Friday, January 9, 2026

বিক্রেতার নিজ মালিকানায় না থাকা পণ্য বিক্রির শারঈ বিধান এবং এ ধরনের লেনদেন বৈধ ও শুদ্ধ করার পদ্ধতিসমূহ

 প্রশ্ন: বিক্রেতার নিজ মালিকানায় না থাকা পণ্য বিক্রির শার’ঈ বিধান কী? এবং এ ধরনের লেনদেন বৈধ ও শুদ্ধ করার পদ্ধতিসমূহ কী কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তরপ্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর বিক্রেতার নিজ মালিকানায় নেই এমন পণ্য বিক্রি করা শরীয়তসম্মত নয়। এ ধরনের লেনদেন শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ আপনি এমন কিছু বিক্রি করছেন যার মালিক আপনি না, আপনি এমন কিছু বিক্রি করছেন যা আপনার কাছে নেই,এমনকি ক্রেতাকে সেটার নিশ্চয়তা দেয়া ও হস্তান্তর করার ক্ষমতা আপনার নেই।ফলে এই লেনদেন প্রকৃতপক্ষে প্রতারণামূলক বিক্রয় ও জুয়ার সদৃশ এক অনিশ্চিত চুক্তিতে পরিণত হয়। এ ধরনের লেনদেন থেকে অসংখ্য বিরোধ ও ঝগড়া-বিবাদের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ—হতে পারে, যে দামে পণ্যটি বিক্রি করা হয়েছে, পরবর্তীতে হঠাৎ তার মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে গেল; অথবা হতে পারে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্যটির স্টকই আর পাওয়া গেল না। এসব পরিস্থিতি উভয় পক্ষের জন্য ক্ষতি ও বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।সুতরাং শরীয়তের দৃষ্টিতে এমন কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বিক্রি করা জায়েয নয়, যার মালিক বিক্রেতা নিজে নয় এবং যা তার দখলে নেই। অনুরূপভাবে, এমন কোনো বস্তু বিক্রি করাও বৈধ নয়, যা কেবল বর্ণনার মাধ্যমে বিক্রেতার জিম্মায় নির্ধারিত হলেও বাস্তবে তা অন্যের দখলে রয়েছে।তবে এর একমাত্র ব্যতিক্রম হলো ‘বাই‘উস সালাম’ পদ্ধতির বিক্রয়, যা শরীয়তের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বৈধ।
.
হাদিসে এসেছে, হাকীম ইবনে হিযাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কোনো লোক এসে এমন কিছু কিনতে চায় যা আমার কাছে নেই। আমি কি তার জন্য সেটি বাজার থেকে কিনে দিব?’ তিনি (ﷺ) বলেন:( لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ ) “তোমার কাছে যে পণ্য নেই তা তুমি বিক্রি করো না।”[(হাদীসটি তিরমিযী হা/১২৩২; আবু দাউদ হা/৩৫০৩; নাসাঈ হা/৪৬১৩; ও ইবনে মাজাহ হা/২১৮৭) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহীহুত তিরমিযীতে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]
.
এ হাদীসের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ক্রয়-বিক্রয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ি মূলনীতি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছেন। তা হলো যে পণ্য বিক্রয়ের সময় বিক্রেতার মালিকানায় বা দখলে নেই, সে পণ্য বিক্রি করা বৈধ নয়।অর্থাৎ শরিয়ত নির্দিষ্টভাবে এমন জিনিস বিক্রয় করতে নিষেধ করেছে, যা বিক্রেতার অধীনে বিদ্যমান নয়। এই নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হলো—যদি কোনো ব্যক্তি এমন জিনিস বিক্রি করে, যা তার মালিকানায় বা দখলে নেই, তাহলে সে নির্ধারিত সময়ে তা সরবরাহ করতে পারবে কি না—এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকা যায় না। কারণ একই বৈশিষ্ট্যের পণ্য সময়মতো পাওয়া যেতে পারে, আবার নাও পাওয়া যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তাই প্রতারণার মূল উৎস। আর যে ক্রয়-বিক্রয়ে প্রতারণা, ধোঁকা বা অনিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকে, শরিয়তের দৃষ্টিতে তা স্পষ্টতই নিষিদ্ধ।অতএব, হাদীসটির সারকথা হলো—ইসলামে এমন কোনো পণ্য বিক্রি করা জায়েয নয়, যা বিক্রেতার মালিকানায় বা বাস্তব দখলে নেই। অর্থাৎ নিজের কাছে মজুদ না থাকা কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর বিক্রয়চুক্তি করা শরিয়তসম্মত নয়। উদাহরণস্বরূপ কোনো ক্রেতা একজন ব্যবসায়ীর কাছে এসে নির্দিষ্ট একটি পণ্য ক্রয় করতে চাইল, অথচ সে পণ্যটি তখন ব্যবসায়ীর কাছে মজুদ নেই। এরপর উভয়ে নগদ বা বাকিতে মূল্য নির্ধারণ করে চুক্তিতে আবদ্ধ হলো। এই অবস্থায় চুক্তির সময় পর্যন্ত বিক্রেতা উক্ত পণ্যের মালিক নয়। পরে সে বাজার থেকে পণ্যটি ক্রয় করে এনে ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের ক্রয়–বিক্রয় বৈধ নয়। এর সহজ উদাহরণ হলো—পালিয়ে যাওয়া কোনো গরু বা মহিষ বিক্রি করা, অথবা এমন কোনো জমি বিক্রি করা, যা নিজের দখলে নেই কিংবা নিজের কর্তৃত্বের বাইরে রয়েছে। এসবই “নিজের কাছে নেই এমন জিনিস বিক্রি করার” নিষিদ্ধ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।(বিস্তারিত দেখুন; আওনুল মা‘বূদ, খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ২৯১)।
.
হাদীসটির ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনু মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وبيع ما ليس عندك يحتمل معنيين : أحدهما : أن يقول : أبيعك عبدا أو دارا معينة وهي غائبة ، فيشبه بيع الغرر لاحتمال أن تتلف أو لا يرضاها . ثانيهما : أن يقول : هذه الدار بكذا ، على أن أشتريها لك من صاحبها ، أو على أن يسلمها لك صاحبها ” . قال ابن حجر : ” وقصة حكيم موافقة للاحتمال الثاني “নিজের কাছে নেই এমন বস্তু বিক্রি করার দুটি অর্থ হতে পারে: (১),বিক্রেতার পক্ষ থেকে ক্রেতাকে এটা বলা যে, আমি তোমার কাছে অমুক একটি নির্দিষ্ট গোলাম বা একটি নির্দিষ্ট বাড়ি বিক্রি করছি, অথচ তার কাছে সেটি (বিক্রির সময়) সেখানে উপস্থিত নেই। এতে লেনদেনটি বাই‘উল গরার (অনিশ্চয়তাপূর্ণ বিক্রয়)-এর সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়। কারণ হতে পারে বস্তুটি ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা ক্রেতা সেটি দেখে সন্তুষ্ট নাও হতে পারে। (২).বিক্রেতার পক্ষ থেকে ক্রেতাকে এটা বলা যে, আমি এই বাড়িটি তোমার কাছে এত দামে (নিদিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়) বিক্রি করলাম’, এই শর্তে যে আমি এটি এর মালিকের কাছ থেকে কিনে দেব অথবা মালিক নিজেই তোমার কাছে বাড়িটি হস্তান্তর করবে। অর্থাৎ বিক্রেতা নিজে মালিক না হয়েই বিক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। হাফেয ইবনু হাজার আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাকিম কর্তৃক বর্ণিত ঘটনাটি দ্বিতীয় অর্থের সাথেই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”(ইবনু হাজার; ফাতহুল বারী: খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৬০)
.
অপর বর্ননায় আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (لَا يَحِلُّ سَلَفٌ وَبَيْعٌ ، وَلَا شَرْطَانِ فِي بَيْعٍ ، وَلَا رِبْحُ مَا لَمْ تَضْمَنْ ، وَلَا بَيْعُ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ ) “বিক্রয় ও ঋণ একসাথে বৈধ নয়, এক বিক্রয়ে দুই রকম শর্ত বৈধ নয়, তুমি যেটার জামিন হওনি সেটা থেকে মুনাফা গ্রহণ বৈধ নয় এবং যা তোমার কাছে নেই তা বিক্রি করা বৈধ নয়।”(হাদীসটি তিরমিযী হা/১২৩৪) বর্ণনা করে বলেন: হাদীসটি হাসান সহীহ। এছাড়া আবু দাউদ হা/৩৫০৪) ও নাসাঈ হা/৪৬১১) বর্ণনা করেন)
.
উপরোক্ত দুটি হাদিসের ব্যাখায় আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন:”فاتفق لفظُ الحديثين على نهيه صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عن بيع ما ليس عنده ، فهذا هو المحفوظُ مِن لفظه صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وهو يتضمن نوعاً مِن الغَرَرِ ؛ فإنه إذا باعه شيئاً معيَّناً ولَيس في ملكه ثم مضى لِيشتريه ، أو يسلمه له : كان متردداً بينَ الحصول وعدمه ، فكان غرراً يشبه القِمَار ، فَنُهِىَ عنه “দুই হাদীসের পাঠ একই যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন পণ্য বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন যা ব্যক্তির কাছে নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বচন থেকে এটি সংরক্ষিত। এই প্রকার বিক্রয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ সে যদি কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বিক্রি করে যা তার মালিকানায় নেই, তারপর সেটি ক্রয় করতে যায় কিংবা তাকে হস্তান্তর করতে যায় তখন সে পণ্যটি পাওয়া বা না-পাওয়ার মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে। তাই এটি অনিশ্চিত জুয়ার সদৃশ। তাই এটিকে নিষেধ করা হয়েছে।”(ইবনু কাইয়ুম, যাদুল মা’আদ ফী হাদই খাইরিল ইবাদ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৮০৮)
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) অস্তিত্বহীন জিনিসের বিক্রির প্রকারসমূহের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন:”معدومٌ لا يُدرى يحصُل أو لا يحصُل ، ولا ثقة لبائعه بحصوله ، بل يكونُ المشتري منه على خطر ، فهذا الذي منع الشارعُ بيعَه ، لا لِكونه معدوماً بل لكونه غَرَراً ، فمنه صورةُ النهي التي تضمنها حديث حكيم بن حزام وابن عمرو رضي الله عنهما ؛ فإن البائعَ إذا باعَ ما ليس في مُلكه ولا له قُدرة على تسليمه ، ليذهب ويحصله ويسلِّمه إلى المشتري : كان ذلك شبيهاً بالقمار والمخاطرة مِن غير حاجة بهما إلى هذا العقدِ ، ولا تتوقَّفُ مصلحتُهما عليه “এমন অস্তিত্বহীন বস্তু যা পাওয়া যাবে কি; যাবে না জানা নেই, বিক্রেতার এটি পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা নেই, বরং তার থেকে ক্রয়কারী ঝুঁকির মধ্যে থাকে; এ ধরণের বস্তু বিক্রয় করা শরীয়তপ্রণেতা নিষিদ্ধ করেছেন। এ নিষেধাজ্ঞা বস্তুটি অস্তিত্বহীন হওয়ার কারণে নয়; বরং অনিশ্চয়তার কারণে। এ শ্রেণীর বিক্রয়ের একটি রূপ হাকীম ইবনে হিযাম ও ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বর্ণিত হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে। বিক্রেতা যদি এমন কিছু বিক্রি করে যা তার মালিকানায় নেই এবং যা হস্তান্তর করার ক্ষমতা তার নেই; কিন্তু সে গিয়ে বস্তুটি সংগ্রহ করে ক্রেতাকে হস্তান্তর করবে; এমন লেনদেন জুয়া ও ঝুঁকির সদৃশ। অথচ এমন লেনদেনে এ দুটোর কোনো প্রয়োজন নেই এবং তাদের স্বার্থ এর উপর নির্ভর করে না।”(ইবনু কাইয়ুম, যাদুল মা’আদ ফী হাদই খাইরিল ইবাদ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৮০১০)
.
একইভাবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে কিছু ক্রেতা অনলাইনের মাধ্যমে পণ্য ক্রয় করার পর তা বাস্তবে নিজ দখলে গ্রহণ করা বা গুদামঘরে হস্তগত করার আগেই অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের লেনদেনও বৈধ নয়। কারণ ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, পণ্য পূর্ণভাবে দখল ও হস্তগত হওয়ার পূর্বে তা বিক্রয় করা অনুমোদিত নয়। তবে প্রয়োজনে ক্রেতা যদি পণ্যটি যেখানে সংরক্ষিত রয়েছে, সেখান থেকেই নিজের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে (যেমন নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করে বা হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করে) বিক্রি করে, তাহলে তা শরিয়তসম্মত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
প্রখ্যাত সাহাবী ইবনে উমর (রাদিআল্লাহু আনহু) বলেন:ابْتَعْتُ زَيْتًا فِي السُّوقِ فَلَمَّا اسْتَوْجَبْتُهُ لِنَفْسِي لَقِيَنِي رَجُلٌ فَأَعْطَانِي بِهِ رِبْحًا حَسَنًا فَأَرَدْتُ أَنْ أَضْرِبَ عَلَى يَدِهِ فَأَخَذَ رَجُلٌ مِنْ خَلْفِي بِذِرَاعِي فَالْتَفَتُّ فَإِذَا زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فَقَالَ : لَا تَبِعْهُ حَيْثُ ابْتَعْتَهُ حَتَّى تَحُوزَهُ إِلَى رَحْلِكَ فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ( نَهَى أَنْ تُبَاعَ السِّلَعُ حَيْثُ تُبْتَاعُ حَتَّى يَحُوزَهَا التُّجَّارُ إِلَى رِحَالِهِمْ )”আমি বাজার থেকে তেল ক্রয় করলাম। ক্রয় পাকাপাকি হবার পর একজন লোক আমার কাছে এসে আমাকে তাতে একটা ভাল লাভ দিতে চাইলো। আমিও তার হাতে হাত মেরে বিক্রয় পাকাপাকি করতে চাইলাম। হঠাৎ করে এক লোক পেছন থেকে আমার বাহু ধরে ফেলল। আমি পেছনে চেয়ে দেখলাম, তিনি যাইদ ইবনে সাবেত। তিনি বললেন: ‘যেখানে ক্রয় করবেন ঐ স্থানে বিক্রয় করবেন না, যতক্ষণ আপনার স্থানে নিয়ে না যান। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্রয় করার স্থানে পণ্য বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন, যতক্ষণ না তা ক্রেতা তার ডেরায় বা স্থানে নিয়ে যায়।”(হাদীসটি আবু দাউদ হা/৩৪৯৯) বর্ণনা করেন।শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ আবি দাউদে এটিকে হাসান বলে গণ্য করেন)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] উপর্যুক্ত তিনটি হাদীস উল্লেখ করার পরে বলেন:” ومِن هذه الأحاديث وما جاء في معناها يتضح لطالب الحق أنه لا يجوز للمسلم أن يبيع سلعة ليست في ملكه ثم يذهب فيشتريها ، بل الواجب تأخير بيعها حتى يشتريها ويحوزها إلى ملكه ، ويتضح أيضا أن ما يفعله كثير من الناس من بيع السلع وهي في محل البائع قبل نقلها إلى ملك المشتري أو إلى السوق أمر لا يجوز ؛ لما فيه من مخالفة سنة الرسول صلى الله عليه وسلم ، ولما فيه من التلاعب بالمعاملات وعدم التقيد فيها بالشرع المطهر ، وفي ذلك من الفساد والشرور والعواقب الوخيمة ما لا يحصيه إلا الله عز وجل ، نسأل الله لنا ولجميع المسلمين التوفيق للتمسك بشرعه والحذر مما يخالفه “উক্ত হাদীস এবং এর সমার্থক হাদীস থেকে সত্যান্বেষী ব্যক্তির কাছে স্পষ্ট যে কোনো মুসলিমের জন্য এমন পণ্য বিক্রি করা জায়েয নেই যা তার মালিকানায় নেই, পরবর্তীতে সে গিয়ে ওটি ক্রয় করবে। বরং তার উপর আবশ্যক হলো: পণ্যটি কিনে নিজের মালিকানায় আনা অবধি বিক্রয়কে বিলম্বিত করা। এতে আরো স্পষ্ট হয় যে অনেক মানুষ যে কাজটি করে, তথা পণ্যটি ক্রেতার মালিকানায় কিংবা বাজারে আনার আগে বিক্রেতার দোকানে থাকতেই বিক্রি করে ফেলা— সেটি জায়েয নেই। কারণ এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ বিরোধী। অধিকন্তু এটি লেনদেন নিয়ে খেল-তামাশা এবং পবিত্র শরীয়ত অনুসরণ না করার নামান্তর। এতে এমন অনিষ্ট, ক্ষতি ও মন্দ পরিণতি রয়েছে যার পরিমাণ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের ও সমস্ত মুসলমানের জন্য তার শরীয়ত আঁকড়ে ধরার এবং শরীয়তের বিরোধী হয় এমন কিছু থেকে সতর্ক থাকার তৌফিক কামনা করছি।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৫২-৫৩)
.
শাইখ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘বিশুদ্ধ ব্যবসা-বাণিজ্যের কিছু শরী‘আতসম্মত নিয়ম-নীতি রয়েছে। শারঈ ব্যবসার একটি নিয়ম হল, ‘মানুষ তার মালিকানাধীন ও অধিকারভুক্ত জিনিস ক্রয়-বিক্রয় করবে’। কিন্তু আজ শেয়ার বাজারে বা অন্যান্য দোকানে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ এমন জিনিস ক্রয়-বিক্রয় করে, যা তার মালিকানাধীন ও অধিকারভুক্ত নয় এবং সেটি তার আয়ত্তেও নেই। শরী‘আতের আলোকে এরূপ ব্যবসা নিষিদ্ধ। সাধারণত শেয়ার ব্যবসায় পণ্য নিজ আয়ত্বে না নিয়েই ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। অথচ শরী‘আতের দৃষ্টিতে ক্রয়কৃত বস্তু হস্তগত হওয়ার পূর্বে বিক্রয় করা হারাম। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘আমরা রাসূল (ﷺ)-এর যুগে খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতাম। তখন তিনি আমাদের নিকট এ মর্মে আদেশ দিয়ে লোক পাঠাতেন যে, ঐ ক্রয়কৃত মাল বিক্রয় করার পূর্বেই যেন ক্রয়ের স্থান হতে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বরং নিজেদের ঘরে তুলে নেয়ার আগেই বিক্রয় করলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হত’ (সহীহ বুখারী, হা/২১৩৭, ২১৩১; সহীহ মুসলিম, হা/১৫২৭)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করবে, সে তা নিজ আয়ত্বে নেয়ার পূর্বে বিক্রয় করতে পারবে না’ (সহীহ বুখারী, হা/২১৩৬; সহীহ মুসলিম, হা/১৫২৫)। রাবী তাঊস (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটি কিভাবে হয়ে থাকে’? তিনি বললেন, ‘এটি এভাবে হয়ে থাকে যে, দিরহামের বিনিময়ে আদান-প্রদান হয়, অথচ পণ্যদ্রব্য অনুপস্থিত থাকে’ (সহীহ বুখারী, হা/২১৩২, ২১৩৫; সহীহ মুসলিম, হা/১৫২৫)। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রত্যেক পণ্যের ব্যাপারে অনুরূপ নির্দেশ প্রযোজ্য হবে’ (সহীহ বুখারী, হা/২১৩৫, ২১৩২; আল মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ, ২৫/২১৮-২১৯; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১২৪৩১১)
.
দ্বিতীয়ত: বিক্রেতার মালিকানায় নেই এমন পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে শরীয়তসম্মতভাবে লেনদেন শুদ্ধ করার পদ্ধতি কী?
.
শরীয়তের দৃষ্টিতে একজন ব্যবসায়ীর ক্রয়-বিক্রয় যেন বৈধ, স্বচ্ছ ও সঠিক হয়—সে জন্য তার করণীয় হলো নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া:
.
(১).পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহী ব্যক্তির কাছে আপনি পণ্য এমনভাবে পেশ করবেন যেন সেটির ব্যাপারে অজ্ঞতা কেটে যায় এবং বিবাদের অবকাশ না থাকে। আপনি পণ্যের মালিক হলে আপনি কত দামে পণ্যটি বিক্রি করবেন সেটি নির্ধারণ করবেন। ক্রেতা আপনাকে এই মূল্যে পণ্যটি কেনার ওয়াদা দিবে। তবে আপনি বিক্রি করতে বাধ্য নন এবং তারাও ক্রয় করতে বাধ্য নন। বরং উভয় পক্ষের লেনদেন করা কিংবা না করার স্বাধীনতা থাকবে। আপনি যখন শরীয়তসম্মত পন্থায় পণ্যের মালিক হবেন এবং এরপর ক্রেতার সাথে বিক্রি করার চুক্তি করবেন, তখন এই চুক্তিটি উভয়পক্ষের জন্য অনিবার্য হয়ে যাবে এবং এটি বিক্রয়ের সুবিদিত বিধানসমূহ অধিগ্রহণ করবে। এই প্রকার বিক্রির নাম ‘ওয়াদার বিক্রি’। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন;বিন বায;(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৬৮-৬৯)
.
(২).আপনি পণ্যটি কিনতে আগ্রহী ব্যক্তির কাছে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশনের বিনিময়ে কিংবা পণ্যের মূলের উপর একটি নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজের বিনিময়ে সেটি বিক্রি করতে পারেন। আপনি মানুষদের কাছে পণ্য উপস্থাপন করবেন এবং একটি নির্দিষ্ট এমাউন্ট নির্ধারণ করে দিবেন। যেমন ধরুন: প্রত্যেক লেনদেনের জন্য দশ ডলার করে কিংবা ক্রয়ের ইনভয়েসের ২ শতাংশ করে। এই পরিমাণ অর্থ বা শতাংশ পণ্য ক্রয়ে আপনার কষ্ট ও ক্লান্তির বিনিময় হিসেবে আপনাকে দেওয়া হবে।আপনি যেমনিভাবে ক্রেতাদের এজেন্ট হতে পারেন, তেমনিভাবে বিক্রেতাদের এজেন্টও হতে পারেন।কারন শর্ত মোতাবেক বা লোকরীতি মোতাবেক ক্রেতা বা বিক্রেতা কিংবা উভয়ের কাছ থেকে দালালির জন্য কমিশন গ্রহণ করা জায়েয। এটি মালেকী মাযহাবের অভিমত। যদি কোনো শর্ত বা লোকরীতি না থাকে তাহলে তাদের মতে বিক্রেতা এটি প্রদান করবে।
.
ড. আব্দুর রহমান ইবনে সালেহ আল-আত্বরাম (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:فإذا لم يكن شرط ولا عرف ، فالظاهر أن يقال : إن الأجرة على من وسّطه منهما ، فلو وسطه البائع في البيع كانت الأجرة عليه ، ولو وسطه المشتري لزمته الأجرة ، فإن وسطاه كانت بينهما”যদি কোনো শর্ত এবং লোকরীতি না থাকে তাহলে অগ্রগণ্য অভিমত হচ্ছে এই যে: ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে যে তাকে (এজেন্ট) দালাল নিযুক্ত করেছে সে তার পারিশ্রমিক দিবে। যদি বিক্রেতা তাকে দালাল নিযুক্ত করে তাহলে বিক্রেতা পারিশ্রমিক দিবে। যদি ক্রেতা তাকে দালাল নিযুক্ত করে তাহলে ক্রেতার উপর পারিশ্রমিক আবশ্যক হবে। আর যদি উভয়ে তাকে দালাল নিযুক্ত করে তাহলে উভয়ের মিলে তার পারিশ্রমিক প্রদান করবে।”(আল-ওয়াসাত্বাহ আত-তিজারিয়্যাহ; পৃষ্ঠা: ৩৮২) থেকে সমাপ্ত, আরো দেখুন: হাশিয়াতুদ দুসূকী; ৩/১২৯)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;”দালাল কী পরিমাণ কমিশন নিবে সেটি নিয়ে অনেক মতভেদ দেখা গিয়েছে। কখনো ২.৫% আবার কখনো ৫% নিচ্ছে। শরীয়ত অনুযায়ী সে কতটুকু নিবে? নাকি এটি বিক্রেতা ও দালালের মধ্যকার চুক্তি মোতাবেক হবে?
উত্তরে স্থায়ী কমিটির আলিমগন বলেন: إذا حصل اتفاق بين الدلال والبائع والمشتري على أن يأخذ من المشتري أو من البائع أو منهما معا سعيا معلوما جاز ذلك، ولا تحديد للسعي بنسبة معينة ، بل ما حصل عليه الاتفاق والتراضي ممن يدفع السعي جاز، لكن ينبغي أن يكون في حدود ما جرت به العادة بين الناس ، مما يحصل به نفع الدلال في مقابل ما بذله من وساطة وجهد لإتمام البيع بين البائع والمشتري، ولا يكون فيه ضرر على البائع أو المشتري بزيادته فوق المعتاد “যদি দালাল, বিক্রেতা ও ক্রেতার মাঝে কোন চুক্তি থাকে যে দালাল ক্রেতা থেকে বা বিক্রেতা থেকে অথবা উভয়ের থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন গ্রহণ করবে তাহলে সেটি জায়েয। দালালের কমিশনের নির্দিষ্ট কোন পার্সেন্টেজ নাই। বরং যে ব্যক্তি কমিশন প্রদান করবে তার সাথে চুক্তি ও সে যা দিতে রাজী সেটাই জায়েয হবে। কিন্তু সেটি লোকাচারের সীমারেখায় হওয়া উচিত; যাতে করে দালাল ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করার জন্য যে পরিশ্রম ও দালালি করেছে এর বিপরীতে সে লাভবান হয়। আবার এতে করে যেন ক্রেতা বা বিক্রেতার উপর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ধার্য হয়ে তাদের কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ২৯; গৃহীত ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-১৮৩১০০)
.
তবে জেনে রাখা ভাল যে,যদি দালাল ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কোনো একজনের দালালি করে তাহলে তার জন্য অন্য পক্ষের সাথে মূল্য বৃদ্ধি অথবা হ্রাসের লক্ষ্যে যোগসাজশ করা জায়েয নেই। কারণ এটি ধোঁকা ও আমানতের খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষতঃ যদি দালাল নিজেই ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন করে। কেননা সেক্ষেত্রে সে উকিল (এজেন্ট)। আর উকিল আমানতদার। সে যা লাভ করবে সেটি তার মক্কেলের প্রাপ্য।যেমন;মাত্বালিবু উলিন্নুহা’ গ্রন্থে এসেছে:(وهبة بائعٍ لوكيلٍ ) اشترى منه , ( كنقصٍ ) من الثمن , فتُلحق بالعقد ( لأنها لموكله)‘উকিল যে বিক্রেতা থেকে ক্রয় করেছে সেই বিক্রেতা উকিলকে কোন উপহার দিলে সেটি মূলচুক্তিতে যুক্ত হবে; যেহেতু সেই উপহার উকিলের মক্কেলের প্রাপ্য।”(মাত্বালিবু উলিন্নুহা; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৩২)
.
৩) তৃতীয় আরেকটি বৈধ পদ্ধতি হলো ‘বাইউস সালাম’ বা ‘সালাফ’, যা মূলত অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়কে বোঝায়। ‘সালাম’ শব্দের অর্থই হলো অগ্রিম লেনদেন। শরয়ি পরিভাষায়, বাইউস্ সালাম এমন এক ধরনের হালাল পন্যের ক্রয়-বিক্রয়, যেখানে বিক্রেতা অগ্রিমভাবে নিদিষ্ট পন্যের সম্পূর্ণ মূল্য গ্রহণ করে এই দায়ভার গ্রহণ করে যে, সে ভবিষ্যতের একটি নির্ধারিত তারিখে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পণ্য ক্রেতার নিকট সরবরাহ করবে। এ ক্ষেত্রে মূল্য নগদে পরিশোধিত হয়, কিন্তু বিক্রিত পণ্যের সরবরাহ বিলম্বিত থাকে।বাইউস্ সালামের ক্ষেত্রে বিক্রয়ের সময় পণ্য উপস্থিত না থাকা ক্রয়–বিক্রয়ের শুদ্ধতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। কারণ, সালাম পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যই হলো—এটি উপস্থিত পণ্য বিক্রির শর্তাধীন নয়। বরং এটি এমন একটি বিক্রয়, যেখানে পণ্যের গুণাগুণ ও সরবরাহের সময়সীমা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিক্রেতা যদি নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যের পণ্য ক্রেতার নিকট হস্তান্তর করে, তবে সে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করে।এ কারণেই আলেমগণ বাইউস্ সালামের জায়েয হওয়ার ক্ষেত্রে বিক্রয়ের সময় পণ্য বিক্রেতার মালিকানায় বা হেফাজতে থাকা শর্ত করেননি; বরং তারা শর্ত করেছেন—নির্ধারিত সময়ে উক্ত পণ্য সরবরাহ করা নিশ্চিত হতে হবে।এ বিষয়ে হাফিয ইবনু হাজার আল-আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:واتفق العلماء على مشروعيته”অর্থাৎ,আলেমগণের সর্বসম্মতিক্রমে বাইউস্ সালাম শরয়ি দৃষ্টিতে বৈধ।”(ফাতহুল বারী, খণ্ড: ৭,পৃষ্ঠা: ৭৬)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বানী: “তোমার কাছে যা নেই তা বিক্রি করো না”-এর সঙ্গে শরিয়তে বাই‘উস সালাম পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ হওয়ার বিষয়টির মধ্যে কীভাবে সমন্বয় সাধিত হয়? তিনি উত্তর দিয়েছেন:السلم هو ع شيء موصوف في الذمة ، فالفرق أن قوله صلى الله عليه وسلم ( لا تبع ما ليس عندك ) يقصد المعين . أما الموصوف في الذمة : فهذا غير معين .ولهذا نطالب الذي باع الشيء الموصوف بالذمة ، نطالبه بإيجاده على كل حال .وأما الشيء المعين لو تلف ، ما نطالبه به“সালাম হচ্ছে এমন একটি চুক্তি, যা দায়িত্বের (যিম্মাহ্‌র) মধ্যে নির্ধারিত গুণাবলিসম্পন্ন কোনো বস্তুর ওপর সম্পাদিত হয়।অতএব পার্থক্য হলো নবী (ﷺ) এর বাণী:”তোমার কাছে যা নেই, তা বিক্রি করো না”—এর উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত কোনো বস্তু। আর যেটি দায়িত্বের মধ্যে নির্ধারিত গুণাবলিসহ বর্ণিত,তা কোনো নির্দিষ্ট একক বস্তু নয়।এই কারণেই, যে ব্যক্তি যিম্মাহ্‌র মধ্যে নির্ধারিত গুণাবলিসম্পন্ন কোনো বস্তু বিক্রি করেছে, আমরা তাকে সব অবস্থাতেই তা সরবরাহ করতে বাধ্য করি।পক্ষান্তরে, যদি বিক্রিত বস্তুটি নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত কোনো বস্তু হয় এবং তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আমরা তাকে তার বিকল্প সরবরাহ করতে বাধ্য করি না।”(ইবনু উসাইমীন; আল-কাফী: ১/২৭৪)
.
বাইউস সালাম জায়েজ হওয়ার পক্ষে অন্যতম দলিল হলো:ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন,قَدِمَ النَّبِيُّ ﷺ الْمَدِيْنَةَ وَهُمْ يُسْلِفُوْنَ بِالتَّمْرِ(وفيْ رِوَايَةِ مُسْلِمٍ فِي الثِّمَارِ السَّنَةَ) السَّنَتَيْنِ وَالثَّلَاثَ فَقَالَ مَنْ أَسْلَفَ فِيْ شَيْءٍ فَفِيْ كَيْلٍ مَعْلُوْمٍ وَوَزْنٍ مَعْلُوْمٍ إِلَى أَجَلٍ مَعْلُوْمٍ “আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন মদীনায় আসেন তখন মদীনাবাসী ফলে বা খেজুরে এক, দুই ও তিন বছরের মেয়াদে সালাম (অর্থাৎ অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়) করতেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, কোন ব্যক্তি সালাম (অর্থাৎ অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়) করলে, সে যেন নির্ধারিত পরিমাপে এবং নির্দিষ্ট ওযনে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় করে”।(সহীহ বুখারী, হা/২২৩৯; সহীহ মুসলিম, হা/১৬০৪)।এই হাদীসে রাসূল (ﷺ) বিশেষ কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে বাইয়ে সালাম চুক্তির অনুমতি দিয়েছেন। যেমন (১)- বাইয়ে সালাম জায়েয হওয়ার জন্য যরূরী হল, ক্রেতা চুক্তির সময়ই বিক্রেতাকে সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করবে। কেননা, চুক্তির সময় ক্রেতা যদি সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ না করে, তাহলে তা ঋণের বিনিময়ে ঋণ বিক্রির সাদৃশ্য হয়ে যাবে, যা করতে রাসূল (ﷺ) নিষেধ করেছেন (আল-মুগনী, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৭; ইবনু উসাইমীন, আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৪৪৪, কুয়েতি ফিকাহ বিশ্বকোষ; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৭৬ পৃ.)। (২)-বাইয়ে সালাম শুধু সেই সব পণ্য দ্রব্যে জায়েয হবে, যে সব পণ্যের কোয়ালিটি বা গুণগত মান, পরিমাণ, পরিমাপ ও সংখ্যা পূর্বেই পরিপূর্ণরূপে নির্ধারণ করা সম্ভব। (৩)-যে পণ্যে সালাম করার ইচ্ছা পোষণ করবে, তার ধরণ এবং গুণগত মান সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে নেয়াও অপিরহার্য, যাতে সেই পণ্যে এমন কোন অস্পষ্টতা বিদ্যমান না থাকে, যা পরবর্তীতে কলহ-কোন্দলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে সম্ভাব্য সকল বিষয় বিশদভাবে উল্লেখ থাকা উচিত। (৪)- কোন রকম অস্পষ্টতা ব্যতীত বিক্রিতব্য দ্রব্যের পরিমাণ, পরিমাপ ও সংখ্যাও নির্দিষ্ট করে নেয়া অপরিহার্য। ৫- বিক্রিতব্য জিনিস পরিশোধের তারিখ এবং স্থানও চুক্তিতে নির্ধারণ করে নেয়া অপরিহার্য ।
.
পরিশেষে আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সকলকে হালাল রিজিক উপার্জন করার তৌফিক দান করেন। (আল্লাহই সর্বজ্ঞ)।
▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

তীব্র ঠান্ডার দিনে ফজরের সালাতের জন্য বাইরে বের হলে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে বাড়িতেই ফরজ সালাত আদায় করলে তা কি সহিহ হবে

প্রশ্ন: তীব্র ঠান্ডার দিনে ফজরের সালাতের জন্য বাইরে বের হলে অসুস্থ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে কেউ যদি বাড়িতেই ফরজ সালাত আদায় করেন। তাহলে তার সালাত কি সহিহ হবে?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর মূলনীতি হলো পুরুষদের জন্য ফরয সালাত মসজিদে গিয়ে জামা‘আতের সাথে আদায় করা ওয়াজিব। বরং ফরয সালাত জামা‘আত সহকারে আদায় না করলে সালাত ক্ববুল না হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা নবী (ﷺ) বলেন, مَنْ سَمِعَ النِّدَاءَ فَلَمْ يَأْتِهِ فَلَا صَلَاةَ لَهُ إِلَّا مِنْ عُذْرٍ “যে ব্যক্তি আযান শুনল অথচ সে কোন ওজর (বৈধ কারণ) না থাকা সত্ত্বেও জামা‘আতে উপস্থিত হল না, তার কোন সালাত নেই। (অর্থাৎ বিনা ওরে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ ঘরে সালাত আদায় করলে তার সালাত পূর্ণাঙ্গ বা কবুল হবে না, কিংবা সালাতের ফরজিয়াত আদায় হলেও তার কবিরা গুনাহ হবে)। অন্য বর্ণনায় এসেছে,সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, ওযর কী? নবী (ﷺ) বললেন, ‘ভয়-ভীতি অথবা অসুস্থতা’ (ইবনু মাজাহ, হা/৭৯১; আবূ দাঊদ, হা/৫৫১; ইরওয়াউল গালীল, হা/৩৩৭; সহীহুল জামি‘ হা/৬৩০০)।অন্যত্র তিনি বলেন, من سمع النداءَ فارغًا صحيحًا فلم يُجِبْ ، فلا صلاةَ لهُ ‘যে ব্যক্তি সুস্থ শরীরে ও অবসর সময়ে আযান শুনল, অথচ সে সাড়া দিল না, তার কোন সালাত নেই’ (হাকিম, হা/৮৯৯; বাইহাক্বী, হা/৫৭৯৭; আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৪৩৪; ইরওয়াউল গালীল, ২/৩৩৮)। আরেক বর্ননায় ইবনু উম্মে মাকতূম (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, তিনি নবী (ﷺ)-কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)! আমি তো অন্ধ, আমার ঘরও দূরে অবস্থিত। আমার একজন পথচালকও আছে, কিন্তু সে আমার অনুগত নয়। এমতাবস্থায় আমার জন্য ঘরে সালাত আদায়ের অনুমতি আছে কি? রাসূল (ﷺ) বললেন, তুমি কি আযান শুনতে পাও? ইবনু উম্মে মাকতূম (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, তাহলে তোমার জন্য অনুমতির কোন সুযোগ দেখছি না (আবূ দাঊদ হা/৫৫২-৫৫৩; সহীহ মুসলিম হা/৬৫৩; নাসাঈ, হা/৮৫১; ইবনু মাজাহ হা/৭৯২; মুসনাদে আহমাদ হা/১৫৪৯০-১৫৪৯১)। এমনকি যারা ফরয সালাতের জামা‘আতে উপস্থিত হয় না, ওযর বা শরী‘আতসম্মত কারণ না থাকা সত্ত্বেও মসজিদে হাজির হয় না, মহানবী (ﷺ) তাদের ঘর-বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন (সহীহ বুখারী, হা/৬৫৭)। জামা‘আত ত্যাগ করা মুমিনের আদর্শ নয়, বরং তা মুনাফিক্বের বৈশিষ্ট্য। (সহীহ মুসলিম, হা/৬৫৪; আবূ দাঊদ, হা/৫৫০)।
.
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত হাদিসসমূহসহ এ ধরনের আরও বহু সহিহ হাদিস গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, শরীয়তের বিধান অনুযায়ী সামর্থ্যবান ও সক্ষম পুরুষদের জন্য মসজিদে গিয়ে জামাআতের সঙ্গে সালাত আদায় করা ওয়াজিব। বিনা শরঈ ওজরে জামাআত পরিত্যাগ করা গুরুতর কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য হয়। তবে একই সঙ্গে রাসূল (ﷺ)-এর সুন্নাহ থেকে এটিও প্রমাণিত যে, ইসলামী শরীয়ত কষ্ট ও অক্ষমতার ক্ষেত্রে কঠোর নয়; বরং বাস্তবসম্মত ও যুক্তিসংগত ওজরের প্রতি শরীয়ত পূর্ণ বিবেচনা রেখেছে। অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি বিশেষ প্রয়োজন, ভয়, অসুস্থতা বা গ্রহণযোগ্য শার’ঈ ওজরের কারণে জামাআতে উপস্থিত হতে অপারগ হয়, তবে সে ক্ষেত্রে একাকী বা নিজ বাড়িতে সালাত আদায় করলে তা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত হবে না।এর স্বপক্ষে দলিল হচ্ছে মহান আল্লাহর বানী: فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُم“তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।”[সূরা তাগাবুন: ১৬] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ“আমি যদি তোমাদেরকে কোন বিষয়ে আদেশ করি তাহলে সাধ্য অনুসারে তা পালন করবে।”(সহিহ বুখারি]
.
সুতরাং যদি প্রচণ্ড শীতের কারণে বহু স্তরের পোশাক বা গরম কাপড় পরিধান করেও, কিংবা গাড়ি ইত্যাদির মাধ্যমে মসজিদে গমন করেও ঠান্ডা থেকে নিজেকে যথাযথভাবে রক্ষা করা সম্ভব না হয়, এবং কোনো ব্যক্তি যুক্তি সংগতভাবে আশঙ্কা করেন যে মসজিদে সালাত আদায়ের জন্য বের হলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন—তাহলে এটি শরীয়তসম্মত একটি ওজর হিসেবে গণ্য হবে, যা তাকে মসজিদে জামাতে সালাত আদায় না করার অনুমতি দেয়। তবে যদি শীত থেকে আত্মরক্ষার উপায় সহজলভ্য হয় এবং অসুস্থ হয়ে পড়ার বাস্তব কোনো আশঙ্কা না থাকে, তাহলে কেবল শীতের অজুহাতে মসজিদের জামাত পরিত্যাগ করা শরীয়তসম্মত ওজর হিসেবে বিবেচিত হবে না। প্রচন্ড শীতের কারণের মসজিদে গমন করতে না পারে বাড়িতে সালাত আদায় করা বৈধ এর স্বপক্ষে দলিল হচ্ছে,নাফি‘ (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, (প্রচন্ড এক শীতের রাতে) ইবনু ‘উমার (রাযি.) মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী পাহাড় যাজনান নামক স্থানে এক শীতের রাতে আযান দিলেন, অতঃপর তিনি ঘোষণা করলেনঃصَلُّوا فِي رِحَالِكُمْ فَأَخْبَرَنَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَأْمُرُ مُؤَذِّنًا يُؤَذِّنُ ثُمَّ يَقُولُ عَلَى إِثْرِهِ أَلاَ صَلُّوا فِي الرِّحَالِ فِي اللَّيْلَةِ الْبَارِدَةِ أَوْ الْمَطِيرَةِ فِي السَّفَرِ.”তোমরা আবাস স্থলেই সালাত আদায় করে নাও। পরে তিনি আমাদের জানালেন যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের অবস্থায় বৃষ্টি অথবা তীব্র শীতের রাতে মুয়াজ্জিনকে আযান দিতে বললেন এবং সাথে সাথে এ কথাও ঘোষণা করতে বললেন যে, তোমরা নিজ বাসস্থলে সালাত আদায় কর।”(সহীহ বুখারী হা/৬৩২;সহীহ মুসলিম হা/৬৬৬)
.
উক্ত হাদীসের ব্যাখায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] বলেন:
وَفِي صَحِيح أَبِي عَوَانَةَ : ( لَيْلَةٌ بَارِدَةٌ أَوْ ذَاتُ مَطَرٍ أَوْ ذَاتُ رِيحٍ ) وَدَلَّ ذَلِكَ عَلَى أَنَّ كُلًّا مِنْ الثَّلَاثَة عُذْرٌ فِي التَّأَخُّر عَنْ الْجَمَاعَة , وَنَقَلَ اِبْن بَطَّالٍ فِيهِ الْإِجْمَاع , لَكِنَّ الْمَعْرُوفَ عِنْدَ الشَّافِعِيَّة أَنَّ الرِّيح عُذْرٌ فِي اللَّيْل فَقَطْ , وَظَاهِر الْحَدِيث اِخْتِصَاص الثَّلَاثَة بِاللَّيْلِ , لَكِنْ فِي السُّنَن مِنْ طَرِيق اِبْن إِسْحَاقَ عَنْ نَافِع فِي هَذَا الْحَدِيث : ( فِي اللَّيْلَة الْمَطِيرَة وَالْغَدَاة الْقَرَّة[الباردة] ) , وَفِيهَا بِإِسْنَادٍ صَحِيح مِنْ حَدِيث أَبِي الْمَلِيحِ عَنْ أَبِيهِ : ( أَنَّهُمْ مُطِرُوا يَوْمًا فَرَخَّصَ لَهُمْ ) وَلَمْ أَرَ فِي شَيْء مِنْ الْأَحَادِيث التَّرَخُّص بِعُذْرِ الرِّيح فِي النَّهَار صَرِيحًا , لَكِنَّ الْقِيَاس يَقْتَضِي إِلْحَاقَهُ .قَوْله : (فِي السَّفَر) ظَاهِره اِخْتِصَاص ذَلِكَ بِالسَّفَرِ , وَرِوَايَة مَالِك عَنْ نَافِع الْآتِيَة فِي أَبْوَاب صَلَاة الْجَمَاعَة مُطْلَقَةٌ , وَبِهَا أَخَذَ الْجُمْهُور , لَكِنَّ قَاعِدَةَ حَمْلِ الْمُطْلَقِ عَلَى الْمُقَيَّدِ تَقْتَضِي أَنْ يَخْتَصَّ ذَلِكَ بِالْمُسَافِرِ مُطْلَقًا , وَيُلْحَق بِهِ مَنْ تَلْحَقُهُ بِذَلِكَ مَشَقَّة فِي الْحَضَر دُونَ مَنْ لَا تَلْحَقهُ ، وَاَللَّه أَعْلَم “
“সহীহ আবি আওয়ানা-তে বর্ণিত হয়েছে: ‘(রাসূলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিতেন মুয়াজ্জিনকে ঘোষণা করতে) প্রচণ্ড শীতল রাতে অথবা বৃষ্টির রাতে অথবা বায়ুপ্রবাহের (ঝড়ো হাওয়া) রাতে।’ এটি প্রমাণ করে যে, এই তিনটির প্রতিটিই জামাতে উপস্থিত না হওয়ার জন্য গ্রহণযোগ্য ওজর বা কারণ। ইবনে বাত্তাল রাহি. এ বিষয়ে (ওজর হওয়ার ব্যাপারে) ‘ইজমা’ বা ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে শাফে’ঈ মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত হলো—বায়ুপ্রবাহ বা ঝড়ো হাওয়া কেবল রাতের বেলাতেই ওজর হিসেবে গণ্য হবে। হাদিসের বাহ্যিক শব্দ থেকেও বোঝা যায় যে, এই তিনটি বিষয় (শীত, বৃষ্টি ও বায়ু) রাতের সাথেই খাস বা সুনির্দিষ্ট। কিন্তু ‘সুনান’ গ্রন্থে ইবনে ইসহাকের সূত্রে নাফে (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে এই হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: ‘বৃষ্টির রাতে এবং শীতল সকালে।’ আবার ‘সুনান’ এই সহীহ সনদে আবু মালিহ তার পিতার সূত্রে বর্ণনা করেছেন: ‘একদিন তারা বৃষ্টির কবলে পড়লেন, তখন তাদের (জামাতে না আসার) অনুমতি দেওয়া হলো।”দিনের বেলা ঝড়ো হাওয়ার কারণে জামাত থেকে বিরত থাকার অনুমতি বিষয়ে আমি কোনো হাদিসে স্পষ্ট কিছু পাইনি, তবে কিয়াস (যৌক্তিক তুলনা) অনুযায়ী একেও বৃষ্টির সাথে যুক্ত করা প্রয়োজন। হাদিসের শব্দ ‘সফরের অবস্থায়’—এর বাহ্যিক দিক থেকে মনে হয় এটি কেবল সফরের সাথেই সংশ্লিষ্ট। ইমাম মালিক (রাহিমাহুল্লাহ) নাফে থেকে জামাতের অধ্যায়ে যে রেওয়ায়েতটি বর্ণনা করেছেন তা ‘মুতলাক’ বা শর্তহীন (অর্থাৎ সফর বা মুকিম কোনোটির উল্লেখ নেই)। জুমহুর বা অধিকাংশ আলিম এই মতটিই গ্রহণ করেছেন (অর্থাৎ সফর ও আবাসস্থল উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য)।তবে ‘মুতলাক’ (সাধারণ)-কে ‘মুয়াক্কাদ’ (নির্দিষ্ট)-এর ওপর ভিত্তি করার মূলনীতি অনুযায়ী এটি কেবল মুসাফিরের জন্যই প্রযোজ্য হওয়া উচিত। আর মুকিম বা নিজ এলাকায় অবস্থানকারী ব্যক্তিদের মধ্যে কেবল তাদেরই অন্তর্ভুক্ত করা হবে যাদের ক্ষেত্রে (বৃষ্টি বা শীতে) চলাচলে কষ্ট হয়; কিন্তু যাদের কোনো কষ্ট হয় না, তারা এর অন্তর্ভুক্ত হবে না। আল্লাহই ভালো জানেন।”( ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১২৭৮৭৬)
.
আবু ইসহাক আল-সিরাজি তাঁর ‘আল-মুহায্‌যাব’ নামক গ্রন্থে বলেন:وتسقط الجماعة بالعذر وهو أشياء … ومنها : أن يخاف ضررا في نفسه أو ماله أو مرضا يشق معه القصد
“ওজরের (যুক্তিসঙ্গত কারণ) দরুন (মসজিদে) জামাতে উপস্থিত হওয়ার আবশ্যকতা রহিত হয়ে যায়; আর ওজরগুলো হলো কয়েকটি বিষয়… তার মধ্যে অন্যতম হলো: নিজের জান বা মালের ক্ষতির আশঙ্কা করা, অথবা এমন অসুস্থতা যা নিয়ে (মসজিদে যাওয়ার) সংকল্প করা অত্যন্ত কষ্টকর।”(আল-মুহাযযাব; খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৭৬)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] তাঁর বিখ্যাত কিতাব ‘আল-মাজমু’-তে শাফি‘ঈ মাযহাবের ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী জামাতে উপস্থিত না হওয়ার বৈধ ওজর প্রসঙ্গে বলেন:”الْبَرْدُ الشَّدِيدُ عُذْرٌ فِي اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ , وَشِدَّةُ الْحَرِّ عُذْرٌ فِي الظُّهْرِ , وَالثَّلْجُ عُذْرٌ إنْ بَلَّ الثَّوْبَ “প্রচণ্ড শীতের রাত এবং দিন উভয় সময়ের জন্যই (জামাতে উপস্থিত না হওয়ার) ওজর বা কারণ হিসেবে গণ্য। তেমনিভাবে জোহরের নামাজের সময় প্রচণ্ড গরমও একটি ওজর। আর তুষারপাতও একটি ওজর, যদি তা কাপড় ভিজিয়ে দেয় (অর্থাৎ কাপড়ে আর্দ্রতা তৈরি করে)।”(নববী আল-মাজমু শারহুল মুহাযযাব, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৯৯)
.
আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষে বলা হয়েছে,والْبَرْدُ الشَّدِيدُ لَيْلاً أَوْ نَهَارًا وَكَذَلِكَ الْحَرُّ الشَّدِيدُ ، من الأَْعْذَار العامة الَّتِي تُبِيحُ التَّخَلُّفَ عَنْ صَلاَةِ الْجَمَاعَةِ . وَالْمُرَادُ : الْبَرْدُ أَوِ الْحَرُّ الَّذِي يَخْرُجُ عَمَّا أَلِفَهُ النَّاسُ ، أَوْ أَلِفَهُ أَصْحَابُ الْمَنَاطِقِ الْحَارَّةِ أَوِ الْبَارِدَةِ “রাতে বা দিনে প্রচণ্ড শীত, একইভাবে প্রচণ্ড গরম এগুলো সেই সকল সাধারণ ওজরের (অপারগতা) অন্তর্ভুক্ত যা জামাতে উপস্থিত না হওয়ার বৈধতা দান করে। আর এখানে প্রচণ্ড শীত বা গরম বলতে উদ্দেশ্য হলো: এমন শীত বা গরম যা মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতার বাইরে, অথবা যা প্রচণ্ড গরম বা শীতপ্রধান অঞ্চলের অধিবাসীদের সচরাচর অভ্যাসের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।”
(আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, খণ্ড: ২৭, পৃষ্ঠা: ১৮৬) এই কিতাবে আরও বলা হয়েছে;وَفِي صَلاَةِ الْجُمُعَةِ وَالْجَمَاعَةِ : أَجَازَ الْفُقَهَاءُ فِي الْبَرْدِ الشَّدِيدِ التَّخَلُّفَ عَنْ صَلاَةِ الْجُمُعَةِ ، وَعَنْ صَلاَةِ الْجَمَاعَةِ نَهَارًا أَوْ لَيْلاً”আর জুমুআ ও জামায়াতে নামাজের ক্ষেত্রে: ফকিহগণ (ইসলামী আইনবিদ) প্রচণ্ড শীতে জুমুআর সালাত এবং দিনে বা রাতে জামায়াতে সালাতে উপস্থিত না হওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।”(আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, খণ্ড:৮, পৃষ্ঠা: ৫৭-৫৮)
.
পরিশেষে, প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত উদ্ধৃতি ও আলোচনার আলোকে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, ইসলামী শরিয়ত মূলত সহজ, সহনশীল ও মানবকল্যাণমুখী। শরিয়ত কখনোই মানুষের ওপর অযথা কষ্ট আরোপ করে না। অতএব, যখন আবহাওয়া এমন চরম অবস্থায় পৌঁছে যায়, যা মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে কিংবা স্বাস্থ্যের জন্য বাস্তব ক্ষতির আশঙ্কা সৃষ্টি করে, তখন ইসলামী শরিয়ত ঘরে অবস্থান করে সালাত আদায়ের অনুমতি প্রদান করেছে। তবে সাধারণ ও স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে—যখন কোনো বাস্তব অজুহাত বিদ্যমান নেই এবং গরম কাপড় বা অন্য কোনো উপায়ে মসজিদে যাওয়া সম্ভব হয়, তবে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের জন্য মসজিদে জামাতে উপস্থিত না হয়ে ঘরে ফরজ সালাত আদায় করা শরিয়তসম্মত নয়। যেমনটি হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,(مَنْ سَمِعَ النِّدَاءَ فَلَمْ يَأْتِهِ فَلَا صَلَاةَ لَهُ إِلَّا مِنْ عُذْرٍ) “যে ব্যক্তি আযান শুনল এবং তার কোন ওযর না থাকা সত্ত্বেও জামাআতে উপস্থিত হলো না, তার সালাত নাই “(সুনানে ইবনে মাজাহ, হা/৭৯৩; আবূ দাঊদ হা/৫৫১; ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি সহীহ বলেছেন, ইরওয়াউল গালীল হা/৩৩৭)। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬

উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি। 

রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামি শরিয়ত বাস্তবায়নে একজন মুসলিম শাসকের বাধ্যবাধকাতা এবং তার পরিধি

 কুরআন-সুন্নাহতে যে সব ব্যাপারে সুষ্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করা মুসলিম শাসকের জন্য ফরজ। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফয়সালা না করার পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
“আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সেই অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না তারাই কাফের।” [সূরা মায়িদাহ: ৪৪]
কুরআনে অন্যত্র তাদেরকে জালিম (অবিচারী) এবং অন্যত্র ফাসিক (পাপিষ্ঠ) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
কোনও মুসলমি শাসক এইত ফরজ হওয়ার বিধানকে অস্বীকার করলে সে কাফের এবং ইসলাম থেকে বহিস্কৃত মুরতাদ বলে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই।
কিন্তু একজন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি ছোট-বড় প্রতিটি আইন-কানুন কি সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করা আবশ্যক?
উত্তর, না। তা আবশ্যক নয়। এটিই সঠিক এবং বাস্তবসম্মত কথা। এর যৌক্তিক ও শরয়ি ভিত্তি বোঝা প্রয়োজন।
এ কথার সপক্ষে প্রধান যুক্তিগুলো হল:
❂ ১. রাষ্ট্রের এমন অসংখ্য প্রশাসনিক ও দুনিয়াবি বিষয় রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে কুরআন এবং সুন্নাহ সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট আদেশ বা নিষেধ দেয়নি। বরং এগুলোকে ‘মাসলাহাত’ বা জনকল্যাণের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রপ্রধানের ইজতিহাদ (গবেষণা) ও সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
❂ ২. পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্র দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে নিজস্ব আইন প্রণয়ন করতে পারে। যেমন:
– ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলা এবং আইন ভঙ্গকারীর জন্য জরিমানা নির্ধারণ।
– সরকারি অফিসের সময়সীমা নির্ধারণ, বেতন স্কেল ও চাকরির বয়স সীমা ঠিক করা।
– প্রশাসনিক বিভিন্ন পদমর্যাদা (Rank) তৈরি এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে নতুন কোনও বিশেষ সংস্থা বা বিভাগ গঠন করা।
– এই হাজারো আইন-কানুন বা নিয়ম-নীতির বিষয়ে ইসলাম নির্দিষ্ট কোনও ছক বেঁধে দেয়নি। এসব ক্ষেত্রে মানুষের উপস্থিত প্রয়োজন ও কল্যাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা ইসলাম রাষ্ট্রকে দিয়েছে। এই নমনীয়তা বা স্বাধীনতা থাকাই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, যা রাষ্ট্রকে যেকোনো যুগে সচল রাখতে সাহায্য করে।
তবে এ ক্ষেত্রে মনে রাখা আবশ্যক যে, এমন কোনও আইন প্রনোয়ন করা জায়েজ নাই যা, ইসলামের কোনও মূলনীতি বা বিধিবাধানের সাথে সাংঘর্ষিক।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রসুলের আনুগত্য করো আর তোমাদের মধ্য হতে উলুল আমরের (মুসলিম শাসকের)।” [সূরা নিসা: ৫৯]
বি. দ্র. ওলামায়ে কেরাম বলেন, উলুল আমর বা শাসক যখন জনস্বার্থে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী নয় এমন আইন করেন, তখন তা মেনে চলা ওয়াজিব।।
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِأَمْرِ دُنْيَاكُمْ
“তোমরা তোমাদের দুনিয়াবি বিষয়ে বেশি ভালো জানো।” [সহিহ মুসলিম: ২৩৬৩]
১. ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.):
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) তাঁর ‘আস সিয়াসাহ আশ শারইয়্যাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, শাসকের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন যে, যে বিষয়গুলোতে শরিয়তের স্পষ্ট কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই সেখানে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন করা কেবল জায়েজই নয় বরং ক্ষেত্র বিশেষে আবশ্যক।
তিনি বলেন:
فَإِنَّ الشَّرِيعَةَ مَبْنَاهَا عَلَى تَحْصِيلِ الْمَصَالِحِ وَتَكْمِيلِهَا، وَتَعْطِيلِ الْمَفَاسِدِ وَتَقْلِيلِهَا
“শরিয়তের ভিত্তি হচ্ছে (জনগণের) কল্যাণ অর্জন ও তা পূর্ণতা দান করা এবং অকল্যাণ দূর করা ও তা হ্রাস করা।” [মাজমুউল ফাতাওয়া: ২০/৪৮]
২. ইমাম শাতবি (রহ.):
ইমাম শাতবি (রহ.) তাঁর ‘আল-মুওয়াফাকাত’ গ্রন্থে ‘মাসালিহ মুরসালাহ’ (এমন জনকল্যাণ যার ব্যাপারে শরিয়তে সরাসরি আদেশ বা নিষেধ নেই) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন যে, জীবনের পরিবর্তনশীল প্রয়োজনে নতুন নতুন আইন বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে, যা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর শব্দে না থাকলেও তার ‘মাকাসিদ’ বা উদ্দেশ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ।
তিনি বলেন,
الْمَصَالِحُ الْمُرْسَلَةُ هِيَ الَّتِي لَمْ يَشْهَدْ لَهَا مِنَ الشَّرْعِ بِالاعْتِبَارِ وَلا بِالالْغَاءِ نَصٌّ مُعَيَّنٌ
“মাসালিহ মুরসালাহ হল, এমন জনকল্যাণমূলক বিষয়, যার সপক্ষে (গ্রহণযোগ্যতার) বা বিপক্ষে (বাতিল করার) শরিয়তের কোনও নির্দিষ্ট বক্তব্য নে নেই।” [আল-ইতিসাম লিশ-শাতবি: ২/৬০৭]
অতএব ইমামগণের এই মূলনীতি থেকে স্পষ্ট যে, ট্রাফিক আইন বা প্রশাসনিক কাঠামো কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়, বরং এগুলো ইসলামের বৃহত্তর লক্ষ্য ‘জনকল্যাণ’ নিশ্চিত করারই অংশ। যারা মনে করেন প্রতিটি প্রশাসনিক খুঁটিনাটি সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর আয়াত বা হাদিসের শব্দে থাকতে হবে, তারা মূলত ইসলামের ব্যাপকতা ও ফিকহি মূলনীতি সম্পর্কে সম্যক অবগত নন।
❂ প্রশ্ন: কুরআন-সুন্নাহর সকল আইন-কানুন কি ফরজ নাকি মুস্তাহাব পর্যায়েরও রয়েছে?
উত্তর: কুরআন-সুন্নাহর সকল আইন-কানুন ফরজ নয়। কিছু আছে মুস্তাহাব পর্যায়ের। সেগুলো করা ভালো। না করলেও কোন গুনাহ নেই। তবে কুরআন ও হাদিসে যে সকল আইন বাস্তবায়ন করাকে ফরজ করা হয়েছে শুধু সেগুলো বাস্তবায়ন করা প্রত্যেক মুসলিম শাসকের জন্য ফরজ। কেউ যদি এই ফরজ বিধানগুলোকে ফরজ মনে না করে তাহলে নিঃসন্দেহে তা হবে কুফরি।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মানব রচিত বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান এবং জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস শরিয়তের দৃষ্টিতে এ কথা কি সঠিক

 প্রশ্ন: মানব রচিত বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনার বিধান কী? “জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস” শরিয়তের দৃষ্টিতে এ কথা কি সঠিক?

উত্তর: সার্বভৌম সৃষ্ট জগতের সর্বময় ক্ষমতার প্রকৃত মালিক আল্লাহ। সুতরাং সৃষ্টি যার বিধান চলবে তার। আর মুসলিম শাসকদের জন্য আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসনকার্য পরিচলনা করা একটি ফরজ আমানত। এর ব্যতিক্রম করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। তবে এ বিষয়টা কিছুটা ব্যাখ্যা রয়েছে। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী শাসন কার্য পরিচালনা করার দুটি দিক রয়েছে। যথা:
❑ ১. যেসব বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিধান আছে:
যেসব বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর স্পষ্ট বিধান আছে একজন মুসলিম শাসকের জন্য সেসব ক্ষেত্রে তা অমান্য করে নিজের খেয়াল-খুশি মতো আইন তৈরির করার বা মানব রচিত বিধান দ্বারা শাসন কার্য পরিচালনা করার কোনও সুযোগ নেই। কেননা কুরআন-সুন্নাহ তে এ ব্যাপারে শক্ত পরিণতির কথা বলা হয়েছে।
✪ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফয়সালা না করার পরিণাম:
وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
“আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সেই অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না তারাই কাফের।” [সূরা মায়িদাহ: ৪৪]
কুরআনে অন্যত্র তাদেরকে জালিম (অবিচারী) এবং অন্যত্র ফাসিক (পাপিষ্ঠ) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
✪ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ফয়সালা মেনে নেওয়া পর্যন্ত ইমানদার হওয়ার সুযোগ নাই:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
“অতএব তোমার রবের কসম, তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিসংবাদের বিচারক হিসেবে তোমাকে মেনে নেয়, তারপর তুমি যে ফয়সালা করবে সে ব্যাপারে তাদের মনে কোনও দ্বিধা থাকবে না এবং তারা তা পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেবে।” [সূরা নিসা: ৬৫]
✪ মানুষের মনগড়া মতবাদের অসারতা:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ ۚ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِّقَوْمٍ يُوقِنُونَ
“তবে কি তারা জাহেলিয়াতের বিধান প্রত্যাশা করে? আর নিশ্চিত বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিধান দানে আল্লাহর চেয়ে উত্তম আর কে হতে পারে?” [সূরা মায়িদা: ৫০]
কুরআন-হাদিসে পর্যাপ্ত বক্তব্য এসেছে। সুতরাং আল্লাহর হালাল করা বিষয়কে হারাম করা বা হারামকে হালাল করার অধিকার জনগণের নেই। এমনটি করা কুফরি এবং আল্লাহর রুবুবিয়াত বা প্রভুত্বে শিরকের শামিল।
✪ বিবাদ নিরসনে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের দিকে ফিরে আসা:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَإِن تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ إِن كُنتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ
“অতঃপর যদি তোমরা কোনও বিষয়ে বিবাদে প্রবৃত্ত হও, তবে তা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের ওপর বিশ্বাস করে থাকো।” [সূরা নিসা: ৫৯]
❑ ২. যেসব বিষয়ে কুরআন ও সুন্নাহর কোনও সরাসরি নির্দেশনা নেই:
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক নিয়ম-কানুন, ট্রাফিক আইন বা জনকল্যাণমূলক বিষয় (যাকে মাসলাহাতুল মুরসালাহ বলা হয়)—যেখানে কুরআন বা হাদিসের সরাসরি কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই সেসব ক্ষেত্রে জনগণের প্রতিনিধিরা বা বিশেষজ্ঞগণ আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারেন। এটি শরিয়ত বিরোধী নয় বরং জায়েজ। এর কয়েকটি উদাহরণ হল:
◆ প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক বিন্যাস: যেমন: সরকারি দপ্তরগুলোর কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় গঠন এবং সিভিল সার্ভিস বা সরকারি কর্মচারী নিয়োগের নিয়মাবলী।
◆ ট্রাফিক আইন ও গণ পরিবহন: রাস্তাঘাটে চলাচলের নিয়ম, সিগন্যাল মানা, লাইসেন্স পদ্ধতি এবং যানবাহন সংক্রান্ত আইনসমূহ। এগুলো জনগণের জান-মাল রক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়।
◆ পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনা: কলকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বনায়ন রক্ষা, ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বা ড্রেনেজ সিস্টেম সংক্রান্ত আইন।
◆ পাসপোর্ট ও ভিসা আইন: বর্তমান আধুনিক বিশ্বে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রয়োজনে পাসপোর্ট, ভিসা এবং নাগরিকত্বের যে প্রশাসনিক নিয়মগুলো প্রচলিত।
◆ অর্থনৈতিক তদারকি: বাজারের দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে ব্যবসায়ীদের জন্য লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা বা মজুতদারি বন্ধে প্রশাসনিক তদারকি।
এই বিষয়গুলোতে কুরআন ও হাদিসে সরাসরি কোনও বিধি-নিষেধ না থাকায়, ইসলামের সাধারণ মূলনীতি (যেমন: মানুষের উপকার করা এবং ক্ষতি থেকে বাঁচানো) অনুযায়ী জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন করা জায়েজ।
❑ সৌদি আরবের প্রধান মুফতি আল্লামা সালেহ আল ফাউজান রাহ. এর ফতওয়া:
“জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস” (الشعب مصدر السلطات) এ কথা বলার বিধান কী?
উত্তর: ❖ সৌদি আরবের প্রধান মুফতি আল্লামা শাইখ সালেহ আল ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয়, “জনগণই সকল ক্ষমতার উৎস”━ এ কথা বলার বিধান কী?
উত্তরে তিনি বলেন━
هذا كفر وإلحاد , مصدر الحكم هو كتاب الله وسنة رسوله صلى الله عليه سلم وليس مصدره الشعب هذا مذهب العلمانيين و اللبراليين وليس هو منهج الإسلام نحن مرجعنا و مصدرنا هو كتاب الله و سنة رسوله صلى الله عليه وسلم
“এটি কুফর ও ইলহাদ (নাস্তিক্যবাদ বা আল্লাহ দ্রোহিতা)। কেননা ইসলামে সকল ক্ষমতার উৎস হল, আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ; জনগণের ইচ্ছা নয়।
এই মতবাদটি ধর্মনিরপেক্ষতা বাদী ও লিবারেলদের মতাদর্শ। ইসলামের মানহাজ বা পদ্ধতির সাথে এর কোনও সম্পর্ক নেই। আমাদের মানদণ্ড ও উৎস হল আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ।” আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Thursday, January 8, 2026

মহিলারা কোথায় ঈদের সালাত আদায় করবে

 প্রশ্ন: মহিলারা কোথায় ঈদের সালাত আদায় করবে? তাদের জন্য কি গৃহে একাকীভাবে অথবা জামাআতের সঙ্গে ঈদের সালাত আদায় করার অনুমতি রয়েছে?

▬▬▬▬▬▬▬▬◆◯◆▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর নারীরা যদি মুসলিমদের সঙ্গে ঈদের জামাতে ঈদগাহে গিয়ে সালাত আদায় করতে সক্ষম হয়,তাহলে তাদের পোশাক-পরিচ্ছদে পূর্ণভাবে ইসলামী অনুশাসন মেনে, ফিতনার উদ্রেককারী এবং দুর্বল ঈমানদারদের অন্তরে আকর্ষণ সৃষ্টি করে এমন সব ধরনের সৌন্দর্যপ্রদর্শন থেকে বিরত থেকে ঈদের সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে ঈদগাহে গমন করবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মুসলিম নারীদের এমনকি হায়েযগ্রস্ত নারী, অন্তঃপুরবাসিনী কিশোরী, অবিবাহিত তরুণী এবং যারা সাধারণত বাইরে বের হন না তাদেরকেও ঈদগাহে উপস্থিত হওয়ার জন্য স্পষ্ট ও জোরালো নির্দেশ দিয়েছেন। তবে হায়েযগ্রস্ত নারীরা সালাতের স্থান থেকে পৃথক স্থানে অবস্থান করবেন। দলিল হচ্ছে, জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি ঈদের দিনে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সালাতে উপস্থিত ছিলাম। দেখলাম তিনি খুৎবার পূর্বে ছালাত আরম্ভ করলেন আযান ও ইক্বামত ছাড়া এবং যখন ছালাত শেষ করলেন বেলালের গায়ে ভর দিয়ে দাঁড়ালেন। অতঃপর আল্লাহর মহিমা ও তাঁর প্রশন্তি বর্ণনা করলেন। তৎপর লোকদেরকে উপদেশ দিলেন। তাদেরকে (পরকালের কথা) স্মরণ করালেন এবং আল্লাহর আনুগত্যের প্রতি উদ্বুদ্ধ করলেন। অতঃপর মহিলাদের দিকে অগ্রসর হলেন আর তখন তাঁর সাথে ছিলেন বেলাল, তাদেরকে তিনি আল্লাহভীতির উপদেশ দিলেন। কিছু নছীহত করলেন এবং (আখেরাতের কথা) স্মরণ করালেন”।(সহীহ নাসাঈ হা/১৫৭৫; ইবনু খুযায়মা হা/১৪৬০; মিশকাত হা/১৪৪৬)। অপর বর্ননায় উম্মে আতিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমাদের নির্দেশ দেওয়া হলো, আমরা যেন ঋতুবতী ও পর্দানশীন মহিলাদেরও দুই ঈদের দিনে (ঈদগাহে) বের করি, যাতে তারা মুসলিমদের জামাআতে এবং তাদের দু‘আয় শামিল হতে পারে; কিন্তু ঋতুবতীগণ যেন তাদের ছালাতের স্থান হতে একদিকে সরে বসে। তখন এক মহিলা প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমাদের কারও (শরীর ঢাকবার) বড় চাদর নেই। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার সাথী তাকে আপন চাদর পরাবে”।(সহীহ বুখারী, হা/৩৫১; সহীহ মুসলিম, হা/৮৯০)
.
উম্মে আতিয়া (রাযিয়াল্লাহু আনহার) হাদিসটির আলোকে শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৮৫২ হি:] বলেন:”فِيهِ اِسْتِحْبَابُ خُرُوجِ النِّسَاءِ إِلَى شُهُودِ الْعِيدَيْنِ سَوَاءٌ كُنَّ شَوَابَّ أَمْ لا وَذَوَاتِ هَيْئَاتٍ أَمْ لا.” ا “এই হাদিসটি দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, দুই ঈদের সালাতে নারীদের বের হওয়া মুস্তাহাব (পছন্দনীয়); তারা যুবতী হোক বা না হোক, আর তারা উচ্চমর্যাদা বা বিশেষ সামাজিক অবস্থানের অধিকারী হোক বা না হোক।”(ফাতহুল বারী ফী শারহিল বুখারী; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৪৫)
.
​ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وَالْحَدِيثُ وَمَا فِي مَعْنَاهُ مِنْ الأَحَادِيثِ قَاضِيَةٌ بِمَشْرُوعِيَّةِ خُرُوجِ النِّسَاءِ فِي الْعِيدَيْنِ إلَى الْمُصَلَّى مِنْ غَيْرِ فَرْقٍ بَيْنَ الْبِكْرِ وَالثَّيِّبِ وَالشَّابَّةِ وَالْعَجُوزِ وَالْحَائِضِ وَغَيْرِهَا مَا لَمْ تَكُنْ مُعْتَدَّةً أَوْ كَانَ خُرُوجُهَا فِتْنَةً أَوْ كَانَ لَهَا عُذْرٌ.”এই হাদিস এবং এই অর্থবোধক অন্যান্য হাদিসগুলো প্রমাণ করে যে, দুই ঈদে নারীদের ঈদগাহে যাওয়া শরীয়তসম্মত। এক্ষেত্রে কুমারী, বিবাহিতা (বা বিধবা/তালাকপ্রাপ্তা), যুবতী, বৃদ্ধা, ঋতুমতী বা অন্য কারো মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। তবে শর্ত হলো— নারী যেন ইদ্দত পালনরত না থাকে, তার বের হওয়া যেন ফিতনার (বিশৃঙ্খলা বা পাপের) কারণ না হয় অথবা তার অন্য কোনো সঙ্গত ওজর (অপারগতা) না থাকে।” (শাওকানী; নায়লুল আওত্বার; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৪২)।
.
সুতরাং প্রিয় পাঠক! উক্ত হাদীসদ্বয় থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, মহিলাদের জন্য ঈদের মাঠে উপস্থিত হওয়া শরীয়তসম্মত; যাতে তারা ঈদের সালাতে অংশগ্রহণ করতে পারে। তবে ঋতুবতী নারীরা সালাত আদায় করবে না; বরং তারা খুৎবা শ্রবণ ও তাকবীরের সঙ্গে শরীক হবে।স্মরণ রাখা জরুরি যে, বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী নারীদের জন্য ঈদের সালাত আদায় করা সুন্নাত; এটি তাদের জন্য ওয়াজিব নয়। কিন্তু এই সুন্নাত আদায়ের উদ্দেশ্যে নারীদের নিজেদের মধ্যে একজনকে ইমাম বানিয়ে গৃহে ঈদের সালাত আদায় করা শরীয়তসম্মত নয়।অনুরূপভাবে,নারীদের জন্য আলাদা কোনো স্থান নির্ধারণ করে সেখানে একান্তভাবে কোনো মহিলার ইমামতিতে ঈদের সালাত আদায়ের ব্যবস্থা করাও শরীয়তসম্মত নয়; বরং এটি বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত। কেননা রাসূলুল্লাহ ﷺ কিংবা তাঁর সাহাবায়ে কেরাম (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)-এর যুগে এ ধরনের কোনো প্রচলন ছিল না।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:”মহিলাদের উপর ঈদের সালাত পড়া কি ওয়াজিব? যদি ওয়াজিব হয় তাহলে তারা কি বাসায় পড়বে; নাকি ঈদগাহে? উত্তরে স্থায়ী কমিটির আলেমগন বলেছেন:
حكم صلاة العيد للمرأة أنها ليست واجبة ولكنها سنة في حقها، وتصليها في المصلى مع المسلمين؛ لأن النبي صلى الله عليه وسلم أمرهن بذلك .ففي الصحيحين وغيرهما عن أم عطية رضي الله عنها قالت: (أُمِرنَا – وفي رواية أمَرَنا؛ تعني النبي صلى الله عليه وسلم – أن نخرج في العيدين العواتق وذوات الخدور، وأمر الحيض أن يعتزلن مصلى المسلمين.” رواه البخاري 1/93 ومسلم (890) وفي رواية أخرى: (أمرنا أن نخرج ونخرج العواتق وذوات الخدور)، وفي رواية الترمذي: (أن رسول الله صلى الله عليه وسلم كان يُخرج الأبكار والعواتق وذوات الخدور والحيض في العيدين، فأما الحيض فيعتزلن المصلى ويشهدن دعوة المسلمين، قالت إحداهن: يا رسول الله، إن لم يكن لها جلباب، قال: فلتعرها أختها من جلابيبها متفق عليه،. وفي رواية النسائي: قالت حفصة بنت سيرين: كانت أم عطية لا تذكر رسول الله صلى الله عليه وسلم إلا قالت: بأبي، فقلت: أسمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يذكر كذا وكذا؟ قالت نعم بأبي، قال: لتخرج العواتق وذوات الخدور والحيض فيشهدن العيد، ودعوة المسلمين، وليعتزل الحيض المصلى. رواه البخاري 1/84 وبناء على ما سبق يتضح أن خروج النساء لصلاة العيدين سنة مؤكدة ، لكن بشرط أن يخرجن متسترات، لا متبرجات كما يعلم ذلك من الأدلة الأخرى .وأما خروج الصبيان المميزين لصلاة العيد والجمعة وغيرهما من الصلوات فهو أمر معروف ومشروع للأدلة الكثيرة في ذلك .والله أعلم.
“মহিলাদের উপর ঈদের সালাত ওয়াজিব নয়; বরং সুন্নত। মহিলারা মুসলমানদের সাথে ঈদগাহে ঈদের সালাত আদায় করবেন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে সেই নির্দেশ দিয়েছেন। সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম এবং অন্যান্য গ্রন্থে উম্মে আতিয়্যা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “আমাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছিল” অন্য রেওয়ায়েতে এসেছে “তিনি আমাদেরকে আদেশ দিয়েছিলেন (অর্থাৎ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী মেয়ে, অন্তপুরবাসিনী তরুনীদেরকে দুই ঈদের সময় (ঈদগাহে) নিয়ে যেতে এবং ঋতুবতী নারীদেরকে সালাতের জায়গা থেকে দূরে থাকতে।”(সহিহ বুখারী (১/৯৩) ও সহিহ মুসলিম (৮৯০)] অন্য এক রেওয়ায়েতে এসেছে‑ “আমাদেরকে আদেশ দেওয়া হয়েছে আমরা যেন ঈদগাহে যাই এবং প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী মেয়ে ও অন্তপুরবাসিনী তরুনীদেরকেও সাথে নিয়ে যাই।” তিরমিযির বর্ণনায় এসেছে- “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবিবাহিত নারী, প্রাপ্তবয়স্ক কুমারী মেয়ে, অন্তপুরবাসিনী তরুনী, ঋতুবতী নারীদেরকে দুই ঈদের সময় ঈদগাহে হাজির হতে বলতেন। তবে, ঋতুবতী নারীরা ঈদগাহ থেকে দূরে থাকত এবং সবার সাথে দোয়ায় শরীক হতো। জনৈক নারী বলল: ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! যদি কোন নারীর জিলবাব (বোরকা) না থাকে? তিনি বললেন: তাহলে তার কোন বোন যেন তাকে নিজের কোন একটি জিলবাব ধার দেয়।”(সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম)। নাসাঈ-এর রেওয়ায়েতে এসেছে‑ হাফসা বিনতে সিরিন বলেন: “উম্মে আতিয়্যা যখনি রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উল্লেখ করতেন তখনি বলতেন: ‘আমার পিতা তাঁর জন্য উৎসর্গ হোক’। আমি বললাম: আপনি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এমন এমন বলতে শুনেছেন? তখন তিনি বললেন: হ্যাঁ, আমার পিতা তাঁর জন্য উৎসর্গ হোক। তিনি বলেছেন: প্রাপ্ত বয়স্ক কুমারী মেয়ে, অন্তপুরবাসিনী তরুনী ও ঋতুবতী নারীরা যেন বের হয় এবং ঈদের নামাযে ও মুসলমানদের দোয়াতে হাযির হয়। ঋতুবতী নারীরা যেন নামাযের জায়গা থেকে দূরে থাকে।”(সহিহ বুখারী (১/৮৪) পূর্বোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে পরিষ্কার যে, নারীদের জন্য দুই ঈদের সালাতে গমন করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তবে শর্ত হচ্ছে তারা পর্দাসহকারে বের হবেন; বেপর্দা নয়­‑ যেমনটি অন্যান্য দলিল থেকে জানা যায়।আর বুঝবান বাচ্চাদের ঈদের সালাতে, জুমার সালাতে ও অন্যান্য সালাতে যাওয়ার বিধান সুবিদিত এবং অনেক দলিল দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ্‌ই উত্তম তাওফিকদাতা।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ: খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ২৮৪-২৮৬; গৃহীত ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া-২৬৯৮৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]–কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:”নারীরা কি ঈদের সালাত তাদের বাড়িতে পড়তে পারবে?
শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) উত্তরে বলেন:
المشروع في حق النساء أن يصلين صلاة العيد في مصلى العيد مع الرجال ، لحديث أم عطية رضي الله عنها ، فالسنة أن يخرج النساء إلى مصلى العيد مع الرجال ، أما صلاة النساء في البيوت فلا أعلم في ذلك سنة”
“নারীদের জন্য শরীয়তের নির্দেশ হলো—তারা পুরুষদের সঙ্গে ঈদগাহে গিয়ে ঈদের সালাত আদায় করবে। কারণ উম্মু আতিয়্যাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর হাদীসে এমনটাই এসেছে। তাই সুন্নাত হলো, নারীরা পুরুষদের সঙ্গে ঈদগাহে যাবে। আর নারীরা বাড়িতে ঈদের সালাত পড়বে—এ বিষয়ে আমি কোনো সুন্নাতের কথা জানি না।”(ইবনু উসাইমীন; ফাতাওয়া নূরুল আলাদ দুরাব: ১৮৯/৮)
.
তাঁকে (শাইখ ইবনে উসাইমিন রাহিমাহুল্লাহ-কে) আরও জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “একজন নারী জানতে চেয়েছেন, আমাদের এলাকায় নারীদের জন্য কোনো ঈদগাহ নেই। তাই আমি কিছু নারীকে আমার বাসায় একত্র করি এবং তাদের নিয়ে ঈদের সালাত আদায় করি। এ ব্যাপারে ইসলামের হুকুম কী?জেনে রাখুন, আমার বাসা পর্দাপূর্ণ এবং পুরুষদের থেকে দূরে।
তিনি উত্তর দিয়েছেন:
الحكم في ذلك أن هذا من البدعة ؛ فصلاة العيد إنما تكون جماعة في الرجال ، والمرأة مأمورة بأن تخرج إلى مصلى العيد فتصلى مع الرجال وتكون خلفهم بعيدة عن الاختلاط بهم .
وأما أن تكون صلاة العيد في بيتها فغلط عظيم ؛ فلم يعهد عن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم ولا عن أصحابه أن النساء يقمن صلاة العيد في البيوت “
“এই কাজটি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত; কারণ ঈদের সালাত জামাতে আদায় করা হয় পুরুষদের সঙ্গে। নারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ঈদগাহে গিয়ে পুরুষদের পেছনে থেকে সালাত পড়তে এবং পুরুষদের থেকে দূরে থাকতে। আর যদি নারী তার বাসায় ঈদের সালাত আদায় করে, তাহলে তা গুরুতর ভুল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের থেকে এমন কোনো দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় না যে, নারীরা ঈদের সালাত বাড়িতে আদায় করেছেন। “(ইবনু উসাইমীন; ফাতাওয়া নূরুল আলাদ দুরাব: ১৮৯/৮)
.
প্রিয় পাঠক, উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, নারীরা যদি সক্ষম হন, তবে শারঈ পর্দা ও অন্যান্য বিধান পূর্ণভাবে মেনে ঈদগাহে গিয়ে পুরুষ ইমামের নেতৃত্বে ঈদের সালাত আদায় করাই সুন্নত ও উত্তম পদ্ধতি। ইসলামী শরীয়তে নারীদের জন্য পৃথকভাবে একাকী কিংবা বাড়িতে জামাআতের মাধ্যমে ঈদের সালাত আদায় করার কোনো স্বতন্ত্র বিধান প্রমাণিত নয়। যদিও ইমাম ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) সহ কেউ কেউ অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু বিশুদ্ধ মতানুসারে, ঈদের সালাত পুরুষদের জন্য ওয়াজিব হলেও নারীদের জন্য তা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। সুতরাং সুন্নত হচ্ছে—পুরুষদের সঙ্গে নারীরাও খোলা ময়দানে ঈদের সালাতে অংশগ্রহণ করবে। তবে ঈদগাহ বা ঈদের সালাত আদায়ের স্থান অধিক দূরে হওয়ার কারণে যাতায়াতের অসুবিধা থাকলে,অথবা সেখানে নারীদের জন্য যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে, কিংবা অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য শারঈ কারণে কোনো নারী ঈদের সালাতে অংশ নিতে না পারলে এতে ইনশাআল্লাহ তার ওপর কোনো গুনাহ বর্তাবে না।অন্যদিকে, যদি কোনো পুরুষ ব্যক্তি শরীয়তসম্মত ওজরের কারণে ঈদগাহে গিয়ে ঈদের দুই রাকাআত সালাত আদায় করতে অক্ষম হন, তাহলে একদল আলেমদের মতে তিনি বাড়িতে একাকী অথবা পরিবার-পরিজনসহ জামাআতের সঙ্গে ঈদের সালাত আদায় করতে পারবেন—এর প্রমাণ হিসেবে প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনু মালিক (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর আমল উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘যাবিরা’ নামক স্থানে তাঁর মুক্তকৃত গোলাম ইবনু আবূ উতবাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেন তাঁর পরিবার-পরিজন ও সন্তানদের নিয়ে শহরের অধিবাসীদের ন্যায় তাকবীরসহ ঈদের সালাত আদায় করেন।(সহীহ বুখারী, কিতাবুল ঈদাইন, অনুচ্ছেদ: ২৫)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◆◯◆▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া রুকন নাকি মুস্তাহাব

 প্রশ্ন: জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া রুকন নাকি মুস্তাহাব? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর সবার জানা উচিত জানাযা মূলত একটি সালাত—যা মৃত ব্যক্তির জন্য জীবিতরা আদায় করে থাকে। তবে এই সালাত অন্যান্য ফরয বা নফল সালাতের ন্যায় নয়। এতে আযান নেই, ইক্বামত নেই, রুকু নেই, সিজদাহ নেই এবং তাশাহুদও নেই। এতদসত্ত্বেও শরিয়তের পরিভাষায় একে সালাত’ বলেই আখ্যায়িত করা হয়েছে।বরং এ বিষয়ে সকল আলেমের ঐকমত্য রয়েছে যে জানাযার সালাত প্রকৃত অর্থেই সালাতের অন্তর্ভুক্ত। এর অন্যতম সুস্পষ্ট দলিল হলো মহান আল্লাহ তাআলার বাণী—:وَ لَا تُصَلِّ عَلٰۤی اَحَدٍ مِّنۡهُمۡ مَّاتَ اَبَدًا وَّ لَا تَقُمۡ عَلٰی قَبۡرِهٖ ؕ اِنَّهُمۡ كَفَرُوۡا بِاللّٰهِ وَ رَسُوۡلِهٖ وَ مَا تُوۡا وَ هُمۡ فٰسِقُوۡنَ”আর তাদের মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না; তারা তো আল্লাহ ও তার রাসূলকে অস্বীকার করেছিল এবং ফাসেক অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।” (সূরা তওবা: ৮৪) এই আয়াত যদিও মুনাফিক্বদের সর্দার আব্দুল্লাহ বিন উবাইয়ের ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে, তবুও এর নির্দেশ ব্যাপক। প্রত্যেক সেই ব্যক্তি যার মৃত্যু কুফরী ও মুনাফিক্বীর উপরেই হয়ে থাকে, সে এরই অন্তর্ভুক্ত। এবং এ আয়াত দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও এ বিষয়টি স্পষ্ট করতে ইমাম বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর সহীহ বুখারীতে ‘জানাযার সালাত আদায়ের পদ্ধতি’ শিরোনামের অধ্যায়ে এভাবেই উল্লেখ করেছেন—যে রাসূল (ﷺ) বলেছেন,صَلُّوا عَلَى النَّجَاشِيِّ “তোমরা তোমাদের সঙ্গীর জন্য (জানাযার) সালাত আদায় করো’। অতঃপর তিনি বলেন, سَمَّاهَا صَلاَةً لَيْسَ فِيهَا رُكُوعٌ وَلاَ سُجُودٌ وَلاَ يُتَكَلَّمُ فِيهَا وَفِيهَا تَكْبِيرٌ وَتَسْلِيمٌ “নবী করীম (ﷺ) একে সালাত বলেছেন, অথচ এর মধ্যে রুকূ ও সিজদাহ নেই এবং এতে কথা বলা যায় না, এতে রয়েছে তাকবীর ও তাসলীম”।(সহীহ বুখারীর পরিচ্ছেদ নং-৫৬)
.
❖▌এবার আমরা আলোচনা করব জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পড়া রুকন/ওয়াজিব নাকি মুস্তাহাব?
.
প্রিয় পাঠক! আমরা প্রথমেই স্পষ্ট করার চেষ্টা করেছি জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। যেহেতু এটি সালাতের অন্তর্ভুক্ত তবুও এতে সূরা ফাতেহা পড়া হবে কিনা বা জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা পাঠ করা রুকন/ওয়াজিব নাকি মুস্তাহাব? এই বিষয়ে আহালুল আলেমদের থেকে সর্বমোট তিনটি মতামত পাওয়া যায়।প্রথমে আমরা সবগুলো মতামত উল্লেখ করব তারপর কোনটি অধিক সঠিক এবং নিরাপদ মত সেটিও উল্লেখ করার চেষ্টা করব।
.
❖১ম অভিমত: একদল বিদ্বান বলেছেন, জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পাঠ করা কোনো অবস্থাতেই মুস্তাহাব বা সুন্নাহ নয়। কারন জানাযার সালাতে কোনো কিরাআত নেই; বরং এতে আল্লাহর প্রশংসা, নবী (ﷺ)–এর ওপর দরূদ পাঠ এবং মৃতের জন্য দুআ করা হয়। এটি ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মালিক,সুফিয়ান আস-সাওরি,আল-আওযায়ি (রাহিমাহুমাল্লাহ) এবং কুফাবাসী আলেমদের একটি দলের অভিমত। বলা হয়, প্রখ্যাত সাহাবী ইবনু উমর ও আবু হুরায়রা, আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) তারা জানাযা সালাতে সূরা ফাতেহা পাঠ করেননি মর্মে মওকুফু সূত্রে কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়।যদিও জানাযা সালাতে তারা সূরা ফাতেহা পড়েননি মর্মে সরাসরি স্পষ্ট শব্দে কোনো আছার পাওয়া যায় না।যেমনটি ইমাম ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন, তিনি বলেন:
لَيْسَ عَنْ وَاحِدٍ مِنْ هَؤُلَاءِ أَنَّهُ قَالَ: لَا يَقْرَأُ فِيهَا بِأُمِّ الْقُرْآن
এদের (সাহাবিদের) মধ্য থেকে একজনের পক্ষ থেকেও এমন কথা বর্ণিত হয়নি যে, তিনি জানাযার সালাতে উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পাঠ করতেন না।”(ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লা; খন্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৩)
.
❖২য় অভিমত: আরেকদল বিদ্বান বলেছেন, জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা ওয়াজিব। বরং তাদের কেউ কেউ একে রুকন (মূল স্তম্ভ) পর্যন্ত বলেছেন। এ মতের অনুসারী আলেমদের সংখ্যা সর্বাধিক তাদের মধ্যে রয়েছেন: ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ, ইমাম ইসহাক, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেমগণ যেমন; ইমাম ইবনু বায, বনু উসাইমীন, ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)। আর প্রখ্যাত সাহাবীদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস, মিসওয়ার, যাহহাক ইবনু কায়েস, আবু দারদা, ইবনু মাসঊদ ও আনাস ইবনু মালিক, ইবনু যুবায়ের ও উবাইদ ইবনু উমাইর (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) প্রমূখ সূরা ফাতিহা পড়তেন বলে প্রমাণিত হয়েছে।
.
❖৩য় অভিমত: আরেকদল বলেছেন,জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া সুন্নাহ (অনাবশ্যকীয় উত্তম আমল)। তাই কেউ যদি সুরা ফাতিহা না পড়ে শুধু দোয়া করে, তাতেও সালাত শুদ্ধ হবে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সূরা ফাতিহা পড়ার পক্ষে যে দলিলগুলো রয়েছে সেগুলো কেবল সুন্নাহ বা মুস্তাহাব হওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করে। শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:“এটিই সঠিক মত।”(দেখুন: ইবনু তাইমিয়া, মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ৩০,পৃষ্ঠা: ৮০)
.
❖▌আমরা যদি চার মাজহাবের বক্তব্য স্পষ্ট জানতে চাই তাহলে দেখবো:
.
হানাফি মাযহাবের অভিমত: হানাফিরা বলেন,قراءة الفاتحة بنية التلاوة في صلاة الجنازة مكروهة تحريماً، أما بنية الدعاء فجائزة.”জানাজার সালাতে তিলাওয়াতের নিয়তে সূরা ফাতিহা পাঠ করা মাকরূহে তাহরীমী (তথা নিষিদ্ধ পর্যায়ের) তবে দু‘আর নিয়তে সূরা ফাতিহা পাঠ করা জায়েয।
.
মালিকি মাযহাবের অভিমত: মালিকিরা বলেন,قراءة الفاتحة فيها مكروهة تنزيهاً “জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা মাকরূহে তানযীহী (অপছন্দনীয়, তবে হারাম নয়)।
.
শাফেয়ি মাযহাবের অভিমত:শাফেয়িরা বলেন,قراءة الفاتحة في صلاة الجنازة ركن من أركانها، والأفضل قراءتها بعد التكبيرة الأولى، وله قراءتها بعد أي تكبيرة، ومتى شرع فيها بعد أي تكبيرة وجب إتمامها، ولا يجوز قطعها ولا تأخيرها إلى ما بعدها، فإن فعل ذلك بطلت صلاته، ولا فرق بين المسبوق وغيره.”জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সালাতের একটি রুকন অপরিহার্য স্তম্ভ)। সর্বোত্তম হলো প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতেহা পাঠ করা। তবে যে কোনো তাকবীরের পর পড়াও বৈধ। কিন্তু যদি কেউ কোনো তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা পাঠ শুরু করে, তাহলে তা সম্পূর্ণ করা ওয়াজিব; মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া বা পরবর্তী তাকবীরের পরে বিলম্ব করা জায়েজ নয়। যদি কেউ তা করে, তাহলে তার সালাত বাতিল হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে মাসবূক (দেরিতে যোগদানকারী) ও অন্যদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।
.
হাম্বলি মাযহাবের অভিমত: হাম্বলিরা বলেন,قراءة الفاتحة فيها ركن، ويجب أن تكون بعد التكبيرة الأولى.”জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা রুকন এবং তা প্রথম তাকবীরের পরেই আদায় করা আবশ্যক।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: আব্দুর রহমান আল-জাযায়রী, কিতাবুল ফিকহ আলাল মাযাহিবিল আরবা‘আহ (বৈরুত: দারুল ইলামিয়্যাহ, তা.বি) খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৭৪)
.
প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত তিনটি অভিমতের মধ্যে কুরআন সুন্না’হর সুস্পষ্ট দলিল এবং প্রসিদ্ধ সালাফি আলেমদের মতামতের আলোকে যা প্রমানিত হয় (আল্লাহু আলাম) তা হলো: জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা একটি রুকন/ওয়াজিব (অপরিহার্য অংশ)। আর কেন সূরা ফাতিহা জানাজার সালাতে রুকন বা ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হবে—ইনশাআল্লাহ,আমরা বিষয়টি দলিলসহ স্পষ্ট ও সুসংহতভাবে উপস্থাপন করবো।
.
❖বর্তমানে যেসব আলেম বলেন যে, জানাযার সালাতে প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা পড়া হবে না বরং হামদ তথা আল্লাহর প্রশংসা (সানা) পাঠ করলেই যথেষ্ট, তাদের মূল দলিল কী? অন্যদিকে যারা বলেন সূরা ফাতিহা পাঠ করা আবশ্যক, অর্থাৎ এটি জানাযার সালাতের রুকন বা ওয়াজিব, তাদেরই বা দলিল কী?
.
▌(১).যারা বলেন যে জানাযার সালাতে চার তাকবীর থাকবে এবং প্রথম তাকবীরের পর সূরা ফাতিহা নয়; বরং আল্লাহর প্রশংসা তথা সানা পাঠ করা হবে—তাদের এই অভিমতের পক্ষে যে দলিলসমূহ পেশ করা হয় এবং সেই দলিলগুলোর ব্যাখ্যায় আলেমদের কী বক্তব্য রয়েছে, তা আমরা এখানে বোঝার চেষ্টা করবো। তাদের মতের পক্ষে যেসব দলিল উল্লেখ করা হয়, সেগুলো হলো:
.
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি:إِذَا صَلَّيْتُمْ عَلَى الْمَيِّتِ فَأَخْلِصُوا لَهُ الدُّعَاءَ”তোমরা কোনো মৃতের জানাযা পড়লে তার জন্য নিষ্ঠার সাথে দু‘আ করবে।”(আবু দাউদ হা/৩১৯৯; ইবনু মাজাহ হা/১৪৯৭;ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীসটি হাসান বলেছেন। কিন্তু এই হাদিসে ছানা পড়ার দলিল নেই। এই হাদীসের ব্যাখ্যাতে হানাফী ইমাম মুফতি তাকী উসমানী লিখেছেন, حنفیہ کی دلیل میں عموماً ابو داود کی اک حدیث پیش کی جاتی ہے ، إذا صليت على الميت فأخلصوا له الدعا، لیکن اس سے استدلال درست نہیں کیو نکہ اس کا مطلب اخلاص کے ساتھ دعا کرنا ہے نہ کہ فاتحہ نہ پڑھی جائے۔ “হানাফীদের দলীল হিসেবে আবু দাউদের একটি হাদীস পেশ করা হয়ে থাকে, আবু হুরায়রা (রাঃ) বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ﷺ)-কে বলতে শুনেছি, যখন তোমরা কোন মৃতের জানাযার সালাত পড়, তখন তার জন্য ইখলাছের সাথে দো‘আ করো। কিন্তু এই বিষয়ে এই হাদীছের দলীল দেওয়া ঠিক না। কেননা এই হাদীছের উদ্দেশ্য হচ্ছে ইখলাছের সাথে দো‘আ করা, ফাতিহা না পড়া উদ্দেশ্য না”।(তিরমিযী; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩০৫ গৃহীত; প্রিয় আশরাফুল ভাইয়ের সংকলন থেকে) ইমাম ইবনু হাযম [মৃত:৪৫৬ হি.] এই হাদীসের বিষয়ে বলেছেন,لَوْ صَحَّ لَمَا مَنَعَ مِنْ الْقِرَاءَةِ، لِأَنَّهُ لَيْسَ فِي إخْلَاصِ الدُّعَاءِ لِلْمَيِّتِ نَهْيٌ عَنْ الْقِرَاءَةِ، وَنَحْنُ نُخْلِصُ لَهُ الدُّعَاءَ وَنَقْرَأُ كَمَا أُمِرْنَا ‘যদি এই হাদীস সহীহও হয়, তবুও এই হাদীছ সূরা ফাতিহা পাঠ (ক্বিরাআত করতে) নিষেধ করে না। কেননা মৃতের ইখলাছের সাথে দো‘আ করা অর্থ ক্বিরাআত করা নিষেধ নয়। আমরা ইখলাছের সাথে দো‘আ করি আবার ক্বিরাআত পাঠ করি, ঠিক যেভাবে আমাদেরকে আদেশ করা হয়েছে”(ইবনু হাযম, আল-মুহাল্লাহ; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৩৫৩)
.
অপর বর্ননায় এসেছে, আবু সাঈদ মাকবুরী (রাহিমাহুল্লাহ) তার পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, তার পিতা জানাযার সালাত কিভাবে পড়বেন তা আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর নিকট প্রশ্ন করলে তিনি বলেন,أَنَا، لَعَمْرُ اللَّهِ أُخْبِرُكَ. أَتَّبِعُهَا مِنْ أَهْلِهَا. فَإِذَا وُضِعَتْ كَبَّرْتُ، وَحَمِدْتُ اللَّهَ. وَصَلَّيْتُ عَلَى نَبِيِّهِ ثُمَّ أَقُولُ: اللَّهُمَّ إِنَّهُ عَبْدُكَ…আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে (তার নিয়ম) জানাব। আমি মৃত ব্যক্তির পরিবার-পরিজন হ’তে জানাযার সাথে চলি। জানাযা যখন রাখা হয়, আমি তখন তাকবীর বলি এবং আল্লাহর হামদ ও তার নবীর উপর দরূদ পাঠ করি। তারপর বলি, আল্লাহুম্মা ইন্নাহু আব্দুকা…।(মুওয়াত্তা ইমাম মালিক; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৩১৯; হা/৭৭৫; এবং বায়হাকি আস-সুনান আল-কুবরা; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা; ৪০) এই হাদীসের জবাবে বলা যায়, প্রথমত; এখানেও সুবহানাকা আল্লাহুম্মা…ছানা পড়ার কোন স্পষ্ট দলীল নেই। এখানে হামদ বলতে আবু হুরায়রা (রাঃ) সূরা ফাতিহা ছাড়া অন্য কিছুই বোঝাননি”। (সহীহ মুসলিম হা/৩৯৫)। আর সূরা ফাতিহার চেয়ে বড় হামদ আর কিংবা হতে পারে? এই হাদীসে সূরা ফাতিহা না পড়ার বিষয়ও স্পষ্ট নয়, যেমনটি এই হাদীসে একটি তাকবীরের কথায় উল্লেখ আছে। বাকী তাকবীরগুলো কি তাহলে দেওয়া লাগবে না? আবার শেষে সালামের কথাও উক্ত হাদীসে নেই, তাহ’লে কি সালাম ছাড়াই জানাযা শেষ হবে? যেখানে অন্য ছাহাবীগণ স্পষ্ট প্রথম তাকবীরের পরে সূরা ফাতিহা পড়া ও অন্যান্য বিষয়গুলো বলেছেন।
.
তাদের মতের পক্ষে আরও একটি দলিল হলো; নাফে‘ (রাহিমাহুল্লাহ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন,أَنَّ عَبْدَ اللهِ بْنَ عُمَرَ كَانَ لَا يَقْرَأُ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجَنَازَة- আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ) জানাযার সালাতে কোন ক্বিরাআত পড়তেন না”।(মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেক হা/৫৩৫, অধ্যায় কিতাবুল জানায়েয; বর্ননাটির সনদ সহীহ;আলিমগন এটিকে গোল্ডেন চেইন উল্লেখ করেছে।(বিস্তারিত দেখুন: ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭২২২১) তবে এখানে কথা আছে অর্থাৎ আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) জানাজার সালাতে (কিরআত) পড়তেন না। এর সঠিক অর্থ কি? এটি আলেমদের মধ্যে একটি সুপরিচিত মতভেদের বিষয়। কারন প্রথমত: এই বর্ণনার মাধ্যমে সূরা ফাতিহা না পরে সানা পড়ার কোন দলিল নেই। দ্বিতীয়ত: এই বর্ণনায় কয়েকটি বিষয় বোঝানো হতে পারে: (১).ইবনে ওমরের বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি জানাযার সালাতে “কিরাআত পড়েননি।”কিন্তু তিনি কি সূরা ফাতিহা পড়েননি, নাকি সূরা ফাতেহার পর অন্য কোনো সূরা পড়তেন না তা স্পষ্ট নয়। (২).এই হাদীস থেকে এটি প্রমাণ করা যায় না যে রাসূল (ﷺ) জানাযায় সূরা ফাতিহা পড়তেন না; বরং এটি ইবনে ওমরের ব্যক্তিগত আমল। (৩).এছাড়া এটিও বোঝানো হতে পারে যে তিনি প্রত্যেক তাকবীরের পরে সূরা ফাতিহা পড়তেন না। উদাহরণস্বরূপ, ইমাম মাকহুল প্রথম দুই তাকবীরের পরে সূরা ফাতিহা পড়তেন, আর ইমাম হাসান বসরী প্রত্যেক তাকবীরের পরে সূরা ফাতেহা পড়তেন। উপরন্তু ইবনু উমর জানজার সালাতে কিরাআত পড়তেন না,এটি নেতিবাচক কথা, আর সূরা আল ফাতিহা পাঠের হাদীসটি হলো ইতিবাচক; উসূলে হাদীস তথা হাদীস বিজ্ঞানের মূলনীতি হলো ইতিবাচক ও নেতিবাচক দু’টি হাদীস পরস্পর সাংঘর্ষিক হলে ইতিবাচক হাদীসটি প্রাধান্য পাবে। সর্বোপরি সাহাবীর কোন কথা বা ‘আমল রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শাশ্বত সুন্নাহকে বর্জন কিংবা রহিত করতে পারে না। সমস্ত উম্মাতের ইজমা বা ঐকমত্য হলো, জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। এতে রয়েছে ক্বিবলামুখী হয়ে দাঁড়ানো, হাত বাঁধা, জামা‘আত হওয়া ইত্যাদি। সুতরাং অন্যান্য সালাতের ন্যায় এখানে ক্বিরাআত পাঠও আবশ্যক। তাছাড়াও সূরাহ্ আল ফাতিহা পাঠের নির্দেশ ও ‘আমল সংক্রান্ত সুস্পষ্ট হাদীস যেখানে বিদ্যমান সেখানে সংশয় সন্দেহ আর কি থাকতে পারে?
.
▌(২).কুরআন সুন্না’হর সুস্পষ্ট দলিল এবং প্রসিদ্ধ সালাফি আলেমদের মতামতের আলোকে বিশুদ্ধ যা প্রমানিত হয় (আল্লাহু আলাম) তা হলো: জানাজার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা একটি রুকন/ওয়াজিব (অপরিহার্য অংশ)। এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই সাধারণ বাণীর অন্তর্ভুক্ত:(لا صَلاةَ لِمَنْ لَمْ يَقْرَأْ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ) “যে ব্যক্তি সালাতে সূরা আল-ফাতিহা পড়লো না তার সালাত হলো না।”(সহীহ বুখারী হা/৭১৪) ও মুসলিম হা/৫৯৫)।সম্ভবত ইবনে উমরের (রা.) মতের প্রেক্ষিতেই ইবনু আব্বাস (রা.) মাঝে মাঝে জানাজার সালাতে সূরা ফাতেহা উচ্চস্বরে পাঠ করতেন—যদিও সুন্নাহ হলো তা নীরবে পাঠ করা। যখন তাঁকে এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তিনি বলেছিলেন:( ليعلموا أنها سنة ) (আমি সূরা ফাতিহা পাঠ করলাম) যাতে লোকেরা জানতে পারে যে,এটা সুন্নাত।”(সহীহ বুখারী হা/১২৪৯; তিরমিযী হা/১০২৪) এই হাদীস উল্লেখ করার পরে ইমাম ছান‘আনী (মৃত ১১৮২ হি.) লিখেছেন,والحديثُ دليلٌ على وجوب قراءةِ الفاتحةِ في صلاةِ الجنازةِ “এই হাদীস জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ ওয়াজিব হওয়ার দলীল”।(সুবুলুস সালাম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ২৯০) আল্লামা আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) আহকামুল জানায়েয গ্রন্থে বলেন,قلت: وعليه فمن العجائب أن لا يأخذ الحنفية بهذا الحديث مع صحته ومجيئه من غير ما وجه، ومع صلاحيته لاثبات السنة على طريقتهم وأصولهم!”আমি বলি: আশ্চর্যের বিষয় হলো হানাফিরা এই সহিহ হাদিস গ্রহণ করেননি, অথচ এটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত হয়েছে এবং তাঁদের নিজস্ব উসুল অনুযায়ীও সুন্নত প্রমাণের জন্য উপযুক্ত!
.
তাছাড়া আলেমগন বলেছেন, উক্ত হাদীসে “সুন্নত” বলার উদ্দেশ্য কেবল “মুস্তাহাব” (ঐচ্ছিক ভালো কাজ) বোঝানো হয়নি; বরং এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তরীকা বা আদর্শ।অর্থাৎ,নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এটি পাঠ করেছেন”।(ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭২২২১) ইসলামী আক্বীদার উলামাগণের পরিভাষায় সুন্নাহ হল:فَهِيَ مَا أمَرَ بِهِ النَّبِيُّ ﷺ وَنَهَى عَنْهُ وَنَدَبَ إِلَيْهِ قَوْلًا وفِعْلًا، مِمَّا لَمْ يَنْطِقُ بِهِ الْكِتَابُ الْعَزِيْزُ‘তা (সুন্নাত) হল এমন বিষয়, যা নবী করীম (ﷺ) করতে আদেশ করেছেন ও যা থেকে নিষেধ করেছেন এবং কথা ও কর্ম দ্বারা এর প্রতি তিনি উৎসাহিত করেছেন, যে বিষয় মহিমান্বিত কিতাবে বলেনি’। এজন্য শরী‘আতের দলীলগুলো সম্পর্কে বলা হয়, কিতাব ও সুন্নাত। অর্থাৎ কুরআন ও হাদীস”।(নিহায়াহ ফী গারীবিল আছার, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৪০৯) হাফেয ইবনু রজব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,السنة هي الطريقة المسلوكة فيشمل ذلك التمسك بما كان عليه ﷺ هو وخلفاؤه الراشدون من الاعتقادات والأعمال والأقوال وهذه هي السنة الكاملة”সুন্নাহ হল অনুসরণীয় পদ্ধতি, যা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের বিশ্বাস, আমল ও বক্তব্যসমূহকে অন্তর্ভূক্ত করে। এটাই পরিপূর্ণ সুন্নাত”।(জামিঊল ঊলুম ওয়াল হিকাম, ১ম খণ্ড, পৃ. ১২০) শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,السُّنَّةَ هِيَ مَا قَامَ الدَّلِيلُ الشَّرْعِيُّ عَلَيْهِ بِأَنَّهُ طَاعَةٌ لِلهِ وَرَسُولِهِ سَوَاءٌ فَعَلَهُ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَوْ فُعِلَ عَلَى زَمَانِهِ أَوْ لَمْ يَفْعَلْهُ وَلَمْ يُفْعَلْ عَلَى زَمَانِهِ لِعَدَمِ الْمُقْتَضِي حِينَئِذٍ لِفِعْلِهِ أَوْ وُجُودِ الْمَانِعِ مِنْهُ”সুন্নাত হল ঐ সকল আমল, যা পালনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর অনুগত হওয়ার ব্যাপারে দলীল রয়েছে। চাই তা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) নিজে পালন করেছেন বা তাঁর যুগে পালন করা হয়েছে অথবা চাহিদা না থাকায় কিংবা অসুবিধার কারণে সে যুগে তিনি নিজে করেনি ও অন্যরাও করেননি। এসবই সুন্নাতের অন্তর্ভূক্ত”।(ইমাম ইবনু তাইমিয়াহ,মাজমু‘ ফাতাওয়া, ২১তম খণ্ড, পৃ. ৩১৭) সুতরাং জানাযার সালাতে সূরাহ্ আল ফা-তিহাহ্ পাঠ করতে হবে উপরোক্ত হাদীস তার প্রকৃষ্ঠ দলীল। (অসংখ্য সাহাবীদের মধ্যে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) সূরাহ আল ফাতিহাহ পাঠ করলেন এবং সুন্নাত বলে দাবী করলেন এতে একজন সাহাবীও তার প্রতিবাদ অথবা বিরোধিতা করেননি, সুতরাং এটা ইজমায়ে সাহাবীর মর্যাদা রাখে)।এছাড়াও বহু সাহাবী থেকে জানাযার সালাতে সূরাহ্ আল ফা-তিহাহ্ পাঠের হাদীস বর্ণিত হয়েছে।ইবনু আব্বাস (রাদিআল্লাহু আনহু) এর এই হাদীসের ব্যাখ্যায় হানাফী মাযহাবের অনুসারী তাকী ওসমানী বলেছেন, اور صحابی جب کسی عمل کو سنت کہے تو وہ حدیث مرفوع ہوتی ہے اور اس لئے اس کی جو تاویلات کی گئی ہیں وہ سب کمزور ہیں اور یہ حدیث بہت سی احادیث مرفوعہ سے مؤید ہے۔ “আর সাহাবী যখন কোন আমলকে সুন্নাত বলে, তখন সেই হাদীস মারফূ হয়ে যায়, আর এজন্য এই হাদীসের বিপক্ষে যত ব্যাখ্যা করা হয়েছে সব দুর্বল। আর এই হাদীছটি আরও অনেক মারফূ হাদীছ দ্বারা শক্তিশালী”।(ইন‘আমুল বারী খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৫০১ গৃহীত; প্রিয় আশরাফুল ভাইয়ের সংকলন থেকে)
.
অপর বর্ননায় কুতায়বা (রহঃ) …আবূ উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন:السُّنَّةُ فِي الصَّلاَةِ عَلَى الْجَنَازَةِ أَنْ يَقْرَأَ فِي التَّكْبِيرَةِ الأُولَى بِأُمِّ الْقُرْآنِ مُخَافَتَةً ثُمَّ يُكَبِّرَ ثَلاَثًا وَالتَّسْلِيمُ عِنْدَ الآخِرَةِ”জানাযার সালাতে সূন্নাত হল প্রথম তাকবীর চুপেচুপে সূরা ফাতিহা তিলাওয়াত করবে। অতঃপর আরো তিনটি তাকবীর বলবে; শেষ তাকবীরে সালাম ফিরাবে।”(সুনানে নাসাঈ হা/১৯৯৩; মুছান্নাফু ইবনি আবী শাইবাহ হা/১১৩৭৯; বায়হাকী সুনানুল কুবরা, হা/৭২০৯)। ইমাম বুখারী, মুসলিমের শর্তে হাদীসটি সহীহ। আলবানী ও শু‘আইব আরনাউত্ব ও জুবায়ের আলী যাঈ (রহঃ) হাদীসটির সনদ সহীহ বলেছেন।(দেখুন ইমাম আলবানী ইরওয়াউল গালীল, খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৮১; হা/৭৩৪) প্রিয় পাঠক! এই হাদীসে সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর জানাযার সালাতের সুন্নত ও তাতে কী কী করা হয়—তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন; যেন তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম সঠিকভাবে তা জানতে পারে এবং তাঁদের ওপর অর্পিত আমানত তারা যথাযথভাবে আদায় করতে পারে। এই হাদীসে আবূ উমামা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন:“জানাযার সালাতে সুন্নত হলো—অর্থাৎ, মৃত ব্যক্তির জন্য আদায় করা জানাযার সালাতে রাসূলুল্লাহ (ﷺ)–এর আমল ছিল এই যে “প্রথম তাকবীরে উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) নীরবে পাঠ করা, অর্থাৎ, তাকবীরে তাহরিমার পর সূরা ফাতিহা চুপিসারে পাঠ করবে; উচ্চস্বরে পাঠ করবে না। “অতঃপর তিনবার তাকবীর দেওয়া, অর্থাৎ, প্রথম তাকবীরের পর আরও তিনটি তাকবীর দেবে। ফলে তাকবীরে তাহরিমাসহ মোট চারটি তাকবীর হবে।“এবং শেষ তাকবীরের পর সালাম দেওয়া,অর্থাৎ, চতুর্থ তাকবীরের পর সালাম ফিরাবে। এই হাদীস থেকে আরও প্রমাণিত হয় উলামায়ে কিরাম মানুষের জন্য যেসব বিষয় জটিল হয়ে যায়, সেগুলো স্পষ্ট করে শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছেন। প্রখ্যাত তাবেঈ সাঈদ বিন মুসাইয়িব (রাহিমাহুল্লাহ) মৃত: ৯৪ হি:] বলেন,السُّنَّةُ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجَنَائِزِ أَنْ تُكَبِّرَ، ثُمَّ تَقْرَأَ بِأُمِّ الْقُرْآنِ ثُمَّ تُصَلِّيَ عَلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم ثُمَّ تُخْلِصَ الدُّعَاءَ لِلْمَيِّتِ،”জানাযার সালাতে সুন্নাত হ’ল, তুমি তাকবীর দিবে অতঃপর উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পড়বে। তারপর নবী করীম (ﷺ)-এর উপরে দরূদ পাঠ করবে এরপর তুমি মাইয়েতের জন্য ইখলাছের সাথে দো‘আ করবে”।(আল-মানহালুল আযবু; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৫৩ মিশকাতুল মাসাবীহ এর বিখ্যাত ব্যাখ্যাগ্রন্থ মির‘আতুল মাফাতীহ এর লেখক ওবায়দুল্লাহ মুবারকপুরী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, والحق والصواب أن قراءة الفاتحة في صلاة الجنازة واجبة، كما ذهب إليه الشافعي وأحمد وإسحاق وغيرهم؛ “হক এবং সঠিক কথা হ’ল, জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব, যেমনটি ইমাম শাফেঈ, আহমাদ, ইসহাক ও অন্যান্যরা বলেছেন”।(মির‘আতুল মাফাতীহ ;খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৩৮১)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,
ويسر القراءة والدعاء في صلاة الجنازة لا نعلم بين أهل العلم فيه خلافا ، ولا يقرأ بعد أم القرآن شيئا ، وقد روي عن ابن عباس أنه جهر بفاتحة الكتاب. قال أحمد : إنما جهر ليعلمهم
“জানাযার সালাতে কিরাআত (সুরা ফাতিহা) এবং দোয়া নিঃশব্দে (মনে মনে) পড়তে হয়—এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে কোনো মতভেদ আছে বলে আমাদের জানা নেই। আর সুরা ফাতিহার পর অন্য কোনো সুরা বা আয়াত পড়তে হয় না। তবে ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি (একবার) জানাযার সালাতে উচ্চস্বরে সুরা ফাতিহা পড়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: তিনি (ইবনে আব্বাস) উচ্চস্বরে পড়েছিলেন কেবল তাঁদের (উপস্থিত লোকদের) এটি শেখানোর জন্য (যে এটি পড়া সুন্নত)।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৪১২)
.
শাইখ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ আল-মুখতার আশ-শশানক্বীতি তাঁর শরহে জাদিল মুস্তাকনিʿ গ্রন্থে বলেন,
وللعلماء في قراءة الفاتحة في صلاة الجنازة قولان:منهم من يقول: يشرع أن تقرأ سورة الفاتحة، وهو مذهب الإمام الشافعي وأحمد وإسحاق بن راهويه وطائفة من أهل الحديث، والدليل على ذلك عموم قوله عليه الصلاة والسلام: (لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب) وقوله عليه الصلاة والسلام: (أيما صلاة لا يقرأ فيها بفاتحة الكتاب .. الحديث)، فإنك إذا تأملت هذا اللفظ وجدته من صيغ العموم، فقوله: (لا صلاة) نكرة في سياق النفي، والقاعدة: أن النكرة في سياق النفي تفيد العموم. (أيما صلاةٍ) أيضاً يدل على العموم؛ لأن (أي) عند الأصوليين من صيغ العموم، فلما قال: أيما صلاةٍ لا يقرأ فيها بفاتحة الكتاب، فقد عمم ولم يفرق بين صلاة الجنازة ولا غيرها، فدل على أن صلاة الجنازة يجب أن يقرأ فيها بفاتحة الكتاب.وتأكدت هذه العمومات بحديث ابن عباس رضي الله عنه أنه صلى على الجنازة وجهر بالفاتحة؛ لكي يعلم الناس أنها سنة، فدل هذا على أن السنة أن يقرأ الفاتحة على الميت.وخالف في ذلك الحنفية والمالكية رحمة الله عليهم، وقالوا: إنه يقتصر على الدعاء، لآثار وردت عن أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم في صفة الصلاة على الميت، ذكر فيها الصلاة على النبي صلى الله عليه وسلم والدعاء، قالوا: فهذا يدل على أنه لا تقرأ الفاتحة.والجواب عن ذلك: أن المرفوع مقدمٌ على الموقوف، ويحمل كلام الصحابة على أن المقصد الأسمى والأعلى في الصلاة على الميت: أن يدعى له، فذكروه وتركوا غيره للعلم به بداهة، هذا مما يعتبر به.وأيضاً: يحتمل أنه لم يبلغهم النص بقراءة الفاتحة، وقد يخفى على بعض أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم من السنن ما لم يطلع عليه؛ ولذلك يُعمل بما ورد عنه عليه الصلاة والسلام ويقدم على غيره.
“জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে দুইটি মত রয়েছে। তাদের একদল বলেন: জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া শরিয়তসম্মত। এটি ইমাম শাফেয়ি, ইমাম আহমদ, ইসহাক ইবন রাহওয়াইহ এবং আহলে হাদিসদের একটি দলের মত। এর দলিল হলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাধারণ বানী: “যে সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় না, সে সালাত হয় না।”আর তাঁর আরেকটি বাণী: “যে কোনো সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় না (হাদিস) আপনি যদি এই শব্দগুলোর প্রতি গভীরভাবে চিন্তা করেন, তাহলে দেখবেন এগুলো সাধারণ অর্থবোধক বাক্য। কারণ, لا صلاة (কোনো সালাতই নয়) এটি নাকেরার প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত একটি অনির্দিষ্ট শব্দ আর উসুলের নিয়ম হলো নাকেরার প্রেক্ষাপটে অনির্দিষ্ট শব্দ সাধারণ অর্থ প্রদান করে। এছাড়া أيما صلاة (যে কোনো সালাত) এটিও সাধারণ অর্থ নির্দেশ করে। কারণ উসুলবিদদের মতে أي শব্দটি আম এর/সাধারণতার অন্যতম শব্দ। অতএব, যখন বলা হলো: যে কোনো সালাতে সুরা ফাতিহা পড়া হয় না, তখন এতে জানাজার সালাত ও অন্যান্য সালাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে জানাজার সালাতও সুরা ফাতিহা পড়া আবশ্যক। এই সাধারণ দলিলগুলো আরও শক্তিশালী হয়েছে ইবনু আব্বাস (রা.)–এর হাদিস দ্বারা। তিনি জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা জোরে পড়েছিলেন, যাতে মানুষ জানতে পারে যে এটি সুন্নাত। এ থেকে বোঝা যায় মৃত ব্যক্তির ওপর জানাজার সালাতে সুরা ফাতিহা পড়াই সুন্নত। তবে হানাফি ও মালিকি মাযহাবের আলেমগণ এ মতের বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের মতে, জানাজার সালাতে কেবল দোয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। তাঁরা এ মতের পক্ষে সাহাবিদের কিছু বর্ণনা পেশ করেন, যেখানে জানাজার সালাতের বিবরণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর দরুদ এবং মৃতের জন্য দোয়ার কথা এসেছে, কিন্তু ফাতিহা পড়ার কথা উল্লেখ নেই। তাঁদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে জানাজার সালাতে ফাতিহা পড়া হয় না। এর জবাব হলো মারফূ হাদিস মাওকূফ বর্ণনার ওপর অগ্রাধিকার পায়।আর সাহাবিদের বক্তব্যকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায় যে, জানাজার সালাতের মূল ও সর্বোচ্চ উদ্দেশ্য হলো মৃতের জন্য দোয়া করা। সে কারণে তাঁরা দোয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, আর অন্যান্য বিষয় স্বতঃসিদ্ধ হওয়ার কারণে তা আলাদা করে বলেননি। আরেকটি সম্ভাবনা হলো ফাতিহা পড়ার হাদিসটি তাঁদের কারো কাছে পৌঁছেনি। কারণ সাহাবিদের কারো কাছেও কোনো কোনো সুন্নত গোপন থাকতে পারে, যা অন্যদের জানা ছিল।অতএব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যা প্রমাণিত হয়েছে, সেটিই গ্রহণযোগ্য এবং অন্য সব কিছুর ওপর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত।”(ইমাম শানকীতি; শারহে যাদুল মুস্তাকনি খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৮৩)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, শ্রেষ্ঠ মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফাক্বীহ ও উসূলবিদ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন, والفاتحة في صلاة الجنازة ركن ؛ لقول النبي عليه الصلاة والسلام : ( لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب ) ، وصلاة الجنازة صلاة ؛ لقوله تعالى : ( وَلا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنْهُمْ مَاتَ أَبَداً ) فسماها الله صلاة ؛ ولأن ابن عباس رضي الله عنهما قرأ الفاتحة على جنازة ، وقال : ( لتعلموا أنها سنة ) “সূরা ফাতিহা পাঠ জানাযার সালাতের একটি রুকন। কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,”যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে না তার সালাত হয় না।’(সহীহ বুখারী হা/৭৫৬)। আর জানাযার সালাতও সালাতের অন্তর্ভুক্ত। কারন মহান আল্লাহ বলেন,”আর তাদের (মুনাফিকদের) মধ্যে কারো মৃত্যু হলে আপনি কখনো তার জন্য জানাযার সালাত পড়বেন না এবং তার কবরের পাশে দাঁড়াবেন না।”(সূরা তওবা; ৯/৮৪)। আল্লাহ এটাকে সালাত বলেছেন। আর ইবনে আব্বাস (রাঃ) জানাযার সালাতে আল-ফাতিহা পাঠ করলেন এবং বললেন; “যাতে তোমরা জানতে পারবে যে এটা সুন্নত।”(ইবনে উসাইমীন, আশ শারহুল মুমতি খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৪০১; ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৭২২২১)। শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন, জানাযার সালাতের ভিত্তিই হলো সংক্ষিপ্ততা। তাই এতে ছানা পড়া উচিত নয়।”(ইমাম ইবনু উসায়মীন,মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাাইল, ১৭তম খণ্ড,পৃষ্ঠা: ১১৯)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: জানাযার সালাতে আল-ফাতিহা পড়ার হুকুম কি? তিনি জবাব বলেন:واجبة ، كما قال صلى الله عليه وسلم : ( صلوا كما رأيتموني أصلي ) ، وقال عليه الصلاة والسلام : ( لا صلاة لمن لم يقرأ بفاتحة الكتاب ) متفق على صحته”এটা ওয়াজিব। যেমন রাসূল (ﷺ) বলেছেন, “তোমরা আমাকে যেভাবে সালাত আদায় করতে দেখেছ সেভাবে সালাত আদায় কর।”(সহীহ বুখারী হা/৬৩১)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অপর বর্ননায় বলেছেন,”যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পাঠ করে না তার সালাত হয় না।’(সহীহ বুখারী হা/৭৫৬, সহীহ মুসলিম হা/৯০০,মাজমু’ ফাতাওয়া আল-শাইখ ইবনে বায, খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ১৪৩)
.
জেনে রাখা ভালো যে, জানাযার সালাতে সানা পড়ার প্রমাণে কোন সহীহ হাদীস পাওয়া যায় না।এজন্য ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, জানাযার সালাতের ভিত্তিই হলো সংক্ষিপ্ততা। তাই এতে ছানা পড়া উচিত নয়। (মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাাইল, ১৭তম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১১৯)। জানাযার সালাতে সানা পাঠ করার প্রমাণ পাওয়া যায় না বিধায় বিগত শতাব্দীর সর্বশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] “এটি বিদ‘আত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।(আহকামুল জানায়িয- বিদ‘আত নং-৭৬,পৃষ্ঠা: ৩১৬)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক, উপরোক্ত আলোচনায় আমি জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করতে হবে নাকি হবে না বিষয়টি পরিস্কার করার চেষ্টা করেছি। যদিও একদল আলেমদের দাবি হলো—জানাযার সালাতে রুকু ও সিজদাহ নেই; সুতরাং এটি নাকি তাওয়াফের অনুরূপ। আর যেহেতু তাওয়াফ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য সূরা ফাতিহা পাঠের প্রয়োজন হয় না, তাই জানাযার সালাতেও সূরা ফাতিহা পাঠ করা জরুরি নয়। কিন্তু এ ধরনের যুক্তি সুস্পষ্ট ও সহীহ হাদীসের মোকাবিলায় অত্যন্ত দুর্বল এবং অগ্রহণযোগ্য। অতএব সচেতন পাঠকদের প্রতি আমার নিবেদন—পুরো আর্টিকেলটি মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করলে, কোন মতটি অধিক শক্তিশালী, নিরাপদ এবং দলীলসম্মত—তা ইনশাআল্লাহ আপনাদের কাছেই স্পষ্ট হয়ে উঠবে। সুতরাং জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা না পড়লে সালাত বাতিল হয়ে যাবে এমনটি আমি বলছি না, বরং আমি শুধু এইটুকুই বলবো যেমনটি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন,إِنَّهُ مَنْ يَعِشْ مِنْكُمْ فَسَيَرَى اخْتِلَافًا كَثِيْرًا، فَعَلَيْكُمْ بِسُنَّتِيْ وَسُنَّةِ الْخُلَفَاءِ الرَّاشِدِيْنَ الْمَهْدِيِّيْنَ، تَمَسَّكُوْا بِهَا وَعَضُّوْا عَلَيْهَا بِالنَّوَاجِذِ، وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُوْرِ، فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ”তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি দীর্ঘায়ু লাভ করবে, সে অনেক মতভেদ দেখতে পাবে। তাই তোমাদের জন্য আমার সুন্নাহ এবং সঠিক পথে পরিচালিত খলিফাদের সুন্নাহ অনুসরণ করা আবশ্যক। এটিকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো এবং দৃঢ়ভাবে লেগে থাকো। নতুন নতুন বিষয় থেকে সাবধান থাকো, কারণ প্রত্যেক নতুন উদ্ভাবন বিদ‘আহ এবং প্রত্যেক বিদ‘আহ পথভ্রষ্টতা”।(আবূ দাঊদ হা/৪৬০৭; তিরমিযী হা/২৬৭৬)
(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate