Sunday, November 28, 2021

রমজান ও সিয়াম বিষয়ক ২০টি প্রশ্ন এবং সেগুলোর ব্যাখ্যা মূলক উত্তর

 রমজান ও সিয়াম বিষয়ক ২০টি প্রশ্ন এবং সেগুলোর ব্যাখ্যা মূলক উত্তর

[রমজান ও সিয়াম কোর্স ২০২১ এর ১ম পরীক্ষার সমাধান]
▬▬▬✪✪✪▬▬▬

নিচে ২০টি প্রশ্নের ব্যাখ্যা মূলক উত্তর প্রদান করা হল:

◍ ১) সিয়াম শব্দের আভিধানিক ও শরঈ অর্থ কি?

উত্তর:

সিয়াম শব্দটি বহুবচন। একবচন হল, সওম। [ফারসি ভাষায় রোজা।] সওম শব্দের শাব্দিক অর্থ: বিরত হওয়া বা রাখা।

আর শরিয়তের দৃষ্টিতে সওম বলা হয়, বিশেষ ধরণের বিরত থাকাকে। অর্থাৎ সওয়াব অর্জনের নিয়তে ফজর উদিত হওয়ার একটু পূর্ব থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত থাকাকে সিয়াম বলা হয়।
অনেক আলেম বর্জনীয় বিষয় সমূহের মধ্যে অশ্লীল যে কোন কথা ও কাজকেও উল্লেখ করেছেন।

◍ ২) রোজা ইসলামের কততম স্তম্ভ?

উত্তর: ৪র্থ।

আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ بُنِيَ الْإِسْلَامُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ وَإِقَامِ
الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ وَصَوْمِ رَمَضَانَ وَحَجِّ الْبَيْتِ

“ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি বিষয়ের উপর। আর তা হল:
(১) “একথার সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনও মাবূদ নেই এবং মুহাম্মদ সা. আল্লাহর রাসূল,
(২) সালাত প্রতিষ্ঠা করা,
(৩) যাকাত প্রদান করা,
(৪) রামজানের সিয়াম (রোজা) পালন করা এবং
(৫) কাবা ঘরের হজ্জ সম্পাদন করা।” (বুখারি ও মুসলিম)

◍ ৩) সিয়াম কখন ফরজ হয়?

উত্তর:

সিয়াম ফরজ হয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হিজরতের ২য় বর্ষে, শাবান মাসের ২৮ তারিখে, সোমবার দিন।[ফিকহুস সুন্নাহ ২/৫০১]

◍ ৪) কুরআনের কোন সূরার কততম আয়াত দ্বারা রমজানের রোজা ফরজ হয়?

উত্তর:
সূরা বাকারা, ১৮৩ নং আয়াত দ্বারা মুমিনদের জন্য রোজা রাখা ফরজ করা হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)

◍ ৫) রোজা ফরজ হওয়ার শর্ত কয় টি বা কাদের উপর রোজা রাখা ফরজ?

উত্তর:
রোজা ফরজ হওয়ার শর্ত ৬টি। যথা:
(ক) মুসলিম হওয়া। (কাফেরের উপর সিয়াম ফরজ নয়, করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হবে।)
(খ) বালেগ বা প্রাপ্ত বয়স্ক (নাবালেগের উপর সিয়াম ফরজ নয়।)
(গ) সুস্থ মস্তিষ্ক বা আকল সম্পন্ন ব্যক্তির উপর। (বেহুঁশ বা পাগলের উপর সিয়াম ফরজ নয়।)
(ঘ) মুকিম বা অবস্থান কারী (মুসাফিরের উপর সিয়াম ফরজ নয়। তবে তারা রোজা ভঙ্গ করলে পরবর্তীতে কাযা আদায় করবে)
(ঙ) দৈহিক ভাবে সক্ষম (রোজা রাখতে অক্ষম বা অসুস্থ ব্যক্তির উপর সিয়াম ফরজ নয়।)
(চ) শরিয়তের বাধা মুক্ত হওয়া। যেমন: নারীর ক্ষেত্রে সে যদি হায়েজ বা নেফাস যুক্ত (প্রসূতি হয়) হয় তবে তার উপর রোজা রাখা ফরজ নয়। (তারা পরবর্তীতে ঐ রোজাগুলোর কাযা আদায় করবে)

◍ ৬) ফরজ রোজা কয় প্রকার?

উত্তর: ফরজ রোজা ৩ প্রকার। যথা:
(ক) রমজানের রোজা
(খ) কাফফারার রোজা (কসম ভঙ্গ, মানত ভঙ্গ, রমজানে দিনের বেলায় স্ত্রী সহবাস ইত্যাদি)
(গ) মানতের রোজা

◍ ৭) বছরের কয় দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ?

উত্তর: ৬ দিন। যথা:

ঈদুল ফিতর (রমজানের ঈদ), ঈদুল আযহা (কুরবানির ঈদ), এর দিন এবং এর পরের আরও তিন দিন (আইয়ামে তাশরিক) এবং ইয়ামুশ শাক্ক (يوم الشك) বা ‘সন্দেহের দিন’। (শাবান মাসের ৩০তম দিনে যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার কারণে রমজানের চাঁদ উঠেছে কি না তাতে সন্দেহ সৃষ্টি হয় তাহলে তাকে ইয়ামুশ শাক্ক বা ‘সন্দেহের দিন’ বলা হয়। এ দিন রোজা থাকার ব্যাপারে হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।)

◍ ৮) রোজা রাখার ক্ষেত্রে সওয়াবের নিয়তের পাশাপাশি স্বাস্থ্য রক্ষার নিয়ত থাকলে কি রোজা বাতিল হয়ে যাবে? না কি এতে সওয়াব কমে যাবে? না কি রোজার কোনও ক্ষতি হবে না?

উত্তর: রোজা বাতিল হবে না কিন্তু সওয়াব কমে যাবে।

◍ ৯) রমজানকে কিভাবে স্বাগত জানাবো বা বরণ করবো?

উত্তর:
নিচে এ বিষয়ে দশটি পয়েন্ট উল্লেখ করা হল:

১) অতীত জীবনের পাপাচার ও অন্যায়-অপকর্মের জন্য খাঁটি অন্তরে আল্লাহর দরবারে তওবা করা।
২) রমাযানে রোযা রাখার ব্যাপারে অন্তরে মজবুত নিয়ত করা এবং এ জন্য মহান রবের নিকট তাওফিক কামনা করে দুআ করা।
৩) রমাযানের আগমনে আনন্দিত হওয়া।
৪) পূর্বের রোযা বাকি থাকলে তা আগামী রমাযান আসার পূর্বে কাযা করে নেয়া।
৫) রোযার বিধিবিধান সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানার্জন করা।
৬) রমাযান আসার পূর্বে যথাসম্ভব দুনিয়াবি কর্মব্যস্ততা কমিয়ে ফেলা।
৭) শাবান মাসে নফল সিয়াম পালন করা।
৮) শাবান মাস থেকে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করা।
৯) রমাযান মাসে রোজাদারদেরকে ইফতার করানো, দাওয়াতি কাজ করা, যাকাত আদায় (যদি তা আদায় করার ইচ্ছা থাকে) সহ বিভিন্ন ধরণের নেকির কাজ করার জন্য অগ্রিম প্রস্তুতি নেয়া।
১০) রমজানে মক্কায় এসে উমরা আদায় করার এবং সেই সাথে মক্কার মসজিদে হারাম অথবা মসজিদে নববী অথবা এলাকার জুমার মসজিদে ইতিকাফের প্রস্তুতি নেয়া।

◍ ১০) “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি শাহরাই রাজাবা ওয়া শাবানা।” এ হাদিসটির মান কি?

উত্তর: জঈফ বা দুর্বল।

নিচে উক্ত হাদিসের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের অভিমত উল্লেখ করা হল:

اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ، وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ
উচ্চারণ: “আল্লা-হুম্মা বা-রিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শাবা-না ও বাল্লিগনা রামাযা-ন।”
অর্থ: “হে আল্লাহ তুমি রজব ও শাবানে আমাদেরকে বরকত দাও। আর আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও।” [মুসনাদে আহমাদ ১/২৫৯, হিলইয়াতুল আওলিয়া, তবাকাতুল আছফিয়া]

মান: হাদিসটি জঈফ বা দুর্বল। কারণ:

– এ হাদিসের সনদে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে যার নাম যায়েদাহ বিন আবুর রিকাদ। তার ব্যাপারে ইমাম বুখারি রহ. বলেন: মুনকারুল হাদিস।
– ইমাম নাসাঈ তার সুনান গ্রন্থে তার নিকট থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করার পর বলেন, “চিনি না এই ব্যক্তি কে?” আর তিনি তার যুয়াফা কিতাবে বলেন, “মুনকারুল হাদিস।” কুনা গ্রন্থে বলেন, “তিনি নির্ভরযোগ্য নন।”
– ইবনে হিব্বান বলেন, “তার বর্ণিত কোন হাদিসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।”
[দ্রষ্টব্য: তাবয়ীনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফী ফযলি রাজাব, ১২ পৃষ্ঠা। আয যুয়াফাউল কাবীর (২/৮১) তাহযীবুত তাহযীব (৩/৩০)-

◍ ১১) তিন শ্রেণীর মানুষের দুআ প্রত্যাখ্যাত হয় না। তারা কারা?

উত্তর:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

ثلاث دعوات مستجابة : دعوة الصائم، دعوة المظلوم، دعوة المسافر

“তিন জন ব্যক্তির দুআ কবুল করা হয়। যথা:
১. রোজাদারের দুআ,
২. মজলুম বা নির্যাতিত ব্যক্তির দুআ।
৩. এবং মুসাফিরের দুআ।” [সহিহুল জামে-আলবানি]

অন্য বর্ণনায়: রোজাদারের পরিবর্তে সন্তানের জন্য পিতার দুআ উল্লেখিত হয়েছে।

◍ ১২) রমজান শুরু হলে সৃষ্টিজগতে আল্লাহ তাআলা যেসব পরিবর্তন ঘটান সেগুলো ৩টি উল্লেখ করুন।

উত্তর:
১. জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেয়া হয় (কোনও কোনও বর্ণনায় আসমানের দরজা সমূহ খোলা হয়)
২. জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয়,
৩. এবং শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। যেমন: হাদিসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِذَا دَخَلَ رَمَضَانُ فُتِّحَتْ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ وَغُلِّقَتْ أَبْوَابُ جَهَنَّمَ وَسُلْسِلَتِ الشَّيَاطِينُ
“যখন রমজান মাস শুরু হয় তখন জান্নাতের দরজাগুলো পরিপূর্ণভাবে খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজা সমূহ মজবুত ভাবে বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদেরকে শিকল দ্বারা বেধে দেয়া হয়।” (সহিহ বুখারি)

◍ ১৩) বছরের শ্রেষ্ঠ দশ দিন এবং শ্রেষ্ঠ দশ রাত কোনগুলো?

উত্তর:
বছরের শ্রেষ্ঠ ১০টি দিন হল, জিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ দিন আর শ্রেষ্ঠ রাত হল, রমজান মাসের শেষ দশ রাত।

◍ ১৪) রমজানে কয় ধাপে বান্দার গুনাহ মোচন করা হয়?

উত্তর: তিন ধাপে। যথা:
১. সিয়াম পালন।
২. কিয়ামুল লায়ল আদায় (রাতের নফল সালাত/তারাবিহ এর সালাত আদায়)
৩. লাইলাতুল কদরে (শবে কদরে) রাত জেগে নফল সালাত ও অন্যান্য ইবাদত-বন্দেগি করা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে কিয়াম করে (তারাবিহ/তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করে) করে তার পূর্বের সকল পাপ মোচন করা হয়।” (বুখারি ও মুসলিম)

তিনি আরও বলেছেন,

مَنْ صَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ وَمَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ছাওয়াবের আশায় রমযানের সিয়াম পালন করে তার পূর্বকৃত সমস্ত গুনাহ মোচন করে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় কদরের রাতে কিয়াম করে তারও পূর্বের সকল গুনাহ মোচন করা হয়।” (বুখারি ও মুসলিম)

◍ ১৫) রোজাদারগণ যে দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন তার নাম রাইয়ান। রাইয়ান শব্দের অর্থ কি?

উত্তর:

রাইয়ান অর্থ: রাইয়ান শব্দটি আরবি ري থেকে উৎপত্তি। এর অর্থ হল চূড়ান্ত তৃপ্তি সহকারে পান করা, পিপাষা নিবারিত হওয়া, পানি সিঞ্চন করা ইত্যাদি।

রোজাদারগণ রইয়ান নামক দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ فِي الْجَنَّةِ بَابًا يُقَالُ لَهُ الرَّيَّانُ يَدْخُلُ مِنْهُ الصَّائِمُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يَدْخُلُ مَعَهُمْ أَحَدٌ غَيْرُهُمْ يُقَالُ أَيْنَ الصَّائِمُونَ فَيَدْخُلُونَ مِنْهُ فَإِذَا دَخَلَ آخِرُهُمْ أُغْلِقَ فَلَمْ يَدْخُلْ مِنْهُ أَحَدٌ
“জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে যার নাম বলা হয় ‘রইয়ান’, কিয়ামতের দিন ঐ দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে কেবল সিয়াম পালনকারীগণ। সেখান দিয়ে তারা ব্যতীত আর কেউই প্রবেশ করতে পারবে না। বলা হবে, সিয়াম পালনকারীগণ কোথায়? তখন তারা উঠে সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। তারা ছাড়া ঐ দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। যখন তারা প্রবেশ করবে তখন সেই দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। ফলে আর কেউ সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারি ও মুসলিম)

রোজাদারগণ জান্নাতে প্রবেশের পর সুস্বাদু পানীয় পান করবে, যার ফলে কোনোদিন তারা তৃষ্ণার্ত হবে না। ইবনে খুযাইমা উপরোক্ত হাদিসের আরও একটু বর্ধিত বর্ণনা দিয়েছেন। তা হল:
مَنْ دَخَلَهُ لَمْ يَظْمَأْ أَبَدًا
“যারা প্রবেশ করবে, তারা পান করবে এবং যে পান করবে সে আর কোনোদিন তৃষ্ণার্ত হবে না।” রোজাদারের জন্য জান্নাতের দরজা রাইয়ান নামকরণের তাৎপর্যও তাই।

◍ ১৬) শূন্যস্থান পূরণ করুন:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “কিয়ামতের দিন রমজান এবং……….বান্দার জন্য সুপারিশ করবে।”

উত্তর:

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
الصِّيَامُ وَالْقُرْآنُ يَشْفَعَانِ لِلْعَبْدِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَقُولُ الصِّيَامُ أَيْ رَبِّ مَنَعْتُهُ الطَّعَامَ وَالشَّهَوَاتِ بِالنَّهَارِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ وَيَقُولُ الْقُرْآنُ مَنَعْتُهُ النَّوْمَ بِاللَّيْلِ فَشَفِّعْنِي فِيهِ قَالَ فَيُشَفَّعَانِ
“কিয়ামত দিবসে সিয়াম ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সিয়াম বলবে: হে আমার পালনকর্তা! আমি তাকে দিবসে পানাহার ও যৌনকর্ম থেকে বিরত রেখেছিলাম। অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল কর। কুরআন বলবে, আমি তাকে রাতে নিদ্রা থেকে বিরত রেখেছিলাম। তাই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল কর। তিনি বলেন, তখন তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।”
[হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ ও ত্বাবরানী (কাবীর গ্রন্থে), ইবনে আবীদ দুনিয়া [আল জু’ও গ্রন্থে] উত্তম সনদে এবং হাকেম। হাকেম বলেনঃ মুসলিমের শর্তানুযায়ী হাদিসটি সহিহ]

◍ ১৭) শূন্যস্থান পূরণ করুন:

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যখন কারও সিয়ামের দিন উপস্থিত হয় সে যেন…………………….কেউ যদি তাকে গালি দেয় বা তার সাথে লড়াই-ঝগড়া করতে আসে সে যেন তাকে বলে দেয় আমি রোজা আছি।” [বুখারি ও মুসলিম]

উত্তর:
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
وَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا يَرْفُثْ وَلَا يَصْخَبْ فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ
“যখন তোমাদের কারো রোজার দিন উপস্থিত হয়, তখন সে যেন কোন অশ্লীল কথা ও কাজ না করে এবং অহেতুক উঁচু কণ্ঠে কথা না বলে অর্থাৎ ঝগড়া-বিবাদ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সহিত লড়াই-ঝগড়া করতে আসে তবে সে যেন তাকে বলে দেয়, আমি সিয়াম ব্রতে রত আছি।” [বুখারি ও মুসলিম]

◍ ১৮) যার পেটে কুরআনের কোনও অংশ নেই তার উদাহরণ কিসের মত?

উত্তর:
পরিত্যক্ত ঘরের মত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِنَّ الَّذِي لَيْسَ فِي جَوْفِهِ شَيْءٌ مِنْ الْقُرْآنِ كَالْبَيْتِ الْخَرِبِ
“যার পেটে মোটেও কুরআন নেই সে তো একটা পরিত্যক্ত ঘরের মত। [তিরমিযী, হাসান-সহীহ[

◍ ১৯) “তারাবিহ এর সালাত ১১ রাকআতের বেশি পড়া বিদআত।” এ কথা কি সঠিক??

উত্তর:
না, এ কথা সঠিক নয়। মূলত: তারাবীহ কত রাকআত তা নিয়ে উলামাদের মধ্যে বিস্তর ইখতেলাফ (মতবিরোধ) আছে। কিন্তু বিতরসহ ১১ বা ১৩ রাকাত আদায় করাই উত্তম। কেননা আয়েশা রা. বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে,
مَا كَانَ يَزِيدُ فِي رَمَضَانَ ، وَلاَ غَيْرِهِ عَلَى إِحْدَى عَشْرَةَ رَكْعَةً
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজান বা অন্য কোন সময়ে ১১ রাকাআতের বেশী পড়তেন না।” [বুখারি ও মুসলিম]

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
كان صلاةُ النبيِّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم ثلاثَ عَشرةَ ركعةً. يعني: باللَّيل
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রাতের নামায ছিল ১৩ রাকাত।” (বুখারি ও মুসলিম) কিন্তু যদি এর চেয়ে বেশী ২০ বা ৩০ বা ততোধিক রাকাত আদায় করা হয়, তাতেও কোন অসুবিধা নেই।

অন্য একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

أنَّ رجلًا سألَ رسولَ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم عن صلاةِ اللَّيل، فقال رسولُ الله صلَّى اللهُ عليه وسلَّم: صلاةُ الليلِ مَثْنَى مثنَى، فإذا خشِيَ أحدُكم الصبحَ صلَّى ركعةً واحدةً، تُوتِر له ما قدْ صلَّى
“জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা.কে রাতের নামায সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, রাতের নামায দু দু রাকাত করে পড়বে। তোমাদের কেউ যদি এভাবে নামাজ পড়তে পড়তে ফজর হয়ে যাওয়ার আশংকা করে তবে সে এক রাকাত পড়বে। তখন এর মাধ্যমে তার নামায বেজোড় বা বিতর হয়ে যাবে”। [বুখারি ও মুসলিম]

অতএব ১১ রাকাতই পড়তে হবে, এর বেশী পড়া যাবে না, এরকম কথা যেমন বাড়াবাড়ি। অনুরূপ ২৩ রাকাতই পড়তে হবে, এরচেয়ে কম বা বেশী পড়া যাবে না, এরকম কথাও বাড়াবাড়ি।

◍ ২০) রমজান মাসে উমরা করার ফজিলত কী?
উত্তর:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
عُمْرَةً فِي رَمَضَانَ تَقْضِي حَجَّةً أَوْ حَجَّةً مَعِي
“রমজানে একটি উমরাতে একটি হজ্জের সওয়াব রয়েছে। অথবা বলেছেন, আমার সাথে একটি হজ্জ পালনের সওয়াব রয়েছে।” (বুখারি ও মুসলিম)
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬
প্রস্তত করণ:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব
কোর্স পরিচালক।

যে ২৩ গুরুতর অপরাধে মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে না

 নিম্নে এমন ২৩টি বিশেষ গুনাহ ও অপরাধের কথা উল্লেখ করা হল, যেগুলোর ব্যাপারে হাদিসে বলা হয়েছে যে, এ সকল গুনাহের কারণে মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে না বা জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না অথবা বলা হয়েছে, জাহান্নামে প্রবেশ করবে। যথা:

১. ঈমান না আনা
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ إِلا مُؤْمِنٌ
“ঈমানদার ব্যতীত কেউ জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (বুখারী ও মুসলিম)
তিনি আরও বলেন,
لا تَدْخُلُوا نَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا
“তোমরা ঈমান না আনা পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেন না।” (সহীহ্‌ মুসলিম, হা/৫৪)
২. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া:
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ لا يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ
“যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহীহ মুসলিম/৪৬)
৩. অহংকার করা:
রসূল সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ
“যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না ।” (মুসলিম, হা/৯১)
৪. চোগলখোরি ও পরনিন্দা করা:
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ نَمَّامٌ
“চুগলখোর বা পর নিন্দাকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না ।” (সহীহ মুসলিম, হা/১০৫)
তিনি আরও বলেছেন,
تَجِدُ مِنْ شَرِّ النَّاسِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عِنْدَ اللَّهِ ذَا الْوَجْهَيْنِ الَّذِي يَأْتِي هَؤُلَاءِ بِوَجْهٍ وَهَؤُلَاءِ بِوَجْهٍ
“কিয়ামতের দিন সবচেয়ে খারাপ লোকদের দলভুক্ত হিসেবে ঐ ব্যক্তিকে দেখতে পাবে যে, যে ছিল দুমুখো- যে এক জনের কাছে এক কথা আরেক জনের কাছে আরেক কথা নিয়ে হাজির হত।” (সহীহ মুসলিম, হা/২৫২৬)
৫. আত্মহত্যা করা:
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ تَرَدَّى مِنْ جَبَلٍ فَقَتَلَ نَفْسَهُ ، فَهْوَ فِى نَارِ جَهَنَّمَ ، يَتَرَدَّى فِيهِ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا ، وَمَنْ تَحَسَّى سَمًّا فَقَتَلَ نَفْسَهُ ، فَسَمُّهُ فِى يَدِهِ ، يَتَحَسَّاهُ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا ، وَمَنْ قَتَلَ نَفْسَهُ بِحَدِيدَةٍ ، فَحَدِيدَتُهُ فِى يَدِهِ ، يَجَأُ بِهَا فِى بَطْنِهِ فِى نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدًا مُخَلَّدًا فِيهَا أَبَدًا
“যে ব্যক্তি নিজেকে পাহাড়ের ওপর থেকে নিক্ষেপ করে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে যাবে। সেখানে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে নিক্ষেপ করতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে, সে তার বিষ তার হাতে থাকবে। জাহান্নামে সর্বদা সে ওইভাবে নিজেকে বিষ খাইয়ে মারতে থাকবে অনন্তকাল ধরে। যে কোনো ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করেছে তার কাছে জাহান্নামে সে ধারালো অস্ত্র থাকবে যার দ্বারা সে সর্বদা নিজের পেটকে ফুঁড়তে থাকবে। [সহীহ বুখারী : ৫৪৪২; মুসলিম : ১০৯]
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ
“আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহীহ মুসলিম, হা/২৫৫৬)
৭. হারাম খাওয়া:
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ لَحْمٌ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ
“হারাম অর্থের মাধ্যমে (যে শরীরে) মাংস বৃদ্ধি পেয়েছে তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। অর্থাৎ যে ব্যক্তি হারাম অর্থ ও অবৈধ উপার্জন দ্বারা দেহ গঠন করেছে জাহান্নামের আগুনই তার প্রাপ্য।” (তাখরীজ মিশকাতুল মাসাবীহ,সহীহ, আলবানী, হাদীস নং ২৭০৩)
৮. উপকার করে খোটা দেয়া
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنَّانٌ
“সে ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না যে উপকার করে খোটা দেয়।” সুনান নাসাঈ, হা/ ৫৬৮৮, সহীহ, আলবানী)
৯. তক্দীর (ভাগ্যের লিখন) অস্বীকার করা
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ عَاقٌّ ، وَلا مُدْمِنُ خَمْرٍ ، وَلا مُكَذِّبٌ بِقَدَرٍ
“পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, মদ্যপায়ী এবং তকদীর অস্বীকার কারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সিলসিলা সহীহা, হাসান, ৬৭৫)
১০. যাদুতে বিশ্বাস করা
১১. মদ, গাঁজা ও নেশা দ্রব্য গ্রহণ করা
১২. গণক
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
” لا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ خَمْسٌ ، مُدْمِنُ خَمْرٍ ، وَلا مُؤْمِنٌ بِسِحْرٍ ، وَلا قَاطِعُ رَحِمٍ ، وَلا مَنَّانٌ ، وَلا كَاهِنٌ ”
“পাঁচ শ্রেণীর মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (তারা হল,) মদ্যপায়ী, যাদুর বৈধতায় বিশ্বাসী, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, চোগলখোর এবং গণক।” (মুসনাদে আহমদ, হাসান, আলবানী)
১৩. ঋণ পরিশোধ না করা
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট কোন ঋণগ্রস্ত মৃতের লাশ (জানাযার জন্য) নিয়ে আসা হলে জিজ্ঞেস করতেন, “সে ঋণ পরিশোধের ব্যবস্থা করেছে কি না?” যদি বলা হত করেছে, তবে জানাযা পড়তেন। অন্যথায় (সাহাবীদেরকে) বলতেন,
صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ
“তোমরা তোমাদের সাথীর জানাযা পড়ে নাও (কিন্তু তিনি নিজে তাতে অংশ গ্রহণ করতেন না)। (সহীহ মুসলিম, হা/১৬১৯)
অন্য হাদীসে রয়েছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
يُغْفَرُ لِلشَّهِيدِ كُلُّ ذَنْبٍ إِلَّا الدَّيْنَ
“শহীদের ঋণ ছাড়া সব গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।” (সহীহ মুসলিম, হা/১৮৮৬)
১৪. পুরুষ বেশধারী নারী
১৫. দাইয়ুস
আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন:
ثَلاثٌ لا يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ : الْعَاقُّ لِوَالِدَيْهِ ، وَالدَّيُّوثُ ، وَرَجُلَةُ النِّسَاءِ
“তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না। তারা হল, পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, দাইয়ূস এবং পুরুষ বেশধারী নারী।” (সহীহুল জামে, আলবানী, হা/৩৬৩)
দাইয়ূস: রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
الدَّيُّوثُ الَّذِي يُقِرُّ فِي أَهْلِهِ الْخَبَثَ
“ঐ ব্যক্তিকে দাইয়ূস বলা হয় যে তার পরিবারের অশ্লীলতা ও কুকর্মকে মেনে নেয়।” (মুসনাদ আহমদ, নাসাঈ)
১৬. বৃদ্ধ ব্যভিচারী
১৭. মিথ্যাবাদী শাসক
১৮. অহংকারী দরিদ্র
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
ثَلاثَةٌ لا يُكَلِّمُهُمُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَلا يُزَكِّيهِمْ وَلَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ : شَيْخٌ زَانٍ ، وَمَلِكٌ كَذَّابٌ ، وَعَائِلٌ مُسْتَكْبِرٌ
“কিয়ামতের আল্লাহ দিন তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলবেন না, তাদেরকে গুনাহ থেকে পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে পীড়া দায়ক শাস্তি। তারা হল, বৃদ্ধ ব্যভিচারী, মিথ্যাবাদী শাসক, অহংকারী দরিদ্র। (মুসলিম, হা/১০৭)
১৯. কঠোর প্রকৃতি ও কটুভাষী লোক এবং যে ব্যক্তি মানুষের কাছে এমন বিষয় নিয়ে গর্ব-অহংকার প্রকাশ করে বেড়ায় প্রকৃতপক্ষে যা তার নিকট নেই
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ الْجَوَّاظُ ، وَلَا الْجَعْظَرِيُّ
“কঠোর প্রকৃতি ও কটুভাষী লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না এবং ঐ লোকও নয় যে এমন সব বিষয়ে মানুষের নিকট গর্ব-অহংকার প্রকাশ করে বেড়ায় প্রকৃতপক্ষে যা তার কাছে নাই।” (আবু দাঊদ, হা/৪৮০১, সহীহ, আলবানী)
২০. মুসলিম সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ ভাবে বসবাসকারী অমুসলিমকে হত্যা করা
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
مَنْ قَتَلَ مُعَاهَدًا لَمْ يَرِحْ رَائِحَةَ الْجَنَّةِ ، وَإِنَّ رِيحَهَا تُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ أَرْبَعِينَ عَامًا
“যে ব্যক্তি কোন মুয়াহিদ তথা মুসলিম সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ ভাবে বসবাসকারী কোন অমুসলিমকে হত্যা করবে সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। অথচ চল্লিশ বছরের পথের দূরত্ব থেকে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাওয়া যায়।” (সহীহ বুখারী হা/৩১৬৬)
২১. বিশ্বাসঘাতক শাসক
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
مَا مِنْ عَبْدٍ يَسْتَرْعِيهِ اللَّهُ رَعِيَّةً ، يَمُوتُ يَوْمَ يَمُوتُ وَهُوَ غَاشٌّ لِرَعِيَّتِهِ إِلا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ
“যাকে আল্লাহ তায়ালা জনসাধারণের শাসনকর্তা হিসেবে দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, কিন্তু সে জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং বিশ্বাসঘাতক অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেছে তাহলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন।” (সহীহ মুসলিম, হা/১৪২)
২২. মানুষকে প্রহার করা
২৩. মহিলাদের পর্দা হীনতা
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ ، لَمْ أَرَهُمَا قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُونَ بِهَا النَّاسَ ، وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيلَاتٌ مَائِلَاتٌ ، رُءُوسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ ، لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلَا يَجِدْنَ رِيحَهَا ، وَإِنَّ رِيحَهَا لَيُوجَدُ مِنْ مَسِيرَةِ كَذَا وَكَذَا
“দু শ্রেণীর মানুষ জাহান্নামে যাবে- যাদের আমি এখনো দেখি নি। (অর্থাৎ নবী সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে তাদের আত্মপ্রকাশ হয় নি)
ক) এমন কিছু লোক যাদের হাতে থাকবে গরুর লেজের মত লাঠি। এরা তা দিয়ে জনগণকে প্রহার করবে।
খ) এবং ঐ সকল উলঙ্গ-অর্ধ উলঙ্গ নারী যারা (নিজেদের চলাফেরা ও বেশ-ভূষায়) মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করবে এবং নিজেরাও অন্য মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথায় উটের মত উঁচু এবং একপাশে ঝুঁকে থাকা চূড়ার মতো কেশ রাশি শোভা পাবে। এসমস্ত নারী জান্নাতে তো যাবেই না বরং জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না অথচ এত এত দূর থেকে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাওয়া যায়।” (সহীহ মুসলিম, হা/২১২৮)
এমন গুনাহ আরও আছে কিন্তু ব্যাপক প্রচলিত কিছু বিষয় এখানে তুলে ধরা হল।
আল্লাহর নিকট দুআ করি, তিনি যেন আমাদেরকে যে সব গুনাহ আমাদের জন্য জান্নাতের পথে বাধা সৃষ্টি করে এবং জাহান্নামের দিকে টেনে নিয়ে যায় সে সব গুনাহ থেকে হেফাজত করেন। আমিন।
——————-
গুরুত্বপূর্ণ টিকা:
উপরোক্ত কাজগুলো কবীরা গুনাহের অন্তর্ভূক্ত। কবীরা গুনাাহে লিপ্ত ব্যক্তিরা যদি তওবা করার পূর্বেই মৃত্যু বরণ করে এবং আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা না করেন তবে তাদের পরিণতি জাহান্নাম। তবে আল্লাহ তায়ালা নিজ দয়া ও ইনসাফের ভিত্তিতে এদের মধ্যে যাকে খুশি ক্ষমা করে দিবেন যদি সে শিরক থেকে দূরে থাকে। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেন:
إِنَّ اللَّـهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
“নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন।” (সূরা নিসা: ৪৮)
তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
( من مات وهو يعلم أنه لا إله إلا الله دخل الجنة (رواه مسلم
“যে ব্যক্তি এমন অবস্থায় মারা গেল যে, (জীবিত অবস্থায়) সে ভালো করে জানত, ‘আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন সত্য ও সত্যিকার মা‘বুদ নেই, সে ব্যক্তি অবশ্যই জান্নাতে প্রবেশ করবে।” (সহীহ মুসলিম)
আর যাদেরকে তিনি ক্ষমা করবেন না তাদেরকে তিনি জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন। পাপের শাস্তি ভোগ করার পর আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। অর্থাৎ তাওহীদপন্থী কবীরা গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তিরা প্রথম পর্যায়ে জান্নাতে প্রবেশকারীদের সাথে জান্নাতে প্রবেশ করবে না বরং জাহান্নামে গিয়ে শাস্তি ভোগ করার পর পরিশেষে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কোন তওহীদপন্থীই অন্যান্য কাফেরদের মত চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামে অবস্থান করবে না। এটাই হল, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামায়াতের আকীদাহ। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। -অনুবাদক
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
المانعات من دخول الجنَّات من كتاب (100 كبيرة من كبائر الذُّنوب)
للدكتور/ صالح بن عبد الله الصّياح
জান্নাতের পথে বাধা সৃষ্টি করে যে সব কাজ:
একশটি কবীরা গুনাহ বই থেকে
মূল: ডক্টর সালিহ বিন আবদুল্লাহ সাইয়াহ
অনুবাদক: আবদুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুাবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মুহররমের বিদআত ও শরিয়া বিরোধী কার্যক্রম

 মুহররম মাস-বিশেষ করে এ মাসের ১০ তারিখে (আশুরার দিন) শিয়া-রাফেযি সম্প্রদায় কর্তৃক অনেক বাড়াবাড়ি, হিংসাত্মক এবং নান ধরণের শরীয়ত বহির্ভূত/বিদআতি কার্যক্রম পালিত হয়ে থাকে।

নিম্নে এ ধরণের কতিপয় কার্যক্রম তুলে ধরা হল:

১) হুসাইন রা. এর শাহাদাতকে কেন্দ্র করে তাঁর প্রতি মিথ্যা সমবেদনার প্রকাশ হিসেবে গালে চপেটাঘাত করা, বুক থাপড়ানো, শরীর রক্তাক্ত করা, তলোয়ার বা ছুরির আঘাতে মাথা থেকে রক্ত প্রবাহিত করা, মাটিতে গড়াগড়ি করা, কান্নাকাটি করা, শরীরের পোশাক ছেঁড়া, নিজেকে নানাভাবে কষ্ট দেয়া ইত্যাদি।
২) কারবালা যুদ্ধের প্রতীক হিসেবে আশুরায় ‘লাঠি খেলা’র আয়োজন করা।
৩) মুহররমের ১০ তারিখে শোক দিবস পালন করা।
৪) হুসাইন রা. এর প্রতীকী কবর তৈরি করে তা সুসজ্জিত করা বা তাতে সম্মান করা।
৫) কালো পতাকা নিয়ে তাজিয়া মিছিল করা এবং তাতে পানি বিতরণ করা।
৬) মুহররমের দশ তারিখে কালো জামা-কাপড় পরিধান করা।
৭) মুহররম উপলক্ষে গান-বাদ্য, কাওয়ালি, জারি, সারি, মর্সিয়া বা পালা গানের আসর বসানো।
৮) হুসাইন রা. এর মৃত্যুতে শোক পালনার্থে মুহররমের প্রথম দশ দিন গোস্ত, মাছ, ডিম ইত্যাদি খাওয়া, বিয়াশাদী করা বা দেয়া থেকে বিরত থাকা।
৯) এ উপলক্ষে মুহররমের প্রথম দশ দিন মাটিতে ঘুমানো।
১০) কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিথ্যা কিচ্ছা-কাহিনী বর্ণনা করে ফেতনার আগুন উসকিয়ে দেয়া এবং পূর্ব যুগের বিভিন্ন নিরপরাধ মানুষের প্রতি অভিশাপ দেয়া।
এ কাজগুলো মূলত: পথভ্রষ্ট শিয়া সম্প্রদায়ের মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে থাকে আর অনেক অজ্ঞ মুসলিম না জানার কারণে তাদের সাথে এ সব কার্যক্রমে অংশ গ্রহণ করে!
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সকল ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
▬▬▬▬▬▬▬▬
গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

কিছু মতবিরোধের কারণে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা

 

প্রশ্ন

আমার বাবা ও আমার ফুফুর মাঝে কিছু পারিবারিক বিবাদ আছে। যার ফলে আমাদের মাঝে আত্মীয়তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এতে কি কোন গুনাহ হবে? উল্লেখ্য, আমার ফুফু তার পক্ষ থেকে আমাদেরকে দেখতে আসেন।

উত্তর

আলহামদু লিল্লাহ।.

নিঃসন্দেহে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। কুরআন-হাদিসের অসংখ্য দলিলে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করার নির্দেশ উদ্ধৃত হয়েছে। যে সব দলিল আমাদের মহান শরিয়তে এ বিষয়টির মহা মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। কারণ ইসলামী শরিয়ার মহান উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—মানুষের মাঝে সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং তাদের মাঝে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক ও মেল-বন্ধন টিকিয়ে রাখা।

আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: "এবং যারা আল্লাহ্‌ যা সংযুক্ত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা সংযুক্ত রাখে (আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখে), নিজেদের প্রভুকে ভয় করে ও কঠিন হিসাবের আশংকায় থাকে।"[সূরা আর-রাদ, আয়াত: ২১]

হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে যে কঠিন হুশিয়ারী এসেছে তার মধ্যে রয়েছে—

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু্ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহ যাবতীয় সৃষ্টিকে পয়দা করলেন। যখন তিনি সৃষ্টি কাজ সমাধা করলেন, তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক বলে উঠলো: সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে আপনার কাছে আশ্রয়প্রার্থীদের এটাই যথাযোগ্য স্থান? তিনি (আল্লাহ) বললেনঃ হ্যাঁ; তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তোমার সাথে যে সুসম্পর্ক রাখবে, আমিও তার সাথে সুসম্পর্ক রাখবো। আর যে তোমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমিও তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবো। সে বলল: হ্যাঁ; আমি সন্তুষ্ট হে আমার রব! আল্লাহ বললেন: তোমার জন্য সেটাই হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেন, ইচ্ছে করলে তোমরা (এ আয়াতটি) পড়:

فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ تَوَلَّيْتُمْ أَنْ تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَى أَبْصَارَهُمْ أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا

(অনুবাদ: তোমরা যদি মুখ ফিরিয়ে নাও তবে তোমাদের কাছ থেকে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা ছাড়া আর কী আশা করা যায়? ওরা তো তারাই আল্লাহ্‌ যাদেরকে লানত করেছেন, বধির করে দিয়েছেন ও তাদের চোখ অন্ধ করে দিয়েছেন। তারা কী কুরআন অনুধাবন করবে না? বরং তাদের অন্তরগুলোর উপর তালা দেয়া।" [সহিহ বুখারী (৫৯৮৭) ও সহিহ মুসলিম (২৫৫৪)]

যদি মানুষ আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার কারণ কী তা ভেবে দেখে তাহলে দেখতে পাবে যে, এ ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থই এর কারণ; কেয়ামতের দিন আল্লাহ্‌র কাছে যার কোন মূল্য নেই। কিংবা এর কারণ হচ্ছে—তাদের মাঝে শয়তানের প্ররোচনা। শয়তান হীন সব কারণে তাদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তৈরী করে; যে সব কারণ ভ্রুক্ষেপ করার মত কিছু নয়।

এমন কি সম্পর্ক ছিন্ন করার যথাযথ কারণও যদি থাকে তারপরেও ইসলামী শরিয়া সম্পর্ক রক্ষা করে চলার নির্দেশ দেয় এবং ভুলগুলো এড়িয়ে যাওয়া, মাফ করে দেয়া, ক্ষমা করে দেওয়া ও সহনশীল হওয়ার প্রতি মুমিনদেরকে উদ্বুদ্ধ করে; ভুলের পিছে লেগে থাকা ও হিংসা-বিদ্বেষ জিইয়ে রাখার প্রতি নয়।

আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, "এক ব্যক্তি বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আমার কিছু আত্মীয় আছে আমি তাদের সাথে সম্পর্ক রেখে চলি; কিন্তু তারা আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে। আমি তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করি; তারা আমার সাথে দুর্ব্যবহার করে। আমি তাদের সাথে সহিষ্ণু আচরণ করি; তারা আমার সাথে মূর্খের মত আচরণ করে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তুমি যেমনটি উল্লেখ করেছ যদি তুমি তেমন হও তাহলে তুমি যেন তাদের মুখে গরম ছাই ছুড়ে দিচ্ছ। তুমি যতক্ষণ এর উপর অটল থাকবে ততক্ষণ তাদের বিরুদ্ধে তোমার সাথে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে একজন সাহায্যকারী থাকবে।"[সহিহ মুসলিম (২৫৫৮)]

ইমাম নববী 'শারহু মুসলিম' (সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যা) গ্রন্থে (১৬/১১৫) বলেন:

হাদিসে المل শব্দের অর্থ: গরম ছাই। يجهلون (মূর্খের মত আচরণ করে) এর মানে তারা খারাপ ব্যবহার করে। (এ অংশের) মর্মার্থ: তুমি যেন তাদেরকে গরম ছাই খাইয়ে দিচ্ছ। এটি একটি উপমা—গরম ছাই খেতে যে কষ্ট হয় তাদের যেন তেমন কষ্ট হচ্ছে। এ ইহসানকারীর কোন ক্ষতি নেই। বরং সম্পর্ক ছিন্ন করার কারণে ও তাকে কষ্ট দেওয়ার কারণে তাদের মহাপাপ হবে। কারো কারো মতে, হাদিসের মর্মার্থ হচ্ছে—তুমি তাদের প্রতি ইহসান করে তাদেরকে লজ্জিত করছ। তাদের কাছে তাদের নিজেদেরকে ছোট করে দিচ্ছ— তাদের প্রতি তোমার অধিক দয়া ও তোমার সাথে তাদের অধিক দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে। আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।[সমাপ্ত]

নবী সাল্লাল্লাহু্ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: "সম্পর্ক রক্ষাকারী সে ব্যক্তি নয় যে ব্যক্তি  অন্যে সম্পর্ক রক্ষা করলে সম্পর্ক রক্ষা করে। বরং ঐ ব্যক্তি হল সম্পর্ক রক্ষাকারী যার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা হলেও সে সম্পর্ক রক্ষা করে।" [সহিহ বুখারী (৫৯৯১)]

প্রিয় ভাই, ইসলাম এমন আখলাকের দিকে আহ্বান করে। সুতরাং যে ব্যক্তি তার বোনের সাথে বা মায়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তার এ কর্মের প্রতিবাদ করতে দ্বিধা করা অনুচিত।  প্রিয় প্রশ্নকারী ভাই, আপনার পিতা কর্তৃক তার বোনের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাকে আপনি সম্মতি দেয়া জায়েয হবে না। বরং আপনার কর্তব্য, তার সাথে যোগাযোগ রাখা ও ভাল ব্যবহার করা এবং তার সাথে আপনার বাবার সম্পর্ক ঠিক করার চেষ্টা করা এবং এর জন্য যা কিছু করা দরকার সেটা করা।

আরও জানতে আমাদের ওয়েবসাইটের 4631 নং, 7571 নং ও 75411 নং প্রশ্নোত্তরগুলো দেখুন।

আল্লাহ্‌ই সর্বজ্ঞ।

আল্লাহর নিকট হেদায়েত লাভের দশটি অতি গুরুত্বপূর্ণ দুআ (আরবি টেক্সট, বাংলা উচ্চারণ ও অনুবাদ সহ)

 হাদিসে কুদসি: আবু যর আল গিফারি রা. থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহর নিকট থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

يَا عِبَادِي! كُلُّكُمْ ضَالٌّ إلَّا مَنْ هَدَيْته، فَاسْتَهْدُونِي أَهْدِكُمْ.
“হে আমার বান্দাগণ, আমি যাকে হেদায়েত (সঠিক পথের সন্ধান) দিয়েছি সে ছাড়া তোমরা সকলে পথভ্রষ্ট। সুতরাং তোমরা আমার কাছে হেদায়েত চাও আমি তোমাদেরকে হেদায়েত দান করব।” (সহিহ মুসলিম)
সে কারণে মহান রবের দরবারে আমাদের হেদায়েত বা সঠিক পথের সন্ধান চাওয়া করা খুব বেশি প্রয়োজন। কারণ তিনি সুপথ না দেখালে আমরা নিশ্চিতভাবে পথভ্রষ্ট, ধ্বংস প্রাপ্ত এবং অন্ধকারের অতল তলে হারিয়ে যাব। (আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করুন)।

নিম্নে কুরআন-সহিহ হাদিস থেকে হেদায়েত প্রার্থনা এবং হেদায়েত পাওয়ার পর তার উপর অবিচল থাকা সংক্রান্ত অতি গুরুত্বপূর্ণ সংক্ষিপ্ত দশটি দুআ উপস্থাপন করা হল:

◈ দুআ: ১
اهْدِنَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ
“হে আল্লাহ, আমাদেরকে সরল পথ দেখাও।” (সূরা ফাতিহা: ৬)

◈ দুআ: ২
اللَّهُمَّ إِنِي أَسْأَلُكَ الهُدَى، وَالتُّقَى، وَالعفَافَ، والغنَى‎
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস আলুকাল হুদা ওয়াত-তুকা ওয়াল আ’ফাফা ওয়াল গিনা।
অর্থ: “হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে সুপথ, আল্লাহ ভীতি,  চরিত্রের নির্মলতা ও অভাব মুক্তির প্রার্থনা করছি।” (সুনানে তিরমিযী, হাদিসটি সহিহ)

◈ দুআ: ৩
اللَّهُمَّ أَلْهِمْنِي رُشْدِي، وَأَعِذْنِي مِنْ شَرِّ نَفْسِي
উচ্চারণ : আল্লা-হুম্মা আলহিমনী রুশদী, ওয়া আয়িজনী মিন শাররি নাফসী।
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমাকে হেদায়েত দান করো এবং আমার নফসের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করো।”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুসাইন ইবনে আলী (রা.)-কে দুটি বাক্য দ্বারা দুআ করতে শিখিয়েছিলেন।
(সুনানে তিরমিজি। অবশ্য এ হাদিসটিকে শাইখ আলবানি রহ. জঈফ বলেছেন [জঈফুল জামে/৪০৯৮] তবে কোনও দুআ ভালো অর্থবোধক হলে তা জইফ সনদে বর্ণিত হলেও কোনও সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ- যেখানে নিজের ইচ্ছেমত দুআ করার সুযোগ আছে)

◈ দুআ: ৪

رَبِّ أَعِنِّي وَلاَ تُعِنْ عَلَىَّ وَانْصُرْنِي وَلاَ تَنْصُرْ عَلَىَّ وَامْكُرْ لِي وَلاَ تَمْكُرْ عَلَىَّ وَاهْدِنِي وَيَسِّرِ الْهُدَى لِي

উচ্চারণ:  রাব্বি আ’য়িননী ওয়ালা তু’য়িন আ’লাইয়া। ওয়ানসুরনি ওয়ালা তানসুর আ’লাইয়া। ওয়ামকুর লী ওয়ালা তামকুর আ’লাইয়া, ওয়াহদিনী ওয়া ইসসিরিল হুদা লী।


অর্থ: ‘‘হে আমার রব, আমাকে সাহায্য করো এবং আমার বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করো না। আমাকে সহযোগিতা করো এবং আমার বিরুদ্ধে কাউকে সহযোগিতা করো না। আমার জন্য কৌশল এঁটো, আমার বিরুদ্ধে কৌশল এঁটো না। আমাকে হেদায়েত দান করো, আমার জন্য হেদায়েতের পথ সহজতর করো এবং যে ব্যক্তি আমার উপর অত্যাচার ও সীমা লঙ্ঘন করে তার বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করো। [সুনানে ইবনে মাজাহ- অধ্যায়: ২৮/ দোয়া, পরিচ্ছেদ: ২৮/২. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দুআ-সহিহ]

◈ দুআ: ৫

‏ اللَّهُمَّ رَبَّ جِبْرَائِيلَ وَمِيكَائِيلَ وَإِسْرَافِيلَ فَاطِرَ السَّمَوَاتِ وَالأَرْضِ عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ اهْدِنِي لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ ‏‏ ‏

“হে আল্লাহ, জিবরিল, মিকাইল ও ইসরাফিলের প্রভু, আসমান-জমিনের মালিক, দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান সবকিছুর ব্যাপারে সম্যক অবগত, আপনার বান্দারা যে সব বিষয়ে মতবিরোধ করছে আপনি তাতে ফয়সালা করেন। হকের যি বিষয়ে মতবিরোধ দেখা যায় সে বিষয়ে  আপনার অনুমতিক্রমে আমাকে সঠিক পথ দেখান। নিশ্চয় আপনি যাকে ইচ্ছা তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।” (সহিহ মুসলিম)

◈ দুআ: ৬
اَللّٰهُمَّ اهْدِنِيْ وَسَدِّدْنِيْ – اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَسْأَلُكَ الْهُدٰى وَالسَّدَادَ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাহদিনী ওয়া সাদ্দিদনী, আল্লাহুম্মা ইন্নী আস-আলুকাল হুদা ওয়াস সাদাদ।
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমাকে হেদায়েত দান কর, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত কর। হে আল্লাহ! তোমার নিকট হেদায়েত ও সঠিক পথ কামনা করছি।”
[সহিহ মুসলিম]

◈ দুআ: ৭
اللَّهُمَّ ثَبِّتْنى وَاجْعَلْهنى هَادِيًا مَهْدِيًّا
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাব্বিতনি ওয়াজ’আলনী হাদিয়াম মাহদিয়া।
অর্থ: “হে আল্লাহ, আমাকে স্থির রাখুন ও হিদায়েত কারী ও হিদায়েত প্রাপ্ত বানান ” [সহিহ মুসলিম]

◈ দুআ: ৮

اللهمَّ اهْدِني فيمن هديتَ, وعافِني فيمن عافيتَ, وتولَّني فيمن توليتَ, وبارِكْ لي فيما أعطيتَ, وقِنِي شرَّ ما قضيتَ, فإنك تقضي ولا يُقْضَى عليك, وإنَّهُ لا يَذِلُّ من واليتَ, ولا يَعِزُّ من عاديتَ, تباركتَ ربنا وتعاليتَ, لا مَنْجَا منك إلا إليكَ

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মাহদিনী ফী মান হাদাইত।
ওয়া-ফিনী ফীমান আ’-ফাইত।
ওয়া তাওয়াল্লানী ফী-মান তাওয়াল্লাইত।
ওয়া বা-রিকলী ফী মা আত্বাইত।
ওয়া ক্বিনী শাররা মা-ক্বায্বাইত।
ফাইন্নাকা তাক্বয্বী অলা য্যুকয্বা আলাইক। ইন্নাহু লা য়্যাযিল্লু মাঁউ ওয়া-লাইত। ওয়া লা য়্যাইয্‌যু মান আ’-দাইত। তাবা-রাকতা রাব্বানা ওয়া তাআ’লাইত। লা মানজা মিনকা ইল্লা ইলাইক।

অর্থ: “হে আল্লাহ! তুমি যাদেরকে হেদায়েত করেছ, আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত কর। তুমি যাদেরকে নিরাপদ রেখেছ আমাদেরকে তাদের দলভুক্ত কর।
তুমি যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছ, আমাদেরকে তাদের দলভুক্ত করো।
তুমি আমাদেরকে যা দিয়েছ তাতে বরকত দাও।
তুমি যে অমঙ্গল নির্দিষ্ট করেছ তা হতে আমাদেরকে রক্ষা করো। নিশ্চয় তুমিই ফয়সালা করো; তোমার ওপরে ফয়সালা করার কেউ নেই। তুমি যার অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছ, সে কোনও দিন অপমানিত হবে না এবং তুমি যার সাথে শত্রুতা করেছ, সে কখনো সম্মানিত হতে পাবে না। হে আমাদের রব, তুমি বরকতময় ও সুমহান। তোমার পাকড়াও থেকে বাঁচার উপায় নাই তোমার আশ্রয় ছাড়া।”
হাসান বিন আলি রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বিতর সলাতে বলার জন্য এ দুআটি শিখিয়েছেন।”
[তিরমিযী, ইরওয়াউল গালীল গ্রন্থে (হা/ ৪২৯), শাইখ আলবানি এটিকে সহীহ বলেছেন]

◈ দুআ: ৯ (হেদায়েত লাভের পর অন্তরের বক্রতা হতে মুক্তি চাওয়ার দুআ)

‎رَبَّنَا لاَ تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
উচ্চারণ: রব্বানা-লা-তুযিগ্ কুলূবানা- বা’দা ইয্ হাদাইতানা-অহাবলানা-মিল্ লাদুনকা রহমাহ , ইন্নাকা আন্তাল্ ওয়াহহা-ব।
অর্থ: “হে আমাদের রব, আপনি হিদায়েত দেয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন।”

◈ দুআ: ১০ (হেদয়েত পাওয়ার পর তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার দুআ)
اللَّهُمَّ مُصَرِّفَ القُلُوبِ صَرِّفْ قُلُوبَنَا عَلَى طَاعَتِكَ
উচ্চারণ: “ইয়া মুসাররিফাল কুলুব সাররিফ কুলুবানা আলা ত্ব-আতিক।”
অর্থ: “হে হৃদয়সমূহের পরিবর্তনকারী, আমাদের হৃদয়গুলোকে আপনার আনুগত্যের দিকে ঘুরিয়ে দিন।” (সহিহ মুসলিম)
‎يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِى عَلَى دِينِكَ
উচ্চারণ: ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব, সাব্বিত কলবি আ’লা দীনিক।
অর্থ: “হে অন্তরসমূহের পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে তোমার দ্বীনের উপর সুদৃঢ় করে দাও।” (তিরমিযি, সহিহুল জামে/৭৯৮৭)
▬▬▬▬◈◍◈▬▬▬▬
সংকলনে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate