Friday, January 9, 2026

রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামি শরিয়ত বাস্তবায়নে একজন মুসলিম শাসকের বাধ্যবাধকাতা এবং তার পরিধি

 কুরআন-সুন্নাহতে যে সব ব্যাপারে সুষ্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করা মুসলিম শাসকের জন্য ফরজ। আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফয়সালা না করার পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَمَن لَّمْ يَحْكُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ
“আল্লাহ যা নাজিল করেছেন, সেই অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না তারাই কাফের।” [সূরা মায়িদাহ: ৪৪]
কুরআনে অন্যত্র তাদেরকে জালিম (অবিচারী) এবং অন্যত্র ফাসিক (পাপিষ্ঠ) বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
কোনও মুসলমি শাসক এইত ফরজ হওয়ার বিধানকে অস্বীকার করলে সে কাফের এবং ইসলাম থেকে বহিস্কৃত মুরতাদ বলে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে আলেমদের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই।
কিন্তু একজন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের জন্য রাষ্ট্রের প্রতিটি ছোট-বড় প্রতিটি আইন-কানুন কি সরাসরি কুরআন-সুন্নাহ থেকে গ্রহণ করা আবশ্যক?
উত্তর, না। তা আবশ্যক নয়। এটিই সঠিক এবং বাস্তবসম্মত কথা। এর যৌক্তিক ও শরয়ি ভিত্তি বোঝা প্রয়োজন।
এ কথার সপক্ষে প্রধান যুক্তিগুলো হল:
❂ ১. রাষ্ট্রের এমন অসংখ্য প্রশাসনিক ও দুনিয়াবি বিষয় রয়েছে, যেগুলোর ব্যাপারে কুরআন এবং সুন্নাহ সরাসরি কোনও নির্দিষ্ট আদেশ বা নিষেধ দেয়নি। বরং এগুলোকে ‘মাসলাহাত’ বা জনকল্যাণের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্রপ্রধানের ইজতিহাদ (গবেষণা) ও সিদ্ধান্তের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
❂ ২. পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং সময়ের প্রয়োজনে রাষ্ট্র দেশ ও জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করে নিজস্ব আইন প্রণয়ন করতে পারে। যেমন:
– ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে চলা এবং আইন ভঙ্গকারীর জন্য জরিমানা নির্ধারণ।
– সরকারি অফিসের সময়সীমা নির্ধারণ, বেতন স্কেল ও চাকরির বয়স সীমা ঠিক করা।
– প্রশাসনিক বিভিন্ন পদমর্যাদা (Rank) তৈরি এবং রাষ্ট্রের প্রয়োজনে নতুন কোনও বিশেষ সংস্থা বা বিভাগ গঠন করা।
– এই হাজারো আইন-কানুন বা নিয়ম-নীতির বিষয়ে ইসলাম নির্দিষ্ট কোনও ছক বেঁধে দেয়নি। এসব ক্ষেত্রে মানুষের উপস্থিত প্রয়োজন ও কল্যাণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা ইসলাম রাষ্ট্রকে দিয়েছে। এই নমনীয়তা বা স্বাধীনতা থাকাই ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, যা রাষ্ট্রকে যেকোনো যুগে সচল রাখতে সাহায্য করে।
তবে এ ক্ষেত্রে মনে রাখা আবশ্যক যে, এমন কোনও আইন প্রনোয়ন করা জায়েজ নাই যা, ইসলামের কোনও মূলনীতি বা বিধিবাধানের সাথে সাংঘর্ষিক।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَأُولِي الْأَمْرِ مِنكُمْ
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রসুলের আনুগত্য করো আর তোমাদের মধ্য হতে উলুল আমরের (মুসলিম শাসকের)।” [সূরা নিসা: ৫৯]
বি. দ্র. ওলামায়ে কেরাম বলেন, উলুল আমর বা শাসক যখন জনস্বার্থে কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী নয় এমন আইন করেন, তখন তা মেনে চলা ওয়াজিব।।
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
أَنْتُمْ أَعْلَمُ بِأَمْرِ دُنْيَاكُمْ
“তোমরা তোমাদের দুনিয়াবি বিষয়ে বেশি ভালো জানো।” [সহিহ মুসলিম: ২৩৬৩]
১. ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.):
ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) তাঁর ‘আস সিয়াসাহ আশ শারইয়্যাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, শাসকের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত, জনকল্যাণ নিশ্চিত করা। তিনি বলেন যে, যে বিষয়গুলোতে শরিয়তের স্পষ্ট কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই সেখানে জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন করা কেবল জায়েজই নয় বরং ক্ষেত্র বিশেষে আবশ্যক।
তিনি বলেন:
فَإِنَّ الشَّرِيعَةَ مَبْنَاهَا عَلَى تَحْصِيلِ الْمَصَالِحِ وَتَكْمِيلِهَا، وَتَعْطِيلِ الْمَفَاسِدِ وَتَقْلِيلِهَا
“শরিয়তের ভিত্তি হচ্ছে (জনগণের) কল্যাণ অর্জন ও তা পূর্ণতা দান করা এবং অকল্যাণ দূর করা ও তা হ্রাস করা।” [মাজমুউল ফাতাওয়া: ২০/৪৮]
২. ইমাম শাতবি (রহ.):
ইমাম শাতবি (রহ.) তাঁর ‘আল-মুওয়াফাকাত’ গ্রন্থে ‘মাসালিহ মুরসালাহ’ (এমন জনকল্যাণ যার ব্যাপারে শরিয়তে সরাসরি আদেশ বা নিষেধ নেই) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি বুঝিয়েছেন যে, জীবনের পরিবর্তনশীল প্রয়োজনে নতুন নতুন আইন বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে, যা সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর শব্দে না থাকলেও তার ‘মাকাসিদ’ বা উদ্দেশ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ।
তিনি বলেন,
الْمَصَالِحُ الْمُرْسَلَةُ هِيَ الَّتِي لَمْ يَشْهَدْ لَهَا مِنَ الشَّرْعِ بِالاعْتِبَارِ وَلا بِالالْغَاءِ نَصٌّ مُعَيَّنٌ
“মাসালিহ মুরসালাহ হল, এমন জনকল্যাণমূলক বিষয়, যার সপক্ষে (গ্রহণযোগ্যতার) বা বিপক্ষে (বাতিল করার) শরিয়তের কোনও নির্দিষ্ট বক্তব্য নে নেই।” [আল-ইতিসাম লিশ-শাতবি: ২/৬০৭]
অতএব ইমামগণের এই মূলনীতি থেকে স্পষ্ট যে, ট্রাফিক আইন বা প্রশাসনিক কাঠামো কুরআন-সুন্নাহর বিরোধী নয়, বরং এগুলো ইসলামের বৃহত্তর লক্ষ্য ‘জনকল্যাণ’ নিশ্চিত করারই অংশ। যারা মনে করেন প্রতিটি প্রশাসনিক খুঁটিনাটি সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর আয়াত বা হাদিসের শব্দে থাকতে হবে, তারা মূলত ইসলামের ব্যাপকতা ও ফিকহি মূলনীতি সম্পর্কে সম্যক অবগত নন।
❂ প্রশ্ন: কুরআন-সুন্নাহর সকল আইন-কানুন কি ফরজ নাকি মুস্তাহাব পর্যায়েরও রয়েছে?
উত্তর: কুরআন-সুন্নাহর সকল আইন-কানুন ফরজ নয়। কিছু আছে মুস্তাহাব পর্যায়ের। সেগুলো করা ভালো। না করলেও কোন গুনাহ নেই। তবে কুরআন ও হাদিসে যে সকল আইন বাস্তবায়ন করাকে ফরজ করা হয়েছে শুধু সেগুলো বাস্তবায়ন করা প্রত্যেক মুসলিম শাসকের জন্য ফরজ। কেউ যদি এই ফরজ বিধানগুলোকে ফরজ মনে না করে তাহলে নিঃসন্দেহে তা হবে কুফরি।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

No comments:

Post a Comment

Translate