ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর আরবি ব্যাকরণ ও ইসলামি পরিভাষা অনুযায়ী ‘হূর’ (حُوْرٌ) শব্দটি স্ত্রীলিঙ্গ। حَوْرَآءُ এর বহুবচন। এর উৎপত্তি حَوَرٌ থেকে। যার অর্থ চোখের সাদা অংশের অত্যধিক সাদা এবং কালো অংশের অত্যধিক কালো হওয়া। حَوْرَآءُ (হুর) এই জন্য বলা হয় যে, দৃষ্টি তাদের রূপ ও সৌন্দর্যকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যাবে। হুর হল সে সমস্ত নারী যাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলা জান্নাতে সৃষ্টি করেছেন।পবিত্র কুরআন ও হাদিসে তাঁদের অতুলনীয় রূপ, নিষ্কলুষ চরিত্র এবং চিরস্থায়ী যৌবনের বর্ণনা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। ব্যাকরণগতভাবে এটি স্ত্রীলিঙ্গ এবং মহান আল্লাহ জান্নাতে মুমিন বান্দাদের জন্য পুরস্কার ও সঙ্গী হিসেবে তাঁদের নির্ধারিত রেখেছেন। মূলত জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামতসমূহের মাঝে পুণ্যবতী স্ত্রী ও এই জান্নাতী হুরগণ মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এক বিশেষ উপহার।মহান আল্লাহ বলেন, “আর আমরা তাদেরকে বড় চোখবিশিষ্ট হূরদের সাথে বিয়ে দেব”। [সূরা আদ-দোখান: ৫৪]
Saturday, May 16, 2026
জান্নাতে একজন পুরুষ কতজন হুর পাবে
.
কুরআন ও হাদীসে তাদের কিছু গুণাগুণ বৰ্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে: “তারা হবে অত্যন্ত শুভ্ৰ। আর এজন্যই তাদের নাম হয়েছে, হুর। কেননা, হূর শব্দ দ্বারা ঐ সমস্ত নারীদেরকে বোঝায় যাদের চোখের সাদা অংশ অত্যন্ত ফর্সা, কোন প্রকার খাদ নেই। আর যাদের চোখের কালো অংশ একেবারে কালো। তারা হবে প্রশস্ত চোখ বিশিষ্টা। তাদের এ দুটি গুণ আলোচ্য আয়াতেই বর্ণিত হয়েছে। [সূরা আল-ওয়াকি’আহ: ২২] তারা হবে সমবয়স্কা উদভিন্ন যৌবনা ও সুভাষিনী। আল্লাহ বলেন, “মুক্তাকীদের জন্য তো আছে সাফল্য, উদ্যান, আঙ্গুর, সমবয়স্কা উদভিন্ন যৌবনা তরুণী” [সূরা আন-নাবা: ৩১–৩৩] তারা হবে কুমারী আর তারা হবে স্বামী সোহাগিনী, মহান আল্লাহ্ বলেন, “ওদেরকে আমরা সৃষ্টি করেছি বিশেষরূপে–ওদেরকে করেছি কুমারী, সোহাগিনী ও সমবয়স্কা,”। [সূরা আল-ওয়াকি’আহঃ ৩৫–৩৭] তাদের দেখতে মনে হবে যেন মনি মুক্তা; আল্লাহ্ বলেন, “সুরক্ষিত মুক্তাসদৃশ” [সূরা আল-ওয়াকিআহ: ২৩] তাদের দেখতে মনে হবে যেন, পরিষ্কার ডিম। আল্লাহ্ বলেন, “মনে হয় যেন তারা সুরক্ষিত ডিম্ব।” [সূরা আস-সাফফাত: ৪৯] তাদেরকে এর আগে কেউ স্পর্শ করেনি। আর তারাও আপনি স্বামী ছাড়া অন্য কারো দিকে তাকায় না। মহান আল্লাহ বলেন, “সেসবের মাঝে রয়েছে বহু আনত নয়না, যাদেরকে আগে কোন মানুষ অথবা জিন স্পর্শ করেনি।” [সূরা আর-রাহমান: ৫৬] অন্যত্র বলা হয়েছে, “তাদের সংগে থাকবে আয়তনয়না, আয়তলোচনা হুরীগণ।” [সূরা আস-সাফফাত: ৪৮] আরও বলা হয়েছে, “তারা হূর, তাঁবুতে সুরক্ষিতা।” [সূরা আর রাহমান: ৭১] তারা দেখতে মূল্যবান পাথরের মত সুন্দর ও মসৃন হবে। আল্লাহ বলেন, “তারা যেন পদ্মরাগ ও প্রবাল।” [সূরা আর-রাহমান: ৫৭] তাদের সৌন্দর্য এমন যে, তা বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীন সার্বিকভাবে ফুটে উঠবে। আল্লাহ বলেন, “সে উদ্যানসমূহের মাঝে রয়েছে সুশীলা, সুন্দরীগণ।” [সূরা আর-রাহমান: ৭০]
.
