April 13, 2026

পহেলা এপ্রিল বা এপ্রিল ফুল ইসলামি শরিয়তের কঠোর হুঁশিয়ারি

 এপ্রিল ফুল (April Fool) বা ‘অল ফুলস ডে’ (All Fools’ Day) হলো, প্রতি বছর ১লা এপ্রিল তারিখে পালিত একটি পশ্চিমা অপসংস্কৃতি। অন্যকে বোকা বানিয়ে বা মিথ্যা বলে আনন্দ উপভোগ করাই এই দিনটির মূল উপজীব্য। কিন্তু “পহেলা এপ্রিল” উপলক্ষে কাউকে মিথ্যা বলে ধোঁকা দেওয়া বা প্রতারণা করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম, কবিরা গুনাহ এবং ঈমানি মূল্যবোধের পরিপন্থী। একজন আত্মমর্যাদা সচেতন মুমিন কখনোই রসিকতার ছলেও মিথ্যা কথা বলতে পারে না বা কারও সাথে ফান করতে পারে না। অমুসলিমদের অন্ধ অনুকরণে এসব অপসংস্কৃতির সয়লাবে হাবুডুবু খাওয়া মুসলিম ব্যক্তিত্বের সাথে সম্পূর্ণ সাংঙ্ঘর্ষিক। নিম্নে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হলো:

✪ ১. হাসানোর জন্য বা মজার ছলেও মিথ্যা বলা নিষিদ্ধ:
ইসলামে কাউকে মিথ্যার ফাঁদে ফেলে হাসানো বা আনন্দ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন:
عَنْ بَهْزِ بْنِ حَكِيمٍ، قَالَ حَدَّثَنِي أَبِي، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ: “وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ”
“যে ব্যক্তি মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯০, সুনানে তিরমিজি: ২৩১৫। হাদিসটি হাসান (আলবানি)]
হাদিসে আরও এসেছে,
“وَيْلٌ لِلَّذِي يُحَدِّثُ فَيَكْذِبُ لِيُضْحِكَ بِهِ الْقَوْمَ وَيْلٌ لَهُ وَيْلٌ لَهُ”
“যে ব্যক্তি মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য, তার জন্য ধ্বংস অনিবার্য।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯০, সুনানে তিরমিজি: ২৩১৫। হাদিসটি হাসান (আলবানি)]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও ইরশাদ করেছেন:
..وَبِبَيْتٍ فِي وَسَطِ الْجَنَّةِ لِمَنْ تَرَكَ الْكَذِبَ وَإِنْ كَانَ مَازِحًا”
“আমি ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের কেন্দ্রস্থলে একটি প্রাসাদের দায়িত্ব নিচ্ছি, যে ব্যক্তি রসিকতার ছলেও মিথ্যা বলে না।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৮০০। হাদিসটি হাসান-আলবানি]
✪ ২. মিথ্যা কথা বলা মুনাফেকের অন্যতম আলামত:
ইসলামে মিথ্যা কথা বলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।মিথ্যা বলাকে মুনাফিকের অন্যতম আলামত বলা হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“آيَةُ الْمُنَافِقِ ثَلَاثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ، وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ، وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ”
“মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় সে তার খেয়ানত করে।” [সহিহ বুখারি: ৩৩, সহিহ মুসলিম: ৫৯]
“মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে এবং আমানত রাখা হলে তার খেয়ানত করে।” [সহিহ বুখারি: ৩৩, সহিহ মুসলিম: ৫৯]
✪ ৩. ধোঁকা ও প্রতারণা:
কাউকে ভয় দেখানো বা মিথ্যা সংবাদ দিয়ে বিভ্রান্ত করে মানসিকভাবে আতঙ্কিত করা ইসলামে জায়েজ নেই। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَا يَحِلُّ لِمُسْلِمٍ أَنْ يُرَوِّعَ مُسْلِمًا
“কোনও মুসলিমের জন্য অন্য কোনও মুসলিমকে আতঙ্কিত করা বৈধ নয়।” [সুনানে আবু দাউদ: ৫০০৪। হাদিসটি সহিহ (আলবানি)]
সম্পর্কে তিনি আরও কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন:
مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا
“যে ব্যক্তি আমাদের (মুসলমানদের) সাথে প্রতারণা করবে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” [সহিহ মুসলিম: ১০১]
✪ ৪. বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ ও ব্যক্তিত্ব হীনতা:
এপ্রিল ফুল মূলত একটি বিজাতীয় ও পশ্চিমা সংস্কৃতি। ইসলামে অমুসলিমদের ধর্মীয় বা আদর্শিক সংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوة مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি অন্য কোনও জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪০৩১। হাদিসটি সহিহ (আলবানি)]
❑ শায়খ সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান (হাফিজাহুল্লাহ)-এর ফতোয়া:
সৌদি আরবের সিনিয়র উলামা পরিষদের সদস্য (বর্তমান সৌদি আরবের প্রধান মুফতি) আল্লামা প্রফেসর শায়খ সালিহ বিন ফাওজান আল ফাওজান (হাফিযাহুল্লাহ) কে এপ্রিল ফুল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন:
هَذِهِ مُسْتَوْرَدَةٌ مِنْ جُمْلَةِ الْعَادَاتِ الْبَاطِلَةِ، وَلَيْسَتْ مِنْ أَعْمَالِ الْمُسْلِمِينَ، وَالْكَذِبُ لَا يَجُوزُ لَا فِي إِبْرِيلَ، وَلَا فِي غَيْرِهِ، فَالْكَذِبُ حَرَامٌ، الْكَذِبُ عَلَى اللهِ، الْكَذِبُ عَلَى رَسُولِهِ، الْكَذِبُ عَلَى النَّاسِ، حَرَامٌ كَبِيرَةٌ مِنْ كَبَائِرِ الذُّنُوبِ، اللهُ حَرَّمَ الْكَذِبَ وَنَهَى عَنْهُ، وَتَوَعَّدَ الْكَاذِبِينَ، فَلَا يَجُوزُ الْكَذِبُ فِي أَيِّ وَقْتٍ.
