Thursday, August 27, 2026

টাক সমস্যার সমাধানে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বা মাথায় চুল প্রতিস্থাপন

 টাক সমস্যার সমাধানে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বা মাথায় চুল প্রতিস্থাপন: পরিচয়, পদ্ধতি ও শরয়ি বিধান:

মাথায় চুল কমে যাওয়া বা টাক পড়ার সমস্যা আজকাল বেশ সাধারণ। মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ অতঃপর আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের কল্যাণে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বা চুল প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে এখন এর স্থায়ী সমাধান পাওয়া সম্ভব। নিম্নে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই অগ্রগতি হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট কী, কীভাব তা করা হয়, কারা এই পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে এবং এর শরিয়তে দৃষ্টিতে এর বিধান কী ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
❒ মাথায় চুল প্রতিস্থাপন (হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট) কী? এর পদ্ধতি কী এবং কারা তা করতে পারে:
চুল পড়া বা টাকের একটি আধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা চুল প্রতিস্থাপন। দেহের অন্যান্য অঙ্গের (যেমন কিডনি, চোখ) মতো চুলও প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে মাথার এক অংশ থেকে চুল নিয়ে অন্য অংশে লাগিয়ে দেওয়া হয়। চুল প্রতিস্থাপনে ক্ষেত্রে বর্তমানে প্রচলিত সবচেয়ে আধুনিক ও ঝঞ্ঝাটহীন উপায়কে বলা হয়, (DHI- Direct Hair Implantation-সরাসরি চুল প্রতিস্থাপন) পদ্ধতি। পুরনো পদ্ধতিতে যেমন পুরো চামড়া কেটে ফেলতে হয় বা বড় কোনও কাটার ব্যাপার থাকে, ডিএইচআই-তে সেগুলোর কোনও ঝামেলাই নেই। এতে ডাক্তার সাহেব একটি বিশেষ ছোট কলম বা হাত দিয়ে চালানোর মতো যন্ত্র (যাকে হ্যান্ড পাঞ্চ বলা হয়) ব্যবহার করে মাথার পেছন বা পাশ থেকে খুব যত্নসহকারে একটি একটি করে চুল বা ফলিকল তুলে নেন।(গাছের যেভাবে গাছের শিকড় সহ গাছ তোলা হয় সে রকম) এরপর ঠিক একইরকম নিখুঁতভাবে যেখানে চুল নেই সেখানে ইমপ্লান্টার পেন দ্বারা খুব সূক্ষ্ম ছিদ্র করে চুলের ফলিকলটি বসিয়ে দেওয়া বসিয়ে দেন। যেহেতু এখানে কাটাছেঁড়া প্রায় হয়ই না এবং কাজটা খুব সূক্ষ্মভাবে করা হয় তাই এতে রক্তপাত ও জটিলতা অনেক কম হয় আর দাগ পড়ার বা শুকানোর ঝামেলাও থাকে না বললেই চলে। যাঁদের বয়স পঁচিশ-ত্রিশ বছর হওয়ার আগেই বংশগত বা হরমোনের কারণে মাথার চুল পড়ে যায়, বয়স বা মেনোপজের পর যেসব নারীর মাথায় টাক দেখা দেয়, কিংবা কোনও দুর্ঘটনার কারণে যাঁরা স্থায়ীভাবে চুল হারিয়েছেন এবং প্রাকৃতিকভাবে আর চুল গজানোর উপায় নেই মূলত তাঁরাই হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা চুল প্রতিস্থাপন করাতে পারেন। আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহে এই পদ্ধতি অপারেশনের ফলে ৪-৬ মাসের মধ্যে নতুন চুল গজাতে শুরু করে এবং ১ থেকে দেড় বছরের মধ্যে স্থায়ী ফলাফল পাওয়া যায়। আলাদা কোনও বাড়তি যত্নের প্রয়োজন হয় না এবং স্বাভাবিক চুলের মতোই কাটা বা স্টাইল করা যায়।
❑ হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট-এর শরয়ি বিধান:
এ সম্পর্কে শরিয়তের বিধান হলো—এটি সম্পূর্ণ জায়েজ। কারণ এটি কোনও ধরনের অহেতুক সৌন্দর্য চর্চা বা আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি আনা নয়। বরং জন্মগত বা পরবর্তী সময়ের সৃষ্ট ত্রুটি ও অপূর্ণতা দূর করার একটি মাধ্যম। নিম্নে এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া উল্লেখ করা হলো:
✪ শাইখ মুহাম্মদ ইবনে উসাইমিন (রহ.):
একবিংশ শতকের অন্যতম ইসলামি ফিকহ বিশেষজ্ঞ আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ ইবনে সালেহ আল উসাইমিন (রাহ.) [মৃত্যু: ২০০১ সাল] কে জিজ্ঞাসা করা হয়, টাকপড়া ব্যক্তির চুল প্রতিস্থাপন করা হয় মাথার পেছন থেকে চুল নিয়ে প্রয়োজনীয় স্থানে বসিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে। এটা কি জায়েজ?
তিনি উত্তরে বলেন:
نَعَمْ يَجُوزُ؛ لِأَنَّ هَذَا مِنْ بَابِ رَدِّ مَا خَلَقَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ، وَمِنْ بَابِ إِزَالَةِ الْعَيْبِ، وَلَيْسَ هُوَ مِنْ بَابِ التَّجْمِيلِ أَوِ الزِّيَادَةِ عَلَى مَا خَلَقَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ، فَلَا يَكُونُ مِنْ بَابِ تَغْيِيرِ خَلْقِ اللَّهِ، بَلْ هُوَ مِنْ رَدِّ مَا نَقَصَ وَإِزَالَةِ الْعَيْبِ، وَلَا يَخْفَى مَا فِي قِصَّةِ الثَّلَاثَةِ النَّفَرِ الَّذِي كَانَ أَحَدُهُمْ أَقْرَعَ وَأَخْبَرَ أَنَّهُ يُحِبُّ أَنْ يَرُدَّ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ عَلَيْهِ شَعْرَهُ فَمَسَحَهُ الْمَلَكُ فَرَدَّ اللَّهُ عَلَيْهِ شَعْرَهُ فَأُعْطِيَ شَعْرًا حَسَنًا.
“হ্যাঁ, এটি জায়েজ। কারণ এটি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির স্বাভাবিক রূপ ফিরিয়ে দেওয়া এবং ত্রুটি দূর করার অন্তর্ভুক্ত, অতিরিক্ত কোনও সৌন্দর্যবর্ধন আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে অতিরিক্ত কিছু সংযোগ করার আওতায় পড়ে না। তাই এটি ‘আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন’ এর অন্তর্ভুক্ত হবে না। বরং এটি হলো যা কম ছিল তা পুনরুদ্ধার করা এবং ত্রুটি বা অপূর্ণতা দূর করা। এক্ষেত্রে তিন ব্যক্তির সেই বিখ্যাত ঘটনাটি প্রণিধানযোগ্য, যার মধ্যে একজন ছিলেন টাক মাথাওয়ালা। তিনি আল্লাহর কাছে এই দোয়াই করেছিলেন যেন আল্লাহ তাঁর মাথার চুল ফিরিয়ে দেন। এরপর ফেরেশতা তাঁর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলে আল্লাহ তাঁকে সুন্দর চুল দান করেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) [ফাতাওয়া উলামাইল বালাদিল হারাম (পৃষ্ঠা ১১৮৫)]
❑ জর্ডান ফতওয়া বোর্ড:
জর্ডানের ফতওয়া বোর্ডকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা উত্তরে বলেন,
زِرَاعَةُ الشَّعْرِ هِيَ عِبَارَةٌ عَنْ عَمَلِيَّةٍ تَجْمِيلِيَّةٍ يَتِمُّ فِيهَا زَرْعُ الشَّعْرِ فِي الْجِلْدِ، وَهِيَ لَيْسَتْ مِنْ تَغْيِيرِ خَلْقِ اللَّهِ تَعَالَى، بَلْ مِنَ الْمُعَالَجَةِ الَّتِي يُقْصَدُ بِهَا رَدُّ الْأَمْرِ إِلَى طَبِيعَتِهِ الَّتِي خَلَقَهُ اللَّهُ تَعَالَى عَلَيْهَا
وَهَذِهِ الْقَضِيَّةُ مِنَ الْمَسَائِلِ الْمُعَاصِرَةِ الَّتِي ظَهَرَتْ بِسَبَبِ التَّطَوُّرِ الْعِلْمِيِّ وَالْمَعْرِفِيِّ، وَقَدْ قَرَّرَ الْفُقَهَاءُ أَنَّ الْأَصْلَ فِي الْأَشْيَاءِ الْإِبَاحَةُ، وَذَلِكَ عِنْدَ عَدَمِ وُجُودِ نَصٍّ أَوْ قَاعِدَةٍ كُلِّيَّةٍ تَقْتَضِي التَّحْرِيمَ، وَبِشَرْطِ أَنْ لَا يَكُونَ فِي الْأَمْرِ ضَرَرٌ أَوْ إِضْرَارٌ
فَإِذَا كَانَتْ عَمَلِيَّةُ زِرَاعَةِ الشَّعْرِ بِهَذِهِ الشُّرُوطِ فَلَا إِشْكَالَ فِيهَا شَرْعًا، جَاءَ فِي قَرَارِ مَجْمَعِ الْفِقْهِ الْإِسْلَامِيِّ الدَّوْلِيِّ رَقْمِ (173) لِعَامِ (2007م) بِشَأْنِ عَمَلِيَّاتِ التَّجْمِيلِ: «يَجُوزُ شَرْعًا إِجْرَاءُ الْجِرَاحَةِ التَّجْمِيلِيَّةِ الضَّرُورِيَّةِ وَالْحَاجِيَّةِ الَّتِي يُقْصَدُ مِنْهَا… إِصْلَاحُ الْعُيُوبِ الطَّارِئَةِ (الْمُكْتَسَبَةِ) مِنْ آثَارِ الْحُرُوقِ وَالْحَوَادِثِ وَالْأَمْرَاضِ وَغَيْرِهَا، مِثْلَ: زِرَاعَةِ الْجِلْدِ وَتَرْقِيعِهِ… وَزِرَاعَةِ الشَّعْرِ حَالَةَ سُقُوطِهِ خَاصَّةً لِلْمَرْأَةِ»
وَعَلَيْهِ؛ فَإِنَّ زِرَاعَةَ الشَّعْرِ لِشَخْصٍ مَا مِنْ شَعْرِهِ نَفْسِهِ جَائِزَةٌ، جَاءَ فِي قَرَارِ مَجْمَعِ الْفِقْهِ الْإِسْلَامِيِّ رَقْمِ (26) لِعَامِ (1988م): «يَجُوزُ نَقْلُ الْعُضْوِ مِنْ مَكَانٍ مِنْ جِسْمِ الْإِنْسَانِ إِلَى مَكَانٍ آخَرَ مِنْ جِسْمِهِ، مَعَ مُرَاعَاةِ التَّأَكُّدِ مِنْ أَنَّ النَّفْعَ الْمُتَوَقَّعَ مِنْ هَذِهِ الْعَمَلِيَّةِ أَرْجَحُ مِنَ الضَّرَرِ الْمُتَرَتِّبِ عَلَيْهَا، وَبِشَرْطِ أَنْ يَكُونَ ذَلِكَ لِإِيجَادِ عُضْوٍ مَفْقُودٍ أَوْ لِإِعَادَةِ شَكْلِهِ أَوْ وَظِيفَتِهِ الْمَعْهُودَةِ لَهُ، أَوْ لِإِصْلَاحِ عَيْبٍ أَوْ إِزَالَةِ دَمَامَةٍ تُسَبِّبُ لِلشَّخْصِ أَذًى نَفْسِيًّا أَوْ عُضْوِيًّا».
“হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বা চুল প্রতিস্থাপন হলো মূলত একধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি, যার মাধ্যমে ত্বকে চুল রোপণ করা হয়। এটি আল্লাহ তাআলার সৃষ্টির পরিবর্তন নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হলো সৃষ্টিকর্তার নির্ধারিত স্বাভাবিক রূপ ও বিন্যাসে তা ফিরিয়ে আনা। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতির কল্যাণে এটি আজকের যুগের একটি নতুন মাসআলা বা সমসাময়িক বিষয় হিসেবে সামনে এসেছে। ফিকহবিদদের সাধারণ মূলনীতি হলো, “কোনও বিষয়ে যদি হারাম ঘোষণা করার মতো স্পষ্ট কোনও নস বা সার্বিক নীতিমালা না থাকে তবে তার মূল ভিত্তি হলো বৈধতা—শর্ত কেবল একটাই। তা হলো তাতে যেন কোনও ধরনের ক্ষতি বা অপকারিতা না থাকে। সুতরাং এই শর্তগুলো সাপেক্ষে চুল প্রতিস্থাপন করাতে শরিয়তে কোনও বাধা নেই। ২০০৭ সালের আন্তর্জাতিক ইসলামি ফিকহ অ্যাকাডেমির ১৭৩ নম্বর সিদ্ধান্তে প্লাস্টিক সার্জারি বা কসমেটিক সার্জারি সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“জরুরি ও প্রয়োজনীয় প্লাস্টিক সার্জারি বা কসমেটিক সার্জারি শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ। যেগুলোর উদ্দেশ্য হলো… অগ্নিদগ্ধ, দুর্ঘটনা, রোগবালাই বা অন্য কোনও কারণে সৃষ্ট আকস্মিক ত্রুটিগুলো সংশোধন করা; যেমন চামড়া গ্রাফটিং ও প্রতিস্থাপন করা… এবং চুল পড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে চুল প্রতিস্থাপন করা, বিশেষ করে নারীদের জন্য।” তাছাড়া নিজের শরীরের এক অংশ থেকে চুল এনে অন্য স্থানে প্রতিস্থাপন করাও সম্পূর্ণ জায়েজ। ১৯৮৮ সালের ইসলামি ফিকহ একাডেমির ২৬ নম্বর সিদ্ধান্তে বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে: “মানুষের শরীরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে অঙ্গ স্থানান্তর করা জায়েজ। তবে শর্ত হলো, এই অপারেশন থেকে প্রাপ্ত কল্যাণ এর সম্ভাব্য ক্ষতির চেয়ে বেশি হবে বলে নিশ্চিত হতে হবে। আর এর উদ্দেশ্য হতে হবে, কোনও হারানো অঙ্গ ফিরিয়ে আনা, তার পূর্বের স্বাভাবিক আকৃতি বা কার্যকারিতা পুনর্বহাল করা, কিংবা এমন কোনও ত্রুটি বা কুৎসিত রূপ দূর করা যা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জন্য মানসিক বা শারীরিক কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।” [ফতোয়া নম্বর: ৩৫৮৪, তারিখ: ১৮-০৮-২০২০, শ্রেণি: পোশাক, সাজসজ্জা ও ছবি]
❑ দুটি জরুরি জ্ঞাতব্য:
১. টাক সমস্যার সমাধানে ওষুধ বা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করায় শরিয়তে কোনও বাধা নেই। কারণ এগুলো বৈধ চিকিৎসারই অন্তর্ভুক্ত। তবে শর্ত হলো, ব্যবহৃত উপাদানগুলো যেন ক্ষতিকর বা নাপাক না হয়।
২. টাক ঢাকতে ইসলামের দৃষ্টিতে কৃত্রিমভাবে চুল লাগানো বা পরচুলা ব্যবহার করা সাধারণভাবে নিষিদ্ধ। পুরুষ-নারী সকলের জন্যই একই বিধান-উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন।
সারাংশ: হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট বা চুল প্রতিস্থাপন কোনও নিষিদ্ধ সৌন্দর্য চর্চা বা আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধন নয়; বরং এটি জন্মগত বা বাহ্যিক কোনও ত্রুটি ও অপূর্ণতা দূর করার একটি বৈধ চিকিৎসা পদ্ধতি। শরিয়তের মৌলিক নীতি এবং প্রখ্যাত ফতওয়া বোর্ড ও উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য অনুযায়ী—প্রয়োজনীয় শর্ত সাপেক্ষে মাথা থেকে চুল নিয়ে তা প্রতিস্থাপন করায় শরিয়তে কোনও বাধা নেই। অনুরূপভাবে টাক সমস্যার সমাধানে ওষুধ বা প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করায় শরিয়তে কোনও বাধা নেই। তবে টাক ঢাকতে ইসলামের দৃষ্টিতে কৃত্রিমভাবে চুল লাগানো বা পরচুলা ব্যবহার করা হারাম। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক ও শরিয়ত সম্মতি পদ্ধতিতে আমাদের রোগব্যাধির চিকিৎসা, দৈহিক ত্রুটি দূর করা সহ সকল সমস্যার সমাধান করার তওফিক দান করুন এবং হারাম থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

এটি কতই না উত্তম বিদআত এর অর্থ এবং বিদআতের প্রকারভেদ

 উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর উক্তি:

«نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هَذِهِ»
“এটি কতই না উত্তম বিদআত!”-এর অর্থ এবং বিদআতের প্রকারভেদ
প্রশ্ন: কেউ কেউ বলেন, বিদআতের মধ্যে বিদআতে হাসানাহ বা ভালো বিদআত ও বিদআতে সাইয়েয়াহ বা মন্দ বিদআত রয়েছে। এর দলিল হিসেবে তারা তারাবিহ সম্পর্কে উমর (রা.)-এর সেই উক্তি পেশ করেন:
«نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هَذِهِ»
“এটি কতই না উত্তম বিদআত!” এই প্রকারভেদ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
উত্তর: কিছু আলেম মনে করেন, বিদআতকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায় এবং তাতে শরিয়তের পাঁচটি হুকুম প্রযোজ্য হয়— হারাম, ওয়াজিব, মাকরুহ, মুস্তাহাব ও মুবাহ। একদল আলেম এ মত পোষণ করেছেন। আবার অন্য আলেমগণ এ প্রকারভেদ অস্বীকার করে বলেছেন, বিদআতের মধ্যে কোনো ভাগ নেই। বরং প্রতিটি বিদআতই গোমরাহি (ভ্রষ্টতা)। মুসলিমদের নেতা ও ইমাম রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই এমনটা বলেছেন,
كل بدعة ضلالة.
—”প্রতিটি বিদআতই গোমরাহি।”
কারো জন্য এর বিপরীত বলার সুযোগ নেই যে, না, সব বিদআত গোমরাহি নয়। এমনটা বলা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর একধরনের ধৃষ্টতা, যা জায়েজ নয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
كُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
“প্রতিটি নবউদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতই গোমরাহি।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৬৭, বর্ণনাকারী: জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)]
তিনি স্পষ্টভাবেই এ কথা বলেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন। কাজেই আমাদের বা অন্য কারও জন্য এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, বিদআতের কিছু অংশ গোমরাহি আর কিছু অংশ গোমরাহি নয়। বরং প্রতিটি বিদআতই গোমরাহি।
– বিদআত কাকে বলে?
বিদআত হলো, মানুষ দ্বীনের মধ্যে যা নতুন সৃষ্টি করে, তার সবটাই গোমরাহি। যারা বিদআতকে ভাগ করার পক্ষে দলিল পেশ করেন তাদের সে দলিলে আসলে কোনো প্রমাণ নেই।
তারা ‘ওয়াজিব বিদআত’-এর দলিল হিসেবে যেসব বিষয় উপস্থাপন করেন—যেমন: মুসহাফে (কুরআনে) নুকতা ও হরকত বসানো, মসজিদ নির্মাণ—এসবের কোনোটিই বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং এসব হলো আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদেশকৃত বিষয়। আল্লাহ মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন, কুরআনের হেফাজত, মুখস্থকরণ ও তিলাওয়াতের প্রতি যত্নবান হতে নির্দেশ দিয়েছেন। যা কিছু এসব কাজে সহায়ক হয় তা এই হেফাজত ও যত্নের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।
মূল কথা হলো, তারা যা উল্লেখ করেছেন তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং তা দ্বীনের অংশ, দ্বীন হেফাজত করার অংশ এবং নেকি ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সাহায্য করার অংশ।
এবার আসা যাক উমর (রা.)-এর সেই উক্তির ব্যাখ্যায়, যা তিনি বলেছিলেন যখন তিনি দেখলেন, মানুষ তাঁর নির্দেশে তারাবিহর নামাজে একত্রিত হয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে মানুষ একা একা এবং ছোট ছোট দলে নামাজ পড়ত। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কয়েক রাত তাদের নিয়ে জামাতে নামাজ পড়ান, তিন রাত টানা কিয়াম করান, তারপর তা বন্ধ করে দেন এবং বলেন, “আমি আশঙ্কা করছি, তোমাদের ওপর রাতের এই নামাজ ফরজ করে দেওয়া হতে পারে।” তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর উম্মতের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন।
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওফাতের পর সিদ্দিক (রা.) মুরতাদদের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, আর সাহাবিগণও তাতে ব্যস্ত ছিলেন। এরপর উমর (রা.)-এর খিলাফতের সময় এলে তিনি এসব বিষয় থেকে অপেক্ষাকৃত অবসর পান। আর তাঁর শাসনকালও দীর্ঘ ছিল। তখন তিনি লক্ষ করলেন, মানুষ মসজিদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আলাদা আলাদাভাবে নামাজ পড়ছে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সবাইকে এক ইমামের পেছনে একত্র করবেন। তিনি সাহাবি উবাই (রা.)-কে তাদের ইমামতি করার নির্দেশ দেন। এরপর একরাতে যখন তিনি বের হয়ে তাদের একত্রে নামাজরত অবস্থায় দেখলেন তখন বললেন,
نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هَذِهِ
“এটি কতই না উত্তম বিদআত!” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১০]
এখানে তিনি একে ভাষাগত অর্থে ‘বিদআত’ বলেছেন, দ্বীনি অর্থে নয়। কেননা ভাষায় ‘বিদআত’ বলা হয় এমন কিছুকে যার পূর্বে কোনো নজির ছিল না। অর্থাৎ এর আগে মানুষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নামাজ পড়ত, এক ইমামের পেছনে একত্র হতো না। যখন তিনি তাদের একত্র করলেন, তখন বললেন, “এটি কতই না উত্তম বিদআত”—যা তিনি নিজে তাদের জন্য করেছিলেন, যাতে তারা একত্রিত হয় এবং নেকি ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহায়তা করে। আর যেহেতু রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এটি ধারাবাহিকভাবে করেননি—মাত্র তিন রাত করে তারপর বন্ধ করে দিয়েছিলেন—তাই উমর (রা.) এ কথা বলেছিলেন। এটি তাঁর ভাষাগত ব্যবহার, শরয়ি অর্থে নয়। কাজেই শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বিদআত নয় বরং তা সুন্নত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি আমল, যা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে করেছেন, খুলাফায়ে রাশিদিন—উমর ও তাঁর পরবর্তীগণ—করেছেন, সাহাবায়ে কেরাম করেছেন এবং মুসলিমগণও করে আসছেন। আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই এর প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেছেন,
مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا؛ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ
“যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাত জেগে নামাজ পড়বে তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৫৯ — বর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)]
তিনি আরও বলেছেন,
مَنْ قَامَ مَعَ الْإِمَامِ حَتَّى يَنْصَرِفَ؛ كُتِبَ لَهُ قِيَامُ لَيْلَةٍ
“যে ব্যক্তি ইমামের সাথে (তারাবিহ) শেষ পর্যন্ত দাঁড়াবে তার জন্য পুরো রাত কিয়াম করার সওয়াব লেখা হবে।” [সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৮০৬ (হাসান সহিহ), বর্ণনাকারী: আবু যর গিফারি (রা.)]
এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, তারাবিহর নামাজ শরিয়তসম্মত। তাতে ইমাম ও জামাত থাকা বৈধ। এটি কোনোভাবেই বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়।”
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
ফতওয়া প্রদান: আল্লামা ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)।
সাবেক প্রধান মুফতি, সৌদি আরব।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

কুরআন কি আল্লাহর সৃষ্ট এ বিষয়ে সঠিক আকিদা

 কুরআন কি আল্লাহর সৃষ্ট, নাকি অসৃষ্ট কালাম? তিলাওয়াতের আওয়াজ বা কণ্ঠস্বর, কুরআন লেখার কাগজ, কালি ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক আকিদা কী?

প্রশ্ন: কুরআন মাজিদের শব্দ ও অর্থ কি সৃষ্ট, নাকি আল্লাহর অসৃষ্ট কালাম? তিলাওয়াতের আওয়াজ ও লেখার কাগজ ইত্যাদি বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ-এর আকিদা কী?
উত্তর: মহাগ্রন্থ কুরআন মহান আল্লাহর কালাম (বাণী), যা তাঁর সিফাত বা গুণ। কুরআনের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ এবং তার অর্থ—সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং অসৃষ্ট। ইমাম ইবনে কুদামা আল মাকদিসি (রহ.) তাঁর “লুমআতুল ই’তিকাদ” গ্রন্থে বলেন:
مُنَزَّلٌ غَيْرُ مَخْلُوقٍ، مِنْهُ بَدَأَ وَإِلَيْهِ يَعُودُ
“(কুরআন আল্লাহর নিকট থেকে) অবতীর্ণ, অসৃষ্ট; তাঁর থেকে শুরু হয়েছে এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাবে।” [লুমআতুল ই’তিকাদ, পৃষ্ঠা: ১৮]
এই বিশুদ্ধ আকিদাটি মূলত দুটি ভ্রান্ত মতবাদকে খণ্ডন করে:
◈ মুতাজিলা ও জাহমিয়াদের মত, যাদের আকিদা হলো, কুরআন (শব্দ ও অর্থ উভয়ই) সৃষ্ট।
◈ পরবর্তী কিছু কালাম-শাস্ত্র বা যুক্তিবিদ (আশআরি-মাতুরিদি মতাবলম্বীদের একাংশ)-এর মত, যারা বলে আমরা মুখে যে কুরআন তিলাওয়াত করি তা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আসল কালাম নয়; বরং আল্লাহর আসল কালাম হলো কেবল একটি অদৃশ্য “অর্থ” (কালামে নাফসি বা আল্লাহর আত্মিক বাণী)। তাদের ধারণা অনুযায়ী, আমরা মুখে যে কালাম পাঠ করি তা সেই আসল অর্থের একটি মানবীয় প্রকাশ বা অনুবাদ মাত্র, যা সৃষ্ট।
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ ও সালাফদের অবস্থান ছিল এর বিপরীত। তাঁরা বলেন, আল্লাহর কালাম শুধু নিছক কোনও অদৃশ্য অর্থ নয়; বরং কুরআন তার অক্ষর, শব্দ ও অর্থ—সকল দিক থেকেই আল্লাহর প্রকৃত কালাম এবং তা অসৃষ্ট। এ বিষয়ে শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.) বলেন:
فَالْقُرْآنُ كُلُّهُ كَلَامُ اللَّهِ، مُنَزَّلٌ غَيْرُ مَخْلُوقٍ، مِنْهُ بَدَأَ وَإِلَيْهِ يَعُودُ بِحُرُوفِهِ وَمَعَانِيهِ جَمِيعًا
“সম্পূর্ণ কুরআন আল্লাহর কালাম, অবতীর্ণ, অসৃষ্ট—হরফ ও অর্থসহ সবকিছুই তাঁর থেকে শুরু হয়ে তাঁর দিকে ফিরে যাবে।” [ফতোয়া নং: ১০১৫২, শাইখ ইবনে বায-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট]
❑ তিলাওয়াতের আওয়াজ বা কণ্ঠস্বর ও কুরআন লেখার কাগজ, কালি ইত্যাদি প্রসঙ্গে:
এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা জরুরি, যা আহলুস সুন্নাহর ইমামগণ স্পষ্ট করেছেন:
◈ যা তিলাওয়াত করা হয় এবং যা মুসহাফে (কুরআনে) লেখা আছে (অর্থাৎ কুরআনের শব্দমালা) তা অবশ্যই মহান আল্লাহর কালাম। এবং তা অসৃষ্ট।
◈ যে মাধ্যমে তা প্রকাশ পাচ্ছে (মানুষের কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ-ক্রিয়া, কাগজ ও কালি): এগুলো বান্দার কর্ম এবং সৃষ্ট বস্তু।
আহলুস সুন্নাহর একটি প্রসিদ্ধ আকিদা হলো, أَفْعَالَ الْعِبَادِ مَخْلُوقَةٌ “বান্দার কর্ম মাখলুক বা সৃষ্ট।”
ইমাম বুখারি (রহ.) বলেন,
“حَرَكَاتُهُمْ وَأَصْوَاتُهُمْ وَاكْتِسَابُهُمْ وَكِتَابَتُهُمْ مَخْلُوقَةٌ، فَأَمَّا الْقُرْآنُ الْمَتْلُوُّ الْمُبِينُ الْمُثْبَتُ فِي الْمَصَاحِفِ الْمَسْطُورُ الْمَكْتُوبُ الْمَوْعَى فِي الْقُلُوبِ فَهُوَ كَلَامُ اللَّهِ لَيْسَ بِخَلْقٍ، قَالَ اللَّهُ: (بَلْ هُوَ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ)”. وَقَالَ إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ: “فَأَمَّا الْأَوْعِيَةُ فَمَنْ يَشُكُّ فِي خَلْقِهَا؟” قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: (وَكِتَابٍ مَسْطُورٍ * فِي رَقٍّ مَنْشُورٍ).
وَقَالَ: (بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ * فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ).
فَذَكَرَ أَنَّهُ يُحْفَظُ وَيُسْطَرُ. قَالَ: (ن ۚ وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ).
“তাদের (মানুষের) নড়াচড়া, আওয়াজ, অর্জন ও লেখা—সবকিছুই সৃষ্ট। পক্ষান্তরে, যে কুরআন মুখে তিলাওয়াত করা হয়, স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়, মুসহাফসমূহে সুরক্ষিত ও লিপিবদ্ধ থাকে এবং মানুষের অন্তরে সংরক্ষিত থাকে—তা হলো স্বয়ং আল্লাহর কালাম; তা কোনোভাবেই সৃষ্ট নয়।”
আল্লাহ তাআলা বলেন: (بَلْ هُوَ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ) “বরং এটি সুস্পষ্ট আয়াত, যা ঐ সকল লোকের হৃদয়পটে সংরক্ষিত যাদেরকে ইলম প্রদান করা হয়েছে।” [সূরা আনকাবুত: ৪৯]
ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম (রহ.) বলেছেন: “পক্ষান্তরে আধার বা সংরক্ষকসমূহ (যেমন কণ্ঠ, বুক, কাগজ ইত্যাদি) যে সৃষ্ট—এ বিষয়ে কে সন্দেহ করবে?”
আল্লাহ তাআলা বলেন: (وَكِتَابٍ مَسْطُورٍ * فِي رَقٍّ مَنْشُورٍ) “লিখিত কিতাবের কসম, যা উন্মুক্ত চামড়ায় লিপিবদ্ধ।” [সূরা তূর: ২-৩]
তিনি আরও বলেন: (بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ * فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ) “বরং এটি মর্যাদাবান কুরআন, যা সুরক্ষিত লাওহে মাহফুজে রয়েছে।” [সূরা আল-বুরুজ: ২১-২২]
মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, কুরআন সুরক্ষিত রাখা হয় এবং লিপিবদ্ধ করা হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন: (ن ۚ وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ) “নুন। কলমের এবং তারা যা লেখে তার কসম।” [সূরা কালাম: ১] [উৎস: ইমাম বুখারি, খালকু আফআলিল ইবাদ (বান্দার কর্মসমূহ সৃষ্ট)]
অর্থাৎ আমরা যখন কুরআন পড়ি বা লিখি তখন আমাদের জিহ্বার নড়াচড়া, কণ্ঠের আওয়াজ, হাত দিয়ে লেখার কাজ এবং কাগজ-কালির ব্যবহার—এ সবকিছুই মানুষের কর্ম এবং তা সৃষ্ট। কিন্তু এই সৃষ্ট মাধ্যমগুলোর সাহায্যে আমরা যা মুখে উচ্চারণ করি (তিলাওয়াত করি), গ্রন্থকারে লিখে রাখি এবং হৃদয়পটে ধারণ করি—সেই মূল কুরআন হলো স্বয়ং আল্লাহর কালাম, যা কোনোভাবেই সৃষ্ট নয়।
-ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সতর্ক করে বলেছেন:
مَنْ قَالَ: لَفْظِي بِالْقُرْآنِ مَخْلُوقٌ فَهُوَ جَهْمِيٌّ، وَمَنْ قَالَ: غَيْرُ مَخْلُوقٍ فَهُوَ مُبْتَدِعٌ
“যে বলে, আমার কুরআন-উচ্চারণ সৃষ্ট, সে জাহমি; আর যে বলে তা নিরঙ্কুশভাবে অসৃষ্ট, সে বিদআতি।” [আস সুন্নাহ: আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমদ (১/১৬৫); আস সুন্নাহ: আল খল্লাল; দারউ তাআরিযিল আকল ওয়ান নাকল: ইবনে তাইমিয়াহ (১/২৬১)]
এর কারণ হলো, “আমার উচ্চারণ সৃষ্ট” বললে কুরআনকেও সৃষ্ট বলে ধারণা করার আশঙ্কা থাকে। আবার “আমার উচ্চারণ অসৃষ্ট” বললে মানুষের কণ্ঠস্বরকেও আল্লাহর অসৃষ্ট গুণের সমতুল্য ভাবার ভুল হতে পারে। তাই সালাফগণ ঢালাওভাবে এমন বাক্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতেন।
❑ সারাংশ:
◈ কুরআনের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ এবং তার অর্থ—সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং অসৃষ্ট। ◈ কুরআনের কাগজ, কালি এবং তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে আমাদের কণ্ঠস্বর ইত্যাদি সৃষ্ট। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

চোখে পানি আসা কি দোয়া কবুলের আলামত এবং আমরা কীভাবে বুঝব যে দোয়া কবুল হয়েছে

 চোখে পানি আসা কি দোয়া কবুলের আলামত? আমরা কীভাবে বুঝব যে, দোয়া কবুল হয়েছে? আল্লাহর ভয়ে কান্না করার ফজিলত কী?

প্রশ্ন: নিচের এ লেখাটি কি সঠিক?
“দোয়ার সময় চোখে পানি আসাটা দোয়া কবুল হওয়ার আলামত। যদি দোয়া করার সময় কান্না আসে তাহলে বুঝে নিও দোয়া কবুল হয়ে গেছে! কারণ দোকান থেকে কিছু কিনলে যেমন রসিদ দেওয়া হয় ক্রেতাকে। এই চোখের পানিও হচ্ছে দোয়া কবুলের রসিদ!”
— মালফুজাতে ফুলপুরী (রাহ.)।
আমরা কীভাবে বুঝব যে, দোয়া কবুল হয়েছে? আল্লাহর ভয়ে কান্না করার ফজিলত কী?
উত্তর: “দোয়ার সময় চোখে পানি আসাটা দোয়া কবুলের আলামত অথবা দোয়া করার সময় চোখে পানি আসলে বুঝে নিও যে, দোয়া কবুল হয়ে গেছে….”—এই ধরনের বক্তব্য সরাসরি সঠিক নয়। কেননা আমার জানামতে, কুরআন-সুন্নাহ কিংবা সালাফদের থেকে এমন কথা প্রমাণিত নয় যে, চোখের পানি আসা মানেই নিশ্চিতভাবে দোয়া কবুল হয়ে যাওয়া যদিও কিছু আলেম এমন কথা বলেছেন। হয়ত তারা তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে এমনটি বলেছেন। কিন্তু দোয়া কবুল হওয়ার বিষয়টি যেহেতু গায়েবি বা অদৃশ্য বিষয় তাই সবার ক্ষেত্রে তা আবশ্যক নয়। অর্থাৎ দোয়া করার সময় চোখে পানি আসলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে না যে, দোয়া কবুল হয়ে গেছে!!
তবে হ্যাঁ, এ কথা সঠিক যে, কেউ যদি দোয়া করার সময় আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে, কবরের ভয়াবহ নিঃসঙ্গতা ও হাশরের ময়দানের বিভীষিকাময় পরিস্থিতি, জাহান্নামের কঠিন শাস্তি ইত্যাদির কথা স্মরণ করে এবং নিজের অন্যায় কৃতকর্ম ও পাপাচারের অপরাধ বোধ থেকে ক্রন্দন করে তাহলে নিঃসন্দেহে তাতে দোয়া কবুলের জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা এটি তার অন্তরের একনিষ্ঠতা, একাগ্রতা, আল্লাহভীতি, জাহান্নামের শাস্তির ভয় এবং অসহায়ত্বের প্রমাণ বহন করে। দোয়া কবুলের জন্য এই বিষয়গুলো অত্যন্ত কার্যকর।
❑ দোয়া কবুলের বাহ্যিক কিছু আলামত:
আমরা নিচের বিষয়গুলো দেখে ধারণা করতে পারি যে, হয়ত মহান আল্লাহ দোয়া কবুল করেছেন।
✪ ১. দোয়া করার বান্দা যখন দুনিয়াতেই তার প্রত্যাশিত জিনিসটি লাভ করে বা তার মনের আশা পূরণ হয়ে যায়।
✪ ২. অনেক সময় মানুষ হয়তো দোয়ার আশানুরূপ বাহ্যিক ফল দেখে না। কিন্তু যখন তার জীবনের বড় কোনও বিপদ-মসিবত, কষ্ট বা অনিষ্ট দূর হয়ে যায় তখন মনে করতে হবে, হয়ত এটাই ছিল তার সেই দোয়ার ফলাফল। অর্থাৎ অনেক সময় বান্দা চায় একটা কিন্তু মহান আল্লাহর তাঁর হেকমত অনুযায়ী অন্য দিকে তার থেকে উত্তম ফলাফল দান করে থাকেন। তবে যদি দুনিয়ায় দোয়ার কোনও প্রতিফল পরিলক্ষিত না হয় তাহলে নিশ্চিত থাকতে হবে যে, মহান আল্লাহর এগুলোর চেয়ে আরও দামি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদান তার জন্য আখিরাতে জমা রেখেছেন যা তিনি সেদিন তাকে দান করবেন। এতে সে আরও বেশি খুশি হবে। তবে শর্ত হল, দোয়া কবুলের শর্তাবলী ঠিক রেখে দোয়া করতে হবে এবং এমন দোয়া করা যাবে না যাতে আল্লাহর নাফরমানি বা আত্মীয়তা সম্পর্কচ্ছেদের মত বিষয় আছে। যেমন: হাদিসে এসেছে,
আবু সাইদ খুদরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَدْعُو بِدَعْوَةٍ لَيْسَ فِيهَا إِثْمٌ وَلَا قَطِيعَةُ رَحِمٍ إِلَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ بِهَا إِحْدَى ثَلَاثٍ: إِمَّا أَنْ تُعَجَّلَ لَهُ دَعْوَتُهُ، وَإِمَّا أَنْ يَدَّخِرَهَا لَهُ فِي الْآخِرَةِ، وَإِمَّا أَنْ يَصْرِفَ عَنْهُ مِنَ السُّوءِ مِثْلَهَا
“যে মুসলিম গুনাহ বা আত্মীয়তা ছিন্নের বিষয় নয় এমন কোনও দোয়া করে আল্লাহ তাকে তিনটি জিনিসের একটি দান করেন— হয় দুনিয়াতেই তার দোয়া তাড়াতাড়ি কবুল করে দেন (অর্থাৎ সে তার প্রত্যাশিত বিষয়টি লাভ করে), অথবা তা আখিরাতের জন্য সঞ্চিত রাখেন, অথবা তার সমপরিমাণ কোনও অনিষ্ট তার থেকে দূর করে দেন।” [মুসনাদ আহমদ, হাদিস নং ১১১৩৩; আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ৭১০, সহিহ তারগিব, হাদিস নং ১৬৩৩]
✪ ৩. দোয়ার পর যদি বান্দার অন্তর আরও বেশি আল্লাহর দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে, ইবাদত-বন্দেগির প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, পাপের প্রতি ঘৃণাবোধ তৈরি হয়, পাপ-পঙ্কিলতা ছেড়ে দ্বীন ও আখিরাতমূখী হয় তাহলে এটি দোয়া কবুলের অন্যতম বড় নিদর্শন।
✪ ৪. দোয়া শেষে অন্তরে অভূতপূর্ব স্বস্তি ও প্রশান্তি অনুভূত হওয়া। এটি দোয়া কবুলের সুনিশ্চিত প্রমাণ না হলেও দোয়ার সুপ্রভাব।
✪ ৫. দোয়া করার পর যদি অন্তরে মহান আল্লাহর প্রতি আরও বেশি ইমানি দৃঢ়তা, গভীর আস্থা ও সুধারণা তৈরি হয় এবং বারবার দোয়া করার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাহলে বুঝতে হবে, এটা আল্লাহর বিশেষ তাওফিক যেটা হয়ত দোয়ার প্রতিদান।
এই লক্ষণগুলোর কোনটিই দলিলে কাতঈ বা সুনিশ্চিত প্রমাণ নয় — এগুলো নিছক বুশরা বা সুসংবাদ, যা বান্দাকে আশাবাদী রাখার জন্য যথেষ্ট। বাহ্যিক ফল না দেখে কেউ যেন মনে না করে যে, তার দোয়া প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেছে। কেননা প্রকৃত ফলাফল আল্লাহর ইলমেই সংরক্ষিত।
❑ যে অশ্রু কখনো বিফলে যায় না:
বান্দা যখন অবুঝ শিশুর মত মহান রবের সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, যখন আকুতি ভরা হৃদয়ে তার দুচোখ বেয়ে কান্নার লোনাজল ঝরে পড়ে তখন তিনি বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান এবং তাকে বিশাল পুরস্কারে ভূষিত করেন। যেমন: হাদিসে এসেছে,
◈ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
لَا يَلِجُ النَّارَ رَجُلٌ بَكَى مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ حَتَّى يَعُودَ اللَّبَنُ فِي الضَّرْعِ
“আল্লাহর ভয়ে কান্নাকারী ব্যক্তি জাহান্নামে প্রবেশ করবে না, যে পর্যন্ত না দুধ আবার ওলানে ফিরে যায়।” [সহিহ সুনানে নাসাঈ, হাদিস: ৩১০৮, সহিহ]
◈ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেছেন:
عَيْنَانِ لَا تَمَسُّهُمَا النَّارُ: عَيْنٌ بَكَتْ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ، وَعَيْنٌ بَاتَتْ تَحْرُسُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“দুই চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—এক চোখ, যা আল্লাহর ভয়ে কেঁদেছে এবং এক চোখ, যা আল্লাহর পথে (জিহাদের ময়দানে) প্রহরায় রাত জেগে কাটিয়েছে।” [সুনানে তিরমিজি, অধ্যায়: ২০/ জিহাদের ফজিলত, পরিচ্ছেদ: ১২. আল্লাহর রাস্তায় (জিহাদের ময়দানে) প্রহরার সওয়াব-সহিহ]
◈ এছাড়াও হাদিসে এসেছে:
لَيْسَ شَيْءٌ أَحَبَّ إِلَى اللَّهِ مِنْ قَطْرَتَيْنِ وَأَثَرَيْنِ: قَطْرَةِ دُمُوعٍ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ، وَقَطْرَةِ دَمٍ تُهْرَاقُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
“আল্লাহর নিকট দুটি ফোঁটা ও দুটি চিহ্নের চেয়ে অধিক প্রিয় আর কিছু নেই। আল্লাহর ভয়ে নির্গত অশ্রুফোঁটা এবং আল্লাহর পথে প্রবাহিত রক্তফোঁটা।” [সহিহ তিরমিজি, হাদিস: ১৬৬৯]
এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহয় আরও কিছু বক্তব্য এসেছে।
মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে তার অনুগত বান্দা বানিয়ে দেন, আমাদের দোয়াগুলো কবুল করেন, আমাদেরকে ক্ষমা করেন এবং আমাদের উপর সন্তুষ্ট হোন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

রোগব্যাধি দুঃখকষ্ট ও বিপদাপদে মুমিন বান্দাদের জন্য সীমাহীন মর্যাদা ও সুসংবাদ

 দুনিয়ার জীবন মানেই তো সুখ-দুঃখ আর চড়াই-উতরাইয়ের এক দীর্ঘ সফর। এই চলার পথে রোগব্যাধি, দুঃখকষ্ট ও নানা বিপদাপদ মানুষের নিত্যসঙ্গী। যে কোনও সময় মুমিন জীবনের দিগন্ত জুড়ে দুঃখ-দুর্দশা, রোগশোক ও কষ্টের কালো মেঘে জমে যেতে পারে। কিন্তু মুমিনের জীবনে এ মেঘমালা কখনো কখনো অবারিত কল্যাণের বৃষ্টি হয়ে অঝর ধারায় বর্ষিত হতে পারে। যা তার জীবনের পাপপঙ্গীলতাকে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দেয় এবং সীমাহীন কল্যাণের বার্তা নিয়ে হাজির হয় আখিরাতের অনন্ত জীবনের জন্য। তাই এসব রোগ-শোক ও দুঃখকষ্ট মুমিন জীবনে কখন কীভাবে কল্যাণ ও সুসংবাদের বার্তাবাহী হয় এবং সেগুলো কী কী তা নিম্নে দলিল ভিত্তিক আলোচনা করা হলো:

❑ রোগব্যাধি কখন বান্দার জন্য কল্যাণকর হয়?
ইমানদারের জীবনে কোনও ক্ষতি বা পরাজয় বলে কিছু নেই; তার প্রতিটি মুহূর্তই পরম প্রাপ্তির। সে যখন ভালো কিছু পায় তখন শুকরিয়া আদায় করে। আর যখন কোনও রোগব্যাধি, ক্ষতি বা বিপদের মুখোমুখি হয় তখন সে বিন্দু পরিমাণ হতাশ হয় না। বরং আল্লাহর তকদিরের ফয়সালাকে হাসিমুখে মেনে নিয়ে চরম ধৈর্য ধারণ করে এবং তাঁরই ওপর ভরসা করে অবিচল থাকে। আর ঠিক তখনই এই রোগব্যাধি ও দুঃখকষ্ট তার জীবনের জন্য অভিশাপ বা নিছক কষ্ট হয়ে নয় বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশাল রহমত ও বরকতের কারণ হয়ে ধরা দেয়। রোগব্যাধি কখন বান্দার জন্য কল্যাণকর হয়—এ বিষয়টি কয়েকটি পয়েন্টে উপস্থাপন করা হলো:
◈ ১. একজন ইমানদার ব্যক্তি যদি রোগাক্রান্ত বা বিপদগ্রস্থ হয় তাহলে তা তার জন্য আখিরাতের জন্য বিশাল কল্যাণ বয়ে আনে যদি সে এতে ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ অভিমূখী হয় এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশা করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَيْءٍ مِّنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِّنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنفُسِ وَالثَّمَرَاتِ ۗ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ – الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتُْم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ – أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ ۖ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ
“আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফল-ফলাতের ক্ষয়ক্ষতির মাধ্যমে। আর ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা নিজেদের ওপর কোনও বিপদ এলে বলে, ‘ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চিতভাবে আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব)। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে বিশেষ ক্ষমা ও রহমত এবং তারাই হলো হেদায়েত প্রাপ্ত।” [সুরা বাকারা: ১৫৫-১৫৭]
◈ ২. মুমিন ব্যক্তির প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর:
মুমিন ব্যক্তির প্রতিটি অবস্থাই কল্যাণকর। সুদিনেও সে শুকরিয়া আদায় করে, যা তার জন্য কল্যাণকর। আর বিপদ-আপদে সে সবর করে, যা তার জন্যও কল্যাণকর।
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
عَجَبًا لِأَمْرِ الْمُؤْمِنِ، إِنَّ أَمْرَهُ كُلَّهُ خَيْرٌ، وَلَيْسَ ذَاكَ لِأَحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ، وَإِنْ أَصَابَتْهُ ضَرَّاءُ صَبَرَ، فَكَانَ خَيْرًا لَهُ
“মুমিনের বিষয়টি কতই না চমৎকার! তার প্রতিটি কাজই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া অন্য কেউ এই বৈশিষ্ট্য লাভ করতে পারে না। তার ভালো কিছু হলে সে শোকর আদায় করে। ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর তার কোনও অকল্যাণ বা মুসিবত হলে সে ধৈর্য ধারণ করে। ফলে তাও তার জন্য কল্যাণকর হয়।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৯৯৯; সহিহ]
◈ ৩. রোগব্যাধি ও বিপদাপদের বিশেষ দুআ ও পুরস্কার:
যেকোনো বালা-মুসিবত বা রোগব্যাধিতে পড়ার সময় এই দোয়া পাঠ করার পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহ তাআলা উত্তম প্রতিদান দান করেন। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ تُصِيبُهُ مُصِيبَةٌ، فَيَقُولُ مَا أَمَرَهُ اللَّهُ: {إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ}، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا، إِلَّا أَخْلَفَ اللَّهُ لَهُ خَيْرًا مِنْهَا
“কোনও মুসলিমের ওপর বিপদ আসার পর সে যদি আল্লাহ তাআলার শেখানো এই দোয়া পড়ে—’ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, আল্লাহুম্মা আজুরনি ফী মুসীবাতি ওয়া আখলিফ লী খাইরান মিনহা’ (নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব। হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে প্রতিদান দিন এবং এর চেয়ে উত্তম বিকল্প আমাকে দান করুন)—তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে এর চেয়ে উত্তম প্রতিদান দান করেন।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ৯১৮; সহিহ]
◈ ৪. রোগব্যাধি মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে:
সুস্থতা ও প্রাচুর্য অনেক সময় মানুষের মধ্যে আত্মম্ভরিতা, অহংকার ও গাফলতি তৈরি করে। কিন্তু রোগব্যাধি বা সামান্য অসুস্থতা মানুষকে অহংকার ভেঙে আল্লাহর দরবারে বিনীত হতে শেখায়। নিজের জীবন সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। অসুস্থ ব্যক্তি বিছানায় শুয়ে যখন একজন বান্দা কায়মনোবাক্যে আল্লাহকে ডাকেন এবং অতীতের ভুলত্রুটির জন্য তওবা করেন তখন এই কষ্ট তার জন্য আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়।
❑ রোগব্যাধিতে ধৈর্য ধারণের অর্থ কী?
এখানে সবর বা ধৈর্যের অর্থ হল, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি ক্ষোভ বা হতাশা প্রকাশ না করা, মানসিকভাবে অস্থিরতায় না ভোগা, ভেঙে না পড়া এবং মানুষের কাছে অপ্রয়োজনীয় অভিযোগ না করা। বরং সর্বাবস্থায় তাকদির বা নিয়তির প্রতি সন্তুষ্ট থাকা এবং আল্লাহ যে অবস্থায় রেখেছেন সেই অবস্থার জন্য তাঁর প্রশংসা করা। এমনকি এই অসুস্থতাকে তওবা ও আত্মশুদ্ধির একটি সুযোগ মনে করে আরও বেশি আল্লাহমুখী হওয়া। তবে রোগব্যাধি ও বিপদাপদে ধৈর্য ধারণের অর্থ এই নয় যে, চিকিৎসা থেকে বিরত থাকতে হবে। বরং সাধ্যমতো শরিয়তসম্মত উপায়ে চিকিৎসা গ্রহণ করা সুন্নত। নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে সর্বশ্রেষ্ঠ ধৈর্যশীল হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন রোগে চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন, আরোগ্যের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন এবং রোগ প্রতিরোধের নানা পদ্ধতির কথাও বলে গেছেন।
❑ অসুস্থতার কারণে ইবাদত কমে যাওয়া কি ইমানের দুর্বলতা?
অসুস্থতার কারণে ইবাদত কমে যাওয়া ইমানের দুর্বলতা নয়। এটি একটি ওজর। ওজরের কারণে অসুস্থ ব্যক্তি যদি সাধ্য অনুযায়ী ফরজ ইবাদতগুলো (বিশেষভাবে সালাত) সম্পাদন করতে পারে; সুন্নত বা নফল ইবাদত করতে নাও পরে তারপরও দয়াময় আল্লাহ আখিরাতে তার জন্য বিশাল পুরস্কার রেখেছেন আল হামদুলিল্লাহ। হ্যাঁ, ইমানি দুর্বলতা তখনই গণ্য হবে যখন একজন মানুষ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থাতে শরিয়ত অনুমোদিত ওজর ছাড়াই আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে থাকে কিংবা ইবাদতের ব্যাপারে অলসতা ও অবহেলা করে বা আল্লাহর তকদিরে উপরে ক্ষোভ ও অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে।
❑ রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হলে বান্দা যেসব মর্যাদা ও পুরস্কার লাভ করে:
নিম্নে হাদিসের আলোকে কোন ইমানদার ব্যক্তি রোগাক্রান্ত হলে তার জন্য যেসব মর্যাদা, শুভ সংবাদ ও পুরস্কার রয়েছে সেগুলো অতিসংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
✪ ১. অসুস্থ ব্যক্তি আখিরাতে এমন মর্যাদা লাভ করে যা কেবল আমল দ্বারা সম্ভব ছিল না:
রোগের কষ্টে ধৈর্য ধারণ করলে বান্দা এমন উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে যায় যা সে কেবল নিজের আমলের মাধ্যমে অর্জন করতে পারত না। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْعَبْدَ إِذَا سَبَقَتْ لَهُ مِنَ اللهِ مَنْزِلَةٌ، لَمْ يَبْلُغْهَا بِعَمَلِهِ ابْتَلَاهُ اللهُ فِي جَسَدِهِ، أَوْ فِي مَالِهِ، أَوْ فِي وَلَدِهِ ثُمَّ صَبَّرَهُ عَلَى ذَلِكَ حَتَّى يُبْلِغَهُ الْمَنْزِلَةَ الَّتِي سَبَقَتْ لَهُ مِنَ اللهِ تَعَالَى
“যখন আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এমন মর্যাদা নির্ধারিত থাকে, যা সে আমলের মাধ্যমে লাভ করতে সক্ষম ছিল না, তখন আল্লাহ তার দেহ, সম্পদ বা সন্তানকে বিপদগ্রস্ত করেন। অতঃপর তাকে ধৈর্য ধারণের সক্ষমতা দান করে সেই মর্যাদায় পৌঁছে দেন।” [আহমদ, হাদিস ২২৩৩৮; আবু দাউদ, হাদিস ৩০৯০, সহিহ]
✪ ২. রোগব্যাধি, দুঃখকষ্ট এবং বিপদাপদের মাধ্যমে আল্লাহ বান্দার গুনাহ মোচন করেন:
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ
“কোনও মুসলিমের ওপর যে ক্লান্তি, রোগব্যাধি, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট কিংবা মনোবেদনা আসে, এমনকি একটি কাঁটাও যদি তাকে বিদ্ধ করে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহসমূহ মোচন করে দেন।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৫৬৪১; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৫৭৩]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেছেন,
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُشَاكُ شَوْكَةً، فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا كُتِبَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ، وَمُحِيَتْ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ
“কোনও মুসলিমের গায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হলে বা তার চেয়ে ছোট কোনও আঘাত লাগলে, এর বিনিময়ে তার এক স্তর মর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং একটি গুনাহ ক্ষমা করা হয়।” [মুসলিম, হাদিস ২৫৭২; সহিহুল জামে, হাদিস ১৬৬০]
✪ ৩. কেউ যদি অসুস্থ হয় কিংবা সফরে থাকে তাহলে তার আবাসে থাকা বা সুস্থ অবস্থার ইবাদতের সমপরিমাণ সওয়াব তার আমলনামায় লিখে দেওয়া হয়:
আবু মুসা আল আশআরি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَوْ سَافَرَ كُتِبَ لَهُ مِثْلُ مَا كَانَ يَعْمَلُ مُقِيمًا صَحِيحًا
“বান্দা যখন অসুস্থ হয় কিংবা সফরে বের হয়, তখন তার জন্য তেমন আমলই লিখে দেওয়া হয়, যেমনটি সে মুকিম অবস্থায় ও সুস্থ থাকাকালীন করত।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২৯৯৬]
✪ ৪. আখিরাতে ইর্ষণীয় পুরস্কার লাভ:
কিয়ামতের দিন বিপদগ্রস্তদের প্রতিদান দেখে সুস্থ ব্যক্তিরাও আফসোস করবে যে, দুনিয়াতে যদি তাদেরও এমন কষ্ট হতো!
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
يَوَدُّ أَهْلُ العَافِيَةِ يَوْمَ القِيَامَةِ حِيْنَ يُعْطَى أَهْلُ البَلَاءِ الثَّوَابَ لَوْ أَنَّ جُلُودَهُمْ كَانَتْ قُرِضَتْ فِي الدُّنْيَا بِالـمَقَارِيْضِ
“কিয়ামতের দিন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের প্রতিদান দেওয়া হলে দুনিয়ার বিপদমুক্ত মানুষেরা আফসোস করে বলবে: হায়! দুনিয়াতে যদি কাঁচি দিয়ে আমাদের শরীরের চামড়া কেটে টুকরো টুকরো করা হতো!” [তিরমিজি, হাদিস ২৪০২, হাসান]
✪ ৫. কবরের শাস্তি থেকে মুক্তি:
নির্দিষ্ট কিছু রোগে মৃত্যুবরণকারীকে কবরের আজাব দেওয়া হয় না। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ قَتَلَهُ بَطْنُهُ لَمْ يُعَذَّبْ فِيْ قَبْرِهِ
“পেটের পীড়ায় মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তিকে কবরের শাস্তি দেওয়া হবে না।” [তিরমিজি, হাদিস ১০৬৪; সহিহুত তারগিব, হাদিস ১৪১০; সহিহুল জামে, হাদিস ৬৪৬১, সহিহ]
✪ ৬. শহিদের মর্যাদা লাভ:
আল্লাহর রাস্তায় নিহত হওয়া ছাড়াও নির্দিষ্ট কিছু রোগে মৃত্যুবরণকারী শহিদের মর্যাদা লাভ করে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
الشَّهَادَةُ سَبْعٌ سِوَى الْقَتْلِ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ: الْمَطْعُوْنُ شَهِيْدٌ، وَالْغَرِقُ شَهِيْدٌ، وَصَاحِبُ ذَاتِ الْجَنْبِ شَهِيْدٌ، وَالْمَبْطُوْنُ شَهِيْدٌ، وَصَاحِبُ الْحَرِيْقِ شَهِيْدٌ، وَالَّذِيْ يَمُوْتُ تَحْتَ الْهَدْمِ شَهِيْدٌ، وَالْمَرْأَةُ تَمُوْتُ بِجُمْعٍ شَهِيْدٌ
“আল্লাহর রাস্তায় নিহত ব্যক্তি ছাড়াও আরও সাত ধরনের শহিদ রয়েছে: মহামারীতে মৃত ব্যক্তি, পানিতে ডুবে মৃত ব্যক্তি, প্লুরিসি বা বুকে ব্যথা জনিত রোগে মৃত ব্যক্তি, পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি, আগুনে পুড়ে মৃত ব্যক্তি, দেয়াল ধসে চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি এবং সন্তান প্রসবের মৃত বা গর্ভকালীন অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নারী।” [আবু দাউদ, হাদিস ৩১১১; মিশকাত, হাদিস ১৫৬১, সহিহ]
✪ ৭. আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের মাধ্যম:
রোগ ও বিপদে ধৈর্য ধারণকারীদের জন্য রয়েছে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ عِظَمَ الجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ البَلَاءِ، وَإِنَّ اللهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ، فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا، وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ
“বড় পরীক্ষার সঙ্গেই রয়েছে বড় প্রতিদান। আল্লাহ যখন কোনও জাতিকে ভালোবাসেন তখন তাদের বিভিন্ন বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন। যারা এতে সন্তুষ্ট থাকে তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর সন্তুষ্টি; আর যারা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর অসন্তুষ্টি।” [তিরমিজি, হাদিস ২৩৯৬; সহিহাহ, হাদিস ১৬৪, হাসান]
✪ ৮. জ্বর ও শারীরিক উষ্ণতা পাপ মোচনের মাধ্যম:
সামান্য জ্বর বা শারীরিক কষ্টও মুমিনের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত হিসেবে আসে, যা তার গুনাহগুলোকে ঝরিয়ে দেয়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
إِنَّ الْحُمَّى حَظُّ كُلِّ مُؤْمِنٍ مِنَ النَّارِ
“নিশ্চয়ই জ্বর হলো জাহান্নামের আগুন থেকে প্রতিটি মুমিনের নির্ধারিত অংশ (অর্থাৎ দুনিয়াতে জ্বর হওয়ার মাধ্যমে আল্লাহ বান্দাকে জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি দেন)।” [মুসনাদ আহমদ, হাদিস ৪৬৪; সহিহুল জামে, হাদিস ৩৭০৫]
অর্থাৎ জ্বর মুমিনের গুনাহ এমনভাবে মুছে দেয় যে, এর বিনিময়ে সে আখিরাতে জাহান্নামের আগুন থেকে বেঁচে যায়। দুনিয়ার এই সামান্য কষ্টটুকুই যেন তার জন্য জাহান্নামের প্রাপ্য অংশ পূরণ করে দেয়। ফলে আখেরাতে তাকে আর সেই আগুনের মুখোমুখি হতে হয় না। জ্বরের ব্যাপারে অন্য একটি হাদিসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«لا تَسُبِّي الحُمَّى؛ فإنَّها تُذْهِبُ خَطَايَا بَنِي آدَمَ، كَمَا يُذْهِبُ الكِيرُ خَبَثَ الحَدِيدِ»
“জ্বরকে গালি দিও না। কারণ জ্বর মানুষের গুনাহগুলো এমনভাবে দূর করে দেয়, যেমন ভাবে হাপর (কামারের আগুনের চুলা) লোহাকে পুড়িয়ে তার মরচে ও ময়লা দূর করে দেয়।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৫]
অন্য একটি হাদিসে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُودٍ رضي الله عنه قَالَ: دَخَلْتُ عَلَى رَسُولِ اللهِ صلى الله عليه وسلم وَهُوَ يُوعَكُ، فَقُلْتُ: إِنَّكَ تُوعَكُ وَعْكًا شَدِيدًا؟ قَالَ: أَجَلْ، إِنِّي أُوعَكُ كَمَا يُوعَكُ رَجُلَانِ مِنْكُمْ. قُلْتُ: ذَلِكَ أَنَّ لَكَ أَجْرَيْنِ؟ قَالَ: أَجَلْ، ذَلِكَ كَذَلِكَ، مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصِيبُهُ أَذًى، مَرَضٌ فَمَا سِوَاهُ، إِلَّا حَطَّ اللهُ بِهِ سَيِّئَاتِهِ كَمَا تَحُطُّ الشَّجَرَةُ وَرَقَهَا
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, একদিন আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে গেলাম, তখন তিনি জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন।
আমি বললাম: আপনার তো প্রচণ্ড জ্বর?
তিনি বললেন: হ্যাঁ, তোমাদের দুজন মানুষ যতটা জ্বরে আক্রান্ত হয় আমি একাই ততটা জ্বরে আক্রান্ত হই।
আমি বললাম: তাহলে তো আপনার দ্বিগুণ সওয়াব হবে?
তিনি বললেন, হ্যাঁ, ঠিক তাই। কোনও মুসলিমের রোগ বা অন্য যেকোনো কষ্ট হলে, আল্লাহ তার বিনিময়ে তার গুনাহগুলো এমনভাবে ঝরিয়ে দেন, যেভাবে গাছ তার পাতা ঝরায়। [সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৬৬০, ৫৬৬৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭১]
✪ ৯. মৃগী রোগের মর্যাদা:
عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي رَبَاحٍ قَالَ: قَالَ لِي ابْنُ عَبَّاسٍ رضي الله عنهما: أَلَا أُرِيكَ امْرَأَةً مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ؟ قُلْتُ: بَلَى. قَالَ: هَذِهِ الْمَرْأَةُ السَّوْدَاءُ أَتَتِ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ: إِنِّي أُصْرَعُ وَإِنِّي أَتَكَشَّفُ، فَادْعُ اللهَ لِي. قَالَ: إِنْ شِئْتِ صَبَرْتِ وَلَكِ الْجَنَّةُ، وَإِنْ شِئْتِ دَعَوْتُ اللهَ أَنْ يُعَافِيَكِ. فَقَالَتْ: أَصْبِرُ. فَقَالَتْ: إِنِّي أَتَكَشَّفُ فَادْعُ اللهَ أَنْ لَا أَتَكَشَّفَ. فَدَعَا لَهَا
আতা ইবনে আবি রাবাহ বলেন, ইবনে আব্বাস (রা.) আমাকে বললেন:
আমি কি তোমাকে জান্নাতি একজন নারী দেখাব না?
আমি বললাম: হ্যাঁ।
তিনি বললেন: এই কালো বর্ণের নারী, যিনি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এসে বলেছিলেন, আমার মৃগীরোগ আছে আর এতে আমার শরীর অনাবৃত হয়ে যায়। আপনি আমার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন।
তিনি বললেন: তুমি চাইলে ধৈর্য ধারণ কর তাহলে তোমার জন্য জান্নাত রয়েছে। আর তুমি চাইলে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন তোমাকে সুস্থ করে দেন।
মহিলা বললেন: আমি ধৈর্য ধারণ করব। এরপর তিনি বললেন, তবে এতে আমার শরীর অনাবৃত হয়ে যায়। আপনি দোয়া করুন যেন তা না হয়।
তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার জন্য দোয়া করলেন। [সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৬৫২; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৬]
এই মহিলার পরিচয় সম্পর্কে ইমাম মুস্তাগফির রচিত ‘কিতাবুস সাহাবাহ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন একজন হাবশি (ইথিওপিয়ান) নারী। তার নাম সুআইরাহ আল আসাদিয়্যাহ (রা.)। তিনি জীবদ্দশায় জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্ত মহিলা সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত।
✪ ১০. দৃষ্টিশক্তি হারানোর বা অন্ধত্বের উপর ধৈর্য ধারণের পুরস্কার:
আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, মহান আল্লাহ বলেন:
يَقُولُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ: مَنْ أَذْهَبْتُ حَبِيبَتَيْهِ فَصَبَرَ وَاحْتَسَبَ لَمْ أَرْضَ لَهُ ثَوَابًا دُونَ الْجَنَّةِ
“আমি যার দুটি প্রিয় বস্তু (দুটি চোখ বা দৃষ্টিশক্তি) কেড়ে নিই এবং সে তাতে ধৈর্য ধারণ করে ও সওয়াবের আশা রাখে তার জন্য জান্নাত ছাড়া অন্য কোনও কম প্রতিদানে আমি সন্তুষ্ট হই না।” [সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২৪০১; মুসনাদ আহমদ; সহিহুল জামে, হাদিস ৮০৭৫]
◈ ১১. অসুস্থ ব্যক্তির কষ্টের কথা গোপন রাখার সওয়াব:
রোগের কষ্টে অধৈর্য না হয়ে এবং মানুষের কাছে অপ্রয়োজনীয় অভিযোগ না করে যারা নীরবে পরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে তা সহ্য করেন আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত অবধারিত করে দেন:
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
إِذَا مَرِضَ الْعَبْدُ أَرْسَلَ اللَّهُ إِلَيْهِ مَلَكَيْنِ، فَقَالَ: انْظُرُوا مَا يَقُولُ لِزُوَّارِهِ؟ فَإِنْ هُوَ حَمِدَ اللَّهَ وَأَثْنَى عَلَيْهِ إِذَا جَاءوهُ، رَفَعَ ذَلِكَ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ، وَهُوَ أَعْلَمُ، فَيَقُولُ: لِعَبْدِي عَلَيَّ إِنْ تَوَفَّيْتُهُ أَنْ أُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ، وَإِنْ شَفَيْتُهُ أَنْ أُبْدِلَهُ لَحْمًا خَيْرًا مِنْ لَحْمِهِ، وَدَمًا خَيْرًا مِنْ دَمِهِ، وَأَنْ أُكَفِّرَ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ
“বান্দা যখন অসুস্থ হয় তখন আল্লাহ তার কাছে দুজন ফেরেশতা পাঠিয়ে দেন এবং বলেন: দেখো, সে তার দেখতে আসা মানুষদের কী বলে? যদি সে তাদের কাছে আল্লাহর প্রশংসা করে ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তবে তা আল্লাহর কাছে তুলে ধরা হয় (যদিও আল্লাহ সব জানেন)। তখন আল্লাহ বলেন, আমার এই বান্দার ওপর আমার হক হলো—যদি আমি তার মৃত্যু দিই তবে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো আর যদি তাকে সুস্থ করে দিই তবে তার আগের রক্ত-মাংসের পরিবর্তে আরও উত্তম রক্ত-মাংস দান করবো এবং তার গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবো।” [মুওয়াত্তা মালেক, হাদিস নং ৫৪৩; মুসনাদ আহমদ, সহিহুত তারগিব, হাদিস নং ৩৪২৪]
পরিশেষে রোগব্যাধি ও শারীরিক কষ্ট মুমিনের জীবনের দুর্ভোগ নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, পাপ মোচন, রবের নৈকট্য অর্জন এবং আখিরাতে সুউচ্চ মর্যাদা লাভ এবং এক অমূল্য সুযোগ। তাই আসুন, অসুস্থতার কঠিন মুহূর্তে অস্থির বা হতাশ না হয়ে চরম ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার সাথে তাকদিরের ফয়সালা মেনে নিই এবং সুন্নাহসম্মত উপায়ে চিকিৎসা গ্রহণ করে আল্লাহর দরবারে অবনত হই। হে পরম দয়াময় আল্লাহ! আপনি আমাদের সকল রোগ-শোকে ধৈর্য ধারণের তৌফিক দিন এবং আমাদের প্রতিটি কষ্টকে পাপ মোচন ও জান্নাত লাভের মাধ্যম বানিয়ে দিন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate