September 16, 2026

স্বামী ধনী হোক বা গরিব পিতা-মাতার সম্পত্তিতে মেয়ের উত্তরাধিকার তার শরিয়তসম্মত অধিকার

 প্রশ্ন: স্বামী সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও কোনো মেয়ে যদি পিতা-মাতার সম্পত্তিতে তার প্রাপ্য অংশ না ছাড়ে এবং বাবা-মায়ের অনুরোধ সত্ত্বেও নিজের হক দাবি করে তাহলে এটি কি নাজায়েজ হবে? এতে সে কি গুনাহগার হবে এবং বাবা-মায়ের কথা অমান্য করার কারণে আখিরাতে আল্লাহ তাআলা তাকে পাকড়াও করবেন কি?

🔸উত্তর: কোনো বিবাহিত মেয়ের স্বামী যত সম্পদশালী হোক না কেন পিতা-মাতার সম্পত্তিতে মেয়ের যে উত্তরাধিকার বা হক রয়েছে তাতে কোনো পরিবর্তন ঘটে না। তাই ওই মেয়ের জন্য তার প্রাপ্য অধিকার দাবি করা শরিয়তসম্মত। এতে সে মোটেও গুনাহগার হবে না। এমনকি পিতা-মাতা জীবিতাবস্থায় যদি মেয়েকে তাদের মৃত্যুর পর তার হক ছেড়ে দিতে বলেন (নাদাবি দেওয়ার নির্দেশ দেন) তবুও পিতা-মাতার এই নির্দেশ পালন করা আবশ্যক নয়। এর জন্য আল্লাহ তাআলা আখিরাতে তাকে পাকড়াও বা শাস্তি দেবেন না। কারণ কুরআনে আল্লাহ তাআলা পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও মিরাসের অধিকার সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেন:
لِّلرِّجَالِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ وَلِلنِّسَاءِ نَصِيبٌ مِّمَّا تَرَكَ الْوَالِدَانِ وَالْأَقْرَبُونَ مِمَّا قَلَّ مِنْهُ أَوْ كَثُرَ ۚ نَصِيبًا مَّفْرُوضًا
“পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষদের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীদেরও অংশ আছে; তা অল্প হোক কিংবা বেশি। এ অংশ নির্ধারিত ফরজ।” [সূরা নিসা: ৭]
সুতরাং হকদার ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তার প্রাপ্য হক না ছাড়লে মা-বাবা কিংবা অন্য কেউ তাকে তা ছাড়তে বাধ্য করতে পারে না; বাবা-মা ছাড়তে নির্দেশ দিলেও তা পালন করা আবশ্যক নয়। বরং এক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করে নাদাবি নেওয়া সম্পূর্ণ অন্যায় ও জুলুম।
✪ অন্যায় আদেশে পিতা-মাতার আনুগত্য করা আবশ্যক নয়:
পিতা-মাতা যদি আল্লাহর নির্ধারিত কোনো ফরজের বিরুদ্ধে আদেশ করেন তবে তা মেনে চলা জায়েজ নয়। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
لَا طَاعَةَ فِي مَعْصِيَةٍ، إِنَّمَا الطَّاعَةُ فِي الْمَعْرُوفِ
“আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে কোনো আনুগত্য নেই; আনুগত্য কেবল সৎ ও ন্যায়সংগত কাজে।” [সহিহ বুখারি: ৭২৫৭, সহিহ মুসলিম: ১৮৪০]
মেয়েটি নিজের অধিকার দাবি করে কোনো গুনাহ করছে না। তাই তাকে নাদাবি দিতে বাধ্য করা পিতা-মাতা বা ভাইদের জন্য কোনোভাবেই বৈধ নয়। সুতরাং মেয়েটি নিজের শরিয়তসম্মত মিরাসি হক দাবি করার অধিকার রাখে; শরিয়তে এতে কোনো বাধা নেই। তবে হক ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ বা অনুরোধের প্রেক্ষাপটে পিতা-মাতা ও ভাই-বোনদের সাথে সম্পর্ক অটুট রাখতে নম্রতা ও প্রজ্ঞার সাথে বিষয়টি বুঝিয়ে বলা উচিত যে, এই হক আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ বিধান; এর সাথে স্বামীর আর্থিক অবস্থার কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো কারণে স্বামীর সাথে মনোমালিন্য হয়ে তালাক ঘটলে ভবিষ্যতে তার নিজের অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। আর সে আসলে অন্যায্য কিছু দাবি করছে না—এটা মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তার পাওনা। তবে হ্যাঁ, কোনো নারী যদি চান প্রয়োজন না থাকলে তিনি তার প্রাপ্য হক পুরোটা কিংবা আংশিক তার অন্যান্য গরিব উত্তরাধিকারীদের জন্য ছেড়ে দিতে পারেন। এতে তিনি সওয়াবের অধিকারী হবেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কাউকে তার প্রাপ্য অংশ ছেড়ে দিতে বা নাদাবি দিতে বাধ্য করা যাবে না। কেউ এমনটি করলে সে গুনাহগার হবে। তার উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং প্রাপককে তার প্রাপ্য কোনো ধরনের দ্বিধা-সংকট ছাড়া নিঃশর্তভাবে প্রদান করা। আল্লাহু আলাম।
⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯⎯
❑ ফতওয়া: মেয়ের তার বাবার ওয়ারিশি সম্পত্তি দাবি করার অধিকার আছে, সে গরিব হোক বা ধনী হোক:
প্রশ্ন: আমি বিবাহিতা এবং আমার স্বামী গরিব। তাঁর বেতন কম যা দিয়ে আমাদের সংসার চলে না। এমতাবস্থায় আমি কি আমার মৃত বাবার সম্পত্তি থেকে আমার ওয়ারিশি অংশ পরিবারের কাছে দাবি করতে পারি? আর আমার বাবার একটি বিল্ডিংয়ে যেভাবে অন্যান্য ওয়ারিশরা ভাড়া ছাড়াই থাকছেন, সেভাবে আমিও কি বিনা ভাড়ায় একটি ফ্ল্যাটে থাকার অধিকার রাখি?
ওয়ারিশরা হলেন: আমার মা, সাত বোন এবং দুই ভাই। বিল্ডিংয়ে থাকেন আমার মা, তাঁর স্বামী, আমার ভাইয়েরা এবং চার বোন। বাকি বোনেরা বিবাহিত এবং নিজেদের বাড়িতে থাকেন। আমি আমার স্বামীর সাথে ভাড়া বাসায় থাকি। কিন্তু স্বামীর বেতন কম হওয়ায় ভাড়া দিতে কষ্ট হয়। আমাকে জানাবেন কী করণীয়?
🔸 উত্তর: “সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওপর, তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের (রা.) ওপর। প্রশ্নকারী বোন, আপনার পিতার সম্পত্তি থেকে আপনার সম্পূর্ণ শরিয়তসম্মত অংশ দাবি করার অধিকার আপনার রয়েছে—আপনি গরিব হোন বা ধনী হোন—এতে কোনো পার্থক্য নেই। এটি পিতামাতার অবাধ্যতা বা আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা বলে গণ্য হবে না। আপনার পরিবারের উচিত, আল্লাহকে ভয় করা এবং প্রত্যেক ওয়ারিশকে তার শরিয়তসম্মত অংশ বুঝিয়ে দেওয়া। যে ওয়ারিশ মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া কোনো ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন তাঁর উচিত বাকি ওয়ারিশদের ভাড়া পরিশোধ করা—যদি না তারা স্বেচ্ছায় তা মাফ করে দেন। শুধু তাই নয়, অতীতের বছরগুলোর জন্যও আপনি আপনার প্রাপ্য ভাড়ার অংশ দাবি করতে পারেন। কারণ মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া প্রতিটি ফ্ল্যাট সমস্ত ওয়ারিশের যৌথ সম্পত্তি বলে বিবেচিত হয় এবং প্রত্যেকে তার শরিয়তসম্মত অংশ অনুযায়ী তাতে অংশীদার। কোনো একজন ওয়ারিশ সেখানে বসবাস করলেই বাকি ওয়ারিশদের অধিকার বাতিল হয়ে যায় না—তারা ভাড়া দাবি করার সম্পূর্ণ অধিকার রাখেন।”
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

যে শর্ত দিয়ে টাকা ধার দিলে সুদ হয়ে যায়

 প্রশ্ন: আমার স্বামীর বোন তাঁকে ৫ লাখ টাকা ধার দিতে চান, যা দিয়ে আমাদের বাড়ির (আমি ও আমার স্বামীর মালিকানাধীন, বোনের কোনো অংশ নেই) বাকি নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। শর্ত হলো, বাড়ি ভাড়া দেওয়া হলে ভাড়ার অর্ধেক অংশ প্রতি মাসে বোন পাবেন এবং নির্দিষ্ট সময় শেষে দেওয়া ৫ লাখ টাকাও তাঁকে সম্পূর্ণ ফেরত দিতে হবে। আমরা আর্থিক সমস্যার কারণে শুধু ধার চেয়েছিলাম। কিন্তু বোন এই শর্তে টাকা দিতে রাজি হয়েছেন। এটি কি সুদ, নাকি বৈধ ব্যবসায়িক বিনিয়োগ? সুদ হলে কারণসহ জানাবেন।

🔸উত্তর: এই লেনদেন জায়েজ নয়। এটা সুদি কারবার। কারণ এখানে মূল লেনদেনটি একটি কর্জ বা ঋণ। আর ঋণের নিয়ম হলো, যত টাকা নেওয়া হয়েছে ঠিক ততটাই ফেরত দিতে হয়; কোনো বাড়তি সুবিধা গ্রহণ করা যাবে না। কিন্তু এখানে বোন কর্জ দেওয়ার শর্ত হিসেবে ভাড়ার একটা অংশও নিচ্ছেন আর সেইসঙ্গে নির্দিষ্ট সময় শেষে তাঁর সম্পূর্ণ মূলধনও ফেরত পাচ্ছেন। অর্থাৎ তিনি ঋণ দিয়ে নিশ্চিতভাবে বাড়তি একটা লাভ পাচ্ছেন।
আর ফিকহের একটি প্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো:
كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا
“যে কর্জ থেকে ঋণদাতা অতিরিক্ত সুবিধা নেয় তা-ই সুদ।” তাই এই লেনদেনকে “ভাড়ার ভাগ” নাম দিলেও মূল বাস্তবতায় এটি সুদি লেনদেন, যা হারাম।
➧ কেউ কেউ মনে করতে পারেন, এটা হয়তো ব্যবসায়িক অংশীদারিত্বের (মুশারাকা) মতো কিছু অথবা পুঁজি-শ্রমের অংশীদারিত্বের (মুদারাবা) মতো কিছু। কিন্তু আসলে তা নয়।
কেননা—
◈ বৈধ ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব (মুশারাকা) হতে হলে, যিনি টাকা দিচ্ছেন তাঁর সেই সম্পদে প্রকৃত মালিকানা থাকতে হয় এবং লাভ-ক্ষতি উভয়ই তাঁকে ভাগাভাগি করতে হয়। কিন্তু এই বাড়িতে বোনের কোনো মালিকানা নেই। আর ক্ষতি হলেও তিনি তার ভাগী হচ্ছেন না; শুধু লাভের অংশ নিচ্ছেন।
◈ আবার পুঁজি-শ্রমের ভিত্তিতে ব্যবসা (মুদারাবা) হতে হলে, পুঁজিদাতার মূলধন ঝুঁকিমুক্ত থাকতে পারে না; কোনো কারণে ক্ষতি হলে আর্থিক ক্ষতি সম্পূর্ণটা তাঁকেই বহন করতে হয়। কিন্তু এখানে বোনকে নির্দিষ্ট সময়ে সম্পূর্ণ মূলধন ফেরত দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে তাঁর পুঁজি সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত। সুতরাং এটি বৈধ লেনদেন হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই এমন লেনদেন থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। এক্ষেত্রে করণীয় হলো, বোন যদি চান, তাহলে সহায়তার উদ্দেশ্যে কোনো ফায়দা গ্রহণের শর্ত আরোপ ছাড়াই কর্জ দেবেন। এক্ষেত্রে তিনি শুধু প্রদত্ত মূলধন ফেরত নেবেন। অতিরিক্ত কোনো মুনাফা বা সুবিধা গ্রহণ করতে পারবেন না। অথবা লাভ-লোকসানের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসার উদ্দেশ্যে অর্থ বিনিয়োগ করবেন (মুদারাবা)। অন্যথায় এভাবে ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
❑ ফতওয়ায়ে বিন বায: ফায়দা দেওয়ার শর্তে ঋণ নেওয়ার হুকুম
প্রশ্ন: এক যুবক ঋণগ্রস্ত। সে একটি ব্যাংকে গিয়ে এই শর্তে দশ হাজার রিয়াল ঋণ নেয় যে, এক বছর পর বারো হাজার রিয়াল ফেরত দেবে। এটা কি সুদ? এতে কি সে গুনাহগার হবে?
উত্তর: “হ্যাঁ, এটি নিশ্চিতভাবেই সুদ। ব্যাংক থেকে দশ হাজার রিয়াল ঋণ নিয়ে বারো হাজার রিয়াল ফেরত দেওয়ার শর্ত করা স্পষ্ট সুদের অন্তর্ভুক্ত। এতে আলেমদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই। চাই এই লেনদেন ব্যাংকের সাথে হোক কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে—সব ক্ষেত্রে তা সমানভাবে হারাম। ইসলামে বাড়তি কিছু ফেরত দেওয়ার শর্তে ঋণ নেওয়া বা দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, তা বাড়তি পরিমাণের পরিমাণ মাত্র এক দিরহাম হলেও। তবে কেউ যদি কোনো শর্ত ছাড়া ঋণ নেয় এবং পরিশোধের সময় স্বেচ্ছায় কোনো চাপ বা পূর্বপ্রত্যাশা ছাড়া কিছু বেশি ফেরত দেয় তবে তা জায়েজ। কারণ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«إِنَّ خِيَارَكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءً»
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে ঋণ পরিশোধে সবচেয়ে উদার।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩৯৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০১]
নবি করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজেও যখন কারো কাছ থেকে ঋণ নিতেন পরিশোধের সময় তার চেয়ে উত্তম ও বেশি কিছু ফেরত দিতেন।”
প্রশ্ন: কিন্তু যদি নির্দিষ্ট কোনো অঙ্ক নির্ধারণ না করে আগে থেকেই অলিখিত কোনো চুক্তি বা বাড়তি দেওয়ার ইঙ্গিত থাকে তবে তার বিধান কী?
উত্তর: “এমন অলিখিত বোঝাপড়া বা মনস্তাত্ত্বিক প্রত্যাশাও জায়েজ নয়। মুখে বা কাগজে নির্দিষ্ট করে লেখা না থাকলেও যদি বাড়তি কিছু দেওয়ার পূর্বশর্ত বা ইঙ্গিত থেকে থাকে তবে অতিরিক্ত কোনো কিছুই দেওয়া যাবে না। সে ক্ষেত্রে যত টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছিল ঠিক ততটাই ফেরত দিতে হবে।”
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
(দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব)।

আদর্শ দাম্পত্য জীবন গঠনে স্ত্রীর সাথে সদাচরণ ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক

 আদর্শ দাম্পত্য জীবন গঠনে স্ত্রীর সাথে সদাচরণ ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্ক: কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর একগুচ্ছ অমূল্য দিকনির্দেশনা

প্রশ্ন: অনেক বোনই তাঁদের স্বামীদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করে থাকেন যে, স্বামীরা তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করেন না। স্ত্রীদের প্রতি সদাচরণের উদ্দেশ্যে স্বামীদেরকে ইসলাম কী উপদেশ দিয়েছে তা একটু জানালে উপকৃত হবো।
উত্তর: স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসার ওপরই দাম্পত্য জীবনের সুখ-সমৃদ্ধি নির্ভর করে। এই ভালোবাসা ও প্রেম-প্রীতিময় পরিবেশ সৃষ্টি করা স্বামী-স্ত্রী উভয়েরই দায়িত্ব। তাই এ ব্যাপারে উভয়কেই সচেষ্ট থাকতে হবে।
ইসলাম স্বামীদেরকে নির্দেশ দিয়েছে—স্ত্রীদের ভরণ-পোষণসহ তাঁদের সাথে সদাচরণ করতে। আর স্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছে, স্বামী অন্যায় ও গুনাহের আদেশ না দিলে বা সাধ্যাতিরিক্ত ও ক্ষতির কারণ না হলে তাঁর আনুগত্য করতে। স্ত্রীর মধ্যে আচরণগত বা দ্বীনি কোনো ত্রুটি দেখা গেলে স্বামী যথাসাধ্য ধৈর্য ধরবেন, আন্তরিকতা ও ভালোবাসার সাথে তাঁকে সংশোধনের চেষ্টা করবেন এবং তাঁর হেদায়েতের জন্য দুআ করবেন।
এ বিষয়ে নিচের কুরআনের আয়াত ও কতিপয় সহিহ হাদিস উপাস্থাপন করা হলো:
মহান আল্লাহ বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“আর তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সৎভাবে ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করো।” [সূরা আন-নিসা: ১৯]
وَلَن تَسْتَطِيعُوا أَن تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ ۖ فَلَا تَمِيلُوا كُلَّ الْمَيْلِ فَتَذَرُوهَا كَالْمُعَلَّقَةِ ۚ وَإِن تُصْلِحُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا
“স্ত্রীদের মাঝে পুরোপুরি ন্যায়বিচার বজায় রাখা তোমাদের সাধ্যাতীত, যদিও তোমরা তা চাও। কাজেই একজনের দিকে সম্পূর্ণ ঝুঁকে পড়ে অন্যজনকে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রেখো না। তোমরা যদি নিজেদের কাজকর্ম শুধরে নাও এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা নিসা: ১২৯]
১. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا، فَإِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلَاهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ»
“আমার কাছ থেকে নারীদের প্রতি কল্যাণের উপদেশ গ্রহণ করো। কেননা নারীকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো তার ওপরের দিক। তুমি যদি তা সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে ফেলবে; আর যদি ফেলে রাখো, তবে তা বাঁকাই থেকে যাবে। কাজেই নারীদের ব্যাপারে কল্যাণের উপদেশ গ্রহণ করো।” [সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]
২. আব্দুল্লাহ ইবনু যাম‘আ (রা.) বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এক খুতবায় বলেছেন—
«يَعْمِدُ أَحَدُكُمْ فَيَجْلِدُ امْرَأَتَهُ جَلْدَ الْعَبْدِ، فَلَعَلَّهُ يُضَاجِعُهَا مِنْ آخِرِ يَوْمِهِ»
“তোমাদের কেউ কেউ তার স্ত্রীকে দাসের মতো বেত্রাঘাত করে, অথচ দিনের শেষে সে তার সাথেই শয্যা গ্রহণ করে!” [সহীহ বুখারী: ৫২০৪, সহীহ মুসলিম: ২৮৫৫]
এই হাদিসে স্ত্রীর প্রতি সহিংস আচরণ ও পরস্পরবিরোধী মনোভাবের কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে—একদিকে কঠোর প্রহার, অন্যদিকে ঘনিষ্ঠতা কাম্য—এই দ্বিচারিতা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অপছন্দ করেছেন।
৩. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ»
“কোনো মুমিন পুরুষ যেন কোনো মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) সম্পূর্ণভাবে ঘৃণা না করে। তার একটি স্বভাব অপছন্দ হলে, নিশ্চয়ই অন্য একটি স্বভাব পছন্দ হবে।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৬৯]
৪. আমর ইবনুল আহওয়াস আল-জুশামী (রা.) বিদায় হজ্জের ভাষণে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন—
«أَلَا وَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا، فَإِنَّمَا هُنَّ عَوَانٍ عِنْدَكُمْ، لَيْسَ تَمْلِكُونَ مِنْهُنَّ شَيْئًا غَيْرَ ذَلِكَ، إِلَّا أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ، فَإِنْ فَعَلْنَ فَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ، فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلَا تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلًا»
“সাবধান! নারীদের ব্যাপারে কল্যাণের উপদেশ গ্রহণ করো, কেননা তারা তোমাদের কাছে (দায়িত্বে থাকা) বন্দিনীর মতো। এর বাইরে তাদের ওপর তোমরা আর কিছুর অধিকারী নও, যদি না তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। যদি তারা তা করে, তবে বিছানায় তাদের থেকে পৃথক থাকো এবং (প্রয়োজনে) সামান্য প্রহার করো, তীব্র নয়। অতঃপর তারা অনুগত হলে তাদের বিরুদ্ধে অন্য কোনো পথ খুঁজো না।” [সুনানে তিরমিযী: ১১৬৩; সুনানে ইবনু মাজাহ, হাদিসটি হাসান সহীহ]
৫. মুয়াবিয়া ইবনু হাইদাহ (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন—হে আল্লাহর রসুল! আমাদের কারো ওপর তার স্ত্রীর কী অধিকার?
তিনি বলেন—
«أَنْ تُطْعِمَهَا إِذَا طَعِمْتَ، وَتَكْسُوَهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ، وَلَا تَضْرِبِ الْوَجْهَ، وَلَا تُقَبِّحْ، وَلَا تَهْجُرْ إِلَّا فِي الْبَيْتِ»
“তুমি যখন খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে, তুমি যখন পরিধান করবে তখন তাকেও পরিধান করাবে, তার মুখমণ্ডলে আঘাত করবে না, তাকে অশ্লীল কথা বলবে না, এবং ঘরের ভেতর ছাড়া তার থেকে দূরে থেকো না।” [সুনানে আবু দাউদ: ২১৪২; সুনানে ইবনু মাজাহ: ১৮৫০, হাদিসটি সহীহ]
৬. আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا، وَخِيَارُكُمْ خِيَارُكُمْ لِنِسَائِهِمْ»
“মুমিনদের মধ্যে ইমানের দিক থেকে সবচেয়ে পরিপূর্ণ সেই ব্যক্তি, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম। আর তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীদের কাছে সর্বোত্তম।”
[সুনানে তিরমিযী: ১১৬২; সুনানে আবু দাউদ: ৪৬৮২, হাদিসটি হাসান সহীহ]
৭. ইয়াস ইবনু আব্দুল্লাহ (রা.) বর্ণনা করেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«لَا تَضْرِبُوا إِمَاءَ اللَّهِ»
“তোমরা আল্লাহর বাঁদীদের (স্ত্রীদের) মারধোর করো না।”
অতঃপর উমর (রা.) এসে অভিযোগ করলেন যে, স্ত্রীরা স্বামীদের ওপর বেয়াদবি শুরু করেছে। তখন প্রহারের অনুমতি দেওয়া হলো। এরপর বহু নারী রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারের কাছে এসে স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে লাগল। তখন তিনি বললেন—
«لَقَدْ طَافَ بِآلِ مُحَمَّدٍ نِسَاءٌ كَثِيرٌ يَشْكُونَ أَزْوَاجَهُنَّ، لَيْسَ أُولَئِكَ بِخِيَارِكُمْ»
“মুহাম্মদের পরিবারের কাছে বহু নারী এসে তাদের স্বামীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে। এসব স্বামীরা তোমাদের মধ্যে ভালো লোক নয়।” [সুনানে আবু দাউদ: ২১৪৬, হাদিসটি সহীহ]
৮. আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন—
«الدُّنْيَا مَتَاعٌ، وَخَيْرُ مَتَاعِ الدُّنْيَا الْمَرْأَةُ الصَّالِحَةُ»
“এই পৃথিবীর জীবন নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী ভোগ-সম্ভার আর এই ভোগ-সম্ভারের মধ্যে সর্বাধিক মূল্যবান সম্পদ হলো একজন নেককার স্ত্রী।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৬৭]
[উৎস গ্রন্থ: রিয়াজুস সালেহিন]
উপরের আয়াত ও হাদিসসমূহ স্পষ্ট করে যে, স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা এবং তার অধিকার আদায় করা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনো স্বামীর জন্যই স্ত্রীর সাথে সবসময় কঠোরতা প্রদর্শন করা বৈধ নয়; বরং যে স্বামী স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম আচরণ করে, সে-ই ইমানের দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন এবং উত্তম ব্যক্তিত্বের অধিকারী। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ এবং একজন আদর্শ স্বামীর বৈশিষ্ট্য

 প্রশ্ন: একজন স্বামী কি সবসময় স্ত্রীর সাথে কঠোরভাবে আচরণ করতে পারে? স্ত্রী যদি কোনও অবাধ্যতাই না করে বরং অনুগত থাকে সেক্ষেত্রে স্বামীর জন্য সবসময় কড়া বা শক্ত ভাষায় কথা বলা কি কোনোভাবে বৈধ হতে পারে? অনেকে মনে করে, পুরুষ মানেই স্ত্রীর সাথে কঠোর হতে হবে। একজন পুরুষের স্ত্রীর সাথে কেমন আচরণ তার উত্তম ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক হতে পারে?

উত্তর: দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও সম্মান। তাই স্বামী বা স্ত্রী—কারও জন্যই একে অপরের সাথে সারাক্ষণ কর্কশ বা কঠোর মেজাজে কথা বলা ঠিক নয়। বিশেষ করে স্ত্রী যদি অনুগত হন এবং কোনও ভুল বা অবাধ্যতা না করেন তবে তার সাথে কঠোর আচরণ করা একেবারেই অনুচিত। “পুরুষ মানেই স্ত্রীর সাথে মেজাজ দেখিয়ে চলতে হবে”—এই চিন্তাটি একটি ভুল ধারণা, সামাজিক কুসংস্কার এবং ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মহান আল্লাহ বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সৎ ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করো।” [সূরা নিসা: ১৯]
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي»
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে উত্তম, যে তার পরিবারের (স্ত্রীর) কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের চেয়েও বেশি উত্তম।” [সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫-হাদিসটি সহীহ]
এই হাদিসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন—তিনি পরিবারের সাথে সবচেয়ে চমৎকার আচরণ করতেন, যা প্রতিটি স্বামীর জন্যই অনুসরণীয়।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«لاَ يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ»
“কোনও মুমিন পুরুষ যেন কোনও মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) সম্পূর্ণভাবে অপছন্দ না করে। কারণ তার একটি আচরণ বা অভ্যাস খারাপ লাগলেও অন্য কোনও আচরণ বা গুণে সে অবশ্যই সন্তুষ্ট হবে।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৬৮]
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন—
«اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا، فَإِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلَاهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ»
“তোমরা নারীদের সাথে ভালো ব্যবহারের উপদেশ গ্রহণ করো। কারণ নারীকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো তার ওপরের দিক। তুমি যদি তা একবারে সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে ফেলবে; আর যদি এমনি ছেড়ে দাও তবে তা বাঁকাই থেকে যাবে। তাই নারীদের সাথে ভালো আচরণ করার উপদেশ মেনে চলো।” [সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]
এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, স্ত্রীর স্বভাবগত কিছু দুর্বলতা থাকতেই পারে—সেগুলো নিয়ে অনর্থক কঠোর না হয়ে ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথে সংসার পরিচালনা করাই একজন দায়িত্বশীল স্বামীর পরিচয়।
❑ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন উত্তম চরিত্রের আদর্শ স্বামীর কতিপয় বৈশিষ্ট্য:
একজন উত্তম চরিত্রের আদর্শ স্বামী তার স্ত্রীর সাথে যেমন আচরণ করবে:
১. কথায় কথায় রাগ না দেখিয়ে স্ত্রীর সাথে শান্ত, ভদ্র ও স্নেহমাখা ভাষায় কথা বলবে; কঠিন ভাষায় বকাঝকা ও গালাগালি করবে না এবং মেজাজ দেখিয়ে চড়া গলায় কথা বলবে না।
২. মানুষমাত্রই ভুল হয়। তাই স্ত্রীর ছোটখাটো ত্রুটিগুলোকে বড় করে না দেখে হাসিমুখে ও ধৈর্যের সাথে তা শুধরে দেওয়ার এবং সুন্দর আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করবে।
৩. স্ত্রী সংসার ও পরিবারের জন্য যা কিছু করে তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো এবং মন খুলে তার কাজের মূল্যায়ন ও প্রশংসা করবে।
৪. স্ত্রীর সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনায় তার প্রকৃত সঙ্গী হবে। তার মনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে, যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে তার পাশে থাকবে এবং তার মানসিক অবস্থা ও অনুভূতির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিবে।
৫. স্ত্রীকে কেবল গৃহস্থালি কাজে সীমাবদ্ধ বা অধীনস্থ মনে না করে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে সমান অংশীদার (লাইফ পার্টনার) হিসেবে সম্মান করা।
৬. স্ত্রীর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনও দুর্বলতা কিংবা পারিবারিক মনোমালিন্যের বিষয় অন্যের কাছে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ না করে নিজেদের মধ্যেই তা সমাধান করবে। কখনোই লোক সম্মুখে, বিশেষ করে তার মা-বাবা ও নিকটাত্মীয়দের কাছে তাকে কখনও অপমান বা ছোট না করবে না।
৭. সারাদিনের ব্যস্ততার ফাঁকেও স্ত্রীর জন্য কিছুটা সময় বের করা, মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনা এবং একান্তে সুন্দর কিছু মুহূর্ত (quality time) কাটানো।
৮. স্ত্রীর বাবা-মা, ভাইবোন ও নিকটাত্মীয়দের নিজের পরিবারের মতোই সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়া।
৯. মাঝেমধ্যে তার পছন্দের ছোটখাটো উপহার দেওয়ার চেষ্টা করবে (যেমন: সুন্দর পোশাক, অলঙ্কার, তার বিশেষ কোনও চাহিদা পূরণ ইত্যাদি) এবং সম্ভব হলে গুনাহ মুক্ত পরিবেশে ঘুরতে যাওয়া বা তার পছন্দের খাবার খাওয়ানো।
১০. পরিবারের ছোট-বড় যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তার সাথে আলোচনা করা।
❑ কঠোরতা কখন প্রযোজ্য?
স্ত্রী যদি স্পষ্ট কোনও অবাধ্যতা করে, শরিয়তের বিধান অমান্য করে বা পরিবারের কোনও ক্ষতি করে তবুও ইসলাম শুরুতেই কঠোর হতে বলে না। কুরআন আমাদের ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে বলেছে—প্রথমে বুঝিয়ে বলা, তারপর শয্যা পৃথক করা, আর একদম শেষ উপায় হিসেবে সামান্য শাসন (যাতে কোনও আঘাত বা দাগ না লাগে)। [দেখুন: তবে তা-ও শুধু বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য, রাগের বশে বা প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।
উপরের আয়াত ও হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, স্ত্রীর সাথে সুন্দর আচরণ, নম্রতা ও ধৈর্য প্রদর্শনই ইসলামের শিক্ষা। আর আমাদের প্রিয় নবি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই এর সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ। মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী আদর্শ দাম্পত্য জীবন গঠনের তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

পিতা ঋণগ্রস্ত থাকা অবস্থায় মারা গেলে সন্তানরা কি সেই ঋণ শোধ করতে বাধ্য

 প্রশ্ন: পিতা যদি কোনো কোম্পানির ঋণের ব্যক্তিগত জামিনদার (গ্যারান্টর) হয়ে মারা যান এবং চুক্তিপত্রে উত্তরাধিকারীদেরও দায়বদ্ধ রাখার শর্ত থাকে তাহলে কোম্পানি ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে পিতার মৃত্যুর পর সন্তানরা কি তা পরিশোধ করতে বাধ্য? সন্তানরা শোধ না করলে আখিরাতে তারা কি পাকড়াও হবে?

উত্তর: শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কারো মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ধারাবাহিকভাবে চারটি বিষয় নিষ্পন্ন করা হয়:
১. দাফন-কাফনের খরচ।
২. তার নিজস্ব ঋণ ও জামিনদারির বকেয়া পরিশোধ।
৩. ওসিয়ত পূরণ (যদি কোনো ওসিয়ত করে থাকেন, তবে তা সর্বোচ্চ অবশিষ্ট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কার্যকর হয়)।
৪. অবশিষ্ট সম্পত্তি ফারায়েজ অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টন।
আল্লাহ তাআলা মিরাসের আয়াতে ওসিয়ত ও ঋণ পরিশোধের এই ধারাবাহিকতার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন:
مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ
“তার করা ওসিয়ত পূরণ অথবা ঋণ পরিশোধের পর।” [সূরা নিসা: ১১]
অর্থাৎ পিতার জামিনদারির দায় তার মৃত্যুর সাথে সাথেই তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির ওপর বর্তায় এবং সম্পত্তি বণ্টনের আগেই তা থেকে ঋণ পরিশোধ করা সন্তানদের জন্য শরয়ি কর্তব্য। কিন্তু পিতা যদি কোনো সম্পত্তি রেখে না যান তবে সন্তানরা নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে সেই ঋণ পরিশোধ করতে শরয়িভাবে বাধ্য নন। ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো—একজনের দায় অন্য নিরপরাধ ব্যক্তির ওপর বর্তায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ
“মানুষ তা-ই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে।” [সূরা নাজম: ৩৯] এই আয়াতের আলোকে ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন যে, কারো কৃতকর্ম বা আর্থিক দায় অন্য কারো ওপর বর্তায় না—যদি না সে স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ করে।
▪️ঋণের জন্য সন্তানগণ আখিরাতে পাকড়াও হবে কি?
পিতা সম্পত্তি রেখে না গেলে এবং সন্তানরা অসচ্ছলতার কারণে জামিনদারির বকেয়া বা ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে এর জন্য সন্তানদের আখিরাতে কোনো পাকড়াও বা গুনাহ হবে না। তবে পিতা সম্পত্তি না রেখে গেলেও সন্তানরা সামর্থ্যবান হলে নিজেদের পক্ষ থেকে সেই ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং পিতার প্রতি ইহসান (সদাচরণ) হিসেবে বিবেচিত হবে। হাদিসে এসেছে, ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির আত্মা ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ঝুলন্ত থাকে। তাই সম্ভব হলে স্বেচ্ছায় ঋণ পরিশোধ করে পিতাকে দায়মুক্ত করা উচিত।
সংক্ষেপে: সন্তানদের প্রথম করণীয় হলো—পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বণ্টনের আগে সেখান থেকে জামিনদারির বকেয়া ঋণ পরিশোধ করা। পিতা কোনো সম্পত্তি না রাখলে সন্তানরা নিজ সম্পদ থেকে তা শোধ করতে শরয়িভাবে বাধ্য নন এবং পরিশোধ করতে না পারলে গুনাহগারও হবেন না। তবে সামর্থ্য থাকলে স্বেচ্ছায় ঋণ পরিশোধ করে পিতার আত্মাকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করা উত্তম ও অধিক সওয়াবের কাজ।
▪️দেশে প্রচলিত আইন:
বাংলাদেশের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (Muslim persona low) অনুযায়ী উত্তরাধিকার পরিচালিত হয়। সেখানেও সম্পত্তি বণ্টনের আগে কাফন-দাফনের খরচ, বাকি ঋণ ও বৈধ ওসিয়ত কার্যকর করার পরই অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টিত হওয়ার নিয়ম অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ শরিয়াহ ও প্রচলিত আইন—উভয় ক্ষেত্রেই ঋণ পরিশোধের স্থান সম্পত্তি বণ্টনের আগে; বণ্টনের পরে নয়। বাবার ঋণ যদি তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয় তবে প্রচলিত আইনি চর্চায়ও সন্তানরা নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে বাকি ঋণ শোধ করতে বাধ্য নন। ঋণদাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেবল মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ থেকেই পাওনা আদায় করতে পারে; ঋণ সম্পদের চেয়ে বেশি হলে উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তি ত্যাগের নোটারি করে নিজেদের দায়মুক্তও রাখতে পারেন। অর্থাৎ এখানেও মূলনীতি একই: সন্তানরা কখনও তাদের নিজস্ব উপার্জিত সম্পদ থেকে বাবার ঋণ শোধ করতে আইনত বাধ্য নন; দায়বদ্ধতা মৃতের রেখে যাওয়া সম্পত্তির পরিমাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। (তবে বিশেষ চুক্তিতে ভিন্ন শর্ত থাকলে সে ক্ষেত্রে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উত্তম।)
▪️ফতওয়ায়ে উসাইমিন: ওয়ারিশদের কি মৃতের ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব?
প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার ওপর যদি ঋণ থাকে এবং সে এমন কোনো সম্পদ রেখে না যায় যা দিয়ে এই ঋণ পরিশোধ করা যায় তাহলে তার ওয়ারিশদের ওপর কি তার পক্ষ থেকে এই ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব, নাকি নয়?
উত্তর:
لَا يَجِبُ عَلَى وَرَثَتِهِ أَنْ يُؤَدُّوا هَذَا الدَّيْنَ عَنْهُ سَوَاءٌ كَانُوا مِنَ الْأَبَاعِدِ أَوْ مِنَ الْأَقَارِبِ، لَكِنْ إِنْ كَانَ هَذَا الْمَيِّتُ وَالِدًا فَيَنْبَغِي لِأَوْلَادِهِ أَنْ يُؤَفُّوا عَنْهُ؛ لِأَنَّ ذَلِكَ مِنْ بِرِّهِ، وَأَمَّا الْوُجُوبُ فَلَا يَجِبُ؛ لِأَنَّنَا لَوْ أَوْجَبْنَا هَذَا لَكُنَّا نُؤَثِّمُهُمْ بِتَرْكِ الْوَفَاءِ، وَهَذَا يُخَالِفُ قَوْلَهُ تَعَالَى: ﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى﴾ وَلِأَنَّنَا لَوْ قُلْنَا بِوُجُوبِ وَفَاءِ الدَّيْنِ عَنِ الْمَيِّتِ الَّذِي لَمْ يَخْلُفْ تَرِكَةً لَكَانَ فِي هَذَا فَتْحُ بَابٍ لِهَؤُلَاءِ الَّذِينَ لَا يُبَالُونَ بِارْتِكَابِ الدُّيُونِ، فَيَقُولُ الْوَاحِدُ: أَنَا سَوْفَ أَتَدَيَّنُ، وَإِذَا مُتُّ فَإِنَّ أَهْلِي أَوْ وَرَثَتِي يَقْضُونَ عَنِّي الدَّيْنَ. فَلَا يُبَالِي بَعْدَ ذَلِكَ بِمَا اسْتَدَانَهُ وَأَلْحَقَهُ ذِمَّتَهُ. ثُمَّ إِنِّي أَقُولُ: إِنَّ الْمَيِّتَ إِذَا مَاتَ وَعَلَيْهِ دَيْنٌ فَإِنْ كَانَ قَدْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُؤَدِّي عَنْهُ مِنْ فَضْلِهِ وَكَرَمِهِ، فَيُرْضِي أَهْلَ الْحَقِّ.
“ওয়ারিশদের ওপর মৃতের ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব নয়—চাই তারা দূরের আত্মীয় হোক বা নিকটাত্মীয়। তবে মৃত ব্যক্তি যদি বাবা হন তবে সমর্থ্য থাকলে সন্তানদের উচিত, তার ঋণ শোধ করে দেওয়া। কেননা এটি বাবার প্রতি সৎব্যবহার ও সদাচরণের অংশ। কিন্তু এটিকে বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) বলা যাবে না। কারণ, আমরা যদি একে ওয়াজিব সাব্যস্ত করি তবে ঋণ পরিশোধ না করার কারণে সন্তানদের গুনাহগার সাব্যস্ত করতে হয়; অথচ এটি আল্লাহ তাআলার এই বাণীর পরিপন্থী:
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
“কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না” [সূরা আনআম: ১৬৪]।
তা ছাড়া, কোনো সম্পদ না রেখে যাওয়া মৃতের ঋণ পরিশোধ করাকে যদি আমরা ওয়াজিব বলে দিই তবে তা অকাতরে ঋণ নেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকদের জন্য এক সুবিধার পথ খুলে দেবে। তখন যে কেউ ভাববে—”আমি ঋণ নিতেই থাকি। আমি মারা গেলে আমার পরিবার বা ওয়ারিশরা তো তা শোধ করেই দেবে!” ফলে নিজের কাঁধে কত ঋণ চাপাচ্ছে, সে বিষয়ে তার আর কোনো পরোয়া থাকবে না। এর পাশাপাশি আমি আরও বলতে চাই—কোনো ব্যক্তি যদি পরিশোধ করার সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে এবং তা পরিশোধ করার আগেই মারা যায় তবে আল্লাহ তাআলাই নিজ অনুগ্রহ ও মহানুভবতায় তার পক্ষ থেকে সেই ঋণ আদায় করে দেবেন এবং পাওনাদারদের সন্তুষ্ট করে দেবেন।”
ফতওয়া দাতা: আল্লামা মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন (রাহিমাহুল্লাহ)।
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
▪️ঋণ রেখে মৃত্যুবরণ করার ভয়াবহতা:
হাদিসে ঋণ পরিশোধ না করে মারা যাওয়ার পরিণতি নিয়ে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهِ حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ»
“মুমিনের আত্মা তার ঋণের সাথে ঝুলে থাকে, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হয়।” [​সহিহ আল-জামে, হাদিস: ৬৭৭৯; সহিহ আত-তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৮]
এমনকি আল্লাহর পথে নিহত শহিদেরও সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, কিন্তু ঋণ ক্ষমা করা হয় না—এমনটিও হাদিসে এসেছে। [মুসলিম]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে ঋণ ও পাপের বোঝা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন এবং সাহাবিদেরও এই দোআ শিক্ষা দিতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে গুনাহ ও ঋণের বোঝা থেকে আশ্রয় চাই।” [বুখারি]
একবার সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রসুল! আপনি এত ঘন ঘন ঋণ থেকে আশ্রয় চান কেন?”
তিনি জবাবে বলেছিলেন: “মানুষ ঋণগ্রস্ত হলে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে এবং ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।”
এ কারণেই ইসলামে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঋণ নেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। প্রকৃত অভাব, চিকিৎসা, ব্যবসার বৈধ প্রয়োজন বা এমন কোনো জরুরি অবস্থায় ঋণ নেওয়া জায়েজ।
তবে বিলাসিতা বা অপ্রয়োজনীয় খরচের জন্য ঋণের বোঝা নিজের কাঁধে চাপানো থেকে বিরত থাকা উচিত।
আর যদি কাউকে ঋণ নিতেই হয় তবে তার উচিত, পরিশোধের সৎ নিয়ত রাখা, সাধ্যমতো দ্রুত তা শোধ করার চেষ্টা করা এবং নিজের অবর্তমানে পরিবার যেন এই দায় থেকে বেকায়দায় না পড়ে সে বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি রাখা—যেমন ঋণের হিসাব লিখে রাখা বা পরিবারকে তা অবহিত করে রাখা। মহান আল্লাহ তৌফিক দানকারী।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

বন্যা ভূমিধ্বস ও অন্যান্য ক্ষতি থেকে কবর রক্ষায় বেড়া ইট পাথর কাঠ বা লোহা ব্যবহারের বিধান

 ইসলামে কবরকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক ও অনাড়ম্বর রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন—বন্যার পানি, ভূমিধ্বস, কিংবা হিংস্র প্রাণীর উপদ্রব থেকে কবর নষ্ট হওয়া বা ধসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে, প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া শরিয়তে বৈধ। ক্ষেত্র বিশেষে কবর রক্ষার্থে ইট, সিমেন্ট, কাঠ, লোহা বা অন্য কোনও প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করা জায়েজ, তবে তা অবশ্যই প্রয়োজনের সীমারেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া উপস্থাপন করা হলো:

❑ ১. কবর চিহ্নিত রাখা ও বন্যার হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তার চারপাশে বেড়া দেওয়ার বিধান:
প্রশ্ন: কবর চিহ্নিত রাখা ও তা বন্যা থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তার চারপাশে এক বিঘত উচ্চতার লোহার বেড়া দেওয়া কি জায়েজ? বেড়াটি খাড়া খুঁটির সাথে আড়াআড়িভাবে চারটি লোহার রড জোড়া দিয়ে তৈরি।
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দরুদ ও সালাম রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি। সহিহ সুন্নাহয় কবরে চুন-সুরকি লাগানো, তা উঁচু করা, তার ওপর কাঠামো তৈরি করা ও নির্মাণকাজ করা নিষেধ করা হয়েছে। এর কারণ হলো, কবরবাসীর ব্যাপারে মানুষ যেন ফিতনায় না পড়ে এবং তাদের প্রতি বাড়াবাড়ি করে শিরকে লিপ্ত না হয় ও তাদের উদ্দেশ্যে ইবাদত না করে বসে—যেমনটি ইতিপূর্বে ইহুদি-খ্রিস্টানরা করেছিল এবং আমাদের যুগেও কিছু মুসলিমের মধ্যে ঘটেছে। পাশাপাশি এতে অনর্থক অর্থ অপচয়েরও বিষয় আছে।
প্রখ্যাত তাবেয়ি আবুল হায়্যাজ আল আসাদি (রাহ.) বর্ণনা করেন, আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) তাঁকে বলেছিলেন:
«أَلَا أَبْعَثُكَ عَلَى مَا بَعَثَنِي عَلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنْ لَا تَدَعَ تِمْثَالًا إِلَّا طَمَسْتَهُ، وَلَا قَبْرًا مُشْرِفًا إِلَّا سَوَّيْتَهُ»
“আমি কি তোমাকে সেই কাজের জন্য পাঠাব না, যে কাজের জন্য রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে পাঠিয়েছিলেন? তুমি কোনও মূর্তি (কোনও প্রাণীর, বিশেষত মানুষ বা জীবজন্তুর, ছবি বা আকৃতিতে তৈরি ভাস্কর্যজাতীয় বস্তু) দেখলে তা মুছে ফেলবে আর কোনও উঁচু কবর দেখলে তা সমান করে দেবে।” [সহিহ মুসলিম: ৯৬৯]
তবে কবরকে হিংস্র জীবজন্তু থেকে রক্ষা করার জন্য কিংবা বন্যা বা অন্য কোনও কারণে তা যেন বিলীন হয়ে না যায় সেজন্য বেড়া দেওয়ার প্রয়োজন হলে প্রয়োজনের পরিমাণে তা দিতে কোনও অসুবিধা নেই। কারণ প্রয়োজন যতটুকু অনুমতিও ততটুকু পর্যন্তই সীমিত থাকে। যদি এক বিঘত উচ্চতার বেড়া দিয়েই আশঙ্কিত ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় তাহলে তার চেয়ে বেশি করা যাবে না। কেবল প্রয়োজনের সীমা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
আর শুধু কবর চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে তা উঁচু করা শরিয়তসম্মত নয়; বরং এটিও নির্মাণ-নিষেধের সাধারণ নির্দেশনার আওতায় পড়বে। কারণ কবর চিহ্নিত করার জন্য এর চেয়ে কম ব্যবস্থাতেই কাজ চলে।
তবে যদি মূল উদ্দেশ্য বন্যা প্রভৃতি থেকে কবর রক্ষা করা হয় এবং কবর চিহ্নিত হওয়াটা তার পাশাপাশি অতিরিক্ত ফায়দা হিসেবে আসে, তাহলে ইনশাআল্লাহ তাতে কোনও অসুবিধা নেই। কেননা যা স্বতন্ত্রভাবে জায়েজ নয় তা অন্য একটি বৈধ উদ্দেশ্যের অনুগামী হিসেবে জায়েজ হয়ে যায়।” আল্লাহই সর্বজ্ঞ। [সূত্র: ইসলাম ওয়েব]
❑ ২. কবর ধসে পড়ার আশঙ্কায় ইট দিয়ে কবর নির্মাণের বিধান:
শাইখ ইবনে বায (রহ.) বলেন:
«إِذَا دَعَتِ الْحَاجَةُ بِأَنْ يَضَعَ فِي الْقَبْرِ حِجَارَةً، أَوْ لَبِنًا، أَوْ خَشَبًا، أَوْ حَدِيدًا؛ لِأَنَّ الْأَرْضَ رَدِيئَةٌ، أَوْ تَعْلُوهَا الْمِيَاهُ؛ فَلَا بَأْسَ بِهَذَا. أَمَّا إِنْ كَانَتِ الْأَرْضُ قَوِيَّةً، يَحْفِرُ فِيهَا حَفْرًا إِلَى نِصْفِ طَرَفِ الرَّجُلِ فَوْقَ السُّرَّةِ، وَيُعَمِّقُ، وَيَجْعَلُ فِي اللَّحْدِ، وَيُوضَعُ فِيهِ الْمَيِّتُ، هَذِهِ السُّنَّةُ، أَمَّا إِنْ كَانَتِ الْأَرْضُ رَخْوَةً، ضَعِيفَةً؛ فَلَا مَانِعَ أَنْ يَكُونَ فِيهَا مَا يُثَبِّتُهَا مِنْ أَلْوَاحٍ، أَوْ حَدِيدٍ، أَوْ حَجَرٍ، أَوْ طُوبٍ حَتَّى لَا تَسْقُطَ، وَحَتَّى لَا يُرْقَى الْمَيِّتُ، لَا بَأْسَ بِهَذَا»
“প্রয়োজন দেখা দিলে কবরের মধ্যে পাথর, ইট, কাঠ বা লোহা ব্যবহার করা যেতে পারে; যেমন—মাটি যদি দুর্বল হয় অথবা সেখানে পানি উঠে যায়। এতে কোনও অসুবিধা নেই। তবে মাটি যদি শক্ত হয় তাহলে একজন মানুষের নাভির ওপর পর্যন্ত গভীর করে গর্ত খুঁড়তে হবে এবং লাহাদ (বগল-কবর) তৈরি করে তাতে মৃত ব্যক্তিকে রাখতে হবে। এটাই সুন্নত। আর মাটি যদি নরম ও দুর্বল হয় তবে তা ধসে পড়া ঠেকাতে এবং মৃতদেহ উন্মুক্ত হওয়া রোধ করতে তক্তা, লোহা, পাথর বা ইট দিয়ে তা মজবুত করায় কোনো বাধা নেই। এতে কোনো অসুবিধা নেই।”
ইবনে হাজার আল-হাইসামি (রহ.) বলেন:
«إِنْ خُشِيَ نَبْشُ أَوْ حَفْرُ سَبُعٍ أَوْ هَدْمُ سَيْلٍ، لَمْ يُكْرَهِ الْبِنَاءُ وَالتَّجْصِيصُ»
“যদি আশঙ্কা থাকে যে কোনও হিংস্র প্রাণী কবর খুঁড়ে ফেলবে অথবা বন্যার পানিতে কবর ধসে পড়বে তাহলে কবরের ওপর নির্মাণকাজ করা ও চুন-সুরকি লাগানো অপছন্দনীয় হবে না।” [তুহফাতুল মুহতাজ: ৩/১৯৬] (সূত্র: islamqa.info)
এসব ফতওয়ার ভিত্তি হলো, ইসলামে নিষিদ্ধ কাজ বিশেষ প্রয়োজনে নিষিদ্ধ বিষয়ও সীমিত পরিসরে বৈধ হওয়া, (الضرورة/الحاجة) ও ক্ষতি রোধের নীতি (الضرر يزال)। এসব মূলনীতির আলোকে কবর ধসে লাশ উন্মুক্ত হওয়া বা নষ্ট হওয়া ঠেকানো জরুরি। এ ছাড়াও জীবিত ব্যক্তির মতো মৃত ব্যক্তির সম্মান ও দেহ অক্ষত রাখা শরিয়তে আবশ্যক। তবে অনুমতি কেবল প্রয়োজন মেটানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ; সৌন্দর্যবর্ধন বা জাকজমকের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা যাবে না।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate