Saturday, February 19, 2022

ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতার জন্য বক্তার মধ্যে কী কী গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক?

 ওয়াজ মাহফিলে বক্তৃতার জন্য বক্তার মধ্যে কী কী গুণ-বৈশিষ্ট্য থাকা আবশ্যক?

(বক্তা, শ্রোতা এবং মাহফিলের আয়োজক সকলের জানা জরুরি)
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
ওয়াজ মাহফিলে বক্তা নির্বাচন ও বক্তৃতার ক্ষেত্রে আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা খুবই শোচনীয়। এ ক্ষেত্রে চলছে চরম দুরাবস্থা ও ভয়াবহ শরিয়ত বহির্ভূত কার্যক্রম। তাই এ ব্যাপারে সর্বস্তরের মুসলিমদের সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।
কারণ— আমাদের অজানা নয় যে, বর্তমান সময়ে কারও চাপার জোর, সুললিত কণ্ঠ, হাসানো, কাঁদানো, কৌতুক, ড্যান্স, অভিনয়, গান-গজল, ইত্যাদি দ্বারা মাহফিল জমানোর মত কৌশল, উস্কানি ও হুংকার মার্কা কথাবার্তা দিয়ে সাধারণ জনগণকে উত্তেজিত করার মত যোগ্যতা থাকলেই তিনি বিশাল বক্তা ও আন্তর্জাতিক মুফাসসিরে কুরআনে পরিণত হন। অনুরূপভাবে সার্টিফিকেট, পদবী, সুন্দর চেহারা, ইংরেজি বলার দক্ষতা থাকলে তিনি বিশাল আল্লামা!
মাহফিলগুলোতে বিদেশ থেকে আগত, রেডিও-টিভির ভাষ্যকার, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, ২৬ ইঞ্চি বক্তা, শিশু বক্তা, নারী থেকে পুরুষের রূপান্তরিত হওয়া বক্তা, নওমুসলিম বক্তা ইত্যাদি নানা অদ্ভুত উপাধি ও বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত বক্তার চাহিদা তুঙ্গে। যেন এগুলোই বক্তা নির্বাচনের মানদণ্ড! কিন্তু প্রকৃত পক্ষে বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে এগুলো আদৌ শরয়ী মানদণ্ডের মধ্যে পড়ে না।

যার কারণে— বিশাল বিশাল ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হচ্ছে, সেগুলোতে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হচ্ছে, এ উপলক্ষে জমজমাট প্রচার-প্রচারণা চলছে, এলাকার যুবকদের মাঝে মাহফিল নিয়ে অনেক উত্তেজনা কাজ করে, মাহফিল উপলক্ষে এলাকায় বিরাজ করে উৎসবের আমেজ। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, এগুলো অধিকাংশই সামাজিক অনুষ্ঠান, বার্ষিক রুটিন ওয়ার্ক এবং অর্থ কালেকশনের মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। ওয়াজ মাহফিল থেকে মানুষ প্রত্যাশিত উপকার লাভ করে না, সেগুলো থেকে হেদায়েতের আলো বিচ্ছুরিত হয় না এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সঠিক দিক নির্দেশনা মূলক বক্তব্য পাওয়া যায় না।

এর কারণ—অধিকাংশ ওয়াজ মাহফিল আয়োজন কারীদের নিয়ত ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সঠিক নয়। ফলে তারা বক্তা নির্বাচনের ক্ষেত্রে শরয়ী মানদণ্ড বিচার না করে মাহফিল জমানো ও আকর্ষণ সৃষ্টি করার মত বক্তা অনুসন্ধান করে। ফলশ্রুতিতে একশ্রেণীর তথাকথিত বাজারি ও পেশাদার বক্তা আরও দ্বিগুণ উৎসাহে মানুষকে কিভাবে আকর্ষণ করে স্টেজ মাতানো যায় সেই চেষ্টায় ব্যস্ত থাকে—যা খুবই দুর্ভাগ্য জনক এবং শরয়ী দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য।

যাহোক, নিম্নে আমরা ইসলামি আইন বিষয়ক বিশ্বকোষ ‘আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যা আল কুয়েতিয়্যা’ থেকে ওয়ায়েজ বা ধর্মীয় বক্তার মধ্যে কী কী শর্তাবলী এবং শিষ্টাচার থাকা কর্তব্য সেগুলো উপস্থাপন করব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তওফিক দানকারী:

❑ ওয়াজ কারী বা বক্তার জন্য কয়েকটি শর্ত রয়েছে। যথা:

◈ এক. শরিয়তের বিধিবিধান আবশ্যিকভাবে অর্পিত হওয়ার মত উপযুক্ত হওয়া অর্থাৎ তিনি সুস্থ বিচারবুদ্ধি সম্পন্ন এবং প্রাপ্ত বয়স্ক হবেন।
◈ দুই. ন্যায়-নীতি ও আদর্শবান হওয়া।
◈ তিন. মুহাদ্দিস হওয়া। অর্থাৎ তিনি হাদিস শাস্ত্রের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখবেন, হাদিস পাঠ করবেন, হাদিসের শব্দাবলীর অর্থ বুঝবেন এবং তার শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান রাখবেন-যদিও তা কোনও বড় মুহাদ্দিস অথবা কোনও ফিকহবিদের গবেষণালব্ধ তথ্যাদির ভিত্তিতে হয়।

◈ চার. মুফাসসির হওয়া। অর্থাৎ তিনি কুরআনের দুর্বোধ্য ও কঠিন শব্দাবলীর অর্থ জানবেন এবং (বাহ্যত) সমস্যাপূর্ণ বিষয়গুলোর সঠিক সমাধান জানবেন এবং সে সম্পর্কে পূর্বসূরি তাফসির কারকদের থেকে বর্ণিত তাফসির সম্পর্কে জ্ঞান রাখবেন।
– পাশাপাশি তার জন্য এমন বাগ্মী ও সুভাষী হওয়া উত্তম যে, তিনি মানুষের ধারণ ক্ষমতার বাইরে কথা বলবেন না। সেই সাথে তিনি হবেন নম্র, ভদ্র ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন।
– তিনি দীনের বিষয়গুলোকে মানুষের সামনে সহজভাবে উপস্থাপন করবেন; জটিলতা সৃষ্টি করবে না। [আবজাদুল উলুম ২/৫৩৬-প্রকাশনী: দারুল কুতুবুল ইলমিয়া]

❑ বক্তার কতিপয় শিষ্টাচার:

ওয়ায়েজ (বক্তা), আলেম এবং শিক্ষকের অন্যতম শিষ্টাচার হল, তিনি এমন সব কথাবার্তা, কার্যক্রম ও আচার-আচরণ পরিত্যাগ করবেন যা বাহ্যত ভুল মনে হয়- যদিও তিনি এ ক্ষেত্রে নির্ভুল হন। কারণ তিনি এমনটি করার কারণে (সাধারণ মানুষের মাঝে) বিভিন্ন সমস্যা ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। যেমন:

❂ কারও মধ্যে এমন বিষয় জানা গেলে অনেকেই ধারণা করে বসবে যে, এটা সর্বাবস্থায় জায়েজ। ফলে তা শরিয়তের বিধান বা আমল যোগ্য বিষয়ে পরিণত হবে- যে বিশেষ পরিস্থিতিতে তা করা হয়েছিলো তার মধ্যে তা সীমাবদ্ধ থাকবে না।
❂ বক্তা যদি নাজায়েজ কর্মে জড়িত হয় তাহলে মানুষ তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবে, তার সমালোচনা করবে এবং তার থেকে দূরে সরে যাবে।
❂ মানুষ তার ব্যাপারে খারাপ ধারণা করে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে এবং মানুষকেও তার ব্যাপারে সাবধান করবে যেন তার থেকে কেউ ইলম গ্রহণ না করে।
❂ তার সাক্ষ্য ও বর্ণনা অগ্রহণযোগ্য হবে। তার দেওয়া ফতোয়ার আমল প্রত্যাখ্যাত হবে এবং তার ইলমি কথা-বার্তার ব্যাপারে মানুষের মন থেকে আস্থা চলে যাবে ইত্যাদি।