জান্নাতে মুমিন বান্দাদের জন্য কতজন হুর থাকবে তার স্পষ্ট বর্ণনা এই হাদিসে পাওয়া যায়,রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সুন্নাহতে যা সহীহ সূত্রে প্রমাণিত, তা হলো জান্নাতে প্রত্যেক মুমিনের জন্য দুইজন স্ত্রী থাকবে; আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে দল প্রথমে জান্নাতে প্রবেশ করবে তাদের চেহারা পূর্ণিমার রাতের চাঁদের মত উজ্জ্বল হবে। তারা সেখানে থুথু ফেলবে না, নাক ঝাড়বেনা, মল মূত্র ত্যাগ করবেনা। সেখানে তাদের পাত্র হবে স্বর্ণের; তাদের চিরুণী হবে স্বর্ণ ও রৌপ্যের, তাদের ধুনুচিতে থাকবে সুগন্ধি কাষ্ঠ। তাদের গায়ের ঘাম মিসকের মত সুগন্ধময় হবে। তাদের প্রত্যেকের জন্য এমন দু’জন স্ত্রী থাকবে যাদের সৌন্দর্যের কারণে গোশত ভেদ করে পায়ের নলার হাড়ের মজ্জা দেখা যাবে। তাদের মধ্যে কোন মতভেদ থাকবে না; পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ থাকবে না। তাদের সকলের অন্তর এক অন্তরের মত হবে। তারা সকাল- সন্ধ্যায় আল্লাহর তাসবীহ পাঠ করতে থাকবে।”(সহীহ বুখারী: ৩২৪৫; সহীহ মুসলিম: ২৮৩৪)
.
এই হাদীসের কিছু সনদে এই দুই স্ত্রীকে ‘হুরুল ঈন’ হিসেবে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, আবার অন্য কিছু বর্ণনায় তা নির্দিষ্ট না করে সাধারণভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া জান্নাতে দুইয়ের অধিক স্ত্রী থাকা—তা বিবাহের মাধ্যমে হোক কিংবা দাসী (তাসার্রী) হিসেবে হোক—এ প্রসঙ্গে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তবে তার অর্থ সরাসরি স্পষ্ট নয়। আবার যেসব হাদীসের বক্তব্য এ বিষয়ে স্পষ্ট, সেগুলো শুদ্ধতার বিচারে ‘সহীহ’ নয়। এ বিষয়ে আলেমদের বিস্তারিত বিশ্লেষণ পরে আসছে। তবে এসব হাদীসের মূল সারকথা ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (রাহি.) তাঁর ‘হাদীউল আরওয়াহ’ গ্রন্থে এভাবে তুলে ধরেছেন:”لا ريب أن للمؤمن في الجنة أكثر من اثنتين لما في الصحيحين [البخاري (3243)، ومسلم (2838)] من حديث أبي عمران الجوني، عن أبي بكر بن عبد الله بن قيس، عن أبيه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: (أن للعبد المؤمن في الجنة لخيمة من لؤلؤ مجوفة طولها ستون ميلا ، للعبد المؤمن فيها أهلون ، فيطوف عليهم لا يرى بعضهم بعضا)”এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, জান্নাতে একজন মুমিনের জন্য দুইয়ের অধিক স্ত্রী থাকবে। কারণ সহীহাইন [বুখারী: ৩২৪৩, মুসলিম: ২৮৩৮] এর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে— আবু ইমরান আল-জাওনী, আবু বকর ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে কায়স থেকে এবং তিনি তাঁর পিতা (আবু মুসা আশআরী) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:’জান্নাতে মুমিন বান্দার জন্য একটি ফাঁপা মুক্তার তৈরি তাঁবু থাকবে, যার উচ্চতা (বা দৈর্ঘ্য) হবে ষাট মাইল। সেখানে মুমিনের পরিবার-পরিজন (স্ত্রীগণ) অবস্থান করবে। মুমিন ব্যক্তি তাদের প্রত্যেকের কাছে যাতায়াত করবে, কিন্তু (বিশালত্বের কারণে) তারা একে অপরকে দেখতে পাবে না।”(সূত্র: হাদীউল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ২৩২)
.
প্রিয় পাঠক, জান্নাতে মুমিনদের পুরস্কার হিসেবে প্রাপ্ত ‘হুর’ বা জীবনসঙ্গিনীদের সংখ্যা নিয়ে বিজ্ঞ আলেমগণের বিভিন্ন তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও মতামত রয়েছে। আমরা পার্থিব নারী ও জান্নাতি হুরদের মধ্যকার পার্থক্যের দীর্ঘ আলোচনায় না গিয়ে সংক্ষেপে এ বিষয়ক মূল তথ্যগুলো আপনার সামনে উপস্থাপন করছি:
.
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وقد صح : لكل رجل من أهل الجنة زوجتان من الإنسيات ، سوى الحور العين”এটি প্রমাণিত যে, জান্নাতবাসী প্রত্যেক পুরুষের জন্য মানবজাতি থেকে (অর্থাৎ দুনিয়া থেকে আসা) দুইজন করে স্ত্রী থাকবে, যা জান্নাতের হুর (হুরুল ঈন) ব্যতীত।”(ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া,খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৩২) ইবনে তাইমিয়াহ (রাহিমাহুল্লাহ) এখানে মূলত বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত সেই সহিহ হাদিসটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে জান্নাতিদের প্রত্যেকের অন্তত দুইজন করে স্ত্রী থাকবে। শাইখ এখানে স্পষ্ট করেছেন যে, এই ‘দুইজন স্ত্রী’ বলতে দুনিয়ার নারীদের (মানুষ) বোঝানো হয়েছে, যারা জান্নাতে যাওয়ার পর হুরদের অতিরিক্ত হিসেবে সেখানে অবস্থান করবেন।হাফিয ইবনে কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”المراد من هذا أن هاتين من بنات آدم، وله غيرهما من الحور العين ما شاء الله عز وجل”এর অর্থ হলো এই যে, এরা দুজন (দুনিয়ার) আদম সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত; আর এদের বাইরেও জান্নাতে তাঁর জন্য ‘হুরদের’ মধ্য থেকে আল্লাহ যা ইচ্ছা করবেন (ততসংখ্যক) স্ত্রী থাকবে।”(সূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ৩৪১)
.
আবার কিছু আলেম আরও বলেছেন যে, দুজন হলো সর্বনিম্ন সংখ্যা, অন্যথায় প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হবে।
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৭৩ হি: মৃত: ৮৫২ হি:] বলেন:”قوله: (ولكل واحد منهم زوجتان) أي: من نساء الدنيا؛ فقد روى أحمد من وجه آخر عن أبي هريرة مرفوعا – في صفة أدنى أهل الجنة منزلة -: (وإن له من الحور العين لاثنتين وسبعين زوجة ، سوى أزواجه من الدنيا) وفي سنده شهر بن حوشب، وفيه مقال. ولأبي يعلى في حديث الصور الطويل من وجه آخر عن أبي هريرة في حديث مرفوع: (فيدخل الرجل على ثنتين وسبعين زوجة مما ينشئ الله، وزوجتين من ولد آدم) وأخرجه الترمذي من حديث أبي سعيد رفعه: (إن أدنى أهل الجنة الذي له ثمانون ألف خادم، وثنتان وسبعون زوجة) وقال: غريب. ومن حديث المقدام بن معد يكرب عنده: (للشهيد ست خصال) الحديث. وفيه: (ويتزوج ثنتين وسبعين زوجة من الحور العين) وفي حديث أبي أمامة عند ابن ماجه والدارمي رفعه: (ما أحد يدخل الجنة إلا زوجه الله ثنتين وسبعين من الحور العين، وسبعين وثنتين من أهل الدنيا) وسنده ضعيف جدا.وأكثر ما وقفت عليه من ذلك ما أخرج أبو الشيخ في العظمة والبيهقي في البعث من حديث عبد الله بن أبي أوفى رفعه: (إن الرجل من أهل الجنة ليزوج خمسمائة حوراء، أو إنه ليفضي إلى أربعة آلاف بكر، وثمانية آلاف ثيب) وفيه راو لم يسم. وفي الطبراني من حديث ابن عباس: (إن الرجل من أهل الجنة ليفضي إلى مائة عذراء). وقال ابن القيم: ليس في الأحاديث الصحيحة زيادة على زوجتين ، سوى ما في حديث أبي موسى: (إن في الجنة للمؤمن لخيمة من لؤلؤة له فيها أهلون، يطوف عليهم) . قلت: الحديث الأخير صححه الضياء.وفي حديث أبي سعيد عند مسلم في صفة أدنى أهل الجنة: (ثم يدخل عليه زوجتاه) .والذي يظهر أن المراد أن أقل ما لكل واحد منهم زوجتان”
রাসূল (ﷺ)-এর বাণী:আর তাদের প্রত্যেকের জন্য থাকবে দুইজন স্ত্রী’—অর্থাৎ দুনিয়ার নারীদের মধ্য থেকে।ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) অন্য একটি সূত্রে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে মারফু হিসেবে (রাসূলের কথা হিসেবে) জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরের ব্যক্তির বিবরণ দিতে গিয়ে বর্ণনা করেছেন: “আর তার জন্য হুরুল ‘ঈনদের মধ্য থেকে বাহাত্তরজন স্ত্রী থাকবে, তার দুনিয়ার স্ত্রীগণ ছাড়া। তবে এর বর্ণনাসূত্রে ‘শাহর ইবনে হাওশাব’ রয়েছেন, যার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে হাদিস বিশারদদের সমালোচনা আছে। ইমাম আবু ইয়া’লা শিঙায় ফুঁৎকার সংক্রান্ত দীর্ঘ হাদিসে অন্য সূত্রে আবু হুরায়রা (রা.) থেকে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেন: “জান্নাতি ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার নবসৃষ্ট (হুরদের) মধ্য থেকে ৭২ জন এবং আদম সন্তানদের (দুনিয়ার নারীদের) মধ্য থেকে ২ জন স্ত্রীর কাছে প্রবেশ করবেন।”ইমাম তিরমিযী আবু সাঈদ (রা.) থেকে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেছেন:”নিশ্চয়ই জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরের ব্যক্তির ৮০ হাজার সেবক এবং ৭২ জন স্ত্রী থাকবে।” তবে ইমাম তিরমিযী একে ‘গরীব’ (দুর্বল পর্যায়ের) বলেছেন। এছাড়া মিকদাম ইবনে মাদিকারিব (রা.) থেকে বর্ণিত তিরমিযীর অপর এক হাদিসে শহীদের ছয়টি বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে:”সে (শহীদ) ৭২ জন হুরকে বিবাহ করবে।” ইমাম ইবনে মাজাহ এবং দারেমিতে আবু উমামা (রা.) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত হয়েছে:”জান্নাতে প্রবেশকারী প্রত্যেক ব্যক্তিকে আল্লাহ ৭২ জন হুর এবং ৭২ জন দুনিয়ার নারীর সাথে বিবাহ দেবেন।”কিন্তু এর বর্ণনাসূত্র অত্যন্ত দুর্বল (যঈফ জিদ্দান)। এ বিষয়ে আমি (ইবনু হাজার) সর্বোচ্চ যে সংখ্যাটি পেয়েছি, তা হলো আবু শেখ ‘আল-আজমাহ’ গ্রন্থে এবং বায়হাকী ‘আল-বা’স’ গ্রন্থে আবদুল্লাহ ইবনে আবি আউফা (রা.) থেকে মারফু সূত্রে বর্ণনা করেছেন: “জান্নাতের একজন ব্যক্তি পাঁচশ হুরকে বিবাহ করবে, অথবা সে চার হাজার কুমারী এবং আট হাজার অকুমারী স্ত্রীর সান্নিধ্য লাভ করবে।”তবে এই বর্ণনায় একজন ‘অজ্ঞাত’ (নামহীন) রাবী রয়েছেন।ইমাম তাবারানি ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন: “জান্নাতের একজন ব্যক্তি একশ কুমারী স্ত্রীর সান্নিধ্য লাভ করবেন।”ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেছেন:”সহীহ হাদিসসমূহে ‘দুইজন স্ত্রীর’ বেশি কোনো সুনির্দিষ্ট সংখ্যার উল্লেখ আসেনি; কেবল আবু মুসা (রা.)-এর হাদিসটি ছাড়া। সেখানে বলা হয়েছে: ‘জান্নাতে মুমিনের জন্য একটি মুক্তার তাবু থাকবে, সেখানে তার স্ত্রীরা থাকবেন এবং তিনি তাদের কাছে যাতায়াত করবেন’।” আমি (ইবনু হাজার) বলছি: শেষোক্ত হাদিসটিকে ইমাম জিয়া আল-মাকদিসি সহীহ বলেছেন। সহীহ মুসলিম-এ আবু সাঈদ (রা.) থেকে জান্নাতের সর্বনিম্ন স্তরের ব্যক্তির বর্ণনায় এসেছে: “অতঃপর তার নিকট তার দুইজন স্ত্রী প্রবেশ করবেন।” সারকথা এই যে, আপাতদৃষ্টিতে এটিই স্পষ্ট হয় যে—জান্নাতিদের প্রত্যেকের জন্য ‘ন্যূনতম’ দুইজন করে স্ত্রী নিশ্চিতভাবে থাকবেন।”( ইবনু হাজার ফাতহুল বারী খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩২৬)
.
পক্ষান্তরে, অনেক আলেম জান্নাতে দুনিয়ার নারীদের এই আধিক্যের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তাঁদের মতে, এই অতিরিক্ত সংখ্যা কেবল ‘হূর-ঈন’দের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তবে ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্যে এ বিষয়ে কিছুটা ভিন্ন ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। আলোচনার শুরুতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, প্রত্যেক মুমিন দুইজন হূর-ঈন স্ত্রী পাবেন এবং আমল অনুযায়ী আরও অনেক দাসী লাভ করবেন। কিন্তু আলোচনার সমাপ্তিতে তিনি সুনিশ্চিতভাবে এই মত ব্যক্ত করেছেন যে, একজন মুমিন জান্নাতে দুইয়ের অধিক স্ত্রী লাভ করবেন—তা দুনিয়ার নারী হোক কিংবা হূর-ঈন।”তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:(لكل امرئ منهم زوجتان) والظاهر أنهن من الحور العين”প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য কমপক্ষে দুইজন স্ত্রী থাকবে; এবং এটি সুস্পষ্ট যে তারা জান্নাতি হূরদের মধ্য থেকেই হবে।”(সূত্র: হাদিউল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ১২৫)
.
জান্নাতে হুর বা সঙ্গিনীদের সংখ্যা সংক্রান্ত বর্ণনাগুলোর ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর ‘হাদিউল আরওয়াহ’ গ্রন্থে এক চমৎকার সমন্বয় করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অধিকাংশ বিশুদ্ধ হাদিসে মূলত দুইজন স্ত্রীর কথা এসেছে; তবে বাহাত্তরজনের বর্ণনাটি যদি সঠিক ধরা হয়, তবে তা দ্বারা দুইজন মূল স্ত্রীর অতিরিক্ত অন্যান্য সেবিকা বা হুরদের বোঝানো হতে পারে, যাদের সংখ্যা জান্নাতীদের মর্যাদা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। অন্যভাবে বলা যায়, এই সংখ্যাটি মূলত মুমিনের শারীরিক সক্ষমতার একটি রূপক প্রকাশ। যেমনটি আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত তিরমিজির একটি সহিহ হাদিসে এসেছে যে, জান্নাতে একজন মুমিনকে একশ জনের সমান শক্তি প্রদান করা হবে। সুতরাং বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লিখিত এই সংখ্যাগুলো জান্নাতের অবারিত নেয়ামত ও মুমিনের অসীম সামর্থ্যের বহিঃপ্রকাশ হওয়াটাই অধিক যুক্তিযুক্ত। প্রকৃত জ্ঞান কেবল আল্লাহর নিকটেই রয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: হাদিউল আরওয়াহ, পৃষ্ঠা: ১২৩)
.
দ্বিতীয় মত: জান্নাতে মুমিনের জন্য দুনিয়ার দুইজন স্ত্রী এবং কমপক্ষে সত্তরজন হুরঈন থাকবে।এর ঊর্ধ্বে কোনো সীমা নেই।
.
ইমাম ইরাকী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:”الزوجتان من نساء الدنيا، والزيادة على ذلك من الحور العين… قد تبين ببقية الروايات أن الزوجتين أقل ما يكون لساكن الجنة من نساء الدنيا، وأن أقل ما يكون له من الحور العين سبعون زوجة. وأما أكثر ذلك فلا حصر له … وروى الترمذي من رواية ثوير بن أبي فاختة عن ابن عمر رضي الله عنهما قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: (إن أدنى أهل الجنة منزلة لمن ينظر إلى جنانه، وأزواجه، ونعيمه، وخدمه، وسرره، مسيرة ألف سنة، وأكرمهم على الله من ينظر إلى وجهه غدوة وعشية)”জান্নাতীদের জন্য দুনিয়ার নারীদের মধ্য থেকে দুইজন স্ত্রী থাকবেন, আর এর অতিরিক্ত যা থাকবে তা হবে হুরুল ঈনদের মধ্য থেকে। … অন্যান্য বর্ণনার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, জান্নাতবাসীদের জন্য দুনিয়ার নারীদের মধ্য থেকে সর্বনিম্ন দুইজন স্ত্রী থাকবেন এবং হুরুল ঈনদের মধ্য থেকে সর্বনিম্ন সত্তরজন স্ত্রী থাকবেন। আর এর সর্বোচ্চ সংখ্যার কোনো সীমা নেই। … ইমাম তিরমিজি (রহ.) সুওয়াইর ইবন আবি ফাখতাহ-এর সূত্রে ইবনু উমর (রাযি.) হতে বর্ননা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:”একজন সাধারণ মর্যাদাসম্পন্ন জান্নাতীর বাগান, স্ত্রী, আমোদ-প্রমোদের সামগ্ৰী, খাদেম এবং খাট-পালং ও আসন সমূহ কেউ দেখতে চাইলে তা তার জন্য হাজার বছরের পথ। তাদের মধ্যে আল্লাহ তা’আলার নিকটে সবচাইতে মর্যাদাবান ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় তার চেহারা দর্শন করবে।”(সূত্র: ত্বরহুত তাসরীব ফী শরহিত তাকরীব; ৮/২৭০)
.
.
ইবনে রজব হাম্বলী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:هاتان الزوجتان من الحور العين، لا بد لكل رجل دخل الجنة منهما، وأما الزيادة على ذلك، فتكون بحسب الدرجات والأعمال، ولم يثبت في حصر الزيادة على الزوجتين شيء “হুরদের মধ্য থেকে এই দুইজন স্ত্রী প্রত্যেক জান্নাতবাসীর জন্য সুনিশ্চিত। এর বাইরে অতিরিক্ত স্ত্রীর সংখ্যা জান্নাতের উচ্চমর্যাদা ও আমলের ওপর নির্ভরশীল। তবে দুইজনের অধিক স্ত্রীর কোনো নির্দিষ্ট সীমা কোনো বর্ণনা দ্বারা সাব্যস্ত হয়নি।” (সূত্র: আত-তাখউইফ মিনান নার (পৃষ্ঠা: ২৬৮)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেন:لكل واحد زوجتان من الحور العين غير زوجاته من الدنيا، وغير ما يعطى من الزوجات الأخريات من الحور العين، وكل واحد لا ينقص عن زوجاته من الحور العين مع ما له من زوجات من الدنيا”প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য হুরদের মধ্য থেকে দুইজন করে স্ত্রী থাকবে, যা তাদের দুনিয়ার স্ত্রীদের বাইরে এবং হুরদের মধ্য থেকে প্রদান করা অন্যান্য স্ত্রীদেরও অতিরিক্ত। আর দুনিয়ার স্ত্রীদের পাশাপাশি হুরদের মধ্য থেকে প্রাপ্ত স্ত্রীদের সংখ্যার ক্ষেত্রে কারো কোনো কমতি হবে না।”(দুরুস লিশ-ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায: ৪/২১)
ইমাম (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেন;”يعطى كل زوج من الحور العين ما شاء الله منهن، على حسب أعماله الصالحة وتقواه لله جل وعلا، ولكل واحد زوجتان من الحور العين، غير ما يعطى منهن زيادة على ذلك، كل واحد له زوجتان من الحور العين، هذا أمر معلوم، لكن الزيادة الله الذي يعلم مقدارها”প্রত্যেক ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী হুর দান করবেন, যা নির্ভর করবে ওই ব্যক্তির নেক আমল এবং আল্লাহর প্রতি তাঁর তাকওয়ার (পরহেজগারিতার) ওপর। তবে প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য (জান্নাতে) অন্তত দুইজন হুর নিশ্চিত থাকবে; এর অতিরিক্ত যা দেওয়া হবে তা এই দুইজনের বাইরে। প্রত্যেকের জন্য দুইজন করে হুর থাকা একটি সুনিশ্চিত বিষয়, তবে এর অতিরিক্ত আর কতজন দেওয়া হবে তার পরিমাণ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানেন না।”—[সূত্র: ফাতাওয়া নূরুন আলাদ-দারব, ইবনে বায; খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৫১]
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে এটি স্পষ্ট যে, রাসূল (ﷺ)-এর হাদিস এবং আল্লামা ইবনে কাইয়্যিম ও হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর গবেষণালব্ধ মতানুযায়ী—জান্নাতের প্রত্যেক শহীদ তাঁদের স্ত্রীদের পাশাপাশি সত্তরোর্ধ্ব হূর লাভ করবেন। তবে সাধারণ মুমিনদের জন্য হূরের নির্দিষ্ট সংখ্যা বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট সহীহ হাদীস না থাকলেও ওলামায়ে কেরাম একমত যে, প্রত্যেক মুমিন জান্নাতে ন্যূনতম দুইজন স্ত্রী পাবেন। এই দুই স্ত্রী জান্নাতের হূর হবেন নাকি দুনিয়ার মুমিন নারী—তা নিয়ে তাত্ত্বিক মতভেদ থাকলেও চূড়ান্ত জ্ঞান কেবল মহান আল্লাহর নিকটই নিহিত। সুতরাং এই বিষয়টি নিয়ে অযথা চিন্তা ভাবনা কিংবা বাড়াবাড়ি না করে কিভাবে জান্নাতে যাওয়া যায় সেটা নিয়ে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো উচিত। গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৫৭৫০৯)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment