে নিম্নোক্ত শিক্ষণীয় বিষয়গুলি ফুটে ওঠে।যেমন:(১) শো‘আয়েব (আঃ) একটি সম্ভ্রান্তগোত্রের মর্যাদাবান ব্যক্তি ছিলেন। নবুঅতেরসম্পদ ছাড়াও তিনি দুনিয়াবী সম্পদে সমৃদ্ধিশালীছিলেন। বস্ত্ততঃ সকল নবীই স্ব স্ব যুগেরসম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং তারাউচ্চমর্যাদাশীল ব্যক্তি ছিলেন। (২) কওমেরনেতারা ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মীয় বিধি-বিধানমানতে প্রস্ত্তত থাকলেও বৈষয়িক জীবনেধর্মীয় বাধা-নিষেধ মানতেরাযী ছিল না (৩)আল্লাহকে স্বীকার করলেও তাদের মধ্যেঅসীলা পূজা ও মূর্তিপূজার শিরকের প্রাদুর্ভাবঘটেছিল (৪) বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসারসমপূজা ছেড়ে নির্ভেজাল তাওহীদের সংস্কারধর্মী দাওয়াত তারা কবুল করতে প্রস্ত্তত ছিল না (৫)মূলতঃ দুনিয়া পূজা ও প্রবৃত্তি পূজারকারণেই তারা শিরকীরেওয়াজ এবং বান্দার হক বিনষ্টকারী অপকর্মসমূহের উপরে যিদ ধরেছিল।(৬) প্রচলিত কোনঅন্যায় রসমের সঙ্গে আপোষ করে তা দূর করাসম্ভবনয়। বরং শত বাধা ও ক্ষতি স্বীকার করেহ’লেও স্রেফ আল্লাহর উপরে ভরসা করেআপোষহীনভাবে সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়াইপ্রকৃত সমাজ সংস্কারকের কর্তব্য (৭) সংস্কারককেসর্বদা স্পষ্ট দলীলের উপরে কায়েম থাকতেহবে (৮) তাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল ও প্রকৃতসমাজদরদী হ’তে হবে (৯) কোনরূপ দুনিয়াবীপ্রতিদানের আশাবাদী হওয়া চলবে না (১০) সকলব্যাপারে কেবল আল্লাহর তাওফীক কামনা করতেহবে এবং প্রতিদান কেবল তাঁর কাছেই চাইতে হবে(১১) শিরক-বিদ‘আত ও যুলুম অধ্যুষিত সমাজেতাওহীদের দাওয়াতের মাধ্যমে সংস্কার কার্যক্রমচালিয়ে যাওয়াকে দুনিয়াদার সমাজনেতারা ‘ফাসাদ’ ও‘ক্ষতিকর’ মনে করলেও মূলতঃ সেটাই হ’ল ‘ইছলাহ’বা সমাজ সংশোধনের কাজ। সকল বাধা উপেক্ষাকরেতাওহীদের দাওয়াত দিয়ে যাওয়াই হ’ল সংস্কারকেরমূল কর্তব্য (১২) চূড়ান্ত অবস্থায় আল্লাহর নিকটেইফায়ছালা চাইতে হবে।আহলে মাদইয়ানের উপরেআপতিত গযবের বিবরণ :হযরত শো‘আয়েব (আঃ)-এর শত উপদেশ উপেক্ষা করে যখন কওমেরনেতারা তাদের অন্যায় কর্মসমূহ চালিয়ে যাবারব্যাপারে অনড় রইল এবং নবীকে জনপদ থেকেবের করেদেবার ও হত্যা করার হুমকি দিল ওসর্বোপরি হঠকারিতা করে তারা আল্লাহর গযবপ্রত্যক্ষ করতে চাইল, তখন তিনি বিষয়টি আল্লাহরউপরে সোপর্দ করলেন এবং কওমেরনেতাদের বললেন, ﻭَﺍﺭْﺗَﻘِﺒُﻮْﺍ ﺇِﻧِّﻲ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﺭَﻗِﻴْﺐٌ ‘(ঠিকআছে), তোমরা এখন আযাবের অপেক্ষায় থাক।আমিও তোমাদের সাথে অপেক্ষায় রইলাম’ (হূদ১১/৯৩)।বলা বাহুল্য, আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় চিরন্তনবিধান অনুযায়ী শো‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর ঈমানদারসাথীগণকে উক্ত জনপদ হ’তে অন্যত্র নিরাপদেসরিয়ে নিলেন। অতঃপর জিবরীলের একগগণবিদারী নিনাদে অবাধ্য কওমের সকলেনিমেষে ধ্বংস হয়ে গেল। এ বিষয়ে আল্লাহবলেন, ﻭَﻟَﻤَّﺎ ﺟَﺎﺀَ ﺃَﻣْﺮُﻧَﺎ ﻧَﺠَّﻴْﻨَﺎ ﺷُﻌَﻴْﺒﺎً ﻭَﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺁﻣَﻨُﻮْﺍ ﻣَﻌَﻪُﺑِﺮَﺣْﻤَﺔٍ ﻣِّﻨَّﺎ ﻭَﺃَﺧَﺬَﺕِ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﻇَﻠَﻤُﻮْﺍ ﺍﻟﺼَّﻴْﺤَﺔُ ﻓَﺄَﺻْﺒَﺤُﻮْﺍ ﻓِﻲﺩِﻳَﺎﺭِﻫِﻢْ ﺟَﺎﺛِﻤِﻴْﻦَ- ﻛَﺄَﻥ ﻟَّﻢْ ﻳَﻐْﻨَﻮْﺍﻓِﻴﻬَﺎ ﺃَﻻَ ﺑُﻌْﺪﺍً ﻟِّﻤَﺪْﻳَﻦَ ﻛَﻤَﺎﺑَﻌِﺪَﺕْ ﺛَﻤُﻮْﺩُ- ‏(ﻫﻮﺩ ৯৪-৯৫)-‘অতঃপর যখন আমারআদেশ এসে গেল, তখন আমি শো‘আয়েব ওতার ঈমানদার সাথীদের নিজ অনুগ্রহে রক্ষা করলাম।আর পাপিষ্ঠদের উপর বিকট গর্জন আপতিত হ’ল।ফলে তারা নিজেদের ঘরে উপুড় হয়ে মরেপড়ে রইল’। ‘(তারা এমনভাবে নিশ্চিহ্ন হ’ল) যেন তারাকখনোই সেখানে বসবাস করেনি। সাবধান! ছামূদজাতির উপর অভিসম্পাতের ন্যায় মাদইয়ানবাসীরউপরেও অভিসম্পাত’ (হূদ ১১/৯৪-৯৫)। যদিও তারাদুনিয়াতে মযবুত ও নিরাপদ অট্টালিকায় বসবাস করত।আছহাবে মাদইয়ানের উপরে গযবের ব্যাপারেকুরআনে ﻇُﻠَّﺔٌ (শো‘আরা ১৮৯), ﺭَﺟْﻔَﺔٌ (হূদ ৯৪),ﺻَﻴْﺤَﺔٌ (আ‘রাফ ৮৮) তিন ধরনের শব্দ ব্যবহৃতহয়েছে। যার অর্থ মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, বিকট নিনাদ,ভূমিকম্প। আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন,আহলে মাদইয়ানের উপরে প্রথমে সাতদিন এমনভীষণ গরম চাপিয়ে দেওয়া হয় যে, তারা দহনজ্বালায় ছটফট করতে থাকে। অতঃপরআল্লাহ তা‘আলাএকটি ঘন কালো মেঘমালা পাঠিয়ে দিলেন, যার নীচদিয়ে শীতল বায়ু প্রবাহিত হচ্ছিল। তখন কওমেরলোকেরা ঊর্ধ্বশ্বাসে সেখানে দৌড়ে এল।এভাবে সবাই জমা হবার পর হঠাৎ ভূমিকম্প শুরু হ’ল এবংমেঘমালা হ’তে শুরু হল অগ্নিবৃষ্টি। তাতে মানুষ সবপোকা-মাকড়ের মত পুড়ে ছাই হ’তে লাগল। ইবনুআববাস (রাঃ) ওমুহাম্মাদ বিন কা‘ব আল-কুরাযী বলেন,অতঃপর তাদের উপর নেমে আসে এক বজ্রনিনাদ।যাতে সব মরে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল’।[7] এভাবেকোনরূপ গ্রেফতারী পরোয়ানা ও সিপাই-সান্ত্রীর প্রহরা ছাড়াই আল্লাহদ্রোহীরা সবাইপায়ে হেঁটে স্বেচ্ছায় বধ্যভূমিতে উপস্থিত হয়এবং চোখের পলকে সবাই নিস্তনাবুদ হয়ে যায়।মক্কা থেকে সিরিয়া যাওয়ার পথেএসব ধ্বংসস্থলনযরে পড়ে। আল্লাহ বলেন, ﻭَﻛَﻢْ ﺃَﻫْﻠَﻜْﻨَﺎ ﻣِﻦْ ﻗَﺮْﻳَﺔٍﺑَﻄِﺮَﺕْ ﻣَﻌِﻴْﺸَﺘَﻬَﺎ ﻓَﺘِﻠْﻚَ ﻣَﺴَﺎﻛِﻨُﻬُﻢْ ﻟَﻢْ ﺗُﺴْﻜَﻦ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِﻫِﻢْ ﺇِﻟَّﺎﻗَﻠِﻴْﻼً ﻭَﻛُﻨَّﺎ ﻧَﺤْﻦُ ﺍﻟْﻮَﺍﺭِﺛِﻴﻦَ ، ‘এসব জনপদ ধ্বংস হওয়ার পরপুনরায় আবাদ হয়নি অল্প কয়েকটি ব্যতীত।অবশেষে আমরাই এ সবের মালিক রয়েছি’ (ক্বাছাছ২৮/৫৮)। তিনি বলেন, ﺇِﻥَّ ﻓِﻲ ﺫَﻟِﻚَ ﻵﻳَﺎﺕٍ ﻟِّﻠْﻤُﺘَﻮَﺳِّﻤِﻴْﻦَ ،‘নিশ্চয়ই এর মধ্যে চিন্তাশীলদের জন্যনিদর্শনসমূহ রয়েছে’ (হিজর ১৫/৭৫)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)যখন এসব স্থান অতিক্রম করতেন, তখন আল্লাহরভয়ে ভীত হয়ে পড়তেন ও সওয়ারীকে দ্রুতহাঁকিয়ে নিয়ে স্থান অতিক্রম করতেন।[8] অথচএখনকার যুগের বস্ত্তবাদী লোকেরা এসবস্থানকে শিক্ষাস্থল না বানিয়ে পর্যটন কেন্দ্রেরনামে তামাশার স্থলে পরিণত করেছে। আল্লাহআমাদের সুপথ প্রদর্শন করুন- আমীন!ওয়াহাব বিনমুনাবিবহ বলেন, শু‘আয়েব (আঃ) ও তাঁর মুমিন সাথীগণমক্কায় চলে যান ও সেখানে মৃত্যুবরণ করেন। কা‘বাগৃহের পশ্চিম দিকে দারুন নাদওয়া ও দার বনু সাহ্মেরমধ্যবর্তী স্থানে তাদের কবর হয়’।[9] তবে এইসকল বর্ণনার ভিত্তি সুনিশ্চিত নয়। আর থাকলেওসেগুলি সবই এখন নিশ্চিহ্ন এবং সবই বায়তুল্লাহরচতুঃসীমার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ সর্বাধিক অবগত।[1]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৩।[2]. মু‘জামুলবুলদান, বৈরুত : দার ছাদের, ১৯৭৯), ৫/৭৭ পৃঃ, ।[3].আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৩।[4]. ইবনু কাছীর,আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/১৬৪ পৃঃ।[5]. যথাক্রমে সূরাআ‘রাফ ৭/৮৫-৯৩=৯; তওবাহ ৯/৭০; হূদ ১১/৮৪-৯৫=১২;হিজর ১৫/৭৮-৭৯; হজ্জ ২২/৪৪;শো‘আরা২৬/১৭৬-১৯১=১৬; ক্বাছাছ ২৮/২৩-২৮=৬; আনকাবূত২৯/৩৬-৩৭; ছোয়াদ ৩৮/১৩-১৫=৩; ক্বাফ ৫০/১৪।সর্বমোট = ৫৩টি।[6]. তাফসীরে কুরতুবী, হূদ৮৭।[7]. তাফসীর ইবনে কাছীর, শো‘আরা ১৮৯;কুরতুবী, ঐ।[8]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৫১২৫‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়, ‘যুলুম’ অনুচ্ছেদ।[9]. আল-বিদায়াহওয়ান নিহায়াহ ১/১৭৯।

Translate