❑ ওয়াজ মাহফিলে অর্থ কালেকশন নাজায়েজ:

ফাতাওয়া হিন্দিয়াতে এসেছে, “বক্তার জন্য ওয়াজ মাহফিলে মানুষের কাছে কোনও কিছু চাওয়া জায়েজ নাই। কারণ তা ইলম এর মাধ্যমে দুনিয়া উপার্জন।” [ফাতাওয়া হিন্দিয়াহ ৫/৩১৯’
[উৎস: আল মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল কুয়েতিয়্যা বা কুয়েতি ফিকাহ বিশ্বকোষ, ৪৪/৮১-৮৩,অনলাইন ভার্সন-সংক্ষেপায়িত]
আল্লাহ তাআলা যেন, আমাদেরকে সবচেয়ে সঠিক ও সুন্দর পদ্ধতিতে আল্লাহর দীনের আহ্বানকে গণ মানুষের কাছে পৌঁছিয়ে দেওয়ার তাওফিক দান করেন আর আমরা যে সব হেদায়েতের কথা মানুষকে বলবো তা যেন কর্মে বাস্তবায়ন করতে পারি রাব্বুল আলামিনের নিকট সেই তাওফিক কামনা করি।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

যে মহিলার লম্বা চুল থাকবে কেয়ামতের দিন উক্ত চুল দ্বারা তার উলঙ্গ শরীর ঢাকা থাকবে। এ কথা কি সঠিক?

 প্রশ্ন: আমি অনেকবার শুনেছি যে, “যে মহিলার লম্বা চুল থাকবে কেয়ামতের দিন উক্ত চুল দ্বারা তার উলঙ্গ শরীর ঢাকা থাকবে।” এ কথার সত্যতা জানতে চাই।

উত্তর:
কিয়ামত দিবসের ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। যেমন: আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি যে,
يُحْشَرُ النَّاسُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلاً ‏
“কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে একত্রিত করা হবে খালি পা, নগ্ন দেহ এবং খাতনা বিহীন অবস্থায়।”
এ কথা শুনে আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল! পুরুষ এবং মহিলা এক সঙ্গেই উত্থিত হবে আর তারা পরস্পর একে অপরের প্রতি তাকাবে?
তিনি বললেন,
‏ يَا عَائِشَةُ الأَمْرُ أَشَدُّ مِنْ أَنْ يَنْظُرَ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ ‏‏ ‏
“হে আয়েশা, তখনকার অবস্থা এতো কঠিন ও ভয়ঙ্কর হবে যে, একে অপরের প্রতি তাকানোর কল্পনারও উদ্রেক হবে না।”
[সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ৫৩। জান্নাত, জান্নাতের নিয়ামত ও জান্নাতবাসীদের বর্ণনা, পরিচ্ছেদ: ১৪. দুনিয়ার নশ্বরতা ও কিয়ামতের বর্ণনা]
কিন্তু ‘কিয়ামতের দিন মহিলাদের মাথার লম্বা চুল দ্বারা তার উলঙ্গ শরীর ঢাকা থাকবে’-এমন কোন কথা হাদিসে বর্ণিত হয় নি।
কাতার ভিত্তিক ইসলামি প্রশ্নোত্তর বিষয়ক বিখ্যাত ওয়েব সাইট Islamweb এ বলা হয়েছে,
وأما القول بأنه يكون ساتراً لها يوم القيامة فلم نقف على دليل يدل عليه. والله أعلم
“কিয়ামতের দিন (মহিলাদের মাথার লম্বা চুল) তার দেহকে আবৃত করবে- এমন কথার পক্ষে আমরা কোনও দলিল জানতে পারি নি। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।” [সূত্র: islamweb, ফতোয়া নং ৩৬৮৭৬]

