January 08, 2026

যে আমল করলে জীন শয়তান ভয়ে পালিয়ে যায়

 ১- রাসুল (সাঃ) বলেন, যে বেক্তি সকালে ১বার ও বিকালে ১বার আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, শয়তান থেকে সারাদিন সে আল্লাহ্‌র আশ্রয়ে থাকবে। (সহিহ তারগিব)

২- “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, যে ব্যক্তি সকাল ও বিকালে সূরা ইখলাস, ‘সূরা ফালাক’ ও ‘সূরা নাস’ তিনবার করে বলবে, এটাই তার সবকিছুর জন্য যথেষ্ট হবে। (আবূ দাউদ; তিরমিযী)
৩- রাসুল (সাঃ) বলেন, যে বেক্তি সকালে ৩বার ও সন্ধ্যায় ৩বার নিম্নোক্ত দুয়াটি বলবে, তাহলে কোন কিছু তার ক্ষতি করতে পারবে না। (সহিহ আবুদাউদ)
«بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لاَ يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلاَ فِي السّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ».
(বিস্‌মিল্লা-হিল্লাযী লা ইয়াদ্বুররু মা‘আ ইস্‌মিহী শাইউন ফিল্ আরদ্বি ওয়ালা ফিস্ সামা-ই, ওয়াহুয়াস্ সামী‘উল ‘আলীম)।
“আল্লাহ্‌র নামে; যাঁর নামের সাথে আসমান ও যমীনে কোনো কিছুই ক্ষতি করতে পারে না। আর তিনি সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী।”
৪- “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : পেশাব পায়খানার স্থানে জিন শয়তান থাকে। অতএব তোমাদের কেহ যখন এখানে আসে সে যেন বলে,
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْخُبْثِ وَالْخَبائِث».
আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ‘ঊযু বিকা মিনাল খুব্‌সি ওয়াল খাবা-ইস
হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট অপবিত্র পুরুষ জিন্ ও নারী জিন্ থেকে আশ্রয় চাই”। (ইবনে হিব্বান, বুখারী, মুসলিম)
এছাড়াও “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) গর্তে পেশাব করতে নিষেধ করেছেন কারণ গর্ত হল জিনদের থাকার জায়গা”।
(সহীহ্-আবু দাউদ)
৫- “রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন : “যখন তোমাদের কেউ ঘরে প্রবেশ করে, আর প্রবেশের সময় ও খাবারের সময় আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন শয়তান (নিজ ব্যক্তিদের) বলে, তোমাদের কোনো বাসস্থান নেই, তোমাদের রাতের কোনো খাবার নেই।” (মুসলিম)
অর্থাৎ খাওয়ার সময় ও ঘরে প্রবেশের সময় বলতে হবে-
«بِسْمِ اللَّهِ»
(বিসমিল্লাহ) “আল্লাহর নামে।”
৬- রাসুল (সাঃ) বলেন : যে ব্যক্তি শোয়ার সময় আয়াতুল কুরসী পড়বে শয়তান সারা রাত তার নিকটে যাবে না।(বুখারী)
৭- রাসুল (সাঃ) বলেন : যখন তোমাদের কেউ হাই তোলে তখন সে যেন তার মুখে হাত দিয়ে বাধা দেয়। কারণ হাই তোলার সময় শয়তান প্রবেশ করে”।(মুসলিম)
ছোট শিশুদের কিভাবে জীন শয়তান থেকে নিরাপদে রাখা যায়:
১- রাসুল (সাঃ) বলেন : সন্ধ্যা বেলায় তোমাদের সন্তানদের বাহিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখবে। কারণ, তখন শয়তানেরা ছড়িয়ে পড়ে। (বুখারী)
২- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হাসান ও হুসাইন রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা-এর জন্য এই বলে (আল্লাহ্‌র) আশ্রয় প্রার্থনা করতেন-
«أُعِيذُكُمَا بِكَلِمَاتِ اللَّهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لاَمَّةٍ».
(উ‘ইযুকুমা বিকালিমা-তিল্লা-হিত তা-ম্মাতি মিন কুল্লি শাইতানিওঁয়া হা-ম্মাহ্‌, ওয়ামিন কুল্লি আইনিল্লা-ম্মাহ্‌)।
“আমি তোমাদের দু’জনকে আল্লাহ্‌র পরিপূর্ণ কালেমাসমূহের আশ্রয়ে নিচ্ছি যাবতীয় শয়তান ও বিষধর জন্তু থেকে এবং যাবতীয় ক্ষতিকর চক্ষু (বদনযর) থেকে।”(বুখারী)
৩- রাসুল (সাঃ) বলেন : নিম্নোক্ত দোয়া পাঠ করে সহবাস করলে উক্ত সহবাসের ফলে সৃষ্ট সন্তানের কোন ক্ষতি শয়তান করতে পারে না”।(বুখারী, আবু দাউদ, তিরমিযী)
«بِسْمِ اللَّهِ، اللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ، وَجَنِّبِ الشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا».
(বিসমিল্লাহি আল্লা-হুম্মা জান্নিবনাশ্-শাইত্বানা ওয়া জান্নিবিশ্-শাইত্বানা মা রযাকতানা)।
“আল্লাহ্‌র নামে। হে আল্লাহ! আপনি আমাদের থেকে শয়তানকে দূরে রাখুন এবং আমাদেরকে আপনি যে সন্তান দান করবেন তার থেকেও শয়তানকে দূরে রাখুন।”
জিন-শয়তান কাউকে আছর করলে করণীয়:
এটা প্রমাণিত যে, কেউ যদি উপরে বর্ণিত আমলগুলো করে তবে জিন-সয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না কিন্তু কেউ এই আমলগুলো না করার কারণে যদি জিন-সয়তান পাকড়াও করে ফেলে তবে আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস দিয়ে ঝার ফুক করলে জীন-শয়তান চলে যাবে ইন-শা-আল্লাহ। কাউকে বিষধর জন্তু বা সাপে কাটলে সূরা ফাতিহা পড়ে মুখের থুথু কাটা জায়গায় লাগাবে এভাবে কয়েকবার করলে সুস্থ হয়ে যাবে ইন-শা-আল্লাহ।(বুখারি, মুসলিম)। আর ১ জনের মাধ্যমে যদি অন্যজনের নজর লাগে তবে যে বেক্তির জন্য নজর লাগলো তাকে গোসল করিয়ে সেই গোসলের পানি নজর লাগা অসুস্থ বেক্তির গায়ে পিছন দিক থেকে ঢেলে দিলে সে সুস্থ হয়ে যাবে। আর কার মাধ্যমে নজর লাগলো এটা বুঝা না গেলে ঐ সুরাগুলো দ্বারা ঝার-ফুক করতে হবে। ইসলামে প্রত্যেক রোগের চিকিৎসা রয়েছে, অথচ মানুষ এগুলো গ্রহণ না করে তন্ত্র-মন্ত্র বা তাবিজ-কবজের আশ্রয় নেয়। শরিয়ত সম্মত এই পদ্ধতিগুলো অবলম্বন করুণ, কেননা তন্ত্র-মন্ত্র বা তাবিজ-কবজের আশ্রয় নেওয়া শির্ক। (মুসনাদে আহমাদ, সিলসিলাহ সহিহাহ)
উৎস: ফেসবুক পেজ-ইসলামী শিষ্টাচার
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

জিন ও ভূত-পরী ও দৈত্য-দানব ইত্যাদি সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামি আকিদা অনুযায়ী জিন জাতির অস্তিত্বে বিশ্বাস করা অপরিহার্য। পবিত্র কুরআন ও হাদিস দ্বারা তাদের অস্তিত্ব অকাট্যভাবে প্রমাণিত। জিনদের অস্তিত্ব অস্বীকার করা ঈমান-পরিপন্থী কাজ। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে জিনদের নিয়ে বহু আয়াত নাজিল করেছেন এবং তাদের নামে ‘সূরা জিন’ নামক একটি স্বতন্ত্র সূরাও রয়েছে। (সূরা নম্বর: ৭২)
✪ জিন জাতির সৃষ্টি ও প্রকৃতি:
মানবজাতি সৃষ্টির বহু আগে থেকেই আল্লাহ তাআলা জিনদের সৃষ্টি করেছেন। মানুষের যেমন স্বাধীন ইচ্ছা ও বিবেক আছে, জিনদেরও তেমনি রয়েছে। তারা প্রধানত আগুন থেকে সৃষ্ট। আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলেছেন:
وَالْجَانَّ خَلَقْنَاهُ مِن قَبْلُ مِن نَّارِ السَّمُومِ
“এবং তিনি এর আগে জিনকে সৃষ্টি করেছেন প্রখর অগ্নিশিখা থেকে।” [সূরা হিজর: ২৭]
মানুষের মতো জিনদের মধ্যেও নারী-পুরুষের বিভাজন রয়েছে এবং তারা বংশবৃদ্ধি করে। তাদের মধ্যে ভালো ও মন্দ—উভয় প্রকারেরই জিন রয়েছে। কেউ অত্যন্ত পরহেজগার। আবার কেউ পাপাচারী। আল্লাহ তাআলা জিনদের বিভিন্ন জড় পদার্থ বা জীবজন্তুর রূপ ধারণ করার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়েছেন। তবে দুষ্ট প্রকৃতির জিনদের কুরআন ও হাদিসে ‘শয়তান’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তারা মানুষের প্রকাশ্য শত্রু এবং নানাভাবে মানুষের মনে কুমন্ত্রণা দিয়ে বা ভয় দেখিয়ে ক্ষতি করার চেষ্টা করে।
✪ জিন সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা বনাম বাস্তবতা:
আমাদের সমাজে দুষ্ট পুরুষ জিনদের ‘ভূত’ বা ‘দৈত্য’ এবং দুষ্ট নারী জিনদের ‘পেত্নী’ বা ‘শাকচুন্নি’ বলে ডাকার প্রচলন আছে। লোককাহিনি বা সিনেমা-নাটকে তাদের বিশাল দেহ, শিং বা ভয়ঙ্কর কুৎসিত অবয়বে কল্পনা করা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে নারী জিনদের ডানাওয়ালা সুন্দরী ‘পরী’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়। মূলত এগুলো মানুষের কল্পনাপ্রসূত ধারণা, যার কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই।
✪ জিন সম্পর্কে ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি:
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী জিনদের নিজস্ব আসল আকৃতিতে দেখার ক্ষমতা সাধারণ মানুষের নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন:
إِنَّهُ يَرَاكُمْ هُوَ وَقَبِيلُهُ مِنْ حَيْثُ لَا تَرَوْنَهُمْ
“নিশ্চয়ই সে (শয়তান) এবং তার দলবল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে যেখান থেকে তোমরা তাদের দেখতে পাও না।” [সূরা আরাফ: ২৭]
যেহেতু জিন জাতি মানুষের চোখের আড়ালে (গায়েব) থাকে তাই নিছক কল্পনার ওপর ভিত্তি করে নাটক, সিনেমা বা কার্টুনে তাদের ছবি আঁকা বা কাল্পনিক দৃশ্যে উপস্থাপন করা নির্ভরযোগ্য মতানুযায়ী শরিয়তসম্মত নয়। এ ধরণের অলীক চিত্রায়ন মানুষের মনে অহেতুক ভীতি সৃষ্টি করে এবং আকিদাগত বিভ্রান্তি ছড়ায়। তাই একজন মুমিনের উচিত, এসব রূপকথা বা কাল্পনিক চরিত্রে বিশ্বাস না করে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক জ্ঞান রাখা। আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬

লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল। 

ছেলে সন্তানের পক্ষ থেকে একটি ছাগল আকিকা করার বিধান

 প্রশ্ন: আল্লাহ আমাকে এক বছর আগে একটি ছেলে সন্তান দান করেছেন। আমরা তার আকিকা হিসেবে দুটি ছাগল জবেহ করার নিয়ত করেছিলাম এবং টাকাও জমিয়েছিলাম। কিন্তু কেনার সময় আমরা দুটি ছোট খাসির বদলে একটি বড় খাসি কিনেছি এই ভেবে যে, এটিতে মাংস বেশি হবে। এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি জায়েজ হয়েছে? নাকি আমাদের আরেকটি ছাগল জবেহ করতে হবে? বর্তমানে বাচ্চার বয়স এক বছর।

উত্তর: আপনাদের ওপর দ্বিতীয় আরেকটি ছাগল জবেহ করা আবশ্যক নয় এবং আপনারা যা করেছেন তাতেই আকিকা আদায় হয়ে গেছে। তবে এটি উত্তম নিয়মের খেলাফ হয়েছে। কারণ ছেলের পক্ষ থেকে দুটি ছাগল জবেহ করা পূর্ণাঙ্গ আমল।
যেমনটি━রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَنْ وُلِدَ لَهُ مَوْلُودٌ فَأَحَبَّ أَنْ يَنْسُكَ عَنْهُ فَلْيَفْعَلْ: عَنِ الْغُلَامِ شَاتَانِ مُكَافِأَتَانِ وَعَنِ الْجَارِيَةِ شَاةٌ
“যার কোনও সন্তান জন্ম নেয় এবং সে তার পক্ষ থেকে পশু জবেহ (আকিকা) করতে চায়, সে যেন তা করে: ছেলের জন্য সমমানের দুটি ছাগল এবং মেয়ের জন্য একটি ছাগল।” [মুসনাদে আহমদ ও অন্যান্য, আরনাউত এটিকে সহিহ বলেছেন]
তবে নবজাতক ছেলে হোক বা মেয়ে—একটির মাধ্যমেও আকিকা আদায় হয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লামা খলিল মালিকী (রহ.) তার ‘মুখতাসার’ গ্রন্থে বলেন: “সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে দিনের বেলা কোরবানির পশুর যোগ্য একটি পশু জবেহ করা মুস্তাহাব।”
এর কারণ হল ━
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত:
أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَقَّ عَنِ الْحَسَنِ وَالْحُسَيْنِ كَبْشًا كَبْشًا
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাসান ও হুসাইন (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর পক্ষ থেকে একটি করে দুম্বা আকিকা করেছেন।” [আবু দাউদ, আলবানি এটিকে সহিহ বলেছেন]
মোটকথা, ছেলের আকিকায় দুটি ছাগল দেওয়া সুন্নাহ ও উত্তম।‌ তবে একটি দিলেও আকিকা হয়ে যাবে। [উৎস: ইসলাম ওয়েব]
▪️ চার সন্তানের পক্ষ থেকে কি একটি ছাগল আকিকা হিসেবে যথেষ্ট?
প্রশ্ন: যদি কোনও ব্যক্তির চার জন সন্তান থাকে তবে কি সে সবার পক্ষ থেকে একটি ছাগল দিয়ে আকিকা করতে পারবে? নাকি তাকে সংখ্যা পূর্ণ করতে হবে? (অর্থাৎ প্রত্যেক সন্তানের জন্য আলাদা আলাদা আকিকা দিতে হবে?)
উত্তর: সুন্নত হল, প্রত্যেক (ছেলে) সন্তানের পক্ষ থেকে দুটি করে ছাগল আকিকা দেওয়া। কিন্তু যদি পিতা অপারগ হন এবং একটি করে ছাগল দিয়ে আকিকা করেন তবে বাকি সওয়াব ইনশাআল্লাহ তিনি পেয়ে যাবেন। সামর্থ্য থাকলে একটি করে দেবেন। এরপর দ্বিতীয়টি দেওয়ার সামর্থ্য হলে তাও দেবেন। আর যদি একদমই সামর্থ্য না থাকে তবে তা আবশ্যক নয়।
কারণ━আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো (অর্থাৎ সাধ্যমতো আমল করো)।” [সূরা তাগাবুন: ১৬]
উত্তর প্রদানে: শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বাজ রাহ. (সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি)।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

যারা কুরআনের যুদ্ধকালীন নির্দেশনাকে স্বাভাবিক অবস্থার উপর প্রয়োগ করে তাদের জবাব

যারা প্রসঙ্গ উল্লেখ এবং পূর্বাপর আলোচনা ছাড়া উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে কুরআনের আয়াত উল্লেখ করে তারা হচ্ছে মারাত্মক পর্যায়ের প্রতারক। যুদ্ধের সময়কার নির্দেশনা অন্য সময় প্রয়োগ করা অপরাধ। শান্তিকালীন সময় যুদ্ধের নির্দেশনা প্রয়োগ করা অপরাধ। কেউ যদি এ আয়াতের প্রসঙ্গ পড়ে তাহলে তার কাছে স্পষ্ট হবে যে উপরোক্ত আয়াত মূলত যুদ্ধের সময়কার। এবার শান্তি চলাকালীন স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষ হত্যার ব্যাপারে কুরআন কি বলে দেখেন: পবিত্র কুরআনে নিরপরাধ মানুষ হত্যা করাকে অত্যন্ত গুরুতর পাপ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং মানবজীবনের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সম্পর্কিত কয়েকটি আয়াত নিচে উল্লেখ করা হলো:
১. একজনের হত্যা মানেই সমগ্র মানবজাতির হত্যা:

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন:
مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاس جَمِيعًا

“যে ব্যক্তি প্রাণের বদলে প্রাণ কিংবা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টির কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করল, সে যেন সকল মানুষকে হত্যা করল। আর যে কারো প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।” [সূরা মায়িদাহ: ৩২]
২. মুমিন ব্যক্তিকে হত্যার পরিণাম:

ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করার ভয়াবহ শাস্তি সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا

“আর যে ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করবে, তার শাস্তি হলো জাহান্নাম; সেখানে সে স্থায়ী হবে। আর আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে লানত করেছেন এবং তার জন্য মহাশাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।” [সূরা নিসা: ৯৩]
৩. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা নিষিদ্ধ:

আল্লাহ তাআলা জীবনকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন এবং তা হরণ করতে নিষেধ করেছেন:
وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ

“আল্লাহ যার জীবনকে হারাম (পবিত্র) করেছেন তাকে তোমরা সংগত কারণ ছাড়া হত্যা করো না।” [সূরা আনআম: ১৫১]
৪. মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন:

وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ
“এবং তারা আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ (উপাস্য) কে ডাকে না এবং আল্লাহ যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন শরিয়তসম্মত কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না।” [সূরা ফুরকান: ৬৮]

এছাড়াও কুরআনে ক্ষমা, দয়া, ন্যায়পরানতা, সদাচরণ, মানুষের অধিকার প্রসঙ্গে অসংখ্য আয়াত রয়েছে।
অতএব কুরআন অবশ্যই মানুষকে সত্যের পথ দেখায় যদি মানুষ সত্য জানার উদ্দেশ্যে কুরআন পাঠ করে।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব। 

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবমাননাকারী অপরাধীর তওবা এবং দণ্ডবিধি সংক্রান্ত আলোচনা

 রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অবমাননা: অপরাধীর তওবা এবং দণ্ডবিধি সংক্রান্ত আলোচনা।

নিম্নে কয়েকটি পয়েন্টে এ বিষয়ে আলোচনা উপাস্থাপন করা হলো:
✪ ক. যদি কোনো কাফের ইসলাম গ্রহণ করে এবং কুফরি অবস্থায় সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দিয়ে থাকে তবে তার ইসলাম গ্রহণ পূর্বের সমস্ত গুনাহ মিটিয়ে দেবে এবং তার ওপর থেকে মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি বাতিল হয়ে যাবে।
✪ খ. কিন্তু এই গালি প্রদানকারী যদি মুসলিম হয়ে থাকে এবং গালি দেওয়ার কারণে মুরতাদ হয়ে যায়। অতঃপর তওবা করে ইসলামে ফিরে আসে তবে তার মৃত্যুদণ্ড বাতিল হওয়া নিয়ে আলেমদের মাঝে মতভেদ রয়েছে:
– শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.-সহ একদল গবেষক আলেম যে মতটি বেছে নিয়েছেন তা হলো, তার মৃত্যুদণ্ড বাতিল হবে না।
❑ শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রহ. বলেছেন:
” إذا سب الرسول فإنه يكفر، سواء كان جاداً أو مازحاً أو مستهزئاً، فإنه يكفر لقول الله تعالى: ( قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ * لا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ) [التوبة:65-66] ولكن إذا تاب تقبل توبته؛ لقوله تبارك وتعالى: (قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعاً إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ) [الزمر:53].
ولكن هل يسقط عنه القتل؟ الجواب على هذا: فيه تفصيل: إن كان الذي سب الرسول صلى الله عليه وسلم سبه وهو كافر لم يسلم بعد فإنه لا يقتل؛ لعموم قوله تعالى: (قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا يُغْفَرْ لَهُمْ مَا قَدْ سَلَفَ) . [الأنفال:38]. أما إذا كان الذي سب الرسول مسلماً وارتد بسبب سبه الرسول صلى الله عليه وسلم
فإن القول الراجح الذي اختاره شيخ الإسلام ابن تيمية أنه يقتل مع قبول توبته ؛ أخذاً بالثأر للرسول صلى الله عليه وسلم. فإن قال قائل: إنه قد وجد أناس سبوا الرسول صلى الله عليه وسلم وقبل توبتهم ولم يقتلهم. قلنا: نعم. هذا صحيح، لكن الحق في القتل لمن ؟ للرسول صلى الله عليه وسلم ، وإذا عفا عنهم في حياته فالحق له ، إن شاء قتلهم وإن شاء لم يقتلهم ، لكن بعد موته لا نستطيع معرفة إن كان الرسول سيعفو عنهم أم لا، فإذا كانوا مستحقين للقتل بسبهم الرسول صلى الله عليه وسلم وهو حق آدمي ، ولم نعلم أنه عفا عنهم ، فإن الواجب قتلهم . ثم إن في قتلهم مصلحة وهو كف ألسنة غيرهم عن سب الرسول صلى الله عليه وسلم ، أما هم فقد قبل الله توبتهم إذا كانت توبتهم نصوحاً، وأمرهم إلى الله ، وإذا لم يقتلوا اليوم ماتوا غداً، وهذا هو القول الراجح في هذه المسألة
ويرى بعض العلماء أنه إذا تاب فلا تقبل توبته ويقتل كافراً، وهو المشهور في مذهب الإمام أحمد ، قال في زاد المستقنع : “ولا تقبل توبة من سب الله أو رسوله” ، ولكن هذا القول ضعيف؛ لأن الصواب: أن التوبة مقبولة متى صدرت على الوجه الصحيح ، لكن إن كان سب الله فإنه لا يقتل ، وإن كان قد سب الرسول فإنه يقتل، ولعلكم تتعجبون فتقولون: أيهما أعظم: سب الله ، أم ؟!سب الرسول صلى الله عليه وسلم
الجواب: سب الله أعظم بلا إشكال ، إذاً.. فلماذا إذا تاب من سب الله قبلنا توبته ولم نقتله ، وإذا تاب من سب الرسول قبلنا توبته وقتلناه ؟ لأن من سب الله وتاب تاب الله عليه، وقد أخبر الله تعالى عن نفسه أنه يسقط حقه فقال: (قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعاً إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ) [الزمر
:53] فنحن نعلم أن الله تعالى قد عفا عنه بتوبته من سب الله ، أما من سب الرسول فلا نعلم أن الرسول عفا عنه ، وحينئذٍ يتعين قتله . هذا وجه الفرق بينهما. وذهب بعض العلماء: إلى أن من سب الله أو رسوله ثم تاب قبلت توبته ولم يقتل، فصارت الأقوال في المسألة ثلاثة، أرجحها أن توبته تقبل ويقتل” انتهى من ” لقاءات الباب المفتوح ” (53/6) .
“যদি কেউ রসুলকে গালি দেয় তবে সে কাফের হয়ে যাবে—চাই সে তা গুরুত্বের সাথে করুন, ঠাট্টাচ্ছলে করুক কিংবা উপহাস করে করুক। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ * لا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ
“বলো, তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রসুলকে নিয়ে বিদ্রূপ করছিলে? তোমরা ওজর পেশ করো না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।” [সূরা তাওবা: ৬৫-৬৬]
তবে সে যদি তওবা করে তবে তার তওবা কবুল হবে। কারণ মহান আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعاً إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“বলো, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা যুমার: ৫৩]
➧ কিন্তু━তার ওপর থেকে কি মৃত্যুদণ্ড বাতিল হবে?
এর উত্তরে ব্যাখ্যা রয়েছে। তা হলো,
❖ যদি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি প্রদানকারী ব্যক্তি কাফের থাকা অবস্থায় গালি দেয় এবং তখনও ইসলাম গ্রহণ না করে থাকে তবে তাকে হত্যা করা হবে না। কারণ আল্লাহর সাধারণ ঘোষণা হলো:
قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ يَنْتَهُوا يُغْفَرْ لَهُمْ مَا قَدْ سَلَفَ
“যারা কুফরি করেছে তাদের বলো, যদি তারা বিরত হয় তবে অতীতে যা হয়েছে তা ক্ষমা করা হবে।” [সূরা আনফাল: ৩৮]
❖ পক্ষান্তরে যদি গালি প্রদানকারী ব্যক্তি মুসলিম হয়ে থাকে এবং এই গালির কারণে মুরতাদ হয়ে যায় তবে বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী—যা শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ পছন্দ করেছেন—রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে প্রতিশোধ স্বরূপ তার তওবা কবুল হওয়া সত্ত্বেও তাকে হত্যা করা হবে।
কেউ প্রশ্ন করতে পারে: অনেক মানুষ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দিয়েছিল এবং তিনি তাদের তওবা কবুল করেছিলেন ও তাদের হত্যা করেননি। (তাহলে তওবা করার পরও এখন কেন তাকে হত্যা করা হবে?)
আমরা বলব: হ্যাঁ, এটি সঠিক। কিন্তু হত্যার অধিকারটি কার? এটি ছিল রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর। তিনি জীবিত থাকা অবস্থায় যখন কাউকে ক্ষমা করে দিয়েছেন সেটি তাঁর অধিকার ছিল। তিনি চাইলে তাদের হত্যা করতেন বা না করতেন। কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের পর আমরা জানার কোনো উপায় রাখি না যে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ক্ষমা করতেন কি না।
সুতরাং রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দেওয়ার কারণে যখন তারা হত্যার যোগ্য হলো এবং এটি যেহেতু একজন মানুষের (রসুলের) অধিকার আর আমরা যেহেতু জানি না যে, তিনি তাকে ক্ষমা করেছেন কি না। তাই তাদের হত্যা করা ওয়াজিব।
তাছাড়া তাদের হত্যা করার মাঝে একটি বড় সামাজিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তা হলো, অন্যদের জিহ্বাকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে গালি দেওয়া থেকে সংযত রাখা।
তাদের তওবা যদি একনিষ্ঠ হয় তবে আল্লাহ তা কবুল করবেন এবং তাদের পরকালীন বিষয়টি আল্লাহর ওপর ন্যস্ত। আজ তারা নিহত না হলেও কাল তো মারা যাবেই। এই বিষয়ে এটিই অগ্রগণ্য মত।
কিছু আলেম মনে করেন, তওবা করলে তা (দুনিয়াতে) কবুল হবে না এবং তাকে কাফের হিসেবেই হত্যা করা হবে। এটি ইমাম আহমদ রহ.-এর মাজহাবে প্রসিদ্ধ।
‘যাদুল মুস্তাকনি’ কিতাবে বলা হয়েছে: ‘আল্লাহ বা তাঁর রসুলকে গালি প্রদানকারীর তওবা কবুল করা হবে না।’ কিন্তু এই মতটি দুর্বল। সঠিক হলো, তওবা সঠিক উপায়ে সম্পন্ন হলে তা গ্রহণযোগ্য। তবে কেউ যদি আল্লাহকে গালি দেয় (এবং তওবা করে) তবে তাকে হত্যা করা হবে না, কিন্তু রসুলকে গালি দিলে হত্যা করা হবে।
আপনারা হয়তো অবাক হয়ে বলবেন: আল্লাহর শান বেশি বড় নাকি রসুলের?
অবশ্যই আল্লাহর শান বেশি বড় এতে কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে কেন কেউ আল্লাহকে গালি দিয়ে তওবা করলে আমরা তাকে হত্যা করি না। কিন্তু রসুলকে গালি দিয়ে তওবা করলে হত্যা করি?
কারণ━কেউ আল্লাহকে গালি দিলে এবং তওবা করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। আল্লাহ তাঁর নিজের পক্ষ থেকে তাঁর অধিকার হরণের বিষয়টি ক্ষমা করে দেওয়ার কথা জানিয়ে দিয়েছেন:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعاً إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
“বলো, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা যুমার: ৫৩]
সুতরাং আমরা জানি যে আল্লাহ তওবার মাধ্যমে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। কিন্তু রসুলকে গালিকারীকে তিনি (রসুল) ক্ষমা করেছেন কি না তা আমরা জানি না। তাই এমতাবস্থায় তাকে হত্যা করাই নির্ধারিত। এটিই উভয়ের মধ্যকার পার্থক্যের কারণ। অন্য কিছু আলেম মনে করেন, আল্লাহ বা রসুলকে গালি দেওয়ার পর কেউ তওবা করলে তা কবুল হবে এবং তাকে হত্যাও করা হবে না। ফলে এই মাসআলায় মোট তিনটি মত পাওয়া গেল, যার মধ্যে সবচেয়ে অগ্রগণ্য হলো: তার তওবা কবুল হবে কিন্তু তাকে হত্যা করা হবে।” [লিক্বাউল বাবিল মাফতুহ ৫৩/৬]
❑ এই দণ্ড কার্যকর করার দায়িত্ব কার?
✪ জেনে রাখা উচিত যে, এই মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিষয়টি একটি ‘হদ’ (নির্ধারিত দণ্ড) এবং হদ কায়েম করার দায়িত্ব কেবল রাষ্ট্রের শাসকের। অর্থাৎ বিষয়টি বিচারালয়ে তোলা হলে মুসলিম শাসক তার ওপর এই দণ্ড কার্যকর করবেন।
✪ আর গালি প্রদানকারী ব্যক্তির বিষয়টি যদি আল্লাহ গোপন রাখেন এবং আদালতের কাছে প্রকাশ না পায় তবে তার কর্তব্য হলো, নিজের বিষয়টি গোপন রাখা এবং একনিষ্ঠভাবে তওবা ও ইস্তেগফার করা। সেই সাথে অধিক হারে সৎ কাজ করা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রশংসা ও সম্মান করা এবং তাঁর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা; যাতে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন এবং কিয়ামতের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার ওপর সন্তুষ্ট করে দেন।
আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
وَإِنِّي لَغَفَّارٌ لِمَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا ثُمَّ اهْتَدَى
“আর নিশ্চয় আমি তার প্রতি পরম ক্ষমাশীল যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎ কাজ করে এবং সৎপথে অবিচলিত থাকে।” [সূরা ত্বহা: ৮২]
তিনি আরও বলেছেন:
ثُمَّ إِنَّ رَبَّكَ لِلَّذِينَ عَمِلُوا السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ تَابُوا مِنْ بَعْدِ ذَلِكَ وَأَصْلَحُوا إِنَّ رَبَّكَ مِنْ بَعْدِهَا لَغَفُورٌ رَحِيمٌ
“অতঃপর যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে এবং পরে তওবা করে ও নিজেদের সংশোধন করে নেয়, তোমার রব তাদের প্রতি এসবের পর অবশ্যই পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আন-নাহল: ১১৯]
হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
لَا يَسْتُرُ اللَّهُ عَلَى عَبْدٍ فِي الدُّنْيَا إِلَّا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
“আল্লাহ দুনিয়াতে কোনো বান্দার দোষ গোপন রাখলে কিয়ামতের দিনও আল্লাহ তার দোষ গোপন রাখবেন।” [সহীহ মুসলিম: ২৫৯০]
আল্লাহই ভালো জানেন। [islamqa থেকে সংক্ষেপিত]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

নাস্তিকতা কেন মানবজাতির জন্য একটি ভ্রান্ত ও ব্যর্থ মতাদর্শ

 ◈ নাস্তিক হলে নীতি-নৈতিকতা ও ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু থাকা সম্ভব নয়। কারণ কোনটা নৈতিক আর কোনটা অনৈতিক, কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায় এই মানদণ্ড কে নির্ধারণ করবে? যেটা আপনার কাছে নৈতিক সেটা আরেকজনের কাছে নাও হতে পারে।

যেমন: একজনের সম্পদ জোর করে কেড়ে নেওয়া।
নাস্তিক্যবাদের দৃষ্টিতে কেউ একে ‘বিবর্তনীয় টিকে থাকার লড়াই’ (Evolutionary Struggle for Survival) বলে বৈধতা দিতে পারে-যেভাবে পশু-পাখিরা একজনের খাবার আরেকজন কেড়ে খায়। কারণ তাদের নীতি-নৈতিকতা ও ন্যায়-অন্যায় বলে কিছু নাই। অথচ আরেকজনের কাছে, অন্য মানুষের সম্পদ কেড়ে নেওয়া অন্যায় ও অনৈতিক।
◈ নাস্তিক হলে যুক্তির উপর নির্ভরশীল থাকার সুযোগ নাই। কারণ একজনের কাছে যেটা যৌক্তিক অন্য জনের কাছে সেটাই অযৌক্তিক। যেহেতু মানুষের বুদ্ধি ও যুক্তি তার পারিপার্শ্বিকতা, আবেগ এবং সীমিত জ্ঞানের ওপর নির্ভরশীল। তাই একজনের কাছে যা যুক্তিযুক্ত, অন্যজনের কাছে তা পাগলামি মনে হতে পারে।
যেমন: সুদ। একজন নাস্তিক পুঁজিবাদীর যুক্তিতে সুদ হল, অর্থ উপার্জনের সেরা মাধ্যম। কিন্তু অন্য জনের যুক্তিতে এটি ‘শোষণের হাতিয়ার।’
◈ নাস্তিক হলে বিজ্ঞানের উপর নির্ভর করে থাকার সুযোগ নাই। কারণ বিজ্ঞান পরিবর্তনশীল। সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে বৈজ্ঞানিক অনেক তথ্যই পরিবর্তিত হচ্ছে। এক বিজ্ঞানী এক কথা বলেন। কিন্তু অন্য বিজ্ঞানী তার বিপরীত বলেন। যেমন: সূর্য ও পৃথিবী ঘোরা সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক মতবাদ, বিবর্তন সংক্রান্ত মতবাদ ইত্যাদি।
◈ এছাড়া বিজ্ঞানে মানব জীবনের প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া লক্ষ লক্ষ সমস্যার কোন সমাধান নেই। যেমন: বিজ্ঞান ক্যান্সার নিরাময় বা রকেট ইঞ্জিনের ফর্মুলা দিতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞান আমাদের বলতে পারে না, কেন পিতামাতার সেবা করা উচিত, কেন বড়দেরকে শ্রদ্ধা ও ছোটদের স্নেহ করা উচিত। পারিবারিক কলহ, একাকীত্ব বা আত্মিক প্রশান্তির সমাধান ল্যাবরেটরিতে পাওয়া সম্ভব নয়;
সুতরাং বিজ্ঞান কখনো ‘জীবন বিধান’ হতে পারে না।
➧ তাহলে সমাধান কী?
এসব কিছুর একমাত্র ও চূড়ান্ত সমাধান, এই বিশ্বচরাচরের একচ্ছত্র স্রষ্টা মহান আল্লাহর উপর বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর নির্দেশিত পন্থা বা তাঁর দেওয়া জীবন বিধান অনুযায়ী জীবনের সব কিছু পরিচালনা করা। কারণ তিনি যেহেতু সব কিছু সৃষ্টি করেছেন সেহেতু তাঁর সৃষ্টির জন্য কোনটা কল্যাণকর আর কোনটা ক্ষতিকর, কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়, কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল ইত্যাদি তিনিই সবচেয়ে বেশি জানেন। সুতরাং সন্দেহাতীতভাবে তাঁর দেওয়া জীবন বিধানই মানব জাতির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত এবং কল্যাণকর। আল হামদুলিল্লাহ-সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

অন্যায়-পাপ কর্মে আল্লাহর নামে কসম খেলে কসম ভঙ্গ করে কাফফারা দেয়া আবশ্যক

 প্রশ্ন: কাজের মেয়েরা সারাক্ষণ স্টার জলসা ইত্যাদি চ্যানেলগুলো দেখতেই থাকে। কেউ যদি প্রচণ্ড রাগের মাথায় বলে ফেলে, ‘আল্লাহর কসম, আবার যদি রিমোট ধরিস, তোর হাত কেটে ফেলব।’ এখন এই মেয়েরা এসব চ্যানেল দেখবেই-দেখছেই। ওরা এসব দেখা বাদ দেবে না। এই কসমের জন্য কি গুনাহ হবে?

উত্তর: এটি নি:সন্দেহে হারাম বিষয়ের উপর কসম করা হয়েছে। কারণ ইসলামে কারো অঙ্গহানী বা ক্ষয়-ক্ষতি করা অথবা কোন অন্যায়-পাপাচার কাজের জন্য কসম করা হারাম। কেউ এমন কসম করলে তা পুরণ করা বৈধ নয়। এ ক্ষেত্রে কসম ভঙ্গ করা জরুরি। তবে কসমের কাফফারা আদায় করতে হবে। কেননা হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لأَنْ يَلَجَّ أَحَدُكُمْ فِي يَمِينِهِ فِي أَهْلِهِ آثَمُ لَهُ عِنْدَ اللهِ تَعَالَى مِنْ أَنْ يُعْطِي كَفَّارَتَهُ الَّتي فَرَضَ اللهُ عَلَيْهِ
‘‘যে ব্যক্তি আপন পরিবার পরিজনের ব্যাপারে কসম খায় ও [তার চেয়ে উত্তম অন্য কিছুতে জেনেও] তার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, সে ব্যক্তির জন্য আল্লাহর নিকট এই কর্মটি বেশি গোনাহর কারণ হবে এই কর্ম থেকে যে, সে [কসম ভেঙ্গে] সেই কাফফারা আদায় করবে, যা আল্লাহ তার উপর ফরয করেছেন।’’ (বুখারী ও মুসলিম)
◼ কসম ভঙ্গের কাফফারা:
কেউ যদি আল্লাহর নামে কোন কিছু করার কসম করে কিন্তু পরে কসম ভঙ্গ করে তাহলে ইসলাম এ সুযোগ দিয়েছে যে, সে কসম ভঙ্গের কাফফারা আদায় করবে। আর তা হল:
🔹 দশজন মিসকিনকে মধ্যম ধরণের খাবার খাবার খাওয়ানো,
🔹 অথবা ১০ জন মিসকিনকে পোশাক দেয়া
🔹 অথবা একজন গোলাম আযাদ করা।
🔸 এ তিনটি কোনটি সম্ভব না হলে তিনটি রোযা রাখা।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَا يُؤَاخِذُكُمُ اللَّـهُ بِاللَّغْوِ فِي أَيْمَانِكُمْ وَلَـٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الْأَيْمَانَ ۖ فَكَفَّارَتُهُ إِطْعَامُ عَشَرَةِ مَسَاكِينَ مِنْ أَوْسَطِ مَا تُطْعِمُونَ أَهْلِيكُمْ أَوْ كِسْوَتُهُمْ أَوْ تَحْرِيرُ رَقَبَةٍ ۖ فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ ثَلَاثَةِ أَيَّامٍ ۚ ذَٰلِكَ كَفَّارَةُ أَيْمَانِكُمْ إِذَا حَلَفْتُمْ ۚ وَاحْفَظُوا أَيْمَانَكُمْ ۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ اللَّـهُ لَكُمْ آيَاتِهِ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
“আল্লাহ তোমাদেরকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অনর্থক শপথের জন্যে; কিন্তু পাকড়াও করেন ঐ শপথের জন্যে যা তোমরা মজবুত করে বাধ। অতএব, এর কাফফরা এই যে, দশজন দরিদ্রকে খাদ্য প্রদান করবে; মধ্যম শ্রেনীর খাদ্য যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে দিয়ে থাক। অথবা, তাদেরকে বস্তু প্রদান করবে অথবা, একজন ক্রীতদাস কিংবা দাসী মুক্ত করে দিবে। যে ব্যক্তি সামর্থ্য রাখে না, সে তিন দিন রোযা রাখবে। এটা কাফফরা তোমাদের শপথের, যখন শপথ করবে। তোমরা স্বীয় শপথসমূহ রক্ষা কর এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য স্বীয় নির্দেশ বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।” সূরা মায়িদাহ: ৮৯)
🔻 কতিপয় লক্ষ্যণীয় বিষয়:
⚫ কোন ব্যক্তি যদি এমন রাগের অবস্থায় কসম খায় যে, সে সময় তার হিতাহিত জ্ঞান ঠিক ছিল না তাহলে তার জন্য কাফফারার দেয়ার বিধান প্রযোজ্য হবে না। কারণ এ ক্ষেত্রে সে পাগল বা মস্তিস্ক বিকৃত হিসেবে গণ্য হবে। আর পাগল বা মস্তিষ্ক বিকৃত ব্যক্তির কসম গ্রহণযোগ্য নয়।
⚫ ১০জন মিসকিন কে একবেলা তৃপ্ত সহকারে মধ্যম মানের খাবার খাওয়াতে হবে। তবে এর পরিবর্তে খাদ্যদ্রব্য দান করাও দেয়া জায়েয রয়েছে। খাদ্যদ্রব্য দানের পরিমান হল, জন প্রতি অর্ধ সা’ বা প্রায় সোয়া কেজি চাল (প্রধান খাবার)।
খাদ্য খাওয়ানো বা খাদ্যদ্রব্য দানের পরিবর্তে টাকা দেয়া বা অন্য কিছু ক্রয় করে দিলে কাফফারা আদায় হবে না। কারণ কুরআনে স্পষ্টভাবে খাদ্যের কথা বলা হয়েছে।
দশজন মিসকিনকে পোশাক দেয়া ক্ষেত্রে কথা হল, এমন পোশাক দিবে যে, তা পড়ে যেন সুন্দরভাবে সালাত আদায় করা যায়। যেমন একটি লুঙ্গি ও একটি জামা বা একটি লম্বা কুর্তা ইত্যাদি।
——————————
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী।
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate