Wednesday, March 3, 2021

হযরত আদম আঃ এর জীবনের কাহিনী

 হযরত আদম (আ:) জীবনের কাহিনি১. হযরত আদম(আলাইহিস সালাম)1.হযরত আদম(আলাইহিস সালাম)2.শয়তানের সৃষ্টি ছিল মানুষের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ3.আদম সৃষ্টির কাহিনী4.খলীফা অর্থ5.সিজদার ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্য6.আদমের পাঁচটি শ্রেষ্ঠত্ব7.নারী জাতি পুরুষেরই অংশ এবং তার অনুগত8.নগ্নতা শয়তানের প্রথম কাজ9.মানব সৃষ্টির রহস্য10.জান্নাত থেকে পতিত হবার পর11.আদমের অবতরণ স্থল1.‘আহদে আলাস্ত্ত-র বিবরণ2.‘আহদে আলাস্ত্ত-র উদ্দেশ্য3.অন্যান্য অঙ্গীকার গ্রহণ4.আদমের মর্যাদা ওশ্রেষ্ঠত্ব5.দুনিয়াবী ব্যবস্থাপনায় আদম(আঃ)6.আদম পুত্রদ্বয়ের কাহিনী7.হত্যাকান্ডেরকারণ8.শিক্ষণীয় বিষয়9.মৃত্যু ও বয়স10.আদম (আঃ)-এর জীবনী থেকে শিক্ষণীয় বিষয়সমূহ১. হযরত আদম(আলাইহিস সালাম)বিশ্ব ইতিহাসে প্রথমমানুষ ও প্রথম নবী হিসাবে আল্লাহ পাক আদম(আলাইহিস সালাম)-কে নিজ দু’হাত দ্বারা সরাসরি সৃষ্টিকরেন(ছোয়াদ ৩৮/৭৫)। মাটির সকল উপাদানের সার-নির্যাস একত্রিত করে আঠালো ও পোড়ামাটির ন্যায়শুষ্ক মাটির তৈরী সুন্দরতম অবয়বে রূহ ফুঁকে দিয়েআল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন।[1]অতঃপরআদমের পাঁজর থেকে তাঁর স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টিকরেন।[2]আর এ কারণেই স্ত্রী জাতি স্বভাবগতভাবেই পুরুষ জাতির অনুগামী ও পরস্পরের প্রতিআকৃষ্ট। অতঃপর স্বামী-স্ত্রীর মাধ্যমে যুগ যুগধরে একই নিয়মে মানববংশ বৃদ্ধির ধারা অব্যাহতরয়েছে। কুরআন-এর বর্ণনা অনুযায়ীপ্রথম দিনথেকেই মানুষ পূর্ণ চেতনা ও জ্ঞান সম্পন্ন সভ্যমানুষ হিসাবেই যাত্রারম্ভ করেছে এবং আজওসেভাবেই তা অব্যাহত রয়েছে। অতএব গুহামানব,বন্যমানব, আদিম মানব ইত্যাদি বলে অসভ্য যুগথেকে সভ্য যুগে মানুষের উত্তরণ ঘটেছেবলে কিছু কিছু ঐতিহাসিক যেসব কথা শুনিয়ে থাকেন,তা অলীক কল্পনা ব্যতীত কিছুই নয়। সূচনাথেকে এযাবত এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মানুষকখনোইমানুষ ব্যতীত অন্য কিছু ছিল না। মানুষ বানরবা উল্লুকের উদ্বর্তিত রূপ বলে ঊনবিংশশতাব্দীতে এসে চার্লস ডারউইন (১৮০৯-১৮৮২)যে ‘বিবর্তনবাদ’ (Theory of Evolution) পেশকরেছেন, তা বর্তমানে একটি মৃত মতবাদ মাত্র এবংতা প্রায় সকল বিজ্ঞানী কর্তৃক প্রত্যাখ্যাতহয়েছে।প্রথম মানুষ আদি পিতা আদম (আঃ)-কেআল্লাহ সর্ব বিষয়ের জ্ঞান ও যোগ্যতা দানকরেন এবং বিশ্বে আল্লাহর খেলাফত পরিচালনারমর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। সাথে সাথে সকল সৃষ্টবস্ত্তকে করে দেন মানুষের অনুগত(লোকমান৩১/২০)ও সবকিছুর উপরে দেন মানুষেরশ্রেষ্ঠত্ব(ইসরা ১৭/৭০)। আর সেকারণেই জিন-ফিরিশতা সবাইকে মানুষের মর্যাদার প্রতি সম্মানপ্রদর্শনের জন্য আদমকে সিজদা করার আদেশদেন। সবাই সে নির্দেশ মেনে নিয়েছিল। কিন্তুইবলীস অহংকার বশে সে নির্দেশ অমান্য করায়চিরকালের মত অভিশপ্ত হয়ে যায়(বাক্বারাহ ২/৩৪)।অথচ সে ছিল বড় আলেম ও ইবাদতগুযার। সেকারণজিন জাতির হওয়া সত্ত্বেও সে ফিরিশতাদের সঙ্গেবসবাস করার অনুমতি পেয়েছিল ও তাদের নেতাহয়েছিল।[3]কিন্তু আদমের উচ্চ মর্যাদা দেখেসে ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ে। ফলে অহংকার বশেআদমকে সিজদা না করায় এবং আল্লাহ ভীতি না থাকায়সে আল্লাহর গযবে পতিত হয়। এজন্য জনৈকআরবী কবি বলেন, ﻟﻮﻛﺎﻥ ﻟﻠﻌﻠﻢ ﺷﺮﻑ ﻣﻦ ﺩﻭﻥﺍﻟﺘﻘﻯﻠﻜﺎﻥ ﺃﺷﺮﻑ ﺧﻠﻖ ﺍﻟﻠﻪ ﺇﺑﻠﻴﺲُ ‘যদি তাক্বওয়া বিহীনইলমের কোন মর্যাদা থাকত,তবে ইবলীসআল্লাহর সৃষ্টিকুলের সেরা বলে গণ্য হ’ত’।শয়তানের সৃষ্টি ছিল মানুষের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ:ইবলীসকে আল্লাহ মানুষের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ সৃষ্টি করেন এবংক্বিয়ামত পর্যন্ত তার হায়াতদীর্ঘ করে দেন। মানুষকে আল্লাহরপথ থেকেবিচ্যুৎ করার জন্য ও তাকে ধোঁকা দেওয়াইশয়তানের একমাত্র কাজ। ‘সে মানুষকে বলেকুফরী কর’। কিন্তু যখন সে কুফরী করে, তখনশয়তান বলে ‘আমি তোমার থেকে মুক্ত। আমিবিশ্বপ্রভু আল্লাহ্কে ভয় করি’(হাশর ৫৯/১৬)।অন্যদিকে যুগে যুগে নবী-রাসূল ও কিতাব পাঠিয়েআল্লাহ মানুষকে সত্য পথ প্রদর্শনের ব্যবস্থাঅব্যাহত রাখেন(বাক্বারাহ ২/২১৩)। আদম থেকে শুরুকরে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) পর্যন্ত একলক্ষচবিবশ হাযার পয়গাম্বর দুনিয়াতে এসেছেন[4]এবংবর্তমানে সর্বশেষ এলাহীগ্রন্থ পবিত্রকুরআনের ধারক ও বাহক মুসলিম ওলামায়ে কেরামশেষনবীর ‘ওয়ারিছ’ হিসাবে[5]আল্লাহ প্রেরিতঅহীর বিধান সমূহ বিশ্বব্যাপী পৌঁছে দেবার দায়িত্বপালন করে যাচ্ছেন(মায়েদাহ ৫/৬৭)। পৃথিবীরচূড়ান্ত ধ্বংস তথা ক্বিয়ামতের অব্যবহিত কাল পূর্বপর্যন্ত এই নিয়ম জারি থাকবে। শেষনবীরভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী পৃথিবীর এমন কোন বস্তিও ঝুপড়ি ঘরও থাকবেনা, যেখানে আল্লাহ ইসলামেরবাণী পৌঁছে দেবেন না।[6]এতদসত্ত্বেওঅবশেষে পৃথিবীতে যখন ‘আল্লাহ’ বলার মতকোন লোক থাকবে না, অর্থাৎ প্রকৃততাওহীদের অনুসারী কোন মুমিন বাকী থাকবেনা, তখন আল্লাহর হুকুমে প্রলয় ঘনিয়ে আসবে এবংক্বিয়ামত সংঘটিতহবে।[7]মানুষের দেহগুলি সব মৃত্যুরপরে মাটিতে মিশে যাবে। কিন্তু রূহগুলি স্ব স্ব ভালবা মন্দ আমল অনুযায়ী ‘ইল্লীন’ অথবা‘সিজ্জীনে’ অবস্থান করবে(মুত্বাফফেফীন৮৩/৭, ১৮)। যা ক্বিয়ামতের পরপরই আল্লাহর হুকুমেস্ব স্ব দেহে পুনঃপ্রবেশকরবে (ফজর ৮৯/২৯)এবং চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশের জন্য সকল মানুষসশরীরে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর দরবারে নীত হবে(মুত্বাফফেফীন ৮৩/৪-৬)।মানুষের ঠিকানা হ’ল তিনটি :১- দারুদ দুনিয়া। অর্থাৎ যেখানে আমরা এখন বসবাসকরছি ২- দারুল বরযখ। অর্থাৎ মৃত্যুর পরেকবরেরজগত। ৩- দারুল ক্বারার। অর্থাৎ ক্বিয়ামতেরদিন শেষ বিচার শেষে জান্নাত বা জাহান্নামেরচিরস্থায়ী ঠিকানা।অতএব পৃথিবী হ’ল মানুষের জন্যসাময়িক পরীক্ষাগার মাত্র। জান্নাত থেকে নেমেআসা মানুষ এই পরীক্ষাস্থলে পরীক্ষা শেষেসুন্দর ফল লাভে পুনরায় জান্নাতেফিরে যাবে, অথবাব্যর্থকাম হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। অতঃপরসেখানেই হবে তাদের সর্বশেষ যাত্রাবিরতি এবংসেটাই হবে তাদের চূড়ান্ত ও চিরস্থায়ী ঠিকানা।আল্লাহ বলেন, ‘মাটি থেকেই আমরা তোমাদেরসৃষ্টি করেছি। ঐ মাটিতেই তোমাদের ফিরিয়েনেব। অতঃপর ঐ মাটি থেকেই আমরাতোমাদেরকে পুনরায় বের করেআনব’(ত্বোয়াহা ২০/৫৫)। অতঃপর বিচার শেষেকাফেরদেরকে হাঁকিয়ে নেওয়া হবে জাহান্নামেরদিকে এবংমুত্তাক্বীদের নেওয়া হবে জান্নাতে(যুমার ৩৯/৬৯-৭৩)। এভাবেই সেদিন যালেম তারপ্রাপ্যশাস্তি ভোগ করবে এবং মযলূম তার যথাযথপ্রতিদান পেয়ে ধন্য হবে। সেদিন কারু প্রতিকোনরূপ অবিচারকরা হবে না(বাক্বারাহ ২/২৮১)।উল্লেখ্য যে, হযরত আদম (আঃ) সম্পর্কে পবিত্রকুরআনের ১০টি সূরায় ৫০টি আয়াতে বর্ণিতহয়েছে।[8]এক্ষণে আদম সৃষ্টির ঘটনাবলীকুরআনে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, তারআলোকে সার-সংক্ষেপ আমরা তুলে ধরার প্রয়াসপাব ইনশাআল্লাহ।আদম সৃষ্টির কাহিনী :আল্লাহ একদাফেরেশতাদের ডেকে বললেন, আমিপৃথিবীতে ‘খলীফা’ অর্থাৎ প্রতিনিধি সৃষ্টি করতেচাই। বল, এ বিষয়ে তোমাদের বক্তব্য কি? তারা(সম্ভবতঃ ইতিপূর্বে সৃষ্ট জিন জাতির তিক্ত অভিজ্ঞতারআলোকে) বলল, হে আল্লাহ! আপনি কিপৃথিবীতে এমন কাউকে আবাদ করতে চান, যারাগিয়ে সেখানে ফাসাদ সৃষ্টি করবে ও রক্তপাতঘটাবে? অথচ আমরা সর্বদাআপনার হুকুম পালনে এবংআপনার গুণগান ও পবিত্রতা বর্ণনায় রত আছি। এখানেফেরেশতাদের উক্ত বক্তব্য আপত্তির জন্য ছিলনা, বরং জানার জন্য ছিল। আল্লাহ বললেন, আমি যা জানি,তোমরা তা জানো না(বাক্বারাহ ২/৩০)। অর্থাৎ আল্লাহচান এ পৃথিবীতে এমন একটা সৃষ্টির আবাদ করতে,যারা হবে জ্ঞান ও ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন এবং নিজস্ববিচার-বুদ্ধি ও চিন্তা-গবেষণা সহকারে স্বেচ্ছায়-সজ্ঞানে আল্লাহর বিধান সমূহের আনুগত্য করবেও তাঁর ইবাদত করবে। ফেরেশতাদের মতকেবলহুকুম তামিলকারী জাতি নয়।খলীফা অর্থ :এখানে‘খলীফা’ বা প্রতিনিধি বলে জিনদের পরবর্তীপ্রতিনিধি হিসাবে বনু আদমকে বুঝানো হয়েছে,যারা পৃথিবীতে একে অপরের প্রতিনিধি হবে(ইবনুকাছীর)। অথবা এর দ্বারা আদম ও পরবর্তীন্যায়নিষ্ঠ শাসকদের বুঝানো হয়েছে, যারাজনগণের মধ্যে আল্লাহর আনুগত্য ও ইনছাফপূর্ণশাসক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বকরবে। কেননা ফাসাদ সৃষ্টিকারী ও অন্যায়রক্তপাতকারী ব্যক্তিরা আল্লাহর প্রতিনিধি নয় (ইবনুজারীর)। তবে প্রথম ব্যাখ্যাই অগ্রগণ্য, যাফেরেশতাদের জবাবে প্রতীয়মান হয় যে, এমনপ্রতিনিধি আপনি সৃষ্টি করবেন, যারা পূর্ববর্তী জিনজাতির মত পৃথিবীতে গিয়ে ফাসাদ ও রক্তপাতঘটাবে। বস্ত্ততঃ ‘জিন জাতির উপর ক্বিয়াস করেই তারাএরূপ কথা বলে থাকতে পারে’ (ইবনু কাছীর)।অতঃপর আল্লাহ আদমকে সবকিছুর নামশিক্ষা দিলেন।‘সবকিছুর নাম’ বলতে পৃথিবীর সূচনা থেকে লয়পর্যন্ত ছোট-বড় সকল সৃষ্টবস্ত্তর ইল্ম ও তাব্যবহারের যোগ্যতা তাকে দিয়ে দেওয়া হ’ল।[9]যাদিয়ে সৃষ্টবস্ত্ত সমূহকে আদম ও বনু আদমনিজেদের অনুগত করতে পারে এবং তা থেকেফায়েদা হাছিল করতে পারে। যদিও আল্লাহর অসীমজ্ঞানরাশির সাথে মানবজাতির সম্মিলিত জ্ঞানের তুলনামহাসাগরের অথৈ জলরাশির বুক থেকেপাখির ছোঁ মারাএক ফোঁটা পানির সমতুল্য মাত্র।[10]বলা চলে যে,আদমকে দেওয়া সেই যোগ্যতা ও জ্ঞান ভান্ডারযুগে যুগে তাঁর জ্ঞানী ও বিজ্ঞানী সন্তানদেরমাধ্যমে বিতরিত হচ্ছে ও তার দ্বারা জগত সংসারউপকৃত হচ্ছে। আদমকে সবকিছুর নাম শিক্ষাদেওয়ার পর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য আল্লাহতাকে ফেরেশতাদের সম্মুখে পেশ করলেন।কুরআনে কেবলফেরেশতাদের কথা উল্লেখিতহ’লেও সেখানে জিনদের সদস্য ইবলীসওউপস্থিত ছিল(কাহফ ১৮/৫০)। অর্থাৎ আল্লাহচেয়েছিলেন, জিন ও ফেরেশতা উভয়সম্প্রদায়ের উপরে আদম-এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিতহৌকএবং বাস্তবে সেটাই হ’ল। তবে যেহেতুফেরেশতাগণ জিনদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ও উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন, সেজন্য কেবল তাদের নাম নেওয়াহয়েছে। আর দুনিয়াতে জিনদের ইতিপূর্বেকারউৎপাত ও অনাচার সম্বন্ধে ফেরেশতারা আগেথেকেই অবহিত ছিল, সেকারণ তারা মানুষ সম্বন্ধেওএকইরূপ ধারণা পোষণ করেছিল এবং প্রশ্নেরজবাবেনেতিবাচক উত্তর দিয়েছিল। উল্লেখ্য যে,‘আল্লাহ জিন জাতিকেআগেই সৃষ্টি করেন গনগনেআগুন থেকে’(হিজর ১৫/২৭)। কিন্তু তারা অবাধ্যতারচূড়ান্ত করে।আদমকে ফেরেশতাদের সম্মুখেপেশ করার পর আল্লাহ ফেরেশতাদেরকে ঐসববস্ত্তর নাম জিজ্ঞেস করলেন।কিন্তু সঙ্গতকারণেই তারা তা বলতে পারল না। তখন আল্লাহআদমকে নির্দেশ দিলেন এবং তিনি সবকিছুরনাম বলেদিলেন। ফলে ফেরেশতারা অকপটে তাদেরপরাজয় মেনে নিল এবং আল্লাহর মহত্ত্ব ও পবিত্রতাঘোষণা করে বলল, হে আল্লাহ! আপনিআমাদেরকে যতটুকু শিখিয়েছেন, তারবাইরেআমাদের কোন জ্ঞান নেই। নিশ্চয়ই আপনিসর্বজ্ঞ ও দূরদৃষ্টিময়’(বাক্বারাহ ২/৩২)। অতঃপরআল্লাহ তাদের সবাইকে আদমের সম্মুখেসম্মানের সিজদা করতে বললেন। সবাই সিজদা করল,ইবলীস ব্যতীত। সে অস্বীকার করল ওঅহংকারে স্ফীত হয়ে প্রত্যাখ্যান করল। ফলেসে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হ’ল(বাক্বারাহ ২/৩৪)।ইবলীস ঐ সময় নিজের পক্ষে যুক্তি পেশ করেবলল,‘আমি ওর চাইতে উত্তম। কেননা আপনিআমাকেআগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন আর ওকে সৃষ্টিকরেছেন মাটি দিয়ে’। আল্লাহ বললেন, তুই বেরহয়ে যা। তুই অভিশপ্ত, তোর উপরে আমার অভিশাপরইল পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত’(ছোয়াদ৩৮/৭৬-৭৮;আ‘রাফ ৭/১২)।সিজদার ব্যাখ্যা ও উদ্দেশ্য :আদমকেসৃষ্টি করার আগেই আল্লাহ ফেরেশতাদেরকেআদমের প্রতি সিজদা করার কথা বলে দিয়েছিলেন(হা-মীম সাজদাহ/ফুছছিলাত ৪১/১১)।তাছাড়া কুরআনেরবর্ণনা সমূহ থেকে একথা স্পষ্ট হয় যে, আদমকেসিজদা করার জন্য আল্লাহর নির্দেশ ব্যক্তি আদমহিসাবে ছিলনা, বরং ভবিষ্যৎ মানব জাতির প্রতিনিধিত্বকারীহিসাবে তাঁর প্রতি সম্মান জানানোর জন্য জিন ওফিরিশতাদের সিজদা করতে বলা হয়েছিল। এই সিজদাকখনোই আদমের প্রতি ইবাদত পর্যায়ের ছিল না।বরং তা ছিল মানবজাতির প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন ওতাদেরকে সকলকাজে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতিদানের প্রতীকী ও সম্মান সূচক সিজদা মাত্র।ওদিকে কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হ’লেও ইবলীসকিন্তু আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা হিসাবেঅস্বীকার করেনি। বরং আল্লাহ যখন তাকে‘অভিসম্পাৎ’ করে জান্নাত থেকে চিরদিনের মতবিতাড়িত করলেন, তখন সে আল্লাহ্কে ‘রব’হিসাবেই সম্বোধন করে প্রার্থনা করল, ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺏِّﻓَﺄَﻧﻈِﺮْﻧِﻲ ﺇِﻟَﻰ ﻳَﻮْﻡِ ﻳُﺒْﻌَﺜُﻮﻥَ -‘হে আমার প্রভু! আমাকেআপনি ক্বিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দিন’(হিজর ১৫/৩৬,ছোয়াদ ৩৮/৭৯)। আল্লাহ তার প্রার্থনা মঞ্জুরকরলেন। অতঃপর সে বলল, ‘হে আমার পালনকর্তা!আপনি যেমন আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, আমিওতেমনি তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানারূপসৌন্দর্যে প্রলুব্ধ করব এবং তাদেরকে পথভ্রষ্টকরে দেব। তবে যারা আপনার একনিষ্ঠ বান্দা,তাদের ব্যতীত’(হিজর ১৫/৩৪-৪০; ছোয়াদ৩৮/৭৯-৮৩)। আল্লাহ তাকে বললেন, তুমি নেমেযাও এবং এখান থেকে বেরিয়ে যাও। তুমিনীচুতমদের অন্তর্ভুক্ত। এখানে তোমার অহংকারকরার অধিকারনেই’(আ‘রাফ ৭/১৩)। উল্লেখ্য যে,ইবলীস জান্নাত থেকে বহিষ্কৃত হ’লেও মানুষেররগ-রেশায় ঢুকে ধোঁকা দেওয়ার ও বিভ্রান্ত করারক্ষমতা আল্লাহ তাকে দিয়েছিলেন।[11]আর এটা ছিলমানুষের পরীক্ষারজন্য। শয়তানের ধোঁকারবিরুদ্ধে জিততে পারলেই মানুষ তার শ্রেষ্ঠত্বেরমর্যাদা অক্ষুণ্ণরাখতে পারবে এবং আখেরাতেজান্নাত লাভে ধন্য হবে। নইলে ইহকাল ও পরকালেব্যর্থকাম হবে। মানুষের প্রতি ফেরেশতাদেরসিজদা করা ও ইবলীসের সিজদা না করার মধ্যেইঙ্গিত রয়েছে এ বিষয়ে যে, মানুষ যেন প্রতিপদে পদে শয়তানের ব্যাপারে সতর্ক থাকে এবংআল্লাহর প্রতি আনুগত্যের মাধ্যমে নিজেরশ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা অক্ষুণ্ণরাখে।আদমের পাঁচটিশ্রেষ্ঠত্ব :(১) আল্লাহ তাকে নিজ দু’হাতে সৃষ্টিকরেছেন(ছোয়াদ ৩৮/৭৫)। (২) আল্লাহ নিজেতার মধ্যে রূহ ফুঁকে দিয়েছেন(ছোয়াদ ৩৮/৭২)।(৩) আল্লাহ তাকে সকল বস্ত্তর নাম শিক্ষাদিয়েছেন(বাক্বারাহ ২/৩১)। (৪) তাকে সিজদা করারজন্য আল্লাহ ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়েছেন(বাক্বারাহ ২/৩৪)। (৫) আদম একাই মাত্র মাটি থেকেসৃষ্ট। বাকী সবাই পিতা-মাতার মাধ্যমে সৃষ্ট(সাজদাহ৩২/৭-৯)।ইবলীসের অভিশপ্ত হওয়ার কারণ ছিলতারক্বিয়াস। সে আল্লাহর আদেশেরবিরুদ্ধে যুক্তিপেশ করে বলেছিল, ‘আমি আদমের চাইতেউত্তম।কেননা আপনি আমাকে আগুন দিয়ে সৃষ্টিকরেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটিদয়ে’(হিজর ২৯)। মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন বলেন, ﺍﻭﻝﻣﻦ ﻗﺎﺱ ﺍﺑﻠﻴﺲ ‘প্রথম ক্বিয়াস করেছিল ইবলীস’।হাসান বছরীও অনুরূপ বলেছেন।[12]নারী জাতিপুরুষেরই অংশ এবং তার অনুগত :সিজদা অনুষ্ঠানের পরআল্লাহ আদমের জুড়ি হিসাবে তার অবয়ব হ’তেএকাংশনিয়ে অর্থাৎ তার পাঁজর হ’তে তার স্ত্রী হাওয়াকেসৃষ্টি করলেন[13]মাটি থেকে সৃষ্ট হওয়া আদমেরনাম হ’ল ‘আদম’ এবং জীবন্ত আদমের পাঁজর হ’তেসৃষ্ট হওয়ায় তাঁর স্ত্রীর নাম হ’ল ‘হাওয়া’(কুরতুবী)।অতঃপর তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বললেন,‘তোমরা দু’জন জান্নাতে বসবাস কর ওসেখানথেকে যা খুশী খেয়ে বেড়াও। তবেসাবধান! এই গাছটির নিকটে যেয়ো না। তাহ’লেতোমরা সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়েযাবে’(বাক্বারাহ ২/৩৫)। এতে বুঝা যায় যে,ফেরেশতাগণের সিজদা কেবল আদমের জন্যছিল, হাওয়ার জন্য নয়। দ্বিতীয়তঃ সিজদা অনুষ্ঠানেরপরে আদমের অবয়ব থেকেহাওয়াকে সৃষ্টি করাহয়, পূর্বে নয়। তিনি পৃথক কোন সৃষ্টি ছিলেন না।এতে পুরুষের প্রতি নারীর অনুগামী হওয়া প্রমাণিতহয়। আল্লাহ বলেন, ‘পুরুষেরা নারীদের উপরকর্তৃত্বশীল’(নিসা ৪/৩৪)। অতঃপর বহিষ্কৃত ইবলীসতার প্রথমটার্গেট হিসাবে আদম ও হাওয়ার বিরুদ্ধেপ্রতারণার জাল নিক্ষেপ করল। সেমতে সেপ্রথমে তাদের খুব আপনজন বনে গেল এবং নানাকথায় তাদের ভুলাতে লাগল। এক পর্যায়ে সে বলল,‘আল্লাহ যে তোমাদেরকে ঐ গাছটির নিকটেযেতে নিষেধ করেছেন, তার কারণ হ’ল এইযে,তোমরা তাহ’লে ফেরেশতা হয়ে যাবে কিংবাতোমরা এখানে চিরস্থায়ী বাসিন্দা হয়েযাবে’(আ‘রাফ ৭/২০)। সে অতঃপর কসম খেয়েবলল যে, আমি অবশ্যই তোমাদের হিতাকাংখী’(ঐ,২১)। ‘এভাবেই সে আদম ও হাওয়াকে সম্মত করেফেলল এবং তার প্রতারণার জালে আটকে গিয়ে তারাউক্ত নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল আস্বাদন করল। ফলেসাথে সাথে তাদের গুপ্তাঙ্গ প্রকাশিত হয়ে পড়লএবং তারা তড়িঘড়ি গাছের পাতা সমূহ দিয়ে তা ঢাকতেলাগল। আল্লাহ তাদেরকে ডেকে বললেন, আমিকি তোমাদেরকে এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করিনিএবং বলিনি যে, শয়তানতোমাদের প্রকাশ্য শত্রু?(ঐ,২২)তখন তারা অনুতপ্ত হ’য়ে বলল, ﻗَﺎﻻَ ﺭَﺑَّﻨَﺎﻇَﻠَﻤْﻨَﺎﺃَﻧﻔُﺴَﻨَﺎ ﻭَﺇِﻥ ﻟَّﻢْ ﺗَﻐْﻔِﺮْ ﻟَﻨَﺎ ﻭَﺗَﺮْﺣَﻤْﻨَﺎ ﻟَﻨَﻜُﻮﻧَﻦَّ ﻣِﻦَﺍﻟْﺨَﺎﺳِﺮِﻳﻦَ-‘হে আমাদের পালনকর্তা! আমরানিজেদের উপর যুলুম করেছি। যদি আপনি আমাদেরক্ষমা না করেন, তবে অবশ্যই আমরাক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব’(২৩)। ‘আল্লাহতখন বললেন, তোমরা (জান্নাত থেকে) নেমেযাও। তোমরা একে অপরের শত্রু।তোমাদেরঅবস্থান হবে পৃথিবীতে এবংসেখানেই তোমরা একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্তসম্পদরাজি ভোগ করবে’(২৪)। তিনি আরও বললেনযে, ‘তোমরা পৃথিবীতেই জীবনযাপন করবে,সেখানেই মৃত্যুবরণ করবে এবং সেখান থেকেইতোমরা পুনরুত্থিত হবে’(আ‘রাফ ৭/২০-২৫)।এখানেএকটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে,ইবলীসের কথায় সর্বপ্রথম হাওয়া প্রতারিত হন।অতঃপর তার মাধ্যমে আদম প্রতারিতহন বলে যে কথাচালু আছে কুরআনে এর কোন সমর্থন নেই।ছহীহ হাদীছেও স্পষ্ট কিছু নেই। এ বিষয়েতাফসীরে ইবনু জারীরে ইবনুআববাস (রাঃ)থেকে যে বর্ণনা এসেছে, তা যঈফ।[14]দ্বিতীয়তঃ জান্নাত থেকে অবতরণের নির্দেশতাদের অপরাধের শাস্তি স্বরূপ ছিলনা। কেননা এটাছিল তওবা কবুলের পরের ঘটনা। অতএব এটা ছিলহয়তবা তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা দানের জন্য। বরং সঠিককথা এই যে, এটা ছিল আল্লাহর পূর্ব নির্ধারিত ওদূরদর্শী পরিকল্পনারই অংশ। কেননা জান্নাত হ’লকর্মফল লাভের স্থান,কর্মের স্থান নয়। তাছাড়াজান্নাতে মানুষের বংশ বৃদ্ধির সুযোগ নেই। এজন্যদুনিয়ায় নামিয়ে দেওয়া যরূরী ছিল।প্রথম বার আদেশদানের পরে পুনরায় স্নেহ ও অনুগ্রহমিশ্রিতআদেশ দিয়ে বললেন, ‘তোমরা সবাইনেমে যাও’। অতঃপর পৃথিবীতে আল্লাহর খলীফাহওয়ার(বাক্বারাহ২/৩০; ফাত্বির ৩৫/৩৯)মহান মর্যাদা প্রদানকরে বললেন, ‘তোমাদের নিকটে আমার পক্ষথেকে হেদায়াত অবতীর্ণ হবে। যারা তার অনুসরণকরবে, তাদের জন্য কোন ভয় বা চিন্তার কারণথাকবে না। কিন্তু যারা তা প্রত্যাখ্যান করবে ও মিথ্যাপ্রতিপন্ন করবে, তারা হবে জাহান্নামের অধিবাসীএবং সেখানে তারা অনন্তকাল ধরে অবস্থানকরবে’(বাক্বারাহ ২/৩৮-৩৯)।উল্লেখ্য যে, নবীগণছিলেন নিষ্পাপ এবং হযরত আদম (আঃ) ছিলেননিঃসন্দেহে নিষ্পাপ। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন ভুলকরেননি। বরং শয়তানের প্ররোচনায় প্রতারিত হয়েতিনি সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ বৃক্ষের নিকটবর্তী হওয়ারনিষেধাজ্ঞার কথাটি ভুলে গিয়েছিলেন। যেমন অন্যআয়াতে বর্ণিত হয়েছে, ﻓَﻨَﺴِﻲَ ﻭَﻟَﻢْ ﻧَﺠِﺪْ ﻟَﻪُﻋَﺰْﻣًﺎ-‘অতঃপর আদম ভুলে গেল এবং আমিতার মধ্যে(সংকল্পের) দৃঢ়তা পাইনি’(ত্বোয়াহা ২০/১১৫)। তাছাড়াউক্ত ঘটনার সময় তিনি নবী হননি বরং পদস্খলনেরঘটনার পরে আল্লাহ তাকে নবী মনোনীতকরে দুনিয়ায় পাঠান ও হেদায়াত প্রদানকরেন’(আ‘রাফ৭/১২২)।এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে,ইবলীসের ক্ষেত্রে আল্লাহ বললেন, ﻗَﺎﻝَﻓَﺎﺧْﺮُﺝْ ﻣِﻨْﻬَﺎ ﻓَﺈِﻧَّﻚَ ﺭَﺟِﻴﻢٌ -‘তুমি জান্নাত থেকেবেরিয়ে যাও। নিশ্চয়ই তুমি অভিশপ্ত’(হিজর ১৫/৩৪;আ‘রাফ ৭/১৮)। অন্যদিকে আদমও হাওয়ারক্ষেত্রে বললেন, ﻗُﻠْﻨَﺎ ﺍﻫْﺒِﻄُﻮﺍْ ﻣِﻨْﻬَﺎ -‘ তোমরানেমে যাও’(বাক্বারাহ ২/৩৬, ৩৮; আ‘রাফ ৭/২৪)।এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ইবলীস কখনোইআর জান্নাতে ফিরে আসতে পারবে না। কিন্তু বনুআদমের ঈমানদারগণ পুনরায় ফিরে আসতে পারবেইনশাআল্লাহ।নগ্নতা শয়তানের প্রথম কাজ :মানুষেরউপরে শয়তানের প্রথম হামলা ছিল তার দেহথেকে কাপড় খসিয়ে তাকে উলঙ্গ করে দেওয়া।আজও পৃথিবীতে শয়তানের পদাংক অনুসারী ওইবলীসের শিখন্ডীদের প্রথম কাজ হ’ল তথাকথিতক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ সমতার নামে নারীকে উলঙ্গকরে ঘরের বাইরে আনা ও তার সৌন্দর্য উপভোগকরা। অথচ পৃথিবীর বিগত সভ্যতাগুলি ধ্বংস হয়েছেমূলতঃ নারী ও মদের সহজলভ্যতার কারণেই। অতএবসভ্য-ভদ্র ও আল্লাহভীরু বান্দাদের নিকটেঈমানের পর সর্বপ্রথম ফরয হ’ল স্ব স্ব লজ্জাস্থানআবৃত রাখা ও ইযযত-আবরূর হেফাযত করা। অন্যান্যফরয সবই এর পরে। নারীর পর্দা কেবলপোষাকে হবে না, বরং তা হবে তার ভিতরে, তারকথা-বার্তায়, আচার-আচরণে ও চাল-চলনে সর্ববিষয়ে। পরনারীর প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি ও মিষ্টকণ্ঠস্বর পরপুরুষের হৃদয়ে অন্যায় প্রভাব বিস্তারকরে। অতএব লজ্জাশীলতাই মুমিন নর-নারীরঅঙ্গভূষণ ও পারস্পরিক নিরাপত্তার গ্যারান্টি। নারী ওপুরুষ প্রত্যেকে একে অপরের থেকেস্ব স্বদৃষ্টিকে অবনত রাখবে(নূর ২৪/৩০-৩১)এবংপরস্পরে সার্বিক পর্দা বজায় রেখে কেবলমাত্রপ্রয়োজনীয় কথাটুকু স্বাভাবিকভাবে সংক্ষেপেবলবে। নারী ও পুরুষ প্রত্যেকে নিজ নিজস্বাতন্ত্র্য ও পর্দা বজায় রেখেস্ব স্ব কর্মস্থলেও কর্মপরিধিরমধ্যে স্বাধীনভাবে কাজ করবেএবংসংসার ও সমাজের কল্যাণে সাধ্যমতঅবদানরাখবে। নেগেটিভ ও পজেটিভ পাশাপাশি বিদ্যুৎবাহীদু’টি ক্যাবলের মাঝে প্লাষ্টিকের আবরণ যেমনপর্দার কাজ করে এবং অপরিহার্য এক্সিডেন্ট ওঅগ্নিকান্ড থেকে রক্ষা করে, অনুরূপভাবেপরনারী ও পরপুরুষের মধ্যকার পর্দা উভয়েরমাঝে ঘটিতব্য যেকোন অনাকাংখিত বিষয় থেকেপরস্পরকে হেফাযত করে। অতএবশয়তানেরপ্ররোচনায় জান্নাতের পবিত্র পরিবেশে আদি পিতা-মাতার জীবনে ঘটিত উক্ত অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনাথেকে দুনিয়ার এই পঙ্কিল পরিবেশে বসবাসরতমানব জাতিকে আরও বেশী সতর্ক ও সাবধান থাকাউচিত। কুরআন ও হাদীছ আমাদেরকে সেদিকেইহুঁশিয়ার করেছে।মানব সৃষ্টির রহস্য :আল্লাহবলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﺭَﺑُّﻚَ ﻟِﻠْﻤَﻼَﺋِﻜَﺔِ ﺇِﻧِّﻴْﺨَﺎﻟِﻖٌ ﺑَﺸَﺮًﺍ ﻣِّﻦﺻَﻠْﺼَﺎﻝٍ ﻣِّﻦْ ﺣَﻤَﺈٍ ﻣَّﺴْﻨُﻮْﻥٍ، ﻓَﺈِﺫَﺍ ﺳَﻮَّﻳْﺘُﻪُ ﻭَﻧَﻔَﺨْﺖُ ﻓِﻴْﻪِ ﻣِﻦﺭُّﻭﺣِﻲْ ﻓَﻘَﻌُﻮْﺍ ﻟَﻪُ ﺳَﺎﺟِﺪِﻳْﻦَ -‘স্মরণ কর সেই সময়েরকথা, যখন তোমার প্রভু ফেরেশতাদের বললেন,আমি মিশ্রিত পচা কাদার শুকনো মাটি দিয়ে ‘মানুষ’ সৃষ্টিকরব। অতঃপর যখন আমি তার অবয়ব পূর্ণভাবে তৈরীকরে ফেলব ও তাতে আমি আমার রূহ ফুঁকে দেব,তখন তোমরা তার প্রতি সিজদায় পড়ে যাবে’(হিজর১৫/২৮-২৯)। অন্যত্র তিনি বলেন, ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﻱْ ﻳُﺼَﻮِّﺭُﻛُﻢْﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺣَﺎﻡِ ﻛَﻴْﻒَ ﻳَﺸَﺂﺀُ ﻵ ﺇِﻟَﻪَ ﺇِﻻَّ ﻫُﻮَ ﺍﻟْﻌَﺰِﻳﺰُ ﺍﻟْﺤَﻜِﻴﻢُ- ‏) ﺁﻝﻋﻤﺮﺍﻥ ৬(-‘তিনিই সেই সত্তা যিনি তোমাদেরকেমাতৃগর্ভে আকার-আকৃতি দান করেছেন যেমন তিনিচেয়েছেন। তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই।তিনি মহা পরাক্রান্ত ও মহা বিজ্ঞানী’(আলে ইমরান৩/৬)। তিনি আরও বলেন, ﻳَﺨْﻠُﻘُﻜُﻢْ ﻓِﻲْ ﺑُﻄُﻮْﻥِ ﺃُﻣَّﻬَﺎﺗِﻜُﻢْﺧَﻠْﻘًﺎ ﻣِّﻦ ﺑَﻌْﺪِﺧَﻠْﻖٍ ﻓِﻲ ﻇُﻠُﻤَﺎﺕٍ ﺛَﻼَﺙٍ- ‏) ﺯﻣﺮ ৬(-‘তিনিতোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভে সৃষ্টিকরেন একের পর এক স্তরে তিনটি অন্ধকারাচ্ছন্নআবরণের মধ্যে’(যুমার ৩৯/৬)। তিনটি আবরণ হ’ল-পেট, রেহেম বা জরায়ু এবং জরায়ুর ফুল বা গর্ভাধার।উপরোক্ত আয়াতগুলিতে আদম সৃষ্টির তিনটি পর্যায়বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমে মাটি দ্বারা অবয়ব নির্মাণ,অতঃপর তার আকার-আকৃতি গঠন ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গসমূহে শক্তির আনুপতিক হার নির্ধারণ ও পরস্পরেরমধ্যে সামঞ্জস্য বিধান এবং সবশেষে তাতে রূহসঞ্চার করে আদমকে অস্তিত্ব দান। অতঃপরআদমের অবয়ব (পাঁজর) থেকে কিছু অংশ নিয়ে তারজোড়া বা স্ত্রী সৃষ্টি করা। সৃষ্টির সূচনা পর্বের এইকাজগুলি আল্লাহসরাসরি নিজ হাতে করেছেন(ছোয়াদ ৩৮/৭৫)। অতঃপর এই পুরুষ ও নারী স্বামী-স্ত্রী হিসাবে বসবাস করেপ্রথম যে যমজ সন্তানজন্ম দেয়, তারাই হ’ল মানুষের মাধ্যমে সৃষ্টপৃথিবীর প্রথম মানব যুগল।তারপর থেকে এযাবতস্বামী-স্ত্রীর মিলনে মানুষের বংশ বৃদ্ধি অব্যাহতরয়েছে।শুধু মানুষ নয়, উদ্ভিদরাজি, জীবজন্তু ওপ্রাণীকুলের সৃষ্টি হয়েছে মাটি থেকে। আর মাটিসৃষ্টি হয়েছে পানি থেকে। পানিই হ’ল সকলজীবন্ত বস্ত্তর মূল(ফুরক্বান ২৫/৫৪)।মৃত্তিকাজাতসকল প্রাণীর জীবনের প্রথম ও মূল একক(Unit) হচ্ছে ‘প্রোটোপ্লাজম’ (Protoplasm)।যাকে বলা হয় ‘আদি প্রাণসত্তা’। এ থেকেই সকলপ্রাণী সৃষ্টি হয়েছে। এজন্য বিজ্ঞানী মরিসবুকাইলী একে Bomb shell বলে অভিহিতকরেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মাটির সকলপ্রকারের রাসায়নিক উপাদান। মানুষের জীবনবীজে প্রচুর পরিমাণে চারটি উপাদান পাওয়া যায়।অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, কার্বন ওহাইড্রোজেন। আর আটটি পাওয়া যায় সাধারণভাবেসমপরিমাণে। সেগুলি হ’ল- ম্যাগনেশিয়াম, সোডিয়াম,পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, ক্লোরিন, সালফার ওআয়রণ। আরও আটটি পদার্থ পাওয়া যায় স্বল্পপরিমাণে। তাহ’ল: সিলিকন, মোলিবডেনাম, ফ্লুরাইন,কোবাল্ট, ম্যাঙ্গানিজ, আয়োডিন, কপার ও যিংক। কিন্তুএই সব উপাদান সংমিশ্রিত করে জীবনের কণা তথা‘প্রোটোপ্লাজম’ তৈরী করা সম্ভব নয়। জনৈকবিজ্ঞানী দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এসব মৌল উপাদানসংমিশ্রিত করতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ব্যর্থহয়েছেন এবং তাতে কোন জীবনের ‘কণা’পরিলক্ষিত হয়নি। এই সংমিশ্রণ ও তাতে জীবন সঞ্চারআল্লাহ ব্যতীত কারু পক্ষে সম্ভবনয়। বিজ্ঞানএক্ষেত্রে মাথা নত করতে বাধ্য হয়েছে।প্রথমপর্যায়ে মাটি থেকে সরাসরিআদমকে অতঃপর আদমথেকে তার স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টি করার পরবর্তীপর্যায়ে আল্লাহ আদম সন্তানদের মাধ্যমে বনুআদমের বংশ বৃদ্ধির ব্যবস্থা করেছেন। এখানেওরয়েছে সাতটি স্তর। যেমন: মৃত্তিকার সারাংশ তথাপ্রোটোপ্লাজম, বীর্য বা শুক্রকীট, জমাটরক্ত, মাংসপিন্ড,অস্থিমজ্জা, অস্থি পরিবেষ্টনকারীমাংস এবং সবশেষে রূহ সঞ্চারণ(মুমিনূন ২৩/১২-১৪;মুমিন ৪০/৬৭; ফুরক্বান ২৫/৪৪; তারেক্ব ৮৬/৫-৭)।স্বামীর শুক্রকীট স্ত্রীর জরায়ুতে রক্ষিতডিম্বকোষে প্রবেশ করার পর উভয়ের সংমিশ্রিতবীর্যে সন্তান জন্ম গ্রহণ করে(দাহর ৭৬/২)।উল্লেখ্য যে, পুরুষের একবার নির্গত লম্ফমানবীর্যে লক্ষ-কোটি শুক্রাণু থাকে। আল্লাহরহুকুমে তন্মধ্যকার একটি মাত্র শুক্রকীট স্ত্রীরজরায়ুতে প্রবেশ করে। এই শুক্রকীট পুরুষক্রোমোজম Y অথবাস্ত্রী ক্রোমোজম Xহয়ে থাকে। এর মধ্যে যেটি স্ত্রীর ডিম্বের Xক্রোমোজমের সাথে মিলিত হয়, সেভাবেইপুত্র বা কন্যা সন্তান জন্ম গ্রহণ করে আল্লাহরহুকুমে।মাতৃগর্ভের তিন তিনটি গাঢ় অন্ধকার পর্দারঅন্তরালে এইভাবে দীর্ঘ নয় মাস ধরে বেড়েওঠা প্রথমত: একটি পূর্ণ জীবন সত্তার সৃষ্টি, অতঃপরএকটি জীবন্ত প্রাণবন্ত ও প্রতিভাবান শিশু হিসাবেদুনিয়াতে ভূমিষ্ট হওয়া কতই না বিষ্ময়কর ব্যাপার।কোন মানুষের পক্ষে এই অনন্য-অকল্পনীয়সৃষ্টিকর্ম আদৌ সম্ভব কী? মাতৃগর্ভের ঐ অন্ধকারগৃহে মানবশিশু সৃষ্টির সেই মহান কারিগর কে? কেসেই মহান আর্কিটেক্ট, যিনি ঐ গোপন কুঠরীতেপিতার ২৩টি ক্রোমোজম ও মাতার ২৩টিক্রোমোজম একত্রিত করে সংমিশ্রিত বীর্যপ্রস্ত্তত করেন? কে সেই মহান শিল্পী, যিনিরক্তপিন্ড আকারের জীবন টুকরাটিকে মাতৃগর্ভেপুষ্ট করেন? অতঃপর ১২০ দিন পরে তাতে রূহসঞ্চার করে তাকে জীবন্ত মানব শিশুতে পরিণতকরেন এবং পূর্ণ-পরিণত হওয়ার পরে সেখানথেকে বাইরে ঠেলে দেন (আবাসা ৮০/১৮-২০)।বাপ-মায়ের স্বপ্নের ফসল হিসাবে নয়নের পুত্তলিহিসাবে? মায়ের গর্ভে মানুষ তৈরীর সেইবিষ্ময়কর যন্ত্রের দক্ষ কারিগর ও সেই মহানশিল্পী আর কেউ নন, তিনি আল্লাহ!সুবহানাল্লাহি ওয়াবেহামদিহি, সুবহানাল্লাহিল আযীম!!পুরুষ ও নারীরসংমিশ্রিত বীর্যেসন্তান জন্ম লাভের তথ্য কুরআনইসর্বপ্রথম উপস্থাপন করেছে (দাহর ৭৬/২)। আধুনিকবিজ্ঞান এ তথ্য জনতে পেরেছে মাত্র গতশতাব্দীতে ১৮৭৫ সালে ও ১৯১২ সালে। তারপূর্বে এরিষ্টটল সহ সকল বিজ্ঞানীর ধারণা ছিল যে,পুরুষের বীর্যের কোন কার্যকারিতা নেই।রাসূলের হাদীছ বিজ্ঞানীদের এই মতকেসম্পূর্ণ বাতিল ঘোষণা করেছে।[15]কেননাসেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে সন্তানপ্রজননে পুরুষও নারী উভয়ের বীর্য সমানভাবেকার্যকর।উল্লেখ্য যে, মাতৃগর্ভে বীর্য প্রথম ৬দিন কেবল বুদ্বুদ আকারে থাকে। তারপর জরায়ুতেসম্পর্কিত হয়। তিন মাসের আগে ছেলে বামেয়ে সন্তান চিহ্নিত হয় না। চার মাস পর রূহ সঞ্চারিতহয়ে বাচ্চা নড়েচড়ে ওঠে ও আঙ্গুল চুষতেথাকে। যাতে ভূমিষ্ট হওয়ার পরে মায়ের স্তনচুষতে অসুবিধা না হয়। এ সময় তার কপালে চারটিবস্ত্ত লিখে দেওয়া হয়। তার আজাল (হায়াত), আমল,রিযিক এবং সে ভাগ্যবান না দুর্ভাগা।[16]এভাবেই জগতসংসারে মানববংশ বৃদ্ধির ধারা এগিয়ে চলেছে। এনিয়মের ব্যতিক্রম নেই কেবল আল্লাহর হুকুমব্যতীত। একারণেই আল্লাহ অহংকারী মানুষকেউদ্দেশ্য করে বলেন, ‘মানুষ কি দেখে না যে,আমরা তাকে সৃষ্টি করেছি শুক্রবিন্দু থেকে?অতঃপর সে হয়ে গেল প্রকাশ্যে বিতন্ডাকারী’।‘সে আমাদের সম্পর্কে নানারূপ দৃষ্টান্ত বর্ণনাকরে। অথচ সে নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে ভুলেযায়, আর বলে যে, কে জীবিত করবে এসবহাড়গোড় সমূহকে, যখন সেগুলো পচে গলেযাবে?(ইয়াসীন ৩৬/৭৭-৭৮)।জান্নাত থেকে পতিতহবার পর :হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ)থেকে ছহীহ সনদে ইমাম আহমাদ,নাসাঈ ও হাকেম(রহঃ) বর্ণনা করেন যে, ﺃﻟﺴﺖ ﺑﺮﺑﻜﻢ ‘আমি কিতোমাদের প্রভু নই? বনু আদমের কাছ থেকেএই বহুল প্রসিদ্ধ ‘আহদে আলাস্ত্ত’ বা প্রতিজ্ঞা-প্রতিশ্রুতিটি তখনই নেওয়া হয়, যখন আদম (আঃ)-কেজান্নাত থেকে পৃথিবীতে নামিয়ে দেওয়া হয়।আর এ প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছিল না‘মান) ﻭﺍﺩﻯ ﻧَﻌْﻤَﺎﻥَ(নামক উপত্যকায়, যা পরবর্তীকালে ‘আরাফাত’-এরময়দান নামে পরিচিত হয়েছে।[17]এর দ্বারা একটিবিষয় প্রমাণিত হয় যে, জান্নাত ও জাহান্নামের অবস্থানপৃথিবীর বাইরে অন্যত্র এবং তা সৃষ্ট অবস্থায় তখনওছিল এখনও আছে। আধুনিক বিজ্ঞান এ পৃথিবী ওসৌরলোকের বাইরে দূরে বহুদূরে অগণিতসৌরলোকের সন্ধান দিয়ে কুরআন ও হাদীছেরতথ্যকেই সপ্রমাণ করে দিচ্ছে।আদমের অবতরণস্থল :আদম ও হাওয়াকে আসমানে অবস্থিত জান্নাতথেকে নামিয়ে দুনিয়ায় কোথায় রাখা হয়েছিল, সেবিষয়ে মতভেদ রয়েছে। যেমন বলা হয়েছেআদমকে সরনদীপে (শ্রীলংকা) ও হাওয়াকেজেদ্দায় (সঊদী আরব) এবং ইবলীসকে বছরায়(ইরাক) ও ইবলাসের জান্নাতে ঢোকার কথিত বাহনসাপকেইস্ফাহানে (ইরান) নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।কেউ বলেছেন, আদমকে মক্কার ছাফা পাহাড়েএবং হাওয়াকেমারওয়া পাহাড়ে নামানো হয়েছিল। এছাড়াআরও বক্তব্য এসেছে। তবে যেহেতু কুরআনও ছহীহ হাদীছে এ বিষয়ে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি,সেকারণ এ বিষয়ে আমাদের চুপ থাকাইশ্রেয়।‘আহ্দে আলাস্ত্ত-র বিবরণ :মুসলিম ইবনেইয়াসার (রাঃ) বলেন, কিছু লোক হযরত ওমর ফারূক(রাঃ)-এরনিকটে সূরা আ‘রাফ ১৭২ আয়াতের মর্মজানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ(ছাঃ)-কে প্রশ্ন করা হ’লে তাঁকে আমি বলতেশুনেছি যে, ‘আল্লাহ তা‘আলা আদম (আঃ)-কে সৃষ্টিকরেন।[18]অতঃপর নিজের ডান হাত তার পিঠেবুলিয়ে দিলেন। তখন তার ঔরসে যত সৎমানুষজন্মাবার ছিল, তারা সব বেরিয়ে এল। আল্লাহবললেন, এদেরকে আমি জান্নাতের জন্য সৃষ্টিকরেছি এবং এরা দুনিয়াতে জান্নাতেরই কাজ করবে।অতঃপর তিনি পুনরায় তার পিঠে হাত বুলালেন, তখনসেখানথেকে একদল সন্তান বের করেআনলেন এবং বললেন, এদেরকে আমিজাহান্নামের জন্যে সৃষ্টি করেছি। এরা দুনিয়াতেজাহান্নামের কাজই করবে। একথা শুনে জনৈকছাহাবী প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল!তাহ’লে আর আমল করানোর উদ্দেশ্য কি?রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, যখন আল্লাহ কাউকেজান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেন, তখন তিনি তাকেদিয়েজান্নাতের কাজই করিয়ে নেন, এমনকি তারমৃত্যুও অনুরূপ কাজেরমধ্যে হয়ে থাকে। অতঃপরআল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। পক্ষান্তরেযখন তিনি কাউকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেন,তখন তাকে দিয়ে জাহান্নামের কাজইকরিয়ে নেন।এমনকি তার মৃত্যুও অনুরূপ কাজের মধ্যে হয়েথাকে। অতঃপর আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশকরান।[19]আবুদ্দারদা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত হয়েছে যে,রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ডান মুষ্টির লোকগুলো ছিলসুন্দর চকচকে ক্ষুদ্র পিপীলিকা দলের ন্যায়। আরবাম মুষ্টির ক্ষুদ্র লোকগুলো ছিল কালো কয়লারন্যায়’।[20]উল্লেখ্য যে, কুরআনে বলা হয়েছে,‘বনু আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে’(আ‘রাফ ১৭২)।অন্যদিকে হাদীছে বলা হয়েছে, ‘আদমেরপৃষ্ঠদেশ’ থেকে- মূলতঃ উভয়ের মধ্যে কোনবৈপরিত্যনেই। আদম যেহেতু বনু আদমের মূল এবংআদি পিতা, সেহেতু তাঁর পৃষ্ঠদেশ বলা আর বনুআদমের পৃষ্ঠদেশ বলা একই কথা। তাছাড়া আদমেরদেহের প্রতিটি লোমকূপ থেকে অসংখ্য বনুআদমকে বের করে এনে উপস্থিত করানোআল্লাহর জন্যবিচিত্র কিছুই নয়।মানুষ যেহেতু তারভাগ্য সম্পর্কে জানে না, সেহেতু তাকে সর্বদাজান্নাত লাভের আশায় উক্তপথেই কাজ করেযেতে হবে। সাধ্যমত চেষ্টা সত্ত্বেও ব্যর্থহ’লে বুঝতে হবে যে, ওটাই তারতাকদীরেরলিখন ছিল। বান্দাকে ভাল ও মন্দ দু’টিকরারই স্বাধীন এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে। আর এইইচ্ছাশক্তি প্রয়োগের স্বাধীনতার কারণেই বনুআদম আল্লাহর সেরা সৃষ্টির মর্যাদায় অভিষিক্তহয়েছে। আর একারণেই তাকে তার ভাল ও মন্দকাজের পরিণতি ভোগ করতে হয়।এখানেআদমের ঔরস বলতে আদম ও তার ভবিষ্যৎসন্তানদের ঔরস বুঝানো হয়েছে। এখানে‘বংশধর’ বলতে তাদের অশরীরী আত্মাকেবুঝানো হয়নি, বরং আত্মা ও দেহের সমন্বয়েজ্ঞান ও চেতনা সম্পন্ন ক্ষুদ্র অবয়ব সমূহকেবুঝানো হয়েছে, যাদের কাছ থেকে সেদিনসজ্ঞানে তাদের প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতি নেওয়াহয়েছিল। আর এটা আল্লাহর জন্য খুবই সহজ।আজকের বিজ্ঞান একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুর ভিতরেগোটা সৌরমন্ডলীয় ব্যবস্থা সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। ফিল্মের মাধ্যমে একটি বিরাটকায়বস্ত্তকে একটি ছোট্ট বিন্দুর আয়তনেদেখানো হচ্ছে। কাজেই আল্লাহ তা‘আলা যদি উক্তঅঙ্গীকার অনুষ্ঠানে সকল আদম সন্তানকেজ্ঞান-বুদ্ধি সম্পন্ন করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্রদেহেঅণু-বিন্দুতে অস্তিত্ব দানকরে থাকেন, তবেতাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। তাছাড়া জ্ঞানসম্পন্ন নাহ’লে এবং বিষয়টি তাদের অনুধাবনে ও উপলব্ধিতেনা আসলে এ ধরনের প্রতিশ্রুতি গ্রহণের ওঅঙ্গীকার ঘোষণার কোন গুরুত্ব থাকে না।প্রশ্নহ’তে পারে যে, সৃষ্টির সূচনায় গৃহীত এই প্রতিজ্ঞাও প্রতিশ্রুতির কথা পরবর্তীতে মানুষের ভুলেযাওয়াটাই স্বাভাবিক। তাহ’লে এ ধরনের প্রতিশ্রুতিগ্রহণের ফলাফলটা কি? এর জবাব এই যে, আদি পিতা-মাতা আদম-হাওয়ার রক্ত ও মানসিকতার প্রভাব যেমনযুগে-যুগে দেশে-দেশে সকল ভাষা ও বর্ণেরমানুষের মধ্যে সমভাবে পরিদৃষ্ট হয়, তেমনিভাবেসেদিনে গৃহীত তাওহীদের স্বীকৃতি ওপ্রতিশ্রুতির প্রভাব সকল মানুষের মধ্যেইকমবেশী বিদ্যমান রয়েছে। মানুষের অস্তিত্বইমানুষকে তার সৃষ্টিকর্তার সন্ধান দেয় ও বিপন্নঅবস্থায় তার কাছে আশ্রয় গ্রহণের জন্য তার হৃদয়ব্যাকুল হয়ে ওঠে।তাই তো দেখা গেছে, বিশ্বইতিহাসের নিষ্ঠুরতম শাসক ও আল্লাহদ্রোহীফেরাঊন ডুবে মরার সময় চীৎকার দিয়ে আল্লাহরউপরে তার বিশ্বাস ঘোষণা করেছিল’(ইউনুস১০/৯০-৯১)। মক্কা-মদীনার কাফের-মুশরিকরাশেষনবীর সাথে শত্রুতা পোষণ করলেওকখনো আল্লাহকে অস্বীকার করেনি। আধুনিকবিশ্বের নাস্তিকসেরা স্ট্যালিনকে পর্যন্ত শেষনিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহূর্তে ‘ওহ মাই গড’ বলেচীৎকার করে উঠতে শোনা গেছে।প্রকৃতপক্ষে সৃষ্টির সূচনালগ্নে গৃহীত উক্তস্বীকারোক্তি প্রত্যেকটি মানুষের হৃদয়েআল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি বিশ্বাসের বীজ বপনকরে দিয়েছে। চাই তার বিকাশ কোন শিরকী ওভ্রান্ত পদ্ধতিতে হৌক বা নবীদের দেখানো সঠিকতাওহীদী পদ্ধতিতে হৌক।এ কথাটাই হাদীছেএসেছে এভাবে যে, ﻣَﺎﻣِﻦْ ﻣَﻮْﻟُﻮْﺩٍ ﺇﻻَّ ﻳُﻮْﻟَﺪُ ﻋَﻠَﻰﺍﻟْﻔِﻄْﺮَﺓِ ﻓَﺄَﺑْﻮَﺍﻩُ ﻳُﻬَﻮِّﺩَﺍﻧِﻪِ ﺍَﻭْ ﻳُﻨَﺼِّﺮَﺍﻧِﻪِ ﺃَﻭْﻳُﻤَﺠِّﺴَﺎﻧِﻪِ…‘প্রত্যেক মানবশিশুই ফিৎরাতের উপরেজন্মগ্রহণ করে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী-নাছারা বা মজূসী (অগ্নিউপাসক) বানায়’।[21]এখানে‘ফিৎরাত’ অর্থ স্বভাবধর্ম ইসলাম।[22]অর্থাৎ মানব শিশুকোন শিরকী ও কুফরী চেতনা নিয়ে জন্মগ্রহণকরে না। বরং আল্লাহকে চেনা ও তার প্রতি আনুগত্যও আত্মসমর্পণের চেতনা ওযোগ্যতা নিয়েজন্মগ্রহণ করে। এরফলে নবীদের প্রদত্ততাওহীদের শিক্ষাকে সে অত্যন্ত সহজে ওসাগ্রহে বরণ করে নেয়। কেননা শুধু জন্মগতচেতনার কারণেই কেউ মুসলমান হ’তে পারে না।যতক্ষণ নাসে নবীর মাধ্যমে প্রেরিত দ্বীনসজ্ঞানে স্বেচ্ছায় কবুল করে।ছহীহ মুসলিমেরঅপর বর্ণনায় এসেছে, ﻭَﺇِﻧِّﻰْ ﺧَﻠَﻘْﺖُ ﻋِﺒَﺎﺩِﻱْ ﺣُﻨَﻔَﺎﺀَﻛُﻠَّﻬُﻢْ ﻭَﺃَﻧَّﻬُﻢْ ﺃَﺗَﺘْﻬُﻢْ ﺍﻟﺸَّﻴَﺎﻃِﻴْﻦُ ﻓَﺎﺟْﺘَﺎﻟَﺘْﻬُﻢْ ﻋَﻦْﺩِﻳْﻨِﻬِﻢْ…‘আল্লাহ বলেছেন, যে আমি আমারবান্দাদের ‘হানীফ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ’রূপে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর শয়তান তার পিছেলেগে তাকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে নিয়েগেছে।[23]আল্লাহ বলেন, ﻓِﻄْﺮَﺓَ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺍﻟَّﺘِﻲْ ﻓَﻄَﺮَﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﻋَﻠَﻴْﻬَﺎ ﻻَﺗَﺒْﺪِﻳْﻞَ ﻟِﺨَﻠْﻖِ ﺍﻟﻠَّﻪِ ‘আল্লাহর ফিৎরত,যারউপরে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহরএই সৃষ্টির কোনপরিবর্তন নেই’(রূম ৩০/৩০)।মোটকথা প্রত্যেক মানবশিশু স্বভাবধর্ম ইসলামের উপরেজন্মগ্রহণ করে এবং নিজ সৃষ্টিকর্তাকে চেনার ওতাকে মেনে চলার অনুভূতি ও যোগ্যতা নিয়ে সৃষ্টিহয়। যদিও পিতা-মাতাও পরিবেশের কারণে কিংবাশয়তানেরওয়াসওয়াসায় পরবর্তীতে অনেকেবিভ্রান্ত হয়। অতএব কাফির-মুমিন-মুশরিক সবার মধ্যেআল্লাহকে চেনার ও তাঁর ইবাদত ও আনুগত্যেরচেতনা ও যোগ্যতা বিদ্যমান রয়েছে। এই সৃষ্টিগতচেতনা ও অনুভূতিকে কেউ পরিবর্তনকরতে পারেনা। অর্থাৎ কুশিক্ষা, কুসঙ্গ ও শয়তানী সাহিত্য পাঠকরে বা নষ্ট ব্লু ফিল্মের নীল দংশনে উক্তচেতনাকে পরিবর্তনের চেষ্টা করা আল্লাহর সৃষ্টিরবিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার শামিল। অতএব উক্ত সৃষ্টিগতচেতনাকে সমুন্নত রাখাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রেরকর্তব্য।একথা ব্যক্ত করে আল্লাহ বলেন, ﻭَﻣَﺎﺧَﻠَﻘْﺖُ ﺍﻟْﺠِﻦَّ ﻭَﺍﻟْﺈِﻧْﺲَ ﺇِﻻَّ ﻟِﻴَﻌْﺒُﺪُﻭْﻥِ -‘আমি জিন ওইনসানকে আমার ইবাদত ব্যতীত অন্য কোনকাজের জন্য সৃষ্টি করিনি’(যারিয়াত ৫১/৫৬)। অর্থাৎ আমিতার প্রকৃতিতে আমার প্রতি ইবাদত ও দাসত্বেরআগ্রহ ও যোগ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছি। এটাকেসঠিক অর্থে কাজে লাগালে আমার অবাধ্যতামূলককোন কাজ বান্দার দ্বারা সংঘটিত হবে না এবংজগতসংসারেও কোন অশান্তি ঘটবে না।যেমনভাবে কোন মুসলিম শিশু জন্মগ্রহণেরসাথে সাথে তারকানে আযান শোনানো হয়।[24]অথচ ঐ শিশু আযানের মর্ম বুঝে না বা বড়হয়েও তার সেকথা মনে থাকে না। অথচঐআযানের মাধ্যমে তার হৃদয়ে প্রোথিত হয়ে যায়তাওহীদ, রিসালাত ও ইবাদতের বীজ। যার প্রভাবসে আজীবন অনুভব করে। সে বে-আমলহ’লেও ‘ইসলাম’-এর গন্ডী থেকে খারিজ হয়েযেতে তার অন্তর কখনোই সায় দেয় না। তারঅবচেতন মনে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আনুগত্যবোধ অক্ষুণ্ণ থাকে। বিশেষ করে হতাশা ও বিপন্নঅবস্থায় সে তার প্রভুর সাহায্য ও সান্নিধ্য লাভেরজন্য ব্যাকুলহয়ে ওঠে।অর্থ না বুঝলেও কুরআনপাঠ ও আযানের ধ্বনি মানুষের মনকে যেভাবেআকৃষ্ট করে এবং হৃদয়ে যে স্থায়ী প্রভাবফেলে তার কোন তুলনা নেই। একারণেই কাফিরআরব নেতারা মানুষকে কুরআন শুনতে দিতনা। অথচনিজেরা রাতের অন্ধকারে তা গোপনে আড়িপেতে শুনত এবং একে জাদু বলত। শ্রেষ্ঠ আরবকবিগণ কুরআনের অলৌকিকত্বের কাছেআত্মসমর্পণ করেন এমনকি অন্যতম শ্রেষ্ঠআরবী কবি লাবীদ বিন রাবী‘আহ কুরআন শোনারপর কাব্যচর্চা পরিত্যাগ করেন। গত শতাব্দীর শুরুতেতুরষ্কে ওছমানীয় খেলাফত উৎখাত করেকামালপাশা ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠাকরেন এবং মসজিদসমূহে আরবী আযান বন্ধ করে তুর্কী ভাষায়আযান দেওয়ার নির্দেশ জারি করেন। কিন্তু তাতেআরবী আযানের প্রতি মানুষের হৃদয়াবেগ আরওবৃদ্ধি পায়। ফলে গণবিদ্রোহ দেখা দিলে তিনি উক্তআদেশ বাতিল করতে বাধ্য হন।আধুনিক বিজ্ঞানওপ্রমাণ করে দিয়েছে যে, শব্দ মানব মনেব্যাপকপ্রভাব বিস্তার করে। তাই আল্লাহপ্রেরিতআযানের ধ্বনি সদ্যপ্রসূত শিশুর কচি মনেআজীবনের জন্য সুদূরপ্রসারী স্থায়ী প্রভাববিস্তার করবে- এটাই স্বাভাবিক। অতএব সৃষ্টিরসূচনাকালের গৃহীত ‘আহ্দে আলাস্ত্ত’ বা আল্লাহরপ্রতি ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতিমানব মনে জীবনব্যাপী স্থায়ী প্রভাব বিস্তারকরে থাকে। যার কথা বারবার বান্দাকে স্মরণ করিয়েদিতে হয় এবং যার বিরোধিতা করা আত্মপ্রবঞ্চনা করারশামিল।‘আহ্দে আলাস্ত্ত-র উদ্দেশ্য :আল্লাহবলেন, ﺃَﻥْ ﺗَﻘُﻮﻟُﻮْﺍ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﺇِﻧَّﺎ ﻛُﻨَّﺎ ﻋَﻦْ ﻫَﺬَﺍ ﻏَﺎﻓِﻠِﻴﻦَ،ﺃَﻭْ ﺗَﻘُﻮﻟُﻮْﺍ ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﺃَﺷْﺮَﻙَ ﺁﺑَﺎﺅُﻧَﺎ ﻣِﻦْ ﻗَﺒْﻞُ ﻭَﻛُﻨَّﺎ ﺫُﺭِّﻳَّﺔً ﻣِّﻦﺑَﻌْﺪِﻫِﻢْ ﺃَﻓَﺘُﻬْﻠِﻜُﻨَﺎ ﺑِﻤَﺎ ﻓَﻌَﻞَ ﺍﻟْﻤُﺒْﻄِﻠُﻮﻥَ، ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧُﻔَﺼِّﻞُ ﺍﻵﻳَﺎﺕِﻭَﻟَﻌَﻠَّﻬُﻢْ ﻳَﺮْﺟِﻌُﻮﻥَ – ‏)ﺍﻷﻋﺮﺍﻑ ১৭২-১৭৪)-‘(আমিপৃথিবীতে আবাদ করার আগেভাগে তোমাদেরঅঙ্গীকার এজন্যেই নিয়েছি) যাতে তোমরাক্বিয়ামতের দিন একথা বলতে না পার যে, (তাওহীদও ইবাদতের) এ বিষয়টি আমাদের জানা ছিল না’। ‘অথবাএকথা বলতে না পার যে, শিরকের গপ্রথা তোআমাদের পূর্বে আমাদের বাপ-দাদারা চালু করেছিল।আমরা হ’লাম তাদের পরবর্তী বংশধর। তাহ’লেসেই বাতিলপন্থীরাযে কাজ করেছে, তার জন্য কিআপনি আমাদের ধ্বংস করবেন’? আল্লাহ বলেন,‘বস্ত্ততঃ এভাবে আমরা (আদিকালে ঘটিত) বিষয়সমূহসবিস্তারে বর্ণনা করলাম, যাতে তারা (অর্থাৎঅবিশ্বাসীরা আমার পথে) ফিরে আসে’(আ‘রাফ১৭২-১৭৪)।উপরোক্ত বর্ণনার আলোকে বুঝাযায়যে, উক্ত প্রতিজ্ঞা ছিল দু’ধরনের। এক-আদিকালে ঘটিত প্রতিজ্ঞা ( ﺍﻟﻤﻴﺜﺎﻕ ﺍﻷﺯﻟﻰ ) এবং দুই-অহীর বিধানের আনুগত্য করার জাগতিক প্রতিজ্ঞা( ﻭﺍﻟﻤﻴﺜﺎﻕ ﺍﻹﻧﺰﺍﻟﻲ ﺍﻟﺤﺎﻟﻲ ) যা প্রত্যেক নবীরআমলে তার উম্মতগণের উপরে ছিল অপরিহার্য।অন্যান্য অঙ্গীকার গ্রহণ :(১) নবী-রাসূলদেরপ্রতিশ্রুতি :‘আহ্দে আলাস্ত্তর মাধ্যমে সাধারণভাবেসকল আদম সন্তানের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতিগ্রহণের পর আল্লাহ নবী-রাসূলদের কাছ থেকেবিশেষভাবে প্রতিশ্রুতি নেন; তারা যেন আল্লাহরপক্ষ থেকেপ্রাপ্তব্য রেসালাতের বাণীসমূহস্বস্ব উম্মতের নিকটে যথাযথভাবে পৌঁছে দেন এবংএতে কারো ভয়-ভীতি ও অপবাদ-ভৎর্সনারপরোয়া না করেন।(২) উম্মতগণের প্রতিশ্রুতি:অনুরূপভাবে বিভিন্ন নবীর উম্মতগণের কাছথেকেও প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়, তারা যেন নিজ নিজনবী-রাসূলদের আনুগত্য করে ও কোন অবস্থায়তাদের নাফরমানী না করে।যেমন ছাহাবী উবাইইবনু কা‘ব (রাঃ) সূরা আ‘রাফ ১৭২ আয়াত (অনুবাদঃ ‘যখনতোমার প্রভু বনু আদমের পিঠ সমূহ থেকেতাদের সন্তানদের বের করে আনলেন’)-এরব্যাখ্যায় বলেন, অতঃপর আল্লাহ তাদের একত্রিতকরলেন এবং নারী-পুরুষে বিভক্ত করলেন। অতঃপরতাদেরকে ভবিষ্যতের আকৃতি দান করলেন ও কথাবলার ক্ষমতা দিলেন। তখন তারা কথা বলল। অতঃপরআল্লাহ তাদের কাছ থেকে প্রতিজ্ঞা ও প্রতিশ্রুতিগ্রহণ করলেন এবং তাদেরকে নিজেদের উপরেসাক্ষী করে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কিতোমাদের প্রতিপালক নই? তারা বলল, হ্যাঁ। আল্লাহবললেন, আমি তোমাদের একথার উপর সাত আসমানও সাত যমীনকে সাক্ষী করছি এবং তোমাদেরউপর তোমাদের পিতা আদমকেসাক্ষী রাখছি, যাতেতোমরা ক্বিয়ামতের দিন একথা বলতে না পার যে, এপ্রতিশ্রুতির কথা আমরাজানতাম না।তোমরা জেনে রাখযে, আমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই ও আমিব্যতীত কোন প্রতিপালক নেই। আর তোমরাআমার সাথে কাউকে শরীক করো না। সত্বর আমিতোমাদের নিকট আমার রাসূলগণকে পাঠাব। তাঁরাতোমাদেরকে আমার সাথে কৃত এই প্রতিজ্ঞা ওপ্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেবেন। আর আমিতোমাদের প্রতি আমার কিতাব সমূহ নাযিল করব। তখনতারা বলল, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনিআমাদের প্রভু এবং উপাস্য। আপনি ব্যতীতআমাদের কোন প্রতিপালক নেই এবং আপনিব্যতীত আমাদের কোন উপাস্য নেই। এভাবেতারা স্বীকৃতি দিল। অতঃপর আদমকেতাদের উপরউঠিয়ে ধরা হ’ল। তিনি তাদের দিকে দেখতেলাগলেন। তিনি দেখলেন তাদের মধ্যকার ধনী-গরীব, সুন্দর-অসুন্দর সবাইকে। তখন তিনি বললেন,হে প্রভু! আপনি কেন আপনার বান্দাদের সমানকরলেন না?আল্লাহ বললেন, আমি চাই যে, এরফলেআমার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাহউক।তিনিতাদের মধ্যে নবীগণকে দেখলেন প্রদীপসদৃশ। তাঁদের নিকট থেকে পৃথকভাবে রিসালাত ওনবুঅতের দায়িত্ব পালনের বিশেষ অঙ্গীকারনেওয়া হয়। যে সম্পর্কেআল্লাহ বলেন, ‘যখনআমরা নবীগণের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণকরলামএবং আপনার নিকট থেকেও এবং নূহ, ইবরাহীম,মূসা ও মারিয়াম-পুত্র ঈসার নিকট থেকে’(আহযাব৩৩/৭)। ঐ রূহগুলির মধ্যে ঈসার রূহ ছিল, যামারিয়ামেরকাছে পাঠানো হয়। উবাইথেকে বর্ণিত হয়েছেযে, উক্ত রূহ মারিয়ামের মুখ দিয়ে প্রবেশ করে’।[25](৪) শেষনবীর জন্য প্রতিশ্রুতি :এরপর সকলনবীর কাছ থেকে বিশেষ প্রতিশ্রুতি নেওয়াহয়েছে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ওমর্যাদাকে মেনে নেওয়ার জন্য, তাঁর অনুসরণেরজন্য এবং তাঁর যুগ পেলে তাঁকে সাহায্য করার জন্য।যেমন- আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﺃَﺧَﺬَ ﺍﻟﻠّﻪُ ﻣِﻴْﺜَﺎﻕَ ﺍﻟﻨَّﺒِﻴِّﻴْﻦَﻟَﻤَﺎ ﺁﺗَﻴْﺘُﻜُﻢ ﻣِّﻦْ ﻛِﺘَﺎﺏٍ ﻭَّﺣِﻜْﻤَﺔٍ ﺛُﻢَّ ﺟَﺎﺀَﻛُﻢْ ﺭَﺳُﻮﻝٌ ﻣُّﺼَﺪِّﻕٌﻟِّﻤَﺎ ﻣَﻌَﻜُﻢْ ﻟَﺘُﺆْﻣِﻨُﻦَّ ﺑِﻪِ ﻭَﻟَﺘَﻨْﺼُﺮُﻧَّﻪُ ﻗَﺎﻝَ ﺃَﺃَﻗْﺮَﺭْﺗُﻢْ ﻭَﺃَﺧَﺬْﺗُﻢْﻋَﻠَﻰ ﺫَﻟِﻜُﻢْ ﺇِﺻْﺮِﻱْ ﻗَﺎﻟُﻮْﺍ ﺃَﻗْﺮَﺭْﻧَﺎ ﻗَﺎﻝَ ﻓَﺎﺷْﻬَﺪُﻭْﺍ ﻭَﺃَﻧَﺎ ﻣَﻌَﻜُﻢﻣِّﻦَ ﺍﻟﺸَّﺎﻫِﺪِﻳْﻦَ- ‏) ﺁﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ ৮১(-‘আর আল্লাহ যখননবীগণের কাছ থেকেঅঙ্গীকার নিলেন যে,আমি যা কিছু তোমাদেরকে দান করেছি কিতাব ওহিকমত, অতঃপর তোমাদের নিকটে (যখন) রাসূল(শেষনবী) আসেন তোমাদের নিকট যা আছে(তাওরাত-ইঞ্জীল) তার সত্যয়নকারী হিসাবে, তখনসেই রাসূলের (শেষনবীর) প্রতি তোমরা ঈমানআনবে ও তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেন,তোমরা কি অঙ্গীকার করছ? এবং উপরোক্তশর্তে তোমরা আমার ওয়াদাকবুল করে নিচ্ছ? তারা(নবীগণ) বলল, আমরা অঙ্গীকার করছি। তিনি(আল্লাহ) বললেন, তাহ’লে তোমরা সাক্ষী থাক।আর আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষীরইলাম’(আলে ইমরান ৩/৮১)।অন্যত্র আল্লাহবলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﻗَﺎﻝَ ﻋِﻴﺴَﻰ ﺍﺑْﻦُ ﻣَﺮْﻳَﻢَ ﻳَﺎ ﺑَﻨِﻲ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴﻞَ ﺇِﻧِّﻲﺭَﺳُﻮﻝُ ﺍﻟﻠَّﻪِ ﺇِﻟَﻴْﻜُﻢ ﻣُّﺼَﺪِّﻗﺎً ﻟِّﻤَﺎ ﺑَﻴْﻦَ ﻳَﺪَﻱَّ ﻣِﻦَ ﺍﻟﺘَّﻮْﺭَﺍﺓِﻭَﻣُﺒَﺸِّﺮﺍً ﺑِﺮَﺳُﻮﻝٍ ﻳَﺄْﺗِﻲ ﻣِﻦ ﺑَﻌْﺪِﻱ ﺍﺳْﻤُﻪُ ﺃَﺣْﻤَﺪُ … ، ‘স্মরণকর, যখন মারিয়াম-তনয় ঈসা বলল, হেইস্রাঈলসন্তানগণ! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহরপ্রেরিত রাসূল এবং আমারপূর্ববর্তী তাওরাত কিতাবেরসত্যয়নকারী। আর আমি একজন রাসূলের সুসংবাদদানকারী, যিনি আমার পরে আসবেন, যার নাম হবে‘আহমাদ’…(ছফ ৬১/৬)।উপরোক্ত আয়াত দ্বয়ে বুঝাযায় যে,বিগত সকল নবী যেমন তাঁর পূর্ববর্তীনবীর সত্যয়নকারী ছিলেন, তেমনি সকল নবীস্ব স্ব উম্মতের নিকটে শেষনবী মুহাম্মাদছাল্লাল্লাহু আলাইহেওয়া সাল্লামের আগমনবার্তাশুনিয়ে গেছেন ও তাঁর প্রতি ঈমান,আনুগত্য ওতাঁকে সার্বিকভাবে সাহায্য করার জন্য অছিয়ত করেগেছেন। এদিক দিয়ে শেষনবী যে বিশ্বনবীছিলেন এবং তাঁর আনীত শরী‘আতের মধ্যেবিগত সকল শরী‘আত যে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে,তা পরিষ্কার হয়ে যায়।(৫) ইহুদী পন্ডিতদেরপ্রতিশ্রুতি :উপরোক্ত ওয়াদা ছাড়াও ইহুদী-নাছারাপন্ডিতদের কাছ থেকে বিশেষ প্রতিশ্রুতি নেওয়াহয়, যাতে তারা সত্য গোপন না করে। যেমনআল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْ ﺃَﺧَﺬَ ﺍﻟﻠّﻪُ ﻣِﻴْﺜَﺎﻕَ ﺍﻟَّﺬِﻳْﻦَ ﺃُﻭﺗُﻮْﺍ ﺍﻟْﻜِﺘَﺎﺏَﻟَﺘُﺒَﻴِّﻨُﻨَّﻪُ ﻟِﻠﻨَّﺎﺱِ ﻭَﻻَ ﺗَﻜْﺘُﻤُﻮﻧَﻪُ ﻓَﻨَﺒَﺬُﻭْﻩُ ﻭَﺭَﺍﺀَ ﻇُﻬُﻮﺭِﻫِﻢْﻭَﺍﺷْﺘَﺮَﻭْﺍ ﺑِﻪِ ﺛَﻤَﻨﺎً ﻗَﻠِﻴْﻼً ﻓَﺒِﺌْﺲَ ﻣَﺎ ﻳَﺸْﺘَﺮُﻭْﻥَ- ‏) ﺁﻝ ﻋﻤﺮﺍﻥ১৮৭(-‘আর আল্লাহ যখন আহলে কিতাবদের(পন্ডিতদের) নিকট থেকে প্রতিজ্ঞা গ্রহণকরলেন যে, তারা তা লোকদের নিকটে বর্ণনাকরবে ও তা গোপন করবে না। তখন তারা সেপ্রতিজ্ঞাকে পিছনে রেখে দিল, আর তা বেচা-কেনা করল সামান্য পয়সার বিনিময়ে। কতই না মন্দতাদের এ বেচা-কেনা’(আলে ইমরান ৩/১৮৭)।(৬)সাধারণ বনু ইস্রাঈলগণের প্রতিশ্রুতি :অতঃপর বনুইস্রাঈলের সাধারণ লোকদের কাছ থেকেওপ্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, ﻭَﺇِﺫْﺃَﺧَﺬْﻧَﺎ ﻣِﻴﺜَﺎﻕَ ﺑَﻨِﻲْ ﺇِﺳْﺮَﺍﺋِﻴْﻞَ ﻻَ ﺗَﻌْﺒُﺪُﻭﻥَ ﺇِﻻَّﺍﻟﻠَّﻪَ ﻭَﺑِﺎﻟْﻮَﺍﻟِﺪَﻳْﻦِﺇِﺣْﺴَﺎﻧًﺎ ﻭَﺫِﻱ ﺍﻟْﻘُﺮْﺑَﻰ ﻭَﺍﻟْﻴَﺘَﺎﻣَﻰ ﻭَﺍﻟْﻤَﺴَﺎﻛِﻴْﻦِ ﻭَﻗُﻮﻟُﻮْﺍ ﻟِﻠﻨَّﺎﺱِﺣُﺴْﻨًﺎ ﻭَﺃَﻗِﻴْﻤُﻮﺍ ﺍﻟﺼَّﻼَﺓَ ﻭَﺁﺗُﻮﺍ ﺍﻟﺰَّﻛَﺎﺓَ ﺛُﻢَّ ﺗَﻮَﻟَّﻴْﺘُﻢْ ﺇِﻻَّ ﻗَﻠِﻴﻼًﻣِﻨْﻜُﻢْ ﻭَﺃَﻧْﺘُﻢْ ﻣُﻌْﺮِﺿُﻮْﻥَ – ‏)ﺍﻟﺒﻘﺮﺓ ৮৩(-‘যখন আমরা বনুইস্রাঈলগণের কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি নিলাম এইমর্মে যে, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারুইবাদত করবে না। আর তোমরা পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন ওইয়াতীম-মিসকীনদের সাথে সদ্ব্যবহারকরবে এবং মানুষের সাথে সুন্দর কথা বলবে, ছালাতকায়েম করবে ও যাকাত আদায় করবে। কিন্তু কিছুলোক ব্যতীত তোমরা সবাই মুখ ফিরিয়ে নিলেএবং তোমরা তা অগ্রাহ্য করলে’(বাক্বারাহ ২/৮৩)।বলাবাহুল্য যে, অধিকাংশ নবী বনুইস্রাঈল থেকেইহয়েছেন। কিন্তু বনু ইস্রাঈলরাই অধিকাংশ নবীকেহত্যা করেছে, তাদেরকে মিথ্যা প্রতিপন্নকরেছে, তাদের ঐশী কিতাবসমূহকে পরিবর্তন ওবিকৃত করেছে, তাদের নবীদের চরিত্র হননকরেছে, তাদের নামে কলংক লেপন করেছেএবং অবশেষে শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কেচিনতে পেরেও(বাক্বারাহ ২/১৪৬; আন‘আম ৬/২০)নাচেনার ভান করেছে ও তাঁর সঙ্গে চূড়ান্ত গাদ্দারীকরেছে। অবশ্য তাদের মধ্যেঅনেকে) ﻗِﺴِّﻴْﺴِﻴْﻦَ ﻭَﺭُﻫْﺒَﺎﻧًﺎ (ঈমান এনে ধন্যহয়েছিলেন এবং আল্লাহর নিকটে কৃত ওয়াদা পূর্ণকরেছিলেন।[26]যেমন খ্যাতনামা ছাহাবী আব্দুল্লাহইবনে সালাম, আদী ইবনে হাতেম প্রমুখনেতৃবৃন্দ। এতদ্ব্যতীত হাবশার খৃষ্টান বাদশাহনাজ্জাশী নিজে তো শেষনবীর উপরেবিশ্বাসী ছিলেন। অধিকন্তু তিনি আবিসিনিয়ার ৬২ জন ওসিরিয়ার ৮ জনমোট ৭০ জনের একটিশীর্ষস্থানীয় খৃষ্টান ধর্মীয় প্রতিনিধিদলকেমদীনায় প্রেরণ করেন। তাঁরা রাসূলের মুখে সূরাইয়াসীন শুনে অবিরল ধারায় অশ্রু বিসর্জন দেন।অতঃপর সবাই ইসলাম গ্রহণ করেন’। তাদেরপ্রত্যাবর্তনের পর নাজ্জাশী নিজের ইসলামকবুলের কথা ঘোষণা করেন এবং একখানা পত্রলিখে স্বীয় পুত্রের নেতৃত্বে আরেকটিপ্রতিনিধিদল মদীনায় প্রেরণ করেন। কিন্তুদুর্ভাগ্যক্রমে জাহায ডুবির কারণে তারা সবাইপথিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেন।[27]আদমের মর্যাদা ওশ্রেষ্ঠত্ব :‘আশরাফুল মাখলূক্বাত’ বা সেরা সৃষ্টিহিসাবে আল্লাহ আদম ও বনু আদমকে সৃষ্টি করেন।এ বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ﻭَﻟَﻘَﺪْ ﻛَﺮَّﻣْﻨَﺎ ﺑَﻨِﻲْ ﺁﺩَﻡَﻭَﺣَﻤَﻠْﻨَﺎﻫُﻢْ ﻓِﻲ ﺍﻟْﺒَﺮِّ ﻭَﺍﻟْﺒَﺤْﺮِ ﻭَﺭَﺯَﻗْﻨَﺎﻫُﻢ ﻣِّﻦَ ﺍﻟﻄَّﻴِّﺒَﺎﺕِﻭَﻓَﻀَّﻠْﻨَﺎﻫُﻤْﻌَﻠَﻰ ﻛَﺜِﻴﺮٍ ﻣِّﻤَّﻦْ ﺧَﻠَﻘْﻨَﺎ ﺗَﻔْﻀِﻴْﻼً- ‏) ﺍﻹﺳﺮﺍﺀ৭০(-‘আমরা বনু আদমকে উচ্চ সম্মানিত করেছি,তাদেরকে স্থল ও জলপথে বহনকরে নিয়েছি,তাদেরকে পবিত্র বস্ত্ত সমূহ হ’তে খাদ্য দানকরেছি এবং আমাদের বহু সৃষ্টির উপরে তাদেরকেউচ্চ মর্যাদা প্রদান করেছি’(ইসরা ১৭/৭০)।এখানেপ্রথমে ﻛَﺮَّﻣْﻨَﺎশব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে মানুষকেএমন কিছু বিষয়ে একচ্ছত্র সম্মান দানের কথা বলাহয়েছে, যা অন্য কোন সৃষ্টিকে দেওয়া হয়নি।যেমন জ্ঞান-বিবেক, চিন্তাশক্তি, ভাল-মন্দ ও ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যবোধ, স্বাধীন ইচ্ছাশক্তিপ্রয়োগের ক্ষমতা ইত্যাদি। অতঃপরﻓَﻀَّﻠْﻨَﺎ শব্দব্যবহারের মাধ্যমে অন্যের তুলনায় মানুষকে উচ্চমর্যাদা দানের কথা বলা হয়েছে। যেমন মানুষেরউন্নত হ’তে উন্নততর জীবন যাপন প্রণালী, গৃহনির্মাণ পদ্ধতি, খাদ্য গ্রহণ, পোষাক-পরিচ্ছদইত্যাদিতে উন্নততর রুচিশীলতা, আইনানুগ ওসমাজবদ্ধ জীবনযাপন প্রভৃতি বিষয়গুলি অন্যান্যপ্রাণী হ’তে বৈশিষ্ট্য মন্ডিত এবং নানা বৈচিত্র্যেভরপুর। তাতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন, পরিবর্ধন, বিবর্তনও উন্নয়ন অব্যাহত রয়েছে। অথচ বাবুই পাখির নীড়রচনা কিংবা বনে-জঙ্গলে বাঘ-শৃগালের বসবাস পদ্ধতিলক্ষ বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে। না তাতেঅতীতে কোন পরিবর্তন এসেছে, নাভবিষ্যতে কোন পরিবর্তন আসার সম্ভাবনারয়েছে।মানুষ জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষেউন্নত হ’তে উন্নততর পরিবহনে চলাফেরা ওব্যবসা-বাণিজ্য করছে।তারা পৃথিবীর সর্বোত্তমখাদ্যসমূহ গ্রহণ করছে, উন্নত পাক-প্রণালীরমাধ্যমে সুস্বাদু খাবার গ্রহণ ও সর্বোত্তম পানীয়পান করছে, যা অন্য প্রাণীর পক্ষেআদৌ সম্ভব নয়।মানব মর্যাদার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিষয় হচ্ছে তাকেকথা বলার শক্তি দান করা, যা অন্য কোন সৃষ্টিকেদেওয়া হয়নি। তাকে দেওয়া হয়েছে ভাষা ও রঙেরবৈচিত্র্য, দেওয়া হয়েছে লিখনক্ষমতা এবং উন্নতসাহিত্য জ্ঞান ও অলংকার সমৃদ্ধ বাক্য গঠন ও কাব্যরচনার যোগ্যতা, যা অন্য কোন সৃষ্টিকে দেওয়াহয়নি।মানব মর্যাদার অন্যতম বিষয় হ’ল, বিশ্বেরপ্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সকল সৃষ্টিকে মানুষের অনুগতকরেদেওয়া হয়েছে(লোকমান ৩১/২০)।যেনআল্লাহর যাবতীয় সৃষ্টিকর্মের মূল লক্ষ্যহচ্ছে মানুষ। মানুষের জন্যই যেন সবকিছু। সূর্যেরকিরণ, চন্দ্রের জ্যোতি,গ্রহ-নক্ষত্রের মিটিমিটিআলো, বাতাসের মৃদুমন্দ প্রবাহ,পানিরজীবনদায়িনী ক্ষমতা, মাটির উর্বরা শক্তি,আগুনের দাহিকা শক্তি, বিদ্যুতের বহু মাত্রিককল্যাণকারিতা, মাঠভরা সবুজ শস্যভান্ডার, গাছ ভরা ফল-ফলাদি, বাগিচায় রং-বেরংয়ের ফুলের বাহার, পুকুর-নদী-সাগর ভরা নানা জাতের মাছ ও মণি-মুক্তারসমাহার,ভূগর্ভে সঞ্চিত স্বর্ণ-রৌপ্য ও খনিজসম্পদরাজি ও তৈল-গ্যাসের আকর, গোয়াল ওজঙ্গলভরা পশু-পক্ষীর আবাস কাদের জন্য? এককথায় জবাব: এসবই কেবল মানুষের জন্য। আল্লাহবলেন, ﻫُﻮَ ﺍﻟَّﺬِﻱ ﺧَﻠَﻖَ ﻟَﻜُﻢ ﻣَّﺎ ﻓِﻲ ﺍﻷَﺭْﺽِ ﺟَﻤِﻴﻌﺎً ‘তিনিইসেই সত্তা, যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীরসবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন’(বাক্বারাহ ২/২৯)।প্রশ্নহ’ল: সবই যখন মানুষের জন্য, তাহ’লে মানুষ কারজন্য? তারও জবাব একটাই: ‘আমরা আল্লাহর জন্য, এবংআমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব’(বাক্বারাহ ২/১৫৬)। ‘আমরাএসেছি তাঁর ইবাদতের জন্য, সর্বক্ষেত্রে তাঁরদাসত্বের জন্য(যারিয়াত ৫১/৫৬)এবং দুনিয়ায় তাঁরখেলাফত পরিচালনার জন্য’(বাক্বারাহ ২/৩০)।।বিশ্বলোকে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর ইবাদতেরত। সবই একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য(লোকমান৩১/২৯)নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে পরিচালিত(ফাতির৩৫/৪৩)। সবই আল্লাহর অনুগত ও তাঁর প্রতি সিজদায়অবনত এবং কেবল তাঁরই গুণগানে রত। জগত সংসারপরিচালনার এই সুনির্দিষ্ট নিয়মটাই হ’ল ‘দ্বীন’ এবং এইদ্বীনের প্রতি নিখাদ আনুগত্য ওআত্মসমর্পণকেই বলা হয় ‘ইসলাম’। এজন্যেই বলাহয়েছে ﺇِﻥَّ ﺍﻟﺪِّﻳﻦَ ﻋِﻨﺪَ ﺍﻟﻠّﻪِ ﺍﻹِﺳْﻼَﻡُ ‘আল্লাহর নিকটে‘দ্বীন’ হ’ল কেবল ‘ইসলাম’(আলে ইমরান ৩/১৯)।ইসলামের দু’টি দিক রয়েছে, প্রাকৃতিক ও মানবিক।প্রথমটি সমস্ত বিশ্ব প্রকৃতিতে পরিব্যপ্ত। যেখানেসবকিছু সরাসরি আল্লাহ কর্তৃক প্রাকৃতিক নিয়মেপরিচালিত। যে নিয়মের কোন ব্যত্যয় নেই কোনব্যতিক্রম নেই (আল্লাহর বিশেষ হুকুম ব্যতীত)(ইউসুফ ১২/৪০; আহযাব ৩৩/৬২; ইসরা ১৭/৭৭)।দ্বিতীয়টি অর্থাৎ মানবিক জীবন পরিচালনার ব্যবহারিকনীতি-নিয়ম যা আল্লাহ যুগে যুগে নবী-রাসূলদেরমাধ্যমে পাঠিয়েছেন। একেই বলে ইসলামীশরী‘আত। যা আদমআলাইহিস সালামেরমাধ্যমে শুরুহয়ে শেষনবী মুহাম্মাদছাল্লাল্লাহু আলাইহেওয়াসাল্লামেরমাধ্যমে শেষ হয়েছে ও পূর্ণতা লাভকরেছে(মায়েদাহ ৫/৩)। উল্লেখ্য যে, আভিধানিকঅর্থে বিগত সকল নবীর দ্বীনকে ইসলাম বলাগেলেও পারিভাষিকভাবে শেষনবীর নিকটেপ্রেরিত সর্বশেষ ও পূর্ণাঙ্গ দ্বীনকেই কেবল‘ইসলাম’ বলা হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন, ﻓَﺄَﻗِﻢْ ﻭَﺟْﻬَﻚَﻟِﻠﺪِّﻳْﻦِ ﺣَﻨِﻴﻔًﺎ ﻓِﻄْﺮَﺓَ ﺍﻟﻠﻪِ ﺍﻟَّﺘِﻲ ﻓَﻄَﺮَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱَ ﻋَﻠَﻴْﻬَﺎ ﻻَ ﺗَﺒْﺪِﻳﻞَﻟِﺨَﻠْﻖِ ﺍﻟﻠﻪِ ﺫَﻟِﻚَ ﺍﻟﺪِّﻳﻦُ ﺍﻟْﻘَﻴِّﻢُ ﻭَﻟَﻜِﻦَّ ﺃَﻛْﺜَﺮَ ﺍﻟﻨَّﺎﺱِ ﻻَﻳَﻌْﻠَﻤُﻮﻥَ – ‏) ﺍﻟﺮﻭﻡ ৩০(-‘তুমি তোমার চেহারাকেদ্বীনের জন্য একনিষ্ঠ কর। এটিই আল্লাহর ফিৎরাত,যার উপরে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহরসৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাইহ’ল সরল ধর্ম।কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না’(রূম ৩০/৩০)।উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা অপরিবর্তনীয়দ্বীনের প্রতি মানুষের দৃষ্টি নিবদ্ধ করতেবলেছেন, সেটি হ’ল সেই দ্বীন, যাবিশ্বলোকে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। মানুষেরদেহসত্তায়ও জীবন প্রবাহে উক্ত দ্বীনপ্রতিবিম্বিত। উক্ত দ্বীনের প্রতি আনুগত্যেরকারণেই পিতার সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম শুক্রাণু থেকেমাতৃগর্ভে ভ্রুণ সৃষ্টি হয়। অতঃপর নির্ধারিত সময়ে তাসুন্দর ফুটফুটে মানবশিশু রূপে দুনিয়াতে ভূমিষ্ট হয়।অতঃপর শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও প্রৌঢ়ত্ব পেরিয়েসে বার্ধক্যে উপনীত হয় ও এক সময় তার মৃত্যুহয়। দেহের এই জন্ম-মৃত্যুর নিয়মের কোনপরিবর্তন নেই। এক্ষেত্রে মানুষ সহ সকলসৃষ্টজীব ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় আল্লাহর অলংঘনীয়বিধানের প্রতি আনুগত্যশীল ও আত্মসমর্পিত‘মুসলিম’(আলে ইমরান ৩/৮৩; রা‘দ ১৩/১৫)। এটা হ’ল‘ইসলাম’-এর প্রাকৃতিক দিক, যা মানতে প্রত্যেক মানুষবাধ্য। মানুষের দেহ তাই প্রাকৃতিক নিয়মের অধীন।কিন্তু জ্ঞানের দিক দিয়ে সে স্বাধীন। সে তারজ্ঞানকে স্বাধীনভাবে প্রয়োগ করতে পারে।মানুষের বাহ্যিক আকৃতির শ্রেষ্ঠত্বের সাথে তারআধ্যাত্মিক দিকের সংযোগ এক অসাধারণ ব্যাপার।অথচ বিশ্বলোকের অন্যান্য সৃষ্টির বাইরের দিক ওভিতরের দিকের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।চন্দ্র-সূর্যের সবটাই আলো, পশুর সবটাই পশুত্বেভরা। কিন্তু মানুষের বাইরের দিকের সাথে ভিতরেরদিকের কোন মিল নেই। বরং তা আরও জটিল ওদুর্বোধ্য। মানুষের দৈহিক অবয়বের মধ্যেওটাএকটা আলাদা জগত। যা দেখা যায় না, কেবলউপলব্ধি করা যায়। মানুষ যেমন ষড় রিপু সমৃদ্ধ একটিজৈবিক সত্তা, তেমনি সে একটি বিবেকবান নৈতিক ওআধ্যাত্মিক সত্তা। মানুষের দেহ জগতের চিকিৎসা ওআরাম-আয়েশের উপকরণ তাই কমবেশী সর্বত্রপ্রায় সমান হ’লেও তার মনোজগতের চিকিৎসা ও সুখ-দুঃখের অনুভূতি সবার জন্য সমান নয়। মনোজগতেশয়তানের তাবেদার হয়ে সেঅনেক সময় তারবাহ্যিক দেহ জগতকে ধ্বংস করে দেয়। মূলত:মনোজগতে লালিত ধারণা ও বিশ্বাসইমানুষেরকর্মজগতে প্রতিফলিত হয়। তাই দয়ালু আল্লাহতাঁর প্রিয় সৃষ্টিমানুষের সার্বিক জীবন সঠিক পথেপরিচালনার জন্য যুগে যুগে নবীগণের মাধ্যমেএলাহী হেদায়াত সমূহ পাঠিয়েছেন। প্রাকৃতিকদ্বীন-এর মত এই দ্বীনও অপরিবর্তনীয় ওচিরকল্যাণময়। আর সেটাই হ’ল ইসলামের বাহ্যিকমানবিক দিক। উক্ত মানবিক দিক পরিচালনার উদ্দেশ্যেযে দ্বীন নবীদের মাধ্যমে প্রেরিতহয়েছে, তা গ্রহণ ও পালনের স্বাধীন এখতিয়ারমানুষকে দেওয়া হয়েছে(কাহফ ১৮/২৯; দাহর৭৬/৪)।এ দ্বীন বা শরী‘আতের পূর্ণাঙ্গঅনুসরণে মানুষ দুনিয়ায় শান্তি পাবে ও আখেরাতেজান্নাত লাভে ধন্য হবে। আর তা অমান্য করলেদুনিয়ায় অশান্তি ভোগ করবে ও পরকালেজাহান্নামের আগুনে দগ্ধীভূত হবে(বাক্বারাহ২/৩৮-৩৯; তাগাবুন ৬৪/ ৯-১০)।বলা বাহুল্য, এ স্বাধীনইচ্ছাশক্তিই মানুষের ‘সৃষ্টির সেরা’ হওয়ার মূল কারণ।এতেই তার পরীক্ষা এবং এতেই তার জান্নাত বাজাহান্নাম। মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের সবচেয়ে বড়দিক হ’ল এ পৃথিবীতে আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠাকরা। কেননা তাকে ‘আল্লাহর খলীফা’ হিসাবেইদুনিয়ায়পাঠানো হয়েছে।[28]এ দুনিয়াকে আল্লাহরইচ্ছা অনুযায়ী সুন্দরভাবে আবাদ করা এবং অহীরবিধান অনুযায়ী সার্বিক জীবন পরিচালনার মাধ্যমেআল্লাহর প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করাই তার প্রধানকাজ। খেলাফতের এ দায়িত্ব সে ব্যক্তি জীবনেযেমন পালন করবে, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়জীবনেও তেমনি পালন করবে। সর্বত্র সেআল্লাহর বিধানের প্রতি আনুগত্যশীল বান্দা হিসাবেনিজেকে প্রমাণ করবে। এই গুরু দায়িত্ব আসমান-যমীন, পাহাড়-পর্বত কেউ গ্রহণ করতে সাহসীহয়নি। মানুষ স্বেচ্ছায় এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল(আহযাব ৩৩/৮২)। কিন্তু দুনিয়ায় এসে এর চাকচিক্যদেখে মানুষ মোহগ্রস্ত হয়ে গেছে ওআল্লাহর খেলাফতের দায়িত্ব পালনের কথা ভুলেগেছে। কেউবা তাতে অলসতা দেখাচ্ছে,কেউবা অস্বীকার করছে। তবুও ক্বিয়ামত-প্রাক্কালঅবধি একদল লোক চিরদিনথাকবে, যারা এ দায়িত্ব পালনকরে যাবে।[29]আল্লাহ বলেন, ﻭَﻣِﻤَّﻦْ ﺧَﻠَﻘْﻨَﺎ ﺃُﻣَّﺔٌﻳَﻬْﺪُﻭﻥَ ﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ ﻭَﺑِﻪِ ﻳَﻌْﺪِﻟُﻮﻥَ -‘আমরা যাদের সৃষ্টি করেছিতাদের মধ্যেএকটি দল রয়েছে, যারা সত্য পথদেখায় ও সেমতে ন্যায়বিচার করে’(আ‘রাফ৭/১৮১)। অতঃপর তিনি বলেন, ﺳَﻨَﻔْﺮُﻍُ ﻟَﻜُﻢْ ﺃَﻳُّﻬَﺎﺍﻟﺜَّﻘَﻼَﻥِ‘হে জিন ও ইনসান! অতিসত্বর আমরাতোমাদের ব্যাপারে মনোনিবেশ করব’(রহমান৫৫/৩১)। অর্থাৎ একটি বিশেষ মুহূর্তে দুনিয়াতেতোমাদের পরীক্ষা গ্রহণের এই ধারা সহসাই বন্ধহয়ে যাবে এবং তোমাদেরকে পুনর্জীবিতকরে হাশরের ময়দানে একত্রিত করা হবে। সেদিনআমার সুক্ষ্ম বিচারের হাত থেকে তোমরাকেউইরেহাই পাবে না।জিনদের আল্লাহ আগেই সৃষ্টিকরেনআগুন থেকে। তারাও ছিল স্বাধীন এখতিয়ারসম্পন্ন। কিন্তু তারা অবাধ্যতা করেছিল। অনেকেজিনকে চর্ম চক্ষুতে দেখতে পায় না বলেতাদেরকে অস্বীকার করে। অথচ বহু জিনিষরয়েছে যা মানুষ বাহ্যিক দৃষ্টিতে দেখতে পায় না।তাই বলে তাদের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা যায়না। যেমন বিদ্যুৎ, বায়ু প্রবাহ, বস্ত্তর স্বাদ ও গন্ধইত্যাদি। মানুষের নবীই জিনদের নবী। তাদেরমধ্যে মুমিন, কাফির, ফাসিক সবই রয়েছে। জিনেরাযে এলাকায় বাস করে সে এলাকার মানুষের ভাষা তারাবুঝে। নবুঅতের দশম বছরে ত্বায়েফ থেকেফেরার পথে ‘নাখলা’ উপত্যকায় জিনেরা রাসূলেরকণ্ঠে সূরা রহমান শুনেছিল ও যতবারই আল্লাহ ﻓَﺒِﺄَﻯِّﺁﻻَﺀِ ﺭَﺑِّﻜُﻤَﺎ ﺗُﻜَﺬِّﺑَﺎﻥِ বলেছেন, ততবারই তারা জবাবেবলেছিল,লা বেশাইয়িন মিন নি‘আমিকা রববানা নুকাযযিবুফালাকাল হাম্দ।[30]তারা মানুষের কথা শোনে, বুঝেও উপলব্ধি করে। আল্লাহর কিতাব জিনও ইনসান সবারজন্য। অতএব তাদের পরিণতি ও মানুষের পরিণতিএকই।বস্ত্ততঃ আদম ও বনু আদম হ’ল আল্লাহরসর্বাধিক প্রিয় ও সেরা সৃষ্টি। মৃত্যুকাল অবধি তাকে এদুনিয়ার পরীক্ষাগারে অবস্থান করতে হবে একজনসজাগ ও সক্রিয় পরীক্ষার্থী হিসাবে। মৃত্যুরপরেই তার ক্বিয়ামত শুরু হয়ে যাবে। ভাল-মন্দকর্মের সুযোগ আর থাকবে না। তাই আল্লাহপ্রেরিত অহীর বিধান মেনে চলে কল্যাণময়জীবন পরিচালনার মাধ্যমে আল্লাহর সেরা সৃষ্টিরমর্যাদা অক্ষুণ্ণ রেখে দুনিয়া থেকে বিদায় হওয়াইবুদ্ধিমান মানুষের কর্তব্য।মনে রাখতে হবে যে,‘আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁর দিকেইফিরে যাব’(বাক্বারাহ ২/১৫৬)। ‘আমাদের ছালাত,আমাদের কুরবানী, আমাদের জীবন, আমাদেরমরণ সবকিছুই কেবলমাত্র বিশ্বপ্রভু আল্লাহরজন্য’(আন‘আম ৬/১৬৩)। জান্নাত থেকে নিক্ষিপ্তবনুআদম আমরা যেন পুনরায় জান্নাতে ফিরে যেতেপারি, করুণাময় আল্লাহ আমাদের সেই তাওফীক দানকরুন- আমীন!!দুনিয়াবী ব্যবস্থাপনায় আদম(আঃ):হাফেয শামসুদ্দীন যাহাবী (রহঃ) ﺍﻟﻄﺐﺍﻟﻨﺒﻮﻯ কেতাবে বলেন, মানুষের দুনিয়াবীজীবনে প্রয়োজনীয় সর্বপ্রকার শিল্পকর্মঅহীর মাধ্যমে কোন না কোন নবীর হাতে শুরুহয়েছে। অতঃপর যুগে যুগে তার উন্নতি ও উৎকর্ষসাধিত হয়েছে। সর্বপ্রথম আদম (আঃ)-এর উপরেযে সব অহী নাযিল করা হয়েছিল, তার অধিকাংশ ছিলভূমি আবাদ করা, কৃষিকার্য ও শিল্প সংক্রান্ত। যাতায়াত ওপরিবহনের জন্য চাকা চালিত গাড়ী সর্বপ্রথমআদম(আঃ) আবিষ্কার করেন। কালের বিবর্তনে নানাবিধমডেলের গাড়ী এখন চালু হয়েছে। কিন্তু সবগাড়ীর ভিত্তি হ’ল চাকার উপরে। বলা চলে যে,সভ্যতা এগিয়ে চলেছে চাকার উপরে ভিত্তি করে।অতএব যিনি প্রথম এটা চালু করেন, তিনিইবড়আবিষ্কারক। আর তিনি ছিলেন আমাদের আদি পিতাপ্রথম মানুষ ও প্রথম নবী হযরত আদম(আলাইহিসসালাম)। যা তিনি অহীর মাধ্যমে প্রাপ্ত হয়েছিলেন।[31]আদমের যুগে পৃথিবীর প্রথম কৃষিপণ্য ছিল‘তীন’ ফল। ফিলিস্তীন ভূখন্ড থেকে সম্প্রতিপ্রাপ্ত সে যুগেরএকটি আস্ত তীন ফলের শুষ্কফসিল পরীক্ষা করে একথা প্রমাণিত হয়েছে।পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ‘তীন’ ফলের শপথকরেছেন। আল্লাহ আমাদের আদি পিতার উপরেশান্তি বর্ষণ করুন- আমীন!আদম পুত্রদ্বয়েরকাহিনী :আল্লাহ বলেন, ﻭَﺍﺗْﻞُ ﻋَﻠَﻴْﻬِﻢْ ﻧَﺒَﺄَ ﺍﺑْﻨَﻲْ ﺁﺩَﻡَﺑِﺎﻟْﺤَﻖِّ.‘আপনি ওদেরকে (আহলে কিতাবদেরকে)আদম পুত্রদ্বয়ের যথার্থ কাহিনী শুনিয়ে দিন। যখনতারা উভয়ে কুরবানী পেশ করল। অতঃপর তাদেরএকজনের কুরবানী কবুল হ’ল। কিন্তু অপরজনেরকুরবানী কবুল হ’ল না। তখন একজন বলল, আমিঅবশ্যই তোমাকে হত্যা করব। জবাবে অপরজনবলল, আল্লাহ কেবলমাত্র আল্লাহভীরুদেরথেকেইকবুল করেন’(মায়েদাহ ২৭)। ‘যদি তুমিআমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াও, আমিতোমাকে হত্যার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াবো না। আমিবিশ্বপ্রভু আল্লাহকে ভয় করি’(২৮)। ‘আমি মনে করিএর ফলে তুমি আমাকে হত্যার পাপ ও তোমারঅন্যান্য পাপসমূহের বোঝা নিয়ে জাহান্নামবাসীহবে। আর সেটাই হ’ল অত্যাচারীদেরকর্মফল’(২৯)। ‘অতঃপর তার মন তাকে ভ্রাতৃহত্যায়প্ররোচিত করল এবং সে তাকে হত্যা করল। ফলেসে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হ’ল’(৩০)। ‘অতঃপরআল্লাহ একটি কাক পাঠালেন। যে মাটি খনন করতেলাগল এটা দেখানোর জন্য যে কিভাবে সেতারভাইয়ের মৃতদেহ দাফন করবে। সে বলল, হায়! আমিকি এই কাকটির মতোও হ’তে পারলাম না, যাতে আমিআমার ভাইয়ের মৃতদেহ দাফন করতে পারি। অতঃপরসে অনুতপ্ত হ’ল’(মায়েদাহ ৫/২৭-৩১)।কুরআনেরউক্ত বর্ণনা ছাড়াও ‘জাইয়িদ’ (উত্তম) সনদ সহআব্দুল্লাহ ইবনে আমর ও আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস(রাঃ) থেকে ‘মওকূফ’ সূত্রে যা যা বর্ণিতহয়েছেএবং হাফেয ইবনু কাছীর যাকে পূর্ববর্তী ওপরবর্তী একাধিক বিদ্বানগণের ‘মশহূর’ বক্তব্যবলে স্বীয় তাফসীরে ও তারীখে উল্লেখকরেছেন, সে অনুযায়ী আদম পুত্রদ্বয়ের নামছিল ক্বাবীল ও হাবীল ( ﻗﺎﺑﻴﻞ ﻭﻫﺎﺑﻴﻞ ) এবংক্বাবীল ছিল আদমের প্রথম সন্তান ও সবার বড় এবংহাবীল ছিল তার ছোট।হত্যাকান্ডের কারণ :এবিষয়ে কুরআন যা বলেছে তা এই যে,দু’ভাইআল্লাহর নামে কুরবানী করেছিল। কিন্তু আল্লাহএকজনের কুরবানী কবুল করেন, অন্যজনেরটাকরেননি। তাতে ক্ষেপে গিয়ে একজনঅন্যজনকে হত্যা করে, যার কুরবানী কবুলহয়েছিল।উল্লেখ্য যে, সে যুগে কুরবানী কবুলহওয়ার নিদর্শন ছিল এই যে, আসমান থেকে একটিআগুন এসে কুরবানী নিয়ে অন্তর্হিত হয়ে যেত।যে কুরবানীকে উক্ত অগ্নি গ্রহণ করত না, সেকুরবানীকে প্রত্যাখ্যাত মনে করা হ’ত। ক্বাবীলকৃষিকাজ করত। সে কার্পণ্য বশে কিছু নিকৃষ্টপ্রকারের শস্য, গম ইত্যাদি কুরবানীর জন্য পেশকরল। হাবীল পশু পালন করত। সে আল্লাহরমহববতে তার উৎকৃষ্ট দুম্বাটি কুরবানী করল। অতঃপরআসমান থেকে আগুন এসে হাবীলের কুরবানীটিনিয়ে গেল। কিন্তু কাবীলের কুরবানী যেমনছিল, তেমনি পড়ে রইল। এতে ক্বাবীল ক্ষুব্ধ হ’লএবং হাবীলকে বলল, ﻟَﺄﻗْﺘُﻠَﻨَّﻚَ ‘আমি অবশ্যইতোমাকে হত্যা করব’। হাবীল তখন তাকেউপদেশ দিয়ে মার্জিত ভাষায় বলল, ﺇِﻧَّﻤَﺎ ﻳَﺘَﻘَﺒَّﻞُ ﺍﻟﻠﻪ ُﻣِﻦَﺍﻟْﻤُﺘَّﻘِﻴﻦَ، ﻟَﺌِﻦ ﺑَﺴَﻄْﺖَ ﺇِﻟَﻲَّ ﻳَﺪَﻙَ ﻟِﺘَﻘْﺘُﻠَﻨِﻲ ﻣَﺎ ﺃَﻧَﺎ ﺑِﺒَﺎﺳِﻂٍﻳَﺪِﻱَ ﺇِﻟَﻴْﻚَ ﻟَﺄَﻗْﺘُﻠَﻚَ ﺇِﻧِّﻲ ﺃَﺧَﺎﻑُ ﺍﻟﻠﻪَ ﺭَﺏَّ ﺍﻟْﻌَﺎﻟَﻤِﻴﻦَ -‘নিশ্চয়ইআল্লাহ তাক্বওয়াশীল বান্দাদের থেকে(কুরবানী) কবুল করে থাকেন। এক্ষণে যদি তুমিআমাকে হত্যা করতে উদ্যত হও, তবে আমিতোমাকে পাল্টা হত্যা করতে উদ্যত হব না। কেননাআমি বিশ্বচরাচরের পালনকর্তা আল্লাহ্কে ভয়করি’(মায়েদাহ ৫/২৭-২৮)।ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন,হাবীলের কুরবানী দেওয়া দুম্বাটিই পরবর্তীতেইবরাহীম (আঃ) কর্তৃক ইসমাঈলকে কুরবানীর বিনিময়হিসাবে জান্নাত থেকে পাঠানো হয়।[32]আহলেকিতাব-এর মধ্যে যুগ যুগ ধরেপ্রসিদ্ধি আছে যে,হত্যাকান্ডেরস্থলটি ছিল উত্তর দামেষ্কে‘ক্বাসিয়ূন’ ( ﻗﺎﺳﻴﻮﻥ ) পাহাড়ের একটি গুহায়। যা আজও‘রক্তগুহা’ ( ﻣﻐﺎﺭﺓ ﺍﻟﺪﻡ ) নামে খ্যাত। যদিও এর কোননিশ্চিত ভিত্তি নেই।[33]কুরতুবী বলেন, ক্বাবীলস্রেফ হিংসা বশে হাবীলকে হত্যা করেছিল। সেচায়নি যে, ছোট ভাই হাবীল তার চাইতে উত্তমব্যক্তি হিসাবে সমাজে প্রশংসিত হৌক(তাফসীরকুরতুবী)ইবনু কাছীর বলেন, ইতিপূর্বে মায়েদাহ২০ হ’তে২৬ আয়াত পর্যন্ত ৭টি আয়াতে মূসার প্রতিবনু ইস্রাঈলের অবাধ্যতা এবং তার শাস্তি স্বরূপতীহপ্রান্তরে তাদের দীর্ঘ ৪০ বছরের বন্দীত্ববরণের লাঞ্ছনাকর ইতিহাস শুনানোর পর মদীনারইহুদীদেরকে আদম পুত্রদ্বয়ের পারস্পরিক হিংসারমর্মান্তিক পরিণামের কথা শুনানো হয়েছেএকারণে যে, তারা যেন স্রেফ হিংসা বশেশেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ)-এর অবাধ্যতা না করে এবংকুরআনকে অস্বীকার না করে’(তাফসীর ইবনুকাছীর)। কেননা তারা শেষনবীকে চিনলেওতাকে মানেনি স্রেফ এই হিংসার কারণে যে, ইস্রাঈলবংশে তাঁর জন্ম না হয়ে ইসমাঈল বংশে জন্মহয়েছিল। এই জ্ঞাতি হিংসা ইহুদীদেরকেমুসলমানদের চিরশত্রুতে পরিণত করেছে।একইভাবে কেবল মাত্র হিংসার কারণেই কাবীল তারসহোদর ছোট ভাই হাবীলকে খুন করেছিল এবংপৃথিবীতে প্রথম হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল।কেবল ইহুদী-নাছারা নয়, যুগে যুগে ইসলাম-বিদ্বেষী সকলের অবস্থা প্রায় একইরূপ।আজকের বিশ্বের অশুভ শক্তি বলয় সর্বত্রইসলামের ও ইসলামের নবীর বিরুদ্ধে যেভাবেবিষোদ্গার করে যাচ্ছে, তা কেবলি সত্যেরবিরুদ্ধে মিথ্যার চিরন্তন হিংসার আধুনিক রূপ মাত্র।উল্লেখ্য যে, আদম (আঃ)-এর শরী‘আতেরবিরোধিতা করে নিজের যমজ সুশ্রী বোনকেজোর করে বিয়ে করার জন্য এবং উক্ত বিয়েরদাবীদার হাবীলকে পথের কাঁটা মনেকরে তাকেচিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য কাবীল হাবীলকেহত্যা করে ছিল বলে যে ‘আছার’ সমূহ ইবনু জারীর,কুরতুবী, ইবনু কাছীর প্রভৃতি তাফসীরের কিতাবেবর্ণিত হয়েছে, তার সবগুলিই ‘মুরসাল’, যঈফ ও মওযূ।ইবনু কাছীর বলেন, এগুলি স্রেফ ইস্রাঈলীউপকথা মাত্র এবং পরবর্তীতে মুসলমান হওয়া সাবেকইহুদী পন্ডিত কা‘ব আল-আহবার থেকে নকলকৃত।[34]আইয়ূব সাখতিয়ানী বলেন, উম্মতে মুহাম্মাদীরমধ্যে এই আয়াতের উপর আমলকারী প্রথম ব্যক্তিহ’লেন তৃতীয় খলীফা হযরত ওছমান ইবনু আফফান(ইবনু কাছীর)। যিনি ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও এবংনিজেরজীবনের বিনিময়ে হ’লেওবিদ্রোহীদের দমনে মদীনাবাসীকেঅস্ত্রধারণের অনুমতি দেননি। ‘ফিৎনার সময় বসেথাকা ব্যক্তি দাঁড়ানো ব্যক্তির চেয়ে উত্তম’ রাসূল(ছাঃ)-এর এরূপ নির্দেশনা প্রসঙ্গে হযরত সা‘দ ইবনুআবী ওয়াকক্বাছ (রাঃ) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল!যখন আমাকে হত্যার জন্য আমার ঘরে ঢুকে কেউআমার দিকে হাত বাড়াবে, তখন আমি কি করব?রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, ﻛُﻨْﻜَﺨَﻴْﺮِ ﺍﺑْﻨَﻰْ ﺁﺩَﻡَ ‘তুমিআদমের দুই পুত্রের মধ্যে উত্তমটির মতহও’ (অর্থাৎ হাবীলের মত মৃত্যুকে বরণ কর)।অতঃপর আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) মায়েদাহ ২৮ আয়াতটি পাঠকরে শুনালেন’।[35]ইবনু কাছীর বলেন যে, এইসব ‘আছার’ একথা দাবী করে যে, আদমপুত্রদ্বয়ের কুরবানী বিশেষ কোন কারণ বশেছিল না বা কোন নারীঘটিতবিষয় এর মধ্যে জড়িতছিল না। কুরআনের প্রকাশ্য অর্থ উক্ত কথাসমর্থনকরে, যা মায়েদাহ ২৭ আয়াতেবর্ণিত হয়েছে।অতএব পূর্বাপর বিষয় সমূহ দ্বারা একথাই স্পষ্ট হয়যে, ভ্রাতৃ হত্যার কারণ ছিল স্রেফ এই হিংসা বশতঃ যে,হাবীলেরকুরবানী কবুল হয়েছিল, কিন্তুক্বাবীলের কুরবানী কবুল হয়নি(তাফসীর ইবনুকাছীর)। যদিও এতে হাবীলের কোন হাত ছিল না।ভালোর প্রতি এই হিংসা ও আক্রোশ মন্দলোকদের মজ্জাগত স্বভাব। যা পৃথিবীতে সর্বযুগে বিদ্যমান রয়েছে। এর ফলে ভালোলোকেরা সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হ’লেও চূড়ান্তবিচারে তারাই লাভবান হয়ে থাকেন। পক্ষান্তরে মন্দলোকেরা সাময়িকভাবে লাভবান হ’লেওচূড়ান্তবিচারে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। নির্দোষহাবীলকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে ক্বাবীল তারআক্রোশ মিটিয়ে সাময়িকভাবে তৃপ্তিবোধকরলেও চূড়ান্ত বিচারে সে অনন্ত ক্ষতিরমধ্যেপতিত হয়েছে। সেদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহবলেন, ﻓَﺄَﺻْﺒَﺢَ ﻣِﻦَ ﺍﻟْﺨَﺎﺳِﺮِﻳْﻦَ -‘অতঃপর সেক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হ’ল’(মায়েদাহ ৫/৩০)।রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন, ﻻَ ﺗُﻘْﺘَﻞُ ﻧَﻔْﺲٌ ﻇُﻠْﻤًﺎ ﺇﻻَّﻛَﺎﻥَ ﻋَﻠَﻰ ﺍﺑْﻦِ ﺁﺩَﻡَ ﺍﻷﻭَّﻝِ ﻛِﻔْﻞٌ ﻣِﻦْ ﺩَﻣِﻬَﺎ ﻟِﺄَﻧَّﻪُ ﺃَﻭَّﻝُ ﻣَﻦْ ﺳَﻦَّﺍﻟْﻘَﺘْﻞَ، ﺭﻭﺍﻫﺎﻟﺒﺨﺎﺭﻱُّ -‘অন্যায়ভাবে কোন মানুষ নিহতহ’লে তাকে খুন করার পাপের একটা অংশ আদমেরপ্রথম পুত্রের আমলনামায় যুক্ত হয়। কেননা সেই-ইপ্রথম হত্যাকান্ডের সূচনা করে’।[36]তিনি আরওবলেন, ‘যে ব্যক্তির উপর তার ভাইয়ের সম্মানহানি বাঅন্য কোন প্রকারের যুলুম রয়েছে, সে যেনতার থেকে আজই তা মুক্ত করে নেয়, সেইদিনআসার আগে, যেদিন তার নিকটে দীনার ও দিরহাম(স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা) কিছুই থাকবে না (অর্থাৎ মৃত্যুরপূর্বে)। যদি তার নিকট কোন সৎকর্ম থাকে, তবেতার যুলুম পরিমাণ নেকী সেখান থেকে নিয়েনেওয়া হবে। আর যদি তার কোন নেকী নাথাকে, তাহ’লে মযলূমের পাপ সমূহ নিয়েযালেমের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে’।[37]উক্তমর্মে কুরআনে বর্ণিত হয়েছে ﻭَﻟَﻴَﺤْﻤِﻠُﻦَّ ﺍَﺗْْﻘَﺎَﻟَﻬُﻢْﻭَﺃَﺛْﻘَﺎَﻻً ﻣَّﻊَ ﺃَﺛْﻘَﺎﻟِﻬِﻢْ ﻭَﻟَﻴُﺴْﺌَﻠُﻦَّ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﻋَﻤَّﺎ ﻛَﺎﻧُﻮْﺍﻳَﻔْﺘَﺮُﻭْﻥَ -‘আর তারা অবশ্যই নিজেদের পাপভার বহনকরবে ও তার সাথে অন্যদের পাপভার এবং তারাযেসব মিথ্যারোপ করে, সে সম্পর্কেক্বিয়ামতের দিন অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে’(আনকাবূত২৯/১৩)।শিক্ষণীয় বিষয় :(১) ক্বাবীল ওহাবীলের উক্ত কাহিনীর মধ্যে মানুষের সহজাতপ্রবৃত্তির তাড়নায় প্ররোচিত হওয়ার ও তার স্বাধীনইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন হওয়ার প্রমাণ নিহিত রয়েছে।(২)অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা যে সর্বাপেক্ষা জঘন্য পাপএবং তওবাব্যতীত হত্যাকারীর কোন নেক আমলআল্লাহ কবুল করেন না, তার প্রমাণ রয়েছে।(৩)আল্লাহভীরু ব্যক্তিগণ অন্যায়ের পাল্টা অন্যায়করেন না, বরং আল্লাহর উপরে ভরসা করেন ও তাঁরনিকটেই তার বদ্লা কামনা করেন।(৪) অন্যায়েরফলে অন্যায়কারী এক সময় অনুতপ্ত হয় ওদুনিয়াতে সে অন্তর্জ্বালায় দগ্ধীভূত হয় এবংআখেরাতে জাহান্নামের খোরাক হয়।(৫) নেককারব্যক্তিগণ দুনিয়ার দুঃখ-কষ্টকে আল্লাহর পরীক্ষামনে করেন এবং এতে ধৈর্য ধারণ করেন।(৬)মযলূম যদি ধৈর্য ধারণ করে, তবে তার গোনাহ সমূহযালেমের ঘাড়ে চাপে এবং দুই জনের পাপেরশাস্তি যালেমকে একাই ভোগ করতে হয়।(৭) মানুষমারা গেলে কবর দেওয়াই আল্লাহ প্রদত্ত চিরন্তনবিধান। ইসলামী শরী‘আতে এই বিধান রয়েছে(আবাসা ৮০/২১)। অতএব মৃত মানুষকেপুড়িয়ে ভস্মকরা উক্ত আবহমান কালব্যাপী এলাহী সুন্নাতেরস্পষ্ট লংঘন।(৮) অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যার এই সিলসিলাক্বাবীলের মাধ্যমে শুর হয় বিধায় ক্বিয়ামত পর্যন্তযত মানুষ অন্যায়ভাবে খুন হবে, সকল হত্যাকারীরপাপের বোঝা ক্বাবীলের আমলনামায় চাপানোহবে। অতএব অন্যায়ের সূচনাকারীগণ সাবধান!মৃত্যুও বয়স :রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমাদেরদিনগুলোর মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম দিন হ’লজুম‘আর দিন। এ দিনেই আদমকে সৃষ্টি করাহয়েছে, এ দিনেই তার মৃত্যু হয়েছে এবং এদিনেই ক্বিয়ামত সংঘটিত হবে…’।[38]আদম (আঃ)-কেএক হাযার বছর বয়স দেওয়া হয়েছিল। রূহেরজগতে দাঊদ (আঃ)-এর সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনিনিজেরবয়স থেকে ৪০ বছর তাকে দান করেন।ফলে অবশিষ্ট ৯৬০ বছর তিনি জীবিত ছিলেন।[39]আদম (আঃ)-এর জীবনী থেকে শিক্ষণীয়বিষয় সমূহ :১. তিনি সরাসরি আল্লাহর দু’হাতে গড়া এবং মাটিহ’তে সৃষ্ট। তিনি জ্ঞানসম্পন্ন ও পূর্ণাঙ্গ মানুষহিসাবে জীবন লাভ করেছিলেন।২. তিনি ছিলেনমানব জাতির আদি পিতা ও প্রথম নবী।৩. তিনি জিন জাতিরপরবর্তী প্রতিনিধি হিসাবে এবং দুনিয়া পরিচালনারদায়িত্বশীল খলিফা হিসাবে প্রেরিত হয়েছিলেন।৪.দুনিয়ার সকল সৃষ্ট বস্ত্তর নাম অর্থাৎ সেসবেরজ্ঞান ও তা ব্যবহারের যোগ্যতা তাকে দানকরাহয়েছিল।৫. জিন ও ফিরিশতা সহ সকল প্রকাশ্য ওঅপ্রকাশ্য সৃষ্টির উপরে মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্বপ্রমাণিত। সকলে তাদের অনুগত ও তাদের সেবায়নিয়োজিত।৬. আদমকে জান্নাতে সৃষ্টি করা হয়। যাপৃথিবীর বাইরে আসমানে সৃষ্ট অবস্থায় তখনও ছিল,এখনও আছে।৭. জান্নাতে আদমের পাঁজরের হাড়থেকে তার জোড়া হিসাবে স্ত্রী হাওয়াকে সৃষ্টিকরা হয়। সেকারণ স্ত্রী জাতি সর্বদা পুরুষজাতিরঅনুগামী এবং উভয়ে পরস্পরের প্রতিআকৃষ্ট।৮. আদম ও হাওয়াকে আসমানীজান্নাতথেকে দুনিয়ায় নামিয়ে দেওয়া হয় এবংপৃথিবীর নাভিস্থল মক্কার সন্নিকটে না‘মান উপত্যকায়অর্থাৎ আরাফাতের ময়দানে ক্বিয়ামত পর্যন্তজন্মগ্রহণকারী সকল মানুষের ক্ষুদ্রদেহীঅবয়ব সৃষ্টি করে তাদের নিকট থেকে ‘আহদেআলাস্ত্ত’ অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি দাসত্বের স্বীকৃতিও প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়।৯. মানুষ হ’ল পৃথিবীরএকমাত্র জ্ঞান সম্পন্ন প্রাণী। তাকে ভালও মন্দদু’টিই করার ইচ্ছাশক্তি ওস্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।১০. আদমের মধ্যে মানবত্ব ও নবুওয়াতেরনিষ্পাপত্ব উভয় গুণ ছিল। তিনি শয়তানের প্ররোচনায়আল্লাহর নিষেধাজ্ঞার কথা সাময়িকভাবে ভুলে গিয়েনিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেয়ে অনুতপ্ত হন ও তওবাকরেন। তওবা কবুল হবার পরে তিনি নবুঅত প্রাপ্তহন। অতএব নিঃসন্দেহে তিনি নিষ্পাপ ছিলেন।একইভাবে আদমের আওলাদগণ পাপ করে তওবাকরলে আল্লাহ তা মাফকরে থাকেন।১১. আদমকেসিজদা না করার পিছনে ইবলীসের অহংকার ও তারপরিণতিতে তার অভিশপ্ত হওয়ার ঘটনার মধ্যেমানুষকে অহংকারী না হওয়ার শিক্ষা প্রদান করাহয়েছে।১২. জৈবিক ও আধ্যাত্মিক দিকের সমন্বয়েমানুষ একটি অসাধারণ সত্তা, যা অন্য কোন সৃষ্টিরসাথেতুলনীয় নয়।১৩. ঈমানদার বান্দাগণ ক্বিয়ামতেরদিন বিচার শেষে পুনরায় জান্নাতে ফিরে যাবে।১৪.দুনিয়াবী ব্যবস্থাপনার সকল জ্ঞান আদমকে দেওয়াহয়েছিল এবং তার মাধ্যমেই পৃথিবীতে প্রথম ভূমিআবাদ ও চাকা চালিত পরিবহনের সূচনা হয়।১৫. সবকিছুইসৃষ্টি হয়েছে মানুষের সেবার জন্য। আর মানুষসৃষ্টি হয়েছে আল্লাহর দাসত্বের জন্য।[1]. মুমিনূন ২৩/১২; ছাফফাত ৩৭/১১; রহমান ৫৫/১৪;তীন ৯৫/৪ ইত্যাদি।[2]. নিসা ৪/১; মুত্তাফাক্ব আলাইহ,মিশকাত হা/৩২৩৮ ‘বিবাহ’ অধ্যায় ‘নারীদের সাথেসদ্ব্যবহার’ অনুচ্ছেদ। আদম এর মূল উপাদান হ’ল মাটি,তাই তাকে ‘আদম’ বলা হয়। পক্ষান্তরে হাওয়ার মূলহ’লেন আদম, যিনি তখন জীবন্ত ব্যক্তি। তাই তাকে‘হাওয়া’ বলা হয়, যা ‘হাই’ (জীবন্ত) থেকে উৎপন্ন(কুরতুবী), বাক্বারাহ ৩৫; আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/৬২পৃঃ।[3]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ(বৈরুত:দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ, তাবি) ১/৬৭।[4]. আহমাদ,ত্বাবারাণী, মিশকাত হা/৫৭৩৭ ‘ক্বিয়ামতের অবস্থা’অধ্যায়‘সৃষ্টির সূচনা ও নবীগণের আলোচনা’অনুচ্ছেদ।[5]. তিরমিযী, আহমাদ, আবুদাঊদ মিশকাতহা/২১২ ‘ইল্ম’ অধ্যায়।[6]. আহমাদ, মিশকাত হা/৪২ ‘ঈমান’অধ্যায়।[7]. মুসলিম, মিশকাত হা/৫৫১৬ ‘ফিতান’ অধ্যায়।[8].যথাক্রমে সূরা বাক্বারাহ ২/৩১-৩৭= ৭; আলে ইমরান৩/৩৩,৫৯; মায়েদাহ ৫/২৭-৩২= ৬; আ‘রাফ ৭/১১, ১৯,২৬, ২৭, ৩১, ৩৫, ১৭২-৭৩= ৮; হিজর ১৫/২৬-৪২= ১৭;ইসরা ১৭/৬১, ৭০; ইয়াসীন ৩৬/৬০।সর্বমোট = ৫০টি।[9]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/৬৫।[10].বুখারী হা/৪৭২৭ ‘তাফসীর’ অধ্যায়,সূরা কাহফ।[11].মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৬৮ ‘ঈমান’ অধ্যায়‘ওয়াসওয়াসা’ অনুচ্ছেদ।[12]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ১/৬৬।[13]. নিসা ৪/১; মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাতহা/৩২৩৮ ‘বিবাহ’ অধ্যায় ১০ম অনুচ্ছেদ।[14]. তাফসীরইবনে জারীর (বৈরুত: ১৪০৬/১৯৮৬) ৮/১০৯ পৃঃ, সূরাআ‘রাফ ৭/ ২২।[15]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাতহা/৪৩৩-৪৩৪ ‘পবিত্রতা’ অধ্যায় ‘গোসল’ অনুচ্ছেদ।[16]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৮২ ‘ঈমান’ অধ্যায়‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ।[17]. আহমাদ,মিশকাত হা/১২১ ‘ঈমান’ অধ্যায় ‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’অনুচ্ছেদ।[18]. আয়াতটি হ’লঃ ﻭَﺇِﺫْ ﺃَﺧَﺬَ ﺭَﺑُّﻚَ ﻣِﻦ ﺑَﻨِﻲﺁﺩَﻡَ ﻣِﻦْ ﻇُﻬُﻮْﺭِﻫِﻢْ ﺫُﺭِّﻳَّﺘَﻬُﻢْ ﻭَﺃَﺷْﻬَﺪَﻫُﻢْ ﻋَﻠَﻰ ﺃَﻧﻔُﺴِﻬِﻢْ ﺃَﻟَﺴْﺖُﺑِﺮَﺑِّﻜُﻢْ ﻗَﺎﻟُﻮﺍْ ﺑَﻠَﻰ ﺷَﻬِﺪْﻧَﺎ ﺃَﻥ ﺗَﻘُﻮﻟُﻮﺍْ ﻳَﻮْﻡَ ﺍﻟْﻘِﻴَﺎﻣَﺔِ ﺇِﻧَّﺎ ﻛُﻨَّﺎ ﻋَﻦْﻫَﺬَﺍ ﻏَﺎﻓِﻠِﻴْﻦَ . ‘আর যখন তোমার পালনকর্তা বনুআদমের পৃষ্ঠদেশ থেকেতাদের সন্তানদেরবের করে আনলেন এবং নিজের উপর তাদেরপ্রতিজ্ঞা করালেন ‘আমি কি তোমাদের পালনকর্তানই’? তারা বলল, অবশ্যই। ‘আমরা এ বিষয়েঅঙ্গীকারকরছি’ আর এটা এজন্য, যাতে তোমরাক্বিয়ামতের দিন একথা বলতে না পারো যে, বিষয়টিআমাদের জানা ছিল না’ (আ‘রাফ ৭/১১২)।[19]. মালেক,আহমাদ, তিরমিযী, আবুদাঊদ,মিশকাত হা/৯৫ ‘ঈমান’ অধ্যায়‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ।[20]. আহমাদ,মিশকাত হা/১১৯ ‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ।[21].মুত্তাফাক্ব আলাইহ, মিশকাত হা/৯০ ‘ঈমান’ অধ্যায়,‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ।[22]. যেমনরাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ﻋﻠﻰ ﻓﻄﺮﺓ ﺍﻻﺳﻼﻡ ‘ইসলামেরউপর’ ছহীহইবনু হিববান হা/১৩২; শু‘আয়েবআরনাঊত্ব বলেন, রাবীগণ সকলে বিশ্বস্ত।[23].মুসলিম হা/২৮৬৫ ‘জান্নাতের বিবরণ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ১৬; আহমাদ হা/১৬৮৩৭।[24]. আলবানী, ছহীহতিরমিযী হা/১২২৪; মিশকাত হা/৪১৫৭ ‘আক্বীক্বা’অনুচ্ছেদ।[25]. আহমাদ, মওকূফ ছহীহ, মারফূহুকমী,মিশকাত হা/১২২ ‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’অনুচ্ছেদ।[26]. মায়েদাহ ৫/৮২; ক্বাছাছ২৮/৫২-৫৪;ঐ, তাফসীর ত্বাবারী ২০/৫৬ পৃ: ;তাফসীর ইবনু কাছীর; ত্বাবারী ৩২+৮=৪০ জন এবংইবনু কাছীর ৭০ জন বলেছেন।[27]. মুফতীমুহাম্মাদ শফী, তাফসীর মা‘আরেফুল কুরআন(বঙ্গানুবাদ সংক্ষেপায়িত : মদীনা ত্বাইয়েবা১৪১৩/১৯৯৩), পৃঃ ৩৪০।[28]. বাক্বারাহ ২/৩০; আন‘আম৬/১৬৫; ফাত্বির ৩৫/৩৯।[29]. মুসলিম, হা/১৯২০‘নেতৃত্ব’ অধ্যায়।[30]. তিরমিযী হা/৩৫২২ ‘তাফসীর’অধ্যায় সূরা রহমান; সনদ হাসান, সিলসিলা ছহীহাহহা/২১৫০।[31]. তাসফীর মা‘আরেফুল কুরআন পৃঃ ৬২৯।[32]. তাফসীর ইবনু কাছীর, মায়েদাহ ২৭-৩১ আয়াত;গৃহীত। তাফসীর ইবনু জারীর, আব্দুল্লাহ ইবনুআমর (রাঃ) হ’তে, সনদ জাইয়িদ।[33]. ইবনু কাছীর,আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (বৈরুত: দারুল কুতুবিল ইলমিয়াহ,তাবি) ১/৮৭ পৃঃ।[34]. আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/৮৭ পৃঃ।[35]. আবুদাঊদ হা/৪২৫৭, ৫৯৬২ ‘ফিতান’ অধ্যায়;তিরমিযী হা/২২০৪, ইবনু মাজাহ হা/৩৯৬১ সনদ ছহীহ।[36]. বুখারী হা/৩৩৩৫; মুসলিম, তিরমিযী, ইবনু মাজাহ;মিশকাত হা/২১১ ‘ইল্ম’ অধ্যায়।[37]. বুখারী হা/২৪৪৯;মিশকাত হা/৫১২৬‘শিষ্টাচার’ অধ্যায় ‘যুলুম’ অনুচ্ছেদ২১।[38]. মুওয়াত্ত্বা, আবুদাঊদ, তিরমিযী, নাসাঈ, মিশকাতহা/১৩৫৯; সনদছহীহ, ‘ছালাত’ অধ্যায় ‘জুম‘আ’অনুচ্ছেদ।[39]. তিরমিযী, মিশকাত হা/১১৮‘তাক্বদীরে বিশ্বাস’ অনুচ্ছেদ; সনদ ছহীহ,তিরমিযী হা/৩০৭৬ ‘তাফসীর সূরা আ‘রাফ’। একইহাদীছ মিশকাত হা/৪৬৬২ ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায় ‘সালাম’অনুচ্ছেদে এসেছে। যেখানে ‘আদম তার বয়সথেকে ৬০ বছর দান করেন’ বলা হয়েছে।তিরমিযী হাদীছটিকে ‘হাসান গরীব’ বলেছেনছাহেবে মিরক্বাত ও ছাহেবে তোহফা উভয়েবলেন যে, ‘৪০ বছর দান করার হাদীছ অগ্রগণ্য( ﺍﻷﺭﺟﺢ)। দ্রঃ তুহফাতুল আহওয়াযী হা/৫০৭২-এরব্যাখ্যা।

হযরত আইয়ুব আঃ এর জীবনী

 হযরত আইয়ূব(আলাইহিস সালাম)1.আইয়ূবেরঘটনাবলী1.শিক্ষণীয় বিষয় সমূহহযরত আইয়ূব (আঃ)ছবরকারী নবীগণেরমধ্যে শীর্ষস্থানীয় এবংঅনন্য দৃষ্টান্ত ছিলেন। ইবনু কাছীরের বর্ণনাঅনুযায়ী তিনি ইসহাক (আঃ)-এর দুই যমজ পুত্র ঈছ ওইয়াকূবের মধ্যেকার প্রথম পুত্র ঈছ-এর প্রপৌত্রছিলেন। আর তাঁর স্ত্রী ছিলেন ইয়াকূব-পুত্র ইউসুফ(আঃ)-এর পৌত্রী ‘লাইয়া’ বিনতে ইফরাঈম বিন ইউসুফ।কেউ বলেছেন, ‘রাহমাহ’। তিনি ছিলেন স্বামীভক্তি ও পতিপরায়ণতায় বিশ্বের এক অতুলনীয়দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশে তিনি ‘বিবি রহীমা’ নামে পরিচিত।তাঁর পতিভক্তি বিষয়ে উক্ত নামে জনপ্রিয় উপন্যাসসমূহ বাজারে চালু রয়েছে। অথচ এ নামটির উৎপত্তিকাহিনী নিতান্তই হাস্যকর। পবিত্র কুরআনে সূরাআম্বিয়া ৮৪ আয়াতে ﺭَﺣْﻤَﺔً ﻣِّﻦْ ﻋِﻨْﺪِﻧَﺎ (‘আমরাআইয়ূবকে…. আরও দিলাম আমার পক্ষ হ’তে দয়াপরবশে’) বাক্যাংশের ‘রাহমাতান’ বা ‘রাহ্মাহ’) ﺭَﺣْﻤَﺔً(শব্দটিকে ‘রহীমা’ করে এটিকে আইয়ূবেরস্ত্রীর নাম হিসাবে একদল লোক সমাজে চালুকরে দিয়েছে। ইহুদী-নাছারাগণ যেমন তাদেরধর্মগ্রন্থের শাব্দিক পরিবর্তন ঘটাতো, এখানেওঠিক ঐরূপ করা হয়েছে। অর্থাৎ আল্লাহ যেনবলছেন যে, আইয়ূবের স্ত্রী রহীমা তারস্বামীকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। পরে আমরাতাকে আইয়ূবেরকাছে ফিরিয়ে দিলাম’। বস্ত্ততঃ এটিএকটি উদ্ভট ব্যাখ্যা বৈ কিছু নয়। মূলতঃ আইয়ূবেরস্ত্রীরনাম কি ছিল, সে বিষয়ে সঠিক তথ্য কুরআন বাহাদীছে নেই। এ বিষয়ের ভিত্তি হ’ল ইহুদীধর্মনেতাদের রচিত কাহিনী সমূহ। যার উপরেপুরোপুরি বিশ্বাস স্থাপন করাটা নিতান্তই ভুল।তাফসীরবিদ ও ঐতিহাসিকগণ আইয়ূবের জনপদের নামবলেছেন ‘হূরান’ অঞ্চলের ‘বাছানিয়াহ’ এলাকা। যাফিলিস্তীনের দক্ষিণ সীমান্ত বরাবর দামেষ্ক ওআযরূ‘আত-এর মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত।[1]পবিত্রকুরআনে ৪টি সূরার ৮টি আয়াতে আইয়ূব (আঃ)-এর কথাএসেছে। যথা- নিসা ১৬৩, আন‘আম ৮৪, আম্বিয়া৮৩-৮৪ এবং ছোয়াদ ৪১-৪৪।আল্লাহ বলেন, ﻭَﺃَﻳُّﻮْﺏَ ﺇِﺫْﻧَﺎﺩَﻯ ﺭَﺑَّﻪُ ﺃَﻧِّﻲْ ﻣَﺴَّﻨِﻲَ ﺍﻟﻀُّﺮُّ ﻭَﺃَﻧْﺖَ ﺃَﺭْﺣَﻢُ ﺍﻟﺮَّﺍﺣِﻤِﻴْﻦَ-ﻓَﺎﺳْﺘَﺠَﺒْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﻓَﻜَﺸَﻔْﻨَﺎ ﻣَﺎﺑِﻪِ ﻣِﻦْ ﺿُﺮٍّ ﻭَّﺁﺗَﻴْﻨَﺎﻩُ ﺃَﻫْﻠَﻪُ ﻭَﻣِﺜْﻠَﻬُﻢﻣَّﻌَﻬُﻢْ ﺭَﺣْﻤَﺔً ﻣِّﻦْ ﻋِﻨْﺪِﻧَﺎ ﻭَﺫِﻛْﺮَﻯ ﻟِﻠْﻌَﺎﺑِﺪِﻳْﻦَ -‘আর স্মরণ করআইয়ূবের কথা, যখন তিনি তার পালনকর্তাকে আহবানকরেবলেছিলেন, আমি কষ্টে পতিত হয়েছি এবংআপনি সর্বোচ্চ দয়াশীল’। ‘অতঃপর আমরা তারআহবানে সাড়া দিলাম এবং তার দুঃখ-কষ্ট দূর করেদিলাম।তার পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সাথেতাদের সমপরিমাণ আরও দিলাম আমাদের পক্ষ হ’তেদয়া পরবশে। আর এটা হ’ল ইবাদতকারীদের জন্যউপদেশ স্বরূপ’(আম্বিয়া ২১/৮৩-৮৪)।অন্যত্র আল্লাহবলেন, ﻭَﺍﺫْﻛُﺮْ ﻋَﺒْﺪَﻧَﺎ ﺃَﻳُّﻮْﺏَ ﺇِﺫْ ﻧَﺎﺩَﻯ ﺭَﺑَّﻪُ ﺃَﻧِّﻲْ ﻣَﺴَّﻨِﻲَﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ ﺑِﻨُﺼْﺐٍ ﻭَﻋَﺬَﺍﺏٍ، ﺍﺭْﻛُﺾْ ﺑِﺮِﺟْﻠِﻚَ ﻫَﺬَﺍ ﻣُﻐْﺘَﺴَﻞٌﺑَﺎﺭِﺩٌ ﻭَﺷَﺮَﺍﺏٌ، ﻭَﻭَﻫَﺒْﻨَﺎ ﻟَﻪُ ﺃَﻫْﻠَﻪُ ﻭَﻣِﺜْﻠَﻬُﻢ ﻣَّﻌَﻬُﻢْ ﺭَﺣْﻤَﺔً ﻣِّﻨَّﺎﻭَﺫِﻛْﺮَﻯ ﻟِﺄُﻭْﻟِﻲ ﺍﻟْﺄَﻟْﺒَﺎﺏِ، ﻭَﺧُﺬْ ﺑِﻴَﺪِﻙَ ﺿِﻐْﺜﺎً ﻓَﺎﺿْﺮِﺏ ﺑِّﻪِ ﻭَﻻَﺗَﺤْﻨَﺚْ ﺇِﻧَّﺎ ﻭَﺟَﺪْﻧَﺎﻩُ ﺻَﺎﺑِﺮﺍً ﻧِﻌْﻢَ ﺍﻟْﻌَﺒْﺪُ ﺇِﻧَّﻪُ ﺃَﻭَّﺍﺏٌ – ‏) ﺹ৪১-৪৪(-‘আর তুমি বর্ণনা কর আমাদের বান্দাআইয়ূবের কথা। যখন সে তার পালনকর্তাকে আহবানকরে বলল, শয়তান আমাকে (রোগের) কষ্ট এবং(সম্পদ ও সন্তান হারানোর) যন্ত্রণাপৌঁছিয়েছে’(ছোয়াদ ৩৮/৪১)। ‘(আমরা তাকেবললাম,) তুমি তোমার পা দিয়ে (ভূমিতে) আঘাত কর।(ফলে পানি নির্গত হ’ল এবং দেখা গেল যে,) এটিগোসলের জন্য ঠান্ডা পানি ও (পানের জন্য উত্তম)পানীয়’(৪২)। ‘আর আমরা তাকে দিয়ে দিলাম তারপরিবারবর্গ এবং তাদের সাথে তাদের সমপরিমাণআমাদের পক্ষ হ’তে রহমত স্বরূপ এবংজ্ঞানীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ’(৪৩)। ‘(আমরাতাকে বললাম,) তুমি তোমার হাতে একমুঠো তৃণশলানাও। অতঃপর তা দিয়ে (স্ত্রীকে) আঘাত কর এবংশপথ ভঙ্গ করো না (বরং শপথ পূর্ণ কর)। এভাবেআমরা তাকে পেলাম ধৈর্যশীলরূপে। কতই নাচমৎকার বানদা সে। নিশ্চয়ই সে ছিল (আমার দিকে)অধিক প্রত্যাবর্তনশীল’(ছোয়াদ ৩৮/৪১-৪৪)।অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْﻦَ ‘আরএভাবেই আমরা সৎকর্মশীলদের পুরস্কৃত করেথাকি’(আন‘আম ৬/৮৪)।অতঃপর আবু হুরায়রা (রাঃ) কর্তৃকবর্ণিত হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, আইয়ূবএকদিন নগ্নাবস্থায় গোসল করছিলেন (অর্থাৎ বাথরুমছাড়াই খোলা স্থানে)। এমন সময় তাঁর উপরেসোনার টিড্ডি পাখি সমূহ এসে পড়ে। তখন আইয়ূবসেগুলিকে ধরে কাপড়ে ভরতে থাকেন।এমতাবস্থায় আল্লাহ তাকে ডেকে বলেন, হেআইয়ূব! ﺃَﻟَﻢْ ﺍَﻛُﻦْ ﺃُﻏْﻨِﻴَﻨَّﻚَ ﻋَﻤَّﺎ ﺗَﺮَﻯ؟ আমি কিতোমাকেএসব থেকে মুখাপেক্ষীহীন করিনি? আইয়ূববললেন, ﺑَﻠَﻰ ﻭَﻋِﺰَّﺗِﻚَ ﻭﻟﻜﻦ ﻻﻏِﻨَﻰ ﺑِﻰ ﻋَﻦْﺑَﺮَﻛَﺘِﻚَ তোমার ইযযতের কসম! অবশ্যই তুমি আমাকেতা দিয়েছ। কিন্তু তোমার বরকত থেকে আমিমুখাপেক্ষীহীন নই’।[2]আইয়ূবের ঘটনাবলী:আইয়ূব (আঃ) সম্পর্কে কুরআনে ও হাদীছেউপরোক্ত বক্তব্যগুলির বাইরে আর কোনবক্তব্য বা ইঙ্গিত নেই। কুরআন থেকে মূল যেবিষয়টি প্রতিভাত হয়, তা এই যে, আল্লাহ আইয়ূবকেকঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। সে পরীক্ষায়আইয়ূব উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। যার পুরস্কার স্বরূপআল্লাহ তাকে হারানো নে‘মত সমূহের দ্বিগুণফেরৎ দিয়েছিলেন। আল্লাহ এখানে ইবরাহীম,মূসা, দাঊদ, সুলায়মান, আইয়ূব, ইউনুস প্রমুখনবীগণের কষ্ট ভোগের কাহিনী শুনিয়েশেষনবীকে সান্ত্বনা দিয়েছেন এবং সেই সাথেউম্মতে মুহাম্মাদীকে যেকোন বিপাদপদেদ্বীনের উপর দৃঢ় থাকার উপদেশ দিয়েছেন।বিপদে ধৈর্য ধারণ করায় এবং আল্লাহর পরীক্ষাকেহাসিমুখে বরণ করে নেওয়ায় আল্লাহ আইয়ূবকে‘ছবরকারী’ হিসাবে ও ‘সুন্দর বান্দা’ হিসাবে প্রশংসাকরেছেন(ছোয়াদ ৪৪)। প্রত্যেক নবীকেইকঠিন পরীক্ষাসমূহ দিতে হয়েছে। তারা সকলেইসে সব পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করেছেন ওউত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু আইয়ূবেরআলোচনায় বিশেষ ভাবে ﺇِﻧَّﺎ ﻭَﺟَﺪْﻧَﺎﻩُ ﺻَﺎﺑِﺮﺍً ‘আমরাতাকে ধৈর্যশীল হিসাবেপেলাম’(ছোয়াদ ৪৪)বলারমধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আল্লাহ তাঁকেকঠিনতম কোন পরীক্ষায় ফেলেছিলেন। তবেসে পরীক্ষা এমন হ’তে পারে না, যা নবীরমর্যাদার খেলাফ ও স্বাভাবিক ভদ্রতার বিপরীত এবং যাফাসেকদের হাসি-ঠাট্টার খোরাক হয়। যেমন তাকেকঠিন রোগে ফেলে দেহে পোকা ধরানো,দেহের সব মাংস খসে পড়া, পচে-গলে দুর্গন্ধময়হয়ে যাওয়ায় ঘর থেকে বের করে জঙ্গলেফেলে আসা, ১৮ বা ৩০ বছর ধরে রোগ ভোগকরা, আত্মীয়-স্বজন সবাই তাকে ঘৃণাভরে ছেড়েচলে যাওয়া ইত্যাদিসবই নবীবিদ্বেষী ও নবীহত্যাকারী ইহুদী গল্পকারদের বানোয়াট মিথ্যাচার বৈকিছুই নয়।ইহুদী নেতাদের কুকীর্তির বিরুদ্ধেযখনই নবীগণ কথা বলেছেন, তখনই তারা তাদেরবিরুদ্ধে খÿহস্ত হয়েছে এবং যা খুশী তাই লিখেকেতাব ভরেছে। ধর্ম ও সমাজ নেতারা তাদেরঅনুসারীদের বুঝাতে চেয়েছে যে, নবীরাসব পথভ্রষ্ট। সেজন্য তাদের উপর আল্লাহর গযবএসেছে। তোমরা যদি তাদের অনুসারী হও,তাহ’লে তোমরাও অনুরূপ গযবে পড়বে। এব্যাপারে মুসলিম মুফাসসিরগণও ধোঁকায় পড়েছেনএবং ঐসব ভিত্তিহীন কাল্পনিক গল্প ছাহাবী ওতাবেঈগণের নামে নিজেদের তাফসীরেরকেতাবে জমা করেছেন। এ ব্যাপারে ছাহাবীইবনুআববাস ও তাবেঈ ইবনু শিহাব যুহরীর নামেইবেশী বর্ণনা করা হয়েছে। যে সবের কোনছহীহ ভিত্তি নেই।এক্ষণে আমরা আইয়ূব (আঃ)-এরবিষয়ে কুরআনী বক্তব্যগুলির ব্যাখ্যায়মনোনিবেশকরব। (১) সূরা আম্বিয়া ও সূরা ছোয়াদের দু’স্থানেইআইয়ূবের আলোচনার শুরুতে আল্লাহর নিকটেআইয়ূবের আহবানের) ﺇِﺫْ ﻧَﺎﺩَﻯ (কথা আনা হয়েছে।তাতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আইয়ূব নিঃসন্দেহেকঠিন বিপদে পড়েছিলেন। যেজন্য তিনিআকুতিভরে আল্লাহকে ডেকেছিলেন। আরবিপদে পড়ে আল্লাহকে ডাকা ও তার নিকটে বিপদমুক্তির জন্য প্রার্থনা করা নবুঅতের শানের খেলাফনয়। বরং এটাই যেকোন অনুগত বান্দার কর্তব্য। তিনিবিপদে ধৈর্য হারিয়ে এটা করেননি, বরং বিপদ দূর করেদেবার জন্য আল্লাহর নিকটে প্রার্থনাকরেছিলেন। তবে সেই বিপদ কি ধরনের ছিল,সে বিষয়ে কিছুই উল্লেখিত হয়নি। অতএব আল্লাহএ বিষয়ে সর্বাধিক অবগত।(২) কষ্টে পড়ারবিষয়টিকে তিনি শয়তানের দিকে সম্বন্ধ করেছেন( ﻣَﺴَّﻨِﻲَ ﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻧُﺒِﻨُﺼْﺐٍ (( ছোয়াদ ৪১), আল্লাহর দিকেনয়। এটা তিনি করেছেন আল্লাহর প্রতি শিষ্টাচারেরদিকে লক্ষ্য রেখে। কেননা শয়তান নবীদেরউপর কোন ক্ষমতা রাখে না। এমনকি কোননেককার বান্দাকেও শয়তান পথভ্রষ্ট করতে পারেনা। তবে সে ধোঁকা দিতে পারে, বিপদেফেলতে পারে, যা আল্লাহর হুকুম ব্যতীতকার্যকর হয় না। যেমন মূসা (আঃ)-এরসাথী যুবকথলে থেকে মাছ বেরিয়ে যাবার কথা মূসাকেবলতে ভুলে গিয়েছিল। সে কথাটি মূসাকে বলারসময় তিনি বলেছিলেন, ﻭَﻣَﺎ ﺃَﻧْﺴَﺎﻧِﻴْﻪُ ﺇِﻻَّﺍﻟﺸَّﻴْﻄَﺎﻥُ‘আমাকে ওটা শয়তান ভুলিয়ে দিয়েছিল’(কাহফ৬৩)। আসলে শয়তানের ধোঁকা আল্লাহ কার্যকরহ’তে দিয়ে ছিলেন বিশেষ উদ্দেশ্যে, যা মূসা ওখিযিরের কাহিনীতে বর্ণিত হয়েছে। এখানেওতেমনি শয়তানের ধোঁকার কারণে আইয়ূব তাকেইদায়ী করেছেন। কিন্তু ঐ ধোঁকা কার্যকর করা এবংতা থেকে মুক্তি দানের ক্ষমতা যেহেতু আল্লাহরহাতে, সেকারণ তিনি আল্লাহর নিকটেই প্রার্থনাকরেছেন।এক্ষণে শয়তান তাকে কী ধরনেরবিপদে ফেলেছিল, কেমন রোগে তিনি আক্রান্তহয়েছিলেন, দেহের সর্বত্র কেমন পোকাধরেছিল, জিহবা ও কলিজা ব্যতীত দেহের সব মাংসতার খসে পড়েছিল, পচা দুর্গন্ধে সবাই তাকেনির্জন স্থানে ফেলে পালিয়েছিল, ইত্যাকার ১৭রকমের কাল্পনিক কাহিনী যা কুরতুবী স্বীয়তাফসীরে জমা করেছেন(কুরতুবী, আম্বিয়া৮৪)এবং অন্যান্য মুফাসসিরগণ আরও যেসব কাহিনীবর্ণনা করেছেন, সে সবের কোন ভিত্তি নেই।বরং স্রেফ ইস্রাঈলীউপকথা মাত্র।(৩) আল্লাহবলেন, ‘আমরা তার দো‘আ কবুল করেছিলাম এবং তারদুঃখ-কষ্ট দূর করে দিয়েছিলাম’(আম্বিয়া ৮৪)।কীভাবে দূর করা হয়েছিল, সে বিষয়ে আল্লাহবলেন যে, তিনি তাকে ভূমিতে পদাঘাত করতেবলেন। অতঃপর সেখান থেকে স্বচ্ছ পানির ঝর্ণাধারা বেরিয়েআসে। যাতে গোসল করায় তারদেহের উপরের কষ্ট দূর হয় এবং উক্ত পানিপানকরায় তার ভিতরের কষ্ট দূর হয়ে যায়(ছোয়াদ ৪২)।এটি অলৌকিক মনে হলেও বিষ্ময়কর নয়। ইতিপূর্বেশিশু ইসমাঈলের ক্ষেত্রে এটা ঘটেছে।পরবর্তীকালে হোদায়বিয়ার সফরে রাসূলেরহাতের বরকতে সেখানকার শুষ্ক পুকুরে পানিরফোয়ারা ছুটেছিল, যা তাঁর সাথী ১৪০০ ছাহাবীর পানিরকষ্ট নিবারণে যথেষ্ট হয়। বস্ত্ততঃ এগুলিনবীগণের মু‘জেযা। নবী আইয়ূবের জন্য তাইএটা হতেই পারে আল্লাহর হুকুমে।এক্ষণে কতদিনতিনি রোগভোগ করেন সে বিষয়ে ৩ বছর, ৭বছর, সাড়ে ৭ বছর, ৭ বছর ৭ মাস ৭ দিন ৭ রাত, ১৮বছর, ৩০ বছর, ৪০ বছর ইত্যাদি যা কিছু বর্ণিতহয়েছে[3], সবই ইস্রাঈলী উপকথা মাত্র। যারকোন ভিত্তি নেই। বরং নবীগণের প্রতি ইহুদীনেতাদের বিদ্বেষ থেকে কল্পিত।(৪) আল্লাহবলেন, ‘আমরা তার পরিবারবর্গকে ফিরিয়ে দিলাম এবংতাদের সাথে সমপরিমাণ আরও দিলাম আমাদেরপক্ষহ’তে দয়া পরবশে(আম্বিয়া ৮৪; ছোয়াদ ৪৩)।এখানে পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি তারবিপদেধৈর্য ধারণের পুরস্কার দ্বিগুণভাবেপেয়েছিলেন দুনিয়াতে এবং আখেরাতে। বিপদেপড়ে যা কিছু তিনি হারিয়েছিলেন, সবকিছুই তিনিবিপুলভাবে ফেরত পেয়েছিলেন। অন্যত্র আল্লাহবলেছেন, ﻭَﻛَﺬَﻟِﻚَ ﻧَﺠْﺰِﻱ ﺍﻟْﻤُﺤْﺴِﻨِﻴْﻦَ ‘এভাবেই আমরাআমাদের সৎকর্মশীল বান্দাদের পুরস্কৃত করেথাকি’(আন‘আম ৮৪)। এক্ষণে তাঁর মৃত সন্তানাদিপুনর্জীবিত হয়েছিল, না-কি হারানো গবাদি পশু সবফেরৎ এসেছিল, এসব কষ্ট কল্পনার কোনপ্রয়োজন নেই। এতটুকুই বিশ্বাস রাখা যথেষ্ট যে,তিনি তাঁর ধৈর্যধারণের পুরস্কার ইহকালে ও পরকালেবহুগুণ বেশী পরিমাণে পেয়েছিলেন। যুগেযুগে সকল ধৈর্যশীল ঈমানদার নর-নারীকে আল্লাহএভাবে পুরস্কৃত করে থাকেন। তাঁর রহমতের দরিয়াকখনো খালি হয় না।(৫) উপরোক্ত পুরস্কার দানেরপর আল্লাহ বলেন, ﺭَﺣْﻤَﺔً ﻣِّﻦْ ﻋِﻨْﺪِﻧَﺎ ‘আমাদের পক্ষহতে দয়া পরবশে’(আম্বিয়া ৮৪)। এর দ্বারা বুঝিয়েদেওয়া হয়েছেযে, আল্লাহ কারু প্রতি অনুগ্রহকরতে বাধ্য নয়। তিনি যা খুশী তাইকরেন, যাকেখুশী যথেচ্ছ দান করেন। তিনি সবকিছুতে একককর্তৃত্বশীল। কেউ কেউ অত্র আয়াতে বর্ণিত‘রাহমাতান’) ﺭَﺣْﻤَﺔً (থেকে আইয়ূব (আঃ)-এর স্ত্রীরনাম ‘রহীমা’ কল্পনা করেছেন। যা নিতান্তই মূর্খতাছাড়া কিছুই নয়’।[4](৬) ছহীহ বুখারীতে আইয়ূবেরউপর এক ঝাঁক সোনার টিড্ডি পাখি এসে পড়ার যেকথা বর্ণিত হয়েছে, সেটা হ’ল আউয়ূবের সুস্থতালাভের পরের ঘটনা। এর দ্বারা আল্লাহ বিপদমুক্তআইয়ূবের উচ্ছ্বল আনন্দ পরখ করতেচেয়েছেন। আল্লাহর অনুগ্রহ পেয়ে বান্দাকতখুশী হ’তে পারে, তা দেখে যেন আল্লাহনিজেই খুশী হন। এজন্য আইয়ূবকে খোঁচা দিয়েকথা বললে অনুগ্রহ বিগলিত আইয়ূব বলে ওঠেন,‘আল্লাহর বরকত থেকে আমি মুখাপেক্ষীহীননই’। অর্থাৎ বান্দা সর্বদা সর্বাবস্থায় আল্লাহর রহমত ওবরকতের মুখাপেক্ষী। নিঃসন্দেহে উক্ত ঘটনাটিওএকটি মু‘জেযা। কেননা কোন প্রাণীই স্বর্ণনির্মিত হয় না।(৭) আল্লাহ আইয়ূবকে বলেন, ﻭَﺧُﺬْﺑِﻴَﺪِﻛَﻀِﻐْﺜﺎً ﻓَﺎﺿْﺮِﺏْ ﺑِّﻪِ ﻭَﻻَ ﺗَﺤْﻨَﺚْ ‘আর তুমি তোমারহাতে এক মুঠো তৃণশলা নাও। অতঃপর তা দিয়ে(স্ত্রীকে) আঘাত কর এবং তোমার শপথ ভঙ্গকরো না’(ছোয়াদ ৪৪)। অত্র আয়াতে আরেকটিঘটনার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে যে, রোগ অবস্থায়আইয়ূব শপথ করেছিলেনযে, সুস্থ হ’লে তিনিস্ত্রীকে একশ’ বেত্রাঘাত করবেন। রোগতাড়িত স্বামী কোন কারণে স্ত্রীরউপরক্রোধবশে এরূপ শপথ করেও থাকতে পারেন।কিন্তু কেন তিনি এ শপথ করলেন, তার স্পষ্ট কোনকারণ কুরআন বা হাদীছে বলা হয়নি। ফলেতাফসীরের কেতাব সমূহে নানা কল্পনার ফানুসউড়ানো হয়েছে, যা আইয়ূব নবীর পুণ্যশীলাস্ত্রীর উচ্চ মর্যাদার একেবারেই বিপরীত। নবীআইয়ূবের স্ত্রী ছিলেন আল্লাহর প্রিয়বান্দীদের অন্যতম। তাকে কোনরূপ কষ্টদানআল্লাহ পসন্দ করেননি। অন্য দিকেশপথ ভঙ্গকরাটাও ছিল নবীর মর্যাদার খেলাফ। তাই আল্লাহএকটি সুন্দর পথ বাৎলে দিলেন, যাতে উভয়েরসম্মান বজায় থাকে এবং যা যুগে যুগে সকলনেককার নর-নারীর জন্য অনুসরণীয় হয়। তা এইযে, স্ত্রীকে শিষ্টাচারের নিরিখে প্রহার করাযাবে। কিন্তুতা কোন অবস্থায় শিষ্টাচারের সীমালংঘন করবে না। আর সেকারণেই এখানেবেত্রাঘাতের বদলে তৃণশলা নিতে বলা হয়েছে,যার আঘাত মোটেই কষ্টদায়ক নয়’(কুরতুবী,ছোয়াদ ৪৪)।(৮) আইয়ূবের ঘটনা বর্ণনার পর সূরাআম্বিয়া ও সূরা ছোয়াদে আল্লাহ কাছাকাছি একইরূপবক্তব্য রেখেছেন যে, এটা হ’ল ﻭَﺫِﻛْﺮَﻯﻟِﻠْﻌَﺎﺑِﺪِﻳْﻦَ‘ইবাদতকারীদের জন্য উপদেশস্বরূপ’(আম্বিয়া ৮৪)এবং ﻭَﺫِﻛْﺮَﻯ ﻟِﺄُﻭْﻟِﻲﺍﻟْﺄَﻟْﺒَﺎﺏِ ‘জ্ঞানীদের জন্য উপদেশ স্বরূপ’(ছোয়াদ৪৪)। এতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, আল্লাহরদাসত্বকারী ব্যক্তিই প্রকৃত জ্ঞানী এবং প্রকৃতজ্ঞানী তিনিইযিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রেআল্লাহর দাসত্বকারী। অবিশ্বাসীকাফের-নাস্তিক এবংআল্লাহর অবাধ্যতাকারী ফাসেক-মুনাফিক কখনোইজ্ঞানী ও বুদ্ধিমান নয়। যদিও তারা সর্বদা জ্ঞানেরবড়াই করে থাকে।ক্বাযী আবুবকর ইবনুল ‘আরাবীবলেন, আইয়ূব সম্পর্কে অত্র দু’টিআয়াতে(আম্বিয়া৮৩ ও ছোয়াদ ৪১)আল্লাহ আমাদেরকে যা খবরদিয়েছেন, তার বাইরে কিছুই বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিতনয়। অনুরূপভাবে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) হ’তে (উপরেবর্ণিত) হাদীছটি ব্যতীত একটি হরফও বিশুদ্ধভাবেজানা যায়নি। তাহ’লে কে আমাদেরকে আইয়ূবসম্পর্কে খবর দিবে? অন্য আর কার যবানে আমরাএগুলো শ্রবণ করব? আর বিদ্বানগণের নিকটেইস্রাঈলী উপকথা সমূহ একেবারেই পরিত্যক্ত।অতএব তাদের লেখা পাঠকরা থেকে তোমারচোখ বন্ধ রাখো। তাদের কথা শোনা থেকেতোমার কানকে বধির করো’(কুরতুবী, ছোয়াদ৪১-৪২)।আইয়ূব (আঃ) ৭০ বছর বয়সে পরীক্ষায়পতিত হন। পরীক্ষা থেকে মুক্ত হবার অনেকপরে ৯৩ বছর বা তার কিছু বেশী বয়সে তিনিমৃত্যুবরণ করেন।তাবেঈ বিদ্বান মুজাহিদ হ’তে বর্ণিতহয়েছে যে, ক্বিয়ামতের দিন ধনীদের সম্মুখেপ্রমাণ স্বরূপ পেশ করা হবে হযরত সুলায়মান (আঃ)-কে (২) ক্রীতদাসদেরসামনে পেশ করা হবেহযরত ইউসুফ (আঃ)-কে এবং (৩) বিপদগ্রস্তদেরসামনে পেশ করা হবে হযরত আইয়ূব (আঃ)-কে।[5]শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ :(১) বড় পরীক্ষায় বড়পুরস্কার লাভ হয়। ধন-সম্পদ ও পুত্র-কন্যা হারিয়েঅবশেষে রোগ জর্জরিত দেহেপতিত হয়েওআইয়ূব (আঃ) আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হননি এবংআল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হননি। এরূপ কঠিনপরীক্ষা বিশ্ব ইতিহাসে আর কারো হয়েছেবলে জানা যায় না। শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) তাইবলেন, ﺇﻥَّ ﻋِﻈَﻢِ ﺍﻟﺠﺰﺍﺀِ ﻣﻊ ﻋﻈَﻢِ ﺍﻟﺒﻼﺀ …‘নিশ্চয়ই বড়পরীক্ষায় বড় পুরস্কার লাভ হয়ে থাকে’।[6]আরদুনিয়াতে দ্বীনদারীর কঠোরতা ও শিথিলতারতারতম্যের অনুপাতে পরীক্ষায় কমবেশী হয়েথাকে। আর সেকারণে নবীগণ হ’লেনসবচেয়ে বেশী বিপদগ্রস্ত।[7](২) প্রকৃতমুমিনগণ আনন্দে ও বিষাদে সর্বাবস্থায় আল্লাহররহমতের আকাংখী থাকেন। বরং বিপদেপড়লে তারাআরও বেশী আল্লাহর নিকটবর্তী হন। কোনঅবস্থাতেই নিরাশ হন না।(৩) প্রকৃত স্ত্রী তিনিই, যিনিসর্বাবস্থায় নেককার স্বামীর সেবায় নিজেকেবিলিয়ে দেন। আইয়ূবের স্ত্রী ছিলেন বিশ্বেরপুণ্যবতী মহিলাদের শীর্ষস্থানীয় দৃষ্টান্ত।(৪)প্রকৃত ছবরকারীর জন্যই দুনিয়া ও আখেরাতেরসফলতা। আইয়ূবদম্পতি ছিলেন তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।(৫) শয়তান প্রতি মুহূর্তে নেককারমানুষের দুশমন।শিরকী চিন্তাধরার জাল বিস্তার করে সে সর্বদামুমিনকে আল্লাহর পথ হ’তে সরিয়ে নিতে চায়।একমাত্র আল্লাহনির্ভরতা এবং দৃঢ় তাওহীদ বিশ্বাসইমুমিনকে শয়তানের প্রতারণা হ’তে রক্ষা করতেপারে।[1]. ইবনু কাছীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ১/২০৬-১০পৃঃ; কুরতুবী, ছোয়াদ ৪১।[2]. বুখারী, মিশকাতহা/৫৭০৭ ‘ক্বিয়ামতের অবস্থা’ অধ্যায় ‘সৃষ্টির সূচনা ওনবীগণের আলোচনা’ অনুচ্ছেদ।[3]. কুরতুবী,আম্বিয়া ৮৪; ছোয়াদ ৪২; ইবনু কাছীর, আম্বিয়া৮৩-৮৪।[4]. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ১/২০৯ পৃঃ।[5].আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ ১/২০৭, ২১০ পৃঃ।[6]. তিরমিযী,ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/১৫৬৬ সনদ হাসান, ‘জানায়েয’অধ্যায় ‘রোগীর সেবা ও রোগের ছওয়াব’অনুচ্ছেদ।[7]. তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, দারেমী,মিশকাত হা/১৫৬২, সনদ হাসান, ‘জানায়েয’অধ্যায়‘রোগীর সেবা ও রোগের ছওয়াব’ অনুচ্ছেদ।

রাসুলুল্লাহ সঃ এর জীবনী পার্ট -দুই

 হযরত মুহাম্মদ স :নবী জীবনীমুর্তি পূজাই ছিল আরব দেশে প্রচলিত ধর্ম। সত্যধর্মের পরিপন্থী এ ধরনের মূর্তিপূজাবাদঅবলম্বন করার কারণে তাদরে এ যুগকেআইয়্যামে জাহেলিয়াত তথা মুর্খতার যুগ বলা হয়। লাত,উযযা, মানাত ও হুবল ছিল তাদের প্রসিদ্ধউপাস্যগুলোর অন্যতম। আরবের কিছু লোকইয়াহূদী বা খৃষ্টান ধর্ম বা অগ্নি পুজকদের ধর্মগ্রহণ করেছিল। আবার স্বল্প সংখ্যক লোক ছিল যারাইবরাহিম আলাইহিস সালাম এর প্রদর্শিত পথে ছিলঅবিচল, আঁকড়ে ধরেছিল তাঁর আদর্শ। অর্থনৈতিক দিকদিয়ে বেদুঈনরা সম্পূর্ণভাবে পশু সম্পদের উপরনির্ভর করত। আর নগরবাসীদের নিকট অর্থনৈতিকজীবনেরও ভিত্তি ছিল কৃষি কাজ ও ব্যবসা-বাণিজ্য।ইসলাম আবির্ভাবের পূর্বে আরব দেশে মক্কাইছিল বৃহত্তর বাণিজ্য নগরী। অন্যান্য বিভিন্নঅঞ্চলে উন্নয়ন ও নাগরিক সভ্যতা ছিল। সামাজিক দিকদিয়ে যুলুম সবর্ত্র বিরাজমান ছিল, সেখানেদুর্বলের ছিলনা কোন অধিকার। কন্যা সন্তানকেজীবদ্দশায় দাফন করা হতো। মান-ইজ্জত ওসম্মানকে করা হতো পদদলিত। সবল দুর্বলেরঅধিকার হরণ করতো। বহুবিবাহ প্রথার কোন সীমাছিল না। ব্যভিচার অবাধে চলতো। নগন্য ও তুচ্চকারণে যুদ্ধের অগ্নিশিখা জ্বলে উঠতো।সংক্ষেপে বলতে গেলে-ইসলামেরআবির্ভাবের পূর্বে আরব দ্বীপের সার্বিকপরিস্থিতি এ ধরনের ভয়াবহই ছিল।ইবনুয্যাবিহাঈনরাসূলের দাদা আব্দুল মুত্তালিবের সাথে কুরাইশরাছেলে-সন্তান ও সম্পদের গৌরব ও অহংকারপ্রদর্শন করতো। তাই তিনি মানত করলেন যে,আল্লাহ যদি তাকে দশ জন ছেলে দান করেনতাহলে তিনি এক জনকে কথিত ইলাহের নৈকট্যপ্রাপ্তির লক্ষ্যে যবেহ করবেন। তাঁর সাধ বাস্তবরূপ পেল। দশ জন ছেলে জুটলো তাঁর ভাগ্যে।তাদের একজন ছিলেন নবীর পিতা আব্দুল্লাহ।আব্দুল মুত্তালিব মানব পুরোন করতে চাইলেলোকজন তাকে বাধা দেয়, যাতে এটা মানুষেরমধ্যে প্রথা না হয়ে যায়। অতঃপর সবাই আব্দুল্লাহ এবংদশটি উটের মধ্যে লটারীর তীর নিক্ষেপকরতে সম্মত হয়। যদি লটারীতে আব্দুল্লাহ নামআসে তাহলে প্রতিবার ১০টি করে উট সংখ্যায় বৃদ্ধিকরা হবে। লটারী বারংবার আব্দুল্লাহর নামে আসতেথাকে। দশমবারে লটারী উটের নামে আসে যখনতার সংখ্যা ১০০ তে দাড়ায়। ফলে তাঁরা উট যবেহ করলএবং রক্ষা পেল আব্দুল্লাহ। আব্দুল্লাহ তাঁর পিতাআব্দুল মুত্তালিবের সব চাইতে প্রিয় ছেলে ছিল।আব্দুল্লাহ তরুণ্যের সীমায় পা রাখলে তাঁর পিতাবনী যোহরা গোত্রের আমেনা বিনতে ওয়াহাবনামক এক তরুণীর সাথে তাঁর বিয়ের ব্যবস্থা করে।বিয়ের পর আমেনা অন্তঃসত্বা হবার তিন মাস পরআব্দুল্লাহ এক বানিজ্যিক কাফেলার সাথে সিরিয়ারউদ্দেশ্যে রাওয়ানা হয়। কিন্তু প্রত্যাবর্তনেরপথে রোগাক্রান্ত হয়ে মদিনায় বনী নাজ্জারগোত্রে তাঁর মামাদের কাছে অবস্থান করে এবংসেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়সেখানে। এদিকে গর্ভের মাসগুলো পুরোহয়ে প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসলো। আমেনাঅবশেষে সন্তান প্রসব করলো। আর এ ঐতিহাসিকঘটনা সংঘটিত হয় ৫৭১ ইং এর ১২ই রবিউল আওয়ালসোমবার ভোরবেলায়। উল্লেখ্য যে সেবছরেই হস্তী বাহিনীর ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল।হস্তী বাহিনীর ঘটনাহস্তী বাহিনীর সংক্ষিপ্ত ঘটনা হলো:আবরাহা ছিল ইথিওপিয়ার শাসক কর্তৃক নিযুক্ত ইয়ামানেরগভর্নর। সে আরবদেরকে কাবা শরিফে হজ্জকরতে দেখে সানআতে (বর্তমানে ইয়ামানেররাজধানী) এক বিরাট গির্জা নির্মাণ করলো যেনআরবরা এ নব নির্মিত গির্জায় হজ্জ করে। কেননাগোত্রের এক লোক (আরবের একটা গোত্র)তা শুনার পর রাতে প্রবেশ করে, গির্জারদেয়ালগুলোকে পায়খানা ও মলদ্বারা পঙ্কিল করেদেয়। আবরাহা এ কথা শুনার পর রাগে ক্ষেপেউঠলো। ৬০ হাজারের এক বিরাট সেনা বাহিনী নিয়েকাবা শরিফ ধ্বংস করার জন্য রওয়ানা হলো। নিজেরজন্য সে সব চেয়ে বড় হাতিটা পছন্দ করলো।সেনাবাহিনীর মধ্যে নয়টি হাতি ছিল। মক্কারনিকটবর্তী হওয়া পর্যন্ত তাঁরা যাত্রা অব্যাহতরাখলো। তাঁর পর সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করেমক্কা প্রবেশ করায় উদ্ধত হলো কিন্তু হাতি বসেগেল কোনক্রমেই কাবার দিকে অগ্রসর করানোগেলনা। যখন তারা হাতীকে কাবার বিপরীত দিকেঅগ্রসর করাতো দ্রুত সে দিকে অগ্রসর হতোকিন্তু কাবার দিকে অগ্রসর করাতে চাইলে বসেপড়তো। এমতাবস্থায় আল্লাহ তাদের প্রতি প্রেরণকরেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি যা তাদের উপর পাথরেরটুকরা নিক্ষেপকরা শুরু করে দিয়েছিল। অতঃপরতাদরেকে ভক্ষিত ভৃণ সদৃশ করে দেয়া হয়।প্রত্যেক পাখি তিনটি করে পাথর বহন করছিল। ১টিপাথর ঠোঁটে আর দুটি পায়ে। পাথর দেহেপড়ামাত্র দেহের সব অঙ্গ-প্রতঙ্গ টুকরোটুকরো হয়ে যেতো। যারা পলায়ন করে তাঁরাওপথে মৃত্যুর ছোবল থেকে রক্ষা পায়নি।আবরাহা এমনি একটি রোগে আক্রান্ত হয় যার ফলেতাঁর সব আঙ্গুল পড়ে যায় এবং সে সানআয় পাখির ছানারমত পৌছলো এবং সেখানে মৃত্যু হলো। কুরাইশরাগিরিপথে বিক্ষিপ্ত হয়ে গিয়েছিল এবং সেনাবাহিনীরভয়ে পর্বতে আশ্রয় নিয়েছিল। আবরাহারসেনাবাহিনীর এ অশুভ পরিণামের পর তাঁরা নিরাপদেঘরে ফিরে আসে। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জন্মের ৫০ দিন পূর্বে এঘটনা সংঘটিত হয়।দুগ্ধ পানআরবদের প্রথা ছিল যে তাঁরা তাদের শিশুদেরকেবেদুঈন অধ্যুষিত মরু অঞ্চলে লালন-পালন করারউদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দিত। সেখানে তাদের দৈহিকসুস্থতার অনুকুল পরিবেশ ছিল। রাসূলের পবিত্র জন্মলাভের পর বনী সা‘দ গোত্রের কিছু বেদুঈনলোক মক্কায় আসে। তাদের মহিলারা মক্কার ঘরেঘরে শিশুর অনুসন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তুরাসূলের পিতৃহীনতা ও দারিদ্রের কারণে কেউতাকে নেয়নি। হালিমা সা‘দিয়াও ছিল তাদের মধ্যেএকজন। সবার মত সেও ছিল বিমুখ। শিশু পালনেরপারিশ্রমিক দিয়ে জীবনের অভাব অনটন বিমোচনকরার লক্ষ্যে মক্কার অধিকাংশ ঘরে শিশুর অনুসন্ধানকরেও সফল হয়নি সে। অধিকন্তু সে বছরে ছিলঅনাবৃষ্টি ও খরা। তাই স্বল্প পরিশ্রমিকে এতিমসন্তানকে নেয়ার উদ্দেশ্যে আমেনার ঘরেআবার ফিরে আসে সে। হালিমা আপন স্বামীরসাথে মক্কায় মন্থর গতিতে চলে এমন একটি দূর্বলগাধিনী নিয়ে এসেছিল। কিন্তু প্রত্যাবর্তনেরপথে রাসূলকে কুলে নেয়ার পর গাধিনী অত্যন্তদ্রুত গতিতে চলতেছিল এবং অন্যান্য সবজানোয়ারকে পিছনে ফেলে আসছিল। ফলেসফর সঙ্গীরা অত্যন্ত আশ্চর্যাম্বিত হয়। হালিমাআরো বর্ণনা করেন যে, তাঁর স্তনে কোন দুধছিল না, তাঁর ছেলে ক্ষুধায় সর্বদা কাঁদতো। রাসূলেকরীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পবিত্র মুখস্তনে রাখার পর প্রচুর পরিমাণে দুধ তাঁর স্তনেআসতে লাগলো। বনী সা‘দ গোত্রের অধ্যুষিতঅঞ্চলের অনাবৃষ্টি সম্পর্কে বলে যে, এ শিশু(মহাম্মদ) দুধ পান করার বদৌলতে জামিতে উৎপন্নহতে লাগলো ফল মুল এবং ছাগল ও অন্যান্য পশুদিতে লাগলো বাচ্চা। অবস্থা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়।দারিদ্র ও অভাব-অনটনের পরিবর্তে সুখ ও সমৃদ্ধিসর্বত্র রিাজমান। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামহালিমার পরিচর্যায় দুবছর পালিত হয়।হালিমা তাঁকে দারুণ ভাবে চাইতো। হালিমা নিজেইহৃদয়ের গভীরে এ শিশুকে ঘিরে রাখা অস্বাভাবিককিছু জিনিস পুরো অনুভব করতো। দু’বছর শেষহবার পর হালিমা তাকে মক্কায় মাতা ও দাদার কাছে নিয়েআসলো। কিন্তু হালিমা রাসূলের বরকত অবলোকনকরে যে, বরকত তাঁর অবস্থায় পরিবর্তন ঘটায়আমেনার কাছে রাসূলকে দ্বিতীয় বার দেয়ারজন্য আবেদন করলো। আমেনা তাতে সম্মত হয়।হালিমা এতিম শিশুকে নিয়ে নিজ এলাকায় আনন্দ ওসন্তোষ সহকারে ফিরে আসে।বক্ষ বিদারণএক দিন শিশু মুহাম্মাদ হালিমার ছেলেরে সাথে তাবুথেকে দূরে খেলা-ধুলা করতেছিল। এ সময় তাঁরবয়স ছিল চার বছরের কাছাকাছি, এমতাবস্থায় হালিমারছেলে ভীত সন্ত্রস্ত ও আতংকগ্রস্ত হয়েমায়ের কাছে দৌড়ে এসে তাকে কুরাইশী ভায়েরসাহায্যে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানালো। ঘটনা কিজিজ্ঞেস করা হলে সে উত্তর দেয় যে, দু’জনসাদা পোষাক পরিহিত লোককে আমাদরে কাছথেকে মুহাম্মাদকে নিয়ে মাটিতে চিৎকরে তাঁরবক্ষ বিদীর্ণ করতে দেখেছি। তাঁর বর্ণনা শেষনা করতেই হালিমা ঘটনা স্থলের দিকে দৌড়ে যান।গিয়ে দেখেন মুহাম্মদ নিজ স্থানে স্থিরভাবেদাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মুখমন্ডল হলুদ বর্ণ, দেহফ্যাকাশে। তাঁকে ঘটনা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলেঅত্যন্ত শান্ত ভাবে জবাব দেন যে তিনি ভালআছেন। তিনি আরো বলেন: সাদা পোষাক পরিহিতদু’ব্যিক্তি এসে তাঁর বক্ষবিদীর্ণ করে হৃদয় বেরকরে কাল জমাট বাধা রক্ত বের করে ফেলেদেয়, এবং হৃদয়কে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে আবারযথাস্থানে রেখে দেয়। বক্ষ মুছিয়ে দৃষ্টিরঅন্তরালে চলে যায়। হালিমা বক্ষের সে স্থানটিস্থির করার চেষ্টা করেও কোন চিহ্ন দেখতেপেলেন না। এরপর মুহাম্মদকে নিয়ে তাবুতেফিরে আসেন। পরের দিন ভোর হতেই হালিমামুহাম্মাদকে তাঁর মায়ের কাছে মক্কায় নিয়ে আসে।আমেনা অনির্ধারিত সময়ে হালিমাকে ছেলে নিয়েআসতে দেখে আশ্চর্যাম্বিত হন, অথচ তিনিছেলেকে অন্তর থেকে দেখতে চাচ্ছিলেন।কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে হালিমা বক্ষ বিদারণের ঘটনারপুরো বিবরণ দেন।আমেনার মৃত্যুআমেনা নিজের এতিম শিশু মুহা্ম্মাদকে নিয়েইয়াসরাবে বনী নাজ্জার গোত্রে মামাদের সাথেমিলিত হওয়ার জন্য যাত্রা করে। সেখনে কিছু দিনঅবস্থান করে ফেরার পথে “আবওয়া” নামক স্থানেমৃত্যু বরণ করে এবং সেখানেই তাকে দাফন করা হয়।ফলে মুহাম্মাদ চার বছর বয়সে মাতৃ-স্নেহ ওআদরের ছায়া থেকে বঞ্চিত হন। দাদা আব্দুলমুত্তালিবকে এ অপূরণীয় ক্ষতির কিছু লাঘব করতেহবে। তাই তিনি তাঁর দেখা-শুনা ও পরিচর্যার দায়িত্বনেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ছয়বছর বয়সে পা রাখেন তখন তাঁর দাদা ইহকাল ত্যাগকরেন। অতঃপর চাচা আবু তালিব আর্থিক অভাব-অনটন ওপরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশী থাকা সত্বেও তাঁরদেখা-শুনার দায়িত্ব নেন। রাসূলের চাচা আবূ তালেবও তাঁর স্ত্রী রাসূলের সাথে আপন ছেলের ন্যায়আচরণ করেন। এতিম ছেলের সম্পর্কে আপনচাচার সাথে অনকটা গভীর হয়ে যায়। এ পরিবেশেতিনি বড় হয়ে উঠেন। সততা ও সত্যবাদিতার মত গুণেগুণাম্বিত হয়ে যৌবন কাল অতিবাহিত করেন। এমন কিকেউ যদি বলে আল-আমিন উপস্থিত হয়েছেন বুঝাহতো মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমনকরেছেন। রাসূল যখন কিছুটা বড় হয়ে যৌবনেপদার্পন করেন, তখন স্বনির্ভরতা অর্জনেরলক্ষ্যে জীবিকার্জনের চেষ্টা শুরু করেন। শ্রমব্যয় ও উপার্জনের পালা আরম্ভ হলো। তিনিপারিশ্রমিকের বিনিময়ে কুরাইশের কিছু লোকেরছাগলের রাখাল হিসেবে কাজ করেন। খাদিজাবিনতে খোয়াইলিদ কর্তৃক আয়োজিত এক বানিজ্যিকভ্রমনে সিরিয়া গমন করেন। খাদিজা ছিলেনবিত্তশালীনী মহিলা। সে ভ্রমণে সম্পদ ওব্যবসায়িক সামগ্রির তত্বাবধায়ক ছিল তাঁরই দাস“মাইসেরাহ”। রাসূলের বরকত ও সততার কারণেখাদিজার এ ব্যবসায়ে নজীরবিহীন লাভ হয়। তিনিস্বীয় দাস মাইসেরাহর কাছে এর কারণ জানতেচাইলে বল হয় মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ নিজেই বেচা-কেনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। ক্রেতার ঢল নামে।ফলে কোন যুলম করা ব্যতিরেকেই আয় হয়প্রচুর। খাদিজা তাঁর দাসের বর্ণনা মনোযোগ দিয়েশুনেন। এমনিতেও তিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম সম্পর্কে অনেক কিছু জানতেন। তিনিমুহাম্মদের প্রতি হয়ে পড়েন মুগ্ধ ও অভিভূত।ইতিপূর্বে তিনি একবার বিয়ে করেছিলেন। স্বামীমারা যাওয়ার পরে বিধবাই রইলেন। এখন পুনরায় তাঁরমধ্যে মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহর সাথে নতুনঅভীজ্ঞতায় প্রবেশ করার তীব্র আকাঙ্খাজাগে। তাই এ ব্যাপারে মুহাম্মদের মনোভাব জানারউদ্দেশ্যে নিজের এক আত্মীয়কে পাঠান।রাসূলের নিকট খাদীজার আত্মীয় বিয়ের প্রস্তাবরাখলে তিনি তা গ্রহণ করেন। বিয়ে সম্পাদিত হলো।একে অপরের দ্বারা সুখী হন। তিনি খাদিজার অর্থসম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচারনায় যোগ্যতা ওদক্ষতার স্বাক্ষর রাখেন। খাদিজার ঔরসে জন্ম লাভকরেন যয়নাব, রুকাইয়্যাহ, উম্মেকুলসুম ও ফাতিমা। এবংকাসিম ও আব্দুল্লাহ নামক দু’ছেলে যারা শৈশবেই মারাযান।তাঁর বয়স চল্লিশের নিকটবর্তী হওয়ার সাথে সাথেমক্কার আদূরে অবস্থিত হেরা নামক এক গুহায় তিনিনিরিবিলি ও নির্জন অবস্থায় কয়েক দিন করে কাটিয়েদিতেন। পবিত্র রমযানের ২১ তারিখের রাতে হেরাগুহায় তাঁর কাছে জিবরাঈল আলাইহিস সালাম আসেন।তখন তাঁর বয়স ছিল ৪০। জিবরাঈল বলেন, পড়ুন। তিনিবললেন, আমি পড়তে জানি না। জিবরাঈল দ্বিতীয় বারও তৃতীয়বারের মত পুনরায় বললেন। তৃতীয়বারজিবরাঈল বলেন,﴿ ﭐﻗۡﺮَﺃۡ ﺑِﭑﺳۡﻢِ ﺭَﺑِّﻚَ ﭐﻟَّﺬِﻱ ﺧَﻠَﻖَ ١ ﺧَﻠَﻖَ ﭐﻟۡﺈِﻧﺴَٰﻦَ ﻣِﻦۡ ﻋَﻠَﻖٍ ٢ﭐﻗۡﺮَﺃۡ ﻭَﺭَﺑُّﻚَ ﭐﻟۡﺄَﻛۡﺮَﻡُ ٣ ﭐﻟَّﺬِﻱ ﻋَﻠَّﻢَ ﺑِﭑﻟۡﻘَﻠَﻢِ ٤ ﻋَﻠَّﻢَ ﭐﻟۡﺈِﻧﺴَٰﻦَ ﻣَﺎ ﻟَﻢۡﻳَﻌۡﻠَﻢۡ ٥﴾ ‏[ ﺍﻟﻌﻠﻖ 5-1: ]অর্থ: পাঠ করুন আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টিকরেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তথেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহাদয়ালু, যিনিকলমেন সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষাদিয়েছেন মানুষকে যা সে জানতো না। [সূরা আল-আলাক: ১-৫] অতঃপর জিবরাঈল আলাইহিস সালাম চলেগেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরহেরা গুহায় অবস্থান করতে পারলেন না। তিনি ঘরেএসে খাদিজাকে হ্নদয় স্পন্দিত অবস্থায় বললেন,আমাকে বস্ত্রাচ্ছাদিত করে. আমাকে বস্ত্রাচ্ছাদিতকর। অতঃপর তিনি বস্ত্রাচ্ছাদিত হয়ে শুয়ে পড়লেন।ভীত ও আতংক দূর হয়ে গেলে তিনি সব কিছুখাদিজাকে খুলে বললেন। এরপর তিনি বললেন-আমিনিজের ব্যাপারে আশংকা বোধ করছি। খাদীজাদৃঢ়তার সাথে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “কখনো নয়,আল্লাহর শপথ! আল্রাহ আপনাকে অপমানিত করবেননা। নিশ্চয় আপনি আত্মীয় স্বজনের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখেন, গরীব ও নিঃস্ব ব্যক্তিকেসাহায্য করেন। অতিথিকে সমাদর করেন। এবংবিপদগ্রস্থদের সহায়তা করেন”। কিছু দিন পরে তিনিআল্লাহর ইবাদত অব্যাহত রাখার জন্য আবার হেরা গুহায়ফিরে আসেন।রমযানের অবশিষ্ট দিনগুলো কাটান।রমযান শেষে হেরা গুহা থেকে অবতরণ করেমক্কা অভিমুখে রওয়ানা হন। উপত্যকায় পৌঁছালেজিবরাঈলকে আকাশ ও যমিনের মধ্যবর্তী স্থানেএকটি চেয়ারে উপবিষ্ট অবস্থায় দেখেন। অতঃপরনিম্নোক্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়। “হেচাদরাবৃত্ত ! উঠুন, সর্তক করুন, আপনার পালন কর্তারমাহাত্ম্য ঘোষণা করুন। আপনার পোষাক পবিত্র করুনএবং অপবিত্রতা দূর করুন।” (মুদ্দাস্সির -১-৫)পরবর্তী সময়ে ওহী অব্যাহত থাকে। রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পবিত্র দাওয়াতী ব্রতশুরু করলে সর্ব প্রথম তাঁর গুণাবর্তী স্ত্রীখাদীজা (রা) ঈমানের ডাকে সাড়া দেন। আল্লাহরএকত্ববাদ ও তাঁর স্বামীর নবুওয়াতের সাক্ষ্য দেন।তাই তিনি ছিলেন সর্ব প্রথম মুসলমান। রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপন চাচা আবুতালিবের স্নেহে,পরিচর্যা ও অবদানের কৃতজ্ঞতা স্বরূপ, যেরাসূলের মাতা ও দাদার পর দেখা-শুনার দায়িত্ব বহনকরেন, তাঁর ছেলে আলির লালন-পালন ও দেখা-শুনারদায়িত্ব নিয়েছিলেন। এ সুন্দর পরিবেশে আলিরঅন্তর ও বিবেক খুলে। তিনিও ঈমান গ্রহণ করেন।অত:পর খাদিজার দাস যাইদ বিন হারেসাহ ইসলামেরসুশীতল ছায়াতলে সমবেত হন। অতঃপর রাসূল তাঁরঅন্তরঙ্গ বন্ধু আবু বাকারের সাথে ইসলামেরব্যাপারে আলাপ করলে দ্বিদাহীন চিত্তে তিনিইসলামে গ্রহণ করেন এবং সত্যতার সাক্ষ্য দেন।রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপন ভাবেদাওয়াতী মিশন চালিয়ে যেতে থাকলেন। আরগোপন বলতে এখানে বোঝানো হয়েছেগোপনীয় স্থান যেখানে তাঁর সাহাবী, শিষ্য ওআরোঅনেক লোক সমবেত হতেন তিনিতাদেরকে ইসলামের প্রতি আহ্বান করতেন অতঃপরতাঁরা ইসলাম গ্রহণ করতেন। এ ভাবে অনেক লোকইসলামের পতাকাতলে একত্রিত হয়েছিলেন কিন্তুসবাই ইসলামকে গোপনে রাখতেন। কারো ইসলামগ্রহণের বিষয়টা প্রকাশ হয়ে গেলে কুরাইশেরকাফেরদের কঠিন নির্যাতনের শিকার হতেন।এসময়ে ব্যক্তিগত ভাবে টার্গেট ভিত্তিক দাওয়াতীকাজ করা হতো।এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৩ বছরপর্যন্ত ব্যক্তিগত দাওয়াতের গোপন ব্রতে ব্রস্তথাকেন। অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশআসে আপনি প্রকাশ্যে শুনিয়ে দেন যা আপনাকেআদেশ করা হয় এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেননা। (হিজর: ৯৪) এ আদেশ পেয়ে এক দিন তিনি সাফাপর্বতে আরোহন কের কুরাইশদেরকে ডাকদেন। তাঁর ডাক শুনে অনেক লোকের সমাগমঘটে। তন্মধ্যে তাঁর চাচা আবূ লাহাবও এক জন ছিল।সে কুরাইশদের মধ্যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সবচাইতে কট্রর শক্র ছিল। মানুষ সমবেত হবার পর রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি যদিআপনাদেরকে একথার সংবাদ দিই যে পাহাড়েরপেছনে এক শক্রদল আপনাদের উপর আক্রমণকরার জন্য অপেক্ষা করছে। আপনারা আমার কথাবিশ্বাস করবেন? সবাই এক স্বরে বললো আমরাআপনার মধ্যে সততা ও সত্যবাদিতা ছাড়া কিছুই দেখিনি।তিনি বললেন, আমি আপনাদেরকে কঠিন শাস্তিরব্যাপারে সতর্ক করছি। অতঃপর তিনি তাদেরকেআল্লাহর পথে আহ্বান করলেন এবং মুর্তিপূজা বর্জনকরতে বরলেন। একথা শুনে আবু লাহাব রাগেক্ষেপে উঠে বলে, তোমার ধ্বংস হোক। এজন্যেই কি আমাদেরকে একত্রিত করেছ। এঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক সূরা লাহাবঅবতীর্ণ করেন। “ আবূ লাহাবের হস্তদয় ধ্বংসহোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে। কোন কাজেআসেনি তাঁর ধন-সম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে।সত্বর সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে এবংতাঁর স্ত্রীও যে ইন্ধন বহন করে। তাঁর গলদেশেখর্জুরের রশি নিয়ে।” (লাহাব-১-৫)রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাওয়াতী কাজপুরো দমে অব্যাহত রাখলেন। জন সমাবেশস্থলে তিনি প্রকাশ্য ভাবে ইসলামের প্রতি আহ্বানজানাতেন। তিনি কা’বা শরিফের নিকটে নামায আদায়করতেন। মুসলমানদের উপরে কাফেরদেরঅত্যাচার ও নিপীড়নের মাত্রা বেড়ে গেলো।ইয়াসের, সুমাইয়্যা ও তাদের সন্তান আম্মারেরবেলায় তাই ঘটেছে। খোদাদ্রোহীদেরনির্যাতনে পিতা-মাতা শহীদ হন। নির্যাতনের কারণেইতাঁর মৃত্যু হয়। বিলাল বিন রাবাহ আবুজেহেলের ওউমায়্যা বিন খালাফের অকথ্য নির্যাতনের শিকার হন।অবশ্যই বিলাল আবূ বাকারের (রা) মাধ্যমে ইসলামগ্রহণ করেন। এ খবর শুনে তাঁর মালিক অত্যাচারেরশিকার হন। অবশ্যই বিলাল হযরত আবু বাকারের (রাঃ)মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন। এ খবর শুনে তাঁরমালিক অত্যাচারের সব পন্থা অবলম্বন করে যাতেবিলাল ইসলাম ত্যাগ করে। কিন্তু তিনি আকঁড়ে ধরেনইসলামকে এবং অস্বীকার করেন ইসলাম ত্যাগকরতে। উমায়্যা তাঁকে শিকলাবন্ধ করে মক্কারবাইরে নিয়ে গিয়ে বুকের উপর বিরাট পাথর রেখেউত্তপ্ত বালিতে হেঁচড়িয়ে টানতো। অতঃপর সে ওতাঁর সঙ্গীরা বেত্রাঘাত করতো আর বিলাল শুধুআহাদ, আহাদ, এক, এক, বলতে থাকতেন। এহেনঅবস্থায় একবার আবূ বকর তাকে দেখেন। তিনিবিলালকে উমায়্যার কাছ থেকে ক্রয় করে নিয়েআল্লাহর নিমিত্তে স্বাধীন করে দেন। এ সবপৈশাচিক ও বর্বর অত্যাচারের কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদেরকে ইসলাম প্রকাশকরতে নিষেধ করেন। তাদের সাথে মিলিত হতেনঅত্যন্ত সংগোপনে। কেননা প্রকাশ্যভাবে মিলিতহলে মুশরিকরা রাসূলের শিক্ষা প্রদানের পথেঅন্তরায়ের সৃষ্টি করবে কখনো দুদলেরসংঘর্ষের আশংকাও ছিল। এ কথা সুবিদিত যে এহেননাজুক পরিস্থিতিতে সংঘর্ষ মুসলমানদের ধ্বংস ওসমূলে বিনাশই ডেকে আনবে। কারণ মুসলমানদেরসংখ্যা ও শক্তি সামর্থ্য ছিল খুবই স্বল্প। তাই তাদেরইসলাম গোপন রাখাটাই ছিল দূরদর্শিতা। অবশ্য রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেরদের অত্যাচারসত্ত্বেও প্রকাশ্যভাবে দাওয়াত ও ইবাদতের কাজকরতেন।হাবশার দিকে হিজরতযার ইসলামের কথা ফাঁস হয়ে যেত তিনি মুশরিকদেরনিপীড়নের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতেন।বিশেষত দুর্বল মুসলিমরা। এ পরিপ্রেক্ষিতে রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহাবীদেরকেদ্বীন নিয়ে হাবশায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার নির্দেশদেন। তিনি সেখানকার শাসক নাজাসীর নিকট নিরাপত্তাপাওয়ার আশ্বাস দেন। অনেক মুসলমান নিজের জানও পরিবার বর্গের ব্যাপারে নিরাপত্তাহীনতায়ভূগতো। তাই নবুওয়াতের ৫ম বছরে প্রায় ৭০ জনমুসলিম সপরিবারে হিজরত করেন। তাঁদের মধ্যেউসমান বিন আফফান ও তাঁর স্ত্রী রুকাইয়্যাও ছিলেন।এ দিকে কুরাইশরা ইথিওপিয়ায় হিজরত কারীদেরঅবস্থান ব্যাহত করার চেষ্টা করে। সে দেশেররাজার জন্য পাঠায় উৎকোচ। পলায়নকারীদের(মুহাজির) বহিস্কারের অনুরোধ জানায়। তারা আরোবলে যে, মুসলিমরা ঈসা আলাইহিস সালাম ও মরিয়ামসম্পর্কে অপমানকর ও অশিষ্ট বাক্য ব্যবহার করে।নাজাসী তাদেরকে ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কেজিজ্ঞেস করলে তাঁরা সত্যটি সুস্পষ্ট ভাবে বলেদেন, শাসক মুসলিমদের আশ্রয় দেন এবং বহিস্কারঅনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেন। এ বছরের রমযানমাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হারামশরীফে যান। সেখানে ছিল কুরাইশেরএক দললোক। তিনি দাঁড়িয়ে হঠাৎ করে তাদের সামনেসুরায়ে নাজম তেলাওয়াত করতে লাগলেন। এ সবকাফেররা ইতিপূর্বে কখনো আল্লাহর বাণীশুনেনি। কেননা তাঁরা রাসূলের কিছুই না শুনার পদ্ধতিঅনুসরণ করে আসতেছিলো। আকস্মাৎতেলাওয়াতের মধুর ধ্বনি তাদের কর্ণে গেলেতাঁরা আল্লাহর হৃদয়গ্রাহী চিত্তাকর্ষক বাণী ওসাবলীল ভাষা একাগ্রচিত্তে শুনে। অন্তরে তা ছাড়াঅন্য কিছুই নেই। এক পর্যায়ে রাসূল—﴿ ﻓَﭑﺳۡﺠُﺪُﻭﺍْۤ ﻟِﻠَّﻪِۤ ﻭَﭐﻋۡﺒُﺪُﻭﺍْ۩ ٦٢﴾ ‏[ ﺍﻟﻨﺠﻢ 62: ]আয়াতটি পড়ে সেজদায় চলে যান। উপস্থিতব্যাক্তিদের মধ্যে কেউ নিজেদেরকে নিয়ন্ত্রনকরতে পারেনি। তাঁরাও সেজদায় চলে যায়।অনুপস্থিত মুশরিকরা তাদেরকে তিরস্কার করে, ভৎসনাকরে। অন্য কোন উপায় না দেখে এরা রাসূলেরবিরুদ্ধে মিথ্যা রচনা করে যে, তিনি তাদের মূর্তিরপ্রশংসা করেন এবং বলেন, “তাদের (মুর্তিসমূহের)সুপারিশের আশা করা যায়” সেজদা করার অজুহাত স্বরুপএ ভিত্তিহীন, নিরেট মিথ্যার বেসাতী করে তারা।ওমরের ইসলাম গ্রহণওমরের রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ মুসলমানদেরজন্য বড় বিজয় ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম তাঁকে ফারুক বলে আখ্যায়িত করেছেন।কারণ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মাধ্যমে সত্য ও বাতিলেরমধ্যে পার্থক্য সূচিত করেছেন। ইসলাম গ্রহনেরকয়েক দিন পরে ওমার রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরাকি সত্যের উপরে নই? তদুত্তোরে তিনি বললেনকেন নয়, নিশ্চয় আমরা সত্যের মধ্যে। ওমরবললেন তাহলে এত গোপনীয়তা কি জন্যে।তখন আরকামের বাড়ীতে সমাবেতমুসলিমদেরকে নিয়ে বের হয়ে পড়েন এবংতাদেরকে দুদলে বিভক্ত করে দেন। হামযা বিনআব্দুল মুত্তালিবের নেতৃত্বে একদল এবং ওমার বিনখাত্তাবের নেতৃত্বে আর একদলের নব সঞ্চারিতশক্তির ঈঙ্গিত দেয়ার জন্যে মক্কার বিভিন্ন অলি-গলিপ্রদক্ষিণ করে। কুরাইশরা দাওয়াত দমন করার জন্যবিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করে। শাস্তি, নির্যাতন,নিপীড়ন, প্রলোভন ও হুমকি প্রদর্শনের মতোসর্ব প্রকার পন্থা গ্রহণ করে। কিন্তু এসবকুপরিকল্পিত ব্যবস্থাসমূহ মুসলমানদের ঈমান বৃদ্ধি ওদ্বীন ইসলামকে অধিকতর আঁকড়ে ধরা ছাড়া আরকোন ভুমিকা রাখতে পারেনি।এক নতুন দুরভিসন্ধি ও মন্দ অভিপ্রায় তাদের অন্তরেজন্ম নিল। আর তা হচ্ছে মুসলমান ও বনীহাশেমকে সম্পূর্ণভাবে বর্জন ও একঘরে করেরাখার এক চুক্তিনামা লিখে, যাতে সবাই সাক্ষর করবে,কাবা শরিফের অভ্যন্তরে ঝুলিয়ে দেবে। চুক্তিঅনুসারে তাদের সাথে বেচা- কেনা, বিয়ে শাদি,সাহায্য সহযোগিতা, ও লেন-দেন সম্পূর্ণভাবে বন্ধথাকবে। এ চুক্তির ফলে মুসলিমরা বাধ্য হয়ে মক্কাথেকে বের হয়ে (শো’বে আবি তালেব নামক)এক উপত্যাকায় গিয়ে আশ্রয় নেন। তাঁরা অবর্ণনীয়ক্লেশ ও দুঃখের শিকার হন সেখানে। ক্ষুধা ওঅর্ধাহারের বিষাক্ত ছবোল থেকে কেউ রক্ষাপায়নি। স্বচ্ছল ও সামর্থবান ব্যক্তিরা নিজেদেরসমস্ত ধন-সম্পদ ব্যয় করে ফেলেন। খাদীজা তাঁরসম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করেন। বিভিন্ন রোগ ছাড়িয়েপড়লো। অধিকাংশ লোকই মৃত্যূর প্রায়-দ্বারপ্রান্তে এসে দাড়ালেন। কিন্ত তাঁরা ধৈর্য অবিচলতারপরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন। তাঁদের মধ্যে একজনওপশ্চাদপদ হননি। অবরোধ একাধারে তিন বছর স্থায়ীরইল। অতঃপর বনী হাশেমের সাথে আত্মীয়তাআছে এমন কিছু শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিজনসমাবেশে চুক্তি ভঙ্গ করার কথা ঘোষনা করে।চুক্তির কাগজ বের করা হলে দেখা যায় যে সেটাখেয়ে ফেলা হয়েছে। শুধুমাত্র কাগজের এককোণ যেখানে “বিসমিকা আল্লাহুম্মা” লেখাছিলসেটাই অক্ষত রয়েছে। সংকটের অবসান হল। আরমুসলিম ও বনী হাশেম মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তুকুরাইশরা মুসলিমদের দমন ও মুকাবিলায় সেই রকম রুঢ়তাও কঠোরতা ক্ষনিকের তরেও পরিহার করেনি।দুঃখের বছরকঠিন রোগ ব্যধি আবু তালেবের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গে ছড়িয়ে যায়। মৃত্যু শয্যায় শায়িত হয়েজীবনের অবশিষ্ট মুহুর্তগুলো গুনতে লাগলেন।মুমূর্ষাবস্থায় যখন সে মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতর তখন রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাথার পার্শ্বে বসেতাকে কালেমায়ে তাওহীদ ( ﻻ ﺇﻟﻪ ﺇﻻ ﺍﻟﻠﻪ ) পড়ারঅনুরোধ জানান। কিন্তু আবু জেহেল সহ অসৎসঙ্গীরা যারা তাঁর পার্শ্বে ছিল তাকে বললো-শেষমূহুর্তে পূর্ব পুরুষের ধর্ম ত্যাগ করো না।মুসলমান হওয়া ব্যতিরেকে তাঁর মৃত্যু হওয়ায় রাসূলেরদুঃখ দ্বিগুণ বেড়ে যায়। আবু তালেবের মৃত্যুর দু’মাসপরে খাদীজা (রা) ওফাত বরণ করেন। ফলেরাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত চিন্তিতহন। তাদের মৃত্যুর পরে কুরাইশের ঔদ্ধত্য ওউপদ্রব আরো বেড়ে যায়।তায়েফের পথেকুরাইশের ধৃষ্ঠ্যতা, এবং মুসলমানদের প্রতি তাদেরনির্যাতন ও নিপীড়নের নীতি অব্যাহত থাকার পররাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সংশোধনও ইসলাম গ্রহণ থেকে নিরাশ হয়ে তায়েফগমনের সিদ্ধান্ত নেন। হতে পারে আল্লাহতাদেরকে হেদায়েত দান করবেন। তায়েফ গমনসহজ ব্যপার ছিল না। আকাশ চুম্বি উচুঁ উচুঁ পাহাড়েরকারণে পথ ছিল দুর্গম। কিন্তু আল্লাহর পথেপ্রত্যেক দুরুহ বস্তু সহজ হয়ে পড়ে।তায়েফবাসীরা রাসূলের সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামসাথে সর্বাপেক্ষা মন্দ আচরণ করে। তাঁরা শিশুকিশোরদেরকে লেলিয়ে দেয়। প্রস্তরনিক্ষেপ করে তাঁর গোড়ালী করে রক্তেরঞ্জিত। তিনি ভীষণ চিন্তিত হয়ে মক্কা অভিমুখেরওয়ানা হন। পথিমধ্যে জিবরাইল আলাইহিস সালামপাহাড়ের দায়িত্বে নিযুক্ত ফেরেশতাসহ এসেবলেন, আল্লাহ পাহাড়ের দায়িত্বে নিযুক্তফেরেশতাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন। আপনিযা ইচ্ছা নির্দেশ দিতে পারেন। ফেরেশতা আরজকরলো, হে মুহাম্মদ ! আপনি যদি চান আমি তাদেরউপর আখসাবাইন (মক্কাকে ঘিরে রাখা পাহাড়) চেপেদিবো। তিনি বললেন, বরং আমি আশা করি আল্লাহতাদের বংশ থেকে এমন লোক সৃষ্টি করবেন, যারাশুধু মাত্র আল্লাহরই ইবাদত করবে, তাঁর সাথে কোনশরিক স্থাপন করবে না।চন্দ্র দু টুকরা হওয়ামুশরিকরা অনেক সময় রাসূলকে অপারগ, অক্ষমসাব্যস্ত করার ফন্দিতে বিভিন্ন অলৌকিক নির্দশনদেখানোর দাবী করতো। আর এধরনের দাবীজানায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহরকাছে দোয়া করলে তাদেরকে চন্দ্র দু’টুকরোকরে দেখানো হয়। কুরাইশরা এ নিদর্শন দীর্ঘসময় পর্যন্ত দেখতে থাকে। কিন্তু তা সত্ত্বেওতাঁরা ঈমান গ্রহণ করেনি। বরং তাঁরা বলে, মুহাম্মাদআমাদেরকে যাদু করেছে তন্মধ্যে এক ব্যক্তিবললো, আমাদের যাদু করলেও সব মানুষকেওতো আর যাদু করতে পারবে না। দূতের অপেক্ষাকর। বিভিন্ন দূত আসলে জিজ্ঞেস করা হয় এবং তাঁরাবলে হ্যাঁ আমরাও দেখেছি। কিন্তু কুরাইশরানিজেদের কুফরে জেদ ধরে রয়ে গেলো।চন্দ্র দু’টুকরা হওয়া এক বৃহত্তর অলৌকিক ঘটনার পটভূমিও অবতরনিকা ছিলো। আর তা হল মেরাজের ঘটনা।মেরাজতায়েফ থেকে ফিরে আসা, তাদের রুঢ় ও অমানবিকআচরণ এবং আবু তালিব ও খাদিজার মৃত্যুর পর কুরাইশেরঅত্যাচার বহু গুণে বৃদ্ধি পায়। এতে রাসূল সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্তরে একাধিক চিন্তাএকত্রিত হয়। মহান রাব্বুল আলামীনের পক্ষথেকে শোকাহত ও দুঃখে কাতর নবীর সান্তনাআসে। নবুওয়াতের ১০ম সালে রজবের ২৭তারিখের রাতে তিনি যখন নিদ্রারত ছিলেন, জিবরাঈলবুরাক নিয়ে আসেন। বোরাক ঘোড়া সদৃশ একজন্তু যার দু’টি দ্রুতমান পাখা আছে বিদ্যুতের ন্যায়।রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে তাতেআরোহণ করানো হয় এবং জিবরাঈল তাকেফিলিস্তীনে বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রথমে নিয়ে যান।অতঃপর সেখান থেকে আসামান পর্যন্ত নিয়ে যান।এ ভ্রমনে তিনি পালনকর্তার বড় বড় নিদর্শন পরিদর্শনকরেন। আসমানেই পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ করা হয়।তিনি একই রাত্রে তুষ্ট মন ও সুদৃঢ় বিশ্বাস নিয়েমক্কায় প্রত্যাগমন করেন। ভোর বেলায় কাবাশরিফে গিয়ে তিনি লোকদেরকে একথা শুনালেকাফেরদের মিথ্যার অভিযোগ ও ঠাট্রা বিদ্রুপআরোপ বেড়ে যায়। উপস্থিত কয়েক জন লোকতাঁকে বাইতুল মুকাদ্দাসের বিবরণ দিতে বলে। মূলতউদ্দেশ্য ছিল তাঁকে অপারগ ও অক্ষম প্রমাণিত করা।তিনি তন্ন তন্ন করে সব কিছু বলতে লাগলেন।কাফেররা এতে ক্ষান্ত না হয়ে বলে, আমরা আরএকটি প্রমাণ চাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামবললেন, আমি পথে মক্কাগামী একটি কাফেলারসাক্ষাৎ পাই এবং তিনি কাফেলার বিস্তারিত বিবরণসহউটের সংখ্যা ও আগমনের সময়ও বলে দিলেন।রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সত্যই বলেছেনকিন্তু কাফেররা হটকারিতা, কুফর ও সত্যকেঅস্বীকার করার দরুণ ভ্রান্ত রয়ে গেল। সকালবেলায় জিবরাঈল এসে রাসূলকে পাঁচ ওয়াক্তনামাজের পদ্ধতি ও সময়সুচী শিখিয়ে দিলেন।ইতিপূর্বে নামায শুধু সকাল বেলায় দু’রাকআত ওবিকেল বলায় দু’রাকআত ছিলো। কুরাইশরা সত্যঅস্বীকার করতে থাকায় এ দিনগুলোতে তিনিমক্কায় আগমণকারী ব্যক্তিদের মাঝে দাওয়াতীতৎপরতা চালাতে লাগলেন। তিনি তাদের অবস্থানস্থলে মিলিত হয়ে দাওয়াত পেশ করতেন এবং তাঁরসুন্দর ব্যাখ্যা দিতেন। আবু লাহাব তাঁর পিছনে তোলেগেই থাকতো। সে লোকদেরকে তাঁরথেকে ও তাঁর দাওয়াত থেকে সতর্ক থাকতেবলতো। এক বার ইয়াসরিব থেকে আগত একদলকে ইসলামের আহবান জানালে তাঁরা মনোযোগদিয়ে শুনে এবং তাঁর অনুসরণ ও তাঁর প্রতি ঈমানআনতে ঐক্যবদ্ধ হয়। ইয়াসরিববাসী ইয়াহূদীদেরকাছে শুনতো যে অদূর ভবিষ্যতে একনবীপ্রেরিত হবেন। তাঁর আবির্ভাবের যুগ নিকটে এসেগেছে। তাদেরকে যখন তিনি ইসলামের দাওয়াতদেন, তাঁরা বুঝতে পারলো যে তিনি সেই নবী যারকথা ইয়াহূদীরা বলেছে। তাঁরা সত্ত্বর ইসলাম গ্রহণকরে ফেলে এবং বলে ইয়াহূদীরা যেন আমাদেরঅগ্রগামী না হয়। তাঁরা ছিল ৬ জন, পরবর্তী বছর ১২জন আসে। তাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম মৌলিক শিক্ষা দেন। প্রত্যাবর্তনের সময়তাদের সাথে তিনি মুসআব বিন উমাইরকে কুরআন ওদ্বীনের বিধানাবলী শিক্ষা দেয়ার জন্য পাঠান।মুসআব মদিনায় বিরাট প্রভাব ফেলতে সক্ষমহয়েছিল। এক বছর পর তিনি যখন মদিনায় আসেন,তখন তাঁর সাথে ৭২ জন পুরুষ ও দু’জন মহিলা ছিল। রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সাথে মিলিত হনএবং তাঁরা দ্বীনের সহযোগিতা ও এর প্রতি যথাযথদায়িত্ব পালনের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।অতঃপর তাঁরা মদিনায় ফিরে যান।মদীনার দিকে হিজরতমদিনা সত্য ও সত্যের ধারকদের আশ্রয়ে পরিণতহয়। মুসলিমরা সে দিকে হিজরত করতে লাগলেন।তবে কুরাইশরা ছিল মুসলিমদেরকে হিজরত করতেবাধা দেয়া ও প্রতিরোধ সৃষ্টি করার জন্য বদ্ধপরিকর। পরে কতিপয় মুহাজির বিভিন্ন প্রকার শাস্তি ওনির্যাতনের শিকার হন। কুরাইশদের ভয়ে মুসলিমরাগোপনে হিজরত করতেন কিন্তু ওমরের(রাদিয়াল্লাহু আনহু) হিজরত ছিল ব্যতিক্রম। তাঁর হিজরতছিলো সাহসিকতা, নির্ভীকতা ও চ্যালেঞ্জের একউজ্জল দৃষ্টান্ত। তরবারী উম্মোচিত করে এবংতীর বের করে কা‘বায় গিয়ে তাওয়াফ করেন।অতঃপর মুশরিকদের উদ্দেশ্যে বলেন, যেব্যক্তি স্বীয় স্ত্রীকে বিধবা বা সন্তান-সন্ততিকেএতীম বানানোর ইচ্ছা করে সে যেন আমার পিছুধাওয়া করে। আমি আল্লাহর পথে হিজরত করছি।অতঃপর তিনি চলে গেলেন। কেউ পিছু ধাওয়া করারসাহস করেনি। আবু বকর সিদ্দিক রাসূলের নিকটহিজতের অনুমতি চাইলে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম তাঁকে বলেন, তাড়াহুড়া করো না। আশা করিআল্লাহ তোমার জন্য এক জন সঙ্গী নির্ধারণকরবেন। অধিকাংশ মুসলিম ইতি পূর্বে হিজরতকরেছেন। কুরাইশরা প্রায় উন্মাদ হয়ে গেল।মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাওয়াতেরউন্নতি ও উজ্জল ভবিষ্যতের ভয় ও আশংকা বোধকরলো। সবাই পরামর্শ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলো।আবু জাহেল প্রস্তাব পেশ করলো যেপ্রত্যেক গোত্রের এক এক জন নির্ভীকযুবককে তরবারী দেয়া হবে। এরা মুহাম্মাদকেচতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে এক যোগেআত্রমণ করে হত্যা করবে। ফলে তার রক্ত বিভিন্নগোত্রের মধ্যে ছড়িয়ে যাবে। বনি হাশেম এরপর সব কবিলার সাথে লড়াই করার হিম্মত করবে না।আল্লাহ তাঁর নবীকে তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কেঅবহিত করে দেন। তিনি আবু বকরের সাথে হিজরতকরার সিদ্ধান্ত নেন। রাতে আলি কে (রাদিয়াল্লাহুআনহু) নিজের বিছানায় শুয়ে থাকতে বললেন, যাতেলোকেরা মনে করে যে, রাসূল বাড়ীতেইআছেন, এবং আলিকেও এ আশ্বাসও দিলেন যেকোন ক্ষতি তাকে স্পর্শ করতে পারবে না।ইতিমধ্যে কাফেররা বাড়ী ঘেরাও করেফেলেছে। বিছানায় আলিকে দেখে তারা নিশ্চিতহয় যে, রাসূল বাড়ীতে আছেন এবং হত্যা করারজন্য তাঁর বের হওয়ার অপেক্ষা করতে লাগলো।এ দিকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেরহয়ে সবার মাথার উপর বালু ছিটিয়ে দিলে আল্লাহতাদের দৃষ্টি শক্তি ছিনিয়ে নেন। ফলে তাঁরা আঁচওকরতে পারলো না যে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম বেরিয়ে গেলেন। অত:পর আবু বকর(রাদিয়াল্লাহু আনহু) সহ প্রায় পাঁচ মাইল অতিক্রম করে“ছওর” গুহায় লকিয়ে থাকেন। কুরাইশ যুবকরা ভোরবেলা পর্যন্ত অপেক্ষা করে অন্যদিকে আলিকেরাসূলের বিছানায় দেখতে পেয়ে হতাশ, বিস্মিত ওক্ষেপে যায়। তারা আলিকে জিজ্ঞাসাবাদ ও মারধরকরে ও কোন হদিস বের করতে না পেয়েচতুর্দিকে লোক জন পাঠালো। তাঁকেজীবিত বামৃত্যু অবস্থায় ধরে দিতে পারার জন্য ১০০ উটপুরস্কার ঘোষণা করা হলো। লোকজন চারিদিকেহন্যে হয়ে খুজতে লাগলো। এমন কি তারা যদিএকটু ঝুকে গুহার ভিতর তাকায়, তাহলে তাদেরদেখতে পায়। এমন শাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতেরাসূলের ব্যাপারে আবু বকারের (রাদিয়াল্লাহু আনহু)চিন্তা ও উদ্বেগ বেড়ে যায়। রাসূল সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: « ﻻ ﺗﺤﺰﻥ ﺇﻥ ﺍﻟﻠﻪ ﻣﻌﻨﺎ »চিন্তা করো না আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।অনুসন্ধানকারীরা তাদের সন্ধান আর পেল না।গুহায় তাঁরা তিন দিন অবস্থান করে মদিনার পথে যাত্রা শুরুকরেন। পথ ছিল সুদীর্ঘ ও দুর্গম। সূর্য ছিলঅতীব উত্তপ্ত। দ্বিতীয় দিন বিকেল বেলায় একতাবুর পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিলেন যেখানে উম্মেমা’বাদ নামে এক মহিলা বাস করতো। রাসূল তাঁর কাছেখাবার ও পানি চাইলে সে কিছুই দিতে পারেনি। কিন্তুএকটি স্ত্রী ছাগল এতই দুর্বল ছিল যে ঘাস খেতেযেতে পারেনি। এক ফোটা দুধ তার স্তনে ছিল না।রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্তনের উপর তাঁরহাত মুবারক বুলিয়ে দিয়ে দুধ দোহন করে এক বড়পাত্র ভরে নেন। উম্মে মা‘বাদ এ অলৌকিক ঘটনাদেখে বিস্মিয় ও বিহবল হয়ে পড়ে। সবাই পানকরেন এবং ক্ষুধা নিবারণ করেন। অতঃপর আর একপাত্র ভরে উম্মে মা‘বাদকে দিয়ে তিনি যাত্রা শুরুকরেন।মদিনাবাসী এদিকে তাঁর শুভাগমনের জন্য অধীরআগ্রহে অপেক্ষা করতেছিলেন। প্রতিদিন তাঁরামদিনার বাইরে প্রতীক্ষায় থাকতেন। যে দিন তাঁরআগমন হয় সে দিন সবাই পুলকিত হৃদয়ে তাঁকে সাদরসম্ভাষণ জানান। তিনি মদীনার নিকটে কুবায় যাত্রা বিরতিকরেন এবং সেখানে চান দিন অবস্থান করেন। তিনিএ সময় কুবা মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন। আরএটাই ইসলামের প্রথম মসজিদ। ৫ম দিন তিনি মদীনারপথে যাত্রা শুরু করেন। অনেক আনসারী সাহাবীরাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অতিথি হিসাবেবরণ করার চেষ্টা করেন এবং তার উটের লাগামধরেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরশুকরিয়া আদায় করে বলেন, উট ছেড়ে দাও, সেনির্দেশপ্রাপ্ত। আল্লাহর নির্দেশ যেখানে হলসেখানে গিয়ে উট বসে যায়। তিনি অবতরণ নাকরতেই উঠে সে অগ্রভাগে কিছু পথ চলে আবারপিছনে এসে প্রথম স্থানে বসে যায়। সেটাই ছিলমসজিদে নব্বীর স্থান। তিনি আবু আইয়্যুবআনসারীর অতিথি হন। আলি ইবন আবু তালিব নবীরসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের পর তিন দিনমক্কায় অবস্থান করেন। অতঃপর কুবায় রাসূলের সাথেমিলিত হন।মসজিদে নব্বীর নির্মাণউট যেখানে বসে গিয়েছিলো জায়গাটি প্রকৃতমালিক থেকে কেনার পর সেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ নির্মাণ করেন। একজনমুহাজির ও আনসারী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন।ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক গভীর ও সুদৃঢ় হয়। মদীনারইয়াহুদিদের সাথে কুরাইশদের সম্পর্ক ছিল। তারামুসলিমদের মাঝে বিশৃংখলা, নৈরাজ্য ও কলহ-বিবাদ সৃষ্টিরপায়তারা চালাতো। কুরাইশরা মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করারহুমকিও প্রদর্শন করতো। এ ভাবে বিপদ ও আশংকামুসলিমদেরকে ভিতর ও বাইরে ঘিরে ছিল। পরিস্থিতিএ পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছে যে সাহাবায়ে কেরাম রাতেঘুমাবার সময় অস্ত্র রাখতেন।বদরের যুদ্ধএমন বিপদজনক ও বিপদ সংকুল পরিস্থিতিতি আল্লাহতা‘আলা সশস্ত্র যুদ্ধের অনুমতি দেন। রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্রদের তৎপরতা জানারলক্ষ্যে সামরিক মিশন চালানো আরম্ভ করেন।শক্রদের বানিজ্যিক কাফেলার পিছু নেয়া ওপ্রতিরোধ সৃষ্টি করতে লাগলেন, যাতে তারামুসলিমদের শক্তির কথা উপলদ্ধি করে শান্তি ও সন্ধিপ্রক্রিয়ায় এসে ইসলাম প্রচারের স্বাধিনতায় ও তাবাস্তবায়েন কোন ধরনের বিঘ্ন না ঘটায়। কতিপয়গোত্রের সাথে মৈত্রি চুক্তি ও দ্বি-পাক্ষিক চুক্তিওস্বাক্ষরিত হয়। একবার তিনি কুরাইশের এক বানিজ্যিককাফেলার পথ রুদ্ধ করা কল্পে তিন শত তের জনসাথী নিয়ে বের হন। সাথে ছিল ২টি ঘোড়া ৭০টিউট। আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে কুরাইশী কাফেলায়উট ছিলো ১০০০ এবং ৪০ জন লোক। আবু সুফিয়ানমুসলিমদের বের হবার কথা শুনে জরুরী ভিত্তিতেএক লোক পাঠিয়ে মক্কায় খবর দেয় এবং সাহায্যেরআবেদন জানিয়ে রাস্তা পরিবর্তন করে অন্য পথধরে। ফলে মুসলিমরা তাদেরকে ধরতে পারেননি। অন্য দিকে কুরাইশরা এ খবর পেয়ে ১০০০যোদ্ধা নিয়ে বের হয়ে পড়ে কাফেলারসাহায্যের জন্য। আবু সুফিয়ান কাফেলার নিরাপদেচলে আসার খবর জানিয়ে তাদেরকে মক্কায় ফিরেযাবার অনুরোধ জানায়। কিন্তু আবু জাহেল ফিরেযেতে অস্বীকার করে এবং যোদ্ধারা বদর নামকস্থান পর্যন্ত যাত্রা অব্যাহত রাখে। কুরাইশের বেরহবার কথা জেনে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামসাহাবায়ে কেরামদের সাথে পরামর্শ করলে সবাইকাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার রায় দেন। হিজরী২য় সনে ১৭ই রমজান শুক্রবার ভোর বেলায়উভয়দল মুখো মুখি হয় এবং তমুল যুদ্ধ চলে। মুসলিমরাবিপুলভাবে জয়লাভ করেন। তাদের মধ্যে ১৪জনশাহাদতের অমীয় সুধা পান করেন। ৭০ জন কাফেরনিহত এবং ৭০ জন গ্রেফতার হয়। যুদ্ধকালীন সময়েনবী কন্যা রুকাইয়্যা মৃত্যুবরণ করেন। ওসমান(রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলের নির্দেশে তাঁররোগাক্রান্ত স্ত্রীর পরিচর্যা ও দেখা-শুনার জন্যমদীনায় থেকে যাওয়ার ফলে বদর যুদ্ধেঅংশগ্রহন করতে পারেন নি। যুদ্ধের পরে রাসূলসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর আর এক মেয়েউম্মে কুলসুমকে ওসমানের সাথে বিয়ে দেন।তাই তাঁর উপাধি ছিল “যিন্নূরাইন” কারণ তিনি রাসূলেরদু’কন্যা বিয়ে করেছিলেন। যুদ্ধ শেষে মুসলিমরাআল্লাহর সাহায্যে উল্লাসিত ও আনন্দিত হয়েমদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। সাথে ছিল যুদ্ধবন্দী ও মালে গনিমত। যুদ্ধ বন্দীদের মধ্যেকিছু লোককে পণ্যের বিনিময়ে, আবারঅনেককে এমনিতে মুক্তি দেয়া হয়। তাদেরমধ্যে কিছু লোকের মুক্তিপণ ছিলো মুসলিমদের১০জন ছেলেকে লেখা পড়া শিখিয়ে দেয়া।ওহুদের যুদ্ধবদর যুদ্ধের পর মুসলিম ও মক্কার কাফেরদেরমধ্যে যেসব যুদ্ধ সংঘটিত হয় ওহুদ যুদ্ধ হচ্ছেতন্মধ্যে দ্বিতীয়। এতে মুশরিকরা জয়লাভ করে।কারণ কিছু সংখ্যক মুসলিম রাসূলের নির্দেশযথাযথভাবে পালন করেন নি। ফলে সুপরিকল্পিত কলাকৌশলকে ব্যাহত করে। যুদ্ধে কাফেরদের সংখ্যাছিল ৩০০০। পক্ষান্তরে মুসলিম ছিলেন ৭০০ জন।খন্দকের বা পরিখা যুদ্ধএ যুদ্ধের পর মদীনার কিছু ইয়াহুদী মক্কায় গিয়েমক্কাবাসীকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করারউস্কানি দেয় এবং নিজেদের সমর্থন, সাহায্যসহযোগিতার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। ফলেকাফেররা ইতবাচক সাড়া দেয়। অতঃপর ইয়াহুদীরাঅন্যান্য গোত্র সমুহকে উস্কানি দিলে তারাওমুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়ার প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত করে।মুশরিকরা প্রত্যেক এলাকা থেকে মদীনা অভিমুখেরওয়ানা দেয়। ১০,০০০ যোদ্ধা সমবেত হল। নবীসাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শক্রপক্ষের তৎপরতারকথা জেনে সাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করেন।সালমান ফারসী মদীনার যে দিকে পাহাড় নেই, সেদিকে পরিখা খননের পরামর্শ দেন। সব মুসলিমউদ্যম ও প্রেরণা সহকারে পরিখা খননে অংশগ্রহণকরেন এবং কাজ সত্ত্বর সমাপ্ত হয়। মুশরিকরা এক মাসপর্যন্ত অবস্থান করেও পরিখা অতিক্রম করতেসক্ষম হয়নি। অবশেষে আল্লাহ তা‘আলা প্রচন্ডবাতাস প্রেরণ করে কাফেরদের তাবু সমূহ উপড়েফেলেন । তারা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে এবংশীঘ্রই নিজ নিজ শহরে ফিরে যায়।মক্কা বিজয়হিজরি ৮ম সনে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামমক্কা অভিযান চালানোর ইচ্ছা করেন। ১০ই রমজান১০০০০ সদস্যের বাহিনী নিয়ে মক্কাঅভিমুখেরওয়ানা হন। মক্কায় যুদ্ধ ছাড়াই প্রবেশ করেন।কুরাইশরা আত্মসমর্পন করে। আল্লাহ তা‘আলামুসলিমদেরকে বিজয় দান করেন। নবী সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা‘বা শরীফ তাওয়াফ করে কা‘বারঅভ্যন্তরে দু’রাকআত নামায আদায় করেন। অতঃপরভেতরে রাখা সব মুর্তি চুর্ণ বিচুর্ণ করেন। কা‘বাশরীফের দরজায় দাড়িয়ে মসজিদে হারামেকাতারবদ্ধভাবে অপেক্ষারত সমবেতকুরাইশদেরকে বলেন, হে কুরাইশরা ! তোমাদেরসাথে কি আচরণ করবো বলে মনে করো। তাঁরাবলে ভালো আচরণ, দয়াবান ভাই, দয়াবান ভাই এর পুত্র।তিনি বলেন, যাও তোমরা সবাই মুক্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ষমার উজ্জল ও বৃহত্তম দৃষ্টান্তপেশ করেন। তারাই সেই লোক যারা তাঁর সাহাবাদেরউপর চালিয়ে ছিল অত্যাচারের স্ট্রীম রোলার, খুনকরেছে অনেককে, কষ্ট দিয়েছে স্বয়ং তাঁকেএবং নিজের মাতৃভুমি থেকে বহিস্কার করেছে।মক্কা বিজয়ের পর লোকজন দলে দলে আল্লাহরদ্বীনের ছায়াতলে সমবেত হয়। হিজরি ১০ম সনেরাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জ করেন। এটাতাঁর একমাত্র হজ্জ ছিল। তাঁর সাথে এক লাখ লোকহজ্জ করেন। হজ্জ পালন শেষে তিনি মদীনায়প্রত্যাগমন করেন।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুপ্রায় আড়াই মাস পর তিনি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন।দৈনন্দিন রোগ বেড়ে যায়। তীব্রভাবেরোগাক্রান্ত হয়ে ইমামতি করতে অক্সম হয়েপড়লে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)কে ইমামতিকরতে বলেন। হিজরি ১১ সনে ১২ ই রবিউল আওয়ালসোমবার ৬৩ বছর বয়সে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন। এ খবর শুনে সাহাবায়েকেরাম প্রায় জ্ঞান ও স্বস্থি হারিয়েফেলেছিলেন। এ খবর বিশ্বাস করতে পারছিলেননা। এমন সময় আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একভাষণে লোক জনকে শান্ত করেন। তিনি বলেন,রাসূল একজন মানুষ ছিলেন। যিনি মৃত্যু বরণ করেন।তিনি রাসূল এক জন মানুষ ছিলেন। যিনি মত্যু বরণকরেন যেমন অন্যান্য মানুষ মৃত্যু বরণ করে। মানুষশান্ত হয়ে যায়। রাসূলের গোসল দেয়া, কাফনপরানো ও দাফন করা সম্পুর্ণ হলো। অতঃপর মুসলিমরাআবু বকরকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নিজেদের খলিফানির্বাচন করেন। তিনি ছিলেন খোলাফয়েরাশেদীনের মধ্যে প্রথম। রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে চল্লিশবছর ও পরে তের বছর মক্কায় এবং দশ বছর মদিনায়অতিবাহিত করেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৬৩ বছর।তাঁর চরিত্রতিনি সর্বাপেক্ষা নির্ভীক ও সাহসী ছিলেন। আলিবিন আবূ তালিব বলেন, যখন তমুল যুদ্ধ শুরু হতো,এক দল অন্য দলের মুখোমুখি যুদ্ধ করতো,আমরা রাসূলকে আড়াল হিসাবে রাখতাম। তিনিসর্বাপেক্ষা দানবীর ছিলেন। কখনো কো জিনিসচাওয়া হলে তিনি না’ করেন নি। তিনি সর্বাপেক্ষাধৈর্যশীল ছিলেন। নিজের জন্য কোনপ্রতিশোধ নেন নি। নিজের স্বার্থের জন্যকখনো রাগাম্বিত হন নি। তবে হ্যাঁ, আল্লাহর হুকুম-বিধান লংঘন করা হলে আল্লাহর নিমিত্তেই প্রতিশোধনিয়েছেন। অধিকারের ব্যাপারে তাঁর নিকটেআত্মীয় অনাত্মীয়, দুর্বল, সবল সমান ছিলো।তিনি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন যে, তাকওয়া ছাড়াআল্লাহর কাছে কেউ কারো চাইতে শ্রেয় নয়।সব মানুষ সমান ও সমকক্ষ। পূর্ববর্তী জাতিগুলোএ জন্য ধ্বংস হয়েছে যে, কোন সম্ভ্রান্তলোক চুরি করলে ছেড়ে দিতো, আর কোনদুর্বল ব্যক্তি চুরি করলে শাস্তি দিতো। তিনি বললেন,আল্লাহর শপথ,ফাতেমা বিনতে মুহাম্মদ যদি চুরিকরে,তবে তার হাত কর্তন করবো। কখনোকোন খাবারের দোষ বর্ণনা করেন নি। রুচি সম্মতহলে আহার করতেন। অন্যথায় বর্জন করতেন।কোন কোন সময় এক মাস দু’মাস পর্যন্ত তাঁরবাড়িতে আগুন প্রজ্জলিত করা হতো না। তিনি ও তাঁরপরিবার শুধু খেজুর ও পানি আহার করেছেন। ক্ষুধারতীব্র জ্বালা প্রশমিত করার জন্য মাঝে মাঝে উদরমুবারকে প্রস্তর বেধে রাখতেন। অসুস্থব্যক্তিদের দেখতে যেতেন। তিনি জুতা সিলাইকরতেন, কাপড়ে তালি লাগাতেন এবং গৃহ কর্মে তাঁরপরিবারবর্গের সহযোগিতা করতেন। তিনি অতি নম্রছিলেন। ধনী গরীব, সম্ভ্রান্ত অসম্ভ্রান্ত সবারদাওয়াত গ্রহণ করতেন। ভাল বাসতেন গরীবমিসকীনকে প্রচুর। জানাযায় হাজির হতেন। পীড়িতলোকদের দেখতে যেতেন। কোন দরিদ্রব্যক্তিকে দারিদ্রের জন্য ঘৃণা করতেন না। কোনরাজা বা শাসককে তাঁর রাজত্ব ও যশ ঐশর্যের কারণেভয় করতেন না। ঘোড়া, উট, গাধা, ও খচ্চরের উপরআরোহন করতেন। সর্বাপেক্ষা সুদর্শন ছিলেন।সব চাইতে বেশি স্নিগ্ধ হাসতেন। অথচ দুঃখ্ বিপদঅনবরত আসতে থাকতো। সুগদ্ধি ভালবাসতেন।দূর্গন্ধ ঘৃণা করতেন। আল্লাহ পাক চারিত্রিক উৎকর্ষও সুন্দর কর্মের অনুপম সন্নিবেশ ঘটিয়েছিলেনতাঁর মধ্যে। আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে এমন জ্ঞান দানকরেছিলেন যা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অন্যকাউকে দান করা হয়নি।তিনি ছিলেন নিরক্ষর। জানতেন না লেখা-পড়া।মানুষের মধ্যে কেউ তাঁর শিক্ষক ছিলো না।আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে আসেন মহানগ্রন্থআল কুরআন যার সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ পাকবলেন, বলুন, যদি মানুষ ও জ্বীন এই কুরআনেরঅনুরূপ রচনা করার জন্য জড়ো হয় এবং তাঁরাপরস্পরের সাহায্যকারী হয়, তবুও তাঁরা কখনো এরঅনুরূপ রচনা করতে পারবেনা। ইসরা-৮৮.রাসূলের সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরক্ষরহওয়াটাই মিথ্যা অপবাদ কারীদের সব অহেতুকপ্রলাপের অকাট্য, অপ্রতিরোধ্য ও অখণ্ডনীয়উত্তর। যাতে একথা বলতে না পারে যে তিনিস্বহস্তে লিখেছেন বা অন্যের কাছেশিখেছেন বা অন্য সুত্র থেকে পাঠ করে সংগ্রহকরেছেন।তাঁর কতিপয় মু‘জিযাতাঁর সব চাইতে বড় মু‘জিযা কুরআন, যা আরবি সাহিত্যেরবড় বড় পন্ডিত ও সাহিত্যিকদের অপারগ করেদিয়েছে এবং সবাইকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেযে, কুরআনের অনুরুপ ১০ টি সূরা অথবা ১টি সূরা বাঅন্তত: পক্ষে ১টি আয়াত রচনা করে আনো।মুশরিকরা নিজেদের অক্ষমতার কথা স্বীকারকরেছ। মুশরিকরা একবার তাঁকে একটি নিদর্শনদেখানোর কথা বললে তিনি চন্দ্র বিদীর্ণহওয়াকে দেখান। চন্দ্র বিদীর্ন হওয়াকে দেখান।চন্দ্র বিদীর্ন হয়ে দু’টুকরো হয়ে গিয়েছিলো।অনেক বার তাঁর আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে পানি উৎসারিতহয়েছে। তাঁর হাতে পাথর তাসবীহ পাঠ করেছে,।অতঃপর যথাক্রমে আবু বকর, ওমার ও উসমানেরহাতেও তাসবীহ পাঠ করেছে। খাবার আহারকরাকালীন তাঁর কাছে তাসবীহ পাঠ করতো এবং এরধ্বনি সাহাবায়ে কেরাম শুনতে পেতেন। নবুওয়াতপ্রাপ্তির রাত সমূহে পাথর ও গাছপালা সালাম করেছে।এক ইয়াহূদী নারী রাসূলকে বিষপানে হত্যা করারজন্য ছাগলের এক পা খেতে দেয় যা বিষ মাখাছিলো। সে পা রাসূলের সাথে কথা বলে। একবারএক বেদুইন তাঁকে একটি নিদর্শন দেখাতে বলে।তিনি একটি গাছকে নির্দেশ দিলে রাসূলের কাছেআসে। আবার নির্দেশ দিলে যথা স্থানে চলে যায়।এক দুধ বিহীন ছাগলের স্থনে হাত মুবারাক স্পর্শকরায় দুগ্ধ আসে। তিনি তা দোহন করে নিজেও পানকরেন এবং আবু বকরকেও পান করতে দেন। আলিইবন আবুতালিবের ব্যথিত চোখে তিনি থুথু দিলেসঙ্গে সঙ্গে তা ভাল হয়ে যায়। এক সাহাবীপায়ের আঘাতে আহত হওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাত মুছিয়ে দিলে সঙ্গে সঙ্গেভাল হয়ে যায়। আনাস ইবন মালিকের জন্য সুদীর্ঘায়ূ,স্বচ্ছলতা এবং সন্তান-সন্ততি এত বরকত দান করেনযে, তাঁর স্ত্রীসমূহের ঔরসে ১২০ জন সন্তানজন্ম নেয়; তাঁর খেজুর গাছে বছরে দু’বার ফলধরত, অথচ এ কথা সুবিদিত যে খেজুর গাছে বছরেএক বারই ফল আসে। আর তিনি ১২০ বছর বয়সপেয়েছিলেন। এক সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহিওয়াসাল্লাম মিম্বারে ছিলেন, এমতাবস্থায় এক লোকএসে অনাবৃষ্টি ও খরা অবসানের জন্য দোয়ারআরজ করল। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামদোয়া করলেন। আকাশে কোন মেঘ ছিল না।হঠাৎ পর্বত সম মেঘ ছেয়ে গেল। মুষল ধারা বৃষ্টিহলো পরবর্তী জুমা পর্যন্ত। একই ব্যাক্তিঅতিবৃষ্টির অবসান হওয়ার জন্য দোয়ার আবেদনকরলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়াকরলে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যায়। মানুষ সূর্যের তাপেবের হয়ে গেলো। একটি ছাগল ও প্রায় তিনকিলো গ্রাম গম দিয়ে এক হাজার পরিখা যুদ্ধেরমুজাহিদগণকে পেট ভরে খাওয়ান। সাবাই খাওয়ারপরেও খাবার সামান্যও কম হয়নি। অনুরূপ ভাবে অল্পখেজুর দিয়ে পরিখা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদেরখাওয়ান যে খেজুর বাশির বিন সা’দের কন্যা তাঁর পিতা ওমামার জন্য এনে ছিলো এবং আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহুআনহু স্বল্প খাদ্য দ্বারা পরিখা যুদ্ধের মুজাহিদগণকেপেট ভরে খাওয়ান। তিনি একশ’জন কুরাইশ ব্যক্তি যারাতাঁকে হত্যা করার জন্য অপেক্ষা করতে ছিলো,এর মুখের দিকে মাটি ছিটিয়ে দিলে কেউ তাকেদেখতে সক্ষম হয়নি। তিনি তাদের নাকের ডগায়চলে গেলেন। সুরাকা বিন মালেক তাঁকে হত্যা করারজন্যে পিছু ধাওয়া করে আর রাসূল দোয়া করলেতার পা যমিনে ধসে যায়।গ্রন্থনা ও অনুবাদ:মক্তব তাওয়িয়াতুল জালিয়াত আল-জুলফিসম্পাদনা : ড. মো: আবদুল কাদেরসূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব

রাসুলুল্লাহ সঃ এর জীবনী পার্ট -এক

 হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) জীবনের কাহিনিমুহাম্মাদ (সঃ) আলাইহিঅসাল্লাম জন্ম:—-হযরত মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামবর্তমান সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশগোত্রের বনি হাশিম বংশে জন্মগ্রহণ করেন।প্রচলিত ধারনা মোতাবেক, উনার জন্ম ৫৭০খৃস্টাব্দে। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা মন্টগোমারি ওয়াটতার পুস্তকে ৫৭০ সনই ব্যবহার করেছেন। তবেউনার প্রকৃত জন্মতারিখবের করা বেশ কষ্টসাধ্য।তাছাড়া মুহাম্মদ(সা.)নিজে কোনো মন্তব্যকরেছেন বলে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমানপাওয়া যায়নি. এজন্যই এ নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধরয়েছে। এমনকি জন্মমাস নিয়েও ব্যপকমতবিরোধ পাওয়া যায় । [৩] যেমন, এক বর্ণনা মতে,উনার জন্ম ৫৭১ সালের ২০ বা ২২ শে এপ্রিল।সাইয়েদ সোলাইমান নদভী, সালমান মনসুরপুরী এবংমোহাম্মদ পাশা ফালাকির গবেষণায় এইতথ্য বেরিয়েএসেছে। তবে শেষোক্ত মতই ঐতিহাসিকদৃষ্টিকোণ থেকে বেশী নির্ভরযোগ্য। যাইহোক, নবীর জন্মের বছরেই হস্তী যুদ্ধেরঘটনা ঘটে এবং সে সময় সম্রাট নরশেরওয়ারসিংহাসনে আরোহনের ৪০ বছর পূর্তি ছিল এ নিয়েকারো মাঝে দ্বিমত নেই।শৈশব ও কৈশোর কালতত্কালীন আরবের রীতি ছিল যে তারা মরুভূমিরমুক্ত আবহাওয়ায় বেড়ে উঠার মাধ্যমে সন্তানদেরসুস্থ দেহ এবং সুঠাম গড়ন তৈরির জন্য জন্মেরপরপরই দুধ পান করানোর কাজে নিয়োজিতবেদুইন মহিলাদের কাছে দিয়ে দিতেন এবং নির্দিষ্টসময় পর আবার ফেরত নিতেন। এই রীতি অনুসারেমোহাম্মদকেও হালিমা বিনতে আবু জুয়াইবের (অপরনাম হালিমা সাদিয়া)হাতে দিয়ে দেয়া হয়। এই শিশুকেঘরে আনার পর দেখা যায় হালিমার সচ্ছলতা ফিরেআসে এবং তারা শিশুপুত্রকে সঠিকভাবে লালনপালনকরতে সমর্থ হন। তখনকার একটি ঘটনাউল্লেখযোগ্য – শিশু মোহাম্মদ কেবল হালিমারএকটি স্তনই পান করতেন এবং অপরটি তার অপরদুধভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। দুই বছরলালনপালনের পর হালিমা শিশু মোহাম্মদকে আমিনারকাছে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এর পরপরই মক্কায়মহামারী দেখা দেয় এবং শিশু মুহাম্মাদকে হালিমারকাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। হালিমাও চাচ্ছিলেন শিশুটিকেফিরে পেতে। এতেতার আশা পূর্ণ হল। ইসলামীবিশ্বাসমতে এর কয়েকদিন পরই একটি অলৌকিক ঘটনাঘটে – একদিন শিশু নবীর বুক চিরে কলিজার একটিঅংশ বের করে তা জমজম কূপের পানিতে ধুয়েআবার যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হয়। এই ঘটনাটিইসলামের ইতিহাসে সিনা চাকের ঘটনা হিসেবে খ্যাত।এই ঘটনার পরই হালিমা মুহাম্মাদকে মা আমিনার কাছেফিরিয়ে দেন। ছয় বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তিনিমায়ের সাথে কাটান। এই সময় একদিন আমিনার ইচ্ছা হয়ছেলেকে নিয়ে মদীনায় যাবেন। সম্ভবতকোন আত্মীয়ের সাথে দেখা করা এবং স্বামীরকবর জিয়ারত করাই এর কারণ ছিল। আমিনা ছেলে,শ্বশুর এবং দাসী উম্মে আয়মনকে নিয়ে ৫০০কিলোমিটারপথ পাড়ি দিয়ে মদীনায় পৌঁছেন। তিনিমদীনায় একমাস সময় অতিবাহিত করেন। একমাস পরমক্কায় ফেরার পথে আরওয়া নামক স্থানে এসেতিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেইমৃত্যুবরণ করেন। মাতার মৃত্যুর পর দাদা আবদুলমোত্তালেব শিশু মুহাম্মাদকে নিয়ে মক্কায়পৌঁছেন। এর পর থেকে দাদাই মুহাম্মাদেরদেখাশোনা করতে থাকেন। মোহাম্মদের বয়সযখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন তখন তার দাদাও মারা যান।মৃত্যুর আগে তিনি তার পুত্র আবু তালিবকেমোহাম্মদের দায়িত্ব দিয়ে যান।আবু তালিব ব্যবসায়ীছিলেন এবং আরবদের নিয়ম অনুযায়ী বছরেএকবার সিরিয়া সফরে যেতেন। মুহাম্মাদের বয়সযখন ১২ ব্ছর তখন তিনি চাচার সাথে সিরিয়া যাওয়ার জন্যবায়না ধরলেন। প্রগাঢ় মমতার কারণে আবু তালিব আরনিষেধ করতে পারলেননা। যাত্রাপথে বসরা পৌঁছার পরকাফেলাসহ আবু তালিব তাঁবু ফেললেন। সে সময়আরব উপদ্বীপের রোম অধিকৃত রাজ্যেররাজধানী বসরা অনেক দিক দিয়ে সেরা ছিল। কথিতআছে, শহরটিতে জারজিস সামেএক খ্রিস্টান পাদ্রীছিলেন যিনি বুহাইরা বা বহিরা নামেই অধিক পরিচিতছিলেন। তিনি তার গীর্জা হতে বাইরে এসেকাফেলার মুসাফিরদের মেহমানদারী করেন। এসময় তিনি বালক মুহাম্মাদকে দেখে শেষ নবীহিসেবে চিহ্নিত করেন। ফুজ্জারের যুদ্ধ যখনশুরুহয় তখন নবীর বয়স ১৫ বছর। এই যুদ্ধে তিনি স্বয়ংঅংশগ্রহণ করেন।যুদ্ধের নির্মমতায় তিনি অত্যন্তব্যথিত হন। কিন্তু তাঁর কিছু করার ছিলনা। সে সময়থেকেই তিনি কিছু একটি করার চিন্তাভাবনা শুরু করেন।নবুয়ত-পূর্ব জীবনআরবদের মধ্যে বিদ্যমান হিংস্রতা, খেয়ানতপ্রবণতাএবং প্রতিশোধস্পৃহা দমনের জন্যই হিলফুল ফুজুলনামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মাদ এতেযোগদান করেন এবং এই সংঘকে এগিয়ে নেয়ারক্ষেত্রে তিনি বিরাট ভূমিকারাখেন। বিভিন্ন সূত্রথেকে জানা যায় তরুণ বয়সে মুহাম্মাদের তেমনকোন পেশা ছিলনা। তবে তিনি বকরি চরাতেন বলেঅনেকেই উল্লেখ করেছেন। সাধারণত তিনি যেবকরিগুলো চরাতেন সেগুলো ছিল বনি সা’দগোত্রের। কয়েক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়েতিনি মক্কায় বসবাসরত বিভিন্ন ব্যক্তির বকরিও চরাতেন।এরপর তিনি ব্যবসায় শুরু করেন। মুহাম্মাদ অল্পসময়ের মধ্যেই একাজে ব্যাপক সফলতা লাভকরেন। এতই খ্যাতি তিনি লাভ করেন যে তার উপাধিহয়ে যায় আল আমিন এবং আল সাদিক যেগুলোর বাংলাঅর্থ হচ্ছে যথাক্রমে বিশ্বস্ত এবং সত্যবাদী।ব্যবসায় উপলক্ষ্যে তিনি সিরিয়া, বসরা, বাহরাইন এবংইয়েমেনে বেশ কয়েকবার সফর করেন।মুহাম্মাদের সুখ্যাতি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়েতখনখাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ তা অবহিত হয়েই তাকেনিজের ব্যবসার জন্য সফরে যাবার অনুরোধ জানান।মুহাম্মাদ এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং খাদীজার পণ্যনিয়ে সিরিয়ার অন্তর্গত বসরা পর্যন্ত যান।খাদীজামাইছারার মুখে মুহাম্মাদের সততা ও ন্যায়পরায়ণতারভূয়সী প্রশংশা শুনে অভিভূত হন। এছাড়া ব্যবসায়েরসফলতা দেখে তিনি তার যোগ্যতা সম্বন্ধেওঅবহিত হন। এক পর্যায়ে তিনি মুহাম্মাদকে বিবাহ করারসিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় বান্ধবী নাফিসাবিনতে মুনব্বিহরের কাছে বিয়ের ব্যাপরে তারমনের কথা ব্যক্ত করেন। নাফিসার কাছে শুনেমুহাম্মাদ বলেন যে তিনি তার অভিভাবকদের সাথে কথাবলেন জানাবেন। মুহাম্মাদ তাঁর চাচাদের সাথে কথাবলে বিয়ের সম্মতি জ্ঞাপন করেন। বিয়ের সময়খাদীজার বয়স ছিল ৪০ আর মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৫।খাদীজার জীবদ্দশায় তিনি আর কোন বিয়েকরেননি। খাদীজার গর্ভে মুহাম্মাদের ৬ জন সন্তানজন্মগ্রহণকরে যার মধ্যে ৪ জন মেয়ে এবং ২জন ছেলে। তাদের নাম যথাক্রমে কাসেম, যয়নাব,রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম’, ফাতিমা এবং আবদুল্লাহ।ছেলে সন্তানদুজনই শৈশবে মারা যায়। মেয়েদেরমধ্যে সবাই ইসলামী যুগ পায় এবং ইসলাম গ্রহণ করেএবং একমাত্র ফাতিমা ব্যতিত সবাই নবীরজীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করে।মুহাম্মাদের বয়সযখন ৩৫ বছর তখন কা’বা গৃহের পূনঃনির্মাণেরপ্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বেশ কয়েকটিকারণে কাবা গৃহের সংস্কার কাজ শুরু হয়। পুরনোইমারত ভেঙে ফেলে নতুন করে তৈরি করা শুরু হয়।এভাবে পুনঃনির্মানের সময় যখন হাজরে আসওয়াদ(পবিত্র কালো পাথর) পর্যন্ত নির্মাণ কাজ শেষ হয়তখনই বিপত্তি দেখা দেয়। মূলত কোনগোত্রের লোক এই কাজটি করবে তা নিয়েই ছিলকোন্দল। নির্মাণকাজ সব গোত্রের মধ্যে ভাগকরে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হাজরে আসওয়াদ স্থাপনছিল একজনের কাজ। কে স্থাপন করবে এ নিয়েবিবাদ শুরু হয় এবং চার-পাঁচ দিন যাবৎ এ বিবাদ অব্যাহত থাকারএক পর্যায়ে এটি এমনই মারাত্মক রূপ ধারণ করে যেহত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়।এমতাবস্থায় আবু উমাইয়া মাখজুমি একটি সমাধান নির্ধারণকরে যে পরদিন প্রত্যুষে মসজিদে হারামের দরজাদিয়ে যে প্রথম প্রবেশ করবে তার সিদ্ধান্তইসবাই মেনে নেবে। পরদিন মুহাম্মাদ সবার প্রথমেকাবায় প্রবেশ করেন। এতে সবাই বেশ সন্তুষ্টহয় এবং তাকেবিচারক হিসেবে মেনে নেয়। আরতার প্রতি সবার সুগভীর আস্থাও ছিল। যা হোক এইদায়িত্ব পেয়ে মুহাম্মাদ অত্যন্ত সুচারুভাবে ফয়সালাকরেন। তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তার উপর নিজহাতেহাজরে আসওয়াদ রাখেন এবং বিবদমান প্রত্যেকগোত্রের নেতাদের ডেকে তাদেরকেচাদরের বিভিন্ন কোণা ধরে যথাস্থানে নিয়েযেতে বলেন এবং তারা তা ই করে। এরপর তিনি পাথরউঠিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করেন।নবুওয়তপ্রাপ্তিচল্লিশ বছর বয়সে ইসলামের নবী মুহাম্মাদনবুওয়ত লাভ করেন, অর্থাৎ এই সময়েই স্রষ্টা তারকাছে ওহী প্রেরণ করেন। নবুওয়তসম্বন্ধেসবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়আজ-জুহরির বর্ণনায়। জুহরি বর্ণিত হাদীস অনুসারেনবী সত্য দর্শনের মাধ্যমে ওহী লাভ করেন।ত্রিশ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পর নবীপ্রায়ই মক্কারঅদূরে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটাতেন। তাঁরস্ত্রী খাদিজা নিয়মিত তাঁকে খাবারদিয়ে আসতেন।এমনি এক ধ্যানের সময় ফেরেশতা জিব্রাইল তারকাছে আল্লাহ প্রেরিত ওহী নিয়ে আসেন।জিব্রাইল তাঁকে এই পংক্তি কটি পড়তে বলেন:“পাঠকরুন, আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টিকরেছেন। সৃষ্টি করেছেনমানুষকে জমাট রক্তথেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনিকলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষাদিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।[৪]”উত্তরেনবী জানান যে তিনি পড়তে জানেন না, এতেজিব্রাইল তাকে জড়িয়ে ধরে প্রবল চাপ প্রয়োগকরেন এবং আবার একই পংক্তি পড়তে বলেন। কিন্তুএবারও মুহাম্মাদ নিজের অপারগতার কথা প্রকাশকরেন। এভাবে তিনবার চাপ দেয়ার পর মুহাম্মাদপংক্তিটি পড়তে সমর্থ হন। অবর্তীর্ণ হয়কুরআনের প্রথম আয়াত গুচ্ছ; সূরা আলাকের প্রথমপাঁচ আয়াত। প্রথম অবতরণের পর নবী এতই ভীতহয়ে পড়েন যে কাঁপতে কাঁপতে নিজ গ্রহেপ্রবেশ করেই খাদিজাকে কম্বল দিয়ে নিজের গাজড়িয়ে দেয়ার জন্য বলেন। বারবার বলতে থাবেন,“আমাকে আবৃত কর”। খাদিজানবীর সকল কথা সম্পূর্ণবিশ্বাস করেন এবং তাঁকে নবী হিসেবে মেনেনেন। ভীতি দূর করার জন্য মুহাম্মাদকে নিয়ে খাদিজানিজ চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফেলের কাছেযান। নওফেল তাঁকে শেষ নবী হিসেবেআখ্যায়িত করে। ধীরে ধীরে আত্মস্থ হননবী। তারপর আবার অপেক্ষা করতে থাকেনপরবর্তী প্রত্যাদেশের জন্য। একটি লম্বা বিরতিরপর তাঁর কাছে দ্বিতীয় বারের মত ওহী আসে।এবার অবতীর্ণ হয়সূরা মুদ্দাস্সির-এর কয়েকটি আয়াত।এর পর থেকে গোপনে ইসলাম প্রচারেআত্মনিয়োগ করেন মুহাম্মাদ। এই ইসলাম ছিলজীবনকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়ার জন্যপ্রেরিতএকটি আদর্শ ব্যবস্থা। তাই এর প্রতিষ্ঠার পথছিল খুবই বন্ধুর। এই প্রতিকূলততার মধ্যেই নবীরমক্কী জীবন শুরু হয়।মক্কীজীবনপ্রত্যাদেশ অবতরণের পর নবী বুঝতেপারেন যে, এটি প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাকেপুরো আরব সমাজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াতেহবে; কারণ তৎকালীন নেতৃত্বের ভীত ধ্বংস করাব্যাতীত ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার অন্য কোনউপায় ছিলনা। তাই প্রথমে তিনি নিজ আত্মীয়-স্বজন ওবন্ধু-বান্ধবের মাঝে গোপনে ইসলামের বাণীপ্রচার শুরু করেন। মুহাম্মাদের আহ্বানে ইসলামগ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন খাদিজা। এরপরমুসলিমহন মুহাম্মাদের চাচাতো ভাই এবং তার ঘরেইপ্রতিপালিত কিশোর আলী, ইসলাম গ্রহণের সময়তার বয়স ছিল মাত্র ১০বছর। ইসলামের বাণী পৌঁছেদেয়ার জন্য নবী নিজ বংশীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদেরনিয়ে একটি সভা করেন; এইসভায় কেউই তাঁর আদর্শমেনে নেয়নি,এ সভাতে শুধু একজনই ইসলাম গ্রহণকরে, সে হলো আলী। ইসলাম গ্রহণকারীতৃতীয় ব্যক্তি ছিল নবীর অন্তরঙ্গ বন্ধূ আবুবকর। এভাবেই প্রথম পর্যায়ে তিনি ইসলাম প্রচারেরকাজ শুরু করেন। এবং এই প্রচারকাজ চলতে থাকেসম্পূর্ণ গোপনে।প্রকাশ্য দাওয়াততিন বছরগোপনে দাওয়াত দেয়ার পর মুহাম্মাদ প্রকাশ্যেইসলামের প্রচার শুরু করেন। এ ধরণের প্রচারেরসূচনাটা বেশ নাটকীয় ছিল।নবী সাফা পর্বতেরওপর দাড়িয়ে চিৎকার করে সকলকে সমবেতকরেন। এরপর প্রকাশ্যে বলেন যে, আল্লাহ ছাড়াকোন প্রভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্র রাসূল। কিন্তুএতে সকলে তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড খেপে যায় এবংএই সময় থেকে ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ওঅত্যাচার শুরু হয়।মক্কায় বিরোধিতারসম্মুখীনবিরুদ্ধবাদীরা কয়েকটি স্তরে নির্যাতন শুরুকরে: প্রথমত উস্কানী ও উত্তেজনার আবহ সৃষ্টি,এরপর অপপ্রচার, কুটতর্ক এবং যুক্তি। এক সময়ইসলামী আন্দোলনকে সহায়হীন করার প্রচেষ্টাশুরু হয় যাকে সফল করার জন্য একটি নেতিবাচকফ্রন্ট গড়ে উঠে। একই সাথে গড়ে তোলা হয়সাহিত্য ও অশ্লীল গান-বাজনার ফ্রন্ট, এমনকি একংপর্যায়ে মুহাম্মাদের সাথে আপোষেরওপ্রচেষ্টা চালায় কুরাইশরা। কিন্তু মুহাম্মাদ তা মেনেনেননি; কারণ আপোষের শর্ত ছিল নিজের মতইসলাম পালন করা, সেক্ষেত্র তার ইসলাম প্রতিষ্ঠারলক্ষ্যই ভেস্তে যেতো।ইথিওপিয়ায়হিজরতধীরে ধীরে যখন মুসলিমদের বিরুদ্ধেসহিংসতা চরম রূপ ধারণ করে, তখন নবী কিছু সংখ্যকমুসলিমকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে পাঠান। সেখানথেকেও কুরাইশরা মুসলিমদের ফেরত আনারচেষ্টা করে, যদিও তৎকালীনআবিসিনিয়ার সম্রাটনাজ্জাশীর কারণে তা সফল হয়নি।গুরুত্বপূর্ণব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণএরপর ইসলামের ইতিহাসেযে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে তা হল উমর ইবনুলখাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ। নবী সবসময় চাইতেনযেন আবু জেহেল ও উমরের মধ্যে যেকোনএকজন অন্তত ইসলাম গ্রহণ করে। তার এই ইচ্ছাএতে পূর্ণতা লাভ করে। আরব সমাজে উমরেরবিশেষ প্রভাব থাকায় তার ইসলাম গ্রহণ ইসলামপ্রচারকে খানিকটা সহজ করে, যদিও কঠিন অংশটিইতখনও মুখ্য বলে বিবিচেত হচ্ছিল। এরপর একসময়নবীর চাচা হামযা ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলামগ্রহণে আরবে মুসলিমদের আধিপত্য কিছুটা হলেওপ্রতিষ্ঠিত হয়।একঘরে অবস্থাএভাবে ইসলাম যখনশ্লথ গতিতে এগিয়ে চলছে তখন মক্কার কুরাইশরামুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার অনুসারীসহ সহ গোটা বনু হাশেম গোত্রকে একঘরে ওআটককরে। তিন বছর আটক থাকার পর তারা মুক্তি পায়।দুঃখের বছর ও তায়েফ গমনকিন্তু মুক্তির পরেরবছরটি ছিল মুহাম্মাদের জন্য দুঃখের বছর। কারণএইবছরে খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তার স্ত্রীখাদিজা ও চাচা আবু তালিব মারা যায়। দুঃখের সময়ে নবীমক্কায় ইসলামের প্রসারের ব্যাপরে অনেকটাইহতাশ হয়ে পড়েন। হতাশ হয়ে তিনি মক্কা বাদ দিয়েএবার ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফ যান (অবশ্যতায়েফ গমনের তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে)।কিন্তু সেখানে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনিচূড়ান্ত অপমান, ক্রোধ ও উপহাসের শিকার হন।এমনকি তায়েফের লোকজন তাদের কিশোর-তরুণদেরকে মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পিছনে লেলিয়ে দেয়; তারা ইট-প্রস্তরেরআঘাতে নবীকে রক্তাক্ত করে দেয়। কিন্তুতবুও তিনি হাল ছাড়েননি; নব নব সম্ভবনার কথা চিন্তাকরতে থাকেন।মি’রাজ তথা উর্দ্ধারোহনএমনসময়েই কিছু শুভ ঘটনা ঘটে। ইসলামী ভাষ্যমতে এসময় মুহাম্মাদ এক রাতে মক্কায় অবস্থিত মসজিদুল হারামথেকে জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদুল আকসায়যান; এই ভ্রমণ ইতিহাসে ইসরা নামে পরিচিত। কথিতআছে, মসজিদুল আকসা থেকে তিনি একটি বিশেষযানে করে উর্দ্ধারোহণ করেন এবং মহান স্রষ্টারসান্নিধ্য লাভ করেন, এছাড়া তিনি বেহেশ্ত ওদোযখ সহ মহাবিশ্বের সকল স্থান অবলোকনকরেন। এই যাত্রা ইতিহাসে মি’রাজ নামে পরিচিত। এইসম্পূর্ণ যাত্রার সময়ে পৃথিবীতে কোন সময়ইঅতিবাহিতহয়নি বলে বলা হয়।মদীনায় হিজরতএরপরআরও শুভ ঘটনা ঘটে। মদীনার বেশকিছু লোকইসলামের প্রতি উৎসাহী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে।তারা মূলত হজ্জ্ব করতে এসে ইসলামে দাওয়াতপেয়েছিল। এরা আকাব নামক স্থানে মুহাম্মাদেরকাছে শপথ করে যে তারা যে কোন অবস্থায়নবীকে রক্ষা করবে এবং ইসলামে প্রসারে কাজকরবে। এই শপথগুলো আকাবার শপথ নামেসুপরিচিত।এই শপথগুলোর মাধ্যমেই মদীনায় ইসলামপ্রতিষ্ঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবংএকসময় মদীনার ১২ টিগোত্রের নেতারা একটিপ্রতিনিধিদল প্রেরণের মাধ্যমে মুহাম্মাদকে(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় আসারআমন্ত্রণ জানায়। মদীনা তথা ইয়াসরিবে অনেকআগে থেকে প্রায় ৬২০ সাল পর্যন্ত গোত্রগোত্র এবং ইহুদীদের সাথে অন্যদের যুদ্ধলেগে থাকে। বিশেষত বুয়াছের যুদ্ধেসবগুলো গোত্র যুদ্ধে অংশ নেয়ায় প্রচুররক্তপাতঘটে। এ থেকে মদীনার লোকেরাবুঝতে সমর্থ হয়েছিল যে, রক্তের বিনিময়েরক্ত নেয়ার নীতিটি এখন আর প্রযোজ্য হতেপারেনা। এজন্য তাদের একজন নেতা দরকার যেসবাইকে একতাবদ্ধ করতে পারবে। এ চিন্তাথেকেই তারা মুহাম্মাদকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল,যদিও আমন্ত্রণকারী অনেকেই তখনও ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেনি। এই আমন্ত্রণে মুসলিমরা মক্কাথেকে হিজরত করে মদীনায় চলে যায়।সবশেষে মুহাম্মাদ ও আবু বকর ৬২২ খ্রিস্টাব্দেমদীনায় হিজরত করেন। তাদের হিজরতের দিনেইকুরাইশরা মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)হত্যার পরিকল্পনা করেছিল যদিও তা সফল হয়নি।এভাবেই মক্কী যুগের সমাপ্তি ঘটে।মাদানীজীবনমূল নিবন্ধ: মদীনায় মুহাম্মাদ(সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম)নিজ গোত্র ছেড়ে অন্য গোত্রেরসাথে যোগদান আরবে অসম্ভব হিসেবেপরিগণিতহত। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সেরকমনয়,কারণ এক্ষেত্রে ইসলামের বন্ধনই শ্রেষ্ঠ বন্ধনহিসেবে মুসলিমদের কাছে পরিগণিত হত। এটিতখনকার যুগে একটি বৈপ্লবিক চিন্তারজন্ম দেয়।ইসলামী পঞ্জিকায় হিজরতের বর্ষ থেকে দিনগণনা শুরু হয়। এজন্য ইসলামী পঞ্জিকারবর্ষেরশেষে AH উল্লেখিত থাকে যার অর্থ:After Hijra।স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সংবিধানপ্রণয়নমুহাম্মাদ মদীনায় গিয়েছিলেন একজনমধ্যস্থতাকারী এবং শাসক হিসেবে। তখন বিবদমান দুটিমূল পক্ষ ছিল আওস ও খাযরাজ। তিনি তার দায়িত্বসুচারুরুপে পালন করেছিলেন। মদীনার সকলগোত্রকে নিয়ে ঐতিহাসিক মদীনা সনদস্বাক্ষরকরেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথমসংবিধানহিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।এই সনদের মাধ্যমেমুসলিমদের মধ্যে সকল রক্তারক্তি নিষিদ্ধ ঘোষণাকরা হয়। এমনকি এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতিরগোড়াপত্তন করা হয় এবং সকল গোত্রের মধ্যেজবাবদিহিতার অনুভুতি সৃষ্টি করা হয়। আওস, খাযরাজ উভয়গোত্রই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এছাড়াও প্রধানততিনটি ইহুদী গোত্র (বনু কাইনুকা, বনু কুরাইজা এবং বনুনাদির)। এগুলোসহ মোট আটটি গোত্র এই সনদেস্বাক্ষর করেছিল। এই সনদের মাধ্যমে মদীনাএকটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবংমুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)হন তার প্রধান।মক্কার সাথে বিরোধ ও যুদ্ধমদীনায় রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠার পরপরই মক্কার সাথে এর সম্পর্ক দিন দিনখারাপ হতে থাকে। মক্কার কুরাইশরা মদীনা রাষ্ট্রেরধ্বংসের জন্য যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণকরতে থাকে।মুহাম্মাদ(স)মদীনায় এসেআশেপাশের সকল গোত্রের সাথে সন্ধি চুক্তিস্থাপনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপনে অগ্রণীছিলেন। কিন্তু মক্কার কুরাইশরা গৃহত্যাগী সকলমুসলিমদের সম্পত্তি ক্রোক করে। এই অবস্থায়৬২৪ সালে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)৩০০ সৈন্যের একটি সেনাদলকে মক্কারএকটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে বাঁধা দেয়ার উদ্দেশ্যেপাঠায়। কারণ উক্ত কাফেলা বাণিজ্যের নাম করেঅস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। কুরাইশরা তাদেরকাফেলা রক্ষায় সফল হয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টারপ্রতিশোধ নেয়ার জন্য যুদ্ধের ডাক দেয়।আত্মরক্ষামূলক এই যুদ্ধে মুসলিমরা সৈন্য সংখ্যার দিকদিয়ে কুরাইশদেরএক তৃতীয়াংশ হয়েও বিজয় অর্জনকরে। এই যুদ্ধ বদর যুদ্ধ নামে পরিচিত যা ৬২৪খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ তারিখে সংঘটিত হয়। মুসলিমদেরমতে এই যুদ্ধে আল্লাহ মুসলিমদের সহায়তাকরেছিলেন। যাহোক, এই সময় থেকেইইসলামের সশস্ত্র ইতিহাসের সূচনা ঘটে। এরপর৬২৫ সালের ২৩ মার্চে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিতে হয়।এতে প্রথম দিকে মুসলিমরা পরাজিত হলেও শেষেবিজয়ীরবেশে মদীনায় প্রবেশ করতে সমর্থহয়। কুরাইশরা বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্তমুহূর্তের নীতিগত দূর্বলতার কারণে পরাজিতেরবেশে মক্কায় প্রবেশ করে। ৬২৭ সালে আবুসুফিয়ান কুরাইশদের আরেকটি দল নিয়ে মদীনাআক্রমণ করে। কিন্তু এবারও খন্দকের যুদ্ধেমুসলিমদের কাছে পরাজিত হয়। যুদ্ধ বিজয়ে উৎসাহিতহয়ে মুসলিমরা আরবে একটি প্রভাবশালী শক্তিতেপরিণত হয়। ফলেআশেপাশের অনেকগোত্রের উপরই মুসলিমরা প্রভাব বিস্তারে সক্ষমহয়।মদীনার ইহুদিদের সাথে সম্পর্ককিন্তু এ সময়মদীনার বসবাসকারী ইহুদীরা ইসলামী রাষ্ট্রেরজন্য হুমকী হয়ে দেখা দেয়। মূলত ইহুদীরাবিশ্বাস করতনা যে, একজন অ-ইহুদী শেষ নবীহতে পারে। এজন্য তারা কখনই ইসলামের আদর্শমেনে নেয়নি এবং যখন ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তিবুঝতে পারে তখন তারা এর বিরুদ্ধে শক্তিপ্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে।মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)প্রতিটি যুদ্ধেরপরে একটি করে ইহুদী গোত্রের উপরআক্রমণ করেন। বদর ও উহুদের যুদ্ধের পর বনুকাইনুকা ও বনু নাদির গোত্র সপরিবারে মদীনাথেকে বিতাড়িত হয়; আর খন্দকের পর সকলইহুদীকে মদীনা থেকে বিতাড়ন করা হয়।[৫]মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এই ইহুদীবিদ্বেশের দুটি কারণের উল্লেখ পাওয়া যায়, একটিধর্মীয় এবং অন্যটি রাজনৈতিক[৬]। ধর্মীয় দিক দিয়েচিন্তা করলে আহলে কিতাব হয়েও শেষ নবীকেমেনে না নেয়ার শাস্তি ছিল এটি। আর রাজনৈতিকভাবেচিন্তা করলে, ইহুদীরা মদীনার জন্য একটি হুমকীও দুর্বল দিক ছিল। এজন্যই তাদেরকে বিতাড়িত করাহয়।[৭]হুদাইবিয়ার সন্ধিকুরআনে যদিও মুসলিমদেরহজ্জ্বের নিয়ম ও আবশ্যকীয়তা উল্লেখ ককরাআছে, তথাপি কুরাইশদের শত্রুতার কারণে মুসলিমরাহজ্জ্ব আদায় করতে পারছিল না। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক দিব্যদর্শনে দেখতে পানতিনি হজ্জ্বের জন্য মাথা কামাচ্ছেন। এ দেখে তিনিহজ্জ্ব করার জন্য মনস্থির করেন এবং ৬হিজরীসনের শাওয়াল মাসে হজ্জ্বেরউদ্দেশ্যে ১৪০০ সাহাবা নিয়ে মদীনার পথে যাত্রাকরেন। কিন্তু এবারও কুরাইশরা বাঁধা দেয়।অগত্যামুসলিমরা মক্কার উপকণ্ঠে হুদাইবিয়া নামকস্থানে ঘাঁটি স্থাপন করে। এখানে কুরাইশদের সাথেমুসলিমদের একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যাইতিহাসে হুদাইবিয়ার সন্ধি নামে সুপরিচিত। এই সন্ধিমতে মুসলিমরা সে বছর হজ্জ্ব করা ছাড়াই মদীনায়প্রত্যাবর্তন করে। সন্ধির অধিকাংশ শর্ত মুসলিমদেরবিরুদ্ধে গেলেও মুহাম্মাদ এই চুক্তি সম্পাদনকরেছিলেন।বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কদের কাছে পত্রপ্রেরণরাসূল (সাঃ)সারা বিশ্বের রাসূল হিসেবেপ্রেরিত হয়েছিলেন। সুতরাং পৃথিবীর সব জায়গায়ইসলামের আহ্বান পৌঁছ দেয়া তাঁর দায়িত্ব ছিল। হুদায়বিয়ারসন্ধির পর কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলোথেকে আশ্বস্ত হয়ে এ কাজে মননিবেশকরেন। সেসময়ে পৃথিবীর প্রধান রাজশক্তিগুলোছিল ইউরোপের রোম সাম্রাজ্য (the holy romanempire),এশিয়ার পারস্য সাম্রাজ্য এবং আফ্রিকার হাবশাসাম্রাজ্য। এছাড়াও মিশরের ‘আযীয মুকাউকিস’,ইয়ামামারসর্দার এবং সিরিয়ার গাসসানী শাসনকর্তাও বেশপ্রতাপশালী ছিল। তাই ষষ্ঠ হিজরীর জিলহজ্জমাসের শেষদিকে একইদিনে এদেঁর কাছেইসলামের আহ্বানপত্রসহ ছয়জন দূত প্রেরণকরেন।প্রেরিত দূতগণের তালিকাদািহয়া ক্বালবী(রাঃ)কে রোমসম্রাট কায়সারের কাছে।আবদুল্লাহবিন হুযাফা (রাঃ)কে পারস্যসম্রাট পারভেজের কাছে।হাতিব বিন আবূ বুলতা’আ (রাঃ) কে মিশরৈর শাসনকর্তারকাছে।আমর বিন উমাইয়া (রাঃ) কে হাবশার রাজানাজ্জাশীর কাছে।সলীত বিন উমর বিন আবদেশামস (রাঃ) কে ইয়ামামার সর্দারের কাছে।শুজাইবনেওয়াহাব আসাদী (রাঃ)কে গাসসানী শাসক হারিসেরকাছে।শাসকদের মধ্য হতে শুধুমাত্রবাদশাহনাজ্জাসী ছাড়া আর কেউ ইসলাম গ্রহণকরেননি।মক্কা বিজয়মূল নিবন্ধ: মুসলমানদের মক্কাবিজয়দশ বছরমেয়াদি হুদাইবিয়ার সন্ধি মাত্র দু’ বছরপরেই ভেঙ্গে যায়। খুযাআহ গোত্র ছিলমুসলমানদের মিত্র,অপরদিকে তাদের শত্রু বকরগোত্র ছিল কুরাইশদের মিত্র। একরাতেবকরগোত্র খুযাআদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়।কুরাইশরা এই আক্রমণেঅন্যায়ভাবে বকরগোত্রকে অস্ত্র দিয়ে সহয়োগিতা করে।কোন কোন বর্ণনামতে কুরাইশদের কিছু যুবকওএইহামলায় অংশগ্রহণ করে। এই ঘটনার পর মুহাম্মাদ (সঃ)কুরাইশদের কাছে তিনটি শর্তসহ পত্র প্রেরণকরেন এবং কুরাইশদেরকে এই তিনটি শর্তের যেকোন একটি মেনে নিতে বলেন। শর্ত তিনটিহলো;কুরাইশ খুযাআ গোত্রের নিহতদের রক্তপণশোধ করবে।অথবা তারা বকর গোত্রের সাথেতাদের মৈত্রীচুক্তি বাতিল ঘোষণা করবে।অথবা এঘোষণা দিবে যে, হুদায়বিয়ারসন্ধি বাতিল করাহয়েছে এবং কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।কুরাইশরা জানালো যে, তারা শুধু তৃতীয় শর্তটি গ্রহণকরবে। কিন্তু খুব দ্রুত কুরাইশ তাদের ভুল বুঝতেপারলো এবং আবু সুফয়ানকে সন্ধি নবায়নের জন্যদূত হিসেবে মদীনায় প্রেরণ করলো। কিন্তুমুহাম্মাদ (সঃ)কুরাইশদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেনএবং মক্কা আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করলেন।৬৩০খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদ (সঃ) দশহাজার সাহাবীর বিশালবাহিনী নিয়ে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন।সেদিনছিল অষ্টম হিজরীর রমজান মাসের দশ তারিখ।বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষ ছাড়া মোটামুটি বিনাপ্রতিরোধেমক্কা বিজিত হলো এবং মুহাম্মাদ (সঃ) বিজয়ীবেশেসেখানে প্রবেশ করলেন। তিনি মক্কাবাসীরজন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলেন। তবে দশজননর এবং নারী এই ক্ষমার বাইরে ছিল। তারাবিভিন্নভাবেইসলাম ও মুহাম্মাদ (সঃ)এর কুৎসা রটাত। তবে এদেরমধ্য হতেও পরবর্তিতে কয়েকজনকে ক্ষমা করাহয়। মক্কায় প্রবেশ করেই মুহাম্মাদ (সঃ) সর্বপ্রথমকাবাঘরে আগমন করেন এবং সেখানকার সকল মূর্তিধ্বংস করেন। মুসলমানদের শান-শওকত দেখে এবংমুহাম্মাদ (সঃ)এর ক্ষমাগুণে মুগ্ধ হয়ে অধিকাংশমক্কাবাসীই ইসলাম গ্রহণ করে। কোরআনে এইবিজয়ের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।মক্কা বিজয়ের পরমূল নিবন্ধ:মক্কা বিজয়ের পরেমুহাম্মাদমৃত্যুমূল নিবন্ধ:মুহাম্মাদের মৃত্যুবিদায় হজ্জথেকে ফেরার পর হিজরী ১১সালের সফর মাসেমুহাম্মদ (সাঃ) জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের তাপমাত্রাপ্রচন্ড হওয়ার কারণে পাগড়ির ওপর থেকেওউষ্ণতা অনুভূত হচ্ছিল। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনিএগারো দিন নামাজের ইমামতি করেন। অসুস্থতাতীব্র হওয়ার পর তিনি সকল স্ত্রীর অনুমতি নিয়েআয়েশা (রাঃ)এর কামরায় অবস্থান করতে থাকেন। তাঁরকাছে সাত কিংবা আট দিনার ছিল,মৃত্যুর একদিন পূর্বেতিনি এগুলোও দান করে দেন। বলা হয়, এই অসুস্থতাছিল খাইবারের এক ইহুদি নারীর তৈরি বিষ মেশানোখাবার গ্রহণের কারণে। অবশেষে ১১ হিজরীসালের রবিউল আউয়াল মাসের ১ তারিখ সন্ধায় তিনিমৃত্যবরণ করেন। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩বছর। আলী(রাঃ) তাকেঁ গোসল দেন এবং কাফনপরান।আয়েশ (রাঃ)এর কামরার যে স্থানে তিনিমৃত্যুবরণ করেন,জানাযার পর সেখানেই তাকেঁ দাফনকরা হয়।ইসলামী বর্ণনামতে মুহাম্মাদেরঅলৌকিকত্বব্যতিক্রমের প্রতি আকর্ষন মানুষেরস্বভাবজাত, অন্যদিকে অলৌকিকত্বের প্রভাবআমাদের লৌকিক জীবনে সুদূর প্রসারী। আরবীমু’জেযা শব্দের অর্থ আসাধারন বিষয়, অলৌকিকত্ব।মুহাম্মদের [স.] অসংখ্য মু’জেযার মধ্যে প্রকাশ্যমু’জেযার সংখ্যা দশ হাজারেরও অধিক।[৮]ব্যাখ্যাকারীগণ মুহাম্মদের [স.]মু’জেযাগুলোকে তিনভাগে বিভক্ত করেআলোচনা করেছেন।প্রথমত যা তাঁর দেহ হতেবহির্ভূত। যথা- চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়া, বৃক্ষ নিকটেআসা, ঊট ও হরিনের অভিযোগ ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত যাতাঁরদেহসম্পৃক্ত যথা- ‘মহরে নবুওয়াত’ যাহলো দুইকাঁধের মাঝখানেআল্লাহর রাসূল মোহাম্মাদবাক্যটিলেখা ছিল মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। তৃতীয়ত তাঁরনৈতিকও চারিত্রিক গুণাবলী যথা- নির্ভিক, অকুতোভয়,দানশীল, সত্য ভাষণকারী, দুনিয়াবিমুখ ইত্যাদি। আলকোরানের সুরা ক্বামারে মুহাম্মদের [স.] আংগুলদ্বারা চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়ার কথা বলা আছে। বদরযুদ্ধের আগের দিন বদর নামকস্থানে পৌঁছে মুহাম্মদ[স.] বললেন ‘এটা আমুকের শাহাদাতের স্থান, এটাঅমুকের (কাফেরের) হত্যার স্থান… সাহাবীরা (রা.)বলেন ‘রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যারজন্য যে স্থান দেখিয়েছেন, তার সামান্য এদিকসেদিক হয়নি।’ (মুসলিম) বিভিন্ন যুদ্ধে আকাশেরফেরেশতাগন অংশগ্রহন করতো। যা আল্লাহর সাহায্যও রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএরমু’জেযার প্রমান। হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস(রাঃ) বলেন- ‘ ওহুদের যুদ্ধের দিন আমি রাসুলুল্লাহ!সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এরডানে বামে সাদাপোষাকের দু জন কে (জিব্রাইল, মিকাইল) দেখলামযাদের কে আর কোন দিন দেখেনি। (বুখারী,মুসলিম)সাহাবীর ভাংগা পা রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরস্পর্শে ভালো হওয়া আরো একটিমু’জেযা। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আতীক (রাঃ)এর পা ভেংগে গেলে তিনি তা রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জানালে রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম তার পায়ের উপর হাত বুলালেন।সাহাবী বলেন- ‘ এতে আমার পা এমনভাবে সুস্থহয়ে গেলো যেন তাতে আমি কখনো আখাতইপাইনি। (বুখারী) স্বল্প খাদ্যে হাজার মানুষেরপরিতৃপ্ত ভোজন হওয়া প্রিয়নবী রাসুলুল্লাহ!সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উল্লেখযোগ্যমু’জেযা। এরুপ বহু ঘটনা বহু সাহাবী বর্ণনাকরেছেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় যখনরাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সকলসাহাবীগন ক্ষুধায় অস্থির ও দুর্বলহয়ে পরেছিলেনতখন জাবের (রাঃ) একটি বকরীর বাচ্চা জবাই করলেনআর এক সা পরিমান জবের রুটি তৈরি করলেন আর তাদিয়েই সবাই তৃপ্তিতে খেলেন। সাহাবী জাবের(রাঃ) আল্লাহর শপথ করে বলেন- ‘সকলে তৃপ্তিসহকারে খেয়ে চলে যাওয়ার পরও চুলায় গোশতভর্তি ডেকচি ফুটছিল এবং রুটি হচ্ছিল।’(বুখারী, মুসলিম)

আদম আঃ এর সৃষ্টি ও শয়তানের অবাধ্যতার কারণ!!

 হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টি এবং শয়তানেরঅবাধ্যতার কাহিনী।হযরত আদম (আঃ) এর সৃষ্টি এবং শয়তানের অবাধ্যতারকাহিনী।আল্লাহ ছাড়া আর কোন সৃষ্টিকর্তা নেই । হযরতমোহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর বান্দা ওরাসূল । হযরত আদম(আঃ) হলেন মানব জাতির পিতা । উনাকে আল্লাহতায়ালাপ্রথম সৃষ্টি করেন । তারপর উনার সঙ্গী মা হওয়া(আঃ) কে সৃষ্টি করেন । কুরআন ও হাদীসে আদম(আঃ) এর সৃষ্টি সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুজানতেপারি । আবু আশআরী (রাঃ) বলেন, রাসূলূল্লাহ (সাঃ)বলেছেনঃআল্লাহ তায়ালা আদম (আঃ) কে পৃথিবীথেকে সংগৃহীত এক মুঠো মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেন। তাই মাটি অনুপাতে আদম সন্তানদের কেউহয় সাদা,কেউ হয় গৈারবর্ণ, কেউ হয় কালো, কেউ হয়মাঝামাঝি । ঈষৎ শাব্দিক পার্থক্যসহ তিনি ভিন্ন সূত্রেউক্ত হাদীসটি বর্ণনা করেছেন । সুদ্দী (রঃ) ইবনআব্বাস ও ইবন মাসউদ (রা) সহ কতিপয় সাহাবা সূত্রেবর্ণনা করেন যে, তারা বলেনঃ আল্লাহতায়ালা কিছুকাদামাটি নেয়ার জন্য জিব্রাঈল (আ) কে যমীনেপ্রেরণ করেন । তিনি এসে মাটি নিতে চাইলেযমীন বলল, তুমি আমার অঙ্গ হানি করবে বা আমাতেখুত সৃষ্টি করবে ; এ ব্যাপারে তোমার নিকটথেকে আমি আল্লাহর কাছে পানাহ চাই । ফলেজীব্রাঈল (আঃ) মাটি না নিয়ে ফিরে গিয়ে বললেন,হে আমার রব ! যমীন তোমার আশ্রয় প্রার্থনাকরায় আমি তাকে ছেড়ে এসেছি । এবারআল্লাহতায়ালা মীকাঈল (আ) কে প্রেরণ করেন ।যমীন তার নিকট থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করেবসে। তাই তিনিও ফিরে গিয়ে জিব্রাঈল (আ) এর মতইবণনা দেন । এবার আল্লাহতায়ালা মালাকুল মউত বাআযরাঈল (আ) কে প্রেরণ করেন। যমীন তারকাছ থেকেও আশ্রয় প্রার্থনা করলে তিনি বললেন,আর আমিও আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন না করে শূন্যহাতে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে তার পানাহ চাই । এ কথাবলে তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন স্হানথেকে সাদা, লাল ওকালো রঙের কিছু মাটি সংগ্রহ করে মিশিয়ে নিয়েচলে যান । এ কারণেই আদম (আঃ) এর সন্তানদেরএক একজনের রঙ এক এক রকম হয়ে থাকে ।আজরাঈল (আঃ) মাটিনিয়ে উপস্হিত হলে আল্লাহতায়ালামাটি গুলো ভিজিয়ে নেন । এতে তা আঠালোহয়েযায় । তারপর আল্লাহতায়ালা ঘোষণা করেনঃ “কাদামাটি দ্বারা আমি মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি । যখন আমিতাকে সুঠাম করব এবং তাতেআমার রুহ সন্চার করব ;তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো । “(১৫/২৮)তারপর আল্লাহতায়ালা আদম (আঃ) কে নিজ কুদরতিহাতে সৃষ্টি করেন যাতে ইবলিশ অহংকার করতে নাপারে । তারপর মাটির তৈরীএ মানব দেহটি আল্লাহচল্লিশ দিন রূহ প্রদান ব্যতীত ফেলে রাখে । তখনএই দেহটির প্রতি লক্ষ্য করে ফেরেশ্তারা এবংইবলিশ ঘুরাঘুরি করত । আর আল্লাহর সৃস্টিকে বুঝারচেষ্টা করত । ইবলিশ আদম (আঃ) এর প্রাণহীনদেহটিকে আঘাত করলে তা ঠন ঠন আওয়াজ করে ।সে দেহটির চারপাশে ঘুরে বলত , তুমি একটিবিশেষ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি হয়েছ । এরপর তারমধ্যে রূহ সন্চার করার সময় এলে আল্লাহতায়ালাবললেনঃ আমি যখন এর মধ্যে রুহ সন্চার করব, তখনএর প্রতি সেজদাবনত হয়ো । যথাসময়েআল্লাহতায়ালাআদম (আঃ) এর দেহে রুহ সন্চার করেন , তখন রুহতার মাথার মধ্যে প্রবেশ করে এবং তিনি হাচি দেন ।ফেরেশ্তারা বললেন, আপনি আল-হামদুলিল্লাহ বলুন ।আদম (আঃ) আল-হামদু লিল্লাহবললেন । জবাবেআল্লাহতায়ালা বললেন, তোমার রব তোমাকে রহমকরুন। তারপর উনার দৃস্টি জান্নাতের ফল-ফলাদির দিকেগেল । তিনি উনার পেটে ক্ষুধা অনুভব করলেন এবংফল-ফলাদি খাওয়ার আকাংখা মনে আসল এবং তাসেগুলো পাওয়ার জন্য তাড়াতাড়ি করে ছুটে যান । একারণেই আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মানুষ সৃষ্টিগতভাবেইত্বরাপ্রবণ ‘ (২১/৩৭) সূরা সাদে আল্লাহতায়ালা বলেন,” স্বরণ কর, তোমার প্রতিপালকফেরেশ্তাদেরকে বলেছিলেন, আমি মানুষ সৃষ্টিকরেছি কাদা মাটি থেকে । যখন আমি তাকে সুষমকরব এবং তাতে আমার রূহ সন্চার করব, তখন তোমরাতার প্রতি সিজদাবনত হয়ে । তখন ফেরেশ্তারাসকলেই সিজদাবনত হলো – কেবল ইবলিশব্যতীত । সে অহংকার করল এবং কাফিরদেরঅর্ন্তভুক্ত হলো । তিনি বললেন, হে ইবলিশ ! আমিযাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করলাম , তার প্রতি সিজদাবনতহতে তোমাকে কিসেবাধা দিল ? তুমি কি উদ্ধতপ্রকাশ করলে না কি তুমি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ? সেবলল, আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠ । আপনি আমাকেআগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃস্টিকরেছেন কাদামাটি থেকে । তিনি বললেন, তুমি এখানথেকে বের হয়ে যাও । নিশ্চয়ই তুমি বিতাড়িত এবংতোমার উপর আমার লা’নৎ স্হায়ী হবে কর্মফলদিবস পর্যন্ত । সে বলল, আমার প্রতিপালক ! আপনিআমাকে অবকাশ দিন পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত । তিনিবললেন, তুমি অবকাশ প্রাপ্তদের অর্ন্তভুক্ত হলে– অবধারিত সময় উপস্হিত হওয়ার দিন পর্যন্ত । সেবলল- আপনার ক্ষমতার শপথ ! আমি তাদেরসকলকেই পথভ্রষ্ট করব । তবে তাদের মধ্যেআপনার একনিষ্ঠ বান্দাদেরকে নয় । আর তিনিবললেন, তবে এটাই সত্য – আর আমি সত্যই বলি –তোমার দ্বারা আর তোমার অনুসারীদের দ্বারাআমিজাহান্নাম পূর্ণ করবই । (৭১-৮৫) সূরা আরাফেআল্লাহতায়ালা বললেন, “সে বলল, আপনি আমাকেউদভ্রান্ত করলেন , এজন্য আমিও তোমার সরলপথে নিশ্চয়ই ওৎ পেতে বসে থাকব । তারপর আমিতাদের নিকটআসবই সম্মুখ, পশ্চাৎ, দক্ষিণ এবংবাম দিকথেকে এবং তুমি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞরূপেপাবে না ।” সুদ্দী আবু সালিহ ও আবু মালিকেরসূত্রে ইবন আব্বাস (রাঃ)থেকে এবং মুররা এরসূত্রে ইবন মাসউদ (রাঃ) ও কতিপয় সাহাবা থেকেবর্ণনা করেন যে, তারা বলেনঃআল্লাহতায়ালাইবলিশকে জান্নাত থেকে বের করে দেন ।আদম (আঃ) তথায় নিঃসঙ্গ একাকী ঘুরে বেড়াতেথাকেন । এখানে তার স্ত্রী নেই যার কাছে গিয়েএকটু শান্তি লাভ করা যায় । এক সময় তিনি ঘুমিয়েপড়েন । জাগ্রত হয়ে দেখতে পেলেন যে,তার শিয়রেএকজন নারী উপবিষ্ট রয়েছেন ।আল্লাহতায়ালা তাকে আদম (আঃ) এর পাজরের হাড়থেকে সৃষ্টি করেন । তাকে দেখে আদম (আঃ)জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কে ? তিনি বললেনঃআমিএকজন নারী । আদম (আঃ) বললেন, তোমাকেকেন সৃষ্টি করা হয়েছে ? জবাবে তিনি বললেন,যাতে আপনি আমার কাছে শান্তি পান । তখনফেরেশ্তাগন আদম (আঃ) এর জ্ঞান যাচাই করার জন্যজিজ্ঞাসা কররেন, হে আদম ! উনার নাম কি বলুনতো ! আদম আঃ বললেন, হাওয়া । আবার তারা জিজ্ঞাসাকরলেন, আচ্ছা হাওয়া নাম হলো কেন ? আদম (আঃ)বললেন, কারণ তাকে ‘হাই’ (জীবন্ত সত্তা)থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে ।এ প্রসঙ্গেআল্লাহতায়ালা বলেন,“হে মানব জাতি ! তোমরাতোমাদের রবকে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকেএক ব্যাক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও যিনি তা হতেতার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেন এবং তাদের দুজনথেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন ।” (৪/১)সহীহবুখারী ও মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছেযে, আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলূল্লাহ (সাঃ)বলেছেনঃ ‘মহিলাদের ব্যাপারে তোমরা আমারসদুপদেশ গ্রহণ কর । কেননা, নারীদেরকেপাজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে । আরপাজরের উপরের অংশটুকুই সর্বাধিক বাকা ।যদি তুমি তাসোজা করতে যাও তাহলেভেঙ্গে ফেলবে এবংআপন অবস্হায় ছেড়ে দিলে তা বাকাই থেকেযাবে ।অতএব, মহিলাদের ব্যাপারে তোমরা আমারসদুপদেশ গ্রহণ কর ” সূত্রঃ আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ।আবুল ফিদা হাফিজ ইবন কাসির আদ-দামেশ্কী (র)।

Translate