Wednesday, February 22, 2023

যার নাম টান সমিতি: ইসলামি বিধান

 প্রশ্ন: আমাদের এলাকায় কিছু মহিলা প্রতি সপ্তাহে একটি খেলা খেলে। খেলাটি হল, ধরুন দশ জন মহিলা ১০০ টাকা করে জমা দিবে। তাহলে সপ্তাহে জমা হবে, ১০০০ টাকা। এই টাকাটা প্রতি সপ্তাহে লটারির মাধ্যমে একজন মহিলা পাবে। অর্থাৎ যার নাম উঠবে সে পাবে। এভাবে প্রতি সপ্তাহে একজন করে মহিলা কমবে। এই লটারির দায়িত্বটা একজনের কাছে থাকবে। সে প্রত্যেকের নাম আলাদা আলাদা কাগজে মুড়িয়ে লটারি করবে। যে এ দায়িত্ব পালন করবে তাকে কিছু (৩০/৪০) টাকা দেওয়া হয়। এখন প্রশ্ন হল, এই খেলাটি কি জায়েজ আছে? হাদিসে তো লটারি নিষেধ আছে। এটা কি সে পর্যায়ে যাবে?

উত্তর: এতে কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ। এটা নিষিদ্ধ লটারির অন্তর্ভুক্ত নয়। কারণ এখানে তারা প্রত্যেকেই সমান টাকা জমা দিবে এবং প্রত্যেকেই তার জমা কৃত পূর্ণ টাকা ফেরত পাবে। কেউ কম-বেশি পাবে না বা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কিন্তু সপ্তাহান্তে জমা কৃত টাকা গুলো একসাথে নেওয়ার ক্ষেত্রে কে আগে নিবে-এটা নির্ধারণের জন্য লটারি করা হয়। এটা দোষের কিছু নয়। এই ধরণের সমিতি অনেক জায়গায় ‘টান সমিতি’ নামে পরিচিত।
মূলত: ইসলামে ওই লটারি হারাম যেটা জুয়া। যেখানে অংশ গ্রহণকারীরা সবাই টাকা জমা দিবে কিন্তু কয়েকজন ব্যক্তি লাভবান হবে আর বাকিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখানে যে ব্যক্তি লটারি ও টাকা ভাগ-বাটোয়ারার বিষয়টি পরিচালনা করে তাকে যে টাকাটা দেওয়া হয় তাতে কোনও আপত্তি নেই। এটা তার পারিশ্রমিক।

■ সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়:
প্রশ্ন: আমরা দশ জনের একদল মানুষ প্রতি মাসে পঁচিশ দিনার প্রদানের মাধ্যমে একটি সমবায় সমিতিতে অংশগ্রহণ করি। এ পরিমাণ দিনার প্রতিমাসে সবাই জমা দিবে কিন্তু পালা অনুযায়ী একজন করে (জমা কৃত সম্পূর্ণ দিনার) গ্রহণ করবে। এভাবে (পালাক্রমে) প্রতি মাসে সবাই তা গ্রহণ করে। এর হুকুম কী? এটা কি জায়েজ? আল্লাহ আপনাকে প্রতিদান দান করুন। আমিন।
উত্তর:
الجواب: ما فيه بأس، إذا تعاونوا لا بأس بهذا المبلغ أو بأكثر أو بأقل، إذا تعاونوا عن سماح نفوسهم فلا بأس بهذا. نعم، هذا من باب التعاون على الخير. نعم.
“এতে দোষের কিছু নেই। তারা সবাই পারস্পারিক সহযোগিতার ভিত্তিতে এ কাজ করলে কোনও দোষ নেই। চাই (তাদের অর্থের পরিমাণ) কম হোক বা বেশি হোক। তারা যদি উদার মনে এভাবে পারস্পারিক সহযোগিতা করে তাতে কোনও সমস্যা নেই। হ্যাঁ, এটি কল্যাণকর কাজে পারস্পারিক সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। জি।

➧ সতর্কতা: এ জাতীয় সমিতির অন্যতম একটা সমস্যা হল, সদস্যদের মধ্যে যে ইতোমধ্যে টাকা পেয়ে গেছে সে অন্যান্য মাসে টাকা জমা না দিয়ে আত্মগোপন করতে পারে অথবা টাকা জমার ক্ষেত্রে গড়িমসি করতে পারে। তাই এতে পরিচিত ও বিশ্বস্ত ছাড়া অন্য কাউকে যুক্ত করা উচিত নয়। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

স্ত্রী, পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের সাথে সুন্দর আচরণ এবং একটি প্রসিদ্ধ হাদিসের ভুল অর্থ ও ব্যাখ্যা

 নিম্নোক্ত হাদিসটি আমাদের সমাজে যথেষ্ট পরিচিত: প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي
“তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সবচেয়ে ভালো যে তার পরিবারের নিকট সবচেয়ে ভালো আর আমি তোমাদের মধ্যে আমার পরিবারের নিকট সবচেয়ে ভালো।” [ইবনে মাজহ: হাদিস নং ১৯৭৭, তিরমিযী: হাদিস নং ৩৮৯৫, শায়েখ আলবানিসহ অনেক মুহাদ্দিস এটিকে সহিহ বলেছেন। সহিহ লিগাইরিহি, সহিহ তিরমিযি, হা/৩৮৯৬]

উপরোক্ত হাদিসটি আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিচিত। কিন্তু অধিকাংশ মানুষের কাছে তার ভুল অর্থ প্রচলিত। আর তা হল, উক্ত হাদিসকে কেবল স্ত্রীর সাথে খাস করা।‌ অর্থাৎ এভাবে অর্থ করা যে, “তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ওই ব্যক্তি যে তার স্ত্রীর কাছে ভালো…।” (অধিকাংশ অনুবাদক এমনটি অর্থ করেছেন) কিন্তু তা সঠিক নয়। বরং ‘আহল‌’ শব্দের সঠিক অর্থ হলো, ‘পরিবার’ (শুধু স্ত্রী নয়)। আর স্ত্রী, মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি, ভাই-বোন ইত্যাদি সকলেই পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। কিছু আলেমের মতে, রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজন বা নিকটাত্মীয়গণও এর মধ্যে শামিল।

🔸নিম্নে উক্ত হাদিসের ব্যাপারে বিজ্ঞ আলেমদের ব্যাখ্যা পেশ করা হলো:

◾সুনানে তিরমিজির অনবদ্য ব্যাখ্যা গ্রন্থ তুহফাতুল আহওয়াজিতে এই হাদিসের ব্যাখায় বলা হয়েছে,
لعياله، وذوي رحمه
“(সবচেয়ে উত্তম হলো সে ব্যক্তি যে), তার পরিবার-পরিজন এবং রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনের নিকট ভালো।”
কেউ কেউ বলেন,
لأزواجه وأقاربه
“স্ত্রী ও নিকাটাত্মীয়গণের নিকট ভালো। কারণ এ হাদিসটি সুন্দর আচরণের অর্থ বহন করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণভাবে সকল মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন এবং সবচেয়ে সুন্দর আচরণের অধিকারী ছিলেন। তিনি ছিলেন, মহান চরিত্রের উপরে প্রতিষ্ঠিত।” [তুহফাতুল আহওয়াজি]

◾সৌদি আরবের গ্র্যান্ড মুফতি বিশ্ব নন্দিত আলেমে দীন শায়েখ আব্দুল্লাহ বিন বায রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,
أهله: زوجته، وأمه، وأبوه، وأولاده، كلهم أهله، يعني: يحسن إليهم، وينفق عليهم، أفضل من الأجانب، والبعيدين.
“আহল অর্থ: স্ত্রী, মা, বাবা ও সন্তান-সন্ততি। এরা সবাই পরিবারভূক্ত। হাদিসটির অর্থ হল, যে ব্যক্তি এদের প্রতি দয়াসুলভ আচরণ করে এবং তাদের জন্য অর্থ খরচ করে সে উত্তম অনাত্মীয় এবং দূরবর্তী লোকদের থেকে।” [binbaz]

◾বর্তমান শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আল্লামা শাইখ মুহম্মদ বিন সালিহ আল উসাইমিন রহ. বলেন,
فإذا كان فيك خير؛ فاجعله عند أقرب الناس لك وليكن أول المستفيدين من هذا الخير
“অতএব যদি তোমার মধ্যে ভালো কিছু থাকে তাহলে তা তোমার কাছের মানুষদেরকে দাও। এই কল্যাণ থেকে তারাই সর্বপ্রথম উপকৃত হোক।”

◾তিনি আরো বলেন,

ومن فوائد هذا الحديث: أنه ينبغي للإنسان أن يقتدي برسول الله صلى الله عليه وسلم في هذا، بحيث يكون مع أهله لينًا هيّنا أليفا لا يبعد عنهم ولا يطيل البعد

“এই হাদিসের অন্যতম একটি শিক্ষা হলো, একজন ব্যক্তির উচিত, আল্লাহর রসূলের আদর্শ অনুসরণ করা, যাতে সে তার পরিবারের সাথে নম্র, সহজ-সরল এবং বন্ধুত্বপূর্ণ হতে পারেন। যে তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকবে না বা দীর্ঘ সময় দূরে থাকবে না।” [শারহে বুলুগুল মারাম-alathar]

মোটকথা, আমাদের সুন্দরতম আচার-আচরণ তথা হাসিমুখে কথা বলা, বদান্যতা, মানুষের অশোভন আচরণে ধৈর্য ধারণ করা, কাউকে কষ্ট না দেওয়া ইত্যাদি উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আচার-আচরণের যত বিষয় রয়েছে সেগুলোর সবচেয়ে বেশি হকদার নিজের স্ত্রী, মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি এবং বিশেষ করে রক্ত সম্পর্কীয় বা নিকটাত্মীয়গণ। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে, আমাদের সমাজে দেখা যায় তার উল্টো চিত্র। অনেক মানুষ বাইরের লোকদের সাথে খুবই নম্র, ভদ্র, সভ্য ও শালিন আচরণ করে কিন্তু নিজের স্ত্রী-পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের সাথে তার সম্পর্ক ও আচরণ খুব নিম্ন পর্যায়ের। এমনটি হওয়া উচিত নয়।‌ বরং হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে ভালো মানুষ তারাই যারা তাদের স্ত্রী, পরিবার, সন্তান-সন্ততি ও আত্মীয়-স্বজনের সাথে সুন্দরতম আচরণ করে। আর সবচেয়ে পূর্ণাঙ্গ ঈমানের অধিকারী সে ব্যক্তি যার আচার-আচরণ সবচেয়ে সুন্দর এবং এই সুন্দর আচরণের অধিকারীরাই কিয়ামতের দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সন্নিকটে অবস্থান করবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমাদের স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, মা,‌ বাবা, ভাই, বোন রক্তের সম্পর্কীয় নিকটাত্মীয়, সর্বোপরি সকল মানুষের সাথে সুন্দরতম আচরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

সচেতনতা মূলক পোস্ট: তর্ক-বিতর্ক ও ঝগড়া-ঝাটি করা পথভ্রষ্টতার কারণ

 বর্তমানে মুসলমানদের মাঝে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, মাসআলা-মাসায়েল নিয়ে তর্ক-বিতর্ক ও মতভেদ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এক পক্ষ অপর পক্ষকে ভয়ানক আক্রমণাত্মক ভাষায় আঘাত করছে। চলছে গালাগালি আর হিংসার উদগীড়ন। একে অপরকে কুরুচিপূর্ণ শব্দ প্রয়োগে ধোলাই করছেন। সব চেয়ে ভাবনার বিষয় হচ্ছে, একেবারে সাধারণ মানুষও ইলম ছাড়াই আলেমদের সাথে বিতর্ক জড়িয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে তারা ভদ্রতার সীমা অতিক্রম করে বক্তব্য দিচ্ছেন। এ পরিস্থিতি কোনভাবেই মুসলিম উম্মাহর জন্য কল্যাণকর নয়। বরং তা গোমরাহির আলামত ও ভ্রষ্টতার পূর্বাভাষ। তাই আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া (তাও শর্ত সাপেক্ষ) নিজেদের মাঝে বিতর্ক পরিহার করা প্রয়োজন।

কারণ আবু উমারা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَا ضَلَّ قَوْمٌ بَعْدَ هُدًى كَانُوا عَلَيْهِ إِلَّا أُوتُوا الْجَدَلَ ثُمَّ تَلَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَذِهِ الْآيَةَ ((مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ
“কোন জাতি হেদায়েতের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার পরে গোমরাহ হয় না যতক্ষণ না তারা তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়। অত:পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াতটি পাঠ করলেন:
مَا ضَرَبُوهُ لَكَ إِلَّا جَدَلًا – بَلْ هُمْ قَوْمٌ خَصِمُونَ
“তারা আপনার সামনে যে উদাহরণ উপস্থাপন করে তা কেবল বিতর্কের জন্যেই করে। বস্তুত: তারা হল এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়।” [তিরমিযি হা/৩১৭৬, ইবনে মাজাহ হা/৪৭, সহীহ তারগীব- হাসান, আলবানি]
সত্য জানার পরেও শুধু প্রতিপক্ষের উপর বিজয়ী হওয়ার উদ্দেশ্যে অথবা ব্যক্তি, দল, মত, বংশ ইত্যাদির স্বার্থে অন্যায় জেনেও তার সমর্থনে তর্ক-বিতর্ক গোমরাহির একটি কারণ।ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, “শরিয়তে ঐ তর্ককে তিরস্কার করা হয়েছে যা ইলম ছাড়া অন্যায়ভাবে করা হয়। অথবা সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও করা হয়। সুতরাং এখান থেকে বুঝা যায়, ঝগড়া-ঝাটি ও অন্যায় বিতর্ক গোমরাহির আলামত। পক্ষান্তরে বিতর্কের উদ্দেশ্য যদি হয়, সত্যকে সমর্থন করা বা অন্যায় কে অন্যায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা তবে তা কখনো ফরজে আইন; কখনো ফরজে কেফায়াহ। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ – وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ- إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَن ضَلَّ عَن سَبِيلِهِ
“ডাক তোমার রবের পথে প্রজ্ঞা এবং সুন্দর উপদেশ বাণীর মাধ্যমে আর তাদের সাথে বিতর্ক কর সুন্দরতম পন্থায়। নিশ্চয় তোমার রব সব চেয়ে বেশি জানেন, কে তার পথে থেকে বিচ্যুত হয়েছে।” [সূরা নাহল: ১২৫]
উক্ত আয়াতে দাওয়াতের দুটি চমৎকার মূলনীতি বলা হয়েছে। যথা:
🔹 এক. হেকমত তথা কুরআন-সুন্নাহর দলিল দ্বারা দাওয়াত দেয়া।
🔹 দুই. সুন্দর উপদেশ বাণী অর্থাৎ কুরআন-সুন্নাহয় যে সকল উৎসাহ ব্যঞ্জক, সতর্ক বাণী, জান্নাতের নেয়ামতরাজি ও জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর মাধ্যমে দাওয়াত দেওয়া।
অনুরূপভাবে এখানে বিতর্ক করার একটি চমৎকার মূলনীতিও বলা হয়েছে। তা হল: যদি বিতর্কের প্রয়োজন হয় তবে সুন্দরতম পন্থায় তথা নম্রতা, ভদ্রতা, শালীনতা, প্রমাণ উপস্থাপন, ইলম (শরিয়তের জ্ঞান) এবং যৌক্তিক বক্তব্য পেশের মাধ্যমে বিতর্ক করতে হবে। গালাগালি ও চিৎকার-চেঁচামেচি করা হলে বিতর্কের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে। বিতর্কের উদ্দেশ্য মানুষকে হেদায়েত করা; প্রতিপক্ষের উপর বিজয় প্রমাণ করা নয়। (তাফসিরে ইবনে কাসির ও তাফসীরে ইবনে সাদি থেকে সংক্ষেপায়িত)
আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করুন। আমীন।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদি আরব।

নাস্তিকের জন্য বদদুআ করার বিধান

 প্রশ্ন: একজন নাস্তিক আল্লাহর রাসূল সহ অনেক মুসলিমকে গালাগালি দিচ্ছে এবং নানাভাবে অনেক কষ্ট দিচ্ছে। এতে আমিও কষ্ট পাচ্ছি।‌ আমি কি তার জন্য বদদুআ করতে পারবো?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধাচারণ বা তাকে কটুক্তি করা নতুন কোন বিষয় নয়। তাঁর জীবদ্দশায় তাকে কাফের-মুশরিক ও মুনাফিকদের পক্ষ থেকে এ সবের মুখোমুখি হতে হয়েছে। আর তাতে মুসলিমগণ কষ্টপাবেন তা স্বাভাবিক। এটি ঈমানের আলামত। সাধারণভাবে কাফের-মুশরিক, নাস্তিক ও ফাসেক লোকদের প্রতি বদদুআ বা লানতের দুআ করা যাবে। এটি ওলামাদের সর্বসম্মত মত। তবে ব্যক্তি বিশেষকে নির্দিষ্ট করে লানত করা বা তার জন্য বদদুআ যাবে কি না তা দ্বিমতপূর্ণ। সঠিক কথা হল, ব্যক্তি বিশেষকে নির্দিষ্ট করে বদদুআ করা যাবে না। কেননা, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নির্দিষ্ট কতিপয় ব্যক্তির নাম ধরে ধরে লানত করেছিলেন তখন কুরআনে আয়াত নাজিলের মাধ্যমে তাকে নিষেধ করা হয়েছে এই আয়াত দ্বারা:

لَيْسَ لَكَ مِنَ الْأَمْرِ شَيْءٌ أَوْ يَتُوبَ عَلَيْهِمْ أَوْ يُعَذِّبَهُمْ فَإِنَّهُمْ ظَالِمُونَ

“হয় আল্লাহ তাদের ক্ষমা করবেন কিংবা তাদেরকে আযাব দেবেন। এ ব্যাপারে আপনার কোন করণীয় নাই। কারণ তারা রয়েছে অন্যায়ের উপর।” [সূরা আলে ইমরান: ১২৮]
উল্লেখ্য যে, ওহুদ যুদ্ধের সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ান, হারিস ইবনে হিশাম ও সাফওয়ান ইবনে উমাইয়া প্রমূখ কাফেরদের লিডারদের নাম ধরে ধরেে লানত করেছিলেন। তখন এই আয়াত নাজিলের মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিষেধ করা হয়। [দ্র: তাফসীরুল কাবীর/মাফাতিহুল গায়ব] আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

বাবা-মা যদি ভুল ধারণার উপরে ভিত্তি করে বা অন্যায় ভাবে সন্তানের উপর বদদুআ করেন তাহলে কি সন্তান এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে

 প্রশ্ন: অনিচ্ছা বশত আমার‌ দ্বারা একটি ভুল কাজ ঘটে গেছে। কিন্তু আম্মা মনে করেছেন, আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে এ কাজ করেছি। যার কারণে তিনি আমাকে বদদুআ করেন এবং বলেন, যেন আমার আশায় ছাই পড়ে। এখন আমি কি তার বদদুআর শিকার হব এবং দুআ করলেও আমার কোনও আশা পূরণ হবে না?

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: নিম্নে চারটি পয়েন্টে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
🔸প্রথমত: বাবা-মার বদদুআ সন্তানের জন্য বিপদজনক। তাই সন্তানের কর্তব্য, পিতা-মাতাকে খুশি রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা। আর পিতা-মাতার কর্তব্য হলো, সন্তানের জন্য কখনো বদদুআ না করা।‌ কেননা হাদিসে‌ এ ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। যেমন:
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لَا تَدْعُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ وَلَا تَدْعُوا عَلَى أَوْلَادِكُمْ وَلَا تَدْعُوا عَلَى خَدَمِكُمْ وَلَا تَدْعُوا عَلَى أَمْوَالِكُمْ، لَا تُوَافِقُوا مِنَ اللهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى سَاعَةَ نَيْلٍ فِيهَا عَطَاءٌ فَيَسْتَجِيبَ لَكُمْ ‏”‏ ‏
“তোমরা নিজেদের উপর বদদুআ করো না, তোমাদের সন্তানদের উপর বদদুআ করো না, তোমাদের খাদেমদের (সেবক বা কাজের মানুষদের) উপর বদদুআ করো না এবং তোমাদের ধন-সম্পদের উপর উপর বদদুআ করো না। কেননা হতে পারে, মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুগ্রহ প্রাপ্তির সময়ের সাথে (দুয়া কবুলের সময়ের সাথে) তোমাদের মিল হয়ে যাবে ফলে তিনি‌ তোমাদের (বদদুআও) কবুল করে নিবেন।” [মুসলিম, অধ্যায়: যুহুদ]

🔸 দ্বিতীয়ত: বান্দার অনিচ্ছাকৃত ভুল স্বয়ং আল্লাহও ক্ষমা করে দিয়েছেন। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ عَنْ أُمَّتِي الْخَطَأَ وَالنِّسْيَانَ وَمَا اسْتُكْرِهُوا عَلَيْه».
‘নিশ্চয় আল্লাহ আমার উম্মতের অনিচ্ছা বশত: এবং ভুলে যাওয়ার কারণে ঘটে যাওয়া গুনাহ এবং জোর জবরদস্তি মূলক কৃত গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।” [আবু দাউদ, হা/৭২১৯-সহিহ]
সুতরাং আমাদেরও উচিত, মানুষের অনিচ্ছা বশত: ঘটে যাওয়া ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দেওয়া। এটি নিঃসন্দেহে উন্নত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।

🔸 তৃতীয়ত: যদি কোনও ব্যক্তির আচার-আচরণ, চরিত্র ও কার্যক্রম অধিকাংশই ভালো ও সন্তোষজনক হয় তাহলে তার দ্বারা হঠাৎ কোনও অন্যায় কর্ম ঘটে গেলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিৎ। হাদিসে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। অবশ্য ইসলামি আইনে‌ দণ্ডবিধি প্রযোজ্য হয় এমন অপরাধ হলে‌ ভিন্ন কথা। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
أقيلوا ذَوي الهيئاتِ عثَراتِهم إلا الحدودَ
“তোমরা সম্মানিত ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী লোকদের হঠাৎ ঘটে যাওয়া ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে দাও দণ্ড যোগ্য অপরাধ ব্যতীত।” [আবু দাউদ, ৪৩৭৫, আহমদ, ২৫৪৭৪, সহীহাহ্ ৬৩৮, সহীহ আল জামি‘ ১১৮৫]

🔸চতুর্থত: মা অথবা বাবা যদি সন্তানের ‘অনিচ্ছাকৃত’ ঘটে যাওয়া কোনও ভুলকে ‘ইচ্ছাকৃত’ মনে করে বদ দুআ করে তাহলে তা আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। কারণ এই বদদুআ যথার্থ হয়নি। কুরআন-হাদিসে মানুষের প্রতি কু ধারণা করতে নিষেধ করা হয়েছে। কিন্তু তিনি সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে ধারণার উপরে ভিত্তি করে সন্তানকে বদদুআ দিয়েছে। এ কারণে তার দুআ আল্লাহর দরবারে প্রত্যাখ্যাত তো হবেই বরং এতে তিনি গুনাহগার বলে গণ্য হবেন। কারণ, ইসলামে সন্তান-সন্ততির উপরে বদদুআ করাই নিষিদ্ধ। তারপরে আবার যদি দুআর মধ্যে গুনাহের বিষয় থাকে তা আল্লাহ কবুল করবেন না। (সুস্পষ্ট প্রমাণ ব্যতিরেকে শুধু ভুল ধারণার উপরে ভিত্তি করে বদদুআ করা নিঃসন্দেহে জুলুম, সীমালঙ্ঘন এবং গুনাহ)।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّهُۥ لَا یُحِبُّ ٱلۡمُعۡتَدِینَ
“নিশ্চয় তিনি (মহান আল্লাহ) সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে পছন্দ করেন না।” [সুরা আরাফ: ৫৫]
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
ما من مسلم يدعو بدعوة، ليس فيها إثم ولا قطيعة رحم إلا أعطاه الله بـها إحدى ثلاث : إما أن يعجل له دعوته، وإما أن يدخرها له في الآخرة وإما أن يصرف عنه من السوء مثلها. قالوا : إذا نكثر قال : الله أكثر
“যখন কোনও মুমিন ব্যক্তি দুআ করে, যে দুআতে কোনও গুনাহ থাকে না এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় থাকে না, তখন আল্লাহ তিন পদ্ধতির কোনও এক পদ্ধতিতে তার দুআ অবশ্যই কবুল করে নেন। যে দুআ সে করেছে হুবহু সেভাবে তা কবুল করেন অথবা তার দুআর প্রতিদান আখিরাতের জন্য সংরক্ষণ করেন কিংবা এ দুআর মাধ্যমে তার অনাগত কোনও বিপদ-মুসিবত তিনি দূর করে দেন। এ কথা শুনে সাহাবিগণ বললেন, আমরা তাহলে অধিক পরিমাণে‌ (দুআ) করব। তিনি বললেন, “আল্লাহ আরও অধিক দাতা” [বুখারি: আদাবুল মুফরাদ ও আহমদ, সহীহ-আলবানি]

তবে আপনার কর্তব্য, আপনার মাকে শান্তভাবে‌ যুক্তি-প্রমাণের আলোকে অনিচ্ছা বশত: ভুল হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বোঝানোর চেষ্টা করা যেন আপনার ব্যাপারে তার ভুল ধারণা ভেঙ্গে যায় এবং তিনি নিজের অবস্থান থেকে ফিরে আসেন। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate