October 16, 2025

দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক

 প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক? যদি কেউ বলেন যে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ বৈধ নয়, তাহলে এই বিষয়ে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর:
.
প্রথমত দ্বিতীয় বিবাহ করার সময় প্রথম স্ত্রী থেকে অনুমতি নেওয়া আবশ্যক কিনা তা দুইটি ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিবেচনা করা যেতে পারে।
.
▪️প্রথম অবস্থা: যদি কোনো নারী প্রথম বিবাহের সময় শর্তারোপ করেন যে, স্বামী জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর অন্য কোনো নারীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না, কিংবা অন্ততপক্ষে তার অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিবাহ করতে পারবেন না—এবং স্বামী যদি এ শর্ত মেনে নিয়ে তার সাথে বিবাহ সম্পাদন করেন, তাহলে এ শর্তের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা তার দায়িত্ব হবে। অতএব তিনি যদি স্ত্রীর সঙ্গে সমঝোতা ও অনুমতি ব্যতিরেকে দ্বিতীয় বিবাহ করেন, তবে তিনি একদিকে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের কারণে গুনাহগার হবেন, অন্যদিকে প্রথম স্ত্রীর জন্য বৈবাহিক সম্পর্ক বাতিল (ফাসখ) করার অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে স্ত্রী চাইলে স্বামীর সাথে বসবাস করতে পারেন অথবা বিচ্ছেদ নিতে পারেন। কারণ স্বামী তার চুক্তি লঙ্ঘন করেছেন অথচ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন:”আর অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”(সূরা বনি ইসরাইল: ১৭/৩৪)। অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন,”হে মুমিনগণ, তোমরা অঙ্গীকারসমূহ পূর্ণ কর।”(সূরা মায়েদাহ: ৫/১)।উক্ত আয়াতের তাফসিরে যায়দ ইবনে আসলাম (রহ.) বলেছেন, এখানে ঐসব চুক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যা মানুষ পরস্পরে একে অন্যের সাথে সম্পাদন করে। যেমন বিবাহ-শাদী ও ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি ইত্যাদি। [তাফসীরে বাগভী সূরা মায়েদার ১ নং আয়াতের তাফসির]। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘শর্তসমূহের মধ্যে যা পূর্ণ করার সর্বাধিক দাবী রাখে তা হল- সেই শর্ত যার দ্বারা তোমরা তোমাদের স্ত্রীদের হালাল করেছ।’(সহীহ বুখারী, হা/২৭২১, ৫১৫১; মুসলিম, হা/১৪১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৩০৪)।রাসূল (ﷺ) আরো বলেছেন, মুসলিমগণ তাদের পরস্পরের শর্তানুযায়ী কাজ করবে যদি তা হালাল হয়। (মুস্তাদরাক হাকেম হা/২৩১০ সহীহুল জামে‘ হা/৬৭১৫)। রাসূল (ﷺ) আরো বলেছেন, মুসলিমগণ পরস্পরের মধ্যে যে শর্ত করবে, তা অবশ্যই পালন করতে হবে। কিন্তু যে শর্ত ও চুক্তি হালালকে হারাম এবং হারামকে হালাল করবে তা জায়েয হবে না।’(আবু দাঊদ হা/৩৫৯৪; তিরমিযী হা/১৩৫২; মিশকাত হা/২৯২৩)।
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,إذا اشترط لها أن لا يخرجها من دارها أو بلدها ، أو لا يسافر بها ، أو لا يتزوج عليها : فهذا يلزمه الوفاء به ، فإن لم يفعل فلها فسخ النكاح ، روي هذا عن عمر وسعد بن أبي وقاص وعمرو بن العاص رضي الله عنهم “যদি পাত্রী তার জন্য শর্ত দেয় যে বিবাহের পর স্বামী তাকে তার বাড়িতে রাখতে হবে অন্য কোথাও নিতে পারবে না, তার সাথে দূরে কোথাও ভ্রমন করবে না।স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ করবেনা এবং সে তার সাথে কোন ষড়যন্ত্র করবেনা তাহলে তাকে অবশ্যই তা পূরণ করুন, এবং যদি তিনি তা না করেন, তবে স্ত্রীর বিবাহ বাতিল করার অধিকার রয়েছে।”(ইমাম ইবনে কুদামাহ আল-মুগনী; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪৮৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:إذا اشترطت أن لا يتزوج عليها فإن هذا يجوز .وقال بعض العلماء : إنه لا يجوز ؛ لأنه حجر على الزوج فيما أباح الله له ، فهو مخالف للقرآن : (فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلاثَ وَرُبَاعَ) النساء/3 .فيقال في الجواب على ذلك : هي لها غرض في عدم زواجه ، ولم تعتد على أحد ، والزوج هو الذي أسقط حقه ، فإذا كان له الحق في أن يتزوج أكثر من واحدة ، أسقطه ، فما المانع من صحة هذا الشرط ؟! ولهذا ؛ فالصحيح في هذه المسألة ما ذهب إليه الإمام أحمد رحمه الله من أن ذلك الشرط صحيح“যদি স্ত্রী এই শর্ত আরোপ করেন যে স্বামী তার সঙ্গে বিবাহের বাইরে আর কোনো নারীকে বিবাহ করবেন না, তবে এটি বৈধ। যদিও কিছু আলেম বলেছেন যে এটি বৈধ নয়, কারণ এতে স্বামীকে এমন বিষয়ে বাধ্য করা হয়েছে যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তার জন্য বৈধ। তারা কুরআনের আয়াত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন:”অতএব তোমরা নারীদের মধ্যে তোমাদের পছন্দমতো বিয়ে করো– দুই, তিন অথবা চারজনকে।”(সূরা নিসা:৩) এই যুক্তির জবাবে বলা যায় যে, বহুবিবাহ না করার বিষয়ে স্ত্রীর আরোপিত শর্তের একটি উদ্দেশ্য রয়েছে এবং এতে তিনি কারও প্রতি কোনো অন্যায় করেননি। বরং স্বামী নিজেই তার বৈধ অধিকার ত্যাগ করেছেন। সুতরাং, যেহেতু স্বামী তার একাধিক স্ত্রীর অধিকার রাখতে পারার ক্ষমতা রাখে, কিন্তু স্বেচ্ছায় তা ত্যাগ করছেন,তাহলে এই শর্তের বৈধ হওয়ার পথে বাধা কোথায়?!অতএব,এই মাসয়ালার ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য ও সঠিক মত হলো ইমাম আহমদের (রহঃ) মত: স্ত্রীর দ্বারা আরোপিত এই শর্ত বৈধ ও গ্রহণযোগ্য।”(ইবনু উসাইমীন; আশ-শারহুল মুমতি; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৪৩) [এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনাসহ আমরা স্বতন্ত্র একটি আর্টিকেল লিখবো ইনশাআল্লাহ]
.
▪️দ্বিতীয় অবস্থা: যদি কোনো নারী প্রথম বিবাহের সময় এমন কোনো শর্ত আরোপ না করেন যে—স্বামী তাঁর জীবদ্দশায় বা মৃত্যুর পর অন্য কোনো নারীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবেন না—তাহলে দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ওয়াজিব নয়। বরং স্বামী যদি শারীরিক ও আর্থিকভাবে সক্ষম হন, তবে তাঁর জন্য দ্বিতীয় বিবাহ করা বৈধ,এতে কোনো আপত্তি নেই।অতএব, যদি কেউ এ দাবি করেন যে দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক—তাহলে তাঁর দায়িত্ব হলো এ দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট শরীয়তসম্মত দলিল উপস্থাপন করা। কেননা, শরীয়তের একটি মূলনীতি হলো: কোনো শর্ত আরোপকারীই তার প্রমাণ পেশ করবে। বিপরীতে, যে ব্যক্তি এ শর্তকে অস্বীকার করেন, তিনি মূলনীতির সাথেই একমত হচ্ছেন। আর মূলনীতি হলো: শর্ত তখনই গ্রহণযোগ্য, যখন তার প্রমাণ পাওয়া যায়; প্রমাণ ছাড়া নয়।কুরআন সুন্নাহ’র একাধিক স্থানে এই মূলনীতির দলিল পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রধান হলো: মহান আল্লাহ বলেন:وَ قَالُوۡا لَنۡ یَّدۡخُلَ الۡجَنَّۃَ اِلَّا مَنۡ كَانَ هُوۡدًا اَوۡ نَصٰرٰی ؕ تِلۡكَ اَمَانِیُّهُمۡ ؕ قُلۡ هَاتُوۡا بُرۡهَانَكُمۡ اِنۡ كُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ
“আর তারা বলে, ইয়াহুদী অথবা নাসারা ছাড়া অন্য কেউ কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। এটা তাদের মিথ্যা আশা। বলুন, “যদি তোমরা সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ কর”।(সূরা বাকারা: ১১১) অপর আয়াতে মহান আল্লাহ আরও বলেন:أَمِ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً ۖ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ ۖ هَٰذَا ذِكْرُ مَن مَّعِيَ وَذِكْرُ مَن قَبْلِي“তারা কি আল্লাহ ছাড়া উপাস্য গ্রহণ করেছে? বলুন: তোমরা তোমাদের প্রমাণ পেশ করো।”(সূরা আম্বিয়া: ২৪) এখানে মূর্তিপূজকদের দাবির খণ্ডনে সরাসরি তাদের কাছ থেকে প্রমাণ চাওয়া হয়েছে।
.
ইমাম তিরমিজি (রাহিমাহুল্লাহ) সুনানে তিরমিজিতে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন যার শিরোনাম হলো;باب مَا جَاءَ فِي أَنَّ الْبَيِّنَةَ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينَ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ
অর্থ: “বাদীর দায়িত্ব হচ্ছে সাক্ষ্য-প্রমাণ হাযির করা এবং বিবাদীর দায়িত্ব হচ্ছে শপথ করা। “অতঃপর তিনি হাদিস নিয়ে এসেছেন, আমর ইবনু শুআইব (রাহিমাহুল্লাহ) হতে পর্যায়ক্রমে তার বাবা ও দাদার সূত্রে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক ভাষণে বলেছেনঃ:الْبَيِّنَةُ عَلَى الْمُدَّعِي وَالْيَمِينُ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ “বাদীর দায়িত্ব হচ্ছে সাক্ষী-প্রমাণ হাযির করা এবং বিবাদীর দায়িত্ব হচ্ছে শপথ করা।” (সুনানে তিরমিজি হা/১৩৪১; ইমাম আল-আলবানী ইরওয়ুল গালীল হা/১৯৩৮)
.
সহীহ বুখারীর অপর এক বর্ননায় এসেছে, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: (لَوْ يُعْطَى النَّاسُ بِدَعْوَاهُمْ لاَدَّعَى نَاسٌ دِمَاءَ رِجَالٍ وَأَمْوَالَهُمْ وَلَكِنَّ الْيَمِينَ عَلَى الْمُدَّعَى عَلَيْهِ) “যদি লোকের দাবি অনুসারে তাদের দিয়ে দেয়া হতো তবে কোন কোন লোক অপর ব্যক্তির জান-মাল দাবি করে বসতো। তাই বিবাদীর জন্য শপথ নেয়ার বিধান রয়েছে।”(সহীহ বুখারী হা/৪৫৫২; সহীহ মুসলিম হা/৪৫৬৭)
.
বিশেষত ইসলামি শরিয়ত সুস্পষ্টভাবে বিবাহসংক্রান্ত বহু শর্ত নির্ধারণ করেছে। কিন্তু সেই শর্তগুলোর কোথাও উল্লেখ নেই যে, দ্বিতীয় বিবাহ করতে হলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি আবশ্যক। বরং বাস্তবে দেখা যায়,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) একাধিক বিবাহ করেছেন, অথচ কোথাও প্রমাণ পাওয়া যায় না যে তিনি তাঁর স্ত্রীদের কারও অনুমতি নিয়েছিলেন। একইভাবে, সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) একাধিক বিবাহ করেছেন, কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রেও এ ধরনের কোনো অনুমতির শর্তের উল্লেখ নেই।অতএব, শরিয়তের দৃষ্টিতে এটি সুস্পষ্ট প্রমাণ যে দ্বিতীয় বিবাহ করতে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া ফরজ নয়। তবে সন্দেহাতীতভাবে উত্তম ও শোভনীয় হলো—যদি কেউ দ্বিতীয় বিবাহ করতে চায়, তবে সে আগে প্রথম স্ত্রীকে অবহিত করবে এবং তাকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করবে। কারণ, এতে পারিবারিক শান্তি-সৌহার্দ্য বজায় থাকে এবং পরিণতিও ইতিবাচক হয়। তবে এটিকে ওয়াজিব বা বাধ্যতামূলক বিধান বলা যাবে না।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে যখন দ্বিতীয় বিয়েতে প্রথম স্ত্রীর সম্মতি আবশ্যক কিনা তা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তখন তারা উত্তর দিয়েছিলেন:
ليس بفرض على الزوج إذا أراد أن يتزوج ثانية أن يرضي زوجته الأولى ، لكن من مكارم الأخلاق وحسن العشرة أن يطيِّب خاطرها بما يخفف عنها الآلام التي هي من طبيعة النساء في مثل هذا الأمر ، وذلك بالبشاشة وحسن اللقاء وجميل القول وبما تيسّر من المال إن احتاج الرضى إلى ذلك “
“স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করতে চান, তবে প্রথম স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করা তার জন্য ফরয (আবশ্যিক) নয়। তবে এটি নিঃসন্দেহে সদাচরণ ও উত্তম চরিত্রের অংশ যে, স্বামী এমনভাবে তার মনকে প্রফুল্ল করার চেষ্টা করবেন, যাতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্ত্রীর স্বাভাবিক দুঃখ-কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়। আর তা হতে পারে— হাসিমুখে ভালো ব্যবহার, আন্তরিক ও কোমল কথাবার্তা, এবং প্রয়োজনে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু আর্থিক অনুগ্রহ প্রদানের মাধ্যমে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৫৩)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “যদি কোনো পুরুষ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চায়, তবে তার কি প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া শর্ত? এবং তার অজান্তে বিয়ে করলে তার বিধান কী?
উত্তরে শাইখ বলেন:
أعتقد أنه لو استأذن منها لأبت أن يتزوج ، ولكن ليس من شرط النكاح أن يستأذن الزوجة الأولى بل حتى لو استأذنها وأَبَتْ فله الحق أن يتزوج ، ولكن مع هذا أرى أنه ينبغي أن يشاورها ويقنعها حتى تقتنع بذلك وتطمئن ، ويبين العلة التي من أجلها يريد أن يتزوج ، فإذا جاءتها الزوجة الجديدة جاءتها وهي على اطمئنانٍ بها وعلى علمٍ بها وعلى رضىً بها ، وحينئذٍ يمكن أن تعيش الزوجتان عيشةً حميدة بدون تنافرٍ ولا تباغض ، فمن أجل مراعاة هذه الفوائد ينبغي أن يستأذنها ويخبرها ، وأما أن يكون ذلك واجباً فليس بواجب ” .فسئل الشيخ”: لو أخفى عنها هذا الزواج ؟ فأجاب : ” لا حرج عليه ” .
“আমি মনে করি যে, যদি সে (স্বামী) তার কাছ থেকে (প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে) অনুমতি চাইত, তাহলে হয়তো সে (স্ত্রী) তার (স্বামীর দ্বিতীয়) বিয়েতে অসম্মতি জানাতো। তবে প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে অনুমতি চাওয়া বিবাহের শর্ত নয়; বরং স্বামী অনুমতি চাইলেও এবং সে (স্ত্রী) অসম্মতি জানালেও, তার (স্বামীর) বিয়ে করার অধিকার রয়েছে। তা সত্ত্বেও, আমি মনে করি তার উচিত হবে প্রথম স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা এবং তাকে বোঝানো, যতক্ষণ না সে এতে সন্তুষ্ট ও আশ্বস্ত হয়। এবং সে যেন সেই কারণও পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করে, যার কারণে সে বিবাহ করতে চায়। ফলে, যখন নতুন স্ত্রী তার কাছে আসবে, তখন সে (প্রথম স্ত্রী) তা জানার পর, আশ্বস্ত মনে ও সন্তুষ্টি সহকারে তাকে গ্রহণ করবে।এর ফলে দুই স্ত্রী শান্তিপূর্ণভাবে, কোনো বিরোধ বা বিদ্বেষ ছাড়া একসাথে জীবনযাপন করতে পারবে। সুতরাং এসব কল্যাণকর ফলাফল অর্জনের জন্য স্বামীর উচিত হবে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি চাওয়া ও তাকে জানানো। কিন্তু একে যে ওয়াজিব (অবশ্য কর্তব্য) বলা যাবে না।”এরপর শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞেস করা হলো: “যদি স্বামী দ্বিতীয় বিবাহটি প্রথম স্ত্রীর কাছ থেকে গোপন রাখে? তিনি উত্তর দিলেন: এতে তার উপর কোনো দোষ নেই।”(ইবনু উসাইমীন, ফাতাওয়া নূরুন ‘আলাদ দারব, শাইখের ওয়েবসাইট থেকে সংকলি) গৃহীত: ইসলাম সাওয়াল জবাব ফাতওয়া নং-২১৮৭৫৯)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অযু এবং গোসলে কতটুকু পানি খরচ করতেন

 প্রশ্ন: রাসূল (ﷺ) অযু এবং গোসলে কতটুকু পানি খরচ করতেন? সংক্ষেপে ওজুর বিশুদ্ধ সুন্নাতি পদ্ধতি জানতে চাই।

▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর রাসূল (ﷺ) অযু এবং গোসলে কতটুকু পানি খরচ করতেন এ বিষয়ে প্রখ্যাত সাহাবী আনাস ইবনু মালিক (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) [মৃত: ৯৩ হি.] বলেন,كَانَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم يَتَوَضَّأُ بِالْمُدِّ وَيَغْتَسِلُ بِالصَّاعِ إِلَى خَمْسَةِ أَمْدَادٍ ‏.‏”রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম,এক মুদ্দ পানি দিয়ে ওজু করতেন, এবং এক সা’ থেকে পাঁচ মুদ্দ পরিমাণ পানি দিয়ে গোসল করতেন।”(সহীহ বুখারী হা/২০১;সহীহ মুসলিম হা/৬৩০) হাদীসে কানা’ (كان) শব্দটি প্রমাণ করে যে রাসূল (ﷺ) নিয়মিত এভাবেই পানি খরচ করতেন।
.
ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ) আম্মাজান আয়িশাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, নিশ্চয়ই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোসল করতেন তিন মুদ অথবা তার নিকটবর্তী মুদ পানি ধারণ ক্ষমতা রাখে এমন পাত্র থেকে গোসল করতেন। অপর বর্ননায় আম্মিজান ‘আয়েশা (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহা) [মৃত: ৫৭/৫৮ হি.] বলেন,”আমি ও রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটা পাত্র থেকে পানি নিয়ে গোসল করতাম। যে পাত্রকে (اَلْفِرَقَ) ফিরাক বলা হয়, আর তাতে তিন (صَاعً) ‘সা’ (সাড়ে সাত কেজি) পরিমান পানি ধারণ ক্ষমতা রয়েছে।”(বুখারী হা/২০১, মুসলিম হা/ ৩২৫; ফাতহুল বারী; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৭২)
.
“মুদ্দ” হলো “সা’”-এর এক-চতুর্থাংশ। এক সা’ প্রায় ২.৫ কেজি থেকে ৩ কেজি ওজনের সমান। এক মুদ্দ প্রায় ৬০০–৭০০ গ্রামের মত, এবং চার মুদ্দ মিলে এক সা’ হয়। লিটার অনুযায়ী হিসাব করলে, এক মুদ্দ প্রায় ০.৭৫ লিটার পানি সমান। সুতরাং,ওজুর জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺ যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করতেন, তা আনুমানিক ৬০০–৭০০ গ্রামের সমান। যেমনটি আমরা উল্লেখ করেছি,এটিকে সহজভাবে দুই হাতের পূর্ণ অঞ্জলির পানির পরিমাণের সঙ্গে তুলনা করাও সম্ভব।মূলকথা হলো صاع ‘সা’ ৫ মুদের বেশী হবে না এবং ৪ মুদের কম হবে না।
.
ফিরোজাবাদী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেনوالمُدُّ، بالضم: مِكْيالٌ، وهو رِطْلانِ، أو رِطْلٌ وثُلُثٌ، أو مِلْءُ كَفَّيِ الإِنسانِ المُعْتَدِلِ إذا مَلأَهُما وَمَدَّ يَدَهُ بهما، وبه سُمِّيَ مُدًّا، وقد جَرَّبْتُ ذلك فَوَجَدْتُهُ صحيحاً”মুদ্দ যেটি পেশ সহ উচ্চারিত হয়, একটি পরিমাপের একক। এটি দুই রিতল, অথবা এক রিতল ও এক-তৃতীয়াংশ,অথবা একজন মধ্যম আকৃতির মানুষের দুই হাতের পূর্ণ মুঠোর পরিমাণ, যা সে উভয় হাত ভরে ভরে টেনে ধরে।এ কারণেই এটিকে ‘মুদ্দ’ বলা হয়েছে।আমি নিজে তা পরীক্ষা করেছি এবং সঠিক পেয়েছি।”(আল-কামুস আল-মুহীত; পৃষ্ঠা: ৩১৮)
.
জেনে রাখা উচিত যে, অযু ও গোসলের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ পানি শরিয়তে বাধ্যতামূলকভাবে নির্ধারিত নেই। বরং প্রত্যেক ব্যক্তি তার প্রয়োজন অনুসারে পানি ব্যবহার করবে। তবে ওযু বা গোসলকারীর কর্তব্য হলো পানি ব্যবহারে সংযম অবলম্বন করা এবং অপচয় থেকে বিরত থাকা। বিশেষ করে অযুর ক্ষেত্রে “এক মুদ্দ” পানিতে সীমাবদ্ধ থাকা আবশ্যক নয়। বরং করণীয় হলো প্রতিটি অঙ্গকে তিনবার ধোয়া এবং এমনভাবে ধোয়া যাতে অযুর অঙ্গ গুলো পূর্ণভাবে পানিতে ভিজে যায়।অযু করতে গিয়ে যদি কখনো এক মুদ্দের বেশি পানি ব্যবহৃত হয়ে যায়—বিশেষত নলকূপ বা কল থেকে অযু করার সময়, যেখানে ঠিক মুদ্দের হিসাব মেনে চলা প্রায় অসম্ভব—তাহলেও এতে কোনো দোষ নেই। তবে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যেন প্রতিটি অঙ্গ তিনবারের বেশি ধোয়া না হয়। কারণ তিনবারের বেশি ধোয়া অপচয় ও সীমালঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্ত।যেমন-আমর ইবনু শু‘আয়ব (রহঃ) থেকে পর্যায়ক্রমে তার পিতা ও তার দাদার সূত্রে বর্ণিত। তিনি (দাদা) বলেন যে,جَاءَ أَعْرَابِيٌّ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَسْأَلُهُ عَنِ الْوُضُوءِ فَأَرَاهُ ثَلَاثًا ثَلَاثًا ثُمَّ قَالَ: «هَكَذَا الْوُضُوءُ فَمَنْ زَادَ عَلَى هَذَا فَقَدْ أَسَاءَ وَتَعَدَّى وَظَلَمَ”এক বেদুঈন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তাঁকে উযু সম্পর্কে জিজ্ঞেস করায়, তিনি তাকে তিন তিনবার করে (উযূর প্রতিটি অঙ্গ ধুয়ে) দেখালেন। অতঃপর বললেন, এই হলো ওযূ। যে ব্যক্তি এর চেয়ে বাড়িয়ে করলো সে মন্দ করলো, সীমালঙ্ঘন করলো ও যুলম করলো।”(সুনানে নাসায়ী হা/১৪০, ইবনু মাজাহ হা/৪২২, সিলসিলা সহীহাহ হা/২৯৭০)
.
শাফি‘ঈ মাযহাবের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ইমাম মুহিউদ্দীন বিন শারফ আন-নববী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬৭৬ হি.] বলেছেন,يشترط في غسل الأعضاء جريان الماء عليها، فإن أمسه الماء ولم يجر: لم تصح طهارته اتفق عليه الأصحاب …..”অঙ্গ ধোওয়ার ক্ষেত্রে শর্ত হলো এর উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়া। যদি পানি শুধু স্পর্শ করে কিন্তু প্রবাহিত না হয়, তবে তার পবিত্রতা (ওজু বা গোসল) সহীহ হবে না এ ব্যাপারে সকল আসহাব একমত।”(নববী আল মাজমূ খণ্ড: ১;পৃষ্ঠা: ৪৯১)
.
তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেছেন:أجمع المسلمون على أن الماء الذي يجزئ في الوضوء والغسل غير مقدر، بل يكفي فيه القليل والكثير؛ إذا وجد شرط الغَسل، وهو جريان الماء على الأعضاء”সমস্ত মুসলিম ঐকমত্যে পৌঁছেছেন যে, ওজু ও গোসলে যে পানি যথেষ্ট হবে তার কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ শরীয়তে বেঁধে দেওয়া হয়নি। বরং অল্প বা বেশি যেকোনো পরিমাণেই যথেষ্ট হবে, শর্ত এই যে পানি অঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে হবে।”(শারহু সহীহ মুসলিম; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ২০)
.
তিনি সহিহ মুসলিমের ব্যাখ্যায় আরও বলেছেন:”أَجْمَعَ الْعُلَمَاءُ عَلَى كَرَاهَةِ الزِّيَادَةِ عَلَى الثَّلَاثِ ، وَالْمُرَادُ بِالثَّلَاثِ الْمُسْتَوْعِبَةِ لِلْعُضْوِ، وَأَمَّا إِذَا لَمْ تَسْتَوْعِبِ الْعُضْوَ إِلَّا بِغَرْفَتَيْنِ ، فَهِيَ غَسْلَةٌ وَاحِدَةٌ”আলেমগণ সর্বসম্মত যে, তিনবারের (ধোয়া) বেশি করা মাকরূহ। আর তিনবার বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, তিনবারে পুরো অঙ্গ ধোয়া হয়ে গেছে। কিন্তু যদি একটি অঙ্গ পূর্ণ ধোয়া না হয় একবারে, বরং দুইবার পানি নেওয়ার মাধ্যমে অঙ্গ ভিজে যায়, তবে সেটি একবার ধোয়ার গণ্য হবে।”(শারহুন নববী আলা মুসলিম; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ১০৯)
.
শাইখ আবু উমর দুবইয়ান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেছেন:
أما بالنسبة للعدد، فالزيادة على الثلاث: إن لم تكن محرمة، فهي مكروهة كراهة شديدة؛ لأنه قد ورد النهي عن الزيادة على الثلاث، وهو أكثر ما فعله رسول الله – صلى الله عليه وسلم -.وأما بالنسبة لمقدار الماء المستعمل في الوضوء، فلم يأت حد من الشرع، بحيث لا يتجاوزه الإنسان، والناس يختلفون في هذا بدانة ونحافة، والمياه في عصرنا تأتي عن طريق الصنابير التي تدفع الماء دفعاً، لا يمكن معه التقيد بالمقدار الوارد؛ إلا أن يأخذ الإنسان الماء في إناء، ويغلق الصنبور، وقد لا يتوفر الإناء في كل مكان. والأحاديث الواردة في مقدار وضوء النبي – صلى الله عليه وسلم – كلها تدل على أن كمية الماء ليس فيها حد بمقدار معين، وإنما الأمر تقريبي”
“সংখ্যার ক্ষেত্রে তিনবারের বেশি করা যদি হারামও না হয়, তবে তা খুবই মাকরূহে তাহরীমী,কারণ তিনবারের বেশি করা থেকে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সবচেয়ে বেশি তিনবারই করেছেন। পানির পরিমাণের ক্ষেত্রে: শরীয়তে ওজুর পানির কোনো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করা হয়নি, যা অতিক্রম করা যাবে না। মানুষের দেহ মোটা-পাতলা ভিন্ন ভিন্ন হওয়ায় এ ব্যাপারে পার্থক্য ঘটে। আমাদের যুগে পানি আসে টিউবওয়েল/ট্যাপ দিয়ে, যেখান থেকে পানি প্রবাহিত হয়, এতে করে নির্দিষ্ট পরিমাণের সাথে মিলানো সম্ভব হয় না। তবে কেউ যদি পাত্রে পানি নিয়ে কল বন্ধ করে নেয়, তাহলে তা সম্ভব। কিন্তু সব জায়গায় পাত্র পাওয়া যায় না।রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ওজুর পানির পরিমাণ সংক্রান্ত হাদিসগুলো সবই প্রমাণ করে যে, পানির কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই,বরং এটি আনুমানিক বিষয়।”(মাওসুয়াতুত ত্বহারাত; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৩৬৮)
.
▪️সংক্ষেপে ওজুর বিশুদ্ধ সুন্নাতি পদ্ধতি কি:
.
অযুর মুস্তাহাব পদ্ধতি: যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে; ওযুর বিস্তারিত পদ্ধতি নিম্নরূপ:-অযুর ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ সর্বাগ্রে অন্তরে ওজুর নিয়ত করবেন। ওজুর আগে মিসওয়াক করতে পারেন; যা একটি সুন্নাতি আমল। এরপর ‘বিসমিল্লাহ’ বলবেন। তারপর দু হাতের কব্জি ধৌত করবেন তিনবার। কব্জিদ্বয় তিনবার ধৌত করা, প্রথমে ডান হাতের কব্জি ধৌত করা এবং দু হাতের আঙুলসমূহ খিলাল করা সুন্নাত। এরপর ডান হাতে পানি নিয়ে তিনবার কুলি করবেন এবং ডান হাতে পানি নিয়ে তিনবার নাকে পানি দেবেন। এক অঞ্জলি পানি দিয়েই একসাথে কুলি করতে ও নাকে পানি দিতে পারবেন; আবার কুলি করা ও নাকে পানি দেওয়ার জন্য আলাদাভাবেও পানি নিতে পারবেন উভয়ই বৈধ। আর নাকে পানি দেওয়ার পর নাক ঝাড়বেন বাম হাত দিয়ে। এরপর তিনবার মুখমণ্ডল ধৌত করবেন। ঘন দাড়ি থাকলে দাড়ি খিলাল করবেন; এক অঞ্জলি পানি নিয়ে দাড়ি ঘষার মাধ্যমে খিলাল করবেন। এরপর তিনবার কনুই সহকারে দুই হাত ধৌত করবেন,কনুই পর্যন্ত। এক্ষেত্রে ডান হাত আগে ধৌত করা সুন্নাত। এরপর দুই হাতে পানি নেওয়ার পর পানি ফেলে দিয়ে ভেজা দুই হাত দ্বারা সমগ্র মাথা একবার মাসেহ করবেন; মাথার সামনের দিকের চুল যেখানে শুরু হয়েছে সেখান থেকে নিয়ে মাথার পেছনে ঘাড়ের শেষভাগ পর্যন্ত মাসেহ করবেন। দুই কানের ওপরে থাকা চুলবিহীন সাদা অংশও মাসেহ করবেন। এরপর নতুন করে পানি নিয়ে পানিভেজা হাত দিয়ে একবার দুই কান মাসেহ করবেন। একসাথে দুই কান মাসেহ না করে প্রথমে ডান কান এরপরে বাম কান মাসেহ করা সুন্নাত। কান মাসেহের সময় তর্জনী আঙুল দিয়ে কানের ছিদ্রের অংশ মাসেহ করবেন এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে কানের পৃষ্ঠদেশ মাসেহ করবেন। এরপর তিনবার টাখনু সহকারে দুই পা ধৌত করবেন, টাখনু পর্যন্ত। প্রথমে ডান পা ধৌত করা সুন্নাত। পা ধোয়ার সময় পায়ের আঙুলগুলো খিলাল করা সুন্নাত। সুতরাং বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুল দিয়ে ডান পায়ের আঙুলগুলো খিলাল করবেন; ডান পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল থেকে শুরু করে ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি পর্যন্ত,এরপর বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলি থেকে শুরু করে বাম পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল পর্যন্ত খিলাল করবেন।পুরুষ ও মহিলার ওযু করার পদ্ধতিতে কোন পার্থক্য নেই।ওযু সমাপ্ত করার পর এই দোয়া বলা মুস্তাহাব: আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহ। সাথে যোগ করতে পারেন আল্লাহুম্মাজ আলনি মিনাত্তা ওয়াবীন ওয়াজ আলনি মিনাল মুতাতাহ্হিরীন। সুবহানাকাল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা আশহাদু আন লা ইলাহা ইল্লা আনতা আসতাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইক। (অর্থ-“আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে তাওবাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও অন্তর্ভুক্ত করুন। হে আল্লাহ! আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আপনি ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই, আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট তাওবা করছি।)(হাদিসগুলো দেখুন;সহিহ মুসলিম, ত্বহারাত ৩৪৫; সহিহুত তিরমিযি হা/৪৮) ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) হাদিসটিকে ‘সহিহ’ আখ্যায়িত করেছেন] (বিস্তারিত দ্রষ্টব্য:মারয়ি বিন ইউসুফ আল-কারামি, দালিলুত তালিব লি নাইলিল মাতালিব, তাহকিক: আবু কুতাইবা আল-ফারিয়াবি (রিয়াদ: দারু তাইবা, ১ম প্রকাশ, ১৪২৫ হি./২০০৪ খ্রি.), পৃষ্ঠা:১১-১২; মানসুর বিন ইউনুস আল-বুহুতি,আর-রওদুল মুরবি বি শারহি জাদিল মুস্তাকনি, তাহকিক খালিদ আল-মুশাইকিহ, আব্দুল আজিজ ;আল-ইদান ও আনাস আল-ইয়াতামা (কুয়েত: দারু রাকায়িজ; ১ম প্রকাশ; ১৪৩৮ হি.);খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১১২-১১৪ ও ১২৪-১২৭; আল-কুআইমি; ফাইদুল জালিল; খন্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৬৬-৭৬ অযু সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: বই সালাতের শর্তাবলি এবং ফরজ-ওয়াজিবসমগ্র। ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব আত-তামিমি আন-নাজদি (রাহিমাহুল্লাহ)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

September 29, 2025

মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত সালাত আদায় না করা পর্যন্ত বসা নিষিদ্ধ

 হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে প্রবেশকারী ব্যক্তিকে দুই রাকাত সালাত আদায় করার আগে বসতে নিষেধ করেছেন।

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“إِذَا دَخَلَ أَحَدُكُمْ الْمَسْجِدَ فَلَا يَجْلِسْ حَتَّى يُصَلِّيَ رَكْعَتَيْنِ”
“যখন তোমাদের কেউ মসজিদে প্রবেশ করবে, তখন সে যেন দুই রাকাত সালাত আদায় না করা পর্যন্ত না বসে।” [সহিহ মুসলিম, হা/৭১৪]
বরং নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জুমার দিন খুতবা দেওয়ার সময় এক ব্যক্তিকে দেখলেন যে, সে বসে পড়ছে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেন,
“أَصَلَّيْتَ؟
‘তুমি কি সালাত আদায় করেছ?’
সে বলল, ‘না।’
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন,
“قُمْ فَصَلِّ رَكْعَتَيْنِ وَتَجَوَّزْ فِيهِمَا
‘তুমি ওঠো এবং দ্রুত দুই রাকাত সালাত আদায় করো।’ [সহিহ মুসলিম]
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বসার বা খুতবা শোনার অনুমতি দেননি যতক্ষণ না সে দুই রাকাত সালাত আদায় করে। তবে তিনি তাকে দ্রুত সালাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন যাতে সে খুতবা শুনতে পারে। কারণ খুতবা শোনা ওয়াজিব।
এ কারণেই যদি কোনো ব্যক্তি অন্যের সাথে কথা বলে- এমনকি সৎ কাজের আদেশও দেয় তবে সে জুমার প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবে। কারণ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
“إِذَا قُلْتَ لِصَاحِبِكَ أَنْصِتْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَالْإِمَامُ يَخْطُبُ فَقَدْ أَلْغَوْتَ”
“যখন তুমি তোমার সঙ্গীকে জুমার দিন ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় ‘চুপ করো’ বলবে, তখন তুমি অনর্থক কাজ করলে।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
সুতরাং যখনই তোমাদের কেউ দিনের বা রাতের যে কোনো সময় মসজিদে প্রবেশ করবে তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ পালনার্থে এবং তার নিষেধ থেকে বিরত থাকার জন্য দুই রাকাত সালাত আদায় না করে বসবে না।
-আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ.
শাইখের বক্তব্যের ভিডিও (বাংলা ক্যাপশন সহ)
ভিডিও বক্তব্য থেকে অনুবাদ:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

ইসলামের দৃষ্টিতে পিটি করা কি জায়েজ

 প্রশ্ন: ইসলামের দৃষ্টিতে পিটি (PT) করা কি জায়েজ?

উত্তর: পিটি (PT) শব্দটি ফিজিক্যাল ট্রেনিং (Physical Training)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। যার আরেক নাম, শরীর চর্চা (Physical Exercise)।
এটি আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় সাধারণত শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা, সুস্থতা, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশৃঙ্খলার অনুশীলন ইত্যাদি উদ্দেশ্যে একটি স্বতন্ত্র ক্লাস বা বিষয় হিসাবে গণ্য করা হয়। এই ক্লাসে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ব্যায়াম, খেলাধুলা এবং শারীরিক কার্যকলাপ অন্তর্ভুক্ত থাকে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুস্থ ও সক্রিয় জীবনযাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে তা নাজায়েজ নয়। তবে অবশ্যই কতিপয় শর্তসাপেক্ষে। যেমন:
১. প্রাপ্ত বয়স্ক ছাত্র-ছাত্রী একসাথে ব্যায়াম, খেলাধুলা বা পিটি করা জায়েজ নেই। বরং ছাত্র ও ছাত্রীরা পৃথক পৃথক স্থানে তা করতে পারে।
২. প্রাপ্ত বয়স্ক বা কিছুটা বড় বুঝমান ছাত্রীরা স্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষিত স্থানে পোশাকের শালীনতা বজায় রেখে তা করতে পারে। সেক্ষেত্রে কোনও পুরুষ শিক্ষার্থী, কর্মচারী, এমনকি পুরুষ প্রশিক্ষকও থাকতে পারবে না।
ইসলামি স্কলারগণ বলেছেন.
وممارسة الفتيات البالغات الرياضة، بحيث يراهن المعلم، أو الطلبة الذكور البالغون؛ قد تكون فيها مخالفة للشرع، الذي أمر النساء بالستر، ونهى عن كل ما يثير الفتنة، ويحرك الشهوة
“প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের খেলাধুলা বা পিটিতে অংশগ্রহণ—যেখানে তাদেরকে পুরুষ শিক্ষক কিংবা বয়ঃপ্রাপ্ত ছাত্ররা দেখে—এ ধরনের কর্মকাণ্ড শরিয়তের বিরোধী হতে পারে। কারণ শরিয়ত নারীদের পরিপূর্ণ পর্দা বজায় রাখার আদেশ দিয়েছে এবং যে কোনও ফিতনা ও কামনা-বাসনা উসকে দেয়—এমন বিষয় থেকে বিরত থাকতে বলেছে।” [ইসলাম ওয়েব]
৩. পিটি করার সময় মিউজিক ব্যবহার করা জায়েজ নেই। কেননা ইসলামে মিউজিক সর্বাবস্থায় হারাম।
৪. শারীরিক কসরত, ভার উত্তোলন, দৌড়াদৌড়ি বা খেলাধুলার ক্ষেত্রে এমন কিছু কার্যক্রম করা যাবে না যা শিক্ষার্থীদের শারীরিক বা মানসিক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়।
৫. শিক্ষার্থীদের পোশাক-আশাক এত টাইট-ফিট হওয়া যাবে না যাতে তাদের শারীরিক অবকাঠামো ফুটে উঠে বা এত পাতলা ফিনফিনে পোশাক পরিধান করা যাবে না যাতে তার চামড়া দেখা যায়।
৬. এমন পোশাক পরিধান করা জায়েজ নাই যাতে সতর (শরীরের যে অঙ্গটা ঢেকে রাখা আবশ্যক) তা অনাবৃত হয়ে যায়।
৭. শারীরিক কসরতের ক্ষেত্রে কাফেরদের সাদৃশ্য হয় এমন কোন কিছু করা যাবে না। যেমন: প্রশিক্ষকের সামনে মাথা নত করে বাউ করা।
৮. সর্বাবস্থায় শরয়ি পর্দা লঙ্ঘন করা হারাম।
৯. প্রশিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীদের স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করা জায়েজ নাই।
১০. পিটি বা শরীর চর্চা করতে গিয়ে যেন কোনোভাবেই সালাত ত্যাগ, ছেলেদের মসজিদে জামাত ত্যাগ, রোজা ভঙ্গ করার মত বিষয়গুলো না ঘটে।
১১. মুসলিমদের জন্য এমন কোন উৎসব বা উপলক্ষে প্যারেড বা কুচকাওয়াজ করা জায়েজ নাই যা ইসলামি শরিয়তে অনুমদতি নয়।
মোটকথা, শারীরিক সুস্থতার উদ্দেশ্যে শারীরিক কসরত, শরীর চর্চা, ব্যায়াম, পিটি, প্যারেড ইত্যাদি করা জায়েজ যদি ইসলামের সীমারেখার মধ্যে থেকে তা করা হয়। অন্যথায় তা হারাম।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ক্ষমতার লোভ এবং দায়িত্বে অবহেলার কঠিন পরিণতি

 আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إنَّكُمْ سَتَحْرِصُونَ علَى الإمارَةِ، وسَتَكُونُ نَدامَةً يَومَ القِيامَةِ، فَنِعْمَ المُرْضِعَةُ وبِئْسَتِ الفاطِمَةُ.
“তোমরা অবশ্যই নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহী হবে, অথচ তা হবে অনুতাপ ও আফসোসের কারণ। কতই না উত্তম তার দুধপানের সময়টা, আর কতই না নিকৃষ্ট তার দুধ ছাড়ানোর সময়টা।” [সহিহ বুখারি, হা/৭১৪৮]
❑ হাদিসের ব্যাখ্যা:
এই হাদিসে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নেতৃত্ব বা পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে উম্মাহকে সতর্ক করেছেন।
✪ ক. “তোমরা অবশ্যই নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহী হবে”:
এই বাক্যটি মানুষের সহজাত দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে, যে মানুষ ক্ষমতা, সম্মান এবং প্রভাবের প্রতি সহজে আকৃষ্ট হয়। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই ভবিষ্যৎবাণী বর্তমানে আমাদের সমাজের বাস্তবতায় প্রমাণিত।
✪ খ. “অথচ তা হবে অনুতাপ ও আফসোসের কারণ”:
এই নেতৃত্ব যখন একজন ব্যক্তির ওপর অর্পিত হয় তখন তার দায়িত্ব অনেক বেড়ে যায়। সে যদি ইনসাফ প্রতিষ্ঠা না করে বা জনগণের অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় তাহলে কিয়ামতের দিন তাকে এর জন্য কঠিন জবাবদিহি করতে হবে। এই জবাবদিহির ভয়ে এবং দায়বদ্ধতার কারণে তা অনুতাপ ও আফসোসের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
✪ গ. “কতই না উত্তম তার দুধপানের সময়টা”:
এর দ্বারা নেতৃত্বের প্রাথমিক পর্যায়কে বোঝানো হয়েছে। যখন একজন ব্যক্তি পদ বা ক্ষমতা লাভ করে তখন সে সম্মান, প্রতিপত্তি ও জাগতিক সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করে। এই সময়টা একজন নবজাতকের মায়ের দুধ পানের মতোই সুস্বাদু ও আরামদায়ক মনে হয়।
✪ ঘ. “আর কতই না নিকৃষ্ট তার দুধ ছাড়ানোর সময়টা”:
এর দ্বারা নেতৃত্বের শেষ পরিণতিকে বোঝানো হয়েছে। দুধ ছাড়ানোর সময় যেমন শিশু কষ্ট পায় ঠিক তেমনি ক্ষমতা হারানোর পর বা কিয়ামতের দিন যখন এই নেতৃত্বের হিসাব দিতে হবে তখন সেই কষ্ট ও অনুতাপ হবে অত্যন্ত কঠিন। ওই দিন সমস্ত ক্ষমতা ও সম্মান বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং এর কারণে সৃষ্ট পাপের বোঝা তাকে বহন করতে হবে।
আমাদের দেশের বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার মসনদে থাকা লোকগুলোর করুণ পরিণতি দেখলে এই হাদিসের প্রকৃত মমার্থ উপলব্ধি করা সহজ হয়ে যায়।
➧ এই হাদিসের মূল শিক্ষা হলো:
মুসলিমদের উচিত নয়, কোনো পদের জন্য লালায়িত হওয়া। বরং যদি কোনো দায়িত্ব অর্পিত হয়, তবে তা সততা ও ইনসাফের সাথে পালন করা উচিত, যেন কিয়ামতের দিনের অনুতাপ থেকে বাঁচা যায়।
❑ আদ দুরার ওয়েব সাইটে এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লেখা হয়েছে:
– মানুষের নেতা হওয়া বা তাদের ওপর কর্তৃত্ব করা আসলে একটা দায়িত্ব। এর মানে হলো, পবিত্র শরিয়াহ অনুযায়ী মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং তাদের সব বিষয় ভালোভাবে দেখাশোনা করা। নেতৃত্ব মানে মানুষের ওপর অহংকার বা জোর খাটানো নয়, যেমনটা অনেক নেতা করে থাকে। তারা মানুষের অধিকার ভুলে যায় এবং নেতৃত্বকে নিজেদের জন্য সুযোগ আর আরাম-আয়েশের মাধ্যম মনে করে। এমন সব নেতাদের জন্য তাদের এই নেতৃত্ব কিয়ামতের দিন চরম কষ্ট আর অপমানের কারণ হবে।
– আর এই হাদিসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “তোমরা অবশ্যই নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহী হবে”। এর মানে হলো, ভবিষ্যতে এমন একটা সময় আসবে, যখন মানুষ যেকোনো পদের জন্য লোভ করবে। কিন্তু এই পদ তাদের জন্য লজ্জা ও আফসোসের কারণ হবে যদি তারা এর দায়িত্ব ঠিকমতো পালন না করে। বরং যদি তারা জুলুম করে, অহংকার ও দাপট দেখায়, তবে দুনিয়াতে এই পদ তাদের সম্মান ও মর্যাদা দিলেও কিয়ামতের দিন তা তাদের জন্য অপমান আর লাঞ্ছনার কারণ হবে।
– এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “কতই না উত্তম তার দুধপানের সময়টা আর কতই না নিকৃষ্ট তার দুধ ছাড়ানোর সময়টা।” এর শুরুটা দুনিয়াতে সবার কাছে অনেক ভালো ও প্রিয় মনে হয়। তখন নেতা সেই শিশুর মতো হয় যাকে তার মা পুষ্টি দেয়। (আর তা হলো এই ক্ষমতা বা নেতৃত্ব) কিন্তু কিয়ামতের দিন এর পরিণতি হবে খুবই খারাপ। এর ফল হবে নিন্দনীয়। এমনকি দুনিয়াতেও এর ফল খারাপ হতে পারে, যেমন—ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া বা হত্যা করা।
❑ এই হাদিস থেকে আমরা যা শিখতে পারি:
➧ ক. নেতা হওয়ার জন্য লোভ করা খারাপ।
➧ খ. যারা মানুষের দায়িত্ব নিয়ে তাদের অধিকার পূরণ করে না তাদের পরিণতি যে কতটা ভয়াবহ হবে তা এখানে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে।
[dorar]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

খাবার শেষে হাতের আঙ্গুল ও প্লেট বা পাত্র চেটে খাওয়া এবং প্লেট ধুয়ে পানি পান করা

 খাবার শেষে হাতের আঙ্গুল, প্লেট বা পাত্র চেটে খাওয়া এবং প্লেট ধুয়ে পানি পান করা: কোনটা সুন্নত আর কোনটা সুন্নত নয়। খাবারের পর হাতের আঙ্গুল এবং প্লেট চেটেপুটে পরিস্কার করে খাওয়া সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। তবে খাওয়ার পর প্লেট বা খাবারের পাত্র ধুয়ে পানি পান করা সুন্নত নয় যা আমাদের সমাজের কিছু মানুষ ধারণা করে থাকে। কেননা এ বিষয়ে কোনও হাদিস সাব্যস্ত হয়নি।

◈ খাবারের পর হাতের আঙ্গুল এবং প্লেট বা খাবার পাত্র চেটেপুটে পরিস্কার করে খাওয়া সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। এ মর্মে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে। যেমন:
প্রখ্যাত সাহাবি জাবের রা. হতে বর্ণিত,
أنَّ رَسُول الله ﷺ أَمَرَ بِلَعْقِ الأَصَابِعِ وَالصَّحْفَةِ، وَقَالَ: «إنَّكُمْ لا تَدْرونَ في أَيِّها البَرَكَةُ»
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (খাবার পর) আঙ্গুলগুলো ও বাসন চেটে খাওয়ার আদেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘‘এগুলোর কোনটিতে বরকত আছে তা তোমরা জান না।’’ [সহিহ মুসলিম, হা/২০৩৩]
জাবের বিন আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত অপর হাদিসে এসেছে, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
«إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلَا يَمْسَحْ أَصَابِعَهُ حَتَّى يَلْعَقَهَا فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي فِي أَيِّ طَعَامِهِ كَانَتِ الْبَرَكَةُ»
‘‘যখন তোমাদের খাবার খাবে আঙ্গুল চেঁটে না খেয়ে হাত মুছবেনা। কেননা তোমরা জান না যে, কোন খাবারে বরকত আছে।’’ [মুসলিম, হা/২০৩৩]
◈ অনুরূপভাবে খাবার মাটিতে পড়ে গেলে তা তুলে পরিষ্কার করে খাওয়াও সুন্নাহ:
রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
إنَّ الشَّيْطَانَ يَحْضُرُ أَحَدَكُمْ عِنْدَ كُلِّ شَيْءٍ مِنْ شَأْنِهِ ، حَتَّى يَحْضُرَهُ عِنْدَ طَعَامِهِ ، فَإِذَا سَقَطَتْ مِنْ أَحَدِكُمْ اللُّقْمَةُ فَلْيُمِطْ مَا كَانَ بِهَا مِنْ أَذًى ثُمَّ ليَأْكُلْهَا وَلَا يَدَعْهَا لِلشَّيْطَانِ ، فَإِذَا فَرَغَ فَلْيَلْعَقْ أَصَابِعَهُ ؛ فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي فِي أَيِّ طَعَامِهِ تَكُونُ الْبَرَكَةُ
‘‘নিশ্চয় শয়তান তোমাদের কারো নিকট তার প্রত্যেক কাজে হাজির হয়। এমনকি সে তার খাবার সময়েও হাজির হয়। সুতরাং যখন তোমাদের মধ্যে কারো খাবারে লোকমা (গ্রাস) পড়ে যাবে তখন তাতে যে ময়লা থাকে তা পরিষ্কার করে খেয়ে নেয় এবং তা শয়তানের জন্য না ছাড়ে।’’ [সহীহ মুসলিম, হা/২০৩৩]
◈ রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন,
إذَا سَقَطَتْ لُقْمَةُ أَحَدِكُمْ فَلْيُمِطْ عَنْهَا الأذَى وَلْيَأْكُلْهَا، وَلَا يَدَعْهَا لِلشَّيْطَانِ، وَأَمَرَنَا أَنْ نَسْلُتَ القَصْعَةَ، قالَ: فإنَّكُمْ لا تَدْرُونَ في أَيِّ طَعَامِكُمُ البَرَكَةُ
“যদি তোমাদের কারো হাত থেকে খাবারের লোকমা পড়ে যায় তাহলে ময়লা পরিষ্কার করে তা খেয়ে নাও। শয়তানের জন্য তা ফেলে রেখো না। তিনি প্লেট বা পাত্র ভালোভাবে মুছে পরিষ্কার করতেও বলেছেন। কারণ তিনি বলেছেন, তোমরা জানো না, তোমাদের কোন খাবারের অংশে বরকত আছে।” [সহিহ মুসলিম, হা/২০৩৪]
❑ আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল ইবনে উসাইমিন (রহ.) খাবারের আদব সম্পর্কে বলেছেন:
“খাবারের আদবগুলোর মধ্যে একটি হলো, যদি খাবারের কোনো অংশ মাটিতে পড়ে যায় তবে তা ফেলে রাখা যাবে না। কারণ শয়তান মানুষের সব কাজে তার সাথে উপস্থিত থাকে। যদি কোনো ব্যক্তি এই কাজটি করে,তবে সে তিনটি বড় উপকার লাভ করে:
১. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদেশ পালন করা হয়: এটি তাঁর আদেশ পালনের একটি অংশ।
২. আল্লাহর প্রতি বিনয় প্রকাশ করা হয়: এটি আল্লাহর প্রতি বিনয় ও নম্রতা প্রকাশের একটি উপায়।
৩. শয়তানকে বঞ্চিত করা হয়: শয়তান যাতে সেই খাবার খেতে না পারে সে জন্য তাকে বঞ্চিত করা হয়।
এই তিনটি উপকার হাসিল করার জন্য খাবারের পড়ে যাওয়া অংশ উঠিয়ে পরিষ্কার করে খেয়ে নেওয়া উচিত।” [শারহ রিয়াদুস সালিহিন, ১/৪৫৯]
তাই আমাদের কতর্ব্য, সুন্নাহ অনুযায়ী খাবার শেষে হাতের আঙ্গুল ও প্লেট চেটেপুটে পরিস্কার করে খাওয়া। কিন্তু যেহেতু খবারের প্লেট ধুয়ে পানি খাওয়ার নির্দেশনার ব্যাপারে কোন হাদিস পাওয়া যায়নি তাই দলিল ছাড়া তা সুন্নত বলার সুযোগ নাই। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
(লিসান্স, মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়), দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার ব্যাপারে যেসব আয়াত এসেছে এবং পৃথিবী সমতল হওয়ার ব্যাপারে যেসব আয়াত এসেছে এ দুটির মাঝে কি কোনো বিরোধ আছে

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি। অতঃপর, পৃথিবী গোলাকার না সমতল—এটি এমন একটি বিষয়, যার ব্যাপারে কুরআন ও সুন্নাহতে কোনো স্পষ্ট ও চূড়ান্ত বক্তব্য পাওয়া যায় না। যদি এ বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকত, তবে মুসলিম হিসেবে তা মেনে নেওয়া আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হতো। বাস্তবে পক্ষে-বিপক্ষে যা কিছু বলা হচ্ছে, সবই গবেষণা ও অনুমাননির্ভর। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই গবেষণার আমাদের ঈমান-আমল বা দৈনন্দিন জীবনে আসলেই কোনো উপকারিতা আছে কি? আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সামগ্রিক উম্মাহর জীবনে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে, যেগুলোর ওপর মনোযোগ দেওয়া অনেক বেশি জরুরি। সেসব বিষয় জীবনমান উন্নত করতে পারে এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান দিতে পারে। অন্যদিকে, পৃথিবী গোলাকার না সমতল—এটি ঈমান বা আকীদার কোনো বিষয় নয়। ফলে এই বিতর্কের কোনো বাস্তব প্রভাব নেই আমাদের ঈমান, আমল কিংবা দুনিয়াবি জীবনে।এটি যে আক্বীদাগত মাসালা নয় সেই বিষয়ে ইমাম আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সুতরাং কুরআন ও সুন্নাহ যে বিষয়ে নীরব থেকেছে, সে বিষয়ে নীরব থাকা-ই ঈমানের সৌন্দর্য।মহান আল্লাহর বহু হুকুম আহকাম ও রাসূল (ﷺ) -এর বহু দিক-নির্দেশনা এখনো আমাদের অজ্ঞাত বা অল্প জানা, যেগুলো আয়ত্ত করা আমাদের জন্য অনেক বেশি প্রয়োজনীয়। সুতরাং মহাজ্ঞানী আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) যখন পৃথিবী গোলাকার নাকি সমতল সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু বলেননি, তখন রাসূল (ﷺ)-এর উম্মত হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো—এ নিয়ে বাড়াবাড়ি বা অকারণে বিতর্ক থেকে বিরত থাকা। কেননা,যদি সত্যিই এ তথ্য আমাদের জন্য জরুরী হতো, তবে নিশ্চয়ই রাসূল (ﷺ) তা পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিতেন।কারন রাসূল (ﷺ) বলেছেন,مَا تَرَكْتُ شَيْئًا مِمَّا أَمَرَكُمُ اللهُ بِهِ إِلاَّ وَقَدْ أَمَرْتُكُمْ بِهِ وَلاَ تَرَكْتُ شَيْئًا مِمَّا نَهَاكُمُ اللهُ عَنْهُ إِلاَّ وَقَدْ نَهَيْتُكُمْ عَنْهُ- ‘”আল্লাহ তা‘আলা তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন এমন কোন জিনিসই আমি (বর্ণনা করতে) ছাড়িনি। আর আমি তার হুকুম তোমাদেরকে অবশ্যই দিয়েছি। আর আমি এমন কোন জিনিসই ছাড়িনি যা আল্লাহ তা‘আলা নিষেধ করেছেন। কিন্তু আমি তোমাদেরকে তা অবশ্যই নিষেধ করেছি”।(মুসনাদ আহমদ ১৭১৭৪; তাবরাবী কাবীর হা/১৬৪৭; সিলসিলা সহীহাহ হা/১৮০৩; আস-সুনানুল কুবরা লিল বায়হাক্বী হা/১৩৮২৫)

.
তবে যেহেতু বর্তমানে পৃথিবী গোলাকার না সমতল—এ প্রসঙ্গ নিয়ে কিছু আবেগপ্রবণ তরুণ ফেসবুকে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে এবং সম্মানিত আলেমদের সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করছে। তাই এই বিষয়ে প্রসিদ্ধ আলেমদের বক্তব্য তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করছি।
.
বিশুদ্ধ আকিদা মানহাজে প্রসিদ্ধ অনেক আলেম পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার বিষয়ে সর্বসম্মত মত (ইজমা) উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) ইমাম আবুল হুসাইন ইবনুল মুনাদী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন:“ইমাম আবুল হুসাইন আহমদ ইবনে জাফর ইবনুল মুনাদী (রাহিমাহুল্লাহ)—যিনি ইসলামি জ্ঞানের বহু শাখা ও গ্রন্থ রচনায় অনন্য কৃতিত্বের অধিকারী ছিলেন এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বালের অনুসারী দ্বিতীয় প্রজন্মের বিশিষ্ট আলেমদের অন্তর্ভুক্ত—তিনি বলেছেন:
لا خلاف بين العلماء أن السماء على مثال الكرة …..
قال : وكذلك أجمعوا على أن الأرض بجميع حركاتها من البر والبحر مثل الكرة . قال : ويدل عليه أن الشمس والقمر والكواكب لا يوجد طلوعها وغروبها على جميع من في نواحي الأرض في وقت واحد ، بل على المشرق قبل المغرب “
“আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে কোনো মতভেদ নেই যে আসমান গোলকের মতো। তিনি আরও বলেন: আলেমগণ এ বিষয়েও ঐক্যমত্যে পৌঁছেছেন যে স্থল ও সমুদ্রসহ সমগ্র পৃথিবীও গোলাকার। এর প্রমাণ হলো এই যে, সূর্য, চন্দ্র এবং অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের উদয় ও অস্ত যাওয়া পৃথিবীর সব অঞ্চলে একই সময়ে ঘটে না,বরং প্রথমে পূর্বে উদয় হয়, তারপর ধীরে ধীরে পশ্চিম দিকে সরে যায়।”(ইবনু তাইমিয়া মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া; খণ্ড; ২৫; পৃষ্ঠা; ১৯৫)
.
পৃথিবী গোলাকার এই বিষয়ে ইবনু ইবন হাযম রাহিমাহুল্লাহসহ বহু সংখ্যক আলেম দলিল হিসেবে উল্লেখ করেছেন মহান আল্লাহর বানী:یُكَوِّرُ الَّیۡلَ عَلَی النَّهَارِ وَ یُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَی الَّیۡلِ “তিনি রাত দ্বারা দিনকে আচ্ছাদিত করেন এবং রাতকে আচ্ছাদিত করেন দিন দ্বারা”।(সুরা যুমার: ৫) তবে সাধারণ মানুষের চোখে পৃথিবী সমতল দেখায়, কারণ এর আকার অনেক বড়। এর গোলাকার আকৃতি স্বল্প দূরত্ব থেকে বোঝা যায় না। তাই দেখার দিক থেকে এটি সমতল, কিন্তু সামগ্রিকভাবে এটি গোলাকার।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: পৃথিবী কি গোলাকার নাকি সমতল?
তাঁরা জবাবে বলেন:الأرض كروية الكل مسطحة الجزء “
“পৃথিবী সামগ্রিকভাবে গোলাকার,কিন্তু এর অংশবিশেষ সমতল।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ২৬; পৃষ্ঠা: ৪১৪)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:لو قال قائل: إن الله عز وجل أخبر أن الأرض قد سطحت، قال: ( وإلى الأرض كيف سطحت) الغاشية/ 20 ، ونحن نشاهد أن الأرض مكورة ، فكيف يكون خبره خلاف الواقع ؟ فجوابه : أن الآية لا تخالف الواقع ، ولكن فهمه خاطئ إما لقصوره أو تقصيره ، فالأرض مكورة مسطحة ، وذلك لأنها مستديرة ، ولكن لكبر حجمها لا تظهر استدارتها ، وحينئذ يكون الخطأ في فهمه، حيث ظن أن كونها قد سطحت مخالف لكونها كروية “যদি কেউ বলে যে, আল্লাহ তা’আলা জানিয়েছেন যে পৃথিবী সমতল করা হয়েছে, যেমন তিনি বলেছেন: ‘এবং পৃথিবীর দিকে যে, কীভাবে তা সমতল করা হয়েছে?’ (সূরা আল-গাশিয়াহ;২০)। কিন্তু আমরা তো দেখছি পৃথিবী গোলাকার, তাহলে কি আল্লাহ তাআলার বানী বাস্তবের বিপরীত? এর উত্তর হলো: আয়াতটি বাস্তবতার বিপরীত নয়। বরং তার বোঝায় ভুল রয়েছে, হয়তো তার জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে কিংবা ত্রুটির কারণে। পৃথিবী গোলাকার এবং সমতল উভয়ই। কারণ এটি গোলাকার হলেও এর বিশাল আকারের কারণে এর গোলাকার ভাব প্রকাশ পায় না। এই পরিস্থিতিতে, তার বোঝার ভুল হয়, যখন সে মনে করে যে এর সমতল হওয়া এর গোলাকার হওয়ার বিপরীত।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ৮; পৃষ্ঠা: ৬৪৪) অর্থাৎ,কোরআনের আয়াতসমূহের মাঝে কোনো ধরনের বিরোধ নেই। বাস্তবতাও এটাই যে পৃথিবী মূলত গোলাকার, তবে তার বিশালত্বের কারণে মানুষের চোখে সমতল মনে হয়।”
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: দু’জন মানুষ আসমান ও জমিনের আকৃতি নিয়ে বিতর্কে লিপ্ত হলো। তাদের একজন বলল, “ আসমান এবং পৃথিবী উভয়ই গোলাকার।” আরেকজন এ কথাটিকে অস্বীকার করে বলল, “এর কোনো ভিত্তি নেই” এবং সে তা প্রত্যাখ্যান করল। এ ক্ষেত্রে সঠিক অভিমত কোনটি?
তিনি উত্তরে বলেন:
السموات مستديرة عند علماء المسلمين ، وقد حكى إجماع المسلمين على ذلك غير واحد من العلماء أئمة الإسلام : مثل أبي الحسين أحمد بن جعفر بن المنادي أحد الأعيان الكبار من الطبقة الثانية من أصحاب الإمام أحمد وله نحو أربعمائة مصنف ، وحكى الإجماع على ذلك الإمام أبو محمد بن حزم وأبو الفرج بن الجوزي ، وروى العلماء ذلك بالأسانيد المعروفة عن الصحابة والتابعين ، وذكروا ذلك من كتاب الله وسنة رسوله ، وبسطوا القول في ذلك بالدلائل السمعية ، وإن كان قد أقيم على ذلك أيضا دلائل حسابية ، ولا أعلم في علماء المسلمين المعروفين من أنكر ذلك ، إلا فرقة يسيرة من أهل الجدل لما ناظروا المنجمين قالوا على سبيل التجويز : يجوز أن تكون مربعة أو مسدسة أو غير ذلك ، ولم ينفوا أن تكون مستديرة ، لكن جوزوا ضد ذلك ، وما علمت من قال إنها غير مستديرة – وجزم بذلك – إلا من لا يؤبه له من الجهال
…”মুসলিম আলেমদের মতে আকাশমণ্ডলী গোলাকার। এবং মুসলিমদের এ বিষয়ে ঐকমত্য আছে বলে একাধিক ইসলামের ইমাম শ্রেণির আলেম বর্ণনা করেছেন। যেমন: আবুল হুসাইন আহমদ ইবনে জাফর ইবনুল মুনাদী (রাহিমাহুল্লাহ)., যিনি ইমাম আহমদের শিষ্যদের দ্বিতীয় স্তরের প্রখ্যাত শীর্ষস্থানীয় আলেমদের একজন, এবং প্রায় চারশোটি গ্রন্থ রচনা করেছেন—তিনি এ ব্যাপারে ইজমা বর্ণনা করেছেন। তেমনিভাবে ইমাম আবু মুহাম্মদ ইবনু হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) ও আবুল ফারজ ইবনুল জাওযীও এ (ইজমা) ঐকমত্য উল্লেখ করেছেন। আলেমগণ পরিচিত সনদসমূহের মাধ্যমে সাহাবা ও তাবেঈন থেকে এই বিষয়টি বর্ণনা করেছেন। তারা কিতাবুল্লাহ (কুরআন) এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ থেকে এর প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন এবং শ্রুতিমূলক দলিল দ্বারা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। যদিও এর ওপর গণিতভিত্তিক প্রমাণও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মুসলিম আলেমদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কারও পক্ষ থেকে আমি কখনো এ বিষয়ে অস্বীকৃতি পাইনি। শুধুমাত্র কিছুসংখ্যক তর্কবিদ ছাড়া,যখন তারা জ্যোতিবিদদের সাথে বিতর্ক করার সময় বলেছিল যে, এটি বর্গাকার বা ষড়ভুজাকার কিংবা অন্য যেকোনো আকারের হতে পারে।তারা এর গোলাকার হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেননি, বরং এর বিপরীত সম্ভাবনা তুলে ধরেছিলেন মাত্র। আর আমি কাউকে জানি না, যে নিশ্চিতভাবে বলেছে আকাশ গোলাকার নয়—শুধুমাত্র সেই অজ্ঞ লোকেরা ছাড়া, যাদের মতামতের কোনো মূল্য নেই।”(ইবনু তাইমিয়া মাজমূ‘ আল-ফাতাওয়া; খণ্ড: ৬; পৃষ্ঠা: ৫৮৬)
.
আবু মুহাম্মদ ইবনে হাযম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন:مطلب بيان كروية الأرض :قال أبو محمد وهذا حين نأخذ إن شاء الله تعالى في ذكر بعض ما اعترضوا به ، وذلك أنهم قالوا : إن البراهين قد صحت بأن الأرض كروية ، والعامة تقول غير ذلك ، وجوابنا وبالله تعالى التوفيق : أن أحداً من أئمة المسلمين المستحقين لاسم الإمامة بالعلم رضي الله عنهم لم ينكروا تكوير الأرض ، ولا يحفظ لأحد منهم في دفعه كلمة ، بل البراهين من القرآن والسنة قد جاءت بتكويرها … ” وساق جملة من الأدلة على ذلك”পৃথিবীর গোলাকারত্ব প্রমাণের প্রসঙ্গ: আবু মুহাম্মদ বলেন:এবার আমরা, আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায়, তাদের কিছু আপত্তির জবাব শুরু করছি। তারা বলেছে: প্রমাণ দ্বারা নিশ্চিত হয়েছে যে পৃথিবী গোলাকার, অথচ সাধারণ মানুষ এ ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করে। আমাদের উত্তর,(আল্লাহ তাআলার সাহায্যে),হলো এই যে: মুসলিম আলিমদের মধ্যে যারা ইমামতের প্রকৃত মর্যাদার অধিকারী, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হোন—তাদের কারো কাছ থেকেই পৃথিবীর গোলাকারত্ব অস্বীকার করা শোনা যায়নি। বরং এ বিষয়ে তাদের কাছ থেকে একটি শব্দও বর্ণিত হয়নি যা এর বিরোধিতা করে। বরং কুরআন ও সুন্নাহ থেকেই এর গোলাকারত্বের পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ এসেছে।”এরপর তিনি এ বিষয়ে বেশ কিছু দলিল উপস্থাপন করেছেন।(আল-ফাসল ফিল মিলাল ওয়াল আহওয়া ওয়ান নিহাল; খণ্ড: ২: পৃষ্ঠা: ৭৮)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
الأرض كروية بدلالة القرآن ، والواقع ، وكلام أهل العلم ، أما دلالة القرآن ، فإن الله تعالى يقول : ( يُكَوِّرُ اللَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى اللَّيْلِ ) ، والتكوير جعل الشيء كالكور ، مثل كور العمامة ، ومن المعلوم أن الليل والنهار يتعاقبان على الأرض ، وهذا يقتضي أن تكون الأرض كروية ؛ لأنك إذا كورت شيئاً على شيء ، وكانت الأرض هي التي يتكور عليها هذا الأمر لزم أن تكون الأرض التي يتكور عليها هذا الشيء كروية .
وأما دلالة الواقع فإن هذا قد ثبت ، فإن الرجل إذا طار من جدة مثلاً متجهاً إلي الغرب خرج إلى جدة من الناحية الشرقية إذا كان على خط مستقيم ، وهذا شيء لا يختلف فيه اثنان .
وأما كلام أهل العلم فإنهم ذكروا أنه لو مات رجل بالمشرق عند غروب الشمس ، ومات آخر بالمغرب عند غروب الشمس ، وبينهما مسافة ، فإن من مات بالمغرب عند غروب الشمس يرث من مات بالمشرق عند غروب الشمس إذا كان من ورثته ، فدل هذا على أن الأرض كروية ، لأنها لو كانت الأرض سطحية لزم أن يكون غروب الشمس عنها من جميع الجهات في آن واحد ، وإذا تقرر ذلك فإنه لا يمكن لأحد إنكاره ، ولا يشكل على هذا قوله تعالى : ( أَفَلا يَنْظُرُونَ إِلَى الإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ . وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ . وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ . وَإِلَى الأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ ) لأن الأرض كبيرة الحجم ، وظهور كرويتها لا يكون في المسافات القريبة ، فهي بحسب النظر مسطحة سطحاً لا تجد فيها شيئاً يوجب القلق على السكون عليها ، ولا ينافي ذلك أن تكون كروية ، لأن جسمها كبير جداً ، ولكن مع هذا ذكروا أنها ليست كروية متساوية الأطراف ، بل إنها منبعجة نحو الشمال والجنوب ، فهم يقولون : إنها بيضاوية ، أي على شكل البيضة في انبعاجها شمالاً وجنوباً “
কুরআন, বাস্তবতা এবং আলেমদের বাণী এ তিন দিক থেকেই পৃথিবীর গোলাকারত্ব প্রমাণিত। কুরআনের প্রমাণ হলো: আল্লাহ তাআলা বলেন,তিনি রাত দ্বারা দিনকে আচ্ছাদিত করেন এবং রাতকে আচ্ছাদিত করেন দিন দ্বারা”।(সূরা যুমার: ৫)।‌আর তাকভীর (التكوير) শব্দের অর্থ হলো কোনো জিনিসকে গোল করে জড়িয়ে দেওয়া; যেমন—পাগড়ি জড়ানোর সময় কাপড়কে গোল করে পেঁচানো হয়। এখন এটা তো জানা কথা যে রাত-দিন পৃথিবীর উপর পর্যায়ক্রমে আসে। এটি অবশ্যই প্রমাণ করে যে পৃথিবী গোলাকার। কারণ, তুমি যদি কোনো কিছুর উপর অন্য কিছু জড়াও, আর পৃথিবীই যেটির উপর এই জড়ানো হয়, তাহলে অবশ্যই পৃথিবী গোলাকারই হবে।
.
বাস্তবতার প্রমাণ হলো—এটি সুপ্রতিষ্ঠিত বিষয়। যেমন: যদি কেউ জেদ্দা থেকে পশ্চিমমুখী হয়ে সোজা উড়ে যায়, তবে সে আবার পূর্ব দিক থেকে জেদ্দায় প্রবেশ করবে। এ ব্যাপারে দু’জন মানুষের মধ্যেও কোনো মতভেদ নেই। অর্থাৎ, আলেমদের ঐকমত্য, কুরআন ও সুন্নাহর দলিল, এবং বাস্তবতা সবই প্রমাণ করে যে পৃথিবী আসলেই গোলাকার।
.
আলেমদের বক্তব্যের প্রমাণ হলো—তারা উল্লেখ করেছেন: যদি কোনো ব্যক্তি পূর্বাঞ্চলে সূর্যাস্তের সময় মারা যায়, এবং আরেকজন পশ্চিমাঞ্চলে সূর্যাস্তের সময় মারা যায়—যাদের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব রয়েছে—তাহলে পশ্চিমে সূর্যাস্তের সময় যে মারা গেছে, সে পূর্বে সূর্যাস্তের সময় মারা যাওয়া ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হবে যদি সে তার ওয়ারিস হয়ে থাকে। এটি প্রমাণ করে যে পৃথিবী গোলাকার। কারণ পৃথিবী যদি সমতল হতো, তবে অবশ্যই সব প্রান্তে সূর্যাস্ত একই সময়ে ঘটতো।এটি নিশ্চিত হওয়ার পর আর কেউ এর অস্বীকার করতে পারবে না। আর এ বিষয়ে আল্লাহর এ বাণী কোনো সংশয় তৈরি করে না: আল্লাহ তাআলা বলেন:তারা কি উটের দিকে তাকায় না, কীভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে? এবং আসমানের দিকে, কিভাবে তা ঊর্ধ্বে স্থাপন করা হয়েছে? আর পাহাড়ের দিকে তাকায় না, কীভাবে তাকে স্থাপন করা হয়েছে? আর পৃথিবীর দিকে তাকায় না, কীভাবে তাকে বিস্তৃত করা হয়েছে?”(সূরা গাশিয়াহ: ১৭-২০) কারণ,পৃথিবী আকারে অতি বিশাল। এর গোলাকারত্ব কাছাকাছি দূরত্বে স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়ে না। এজন্য মানুষের চোখে এটি সমতল মনে হয়। সমতল মানে—এখানে এমন কোনো উঁচুনিচু বা ঢেউ নেই, যা এর উপর বসবাসকে কষ্টকর বা অস্বস্তিকর করে তোলে। তবে এর দ্বারা পৃথিবীর গোলাকারত্ব অস্বীকার করা হয় না। কেননা এর দেহ (আকার) খুবই বিশাল। তবে আলেমরা এটাও উল্লেখ করেছেন যে, পৃথিবী একেবারে নিখুঁতভাবে গোলাকার নয়; বরং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে কিছুটা চ্যাপ্টা। এজন্য তারা বলেন: এটি ডিম্বাকৃতি। অর্থাৎ ডিমের মতো, উত্তর ও দক্ষিণ দিকে কিছুটা চ্যাপ্টা। (ইবনু উসাইমীন; ফাতাওয়া নূরুন আলা আদ দারব; ইবনু উসাইমীন;মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ২৫; পৃষ্ঠা: ১৯৫)
.
পৃথিবী গোলাকার নাকি সমতল যারা এই বিষয়ে বাড়াবাড়ি করে তাদের সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে শাইখ গুনাইমান শারহু ফাতহুল মাজীদ এ বলেন:
بعض الناس قد يقول قولا يظنه حقا، ويصر عليه، ويزعم أن القرآن يدل على ذلك، ولما يتثبت بعد من صحة ما فهم، فيكون في هذا فتنة له، ولغيره. فمثلا الذي يقول: إن القمر في السماء، وإنه ملاصق لها! وقد شاهد الناس، أو المختصون بهذا، بعد القمر عن السماء، وأنه إلى الأرض أقرب منها إلى السماء بكثير جدا، فإذا ما سمع خبراء الفلك، وعلماء الكواكب التفسير السابق المدعم بالأدلة – كما يزعم صاحبه- ظنوا أن القرآن يخالف الواقع، والحقائق العلمية، وما كان كذلك فلا يكون صحيحا. كما أنه وجد -مثلا- من يقول: بأن الأرض مسطحة، وليست كروية، مستدلا على ذلك بقول الله جل وعلا: {أفلا ينظرون إلى الإبل كيف خلقت … وإلى الأرض كيف سطحت} [الغاشية:17 – 20]، وقال في الآية الأخرى: {والأرض بعد ذلك دحاها} [النازعات:30] وما أشبه ذلك، فإذا سمع الإنسان الذي يعرف كروية الأرض، وليس عنده في ذلك شك، فإنه سينسب الخطأ إلى القرآن، وسيقول: هذا دليل على أن القرآن ليس صحيحا، ولو كان صحيحا ما كان مخالفا للواقع، فيكون فتنة له، ولهذا لا يجوز للإنسان أن يتكلم بالشيء الذي لا يعرفه، بل يجب أن يكون كلامه عن علم ومعرفة، وألا يقول على الله جل وعلا شيئا لا يعرف حقيقته. اهـ. وأما وجه الخطأ في الاستدلال السابق، فبينه كثير من أهل العلم.
قال العلامة الطاهر بن عاشور في (التحرير والتنوير): المد: البسط، أي بسطنا الأرض فلم تكن مجموع نتوءات؛ إذ لو كانت كذلك، لكان المشي عليها مرهقا. والمراد: بسط سطح الأرض، وليس المراد وصف حجم الأرض؛ لأن ذلك لا تدركه المشاهدة، ولم ينظر فيه المخاطبون نظر التأمل، فيستدل عليهم بما لا يعلمونه، فلا يعتبر في سياق الاستدلال على القدرة على خلق الأمور العظيمة، ولا في سياق الامتنان بما في ذلك الدليل من نعمة، فلا علاقة لهذه الآية بقضية كروية الأرض. اهـ.
“কিছু মানুষ এমন কথা বলে যেটিকে সে নিজে সঠিক মনে করে, তারপর সে সেটার ওপর একগুঁয়েমি ধরে বসে এবং দাবি করে যে কুরআন তার কথার পক্ষে প্রমাণ দেয়। অথচ সে এখনো যাচাই-পরীক্ষা করেনি তার এই বোঝাটা আসলেই সঠিক কি না। এর ফলে সে নিজেও ফিতনায় পড়ে এবং অন্যদের জন্যও ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন—কেউ যদি বলে: চাঁদ আকাশের ভেতরে আছে এবং সেটি আকাশের সাথেই লেগে আছে! অথচ মানুষ এবং বিশেষজ্ঞরা দেখেছে যে চাঁদ আসলে আকাশ থেকে অনেক দূরে, বরং পৃথিবীর তুলনায় আকাশের চেয়ে অনেক কাছাকাছি। তখন জ্যোর্তিবিজ্ঞানীরা যদি এই ধরনের আগের কোনো তাফসীর শুনে—যার লেখক দলীল-প্রমাণ দিয়ে দাবি করছে যে এটি সত্য—তাহলে তারা ভেবে বসতে পারে যে কুরআন বাস্তবতার বিরোধিতা করছে এবং বৈজ্ঞানিক সত্যকে অস্বীকার করছে। অথচ বাস্তবে কুরআন এমন কিছু বলে না। আবার যেমন—কেউ কেউ বলে: পৃথিবী সমতল, গোলাকার নয়। প্রমাণ হিসেবে তারা পড়ে শোনায় আল্লাহর বাণী:“তারা কি উটের দিকে লক্ষ্য করে না, কিভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে … আর পৃথিবীর দিকে লক্ষ্য করে না, কিভাবে তা বিছানো হয়েছে” (সূরা আল-গাশিয়াহ: ১৭–২০)। আবার তিনি বলেনঃ “এরপর পৃথিবীকে তিনি প্রসারিত করেছেন” (সূরা আন-নাযিআত: ৩০)। ইত্যাদি। তখন যে ব্যক্তি পৃথিবীর গোলাকারত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত, সে এই দাবিকে কুরআনের ভুল মনে করবে এবং বলতে পারে: এটা প্রমাণ করে যে কুরআন সত্য নয়;(নাউজুবিল্লাহ) যদি সত্য হতো তবে এটি বাস্তবতার বিরোধিতা করত না। ফলে এ ধরনের দাবি তার জন্য ফিতনায় পরিণত হয়। এই কারণেই মানুষের উচিত নয় এমন বিষয়ে কথা বলা, যা সে জানে না। বরং জ্ঞান ও দলীলের ভিত্তিতেই কথা বলা জরুরি, এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কিছু বলা যাবে না যার বাস্তবতা সম্পর্কে সে অবগত নয়।এ ধরনের ভুল ব্যাখ্যা বহু আলেম স্পষ্টভাবে খণ্ডন করেছেন। যেমন আল্লামা তাহির ইবনু আশুর (রহিমাহুল্লাহ) তাঁর আত-তাহরীর ওয়াত-তানওয়ীর তাফসীরে বলেছেন: “আল-মাদ্দ” শব্দের অর্থ হলো প্রসারিত করা। অর্থাৎ, আমরা জমিনকে এমনভাবে প্রসারিত করেছি যে তা কেবল উঁচু-নিচু পাহাড়-পর্বতে পরিপূর্ণ হয়ে যায়নি। কারণ যদি এমন হতো তবে এর ওপর চলাফেরা করা মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যেত। সুতরাং এর অর্থ হলো জমিনের পৃষ্ঠতলকে প্রসারিত করা, আর এখানে উদ্দেশ্য জমিনের আকার বা আকৃতি বর্ণনা করা নয়। কেননা, জমিনের প্রকৃত আকার মানুষের দৃষ্টিসীমায় ধরা পড়ে না, এবং সম্বোধিতরা এ নিয়ে চিন্তা-ভাবনাও করতো না। তাই আল্লাহ তাদের এমন প্রমাণে আবদ্ধ করেননি যা তারা জানে না।”(গৃহীত: ইসলাম ওয়েব ফাতওয়া নং-২৯৮০৩৩)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে আপনারা জেনে নিলেন যে পৃথিবীর গোলাকার হওয়া, ডিম্বাকৃতির মতো হওয়ার পরিপন্থী নয়। বরং বাতিল কথা হলো এই দাবি করা যে পৃথিবী সমতল—যেমনটা চার্চ/গির্জা কর্তৃপক্ষ বিশ্বাস করত। এজন্য তারা এমন আলেমদের প্রতি ক্রুদ্ধ ছিল, যারা পৃথিবীর গোলাকার হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করত; তাদেরকে অভিশাপ দিত এবং আগুনে দগ্ধ করত।”(বিস্তারিত জানতে দেখুন: আল-ইলমানিয়্যাহ: নাশআতুহা ওয়াতাতাওরুহা: ১/১৩০)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: উস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান হাফিজাহুল্লাহ।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি, সৌদি আরব।

Translate