“এটি আমদানি করা বাতিল প্রথাগুলোর একটি অংশ এবং এটি মুসলমানদের কাজ নয়। মিথ্যা বলা কোনোভাবেই জায়েজ নয়—এপ্রিলে হোক বা অন্য কোনও সময়ে। মিথ্যা বলা হারাম। আল্লাহর ওপর মিথ্যা বলা, তাঁর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর মিথ্যা বলা এবং মানুষের সাথে মিথ্যা বলা হারাম এবং এটি কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা মিথ্যাকে হারাম করেছেন, এ থেকে নিষেধ করেছেন এবং মিথ্যাবাদীদের কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সুতরাং কোনও সময়েই মিথ্যা বলা জায়েজ নয়।” [ফতোয়া নম্বর: ৭৩৪৩]
❑ শায়খ আব্দুল আজিজ ফারহান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
«الكَذِبُ أَسْوَدُ. لَيْسَ لَدَيْنَا شَيْءٌ اسْمُهُ الكِذْبَةُ البَيْضَاءُ وَالكِذْبَةُ السَّوْدَاءُ. الكَذِبُ كُلُّهُ قَبِيحٌ وَكُلُّهَا سَيِّئَةٌ. وَلَا يَجُوزُ لِلْإِنْسَانِ أَنْ يَلْجَأَ إِلَى مِثْلِ هَذِهِ الأُمُورِ. خُصُوصًا أَنَّهُ، وَللهِ الحَمْدُ، بِفَضْلِ اللهِ، تُسَمَّى هَذِهِ الكِذْبَةُ كِذْبَةً. هَذَا ذَنْبٌ، لَا سَمَحَ اللهُ، لِأَنَّهَا كَذِبٌ. الأَمْرُ الثَّانِي هُوَ أَنَّهُ تَمْثِيلٌ. لَيْسَ لِأَهْلِ الإِسْلَامِ شَيْءٌ يُسَمَّى كِذْبَةَ إِبْرِيلَ. إِنَّهَا تَمْثِيلٌ مَعَ الآخَرِينَ. يَجُوبُ أَنْ يَكُونَ لِلْمُسْلِمِ شَخْصِيَّةٌ مُسْتَقِلَّةٌ، خَاصَّةً فِي مَا يَتَعَلَّقُ بِدِينِهِ وَإِيمَانِهِ. لَا يَجُوزُ لَهُ أَنْ يَكُونَ إِمَّعَةً. فَالْوَاجِبُ عَلَى النَّاسِ أَنْ يَتَّقُوا اللهَ وَيَتَّقُوا اللهَ.»
“মিথ্যা সবসময়ই কালো। আমাদের কাছে ‘সাদা মিথ্যা’ বা ‘কালো মিথ্যা’ বলে কিছু নেই। সব মিথ্যাই কুৎসিত এবং মন্দ। মানুষের জন্য এ জাতীয় বিষয়ের আশ্রয় নেওয়া বৈধ নয়। বিশেষ করে, আল্লাহর শোকর যে মানুষ একে ‘মিথ্যা’ (এপ্রিল ফুল বা এপ্রিলের মিথ্যা) বলেই ডাকছে। এটি একটি গুনাহ, কারণ এটি শেষ পর্যন্ত মিথ্যাই। দ্বিতীয় বিষয় হলো, এটি অন্যদের অন্ধ অনুকরণ। ইসলাম অনুসারীদের জন্য ‘এপ্রিল ফুল’ বলতে কিছু নেই। এটি অন্যদের দেখাদেখি একটি অভিনয় (অনুকরণ) মাত্র। একজন মুসলিমের নিজস্ব স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব থাকা উচিত━বিশেষ করে তার দ্বীন ও ঈমানের ক্ষেত্রে। তার জন্য ব্যক্তিত্বহীন বা পরানুকরণকারী হওয়া জায়েজ নয়। মানুষের উচিত আল্লাহকে ভয় করা।”
মোটকথা, পশ্চিমা সংস্কৃতিতে গা ভাসিয়ে দেওয়া কোনও আত্মমর্যাদবান মুমিনের জন্য বৈধ নয়। এবং এপ্রিল ফুল উপলক্ষে “প্র্যাঙ্ক” করা, মানুষকে বোকা বানানো, মিথ্যা বলে হাসানো বা ফান করা থেকে বিরত থাকাই ঈমানের দাবি। আল্লাহ আমাদের সর্বদা সত্য বলার এবং অনর্থক কাজ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লিখনি: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়া অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

বিদআতপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত মসজিদে দান করার বিধান

 প্রশ্ন: বিদআতপন্থীদের দ্বারা পরিচালিত মসজিদে দান করার বিধান কী?

উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পরিবার এবং তাঁর সাথীদের ওপর। অতঃপর:
যদি দানকৃত অর্থ আল্লাহর আনুগত্যমূলক কাজে ব্যয় করা হয়—যেমন: মসজিদের সংস্কার, কার্পেট বা ফরাস কেনা এবং মসজিদ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বৈধ কর্মকাণ্ড তবে সেই মসজিদে দান করতে কোনো অসুবিধা নেই। পরিচালনাকারীরা বিদআতপন্থী হওয়া সত্ত্বেও এই দান করতে কোনো বাধা নেই। কেননা পরিচালকদের বিদআত মসজিদে নেক কাজ করতে বাধা সৃষ্টি করে না। এর প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়, উসমান (রা.)-এর সময় যখন খারেজিরা মদিনা ও তার মসজিদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং তারা মানুষের ইমামতি শুরু করে তখন লোকেরা তাদের পেছনে নামাজ পড়তে ইতস্তত বোধ করছিল। এমতাবস্থায় উসমান (রা.) তাদের মসজিদে নামাজ পড়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। ইমাম বুখারি (রহ.) তাঁর সহিহ গ্রন্থে “বিপথগামী ও বিদআতপন্থীর ইমামতি” (إِمَامَةِ المَفْتُونِ وَالمُبْتَدِعِ) শীর্ষক পরিচ্ছেদে উবাইদুল্লাহ বিন আদি বিন খিয়ার রাহ. থেকে বর্ণনা করেছেন যে:
أَنَّهُ دَخَلَ عَلَى عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ -رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، – وَهُوَ مَحْصُورٌ – فَقَالَ: إِنَّكَ إِمَامُ عَامَّةٍ، وَنَزَلَ بِكَ مَا نَرَى، وَيُصَلِّي لَنَا إِمَامُ فِتْنَةٍ، وَنَتَحَرَّجُ؟ فَقَالَ: «الصَّلاَةُ أَحْسَنُ مَا يَعْمَلُ النَّاسُ، فَإِذَا أَحْسَنَ النَّاسُ، فَأَحْسِنْ مَعَهُمْ، وَإِذَا أَسَاءُوا فَاجْتَنِبْ إِسَاءَتَهُمْ». اهــ
“তিনি অবরুদ্ধ অবস্থায় উসমান বিন আফফান (রা.)-এর কাছে প্রবেশ করে বললেন, “আপনি জনগণের ইমাম অথচ আপনার ওপর যা আপতিত হয়েছে তা আমরা দেখতে পাচ্ছি (আপনি অবরুদ্ধ)। এখন আমাদের ইমামতি করছে ফিতনাবাজ এক ব্যক্তি। এ কারণে আমরা (নামাজ পড়তে) সংকোচ বোধ করছি।” তখন উসমান (রা.) বললেন, “মানুষ যত আমল করে তার মধ্যে সালাত বা নামাজ হলো সর্বোত্তম। অতএব লোকেরা যখন ভালো কাজ করে, তখন তুমিও তাদের সাথে ভালো কাজে শরিক হও আর তারা যখন মন্দ কাজ করে তখন তাদের মন্দ থেকে বেঁচে থাকো।” তবে যদি সেই দান তাদের বিদআতি কার্যক্রমের পেছনে ব্যয় করা হয় তবে সেক্ষেত্রে দান করা জায়েজ হবে না। কারণ এটি হবে পাপাচারের কাজে সহযোগিতা করা। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
…وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
“…তোমরা নেক কাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা করো। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয়ই আল্লাহর আজাব অত্যন্ত কঠিন।” [সূরা মায়িদাহ: ২]
মোটকথা, মসজিদের অবকাঠামো বা মুসল্লিদের সুবিধার্থে দান করা বৈধ। কিন্তু সরাসরি বিদআতি প্রথা বা অনুষ্ঠানের জন্য দান করা যাবে না। আপনার বাপ-চাচাদের মসজিদে দান করার ক্ষেত্রে এই মূলনীতিটি অনুসরণ করা আপনার জন্য নিরাপদ হবে। (উৎস: ইসলাম ওয়েব)
উল্লেখ্য যে, শিরক ও কুফরি পর্যায়ের বিদআতে লিপ্ত ব্যক্তিদের (যেমন: ব্রেলভি, রেজভি বা কথিত সুন্নি কবর পূজারী) নিয়ন্ত্রণাধীন ও পরিচালিত মসজিদের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য নয়। এমন পথভ্রষ্ট আকিদার ধারক ও বাহক ইমামের পেছনে যেহেতু নামাজ শুদ্ধ হবে না তাই তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন মসজিদেও দান করা যাবে না। বরং এটি ঐ সকল মসজিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যাদের মধ্যে এমন কিছু বিদআত রয়েছে যা শিরক বা কুফরি পর্যন্ত পৌঁছায় না। তবে সর্বাবস্থায় সহিহ সুন্নাহ ভিত্তিক পরিচালিত মসজিদে দান করা অধিক উত্তম। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

যুবকদের প্রতি একগুচ্ছ সোনালী উপদেশ

 যুবকদের প্রতি একগুচ্ছ সোনালী উপদেশ (শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. উপদেশ সহ)

প্রশ্ন: শাইখ, আমাদের যুব সমাজকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নসিহা করুন যেন, দ্বীনের পথে থাকতে পারি, হারাম থেকে বেঁচে থাকতে পারি এবং আল্লাহ ও রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পথে চলতে পারি।
উত্তর: যৌবনকাল আল্লাহর দেওয়া এক বিশেষ নেয়ামত। কিন্তু চতুর্দিকে যখন ফিতনার সয়লাব চলছে, এমন সময়ে দ্বীনের পথে অবিচল থাকা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকার জন্য আল্লাহর অনুগ্রহ ও তৌফিক কামনা করার পাশাপাশি দৃঢ় মনোবল থাকা অপরিহার্য। অন্যথায় এই পথে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন। নিম্নে বর্ণিত নসিহতগুলো মেনে চলে আশা করি, একজন মুসলিম যুবক দ্বীনের ওপরে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারবে এবং তার দ্বারা দেশ ও জাতি উপকৃত হবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
◈ ১. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সাথে আদায় করা:
সালাত হলো মুমিনের ঢাল, যা তাকে পাপাচার থেকে রক্ষা করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ
“নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” [সূরা আনকাবুত: ৪৫]
◈ ২. চোখের হেফাজত ও লজ্জাস্থানের সুরক্ষা:
স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের এই যুগে কুদৃষ্টি থেকে বেঁচে থাকা চ্যালেঞ্জিং বিষয়। তাই এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে রক্ষা করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা অপরিহার্য।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الْجَنَّةَ
“যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী স্থান (জিহ্বা) এবং দুই পায়ের মধ্যবর্তী স্থানের (লজ্জাস্থান) জামানত দেবে, আমি তার জান্নাতের জামিন হব।” [সহিহ বুখারি: ৬৪৭৪]
◈ ৩. সৎ সঙ্গী ও ভালো বন্ধু নির্বাচন:
মানুষ তার বন্ধুর আদর্শ ও চরিত্রের দ্বারা দ্রুত প্রভাবিত হয়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
الْمَرْءُ عَلَى دِينِ خَلِيلِهِ، فَلْيَنْظُرْ أَحَدُكُمْ مَنْ يُخَالِلُ
“মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের অনুসারী হয়। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকে যেন লক্ষ্য করে যে, সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩-সহিহ]
◈ ৪. যৌবনকাল সম্পর্কে জবাবদিহিতার প্রস্তুতি:
কিয়ামতের ময়দানে যৌবনকাল সম্পর্কে বিশেষ প্রশ্ন করা হবে।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لا تَزُولُ قَدَمَا ابْنِ آدَمَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ… وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَا أَبْلاهُ
“কিয়ামতের দিন কোনো আদম সন্তান তার রবের নিকট থেকে এক কদমও নড়তে পারবে না, যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি প্রশ্ন করা হয়… (তার মধ্যে একটি হলো) তার যৌবনকাল সে কোন কাজে অতিবাহিত করেছে।” [সুনানে তিরমিজি: ২৪১৬-সহিহ]
◈ ৫. তাওবা ও ইস্তিগফারের অভ্যাস করা:
মানুষ হিসেবে ভুল হওয়া স্বাভাবিক তবে ওই ব্যক্তির শ্রেষ্ঠ যে, ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
التَّائِبُ مِنَ الذَّنْبِ كَمَنْ لا ذَنْبَ لَهُ
“গুনাহ থেকে তওবাকারী ব্যক্তি এমন, যেন তার কোনো গুনাহই নেই।” [সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪২৫০-হাসান]
◈ ৬. আরশের নিচে ছায়া পাওয়ার সংকল্প:
যৌবনকালকে ইবাদতে কাটানোর পুরস্কার অত্যন্ত বিশাল। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাত শ্রেণির মানুষের কথা বলেছেন যারা আরশের নিচে ছায়া পাবে। তার মধ্যে একজন হলো:
وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللَّهِ
“সেই যুবক, যে আল্লাহর ইবাদতের মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছে।” [সহিহ বুখারি: ৬৬০]
প্রিয় যুবক ভাই, একা থাকা অবস্থায় নিজেকে আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত রাখুন। কারণ শয়তান একাকী মানুষকে সহজেই পথভ্রষ্ট করে। দ্বীনি ইলম অর্জনে সচেষ্ট থাকুন এবং সবসময় এই দোয়াটি করুন:
يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِي عَلَى دِينِكَ
“হে অন্তর পরিবর্তনকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন।” [সুনানে তিরমিজি: ৩৫২২-সহিহ]
❑ মুসলিম যুবকদের জন্য আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)-এর কিছু উপদেশ:
(শাইখের বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত এবং সংক্ষিপ্ত) যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দাঈ, ফকিহ এবং শিক্ষক সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)-এর কয়েকটি আলোচনা থেকে যুবকদের জন্য কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ নসিহত ও দিকনির্দেশনা নিচে পয়েন্ট আকারে তুলে ধরা হলো:
✪ ১. ইলমে দ্বীন অর্জনে সচেষ্ট হওয়া:
যুবকদের প্রধান কাজ হলো, ইলমে নাফে বা কল্যাণকর জ্ঞান অর্জনে সশরীরে পরিশ্রম করা এবং দ্বীনের সঠিক বুঝ হাসিলের জন্য আল্লাহর কাছে তাওফিক প্রার্থনা করা। যেন তারা ভবিষ্যতে উম্মাহর পথপ্রদর্শক হতে পারে।
✪ ২. সঠিক বুঝ ও দূরদর্শিতা (بصيرة) তৈরি করা:
কুরআন ও সুন্নাহর নুসুস (টেক্সট) পড়ার সময় সেটির সঠিক মর্ম অনুধাবন করা জরুরি। কেবল ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে তুষ্ট না থেকে বারবার অধ্যয়ন করা এবং শিক্ষক ও বিজ্ঞ সহপাঠীদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সঠিক বুঝ নিশ্চিত করা উচিত।
✪ ৩. আমল ও দাওয়াহর সমন্বয়:
দ্বীন হলো চারটি বিষয়ের সমষ্টি: ইলম (জ্ঞান), আমল (প্রয়োগ), দাওয়াহ (প্রচার) ও সবর (ধৈর্য)। যা কিছু জানা হবে (যেমন: সালাত, জাকাত, পর্দা) তা আমল করতে হবে এবং অন্যদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
✪ ৪. না জেনে কথা বলা থেকে বেঁচে থাকা:
বিনা ইলমে বা না জেনে আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে কোনো কথা বলা কবিরা গুনাহ, যা শিরকের কাছাকাছি পর্যায়ের। শয়তান মানুষকে সর্বদা না জেনে কথা বলতে এবং অশ্লীলতার দিকে প্ররোচিত করে; তাই এ বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
✪ ৫. কুরআন ও সুন্নাহর সাথে গভীর সম্পর্ক:
– নিয়মিত তিলাওয়াত, হিফজ এবং তাদাব্বুর (গভীর চিন্তা) করতে হবে। অর্থ বোঝার জন্য তাফসিরে ইবনে কাসীর বা বাগভি পাঠ করা যেতে পারে।
– অন্তত প্রাথমিক পর্যায়ের হাদিসের কিতাবগুলো যেমন—উমদাতুল আহকাম, বুলুগুল মারাম এবং আরবাঈন নববী (ইমাম নওয়াবির ৪০ হাদিস) মুখস্থ বা গভীরভাবে অধ্যয়ন করা।
✪ ৬. ভারসাম্য রক্ষা করা (ইফরাত ও তাফরিত বর্জন):
দ্বীনের পথে চলার সময় ইফরাত (চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ি) এবং তাফরিত (শিথিলতা)—উভয়টি বর্জন করে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে।
✪ ৭. উপকারী কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করা:
শায়খ ইবনে বায (রহ.) যুবকদের জন্য বিশেষ কিছু কিতাবের নাম প্রস্তাব করেছেন:
– আকিদা ও মূলনীতি: কিতাবুত তাওহিদ, তিনটি মূলনীতি (সালাসাতুল উসুল)।
– হাদিস: সহীহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনান আরবায়া, মুত্তাওয়াত মালেক ও মুসনাদে আহমদ।
– ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.)-এর ‘যাদুল মাআদ’, ‘ইলামুল মুওয়াক্কিয়ীন’ এবং ‘ইগাছাতুল লাহফান’।
– এছাড়া ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর ‘মুনতাকাল আখবার’ এবং ইবনুল আসিরের ‘জামেউল উসুল’।
✪ ৮. উম্মাহর সেবায় অন্যান্য বিদ্যা অর্জন:
দ্বীনি জ্ঞানের পাশাপাশি যদি সম্ভব হয় তবে চিকিৎসা বিজ্ঞান বা অন্যান্য প্রয়োজনীয় জাগতিক বিদ্যা অর্জন করাও সওয়াবের কাজ, যাতে উম্মাহর সেবা করা যায়। আল্লাহ তাআলা আপনাকে ও আমাদের সকল যুবককে সিরাতুল মুস্তাকিমের উপর অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করা এবং আল্লাহকে সেজদা করা কোনটা সঠিক এবং কোনটা ভুল

 “আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করা’ এবং ‘আল্লাহকে সেজদা করা’: কোনটা সঠিক কোনটা ভুল?

ইসলামি শরিয়তে সেজদা হলো ইবাদতের সর্বোচ্চ শিখর। এই সেজদার ক্ষেত্রে শব্দচয়ন এবং অন্তরের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এর হুকুম ভিন্ন হতে পারে। নিচে এর বিস্তারিত বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. “আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করা:” (Sajdah for Allah)
এটি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বিশুদ্ধ বাক্য। যখন কেউ বলে ‘আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করছি’, তখন সে মূলত তার ‘নিয়ত’ বা ‘উদ্দেশ্য’ প্রকাশ করে। এর অর্থ হলো—এই ইবাদতটি কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এটি তাওহিদের মূল দাবি এবং এটি সম্পূর্ণ শিরকমুক্ত একটি বিশুদ্ধ ইবাদত। এখানে কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ বা অন্য কোনো সত্তার অংশীদারিত্বের অবকাশ থাকে না।
২. আল্লাহকে সেজদা করা (Sajdah to Allah)
‘আল্লাহকে সেজদা করা’—এই বাক্যটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে বক্তার অন্তরের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে দুটি ভিন্ন অর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে:
ক. ভ্রান্ত বা কুফরি অর্থ:
যদি কেউ মনে করে—নাউযুবিল্লাহ—মহান আল্লাহ সরাসরি তার সামনে সসত্তায় উপস্থিত আছেন এবং সে সরাসরি আল্লাহর সত্তাকে বা তাঁর পায়ে বা কুদরতি পায়ে সেজদা করছে তবে তা কুফরি হিসেবে গণ্য হবে। কারণ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা হলো—মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সপ্ত আসমানের উপরে তাঁর সুউচ্চ আরশে আজিমে সসত্তায় অবস্থান করেন। তাঁকে মাখলুকের মতো সামনে উপস্থিত কল্পনা করা বা তাঁর জন্য কোনো দৈহিক সীমাবদ্ধতা সাব্যস্ত করা আকিদাবিরোধী।
খ. সঠিক বা গ্রহণযোগ্য অর্থ:
যদি বক্তার বিশ্বাস এমন হয় যে—মহান আল্লাহ আসমানের ওপর আরশে আজিমে অবস্থান করছেন এবং তিনি সেই মহান সত্তার ইবাদতের নিমিত্তে তাঁকে (প্রাপক হিসেবে) সেজদা করছেন তবে এতে কোনো সমস্যা নেই। এখানে ‘আল্লাহকে’ শব্দ দ্বারা সেজদার ‘প্রাপক’ বা ‘মাবুদ’ বোঝানো হয়েছে, সত্তাগতভাবে সামনে উপস্থিতি নয়। বাংলা ভাষায় ‘কে’ বিভক্তিটি অনেক সময় সরাসরি কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য না করে ‘নিমিত্ত’, ‘উদ্দেশ্য’ বা ‘জন্য’ (Dative Case/সম্প্রদান কারক) অর্থে ব্যবহৃত হয়। এই ‘কে’ বিভক্তিটি যখন ‘চতুর্থী বিভক্তি’ (নিমিত্তার্থে) হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন তা সরাসরি সামনে উপস্থিত থাকা বোঝায় না। অতএব কেউ যখন সঠিক আকিদা রেখে বলে—”আমি আল্লাহকে সেজদা করছি” তখন বাংলা ভাষার অলঙ্কার অনুযায়ী এর অর্থ দাঁড়ায়: “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে এবং একমাত্র তাঁরই ইবাদতের নিমিত্তে সেজদা করছি।”
মোটকথা, ‘আল্লাহকে সেজদা করা’ বাক্যটি মূলত বক্তার বিশ্বাস ও নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। যদি উদ্দেশ্য হয় ‘আরশে অবস্থানকারী মহান রবের ইবাদত করা’ তবে তা বৈধ। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় ‘আল্লাহকে সামনে সত্তাগতভাবে উপস্থিত কল্পনা করা’ তবে তা আকিদাগত বিভ্রান্তি ও কুফরির অন্তর্ভুক্ত। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেছেন:
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ
“নিশ্চয়ই সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” [সহীহ বুখারী: ১]
পরিশেষে বলবো, শব্দচয়নের ক্ষেত্রে ‘আল্লাহর উদ্দেশ্যে সেজদা করা’ বলা অধিকতর নিরাপদ এবং সংশয়মুক্ত। তবে কেউ যদি ‘আল্লাহকে সেজদা’ কথাটি সঠিক আকিদা রেখে বলে, তবে তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে জাহান্নামি বলার বিধান নিয়ে বিজ্ঞ আলেমদের একগুচ্ছ ফতওয়া

 নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে জাহান্নামি বলার বিধান: বিজ্ঞ আলেমদের একগুচ্ছ ফতওয়া

ভূমিকা: ইসলামি শরিয়তে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আখিরাতের ফয়সালা করার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা অনুযায়ী, কুফরি বা শিরকি কাজে লিপ্ত থাকা অবস্থায় কাউকে দেখলে তাকে কতিপয় শর্তসাপেক্ষে সাধারণভাবে ‘কাফের’ বা ‘মুশরিক’ বলা গেলেও নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির নাম ধরে সে ‘জাহান্নামি’—এমন চূড়ান্ত ফয়সালা দেওয়া জায়েজ নয়। এর মূল কারণ হলো, মানুষের অন্তরের অবস্থা এবং মৃত্যুর ঠিক আগের মুহূর্তের ঈমানি অবস্থা কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলাই জানেন।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে ইহুদি যুবককে শেষ মুহূর্তে কালিমা পড়িয়ে জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুসংবাদ দিয়েছিলেন তা আমাদের শেখায় যে শেষ পরিণতি (খাতিমাহ) মানুষের অজানা। তাই নীতিগতভাবে আমরা বিশ্বাস করি, সব কাফের জাহান্নামি এবং সব মুমিন জান্নাত। কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের ক্ষেত্রে আমরা কেবল তাদের ওপরই জান্নাত বা জাহান্নামের হুকুম লাগাব যাদের ব্যাপারে কুরআন বা সহিহ হাদিসে স্পষ্ট সাক্ষ্য দেওয়া হয়েছে (যেমন: আবু লাহাব বা আশারায়ে মুবাশশারা)। এর বাইরে অন্য সবার ক্ষেত্রে আমরা নেককারদের জন্য জান্নাতের আশা রাখি এবং পাপাচারীদের জন্য আল্লাহর শাস্তির ভয় করি, কিন্তু চূড়ান্ত বিচার আল্লাহর ওপর ন্যস্ত রাখি। নিচে এ বিষয়ে বিশ্ববিখ্যাত আলেম ও ফতোয়া বোর্ডগুলোর সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরা হলো:
❑ ১. সৌদি আরবের বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা সালেহ আল ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ)-এর ফতওয়া:
প্রশ্ন: সুনির্দিষ্ট কোনো কাফেরের ওপর কি জাহান্নামি হওয়ার হুকুম লাগানো জায়েজ? যেমন একটি হাদিসে এসেছে: إِذَا مَرَرْتَ بِقَبْرِ مُشْرِكٍ فَبَشِّرْهُ بِالنَّارِ “যখন তুমি কোনো মুশরিকের কবরের পাশ দিয়ে যাবে তখন তাকে জাহান্নামের সুসংবাদ দাও।” এখন আমি যদি নিশ্চিত হই যে, সে শিরকের ওপর মারা গেছে তবে কি আমি নির্দিষ্টভাবে তার ওপর হুকুম লাগাতে পারব?
উত্তর:
لكن وأيش يدريك أنه مات على الشرك؟! أنت تعلم الغيب؟ إن كان هو عند الموت نطق بالشهادتين ومات على التوحيد، اليهودي الذي زاره النبي ﷺ وهو يحتضر فقال له: «قل لا إله إلا الله» فنظر إلى أبيه فقال: أطع أبا القاسم، فقال: أشهد أن لا إله إلا الله وأن محمدًا رسول الله، فأمر النبي ﷺ الصحابة أن يتولوا أخاهم وأن يكفنوه وقال: «الحمد لله الذي أنقذه بي من النار» فما تدري عن الخواتيم يا أخي، لكن نقول من فعل الكفر أو الشرك الأكبر فهو كافر أو مشرك، نحكم على الظاهر أما البواطن فلا يحكم عليها إلا الله سبحانه وتعالى، ولا ندري بالخواتيم ولا نحكم على معين أنه في جنة أو في نار إلا من شهد له رسول الله ﷺ هذا منهج أهل السُّنة والجماعة أنهم لا يحكمون لمعين بجنة ولا بنار إلا من شهد له رسول الله ﷺ وإنما نرجو للمحسن ونخاف على المسيء هذه القاعد
“কিন্তু আপনি কীভাবে জানবেন যে সে শিরকের ওপরই মারা গেছে?! আপনি কি গায়েব জানেন? হতে পারে মৃত্যুর সময় সে কালেমা পাঠ করেছে এবং তাওহিদের ওপর মৃত্যুবরণ করেছে। জনৈক ইহুদি যুবক, যাকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দেখতে গিয়েছিলেন যখন সে মরণাপন্ন ছিল। তিনি তাকে বললেন: قُلْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলো।’ যুবকটি তার পিতার দিকে তাকাল, পিতা বলল: أَطِعْ أَبَا الْقَاسِمِ ‘ আবুল কাসেমের (নবীজি) আনুগত্য করো।’ তখন সে সাক্ষ্য দিল: أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া আন্না মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ।’ এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের নির্দেশ দিলেন তাদের ভাইয়ের (দাফনের) দায়িত্ব নিতে এবং বললেন: الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي أَنْقَذَهُ بِي مِنَ النَّارِ ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি তাকে আমার উসিলায় জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিলেন।’
হে ভাই! মানুষের শেষ পরিণতি সম্পর্কে আপনি কিছুই জানেন না। তবে আমরা বলব, যে ব্যক্তি কুফরি বা শিরকে আকবর করবে সে কাফের বা মুশরিক। আমরা বাহ্যিক অবস্থার ওপর হুকুম দেব আর অন্তরের খবর কেবল আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা জানেন। আমরা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির জান্নাত বা জাহান্নামের ব্যাপারে ফয়সালা দেব না যতক্ষণ না রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো—তারা নির্দিষ্ট কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলে না। তবে নেককারদের জন্য আশা রাখে এবং পাপাচারীদের জন্য আশঙ্কা করে।”
❑ ২. শাইখ সালেহ আল ফাওযান রাহ. আরও বলেন,
ولا أشهد لأحد من المسلمين بجنة ولا نار إلا من شهد له رسول الله صلى الله عليه وسلم؛ لكني أرجو للمحسن وأخاف على المسيء، ولا أكفر أحدا من المسلمين بذنب، ولا أخرجه من دائرة الإسلام.
هذا معتقد أهل السنة والجماعة، أنهم لا يشهدون لأحد معين بجنة ولو كان من الصالحين، ولا يشهدون لأحد بالنار ولو كان من الكافرين؛ كأن تقول: هذا من أهل الجنة، أو هذا من أهل النار. هذا لا يجوز إلا لمن أطلعه الله على الغيب وهو الرسول صلى الله عليه وسلم، ولم يطلعه على الغيب كله، ولكن على شيء من المغيبات، ومن ذلك أن الرسول صلى الله عليه وسلم شهد لأناس بالجنة، فنحن نشهد أنهم من أهل الجنة، كالعشرة المبشرين بالجنة من صحابة رسول الله صلى الله عليه وسلم، وهم: الخلفاء الأربعة، وطلحة، والزبير، وسعد، وسعيد، وعبد الرحمن بن عوف، وأبو عبيدة، عامر بن الجراح، هؤلاء شهد لهم رسول الله صلى الله عليه وسلم بالجنة، وثابت بن قيس بن شماس بشره النبي صلى الله عليه وسلم بالجنة فهؤلاء نشهد لهم؛ لأن الرسول شهد لهم بأعيانهم، فنقول: فلان في الجنة، أبو بكر في الجنة، عمر في الجنة، طلحة، والزبير، كل هؤلاء في الجنة؛ لأن الرسول أخبر أنهم في الجنة.
والرسول صلى الله عليه وسلم لا ينطق عن الهوى، وإن كان هذا من الغيب، ولكن الله أطلع الرسول صلى الله عليه وسلم على الغيب، {عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا إِلَّا مَنِ ارْتَضَى مِنْ رَسُولٍ} [الجن: ٢٦، ٢٧] ، يطلع الله الرسل على شيء من المغيبات؛ لأجل مصلحة البشر.
وكذلك لو كان كافرا أو فاسقا فإننا لا نشهد له بالنار؛ لأننا لا
ندري عن خاتمته، لا نشهد لأحد بالجنة وإن كان من الصالحين؛ لأننا لا ندري عن خاتمته بم يختم له؟ ولا نشهد لأحد بالنار ولو كان كافرا لأننا لا ندري بم يختم له؟ والنبي صلى الله عليه وسلم يقول: «إن العبد ليعمل بعمل أهل النار حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع، فيسبق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل الجنة فيدخلها، وإن الرجل ليعمل بعمل أهل الجنة حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع فيسبق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل النار فيدخلها» .
والخواتيم لا يعلمها إلا الله سبحانه وتعالى، فنحن لا نشهد للمعين، أما العموم فنحن نشهد على الكفار أنهم في النار من غير تعيين فلان، نقول: الكافرون في النار، والمؤمنون في الجنة، على العموم، قال تعالى في الجنة: {أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ} [آل عمران: ١٣٣] ، وقال في النار: {أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ} [آل عمران: ١٣١] ، فلا شك أن الكفار في النار من غير تعيين أشخاص إلا بشهادة، ولا شك أن المؤمنين في الجنات من غير تعيين أشخاص إلا بشهادة ممن لا ينطق عن الهوى.
وهذا من التأدب مع الله سبحانه وتعالى فنحن لا نشهد للمعين إلا بدليل، ولكننا نرجو للمحسن ونخاف على المسيء.
“আমরা কারো শেষ পরিণতি সম্পর্কে জানি না। তাই কেউ নেককার হলেও আমরা নির্দিষ্ট করে তার জান্নাতের সাক্ষ্য দেই না; কারণ তার মৃত্যু কোন অবস্থায় হবে তা আমাদের জানা নেই। আবার কেউ কাফের হলেও আমরা (নির্দিষ্ট করে) তার জাহান্নামি হওয়ার সাক্ষ্য দেই না। আমি কোনো মুসলিমের জন্যই জান্নাত বা জাহান্নামের সাক্ষ্য দেই না, যতক্ষণ না রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে আমি নেককার ব্যক্তির জন্য (জান্নাতের) আশা রাখি এবং গুনাহগারের জন্য (শাস্তির) ভয় করি। আমি কোনো মুসলিমকে গুনাহের কারণে কাফের বলি না এবং তাকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেই না। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, তারা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি নেককার হলেও তার জান্নাতের সাক্ষ্য দেয় না এবং কোনো ব্যক্তি কাফের হলেও তার জাহান্নামের সাক্ষ্য দেয় না। অর্থাৎ আপনি বলতে পারেন না যে—’এই ব্যক্তি জান্নাতি’ অথবা ‘এই ব্যক্তি জাহান্নামি’। আল্লাহ তাআলা যাকে গায়েবের খবর জানিয়েছেন তিনি অর্থাৎ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছাড়া আর কারো জন্য এমনটি বলা জায়েজ নয়। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কেও সমস্ত গায়েব জানানো হয়নি। বরং গায়েবের কিছু কিছু বিষয় জানানো হয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো—রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছু মানুষের জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং আমরাও সাক্ষ্য দেই যে তারা জান্নাতি। যেমন: রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিদের মধ্য থেকে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ১০ জন (আশারায়ে মুবাশশারা)। তাঁরা হলেন: চার খলিফা, তালহা, যুবাইর, সা’দ, সাঈদ, আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং আবু উবাইদাহ আমের ইবনুল জাররাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের জান্নাতের সাক্ষ্য দিয়েছেন। এছাড়া সাবেত ইবনে কায়েস ইবনে শামমাস (রা.)-কেও নবীজি জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। আমরা তাঁদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দেই। কারণ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের নাম ধরে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাই আমরা বলি: আবু বকর জান্নাতি, ওমর জান্নাতি, তালহা ও জুবাইর জান্নাতি। কারণ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সংবাদ দিয়েছেন যে তারা জান্নাতি। আর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের খেয়ালখুশি মতো কথা বলেন না। যদিও এটি গায়েবি বিষয়। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাঁর রসুলকে এই গায়েব সম্পর্কে অবগত করেছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَى غَيْبِهِ أَحَدًا * إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِن رَّسُولٍ
“তিনি অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না; তাঁর মনোনীত রসুল ছাড়া।” [সূরা জিন: ২৬-২৭]
মানুষের কল্যাণের স্বার্থে আল্লাহ তাআলা তাঁর রসুলদের কিছু গায়েবি বিষয়ে অবগত করেন। একইভাবে কোনো ব্যক্তি কাফের বা ফাসেক হলেও আমরা তার জাহান্নামি হওয়ার সাক্ষ্য দেই না। কারণ তার শেষ পরিণতি কী হবে তা আমরা জানি না। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
«إن العبد ليعمل بعمل أهل النار حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع، فيسبق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل الجنة فيدخلها، وإن الرجل ليعمل بعمل أهل الجنة حتى ما يكون بينه وبينها إلا ذراع فيسبق عليه الكتاب فيعمل بعمل أهل النار فيدخلها»
“নিশ্চয়ই কোনো বান্দা (সারা জীবন) জাহান্নামিদের মতো আমল করতে থাকে, এমনকি তার ও জাহান্নামের মাঝে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, এমন সময় তার ওপর তাকদির প্রবল হয় এবং সে জান্নাতিদের মতো আমল শুরু করে দেয় এবং জান্নাতে প্রবেশ করে। আবার কোনো ব্যক্তি জান্নাতীদের মতো আমল করতে থাকে, এমনকি তার ও জান্নাতের মাঝে মাত্র এক হাত দূরত্ব থাকে, এমন সময় তার ওপর তাকদির প্রবল হয় এবং সে জাহান্নামিদের মতো আমল শুরু করে দেয় এবং জাহান্নামে প্রবেশ করে।” মানুষের শেষ পরিণতি আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না। তাই আমরা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে (জান্নাত বা জাহান্নামের) সাক্ষ্য দেই না। তবে সাধারণভাবে আমরা কাফেরদের জাহান্নামি হওয়ার সাক্ষ্য দেই—কাউকে নির্দিষ্ট না করে। আমরা বলি: কাফেররা জাহান্নামি এবং মুমিনরা জান্নাতি। জান্নাত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:
أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ
“এটি (জান্নাত) মুত্তাকিদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।” [সূরা আলে ইমরান: ১৩৩]
আর জাহান্নাম সম্পর্কে বলেছেন:
أُعِدَّتْ لِلْكَافِرِينَ
“এটি (জাহান্নাম) কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।” [সূরা আলে ইমরান: ১৩১]
সুতরাং কাফেররা যে জাহান্নামে যাবে এবং মুমিনরা যে জান্নাতে যাবে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে ওহী ছাড়া আমরা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ওপর এই হুকুম লাগাব না। এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার সাথে আদব বা শিষ্টাচারের অন্তর্ভুক্ত যে, আমরা দলিল ছাড়া নির্দিষ্ট কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলব না। বরং আমরা নেককারদের জন্য আশা রাখি এবং পাপাচারীদের জন্য আশঙ্কা করি।”
❑ ৩. আল্লামা ইবনে উসাইমিন রহ.-এর ফতওয়া:
“আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালিহ উসাইমিন রহ. বলেন:
وإذا رأينا رجلاً كافراً ملحداً مسلطاً على المسلمين، يمزق كتاب الله ويدوسه برجليه ويستهزىء بالله ورسوله فلا نقول: هذا من أهل النار، بل نقول: من فعل هذا فهو من أهل النار. بلا تعيين، لأنه من الجائز في آخر لحظة أن يمنّ الله عليه ويهديه، فأنت لا تدري، لذلك يجب التفريق بين التعيين والإطلاق، أوالتعيين والإجمال، فإذا مات رجل ونحن نعرف أنه مات على النصرانية حسب ما يبدو لنا من حاله، فلا نشهد له بالنار؛ لأنه إن كان من أهل النار فسيدخل ولو لم نشهد، وإن لم يكن من أهل النار فشهادتنا شهادة بغير علم، فمثل هذه المسائل لا داعي لها، فلو قال قائل: مات رجل من الروس، من الملحدين، مات رجل من الأمريكان من الملحدين منهم، مات رجل من اليهود من الملحدين، العنه واشهد له بالنار، نقول: لا يمكن، نحن نقول: من مات على هذا فهو من أهل النار، من مات على هذا لعناه، أما الشخص المعين فلا، ولهذا كان من عقيدة أهل السنة والجماعة قالوا: لا نشهد لأحد بالجنة أو بالنار إلا لمن شهد له النبي صلى الله عليه وسلم ، ولكننا نرجو للمحسن ونخاف على المسيء، هذه عقيدة أهل السنة والجماعة
“আর যদি আমরা এমন কোনো কাফের বা নাস্তিক ব্যক্তিকে দেখি যে মুসলিমদের ওপর চড়াও হয়েছে, আল্লাহর কিতাব ছিঁড়ে ফেলছে এবং তা পদদলিত করছে, আর আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিয়ে উপহাস করছে—তবুও আমরা নির্দিষ্ট করে বলব না যে: ‘এই ব্যক্তি জাহান্নামি’। বরং আমরা এভাবে বলব: ‘যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে সে জাহান্নামি’। অর্থাৎ ব্যক্তি নির্দিষ্ট না করে সাধারণভাবে বলব। কারণ হতে পারে শেষ মুহূর্তে আল্লাহ তাকে তাওফিকের নিয়ামত দান করবেন এবং হেদায়েত দেবেন, যা আপনি জানেন না।
এজন্য নির্দিষ্ট করা এবং সাধারণ রাখা (ইতলাক বা ইজমাল)-এর মধ্যে পার্থক্য করা আবশ্যক। যদি কোনো ব্যক্তি মারা যায় এবং আমরা জানি যে আমাদের দৃষ্টিতে সে খ্রিষ্টান হিসেবে মারা গেছে, তবুও আমরা তার ব্যাপারে জাহান্নামের সাক্ষ্য দেব না। কারণ সে যদি জাহান্নামি হয়ে থাকে তবে আমাদের সাক্ষ্য ছাড়াই সে সেখানে প্রবেশ করবে, আর যদি সে জাহান্নামি না হয় তবে আমাদের সাক্ষ্য হবে জ্ঞানহীন এক সাক্ষ্য। তাই এমন সব বিষয়ে জড়ানোর প্রয়োজন নেই। যদি কেউ বলে, রাশিয়ার অমুক নাস্তিক মারা গেছে, আমেরিকার অমুক নাস্তিক মারা গেছে কিংবা ইহুদিদের কোনো নাস্তিক মারা গেছে, তাকে অভিশাপ দাও এবং তার জাহান্নামি হওয়ার সাক্ষ্য দাও; আমরা বলব: না, এটা সম্ভব নয়। আমরা বলব: ‘যে এই অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামি’ অথবা ‘যে এই অবস্থায় মারা যাবে তার ওপর অভিশাপ’। কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা বলা যাবে না। এ কারণেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আকিদা হলো, তাঁরা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাদের ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন তারা ব্যতীত নির্দিষ্ট করে কাউকে জান্নাতি বা জাহান্নামি বলেন না। তবে আমরা সৎকর্মশীলের জন্য (জান্নাতের) আশা রাখি এবং পাপাচারীর ব্যাপারে (শাস্তির) ভয় পাই। এটাই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা।”
❑ ৪. শাইখ বিন বায রহ.-এর ফতোয়া
مَن مات على الكفر: يهودي أو نصراني أو غيره، إذا مات على دينه فهو في النار، الله توعَّدهم بالنار، فالكفَّار في النار يقينًا، والمسلمون في الجنة يقينًا.
أما الكلام في الواحد المعين: فلان ابن فلان، هو محل: هل يُشهد له بالتَّعيين أم لا؟ إلا مَن شهد له الرسولُ ﷺ.
اليهود في النار، والنصارى في النار، كل الكفَّار، كما أن المؤمنين في الجنة، قال الله جلَّ وعلا: وَعَدَ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ [التوبة:72]، فهم في الجملة موعودون بالجنة.
لكن فلان ابن فلان كونه مؤمنًا، فالله الذي يعلم ما في قلبه، إلا إذا شهد له المعصومُ عليه الصلاة والسلام، أو شهد له القرآن، مثل: أبي لهب: تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ [المسد:1]
“যে ব্যক্তি কুফরির ওপর মারা যায়—সে ইহুদি, খ্রিষ্টান বা অন্য যে কেউ হোক—যদি সে তার নিজের (বাতিল) ধর্মের ওপরই মারা যায়, তবে সে জাহান্নামি। আল্লাহ তাআলা তাদের জাহান্নামের হুমকি দিয়েছেন। সুতরাং কাফেররা নিশ্চিতভাবেই জাহান্নামি এবং মুসলিমরা নিশ্চিতভাবেই জান্নাতি। তবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে—যেমন অমুকের পুত্র অমুক—তাকে কি নির্দিষ্টভাবে (জান্নাতি বা জাহান্নামি) সাক্ষ্য দেওয়া যাবে কি না, তা ভিন্ন বিষয়। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন সে ছাড়া অন্য কাউকে নির্দিষ্ট করা যাবে না।
সাধারণভাবে ইহুদিরা জাহান্নামে যাবে, খ্রিষ্টানরা জাহান্নামে যাবে এবং সব কাফেরই জাহান্নামি; ঠিক যেমন মুমিনরা জান্নাতি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
وَعَدَ اللَّهُ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ
“আল্লাহ মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদের এমন জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যার তলদেশ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়।” [সূরা তাওবাহ: ৭২]
অর্থাৎ তারা সামগ্রিকভাবে জান্নাতের প্রতিশ্রুতিপ্রাপ্ত। কিন্তু অমুকের পুত্র অমুক ব্যক্তিটি মুমিন কি না (অর্থাৎ তার অন্তরের প্রকৃত অবস্থা কী), তা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে যদি মাসুম নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়ে থাকেন অথবা পবিত্র কুরআনে তার ব্যাপারে সাক্ষ্য এসে থাকে (তবে তাকে নির্দিষ্ট করা যাবে); যেমন আবু লাহাবের ব্যাপারে বলা হয়েছে:
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ
“আবু লাহাবের হাত দুটি ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক।” [সূরা মাসাদ: ১]” [ইমাম মুজাদ্দিদ আব্দুল ওয়াহাব রাহ. রচিত কিতাবুত তাওহিদ-এর শরাহ (ব্যাখ্যা)]
❑ ৫. সৌদি আরবের ফাতওয়া ও গবেষণা বিষয়ক স্থায়ী কমিটি-এর ফতওয়া:
প্রশ্ন: যে ইহুদি বা খ্রিষ্টান মুসলিমদের মাঝে বসবাস করে অথবা ইসলাম, কুরআন ও নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছে—সে যদি তার নিজের ধর্ম পরিবর্তন না করে ইহুদি বা খ্রিষ্টান অবস্থায় মারা যায় তবে কি আমরা বলব যে সে জাহান্নামে যাচ্ছে? নাকি আমরা কবিরা গুনাহে লিপ্ত কোনো মুসলিমের মতো তার ব্যাপারেও নীরবতা অবলম্বন করব (যে আল্লাহর ইচ্ছাধীন)? আমাদের ফতোয়া দিয়ে উপকৃত করুন।
উত্তর:
مذهب أهل السنة: أنه لا يحكم على معين بأنه من أهل النار أو من أهل الجنة ، إلا من شهد له رسول الله صلى الله عليه وسلم، ولكننا نرجو للمحسن ونخاف على المسيء، ولا يعلم الخواتيم وعواقب الأمور إلا الله سبحانه وتعالى، مع العلم بأن اليهود والنصارى كفار، وكل من مات على الكفر فهو من أهل النار، كما أن كل من مات على
الإيمان بالله ورسوله محمد صلى الله عليه وسلم فهو من أهل الجنة، كما قال سبحانه: الآية من سورة التوبة، وقال تعالى في شأن الكفار: .
وبالله التوفيق، وصلى الله على نبينا محمد وآله وصحبه وسلم.
“আহলুস সুন্নাহর মাজহাব হলো, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে সে জাহান্নামি না জান্নাতি—তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না, যতক্ষণ না রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তবে আমরা নেককার ব্যক্তির জন্য (জান্নাতের) আশা রাখি এবং পাপাচারীর জন্য (শাস্তির) ভয় পাই। মানুষের শেষ পরিণতি ও পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা ছাড়া আর কেউ জানে না। এর পাশাপাশি এটি নিশ্চিতভাবে জানতে হবে যে, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা কাফের। আর যে ব্যক্তি কুফরের ওপর মারা যাবে সে জাহান্নামি; ঠিক যেমন যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রসুল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর ঈমান নিয়ে মারা যাবে সে জান্নাতি। যেমনটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা তাওবার আয়াতে বলেছেন এবং কাফেরদের সম্পর্কেও অনুরূপ বলেছেন। আর আল্লাহর তাওফিকেই সব কাজ সম্পন্ন হয়। আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সাহাবিদের ওপর দরুদ ও সালাম বর্ষণ করুন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
সংকলন ও অনুবাদ:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate