Thursday, June 16, 2022

সহবাসের সময় আজান হলে কী করণীয়?

 প্রশ্ন: সহবাসের সময় আজান হলে কী করণীয়?

উত্তর:
স্ত্রী সহবাসের সময় আজান শুনলে স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করবে। তবে এ সময় মুখে উচ্চারণ করে আজানের জবাব দেয়া সমীচীন নয়।
ইমাম নওবি রহ. বলেন,
ويكره للقاعد على قضاء الحاجة أن يذكر الله تعالى بشيء من الاذكار فلا يسبح ولا يهلل ولا يرد السلام ولا يشمت العاطس ولا يحمد الله تعالى اذا عطس ولا يقول مثل ما يقول المؤذن. قالوا وكذلك لا يأتي بشيء من هذه الأذكار في حال الجماع، وإذا عطس في هذه الاحوال يحمد الله تعالى في نفسه ولا يحرك به لسانه. وهذا الذي ذكرناه من كراهة الذكر في حال البول والجماع هو كراهة تنزيه لا تحريم فلا إثم على فاعله. انتهى.
“প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য বসা অবস্থায় সময় কোনও প্রকার আল্লাহর জিকর-আজকার করা মাকরুহ (অ পছন্দনীয়)। সুতরাং এ সময় মুখে উচ্চারণ করে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (ইত্যাদি জিকির-আজকার) পাঠ করা, সালামের জবাব দেয়া, হাঁচির জবাব দেয়া, হাঁচি দিলে আল হামদুলিল্লাহ পাঠ করা এবং মুয়াজ্জিনের আজানের জবাব দেয়া যাবে না। এ অবস্থায় হাঁচি দিলে মনে মনে আল হামদুলিল্লাহ পাঠ করবে। জিহ্বা নাড়িয়ে উচ্চারণ করবে না।
উল্লেখিত বিষয়গুলো পেশাব-পায়খানা এবং স্ত্রী সহবাস রত অবস্থায় করা মাকরুহ তানযিহি; তাহরিমি নয়। সুতরাং কেউ তা করলেও গুনাহ হবে না।” (শরহে মুসলিম)
তবে রমজান মাসে ফজরের পূর্বে স্ত্রী সহবাস করার পর ফজরের আজান শুনার সাথে সাথে সহবাস থেকে বিরত হওয়া আবশ্যক। এর পরে সহবাস অব্যাহত রাখা জায়েজ নেই। অন্যথায় উক্ত রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং এ কারণে তওবা-ইস্তিগফারের পাশাপাশি কাফফারাও দিতে হবে।
তবে নফল রোজার ক্ষেত্রে স্ত্রী সহবাস বন্ধ করা আবশ্যক নয়। এ ক্ষেত্রে তা অব্যাহত রাখলে উক্ত রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে সম্ভব হলে তা পরবর্তীতে কাজা করে নেয়া উত্তম। এতে কোনও কাফফারা নেই।

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

কবর জিয়ারত করতে গিয়ে দু হাত উত্তোলন করে দুআ করার বিধান

 প্রশ্ন: কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কি দু হাত উত্তোলন করে দুআ করার বিধান কি?

উত্তর:
হ্যাঁ, কবর জিয়ারতে গিয়ে একাকী হাত তুলে দুআ করা জায়েজ আছে। কারণ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
فَأَطَالَ الْقِيَامَ ثُمَّ رَفَعَ يَدَيْهِ ثَلاَثَ مَرَّاتٍ
“তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেখানে (মদিনার বাকি গোরস্থানে) দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকলেন। অতঃপর তিনি তিনবার হাত উঠিয়ে দু’আ করলেন।” [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ১২। জানাজা, পরিচ্ছেদ: ৩৫. কবরে প্রবেশের সময় কী বলবে এবং কবর বাসীর জন্য দুআ প্রসঙ্গে]

◈ ইমাম নওবী রাহ. এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,
فيه : استحباب إطالة الدعاء وتكريره ، ورفع اليدين فيه . وفيه : أن دعاء القائم أكمل من دعاء الجالس في القبور
“এ হাদিস যে সব বিষয় রয়েছে সেগুলোর মধ্যে:
● ১. দুআ লম্বা করা, তা বারবার করা এবং তাতে দু হাত উত্তোলন করা মুস্তাহাব।
● ২. আরও রয়েছে, কবরে বসে থাকা ব্যক্তির দুআর চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির দুআ অধিক উত্তম। [শরহে মুসলিম]

◈ শাইখ বিন বায রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়, মৃতের কবরে হাত তুলে দুআ করার বিধান কী?
তিনি উত্তরে বলেন,

إن رفع يديه فلا بأس؛ لما ثبت عن النبي ﷺ في حديث عائشة رضي الله عنها: أنه ﷺ زار القبور ورفع يديه ودعا لأهلها رواه مسلم

“যদি হাত উত্তোলন করে তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নেই। কারণ আয়েশা রা. কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে, তিনি কবর জিয়ারত করতে গিয়ে কবরবাসীদের জন্য দু হাত উত্তোলন করে দুআ করেছেন।” (সহিহ মুসলিম)।
তবে কবর জিয়ারত করতে গিয়ে অথবা দাফন করার পরপর মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে সম্মিলিত দুআ করা শরিয়ত সম্মত নয়। বরং প্রত্যেকে নিজে নিজে দুআ করবে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন,
الدعاء الجماعي عند القبر ليس له أصل

“কবরের নিকট সম্মিলিত দুআ করার কোনও ভিত্তি নাই।” মৃতকে কবরের দাফন করার পরপর দুআ করার ক্ষেত্রেও তিনি বলেন, “প্রত্যেকেই নিজে নিজে দুআ করবে। প্রত্যেকই বলবে, হে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দাও, তার প্রতি দয়া করো, তাকে (কবরে ফেরেশতাদের প্রশ্নের) সঠিক উত্তর দেওয়ার শক্তি দাও এবং তাতে সুদৃঢ় রাখো ইত্যাদি।” [শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট]

◈ শাইখ সালেহ আল ফাউযান (হাফিজাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয়, মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে দুআ করার সময় দু হাত উত্তোলন করা করা কি জায়েজ?
তিনি উত্তরে বলেন,
نعم , لا بأس. الأصل فى الدعاء أن ترفع فيه الأيدي إلا ما ورد أن الرسول دعا ولم يرفع يديه
“হ্যাঁ, এতে কোনও সমস্যা নেই। কেননা দুআর ক্ষেত্রে মূলনীতি হল, এতে হাত উঠানো উচিত। তবে যে সব ক্ষেত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুআ করেছেন কিন্তু হাত উঠাননি সেসব ক্ষেত্রে ব্যতিরেকে।” [ইউটিউব চ্যানেল: ডক্টর আল্লামা সালেহ আল ফাউযান]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬◆◈◆ ▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।।

পরিবারে থাকলে যদি ঈমানে সমস্যা মনে হয় তাহলে কি করব?

 প্রশ্ন: গত ২ মাস ধরে অনেক ধরনের প্রশ্ন মাথায় এসেছে। সবচেয়ে বড় কিছু প্রশ্ন হল মেয়েদের পড়াশুনা নিয়ে, খাবার দাবার, ওষুধপত্র ইত্যাদির ক্ষেত্রে শিরক নিয়ে আর পাক পবিত্রতা নিয়ে। আর হালাল হারাম খাদ্য নিয়েও প্রশ্ন আছে। আমার পরিবারের সদস্যদের ইসলামের জ্ঞান কম। পাক নাপাকি বিষয়ে সচেতন না আবার অজান্তে কুফরিও করে।তাদের সাথে থাকতে গেলে ইমানে সমস্যা মনে হতে থাকে। তাদেরকে যে বুঝাবো সে কথা তারা মানবে কিনা তাও জানি না। এমতাবস্থায় নামাজও পড়তে পারছি না। তাদের কাছে হয়ত মনে হয় আমি বাড়াবাড়ি করি। একজন বলে যে

এই ১৪ বছর বয়সেই পাক নাপাকির মাসায়ালা জানার দরকার নেই।কিন্তু আমি অনেক নিশ্চিত যে নাপাক আছে আমাদের ঘরে। কিন্তু আমি স্টুডেন্ট হওয়ায় তারা আমাকে কাজও করতে দেয় না। দুনিয়ার সাফল্যের জন্য শুধু পড়াশুনাটাই কি প্রধান কাজ?

আমার প্রশ্ন হচ্ছে যে:
পরিবারে থাকলে যদি ঈমানে সমস্যা মনে হয় তাহলে কি করব? কথা কম বলতাম মাঝখানে, তারা আমাকে এসে বুঝায় যে তাদের সাথে কথা বললে মন ভাল হবে, বান্ধবীদের সাথে মিশতে। কিন্তু তাদের সাথে কথা বলতে গেলেই মনে হয় কুফর হয়ে যাচ্ছে। এভাবে চুপচাপ থাকার কারনে তারা আমার কথাও শুনবে কিনা জানিনা।
এখন মনে হয় সব জায়গাতেই নাপাকি লেগে আছে, আগে অজ্ঞতাবশত, এখন জানা থাকার পরেও অপারগতার বা অলসতার দরুন। কাজের বুয়াকে দিয়ে কাপড় ধুয়ানো হয়। সে একজনের বাসা থেকে কাজ করে আসে, আমার জানামতে সেই বাসার মহিলা একজন পাক নাপাকি নিয়ে সচেতন না। আল্লাহ জানে।

এই অবস্থায় কি করব একটা পরামর্শ চাচ্ছি। আর কম কথা বলি তাদের সাথে, তাই ইসলাম বিষয়ক কোন কথা শুনতে চাবে কিনা জানিনা। এখন কি করব? তাদের কে ধীরে সুস্থে বুঝাতে গেলে তো কুফরের সম্ভাবনা থেকে যায়। আবার না বুঝালে যে সবসময়েই সমস্যা? এখন কি বাসা ছেড়ে দিব আমি? কিন্তু আমি যে মেয়ে।

উত্তর: আসসালামু আলাইকুম।

১) এগুলো সবই হচ্ছে আপনার কুধারণা। আপনার মধ্যে ওয়াসওয়াসা কাজ করছে। আমাদের জানামতে অনেকের মধ্যেই এ ধরনের খুঁত খুঁত ভাব থাকে। এমনি এমনি পাক-নাপাক নিয়ে ধারণা করতে থাকে। এমনি মনে করে এই বুঝি নাপাকী লেগে গেল, নাপাক হয়ে গেল। না, নাপাকী যতক্ষণ পর্যন্ত স্পষ্ট না দেখবেন ততক্ষণ পর্যন্ত নাপাক হয় না। সুধু যেকোনো জিনিসকে নাপাক বলে দেওয়া তারপর কথা বলতে এইগুলো কুফর। এগুলো সব ওয়াসওয়াসা। কথা বলতে কুফর হবে কেন? শুধু যে কথা বললেই কুফর হয়ে যাবে অথবা কাজের বুয়াকে দিয়ে কাপড় ধুয়ালে কাপড় নাপাক হয়ে যাবে এগুলো আপনার মধ্যে ওয়াসওয়াসা কাজ করছে। এই ওয়াসওয়াসাকে দূর করতে হবে। স্পষ্ট যদি নাপাকী না লাগে তাহলে যে ব্যক্তিই কাপড় ধোয় না কেন নাপাকী লাগার সম্ভাবনা নাই ইন শাহ্ আল্লাহ।

২) ধীরে সুস্থে বোঝাতে গেলে কুফর হবে কেন। এটাও আপনার একটা কুধারণা। আপনার ভিতরে ওয়াসওয়াসা কাজ করতেছে, কুমন্ত্রণা কাজ করতেছে, সন্দেহ কাজ করতেছে। মনের মধ্যে থেকে সন্দেহ দূর করতে হবে, কুমন্ত্রণা দূর করতে হবে, ওয়াসওয়াসা দূর করতে হবে। কথা বললেই কুফর হয় এটা ঠিক নয়, মিশতে গেলেই কুফর হয় এটা ঠিক নয়। কম কথা বলেন ঠিক আছে। কিন্তু মানুষকে সত্য কথা বলতে হবে, ভালো কথা বলতে হবে। কিন্তু কারো সাথে কথা বললেই কুফর হয়ে যাবে। এটা আপনার ওয়াসওয়াসা। সুতরাং মানুষের সাথে মিশতে হবে, তাদের সাথে কথাবার্তা বলতে হবে, তাদেরকে বুঝাতে হবে। আল্লাহ আপনাকে ধৈর্য দান করুন এবং মানুষকে বোঝানোর তৌফিক দান করুন। আমীন।

৩) বাসা ছাড়বেন কেন? এই ভুল আপনি করবেন না। আপনি বাসা ছেড়ে যাবেন কোথায়? বাসাতেই থাকতে হবে। বাসার মানুষের সাথে মিশতে হবে। আপনি সালাত আদায় করবেন, মানুষকে বুঝাবেন। আপনি ইবাদত করবেন, তাদেরকেও বুঝাবেন। কিন্তু বাসা ছেড়ে যাওয়ার চিন্তাভাবনা করবেন না।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর দিয়েছেন:

শাইখ সাইফুল ইসলাম মাদানী।

কেউ যদি নারী পুরুষ সমতায় বিশ্বাস করে, এমন মহিলার সাথে স্কুল,কোচিং এ যাওয়া কি সেই মহিলার কুফরি কাজে সাহায্য হবে?

 ১) আমি যখন বাইরে প্রাইভেট পড়তে যাই, তখন মেয়েরা পড়াশুনা নিয়ে হেল্প চায়, বলে এটা কিভাবে করসিস, আবার আমাকে দেখে বলে তুই অনেক পড়িশ, হয়তবা কেউ কেউ আমাকে দেখে জিদ নিয়ে পড়ে পরীক্ষায় ভাল নাম্বারের জন্য। তারা অজ্ঞতাবশত ফেমিনিজম এ বিশ্বাসী হতে পারে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমার কি তাদেরকে সাহায্য করা উচিত? আর আমাকে দেখে কোন ফেমিনিস্ট আরো উদ্যম নিয়ে পড়লে ( যা আমি জানি না), তাদের এভাবে পরোক্ষভাবে সাহায্য করলে কেমন গুনাহ হবে?

২) কেউ যদি নারী পুরুষ সমতায় বিশ্বাস করে, এমন মহিলার সাথে স্কুল,কোচিং এ যাওয়া কি সেই মহিলার কুফরি কাজে সাহায্য হবে?

উত্তর:

১) পড়ালেখার ব্যাপারে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করতে পারবেন। তবে মেয়ে মেয়েদেরকে সহযোগিতা করবেন এবং ছেলে ছেলেদেরকে সহযোগিতা করবেন। বিপরীত লিঙ্গকে সহযোগিতা করতে গিয়ে যেন ফিতনায় না পড়ে যায় সেদিকে খেয়াল করতে হবে। আর ফেমিনিস্ট এর ব্যাপারে যেহেতু আপনার জানা নাই সেই ক্ষেত্রে চুপ থাকাটাই ভাল। যেই বিষয়ে জানা নাই সেই বিষয়ে চুপ থাকাটাই উত্তম। তবে পড়ালেখার ব্যাপারে কেউ সাহায্য চাইলে তাদেরকে সাহায্য করতে কোন দোষ নাই ইন শাহ্ আল্লাহ।

২) না এমন মহিলার সাথে স্কুল, কোচিং এ যাওয়া তাকে কুফরি কাজে সাহায্য কলার পর্যায়ে পড়বে না। তার কুফরি কথা অনুযায়ী যদি কাউকে বলেন অথবা তা সমর্থন করেন তাহলে তার কুফরি কাজে সাহায্য করা হবে। তবে এধরনের ব্যক্তি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ধরনের ব্যক্তিদের থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর দিয়েছেন:

শাইখ সাইফুল ইসলাম মাদানী।

লেখকের লেখা পোস্টে তার নাম উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সেটা কেটে নিজের মতো করে প্রচার করা

 প্রশ্ন: লেখকের লেখা পোস্টে তার নাম উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সেটা কেটে নিজের মতো করে প্রচার করাটা কি ইনসাফ এর মধ্যে পড়ে? আর লেখকের নাম প্রকাশে কি রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে?

উত্তর:
অন্যের লেখা নিজের নামে প্রচার করা অথবা লেখকের নাম কেটে তা প্রচার করা নি:সন্দেহে মূল লেখকের প্রতি বেইনসাফি, ইলমি আমানতের খেয়ানত এবং অকৃতজ্ঞতা। আইনের দৃষ্টিতেও এ কাজটি মেধাস্বত্ব চুরির অন্তর্ভুক্ত-যা বৈধ নয়।

ইমাম সুয়ূতী বলেন,

من بركة العلم وشكره عزْوُه إلى قائله

‘ইলমের বরকত এবং শুকরিয়া তখন হবে, যখন এটা কোথা থেকে সংকলন করা হয়েছে, তার উৎস পেশ করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, “আব্বাস বিন মুহাম্মাদ আ‌দ দূরী বলেন, “আমি আবু উবাইদকে একথা বলতে শুনেছি, ইলমের শুকরিয়া করা উচিত। তুমি যখন কারো নিকট থেকে উপকৃত হবে, তখন বলবে, আমি এটা জানতাম না, এটা আমার জ্ঞানে ছিল না। এ বিষয়ে উমুক ব্যক্তি বা উমুক কিতাব থেকে এই এই ফায়েদা লাভ করেছি.. এটা হচ্ছে ইলমের শুকরিয়া।” [আল মুযাহহার ২/২৭৩, মাকতাবা শামেলা]

এ ধরণের নিন্দনীয় কাজের ক্ষেত্রে ইমাম আলবানি রহ. নিম্নোক্ত হাদিসটি পেশ করে থাকেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

الْمُتَشَبِّعُ بِمَا لَمْ يُعْطَ كَلَابِسِ ثَوْبَيْ زُورٍ

“মানুষ যে বস্তুর মালিক নয়, তা নিজের বলে প্রকাশ করা, দুটি মিথ্যার চাদর পরিধানকারীর ন্যায়।” (বুখারী ও মুসলিম) [আল কালেমুত তাইয়্যেব- ইবনে তায়মিয়া, তাহকীক আলবানী ভূমিকা, পৃ: ১১]

উলামাগণ অন্য লেখকদের বক্তব্য নকল করাকে নিন্দা করেননি, নকল করার সময় বক্তব্যটি লেখকের দিকে নেসবত না করাটাকে তিনি নিন্দা করেছেন।
বিশেষভাবে আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহ. বক্তব্য উদ্ধৃত করে তা লেখকের দিকে নেসবত না করার বিষয়টিকে কঠিনভাবে সমালোচনা করেছেন। [তাহকীক আল কালেমুত তাইয়্যেব, ইবনে তাইমিয়া বইয়ের তাহকীকের ভূমিকা]

তিনি বলেন, “ইলমের আমনত হচ্ছে, প্রত্যেকটি বক্তব্যকে মূল লেখকের দিকে নেসবত করা।” [সহীহ আবু দাউদ, ১/২২১]
(শাইখ আবদুল্লাহ আল কাফী (হাফিযাহুল্লাহ) রচিত প্রবন্ধ থেকে নেওয়া)

সুতরাং লেখক এর নাম কেটে নিজের নাম বসিয়ে দেওয়া কিংবা মূল লেখকের নাম সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে লেখা প্রকাশ করার এমন হীন মনোভাব থেকে আমাদের বের হয়ে আসা আবশ্যক।

🔶 ইসলামি লেখার সাথে লেখকের নাম উল্লেখ করা কি রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা)?

রিয়া বিষয়টি নিয়তের উপর নির্ভরশীল। কেউ যদি প্রসিদ্ধি অর্জন, প্রশংসা লাভ বা বাহবা কুড়ানোর নিয়তে এ কাজ করে তাহলে তা রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা) বলে গন্য হবে-যা হারাম বরং ছোট শিরক।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ قَالُوا وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: الرِّيَاءُ، يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمُ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً

“তোমাদের উপর সবচেয়ে ভয়ানক যে বিষয়ের আমি আশংকা করছি তা হল শির্ক আসগার (ছোট শির্ক)।’’ তারা বললেনঃ ছোট শির্ক কী হে আল্লাহর রাসূল?

তিনি বললেন, রিয়া। সম্মানিত আল্লাহ যখন মানুষকে তাদের কর্মফল দান করবেন তখন বলবেন, দুনিয়ায় যাদেরকে দেখানোর উদ্দেশ্যে তোমরা আমল করতে তাদের কাছে যাও। দেখ, তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কি না?’’

[জাইয়েদ (উত্তম) সনদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ। আরও বর্ণনা করেন, ইমাম বায়হাকি ও ইবনু আবিদ দুনিয়া]

কিন্তু যদি নিজের হক সংরক্ষণ, লেখার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ, আমানতদারিতা, মানুষের কাছে লেখার গ্রহণযোগ্যতার উদ্দেশ্যে লেখক নিজের নাম-পরিচয় ইত্যাদি প্রকাশ করে তাহলে তা রিয়ার মধ্যে গণ্য হবে না। বরং অজ্ঞাত ও নাম পরিচয় হীন লেখকের লেখা না পড়াই নিরাপদ। কারণ অনেক বিদআতি ও ভ্রান্ত আকিদার অনুসারী লেখক সুন্দর ও আকর্ষণীয় ভাষায় বিদআত, বাতিল আকিদা ও বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা প্রচার করে থাকে যা সাধারণ মানুষ সহজে ধরতে পারে না। তাই লেখক পরিচিতি থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ-বিশেষ করে দীনী বিষয়ে।

মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (বিখ্যাত তাবিঈ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

إن هذا العلم دين، فانظروا عمن تأخذون دينكم

“নিশ্চয়ই এ ইলম হল, দীন। কাজেই কার কাছ থেকে তোমরা দীন গ্রহণ করছে তা যাচাই করে নাও।”

ইবনু সীরীন রহ. হতে আরও বর্ণিত। তিনি বলেন, “এমন এক সময় ছিল যখন লোকেরা সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো না। কিন্তু পরে যখন ফিতনা দেখা দিল তখন লোকেরা হাদিস বর্ণনাকারীদেরকে বলতো,

سَمُّوا لَنَا رِجَالَكُمْ فَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ السُّنَّةِ فَيُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ وَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ الْبِدَعِ فَلاَ يُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ

“তোমরা যাদের নিকট থেকে হাদিস গ্রহণ করেছ, আমাদের কাছে তাদের নাম বল। তারা এ কথা এ কারণে জানতে চাইত, যাতে দেখা যায় তারা আহলে সুন্নাত কিনা? যদি তারা এর অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে তাদের হাদিস গ্রহণযোগ্য হবে। আর যদি দেখা যায় তারা বিদআতি তাহলে তাদের হাদিস গ্রহণ করা হবে না।” [সহীহ মুসলিম এর আল মুকাদ্দামাহ (ভূমিকা)]

এ মর্মে আরও অনেক সতর্কতামূলক বক্তব্য রয়েছে। যদিও এগুলো হাদিস গ্রহণ সম্পর্কে বলা হয়েছে কিন্তু তা মূলত দীনের সামগ্রিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে।

তাছাড়া অনেক সময় লেখকের নাম পরিচয় জানা থাকলে লেখা বিষয়ে তার সাথে যোগাযোগ করা সহজ হয় এবং কোন সংশোধনী বা সংযোজন থাকলে তাকে জানানো যায়। এতে লেখা আর সমৃদ্ধ ও ত্রুটিমুক্ত হয়-যা সকলের জন্য উপকারী।

🔶 অন্যের লেখা কপি করা করার বিধান:

প্রশ্ন: যদি কোনও বইয়ে লেখকের পক্ষ থেকে কপি করার কোনও নিষেধাজ্ঞার কথা লেখা না থাকে অথবা ‘স্বত্ব সংরক্ষিত’ এ ধরণের কোনও লেখা না থাকে,-যা লেখক চাইলে যুক্ত করতে পারতো-তাহলে কি তা কপি করা যাবে?

উত্তর:
কোন বই, আর্টিকেল ইত্যাদিতে ‘স্বত্ব সংরক্ষিত’ বা ‘কপি রাইট’ লেখা না থাকলে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় অংশ কপি করা জায়েজ আছে। তবে শর্ত হল, কপি কৃত লেখাটুকু কোটেশন চিহ্ন ( ” – “) এর মধ্যে রেখে লেখকের নাম/পরিচয় উল্লেখ করতে হবে। অথবা কপিকৃত অংশটুকু বিশেষভাবে চিহ্নিত করতে হবে। কোনভাবেই তা নিজের লেখা বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। অন্যথায় তা মেধাস্বত্ব চুরি, আমানতের খেয়ানত এবং লেখকের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ হিসেবে গণ্য হবে। চাই তা অনলাইন থেকে হোক অথবা অফলাইন থেকে হোক।

🔶 বাংলাদেশে কপিরাইট আইন ২০২১ (খসড়া):

“কপিরাইট আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা এবং চার বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী অপরাধী উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।” [BBC Bangla এর ওয়েবসাইট]
الله أعلم
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

Translate