Saturday, February 19, 2022

ঘুম ও পানাহারের আদব এবং কাপড় ধোয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা

 প্রশ্ন: আমার এক নানু বললেন যে, কোল বালিশ নিয়ে ঘুমানো নাকি ঠিক না; গুনাহ। বোতল দিয়ে পানি পান করা গুনাহ। কাপড় তিন বার ধোয়া, বিসমিল্লাহ বলা নাকি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নত। এ কথাগুলো কি সঠিক কথা?

উত্তর:
কাপড় ধোয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত-এটা ছাড়া আপনার নানুর অন্যান্য কথাগুলো কেবলই অনুমান নির্ভর। ইসলামী শরীয়তে এ সব কথার নূন্যতম কোন ভিত্তি নাই। যাহোক সঠিক কথা হল, কোল বালিশ নিয়ে ঘুমানো এবং বোতলে পানি খাওয়ায় কোন আপত্তি নাই। তবে ঘুম ও পানি পানের ইসলামী আদব রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে। সেগুলো সংক্ষেপে নিম্নরূপ:

❐ ঘুমের আদব সমূহ:

✪ ১) ঘুমের পূর্বে ওযু করা।
✪ ২) বিছানায় শোয়ার পূর্বে লুঙ্গি বা পরিধেয় বস্ত্রের নিম্নাংশ অথবা অন্য কোন কাপড় দ্বারা বিছানা ঝেড়ে নেয়া।
✪ ৩) ঘুমের পূর্বে যে সকল আমল, জিকির ও তাসবিহ রয়েছে সেগুলো পড়া। তারপর ঘুমের দুআ পড়ে ঘুমানো।
✪ ৪) ডান দিকে কাঁথ হয়ে শোয়া সুন্নত। পেটের উপর ভর করে উপুড় হয়ে বা বাম দিকে কাঁথ হয়ে ঘুমানো ঠিক নয়। তবে উপুড় হয়ে শয়ন করা বেশি খারাপ বাম দিকে কাঁথ হয়ে শয়ন করার চেয়ে। কারণ, হাদিসে উপুড় হয়ে শয়ন করাকে জাহান্নামীদের শয়ন পদ্ধতি হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে। তবে ইচ্ছে করলে কখনও কখনো চিৎ হয়ে শয়ন করা জায়েজ আছে।

❐ পানাহারের আদব সমূহ:

❂ ১. পানাহারের শুরুতে বিসমিল্লাহ পাঠ করা
❂ ২. পানাহার করার প্রথমে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলে মাঝখানে যখনই স্মরণ হবে তখনই বলবে, “বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু ওয়া আখিরাহু” অথবা “বিসমিল্লাহি ফী আওয়ালিহী ওয়া আখিরিহী।”
❂ ৩. পানাহার করার পর আল হামদুলিল্লাহ অথবা খাওয়া শেষের দুআ পাঠ করা বলা সুন্নত।
❂ ৪. ডান হাতে পানাহার করা সুন্নত। বাম হাতে পানাহার করা হারাম এবং শয়তানের কাজ।
❂ ৫. পান করার জন্য গ্লাস বা বোতল যাই হোক না তিন ঢোকে পান করা ভালো। তবে প্রয়োজনবোধে এক ঢোক বা দু ঢোকে পান করাও জায়েজ।
❂ ৬. পানি পান করার সময় গ্লাস বা পানপাত্রে নি:শ্বাস ফেলা ঠিক নয়।
❂ ৭. হেলান দিয়ে পানাহার করা ঠিক নয়।
❂ ৮. বসে পানাহার করা উত্তম। কিন্তু প্রয়োজনবোধে দাঁড়িয়ে বা পথ চলতে চলতে পানাহার করায় কোন আপত্তি নেই। (এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা ইতোপূর্বে করা হয়েছে)
❂ ৯. খাবার নিচে পড়ে গেলে সম্ভব হলে তা পরিষ্কার করে খাওয়া।
❂ ১০. খাবার প্লেট ও আঙ্গুল পরিষ্কার করে খাওয়া।
❂ ১১. খাদ্য-পানীয় অপচয় না করা।
❂ ১২. এক প্লেটে কয়েকজন একসাথে বসে খাওয়া তৃপ্তি অর্জন ও বরকতের কারণ।
❂ ১৩. একসাথে খেতে বসলে নিজের দিক থেকে নিয়ে খাওয়া। হাত বাড়িয়ে অন্যের দিক থেকে তার অনুমতি ছাড়া খাওয়া ঠিক নয়।
❂ ১৪. বেশি গরম অবস্থায় খাওয়া বরকত চলে যাওয়ার কারণ।
❂ ১৫. স্বর্ণ-রৌপ্যের পাত্রে পান করা ঠিক নয়।
❂ ১৬. একসাথে একাধিক ব্যক্তি উপস্থিত থাকলে বড় ও সম্মানিত ব্যক্তির আগে খাওয়া শুরু না করা।
❂ ১৭. মেহমান হিসেবে খেতে গেলে খাওয়ার পর মেহমানের জন্য হাদিসে বর্ণিত দুআ পাঠ করা এবং খাওয়া শেষে যথাসম্ভব সেখানে দেরি না করা। অবশ্য মেজবানের পক্ষ থেকে থাকার সম্মতি থাকলে তাতে সমস্যা নেই ইত্যাদি।

❐ কাপড় ধোয়ার শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা:

🔸 কাপড় ধেয়ার পূর্বে তিনবার নয় এক বার বিসমিল্লাহ বলাই যথেষ্ট। কেবল কাপড় ধোয়া নয় বরং যে কোন কাজের শুরুতে একবার বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত। এতে বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমত ও বরকত নেমে আসে এবং তিনি তাকে সাহায্য করেন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬◍❂◍▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

বাথরুমে স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশা কি গুনাহর কাজ

 প্রশ্ন: বাথরুমে স্বামী-স্ত্রীর মেলামেশা কি গুনাহর কাজ?

▬▬▬◍❂◍▬▬▬
উত্তর:
বাস্তবতা হল, যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের জিজ্ঞাসারাও পরিবর্তন হচ্ছে। বাথরুমে স্ত্রীসহবাস করার বিষয়টিও তেমনই একটি প্রশ্ন। বর্তমানে অনেক মানুষই এ ব্যাপারে জানতে চায়। এটি খুবই স্বাভাবিক।

যাহোক, আমাদের অজানা নয় যে, পূর্ব যুগের পায়খানা/টয়লেট এবং আধুনিক যুগের বাথরুমগুলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক যুগে শহরের উন্নত বাড়িগুলোতে সাধারণত: বাথরুমগুলো মোজাইক, টাইলস, সিমেন্ট ইত্যাদি ব্যবহার করে অত্যন্ত পরিপাটি করে তৈরি করা হয় এবং তা খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জীবাণুমুক্ত রাখা হয়।

এ জাতীয় বাথরুমগুলোতে টয়লেটের পাশাপাশি গোসলের জন্য ঝর্ণা থাকে, কোথাও কোথাও বাথটব থাকে, হাতমুখ ধোয়ার বেসিন থাকে। বেসিনের সামনে আয়না রাখা হয় এবং বিভিন্ন কিছু দ্বারা সজ্জিত রাখা হয়। সেখানে পেশাব-পায়খানা বা ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ থাকে না বললেই চলে। মোটকথা, এগুলো দুর্গন্ধ ও জীবাণু মুক্ত, পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি করে রাখা হয়।
সুতরাং এমন পরিবেশে কেউ যদি বাথরুমে স্ত্রী মিলন করতে চায় তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে তাতে কোনও সমস্যা নাই ইনশাআল্লাহ। হাদিসে এ ব্যাপারে কোনও নিষেধাজ্ঞা বর্ণিত হয় নি। তবে নোংরা ও দুর্গন্ধময় টয়লেটে স্বামী-স্ত্রীর মিলন করা অনুচিত এবং একজন মুসলিম ব্যক্তির আত্মমর্যাদার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ।
যাহোক, আধুনিক বাথরুমগুলোতে স্ত্রী মিলনের ক্ষেত্রে কতিপয় বিষয় লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন:

✪ ১. বাথরুমে সহবাস করা নাজায়েজ না হলে তা থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকা ভালো। কারণ, তা সহবাসের উপযুক্ত স্থান নয়।

✪ ২. কেউ তা কোনও কারণে করতে চাইলে সহবাসের দুআ মুখে উচ্চারণ করে পড়বে না বরং মনে মনে বলবে। কারণ টয়লেটে দুআ, জিকির, তসবিহ, কুরআনের আয়াত, আল্লাহর নাম ইত্যাদি সম্মান জনক বিষয়গুলো মুখে উচ্চারণ করা মাকরূহ। প্রখ্যাত তাবেঈ ইকরিমা রহ. বলেন, “টয়লেটে থাকা অবস্থায় মুখে উচ্চারণ করে যিকির করবে না তবে মনে মনে করতে পারে।” [আল আওসাত. ১/৩৪১]

✪ ৩. টয়লেটে প্রবেশের দুআগুলো (বিসমিল্লাহ..আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিনাল খুবসি ওয়াল খাবাইস) পাঠ করবে। কেননা সেখানে শয়তান হাজির থাকে। দুআ পাঠ করে প্রবেশ করলে শয়তান বনি আদমের লজ্জা স্থান দেখতে পায় না। আর দুআ না পড়ে প্রবেশ না করলে সেখানে সহবাস পরিহার করা কর্তব্য। কারণ শয়তান তাদের ক্ষতি করতে পারে।

▪ আলী ইবনে আবি তালিব রা. থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
سَتْرُ مَا بَيْنَ أَعْيُنِ الْجِنِّ وَعَوْرَاتِ بَنِي آدَمَ إِذَا دَخَلَ أَحَدُهُمْ الْخَلَاءَ أَنْ يَقُولَ بِسْمِ اللَّهِ
“যখন তোমাদের কেউ পায়খানায় প্রবেশ করবে তখন জিন শয়তানের চোখ ও বানী আদমের লজ্জা স্থানের মধ্যে পর্দা হল: বিসমিল্লাহ “আল্লাহর নামে প্রবেশ করছি” বলা। [সহীহ : তিরমিযী ৬০৬, সহীহুল জামি‘ ৩৫১১]
অর্থাৎ টয়লেটে প্রবেশের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করলে জিন-শয়তানদের দৃষ্টির সামনে পর্দা ফেলে দেয়া হয়। ফলে তারা আর মানুষের লজ্জা স্থান দেখতে পায় না।

▪ অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ إِنَّ هذِهِ الْحُشُوْشَ مُحْتَضَرَةٌ فَإِذَا أَتى أَحَدُكُمُ الْخَلَاءَ فَلْيَقُلْ أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ. رَوَاهُ أَبُوْ دَاوٗدَ وَاِبْنُ مَاجَةَ
যায়দ ইবনে আরকাম রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “এসব টয়লেটে জিন-শয়তানরা উপস্থিত হয়। সুতরাং তোমাদের যারা টয়লেটে যাবে তারা যেন এ দুআ পড়ে :
أَعُوذُ بِاللهِ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ.
“আ’উযু বিল্লাহি মিনাল খুবুসি ওয়াল খবায়িস”
“আমি আল্লাহর নিকট নাপাক নর-নারী জিন-শয়তান থেকে আশ্রয় চাই।”
[সহীহ : আবু দাউদ ৬, ইবনে মাজাহ্ ২৯৬, সহীহুল জামি‘ ২২৬৩।]

▪ সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি বলেছে,
من آداب الإسلام أن يذكر الإنسان ربه حينما يريد أن يدخل بيت الخلاء أو الحمَّام ، بأن يقول قبل الدخول : ” اللهم إني أعوذ بك من الخبث والخبائث ” ، ولا يذكر الله بعد دخوله ، بل يسكت عن ذكره بمجرد الدخول .
“ইসলামের শিষ্টাচার হল, মানুষ যখন টয়লেট বা গোসলখানায় প্রবেশ করবে তখন তাদের প্রতিপালককে স্মরণ করবে এভাবে যে, প্রবেশের পূর্বে বলবে,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْخُبْثِ وَالْخَبَائِثِ
“আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিনাল খুবুসি ওয়াল খাবাইস”
অর্থ: “হে আল্লাহ, তোমার নিকট নাপাক নর-নারী জিন-শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি।” [বুখারি ও মুসলিম] আর প্রবেশ করার পর মুখে যিকির পাঠ করবে না বরং প্রবেশ করার সাথে সাথে যিকির পাঠ করা করা বাদ দিয়ে নীরবতা অবলম্বন করবে।” [ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা ৫/৯৩]
✪ ৪. কোনোভাবেই যেন তাদের লজ্জা স্থান বা মিলনের দৃশ্য অন্য মানুষ দেখতে না পায় সে ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে।
আল্লাহু আলাম
▬▬▬◍❂◍▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

মারহাবা কি ইসলামিক পরিভাষা

 মারহাবা ♡ স্বাগতম ♡ ওয়েলকাম ♡

▬▬▬▬◆♡◆ ▬▬▬▬
প্রশ্ন: মারহাবা কি ইসলামিক পরিভাষা? এটা কি বলা যাবে? ইসলামে মানুষকে স্বাগত জানানোর বিধান কি?
উত্তর:
মারহাবা শব্দের অর্থ: স্বাগতম, খোশ আমদেদ, ওয়েলকাম।
এটি সাধারণত: আরবি ভাষীগণ কারও আগমন উপলক্ষে তাকে স্বাগত জানানোর জন্য ব্যবহার করে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু আরবি ভাষী ছিলেন সেহেতু তিনি বিভিন্ন সময় স্বাগত জানানোর ক্ষেত্রে এ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

ইমাম বুখারি রাহ. এ বিষয়ে একটি অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন-যার শিরোনাম হল:

“পরিচ্ছেদ: ২৫৩০. কাউকে মারহাবা বলা। আয়েশা রা. বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতেমা রা. কে বলেছেন, “আমার মেয়েকে মারহাবা (স্বাগতম)। উম্মে হানী রা. কে বলেন, আমি একবার নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এলে তিনি বললেন, “উম্মে হানীকে মারহাবা (স্বাগতম)।”

অত:পর তিনি রাসূল সাল্লাহু সাল্লাম কর্তৃক কায়েস প্রতিনিধি দলের লোকজনকে স্বাগত জানানোর নিম্নোক্ত হাদিসটি উল্লেখ করেছেন:

◈ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবদুল কায়েসের প্রতিনিধি দল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এলে তিনি বললেন, مَرْحَبًا بِالْوَفْدِ “প্রতিনিধি দলকে মারহাবা (স্বাগতম)। [সহিহ বুখারি, অধ্যায়: আদব বা শিষ্টাচার]

◈ তিনি তার প্রিয় কন্যা ফাতিমা রা. কে ‘মারহাবা’ বলে স্বাগত জানিয়েছেন। যেমন:

عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتِ اجْتَمَعَ نِسَاءُ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَلَمْ يُغَادِرْ مِنْهُنَّ امْرَأَةً فَجَاءَتْ فَاطِمَةُ تَمْشِي كَأَنَّ مِشْيَتَهَا مِشْيَةُ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ ‏”‏ مَرْحَبًا بِابْنَتِي ‏”‏ ‏.‏ فَأَجْلَسَهَا عَنْ يَمِينِهِ أَوْ عَنْ شِمَالِهِ
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সকল স্ত্রী তাঁর নিকটেই ছিলেন। এমন সময় ফাতিমা রা.পায়ে হেঁটে সেখানে উপস্থিত হলেন। বলা বাহুল্য, ফাতিমা রা. এর হাঁটার ভঙ্গি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুরূপ ছিল। ফাতিমা রা. দেখে তিনি বললেন, “মারহাবা (স্বাগতম), হে স্নেহের কন্যা।” অতঃপর তাকে তাঁর ডানদিকে কিংবা তাঁর বামদিকে বসালেন…।
[ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম হাদিসটি বর্ণনা করেছেন]

◈ এ ছাড়াও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার চাচাতো বোন আবু তালিবের কন্যা উম্মে হানী বিনতে আবি তালিব রা. কে মারহাবা বলে স্বাগত জানিয়েছেন:

যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট গেলাম। তখন তাঁকে এমন অবস্থায় পেলাম যে, তিনি গোসল করছিলেন এবং তাঁর মেয়ে ফাতিমা রা. তাঁকে পর্দা করছিলেন। আমি তাঁকে সালাম করলে তিনি জানতে চাইলেন, কে ইনি? আমি বললাম, আমি উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব। তিনি বললেন,
مَرْحَبًا بِأُمِّ هَانِئٍ
“মারহাবা (স্বাগতম) হে উম্মে হানী!” অতঃপর যখন তিনি গোসল শেষ করে, একখানি কাপড়ে শরীর ঢেকে দাঁড়িয়ে আট রাকআত সালাত আদায় করলেন।….উম্মে হানী রা. বলেন, তখন ছিল চাশত/যুহা (পূর্বাহ্ণ) এর সময়। [সহীহ বুখারি ৫৮/ জিযিয়া বা কর ও সন্ধি স্থাপন, পরিচ্ছেদ: ৫৮/৯. নারীগণ কর্তৃক নিরাপত্তা ও আশ্রয় প্রদান।]

◈ আধুনিক বিশ্বেও আরবি ভাষীগণ যে সকল বাক্য দ্বারা মানুষকে স্বাগত জানায় সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল, আহলান ওয়া সাহলান, মারহাবা [উভয়টি সমার্থ বোধক]

❑ আগন্তুককে সৌজন্যতার খাতিরে স্বাগত জানানো সুন্নত/মুস্তাহাব:

উপরোক্ত হাদিস সমূহ থেকে বুঝা গেল, আগন্তুককে স্বাগত জানানো সুন্নত বা মুস্তাহাব। ইবনে হাজার আসকালানি রাহ. বলেন,
وفيه دليل على استحباب تأنيس القادم وقد تكرر ذلك من النبي صلى الله عليه وسلم، ففي حديث أم هانئ مرحبا بأم هانئ، وفي قصة عكرمة بن أبي جهل مرحبا بالراكب المهاجر، وفي قصة فاطمة مرحبا بابنتي، وكلها صحيحة، وأخرج النسائي من حديث عاصم بن بشير الحارثي عن أبيه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال له لما دخل فسلم عليه: مرحبا وعليك السلام
“এতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, আগন্তুকের প্রতি সৌজন্য প্রকাশ করা মুস্তাহাব। এটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একাধিক বার ঘটেছে।
– তিনি উম্মে হানী রা. কে মারহাবা বলে স্বাগত জানিয়েছেন।
– আবু জাহেলের ছেলে ইকরিমা রা. এর ঘটনায় তাকে উদ্দেশ্যে করে বলেছেন, “মুহাজির আরোহীকে মারহাবা (স্বাগতম)।”
– ফাতিমা রা. এর ঘটনায় তাকে মারহবা বলে স্বাগত জানিয়েছেন। এ সবগুলোই সহিহ।
– সুনানে নাসায়ীতে আসিম বিন বাশীর আল হারেসি এর হাদিস। তার পিতা (বাশীর আল হারেসি) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিকট সালাম দিয়ে প্রবেশ করেন তখন তাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, “মারহাবা (স্বাগতম) ওয়ালাইকুমুস সালাম।” [ফাতহুর বারী]

উল্লেখ্য যে, আগন্তুক ব্যক্তি সালাম দিলে সালামের উত্তর বলে স্বাগত জানানো অথবা আগে স্বাগত জানিয়ে পরে সালামের উত্তর দেওয়া‌‌-উভয়টি জায়েজ। এতে কানও আপত্তি নাই।

তবে সব মুসলিমদেরকে এই আরবি শব্দ ‘মারহাবা’ ব্যবহার করেই স্বাগত জানাতে হবে-এমন কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। এতে বিশেষ কোনও সওয়াবও নেই। বরং প্রত্যেক ভাষাভাষী লোকেরা তাদের দেশে/সমাজে প্রচলিত বাক্য বা ভাষা দ্বারা স্বাগত জানাবে-এটাই সঠিক পদ্ধতি। তবে যাদের উদ্দেশ্যে মারহাবা বলে স্বাগত জানানো হবে তারা যদি এর অর্থ বুঝে এবং আনন্দিত হয় তাহলে তা ব্যবহারে কোনও আপত্তি নেই। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬◆◯◆ ▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

কবরের ফিতনা দ্বারা কী উদ্দেশ্য? কবরের আজাব এবং কবরের ফিতনা কি ভিন্ন

 প্রশ্ন: কবরের ফিতনা দ্বারা কী উদ্দেশ্য? কবরের আজাব এবং কবরের ফিতনা কি ভিন্ন? কারা এই ফিতনা থেকে রক্ষা পাবে?

উত্তর:
ফিতনা (فتنة) শব্দটির একাধিক অর্থ রয়েছে। যেমন: পরীক্ষা, দাঙ্গা, গোলযোগ, বিপদ, কষ্ট, পরীক্ষা, সম্মোহন ও আকর্ষণ ইত্যাদি। [ডা. ফজলুর রাহমান রচিত আরবী-বাংলা অভিধান]
তবে কুরআন-হাদিসে পরীক্ষা অর্থে ‘ফিতনা’ শব্দটির ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়। আল্লাহ তাআলা অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততিকে ‘ফিতনা’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। যেমন:

আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاعْلَمُوا أَنَّمَا أَمْوَالُكُمْ وَأَوْلَادُكُمْ فِتْنَةٌ
“আর জেনে রেখো যে, নিঃসন্দেহে তোমাদের ধনদৌলত ও সন্তান-সন্ততি তোমাদের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ।” [সূরা আনফাল: ২৮]

ইবনে কাসির রাহ. ফিতনা শব্দের অর্থ করতে গিয়ে বলেন, أي : اختبار وامتحان منه لكم অর্থাৎ পরীক্ষা করা, যাচায় বা পরখ করা। মহান আল্লাহ তোমাদেরকে এগুলো দিয়েছেন যেন তিনি জানতে পারেন যে, তোমরা এসব পেয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় কর ও তার আনুগত্য কর না কি এগুলোতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে তার থেকে দূরে সরে পড়।” [তাফসিরে ইবনে কাসির]

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَنَبْلُوكُم بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً
“আর আমি তোমাদেরকে মন্দ ও ভাল দিয়ে পরীক্ষা করি।” [সূরা আন্বিয়া: ৩৫]
এ সব ক্ষেত্রে ফিতনা অর্থ: পরীক্ষা। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা এসব জিনিস দ্বারা বান্দাকে পরীক্ষা করতে চান। তারপর দেখতে চান, কারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় আর কারা ব্যর্থ হয়।
(যদিও কুরআনে অন্য অর্থেও এর ব্যাবহার রয়েছে)

ঠিক তদ্রূপ ‘কবরের ফিতনা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কবরের পরীক্ষা। শাইখ বিন বায রহ. বলেন,
الفتنة في القبور معناها الابتلاء والامتحان
“কবরের ফেতনা অর্থ: কবরের পরীক্ষা।”

অর্থাৎ আল্লাহর দু জন ফেরেশতা বিশেষ কিছু ব্যক্তি ছাড়া (যেমন: শহিদ, মুসলিম দেশের সীমান্ত প্রহরী মুজাহিদ প্রমুখ) কবরে সকল মানুষের পরীক্ষা নিবেন। এ কারণে হাদিসে এ দুজন ফেরেশতাকে فتان (ফাত্তান) বা পরীক্ষক ফেরেশতা নামে অবহিত করা হয়েছে। সেখানে তারা কবর বাসীদেরকে তিনটি প্রশ্ন করবেন। (যেগুলো নিম্নোক্ত হাদিসে উল্লেখিত হয়েছে) যারা সেগুলোর সঠিক উত্তর দিতে পারবে হবে তারা সফলকাম এবং সৌভাগ্যবান। আর যারা পারবে না তারা ব্যর্থ ও হতভাগ্য।

পরীক্ষায় উত্তীর্ণদেরকে মহা পুরস্কারে ভূষিত করা হবে। আর তা হল, তাদের কবরের সাথে জান্নাতের সংযোগ স্থাপন করা হবে। তারা সেখানে জান্নাতের নিয়ামতরাজি উপভোগ করবেন কিয়ামত পর্যন্ত। আর অকৃতকার্যরা ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে। ফেরেশতাগণ তাদের উপর কঠিন আজাব (শাস্তি) প্রয়োগ শুরু করবেন। জাহান্নামের সাথে তাদের কবরের সংযোগ স্থাপন করা হবে। সেখানে তারা কিয়ামত পর্যন্ত কঠিন আজাবের মধ্যে কালাতিপাত করবে। এ ব্যাপারে হাদিসে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে।

সুতরাং বুঝা গেল, ‘কবরের ফিতনা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হল, কবরের পরীক্ষা তথা দু জন ফেরেশতা কর্তৃক কবর বাসীদেরকে প্রশ্ন করা আর কবরের আজাব হল, সেখানকার শাস্তি। যারা এই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে তারা কবরের আজাবের সম্মুখীন হবে আর যারা সফল হবে তা হতে রক্ষা পাবে। (আল্লাহর নিকট কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাই)

❑ কবরে প্রশ্ন সংক্রান্ত হাদিস:

নিম্নে কবর নামক পরীক্ষার হলের প্রশ্ন সম্পর্কিত দুটি হাদিস পেশ করা হল: (যা আগেই ফাঁস করে দেওয়া হয়েছে)

◈ প্রথম হাদিস:

আনাস ইবনে মালিক রা. হতে বর্ণিত যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّهُ حَدَّثَهُمْ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا وُضِعَ فِي قَبْرِهِ وَتَوَلَّى عَنْهُ أَصْحَابُهُ وَإِنَّهُ لَيَسْمَعُ قَرْعَ نِعَالِهِمْ أَتَاهُ مَلَكَانِ فَيُقْعِدَانِهِ فَيَقُولاَنِ مَا كُنْتَ تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ لِمُحَمَّدٍ فَأَمَّا الْمُؤْمِنُ فَيَقُولُ أَشْهَدُ أَنَّهُ عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ فَيُقَالُ لَهُ انْظُرْ إِلَى مَقْعَدِكَ مِنْ النَّارِ قَدْ أَبْدَلَكَ اللهُ بِهِ مَقْعَدًا مِنْ الْجَنَّةِ فَيَرَاهُمَا جَمِيعًا قَالَ قَتَادَةُ وَذُكِرَ لَنَا أَنَّهُ يُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ ثُمَّ رَجَعَ إِلَى حَدِيثِ أَنَسٍ قَالَ وَأَمَّا الْمُنَافِقُ وَالْكَافِرُ فَيُقَالُ لَهُ مَا كُنْتَ تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ فَيَقُولُ لاَ أَدْرِي كُنْتُ أَقُولُ مَا يَقُولُ النَّاسُ فَيُقَالُ لاَ دَرَيْتَ وَلاَ تَلَيْتَ وَيُضْرَبُ بِمَطَارِقَ مِنْ حَدِيدٍ ضَرْبَةً فَيَصِيحُ صَيْحَةً يَسْمَعُهَا مَنْ يَلِيهِ غَيْرَ الثَّقَلَيْنِ
“বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তার সাথীরা এতটুকু মাত্র দূরে যায় যে, সে তখনও তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়। এ সময় দু জন ফেরেশতা তার নিকট এসে তাকে বসান এবং প্রশ্ন করেন,
এ ব্যক্তি অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তুমি কী বলতে?
তখন মুমিন ব্যক্তি বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহ্‌র বান্দা এবং তাঁর রাসূল। তখন তাঁকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থান স্থলটির দিকে তাকাও। আল্লাহ তোমাকে তার বদলে জান্নাতের একটি অবস্থান স্থল দান করেছেন। তখন সে দু’টি স্থলের দিকেই দৃষ্টি করে দেখবে।
কাতাদাহ রাহ. বলেন, আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, সে ব্যক্তির জন্য তাঁর কবর প্রশস্ত করে দেয়া হবে। অতঃপর তিনি (কাতাদাহ) পুনরায় আনাস রা.-এর হাদিসের বর্ণনায় ফিরে আসেন। তিনি [(আনাস) (রাঃ)] বলেন, “আর মুনাফিক বা কাফির ব্যক্তিকেও প্রশ্ন করা হবে, তুমি এ ব্যক্তি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কী বলতে?”
সে উত্তরে বলবে, আমি জানি না। লোকেরা যা বলত আমি তা-ই বললাম।

তখন তাকে বলা হবে, তুমি না নিজে জেনেছ, না তিলাওয়াত করে শিখেছ। আর তাকে লোহার মুগুর দ্বারা এমনভাবে আঘাত করা হবে যে, এতে সে এমন বিকট চিৎকার করে উঠবে যে, দু জাতি (মানুষ ও জিন) ছাড়া তার আশপাশের সকলেই তা শুনতে পাবে।” [সহীহ বুখারি, অধ্যায়: ২৩/ জানাজা, পরিচ্ছেদ: ২৩/৮৬. কবরের আজাব সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে]

এ হাদিসে কেবল একটি প্রশ্নের কথা এসেছে। তবে অন্য হাদিসে তিনটি প্রশ্নের কথা বর্ণিত হয়েছে।

◈ ২য় হাদিস: (একটি লম্বা হাদিসের অংশ বিশেষ)

«فَتُعَادُ رُوحُهُ فِي جَسَدِهِ فَيَأْتِيهِ مَلَكَانِ فَيُجْلِسَانِهِ فَيَقُولَانِ لَه:ُ مَنْ رَبُّكَ؟ فَيَقُولُ: رَبِّيَ اللَّهُ، فَيَقُولَانِ لَهُ: مَا دِينُكَ؟ فَيَقُولُ دِينِيَ الْإِسْلَامُ، فَيَقُولَانِ لَهُ: مَا هَذَا الرَّجُلُ الَّذِي بُعِثَ فِيكُمْ؟ فَيَقُولُ: هُوَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ، فَيَقُولَانِ لَهُ: وَمَا عِلْمُكَ؟ فَيَقُولُ: قَرَأْتُ كِتَابَ اللَّهِ فَآمَنْتُ بِهِ وَصَدَّقْتُ، فَيُنَادِي مُنَادٍ فِي السَّمَاء:ِ أَنْ صَدَقَ عَبْدِي، فَافْرِشُوهُ مِنْ الْجَنَّةِ، وَأَلْبِسُوهُ مِنْ الْجَنَّةِ وَافْتَحُوا لَهُ بَابًا إِلَى الْجَنَّةِ، قَالَ فَيَأْتِيهِ مِنْ رَوْحِهَا وَطِيبِهَا، وَيُفْسَحُ لَهُ فِي قَبْرِهِ مَدَّ بَصَرِهِ
“অতঃপর তার রূহ তার শরীরে ফিরিয়ে দেয়া হবে। এরপর তার নিকট দু জন ফেরেশতা আগমন করে তাকে উঠিয়ে বসাবে। অতঃপর বলবে:
তোমার রব কে?
সে বলবে: আল্লাহ।
অতঃপর তারা প্রশ্ন করবে: তোমার দ্বীন কি?
সে উত্তর দিবে: আমার দ্বীন ইসলাম।
অতঃপর প্রশ্ন করবে: এ ব্যক্তি কে যাকে তোমাদের মাঝে (নবী হিসেবে) প্রেরিত হয়েছিল?
সে বলবে: তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

অতঃপর তারা বলবে: কীভাবে জানলে?
সে বলবে: আমি আল্লাহর কিতাব পড়েছি, তাতে ঈমান এনেছি ও তা সত্য বলে বিশ্বাস করেছি।

অতঃপর এক ঘোষণাকারী আসমানে ঘোষণা দিবে: আমার বান্দা সত্য বলেছে, অতএব তার জন্য জান্নাতের বিছানা বিছিয়ে দাও, তাকে জান্নাতের পোশাক পরিধান করাও এবং তার জন্য জান্নাতের দিকে একটি দরজা খুলে দাও। তিনি বলেন: ফলে তার কাছে জান্নাতের সুঘ্রাণ ও সুগন্ধি আসবে, তার জন্য তার দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত তার কবর প্রশস্ত করে দেয়া হবে।” [আহমদ ১৮৫৩৪, ইবনে আবি শায়বাহ্ ১২০৫৯, মুসতাদরাক লিল হাকিম ১০৭, সহীহ আত্ তারগীব ৩৫৫৮, সহীহ আল জামি‘ আস্ সগীর ১৬৭৬০সহীহ]

❑ আল্লাহর পথের যুদ্ধরত অবস্থায় শাহাদত বরণকারী এবং মুসলিম দেশের সীমান্ত প্রহরী মুজাহিদগণ কবরের প্রশ্নের সম্মুখীন হবে না:

এ সংক্রান্ত তিনটি হাদিসে পেশ করা হল:

✪ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর এক সাহাবী থেকে বর্ণিত যে, এক সাহাবী জিজ্ঞাসা করলেন,
عَنْ رَجُلٍ، مِنْ أَصْحَابِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم أَنَّ رَجُلاً قَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ مَا بَالُ الْمُؤْمِنِينَ يُفْتَنُونَ فِي قُبُورِهِمْ إِلاَّ الشَّهِيدَ قَالَ ‏ “‏ كَفَى بِبَارِقَةِ السُّيُوفِ عَلَى رَأْسِهِ فِتْنَةً ‏”‏
হে আল্লাহর রাসূল! শহীদ ব্যতীত অন্যান্য মুমিনগণ কবরের ফিতনার সম্মুখীন হবে এর কারণ কি? তিনি বললেন, তার মাথার উপর উজ্জ্বল তরবারি তাকে কবরের ফিতনা থেকে নিরাপদ রাখবে।

[সুনান আন-নাসায়ী, অধ্যায়: ২১/ জানাজা, পরিচ্ছেদ: ১১২/ শহীদ সহীহ। আল-আহকাম ৩৬, আত-তা’লীকুর রাগীব ২/১৯৭]

✪ সালমান ফারেসী রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি,
«رِبَاطُ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ خَيْرٌ مِنْ صِيَامِ شَهْرٍ وَقِيَامِهِ وَإِنْ مَاتَ جَرَى عَلَيْهِ عَمَلُهُ الَّذِي كَانَ يَعْمَلُهُ وَأُجْرِيَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ وَأَمِنَ الْفَتَّانَ»
“আল্লাহর পথে একদিন বা একরাত সীমানা পাহারা দেয়া, একমাসের সওম পালন ও সালাত আদায় করা হতে উত্তম। আর ঐ প্রহরী যদি এ অবস্থায় মারা যায়, তবে তার কৃতকর্মের এ পুণ্য ‘আমলের সাওয়াব অবিরত পেতে থাকবে, তার জন্য সর্বক্ষণ রিযক (জান্নাত হতে) আসতে থাকবে এবং সে কবরের কঠিন পরীক্ষা হতে মুক্তি পাবে। [সহিহ মুসলিম]

✪ অন্য হাদিসে এসেছে, ফাদালাহ ইবনে উবাইদ রা. সূত্রে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
كُلُّ الْمَيِّتِ يُخْتَمُ عَلَى عَمَلِهِ إِلَّا الْمُرَابِطَ، فَإِنَّهُ يَنْمُو لَهُ عَمَلُهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ، وَيُؤَمَّنُ مِنْ فَتَّانِ الْقَبْرِ
“প্রত্যেক ব্যক্তির মৃত্যুর সাথে সাথে তার আমল শেষ হয়ে যায় কিন্তু সীমান্ত প্রহরায় সাওয়াব বন্ধ হয় না। কিয়ামত পর্যন্ত তার আমলের সাওয়াব বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং সে কবরের ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকবে।”
[সুনান আবু দাউদ (তাহকিক কৃত), অধ্যায়: ৯/ জিহাদ, পরিচ্ছদ: ১৬. সীমান্ত পাহারা দেয়ার ফযিলত-সহিহ]

কতিপয় আলেম বলেন, নবী-রাসূলগণকেও কবরে এই তিনটি প্রশ্ন করা হবে না। কেননা, তাদের উম্মতদেরকে তাদের সম্পর্কেই প্রশ্ন করা হবে।

মহান আল্লাহর নিকট দুআ করি, তিনি যেন আমাদেরকে বেঁচে থাকা অবস্থায় কবরের প্রশ্ন সমূহের উত্তর দেওয়ার জন্য যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফিক দান করেন এবং কবরের ভয়াবহ আজাব থেকে রক্ষা করেন। আমিন।
▬▬▬❂❂❂▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

রাস্তার ১৫টি হক এবং নিরাপদ সড়কের জন্য ইসলামের চমৎকার দিক-নির্দেশনা

 প্রশ্ন: ইসলামের দৃষ্টিতে রাস্তার হক সমূহ কি? নিরাপদ সড়কের জন্য ইসলামের দিক-নির্দেশনা কী?

উত্তর:
ইসলাম একটি অত্যন্ত উন্নত ও সুসভ্য জীবনাদর্শের নাম। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইসলামের রয়েছে চমৎকার সব দিক-নির্দেশনা। তাইতো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাস্তার হক এবং রাস্তা চলাচলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন শিষ্টাচার শিক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সমাজে “নিরাপদ সড়ক চাই” বলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করা হচ্ছে, কত মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ, সেমিনার-সেম্পোজিয়াম, পোস্টার, ব্যানার, গণমাধ্যমে প্রচারণা ইত্যাদি অনেক কিছু করা হচ্ছে। কিন্তু নিরাপদ সড়কের দাবীতে এমন কিছু করা হচ্ছে যা এই দাবীর সাথে সাংঘর্ষিক। যেমন: নিরাপদ রাস্তার দাবীতে গাড়ি ভাঙচুর, রাস্তা অবরোধ, রাস্তা আটকিয়ে সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ, মিছিল-মিটিং এবং রাস্তায় কাঠ, টায়ার ইত্যাদি পুড়িয়ে এক ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা এবং গাড়ি দুর্ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত এবং সঠিক বিচার ও ক্ষতিপূরণের পরিবর্তে বহু নিরপরাধ মানুষের গাড়ি ভাঙচুর, অগ্নি সংযোগ, বাছ-বিচার ছাড়া সন্দেহভাজনকে গণধোলাই ইত্যাদি। অর্থাৎ নিরাপদ সড়কের দাবীদাররাই সড়ককে অনিরাপদ করে তুলছে।
অথচ ইসলাম আমাদেরকে নিরাপদ সড়ক এবং পথিকের নির্বিঘ্নে পথ চলার স্বার্থে বেশি কিছু রাস্তার হক এবং পথিকের আচরণ বিধি দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, প্রকৃত ইসলামের আলো থেকে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা অনেক দূরে অবস্থানের ফলে সেগুলো অধিকাংশই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ ইসলাম নির্দেশিত এ সকল রাস্তার হক ও পথিকের আচরণ বিধি মেনে চললে এ সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সুন্দর সমাধান করা সম্ভব।

তাহলে আমরা জেনে নেই, ইসলাম নির্দেশিত রাস্তার হক এবং পথিকের আচরণবিধি সমূহ। নিচে এ বিষয়গুলো পয়েন্ট ভিত্তিক সংক্ষেপে আলোচনা করা হল: وبالله التوفيق

রাস্তার হক সমূহ: (১৫টি)

১. রাস্তায় না বসা।
২. দৃষ্টি অবনমিত রাখা।
৩. মানুষকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা।
৪. পথ চলার ক্ষেত্রে সালাম লেনদেন করা।
৫. সৎকাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা।
৬. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা।
৭. রাস্তায় মল-মূত্র ত্যাগ করা থেকে বিরত থাকা।
৮. গতি নিয়ন্ত্রণ করা।
৯. দম্ভভরে না চলা (বিনয় অবলম্বন করা)।
১০. পথহারাকে পথ দেখিয়ে দেওয়া।
১১. মজলুম ও বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা।
১২. বোঝা বহনকারীকে (বোঝা উঠানো বা নামানোর ক্ষেত্রে) সহযোগিতা করা।
১৩. ভালো কথা বলা।
১৪. হাঁচির জবাব দেয়া।
১৫. অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করা।

◯ নিম্নে কুরআন ও হাদিসের আলোকে উপরোক্ত বিষয় সমূহ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল:

আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা রাস্তার উপর বসা থেকে দূরে থাকো।”
লোকজন বলল, এ ছাড়া তো আমাদের কোন উপায় নেই। কেননা, এটাই আমাদের উঠাবসার জায়গা এবং এখানে বসেই আমরা কথাবার্তা বলে থাকি।
তিনি বলেন, “যদি তোমাদের সেখানে বসতেই হয়, তবে রাস্তার হক আদায় করবে।”
তারা প্রশ্ন করলেন: রাস্তার হক কি?

তিনি বললেন,
غَضُّ الْبَصَرِ، وَكَفُّ الأَذَى، وَرَدُّ السَّلاَمِ، وَأَمْرٌ بِالْمَعْرُوفِ، وَنَهْىٌ عَنِ الْمُنْكَرِ
১. “দৃষ্টি অবনমিত রাখা,
২. মানুষকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা,
৩. সালামের উত্তর দেওয়া,
৪. সৎকাজের আদেশ দেওয়া
৫. এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা।”
[সহিহ বুখারি (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৩৮/ জুলুম ও কিসাস, পরিচ্ছেদ: ১৫৪৬. ঘরের আঙ্গিনা ও তাতে বসা এবং রাস্তার উপর বসা]

আর এটা বাস্তব যে, ইসলাম নির্দেশিত রাস্তার আদব সমূহ রক্ষা এবং রাস্তার হক সমূহ বাস্তবায়ন আদায় না করার কারণে প্রচুর পরিমাণে রোড এক্সিডেন্ট ও নানা দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।

❑ ১. রাস্তায় বসা নিষেধ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাস্তায় বসতে নিষেধ করেছেন। অথচ কিছু মানুষ রাস্তায় এমনভাবে দাঁড়ায় বা বসে আড্ডা মারে যে, তাতে যাতায়াতকারীর কষ্ট হয়। অনেক সময় গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হয়। এছাড়াও রাস্তায় ক্রিকেট-ফুটবল খেলা, রাস্তা দখল করে গাড়ির অবৈধ পার্কিং, দোকানপাটে ফুটপাথ একাকার, হাঁটার পথ বেদখল ইত্যাদি কারণে প্রতিদিন যানজটে নগরবাসীর ত্রাহি দশা অবস্থার সৃষ্টি হয়।

❑ ২. দৃষ্টি অবনত রাখা:

আল্লাহ তাআলা পুরুষদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
قُلْ لِّلْمُؤْمِنِیْنَ یَغُضُّوْا مِنْ اَبْصَارِهِمْ وَ یَحْفَظُوْا فُرُوْجَهُم ذٰلِكَ اَزْكٰی لَهُمْ اِنَّ الله خَبِیْرٌۢ بِمَا یَصْنَعُوْنَ .
“মুমিন পুরুষদের বলে দিন, তারা যেন দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য উৎকৃষ্ট পন্থা। তারা যা কিছু করে আল্লাহ সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ অবগত।” [সূরা নূর: ৩০]
আর নারীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,
وَ قُلْ لِّلْمُؤْمِنٰتِ یَغْضُضْنَ مِنْ اَبْصَارِهِنَّ وَ یَحْفَظْنَ فُرُوْجَهُنَّ وَ لَا یُبْدِیْنَ زِیْنَتَهُنَّ
“এবং মুমিন নারীদের বলে দিন, তারা যেন দৃষ্টি অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে এবং নিজেদের ভূষণ প্রকাশ না করে।” [সূরা নূর: ৩১]

আর ইসলামের দৃষ্টিতে রাস্তা অন্যতম একটি হক হল, দৃষ্টি অবনত রাখা।

এ বিধানটির প্রতি আমাদের অবহেলার কারণে প্রচুর পরিমাণ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। রাস্তায় চলার সময় বিপরীত লিঙ্গের দিকে তাকাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বাইক বা গাড়ি এক্সিডেন্ট ঘটে, চলার পথে রাস্তার খাম্বার সাথে ধাক্কা লেগে বা গর্তে পতিত হয়ে আহত-নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। কিছু বখাটে যুবক রাস্তায় দাঁড়িয়ে নারীদেরকে ইভ টিজিং করে-যা শুধু ইসলামের দৃষ্টিতে গুনাহের কারণ নয় বরং প্রচলিত আইনেও দণ্ডনীয় অপরাধ।

❑ ৩. মানুষকে কষ্ট দেওয়া হতে বিরত থাকা:

রাস্তার অন্যতম হক হল, পথিক, যাত্রী সাধারণ বা কোনও মানুষকে কষ্ট না দেয়া। অথচ আমরা মানুষকে কতভাবে যে কষ্ট দেই তার কোনও ইয়ত্তা নাই।

কষ্ট দেওয়ার বিভিন্ন পদ্ধতি:

◈ রাস্তায় গাছের গুড়ি ফেলা, টায়ার জ্বালানো, অহেতুক রাস্তা বন্ধ করা, রাস্তা কেটে রাখা, ফলের খোসা-ময়লা-আবর্জনা ও উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলা, পানের পিক ফেলা, দুর্গন্ধ ছড়ায় এমন কোনও জিনিস ফেলে রাখা, ছাদ থেকে পানি নিষ্কাশনের পাইপ রাস্তায় দেওয়া। এসব কষ্ট দেওয়ার নানা উপায়।

◈ ফুটপাতে বা রাস্তায় দোকান বসানো। যার কারণে চলাচলের পথ সংকীর্ণ হয়। এটাও কষ্ট দেওয়ার অন্তর্ভুক্ত। দোকানের সীমানা বাড়াতে বাড়াতে রাস্তার মধ্যে চলে যাওয়া, অথবা বাড়ির প্রাচীর বাড়িয়ে দেওয়া; যে কারণে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় বা সংকীর্ণ হয়ে যায়। এগুলোও কষ্টের কারণ।

◈ যত্রতত্র সাইকেল, মোটরসাইকেল, গাড়ি পার্ক করে রাখা। নিষিদ্ধ জায়গায় গাড়ি পার্ক করাও রাস্তার হক নষ্ট করার শামিল।

◈ ফুটপাথ দখল করে ক্রয়-বিক্রয় করা, দোকান ঘর তৈরি করা বা দোকানের মালামাল রাখা। এতে মানুষের পথ চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। নিঃসন্দেহে তা রাস্তার হক নষ্ট করার শামিল।

◈ অনেক মানুষ গাড়ি চালানোর সময় অকারণে ভেঁপু বাজিয়ে শব্দ দূষণ করে এবং ইচ্ছাকৃত ভাবে রাস্তায় ধুলো ও কাদা-পানি ছিটিয়ে মানুষকে কষ্ট দেয়।

◈ কিছু উঠতি বয়সের বখাটে যুবক জনবহুল রাস্তায় গাড়ি ড্রিফটিং করে এবং ওভারটেকিং এর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে বড় বড় দুর্ঘটনার শিকার হয়।

◈ কিছু চালক বেপরোয়া গাড়ি চালায়, কেউ বা মদ ও নেশা দ্রব্য পান করে ড্রাইভিং করে। অনেকে ফাসেক ও আত্মমর্যাদা হীন মানুষ গাড়িতে উচ্চ আওয়াজে মিউজিক চালিয়ে শব্দ দূষণের পাশাপাশি মানুষকে বিরক্ত করে।

এ সবই শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে গুনাহের কাজ এবং দেশীয় আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ। ট্রাফিক পুলিশের উচিৎ, এসকল অপরাধীদেরকে ছাড় না দেয়া।

❑ ৪. পথ চলার ক্ষেত্রে সালাম লেনদেন করা:

হাদিসে আছে, আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يُسَلِّمُ الصَّغِيرُ علَى الكَبِيرِ، والمارُّ علَى القاعِدِ، والقَلِيلُ علَى الكَثِيرِ
“ছোট বা কম বয়সী বয়োজ্যেষ্ঠকে, গমনকারী ব্যক্তি বসে থাকা ব্যক্তিকে ও কম সংখ্যক মানুষ বেশি সংখ্যক মানুষকে সালাম দিবে। [বুখারি ও মুসলিম)]

অন্য হাদিসে এসেছে, আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
يُسَلِّمُ الرَّاكِبُ عَلَى الْمَاشِي وَالْمَاشِي عَلَى الْقَاعِدِ وَالْقَلِيلُ عَلَى الْكَثِيرِ ‏
“আরোহী ব্যক্তি পথচারীকে, পথচারী ব্যক্তি বসে থাকা ব্যক্তিকে এবং অল্প সংখ্যক লোক অধিক সংখ্যককে সালাম করবে।” [সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ৪০/ সালাম পরিচ্ছেদ: ১. আরোহী পথচারীকে এবং অল্প সংখ্যক অধিক সংখ্যককে সালাম করবে]
অনুরূপভাবে সালামের উত্তর দেয়া মুসলিমদের পাঁচটি হকের অন্তর্ভুক্ত।

চলার পথে সালাম আদান-প্রদান করা উত্তম চরিত্র, অন্যের সম্মান প্রদর্শন, শালীনতা, ভদ্রতা ও উত্তম চরিত্রের প্রমাণ। পথিক বা যাত্রাপথে থাকা ব্যক্তি পথের ধারে অবস্থানরত লোকজনকে সালাম দিবেন। আর কেউ সালাম দিলে সুন্দরভাবে তার উত্তর দিতে হবে। এটি এক মুসলিমের উপর আরেক মুসলিমের অন্যতম হক। এটি রাস্তার অন্যতম হক।

সুতরাং আমাদের কর্তব্য, রাস্তায় চলার সময় ইসলামি সংস্কৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি চর্চা ও সম্প্রসারণ করার মাধ্যমে ইসলামি শিষ্টাচার ও সম্মানজনক পরিবেশ বজায় রাখা।

❑ ৫ . সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ বাধা প্রদান করা:

সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজ বাধা প্রদান করা রাস্তার অন্যতম হক। মানুষকে কল্যাণের পথে আহ্বান করা, ইসলামি রীতি-নীতি ও বিধিবিধান মেনে চলার ব্যাপারে মানুষকে সচেতন করা, সবধরণের শরিয়া ও আইন বিরুদ্ধ অন্যায় ও ক্ষতিকর কার্যক্রম সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করা। বিশেষ করে উঠতি যুবক এবং তরুণ প্রজন্মকে ইসলামের শিক্ষার আলোকে গড়ে তোলা। এগুলো সবই এর অন্তর্ভুক্ত।

ইসলাম নির্দেশিত এসব হক বাস্তবায়ন করা হলে নি:সন্দেহে ট্রাফিক দুর্ঘটনা কমবে আর আমরা পাব নিরাপদ সড়ক এবং শান্তিপূর্ণ সুন্দর সামাজিক জীবন।

❑ ৬. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা:

❂ ক. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা ঈমানের অন্যতম একটি শাখা:

রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা শুধু রাস্তার একটি হক নয় বরং তা ঈমানের অন্যতম একটি শাখা। যেমন:

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
الإِيمَانُ بِضْعٌ وَسَبْعُونَ أَوْ بِضْعٌ وَسِتُّونَ شُعْبَةً فَأَفْضَلُهَا قَوْلُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَدْنَاهَا إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ
“ঈমানের শাখা সত্তরটিরও কিছু বেশি। অথবা ষাটটিরও কিছু বেশি। এর সর্বোচ্চ শাখা হল, লা ইলা হা ইল্লাল্লাহ তথা “আল্লাহ ব্যতীত সত্য উপাস্য নেই” এ কথার স্বীকৃতি দেয়াা আর এর সর্বনিম্ন শাখা হল, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করা।”
[সহিহ মুসলিম, অধ্যায়: ১/ কিতাবুল ঈমান, পরিচ্ছেদ: ১২. ঈমানের শাখা-প্রশাখার সংখ্যা, তার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন শাখার বর্ণনা, লজ্জাশীলতার ফযিলত এবং তা ঈমানের শাখা হওয়ার বর্ণনা]

❂ খ. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করার সওয়াব সদকার সমতুল্য:

আবু হুরায়রা রা. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন,
يُمِيطُ الأَذَى عَنْ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
“রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু দূর করা সদকাস্বরূপ।” [সহিহ বুখারি]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু যর গিফারি রা.-কে বেশ কিছু উপদেশ দেন। সেগুলো মধ্যে একটি ছিল:
وَإِمَاطَتُكَ الحَجَرَ وَالشَّوْكَةَ وَالعَظْمَ عَنِ الطَّرِيقِ لَكَ صَدَقَةٌ.
“রাস্তা থেকে পাথর, কাঁটা, হাড্ডি সরানোও তোমার জন্য একটি সদকা।” [জামে তিরমিযী, হাদিস ১৯৫৬]

❂ গ. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রাপ্তির অন্যতম একটি কারণ:

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
بيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي بِطَرِيقٍ وَجَدَ غُصْنَ شَوْكٍ عَلَى الطَّرِيقِ فَأَخَذَهُ فَشَكَرَ اللهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ
“এক ব্যক্তি রাস্তা দিয়ে চলার সময় রাস্তায় কাঁটাদার গাছের একটি ডাল পেল। তখন সেটাকে রাস্তা হতে অপসারণ করলে আল্লাহ তার এ কাজকে কবুল করে নিলেন ফলে তাকে ক্ষমা করে দিলেন।” [সহিহ বুখারি, অধ্যায়: ৪৬/ অত্যাচার, কিসাস ও লুণ্ঠন, পরিচ্ছেদ: ৪৬/২৮. যে ব্যক্তি ডালপালা ও কষ্টদায়ক দ্রব্য রাস্তা থেকে তুলে দূরে নিক্ষেপ করে]

❂ রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস অপসারণ করা নেকির কাজ-যা জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ:

– মুয়াবিয়া ইবনে কুররা রা. বলেন, আমি মাকিল আল-মুযানী রা. এর সাথে ছিলাম। তিনি রাস্তা থেকে একটা কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করলেন। অতঃপর আমিও রাস্তায় কিছু একটা দেখে তা সরালাম। তিনি বলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তোমাকে কিসে এই কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে?
আমি বললাম, আপনাকে এরূপ করতে দেখে আমিও তাই করলাম। তিনি বলেন, হে ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি খুব উত্তম কাজ করেছো। আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি:
مَنْ أَمَاطَ أَذًى عَنْ طَرِيقِ الْمُسْلِمِينَ كُتِبَ لَهُ حَسَنَةٌ، وَمَنْ تُقُبِّلَتْ لَهُ حَسَنَةٌ دَخَلَ الْجَنَّةَ‏
“যে ব্যক্তি মুসলিমদের রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করে, তার জন্য একটি সওয়াব লেখা হয়। আর যার একটি সওয়াবের কাজ কবুল হয়, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [আল-আদাবুল মুফরাদ বিবিধ বিষয়, পরিচ্ছেদ: ২৬৮- বিদ্রোহ, সনদ হাসান]

উপরোক্ত হাদিস সমূহ থেকে দ্ব্যার্থহীন ভাবে প্রমাণিত হয় যে, চলাচলের পথ কণ্টক মুক্ত রাখা, যে সব জিনিস পথিকের চলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ও কষ্ট দেয় সেগুলো অপসারণ করা এবং রাস্তার পরিচ্ছন্নতা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ
ও সওয়াবের বিষয়।
অথচ আমাদের সমাজের বেশির ভাগ মানুষ রাস্তা-ঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অত্যন্ত উদাসীন। মানুষ ময়লা ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করে না। যার কারণে রাস্তায় দেখা যায় ময়লা আবর্জনার ভাগাড়। আমরা যত্রতত্র থুতু ফেলছি। নাকে কোনও কিছু না দিয়ে হাঁচি দিচ্ছি। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলছি। বাদামের খোসা, কলার খোসা, বাসার ময়লা, চিপসের প্যাকেট, সিগারেটের প্যাকেট, পানের পিক, পলিথিন ইত্যাদি রাস্তায় ফেলছি। এমনকি বাসার উপর থেকে ময়লা ডাস্টবিনে না ফেলে রাস্তার উপর ফেলে দিচ্ছি। এতে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। রোগ জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। রাস্তা অপরিচ্ছন্ন হচ্ছে। দুর্গন্ধের সৃষ্টি হচ্ছে। রাস্তার পাশে ডাস্টবিন আছে। কিন্তু সময়মত ডাস্টবিনগুলো পরিষ্কার করা হয় না।
গ্রামে গঞ্জে দেখা যায়, ছোট-বড় প্রায় সকল রাস্তাই চাষিদের দখলে। অধিকাংশ রাস্তার উপর ধান মাড়াই, ভুট্টা মাড়াই, পাট ও পাটকাঠি শুকানো, ধানের খড় শুকানো সহ খড় ও পাটকাঠির গাদা তৈরি করা হচ্ছে। আর ধান, ভুট্টা ও পাটে একাকার হয়ে আছে রাস্তার দুই-তৃতীয়াংশ জায়গা। ফলে প্রতিনিয়তই ঘটছে দুর্ঘটনা এবং মানুষ নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এগুলো সবই ইসলামের শিখানো রাস্তার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং তা পথিকের জন্য নিরাপদ করার প্রতি গুরুত্ব হীনতা এবং তার হকের ব্যাপারে উদাসীনতার প্রমাণ।

❑ ৭. রাস্তায় মল-মূত্র ত্যাগ করা করা থেকে বিরত থাকা:

রাস্তার অন্যতম হক হল, রাস্তায় মল-মূত্র ত্যাগ না করা। এটি কবিরা গুনাহ।

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
اتَّقُوْا اللَّاعِنَيْنِ، قَالُوْا: وَمَا اللَّاعِنَانِ يَا رَسُوْلَ اللهِ ؟! قَالَ: الَّذِيْ يَتَخَلَّى فِيْ طَرِيْقِ النَّاسِ أَوْ ظِلِّهِمْ.
‘‘তোমরা অভিশাপের দু টি কারণ হতে দূরে থাকো। সাহাবিগণ বললেন, অভিশাপের কারণ দুটি কি? তিনি বললেন, মানুষ চলাচলের রাস্তায় অথবা ছায়াবিশিষ্ট গাছের তলায় মল-মূত্র ত্যাগ করা।” [সহিহ মুসলিম]

অথচ আমাদের সমাজে-বিশেষ করে শহরের রাস্তায় নগরবাসীকে যত্রতত্র মল মূত্র ত্যাগ করতে দেখা যায়। অনেক লোক রাস্তা সংলগ্ন স্থানে মূত্র ত্যাগ করে। ফলে, তা ড্রেন গড়িয়ে রাস্তায় চলে আসে। এতে পথচারীদের ব্যাপক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। একটু বৃষ্টি হলে সড়ক দ্বীপের নালায় জমা হওয়া প্রস্রাবের উৎকট দুর্গন্ধে হাঁটা যায় না। বৃষ্টির পানি ও নালার পানি একত্রে মিশে অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি করে। পথিকের হাঁটতে গেলে দম বন্ধ হয়ে আসে।
আমাদের দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ পথের ধারে অথবা ফুটপাথে প্রস্রাব করতে লজ্জাবোধ করেন না। এটি লজ্জাহীনতার পাশাপাশি অসভ্যতারও প্রমাণ।

❑ ৮. গতি নিয়ন্ত্রণ করা:

গাড়ি চালানো বা পায়ে হাঁটা সকল ক্ষেত্রেই ইসলামের নির্দেশনা হল, পায়ে হেঁটে পথ চলা বা গাড়ি চালনা করার ক্ষেত্রে মধ্যম গতি অবলম্বন করা। খুব দ্রুত বা খুব ধীরে চলা ঠিক নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন,
اقْصِدْ فِي مَشْيِكَ وَاغْضُضْ مِن صَوْتِكَ ۚ إِنَّ أَنكَرَ الْأَصْوَاتِ لَصَوْتُ الْحَمِيرِ
”বরং তোমার চলাফেরায় তুমি মধ্যপন্থা অবলম্বন করো (সুসংযত থাকো) আর তোমার কণ্ঠস্বর নিচু রেখো।” [সূরা লোকমান: ১৯]

বুয়েটের সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইন্সটিটিউট (এআরআই) দুর্ঘটনার কারণ-সংক্রান্ত পুলিশের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে থাকে। ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনার বিশ্লেষণ করে এআরআই বলছে, দেশে ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও গতির কারণে ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। আর পরিবেশ-পরিস্থিতিসহ অন্যান্য কারণে দুর্ঘটনার পরিমাণ ১০ শতাংশ।” [প্রথম আলো পত্রিকা অনলাইন]

❑ ৯. দম্ভভরে না চলা (বিনয় অবলম্বন করা):
মহান আল্লাহ বলেন,

وَلَا تَمْشِ فِي الْأَرْضِ مَرَحًا ۖ إِنَّكَ لَن تَخْرِقَ الْأَرْضَ وَلَن تَبْلُغَ الْجِبَالَ طُولًا ‎-=كُلُّ ذَٰلِكَ كَانَ سَيِّئُهُ عِندَ رَبِّكَ مَكْرُوهًا
“পৃথিবীতে দম্ভভরে পাদচারণা করো না। তুমি তো ভূ-পৃষ্ঠকে বিদীর্ণ করতে পারবে না এবং উচ্চতায় তুমি পর্বত সমান হতে পারবে না।” [সূরা ইসরা: ৩৭]

মানুষের উচিত, দয়ালু, বিনয়ী ও নম্র হওয়া। প্রকৃতপক্ষে মানুষের অহংকার করা সাজে না। কারণ সে তো অতিশয় দুর্বল ও অন্যের মুখাপেক্ষী। সে রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, ক্ষুধা-পিপাসায় অচল হয়ে পড়ে, শারীরিক আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয়, মানসিক কষ্টে মুষড়ে পড়ে, ভয়ঙ্কর কিছু দেখলে বা শুনলে ভয়ে বিহ্বল হয়, বিভিন্ন কারণে দু:শ্চিন্তা ও উৎকণ্ঠায় অস্থির হয়, ঠাণ্ডা ও গরমে কাতর হয়, কষ্টে কান্না করে, বয়সের ভারে দুর্বল হয় এবং এক সময় সবকিছু ছেড়ে শূন্য হস্তে দুনিয়া থেকে চিরবিদায় নিতে হয়।

এমন যার বৈশিষ্ট্য সে অহংকার করার যোগ্য নয়। অহংকার তো কেবল তাকে সাজে যে এসকল দুর্বলতা ও অন্যের মুখাপেক্ষিতা থেকে ঊর্ধ্বে। আর তিনি হলেন একমাত্র বিশ্বচরাচরের একচ্ছত্র অধিপতি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। তিনি ছাড়া কোনও সৃষ্টির অহংকার করার অধিকার নেই।

কিন্তু অজ্ঞ মানুষ গাড়ি, বাড়ি, সম্পদের প্রাচুর্যতা, ক্ষমতা ও পদমর্যাদা লাভ করেই নিজের সব অক্ষমতা, দুর্বলতা ও মুখাপেক্ষিতার কথা ভুলে যায়! কিছু অহংকারী গাড়ি চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালনা ও অহংকার সূলভ আচরণের ফলে কত রিক্সাওয়ালা, টেম্পুওয়ালা, রাস্তার হকার, ভিক্ষুক এবং সাধারণ পথচারী ক্ষতিগ্রস্ত হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অথচ ইসলামে পথ চলায় দম্ভ ও অহমিকা পরিহার করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

এছাড়াও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও কতিপয় রাস্তার হকের কথা বলেছেন। যেমন:

❑ ১০ ও ১১. পথহারাকে পথ দেখিয়ে দেওয়া এবং মজলুম ও বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা:
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
«إن كنتم لا بد فاعلين فأفشوا السلام، وأعينوا المظلوم، واهدوا السبيل
“তোমাদেরকে যদি রাস্তায় বসতেই হয় তাহলে, সালামের সম্প্রসারণ কর, মাজলুমকে সাহায্য করো এবং মানুষকে পথ দেখাও।” [মুসনাদে আহমদ, হা ১৭৭৫২]

অন্য হাদিসে এসেছে,
وتغيثوا الملهوف، وتهدوا الضال“

“”আর তোমরা বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করবে এবং পথহারাকে পথ দেখাবে।
সহিহ আবু দাউদ, হা/২/৬৭২

রাস্তায় মানুষ নানা বিপদাপদে পতিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের দায়িত্ব হল, তাকে সাহায্য-সহযোগিতার জন্য ছুটে আসা। যেমন: অনাহারীকে খাবার দান, নিঃস্বকে আর্থিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা, দুর্বল ও নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করা ইত্যাদি।

কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হল, অনেক সময় গাড়ি দুর্ঘটনার শিকার হলে, কিছু নিকৃষ্ট মানুষ বিপদগ্রস্তকে সাহায্যের পরিবর্তে তার মালামাল ও অর্থ-সম্পদ লুটতে শুরু করে! মানুষ হিসেবে এটা যে, কত বড় অমানবিক ও লজ্জাজনক কাজ তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়। [আল্লাহ তাআলা অবুঝ ও অজ্ঞদেরকে সঠিক জ্ঞান দান করুন]

অনুরূপভাবে ভিনদেশী, পথভোলা বা নতুন আগন্তুক ব্যক্তিকে সঠিক পথ দেখানোও
রাস্তার অন্যতম হক। কেউ এ ক্ষেত্রে অবহেলা করলে বা তাকে ভুল পথ দেখালে নিঃসন্দেহে মানুষের হক নষ্ট করার অপরাধে গুনাহগার হবে।

❑ ১২. বোঝা বহনকারীকে (বোঝা উঠানো বা নামানোর ক্ষেত্রে) সহযোগিতা করা:

في حديث ابن عباس عند البزار من الزيادة: «وأعينوا على الحمولة»،
মুসনাদে বাযযারে ইবনে আব্বাস রা. এর বর্ণনায় রাস্তার হক সম্পর্কে অতিরিক্ত এসেছে, “তোমরা বোঝা বহনকারীকে (বোঝা উঠানো বা নামানোর ক্ষেত্রে) সহযোগিতা কর।”

চলার পথে মানুষকে তার বোঝাটা উঠাতে সাহায্য করা উচিৎ। একজন পথচারী অন্য পথচারীর নিকট এই সামান্য সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার রাখে।

❑ ১৩. ভালো কথা বলা:

ইসহাক ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবু তালহার পিতা [আবদুল্লাহ রা.] থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, (আমার পিতা) আবু তালহা রা. বলেছেন, আমরা (বাড়ির সামনের খোলা) আঙ্গিনায় বসে কথাবার্তা বলছিলাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এলেন এবং আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, রাস্তা-ঘাটে বৈঠক-মজলিস করা তোমাদের অভ্যাস কেন? রাস্তাঘাটে মজলিস-বৈঠক করা তোমরা বর্জন করবে।

আমরা বললাম, আমরা তো বসেছি কোনও অসুবিধা করার উদ্দেশ্য নিয়ে নয়। আমরা বসে আলাপ-আলোচনা ও কথাবার্তা বলছি।

তিনি বললেন, যদি তা না করে না-ই পার, (সেখানে বসতেই হয়) তা হলে রাস্তার হক আদায় করবে। আর তা হল,
حَقَّهَا غَضُّ الْبَصَرِ وَرَدُّ السَّلاَمِ وَحُسْنُ الْكَلاَمِ ‏”‏ ‏.
“দৃষ্টি অবনত রাখা, সালামের জবাব দেওয়া এবং উত্তম কথা বলা।” [সহীহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৪০/ সালাম, পরিচ্ছেদ: ২. সালামের জবাব দেয়া রাস্তায় বসার অন্যতম হক]

একজন মুসলিমের চরিত্র হল, সে সর্বদা সুন্দর কথা বলবে। রাস্তায় যাতায়াতের পথে, বাহনে থাকা অবস্থায়, তার সফর সঙ্গী বা পাশের যাত্রীর সাথে দ্বীন বা দুনিয়ার উপকারী কথা বলবে এবং সুন্দর ভাষা ব্যবহার করবে। গালাগালি, সমালোচনা, গিবত, পরনিন্দা, অশ্লীল বাক্যালাপ ইত্যাদি থেকে দুরে থাকবে।

❑ ১৪. হাঁচির জবাব দেয়া:

আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাড়ির আঙ্গিনায় এবং উঁচু স্থানসমূহের ঢালে বসতে নিষেধ করলেন। মুসলিমগণ বলেন, তা তো আমাদের সাধ্যের বাইরে। তিনি বলেন, “যদি তাই হয় তবে তোমরা তার দাবি পূরণ করো।
তারা বলেন, রাস্তার দাবি কি?
তিনি বলেন,
غَضُّ الْبَصَرِ، وَإِرْشَادُ ابْنِ السَّبِيلِ، وَتَشْمِيتُ الْعَاطِسِ إِذَا حَمِدَ اللَّهَ، وَرَدُّ التَّحِيَّةِ‏.‏
“দৃষ্টি সংযত রাখা, পথিককে পথ দেখিয়ে দেওয়া, হাঁচি দাতা ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বললে তার জবাব দেয়া এবং সালামের উত্তর দেয়া।” [আবু দাউদ, আল-আদাবুল মুফরাদ পরস্পর সালাম বিনিময়-সহিহ]
যে ব্যক্তি হাঁচি দিবে সে বলবে, আল হামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য)। আর হাঁচির উত্তরদাতা বলবে, “ইয়ার হামুকাল্লাহ” (আল্লাহ আপনার উপর দয়া করুন)। এর প্রতিউত্তরে হাঁচি দাতা আবার বলবে, “ইয়াহদিকুমুল্লাহু ওয়া ইউসলিহু বা-লাকুম” (আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথ দেখান এবং আপনার অন্তরকে পরিশুদ্ধ রাখুন।)

❑ ১৫. অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করা:

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,
سهل بن حنيف عند الطبراني من الزيادة: «ذكر الله كثيراً»
রাস্তার হক সংক্রান্ত হাদিসে সাহল ইবনে হানিফ কর্তৃক তবরানির বর্ণনায় রয়েছে, “অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করা।” [তবারানী, হা/৫৫৯২]

মুমিনের কর্তব্য, চলতে-ফিরতে, উঠতে, বসতে, বাহনে থাকা অবস্থায়, কারও জন্য অপেক্ষার সময়, কর্মক্ষেত্রে, সংসারের কাজ করার সময় ইত্যাদি সর্বাবস্থায় অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করা। সফরের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে দুআ পড়ে বের হওয়া, আল্লাহর নামে গাড়ি চালু করা, সফরের দুআ পাঠ, গাড়িতে আরোহণের দুআ পাঠ ইত্যাদির মাধ্যমে আল্লাহকে স্মরণ করবে। এতে সে অবারিত সওয়াব লাভের পাশাপাশি তার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে এবং সে নানাভাবে সাহায্য প্রাপ্ত হবে।

পরিশেষে বলব, আমরা যদি নিরাপদ সড়ক চাই, নিরাপত্তার সাথে পথ চলতে চাই এবং সর্বোপরি একটি সুস্থ ও সুন্দর বসবাসযোগ্য পৃথিবী চাই তাহলে ইসলামের এসব মানবিক এবং চমৎকার নির্দেশনা, শিষ্টাচার এবং বিধিবিধানগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি। এ ছাড়া যতাই হৈচৈ করা হোক-তাতে নিরাপদ সড়ক পাওয়া তো দূরের কথা আমরা একটি অসভ্য সমাজে পরিণত হবো।

আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন। আমিন।
▬▬▬❂❂❂▬▬▬
গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

Translate