February 22, 2026

উমরা নির্দেশিকা সহিহ সুন্নাহ পদ্ধতিতে প্রস্তুতি গ্রহন থেকে শেষ পর্যন্ত

 উমরা আদায় করা একটি অত্যন্ত আধ্যাত্মিক সফর, যার জন্য মানসিক ও শারীরিক দুই দিক থেকেই প্রস্তুতির প্রয়োজন। আমি একটি পূর্ণাঙ্গ উমরা নির্দেশিকা (গাইড) তৈরি করেছি, যেখানে আমি অন্তর্ভুক্ত করেছি ইহরাম অবস্থায় কী কী নিষিদ্ধ এবং কী কী নিষিদ্ধ নয়, উমরা ও যিয়ারত সম্পর্কিত বিদআত সমূহ, উমরা চেকলিস্ট (কি কি জিনিসপত্র সাথে করে নিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ) এবং মক্কা ও মদিনায় জিয়ারতের স্থানগুলোর বর্ণনা যা এই প্রবন্ধের শেষ অংশে পাবেন।

উমরার রুকন ও ওয়াজিব সমূহ

উমরার রুকন তিনটি:

১. ইহরাম (নিয়ত): এটি শুধুমাত্র ইহরামের কাপড় পরিধান করা নয়; বরং উমরা শুরু করার জন্য আন্তরিক নিয়ত করাও।

২.তাওয়াফ: ৭ বার কাবা প্রদক্ষিণ করা।

৩. সাঈ: সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝ দিয়ে ৭ চক্কর দেওয়া।

উমরার ওয়াজিব দুটি:

১. মিকাত থেকে ইহরামে প্রবেশ করা: মিকাত সীমা অতিক্রমের আগে বা সীমায় পৌঁছে নিয়ত করতে হবে। যদি কেউ মিকাত পেরিয়ে পরে নিয়ত করে, তবে তার উপর একটি দম (কুরবানি) ওয়াজিব হবে।

২. মাথার চুল মুন্ডন বা কাটা:

  • পুরুষদের জন্য: পুরো মাথা মুন্ডন করা বা সব চুল সমানভাবে ছোট করে কাটা। মুন্ডন করা ছোট করার চেয়ে উত্তম ও বেশী সওয়াবের।
  • নারীদের জন্য: নারীরা মাথা মুন্ডন করবে না; তারা চুল একসাথে গুছিয়ে আঙুলের ডগার পরিমাণ (প্রায় ১ ইঞ্চি) শেষ দিক থেকে কাটবে।

উমরার মিকাতসমূহ

মিকাত বলতে নির্দিষ্ট সে সব স্থানকে বা সীমানাকে বোঝায়, যেখানে পৌঁছানোর আগে হজ্ব বা উমরাকারীদের ইহরামে প্রবেশ করতে হয়। মক্কার চারপাশে পাঁচটি প্রধান মিকাত রয়েছে, বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত হজ্ব ও উমরাকারীদের জন্য এগুলো নির্ধারিত। ৫টির মধ্যে ৪টি মিকাত হাদিসে বর্ণিত, আর একটি নির্ধারণ করা হয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)–এর খিলাফতের সময়।

[৪টি মিকাতের হাদিস: সহিহ আল‑বুখারি: ১৫২৬]

১. যুল হুলাইফাহ (আবিয়ার আলী):

  • যুল হুলাইফাহ মসজিদ মক্কা থেকে প্রায় ৪৫০ কিমি দূরে এবং মদিনা থেকে প্রায় ৯ কিমি দূরত্বে অবস্থিত।
  • মদিনা থেকে আগত বা মদিনার মধ্য দিয়ে আসা হাজীদের জন্য এটি মিকাত।

২. আল‑জুহফা (রাবিগের নিকটে):

  • আল‑জুহফা মক্কার উত্তর‑পশ্চিম দিকে প্রায় ১৯০ কিমি দূরে অবস্থিত।
  • (শাম) অঞ্চল—সিরিয়া, মিশর, ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, মরক্কো, তুরস্ক, জর্ডান, লেবানন, সুদান, আলজেরিয়া ও বিভিন্ন আফ্রিকা অঞ্চলের হাজীদের জন্য মিকাত।

৩. কারনুল মানাজিল (আস‑সাইলুল কাবির):

  • কারনুল মানাজিল মক্কার পূর্বদিকে প্রায় ৮০ কিমি দূরে, তাইফের কাছে অবস্থিত।
  • (নাজদ) অঞ্চল—রিয়াদ, মধ্য সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও অনুরূপ অঞ্চলের হাজীদের জন্য মিকাত।

৪. ইয়ালামলাম:

  • ইয়ালামলাম মক্কার দক্ষিণ দিকে প্রায় ১০০ কিমি দূরে অবস্থিত।
  • ইয়েমেন, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণাঞ্চলীয় দেশগুলোর হাজীদের জন্য মিকাত।

৫. যাতু ইরক:

  • যাতু ইরক মক্কার উত্তর‑পূর্ব দিকে প্রায় ৯৪ কিমি দূরে অবস্থিত।
  • ইরাক, ইরান, চীন, রাশিয়া ও মধ্য এশিয়া থেকে আগত হাজীদের জন্য মিকাত।
  • যাতু ইরক মিকাতটি উমর (রা.)–এর খিলাফতের সময় নির্ধারিত হয় এবং এলাকার বৃহত্তম পর্বত ‘ইরক আসওয়াদ’-এর নামে নামকরণ করা হয়। যখন বসরা ও কুফা নগরী মুসলমানদের দখলে আসে, তখন ওই অঞ্চল থেকে আগত মানুষ কারনুল মানাজিল (রাসুল ﷺ যে মিকাত নাজদের লোকদের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন) পর্যন্ত পৌঁছতে কষ্টের কথা প্রকাশ করেন। তখন উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) প্রস্তাব দেন, কারনুল মানাজিলের সমান্তরাল ও তাদের স্বাভাবিক পথের বিপরীত পাশে একটি নতুন মিকাত নির্ধারণের। অতঃপর তিনি যাতু ইরককে নতুন মিকাত হিসেবে নির্ধারণ করেন।

উমরা শুরু করার পদ্ধতি

১. ইহরামের অবস্থায় প্রবেশ:

মিকাতে পৌঁছানোর আগে (যে সীমানায় ইহরাম বাধ্যতামূলক হয়ে যায়) কিছু শারীরিক পবিত্রতা অর্জন করা সুন্নাহ:

  • গোসল: সুন্নাহ পদ্ধতিতে গোসল করা।

  • পরিচ্ছন্নতা: নখ কাটা এবং অপ্রয়োজনীয় লোম পরিষ্কার করা।

  • সুগন্ধি (শুধু পুরুষদের জন্য): মাথা ও দাড়িতে সুগন্ধি লাগানো, তবে ইহরামের কাপড়ে লাগানো যাবে না।

  • পোশাক: পুরুষরা দুই টুকরা সাদা সেলাই বিহীন কাপড় (ইযার ও রিদা) পরবে; নারীরা তাদের স্বাভাবিক শালীন পোশাকই পরবে (হাত ও মুখ খোলা থাকবে)। নারীদের জন্য আলাদা কোনো বিশেষ পোশাক বাধ্যতামূলক নয়। পুরুষেরা মিকাতে পৌঁছার আগে ইহরামের কাপড় পরতে পারে, তবে তারা মিকাতে পৌঁছার আগে ইহরামের নিয়ত করবে না [এবং তালবিয়া পড়বে না]।

২. মিকাতে পৌঁছে নিয়ত করা:

মিকাতে পৌঁছার পর ইহরামে প্রবেশ করা ওয়াজিব। এই সময় ইহরামের কাপড় পরিধানের পাশাপাশি জোরে উচ্চারণ করে নিয়ত করতে হবে। শুধু মনে মনে উমরার নিয়ত করলেই যথেষ্ট নয়; ইহরামের অবস্থায় প্রবেশের জন্য শারীরিক (কাপড়) ও মৌখিক (উচ্চারণ) দুইটিই করতে হবে। সুতরাং, পুরুষ ও নারী উভয়ে মিকাতে পৌঁছে এই নিয়ত পাঠ করবে:

لَبَّيْكَ اللَّهمَّ بِعُمْرَةٍ

লাব্বাইকা আল্লা-হুম্মা বি’উমরাহ।

“হে আল্লাহ, আমি উমরাহ পালনের জন্য উপস্থিত।”

ঐচ্ছিক শর্ত: যদি আপনি আশঙ্কা করেন যে অসুস্থতা/ভ্রমণ ইত্যাদির কারণে উমরা শেষ করতে নাও পারেন, তাহলে বলবেন:

اللَّهُمَّ مَحِلِّي حَيْثُ حَبَسْتَنِي

আল্লাহুম্মা মাহিল্লি হাইসু হাবাস্তানি।

“হে আল্লাহ! আপনি যেখানে আমাকে থামিয়ে দেবেন, সেখানেই আমার ইহরাম ভাঙার স্থান।”

৩. মিকাত থেকে তালবিয়া পাঠ:

মিকাত থেকে কাবায় পৌঁছা পর্যন্ত পথ চলার পুরো সময় তালবিয়া বেশি বেশি পড়তে হবে।

  • পুরুষরা উচ্চ স্বরে তালবিয়া পড়বে।

  • নারীরা নিরবে পড়বে।

لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لاَ شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لاَ شَرِيكَ لَكَ

লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শরীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি‘মাতা, লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।

“হে আল্লাহ! আমি হাজির, আমি হাজির। আপনি ছাড়া কোনো অংশীদার নেই, আমি হাজির। নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা, সব অনুগ্রহ ও সার্বভৌমত্ব একমাত্র আপনারই। আপনার কোনো অংশীদার নেই।”

৪. মসজিদুল হারামে প্রবেশ:

মসজিদুল হারামে প্রবেশের সময় ডান পা আগে রেখে এ দোয়া পড়বেন:

بِسْمِ اللَّهِ، اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ، اَللَّهُمَّ افْتَحْ لِي أَبْوَابَ رَحْمَتِكَ

বিসমিল্লা-হি আল্লা-হুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ, আল্লা-হুম্মাফ্‌ তা’হ্ লী আবওয়া-বা রাহ্‌মাতিক।

“আল্লাহর নামে, হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি রহমত ও শান্তি প্রেরণ করুন। হে আল্লাহ! আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাসমূহ খুলে দিন।”

তারপর কাবার দিকে যাবেন, যেন কালো পাথর (হাজরে আসওয়াদ)–এর কোণা থেকে তাওয়াফ শুরু করতে পারেন। “আমি তাওয়াফের নিয়ত করলাম…” এ ধরনের বাক্য উচ্চারণ করবেন না। এভাবে উচ্চারণ করে তাওয়াফের নিয়ত করা রাসুল ﷺ থেকে বর্ণিত নয়। নিয়ত হৃদয়ের আমল। শুধু মাত্র মিকাতে ইহরামে প্রবেশ করার সময় ইহরামের নিয়ত মুখে উচ্চারণ করে পড়তে হয়। তাওয়াফের জন্য উযু করা অধিকতর সঠিক মত অনুযায়ী ওয়াজিব; তবে সাঈর জন্য উযু করা শর্ত নয়।

৫. তাওয়াফ (৭ চক্কার):

হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথরের) কাছে পৌঁছালে তালবিয়া পাঠ বন্ধ করবেন।

শুরু:

  • হাজরে আসওয়াদের সামনে এসে সম্ভব হলে হাত দিয়ে তা স্পর্শ করবেন এবং চুমু দেবেন।

  • যদি চুমু দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে শুধু হাতে দিয়ে স্পর্শ করে সেই হাতকেই চুমু দেবেন।

  • যদি হাত দিয়েও স্পর্শ করা সম্ভব না হয়, তবে হাত উঁচু করে হাজরে আসওয়াদের দিকে ইশারা করে বলবেন:

بِسْمِ اللَّهِ، اللَّهُ أَكْبَر

বিসমিল্লাহি, আল্লাহু আকবার।

“আল্লাহর নামে, আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।”

পুরুষদের জন্য:

  • ইত্তিবা: তাওয়াফের পুরো সময় ডান কাঁধ খোলা রাখবেন। উপরের কাপড় ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের উপর ফেলে রাখবেন।

  • প্রথম তিন চক্করে রমল: একটু দ্রুত হাঁটা/হালকা দৌড়ানো সুন্নাহ, বাকি চার চক্করে স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবেন।

নারীদের জন্য:

তাওয়াফে দৌড়ানো বা দ্রুত হাঁটার কোনো বিধান নেই; স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবেন।

সাধারণ দোয়া/যিকির:

প্রতিটি চক্করের জন্য নির্দিষ্ট কোন দোয়া নেই। আপনি কুরআন পড়তে পারেন, কুরআন-সুন্নাহ থেকে বিভিন্ন দোয়া ও জিকির করতে পারেন। এ সব দোয়া ও জিকির একত্রে সম্মিলিতভাবে না পড়ে, প্রত্যেকে নিজ নিজ ভাবে পড়বেন।

রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে:

প্রতিবার রুকনে ইয়ামানি অতিক্রমের সময় হাত দিয়ে স্পর্শ করবেন, তবে চুমু দেবেন না। যদি স্পর্শ করা না যায়, তাহলে দূর থেকে ইশারা করবেন না। বাকি দুই কোণা স্পর্শ বা ইশারা করা সুন্নাহ নয়। রুকনে ইয়ামানি ও হাজরে আসওয়াদের মাঝখানে এই দোয়া পড়বেন:

رَبَّنَا اٰتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الْاٰخِرَةِ حَسَنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ

 রব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাওঁ ওয়াফিল আ-খিরাতি হাসানাতাওঁ ওয়াক্বিনা ‘আযা-বান্না-র।

“হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দিন, আর আমাদেরকে জাহান্নামের আজাব থেকে রক্ষা করুন।”

প্রতিবার হাজরে আসওয়াদে পৌঁছালে:

হাজরে আসওয়াদের সামনে এসে তা স্পর্শ বা ইশারা করে বলবেন:

اللهُ أَكْبَر

আল্লাহু আকবার।

“আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ।”

৬. তাওয়াফ শেষে মাকামে ইবরাহিমের নিকটে যাওয়া:

সাত চক্কর শেষ হলে পুরুষরা ডান কাঁধ ঢেকে নেবেন। এরপর মাকামে ইবরাহিমের দিকে অগ্রসর হবেন। এটি একটি ছোট কাচ ও পিতলের গম্বুজ/ঘেরা স্থাপনা, যা হাজরে আসওয়াদের কাছে অবস্থিত। মাকামে ইবরাহিমকে সামনে রেখে এই দোয়া পাঠ করবেন:

وَاتَّخِذُوْا مِنْ مَّقَامِ إِبْرَاهِيْمَ مُصَلًّى

ওয়াত্তাখিযূ মিন-মাক্বামি ইবরাহীমা মুসাল্লা।

“এবং মাক্বামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থান হিসেবে গ্রহণ করুন।”

  • দুই রাকাত সালাত আদায়: সম্ভব হলে মাকামে ইবরাহিমের পেছনে (বা ভিড় হলে মসজিদের যেকোনো স্থানে) দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করবেন। প্রথম রাকাতে সূরা আল‑কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা আল‑ইখলাস পড়া উত্তম।
  • জমজম পানি পান: দুই রাকাত সালাত শেষ করে জমজম পানির স্থানে গিয়ে পানি পান করবেন এবং কিছু পানি মাথায় ঢালবেন। জমজম পান করার সময় আপনি নিজের যেকোনো দোয়া করতে পারেন।
  • আবার হাজরে আসওয়াদের নিকটে ফিরে আসা: এরপর সম্ভব হলে আবার হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করবেন। যদি তা সম্ভব না হয়, দূর থেকে ইশারা করার প্রয়োজন নেই; সেক্ষেত্রে সরাসরি সাফা পাহাড়ের দিকে রওনা হবেন।

৭. সাঈ (সাফা ও মারওয়ার মাঝের ৭ চক্কর):

  • সাফার দিকে আগমন: সাফা পাহাড়ের নিকটে পৌঁছালে এ আয়াতসহ দোয়া পড়বেন:

إِنَّ الصَّفَا وَالْمَرْوَةَ مِنْ شَعَائِرِ اللَّهِ. أَبْدَأُ بِمَا بَدَأَ اللهُ بِهِ

ইন্নাস্‌সাফা ওয়াল-মারওয়াতা মিন শা‘আ-ইরিল্লা-হ। আবদাউ বিমা বাদা-আল্লাহু বিহি।

“নিশ্চয়ই সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্তর্ভুক্ত। আমি সেই দিক থেকেই শুরু করছি, যেখান থেকে আল্লাহ শুরু করেছেন।”

এই দোআ কেবল সাফার পাদদেশে প্রথমবারই পড়বেন, পরে আর পুনরাবৃত্তি করবেন না।

  • সাফা পাহাড়ের উপরে: যতটা সম্ভব কাবা দেখা যায়, ততটুকু উঁচুতে উঠে কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে হাত উঠিয়ে এই দোয়া পড়বেন:

اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُ أَكْبَرُ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، يُحْيِي وَيُمِيتُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ، لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَه أَنْجَزَ وَعْدَهُ وَ نَصَرَ عَبْدَهُ، وَهَزَمَ الْأَحْزَابَ وَحْدَهُ

আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু, ইউহয়ী ওয়া ইউমীতু, ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাই-ইন ক্বাদীর। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, আনজাযা ওয়া’দাহু ওয়া নাসারা আবদাহু, ওয়া হাযামাল আহযাবা ওয়াহদাহু।

“আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ সবচেয়ে মহান, আল্লাহ সবচেয়ে মহান। আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই; রাজত্ব তাঁর, সমস্ত প্রশংসাও তাঁর; আর তিনি সকল কিছুর উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান। আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই, তিনি তাঁর ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন, এবং তিনি সকল বিরোধী দলগোষ্ঠীকে একাই পরাজিত করেছেন।”

এই দোয়া তিনবার পাঠ করবেন এবং প্রতিবার পাঠের পরে কল্যাণের জন্য প্রচুর দুআ করবেন (কিন্তু তৃতীয়বারের পর আর দোয়া করবেন না)। 

  • সাফা থেকে মারওয়ার দিকে যাত্রা: সাফা থেকে নেমে মারওয়ার দিকে হাঁটতে থাকুন। মাঝপথে সবুজ বাতির অংশে পৌঁছলে পুরুষরা সবুজ বাতির মাঝের অংশে যতটা সম্ভব দ্রুত দৌড়াবেন, তবে কারো ক্ষতি না করে। নারীরা দৌড়াবেন না, স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবেন।
  • মারওয়া পাহাড়ে: মারওয়ার দিকে গিয়ে কিছুটা উঁচুতে উঠে কাবার দিকে মুখ করে ঠিক সাফার মতোই তিনবার তাকবির ও দোয়া পড়বেন এবং মাঝখানে দোয়া করবেন। এরপর মারওয়া থেকে সাফার দিকে ফিরে যাবেন, সবুজ বাতির মাঝে পুরুষেরা আবার যতটা সম্ভব দ্রুত দৌড়াবেন এবং নারীরা স্বাভাবিক গতিতে হাঁটবেন।
  • ৭ চক্করের হিসাব: সাফা থেকে মারওয়া = ১ম চক্কর। মারওয়া থেকে সাফা = ২য় চক্কর। আবার সাফা থেকে মারওয়া = ৩য়, এভাবে চলতে থাকবে। ৭ম চক্কর মারওয়ায় শেষ হবে। ৭ম চক্কর শেষে মারওয়ায় পৌঁছে আর আগের মতো দোয়া/তাকবির পুনরায় পড়া জরুরি নয়। সেখানে পৌঁছানোর মধ্য দিয়েই সাঈ সম্পন্ন হয়।

সাফা-মারওয়ার মাঝের পথে হাঁটার সময় আপনি কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া ও যিকির যা ইচ্ছা করতে পারেন। আপনার সাথে ছোট দোয়া/যিকিরের বুকলেট, বই বা কাগজ রাখতে পারেন, তাওয়াফ ও সাঈ করার সময় সেগুলো থেকে পড়া জায়েজ।

৮. চুল মুন্ডন করে বা কেটে উমরা সম্পূর্ণ করা:

  • পুরুষদের জন্য: সাঈ শেষ করে মারওয়ায় পৌঁছার পর পুরুষরা মাথার সব চুল সম্পূর্ণভাবে মুন্ডন করবে বা  সমানভাবে ছোট করে কাটবে। মুন্ডন (হালক্ব) করা উত্তম, যদিও ছোট করে কাটা (তাক্বসির)ও বৈধ।
  • নারীদের জন্য: নারীরা সব চুল একত্র করে গুছিয়ে ধরে শেষ দিক থেকে আঙুলের ডগার পরিমাণ (প্রায় ১ ইঞ্চি) কাটবে।

এটি সম্পন্ন হলে আপনার উমরা শেষ হয়ে যাবে এবং আপনি আর ইহরামের অবস্থায় থাকবেন না। ইহরামে প্রবেশের সময় যা যা নিষিদ্ধ হয়েছিল, সব আবার জায়েজ হয়ে যাবে।

কিছু টিপস:

  • পুরুষ: তাওয়াফের ৭ চক্করের সময়েই শুধু ডান কাঁধ খোলা থাকবে।

  • পুরুষ: তাওয়াফের প্রথম ৩ চক্করে শুধু (রমল করা) দ্রুত হাঁটা/হালকা দৌড়ানো সুন্নত।

  • নারীরা: তাওয়াফ এবং সাঈ দুই ক্ষেত্রেই দৌড়ানো/দ্রুত হাঁটবেন না।


ইহরামে প্রবেশের পর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ

ইহরামের নিয়ত করার পর কিছু নির্দিষ্ট কাজ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। এগুলো ইচ্ছাকৃত করলে সাধারণত ফিদিয়া (শাস্তিস্বরূপ কাফফারা) লাগতে পারে।

১. সাধারণ নিষেধাজ্ঞা (পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্য):

  • চুল বা নখ কাটা: শরীরের কোনও অংশ থেকে চুল ছাঁটাই, শেভ করা বা উপড়ে ফেলা যাবে না। নখ কাটা যাবে না।

  • সুগন্ধি ব্যবহার: শরীর বা ইহরামের কাপড়ে কোনো সুগন্ধি লাগানো যাবে না। (নিয়তের আগে লেগে থাকা সুগন্ধির গন্ধ ইহরাম অবস্থায় টিকে থাকলে সমস্যা নেই।) ইহরাম অবস্থায় কাবার সুগন্ধি স্পর্শ করা ইহরামের বিধান লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। কারণ কাবার গিলাফ (কিসওয়া)-তে প্রচুর পরিমাণে সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহার করা হয়। ইহরাম অবস্থায় আপনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সুগন্ধিযুক্ত ওই কাপড় স্পর্শ করেন অথবা সুগন্ধি আপনার ত্বক বা কাপড়ে লেগে যায়, তাহলে তা সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে ফেলতে হবে এবং আপনাকে দম (জরিমানা) আদায় করতে হবে।

  • যৌন আচরণ: দাম্পত্য মিলন, তার দিকে নিয়ে যায় এমন সব কথা, ইশারা, প্রস্তাব ও উত্তেজক আচরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

  • বিয়ে: ইহরাম অবস্থায় কেউ নিজে বিয়ে করতে পারবে না, কিংবা অন্য কারো বিয়ের আকদও করাতে পারবে না।

  • শিকার: স্থলজ প্রাণী শিকার করা বা হত্যা করা নিষিদ্ধ (তবে ক্ষতিকর পোকামাকড় যেমন মশা, সাপ ইত্যাদি নষ্ট করা বৈধ)।

  • গুনাহ/ঝগড়া: ঝগড়া-বিবাদ, অশালীন ও গালমন্দপূর্ণ কথাবার্তা থেকে দূরে থাকতে হবে।

২. পুরুষদের জন্য বিশেষ নিষেধাজ্ঞা:

  • মাথা ঢেকে রাখা: টুপি, পাগড়ি, হুড ইত্যাদি এমনভাবে মাথায় পরা যাবে না, যা মাথাকে স্পর্শ করে ঢেকে রাখে। তবে ছাতা দিয়ে রোদ থেকে আশ্রয় নেওয়া জায়েজ, যতক্ষণ তা মাথায় লাগিয়ে পরা হয় না।

  • সেলাই করা পোশাক: অর্থাৎ এমন পোশাক, যা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আকার অনুযায়ী তৈরি (শার্ট, প্যান্ট, পায়জামা, আন্ডারওয়্যার, মোজা ইত্যাদি)। পুরুষদের শুধু দুইখানা সেলাই বিহীন কাপড় (রিদা ও ইযার) পরে থাকতে হবে।

  • টাখনু ঢেকে রাখা: পায়ের এমন জুতা পরা যাবে না যা টাখনু ও পায়ের উপরের অংশ ঢেকে ফেলে। স্যান্ডেল জাতীয় জুতা উত্তম।

৩. নারীদের জন্য বিশেষ নিষেধাজ্ঞা:

  • নেকাব ও গ্লাভস: রাসুল ﷺ স্পষ্টভাবে ইহরাম অবস্থায় নারীদের নেকাব (মুখের সাথে লাগানো পর্দা) এবং হাতমোজা পরা নিষিদ্ধ করেছেন।

  • তবে: যদি পুরুষেরা পাশে দিয়ে হেঁটে যায় বা সামনে থাকে, নারীরা তাদের খিমারের (ওড়না/স্কার্ফ) অংশ নিচে টেনে মুখ ঢেকে নিতে পারে; তবে মুখের সাথে লাগানো আঁটসাঁট পর্দা (নেকাব) পরবে না।

কোন ভুল করলে কী করবেন?

  • ভুলে গেলে/না জানলে: ভুলে বা অজ্ঞতার কারণে কেউ নিষিদ্ধ কাজ করে ফেললে (যেমন অসাবধানতাবশত সুগন্ধিযুক্ত সাবান ব্যবহার করা), সাধারণত তার ওপর গোনাহ ও ফিদিয়া নেই। বিষয়টি বুঝে গেলে তা সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করবে এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবে।

  • ইচ্ছাকৃত/অত্যাবশ্যক: কোনো বৈধ প্রয়োজন বা চিকিৎসাজনিত কারণে কিছু করতে হলে (যেমন মাথায় ব্যান্ডেজ বাধা, বিশেষ ধরনের টুপি পরা) তখন ফিদিয়া দিতে হয়—সাধারণত ৩ দিন রোজা রাখা, ৬ জন গরিবকে খাওয়ানো বা একটি ছাগল/ভেড়া কোরবানি করা—এর কোন একটি।

কিছু জায়েজ কাজ (যেগুলো নিয়ে সন্দেহ হয়):

  • গোসল: ইহরাম অবস্থায় গোসল করা, মাথা ও শরীর ধোয়া জায়েজ, তবে সুগন্ধিমুক্ত সাবান ব্যবহার করা উত্তম।

  • চুলকানো: মাথা বা শরীর চুলকাতে পারবেন; এতে যদি হঠাৎ কিছু চুল পড়ে যায়, তবু অসুবিধা নেই।

  • ইহরামের কাপড় বদলানো: নোংরা/ভেজা হয়ে গেলে ইহরামের কাপড় বদলানো যাবে।

  • বেল্ট পরা: কোমরে মানি-বেল্ট বা পাউচ ব্যবহার করা জায়েজ, যাতে টাকা/ডকুমেন্ট রাখা যায়।

  • জুতা/স্যান্ডেল: পুরুষ ইহরাম অবস্থায় এমন স্যান্ডেল পরতে পারবে, যা টাখনু ঢেকে রাখে না।

  • অন্যান্য বৈধ জিনিস: ঘড়ি, সানগ্লাস, কনট্যাক্ট লেন্স, হিয়ারিং এইড, লাঠি, ছাতা ও ব্যাকপ্যাক ব্যবহার করা জায়েজ। ইহরামের পুরো সময় স্যান্ডেল পরে থাকা জায়েজ; কষ্ট কমানোর জন্য এটি করা যেতে পারে। বয়স্ক, অসুস্থ বা আহত ব্যক্তির জন্য হুইলচেয়ারে বসা ও অন্য কারও দ্বারা হুইলচেয়ার ঠেলে নেওয়া উভয়েরই উমরা সহিহ হবে।


উমরা সম্পর্কিত বিদআত সমূহ

ইহরাম সম্পর্কিত বিদআত সমূহ:

  • উচ্চৈঃস্বরে নিয়ত পড়া।
  • তাওয়াফ ব্যতীত অন্য সময় ইহরাম অবস্থায় ডান কাঁধ খালি রেখে ডান বগলের নীচ দিয়ে ইহরামের কাপড় পরিধান করা। যা শুধুমাত্র তাওয়াফের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। তাওয়াফ ব্যতীত অন্য সময় তা করা বিদআত। এমনকি বর্তমানে অনেকেই ডান কাঁধ খোলা রাখা অবস্থাতেই সালাত আদায় করে থাকেন। অথচ কাঁধ খোলা রাখা অবস্থায় সালাত আদায় করলে সালাত শুদ্ধ হবে না।
  • দলবদ্ধভাবে তালবিয়া পাঠ করা। মীকাত থেকে ইহরাম বেঁধে স্ব স্ব তালবিয়া পাঠ করতে হয়। কিন্তু অনেকেই দলবদ্ধভাবে সম্মিলিতভাবে তালবিয়া পাঠ করে থাকেন যা বিদআত।
  • পুরুষের নিম্নস্বরে তালবিয়া পাঠ। পুরুষের উচ্চৈঃস্বরে এবং মহিলাদের নিম্নস্বরে স্ব স্ব তালবিয়া পাঠ করাই হল সুন্নাত।
  • মসজিদ আয়েশা বা তানীম মসজিদ থেকে ইহরাম বেঁধে বার বার উমরা পালন করা।

তাওয়াফ সম্পর্কিত বিদআত সমূহ:

  • তাওয়াফের উদ্দেশ্যে মসজিদুল হারামে প্রবেশের পর তাহিয়াতুল মসজিদ আদায় করা।
  • মসজিদুল হারামে নির্দিষ্ট দরজা দিয়ে প্রবেশ করাকে বাধ্যতামূলক ও শরীআতের বিধান মনে করা।
  • তাওয়াফ শুরুর সময় উচ্চারণ করে নিয়ত পাঠ করা। শুধু মাত্র মিকাতে ইহরামে প্রবেশ করার সময় ইহরামের নিয়ত মুখে উচ্চারণ করে পড়তে হয়।
  • মনগড়া দোয়া পড়া।
  • হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করার সময় রাফউল ইয়াদায়েন করা।
  • রুকনে ইয়ামানতে চুম্বন করা।
  • মাকামে ইবরাহিমে হাত বুলানো বা চুম্বন করা।
  • কাবার গিলাফ, দেয়াল, দরজা প্রভৃতি স্থানে হাত দিয়ে ধরে বা মুখ-বুক লাগিয়ে বরকত কামনা করা বা দোয়া বা কান্নাকাটি করা। ইহরাম অবস্থায় কাবার সুগন্ধি স্পর্শ করা ইহরামের বিধান লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। কারণ কাবার গিলাফ (কিসওয়া)-তে প্রচুর পরিমাণে সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহার করা হয়। ইহরাম অবস্থায় আপনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে সুগন্ধিযুক্ত ওই কাপড় স্পর্শ করেন অথবা সুগন্ধি আপনার ত্বক বা কাপড়ে লেগে যায়, তাহলে তা সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ে ফেলতে হবে এবং আপনাকে দম (জরিমানা) আদায় করতে হবে।
  • তাওয়াফের সময় দলব্ধভাবে সম্মিলিত দোয়া পাঠ করা।
  • হাতীমের মধ্যে দিয়ে তাওয়াফ করা। কাবার উত্তর পার্শ্বে স্বল্প উচ্চ দেওয়াল ঘেরা হাতীেমের বাহির দিয়ে তাওয়াফ করতে হবে। ভিতর দিয়ে গেলে ঐ তাওয়াফ বাতিল হয়ে যাবে এবং পুনরায় আরেকটি তাওয়াফ করতে হবে।
  • প্রতিটি চক্করে আলাদা আলাদা নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করা।
  • তাওয়াফের সময় প্রথম তিন চক্করে ‘রমল’ না করা অথবা প্রতি চক্করেই রমল করা।
  • রমলের সময় নির্দিষ্ট কোন দো‘আ পাঠ
  • হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ বা চুম্বনের সময় নির্দিষ্ট দোয়া পাঠ করা।
  • রুকনে ইরাক্বী ও রুকনে শামী স্পর্শ করা।
  • রুকনে ইয়ামানির দিকে ইশারা করা ও তাকবীর বলা। রুকনে ইয়ামানি স্পর্শ করা সুন্নাত। কিন্তু কোন কারণে স্পর্শ করতে না পারলে ইশারা করার এবং তাকবীর বলার কোন বিধান নেই।
  • হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ করে দু’হাত উঁচু করে সগর্বে আল্লাহু আকবার বলা। অনেকেই হাজরে আসওয়াদকে স্পর্শ ও চুম্বন করাকে অনেক গর্ব মনে করেন। তাই হাজরে আসওয়াদ স্পর্শ ও চুম্বন করে দু’হাত উঁচু করে সগর্বে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে সকলকে জানিয়ে দেন যে আমি পেরেছি।

সাঈ সম্পর্কিত বিদআত সমূহ:

  • সাঈ শুরুর পূর্বে উচ্চারণ করে নিয়ত পাঠ করা।
  • অধিক সওয়াবের প্রত্যাশায় সাঈ শুরুর পূর্বে ওযূ করা।
  • মনগড়া দোয়া পড়া।
  • কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত সা‘ঈর নির্দিষ্ট দোয়ার সাথে অন্য দোয়া নির্দিষ্ট করা।
  • সাঈ করার সময় প্রত্যেক চক্করে নির্দিষ্ট দোয়া করা।
  • মহিলাদের সাফা-মারওয়ার মাঝখানে সবুজ লাইট চিহ্নিত স্থানে দ্রুত চলা বা দৌড়ানো।
  • সাঈ শেষে সালাত আদায় করা।

যমযম সম্পর্কিত বিদআত সমূহ:

  • যমযম পানি পানের সময় নির্দিষ্ট দোয়া পড়া।
  • বরকত লাভের উদ্দেশে শরীরে যমযম পানি ঢালা।
  • যমযমের পানি দ্বারা ইহরামের কাপড় ধৌত করা।

মক্কা ও মদিনায় যিয়ারত সম্পর্কিত বিদআত সমূহ:

  • নির্দিষ্ট পাহাড় বা স্থানে গিয়ে বিশেষ ইবাদত আবশ্যক মনে করা। যেমন জাবালে নূর (হেরা গুহা) বা জাবালে সাওরে গিয়ে সালাত আদায় করাকে সওয়াবের কাজ বা উমরার অংশ মনে করা।
  • নির্দিষ্ট পাহাড় বা স্থান বা গুহায় গিয়ে সালাত আদায় করা বা দোয়া করা।
  • জাবালে রহমত (আরাফার ময়দান) বা অন্য কোনো পাহাড়ে পাথর নিক্ষেপ করা বা সেখানে নাম লিখে রাখাকে সওয়াবের কাজ মনে করা।
  • মক্কা বা মদিনার বা সেখানের পাহাড়ের মাটি বা পাথর বা গাছের পাতা বরকতের জন্য নিয়ে আসা।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবরের উদ্দেশ্যেই শুধু সফর করা।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারতকে হজ বা উমরার অংশ মনে করা।
  • মদীনায় প্রবেশের পূর্বে সুন্নাহ মনে করে গোসল করা, নির্দিষ্ট আয়াত বা দোয়া পড়া যা কুরআন-হাদিসে নেই।
  • মসজিদে নববীতে প্রবেশ করে কোন সালাত আদায়ের পূর্বেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারতের জন্যে যাওয়া।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের সামনে সালাতে দাঁড়ানোর মত ডান হাত বাম হাতের ওপর রেখে হাত বেঁধে দাঁড়ানো।
  • দোয়া করার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের দিকে ফিরে দোয়া করা।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর যিয়ারতের সময় নির্দিষ্ট কোনো দোয়া বা দরুদ বানানো, যা হাদিসে বর্ণিত হয়নি।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের দিকে ফিরে দোয়া করলে কবুল হবে মনে করা।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্ত্বা ও তাঁর সম্মানের অসীলা দিয়ে দু’আ করা।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে সুপারিশ চাওয়া।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে কোনো কিছু চাওয়া। আল্লাহ ব্যতীত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে কোনো প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রার্থনা করা। এরূপ করা নিঃসন্দেহে বড় শিরক।
  • এটা মনে করা যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের অবস্থা জানেন। এরূপ মনে করা সুস্পষ্ট শিরক।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরকে সেজদা করা বা রুকু করা। যা সুস্পষ্ট শিরক।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের ছোট ছিদ্র পথে বরকত লাভের আশায় হাত ঢুকানো। এটাও শিরক।
  • বরকত লাভের আশায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর চুম্বন করা অথবা স্পর্শ করা এবং কবরের সাথে লাগোয়া কোন কাঠ স্পর্শ করা বা চুব্বন করা।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবরের দিকে ফিরে সালাত আদায় করা।
  • রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবরের কাছে বসে কুরআন পাঠ বা যিকর করা।
  • প্রতি সালাতের পরই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবর যিয়ারতের জন্য কবরের কাছে যাওয়া।
  • মসজিদে নববীতে প্রবেশ করার সময় এবং বের হওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবরের দিকে মুখ করে থাকা।
  • দূর থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবরকে উদ্দেশ্য করে বিনীতভাবে দাঁড়িয়ে কান্নাকাটি করা।
  • সালাতের পর পর আসসালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ বলা।
  • মসজিদের প্রথম অংশ বাদ দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কবরে সালাত পড়া উত্তম মনে করা।
  • মসজিদে নববীর মিম্বার, মেহরাব, স্তম্ভ, দরজা, রেলিং, সবুজ গম্বুজ থেকে পড়া পানি ইত্যাদি দিয়ে “তাবারুক” নেওয়া।
  • মসজিদ নববী এবং কুবা মসজিদ ছাড়া অন্য মসজিদে সওয়াবের উদ্দেশ্যে গমন করা।
  • মসজিদ নববী থেকে বের হওয়ার সময় পেছন দিকে উল্টো হেঁটে বের হওয়া।
  • জান্নাতুল বাকী বা উহুদের শহীদদের কবরে অতিরিক্ত আচার। যেমন: কবরের উপর হাত রাখা, চুম্বন করা, বরকতের আশায় মাটি নেওয়া, তাদের কাছে কিছু চাওয়া, তাদের দিকে ফিরে দোয়া করা।
  • প্রতিদিন বাকী কবরস্থান যিয়ারত করা বা যিয়ারতকে আবশ্যিক বা বিশেষ ফজিলতের মনে করা।

উমরা চেকলিস্ট

১. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:

এগুলো একটি গলার ব্যাগ অথবা একটি ছোট ক্রস-বডি ব্যাগে রাখুন যা সর্বদা আপনার সাথে থাকে।

  • পাসপোর্ট: ভ্রমণের তারিখ থেকে অন্তত ৬ মাসের মেয়াদ থাকা আবশ্যক।

  • উমরা ভিসা: ই-ভিসা বা স্ট্যান্ডার্ড ভিসার প্রিন্ট কপি।

  • টিকা সনদ: বিশেষ করে Meningococcal ACYW135 (যদি তা বাধ্যতামূলক হয়)।

  • ফ্লাইট টিকিট ও হোটেল কনফার্মেশন: প্রিন্ট ও ডিজিটাল কপি; এজেন্টের প্যাকেজ নিলে তার প্রিন্ট কপি।

  • সম্পর্কের প্রমাণ: স্বামী-স্ত্রী একসাথে গেলে বিবাহ সনদ ইত্যাদি।

  • Nusuk অ্যাপ: অ্যাপ ইনস্টল করে রাখুন, এবং প্রয়োজনীয় পারমিট বুক করা আছে কিনা দেখুন।

  • নগদ (সৌদি রিয়াল) + ডেবিট/ক্রেডিট কার্ড।

  • জরুরি যোগাযোগ: বাড়ির নম্বর, হোটেল নম্বর, স্থানীয় এজেন্ট (যদি থাকে)।

  • লাগেজ ওয়েট স্কেল: ব্যাগের ওজন আগেভাগে চেকের জন্য।

  • কলম/মার্কার: লাগেজ বা জমজমের প্যাকেজে নিজের তথ্য লিখতে।

২. ইহরাম ও সালাতের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিস:

পুরুষদের জন্য:

  • ইহরামের কাপড়: অন্তত ২ সেট সাদা সেলাই বিহীন কাপড় (একটি নষ্ট/নোংরা হলে অন্যটি ব্যবহার করতে পারবেন)।

  • ইহরাম বেল্ট: নিচের কাপড় মজবুত করার জন্য এবং মোবাইল/টাকা রাখার জন্য।

  • সেফটি পিন: উপরের কাপড় ঠিক রাখতে সহায়ক।

  • স্যান্ডেল: টাখনু ও পায়ের উপরের অংশ খুলা থাকে এমন স্যান্ডেল।

  • জুতা রাখার ব্যাগ: মসজিদের ভেতরে জুতা বহনের জন্য ছোট পিঠে বহনের ব্যাগ।

নারীদের জন্য:

  • আবায়া: ২–৩টি হালকা ও ঢিলেঢালা আবায়া।

  • হিজাব: বাতাস চলাচল করে এমন কটন স্কার্ফ; সাধারণত গাঢ় রঙ হলে ভাল কারন তাতে দাগ কম লাগে।

  • স্কার্ফের নিচে পরার ক্যাপ: চুল ও হিজাব ঠিক রাখতে।

সালাতের জন্য জিনিস:

  • পকেট কুরআন ও দোয়া বই।

  • হালকা জায়নামাজ।

  • জুতা রাখার ছোট ব্যাগ।

৩. টয়লেট্রিজ (সুগন্ধিবিহীন):

ইহরাম অবস্থায় সুগন্ধিযুক্ত দ্রব্য ব্যবহার করা যাবে না।

  • সুগন্ধিবিহীন সাবান ও শ্যাম্পু (Fragrance-Free লেখা থাকে এমন)।

  • সুগন্ধিবিহীন ডিওডোরেন্ট (স্টিক বা রোল‑অন)।

  • সুগন্ধিবিহীন সানস্ক্রিন ও লিপ বাম।

  • টুথব্রাশ ও টুথপেস্ট, অথবা মিসওয়াক।

  • ছোট তোয়ালে।

  • নেইল কাটার ও ছোট কাঁচি (ইহরামের আগে বা উমরা শেষে ব্যবহার করার জন্য)।

  • সুগন্ধিবিহীন টিস্যু ও ওয়েট ওয়াইপ।

  • হ্যান্ড স্যানিটাইজার (সুগন্ধিহীন)।

৪. স্বাস্থ্য ও ওষুধপত্র:

  • প্রেসক্রিপশন ওষুধ: যেগুলো নিয়মিত খান, পুরো সফরের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে, কয়েক দিন অতিরিক্তসহ।

  • প্রাথমিক চিকিৎসা: প্লাস্টার, ব্লিস্টার প্লাস্টার, ছোট ব্যান্ডেজ, অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম/অয়েন্টমেন্ট, পায়ের/মাংসপেশির ব্যথার জন্য ক্রিম/জেল, চাইলে সামান্য সানবার্ন রিলিফ জেল।

  • ব্যথা ও জ্বর: প্যারাসিটামল/আইবুপ্রোফেন।

  • পেটের সমস্যা: ডায়রিয়া প্রতিরোধক ট্যাবলেট, গ্যাস/অম্বল/হার্টবার্নের ওষুধ।

  • সর্দি‑কাশি: ভিড় ও এসি–এর কারণে “উমরা কাশি” খুবই সাধারণ; এজন্য ঠান্ডা, সর্দি/কাশির ট্যাবলেট ও লজেন্স।

  • অ্যালার্জি: নন‑ড্রাউজি অ্যান্টিহিস্টামিন।

  • বমি: বমিনাশক ট্যাবলেট।

  • ভ্যাসেলিন: উরুর ঘষা থেকে বাঁচতে (বিশেষত ইহরামের কাপড় পরা পুরুষদের জন্য)।

৫. ইলেকট্রনিক্স ও অন্যান্য:

  • ইউনিভার্সাল ট্রাভেল অ্যাডাপ্টার: সৌদি আরবে সাধারণত টাইপ G (৩ পিন) এবং কখনও টাইপ C ব্যবহৃত হয়।

  • পাওয়ার ব্যাংক: হারামে দীর্ঘ সময় থাকার জন্য খুব প্রয়োজনীয়।

  • সৌদি সিম: বিমানবন্দরে STC, Zain, Mobily ইত্যাদির সিম, বা ই‑সিম নিতে পারেন।

  • রিইউজেবল পানির বোতল: জমজমসহ পানি পান করার জন্য সবসময় সঙ্গে রাখুন।

  • ছোট ছাতা বা ক্যাপ: সাদা বা হালকা রঙের হলে তাপ কম লাগে।

  • সানগ্লাস।

  • ছোট পোর্টেবল ফ্যান: তাওয়াফ/সাঈর সময় গরম লাগলে কাজে দেবে।

কিছু টিপস:

  • হাঁটার অনুশীলন: ভ্রমণের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে প্রতিদিন ৩–৫ কিমি হাঁটার অভ্যাস করলে সহনশক্তি বাড়বে।

  • কাপড় ধোয়া: মক্কা-মদিনায় লন্ড্রি সার্ভিস সাধারণত সস্তা ও দ্রুত, তাই বেশি কাপড় প্যাক করার প্রয়োজন নেই।

  • ডকুমেন্টের কপি: সব কাগজপত্রের ছবি ফোনে/ক্লাউডে সংরক্ষণ করে রাখুন।


মক্কা ও মদিনায় জিয়ারতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থান

মক্কায়:

  • জাবাল আন‑নূর (হেরা গুহা): এখানে রাসুল ﷺ প্রথম ওয়াহি গ্রহণ করেন। পাহাড়টি উঁচু, তাই ভোরে বা সন্ধ্যার পর গেলে গরম কম লাগে।

  • জাবাল সাওর: হিজরতের সময় রাসুল ﷺ ও আবু বকর (রা.) এ গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।

  • জান্নাতুল মু‘আল্লা: মক্কার ঐতিহাসিক কবরস্থান; এখানে নবীজির স্ত্রী খাদিজা (রা.)সহ পরিবারের অনেক সদস্য সমাহিত।

  • মিনা: এখানে ইবরাহিম (আ.)–কে তাঁর পুত্র ইসমাইল (আ.)–কে কুরবানি করার হুকুম দেওয়া হয়েছিল। তিনি আনুগত্য দেখালে আল্লাহ তাআলা ইসমাইলের পরিবর্তে একটি দুম্বা কুরবানি করার ব্যবস্থা করেন। হজে কুরবানি/উযিয়ার এই রীতি তারই স্মরণ। হাজীরা ৮ জিলহজ্জ মিনাতে অবস্থান করে, এরপর ১০, ১১, ১২ (কখনও ১৩) জিলহজ্জ পর্যন্ত এখানকার জামারাতগুলোকে পাথর মারেন এবং কুরবানি করেন।

  • আরাফাহ: জাবাল আরাফাহ/জাবাল রাহমাহ ছোট একটি পাহাড় ও বিস্তৃত প্রান্তর, যেখানে ৯ জিলহজ্জ মূল ওয়ুকুফে আরাফাহ অনুষ্ঠিত হয়, যা হজের কেন্দ্রীয় রুকন।

  • মসজিদে নামিরাহ: আরাফাহতে জাবাল রাহমাহর কাছে অবস্থিত; এখানেই রাসুল ﷺ বিদায় হজের ঐতিহাসিক খুৎবা প্রদান করেন।

  • মুযদালিফা: ৯ জিলহজ্জ আরাফাহ থেকে ফিরে রাসুল ﷺ এই স্থানে রাত কাটিয়েছেন।

  • নবীজি ﷺ এর জন্মস্থান: হারামের নিকটে অবস্থিত, বর্তমানে মক্কা লাইব্রেরি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

  • মসজিদে তানীম (মসজিদ আইশা): রাসুল ﷺ তাঁর স্ত্রী আয়েশা (রা.)–কে এখান থেকে অতিরিক্ত উমরার জন্য ইহরামে প্রবেশ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে বর্ণিত।

  • মসজিদে জিন: যেখানে কিছু জিন রাসুল ﷺ–এর কুরআন তিলাওয়াত শুনে ইসলাম কবুল করেছিল, সেই স্থানে নির্মিত মসজিদ।

মদিনায়:

  • মসজিদে নববী: মদিনার কেন্দ্রবিন্দু; ইসলামের দ্বিতীয় পবিত্র মসজিদ, যেখানে নবীজি ﷺ এর কবর (রাওদাহ) অবস্থিত।

  • মসজিদে কুবা: ইসলামের প্রথম মসজিদ। রাসুল ﷺ বলেছেন, এখানে দুই রাকাত সালাতের সওয়াব এক উমরার সমান।

  • জান্নাতুল বাকি: মসজিদে নববীর পাশে অবস্থিত কবরস্থান; এখানে বহু সাহাবি ও আহলে বাইতের সদস্য সমাহিত।

  • উহুদের পাহাড় ও শহীদদের কবরস্থান: ইসলামের দ্বিতীয় বড় যুদ্ধের স্থান। এখানে ছোট তীরন্দাজ পাহাড় (জাবালুর রুমাত) এবং ৭০ শহীদের কবর, যার মধ্যে হামজা (রা.)–ও অন্তর্ভুক্ত।

  • মসজিদে ক্বিবলাতাইন: যে মসজিদে ক্বিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে কাবার দিকে পরিবর্তনের আদেশ নাজিল হয়।

  • সাত মসজিদ (সাবাআ মসাজিদ): খন্দকের যুদ্ধে ব্যবহৃত স্থানসমূহের নিকটে ছোট কয়েকটি ঐতিহাসিক মসজিদের সমষ্টি।

  • দারুল মদিনাহ মিউজিয়াম: প্রদর্শনীর মাধ্যমে নবীজি ﷺ এর যুগ ও মদিনার ইতিহাস জানতে চমৎকার একটি জাদুঘর।

জিয়ারতের জন্য কিছু পরামর্শ:

  • সময় নির্বাচন: প্রচণ্ড গরম ও ভিড় এড়াতে ফজরের পরপর বা বিকেল/আসর–মাগরিবের মাঝামাঝি সময়ে জিয়ারত করা উত্তম।

  • যাতায়াত: অধিকাংশ হোটেল থেকে প্রাইভেট ট্যাক্সি বা বাস–ভিত্তিক “জিয়ারত ট্যুর” পাওয়া যায়। ট্যাক্সি তুলনামূলক বেশি নমনীয়; আপনি নির্দিষ্ট স্থানে বেশি সময় কাটাতে পারবেন।

  • Nusuk অ্যাপ: মদিনায় রাওদাহ জিয়ারত এবং উমরার জন্য প্রবেশাধিকার—দুটোরই জন্য Nusuk অ্যাপে পারমিট বুক করা জরুরি।

  • পানি পান: সবসময় সাথে পানির বোতল রাখুন। অধিকাংশ স্থানের কাছে জমজম বা পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকে।

▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: মোহাম্মাদ আসাদ।

আছিয়া বিনতে মুজাহিম সম্পর্কে জানতে চাই

 প্রশ্ন: আছিয়া বিনতে মুজাহিম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে জানতে চাই।

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর ফেরাউনের মহীয়সী স্ত্রী আছিয়া বিনতে মুজাহিম (আলাইহাস্‌ সালাম) সম্পর্কে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহতে বিস্তারিত জীবনীমূলক তথ্য খুব সীমিত। তাঁর জীবন ও ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, তার উল্লেখযোগ্য অংশই মূলত ইসরাঈলি রেওয়ায়াত—অর্থাৎ পূর্ববর্তী আহলে কিতাবের সূত্রে বর্ণিত তথ্য, যা নির্ভরযোগ্য ও সুস্পষ্ট সহীহ নস দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে প্রমাণিত নয়।তবে ঐতিহাসিক ও তাফসিরমূলক আলোচনায় সাধারণভাবে এ বিষয়টি প্রতীয়মান হয় যে, আছিয়া (আলাইহিস্‌ সালাম) ছিলেন সময়ের শ্রেষ্ঠ প্রাসাদের অধিপতি। তার সেবায় ছিল অসংখ্য দাস-দাসী এবং অফুরন্ত ধন-সম্পদ। তিনি অত্যন্ত বিলাসিতার মাঝে জীবন যাপন করতেন। কিন্তু তার স্বামী ছিল এক চরম অত্যাচারী ও অহংকারী শাসক, যে নিজেকে রব দাবি করে ঘোষণা দিয়েছিল— “আমিই তোমাদের শ্রেষ্ঠ পালনকর্তা।”আসিয়া (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম)কে ছোট বেলা থেকেই লালন পালন করেছিলেন।ঘটনাটি ছিল এমন যে,ফেরাঊনের সৈন্যদের হাতে নিহত হবার নিশ্চিত সম্ভাবনা দেখা দিলে আল্লাহর প্রত্যাদেশ (ইলহাম) অনুযায়ী পিতা-মাতা তাদের প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানকে সিন্দুকে ভরে বাড়ীর পাশের নীল নদীতে ভাসিয়ে দিলেন।অতঃপর স্রোতের সাথে সাথে সিন্দুকটি এগিয়ে চলল। ওদিকে মূসার (বড়) বোন তার মায়ের হুকুমে (ক্বাছাছ ২৮/১১) সিন্দুকটিকে অনুসরণ করে নদীর কিনারা দিয়ে চলতে লাগল (ত্বোয়াহা ২০/৪০)। এক সময় তা ফেরাঊনের প্রাসাদের ঘাটে এসে ভিড়ল। ফেরাঊনের পুণ্যবতী স্ত্রী আসিয়া (آسية ) বিনতে মুযাহিম ফুটফুটে সুন্দর বাচ্চাটিকে দেখে অভিভূত হয়ে পড়লেন। ফেরাঊন তাকে বনু ইস্রাঈলের সন্তান ভেবে হত্যা করতে চাইল। কিন্তু সন্তানহীনা স্ত্রীর (আসিয়ার) অপত্য স্নেহের কারণে তা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ফেরাঊন নিজে তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। কারণ আল্লাহ মূসা (আলাইহিস সালাম) এর চেহারার মধ্যে বিশেষ একটা মায়াময় কমনীয়তা দান করেছিলেন (সূরা ত্বোয়াহা ২০/৩৯)। যাকে দেখলেই মায়া পড়ে যেত। ফেরাঊনের পাষাণ হৃদয় গলতে সেটুকুই যথেষ্ট ছিল। বস্তুত এটাও ছিল আল্লাহর মহা পরিকল্পনারই অংশ বিশেষ। ফুটফুটে শিশুটিকে দেখে ফেরাঊনের স্ত্রী তার স্বামীকে বললেন,وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْنَ قُرَّتُ عَيْنٍ لِّي وَلَكَ لاَ تَقْتُلُوهُ عَسَى أَن يَّنْفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَداً وَهُمْ لاَ يَشْعُرُوْنَ- (القصص ৯)-“এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি। একে হত্যা করো না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি’। আল্লাহ বলেন, ‘অথচ তারা (আমার কৌশল) বুঝতে পারল না’ (ক্বাছাছ ২৮/৯)। মূসা এক্ষণে ফেরাঊনের স্ত্রীর কোলে পুত্রস্নেহ পেতে শুরু করলেন। অতঃপর বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানোর জন্য রাণীর নির্দেশে বাজারে বহু ধাত্রীর কাছে নিয়ে যাওয়া হ’ল। কিন্তু মূসা কারো বুকেই মুখ দিচ্ছেন না। আল্লাহ বলেন, وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ مِن قَبْلُ- (القصص ১২)- ‘আমরা পূর্ব থেকেই অন্যের দুধ খাওয়া থেকে মূসাকে বিরত রেখেছিলাম’ (ক্বাছাছ ২৮/১২)। এমন সময় অপেক্ষারত মূসার ভগিনী বলল, ‘আমি কি আপনাদেরকে এমন এক পরিবারের খবর দিব, যারা আপনাদের জন্য এ শিশু পুত্রের লালন-পালন করবে এবং তারা এর শুভাকাঙ্ক্ষী? (ক্বাছাছ ২৮/১২)। রাণীর সম্মতিক্রমে মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে প্রস্তাবিত ধাত্রীগৃহে প্রেরণ করা হল। মূসা খুশী মনে মায়ের দুধ গ্রহণ করলেন। অতঃপর মায়ের কাছে রাজকীয় ভাতা ও উপঢৌকনাদি প্রেরিত হতে থাকল। এভাবে আল্লাহর অপার অনুগ্রহে মূসা তার মায়ের কোলে ফিরে এলেন। এভাবে একদিকে পুত্র হত্যার ভয়ংকর আতংক হতে মা-বাবা মুক্তি পেলেন ও নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া সন্তানকে পুনরায় বুকে ফিরে পেয়ে তাদের হৃদয় শীতল হল। অন্যদিকে বহু মূল্যের রাজকীয় ভাতা পেয়ে সংসার যাত্রা নির্বাহের দুশ্চিন্তা হতে তারা মুক্ত হলেন। সাথে সাথে সম্রাট নিয়োজিত ধাত্রী হিসাবে ও সম্রাট পরিবারের সাথে বিশেষ সম্পর্ক সৃষ্টি হওয়ার ফলে তাঁদের পরিবারের সামাজিক মর্যাদাও বৃদ্ধি পেল। এভাবেই ফেরাঊনী কৌশলের উপরে আল্লাহর কৌশল বিজয়ী হল। ফালিল্লাহিল হাম্দ। আল্লাহ বলেন, وَمَكَرُوا مَكْراً وَمَكَرْنَا مَكْراً وَهُمْ لاَ يَشْعُرُونَ- (النمل ৫০)- ‘তারা চক্রান্ত করেছিল এবং আমরাও কৌশল করেছিলাম। কিন্তু তারা (আমাদের কৌশল) বুঝতে পারেনি’ (নমল ২৭/৫০)। আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন; তাফসীর ইবনু কাসীর, ক্বাসাস ৭ আয়াত; কুরতুবী, ইবনু কাসীর, আল-বিদায়াহ ১/২২৫; ঐ, তাফসীর সূরা ত্বোয়াহা ৪০ আয়াত, নাসাঈ, ‘হাদীছুল ফুতূন’)
.
অতঃপর আসিয়া (আলাইহিস সালাম) মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর তাওহীদী দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ঈমান গ্রহণ করেন। প্রাথমিক সময়ে তিনি তার ঈমান পাপিষ্ঠ ফেরাউনের নিকট গোপন রেখেছিলেন এবং চুপচাপ মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু যখন তার ঈমান প্রকাশিত হয়, তখন ফেরাউন শুরু করেন অমানুষিক নির্যাতন। বলা হয়, ফেরাউন তার সৈন্যদের নির্দেশ দিলে তারা আসিয়াকে মিশরের মরুভূমিতে নিয়ে গিয়ে চার কোণায় বেঁধে সূর্যের প্রখর রোদে ফেলে রাখত। মরুভূমির তপ্ত বালু আর তৃষ্ণার মাঝেও তিনি দৃঢ় ঈমানের সঙ্গে ধৈর্য ধারণ করতেন। আল্লাহর কুদরত অপূর্ব—ফেরেশতারা তাঁর চারপাশে ডানা ছড়িয়ে তাকে ছায়া দিত, যাতে সূর্যের তাপ তাঁকে স্পর্শ করতে না পারে। এই সকল কষ্ট ও নির্যাতনেও, আসিয়া (আলাইহিস সালাম) তাঁর প্রভুর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও সন্তুষ্টি বজায় রাখলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে তিনি কাতর কণ্ঠে প্রার্থনা করলেন, যেমন আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নির্দেশ দিয়েছেন—,وَضَرَبَ اللهُ مَثَلاً لِلَّذِينَ آمَنُوا اِمْرَأَةَ فِرْعَوْنَ إِذْ قَالَتْ رَبِّ ابْنِ لِي عِندَكَ بَيْتاً فِي الْجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ-“আল্লাহ ঈমানদারগণের জন্য দৃষ্টান্ত বর্ণনা করেন ফেরাঊনের স্ত্রীর, যখন সে বলেছিল,”হে আমার পালনকর্তা! তোমার নিকটে জান্নাতে আমার জন্য একটি গৃহ নির্মাণ করো! আমাকে ফেরাঊন ও তার পারিষদবর্গের হাত থেকে উদ্ধার কর এবং আমাকে যালেম সম্প্রদায়ের কবল থেকে মুক্তি দাও”।(সূরা তাহরীম;৬৬/১১)। ​আল্লাহ তাআলা তার দোয়া কবুল করলেন এবং আসিয়া জীবিত অবস্থাতেই জান্নাতে নিজের অবস্থান দেখে হেসে ফেললেন। ফেরাঊন অবাক হয়ে তার লোকদের বলল, “দেখো তার পাগলামি! এই মরণ যন্ত্রণাতেও সে হাসছে?” অথচ মহান আল্লাহ পাথরটি তার ওপর পড়ার আগেই তার রূহ কবুল করে নেন। ফলে তিনি পাথরের আঘাতের কোনো যন্ত্রণাই অনুভব করেননি। কিছু বর্ণনায় এসেছে যে, আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়াতেই জান্নাতে তাঁর গৃহ প্রদর্শন করান, যা তাঁর ঈমানের উচ্চতা ও মর্যাদার প্রতি এক বিশেষ সম্মান ও সুসংবাদ হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন প্রখ্যাত সাহাবী আবূ হুরায়রা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৫৯ হি.] থেকে মওকুফ সূত্রে প্রমাণিত আছে যে তিনি বলেন,إنَّ فرعونَ أوتَدَ لامرأتِه أربعةَ أوتادٍ في يدَيها ورِجْلَيها فكان إذا تفرَّقوا عنها أظلَّتْها الملائكةُ فقالت { رَبِّ ابْنِ لِي عِنْدَكَ بَيتًا فِي الجَنَّةِ وَنَجِّنِي مِنْ فِرْعَوْنَ وَعَمَلِهِ وَنَجِّنِي مِنَ القَوْمِ الظَّالِمِينَ } فكُشِفَ لها عن بيتِها في الجنَّةِ “ফেরাঊন তার স্ত্রীকে (আছিয়া) চারটি স্থির পেরেক দিয়ে (মাটিতে আটকে রাখার জন্য) বন্দী করেছিলেন—দুটি হাতে, দুটি পায়ে। যখন ফেরাউনের লোকেরা তাকে ছেড়ে চলে যেত, তখন ফেরেশতারা তাকে ছায়া দান করতেন। এরপর তিনি (আছিয়া) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন: “হে আমার পালনকর্তা! আমার জন্য আপনার নিকট জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফেরাঊন ও তার দুষ্কর্ম থেকে উদ্ধার করুন এবং আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকে মুক্তি দিন।”(সূরা আত-তাহরীম: ১১)। অতঃপর জান্নাতে তাঁর ঘরটি তাঁর সামনে উন্মোচিত করা হলো (অর্থাৎ তিনি তা দেখতে পেলেন)।”(মুসনাদে আবী ইয়ালা, হা/৭০২৫;মুস্তাদরাকে হাকেম,হা/৩৯৫৯; ইমাম আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,হাদীসটি আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে মওকূফ সহীহ, যা মরফূ হুকমীর পর্যায়ভুক্ত;সিলসিলা সহীহাহ হা/২৫০৮)।
.
আসিয়া আলাইহিস (সালাম) ছিলেন জান্নাতী চার শ্রেষ্ঠ নারীর একজন।আবূ মূসা আশ’আরী (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,من الرجال كثير ولم يكمل من النساء إلا آسية امرأة فرعون ومريم بنت عمران وإن فضل عائشة على النساء كفضل الثريد على سائر الطعام”পুরুষদের মধ্যে অনেকেই পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়েছে, কিন্তু নারীদের মধ্যে মারইয়াম বিনতে ‘ইমরান ও ফিরাউনের স্ত্রী আসিয়া (রহঃ) ছাড়া অন্য কেউ তাদের মতো পূর্ণতাপ্রাপ্ত হননি। আর ‘আয়িশা (রাঃ)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব অন্যান্য নারীদের উপর এমন যেমন সারীদ অর্থাৎ গোশ্‌ত এবং রুটি দ্বারা তৈরী খাদ্য বিশেষ এর মর্যাদা অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের উপর।”(সহীহ বুখারী হা/৩৭৬৯;সহীহ মুসলিম হা/২৪৩১) অপর বর্ননায় প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনু মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৯৩ হি.] হতে বর্ণিত, রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,أَفْضَلُ نِسَاءِ أَهْلِ الْجَنَّةِ خَدِيجَةُ بِنْتُ خُوَيْلِدٍ وَفَاطِمَةُ بِنْتُ مُحَمَّدٍ وَمَرْيَمُ بِنْتُ عِمْرَانَ وَآسِيَةُ بِنْتُ مُزَاحِمٍ امْرَأَةُ فِرْعَوْنَ “জান্নাতী মহিলাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলেন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ, ফাতেমা বিনতে মুহাম্মাদ, মারিয়াম বিনতে ইমরান ও ফেরাঊনের স্ত্রী আসিয়া বিনতে মুযাহিম”।(মুসনাদে আহমাদ হা/২৬৬৮, তিরমিযী হা/৩৮৭৮; সহীহুল জামি হা/৩১৪৩; সনদ সহীহ)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি,(রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম: ৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] বলেন;ومن فضائل آسية امرأة فرعون أنها اختارت القتل على الملك والعذاب في الدنيا على النعيم الذي كانت فيه وكانت فراستها في موسى عليه السلام صادقة حين قالت قرة عين لي ​”ফেরাউনের স্ত্রী আছিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ হলো—তিনি রাজত্বের সুবিধা ত্যাগ করে মৃত্যুকে বেছে নিয়েছিলেন, এবং দুনিয়ার আনন্দ-সুখের বদলে আখেরাতের জন্য কষ্ট ও পরীক্ষাকে গ্রহণ করেছিলেন। মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর ব্যাপারে তাঁর দূরদর্শিতা সঠিক ছিল, যখন তিনি বলেছিলেন: “সে আমার জন্য চক্ষুপ্রিয় ও আনন্দদায়ক।”(ফাতহুল বারী: খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৪৮)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

তীব্র শীতের কারণে পানি ব্যবহার করলে অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে জানাবাত অবস্থায় তায়াম্মুম করে কি সালাত আদায় করা যাবে

 প্রশ্ন: তীব্র শীতের কারণে পানি ব্যবহার করলে অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে, জানাবাত অবস্থায় তায়াম্মুম করে কি সালাত আদায় করা যাবে যদিও তখন পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করা সম্ভব নয়?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর মূলনীতি হলো যে ব্যক্তির উপর গোসল ফরয হয়েছে সে ব্যক্তি সালাত পড়তে চাইলে তার উপর ফরয হচ্ছে– পানি দিয়ে গোসল করে নেয়া। দলিল হচ্ছে আল্লাহ্‌র বানী:( وَإِنْ كُنْتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُوا )“আর তোমরা জুনুবী (অপবিত্র) হলে প্রকৃষ্টভাবে পবিত্রতা অর্জন করবে।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬] তাই কেউ যদি পানি ব্যবহারে অক্ষম হয়– পানি না থাকার কারণে কিংবা পানি থাকলেও এর ব্যবহারে রোগের ক্ষতি হতে পারে কিংবা তীব্র ঠান্ডার কারণে (তার কাছে পানি গরম করার মত কিছু না থাকলে); তাহলে সে ব্যক্তি পানি দিয়ে গোসল করার পরিবর্তে মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করতে পারেন। এর দলিল হচ্ছে আল্লাহ্‌র বাণী:(وَإِنْ كُنْتُمْ مَرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاءَ أَحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أَوْ لامَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا ) “আর যদি তোমরা অসুস্থ হও বা সফরে থাক বা তোমাদের কেউ মলত্যাগ করে আসে বা তোমরা স্ত্রী সহবাস কর এবং পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করবে।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬] এ আয়াতে দলিল রয়েছে যে, অসুস্থ ব্যক্তি পানি ব্যবহার করার ফলে যদি তার মৃত্যু ঘটা, কিংবা রোগ বেড়ে যাওয়া কিংবা আরোগ্য লাভ বিলম্ব হওয়ার আশংকা থাকে সেক্ষেত্রে তিনি তায়াম্মুম করবেন। আল্লাহ্‌ তাআলা তায়াম্মুমের পদ্ধতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:(فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ )“তা দ্বারা মুখমণ্ডল ও হাত মাসেহ করবে।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬] আল্লাহ্‌ তাআলা এ বিধান প্রদান করার গূঢ় রহস্যও বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন:( مَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ حَرَجٍ وَلَكِنْ يُرِيدُ لِيُطَهِّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ ) “আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর কোন কাঠিন্য রাখতে চান না; বরং তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করতে চান এবং তোমাদের প্রতি তাঁর নেয়ামত সম্পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন কর।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬]
.
এছাড়াও হাদিসে এসেছে, আমর বিন আস (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন:احتلمت في ليلة باردة في غزوة ” ذات السلاسل ” فأشفقت إن اغتسلت أن أهلك ، فتيممت ، ثم صليت بأصحابي الصبح ، فذكروا ذلك للنبي صلى الله عليه وسلم فقال : يا عمرو صليت بأصحابك وأنت جنب ؟ فأخبرته بالذي منعني من الاغتسال وقلت : إني سمعت الله يقول : ( وَلا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيماً ) النساء/29، فضحك رسول الله صلى الله عليه وسلم ولم يقل شيئاً “যাতুস সালাসিল’ এর অভিযানে এক ঠান্ডার রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়ে গেল। আমি আশংকা করলাম, আমি যদি গোসল করি তাহলে ধ্বংস হয়ে যাব। তাই আমি তায়াম্মুম করলাম। এরপর আমার সাথীদেরকে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করলাম। আমার সাথীরা বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উল্লেখ করলে তিনি বললেন: হে আমর! তুমি কি জুনুবী (গোসল ফরজ হওয়া) অবস্থায় তোমার সাথীদের নিয়ে সালাত পড়েছ? তখন আমি তাঁকে জানালাম কি কারণে আমি গোসল করিনি এবং আমি আরও বললাম: আমি শুনেছি আল্লাহ্‌ বলেন: ‘তোমরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তোমাদের প্রতি দয়ালু”(সূরা নিসা, আয়াত: ২৯) তখন রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হেসে দিলেন, কোন কিছু বললেন না।(সুনানে আবু দাউদ (৩৩৪), আলবানী ‘সহিহ সুনানে আবু দাউদ’ গ্রন্থে হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন)
.
উক্ত হাদীসের ব্যাখায় শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, আবুল ফাদল আহমাদ বিন আলি ইবনু হাজার আল-আসকালানি, (রাহিমাহুল্লাহ) [জন্ম:৭৭৩ হি: মৃত:৮৫২ হি:] বলেন:وفي هذا الحديث جواز التيمم لمن يتوقع من استعمال الماء الهلاك سواء كان لأجل برد أو غيره ، وجواز صلاة المتيمم بالمتوضئين “এ হাদিসে দলিল রয়েছে যে, পানি ব্যবহার করলে যে ব্যক্তি মারা যাওয়ার আশংকা রয়েছে; সেটা ঠান্ডার কারণে হোক কিংবা অন্য কোন কারণে হোক– তার জন্য তায়াম্মুম করা জায়েয। তায়াম্মুমকারীর জন্য ওজুকারীদের ইমাম হওয়াও জায়েয।”(ইবনু হাজার ফাতহুল বারী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৫৪)
.
.বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন,إن كنت تستطيع أن تجد ماء دافئا أو تستطيع تسخين البارد ، أو الشراء من جيرانك أو غير جيرانك : فالواجب عليك أن تعمل ذلك ؛ لأن الله يقول : ( فاتَّقوا الله ما استَطَعْتُم ) ، فعليك أن تعمل ما تستطيع من الشراء أو التسخين أو غيرهما من الطرق التي تمكنك من الوضوء الشرعي بالماء ، فإن عجزت وكان البرد شديداً ، وفيه خطر عليك ، ولا حيلة لك بتسخينه ولا شراء شيء من الماء الساخن ممن حولك : فأنت معذور ، ويكفيك التيمم ؛ لقول الله تعالى : ( فاتَّقوا الله ما استَطَعْتُم ) وقوله سبحانه : ( فَلَمْ تَجِدُوا مَاءً فَتَيَمَّمُوا صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوا بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُمْ مِنْهُ ) .والعاجز عن استعمال الماء حكمه حكم من لم يجد الماء
“যদি আপনার পক্ষে গরম পানি সংগ্রহ করা সম্ভব হয় কিংবা আপনি গরম করতে পারেন কিংবা প্রতিবেশি বা অন্য কারো থেকে কিনে নিতে পারেন তাহলে সেটা করা আপনার উপর আবশ্যকীয়। কেননা আল্লাহ্‌ বলেন: “তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহ্‌কে ভয় কর।”[সূরা তাগাবুন, আয়াত: ১৬] তাই আপনার কর্তব্য হচ্ছে পানি কেনা বা গরম করা কিংবা অন্য যেভাবে শরিয়তের বিধান মোতাবেক ওজু করা যায় সেটা করা। যদি আপনি অপারগ হন এবং ঠান্ডা অতি তীব্র হয়, পানি ব্যবহারে বিপদ ঘটার আশংকা থাকে, পানি গরম করা বা আশপাশে কারো থেকে গরম পানি কেনার কোন উপায় না থাকে সেক্ষেত্রে আপনার ওজর গ্রহণযোগ্য এবং তায়াম্মুম করাই আপনার জন্য যথেষ্ট। যেহেতু আল্লাহ্‌ বলেছেন: “তোমরা সাধ্যানুযায়ী আল্লাহ্‌কে ভয় করো” এবং তিনি আরও বলেছেন: “পানি না পাও তবে পবিত্র মাটি দিয়ে তায়াম্মুম করবে: তা দ্বারা মুখমন্ডল ও হাত মাসেহ করবে।”[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬] যে ব্যক্তি পানি ব্যবহারে অক্ষম সে ব্যক্তির হুকুম যে ব্যক্তি পানি পায়নি তার হুকুমের অনুরূপ।”(ইমাম বিন বায;মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ; খণ্ড: ১০; পৃষ্ঠা: ১৯৯-২০০; গৃহীত: ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-৭০৫০৭)
.
উল্লেখ্য যে, উক্ত বিধান কেবল স্বপ্নদোষের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং স্বামী-স্ত্রীর সহবাস বা জাগ্রত অবস্থায় বীর্যপাতের মাধ্যমে জুনুবি (নাপাক) হওয়া, নারীদের হায়েয (ঋতুস্রাব) থেকে পবিত্র হওয়া এবং প্রসূতি নারীর নিফাস শেষে পবিত্রতা অর্জনের জন্য ফরয গোসলের ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ইসলামে আমানত সম্পর্কে বিস্তারিত

 প্রশ্ন: ইসলামে আমানতের সংজ্ঞা ও রক্ষার গুরুত্ব কী এবং আমানতের খেয়ানতের সংজ্ঞা ও এর শরয়ি বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর  ‘আমানত’ (الأمانة) একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ—বিশ্বস্ততা, আস্থা, নিরাপত্তা, তত্ত্বাবধান ও হেফাযত ইত্যাদি। প্রখ্যাত অভিধানবিদ ইবনু মানযূর (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الأمانة ضد الخيانة—অর্থাৎ আমানত হলো খেয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতার সম্পূর্ণ বিপরীত। ‘আমানত’-এর বহুবচন أمانات, যার দ্বারা বিশ্বস্ততা, আস্থা, নিরাপত্তা প্রদান, দায়িত্ব রক্ষা ও হেফাযতের অর্থ প্রকাশ পায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِلنَّاسِ وَأَمْنًا ‘যখন আমরা কা‘বা গৃহকে মানব জাতির জন্য সুরক্ষিত স্থান ও মানুষের জন্য মিলনস্থল করলাম”।(সূরা বাক্বারাহ ২/১২৫)। যদি কেউ আমানতদার ও বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত হয়, তবে তার কাছ থেকে ব্যক্তিগত জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে কেউ অনিশ্চয়তায় থাকে না। পরিভাষিক অর্থে, আমানত হলো সেই সমস্ত দায়িত্ব ও কর্তব্য যা একজন বান্দার উপর ফরজ করা হয়েছে, যেমন—সালাত, সিয়াম, যাকাত এবং ঋণ পরিশোধ।”
.
▪️প্রথমত: শারঈ দৃষ্টিকোণ থেকে আমানতের অর্থ:
.
ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় আমানতের দুটি অর্থ রয়েছে, একটি সাধারণ অর্থ এবং অপরটি নির্দিষ্ট অর্থ। আমানতের সাধারণ অর্থ ইসলামের সকল আদেশ-নিষেধের সাথে সম্পর্কিত। এর প্রমাণ হিসেবে আল্লাহ তাআলা যে আয়াতটি বলেছেন:اِنَّا عَرَضۡنَا الۡاَمَانَۃَ عَلَی السَّمٰوٰتِ وَ الۡاَرۡضِ وَ الۡجِبَالِ فَاَبَیۡنَ اَنۡ یَّحۡمِلۡنَهَا وَ اَشۡفَقۡنَ مِنۡهَا وَ حَمَلَهَا الۡاِنۡسَانُ ؕ اِنَّهٗ كَانَ ظَلُوۡمًا جَهُوۡلًا”নিশ্চয়ই আমরা তো আসমান, যমীন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত (আমানত বা নৈতিক দায়িত্ব বা সততা এবং আল্লাহর নির্ধারিত সকল কর্তব্য) পেশ করেছিলাম, কিন্তু তারা এটা (আল্লাহর আযাবের ভয়ে) বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শংকিত হল, আর মানুষ তা বহন করল; প্রকৃতপক্ষে, সে (নিজের প্রতি) অত্যন্ত জুলুমকারী, এবং (এর ফলাফল সম্পর্কে) খুবই অজ্ঞ।”(সূরা আহযাব: ৭২)
.
আয়াতে ‘আমানত’ বলতে মূলত শরিয়তের যাবতীয় বিধিবিধানকেই বোঝানো হয়েছে। এমনটিই বলেছেন, ইবনু আব্বাস (রাঃ), হাসান বসরী, মুজাহিদ, সাঈদ ইবনু জুবাইর, যাহহাক, ইবনু যায়দসহ অধিকাংশ মুফাসসির। (বিস্তারিত জানতে তাফসীরে তাবারী; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা; ৩৩৬–৩৪০), তাফসীরে ইবনে কাসীর; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৮৮–৪৮৯), আল-জামি‘ লি আহকামিল কুরআন; খণ্ড: ১৪; পৃষ্ঠা: ২৫২–২৫৩), এবং ফাতহুল কাদীর; খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৪৩৭)।
.
উক্ত আয়াতের তাফসিরে যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুফাসসিরকুল শিরোমণি, উম্মাহ’র শ্রেষ্ঠ ‘ইলমী ব্যক্তিত্ব, সাহাবী ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) [মৃত: ৬৮ হি.] বলেছেন:عُرِضَتْ عَلَى آدَمَ فَقَالَ : خُذْهَا بِمَا فِيهَا، فَإِنْ أَطَعْتَ غَفَرت لَكَ، وَإِنْ عَصَيت عَذَّبْتُكَ قَالَ : قَبِلْتُ، فَمَا كَانَ إِلاَّ قَدْرُ مَا بَيْنَ الْعَصْرِ إِلَى اللَّيْلِ مِنْ ذَلِكَ الْيَوْمِ، حَتَّى أَصَابَ الْخَطِيئَةَ-“আল্লাহ আদমকে বলেন, তুমি আমানত গ্রহণ কর এই মর্মে যে, যদি তুমি আনুগত্য কর, তাহ’লে আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। আর যদি অবাধ্যতা কর, তাহ’লে তোমাকে শাস্তি দেব। আদম বলল, আমি কবুল করলাম। অতঃপর আছর থেকে মাগরিবের মধ্যেই আদম ভুল করে বসেন”।(তাফসীর ইবনু জারীর; খণ্ড: ২০; পৃষ্ঠা: ৩৩৭)
.
ইমাম ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) “আমানাহ” শব্দের ব্যাখ্যা সম্পর্কে পূর্ববর্তী পণ্ডিতদের বেশ কিছু মতামত উদ্ধৃত করেছেন,সবগুলো মত উল্লেখ করে তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন;وكل هذه الأقوال لا تنافي بينها ، بل هي متفقة وراجعة إلى أنها : التكليف ، وقبول الأوامر والنواهي بشرطها ، وهو أنه إن قام بذلك أثيب ، وإن تركها عوقب ، فقبلها الإنسان على ضعفه وجهله وظلمه ، إلا من وفق الله ، وبالله المستعان”এই সকল মতামতের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; বরং এগুলো পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ। এগুলোর মূল কথা হলো: এটি (আমানত) হলো ‘তাকলীফ’ (শরীয়তের বিধান পালনের দায়িত্ব) এবং শর্তসাপেক্ষে আদেশ ও নিষেধসমূহ গ্রহণ করা।শর্তটি হলো;যদি সে এটি পালন করে তবে পুরস্কৃত হবে, আর যদি তা বর্জন করে তবে শাস্তি পাবে। মানুষ তার দুর্বলতা, অজ্ঞতা ও জুলুম (অবিচার) সত্ত্বেও এটি গ্রহণ করে নিয়েছে; তবে তারা ব্যতীত যাদের আল্লাহ তাওফীক দান করেছেন। আর আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করছি।”(তাফসিরে ইবনু কাসীর; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৮৯)
.
এই ব্যাখ্যাটিই ইমাম ইবনু জারীর আত্ব-ত্বাবারী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৩১০ হি.] গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন—إنه عُنِي بالأمانة في هذا الموضع جميع معاني الأمانات في الدين ، وأمانات الناس . وذلك أن الله لم يَخُصّ بقوله (عَرَضْنَا الأمَانَةَ) بعض معاني الأمانات لما وصفنا“এ বিষয়ে সবচেয়ে সঠিক মত হলো তাদের মত, যারা বলেছেন এখানে ‘আমানত’ বলতে দ্বীনের সকল প্রকার আমানত এবং মানুষের পারস্পরিক সব আমানতই উদ্দেশ্য। কারণ আল্লাহর বানী:”আমরা আমানত পেশ করলাম” এর মাধ্যমে আমানতের কোনো নির্দিষ্ট অর্থকে আলাদা করে সীমাবদ্ধ করেননি;যেমনটি আমরা পূর্বে ব্যাখ্যা করেছি।” (তাফসীরে আত-তাবারী: খণ্ড: ১৯: পৃ. ২০৪–২০৫)
.
ইমাম আবু ‘আব্দুল্লা-হ্ মুহাম্মাদ বিন আহমাদ আল ক্বুরত্বুবী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭১ হি.] বলেন:والأمانة تعمّ جميع وظائف الدّين على الصحيح من الأقوال ، وهو قول الجمهور “সঠিক মত অনুযায়ী আমানত দ্বীনের সকল দায়িত্বকে অন্তর্ভুক্ত করে এটাই অধিকাংশ আলেমের মত।” (তাফসীরে কুরতুবী; খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ২৪৪)
.
আব্দুর রহমান ইবনু নাছির আস-সা‘আদী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:جميع ما أوجبه الله على عبده أمانة ، على العبد حفظها بالقيام التام بها ، وكذلك يدخل في ذلك أمانات الآدميين ، كأمانات الأموال والأسرار ونحوهما ، فعلى العبد مراعاة الأمرين ، وأداء الأمانتين ( إن الله يأمركم أن تؤدوا الأمانات إلى أهلها ) “আল্লাহ তার বান্দার ওপর যা কিছু ফরজ করেছেন সবই আমানত। বান্দার কর্তব্য তা পূর্ণভাবে সংরক্ষণ ও আদায় করা। এর মধ্যে মানুষের পারস্পরিক আমানতও অন্তর্ভুক্ত যেমন সম্পদের আমানত, গোপন কথা এবং এ ধরনের অন্যান্য বিষয়। সুতরাং বান্দার ওপর আবশ্যক—এই উভয় প্রকার আমানতের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং উভয় আমানতই যথাযথভাবে আদায় করা। (আল্লাহ তাআলা বলেন):  “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে আমানতসমূহ তাদের প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দিতে আদেশ করেছেন।”(তাফসীরে সা‘আদী, পৃষ্ঠা: ৫৪৭)
.
ইমাম শানকিতী (রাহিমাহুল্লাহ ) বলেন:ذكر جل وعلا في هذه الآية الكريمة أنه عرض الأمانة ، وهي التكاليف مع ما يتبعها من ثواب وعقاب على السماوات والأرض والجبال ، وأنهن أبين أن يحملنها وأشفقن منها ، أي : خفن من عواقب حملها أن ينشأ لهن من ذلك عذاب الله وسخطه ، وهذا العرض والإباء والإشفاق كله حق ، وقد خلق الله للسماوات والأرض والجبال إدراكا يعلمه هو جل وعلا ، ونحن لا بعلمه ، وبذلك الإدراك أدركت عرض الأمانة عليها ، وأبت وأشفقت ، أي : خافت “এই আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও পর্বতমালার সামনে আমানত পেশ করেছেন। আর এই আমানত হলো (শরিয়তের) বিধিবিধান বা দায়িত্বসমূহ, যার সাথে পুরস্কার ও শাস্তি জড়িত। তারা তা বহন করতে অস্বীকার করেছে এবং এ থেকে শঙ্কা প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ, তারা এই আমানত বহনের পরিণাম সম্পর্কে ভীত ছিল যে, এর ফলে আল্লাহর আযাব ও তাঁর ক্রোধের শিকার হতে হয় কি না সেই আশঙ্কায়। এই যে আমানত পেশ করা, তাদের অস্বীকার করা এবং ভীত হওয়া—এর পুরোটাই সত্য ও বাস্তব। আল্লাহ তাআলা আসমান, জমিন ও পাহাড়-পর্বতের জন্য এমন এক প্রকার উপলব্ধি বা বোধশক্তি সৃষ্টি করেছেন যা কেবল আল্লাহই জানেন, আমরা তা জানি না। সেই বোধশক্তির মাধ্যমেই তারা তাদের ওপর আমানত পেশ করার বিষয়টি বুঝতে পেরেছে এবং তা গ্রহণে অস্বীকার করেছে ও শঙ্কা প্রকাশ করেছে; অর্থাৎ ভয় পেয়েছে।”(আদ্বা’উল বায়ান; খণ্ড: ৩৬; পৃষ্ঠা: ১৩৯)
.
▪️দ্বিতীয়ত: আমানতের বিশেষ অর্থ:
.
শরীয়তে বহু স্থানেই আমানত সংরক্ষণ ও খেয়ানত না করার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফিকহের গ্রন্থগুলো এবং সাধারণ মানুষের মুখে এই বিশেষ অর্থটিই বেশি প্রচলিত। এই অর্থে, আমানত হলো অন্যের অধিকার যা মানুষকে সংরক্ষণ করতে হবে এবং যা আদায় করা ফরজ বা ওয়াজিব। এটির তিনটি প্রসিদ্ধ রূপ বিদ্যমান।
প্রথম রূপ: চুক্তিভিত্তিক আর্থিক অধিকার যেমন আমানত (ওয়াদী‘আ), ঋণ, ভাড়া ইত্যাদি; অথবা চুক্তি ছাড়াও যেমন কুড়ানো জিনিস (লুক্বতা), হারানো সম্পদ যা কেউ পায়।আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ,গন্থে-এ বলা হয়েছে:
وبالتتبع تبين أن الأمانة قد استعملها الفقهاء بمعنيين :
أحدهما: بمعنى الشيء الذي يوجد عند الأمين ، وذلك يكون في :
أ – العقد الذي تكون الأمانة فيه هي المقصد الأصلي ، وهو الوديعة ، وهي العين التي توضع عند شخص ليحفظها، فهي أخص من الأمانة ، فكل وديعة أمانة ولا عكس.
ب – العقد الذي تكون الأمانة فيه ضمنا ، وليست أصلا ، بل تبعا ، كالإجارة والعارية والمضاربة والوكالة والشركة والرهن .
ج – ما كانت بدون عقد ، كاللقطة ، وكما إذا ألقت الريح في دار أحد مال جاره ، وذلك ما يسمى بالأمانات الشرعية “
“অনুসন্ধানের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয় যে,ফুকাহারা ‘আমানত’ শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহার করেছেন:
​প্রথমটি: এমন কোনো বস্তু যা আমানতদার ব্যক্তির কাছে গচ্ছিত থাকে। এটি মূলত নিচের ক্ষেত্রগুলোতে হয়ে থাকে:
(ক).এমন চুক্তি যেখানে আমানত রক্ষা করাই মূল উদ্দেশ্য: আর তা হলো ‘ওয়াদিয়া’ (গচ্ছিত রাখা)। এটি এমন একটি বস্তু যা কোনো ব্যক্তির কাছে সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়। এটি (ওয়াদিয়া) সাধারণ আমানতের চেয়ে আরও সুনির্দিষ্ট। তাই প্রতিটি ‘ওয়াদিয়া’ই আমানত, কিন্তু প্রতিটি ‘আমানত’ ই ‘ওয়াদিয়া’ নয়।
(খ) এমন চুক্তি যেখানে আমানত আনুষঙ্গিক বিষয় হিসেবে থাকে: অর্থাৎ এখানে আমানত মূল উদ্দেশ্য নয়, বরং অন্য কোনো চুক্তির অনুগামী হিসেবে আসে। যেমন— ইজারা (ভাড়া), আরিয়াহ (ধারে দেওয়া), মুদারাবাহ (অংশীদারিত্বের ব্যবসা), ওকালাহ (প্রতিনিধিত্ব), শিরকাহ (অংশীদারিত্ব) এবং রাহন (বন্ধক)।
.
(গ) যা কোনো চুক্তি ছাড়াই আমানত হিসেবে গণ্য হয়: যেমন— লুক্বাতা’ (কুড়িয়ে পাওয়া জিনিসপত্র )
অথবা যদি বাতাসের ঝাপটায় প্রতিবেশীর কোনো মাল কারও বাড়িতে এসে পড়ে। এগুলোকে ‘আমানত শারইয়্যাহ’ (শরয়ি আমানত) বলা হয়।”(মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ,খণ্ড;৬;পৃষ্ঠা;২৩৬)
.
দ্বিতীয় রূপ: মানুষের গোপন কথা বা রহস্য রক্ষা করা: আবু সাঈদ আল-খুদরি রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন:( إِنَّ مِنْ أَعْظَمِ الْأَمَانَةِ عِنْدَ اللهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ، الرَّجُلَ يُفْضِي إِلَى امْرَأَتِهِ ، وَتُفْضِي إِلَيْهِ ، ثُمَّ يَنْشُرُ سِرَّهَا ) “সে ব্যক্তি ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহ্‌র কাছে সর্বাপেক্ষা বড় আমানত খিয়ানতকারী যে তার স্ত্রীর সাথে মিলিত হয় এবং স্ত্রীও তার সাথে মিলিত হয়। অতঃপর সে তার স্ত্রীর গোপনীয়তা ফাঁস করে দেয়। ইবনু নুমায়র বলেন, “ইন্না মিন ‘আযিম” স্থলে “ইন্না ‘আযিম” (সবচেয়ে অধিক) হবে।”(সহীহ মুসলিম হা/৩৪৩৫)
.
জাবির ইবনু আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহি ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ( إِذَا حَدَّثَ الرَّجُلُ بِالْحَدِيثِ ثُمَّ الْتَفَتَ : فَهِيَ أَمَانَةٌ )”কোন ব্যক্তি কোন কথা বলার পর মুখ ঘুরালে (কেউ শুনেছে কিনা তা দেখলে) তা আমানতস্বরূপ।”(সুনানে আবু দাউদ হা/৪৮৬৮;তিরমিজি হা/১৯৫৯) ইমাম তিরমিজি রাহিমাহুল্লাহ হাদিসটি হাসান হাদিস বলেছেন এবং ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ বলেছেন)।
.
​তৃতীয় রূপ: দায়িত্ব ও সরকারি-বেসরকারি পদমর্যাদা:
যে কোনো দায়িত্ব বা পদই মূলত একটি আমানত। এটি যথাযথভাবে পালন করা এবং ন্যায়ের সাথে সম্পাদন করা সকলের ওপর ফরজ। উদাহরণস্বরূপ: শাসনের দায়িত্ব একটি আমানত, বিচারকের পদ একটি আমানত, কোনো প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজারের দায়িত্বও একটি আমানত, এমনকি পরিবারের দায়িত্বও একইভাবে আমানতের অন্তর্ভুক্ত। সংক্ষেপে, সকল পদ এবং দায়িত্বই আমানতের অংশ।
.
▪️আমানত রক্ষার শার’ঈ বিধান:
“শার‘ঈ দৃষ্টিতে, প্রতিটি সরকারি বা ব্যক্তিগত আমানত রক্ষা করা ওয়াজিব; অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম অনুসারে সতর্কতার সঙ্গে সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও পরিচালনা করা আবশ্যক। আমানতকে নষ্ট করা বা এতে খিয়ানত করা কঠোরভাবে হারাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:”হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি খিয়ানত করো না এবং জেনে শুনে তোমাদের অর্পিত আমানতেও খিয়ানত করো না।”(সূরা আনফাল: ২৭) অপর আয়াতে আরো বলেন:اِنَّ اللّٰهَ یَاۡمُرُكُمۡ اَنۡ تُؤَدُّوا الۡاَمٰنٰتِ اِلٰۤی اَهۡلِهَا “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দাও” (সূরা আন-নিসা ৪: ৫৮) এখান থেকে বোঝা যায়, প্রতিটি আমানত—ছোট হোক বা বড়—ই আমাদের দায়িত্ব ও সততার পরীক্ষা। আমানত রক্ষা করা শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, এটি ঈমানের অংশ। হাদিসে এসেছে,ইউসুফ ইবনু মাহাক আল-মাক্কি (রহঃ) থেকে বর্ণিতঃতিনি বলেন আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছেন:أَدِّ الأَمَانَةَ إِلَى مَنِ ائْتَمَنَكَ وَلاَ تَخُنْ مَنْ خَانَكَ”যে ব্যক্তি তোমার কাছে কিছু আমানত রেখেছে তাকে তা ফেরত দাও। আর যে ব্যক্তি তোমার সাথে খিয়ানাত করেছে তুমি তার সাথে খিয়ানাত করো না।”(তিরমিযী হা/১২৮৭; আবু দাউদ হা/৩৫৩৪)
.
আমানত রক্ষা করার ক্ষেত্রে মানুষের শ্রেণী বিভাগ:
.
আধুনিক সুফাসসির আব্দুর রহমান ইবনু নাছির আস-সা‘আদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত:১৩৭৬ হি:] বলেন: আমানত রক্ষার ক্ষেত্রে মানুষ তিন প্রকার। যথা-
(১) منافقون বা মুনাফিকরা। এদের বৈশিষ্ট্য হল,قاموا بها ظاهرا لا باطنا “তারা বাহ্যিকভাবে আমানত সম্পাদন করে, আন্তরিকভাবে নয়’। অর্থাৎ সালাত,সিয়াম, হজ্জ,জিহাদ ইত্যাদি কর্মগুলি দুনিয়ার স্বার্থে করে থাকে, আখেরাতের স্বার্থে নয়।
.
(২) مشركون বা মুশরিকরা। তাদের অবস্থা হল:تركوها ظاهرا وباطنا “তারা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে তা বর্জন করে। অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল (ﷺ) নবুঅত লাভের পর তা প্রচার করতে গেলে মূলতঃ মুশরিকদের সাথে সর্বপ্রথম দ্বন্দ্ব ও সংঘাত লেগে যায়। তারা প্রকাশ্যভাবে ইসলামের বিরোধিতা করতে থাকে। ফলে তাদের সহজেই চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু মুনাফিকরা বাহ্যিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করলেও অন্তরে কপটতা পোষণ করে বলে তাদেরকে সহজে চেনা যায় না। বস্তুত তাদের দ্বারাই দেশ, জাতি ও ধর্মের মারাত্মক ক্ষতি হয়।
.
(৩) مؤمنون বা মুমিনগণ। তাদের বৈশিষ্ট্য হল:قائمون بها ظاهرا وباطنا “তারা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যভাবে আমানত সম্পাদন করে থাকে”। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা উল্লিখিত তিন শ্রেণীর লোকদের আমলের প্রতিদান ও শাস্তি প্রদান প্রসঙ্গে বলেন:”পরিণামে আল্লাহ মুনাফিক পুরুষ ও মুনাফিক নারী এবং মুশরিক পুরুষ ও মুশরিক নারীকে শাস্তি দিবেন। আর মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল,পরম দয়ালু”।(সূরা আহযাব ৩৩/৭৩; তাফসীরে আস-সা‘দী পৃষ্ঠা: ৬২০)
.
▪️খেয়ানতের সংজ্ঞা এবং শরয়ি বিধান কী?
.
খিয়ানত হলো আমানতের বিপরীত। “খিয়ানত” শব্দটি এসেছে خَانَهُ (খানা) থেকে, যার অর্থ হলো– কেউ তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এর বিভিন্ন রূপ হলো:
خَوْنًا (খাওন) خيانة (খিয়ানত) مَخَانة (মাখানা) اختانه (ইখতানাহু) যে ব্যক্তি খিয়ানত করে, তাকে বলা হয়:
خائن (খায়েন) পুরুষের ক্ষেত্রে خائنة (খায়েনা) –নারী ক্ষেত্রে خؤون (খুওন) خَوَّان (খাওয়ান) এদের বহুবচন خانة (খানা) خَوَنة (খাওনা) خُوَّان (খুওয়ান)
(উৎস: বাশায়ির,“যাওয়িত তামঈয”, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৫৮২)
.
রাগিব ইসফাহানি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
(الخيانة مخالفة الحقّ بنقض العهد في السّرّ. ونقيض الخيانة: الأمانة، يقال: خُنْتُ فلانا، وخنت أمانة فلان)
“খিয়ানত হলো গোপনে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে সত্যের বিরোধিতা করা। খিয়ানতের বিপরীত হলো আমানত। বলা হয়: আমি অমুকের সঙ্গে খিয়ানত করেছি, এবং আমি অমুকের আমানতে খিয়ানত করেছি।”(মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন ৩০৫)
.
▪️খিয়ানতের পারিভাষিক অর্থ:
.
ত্বিব্বী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:(هي مخالفة الحق بنقض العهد في السر، والأظهر أنها شاملة لجميع التكاليف الشرعية) “খিয়ানত হলো গোপনে অঙ্গীকার ভঙ্গের মাধ্যমে সত্যের বিরোধিতা করা। স্পষ্টতই এটি সকল শারয়ি দায়িত্ব ও বিধানকে অন্তর্ভুক্ত করে। (মিরআতুল মাফাতীহ; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ২২৯)
.
জাহিজ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:الاستبداد بما يؤتمن الإنسان عليه من الأموال والأعراض والحرم وتملك ما يستودع، ومجاحدة مودعه) “খিয়ানত হলো মানুষকে যে সম্পদ, সম্মান, ইজ্জত-আব্রু ও পবিত্র বিষয়ের আমানত দেওয়া হয়, তাতে একচেটিয়া আচরণ করা, গচ্ছিত জিনিস নিজের করে নেওয়া এবং যিনি আমানত রেখেছেন তার সাথে অস্বীকার ও বিশ্বাসঘাতকতা করা।” (তাহযীবুল আখলাক পৃষ্ঠা: ৩১)
.
ইবনু আশূর (রাহিমাহুল্লাহ)বলেন:(وحقيقة الخيانة عمل من اؤتمن على شيء بضد ما اؤتمن لأجله بدون علم صاحب الأمانة) “খিয়ানতের প্রকৃত অর্থ হলো যে ব্যক্তির কাছে কোন কিছু আমানত রাখা হয়েছে, সে আমানতদাতার অজান্তে যে উদ্দেশ্যে আমানত রাখা হয়েছিল তার বিপরীত কাজে তা ব্যবহার করা। (আত তাহরীর ওয়াত তানবীর; পৃষ্ঠা: ২৪)
.
আমানতের খেয়ানত করা একদিকে যেমন কবীরা গোনাহ, অপরদিকে এটি মুনাফিকির একটি লক্ষণ। মহান আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَمَنْ يَغْلُلْ يَأْتِ بِمَا غَلَّ ‘যে ব্যক্তি যা খেয়ানত করে, তা নিয়ে সে ক্বিয়ামতের দিন হাযির হবে’ (আলে ইমরান ৩/১৬১) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেনঃ “হে মানুষ সকল! তোমাদের কাউকে কোন কাজে লাগালে যদি সে আমাদের থেকে কিছু লুকায় তবে সে তা কেয়ামতের দিন সাথে নিয়ে আসবে”(সহীহ মুসলিম হা/১৮৩৩) আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাদিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোন একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি করে।”(সহীহ বুখারী হা/৩৪ সহীহ মুসলিম হা/৫৮) সহীহ মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় এসেছে: وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى وَزَعَمَ أَنَّهُ مُسْلِمٌ “যদিও সে রোজা রাখে, নামাজ পড়ে এবং নিজেকে মুসলিম বলে দাবি করে।” সহীহ মুসলিম হা/৯০) এটি প্রমাণ করে যে, খেয়ানত বা বিশ্বাসঘাতকতা মুনাফিকের স্বভাব।মুসনাদে আহমাদে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:لا إِيمَانَ لِمَنْ لا أَمَانَةَ لَهُ وَلا دِينَ لِمَنْ لا عَهْدَ لَهُ “যার আমানতদারী নেই তার ঈমান নেই, আর যে অঙ্গীকার রক্ষা করে না তার দ্বীন নেই।” (মুসনাদে আহমাদ হা/১১৯৩৫) নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই বলে দোয়া করতেন:اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْجُوعِ فَإِنَّهُ بِئْسَ الضَّجِيعُ وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ الْخِيَانَةِ فَإِنَّهَا بِئْسَتِ الْبِطَانَةُ “(হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট ক্ষুধা ও দুর্ভিক্ষ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। কারণ তা (মানুষের) নিকৃষ্ট সাথী এবং আমি আপনার নিকট আরও আশ্রয় প্রার্থনা করি খেয়ানত (বিশ্বাসঘাতকতা) থেকে। কারণ তা গোপন চারিত্রিক দোষ)।(সুনানে নাসাঈ হা/৫৩৭৩, আবু দাউদ হা/১৩২৩, ইবনে মাজাহ: ৩৩৪৫।ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটি হাসান সহীহ বলেছেন)।প্রখ্যাত তাবেয়ী মায়মুন ইবনে মেহরান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:ثلاثة يؤدَّين إلى البَرّ والفاجر : الأمانة ، والعهد ، وصلة الرحم “তিনটি বিষয় এমন যা সৎ ও অসৎ (ভালো-মন্দ) উভয়ের সাথেই পালন করতে হয়: আমানত রক্ষা করা, অঙ্গীকার পূর্ণ করা এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।”
.
এছাড়াও পরকালে খিয়ানতকারীর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ যেমন: রসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,مَا مِنْ وَالٍ يَلِى رَعِيَّةً مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ، فَيَمُوْتُ وَهْوَ غَاشٌّ لَهُمْ، إِلاَّ حَرَّمَ اللهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ-“কোন দায়িত্বশীল ব্যক্তি মুসলিম জনসাধারণের দায়িত্ব লাভ করলো আর তার মৃত্যু হল এই হালতে যে, সে ছিল খিয়ানাতকারী, তাহলে আল্লাহ্‌ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।” (সহীহ মুসলিম ১/৬৩, হা/১৪২,মুসনাদে আহমাদ হা/২০১৩১) আরেক বর্ননায় এসেছে,আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূল (ﷺ) এরশাদ করেন,لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ عِنْدَ اسْتِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَفِي رِوَايَةٍ : لِكُلِّ غَادِرٍ لِوَاءٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرْفَعُ لَهُ بِقَدْرِ غَدْرِهِ أَلاَ وَلاَ غَادِرَ أَعْظَمُ غَدْرًا مِنْ أَمِيرِ عَامَّةٍ- ‘প্রত্যেক খেয়ানতকারীর জন্য ক্বিয়ামতের দিন একটি ঝান্ডা থাকবে, যা তার পিঠের পিছনে পুঁতে দেওয়া হবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তার খেয়ানতের পরিমাণ অনুযায়ী সেটি উঁচু হবে। সাবধান! জনগণের নেতার খেয়ানতের চাইতে বড় খেয়ানত আর হবেনা”(সহীহ মুসলিম হা/১৭৩৮; মিশকাত হা/৩৭২৭)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]- কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;কথা বা অন্য কোনো মাধ্যমে আমানতের খিয়ানত করার বিধান কী? আর এর কাফফারা কী?
উত্তরে শাইখ বলেছেন:
الحمد لله رب العالمين ، وصلى الله وسلم على نبينا محمدٍ خاتم النبين وإمام المتقين ، وعلى آله وأصحابه ومن تبعهم بإحسانٍ إلى يوم الدين :خيانة الأمانة من علامات النفاق، فإن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم قال: (آية المنافق ثلاث: إذا حدث كذب، وإذا وعد أخلف، وإذا اؤتمن خان)، ولا يحل لأحد أن يخون الأمانة سواء كانت قولية أو فعلية؛ لأنه إن فعل ذلك كانت فيه علامة من علامات النفاق، وربما تسري هذه حتى تصل إلى النفاق الأكبر -والعياذ بالله-، فإذا حدثك إنسان بحديث، وقال: إنه أمانة، حرم عليك أن تفشيه لأي أحد، وإذا عاملك معاملة، وقال: إنها أمانة، حرم عليك أن تفشيها لأي أحد، فإن فعلت، فقد خنت الأمانة,لكن لو فرض أنك أخطأت فخنت الأمانة، فالواجب عليك أن تتحلل ممن ائتمنك، لأنك ظلمته حيث خنته ، لعل الله يهديه فيحللك ، والذي ينبغي لمن جاءه أخوه معتذراً أن يعذره ويحلله حتى يكون أجره على الله عز وجل ، كما قال تعالى : (( فمن عفا وأصلح فأجره على الله )) ، ولا شك أن الأمانات تختلف في آثارها ، قد يكون إفشاء السر في هذه الأمانة عظيماً يترتب عليه مفاسد كثيرة ، وقد يكون متوسطاً وقد يكون سهلاً.
“সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর ওপর, যিনি শেষ নবী এবং মুত্তাকীদের ইমাম। আরও বর্ষিত হোক তাঁর পরিবার, সাহাবী এবং যাঁরা কিয়ামত পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তাঁকে অনুসরণ করবে, তাঁদের সবার ওপর।”আমানতে খেয়ানত নিফাকের লক্ষণ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: ‘মুনাফিকের নিদর্শন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে, আর আমানত দেওয়া হলে খেয়ানত করে।”কোনো ব্যক্তির জন্য কথাবার্তা হোক বা কাজ কোন আমানতেই খেয়ানত করা হালাল নয়। কারণ এতে নিফাকের একটি আলামত সৃষ্টি হয়। এমনকি তা বেড়ে বড় নিফাকে (আক্বীদাগত মুনাফেকি) পৌঁছাতে পারে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। উদাহরণস্বরূপ: যদি কেউ তোমাকে কোনো কথা বলে এবং বলে এটি আমানত তবে তা কারো কাছে প্রকাশ করা হারাম। আর যদি কোনো লেনদেনকে আমানত বলে তাও প্রকাশ করা হারাম। যদি প্রকাশ করো তবে তুমি আমানতে খেয়ানত করলে।ধরে নেওয়া যাক, আপনি ভুলবশত আমানতের খেয়ানত (বিশ্বাসভঙ্গ) করে ফেলেছেন; এমতাবস্থায় আপনার ওপর ওয়াজিব বা আবশ্যিক কর্তব্য হলো—যিনি আপনার নিকট আমানত রেখেছিলেন, তার কাছে ক্ষমা চেয়ে দায়মুক্ত হওয়া। কারণ খেয়ানত করার মাধ্যমে আপনি তার প্রতি জুলুম করেছেন। আশা করা যায়, আল্লাহ তাকে সঠিক বুঝ দান করবেন এবং তিনি আপনাকে ক্ষমা করে দেবেন।আর কোনো ব্যক্তি যখন তার ভাইয়ের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে আসে, তখন অপরজনের উচিত তাকে ক্ষমা করে দেওয়া এবং দায়মুক্ত করা, যাতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রতিদান নিশ্চিত হয়। যেমনটি আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:”অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপস-নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে নিহিত”(সূরা আশ-শূরা: ৪০)। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমানতের প্রভাব বা ফলাফল বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে।কোনো আমানতের ক্ষেত্রে গোপন তথ্য ফাঁস করা অনেক বড় অপরাধ হতে পারে যা অনেক ক্ষতির কারণ হয়, আবার কখনও তা মাঝারি বা সামান্য হতে পারে।”(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, পৃষ্ঠা: ৭২২)
.
সুতরাং যেহেতু আমানতের খেয়ানত করা বড় পাপের অন্তর্ভুক্ত, তাই এটি শুধুমাত্র তওবার মাধ্যমে মাফ করা যায়। যদি খেয়ানত আল্লাহ্‌র হক সংক্রান্ত হয়—যেমন সালাত আদায় না করা, রমজানের সিয়াম পালন না করা, কাফফারা দেওয়া থেকে বিরত থাকা ইত্যাদি—তাহলে তার জন্য অতিরিক্ত তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা আবশ্যক। আর যদি খেয়ানত মানুষের হকের সাথে সম্পর্কিত হয়—যেমন কারো সম্পদ দখল করা বা ক্ষতি করা—তাহলে তা যত দ্রুত সম্ভব ফেরত দিতে হবে বা ভুক্তভোগীর সম্মতি নিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। রাসূল (ﷺ) বলেন:مَنْ كَانَتْ لَهُ مَظْلَمَةٌ لأَحَدٍ مِنْ عِرْضِهِ أَوْ شَىْءٍ فَلْيَتَحَلَّلْهُ مِنْهُ الْيَوْمَ، قَبْلَ أَنْ لاَ يَكُوْنَ دِيْنَارٌ وَلاَ دِرْهَمٌ، إِنْ كَانَ لَهُ عَمَلٌ صَالِحٌ أُخِذَ مِنْهُ بِقَدْرِ مَظْلَمَتِهِ، وَإِنْ لَمْ تَكُنْ لَهُ حَسَنَاتٌ أُخِذَ مِنْ سَيِّئَاتِ صَاحِبِهِ فَحُمِلَ عَلَيْهِ-“যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের সম্ভ্রমহানি বা অন্য কোন বিষয়ে যুলুমের জন্য দায়ী থাকে, সে যেন আজই তার কাছ হতে মাফ করিয়ে নেয়, সেদিন আসার পূর্বে যেদিন তার কোন দীনার বা দিরহাম থাকবে না। সেদিন তার কোন সৎকর্ম না থাকলে তার যুলুমের পরিমাণ নেকী তার নিকট হতে নেয়া হবে আর তার কোন সৎকর্ম না থাকলে প্রতিপক্ষের পাপ হতে নিয়ে তার উপর চাপিয়ে দেয়া হবে।”(সহীহ বুখারী হা/২৪৪৯; মিশকাত হা/৫১২৬) (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।

January 10, 2026

বিক্রেতার নিজ মালিকানায় না থাকা পণ্য বিক্রির শারঈ বিধান এবং এ ধরনের লেনদেন বৈধ ও শুদ্ধ করার পদ্ধতিসমূহ

 প্রশ্ন: বিক্রেতার নিজ মালিকানায় না থাকা পণ্য বিক্রির শার’ঈ বিধান কী? এবং এ ধরনের লেনদেন বৈধ ও শুদ্ধ করার পদ্ধতিসমূহ কী কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: প্রথমত: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর বিক্রেতার নিজ মালিকানায় নেই এমন পণ্য বিক্রি করা শরীয়তসম্মত নয়। এ ধরনের লেনদেন শরীয়তের সাথে সাংঘর্ষিক। কারণ আপনি এমন কিছু বিক্রি করছেন যার মালিক আপনি না, আপনি এমন কিছু বিক্রি করছেন যা আপনার কাছে নেই,এমনকি ক্রেতাকে সেটার নিশ্চয়তা দেয়া ও হস্তান্তর করার ক্ষমতা আপনার নেই।ফলে এই লেনদেন প্রকৃতপক্ষে প্রতারণামূলক বিক্রয় ও জুয়ার সদৃশ এক অনিশ্চিত চুক্তিতে পরিণত হয়। এ ধরনের লেনদেন থেকে অসংখ্য বিরোধ ও ঝগড়া-বিবাদের আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ—হতে পারে, যে দামে পণ্যটি বিক্রি করা হয়েছে, পরবর্তীতে হঠাৎ তার মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে গেল; অথবা হতে পারে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্যটির স্টকই আর পাওয়া গেল না। এসব পরিস্থিতি উভয় পক্ষের জন্য ক্ষতি ও বিরোধের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।সুতরাং শরীয়তের দৃষ্টিতে এমন কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বিক্রি করা জায়েয নয়, যার মালিক বিক্রেতা নিজে নয় এবং যা তার দখলে নেই। অনুরূপভাবে, এমন কোনো বস্তু বিক্রি করাও বৈধ নয়, যা কেবল বর্ণনার মাধ্যমে বিক্রেতার জিম্মায় নির্ধারিত হলেও বাস্তবে তা অন্যের দখলে রয়েছে।তবে এর একমাত্র ব্যতিক্রম হলো ‘বাই‘উস সালাম’ পদ্ধতির বিক্রয়, যা শরীয়তের নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বৈধ।
.
হাদিসে এসেছে, হাকীম ইবনে হিযাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে কোনো লোক এসে এমন কিছু কিনতে চায় যা আমার কাছে নেই। আমি কি তার জন্য সেটি বাজার থেকে কিনে দিব?’ তিনি (ﷺ) বলেন:( لَا تَبِعْ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ ) “তোমার কাছে যে পণ্য নেই তা তুমি বিক্রি করো না।”[(হাদীসটি তিরমিযী হা/১২৩২; আবু দাউদ হা/৩৫০৩; নাসাঈ হা/৪৬১৩; ও ইবনে মাজাহ হা/২১৮৭) বর্ণনা করেন। শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহীহুত তিরমিযীতে এটিকে সহিহ বলে গণ্য করেন]
.
এ হাদীসের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) ক্রয়-বিক্রয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ি মূলনীতি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করেছেন। তা হলো যে পণ্য বিক্রয়ের সময় বিক্রেতার মালিকানায় বা দখলে নেই, সে পণ্য বিক্রি করা বৈধ নয়।অর্থাৎ শরিয়ত নির্দিষ্টভাবে এমন জিনিস বিক্রয় করতে নিষেধ করেছে, যা বিক্রেতার অধীনে বিদ্যমান নয়। এই নিষেধাজ্ঞার মূল কারণ হলো—যদি কোনো ব্যক্তি এমন জিনিস বিক্রি করে, যা তার মালিকানায় বা দখলে নেই, তাহলে সে নির্ধারিত সময়ে তা সরবরাহ করতে পারবে কি না—এ ব্যাপারে নিশ্চিত থাকা যায় না। কারণ একই বৈশিষ্ট্যের পণ্য সময়মতো পাওয়া যেতে পারে, আবার নাও পাওয়া যেতে পারে। এই অনিশ্চয়তাই প্রতারণার মূল উৎস। আর যে ক্রয়-বিক্রয়ে প্রতারণা, ধোঁকা বা অনিশ্চয়তা বিদ্যমান থাকে, শরিয়তের দৃষ্টিতে তা স্পষ্টতই নিষিদ্ধ।অতএব, হাদীসটির সারকথা হলো—ইসলামে এমন কোনো পণ্য বিক্রি করা জায়েয নয়, যা বিক্রেতার মালিকানায় বা বাস্তব দখলে নেই। অর্থাৎ নিজের কাছে মজুদ না থাকা কোনো নির্দিষ্ট পণ্যের ওপর বিক্রয়চুক্তি করা শরিয়তসম্মত নয়। উদাহরণস্বরূপ কোনো ক্রেতা একজন ব্যবসায়ীর কাছে এসে নির্দিষ্ট একটি পণ্য ক্রয় করতে চাইল, অথচ সে পণ্যটি তখন ব্যবসায়ীর কাছে মজুদ নেই। এরপর উভয়ে নগদ বা বাকিতে মূল্য নির্ধারণ করে চুক্তিতে আবদ্ধ হলো। এই অবস্থায় চুক্তির সময় পর্যন্ত বিক্রেতা উক্ত পণ্যের মালিক নয়। পরে সে বাজার থেকে পণ্যটি ক্রয় করে এনে ক্রেতার কাছে হস্তান্তর করলেও শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের ক্রয়–বিক্রয় বৈধ নয়। এর সহজ উদাহরণ হলো—পালিয়ে যাওয়া কোনো গরু বা মহিষ বিক্রি করা, অথবা এমন কোনো জমি বিক্রি করা, যা নিজের দখলে নেই কিংবা নিজের কর্তৃত্বের বাইরে রয়েছে। এসবই “নিজের কাছে নেই এমন জিনিস বিক্রি করার” নিষিদ্ধ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত।(বিস্তারিত দেখুন; আওনুল মা‘বূদ, খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ২৯১)।
.
হাদীসটির ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনু মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:وبيع ما ليس عندك يحتمل معنيين : أحدهما : أن يقول : أبيعك عبدا أو دارا معينة وهي غائبة ، فيشبه بيع الغرر لاحتمال أن تتلف أو لا يرضاها . ثانيهما : أن يقول : هذه الدار بكذا ، على أن أشتريها لك من صاحبها ، أو على أن يسلمها لك صاحبها ” . قال ابن حجر : ” وقصة حكيم موافقة للاحتمال الثاني “নিজের কাছে নেই এমন বস্তু বিক্রি করার দুটি অর্থ হতে পারে: (১),বিক্রেতার পক্ষ থেকে ক্রেতাকে এটা বলা যে, আমি তোমার কাছে অমুক একটি নির্দিষ্ট গোলাম বা একটি নির্দিষ্ট বাড়ি বিক্রি করছি, অথচ তার কাছে সেটি (বিক্রির সময়) সেখানে উপস্থিত নেই। এতে লেনদেনটি বাই‘উল গরার (অনিশ্চয়তাপূর্ণ বিক্রয়)-এর সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যায়। কারণ হতে পারে বস্তুটি ধ্বংস হয়ে গেছে অথবা ক্রেতা সেটি দেখে সন্তুষ্ট নাও হতে পারে। (২).বিক্রেতার পক্ষ থেকে ক্রেতাকে এটা বলা যে, আমি এই বাড়িটি তোমার কাছে এত দামে (নিদিষ্ট পরিমাণ অর্থের বিনিময়) বিক্রি করলাম’, এই শর্তে যে আমি এটি এর মালিকের কাছ থেকে কিনে দেব অথবা মালিক নিজেই তোমার কাছে বাড়িটি হস্তান্তর করবে। অর্থাৎ বিক্রেতা নিজে মালিক না হয়েই বিক্রয়ের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। হাফেয ইবনু হাজার আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, হাকিম কর্তৃক বর্ণিত ঘটনাটি দ্বিতীয় অর্থের সাথেই অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”(ইবনু হাজার; ফাতহুল বারী: খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৪৬০)
.
অপর বর্ননায় আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বর্ণনা করেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (لَا يَحِلُّ سَلَفٌ وَبَيْعٌ ، وَلَا شَرْطَانِ فِي بَيْعٍ ، وَلَا رِبْحُ مَا لَمْ تَضْمَنْ ، وَلَا بَيْعُ مَا لَيْسَ عِنْدَكَ ) “বিক্রয় ও ঋণ একসাথে বৈধ নয়, এক বিক্রয়ে দুই রকম শর্ত বৈধ নয়, তুমি যেটার জামিন হওনি সেটা থেকে মুনাফা গ্রহণ বৈধ নয় এবং যা তোমার কাছে নেই তা বিক্রি করা বৈধ নয়।”(হাদীসটি তিরমিযী হা/১২৩৪) বর্ণনা করে বলেন: হাদীসটি হাসান সহীহ। এছাড়া আবু দাউদ হা/৩৫০৪) ও নাসাঈ হা/৪৬১১) বর্ণনা করেন)
.
উপরোক্ত দুটি হাদিসের ব্যাখায় আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনু কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] বলেছেন:”فاتفق لفظُ الحديثين على نهيه صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عن بيع ما ليس عنده ، فهذا هو المحفوظُ مِن لفظه صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وهو يتضمن نوعاً مِن الغَرَرِ ؛ فإنه إذا باعه شيئاً معيَّناً ولَيس في ملكه ثم مضى لِيشتريه ، أو يسلمه له : كان متردداً بينَ الحصول وعدمه ، فكان غرراً يشبه القِمَار ، فَنُهِىَ عنه “দুই হাদীসের পাঠ একই যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন পণ্য বিক্রি করতে নিষেধ করেছেন যা ব্যক্তির কাছে নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বচন থেকে এটি সংরক্ষিত। এই প্রকার বিক্রয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ সে যদি কোনো নির্দিষ্ট পণ্য বিক্রি করে যা তার মালিকানায় নেই, তারপর সেটি ক্রয় করতে যায় কিংবা তাকে হস্তান্তর করতে যায় তখন সে পণ্যটি পাওয়া বা না-পাওয়ার মধ্যে দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে। তাই এটি অনিশ্চিত জুয়ার সদৃশ। তাই এটিকে নিষেধ করা হয়েছে।”(ইবনু কাইয়ুম, যাদুল মা’আদ ফী হাদই খাইরিল ইবাদ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৮০৮)
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) অস্তিত্বহীন জিনিসের বিক্রির প্রকারসমূহের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেন:”معدومٌ لا يُدرى يحصُل أو لا يحصُل ، ولا ثقة لبائعه بحصوله ، بل يكونُ المشتري منه على خطر ، فهذا الذي منع الشارعُ بيعَه ، لا لِكونه معدوماً بل لكونه غَرَراً ، فمنه صورةُ النهي التي تضمنها حديث حكيم بن حزام وابن عمرو رضي الله عنهما ؛ فإن البائعَ إذا باعَ ما ليس في مُلكه ولا له قُدرة على تسليمه ، ليذهب ويحصله ويسلِّمه إلى المشتري : كان ذلك شبيهاً بالقمار والمخاطرة مِن غير حاجة بهما إلى هذا العقدِ ، ولا تتوقَّفُ مصلحتُهما عليه “এমন অস্তিত্বহীন বস্তু যা পাওয়া যাবে কি; যাবে না জানা নেই, বিক্রেতার এটি পাওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা নেই, বরং তার থেকে ক্রয়কারী ঝুঁকির মধ্যে থাকে; এ ধরণের বস্তু বিক্রয় করা শরীয়তপ্রণেতা নিষিদ্ধ করেছেন। এ নিষেধাজ্ঞা বস্তুটি অস্তিত্বহীন হওয়ার কারণে নয়; বরং অনিশ্চয়তার কারণে। এ শ্রেণীর বিক্রয়ের একটি রূপ হাকীম ইবনে হিযাম ও ইবনে আমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বর্ণিত হাদীসে উদ্ধৃত হয়েছে। বিক্রেতা যদি এমন কিছু বিক্রি করে যা তার মালিকানায় নেই এবং যা হস্তান্তর করার ক্ষমতা তার নেই; কিন্তু সে গিয়ে বস্তুটি সংগ্রহ করে ক্রেতাকে হস্তান্তর করবে; এমন লেনদেন জুয়া ও ঝুঁকির সদৃশ। অথচ এমন লেনদেনে এ দুটোর কোনো প্রয়োজন নেই এবং তাদের স্বার্থ এর উপর নির্ভর করে না।”(ইবনু কাইয়ুম, যাদুল মা’আদ ফী হাদই খাইরিল ইবাদ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৮০১০)
.
একইভাবে দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে কিছু ক্রেতা অনলাইনের মাধ্যমে পণ্য ক্রয় করার পর তা বাস্তবে নিজ দখলে গ্রহণ করা বা গুদামঘরে হস্তগত করার আগেই অন্য কারো কাছে বিক্রি করে দেয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের লেনদেনও বৈধ নয়। কারণ ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, পণ্য পূর্ণভাবে দখল ও হস্তগত হওয়ার পূর্বে তা বিক্রয় করা অনুমোদিত নয়। তবে প্রয়োজনে ক্রেতা যদি পণ্যটি যেখানে সংরক্ষিত রয়েছে, সেখান থেকেই নিজের নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে (যেমন নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করে বা হস্তান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করে) বিক্রি করে, তাহলে তা শরিয়তসম্মত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
প্রখ্যাত সাহাবী ইবনে উমর (রাদিআল্লাহু আনহু) বলেন:ابْتَعْتُ زَيْتًا فِي السُّوقِ فَلَمَّا اسْتَوْجَبْتُهُ لِنَفْسِي لَقِيَنِي رَجُلٌ فَأَعْطَانِي بِهِ رِبْحًا حَسَنًا فَأَرَدْتُ أَنْ أَضْرِبَ عَلَى يَدِهِ فَأَخَذَ رَجُلٌ مِنْ خَلْفِي بِذِرَاعِي فَالْتَفَتُّ فَإِذَا زَيْدُ بْنُ ثَابِتٍ فَقَالَ : لَا تَبِعْهُ حَيْثُ ابْتَعْتَهُ حَتَّى تَحُوزَهُ إِلَى رَحْلِكَ فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ( نَهَى أَنْ تُبَاعَ السِّلَعُ حَيْثُ تُبْتَاعُ حَتَّى يَحُوزَهَا التُّجَّارُ إِلَى رِحَالِهِمْ )”আমি বাজার থেকে তেল ক্রয় করলাম। ক্রয় পাকাপাকি হবার পর একজন লোক আমার কাছে এসে আমাকে তাতে একটা ভাল লাভ দিতে চাইলো। আমিও তার হাতে হাত মেরে বিক্রয় পাকাপাকি করতে চাইলাম। হঠাৎ করে এক লোক পেছন থেকে আমার বাহু ধরে ফেলল। আমি পেছনে চেয়ে দেখলাম, তিনি যাইদ ইবনে সাবেত। তিনি বললেন: ‘যেখানে ক্রয় করবেন ঐ স্থানে বিক্রয় করবেন না, যতক্ষণ আপনার স্থানে নিয়ে না যান। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্রয় করার স্থানে পণ্য বিক্রয় করতে নিষেধ করেছেন, যতক্ষণ না তা ক্রেতা তার ডেরায় বা স্থানে নিয়ে যায়।”(হাদীসটি আবু দাউদ হা/৩৪৯৯) বর্ণনা করেন।শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) সহিহ আবি দাউদে এটিকে হাসান বলে গণ্য করেন)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] উপর্যুক্ত তিনটি হাদীস উল্লেখ করার পরে বলেন:” ومِن هذه الأحاديث وما جاء في معناها يتضح لطالب الحق أنه لا يجوز للمسلم أن يبيع سلعة ليست في ملكه ثم يذهب فيشتريها ، بل الواجب تأخير بيعها حتى يشتريها ويحوزها إلى ملكه ، ويتضح أيضا أن ما يفعله كثير من الناس من بيع السلع وهي في محل البائع قبل نقلها إلى ملك المشتري أو إلى السوق أمر لا يجوز ؛ لما فيه من مخالفة سنة الرسول صلى الله عليه وسلم ، ولما فيه من التلاعب بالمعاملات وعدم التقيد فيها بالشرع المطهر ، وفي ذلك من الفساد والشرور والعواقب الوخيمة ما لا يحصيه إلا الله عز وجل ، نسأل الله لنا ولجميع المسلمين التوفيق للتمسك بشرعه والحذر مما يخالفه “উক্ত হাদীস এবং এর সমার্থক হাদীস থেকে সত্যান্বেষী ব্যক্তির কাছে স্পষ্ট যে কোনো মুসলিমের জন্য এমন পণ্য বিক্রি করা জায়েয নেই যা তার মালিকানায় নেই, পরবর্তীতে সে গিয়ে ওটি ক্রয় করবে। বরং তার উপর আবশ্যক হলো: পণ্যটি কিনে নিজের মালিকানায় আনা অবধি বিক্রয়কে বিলম্বিত করা। এতে আরো স্পষ্ট হয় যে অনেক মানুষ যে কাজটি করে, তথা পণ্যটি ক্রেতার মালিকানায় কিংবা বাজারে আনার আগে বিক্রেতার দোকানে থাকতেই বিক্রি করে ফেলা— সেটি জায়েয নেই। কারণ এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ বিরোধী। অধিকন্তু এটি লেনদেন নিয়ে খেল-তামাশা এবং পবিত্র শরীয়ত অনুসরণ না করার নামান্তর। এতে এমন অনিষ্ট, ক্ষতি ও মন্দ পরিণতি রয়েছে যার পরিমাণ আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের ও সমস্ত মুসলমানের জন্য তার শরীয়ত আঁকড়ে ধরার এবং শরীয়তের বিরোধী হয় এমন কিছু থেকে সতর্ক থাকার তৌফিক কামনা করছি।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৫২-৫৩)
.
শাইখ ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন, ‘বিশুদ্ধ ব্যবসা-বাণিজ্যের কিছু শরী‘আতসম্মত নিয়ম-নীতি রয়েছে। শারঈ ব্যবসার একটি নিয়ম হল, ‘মানুষ তার মালিকানাধীন ও অধিকারভুক্ত জিনিস ক্রয়-বিক্রয় করবে’। কিন্তু আজ শেয়ার বাজারে বা অন্যান্য দোকানে দেখা যায় অধিকাংশ মানুষ এমন জিনিস ক্রয়-বিক্রয় করে, যা তার মালিকানাধীন ও অধিকারভুক্ত নয় এবং সেটি তার আয়ত্তেও নেই। শরী‘আতের আলোকে এরূপ ব্যবসা নিষিদ্ধ। সাধারণত শেয়ার ব্যবসায় পণ্য নিজ আয়ত্বে না নিয়েই ক্রয়-বিক্রয় করা হয়। অথচ শরী‘আতের দৃষ্টিতে ক্রয়কৃত বস্তু হস্তগত হওয়ার পূর্বে বিক্রয় করা হারাম। ইবনু উমার (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, ‘আমরা রাসূল (ﷺ)-এর যুগে খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করতাম। তখন তিনি আমাদের নিকট এ মর্মে আদেশ দিয়ে লোক পাঠাতেন যে, ঐ ক্রয়কৃত মাল বিক্রয় করার পূর্বেই যেন ক্রয়ের স্থান হতে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। বরং নিজেদের ঘরে তুলে নেয়ার আগেই বিক্রয় করলে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হত’ (সহীহ বুখারী, হা/২১৩৭, ২১৩১; সহীহ মুসলিম, হা/১৫২৭)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন খাদ্যদ্রব্য ক্রয় করবে, সে তা নিজ আয়ত্বে নেয়ার পূর্বে বিক্রয় করতে পারবে না’ (সহীহ বুখারী, হা/২১৩৬; সহীহ মুসলিম, হা/১৫২৫)। রাবী তাঊস (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমি ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এটি কিভাবে হয়ে থাকে’? তিনি বললেন, ‘এটি এভাবে হয়ে থাকে যে, দিরহামের বিনিময়ে আদান-প্রদান হয়, অথচ পণ্যদ্রব্য অনুপস্থিত থাকে’ (সহীহ বুখারী, হা/২১৩২, ২১৩৫; সহীহ মুসলিম, হা/১৫২৫)। ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) আরো বলেন, ‘আমি মনে করি, প্রত্যেক পণ্যের ব্যাপারে অনুরূপ নির্দেশ প্রযোজ্য হবে’ (সহীহ বুখারী, হা/২১৩৫, ২১৩২; আল মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ, ২৫/২১৮-২১৯; ইসলাম সাওয়াল ওয়া জাওয়াব, ফৎওয়া নং-১২৪৩১১)
.
দ্বিতীয়ত: বিক্রেতার মালিকানায় নেই এমন পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে শরীয়তসম্মতভাবে লেনদেন শুদ্ধ করার পদ্ধতি কী?
.
শরীয়তের দৃষ্টিতে একজন ব্যবসায়ীর ক্রয়-বিক্রয় যেন বৈধ, স্বচ্ছ ও সঠিক হয়—সে জন্য তার করণীয় হলো নিম্নোক্ত বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া:
.
(১).পণ্য ক্রয় করতে আগ্রহী ব্যক্তির কাছে আপনি পণ্য এমনভাবে পেশ করবেন যেন সেটির ব্যাপারে অজ্ঞতা কেটে যায় এবং বিবাদের অবকাশ না থাকে। আপনি পণ্যের মালিক হলে আপনি কত দামে পণ্যটি বিক্রি করবেন সেটি নির্ধারণ করবেন। ক্রেতা আপনাকে এই মূল্যে পণ্যটি কেনার ওয়াদা দিবে। তবে আপনি বিক্রি করতে বাধ্য নন এবং তারাও ক্রয় করতে বাধ্য নন। বরং উভয় পক্ষের লেনদেন করা কিংবা না করার স্বাধীনতা থাকবে। আপনি যখন শরীয়তসম্মত পন্থায় পণ্যের মালিক হবেন এবং এরপর ক্রেতার সাথে বিক্রি করার চুক্তি করবেন, তখন এই চুক্তিটি উভয়পক্ষের জন্য অনিবার্য হয়ে যাবে এবং এটি বিক্রয়ের সুবিদিত বিধানসমূহ অধিগ্রহণ করবে। এই প্রকার বিক্রির নাম ‘ওয়াদার বিক্রি’। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন;বিন বায;(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৬৮-৬৯)
.
(২).আপনি পণ্যটি কিনতে আগ্রহী ব্যক্তির কাছে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশনের বিনিময়ে কিংবা পণ্যের মূলের উপর একটি নির্দিষ্ট পার্সেন্টেজের বিনিময়ে সেটি বিক্রি করতে পারেন। আপনি মানুষদের কাছে পণ্য উপস্থাপন করবেন এবং একটি নির্দিষ্ট এমাউন্ট নির্ধারণ করে দিবেন। যেমন ধরুন: প্রত্যেক লেনদেনের জন্য দশ ডলার করে কিংবা ক্রয়ের ইনভয়েসের ২ শতাংশ করে। এই পরিমাণ অর্থ বা শতাংশ পণ্য ক্রয়ে আপনার কষ্ট ও ক্লান্তির বিনিময় হিসেবে আপনাকে দেওয়া হবে।আপনি যেমনিভাবে ক্রেতাদের এজেন্ট হতে পারেন, তেমনিভাবে বিক্রেতাদের এজেন্টও হতে পারেন।কারন শর্ত মোতাবেক বা লোকরীতি মোতাবেক ক্রেতা বা বিক্রেতা কিংবা উভয়ের কাছ থেকে দালালির জন্য কমিশন গ্রহণ করা জায়েয। এটি মালেকী মাযহাবের অভিমত। যদি কোনো শর্ত বা লোকরীতি না থাকে তাহলে তাদের মতে বিক্রেতা এটি প্রদান করবে।
.
ড. আব্দুর রহমান ইবনে সালেহ আল-আত্বরাম (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:فإذا لم يكن شرط ولا عرف ، فالظاهر أن يقال : إن الأجرة على من وسّطه منهما ، فلو وسطه البائع في البيع كانت الأجرة عليه ، ولو وسطه المشتري لزمته الأجرة ، فإن وسطاه كانت بينهما”যদি কোনো শর্ত এবং লোকরীতি না থাকে তাহলে অগ্রগণ্য অভিমত হচ্ছে এই যে: ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে যে তাকে (এজেন্ট) দালাল নিযুক্ত করেছে সে তার পারিশ্রমিক দিবে। যদি বিক্রেতা তাকে দালাল নিযুক্ত করে তাহলে বিক্রেতা পারিশ্রমিক দিবে। যদি ক্রেতা তাকে দালাল নিযুক্ত করে তাহলে ক্রেতার উপর পারিশ্রমিক আবশ্যক হবে। আর যদি উভয়ে তাকে দালাল নিযুক্ত করে তাহলে উভয়ের মিলে তার পারিশ্রমিক প্রদান করবে।”(আল-ওয়াসাত্বাহ আত-তিজারিয়্যাহ; পৃষ্ঠা: ৩৮২) থেকে সমাপ্ত, আরো দেখুন: হাশিয়াতুদ দুসূকী; ৩/১২৯)
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল;”দালাল কী পরিমাণ কমিশন নিবে সেটি নিয়ে অনেক মতভেদ দেখা গিয়েছে। কখনো ২.৫% আবার কখনো ৫% নিচ্ছে। শরীয়ত অনুযায়ী সে কতটুকু নিবে? নাকি এটি বিক্রেতা ও দালালের মধ্যকার চুক্তি মোতাবেক হবে?
উত্তরে স্থায়ী কমিটির আলিমগন বলেন: إذا حصل اتفاق بين الدلال والبائع والمشتري على أن يأخذ من المشتري أو من البائع أو منهما معا سعيا معلوما جاز ذلك، ولا تحديد للسعي بنسبة معينة ، بل ما حصل عليه الاتفاق والتراضي ممن يدفع السعي جاز، لكن ينبغي أن يكون في حدود ما جرت به العادة بين الناس ، مما يحصل به نفع الدلال في مقابل ما بذله من وساطة وجهد لإتمام البيع بين البائع والمشتري، ولا يكون فيه ضرر على البائع أو المشتري بزيادته فوق المعتاد “যদি দালাল, বিক্রেতা ও ক্রেতার মাঝে কোন চুক্তি থাকে যে দালাল ক্রেতা থেকে বা বিক্রেতা থেকে অথবা উভয়ের থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ কমিশন গ্রহণ করবে তাহলে সেটি জায়েয। দালালের কমিশনের নির্দিষ্ট কোন পার্সেন্টেজ নাই। বরং যে ব্যক্তি কমিশন প্রদান করবে তার সাথে চুক্তি ও সে যা দিতে রাজী সেটাই জায়েয হবে। কিন্তু সেটি লোকাচারের সীমারেখায় হওয়া উচিত; যাতে করে দালাল ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে ক্রয়-বিক্রয় সম্পন্ন করার জন্য যে পরিশ্রম ও দালালি করেছে এর বিপরীতে সে লাভবান হয়। আবার এতে করে যেন ক্রেতা বা বিক্রেতার উপর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ধার্য হয়ে তাদের কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ২৯; গৃহীত ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-১৮৩১০০)
.
তবে জেনে রাখা ভাল যে,যদি দালাল ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে কোনো একজনের দালালি করে তাহলে তার জন্য অন্য পক্ষের সাথে মূল্য বৃদ্ধি অথবা হ্রাসের লক্ষ্যে যোগসাজশ করা জায়েয নেই। কারণ এটি ধোঁকা ও আমানতের খেয়ানতের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষতঃ যদি দালাল নিজেই ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি সম্পন্ন করে। কেননা সেক্ষেত্রে সে উকিল (এজেন্ট)। আর উকিল আমানতদার। সে যা লাভ করবে সেটি তার মক্কেলের প্রাপ্য।যেমন;মাত্বালিবু উলিন্নুহা’ গ্রন্থে এসেছে:(وهبة بائعٍ لوكيلٍ ) اشترى منه , ( كنقصٍ ) من الثمن , فتُلحق بالعقد ( لأنها لموكله)‘উকিল যে বিক্রেতা থেকে ক্রয় করেছে সেই বিক্রেতা উকিলকে কোন উপহার দিলে সেটি মূলচুক্তিতে যুক্ত হবে; যেহেতু সেই উপহার উকিলের মক্কেলের প্রাপ্য।”(মাত্বালিবু উলিন্নুহা; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১৩২)
.
৩) তৃতীয় আরেকটি বৈধ পদ্ধতি হলো ‘বাইউস সালাম’ বা ‘সালাফ’, যা মূলত অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়কে বোঝায়। ‘সালাম’ শব্দের অর্থই হলো অগ্রিম লেনদেন। শরয়ি পরিভাষায়, বাইউস্ সালাম এমন এক ধরনের হালাল পন্যের ক্রয়-বিক্রয়, যেখানে বিক্রেতা অগ্রিমভাবে নিদিষ্ট পন্যের সম্পূর্ণ মূল্য গ্রহণ করে এই দায়ভার গ্রহণ করে যে, সে ভবিষ্যতের একটি নির্ধারিত তারিখে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পণ্য ক্রেতার নিকট সরবরাহ করবে। এ ক্ষেত্রে মূল্য নগদে পরিশোধিত হয়, কিন্তু বিক্রিত পণ্যের সরবরাহ বিলম্বিত থাকে।বাইউস্ সালামের ক্ষেত্রে বিক্রয়ের সময় পণ্য উপস্থিত না থাকা ক্রয়–বিক্রয়ের শুদ্ধতার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না। কারণ, সালাম পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যই হলো—এটি উপস্থিত পণ্য বিক্রির শর্তাধীন নয়। বরং এটি এমন একটি বিক্রয়, যেখানে পণ্যের গুণাগুণ ও সরবরাহের সময়সীমা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকে। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বিক্রেতা যদি নির্ধারিত বৈশিষ্ট্যের পণ্য ক্রেতার নিকট হস্তান্তর করে, তবে সে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভ করে।এ কারণেই আলেমগণ বাইউস্ সালামের জায়েয হওয়ার ক্ষেত্রে বিক্রয়ের সময় পণ্য বিক্রেতার মালিকানায় বা হেফাজতে থাকা শর্ত করেননি; বরং তারা শর্ত করেছেন—নির্ধারিত সময়ে উক্ত পণ্য সরবরাহ করা নিশ্চিত হতে হবে।এ বিষয়ে হাফিয ইবনু হাজার আল-আসকালানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:واتفق العلماء على مشروعيته”অর্থাৎ,আলেমগণের সর্বসম্মতিক্রমে বাইউস্ সালাম শরয়ি দৃষ্টিতে বৈধ।”(ফাতহুল বারী, খণ্ড: ৭,পৃষ্ঠা: ৭৬)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বানী: “তোমার কাছে যা নেই তা বিক্রি করো না”-এর সঙ্গে শরিয়তে বাই‘উস সালাম পদ্ধতিতে ক্রয়-বিক্রয় বৈধ হওয়ার বিষয়টির মধ্যে কীভাবে সমন্বয় সাধিত হয়? তিনি উত্তর দিয়েছেন:السلم هو ع شيء موصوف في الذمة ، فالفرق أن قوله صلى الله عليه وسلم ( لا تبع ما ليس عندك ) يقصد المعين . أما الموصوف في الذمة : فهذا غير معين .ولهذا نطالب الذي باع الشيء الموصوف بالذمة ، نطالبه بإيجاده على كل حال .وأما الشيء المعين لو تلف ، ما نطالبه به“সালাম হচ্ছে এমন একটি চুক্তি, যা দায়িত্বের (যিম্মাহ্‌র) মধ্যে নির্ধারিত গুণাবলিসম্পন্ন কোনো বস্তুর ওপর সম্পাদিত হয়।অতএব পার্থক্য হলো নবী (ﷺ) এর বাণী:”তোমার কাছে যা নেই, তা বিক্রি করো না”—এর উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত কোনো বস্তু। আর যেটি দায়িত্বের মধ্যে নির্ধারিত গুণাবলিসহ বর্ণিত,তা কোনো নির্দিষ্ট একক বস্তু নয়।এই কারণেই, যে ব্যক্তি যিম্মাহ্‌র মধ্যে নির্ধারিত গুণাবলিসম্পন্ন কোনো বস্তু বিক্রি করেছে, আমরা তাকে সব অবস্থাতেই তা সরবরাহ করতে বাধ্য করি।পক্ষান্তরে, যদি বিক্রিত বস্তুটি নির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত কোনো বস্তু হয় এবং তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে আমরা তাকে তার বিকল্প সরবরাহ করতে বাধ্য করি না।”(ইবনু উসাইমীন; আল-কাফী: ১/২৭৪)
.
বাইউস সালাম জায়েজ হওয়ার পক্ষে অন্যতম দলিল হলো:ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন,قَدِمَ النَّبِيُّ ﷺ الْمَدِيْنَةَ وَهُمْ يُسْلِفُوْنَ بِالتَّمْرِ(وفيْ رِوَايَةِ مُسْلِمٍ فِي الثِّمَارِ السَّنَةَ) السَّنَتَيْنِ وَالثَّلَاثَ فَقَالَ مَنْ أَسْلَفَ فِيْ شَيْءٍ فَفِيْ كَيْلٍ مَعْلُوْمٍ وَوَزْنٍ مَعْلُوْمٍ إِلَى أَجَلٍ مَعْلُوْمٍ “আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যখন মদীনায় আসেন তখন মদীনাবাসী ফলে বা খেজুরে এক, দুই ও তিন বছরের মেয়াদে সালাম (অর্থাৎ অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়) করতেন। আল্লাহর রাসূল (ﷺ) বললেন, কোন ব্যক্তি সালাম (অর্থাৎ অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয়) করলে, সে যেন নির্ধারিত পরিমাপে এবং নির্দিষ্ট ওযনে এবং নির্দিষ্ট মেয়াদে অগ্রিম ক্রয়-বিক্রয় করে”।(সহীহ বুখারী, হা/২২৩৯; সহীহ মুসলিম, হা/১৬০৪)।এই হাদীসে রাসূল (ﷺ) বিশেষ কয়েকটি শর্তসাপেক্ষে বাইয়ে সালাম চুক্তির অনুমতি দিয়েছেন। যেমন (১)- বাইয়ে সালাম জায়েয হওয়ার জন্য যরূরী হল, ক্রেতা চুক্তির সময়ই বিক্রেতাকে সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ করবে। কেননা, চুক্তির সময় ক্রেতা যদি সম্পূর্ণ মূল্য পরিশোধ না করে, তাহলে তা ঋণের বিনিময়ে ঋণ বিক্রির সাদৃশ্য হয়ে যাবে, যা করতে রাসূল (ﷺ) নিষেধ করেছেন (আল-মুগনী, খণ্ড: ৪; পৃষ্ঠা: ৩৭; ইবনু উসাইমীন, আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৪৪৪, কুয়েতি ফিকাহ বিশ্বকোষ; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ১৭৬ পৃ.)। (২)-বাইয়ে সালাম শুধু সেই সব পণ্য দ্রব্যে জায়েয হবে, যে সব পণ্যের কোয়ালিটি বা গুণগত মান, পরিমাণ, পরিমাপ ও সংখ্যা পূর্বেই পরিপূর্ণরূপে নির্ধারণ করা সম্ভব। (৩)-যে পণ্যে সালাম করার ইচ্ছা পোষণ করবে, তার ধরণ এবং গুণগত মান সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করে নেয়াও অপিরহার্য, যাতে সেই পণ্যে এমন কোন অস্পষ্টতা বিদ্যমান না থাকে, যা পরবর্তীতে কলহ-কোন্দলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে সম্ভাব্য সকল বিষয় বিশদভাবে উল্লেখ থাকা উচিত। (৪)- কোন রকম অস্পষ্টতা ব্যতীত বিক্রিতব্য দ্রব্যের পরিমাণ, পরিমাপ ও সংখ্যাও নির্দিষ্ট করে নেয়া অপরিহার্য। ৫- বিক্রিতব্য জিনিস পরিশোধের তারিখ এবং স্থানও চুক্তিতে নির্ধারণ করে নেয়া অপরিহার্য ।
.
পরিশেষে আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সকলকে হালাল রিজিক উপার্জন করার তৌফিক দান করেন। (আল্লাহই সর্বজ্ঞ)।
▬▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

Translate