Saturday, June 3, 2023

মানুষকে শয়তান বা ইবলিশ বলার বিধান

 প্রশ্ন: অনেকে ছোট বাচ্চা দুষ্টুমি করলে তাকে বলে, শয়তানি কেন করছ? আবার অনেক সময় একজন আরেকজনকে শয়তান বা ইবলিশ বলে সম্বোধন করে। ইসলামের দৃষ্টিতে এটা কি ঠিক?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: শয়তানি করা মানে, দুর্বৃত্ততা, দুষ্টামি করা, ক্ষতি করা ইত্যাদি। কোন মানুষ যখন কারো সাথে দুর্বৃত্ততাপনা করে বা দুষ্টমি করে বা করো ক্ষতি সাধন করে তখন শয়তানি করা কথাটি বলা হয়। কিংবা এর অর্থ, শয়তানের কাজ করা বা শয়তানের মত কাজ করা।
تَشَيْطَنَ الوَلَدُ : قَامَ بِعَمَلِ الشَّيْطَانِ
সুতরাং এসব ক্ষেত্রে এই শব্দটি ব্যবহার করায় কোন দোষ নেই ইনশাআল্লাহ।
কেননা এখানে কাজটিকে শয়তানের কাজ বা দুর্বৃত্তপনা বলা হচ্ছে; ব্যক্তিকে নয়।
🔹 কোন ব্যক্তিকে কি শয়তান বা ইবলিশ বলা যাবে কি? শয়তান হল, কাফের, আল্লাহর দুশমন। তার প্রকৃত নাম হলো ইবলিশ।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এই বিতাড়িত ইবলিশ শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আমরা “আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম” (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি) বলার মাধ্যমে শয়তান থেকে মহান রবের কাছে আশ্রয় চাই।

সুতরাং কোন ইমানদারকে উদ্দেশ্য করে শয়তান বা ইবলিশ শব্দ ব্যবহার করা জায়েজ নাই।
তাছাড়া এটি নিকৃষ্ট গালাগালির শব্দ। আর মুসলিম কখনো নোংরা চরিত্রের গালিবাজ হতে পারে না।
– হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত।তিনি বলেন,
لَمْ يَكُنْ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ لَعَّانًا وَلاَ سَبَّابًا
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশালীন, লানতকারী (অভিসম্পাত কারী) ও গালিবাজ ছিলেন না।” [সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়: ৭৮/ আচার-ব্যবহার, পরিচ্ছেদ: ৭৮/৪৪. গালি ও অভিশাপ দেয়া নিষিদ্ধ]
– অন্য হাদিসে এসেছে,
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ وَقِتَالُهُ كُفْرٌ
“মুসলিমকে গালি দেওয়া গুনাহের কাজ এবং তার সাথে মারামারি করা কুফুরি।” [সহীহ মুসলিম (হাদীস একাডেমী), অধ্যায়: ১। ঈমান, পরিচ্ছেদ: ২৮. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণী: “মুসলিমদেরকে গালি-গালাজ করা গুনাহের কাজ এবং তাদের সাথে মারামারি করা কুফরি।”]

– আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাউযান (হাফিযাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয় যে, কখনো কখনো কিছু মানুষ অন্যকে উদ্দেশ্য করে মজার ছলে বলে থাকে ‘অমুক শয়তান’ বা ‘অমুক ইবলিশ’। এর বিধান কী?
তিনি বলেন,
هذا ما يجوز -هذا من الشتم والسب, أن يقال: فلان شيطان, فلان إبليس, او ما أشبه ذلك كلمات قبيحة لا يجوز, لا يجوز أن يقال: فلان فاسق, يا فاسق يا عدو الله فكيف يقال: فلان شيطان, أو فلان إبليس..للأسف! والعياذ بالله
“এটা জায়েজ নয়। ‘অমুক শয়তান, অমুক ইবলিশ’ বা এই জাতীয় শব্দগুলো কুৎসিত গালাগালির অন্তর্ভুক্ত। যা জায়েজ নয়। যেখানে কাউকে উদ্দেশ্য করে, অমুক ফাসেক, বা হে ফাসেক, হে‌ আল্লাহর দুশমন বলা জায়েজ নাই সেখানে কীভাবে “অমুক‌‌ শয়তান বা অমুক ইবলিশ” বলা জায়েজ হতে পারে? দুঃখজনক।আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি।”
[শাইখের অডিও প্রশ্নোত্তর থেকে অনূদিত]
মোটকথা, একজন আদর্শবান মুসলিম কখনোই অশ্লীল শব্দ ও কটু বাক্য মুখ দিয়ে উচ্চারণ করবে না। মজার ছলে হলেও। এটি উত্তম চরিত্রের পরিপন্থী। তাছাড়া, আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে, মানুষ মুখ দিয়ে যা কিছু উচ্চারণ করুক না কেন আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত অতন্দ্র প্রহরী লেখক ফেরেশতা সাথে সাথে তা তার আমলনামায় লিখে নেন।
সুতরাং ঝগড়াঝাটি হোক কিংবা মজার ছলে হোক কোন অবস্থাতেই গালাগালি করা বা কোন মুসলিমকে উদ্দেশ্য করে ইবলিশ, শয়তান ইত্যাদি বলা জায়েজ নেই। আল্লাহ তৌফিক দান করুন আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত এবং মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত কোনটি সঠিক

 প্রশ্ন: মানুষকে বলতে শোনা যায় যে, “মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত”। আবার এটাও শোনা যায় যে, “স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত।” এ দুটি কথার মধ্যে মূলত: কোন হাদিসটি সঠিক দয়া করে জানাবেন।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর:
💠 “স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত” এ কথাটা কোন হাদিস নয়। বরং বানোয়াট কথা। কিন্তু হাদিস হিসেবে আমাদের সমাজে প্রচলিত রয়েছেে!! তবে স্ত্রীর কাছে স্বামীর সম্মানের কথা হাদিসে এভাবে উল্লিখিত হয়েছে,
لَوْ كُنْتُ آمِرًا أَحَدًا أَنْ يَسْجُدَ لِغَيْرِ اللهِ لأَمَرْتُ الْمَرْأَةَ أَنْ تَسْجُدَ لِزَوْجِهَا وَالَّذِى
نَفْسُ مُحَمَّدٍ بِيَدِهِ لاَ تُؤَدِّى الْمَرْأَةُ حَقَّ رَبِّهَا حَتَّى تُؤَدِّىَ حَقَّ زَوْجِهَا وَلَوْ سَأَلَهَا نَفْسَهَا وَهِىَ عَلَى قَتَبٍ لَمْ تَمْنَعْهُ
“যদি আমি কাউকে নির্দেশ দিতাম আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে সিজদা করার, তাহ’লে স্ত্রীকে নির্দেশ দিতাম তার স্বামীকে সিজদা করার জন্য।” [ইবনে মাজাহ, হা/১৮৫৩; সহীহাহ, হা/১২০৩।]

– স্বামী জান্নাত অথবা জাহান্নাম:

হুসাইন বিন মিহসানের এক ফুফু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট কোন প্রয়োজনে এলেন এবং তা পূরণ হয়ে গেলে তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
– তোমার কি স্বামী আছে?
সে বলল, জী, হ্যাঁ।
– তিনি বললেন, তার কাছে তোমার অবস্থান কী?
সে বলল, ’যথাসাধ্য আমি তার সেবা করি।’
– তিনি বললেন, ’’খেয়াল করো, তার কাছে তোমার অবস্থান কোথায়। যেহেতু সে তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম।”

عَنِ الْحُصَيْنِ بْنِ مِحْصَنٍ أَنَّ عَمَّةً لَهُ أَتَتْ النَّبِيَّ ﷺ فِي حَاجَةٍ فَفَرَغَتْ مِنْ حَاجَتِهَا فَقَالَ لَهَا النَّبِيُّ ﷺ أَذَاتُ زَوْجٍ أَنْتِ قَالَتْ نَعَمْ قَالَ كَيْفَ أَنْتِ لَهُ قَالَتْ مَا آلُوهُ إِلَّا مَا عَجَزْتُ عَنْهُ قَالَ فَانْظُرِي أَيْنَ أَنْتِ مِنْهُ فَإِنَّمَا هُوَ جَنَّتُكِ وَنَارُكِ
[আহমদ, ১৯০০৩, নাসাঈ, হাকেম, বাইহাকি-সহিহ]

💠 “মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত” হুবহু এ শব্দে বর্ণিত হাদিসটি খুব দুর্বল মতান্তরে বানোয়াট। কিন্তু তার অর্থটি সঠিক-যেমনটি বর্ণিত হয়েছে নিম্নোক্ত হাদিস সমূহে:

🔰 মুআবিয়া ইবনে জাহিমা রা. হতে বর্ণিত। একদা আমার পিতা জাহিমা রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এসে বললেন,

يَا رَسُولَ اللهِ أَرَدْتُ الْغَزْوَ وَجِئْتُكَ أَسْتَشِيْرُكَ فَقَالَ هَلْ لَكَ مِنْ أُمٍّ قَالَ نَعَمْ فَقَالَ الْزَمْهَا فَإِنَّ الْجَنَّةَ عِنْدَ رِجْلِهَا

‘হে আল্লাহর রাসূল, আমি জিহাদে যেতে ইচ্ছুক। আমি আপনার নিকট পরামর্শ নিতে এসেছি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তোমার মা আছে কি? লোকটি বললেন, হ্যাঁ।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তুমি তার পদযুগল জড়িয়ে থাকো (অর্থাৎ তার সেবা করো), কেননা তাঁর পায়ের নিকটেই জান্নাত রয়েছে।” [আহমদ, নাসাঈ, মিশকাত হা/৪৯৩৯; সহীহুল জামে‘ হা/১২৪৯, সহীহু তারগীব ওয়াত তারহীব।]
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
فالزَمها فإنَّ الجنَّةَ تحتَ رِجلَيها
“তুমি তার পদযুগল জড়িয়ে থাকো (অর্থাৎ তার সেবা করো), কেননা তাঁর পায়ের নিচেই জান্নাত রয়েছে।” [সহিহ নাসাঈ, হা/৩১০৪]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাহিমা রা. তাকে জিজ্ঞাসা করলেন,
أَلكَ والِدَانِ . قُلْتُ : نَعَمْ . قال : الزَمْهُما ، فإنَّ الجنةَ تَحْتَ أَرْجُلِهما
“তোমার কি পিতামাতা আছে?”
আমি বললাম, হ্যাঁ।
তিনি বললেন, “তুমি তাদেরকে আঁকড়িয়ে থাকো। কারণ জান্নাত রয়েছে, তাদের পায়ের নিচে।” [সহিহ তারগিব, হাসান সহিহ, ২৪২৫]
এ বর্ণনায় পাওয়া গেলো, পিতামাতা উভয়ের পায়ের নিচেই জান্নাত রয়েছে।
🔰 আবু উমামা রা. হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খিদমতে হাজির হয়ে বললেন,
يَا رَسُولَ اللهِ مَا حَقُّ الْوَالِدَيْنِ عَلَى وَلَدِهِمَا قَالَ هُمَا جَنَّتُكَ وَنَارُكَ
“হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সন্তানের উপর পিতামাতার কি হক? তিনি বললেন, “তারা উভয় তোমার জান্নাত ও জাহান্নাম’। [ইবনে মাজাহ, মিশকাত হা/৪৭২৪।] অর্থাৎ মায়ের সেবা করা জান্নাতে যাওয়ার একটি মাধ্যম।

❌ ‘মায়ের পদতলে সন্তানের জান্নাত’ মর্মে নিন্মোক্ত শব্দে বর্ণিত দুটি হাদিস সহিহ নয়। যথা:
((الجنة تحت أقدام الأمهات)). وفي لفظ: ((الجنة تحت أقدام الأمهات، مَنْ شِئن أدخلن، ومَن شِئن أخرجن!))
ক. “বেহেশত রয়েছে মায়েদের পদতলে।”
খ. অন্য শব্দে “বেহেশত রয়েছে মায়েদের পদতলে। যাকে খুশি তারা জান্নাতে প্রবেশ করাবে আর যাকে খুশি বের করবে।”
এই শব্দে বর্ণিত হাদিস দুটি মুহাদ্দিসদের মতানুসারে জঈফ (দুর্বল) আর কারো মতে মউযু (বানোয়াট)। তবে ‘মায়ের পায়ের নিকট জান্নাত’ এর মর্মার্থটি পূর্বোল্লিখিত হাদিসদ্বয়ের আলোক সহিহ। আল্লাহু আলাম
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Wednesday, April 12, 2023

ফিতরা

 প্রশ্ন: ফিতরা কাকে বলে? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে কী দ্বারা এবং কী পরিমাণ ফিতরা দেওয়া হত?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ফিতরাকে শরিয়তে ‘যাকাতুল ফিতর এবং সাদাকাতুল ফিতর’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ ফিতরের যাকাত বা ফিতরের সদকা। ফিতর বা ফাতূর বলা হয় সেই আহারকে যা দ্বারা রোযাদার রোযা ভঙ্গ করে। [আল মুজাম আল ওয়াসীত/৬৯৪]
আর যাকাতুল ফিতর বলা হয় ঐ জরুরী দানকে যা, রোযাদারেরা ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অভাবীদের দিয়ে থাকে। [প্রাগুক্ত]
যেহেতু দীর্ঘ দিন রোযা অর্থাৎ পানাহার থেকে বিরত থাকার পর ইফতার বা আহার শুরু করা হয় সে কারণে এটাকে ফিতরের তথা আাহারের যাকাত বলা হয়। [ ফাতহুল বারী ৩/৪৬৩]

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে কি দ্বারা এবং কি পরিমাণ ফিতরা দেওয়া হত?

বুখারী শরীফে ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘‘আল্লাহর রাসূল যাকাতুল ফিতর স্বরূপ এক সা খেজুর কিংবা এক সা যব ফরয করেছেন মুসলিম দাস ও স্বাধীন, পুরুষ ও নারী এবং ছোট ও বড়র প্রতি। আর তা লোকদের নামাজে বের হওয়ার পূর্বে আদায় করে দিতে আদেশ করেছেন’’। [বুখারী, অধ্যায়: যাকাত হাদিস নম্বর, ১৫০৩/ মুসলিম নং ২২৭৫]
উক্ত হাদিসে দুটি খাদ্য দ্রব্যের নাম পাওয়া গেল যা, দ্বারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে ফিতরা দেওয়া হত। একটি হচ্ছে, খেজুর অপরটি জব। এবার নিম্নে আর একটি হাদিস পাঠ করুন।
আবু সাঈদ খুদরীরা. বলেন, “আমরা-নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে যাকাতুল ফিতর বের করতাম এক সা খাদ্য দ্রব্য কিংবা এক সা যব কিংবা এক সা খেজুর কিংবা এক সা পনীর কিংবা এক সা কিশমিশ।” [বুখারি- ১৫০৬ মুসলিম-২২৮১]
এই হাদিসে খেজুর ও জব ছাড়া আরও যে কয়েকটি বস্তুর নাম পাওয়া গেল তা হল: কিশমিশ, পনীর এবং খাদ্য দ্রব্য। উল্লেখ থাকে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বিগত হওয়ার পরে মুআবিয়া রা.- এর খেলাফতে অনেকে গম দ্বারাও ফিতরাদিতেন। [বুখারী- ১৫০৮ ও মুসলিম-২২৮১ ]
প্রমাণিত হল যে, নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগে যে সব দ্রব্যাদি দ্বারা ফিতরা দেওয়া হয়েছিল তা হল, খেজুর, জব, কিশমিশ, পনীর এবং খাদ্য দ্রব্য। এবং এটাও প্রমাণিত হল যে ফিতরার পরিমাণ ছিল এক সা’। যদি নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) খাদ্য দ্রব্য শব্দটি না বলতেন তো আমাদের প্রতি খেজুর, জব, কিশমিশ এবং পনীর দ্বারাই ফিতরা দেওয়া নির্ধারিত হত। কিন্তু আমাদের প্রতি আল্লাহর রহমত দেখুন এবং ইসলামের বিশ্বজনীনতা লক্ষ্য করুন যে খাদ্য দ্রব্য শব্দটি উল্লেখ হয়েছে বলেই উপরোল্লিখিত দ্রব্যাদি যাদের খাবার নয় তারাও নিজ খাবার দ্বারা ফিতরাআদায় করতে পারবেন। আর এখান থেকেই প্রশ্ন আসে যে, ধান দ্বারা ফিতরা দিতে হবে না চাল দ্বারা? দুটিই কি খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
লেখক: আব্দুর রাকীব (মাদানি)
দাঈ, দাওয়াহ সেন্টার খাফজী, সউদী আরব।
সম্পাদনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল। দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Monday, March 27, 2023

একই নামায দুইবার পড়া যায় কি?

 একই নামায দুইবার পড়া নিষিদ্ধ। মহানবী (সাঃ) বলেন, “একই নামাযকে একই দিনে দুইবার পড়ো না।” (আবূদাঊদ, সুনান ৫৭৯নং)

একদা তিনি এক সাহাবীকে ফজরের পরে নামায পড়তে দেখে বললেন, “এটি আবার কোন্‌ নামায? (ফজরের নামায কি দুইবার?)” (আহমাদ, মুসনাদ, আবূদাঊদ, সুনান ১২৬৭, তিরমিযী, সুনান, ইবনে মাজাহ্‌, সুনান ১১৫৪, ইবনে খুযাইমাহ্‌, সহীহ, ইবনে হিব্বান, সহীহ)

কিন্তু যদি কেউ কোন অসুবিধার কারণে বাসায় নামায পড়ে নিয়ে মসজিদে এসে দেখে যে, তখনও জামাআত চলছে, তাহলে জামাআতের ফযীলত পাওয়ার আশায়, এক জামাআতে (মসজিদে) নামায পড়ার পর দ্বিতীয় জামাআতে (মসজিদে) কোন কাজের খাতিরে গিয়ে জামাআত চলছে দেখলে অধিক সওয়াবের আশায়, ইমাম অত্যন্ত দেরী করে নামায পড়লে আওয়াল অক্তে নামায পড়ে নেওয়ার পর পুনরায় ঐ ইমামের জামাআতে এবং এ সকল ক্ষেত্রে নফলের নিয়তে ও বেনামাযী বা জামাআত ত্যাগী হওয়ার অপবাদ অপনোদন করার উদ্দেশ্যে একই নামায দ্বিতীয়বার পড়া উত্তম। অনুরুপ কোন সাধারণ মসজিদের ইমাম শ্রেষ্ঠতর মসজিদে (মাহাত্মপূর্ণ ৪ মসজিদের কোন একটিতে) নামায পড়ার পর নিজের মসজিদে ইমামতি করার জন্য, অথবা একাকী নামাযীকে জামাআতের সওয়াব অর্জন করাবার উদ্দেশ্যেও পড়ে নেওয়া নামায নফলের নিয়তে পুনরায় পড়া যায়।

একদা মসজিদে খাইফে তিনি ফজরের নামাযে সালাম ফিরে দেখলেন, মসজিদের এক প্রান্তে দুই ব্যক্তি জামাআতে নামায পড়েনি। কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘আমরা আমাদের বাসায় নামায পড়ে নিয়েছি।’ তিনি বললেন, “এমনটি আর করো না। বরং যখন তোমাদের কেউ নিজ বাসায় নামায পড়ে নেয়, অতঃপর (মসজিদে এসে) দেখে যে, ইমাম নামায পড়ে নি, তখন সে যেন (দ্বিতীয়বার) তাঁর সাথে নামায পড়ে। আর এ নামায তার জন্য নফল হবে।” (আবূদাঊদ, সুনান ৫৭৫, তিরমিযী, সুনান ২১৯, নাসাঈ, সুনান, মিশকাত ১১৫২, জামে ৬৬৭নং)

সাহাবী মিহ্‌জান (রাঃ) এক মজলিসে আল্লাহর রসূল (সাঃ)-এর সাথে বসেছিলেন। ইতিমধ্যে আযান (ইকামত) হলে আল্লাহর রসূল (সাঃ) উঠে গেলেন। তিনি নামায পড়ে এসে দেখলেন, মিহ্‌জান তাঁর সেই মজলিসেই বসে আছেন। আল্লাহর রসূল (সাঃ) তাঁকে বললেন, “লোকেদের সাথে নামায পড়তে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি মুসলিম নও?” মিহ্‌জান বললেন, ‘অবশ্যই, হে আল্লাহর রসূল! তবে আমি আমার ঘরে নামায পড়ে নিয়েছি।’ এ কথা শুনে আল্লাহর রসূল (সাঃ) তাঁকে বললেন, “তুমি নামায পড়ার পর যখন মসজিদে আস এবং নামাযের জামাআত শুরু হয়, তখন তুমিও লোকেদের সাথে নামায পড়ে নাও; যদিও তুমি পূর্বে সে নামায পড়ে নিয়ে থাক।” (মালেক, মুঅত্তা, নাসাঈ, সুনান, মিশকাত, সিলসিলাহ সহীহাহ, আলবানী ১৩৩৭নং)

একদা মহানবী (সাঃ) আবূ যার (রাঃ)-কে বললেন, “তোমার অবস্থা কি হবে, যখন এমন এমন আমীর হবে, যারা নামায মেরে ফেলবে অথবা যথাসময় থেকে দেরী করে পড়বে?” আবূ যার (রাঃ) বললেন, ‘আপনি আমাকে কি আদেশ করেন?’ তিনি বললেন, “তুমি যথাসময়ে নামায পড়ে নাও। অতঃপর যদি সেই নামায তাদের সাথে পাও, তাহলে তা আবার পড়ে নাও; এটা তোমার জন্য নফল হবে।” (মুসলিম, আবূদাঊদ, সুনান, মিশকাত ৬০০নং)

মুআয বিন জাবাল (রাঃ) মহানবী (সাঃ) এর সাথে তাঁর মসজিদে (নববীতে) নামায পড়তেন। অতঃপর নিজ গোত্রে ফিরে এসে ঐ নামাযেরই ইমামতি করতেন। (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ১১৫০ নং)

মহানবী (সাঃ) একদা এক ব্যক্তিকে একাকী নামায পড়তে দেখলে তিনি অন্যান্য সাহাবীদের উদ্দেশ্যে বললেন, “এমন কেউ কি নেই, যে এর সাথে নামায পড়ে একে (জামাআতের সওয়াব) দান করে?” এ কথা শুনে এক ব্যক্তি উঠে তার সাথে নামায পড়ল। (আবূদাঊদ, সুনান ৫৭৪, তিরমিযী, সুনান, মিশকাত ১১৪৬ নং) অথচ সে মহানবী (সাঃ) এর সাথে ঐ নামায পূর্বে পড়েছিল।

দুটি নামাযের মধ্যে কোন্‌ নামাযটি নফল হবে সে বিষয়ে হযরত আব্দুল্লাহ বিন উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞাসা করা হল যে, ‘উভয় নামাযের মধ্যে কোন্‌টি আমার (ফরয) নামায গণ্য করব?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘এ এখতিয়ার কি তোমার আছে? এ এখতিয়ার আছে একমাত্র আল্লাহ আয্‌যা জাল্লারই। তিনি উভয়ের মধ্যে যেটিকে ইচ্ছা ফরয রুপে গণ্য করবেন।’ (মালেক, মুঅত্তা, মিশকাত ১১৫৬নং) অবশ্য পূর্বোক্ত অনেক বর্ণনায় স্পষ্ট আছে যে, শেষের নামাযটাই নফল গণ্য হবে।

ইসলাম/ঈমান বিনষ্টকারী বিষয় সমুহ

 লেখক: মুহাম্মদ আব্দুর রব্ব আফ্ফান

সম্পাদনা: আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান

ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয় দশটি:

১। আল্লাহর ইবাদতে কোন কিছুকে শরীক করা:

আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ

“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করেন না, তা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” সূরা আন-নিসা: ৪৮
মৃত ব্যক্তির নিকট প্রার্থনা, ফরিয়াদ এবং মৃত ব্যক্তির নামে মানত ও জবেহ করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

২। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর মাঝে অন্যদেরকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে ও তাদের কাছে প্রার্থনা জানায়, তাদের নিকট সুপারিশ কামনা করে এবং তাদের উপর ভরসা করে, সে আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে কাফের।

৩। মুশরিকদেরকে অমুসলিম ও কাফের বলে বিশ্বাস না করা বা তাদের কুফরীতে সন্দেহ পোষণ করা অথবা তাদের ধর্মমতকে সঠিক বলে মন্তব্য করা।

৪। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত ত্বরীকার চেয়ে অন্য ত্বরীকা কে পরিপূর্ণ বলে বিশ্বাস করা অথবা নবীর আনীত বিধান থেকে অন্য বিধানই উত্তম বলে মনে করা। এরূপ আকীদা পোষন কারী ব্যক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে কাফের বলে বিবেচিত। যেমন কোন ব্যক্তি তাঁর আনীত বিধানের উপর তাগুতের (মানব রচিত) বিধানকে অগ্রাধিকার দিল, এবং কোরআন হাদীসের সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে বৈধ জ্ঞানকরে মানব রচিত বিধানে বিচার শাসন করল।

৫। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত কোন বিধানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা যদিও উক্ত বিধানের উপর আমল করা হয়। যদি কোন মুসলিম এরূপ করে তাহলে সে শরীয়তের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাফের বলে বিবেচিত হবে।

কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ

“এটি এ জন্য যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তারা তা অপছন্দ করে, সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্মসমূহকে নিষ্ফল করে দেবেন”। সূরা মুহাম্মাদ: ৯

৬। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত কোন সামান্য বিষয় অথবা এর সওয়াব প্রতিদান বা শাস্তির বিধানের প্রতি কোনরূপ ঠাট্টা বিদ্রুপ করা কুফরী।

কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُلْ أَبِاللَّهِ وَآَيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ﴿৬৫﴾ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ

“বল! তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রুপ করছিলে? তোমরা আর অজুহাত দাড় করো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছ।” সূরা আত-তাওবা: ৬৫-৬৬

৭। যাদু করা ও যাদুর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া, সুতরাং যে যাদু করল অথবা যাদুর প্রতি সন্তুষ্ট থাকল সে কুফরী করল।

কেননা আল্লাহ তাআল বলেন:
وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ

“তারা কাউকে (যাদু) শিক্ষা দিত না এ কথা না বলে যে, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ; সুতরাং তুমি কুফরী কর না।” সূরা আল-বাকারা : ১০২

৮। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাবত: অমুসলিম তথা ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুশরিক প্রমূখদের সাহায্য করা।

কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ

“তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই একজন হবে, নিশ্চয় আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না”। সূরা আল-মায়িদাহ: ৫১

৯। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, কিছু লোক আছেন যাদের জন্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়ত থেকে বের হয়ে যাওয়ার অনুমতি আছে। এরূপ বিশ্বাস পোষন কারী ব্যক্তি শরীয়তের বিবেচনায় কাফের বলে বিবেচিত হবে।

কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ

“কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন বা ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনও কবুল হবে না এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত”। সূরা আলে ইমরান: ৮৫

১০। আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীন, ইসলামকে উপেক্ষা করে চলা। এর বিধি বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন ও সে অনুযায়ী আমল না করা।

কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِّرَ بِآَيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنْتَقِمُونَ

“যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী দ্বারা উপদিষ্ট হয়ে তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে? আমি অবশ্যই অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে থাকি”। সূরা আস সিজদা: ২২

উল্লেখিত ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয় সমূহে স্বেচ্ছায় জড়িত হওয়া আর ঠাট্টা-বিদ্রুপ কিংবা ভয়ভীতির করণে জড়িত হওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অবশ্য কেহ জোরপূর্বক বাধ্য করলে অন্য কথা। ক্ষতির দিক থেকে আলোচিত কারণগুলোর প্রত্যেকটিই খুবই ভয়াবহ ও মারাত্মক। আর বিষয়গুলো অনেক মুসলিমের জীবনে অহ-রহ সংঘটিত হয়ে থাকে। অতএব প্রতিটি মুসলমানের উচিত এ বিষয়গুলো থেকে নিজেকে দূরে রাখা ও সতর্ক থাকা।

Translate