– উল্লেখ্য যে, প্রয়োজন বোধে শর্ত সাপেক্ষে মহিলারা তাদের মাথার চুল খাটো করতে পারে। ইসলামি শরিয়তে এতে কোনও বাধা নেই।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
(লিসান্স, মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সউদি আরব)।

দরুদের মধ্যে কেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে কেবল ইবরাহিম আ. এর নাম বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়েছে

 প্রশ্ন: দরুদের মধ্যে কেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে অন্য নবী-রাসূলগণের মধ্যে কেবল ইবরাহিম আ. এর নাম বিশেষভাবে যুক্ত করা হয়েছে?

উত্তর:
সালাতে তাশাহুদের বৈঠকে নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর পরিবারবর্গের পাশাপাশি তাঁর পূর্বপুরুষ ইবরাহিম ও তার পরিবার বর্গের প্রতিও দরুদ পেশ করা হয়। তাই এটি ‘দরুদে ইবরাহিম’ নামে সুপরিচিত।
আলেমগণ এর কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। যথা:

◯ ১. ইবরাহিম আলাইহিস সালাম বংশগতভাবে রাসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সমগ্র আরবের ঊর্ধ্বতন পিতা। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এরপরে যত নবী-রাসুলের আগমন ঘটেছে সকলেই তাঁর বংশ থেকে এসেছে। তাই তাকে বলা হয় ‘আবুল আম্বিয়া’ বা নবীদের পিতা।

সুতরাং তাঁর প্রতি এবং তাঁর পরিবারের প্রতি সালাত পেশ করা হলে তার পরবর্তী সকল-নবী রাসূল তাতে শামিল হয়ে যায়। কারণ তারা সকলেই বংশগতভাবে তাঁর পরিবারভুক্ত।

তাই তো আসমানি কিতাব ধারী সকল ধর্ম তথা ইহুদি, খ্রিস্টান এবং ইসলাম-এ তিনটি মূল ধর্মের অনুসারীরাই তাঁর শরিয়তের উপর বিশ্বাস রাখে। সে কারণেই ইসলাম এবং তাওরাত-ইনজিলের অনুসারী ইহুদি ও খৃষ্টান ধর্মকে এককথায় ইবরাহিমিয় ধর্ম’ বা আবরাহামিয় ধর্ম [Abrahamic Religion]-যাকে সেমেটিক ধর্ম বা সেমিটিক ধর্মও বলা হয়। যদিও ইহুদি-খৃষ্টান ধর্ম পরবর্তীতে বিকৃতির শিকার হয়েছে।

◯ ২. সকল নবী-রাসূল সম্মানিত। কিন্তু বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী- যা তাকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। কুরআনে আল্লাহ তাআলা তার অনেক মর্যাদা ও গুণাবলী উল্লেখ করেছেন।

সেগুলোর মধ্য অন্যতম হল: তিনি উলুল আযম তথা দৃঢ় সংকল্প ধারী পাঁচ জন নবী-রাসূলের অন্তর্ভুক্ত [দেখুন: সূরা আহকাফ এর ৩৫ নং আয়াতের তাফসির]

◯ ৩. ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ছিলেন, তাওহীদ প্রতিষ্ঠা ও শিরক উৎখাতের এক মহান প্রাণপুরুষ।

মহান আল্লাহ তাআলা ইহুদি-খৃষ্টানদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তাঁর প্রসঙ্গে বলেন,
مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَٰكِن كَانَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
“ইবরাহিম ইহুদি ছিলেন না এবং নাসারাও ছিলেন না কিন্তু তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ ও আত্মসমর্পণকারী এবং তিনি মুশরিক ছিলেন না।” [সূরা আলে ইমরান: ৬৭]

◯ ৪. কুরআনে সকল নবী-রাসূলদের মধ্যে তাঁকে ‘তোমাদের পিতা’ বলে অভিহিত করে তার আদর্শকে অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
مِّلَّةَ أَبِيكُمۡ إِبۡرَٰهِيمَۚ
“তোমরা তোমাদের পিতা ইবরাহিমের মিল্লাত (দীন‌ ও আদর্শ অনুসরণ করো।” [সূরা হিজর: ৭৮]

উল্লেখ্য যে, তিনি বংশগতভাবে আরবদের পিতা এবং মর্যাদার দিক দিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সকল তাওহীদ পন্থী মুমিনের পিতৃতুল্য।

আল্লাহ আরও বলেন,
ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۖ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ
“অতঃপর আপনার প্রতি প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেছি যে, ইবরাহিমের দীন অনুসরণ করুন, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন এবং মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” [সূরা নহল: ১২৩]

– তিনি আরও বলেন,
إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِإِبْرَاهِيمَ لَلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهَٰذَا النَّبِيُّ وَالَّذِينَ آمَنُوا ۗ وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِينَ
“মানুষদের মধ্যে যারা ইবরাহিমের অনুসরণ করেছিল, তারা আর এই নবী এবং যারা এ নবীর প্রতি ঈমান এনেছে তারা ইবরাহিমের ঘনিষ্ঠতম-আর আল্লাহ হলেন, মুমিনদের অভিভাবক।” [সূরা আলে ইমরান: ৬৮]

◯ ৫. তিনি শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পরে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। যার কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁর ব্যাপারে বলেন,
وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۗ وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا
“যে আল্লাহর নির্দেশের সামনে মস্তক অবনত করে সৎকাজে নিয়োজিত থাকে এবং ইবরাহিমের আদর্শের অনুসরণ করে- যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন-তার চাইতে উত্তম আদর্শ কার? আর আল্লাহ ইবরাহিমকে খলিল (অন্তরঙ্গ বন্ধু) রূপে গ্রহণ করেছেন।” [সূরা নিসা: ১২৫]

ইবনে কাসির রাহ. বলেন,
ولا خلاف أن محمدا صلى الله عليه وسلم أفضلهم، ثم بعده إبراهيم، ثم موسى على المشهور. اهـ.
“সকল নবী-রাসূলদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এ বিষয়ে কোনও দ্বিমত নেই। তবে প্রসিদ্ধ মতানুসারে এর পরেই ইবরাহিম আ., অত:পর মুসা আ. এর অবস্থান।” [তাফসিরে ইবনে কাসির]

◍ আল্লামা বদরুদ্দীন আইনি হানাফি রাহ. এর অন্য একটি কারণ উল্লেখ করেছেন। তা হল, সালাতে দরুদ পাঠের সময় ইবরাহিম আলাইহিস সালামের এর নাম এ জন্যই উল্লেখ করা হয় যে, মিরাজ রজনীতে যখন নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঊর্ধ্বাকাশ ভ্রমণ করেন তখন পথিমধ্যে যত নবী-রাসূলের সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটেছিলো তাদের মধ্যে একমাত্র ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এই উম্মতের প্রতি সালাম পেশ করেছিলেন। তার প্রতিদান হিসেবে কেয়ামত পর্যন্ত মুমিনগণ তার প্রতি দরুদ পাঠে নির্দেশিত হয়। [শারহে সুনানে আবু দাউদ লিল আইনি ৪/২৬০]
لأن النبي عليه السلام رأى ليلة المعراج جميع الأنبياء والمرسلين ، وسلم على كل نبي ، ولم يسلم أحد منهم على أمته غير إبراهيم عليه السلام ، فأمرنا النبي عليه السلام أن نصلي عليه في آخر كل صلاة إلى يوم القيامة ، مجازاة على إحسانه
شرح سنن أبي داود” للعيني (4/260) .
◍ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. বলেন,
قد خُصَّ بأنه أبو الأنبياء ، وأنه صاحب الحنيفية ، وأمرنا باتباعه ؛ لأننا نحن أولى بإبراهيم
“নবীদের মাঝে তাঁকে (ইবারাহিম আ. কে) বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হল, তিনি নবীদের পিতা, একনিষ্ঠ তাওহীদ অভিমূখী ও শিরক বিমুখ। আর আমরা তাঁকে অনুসরণের নির্দেশ প্রাপ্ত। কারণ আমরাই ইবারাহিম এর সর্বাধিক ঘনিষ্ঠ।” [আল লিকাউশ শাহরি (মাসিক সভা)-১৮৯, প্রশ্ন নং ৭]
আল্লাহু আলাম।

▬▬▬✪✪✪▬▬▬
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল-

মহিলাদের আইডি কার্ডের জন্য কান খোলা ছবি তোলার বিধান

 প্রশ্ন: আইডি কার্ডের জন্য মহিলাদের ছবি তোলার ক্ষেত্রে কান খোলা রাখতে হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ক্ষেত্রে করণীয় কী?

উত্তর:
ইসলামের বিধান হল, একান্ত জরুরি দরকার ছাড়া কোনও প্রাণীর ছবি তোলা জায়েজ নাই। তবে বিশেষ প্রয়োজন হলে ভিন্ন কথা। আর অধিক বিশুদ্ধ মতে, পরপুরুষের সামনে নারীদের মুখমণ্ডল, কান, গলা ইত্যাদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঢেকে রাখা ফরজ-চাই বাস্তবে হোক অথবা ছবি-ভিডিও ইত্যাদি মাধ্যমে হোক।

কিন্তু আমাদের অনৈসলামিক সমাজ ব্যবস্থায় দুর্ভাগ্য জনক ভাবে নানা যুক্তিতে মহিলাদের মুখমণ্ডলের ছবি তোলার ক্ষেত্রে দু কান খোলা রাখার শর্তারোপ করা হয়েছে। এমন ছবি ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়া যাবে না, পাবলিক পরীক্ষায় বা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করা যাবে না, পাসপোর্ট পাওয়া যাবে না ইত্যাদি। ফলে সরকারের এই আইন লঙ্ঘন করে আমাদের জীবনযাত্রা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে। অর্থাৎ আমরা ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় সরকারের কর্তৃক বেঁধে দেওয়া এ নিয়ম অনুসরণ করতে বাধ্য-যা প্রতিরোধ করাও আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে নিরুপায় অবস্থায় তা জায়েজ হবে যদি দেশে বসবাস করতে চাই।
◈ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
عُفِيَ لأمَّتي عن الخطأِ والنِّسيانِ وما استُكرِهوا عليهِ
“আমার উম্মতের হঠাৎ ঘটে যাওয়া ভুল, স্মরণ না থাকার কারণে ঘটে যাওয়া গুনাহ এবং জোরজবরদস্তি মূলক কৃত অপরাধকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে।” [ইবনে হাযম রা. রচিত আল মুহাল্লা, তিনি এটিকে সহীহ বলেছেন]

◈ আর ইসলামি ফিকহের একটি সুপরিচিত মূলনীতি হল,
الضرورات تبيح الْمَحْظُورَات
“তীব্র প্রয়োজন হারামকে হালাল করে দেয়।” [সুয়ুতি রচিত আল আশবাহ ৪৩, আল ওয়াজীয ১৭৫]

❑ সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি বিশিষ্ট ফকিহ আল্লামা বিন বায রাহ. এই মূলনীতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেন,
هذه قاعدة معروفة إذا وجدت الضرورة مثلما يباح للمرأة أن تكشف عورتها للطبيب عند الحاجة تكشف وجهها عند الحاجة، ويباح للرجل أن يكشف عورته عند الحاجة للطبيب، ومثلما يأكل الميتة عند الضرورة
“এটি একটি সুপরিচিত মূলনীতি- যদি প্রয়োজন দেখা দেয়। যেমন: একজন মহিলার জন্য প্রয়োজনে তার শরীরের ঢেকে রাখার স্থানগুলো ডাক্তারের কাছে খোলা জায়েজ। প্রয়োজনে তার মুখমণ্ডল খোলাও জায়েজ। অনুরূপভাবে পুরুষের জন্যও ডাক্তারের কাছে প্রয়োজনে তার গোপনাঙ্গ খোলা জায়েজ- ঠিক যেমন সে প্রয়োজনে মৃত প্রাণী খেতে পারে।”

