প্রশ্ন: রাতে স্বপ্নদোষ হলে এই শীতের সকালে গোসল সম্ভব নয়। তাহলে এ ক্ষেত্রে নামাজ পড়তে চাইলে কী করা উচিত?
January 11, 2025
প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ফরজ গোসলের বিধান
রজব মাস সম্পর্কিত কতিপয় জাল ও জঈফ হাদিস
রজব মাস সম্পর্কে আমাদের সমাজে লোকমুখে, ইন্টারনেটে বা বিভিন্ন ইসলামিক বই-পুস্তকে অনেক হাদিস প্রচলিত রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কিছু হাদিস মুহাদ্দিসদের মানদণ্ডে সহিহ নয় আর কিছু হাদিস এমন রয়েছে যেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।
এ ধরণের কতিপয় হাদিস সম্পর্কে নিম্নে পর্যালোচনা পেশ করা হলো:
🚫 ক. রজব মাস সম্পর্কে কয়েকটি দুর্বল হাদিস:
● ১. “জান্নাতে একটি নহর আছে যাকে বলা হয় রজব। যার পানি দুধের চেয়ে সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্টি। যে ব্যক্তি রজব মাসে একদিন রোজা রাখবে তাকে সেই নহরের পানি পান করতে দেয়া হবে।”
ইবনে হাজার রহ. বলেন, হাদিসটি বর্ণনা করেছেন, আবুল কাসেম আত তাইমী তার আত তারগীব ওয়াত তারহীব কিতাবে, হাফেয আসপাহানী ফাযলুস সিয়াম কিতাবে, বাইহাকী, ফাযায়েলুল আওকাত কিতাবে, ইবনে শাহীন আত তারগীব ওয়াত তারহীব কিতাবে।
এ হাদিসটি দুর্বল। ইবনুল জাওযী ইলালুল মুতানাহিয়া গ্রন্থে বলেন, এ হাদিসের বর্ণনা সূত্রে একাধিক অজ্ঞাত রাবি রয়েছে। তাই এ হাদিসের সনদ দুর্বল। তবে বানোয়াট বলার মত পরিস্থিতি নেই। এর আরও কয়েকটি সূত্র রয়েছে কিন্তু সেগুলোতেও একাধিক অজ্ঞাত বর্ণনাকারী রয়েছে। [দ্রষ্টব্য: তাবয়ীনুল আজাব (পৃষ্ঠা নং ৯, ১০ ও ১১), আল ইলালুল মুতানাহিয়া, (২য় খণ্ড, ৬৫ পৃষ্ঠা)।]
● ২. “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শাবানা ও বাল্লিগনা রমজান।”
“হে আল্লাহ তুমি রজব ও শাবানে আমাদেরকে বরকত দাও। আর আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও।” [মুসনাদ আহমাদ ১/২৫৯]
হাদিসটি দুর্বল।
এ হাদিসের সনদে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে যার নাম যায়েদাহ বিন আবুর রিকাদ। তার ব্যাপারে ইমাম বুখারী রহ. বলেন, মুনকারুল হাদিস। ইমাম নাসাঈ তার সুনান গ্রন্থে তার নিকট থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করার পর বলেন, চিনি না এই ব্যক্তি কে? আর তিনি তার যুয়াফা কিতাবে বলেন, মুনকারুল হাদিস। কুনা গ্রন্থে বলেন, “তিনি নির্ভরযোগ্য নন। ইবনে হিব্বান বলেন, তার বর্ণিত কোন হাদিসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। দ্রষ্টব্য: তাবয়ীনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফী ফযলি রাজাব, ১২ পৃষ্ঠা। আয যুয়াফাউল কাবীর (২/৮১) তাহযীবুত তাহযীব (৩/৩০)
● ৩. “রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাজানের পরে রজব ও শাবান ছাড়া অন্য কোন মাসে রোজা রাখেননি।” [বাইহাকী]
হাফেয ইবনে হাজার বলেন, উক্ত হাদিসটি মুনকার। কারণে, এর সনদের ইউসুফ বিন আতিয়া নামক একজন রাবি রয়েছে। সে খুব দুর্বল। [তাবয়ীনুল আজাব ১২ পৃষ্ঠা]
🚫 খ. রজব মাস সম্পর্কে কয়েকটি জাল হাদিস:
● ১. রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রমজান আমার উম্মতের মাস।”
এটি জাল হাদিস।
হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, উক্ত হাদিসটি বর্ণনাকারীদের মধ্যে আবু বকর আন নাক্কাশ নামে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। সে কুরআনের মুফাসসির। কিন্তু লোকটি জাল হাদিস রচনাকারী এবং চরম মিথ্যাবাদী দাজ্জাল। ইবনে দেহিয়া বলেন, এই হাদিসটি জাল। (তাবয়ীনুল আজব, ১৩-১৫ পৃষ্ঠা) এছাড়াও উক্ত হাদিসকে জাল বলে চিহ্নিত করেছেন ইবনু জাওযী তার আল মাওযূয়াত কিতাবে (২/২০৫-২০৬) এবং ইমাম সানয়ানী মাওযূআত কিতাবে (৬১ পৃষ্ঠা) এবং সূয়ূতী তার আল লাআলী আল মাসনূআহ কিতাবে (২/১১৪)।
● ২. কুরআনের মর্যাদা সকল জিকির-আজকারের উপর যেমন রজব মাসের মর্যাদা অন্যান্য মাসের উপর তেমন।”
হাদিসটি বানোয়াট।
ইবনে হাজার আসকালানী উক্ত হাদিসটি বর্ণনা করার পর বলেন, এই হাদিসটি সনদের রাবিগণ সবাই নির্ভরযোগ্য একজন ছাড়া। তার নাম হল, সিকতী। আর এ লোকটিই হল বিপদ। কেননা, সে একজন বিখ্যাত জাল হাদিস রচনাকারী। (তাবয়ীনুল আজাব: ১৭ পৃষ্ঠা)
● ৩. রজব মাসে যে ব্যক্তি তিনটি রোজা রাখবে আল্লাহ তাআলা তার আমলনামায় একমাস রোজা রাখার সওয়াব লিপিবদ্ধ করবেন, আর যে ব্যক্তি সাতটি রোজা রাখবে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জাহান্নামের সাতটি দরজা বন্ধ করে দিবেন।”
হাদিসটি জাল।
এটিকে জাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইবনু জাওযী আল মাওযূয়াত কিতাবে (২/২০৬), সূয়ূতী আল লাআলী আল মাসনূআহ কিতাবে (২/১১৫), শাওকানী আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ কিতাবে (১০০ পৃষ্ঠা, হাদিস নং ২২৮) এবং তাবয়ীনুল আজাব কিতাবে (১৮ পৃষ্ঠা)।
● ৪. “যে ব্যক্তি রজবের প্রথম তারিখে মাগরিব নামাজ আদায় করত: বিশ রাকাত নামাজ পড়বে, প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা এবং সূরা ইখলাস একবার করে পড়বে এবং প্রতি দু রাকাত পরপর সালাম ফিরিয়ে মোট দশ সালামে বিশ রাকাত পূর্ণ করবে তোমরা কি জানেন তার সওয়াব কি?…তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা তাকে হেফাজত করবেন এবং তার পরিবার, সম্পত্তি ও সন্তান-সন্ততীকে হেফাজত করবেন, কবরের আজাব থেকে রক্ষা করবেন এবং বিনা হিসেব ও বিনা শাস্তিতে বিদ্যুৎ গতিতে পুলসিরাত পার করাবেন।”
এটি একটি বানোয়াট হাদিস।
[দ্রষ্টব্য: ইবনুল জাউযী তার মাওযূয়াত (২/১২৩), তাবয়ীনুল আজাব (২০ পৃষ্ঠা), আল ফাওয়াইদুল মাজমূয়াহ (৪৭পৃষ্ঠা, জাল হাদিস নং ১৪৪)]
● ৫. “যে ব্যক্তি রজব মাসে রোজা রাখবে এবং চার রাকাত নামাজ পড়বে সে জান্নাতে তার নির্ধারিত আসন না দেখে মৃত্যু বরণ করবে না।”
নফল রোজা বা তাহাজ্জুদ সালাত ইত্যাদির মাধ্যমে বর্ষবরণ হল নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকা
❑ প্রশ্ন-১: নতুন বছরের ১ম দিন কি নফল রোজা রাখা যাবে?
উত্তর: নতুন বছরের ১ম দিন বর্ষবরণের উদ্দেশ্যে বিশেষ কোন নামাজ, রোজা, কুরআন তিলাওয়াত, দুআ বা অন্য কোন ইবাদত নেই। চাই তা খ্রিষ্টীয় নববর্ষ হোক বা বাংলা নববর্ষ হোক কিংবা হিজরি নববর্ষ হোক। কেননা ইসলামে বর্ষবরণের জন্য এমন কোনও নির্দেশনা আসেনি। অর্থাৎ ইসলামের সোনালী যুগ তথা রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবি ও তাবেয়ীদের থেকে এমন কোনও আমল প্রমাণিত হয়নি। তাই এই নিয়তে এসব কিছু করলে তা বিদআত বা দ্বীনের মধ্যে নব আবিষ্কৃত আমল হিসেবে গণ্য হবে-যা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।
আমাদের মনে রাখা কর্তব্য যে, বিদআতি আমলে নেকির পরিবর্তে গুনাহ দ্বারা আমলনামা পূর্ণ হয় যদিও বাহ্যত তা দেখতে নেকির কাজ বা ভালো কাজ বলে মনে হয়। মূলতঃ এগুলোই হলো, “নেক সুরতে শয়তানের ধোঁকা।” (আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমিন।)
✪✪ বিদআত তথা ইসলামের নামে দ্বীনের মধ্যে নিত্য-নতুন আবিষ্কারের ভয়াবহতা সম্পর্কে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বহু হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন:
◈ অন্য হাদিসে এসেছে, জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগানের পর বললেন,
إنَّما الأعمالُ بالنِّيَّاتِ وإنَّما لِكلِّ امرئٍ ما نوى
“প্রতিটি আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল। আর প্রতিটি মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।” [সহিহ বুখারি-১ম হাদিস]
সালাত সংক্রান্ত কতিপয় জরুরি মাসায়েল
সালাতে সূরা ফাতিহার পর সর্বনিম্ন পূর্ণ অর্থবোধক বা কোনও হুকুম সম্বলিত একটি আয়াত পড়াই যথেষ্ট।
❑ সালাতে সূরা ফাতিহার পর সর্বনিম্ন পূর্ণ অর্থবোধক বা কোন হুকুম সম্বলিত একটি আয়াত পড়াই যথেষ্ট
উল্লেখ্য যে, ১ম বা ২য় রাকাতে সূরা ফাতিহার পর অন্য সূরা মিলানো ওয়াজিব নয় বরং মোস্তাহাব। অর্থাৎ কেউ যদি সূরা ফাতিহার পরে কোন কিছু না পড়ে সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে ইচ্ছাকৃত ভবে তা ছাড়া ঠিক নয়। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
من قرأ بأم الكتاب فقد أجزأت عنه ، ومن زاد فهو أفضل
“যে ব্যক্তি সুরা ফাতিহা পাঠ করবে (সালাত বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য) তা তার জন্য যথেষ্ট হবে। আর যে এর চেয়ে বেশী পাঠ করবে তা হবে উত্তম।” [সহীহ বুখারী, হা/৭৩৮] আল্লাহু আলাম।
রাতের বেলায় কুরআনের ১০০ টি আয়াত তেলাওয়াতের বিশেষ মর্যাদা
প্রশ্ন: হাদীসে বর্ণিত হয়েছে রাতের বেলা ১০০ আয়াত পাঠ করলে সারা রাত নফল নামাযের সওয়াব পাওয়া যায়। এখন প্রশ্ন হল, এই ১০০ আয়াত তেলাওয়াত করার ক্ষেত্রে আমরা নামাযে যে সব সুরা পাঠ করি সেগুলোও কি এর আওতাভুক্ত হবে নাকি নামাযের বাইরে আলাদা ভাবে তেলাওয়াত করতে হবে? বিষয়টি জানালে উপকৃত হবো।
❑ তিনি আরও বলেছেন,.
(ইমাম মুহাম্মদ বিন নাসর আল মারওয়াযী রহ. ক্বিয়ামুল লাইল, পৃ:৬৬; শাইখ আলবানী সিলসিলা সহীহাহ গ্রন্থে বলেন, এ হাদীসে শাইখাইন তথা ইমাম বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। হা/৬৪৩)
উপরোক্ত হাদীসদ্বয়ে কেবল রাতের বেলা ১০০টি আয়াত পড়ার কথা বলা হয়েছে। নামাযের ভিতরে না কি বাইরে সে ব্যাপারে কিছু বলা হয় নি। তাহলে আশা করা যায়, নামাযের ভিতরেই হোক অথবা বাইরে হোক রাতে একশত আয়াত পড়া হলে উক্ত মর্যাদা লাভ করা যাবে ইনশাআল্লাহ।
প্রশ্ন : উক্ত মর্যাদা লাভের জন্য কি রাতের সালাতে পড়া আবশ্যক?
সুতরাং এমতানুযায়ী যদি সালাতের বাইরেও আয়াতুল কুরসি, সূরাতুল ইখলাস, সূরাতুল ফালাক, সূরাতুন নাস, সুরাতুল মুলক ইত্যাদি পাঠ করে তাহলে এই হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হবে ইনশাআল্লাহ। তবে সালাতের মধ্যে পাঠ করা নিঃসন্দেহে আরও বেশি মর্যাদাপূর্ণ। এতে সালাতের মর্যাদার পাশাপাশি এই ১০০ আয়াত পাঠের মর্যাদা উভয়টি লাভ করবে ইনশাআল্লাহ।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইসলাম ওয়েবের ফতোয়ায় লেখা হয়েছে,
“যে ব্যক্তি রাতে দশটি আয়াত পাঠ করবে সে গাফিলদের দলভুক্ত হিসেবে নথিভুক্ত হবে না।”
[ইমাম হাকেম হাদিসটি বর্ণনা করার পর বলেন, সহিহ মুসলিমের শর্ত মোতাবেক সহিহ। শাইখ আলবানি বলেন, সহিহ লিগাইরিহী।]
অবৈধ পন্থায় প্রবাসে বসবাস ও কাজ করার বিধান এবং এর ক্ষতিকর দিক সমূহ
প্রশ্ন: অবৈধ হিসাবে প্রবাসে বসবাসকারী অনেক ঋণগ্রস্ত ভাই রয়েছেন যাদের দেশে এসে জীবন ধারণের কোন ব্যবস্থা নেই। তাদের ক্ষেত্রে অবৈধভাবে প্রবাসে থেকে অর্থ উপার্জন করা কি হালাল হবে?
উত্তর: ইসলামে প্রবাসে বসবাস ও কাজ করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে অনেকেই বিভিন্ন কারণে দেশের বাইরে চলে যান। কিন্তু অনেকে সেখানে গিয়ে অবৈধভাবে বসবাস করে ও অর্থ উপার্জন করে।
ইসলাম শরিয়ত এই বিষয়ে কী নির্দেশনা দেয় তা জানা অত্যন্ত জরুরি। নিম্নে এ বিষয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো:
❑ অবৈধ পন্থায় প্রবাস: ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
অবৈধ পন্থায় প্রবাস বলতে সাধারণত বোঝায়, কোনও দেশের আইন-কানুন ভঙ্গ করে বা অনুমতি ছাড়া সেখানে বসবাস করা এবং কাজ করা।
মনে রাখা কর্তব্য যে, একজন মানুষ যখন প্রবাসে যাওয়ার জন্য ভিসা গ্রহণ করে তখন সে দেশে গিয়ে সেখানকার আইন-কানুন মেনে চলার ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে বলে পরিগণিত হয়। অতএব সে আইন ও শরিয়ত উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে উক্ত দেশের প্রচলিত আইন-কানুন মেনে চলতে বাধ্য।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ
“হে ইমানদারগণ, তোমরা অঙ্গীকার (ও চুক্তিসমূহ) পূর্ণ কর।” [সূরা মায়েদা: ১]
আর রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
المسلمونَ على شروطِهم
“মুসলিমগণ তাদের শর্তের উপরে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।” [সহীহ আবু দাউদ, হা/৩৫৯৫] অর্থাৎ মুসলিমগণ তাদের সাথে কৃত শর্ত লঙ্ঘন করবে না।
সুতরাং প্রবাসীদের জন্য ইচ্ছাকৃত ভাবে সে দেশের কোনও আইন লঙ্ঘন করা জায়েজ নেই। (যদি শরিয়ত বিরোধী কোন আইন না হয়। শরিয়ত বিরোধী হলে তা মানা জায়েজ নয়)।
অতএব কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে অবৈধ ভাবে প্রবাসে বসবাস করে তাহলে সে দেশের আইনের দৃষ্টিতে যেমন অপরাধী বলে গণ্য হবে তেমনি ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতেও সে গুনাহগার হবে। তবে সে যদি হালাল কাজের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে তাহলে হারাম নয়।
অন্য দেশে যাওয়া মুসলমানদের উচিত, সেই দেশের আইন-কানুন মেনে চলা-সেখানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার সময় যেগুলো মেনে চলার প্রতিশ্রুতি নেওয়া হয়েছিলো যদি না সেগুলো ইসলাম বিরোধী হয়। কেননা মুসলিমগণ চুক্তি রক্ষা করে, ওয়াদা পালনে সত্যবাদি হয় এবং আমানত যথাযথভাবে পালন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْؤولًا
❑ অবৈধ পন্থায় বিদেশে থাকার ক্ষতিকর দিক সমূহ:
প্রকৃতপক্ষে অবৈধ পন্থায় প্রবাসে বসবাসকারীগণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার কারণে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। যেমন:
❑ কেউ যদি পরিস্থিতির শিকার হয়ে কিংবা অনিচ্ছা বশতঃ প্রবাসে অবৈধ হয়ে যায় তাহলে তার করণীয়:
কোন ব্যক্তি যদি তার ইচ্ছার বাইরে বা পরিস্থিতির শিকার হয়ছ প্রবাসে ‘অবৈধ’ হয়ে যায় তাহলে সে নিজ দেশে ফিরে আসার জন্য সে উক্ত দেশে নিয়োজিত দূতাবাস/কনস্যুলেটের মাধ্যমে আইনানুগ পন্থায় চেষ্টা করবে। এ সময় তার জীবন ধারণ এবং দেশে ফেরত আসার খরচ যোগানের জন্য সে সতর্কতার সাথে যেকোনো হালাল কাজ করতে পারে। কেননা এটা অপারগ অবস্থা। অপারগ অবস্থায় শরিয়তের ছাড় রয়েছে। ইসলামি ফিকাহের একটি প্রসিদ্ধ মূলনীতি হল,
الضرورة تبيح المحظورات
“জরুরত নিষিদ্ধ জিনিসকে বৈধ করে দেয়।” যেমন প্রচণ্ড ক্ষুধায় মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার জন্য শূকর বা মরা প্রাণীর গোস্ত খাওয়া। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে সে দেশে অবৈধ পন্থায় জীবন-যাপন করা ও অর্থ উপার্জন অব্যাহত রাখা জায়েজ নাই।
মসজিদুল হারামের সম্মুখে একজন বিধর্মী ফুটবল খেলোয়াড়ের ফেইক ছবি জায়েজ নাকি নাজায়েজ
মক্কার মসজিদুল হারামের সম্মুখে একজন কা*ফের ফুটবল খেলোয়াড়ের ফেইক ছবি। জায়েজ নাকি নাজায়েজ? কা*ফের খেলোয়াড়, নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা ইত্যাদিকে ভালোবাসার বিধান।
যাহোক, সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ারকৃত ছবিগুলো মূলত বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড় ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো এবং তার স্ত্রীর। এ ছবিগুলো পুরোটাই এডিট কৃত বা আর্টিফিশ্যাল ইনটেলিজেন্ট (AI) দ্বারা তৈরি। অর্থাৎ এগুলো ফেইক বা মিথ্যাচার। এটি উক্ত ব্যক্তিদের প্রতি যেমন মিথ্যাচার তেমনি সাধারণ মানুষের সাথেও মিথ্যাচার। আর ইসলামে মিথ্যাচার করা সাধারণ কোনও গুনাহ নয় বরং কবিরা গুনাহ।
◈ আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ
“তোমরা মিথ্যাচার থেকে বেঁচে থাকো। মিথ্যা পাপাচারের পথ দেখায়, আর পাপ জাহান্নামের দিকে পথ দেখায়।” [বুখারী ৬০৯৪, মুসলিম ১০৫-(২৬০৭)]
সুতরাং এসব ফেইক ছবি তৈরি করা ও প্রচার করা, শেয়ার বা লাইক করা সবই হারাম।
যারা এসব করাকে ইসলাম প্রচার করা মনে করছে তারা মূলত মূর্খ। এসব বকধার্মিক মূর্খরা সোশাল মিডিয়ায় কিছু লাইক ও কমেন্ট পাওয়ার ধান্ধায় এ ধরণের নিম্নমানের কাজ করে থাকে।
– অন্য দিকে একজন কাফে**রকে ইহরামের পোশাক পরিধান করিয়ে কাবার সম্মুখে মুনাজাত রত অবস্থায় তার মুখ খোলা স্ত্রীর সাথে কিংবা এককভাবে ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করা শুধু হারাম নয় বরং অত্যন্ত গর্হিত কাজ। কেননা একথা স্বতঃসিদ্ধ যে, ইসলামের দৃষ্টিতে কা**ফেরদের জন্য জন্য ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মক্কার হারাম সীমানায় প্রবেশ নিষিদ্ধ।
◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,
সুতরাং এসব ছবি আল্লাহর নিষেধাজ্ঞাকে তুচ্ছ করার শামিল এবং মুসলিম জাতির কিবলা ও দুনিয়ার সবচেয়ে সম্মানিত ঘর কাবাতুল মুশাররাফার জন্য মর্যাদাহানিকর।
❑ কা**ফের নায়ক-নায়িকা, খেলোয়াড় ইত্যাদিকে ভালোবাসা হারাম:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ
“যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে, তাদেরকে আপনি আল্লাহ ও তাঁর রসুলের বিরুদ্ধাচরণ কারীদের সাথে বন্ধুত্ব করতে দেখবেন না, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভ্রাতা অথবা জ্ঞাতি-গোষ্ঠী হয়।” [সূরা মুজাদালা: ২২]
◈ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ ۘ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
“হে মুমিনগণ, তোমরা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।” [সূরা মায়িদা: ৫১]
ভালোবাসার ক্ষেত্রে ইসলামের মূলনীতি হলো, কাউকে ভালোবাসতে হলে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ভালবাসতে হবে এবং কাউকে ঘৃণা করতে হলে কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যেই করতে হবে। এটিই ইমানের দাবী ও সবচেয়ে শক্তিশালী শাখা। যেমন হাদিসে এসেছে,
◈ আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু যর রা. কে বললেন, হে আবু যর, ইমানের কোন শাখাটি সর্বাধিক মজবুত? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রসুলই অধিক অবগত। তিনি বললেন,
«الْمُوَالَاةُ فِي اللَّهِ وَالْحُبُّ فِي اللَّهِ وَالْبُغْضُ فِي اللَّهِ»
“একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পরস্পর সখ্যতা স্থাপন করা এবং শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই কাউকে ঘৃণা করা। [বায়হাকি-এর শুআবুল ঈমান। হাসান]
◈ হাদিসে আরও বলা হয়েছে,
الْمَرْءُ مَعَ مَنْ أَحَبَّ
“যে ব্যক্তি যাকে ভালোবাসে (কিয়ামত দিবসে) সে তার সাথেই অবস্থান করবে।” [সুনান আত তিরমিজি, অধ্যায়: ৩৪/ দুনিয়াবি ভোগবিলাসের প্রতি অনাসক্তি, পরিচ্ছেদ: ৫০. যে যাকে ভালোবাসে (কিয়ামত দিবসে) সে তার সাথী হবে]
আর এটা নিশ্চিত যে, কা**ফেররা পরকালে জাহান্নামের লেলিহান আগুনের বাসিন্দা হবে। সুতরাং যে সকল নামধারী মুসলিম এসব কা**ফেরদেকে অকুণ্ঠ ভালোবাসে তাদের কী পরিণতি হবে তা সহজে অনুমেয় যদি না তারা জীবদ্দশায় লজ্জিত অন্তরে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করে। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।
◈ এছাড়া কেবল আল্লাহর জন্য ভালোবাসা এবং আল্লাহর জন্যই ঘৃণা পোষণ করা ইমানের প্রকৃত স্বাদ লাভ এবং কিয়ামতের দিন আরশের ছায়াতলে অবস্থানের সুযোগ লাভের কারণ হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে।
কা**ফেদের প্রতি আন্তরিক ভালবাসা প্রকাশ একজন মুমিনের ইমানকে দুর্বল করে দেয়। এমনকি ইমান থেকেও দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তবে আমরা সর্বদা অমুসলিমদের জন্য দুআ করব, আল্লাহ যেন, তাদেরকে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণের তৌফিক দান করুন। আমিন।
আমরা মহান আল্লাহ নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে সব ধরণের হারাম ও নির্বুদ্ধিতা সুলভ কার্যক্রম থেকে হেফাজত করেন। আমিন।
-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি-