Sunday, July 9, 2023

আযল কি এবং ইসলামী শরীয়তে আযল অথবা জন্মনিয়ন্ত্রণের বিধান কি

 ভূমিকা: আযল (العزل) শব্দের অর্থ হলো বিরত থাকা, আলাদা করা ইত্যাদি।যেমন আরবিতে বলা হয় –عَزَل الشَّيءَ عن غيره) সে একটি বস্তুকে অন্য বস্তু থেকে পৃথক করেছে। পরিভাষায়: আযল হল সহবাসের সময় পুরুষাঙ্গ স্ত্রীর গোপনাঙ্গের ভেতর থেকে বের করে নেওয়া যেন শুক্র স্ত্রী অঙ্গের ভেতরে স্খলিত হওয়ার পরিবর্তে বাইরে স্খলিত হয়। যার উদ্দেশ্য স্ত্রীকে গর্ভধারণ থেকে বিরত রাখা।অন্যভাবে বলা চলে আযল হলো জন্মনিয়ন্ত্রণের একটি ন্যাচারাল পদ্ধতি। যেখানে সহবাসের সময় স্বামীর বীর্য নির্গত হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসলে স্ত্রীর যৌনি থেকে লিঙ্গ বের করে নিয়ে আসা হয়।শারীরিক অসুস্থতা অথবা দুই সন্তানের মাঝে প্রয়োজনীয় ব্যবধান রাখার ক্ষেত্রে অস্থায়ীভাবে আযল করা শরী‘আতে বৈধ।আযল জন্ম নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কৌশল মাত্র। তবে বিশ্বাস রাখতে হবে যে,মহান আল্লাহ চাইলে আযল করার পরেও গর্ভে সন্তান আসতে পারে। কেননা হাদীসে এসেছে,জাবের (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, যখন কুরআন মাজিদ নাযিল হচ্ছিল তখন আমরা আযল করতাম। (সহীহ বুখারী, হা/৫২০৮; সহীহ মুসলিম, হা/১৪৪০; তিরমিযী, হা/১১৩৭; মিশকাত, হা/৩১৮৪)।

.
আবূ সা‘ঈদ আল খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, বানী মুসত্বালিক যুদ্ধে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে বের হলাম এবং এ যুদ্ধে আমরা অনেক ‘আরাবীয় নারী বন্দীনীরূপে করায়ত্ত করি। যেহেতু আমরা দীর্ঘদিন নারীবিহীন থাকায় অস্বস্থি বোধ করছিলাম, ফলে আমরা নারী সঙ্গমের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়লাম। কিন্তু আমরা ‘আযল করা পছন্দ করলাম এবং আমরা পরস্পরের মধ্যে ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ করে বললাম, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে সমুপস্থিত থাকতে তাঁকে জিজ্ঞেস না করে এরূপ করা কি ঠিক হবে? অতঃপর আমরা তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তোমরা ‘আযল করবে না এমনটি নয়, তবে কিয়ামত পর্যন্ত (সৃষ্টিজীব পৃথিবীতে) যা হওয়ার আছে, তা অবশ্যই সৃষ্টি হবে (বুখারী ৪১৩৮, মুসলিম ১৪৩৮, আবূ দাঊদ ২১৭২, আহমাদ ১১৬৪৭ মিশকাত, ৩১৮৬)।
.
অপর বর্ননায়, জনৈক ব্যক্তি রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম )-এর নিকট এসে বলল, আমার দাসীর সাথে আমি মিলিত হ’লেও তার গর্ভধারণ আমি পছন্দ করি না। তিনি বললেন, তুমি চাইলে আযল করতে পার, তবে আল্লাহ তা‘আলা যা তাক্বদীরে লিখেছেন তা হবেই (সহীহ মুসলিম হা/৩৬২৯; মিশকাত হা/৩১৮৫)।
.
উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন, ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এর দ্বারা প্রমাণিত যে, ‘আযল করা সত্ত্বেও গর্ভ সঞ্চার সম্ভব। তবে তা কিভাবে? এ প্রশ্নের উত্তরে ‘আলী (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, পূর্বের অবশিষ্ট শুক্রানু যা তার পুরুষাঙ্গে রক্ষিত ছিল তাই গর্ভে নির্গত হয়েছে এবং তার মাধ্যমেই ভ্রূণ সৃষ্টি হয়েছে। ফতোয়ায় কাযীখান-এ এরূপ একটি যুক্তিও উপস্থাপন করা হয়েছে যে, পুরুষ ‘আযল করে হয়তো নারীর যৌনাঙ্গের বাহিরে তার রেতপাত করেছে, তা হতে কিছু শুক্রানু তার গর্ভাশয়ে প্রবেশ করে ভ্রূণ সঞ্চারিত হয়েছে। (শারহে মুসলিম ৯/১০ম খন্ড, হাঃ ১৪৩৯; মিরকাতুল মাফাতীহ)।
.
ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন, সাহাবায়ে কেরামের মধ্য থেকে যারা আযল জায়েজ হওয়ার অভিমত দিয়েছেন, তাদের মধ্যে –ইবনু আব্বাস, ইবনু মাসউদ, জাবির, জায়েদ ইবনু সাবিত, সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস প্রমুখ রাদিয়াল্লাহু আনহুম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।’তাবেঈনদের মধ্যে– ইমাম মালিক, ইমাম শাফি আহলে কুফা (হানাফি ) ও সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলে আলিমের অভিমত। (ইমাম ইবনু কাইয়িম যাদুল মায়াদ ৫/১৪৫) ইবনুল হুমাম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনঃ অধিকাংশ ‘আলিমের নিকট ‘আযল জায়িয। পক্ষান্তরে সাহাবীদের একদল এবং তৎপরবর্তী এটাকে অপছন্দ করেছেন। তবে বিশুদ্ধ কথা হলো এটা জায়িয। (ফাতহুল কাদীর ৩য় খন্ড, পৃষ্ঠা: ২৭২)।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেন, নারী যদি এত বেশি সন্তান প্রসব করে যে, তার ফলে শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় অথবা সে গৃহস্থালির আবশ্যক কাজ-কর্ম সমূহ সুচারুরূপে আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয় না। আর সে এই গর্ভ সঞ্চারের বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট সময়ের মাঝে সীমাবদ্ধ করতে চায়, যেমন প্রতি দু’বছর পর একবার গর্ভধারণ, তবে স্বামীর অনুমতিক্রমে সে এটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এটা সাহাবায়ে কেরামের যুগে ‘আযল’ করার অনুরূপ। তারা ‘আযল’ করতেন কিন্তু সে সম্পর্কে আল্লাহ বা তাঁর রাসূল কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন নি।(উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব ১৯/০২ পৃষ্ঠা)।
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ড (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ) এবং সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের প্রবীণ সদস্য, যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, শাইখ আবদুল্লাহ ইবনে জিবরীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪৩০ হি./২০০৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আমি একজন নারী ডাক্তার। বর্তমানে ইন্টার্নি করছি। ছাত্রাবস্থায় আমি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি। কিন্তু এখনো সন্তান নিইনি। আমি আমার এ পড়াশুনার মাধ্যমে -ইনশাআল্লাহ- মুসলিম নারীদের সেবা করতে আগ্রহী। (ইন্টার্নিকালে) আমার কাজ হচ্ছে নারী-পুরুষের বিভিন্ন মেডিকেল টেস্ট করানো ও তাদেরকে চিকিৎসা দেয়া। এমতাবস্থায় আমি ও আমার স্বামী চাচ্ছি দেরীতে সন্তান নিতে; যাতে করে উঁচুমানের এ ইন্টার্নি শেষ করতে পারি (অর্থাৎ গ্রাজুয়েট হয়ে)। এ বিলম্ব শুধু পড়াশুনা করা পর্যন্ত। এটি কি জায়েজ হবে?
.
জবাবে শাইখ বলেন: যদি স্বামী-স্ত্রী সুনির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য বিশেষ কোন জন্ম নিরোধক ব্যবহারে একমত হন বা রাজি হন তাহলে এতে কোন আপত্তি নেই; এ অধিকার তাদের রয়েছে। যদিও সাধারণভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করাকে আমরা জায়েয মনে করি না। দলিল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “আমরা তাদেরকে ও তোমাদেরকে রিযিক দান করি।” যদি এমন গুরুত্বপূর্ণ কিছুর কারণে তারা দেরীতে সন্তান নিতে চান তাহলে এতে কোন বাধা নেই। আমি এ নারীকে নসীহত করব তিনি যেন পুরুষদের চিকিৎসা না করেন; যদি এ চিকিৎসা সতর এর সাথে সম্পৃক্ত হয় কিংবা অভ্যন্তরীণ কোন অঙ্গের সাথে সম্পৃক্ত হয় কিংবা এতে পুরুষকে স্পর্শ করা ও পুরুষের সতর খুলতে হয়। তবে যদি সামান্য কিছু হয় যেমন- চোখের চিকিৎসা বা কানের চিকিৎসা কিংবা দাঁতের চিকিৎসা সম্ভবত সেটা জায়েয হবে।(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৩০৩৯৫)।
.
জেনে রাখা ভাল যে,অধিক সন্তানের ভরণ-পোষণের ভয়ে ‘আযল’ করা নিষিদ্ধ এবং হারাম। কেননা আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা দরিদ্রতার ভয়ে সন্তানদেরকে হত্যা করো না। কেননা আমি যেমন তোমাদেরকে রূযী দেই, তেমনি তাদেরকেও রূযী দেব।’ (সূরা আন‘আম: ৬/১৫১)। অপর আয়াতে বলেন,আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা খাদ্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমি তাদেরকে এবং তোমাদেরকে জীবিকা প্রদান করে থাকি।’ (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩১)। তাছাড়া অধিক জনসংখ্যা আল্লাহর একটি নেয়ামত; এ নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা ও নিরংকুশভাবে তাঁর ইবাদত করা কর্তব্য। এ কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী শুয়াইব (আঃ) এর কথা উল্লেখ করেন যে, তিনি তাঁর কওমকে আল্লাহর কিছু নেয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে বলেন: “স্মরণ কর; যখন তোমরা সংখ্যায় কম ছিলে; তিনি তোমাদের সংখ্যা বৃদ্ধি করলেন।”[সূরা আরাফ, আয়াত: ৮৬] অধিক জনসংখ্যা উম্মতের মর্যাদা ও শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মাধ্যম। তাই তো আল্লাহ তাআলা বনী ঈসরাইলদের সম্পর্কে বলেন: “অতঃপর আমি তোমাদের জন্যে তাদের বিরুদ্ধে পালা ঘুরিয়ে দিলাম, তোমাদেরকে ধন-সম্পদ ও পুত্রসন্তান দ্বারা সাহায্য করলাম এবং তোমাদেরকে জনসংখ্যার দিক দিয়ে একটা বিরাট বাহিনীতে পরিণত করলাম।”[সূরা বনী ঈসরাইল, আয়াত: ৭]।
.
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা অধিক প্রেমানুরাগিণী, অধিক সন্তান জন্মদানকারিণী মহিলাকে বিয়ে করো। কারণ আমি ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করব।’ (আবুদাঊদ, হা/২০৫০; নাসাঈ, হা/৩২২৭; মিশকাত, হা/৩০৯১, সনদ সহীহ) অপর বর্ননায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা কুমারী রমণী বিয়ে কর, কেননা কুমারী রমণীর মুখের মধুময়তা বেশি, অধিক গর্ভধারণ যোগ্য এবং অল্পতুষ্টের অধিকারী।(ইবনু মাজাহ ১৮৬১, সহীহ আল জামি‘ ৪০৫৩)।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] কে প্রশ্ন: যিনি বলেন: এ যুগে মুসলমানদের দরিদ্রতা, দুর্বলতা ও পিছিয়ে থাকার কারণ হচ্ছে– অর্থনৈতিক অগ্রগতির তুলনায় জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ও অধিক জন্মহার। আপনাদের দৃষ্টিতে এ ব্যক্তির ব্যাপারে শরয়ি হুকুম কি এবং তার প্রতি আপনাদের নসীহত কি?

উত্তরে শাইখ বলেন, আমরা মনে করি, তার এ দৃষ্টিভঙ্গি ভুল। কারণ যার জন্য ইচ্ছা রিযিকের সমৃদ্ধিদানকারী ও সংকোচনকারী হচ্ছেন আল্লাহ তাআলা। অধিক জনসংখ্যা রিযিক সংকোচনের কারণ নয়। যেহেতু এ পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে সকলের রিযিকের ভার আল্লাহর উপরে। তবে, আল্লাহ তাআলা কোন হেকমতের কারণে রিযিক দেন এবং কোন হেকমতের কারণে রিযিক থেকে বঞ্ছিত করেন। যে ব্যক্তি এমন বিশ্বাস করে তার জন্য আমার নসীহত হচ্ছে- সে যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং এ বাতিল বিশ্বাস ত্যাগ করে। সে যেন জেনে রাখে, এ বিশ্বজগতের সদস্য যতই বৃদ্ধি পাক না কেন আল্লাহ চাইলে তাদের সকলের রিযিকে সমৃদ্ধি দিতে পারেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে বলেছেন,“যদি আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে রিযিকে সমৃদ্ধি দিতেন, তবে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত। কিন্তু তিনি যে পরিমাণ ইচ্ছা সে পরিমাণ নাযিল করেন। নিশ্চয় তিনি তাঁর বান্দা সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত ও সূক্ষ্মদর্শী।[সূরা শুরা, আয়াত: ২৭ উসাইমিন ফাতাওয়া উলামায়িল বালাদিল হারাম, পৃষ্ঠা- ১০৮৪ ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১১৯৯৯৫৫)।
.
ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] আরো বলেছেন, জন্ম-নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন দেয়া নিঃসন্দেহে এটি মুসলমানদের শত্রুদের চক্রান্ত। শত্রুরা চায় মুসলমানদের সংখ্যা না বাড়ুক। কারণ মুসলমানদের সংখ্যা বাড়লে শত্রুরা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবং মুসলমানেরা নিজেরা স্বয়ং সম্পূর্ণ হয়ে যেতে পারে: নিজেরা চাষাবাদ করবে, ব্যবসা বাণিজ্য করবে- এর মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটবে ও আরও নানামুখি কল্যাণ অর্জিত হবে। আর যদি তারা সংখ্যায় অল্প হয়ে থাকে তাহলে লাঞ্ছিত হয়ে থাকবে এবং সবকিছুতে অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবে।(ইসলাম সওয়াল জবাব ফাতাওয়া নং-১১৯৯৫৫)।
.
অতএব আযল পদ্ধতি অথবা বর্তমান যুগে আবিষ্কৃত জন্মনিয়ন্ত্রণের যত পদ্ধতি রয়েছে, সেগুলো শারীরিক অসুস্থতা অথবা দুই সন্তানের মাঝে প্রয়োজনীয় ব্যবধান রাখার উদ্দেশ্যে অস্থায়ীভাবে গ্রহণ করা জায়েয।যা উপরোক্ত আলোচনা থেকে প্রমানিত, কিন্তু স্থায়ীভাবে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা নিষিদ্ধ। মনে রাখতে হবে যে, ইসলামে অধিক সন্তান লাভে উৎসাহিত করা হয়েছে। তাছাড়া গবেষণায় একথাও প্রমাণিত, যে নারীর সন্তান যত বেশী, সে নারী তত সুখী ও স্বাস্থ্যবর্তী। সন্তান জন্ম দেওয়াই নারীর প্রকৃতি। আর এই প্রকৃতির উপর হস্তক্ষেপ করলে একদিকে যেমন নারীর স্বাস্থ্যের ক্ষতি হয়।তেমনি তার মন্দ প্রতিক্রিয়া হওয়াটাই স্বাভাবিক।(আল্লাহই অধিক জ্ঞানী)।
_____________________________
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ইচ্ছাপূর্বক মিথ্যা বলার নানাবিধ কারণ

 ইচ্ছাপূর্বক মিথ্যা বলার নানাবিধ কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে নেতৃত্বের লোভ একটি, বিস্তারিত জানতে পুড়ুন:

▬▬▬▬▬▬▬💠💠💠▬▬▬▬▬▬▬
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেছেন, ইচ্ছাপূর্বক মিথ্যা বলার নানাবিধ কারণ রয়েছে। তন্মধ্যে নেতৃত্বের লোভ একটি(মাজমূউ ফাতাওয়া খন্ড: ১৮ পৃষ্ঠা: ৪৬)।
.
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া আরো বলেছেন, মানুষের মনে অনেক বাসনাই সুপ্ত থাকে, যা সে বুঝতে পারে না। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মোহ অনেক মানুষের মনের মাঝে লুক্কায়িত তেমনি একটি সুপ্তবাসনা। লোকটা হয়ত খাঁটি মনে আল্লাহর ইবাদত করে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সমস্যাবলীই বা কী, আর দোষ-ত্রুটিই বা কোথায় তাও সে হয়ত জানত না। কিন্তু যেকোনভাবে তার সামনে ক্ষমতা লাভের কোন একটি সুযোগ এসে গেল অমনিই সে তা লুফে নিতে তৎপর হয়ে উঠল। অথচ তার মাঝে যে ক্ষমতার বাসনা ছিল তা সে এর আগ মুহূর্তেও বুঝে উঠতে পারেনি। পরিবেশ অনুকূল হওয়ায় সেই সুপ্ত বাসনা এখন জেগে উঠেছে। ক্ষমতার সিঁড়িতে এভাবে বহু মানুষই পা রেখেছে। এজন্যই ক্ষমতার এই মোহকে ‘সুপ্তবাসনা’ বলা হয়।(মাজমূউ ফাতাওয়া খন্ড: ১৬ পৃষ্ঠা: ৩৪৬)।
.
ইমাম ইবনু রজব আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৯৫ হি.] বলেছেন, ক্ষমতাবান ও প্রতিপত্তিশালীরা মানুষের মুখ থেকে প্রশংসা ও সুখ্যাতি শুনতে ভালবাসে। তারা জনগণের কাছে তা দাবীও করে। যারা তাদের প্রশংসা করে না তাদেরকে তারা নানাভাবে কষ্ট দেয়। অনেক সময় তারা একাজে এতটাই বাড়াবাড়ি করে বসে যে প্রশংসা থেকে নিন্দাই তাদের বেশী পাওনা হয়ে দাঁড়ায়। আবার কোন কোন সময় তারা তাদের দৃষ্টিতে ভাল কাজ করছে বলে যাহির করে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে তাদের মন্দ অভিপ্রায় কাজ করে। এভাবে মিথ্যাকে সত্যের আবরণে আচ্ছাদিত করতে পেরে তারা উৎফুল্ল হয় এবং লোকদের থেকে প্রশংসা লাভ ও তাদের মাঝে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ার আকাঙ্খা পোষণ করে। এমন লোকদের প্রসঙ্গেই আল্লাহ বলেন, যেসব লোকেরা তাদের মিথ্যাচারে খুশী হয় এবং তারা যা করেনি, এমন কাজে প্রশংসা পেতে চায়, তুমি ভাব না যে তারা শাস্তি থেকে বেঁচে যাবে। বস্ত্ততঃ তাদের জন্য রয়েছে মর্মান্তিক আযাব’ (আলে ইমরান ৩/১৮৮)। এ আয়াত এরূপ বিনাকাজে প্রশংসার জন্য লালায়িতদের জন্য অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ মানবকুল থেকে প্রশংসা তলব করা, প্রশংসা পেয়ে খুশি হওয়া এবং প্রশংসা না করার দরুন শাস্তি দেওয়া কেবলমাত্র লা শরীক আল্লাহর জন্যই মানায়। এজন্যই সৎপথপ্রাপ্ত ইমামগণ তাদের কাজ-কর্মের দরুন তাদের প্রশংসা করতে নিষেধ করতেন। মানুষের কোন কল্যাণ করার জন্য তাদের স্বত-স্ত্ততি করতে দিতেন না; বরং সেজন্য অংশীদার শূন্য এক আল্লাহর প্রশংসা করতে তারা বেশী বেশী উদ্বুদ্ধ করতেন। কেননা সকল প্রকার নে‘মত ও অনুগ্রহের মালিক তো তিনিই। খলীফা ওমর বিন আব্দুল আযীয এ ব্যাপারে খুবই সংযত ছিলেন। একবার তিনি হজ্জে আগত লোকদের পড়ে শোনানোর জন্য একটি পত্র প্রেরণ করেন। তাতে তিনি তাদের উপকার করতে আদেশ দেন এবং তাদের উপর যে যুলুম-নিপীড়ন জারী ছিল তা বন্ধ করতে বলেন। ঐ পত্রে এও ছিল যে, এসব কল্যাণ প্রাপ্তির দরুন তোমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কারো প্রশংসা কর না। কেননা তিনি যদি আমাকে আমার নিজের হাতে সোপর্দ করতেন তাহ’লে আমি অন্যদের মতই হ’তাম। তাঁর সঙ্গে সেই মহিলার ঘটনা তো সুপ্রসিদ্ধ, যে তার ইয়াতীম মেয়েদের জন্য খলীফার নিকট ভাতা বরাদ্দের আবেদন জানিয়েছিল। মহিলাটির চারটি মেয়ে ছিল। খলীফা তাদের দু’জনের ভাতা বরাদ্দ করেছিলেন। ঐ মহিলা আল্লাহর প্রশংসা করে। কিছুকাল পর তিনি তৃতীয়জনের জন্য ভাতা নির্ধারণ করেন। এবারও মহিলা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। তার শুকরিয়া প্রকাশের কথা জেনে খলীফা তাকে বলেন, আমরা তাদের জন্য ভাতা বরাদ্দ করতে পেরেছি। আপনার এভাবে প্রশংসার প্রকৃত হকদারের প্রশংসা করার জন্যেই। এখন আপনি ঐ তিনজনকে বলবেন, তারা যেন চতুর্থজনের প্রতি সহমর্মিতা দেখায়। তিনি এর দ্বারা বুঝাতে চেয়েছেন যে, রাষ্ট্রের নির্বাহী পদাধিকারী কেবলই আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়নে নিযুক্ত। তিনি আল্লাহর বান্দাদেরকে তাঁর আনুগত্যের হুকুমদাতা এবং তাঁর নিষিদ্ধ জিনিসগুলো থেকে নিষেধকারী মাত্র। আল্লাহর বান্দাদেরকে আল্লাহর দিকে আহবান জানানোর মাধ্যমে তিনি তাদের কল্যাণকামী। তার বিশেষ চাওয়া-পাওয়া যে, দ্বীন সর্বতোভাবে আল্লাহর জন্য হয়ে থাক এবং ইয্যত-সম্মান সব আল্লাহর হোক। তারপরও তার সদাই ভয় হ’ত যে, তিনি আল্লাহর হক আদায়ে কতইনা ত্রুটি করে ফেলছেন। (শারহু হাদীস মাযেবানে জায়ে‘আনে, পৃষ্ঠা: ৪১-৪৩)।
.
আল্লামা ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন, কোন লোক ক্ষমতা লাভ করলে তার অনেক সঙ্গী-সাথী ক্ষমতা লাভের আগে সে তাদের সাথে যেমন আচরণ করত, ক্ষমতা লাভের পরেও তার থেকে তেমন আচরণ প্রত্যাশা করে। কিন্তু তা না পাওয়ার দরুন তাদের মধ্যকার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক টুটে যায়। এটা ঐ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক প্রত্যাশী সঙ্গীর অজ্ঞতা। সে যেন একজন মাতাল সঙ্গী থেকে তার স্বাভাবিক সুস্থ অবস্থার সময়কালীন আচরণ কামনা করছে। এটা তো কখনো হবার নয়। কেননা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মাদকের মতই এক প্রকার নেশা, এমনকি তার থেকেও মারাত্মক। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা যদি নেশাকর না হ’ত তবে এই ক্ষমতার পূজারীরা কখনই চিরস্থায়ী পরকালের বদলে তা গ্রহণ করত না। সুতরাং তার নেশা চা-কফির নেশা থেকেও অনেক অনেক বেশী। আর চরম নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি থেকে সুস্থ-সবল মানুষের আচরণ লাভ অসম্ভব। তাই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর সৃষ্টির মহান ব্যক্তিত্ব মূসা (আঃ)-কে মিশরের কিবতী (কপটিক) সম্প্রদায়ের প্রধান নেতা ফেরা‘ঊনের সাথে বিনয়-নম্র ভাষায় সম্ভাষণ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন,فَقُوْلاَ لَهُ قَوْلاً لَيِّنًا لَعَلَّهُ يَتَذَكَّرُ أَوْ يَخْشَى ‘তোমরা দু’জন তাকে নরম ভাষায় বুঝাও। হ’তে পারে সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে’ (সূরা ত্বা-হা ২০/৪৪)। সুতরাং রাষ্ট্রনায়ক বা ক্ষমতাসীনদের সাথে বিনম্র বচনে কথা বলা শরী‘আত, বিবেক, প্রথা ইত্যাদি সবকিছুরই দাবী। কিন্তু অনেক সময় লোকে তা করে উঠতে পারে না বলে সমস্যা সৃষ্টি হয়।(বাদায়েউল ফাওয়ায়েদ খন্ড: ৩ পৃষ্ঠা: ৬৫২)।
.
ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) আরো বলেছেন,‘রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি লালসার ন্যূনতম ক্ষতি এই যে, তা আল্লাহর ভালবাসা ও যিকির থেকে মনকে অন্য দিকে সরিয়ে দেয়। আর যার ধন-সম্পদ, ক্ষমতালিপ্সা তাকে আল্লাহর যিকির থেকে বিমুখ করে দেয়, সে ক্ষতিগ্রস্তদের শ্রেণীভুক্ত। আর মন যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিল হয়ে পড়ে, তখন শয়তান সেখানে বাসা বাঁধে এবং যেদিকে খুশি তাকে পরিচালিত করে’।(উদ্দাতুছ ছাবিরীন, পৃষ্ঠা: ১৮৬) সংকলিত (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।

▬▬▬✿◈✿▬▬▬

উপস্থাপনায়:

জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

পুরপুরুষের উপস্থিতিতে মহিলাদের সালাত আদায় করার বিধান

 পুরপুরুষের উপস্থিতিতে মহিলাদের সালাত আদায় করার বিধান। (প্রসঙ্গ: সমুদ্র সৈকতে পরপুরুষের সামনে এক মহিলার সালাত আদায়ের ভাইর‍্যাল ভিডিও)

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
প্রশ্ন: ফেসবুকে একটা ভিডিও দেখলাম যে, একজন মহিলা সমুদ্র সৈকতে সালাত আদায় করছে। যেখানে দর্শনার্থী অনেক নারী-পুরুষের উপস্থিতি ছিল। উল্লেখ্য যে, তাকে বোরখা পরা অবস্থায় নয় বরং তিনি সালোয়ার-কামিজ পরিহিত ছিলেন। আমার প্রশ্ন হল, মহিলারা সালাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কায় এভাবে রাস্তার পাশে বা জনসম্মুখে সালাত আদায় করতে পারবে কী? অনেক মেয়েকে দেখছি, বর্তমানে রাস্তায় নেমে সালাত আদায় করতে চাচ্ছে। কারণ তাদের সালাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটা কতটুকু শরিয়ত সম্মত?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর:
প্রথমত: জানা দরকার যে, মহিলাদের জন্য নিজ বাড়িতে সালাত আদায় করা উত্তম। তবে মসজিদে যদি পড়ার সুযোগ থাকে তাহলে সেখানেও পড়া জায়েজ আছে। যেমন:

হাদিসে এসেছে, উম্মে হুমায়েদ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি ছিলেন আবু হুমায়েদ রা.-এর স্ত্রী। তিনি একদা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে আরজ করলেন, হে আল্লাহর রসূল, আমি আপনার সাথে মসজিদে নববীতে নামাজ পড়তে ভালবাসি।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন,

قَدْ عَلِمْتُ أَنَّكِ تُحِبِّينَ الصَّلَاةَ مَعِي، وَصَلَاتُكِ فِي بَيْتِكِ خَيْرٌ لَكِ مِنْ صَلَاتِكِ فِي حُجْرَتِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي حُجْرَتِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِكِ فِي دَارِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي دَارِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ، وَصَلَاتُكِ فِي مَسْجِدِ قَوْمِكِ خَيْرٌ مِنْ صَلَاتِكِ فِي مَسْجِدِي

“আমি জানি, তুমি আমার সাথে সালাত আদায় করতে ভালবাসো। কিন্তু তোমার জন্যে তোমার নিজের ক্ষুদ্র কক্ষে সালাত আদায় করা, বাড়িতে (প্রশস্ত ঘরের মধ্যে) সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম। আর বাড়িতে সালাত আদায় করা, বাড়ির উঠানে সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম। নিজ বাড়ির উঠানে সালাত আদায় করা মহল্লার মসজিদে সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম। আর মহল্লার মসজিদে সালাত আদায় করা আমার মসজিদে (মসজিদে নববীতে) সালাত আদায়ের চেয়ে উত্তম।’’ তারপর উম্মে হুমাইদ রা. এর কথামত তার জন্যে নিজ ঘরের ভিতরে অন্ধকার স্থানে সালাত আদায় করেছেন। [হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ ৬/৩৭১, ইবনে খুযায়মা ৩/৯৫, ইবনে হিব্বান ৪/২২-হাসান]

দ্বিতীয়ত: যদি কোনও বিশেষে পরিস্থিতিতে পরপুরুষের সামনে সালাত আদায়ের প্রয়োজন হয় তাহলে তা জায়েজ আছে। তবে যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে, লোক চক্ষুর আড়ালে গিয়ে সালাত আদায় করার। যেমন: কোন ঘর, ঝোপঝাড় বা গাড়ি ইত্যাদির আড়ালে। কমপক্ষে চেষ্টা করবে তুলনামূলক যেখানে লোকসমাগম কম সেখানে সালাত আদায় করার। কিন্তু এমন পরিস্থিতি না থাকলে পরপুরুষের সামনেই পূর্ণাঙ্গ পর্দা সহকারে সালাত আদায় করা যাবে। এ ক্ষেত্রে মুখমণ্ডল এবং হাত সহ পুরো শরীর ভালোভাবে ঢাকবে। এই অজুহাতে সালাত ছেড়ে দেওয়া বৈধ নয়।‌ কারণ ইসলামে সালাতের মর্যাদা অপরিসীম। শরিয়তের ওজর ব্যতিরেকে তা তার নির্দিষ্ট সময় অতিক্রম করে পড়া জায়েজ নাই।

আর মহিলাদের কর্তব্য হল, বাইরে যাওয়ার সময় বোরকা দ্বারা পুরো শরীর আবৃত করা। কিন্তু যদি কখনো বোরকা না থাকে এবং সালাতের সময় হয়ে যায় তাহলে সে যে পোশাকে আছে সে পোশাকেই সারা শরীর ভালোভাবে ঢেকে সালাত আদায় করবে।

❑ সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটির ফতোয়া:

প্রশ্ন: একজন মহিলা যদি তার কাছে পরপুরুষ থাকে-যেমন: মসজিদুল হারামে, একইভাবে যদি রাস্তায় মহিলাদের জন্য কোন মসজিদ না থাকে তাহলে সে কীভাবে নামাজ পড়বে?
তারা উত্তরে বলেছেন,
إن المرأة يجب عليها ستر جميع بدنها في الصلاة إلا الوجه والكفين لكن إذا صلت وبحضرتها رجال أجانب يرونها وجب عليها ستر جميع بدنها بما في ذلك الوجه والكفان
“একজন মহিলার জন্য তার মুখমণ্ডল ও হাতের কব্জি দ্বয় ব্যতীত নামাজে সমস্ত শরীর ঢাকা ওয়াজিব। তবে যদি সে পরপুরুষদের উপস্থিতিতে নামাজ পড়ে তবে তাকে কব্জি দ্বয় ও মুখমণ্ডলসহ সমস্ত শরীর ঢেকে রাখতে হবে।”
[সৌদি আরবের স্থায়ী কমিটির ফতোয়া কমিটি, ৭/৩৩৯] আল্লাহ আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে কবিতা চর্চার বিধান ও শর্তাবলী

 প্রশ্ন: ইসলামের দৃষ্টিতে কবিতা চর্চার বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: নিম্নে ইসলামের দৃষ্টিতে কবিতা চর্চার বিধান, প্রশংসনীয় কবিতা ও নিন্দনীয় কবিতা এবং কবিতা চর্চা বৈধ হওয়ার শর্তাবলী সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হল: وبالله التوفيق

মহাগ্রন্থ কুরআনে শুয়ারা (الشعراء) নামক একটি সূরা আছে। এর অর্থ: কবিগণ। এ সূরার ২২৭ ও ২২৮ নাম্বার আয়াতে মহান আল্লাহ কবিদের সম্পর্কে বলেন,
وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ ‎-‏ أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ ‎- إِلَّا الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا وَانتَصَرُوا مِن بَعْدِ مَا ظُلِمُوا
“বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে। তুমি কি দেখ না যে, তারা (কবিরা) প্রতি উপত্যকায় উদভ্রান্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায় এবং এমন কথা বলে, যা তারা করে না? তবে তাদের কথা ভিন্ন, যারা ইমান আনে, সৎকর্ম করে এবং আল্লাহ কে খুব স্মরণ করে এবং নিপীড়িত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে।” [সূরা শুয়ারা: ২২৭ ও ২২৮]

– ইবনে আব্বাস রা. এর ব্যাখ্যায় বলেন,
أكثر قولهم يكذبون فيه
“কবিরা তাদের অধিকাংশ কথাবার্তায় মিথ্যা বলে।” [তাফসিরে ইবনে কাসির]

– আল্লামা আব্দুর রাহমান বিন সাদি রহ. এই আয়াতের তাফসিরে বলেন,

أَلَمْ تَرَ ) غوايتهم وشدة ضلالهم ( أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ ) من أودية الشعر، ( يَهِيمُونَ ) فتارة في مدح, وتارة في قدح, وتارة في صدق، وتارة في كذب، وتارة يتغزلون, وأخرى يسخرون, ومرة يمرحون, وآونة يحزنون, فلا يستقر لهم قرار, ولا يثبتون على حال من الأحوال.

“(পথভ্রষ্ট ও সত্য চ্যুত কবিরা) কবিতার সব উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়। কখনো প্রশংসা, কখনো কুৎসা, কখনো সত্য, কখনো মিথ্যা, কখনো প্রেম-প্রণয়, কখনো তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, একবার আনন্দ-বিনোদন তো আরেকবার দুঃখ গাঁথা (এভাবে তারা সব উপত্যকায় উদভ্রান্তের মত উদ্দেশ্যহীণভাবে বিচরণ করে।) মোটকথা, তারা কোন একটি সিদ্ধান্তের উপর অবিচল থাকে না বা এক অবস্থার উপর উপর স্থির থাকে না।” [তাফসিরে বিন সাদি]

❑ কবিতা চর্চার কতিপয় শর্তবলী:

কবিদের কাব্যচর্চার এ ভাবের জগত থেকে এবং কল্পনা প্রবণতা থেকে দূরে রাখা আল্লাহ তাআলার উদ্দেশ্য নয়। তবে তারা যেন এ ভাবের জগতে বিচরণ করতে গিয়ে অসত্য, ভ্রান্ত ও বিপথগামিতার পথে না হাঁটে সে জন্য আল্লাহ তাআলা কবিতা রচনার জন্য উপরোক্ত আয়াতে কয়েকটি শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। যেমন:
◆ ১. কবিকে ইমানদার হতে হবে।
◆ ২. ঈমান আনার সঙ্গে সঙ্গে সৎকর্ম শীল হতে হবে। সে অন্যায় ও অসৎ কর্ম বর্জন করে সত্য ও সুন্দরের অনুসারী হবে।
◆ ৩. ভাব ও কল্পনা প্রবণতা এবং আবেগী বিচরণ যাতে তাকে সৎ পথ থেকে বিচ্যুত করতে না পারে সে জন্য আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করবে।
◆ ৪. আর যখনই মানবতা বিপন্ন হবে, নিপীড়িত, নির্যাতিত হবে তখনি কবি তার সর্ব শক্তি নিয়োগ করে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করবে। সত্য পন্থী কবিদের অন্যতম দায়িত্ব হল, সত্য, ন্যায় ও সভ্যতার স্বপক্ষে প্রতিবাদ বাণী উচ্চারণ করা।

❑ উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলামি শরিয়তে কাব্যচর্চার বিধান প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তাফসিরে ফাতহুল মাজিদে বলা হয়েছে:

পূর্বের আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট হয়ে গেল কবিতা ও কবি দু প্রকার। যথা:

✪ ১. যারা অশ্লীল-বেহায়া, অসত্য ও কাল্পনিক-অবাস্তব কথা বলে, মানুষের প্রশংসা ও নিন্দা করতে গিয়ে বাড়াবাড়ি করে কবিতা রচনা করে এবং আল্লাহ তাআলার স্মরণ, কুরআন ও জ্ঞানচর্চার ওপর প্রবল হয়ে যায় ও শরিয়ত বিরোধী বিষয়বস্তু সম্বলিত হয় তাহলে সে সব কবি ও কবিতা নিন্দনীয়, এরূপ কবি ও কবিতাকে আল্লাহ তাআলা নিন্দা করেছেন যেমন: সূরা শুয়ারা-এর ২২৭ ও ২২৮ নাম্বার আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। হাদিসে এসেছে,
আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সঙ্গে আরজ অঞ্চলে ভ্রমণ করছিলাম। সে সময় এক কবি কবিতা আবৃতি করতে করতে আসতে লাগল। তখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, শয়তানটাকে ধরো। অথবা (বর্ণনায় সংশয়, তিনি বললেন) শয়তানটাকে বাধা দাও। তারপর বললেন,
لأنْ يَمْتلِئَ جَوْفُ أحَدِكم قَيْحًا حتَّى يَرِيَه خيْرٌ له مِن أن يَمْتلِئَ شِعْرًا
“তোমাদের কারো পেট পুঁজ দ্বারা পূর্ণ করুক এটা তার জন্য উত্তম কবিতা দিয়ে পেট পূর্ণ করা থেকে।” [সহীহ বুখারী হা/৬১৫৪, সহীহ মুসলিম হা/ ২২৫৭]
– খলিফা উমর রা. এর গভর্নর আদী বিন নযলাকে অশ্লীল কবিতা বলার অপরাধে পদচ্যুত করেন।
– উমর বিন আব্দুল আজিজ একই কারণে আবুল আহওয়াসকে দেশান্তরিত করেন। [তাফসিরে কুরতুবি]

✪ ২. যে সব কবিতায় অসত্য, বেহায়া, অশ্লীল ও শরিয়ত গর্হিত কোন কথা নেই এবং আল্লাহ তাআলার জিকির, ইবাদত ও কুরআন থেকে গাফেল রাখে না বরং ঈমান ও আমলের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে, জি/হা/দের প্রতি প্রেরণা যোগায় তা ভালো ও প্রশংসনীয়। এরূপ কবি ও কবিতা উভয়কে আল্লাহ তাআলা ও রসূল প্রশংসা করেছেন। যেমন: সূরা শুয়ারা-এর ২২৭ নাম্বার আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

– রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ مِنَ الشِّعْرِ حِكْمَةً
“কিছু কবিতা রয়েছে প্রজ্ঞা পূর্ণ।” [সহীহ বুখারী, হা/ ৬১৪৫]
– তিনি আরও বলেন,
الشعرُ بمنزلةِ الكلامِ ، فحسَنُه كحسنِ الكلامِ ، و قبيحُه كقبيحِ الكلامِ
“কবিতা হল, কথার মত। ভালো কবিতা ভালো কথার মত আর খারাপ কবিতা খারাপ কথার মত।” [সিলসিলা সহীহাহ, হা/৪৪৭, সহিহুল জামে, হা/ ৩৭৩৩]

– রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একজন কবি ছিলেন যার নাম হাসসান বিন সাবেত রা.। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষে কাফিরদের কবিতার প্রত্যুত্তর দিতেন। মদিনায় দশ জন সাহাবি কবি ছিলেন। [তাফসিরে কুরতুবি]।

সুতরাং কবিদের সতর্ক হওয়া উচিত সে কী কবিতা বলছে। যদি ভাল হয় তাহলে তার পরিণাম ভালো আর মন্দ হলে তার মন্দ পরিণাম নিজের ওপর বর্তাবে।”
[শাইখ শহীদুল্লাহ খান মাদানি (হাফিযাহুল্লাহ) রচিত তাফসিরে ফাতহুল মাজিদ থেকে নেওয়া। সামান্য পরিমার্জিত ও সংযোজিত]

◈ আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবি হাসসান বিন সাবিত রা.-এর উদ্দেশ্যে দুআ করেছেন:

হাসসান ইবনে সাবিত রা. হতে বর্ণিত। তিনি বললেন, হে আবু হুরায়রা, আমি আপনাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করছি। আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে এ কথা বলতে শুনেছেন যে,

‏ يَا حَسَّانُ أَجِبْ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ أَيِّدْهُ بِرُوحِ الْقُدُسِ ‏

“ওহে হাসসান! তুমি আল্লাহর রাসূলের পক্ষ থেকে (মুশরিকদের) প্রত্যুত্তর দাও। হে আল্লাহ! তুমি জিবরিল আ.-এর মাধ্যমে তাকে সাহায্য কর।”?
আবু হুরাইরা রা. বললেন, হ্যাঁ।”
[সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়: ৭৮/ আচার-ব্যবহার, পরিচ্ছেদ: ৭৮/৯১. কবিতার মাধ্যমে মুশরিকদের নিন্দা করা।]

◈ কা/ফি/র-মু/শ/রি/কদের বিরুদ্ধে কবিতা আবৃতিকে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমর্থন করেছেন:
আনাস রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উমরাতুল কাযায় মক্কায় প্রবেশ করেন। আর তখন আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রা. এই কবিতা পাঠ করতে করতে তাঁর সামনে হাঁটছিলেন:

خَلُّوا بَنِي الْكُفَّارِ عَنْ سَبِيلِهِ
الْيَوْمَ نَضْرِبْكُمْ عَلَى تَنْزِيلِهِ
ضَرْبًا يُزِيلُ الْهَامَ عَنْ مَقِيلِهِ
وَيُذْهِلُ الْخَلِيلَ عَنْ خَلِيلِهِ

অর্থ: “হে কাফির সম্প্রদায়! তাঁর রাস্তা ছেড়ে দাও। তার প্রবেশে বাধা দিলে তোমাদেরকে আঘাত করবো। এমন আঘাত, যা মাথা স্থানচ্যুত করে দেবে এবং বন্ধুকে বন্ধুর কথা তুলিয়ে দেবে।”

তারপর তাকে উমর রা. বললেন, হে ইবনে রাওয়াহা! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে হারাম শরিফে তুমি কবিতা আবৃত্তি করছ! তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে ছেড়ে দাও। এই কবিতা কাফিরদের অন্তরে তীর নিক্ষেপের চেয়ে দ্রুত প্রভাব বিস্তারকারী।”

[সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ২৪/ হজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি, পরিচ্ছেদ: ১০৯. ইমামের সামনে দিয়ে হারামে কবিতা পাঠ করা ও হাঁটা-চলা করা]

❑ আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. বলেন,

هذا فيه تفصيل أيضًا، والشعر مثلما قال الشافعي رحمه الله: “حسنه حسن، وقبيحه قبيح”، فالشعر الذي ينصر الحقَّ ويُؤيد الحقَّ، ويهدم الباطل وأهل الباطل؛ هذا مطلوبٌ، هذا مشروعٌ، وهو الذي كان يقوم به حسان بن ثابت ، وعبدالله بن رواحة، وسعد بن مالك، وغيرهم من الشعراء الذين كانوا في عهده ﷺ وبعده.
أما إذا كان الشعر في ذمِّ الحق، ومدح الخنا والفساد، والدعوة إلى الزنا والفجور؛ فهذا منكرٌ محض لا يجوز.
فالشعر يختلف بحسب مقاصده ومراد صاحبه: فإن أراد الحقَّ والخير ومُقتضى شعره يدل على ذلك؛ فلا بأس في ذلك، ومن الدعوة إلى الخير، والدعوة إلى الحق، وإن كان شعره يدعو إلى الباطل والفساد؛ صار مذمومًا يجب منعه منه

“ইসলামে কবিতা চর্চা জায়েজ-নাজায়েজ হওয়ার বিষয়টিও ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। যেমনটি ইমাম শাফেয়ী রাহ. বলেছেন, “এর ভালোটি ভালো এবং খারাপটি খারাপ।”
সুতরাং যে কবিতা সত্য ও ন্যায়কে সাহায্য ও সমর্থন করে এবং বাতিল এবং বাতিল পন্থীদেরকে ধ্বংস করে সে কবিতা প্রত্যাশিত এবং তা শরিয়ত সম্মত। এ কাজটিই করেছেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর-যুগে হাসান বিন সাবিত রা., আবদুল্লাহ বিন রাওয়াহা রা., সাদ বিন মালিক রা. প্রমুখ যে সব কবিরা ছিলেন তারা।
কিন্তু কবিতা যদি সত্যের সমালোচনা করে, বিশ্বাসঘাতকতা, দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার প্রশংসা করে এবং ব্যভিচার ও পাপাচারের দিকে আহ্বান জানায় তাহলে তা হল, নিন্দনীয় ও নিকৃষ্ট কাজ-যা জায়েজ নয়।

মোটকথা, কবিতার উদ্দেশ্য এবং কবির অভিপ্রায় অনুসারে কবিতার বিধান ভিন্ন হয়। যদি তার উদ্দেশ্য হয় সত্য ও কল্যাণ এবং তার কবিতার মূল বক্তব্য সে দিকে ইঙ্গিত দেয়, কল্যাণ ও সত্যের দিকে আহ্বান করে তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু যদি কবিতা মিথ্যা, বিশৃঙ্খলা ও অন্যায়ের দিকে আহ্বান করে তাহলে তা হয়ে উঠে নিন্দনীয়- যা থেকে তাকে নিবৃত রাখা অপরিহার্য।” [binbaz]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ভাগে কুরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে তা একজন ব্যক্তি এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে

 প্রশ্ন: দু জন ব্যক্তি প্রত্যেকে সমপরিমাণ টাকা দিয়ে কুরবানির উদ্দেশ্যে একটি পশু ক্রয় করে নিজ নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি করতে চান। এ পদ্ধতি সঠিক কিনা মেহেরবানি করে জানাবেন।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: গরু বা উটে সর্বোচ্চ ৭ ভাগে কুরবানি দেওয়া জায়েজ। (ছাগল, দুম্বা, ভেড়া ইত্যাদিতে নয়)। তবে এর নিচে ২, ৩, ৪, ৫ বা ৬ ভাগে কুরবানি দেওয়া আরও উত্তমপন্থায় জায়েজ। এতে বাকি ভাগাগুলোর জন্য নফল হিসেবে কুরবানি দাতা সওয়াব পাবে ইনশাআল্লাহ। মুহাক্কিক আলেমগণ এমনটি বলেছেন।
তবে ভাগে কুরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি ভাগা একজন ব্যক্তি এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে কিনা সে বিষয় দ্বিমত থাকলেও সঠিক কথা হলো, যেহেতু পরিবারে প্রধান কর্তা ব্যক্তির উপর সামর্থ্য থাকলে কুরবানি দেওয়া কর্তব্য (সুন্নতে মুয়াক্কাদা মতান্তরে ওয়াজিব) সেহেতু সে নিজে একটা স্বতন্ত্র কুরবানি দিক বা উট/গরুতে এক ভাগায় অংশগ্রহণ করুক তা তার নিজের এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে। অর্থাৎ নিয়তের মধ্যে সবাইকে শরিক করলে আল্লাহ তায়ালা সবাইকে সওয়াব দান করবেন ইনশাআল্লাহ।

▪️এ বিষয়ে বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ আলেমদের কিছু ফতোয়া তুলে ধরা হলো:
🔸 ১. সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি বিশ্ব নন্দিত ফকিহ আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. বলেন,
قد دلت السنة الصحيحة عن النبي ﷺ أن الرأس الواحد من الإبل والبقر والغنم يجزئ عن الرجل وأهل بيته وإن كثروا، أما السبع من البدنة والبقرة، ففي إجزائه عن الرجل وأهل بيته تردد وخلاف بين أهل العلم، والأرجح أنه يجزئ عن الرجل وأهل بيته؛ لأن الرجل وأهل بيته كالشخص الواحد، ولكن الرأس من الغنم أفضل
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত বিশুদ্ধ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত যে, একটি উট, গরু বা ছাগল একজন ব্যক্তি ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে যদিও তাদের সংখ্যা অনেক হয়।
কিন্তু উট বা গরুর সাত ভাগের একভাগ একজন ব্যক্তি এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে কি না সে ব্যাপারে আহলুল ইলমদের মাঝে দ্বিমত থাকলেও অধিক অগ্রাধিকাযোগ্য কথা হল, তা একজন ব্যক্তি ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে। কারণ একজন মানুষ ও তার পরিবার একজন ব্যক্তির মতই। তবে একটি ছাগল কুরবানি করা অধিক উত্তম।”
🔸 ২. বিংশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও গবেষক আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রহ. বলেন,
فإذا كان الإنسان يضحي بالواحدة بالشاة الواحدة عنه وأهل بيته فإنه يضحي بالسبع عنه وعن أهل بيته لأن هذا تشريك في الثواب والتشريك في الثواب لا حصر له
“অতএব একজন মানুষ যেমন একটি ছাগল তার পক্ষ থেকে এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি দিতে পারে তেমনি (উট বা গরুতে) সাত ভাগের এক ভাগ তার পক্ষ থেকে এবং তার পরিবারের পক্ষ থেকে কুরবানি দিতে পারে। কেননা এখানে সওয়াবের মধ্যে অন্যদেরকে শরিক করা হচ্ছে। আর সওয়াবে শরিক করানোর কোন সীমা নির্ধারিত নয়।” [Source: alarhar]
🔸৩. সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড-এর ফতোয়া হল:
تجزئ البدنة والبقرة عن سبعة ، سواء كانوا من أهل بيت واحد أو من بيوت متفرقين ، وسواء كان بينهم قرابة أو لا ؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم أذن للصحابة في الاشتراك في البدنة والبقرة كل سبعة في واحدة ، ولم يفصل ذلك ” انتهى .
“فتاوى اللجنة الدائمة” (11/401)
“উট এবং গরুতে সাত ভাগে কুরবানি করা যথেষ্ট-চাই তারা সকলে এক বাড়ির হোক ও অথবা ভিন্ন ভিন্ন বাড়ির হোক। চাই তাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকুক অথবা না থাকুক। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে উট এবং গরুতে সাত ভাগে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি আর বিস্তারিত কিছু বলেননি।” [ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমাহ, ১১/৪০১]
الله اعلم بالصواب
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate