Thursday, June 16, 2022

কখন “ইয়া রাসূলাল্লাহ” বলা শিরক আর কখন জায়েজ?

 প্রশ্ন: `ইয়া রাসুলুল্লাহ’ (হে আল্লাহর রাসূল) বলা জায়েজ কি?

উত্তর:
ইয়া রাসুলুল্লাহ অর্থ: হে আল্লাহর রাসূল! এটি উপস্থিত কাউকে উদ্দেশ্য করে সম্বোধন সূচক বাক্য।
যেমন: মানুষ জীবিত উপস্থিত কোনও ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে অথবা যাকে ডাকলে কথা শুনতে পায় এবং কথার উত্তর দেয় এমন ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলা হয়-ইয়া ফুলান (হে অমুক।)।

◈ রাসূল ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলা জায়েজ হবে কি?

এ বাক্যটি কখনো কখনো বলা শিরক আর কখনো জায়েজ। নিম্নে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হল:

◍ যখন ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলা শিরক:

কেউ যদি এ বিশ্বাস থেকে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ (হে আল্লাহর রাসুল) বলে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আহ্বান করলে তিনি কবরে থেকেও তা শুনেন এবং বিপদাপদে সাহায্য করেন। তিনি সর্বত্র হাজির-নাজির, সর্ব শ্রোতা ও সর্ব দ্রষ্টা তাহলে তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এগুলো একমাত্র আল্লাহর বৈশিষ্ট্য। আর আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কোনও বৈশিষ্ট্য তার মাখলুকের জন্য ব্যবহার করা হলে তাকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করার শামিল-যা শিরকে আকবর (বড় শিরক)।
বরং আমাদের বলা উচিৎ, ইয়া আল্লাহ, ইয়া রাহমান, ইয়া গাফুর, ইয়া কুদ্দুস ইত্যাদি। কারণ একমাত্র আল্লাহই সাত আসমানের উপর থেকে প্রতিটি মাখলুকের ডাক শুনেন এবং তাদেরকে সাহায্য করেন। এটি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর শান। কোনও মাখলুক সৃষ্টি জীবকে আল্লাহ এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করেন নি।

❑ ডাকতে হবে কেবল আল্লাহকে; কোনও নবী-রাসূল, ওলি-আউলিয়া, পীর-বুজুর্গ, জিন বা ফেরেশতাকে নয়:

◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا ۖ
“আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক।” [সূরা আরাফ: ১৮০]

◈ তিনি আরও বলেন,
ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
“তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব।” [সূরা গাফির/মুমিনুন: ৬০]

◈ তিনি আরও বলেন,
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
“(এবং এই প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে), মসজিদসমূহ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করার জন্য। অতএব, তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে অন্য কাউকে ডেকো না।” [সূরা জিন: ১৮]

◈ তিনি আরও বলেন,
وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ ۖ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ
“আর নির্দেশ হয়েছে আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকবে না, যে তোমার ভালো করবে না-মন্দও করবে না। বস্তুত: তুমি যদি এমন কাজ কর, তাহলে তখন তুমিও জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।” [সূরা ইউনুস: ১০৬]

◈ তিনি আরও বলেন,
وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ ‎﴿١٣﴾‏ إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَة
“তাঁর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আঁটিরও অধিকারী নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শুনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না।” [সূরা ফাতির: ১৩ ও ১৪)

◈ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إذَا سَأَلْت فَاسْأَلْ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْت فَاسْتَعِنْ بِاَللَّهِ
“যখন কিছু চাইবে তো আল্লাহর কাছেই চাইবে; যখন সাহায্য চাইবে তো আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে।” [তিরমিযী: ২৫১৬, হাদিসটি সহীহ (হাসান) বলেছেন।]

এ সকল আয়াও হাদিস থেকে প্রমাণিত হল যে, বিপদাপদে সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে একমাত্র আল্লাহকেই ডাকতে হবে। কোনও মৃত ব্যক্তি, নবী, ওলি, ফেরেশতা, জিন বা কোনও অদৃশ্য শক্তি ইত্যাদিকে ডাকা যাবে না। অন্যথায় তা বড় শিরকে পরিণত হবে। আর শিরক হল, আল্লাহর নিকট ক্ষমাহীন ইমান বিধ্বংসী সবচেয়ে বড় অপরাধ। কেউ জেনে বুঝে তাতে লিপ্ত হলে, তার জীবনের সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে, তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত এবং জান্নাত চিরকালের জন্য হারাম হয়ে যাবে। (আল্লাহ ক্ষমা করুন। আমিন।)

◈ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করার পর কোনও বিপদাপদে বা সমস্যা-সংকটে সাহাবি বা তাবেয়িগন কখনও “ইয়া রাসূলাল্লাহ” (হে আল্লাহর রাসূল) বা “ইয়া নাবিয়াল্লাহ”(হে আল্লাহর নবী) বলে সম্বোধন করে তার নিকট সাহায্যের আবেদন করেছেন বলে প্রমাণিত হয় নি।

❑ কখন কখন ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলা জায়েজ?

নিম্নোক্ত ক্ষেত্র সমূহে “ইয়া রাসুলাল্লাহ” বলা দূষণীয় নয়। যেমন:

ক. হাদিসে বর্ণিত কোনও দুআর মধ্যে যদি এ বাক্যটি আসে তাহলে তা পাঠ করতে কোনও সমস্যা নাই। যেমন:
তাশাহুদের দুআয় আমরা বলি, “আসালামু আলাইকা আইয়্যুহান্নাবিয়্যু” (হে আল্লাহর নবী, আপনার উপর সালাম বর্ষিত হোক)।
হাদিসে যেহেতু এভাবেই বর্ণিত হয়েছে সেহেতু তাতে কোনও আপত্তি নাই।

খ. হাদিসের ইবারতে এ বাক্যটি থাকলে তা পাঠ করতে কোনও আপত্তি নাই। কারণ বহু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সাহাবিগণ ইয়া রাসূলাল্লাহ (হে আল্লাহর রাসূল) বলে সম্বোধন করতেন।

গ. মদিনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের সন্নিকটে উপস্থিতি হয়ে তার উপর প্রতি সালাত-সালাম পেশ করার সময়।

যেমন:
মদিনা জিয়ারাত কারীগণ, তাঁর কবরের সন্নিকটে উপস্থিত হয়ে তাঁকে এবং তার পার্শ্বে শায়িত তার দুই সহচর প্রথম খলিফা আবু বকর রা. এবং ২য় খলিফা উমর রা. এর কবরের উদ্দেশ্য বলে থাকেন,
“আস সালাতু আস সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ”,
“আস সালাতু আস সালামু আলাইকা ইয়া আবা বাকর রা.”,
“আস সালাতু আস সালামু আলাইকা ইয়া উমার রা.।”

এটা অবশ্যই জায়েজ। কারণ এখনে তারা তাদের কবরের সামনে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে সালাত ও সালাম পেশ করছেন।
মোটকথা, অন্তরের বিশ্বাস এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলার বিধান বর্তাবে। কখনো তা শিরক হবে আর কখনো জায়েজ।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

শেষ জামানা এবং সে সময় সুন্নত আঁকড়ে ধরার অতুলনীয় মর্যাদা

 প্রশ্ন: আমরা কি শেষ জামানায় আছি? আমরা কি এখন একটা সুন্নাত পালন করলে ৫০ জন সাহাবির সমপরিমাণ সাওয়াব পাব?

উত্তর:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমন মানেই শেষ জামানা। তার মানে এর পরে কোন নবী রাসুল আসবে না বা কোন আসমানি গ্রন্থ নাজিল হবে না এবং এরপরে কেয়ামত সংঘটিত হবে। সুতরাং অবশ্যই আমরা শেষ জমানায় রয়েছি।

কিন্তু কখন কিয়ামত সংগঠিত হবে আমরা কেউ জানি না। এর নিশ্চিত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। আল্লাহ বলেন,
{ يَسۡـَٔلُونَكَ عَنِ ٱلسَّاعَةِ أَيَّانَ مُرۡسَٰهَاۖ قُلۡ إِنَّمَا عِلۡمُهَا عِندَ رَبِّيۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقۡتِهَآ إِلَّا هُوَۚ}
“তারা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে (বলে) ‘তা কখন ঘটবে? বলুন, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার রবেরই নিকট। শুধু তিনিই যথাসময়ে সেটার প্রকাশ ঘটাবেন।” [Surah Al-A`râf: 187]

এ ক্ষেত্রে বিখ্যাত হাদিসে জিবরিলও উল্লেখযোগ্য।

🟢 শেষ জামানায় সুন্নত আঁকড়ে ধরার অপরিসীম মর্যাদা:

নিঃসন্দেহে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা তথা তাঁর নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা, ফরজ ও ওয়াজিবগুলো সঠিকভাবে পালনের পাশাপাশি, সুন্নত ও নফল ইবাদতগুলো যথাসম্ভব সম্পাদন করা এবং হারাম ও বিদাআতি আচার-বিশ্বাস থেকে দূরে থাকা।‌ সেই সাথে তা প্রচার-প্রসার করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। হাদিসে এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

▪️যেমন:

عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِيِّ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ الإِسْلامَ بَدَا غَرِيبًا وَسَيَعُودُ غَرِيبًا كَمَا بَدَا فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ قِيلَ : وَمَنِ الْغُرَبَاءُ يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : الَّذِينَ يُصْلِحُونَ إِذَا فَسَدَ النَّاسُ
সাহল বিন সা’দ সায়েদী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অল্পসংখ্যক মানুষ সহকারে যেভাবে ইসলামের সূচনা হয়েছে ঠিক সেভাবে অচিরেই অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে তা ফিরে-যেমন শুরুতে হয়েছিল।

সুতরাং শুভ সংবাদ (দুনিয়ায় সফলতা ও আখিরাতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ ও জান্নাতে প্রবেশ) ঐ অল্প সংখ্যক লোকদের জন্য।’’
জিজ্ঞাসা করা হল, এই সুসংবাদ প্রাপ্ত অল্প সংখ্যক লোক কারা হে আল্লাহর রসূল?
তিনি বললেন, যারা সংস্কার ও সংশোধনী মূলক কাজ করে যখন মানুষের মাঝে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে বা মানুষ খারাপ হয়ে যায়।”
[আহমাদ ১৬৬৯০, ত্বাবারানীর কাবীর ৭৫৫৪, আওসাত্ব ৩০৫৬-সহিহ]

▪️এ প্রসঙ্গে আরেকটি হাদিস হল, আবু সা’লাবাহ খুশানী কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ أَيَّامَ الصَّبْرِ الصَّبْرُ فِيهِ مِثْلُ قَبْضٍ عَلَى الْجَمْرِ لِلْعَامِلِ فِيهِمْ مِثْلُ أَجْرِ خَمْسِينَ رَجُلاً يَعْمَلُونَ مِثْلَ عَمَلِهِ قَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَجْرُ خَمْسِينَ مِنْهُمْ قَالَ أَجْرُ خَمْسِينَ مِنْكُمْ
“তোমাদের পরবর্তীতে আছে ধৈর্যের যুগ। সে (যুগে) ধৈর্যশীল হবে মুষ্টিতে অঙ্গার ধারণকারীর মতো। সে যুগের আমলকারীর হবে পঞ্চাশ জন পুরুষের সমান সওয়াব।
জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহর রসূল! পঞ্চাশ জন পুরুষ আমাদের মধ্য হতে, নাকি তাদের মধ্য হতে?
তিনি বললেন, “তোমাদের মধ্য হতে।”
[আবু দাউদ ৪৩৪৩, তিরমিযী ৩০৫৮, ইবনে মাজাহ ৪০১৪, ত্বাবারানী ১৮০৩৩, সহীহুল জামে’ ২২৩৪]

🚫 “উম্মতের বিশৃংখলার সময় সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মর্যাদা ১০০ শহিদের সমান” সংক্রান্ত হাদিসটি সহিহ নয়:
এ সংক্রান্ত হাদিসটি আমাদের মাঝে বহুল প্রচলিত। বক্তাদের মুখেও আমরা তা অহরহ শুনতে পাই। কিন্তু‌ সম্মানিত মুহাদ্দেসিনের দৃষ্টিতে সনদের বিচারে উক্ত হাদিসটি সহীহ নয়।
নিম্নে উক্ত হাদিস এবং তৎপ্রসঙ্গে মুহাদ্দিসিনে কেরামের গবেষণালব্ধ সনদ বিশ্লেষণ পেশ করা হল:
من تمسك بسنتي عند فساد أمتي له أجر مائة شهيد
“যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বিশৃঙ্খলার সময় আমার সুন্নতকে আঁকড়ে ধরবে তার জন্য রয়েছে একশ শহিদের সমপরিমাণ সওয়াব।”
[হাদিসটি যঈফ (দুর্বল)। দ্রষ্টব্য: সিলসিলা যইফা, হা/৩২৭]

সনদ বিশ্লেষণ:

عن ابن عباس رضي الله عنهما أن النبي صلى الله عليه وسلم قال :
( من تمسك بسنتي عند فساد أمتي فله أجر مائة شهيد )
أخرجه ابن عدي في “الكامل” (2/327) وسنده ضعيف جدا ، فيه الحسن بن قتيبة : متروك الحديث ، انظر ترجمته في “لسان الميزان” (2/246) ، وضعفه الألباني في “السلسلة الضعيفة” (326)

عن أبي هريرة رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال :
( المتمسك بسنتي عند فساد أمتي له أجر شهيد )
أخرجه الطبراني في “الأوسط” (2/31) وعنه أبو نعيم في “حلية الأولياء” (8/200)
وفي سنده علتان :
1- تفرد عبد المجيد بن عبد العزيز بن أبي رواد ، ومثله لا يحتمل تفرده .
2- جهالة محمد بن صالح العذري : قال الهيثمي في “مجمع الزوائد” (1/172) : لم أر من ترجمه .
ولذلك ضعفه الشيخ الألباني رحمه الله في “السلسلة الضعيفة” (327) .
পরিশেষে আমাদের কর্তব্য, চতুর্মুখী ফিতনা-ফাসাদের সয়লাবের মধ্যেও আল্লাহর দ্বীনকে শক্তভাবে ধারণ করা, চারদিকে অজ্ঞতার গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে জ্ঞানের মশাল জ্বেলে সত্যের পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং বিদআতের জয়জয়কারের মাঝেও রাসুলের সুন্নাহকে জীবনের ব্রত বানিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি এই পথে চলতে গিয়ে সকল ঝড়ঝঞ্জা, অগ্নিপরীক্ষা, বিপদ-আপদ এবং অপবাদ ও অপপ্রচারের সামনে আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশায় পরম ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া। তবেই মিলবে প্রতিশ্রুত সফলতা এবং জান্নাতের সুসংবাদ‌। সেই সাথে মিলবে সাহাবিদের ৫০ জন ব্যক্তির সমতুল্য সওয়াব ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ আমাদেরকে সত্যের পথে অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন।‌ আমিন।
আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Friday, April 22, 2022

পহেলা বৈশাখ পালনের বিধান এবং এ উপলক্ষে সরকারী নির্দেশে আমাদের করণীয়

 প্রশ্ন: ‘পহেলা বৈশাখ’ উপলক্ষে পান্তা-ইলিশ খাওয়া যাবে কি? বর্তমান সরকার এ উৎসব উপলক্ষে ছাত্র/ছাত্রী ও শিক্ষকদেরকে স্কুল-কলেজে উপস্থিত থাকা ও তা পালন করা বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?

উত্তর:
ইসলামে মুসলিমদের জন্য দুটি জাতীয় উৎসবের দিন নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। একটি হল, ঈদুল আজহা অপরটি হল, ঈদুল ফিতর। এ দুটি ছাড়া মুসলিমদের জন্য ৩য় কোন আনন্দ-উৎসব জাতীয়ভাবে উদযাপন করার সুযোগ নেই।
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় আগমন করে দেখলেন, মদিনা বাসী খেলা-ধুলার মধ্য দিয়ে দুটি দিবস উদযাপন করে থাকে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এ দুটি দিবস কী?

তারা বলল, এ দুটি দিবস জাহেলি যুগে আমরা খেলা-ধুলার মধ্য দিয়ে উদযাপন করতাম। তিনি বললেন,
إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا يَوْمَ الْأَضْحَى وَيَوْمَ الْفِطْرِ
“আল্লাহ তোমাদের জন্য এর থেকে উত্তম দুটি দিবসের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। একটি হল, ঈদুল আজহা এবং অপরটি হল, ঈদুল ফিতর।” [সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ৯৫৯ সনদ-সহীহ, আলবানি]
উপরোক্ত হাদিস থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, ইসলামি শরিয়তে ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর ব্যতিরেকে জাতীয়ভাবে তৃতীয় কোন ঈদ বা উৎসব পালনের সুযোগ নেই। অথচ দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, আমাদের মুসলিম সমাজে বর্তমানে কত ধরণের ঈদ-উৎসব জমজমাট ভাবে পালন করা হচ্ছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। যেমন: ঈদে মিলাদুন নবী বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্ম উৎসব। বরং এটাকে ‘সকল ঈদের শ্রেষ্ঠ ঈদ’ বলে জোরেশোরে প্রচার করা হচ্ছে। যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসের সুস্পষ্ট বিরোধী। অনুরূপভাবে তথাকথিত পহেলা বৈশাখ, খৃষ্ট নববর্ষ, এপ্রিল ফুল, বড় দিন (Xmas Day) ইত্যাদি অগণিত উৎসব আমদের মুসলিমগণ অবলীলায় পালন করে যাচ্ছে কিন্তু একবারও চিন্তা করে দেখে না যে, আসলে এগুলোর উৎস কোথায়? এসব মূলত: হিন্দু ও খৃষ্টানদের থেকে আমদানিকৃত সংস্কৃতি যার সাথে মুসলমানের কোন সম্পর্ক থাকতে পারে না।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-বলে গেছেন,
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি অন্য কোন জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করল সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।” [আবু দাউদ হাদিস নং ৩৫১২, সনদ-সহীহ, আলবানী]
সুতরাং আমাদের সমাজে ইদানীং পহেলা বৈশাখ পালনের যে মহা আয়োজন দেখা যাচ্ছে এর সাথে মুসলিমদের কোন সম্পর্ক নেই। বরং এ সব অনুষ্ঠান উপলক্ষে যা কিছু দেখা যাচ্ছে সেগুলো অধিকাংশ হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির সাথে সংগতিপূর্ণ।

তাই এ উপলক্ষে কোন ধরণের অনুষ্ঠান করা, শুভেচ্ছা বিনিময় করা, কথিত প্রভাত ফেরী ও মঙ্গল শোভা যাত্রায় অংশ গ্রহণ করা, পণ্যটা-ইলিশ খাওয়া এ সব জাহেলিয়াত পূর্ণ কাজ। এগুলোতে কোন মুসলিম সন্তানের অংশ গ্রহণ করা বৈধ নয়।

সরকার যদি অন্যায় ভাবে মুসলিমদের উপর কোন অনৈসলামিক অনুষ্ঠান চাপিয়ে দেয় তাহলে তা মান্য করা যাবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَا طَاعَةَ لِمَخْلُوقٍ فِي مَعْصِيَةِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না।” [মুসনাদ আহমদ-সহীহ] বরং আইন সঙ্গত পন্থায় তার প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু যদি প্রতিবাদ করার ক্ষমতা না থাকে বা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ না করলে জান-মালের ক্ষতির আশংকা থাকে তাহলে ঘৃণা সহকারে তাতে অংশ গ্রহণ করা যাবে। এটুকু হল ঈমানের সর্ব নিম্ন আলামত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহীহ হাদিসে বলেছেন,
«مَنْ رَأَى مِنْكُمْ مُنْكَرًا فَلْيُغَيِّرْهُ بِيَدِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِلِسَانِهِ، فَإِنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَبِقَلْبِهِ، وَذَلِكَ أَضْعَفُ الْإِيمَانِ»
“তোমাদের মধ্যে যে অন্যায় দেখবে সে যেন তা তার হাত দিয়ে বাধা দেয়, আর যদি হাত দিয়ে বাধা না দিতে পারে তবে যেন মুখ দিয়ে বাধা দেয়, আর যদি মুখ দিয়ে বাধা না দিতে পারে তবে যেন অন্তর দিয়ে বাধা দেয়, আর এটি হলো দুর্বল ঈমানের পরিচয়।” [সহিহ মুসলিম, হা/৪৯]
আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরণের বিজাতীয় সংস্কৃতি ও অন্ধ অনুকরণ থেকে রক্ষা করুন। আমীন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

সহবাসের সময় আজান হলে কী করণীয়?

 প্রশ্ন: সহবাসের সময় আজান হলে কী করণীয়?

উত্তর:
স্ত্রী সহবাসের সময় আজান শুনলে স্বাভাবিকভাবেই নিজেদের প্রয়োজন পূরণ করবে। তবে এ সময় মুখে উচ্চারণ করে আজানের জবাব দেয়া সমীচীন নয়।
ইমাম নওবি রহ. বলেন,
ويكره للقاعد على قضاء الحاجة أن يذكر الله تعالى بشيء من الاذكار فلا يسبح ولا يهلل ولا يرد السلام ولا يشمت العاطس ولا يحمد الله تعالى اذا عطس ولا يقول مثل ما يقول المؤذن. قالوا وكذلك لا يأتي بشيء من هذه الأذكار في حال الجماع، وإذا عطس في هذه الاحوال يحمد الله تعالى في نفسه ولا يحرك به لسانه. وهذا الذي ذكرناه من كراهة الذكر في حال البول والجماع هو كراهة تنزيه لا تحريم فلا إثم على فاعله. انتهى.
“প্রাকৃতিক প্রয়োজন পূরণের জন্য বসা অবস্থায় সময় কোনও প্রকার আল্লাহর জিকর-আজকার করা মাকরুহ (অ পছন্দনীয়)। সুতরাং এ সময় মুখে উচ্চারণ করে ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (ইত্যাদি জিকির-আজকার) পাঠ করা, সালামের জবাব দেয়া, হাঁচির জবাব দেয়া, হাঁচি দিলে আল হামদুলিল্লাহ পাঠ করা এবং মুয়াজ্জিনের আজানের জবাব দেয়া যাবে না। এ অবস্থায় হাঁচি দিলে মনে মনে আল হামদুলিল্লাহ পাঠ করবে। জিহ্বা নাড়িয়ে উচ্চারণ করবে না।
উল্লেখিত বিষয়গুলো পেশাব-পায়খানা এবং স্ত্রী সহবাস রত অবস্থায় করা মাকরুহ তানযিহি; তাহরিমি নয়। সুতরাং কেউ তা করলেও গুনাহ হবে না।” (শরহে মুসলিম)
তবে রমজান মাসে ফজরের পূর্বে স্ত্রী সহবাস করার পর ফজরের আজান শুনার সাথে সাথে সহবাস থেকে বিরত হওয়া আবশ্যক। এর পরে সহবাস অব্যাহত রাখা জায়েজ নেই। অন্যথায় উক্ত রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং এ কারণে তওবা-ইস্তিগফারের পাশাপাশি কাফফারাও দিতে হবে।
তবে নফল রোজার ক্ষেত্রে স্ত্রী সহবাস বন্ধ করা আবশ্যক নয়। এ ক্ষেত্রে তা অব্যাহত রাখলে উক্ত রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। তবে সম্ভব হলে তা পরবর্তীতে কাজা করে নেয়া উত্তম। এতে কোনও কাফফারা নেই।

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

অমুসলিমদেরকে ইফতার বা সাধারণ খাবার খাওয়ানো যাবে কি

 প্রশ্ন : অমুসলিমদেরকে ইফতার বা সাধারণ খাবার খাওয়ানো যাবে কি?

উত্তর :
অমুসলিমদের সামনে ইসলামের উদারতা, সৌন্দর্য এবং মহানুভবতা প্রকাশ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি তাদের অন্তরকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার অন্যতম উপায়। সুতরাং ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোন অমুসলিমকে মুসলিমদের ইফতার খাওয়ার জন্য ডাকা জায়েজ রয়েছে। হতে পারে, এটি তার হেদায়েতের ওসিলা হয়ে যাবে।
অনুরূপভাবে যে কোন অভাবী বা নি:স্বকে খাদ্য খাওয়ানো বিরাট সওয়াবের কাজ। এ বিষয়ে কুরআন-হাদিসে বহু বক্তব্য এসেছে। তাই কোন গরিব-অসহায় কাফিরকে যদি ইফতারের খাবার দেওয়া হয় তাতেও সওয়াব রয়েছে ইনশাআল্লাহ যদি সে মুহারিব তথা মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত না হয়। তবে শর্ত হল তার সাথে আন্তরিক ভালবাসা পূর্ণ সম্পর্ক রাখা চলবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّـهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
“দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে নি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিষ্কৃত করে নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদেরকে ভালবাসেন।” (সূরা মুমতাহিনাহ: ৮)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِم بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُم مِّنَ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ ۙ أَن تُؤْمِنُوا بِاللَّـهِ رَبِّكُمْ
“হে মুমিনগণ, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করছে। তারা রসূলকে ও তোমাদেরকে বহিষ্কার করে এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ।” (সূরা মুমতাহিনাহ: ১)

মোটকথা, ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার উদ্দেশ্যে কাফিরদেরকে ইফতার খাওয়ানো জায়েজ।
অনুরূপভাবে যে কোন অভাবী, গরিব-অসহায় মানুষকে-চাই সে মুসলিম হোক বা কাফির হোক- খাদ্যদানে সওয়াব রয়েছে।
তবে যদি কোন কাফির মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ লিপ্ত হয় বা ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা না থাকে বা অভাবী না হয় তাহলে তাদেরকে ইফতার খাওয়ার জন্য ডাকা ঠিক নয়। বরং সে ক্ষেত্রে মুসলিম, দ্বীনদার ও নিকটাত্মীয়রা এই খাদ্য খাওয়ার বেশি হকদার। আল্লাহু আলাম।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(মদিনা ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সউদী আরব।।

Translate