এই মূলনীতির সমর্থনে নিম্নোক্ত আয়াত সমূহ প্রযোজ্য। সূরা বাকারা এর ১৭৩, সূরা আনআম এর ১১৯, সূরা মায়িদাহ এর ৩ ও ১৪৫ এবং সূরা নাহল এর ১১৫ নং আয়াত।

✪ আরেকটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হল,
الضرورات تقدر بِقَدرِهَا
“প্রয়োজন তার সীমায় সীমিত থাকবে।” সুতরাং জরুরি প্রয়োজন বিবেচনায় যতটুকু না হলে নয় ততটুকু খুলে ছবি তুলবে। যেমন: মুখমণ্ডল এবং দু কান। তার অতিরিক্ত তথা পুরো মাথা, চুল, গলা ইত্যাদি অংশ খোলা জায়েজ হবে না।

সুতরাং হারাম কাজের প্রতি অন্তরে ঘৃণাবোধ বজায় রেখে জরুরি কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন বোধে মহিলাদের জন্য মুখমণ্ডল ও দু কান খোলা রেখে ছবি তোলা জায়েজ। তবে যেহেতু কাজটা হারাম কিন্তু বাধ্য হয়ে করতে হয়েছে তাই আল্লাহর কাছে তওবা করা ছাড়া গত্যন্তর নাই।
আল্লাহ আমাদের দুর্বলতাকে ক্ষমা করুন। নিশ্চয় তিনি পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬ ◐◯◑ ▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম কোন নবীকে কাপড় পরানো হবে

 প্রশ্ন: কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম কোন নবীকে কাপড় পরানো হবে?

উত্তর:
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ইবরাহিম আ. কে কাপড় পরিধান করানো হবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّكُمْ مَحْشُورُونَ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلاً (كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيْدُهُ) الآيَةَ وَإِنَّ أَوَّلَ الْخَلاَئِقِ يُكْسَى يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِبْرَاهِيمُ
“নিশ্চয়ই তোমাদের হাশর করা হবে নগ্ন পা, নগ্ন দেহে ও খতনা বিহীন অবস্থায়। আয়াত: كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيْدُهُ “আল্লাহ বলেন, যেভাবে আমি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে আবার সৃষ্টি করব।” [সূরা আম্বিয়া: ১০৫]
আর কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ইবরাহিম আ.-কে পোশাক পরিধান করানো হবে।” [সহীহ বুখারী, অধ্যায়: ৮১/ সদয় হওয়া, পরিচ্ছেদ: ৮১/৪৫. হাশরের অবস্থা কেমন হবে]
ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত আছে যে,
أن إبراهيم يؤتى له بكرسي على يمين العرش، فيكسى حلة تشرئب إليه أعناق البشر
“আরশের ডান দিকে ইবরাহিম আ. এর জন্য একটি কুরসি (চেয়ার) আনা হবে। এরপর তাকে এমন উন্নত পোশাক পরানো হবে যা মানুষ ঘাড় উঁচু করে দেখবে।” [বায়হাকী-কিতাবুল আসমা ওয়াস সিফাত ২/২৭৬, হা/৮৩৯]

আলেমগণ বলেছেন, এর কারণ হতে পারে, তিনি একমাত্র নবী যাকে কাফের সম্প্রদায় অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিলো উলঙ্গ অবস্থায়। তাই আল্লাহ তাআলা এর প্রতিদান হিসেবে কিয়ামতের দিন তাঁকে এই মর্যাদায় ভূষিত করবেন। এ বিষয়ে আরও একাধিক মতের মধ্যে এটি সর্বাধিক সঠিক বলে নির্ভরযোগ্য আলেমগণ মত ব্যক্ত করেছেন।
আল্লাহু আলাম।

▬▬▬✪✪✪▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate