August 04, 2026

কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী

 প্রশ্ন: কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী? এতে কি মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়? এ বিষয়ে ফাতাওয়া ইবনু উসাইমীন গ্রন্থের ২৪০ নম্বর ফাতওয়ার অনুবাদ কিংবা মূল ফাতওয়ায় কি কোনো ভুল রয়েছে? একটি গবেষণা ভিত্তিক পর্যালোচনা।

▬▬▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য। অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর, সম্প্রতি এক ভাইকে দেখলাম আমাদের সম্মানিত কয়েকজন তরুণ দাঈ কর্তৃক অনূদিত ফাতাওয়া ইবনু উসাইমীন নামক গ্রন্থের ২৪০ নম্বর ফাতওয়া—যার বিষয় মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছায় কি না—তা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। তিনি প্রথমে দাবি করেন যে ফাতওয়ার অনুবাদে ভুল রয়েছে; কিন্তু কোথায় সেই ভুল হয়েছে জানতে চাওয়া হলে কোনো সুস্পষ্ট ইলমি ব্যাখ্যা উপস্থাপন না করে পরবর্তীতে ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মূল ফাতওয়াকেই ভুল বলে মন্তব্য করেন। অথচ তাঁর বক্তব্য ও আলোচনার ধরন থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এ বিষয়ে তাঁর পর্যাপ্ত ইলম ও গভীর গবেষণার ঘাটতি রয়েছে।কারন বাস্তবতা হলো,ফাতওয়ায় ইবনু উসাইমীন-এর উক্ত ফাতওয়ার অনুবাদে কোনো ভুল প্রমাণিত হয়নি এবং ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতকে সরাসরি ভুল বলা ন্যায়সংগত নয়। কারণ, মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছায় কি না—এটি একটি সুপরিচিত ইজতিহাদি মাসআলা, যাতে প্রাচীন ও সমকালীন বহু আলেমের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই ফাতওয়াটি তাঁর নিজস্ব কোনো ব্যতিক্রমী মত নয়; বরং তাঁর পূর্বেও বহু ইমাম একই মত গ্রহণ করেছেন এবং কুরআন-সুন্নাহ থেকে এর পক্ষে দলিল ও ইলমি যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। তাই এমন একটি ইজতিহাদি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল, গভীর গবেষণা ও পর্যাপ্ত শরঈ জ্ঞান ছাড়া কোনো ফাতওয়ার অনুবাদকে ভুল বলা কিংবা ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতো একজন স্বীকৃত ইমামের ফাতওয়াকে সরাসরি ‘ভুল’ আখ্যায়িত করা ইলম, ইনসাফ ও আদবের পরিপন্থী।একই সঙ্গে এটিও উল্লেখযোগ্য যে, শাইখ ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) নিজে এ আমলকে উত্তম বা অগ্রাধিকারযোগ্য বলেননি; বরং তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, মানুষের উচিত নিজের নেক আমল নিজের জন্য সংরক্ষণ করা এবং মৃতদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা। কেননা, দোয়াই তাদের জন্য নেক আমলের সওয়াব উৎসর্গ করার চেয়ে অধিক উত্তম ও উপকারী। তাই এমন একটি ইজতিহাদি বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল, গভীর গবেষণা ও পর্যাপ্ত শরঈ জ্ঞান ছাড়া কোনো ফাতওয়ার অনুবাদকে ভুল বলা কিংবা ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মতো একজন স্বীকৃত ইমামের ফাতওয়াকে সরাসরি ‘ভুল’ আখ্যায়িত করা ইলম, ইনসাফ ও আদবের পরিপন্থী। আমাদের সেই ভাইয়ের প্রতি আন্তরিক নসীহত হলো—শরঈ বিষয়ে কথা বলার সময় আল্লাহকে ভয় করুন, যথাযথ যাচাই-বাছাই করে কথা বলুন এবং কোনো মতের সমালোচনা করতে চাইলে তা কুরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের আলোকে বিনয়, ইনসাফ ও ইলমি পদ্ধতিতে উপস্থাপন করুন। কারণ, বিশুদ্ধ ইলম ছাড়া শরঈ বিষয়ে মন্তব্য করা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যথাযথ প্রমাণ ব্যতীত কোনো ফাতওয়াকে ভুল হিসেবে প্রচার করা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। তাই কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী, মৃত ব্যক্তি এর দ্বারা উপকৃত হন কি না, এবং এ বিষয়ে ফাতাওয়া ইবনু উসাইমীন গ্রন্থের ২৪০ নম্বর ফাতওয়ার অনুবাদ বা মূল ফাতওয়ায় কোনো ভুল রয়েছে কি না—এসব বিষয় কুরআন, সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের বক্তব্যের আলোকে সংক্ষেপে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করব।
.
◽কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার শরয়ী বিধান কী? এতে কি মৃত ব্যক্তি উপকৃত হয়?
.
প্রথমত: প্রথমেই জানা উচিত, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করলে তা তার কাছে পৌঁছায় কি না—এটি কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত (কাতঈ) দলিল দ্বারা প্রমাণিত এমন কোনো আকীদাগত বিষয় নয়, যার ওপর ঈমান আনা ফরজ; বরং এটি একটি ফিকহি ও ইজতিহাদভিত্তিক মাসআলা, যেখানে যুগে যুগে নির্ভরযোগ্য আহলুস সুন্নাহর আলেমদের মধ্যে মতভেদ বিদ্যমান রয়েছে। তাই এ বিষয়ে আলোচনা, গবেষণা বা মতামত প্রদান করতে হলে কুরআন-সুন্নাহর দলিল, সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং সালাফে সালেহীনের বুঝের আলোকে ইলমী আমানতদারিতা, ইনসাফ ও শরয়ী আদব বজায় রাখা অপরিহার্য। এ ধরনের ইজতিহাদি মতভেদকে আকীদাগত বিরোধে রূপ দেওয়া, কিংবা এর কারণে কাউকে বিদআতী, পথভ্রষ্ট বা আহলুস সুন্নাহর গণ্ডির বাইরে আখ্যায়িত করা মোটেও সঙ্গত নয়। বিশেষত যারা এ মাসআলায় অতি কঠোরতা বা বাড়াবাড়ির পরিচয় দিয়ে নিজেদের মতকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য মনে করে এবং ভিন্নমত পোষণকারী নির্ভরযোগ্য আলেমদের ইজতিহাদকে অবমূল্যায়ন বা নিন্দা করে, তারা ইলমী ইনসাফ ও আহলুস সুন্নাহর আদব থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। অতএব, এ ধরনের ইজতিহাদি মতভেদের ক্ষেত্রে দলিলের অনুসরণ, পারস্পরিক সম্মান, ন্যায়পরায়ণতা এবং শিষ্টাচার বজায় রাখাই একজন তালিবুল ইলম ও আহলুস সুন্নাহর অনুসারীর প্রকৃত বৈশিষ্ট্য।
.
দ্বিতীয়ত: মূলনীতি হলো, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার নিজস্ব আমলের ধারা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যায় এবং তার আমলনামায় নতুন করে কোনো নেকি লিপিবদ্ধ হয় না। তবে শরীয়তে এ মূলনীতির কিছু সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে। সহীহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আল্লাহর ইচ্ছায় জীবিত ব্যক্তির নির্দিষ্ট কিছু নেক আমলের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হতে পারেন এবং তার নিকট সেই আমলের সওয়াব পৌঁছাতে পারে। এ প্রসঙ্গে আবু হুরাইরা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন: “মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি জিনিস ছাড়া: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা উপকার লাভ করা হয় এবং এমন নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহীহ মুসলিম, হা/১৬৩১)। তবে জীবিত ব্যক্তি মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব উৎসর্গ করলে তা মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় কি না—এ বিষয়ে প্রাচীনকাল থেকেই আহলুস সুন্নাহর আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ বিষয়ে তাদের দুটি প্রসিদ্ধ মত রয়েছে। (১). প্রথম মত অনুযায়ী, জীবিত ব্যক্তি মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব উৎসর্গ করলে তা মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে এবং তিনি এর দ্বারা উপকৃত হন। (২). আর দ্বিতীয় মত অনুযায়ী, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলে তা তার নিকট পৌঁছে না; বরং এ ক্ষেত্রে কেবল সেই সব আমলই মৃতের উপকারে আসে, যেগুলোর পক্ষে কুরআন ও সহীহ সুন্নাহয় সুস্পষ্ট দলিল বিদ্যমান।
.
▪️প্রথম মত অনুযায়ী: যারা বলেন যে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে, তারা এ বিষয়ে কুরআন বা সহিহ হাদিস থেকে কোনো সুস্পষ্ট, সহিহ ও সরাসরি দলিল পেশ করতে পারেন না। বরং তাদের মতের ভিত্তি হলো কিয়াস (তুলনামূলক যুক্তি) এবং শরীয়তে প্রমাণিত কিছু সাধারণ নীতিমালা। তাদের বক্তব্য হলো, যেহেতু সহিহ দলিল দ্বারা প্রমাণিত যে মৃত ব্যক্তি জীবিতের দোয়া, সদকা, হজ্জ এবং মান্নতের রোজার মাধ্যমে উপকৃত হয়, তাই কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও তার কাছে পৌঁছানো উচিত। অর্থাৎ, তারা কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানোর জন্য কোনো স্বতন্ত্র ও নির্দিষ্ট দলিল উপস্থাপন করেন না; বরং অন্যান্য ইবাদতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছানোর প্রমাণের ওপর কিয়াস করে এ মত গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে তারা বিশেষভাবে দোয়ার দলিল পেশ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: ﴿رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ﴾ — “হে আমাদের রব! আমাদের এবং আমাদের পূর্ববর্তী মুমিন ভাইদের ক্ষমা করে দিন।” (সূরা আল-হাশর: ১০)। তাদের যুক্তি হলো, যেহেতু দোয়া মৃতের উপকারে আসে, তাই কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও পৌঁছাবে। একইভাবে সহিহ হাদিসে মৃতের পক্ষ থেকে সদকা করা, হজ্জ আদায় করা এবং মান্নতের রোজা পূরণ করার অনুমতি ও তার উপকারিতার কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই তাদের দাবি, যখন এসব ইবাদতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছায়, তখন কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াবও কিয়াসের ভিত্তিতে তার অন্তর্ভুক্ত হবে।এ মতটি হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী মত। এছাড়া কিছু শাফেয়ি আলেম, শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) এবং আরও বহু আলেম এ মতকে সমর্থন করেছেন। এমনকি এটিই জমহুর (অধিকাংশ) আলেমের অভিমত। কিন্তু শাইখ ইবনু উসাইমীন, শাইখ আল-আলবানী প্রমুখ আলেম বলেন, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতকে উৎসর্গ করার পক্ষে সহিহ ও স্পষ্ট কোনো দলিল নেই। তাই এটিকে ইবাদত হিসেবে নিয়মিত করা শরয়িসম্মত নয়। তবে মৃতের জন্য দোয়া, সদকা, হজ ইত্যাদি—যেগুলোর ব্যাপারে সহিহ দলিল রয়েছে—সেগুলোই করা উচিত।
.
আল মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ-এ বলা হয়েছে:
ذهب الحنفية والحنابلة إلى جواز قراءة القرآن للميت وإهداء ثوابها لـه، قال ابن عابدين نقلاً عن البدائع: ولا فرق بين أن يكون المجعول لـه ميتاً أو حياً، والظاهر أنه لا فرق بين أن ينوي به عند الفعل للغير أو يفعل لنفسه، ثم بعد ذلك يجعل ثوابه لغيره.وقال الإمام أحمد: الميت يصل إليه كل شيء من الخير، للنصوص الواردة فيه، ولأن الناس يجتمعون في كل مِصْرٍ، ويقرؤون ويهدون لموتاهم من غير نكير فكان إجماعاً. قاله البهوتي من الحنابلة.
وذهب المتقدمون من المالكية إلى كراهة قراءة القرآن للميت، وعدم وصول ثوابها إليه، لكن المتأخرين على أنه لا بأس بقراءة القرآن والذكر وجعل الثواب للميت ويحصل له الأجر.وقال ابن هلال: الذي أفتى به ابن رشد، وذهب إليه غير واحد من أئمتنا الأندلسيين، أن الميت ينتفع بقراءة القرآن الكريم ويصل إليه نفعه، ويحصل لـه أجره إذا وهب القارئ ثوابه لـه، وبه جرى عمل المسلمين شرقاً وغرباً، ووقفوا على ذلك أوقافاً، واستمر عليه الأمر منذ أزمنة سالفة.والمشهور من مذهب الشافعي أنه لا يصل ثواب القراءة إلى الميت، وذهب بعض الشافعية إلى وصول ثواب القراءة للميت، قال سليمان الجمل: ثواب القراءة للقارئ، ويحصل مثله أيضاً للميت، لكن إن كان بحضرته أو بنيته، أو يجعل ثوابها لـه بعد فراغها على المعتمد في ذلك.
“হানাফি ও হাম্বলি মাযহাবের মত:হানাফি ও হাম্বলি পন্থীগণ মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করা এবং তার সওয়াব তাকে বখশে দেওয়া (দান করা) জায়েয বলে মত দিয়েছেন। ইবনু আবেদীন (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল-বাদায়ে‘’ গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত করে বলেন,যার জন্য সওয়াব দান করা হবে সে ব্যক্তি জীবিত হোক কিংবা মৃত, তাতে কোনো পার্থক্য নেই। তিলাওয়াত করার সময় থেকেই অন্যের জন্য নিয়ত করা কিংবা নিজের জন্য আমল করার পর তার সওয়াব অন্যকে দান করা—উভয় পদ্ধতির মাঝেই দৃশ্যত কোনো পার্থক্য নেই।ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: মৃত ব্যক্তির কাছে সব ধরনের নেক আমলের সওয়াব পৌঁছে। কারণ এ বিষয়ে বিভিন্ন দলিল রয়েছে। তাছাড়া মুসলমানরা সব যুগে ও সব দেশে একত্র হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করে তাদের মৃতদের সওয়াব দান করে আসছে,অথচ এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত বা অস্বীকৃতি জানা যায়নি; সুতরাং এটি ইজমা (ঐকমত্য) হিসেবে গণ্য।” কথাটি হাম্বলি আলেম আল-বাহূতি (রাহিমাহুল্লাহ) উল্লেখ করেছেন।
মালিকি মাযহাবের মত: প্রাচীন মালিকি আলেমদের মতে, মৃতের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরূহ এবং এর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় না। তবে পরবর্তী মালিকি আলেমদের মতে, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ইত্যাদি করে তার সওয়াব মৃতকে দান করতে কোনো অসুবিধা নেই এবং মৃত ব্যক্তি এর দ্বারা উপকৃত হন।ইবনু হিলাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ইবনু রুশদ (রাহিমাহুল্লাহ) যে ফতোয়া দিয়েছেন এবং আন্দালুসের আমাদের বহু ইমাম যে মত গ্রহণ করেছেন তা হলো মৃত ব্যক্তি পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের উপকার লাভ করেন এবং তিলাওয়াতকারী যদি তার সওয়াব মৃতকে তাকে দান করেন, তবে সে সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে। পূর্ব ও পশ্চিমের মুসলিম উম্মাহর সর্বযুগের আমল এর ওপরই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এ ব্যাপারে তারা ওয়াকফ বা endowments নির্ধারণ করেছেন এবং সুদূর অতীত থেকেই এই ধারাবাহিকতা চলে আসছে।
শাফেয়ি মাযহাবের মত: প্রসিদ্ধ শাফেয়ি মত অনুযায়ী, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় না।তবে শাফেয়ি মাযহাবের কিছু আলেম বলেন, কুরআনের তিলওয়াতের সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে।সুলাইমান জামাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:তিলওয়াতের মূল সওয়াব তো তিলাওয়াতকারীর জন্যই। তবে নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী,যদি মৃত ব্যক্তির উপস্থিতিতে তিলাওয়াত করা হয়, অথবা তার জন্য নিয়ত করা হয়, কিংবা তিলাওয়াত শেষ করে তার সওয়াব মৃতকে দান করা হয়, তাহলে নির্ভরযোগ্য মত অনুযায়ী মৃতও অনুরূপ সওয়াব লাভ করবেন।”(আল-মাওসূ‘আতুল ফিক্বহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ; খণ্ড: ৩৩; পৃষ্ঠা:  ৬০)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] তাঁর আল মুগনী গ্রন্থে মৃতের কাছে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানোর পক্ষে কিছু দলিল উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন:وهذه أحاديث صحاح، وفيها دلالة على انتفاع الميت بسائر القرب، لأن الصوم والحج والدعاء والاستغفار عبادات بدنية قد أوصل الله نفعها إلى الميت، فكذلك ما سواها مع ما ذكرنا من الحديث في ثواب من قرأ سورة (يس) وتخفيف الله -تعالى- عن أهل المقابر بقراءته، ولأنه إجماع المسلمين، فإنهم في كل عصر ومصر يجتمعون ويقرأون القرآن ويهدون ثوابه إلى موتاهم من غير نكير”এগুলো সহীহ হাদিস। এগুলো থেকে প্রমাণিত হয় যে, মৃত ব্যক্তি অন্যান্য নেক আমলের দ্বারাও উপকৃত হয়। কারণ, রোজা, হজ, দোয়া ও ইস্তিগফার এসব শারীরিক ইবাদতের উপকারও আল্লাহ মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছে দেন। সুতরাং অন্যান্য ইবাদতও একইভাবে পৌঁছবে। এছাড়া সূরা ইয়াসীন পাঠের সওয়াব এবং তা পাঠ করার কারণে কবরবাসীদের শাস্তি লাঘব হওয়ার যে হাদিস বর্ণিত হয়েছে, সেটিও এর পক্ষে উল্লেখযোগ্য। আরও কারণ হলো, এটি মুসলিমদের ধারাবাহিক আমল। কেননা, প্রত্যেক যুগে ও প্রত্যেক দেশে মুসলিমরা একত্রিত হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করেছেন এবং তার সওয়াব তাদের মৃতদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছেন; এ বিষয়ে কোনো আপত্তি বা অস্বীকৃতি দেখা যায়নি।”(ইবনু কুদামাহ আল মুগনী; খণ্ড: ২; পৃষ্ঠা: ৫৬৮)
.
হানাফী ফকীহগণও স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃতের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলে মৃত ব্যক্তি তা দ্বারা উপকৃত হন। (আদ দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার-এ বলা হয়েছেويقرأ سورة (يس) لما ورد: من دخل المقابر فقرأ سورة (يس) خفف الله عنهم يومئذ، وكان له بعدد من فيها حسنات”সূরা ইয়াসীন পাঠ করবে। কারণ, বর্ণিত হয়েছে: যে ব্যক্তি কবরস্থানে প্রবেশ করে সূরা ইয়াসীন পাঠ করবে, আল্লাহ সেদিন কবরবাসীদের শাস্তি হালকা করে দেবেন এবং পাঠকারীর জন্য সেখানে সমাহিত ব্যক্তিদের সংখ্যার সমপরিমাণ নেকি লেখা হবে। (আদ দুররুল মুখতার ও রদ্দুল মুহতার: ২/২৪৩)
.
মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত সম্পর্কে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:إن ثوابها يصل إليه فقد ذكر أن في هذه المسألة قولين للعلماء، ثم رجح القول بوصول ثواب قراءة القرآن للميت فقال -رحمه الله- تعالى: “وأما الصيام، وصلاة التطوع، وقراءة القرآن فهذا فيه قولان للعلماء:الأول:- ينتفع به وهو مذهب أحمد وأبي حنيفة وغيرهما.الثاني: لا تصل إليه وهو المشهور في مذهب مالك.ثم قال –رحمه الله- في فتوى له: وتنازعوا في وصول الأعمال البدنية: كالصوم والصلاة وقراءة القرآن، والصواب أن الجميع يصل إليه، أي يصل ثوابها إلى الميت”নিশ্চয়ই মৃত ব্যক্তির জন্য কুরআন তিলাওয়াত করলে তার সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছে। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। এরপর তিনি মৃতের কাছে কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছায় এই মতকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তিনি বলেন: আর রোজা, নফল সলাত এবং কুরআন তিলাওয়াত এগুলো সম্পর্কে আলেমদের দুটি মত রয়েছে। প্রথম মত: এগুলোর সওয়াব মৃত ব্যক্তি লাভ করে। এটি ইমাম আহমাদ, ইমাম আবু হানিফা এবং আরও অনেক আলেমের মত। দ্বিতীয় মত: এগুলোর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় না। এটি ইমাম মালিকের মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত।এরপর তিনি অন্য এক ফতোয়ায় বলেন: শারীরিক ইবাদত যেমন রোজা, সলাত এবং কুরআন তিলাওয়াত এর সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছায় কি না, এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ রয়েছে। তবে সঠিক মত হলো, এসব ইবাদতের সওয়াবই মৃতের কাছে পৌঁছে।”(মাজমূউল ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৪; পৃষ্ঠা: ৩১৫ ও ৩৬৬)
.
আর ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: والعبادات قسمان : مالية وبدنية ، وقد نبه الشارع بوصول ثواب الصدقة على وصول سائر العبادات المالية ، ونبه بوصول ثواب الصوم على وصول سائر العبادات البدنية وأخبر بوصول ثواب الحج المركب من المالية والبدنية، فالأنواع الثلاثة ثابتة بالنص والاعتبار .”ইবাদত মূলত দুই প্রকার (১) আর্থিক ইবাদত এবং (২) শারীরিক ইবাদত। শরীয়ত সদকার সওয়াব মৃতের কাছে পৌঁছানোর কথা বলে অন্যান্য আর্থিক ইবাদতের সওয়াবও পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। আবার রোজার সওয়াব পৌঁছানোর কথা বলে অন্যান্য শারীরিক ইবাদতের সওয়াবও পৌঁছানোর ইঙ্গিত দিয়েছে। আর হজ যা আর্থিক ও শারীরিক উভয় ধরনের ইবাদতের সমন্বয় তার সওয়াবও পৌঁছায় বলে জানিয়েছে। সুতরাং এই তিন প্রকার ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানো কুরআন-সুন্নাহর দলিল এবং সঠিক কিয়াস উভয় দ্বারাই প্রমাণিত।”(কিতাবুর রূহ পৃষ্ঠা: ৪৮)
.
তবে এ মতের আলেমগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানোর কথা ধরা হলেও, তিলাওয়াত অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হতে হবে; এর বিনিময়ে পারিশ্রমিক বা কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ গ্রহণ করা যাবে না। কারণ অর্থের বিনিময়ে কুরআন তিলাওয়াত করলে সেই আমলে কোনো সওয়াব অবশিষ্ট থাকে না। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,وأما الاستئجار لنفس القراءة –أي قراءة القرآن – والإهداء، فلا يصح ذلك، لأنه لا يجوز إيقاعها إلا على وجه التقرب إلى الله تعالى، وإذا فعلت بعروض لم يكن فيها أجر بالاتفاق، لأن الله تعالى إنما يقبل من العمل ما أريد به وجهه لا ما فعل لأجل عروض الدنيا.ثم قال – رحمه الله تعالى-: وأما إذا كان لا يقرأ القرآن إلا لأجل العروض – أي الأعواض المادية – فلا ثواب له على ذلك، وإذا لم يكن في ذلك ثواب فلا يصل إلى الميت شيء؛ لأنه إنما يصل إلى الميت ثواب العمل لا نفس العمل ..”শুধু কুরআন তিলাওয়াতের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ নয়। কেননা এ ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই নিবেদিত হওয়া উচিত। যদি তা দুনিয়াবি লাভের উদ্দেশ্যে করা হয়, তবে সর্বসম্মতিক্রমে এতে কোনো সওয়াব থাকে না; কারণ আল্লাহ কেবল সেই আমলই কবুল করেন, যা একনিষ্ঠভাবে তাঁর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত হয়। তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি কেবল অর্থের বিনিময়ে কুরআন তিলাওয়াত করে, সে নিজেই এ তিলাওয়াতের কোনো সওয়াব পাবে না। আর যখন তার নিজেরই কোনো সওয়াব থাকবে না, তখন মৃতের কাছেও কিছু পৌঁছাবে না। কেননা মৃতের নিকট পৌঁছে আমলের সওয়াব, আমলটি নিজে নয়।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মৃতের কবরের কাছে অথবা তার রূহের উদ্দেশ্যে কুরআন পড়ার জন্য কাউকে পারিশ্রমিক দিয়ে নিয়োগ করার হুকুম কী?
উত্তরে তারা বলেন: (لا يجوز استئجار من يقرأ القرآن على قبر الميت أو على روحه، ويهب ثوابه للميت؛ لأنه لم يفعله النبي – صلى الله عليه وسلم -، ولا أحدٌ من السَّلف، ولا أمر به أحد من أئمة الدين، ولا رخص فيه أحد منهم فيما نعلم، والاستئجار على نفس التلاوة غير جائز بلا خلاف) “মৃতের কবরের কাছে বা তার রূহের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব মৃতকে দান করার জন্য কাউকে ভাড়া করা বৈধ নয়।কারণ,রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এটি করেননি, সালাফে সালেহীনদের কেউও করেননি। দ্বীনের কোনো ইমাম এ কাজের নির্দেশ দেননি, এবং আমাদের জানা মতে কেউ এর অনুমতিও দেননি। বিশেষ করে কেবল কুরআন তিলাওয়াতের জন্য পারিশ্রমিক গ্রহণ বা দেওয়া এটি সর্বসম্মতিক্রমে অবৈধ।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৯;পৃষ্ঠা: ৩৫–৪১)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন: ولكن استئجار من يقرأ القرآن له هذا هو الذي يكون حراما، لأن قراءة القرآن قربة، والقربة لا يصح أخذ الأجرة عليها، فلو استأجروا شخصا يقرأ القرآن للميت فإن عقد الإجارة محرم، والقارئ لا يملك الأجرة بذلك، وليس له ثواب من قراءته، لأنه أراد بها غير وجه الله، والميت لا ينتفع بها حينئذ، لأنها ليست مقبولة يترتب عليها الأجر والثواب، وحينئذ يكون أهل الميت الذين بذلوا هذه الدراهم خاسرين، وقد فات الميت ما يرجونه من الثواب”তবে মৃতের জন্য কুরআন পড়ার উদ্দেশ্যে কাউকে পারিশ্রমিক দিয়ে নিয়োগ করা হারাম। কারণ, কুরআন তিলাওয়াত একটি ইবাদত, আর ইবাদতের বিনিময়ে পারিশ্রমিক গ্রহণ করা বৈধ নয়। যদি কেউ মৃতের জন্য কুরআন পড়ার উদ্দেশ্যে কাউকে ভাড়া করে, তাহলে সেই চুক্তি শরিয়তসম্মত নয়। এভাবে পাঠকারী ব্যক্তি ওই পারিশ্রমিকের অধিকারী নয় এবং তার তিলাওয়াতেরও কোনো সওয়াব হবে না। কারণ, সে আল্লাহর সন্তুষ্টি নয়, বরং দুনিয়াবি লাভের উদ্দেশ্যে তিলাওয়াত করেছে।ফলে মৃত ব্যক্তিও এর দ্বারা উপকৃত হবে না। কেননা, এ তিলাওয়াত আল্লাহর কাছে কবুল হয় না, আর কবুল না হলে এর ওপর কোনো সওয়াবও নির্ধারিত হয় না।সুতরাং মৃতের স্বজনরা যারা এ অর্থ ব্যয় করেছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর মৃত ব্যক্তিও যে সওয়াবের আশা তারা করেছিল, তা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১৬২)
.
শাইখ বকর ইবনে আব্দুল্লাহ আবু যায়েদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:عند حديثه عن المحدثات فائدة هذا نصها:(استئجار شخص أو أكثر لقراءة القرآن، وإهداء ثوابها لميت أو حي، وهذا عمل مبتدع، وقد فات ثواب القراءة على القارئ لما فيه من إرادة الإنسان بعمله الدنيا، وفات على المستأجر؛ لأنه عمل مبتدع، وقد قال – صلى الله عليه وسلم -:”من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد”)”একজন বা একাধিক ব্যক্তিকে পারিশ্রমিক দিয়ে কুরআন তিলাওয়াত করানো এবং সেই তিলাওয়াতের সওয়াব কোনো মৃত বা জীবিত ব্যক্তিকে দান করা একটি বিদআত। এতে তিলাওয়াতকারীর সওয়াব নষ্ট হয়ে যায়, কারণ সে তার আমলের মাধ্যমে দুনিয়াবি স্বার্থ কামনা করেছে। আর যে ব্যক্তি তাকে ভাড়া করেছে, সেও সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়, কারণ সে একটি বিদআতী কাজ করেছে। নবী (ﷺ) বলেছেন:”যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন কোনো নতুন বিষয়ের অবতারণা করে যা তার অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”(সহীহ বুখারী: ২৬৯৭, সহীহ মুসলিম: ১৭১৮)
.
বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: রমজানে আমি যদি কুরআন তিলাওয়াত করে তার সওয়াব কোনো মৃত ব্যক্তিকে দান করি, অথবা তার পক্ষ থেকে তাওয়াফ করি এটি কি জায়েয?
উত্তরে শাইখ রাহিমাহুল্লাহ বলেন:هذا يعني أنك تعمل عملاً صالحاً وتجعل ثوابه لشخص ميت، والجواب أن ذلك لا بأس به، فإذا أراد شخص أن يصلي ويجعل ثوابها لميته، أو يتصدق، أو يحج، أو يقرأ القرآن، أو يصوم، ويجعل ثواب ذلك لميته فلا بأس به. وذلك لما ورد في الحديث الصحيح أن رجلاً أتى رسول الله – صلى الله عليه وسلم- فقال: يا رسول الله، إن أمي افتُلتت نفسها، وإنها لو تكلمت لتصدقت أفأتصدق عنها؟ قال: «نعم». وكذلك أذن لسعد بن عبادة – رضي الله عنه- أن يتصدق لأمه، وسائر العبادات كالصدقة إذ لا فرق بينهما. والنبي – صلى الله عليه وسلم- لم يرد عنه نص يمنع مثل ثواب هذه للميت، حتى نقول: إننا نقتصر على ما ورد، فإذا جاءت السنة بجنس العبادات فإنه يكون المسكوت عنه مثل المنطوق به، لاسيما وأن هذا ليس بنطق من الرسول – صلى الله عليه وسلم-، بل إنه استفتاء في قضايا أعيان، وإفتاء الرسول – صلى الله عليه وسلم- بأنه يجوز أن يتصدق الإنسان عن أمه لا يدل على أن ما سواه ممنوع. ولكن الذي أرى أن يجعل الإنسان العمل الصالح لنفسه، وأن يدعو لأمواته، فالدعاء أفضل من التبرع لهم، لأن النبي – صلى الله عليه وسلم- قال: «إذا مات الإنسان انقطع عمله إلا من ثلاث: إلا من صدقة جارية، أو علم ينتفع به، أو ولد صالح يدعو له»، ولم يقل: يتعبد له. وبناء على ذلك فالدعاء لأبيك، أو لأمك أفضل من أن تهدي لهم الصلاة، أو القرآن، أو ما أشبه ذلك، واجعل الأعمال لنفسك كما أرشد إلى ذلك رسول الله – صلى الله عليه وسلم-. والله الموفق”এর অর্থ হলো, আপনি একটি নেক আমল করে তার সওয়াব একজন মৃত ব্যক্তিকে দান করছেন।এর জবাব হলো: এতে কোনো অসুবিধা নেই। অতএব, কেউ যদি নামাজ পড়ে, সদকা করে, হজ করে, কুরআন তিলাওয়াত করে অথবা রোজা রেখে তার সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে দান করতে চায়, তবে এতে কোনো দোষ নেই। কারণ, সহিহ হাদিসে এসেছে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছে এসে বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমার মা হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি মনে করি, যদি তিনি কথা বলতে পারতেন, তবে সদকা করতেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে সদকা করব? তিনি বললেন: হ্যাঁ। এছাড়া তিনি সা‘দ ইবনু উবাদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কেও তাঁর মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করার অনুমতি দিয়েছিলেন। অন্যান্য ইবাদতও সদকার মতোই, এদের মধ্যে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। নবী (ﷺ) থেকে এমন কোনো সহিহ বর্ণনা নেই, যা মৃতকে কুরআন বা অন্যান্য নেক আমলের সওয়াব পৌঁছানো নিষিদ্ধ করে। তাই আমরা শুধু বর্ণিত কয়েকটি ইবাদতেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখব এমন কথা বলা সঠিক নয়। বরং যখন সুন্নাহ একটি শ্রেণির ইবাদতের সওয়াব পৌঁছানোর প্রমাণ দিয়েছে, তখন একই ধরনের অন্যান্য ইবাদতও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। বিশেষ করে এগুলো রাসূল ﷺ -এর নিজ উদ্যোগে বলা কথা নয় বরং নির্দিষ্ট ঘটনার প্রশ্নের উত্তরে দেওয়া ফতোয়া। সুতরাং তিনি যখন মায়ের পক্ষ থেকে সদকা করার অনুমতি দিয়েছেন, তখন তা থেকে অন্য ইবাদত নিষিদ্ধ এ কথা প্রমাণিত হয় না। তবে আমার (শাইখ ইবনু উসাইমীনের) অভিমত হলো: মানুষের উচিত নিজের নেক আমল নিজের জন্য রাখা এবং মৃতদের জন্য বেশি বেশি দোয়া করা। কারণ দোয়া, তাদের জন্য নেক আমলের সওয়াব দান করার চেয়ে উত্তম। নবী (ﷺ) বলেছেন: মানুষ মারা গেলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি জিনিস ব্যতীত: সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে। তিনি বলেননি যে তার জন্য ইবাদত করবে। অতএব, আপনার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করা তাদের উদ্দেশ্যে নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত বা অনুরূপ ইবাদতের সওয়াব দান করার চেয়ে উত্তম। আর নিজের নেক আমল নিজের জন্য রাখুন যেমনটি রাসূলুল্লাহ সা. এর দিকনির্দেশনা থেকে প্রতীয়মান হয়। আল্লাহ তাআলা তাওফীকদাতা।”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল; খণ্ড: ১৭; পৃষ্ঠা: ২৫৩–২৫৪)। এটিই ফাতওয়ায় ইবনু উসাইমীনে রয়েছে।যেটা সম্পর্কে পোস্টকারী উক্ত ফাতওয়াটি সঠিকভাব না বুঝে মন্তব্য করেছেন। শাইখ এখানে মৃত ব্যক্তির জন্য নেক আমলের সওয়াব পৌঁছানোর বিষয়ে একটি মত উল্লেখ করেছেন। তবে তিনি এটিকে সুন্নাহর নির্দেশিত সর্বোত্তম পদ্ধতি হিসেবে বলেননি। বরং ফাতওয়ার শেষাংশে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, মানুষের উচিত নিজের নেক আমল নিজের জন্য রাখা এবং মৃত ব্যক্তির জন্য বেশি বেশি দোয়া করা; কারণ রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মৃতের জন্য দোয়া করার বিষয়টিই উল্লেখ করেছেন। অতএব, শাইখ রাহিমাহুল্লাহ এখানে সরাসরি এ কথা বলেননি যে, মৃতের উদ্দেশ্যে কুরআন তিলাওয়াত করলে অবশ্যই সওয়াব পৌঁছে যায়; বরং তিনি একটি মত উল্লেখ করার পর দোয়ার শ্রেষ্ঠত্বের দিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তাই কোনো আলেমের বক্তব্য বুঝতে হলে পুরো ফাতওয়া ও প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা জরুরি।
.
▪️দ্বিতীয় মত অনুযায়ী: কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় না। এ মতের মূল ভিত্তি হলো—এর পক্ষে সরাসরি কোনো সহীহ দলিল নেই তাছাড়া রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনো কুরআন তিলাওয়াত করে তাঁর কোনো নিকটাত্মীয় বা অন্য কোনো মৃত মুসলিমের উদ্দেশ্যে সাওয়াব উৎসর্গ করেননি। যদি এ আমলের মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হতো, তবে সর্বপ্রথম রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজেই তা করতেন এবং উম্মতকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিতেন। কারণ তিনি ছিলেন উম্মতের প্রতি অত্যন্ত দয়ালু ও কল্যাণকামী। একইভাবে খুলাফায়ে রাশেদীন ও অন্যান্য সাহাবায়ে কিরাম (রাদিয়াল্লাহু আনহুম)ও তাঁর যথাযথ অনুসরণ করেছেন; অথচ তাঁদের কারো থেকেই কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতের উদ্দেশ্যে সাওয়াব বখশে দেওয়ার কোনো সহীহ প্রমাণ বর্ণিত হয়নি। তাই এ মতের আলেমগণ এটিকে বিদআতী আমল বলে মনে করেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “তোমরা নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ থেকে সতর্ক থাকো; কেননা প্রত্যেক নব উদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” (আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; মুসনাদ আহমাদ, হা/১৭১৮৫)। যদিও এটি তুলনামূলকভাবে অল্পসংখ্যক আলেমের মত, তবুও দলিলের বিচারে এটিই অধিক বিশুদ্ধ মত। তাঁদের যুক্তি হলো, কুরআন তিলাওয়াত জীবিত ব্যক্তির নিজস্ব আমল; এটি মৃত ব্যক্তির আমল নয়। তাই এর সাওয়াব মূলত তিলাওয়াতকারীর জন্যই নির্ধারিত। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ﴿وَأَن لَّيۡسَ لِلۡإِنسَٰنِ إِلَّا مَا سَعَىٰ﴾ — “আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।” (সূরা আন-নাজম: ৩৯)। অতএব, এ মত অনুযায়ী জীবিত ব্যক্তি নিজের কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব অন্যের, বিশেষত মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে দেওয়ার শরয়ী অধিকার রাখে না।এ মতটি মালিকী মাযহাবের প্রসিদ্ধ মত, শাফেয়ী মাযহাবের একদল আলেম, সৌদি আরবের স্থায়ী ফাতওয়া কমিটি (আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহ), শাইখ আল-আলবানী (রহিমাহুল্লাহ), শাইখ সালিহ আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) প্রমুখ সমসাময়িক আলেমের অভিমত; দলিলের বিচারে অনেক মুহাক্কিক আলেম এটিকেই অধিক বিশুদ্ধ মত হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: কুরআন তিলাওয়াত ও অন্যান্য ইবাদাতের সাওয়াব কি মৃতদের নিকট পৌঁছে? মৃত ব্যক্তির সন্তান বা যার পক্ষ থেকেই হোক? উত্তরে তারা বলেছেন: আমরা যতদূর জানি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরআন তিলাওয়াত করে নিকট আত্মীয় বা অন্য কোনো মৃত ব্যক্তির জন্য ঈসালে সাওয়াব করেন নি। তিলাওয়াতের সাওয়াব যদি মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছত বা এর দ্বারা সে কোনোভাবে উপকৃত হত, তাহলে অবশ্যই তিনি তা করতেন, উম্মতকে বাতলে দিতেন, যেন তাদের মৃতরা উপকৃত হয়। তিনি ছিলেন মুমিনদের ওপর দয়ালু ও অনুগ্রহশীল। তাঁর পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদীন ও সকল সাহাবায়ে কেরাম তার যথাযথ অনুসরণ করেছেন, (আল্লাহ তাদের সকলের ওপর সন্তুষ্ট হোন) আমাদের জানা মতে তারা কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে ঈসালে সাওয়াব করেন নি। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের আদর্শ অনুসরণ করাই আমাদের জন্য কল্যাণ। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:«اياكم ومحدثات الامور فان كل محدثة بدعة، وكل بدعة ضلالة‏»“খবরদার! তোমরা নতুন আবিষ্কৃত বস্তু থেকে সতর্ক থেকো, কারণ প্রত্যেক নতুন আবিষ্কৃত বস্তু বিদ’আত, আর প্রত্যেক বিদ’আত গোমরাহী ও পথভ্রষ্টতা।”(আবু দাউদ, হাদীস নং ৩৯৯৩) তিনি অন্যত্র বলেন:«من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فهو رد‏»“যে আমাদের এ দীনে এমন কিছু আবিষ্কার করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা পরিত্যক্ত।”(সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৫১২; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৩২৪৮) তাই আমরা বলি, মৃতদের জন্য কুরআন তিলাওয়াত করা বা করানো জায়েয নয়, এর সাওয়াব তাদের নিকট পৌঁছে না, বরং এটা বিদ’আত। এ ছাড়া যেসব ইবাদাতের সাওয়াব মৃতদের নিকট পৌঁছে মর্মে বিশুদ্ধ দলীল রয়েছে তা অবশ্য গ্রহণীয়। যেমন, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে সদকা ও হজ করা মর্মে বিশুদ্ধ দলীল রয়েছে। আর যে সব বিষয়ে কোনো দলীল নেই তা বৈধ নয়। তাই প্রমাণিত হলো, কুরআন তিলাওয়াত করে মৃতদের ঈসালে সাওয়াব করা বৈধ নয়, তাদের নিকট এর সাওয়াব পৌঁছায় না, বরং এটা বিদ’আত। এটাই আলেমদের বিশুদ্ধ অভিমত। আর আল্লাহই ভালো জানেন।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৯; পৃষ্ঠা: ৪৪-৪৬ ফাতওয়া নং-২২৩২)
.
সৌদি ফতোয়া বোর্ডের বর্তমান গ্র্যান্ড মুফতি,যুগশ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম সালিহ বিন ফাওযান আল-ফাওযান (হাফিযাহুল্লাহ) [জন্ম: ১৩৫৪ হি./১৯৩৫ খ্রি.]-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: জীবিতদের পক্ষ থেকে মৃত ব্যক্তি কোন কোন আমলের দ্বারা উপকৃত হন? শারীরিক ইবাদত ও আর্থিক ইবাদতের মধ্যে কি কোনো পার্থক্য আছে? এ বিষয়ে একটি মূলনীতি জানিয়ে দিন।
তিনি উত্তর দেন:ينتفع الميت من الحي بما دل عليه الدليل من الدعاء له والاستغفار له والتصدق عنه والحج عنه والعمرة عنه وقضاء الديون التي عليه وتنفيذ وصاياه الشرعية ، كل ذلك قد دلت الأدلة على مشروعيته‏ .وقد ألحق بها بعض العلماء كل قربة فعلها مسلم وجعل ثوابها لمسلم حي أو ميت‏ ،‏ والصحيح الاقتصار على ما ورد به الدليل ، ويكون ذلك مخصصًا لقوله تعالى‏ : ( وَأَنْ لَيْسَ لِلإِنْسَانِ إِلا مَا سَعَى )”মৃত ব্যক্তি জীবিতদের পক্ষ থেকে কেবল সেই সব আমলের মাধ্যমে উপকৃত হন, যেগুলোর ব্যাপারে শরিয়তের দলিল এসেছে। যেমন,তার জন্য দোয়া করা, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা,তার পক্ষ থেকে সদকা করা, তার পক্ষ থেকে হজ করা,তার পক্ষ থেকে উমরা করা, তার ওপর থাকা ঋণ পরিশোধ করা, এবং তার বৈধ ওসিয়ত বাস্তবায়ন করা।এসবের বৈধতার ব্যাপারে শরিয়তের সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে।কিছু আলেম এ সবের সঙ্গে আরও প্রতিটি নেক আমলকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যদি কোনো মুসলিম তার সওয়াব জীবিত বা মৃত অন্য মুসলিমকে দান করে।কিন্তু সঠিক মত হলো, কেবল যেসব বিষয়ে শরিয়তের দলিল এসেছে, সেগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা। এটাই আল্লাহ তাআলার এই বাণীর ব্যাখ্যা ও বিশেষীকরণ:মানুষ কেবল সেই আমলেরই অধিকারী, যার জন্য সে নিজে চেষ্টা করেছে। (সূরা নাজম: ৩৯; আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়াস শাইখ সালিহ আল-ফাওযান; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৬১)
.
শাইখ (হাফিজাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: জীবিত ও মৃত অবস্থায় পিতা-মাতার জন্য কোন কোন আমল তাদের উপকারে আসে?
তিনি উত্তরে বলেন:الأعمال هي : برهما في حياتهما ، والإحسان إليهما بالقول والعمل ، والقيام بما يحتاجانه من النفقة والسكن وغير ذلك والأنس بهما ، والكلام الطيب معهما وخدمتهما ؛ لقوله تعالى ‏:‏ ( وَقَضَى رَبُّكَ أَلا تَعْبُدُوا إِلا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا) الإسراء‏/‏ 23‏ ،‏ خصوصًا في كبرهما ، أما بعد الممات : فإنه يبقى من برهما أيضًا الدعاء ، والصدقة لهما ، والحج والعمرة عنهما ، وقضاء الديون التي في ذمتهما ، وصلة الرحم المتعلقة بهما ، وكذلك برُّ صديقهما ، وتنفيذ وصاياهما المشروعة‏ “কাজগুলো হলো: জীবিত অবস্থায় পিতা মাতার প্রতি উত্তম আচরণ করা, কথা ও কাজে তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা, তাদের প্রয়োজনীয় খরচ, বাসস্থান ও অন্যান্য চাহিদা পূরণ করা, তাদের সঙ্গ দেওয়া, তাদের সঙ্গে কোমল ও সুন্দর ভাষায় কথা বলা এবং তাদের সেবা করা এসবই তাদের প্রতি সদাচরণের অন্তর্ভুক্ত।কারণ আল্লাহ তাআলা বলেছেন:”আর আপনার রব ফায়সালা করেছেন যে, আপনারা কেবল তাঁরই ইবাদত করবেন এবং পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করবেন”।(সূরা ইসরা: ২৩) বিশেষ করে যখন তারা বার্ধক্যে উপনীত হন। আর মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি সদাচরণ অব্যাহত থাকে। যেমন তাদের জন্য দোয়া করা, তাদের পক্ষ থেকে সদকা করা, তাদের পক্ষ থেকে হজ ও উমরা আদায় করা, তাদের ঋণ পরিশোধ করা, তাদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত আত্মীয়দের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের বন্ধুদের সম্মান ও সদ্ব্যবহার করা,এবং তাদের বৈধ অসিয়ত বাস্তবায়ন করা।”(আল-মুনতাক্বা মিন ফাতাওয়াস শাইখ সালিহ আল-ফাওযান; খন্ড: ২; পৃষ্ঠা: ১৬২)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা পরিষ্কার যে, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব মৃত ব্যক্তিকে উৎসর্গ করলে মৃত ব্যক্তি উপকৃত হবে কিনা—এটি একটি ইজতিহাদি ফিকহি মাসআলা, যেখানে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম তা বৈধ বলেছেন, আবার অন্যদল বলেছেন এর পক্ষে সুস্পষ্ট দলিল নেই। শাইখ ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ফাতওয়ায় কোনো ভুল নেই; তিনি একটি মত উল্লেখ করার পাশাপাশি মৃতের জন্য দোয়াকে অধিক উত্তম বলেছেন। তাই এ বিষয়ে মতভেদকে সম্মান করা, আলেমদের বক্তব্য ইনসাফের সঙ্গে বোঝা এবং কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত আমল যেমন দোয়া, সদকা ইত্যাদির প্রতি গুরুত্ব দেওয়াই উচিত। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬
আপনাদের দ্বীনি ভাই: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

যে ব্যক্তি জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয় করে হোক তা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য হোক বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে

 প্রশ্ন: যে ব্যক্তি জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয় করে হোক তা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে—শরীয়তের দৃষ্টিতে তার এ কাজের বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য। অগণিত দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর, জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের বিষয়টি বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী একটি মাসআলা। আমাদের সমাজে চুরির ঘটনা দিন দিন উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত ব্যবহার কিংবা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের প্রবণতাও কম নয়। অনেকেই কম দামে পণ্য পাওয়ার লোভে এ ধরনের লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন, আবার অনেকে শরীয়তের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে এমন কাজকে তেমন গুরুতর মনে করেন না। অথচ বাস্তবে চোরের কাছ থেকে চুরিকৃত পণ্য ক্রয় করা কেবল একটি অবৈধ লেনদেনই নয়; বরং এটি চুরি, জুলুম ও অন্যায়কে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা এবং অপরাধীদের উৎসাহিত করার শামিল। এর ফলে মানুষের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, সমাজে অপরাধের বিস্তার ঘটে এবং পারস্পরিক আস্থা ও নিরাপত্তাবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই এ বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান জানা, এ ধরনের হারাম লেনদেন থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং সমাজে ন্যায়, ইনসাফ ও মানুষের সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে শরীয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
.
প্রথমত: মূলনীতি হলো চুরি করা পণ্য ক্রয় করা শরীয়তসম্মত নয়; যদিও তা কোনো কাফিরের কাছ থেকে চুরি করা হয়ে থাকে। কারণ চুরিকৃত সম্পদ সত্তাগতভাবেই হারাম এবং তা কারও জন্য বৈধভাবে অধিকারে নেওয়া জায়েয নয়—চাই তা ক্রয়ের মাধ্যমে হোক, উপহার (হেবা) হিসেবে হোক কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রেই হোক।সুতরাং যে ব্যক্তি জানে যে সে যে পণ্যটি কিনতে যাচ্ছে তা চুরি করা, তার ওপর ওয়াজিব হলো চোরকে এ অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে উৎসাহিত করা, তাকে আল্লাহর কাছে আন্তরিক তওবার উপদেশ দেওয়া এবং চুরি করা সম্পদ তার প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে উদ্বুদ্ধ করা। যদি মালিকের পরিচয় জানা থাকে এবং তা সম্ভব হয়, তবে পণ্যটি তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা, অথবা অন্তত তাকে কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা আবশ্যক। পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয় করেছে, সে কবিরা গুনাহগার হয়েছে। তার তওবা তখনই পূর্ণতা লাভ করবে, যখন সে চুরিকৃত সম্পদ প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেবে এবং যে চোরের কাছ থেকে পণ্যটি কিনেছিল তার কাছ থেকে পরিশোধিত অর্থ ফেরত নেবে। কারণ, চোরের কাছ থেকে পণ্য ক্রয় করা মূলত তাকে পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করা, তার অপরাধকে উৎসাহিত করা এবং অন্যায় প্রতিরোধের ইসলামী দায়িত্ব পরিত্যাগ করার শামিল।তদুপরি,শরীয়তসম্মত ক্রয়-বিক্রয়ের মৌলিক শর্তগুলোর একটি হলো—বিক্রেতা বিক্রিত বস্তুর বৈধ মালিক হতে হবে। যেহেতু চোর সেই সম্পদের মালিক নয়, তাই তার বিক্রয় বৈধ নয় এবং এর ভিত্তিতে সম্পাদিত ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তিও বাতিল।আশ-শাইখ আল-বুহূতী (রহিমাহুল্লাহ) বিক্রয় চুক্তি সঠিকভাবে সম্পন্ন হওয়ার শর্তাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন:الشَّرْطُ الرَّابِعُ : أَنْ يَكُونَ الْمَبِيعُ مَمْلُوكًا لِبَائِعِهِ وَقْتَ الْعَقْدِ مِلْكًا تَامًّا ، أَوْ مَأْذُونًا لَهُ فِي بَيْعِهِ وَقْتَ إيجَابٍ وَقَبُولٍ … فَإِنْ بَاعَ مِلْكَ غَيْرِهِ بِغَيْرِ إذْنِهِ لَمْ يَصِحَّ الْبَيْعُ”চতুর্থ শর্ত: চুক্তি সম্পাদনের সময় বিক্রিত বস্তু বা পণ্যটি বিক্রেতার পূর্ণ মালিকানাধীন হতে হবে, অথবা চুক্তি সম্পাদনের মুহূর্তেই (ইজাব ও কবুলের সময়) তা বিক্রি করার অনুমতিপ্রাপ্ত হতে হবে…অতএব, কেউ যদি অনুমতি ছাড়া অন্যের মালিকানাধীন বস্তু বিক্রি করে, তবে সেই বিক্রি সঠিক (সহীহ) হবে না।”(কাশশাফুল ক্বিনা’: ৩/১৮০)
.
অতএব, এ ধরনের ক্রয়-বিক্রয় বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো পাপের কাজে সহযোগিতা করাও হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ﴾—“তোমরা সৎকাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পরকে সহযোগিতা করো; কিন্তু পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না। আর আল্লাহকে ভয় করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।”(সূরা আল-মায়িদাহ: ২)।
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যাতে ইমাম ইবনু কাসীর (রাহিমাহুল্লাহ) ও ইমাম কুরতুবী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘এখানে আল্লাহ তা‘আলা মুমিন ব্যক্তিদেরকে ভালো কাজে সহযোগিতা করতে আদেশ করেছেন এবং অন্যায়, অসৎ ও হারাম কাজে সাহায্য, সহযোগিতা করতে নিষেধ করেছেন’ (তাফসীর ইবনু কাসীর: ২/১২; তাফসীরে কুরতুবী: ৬/৪৬-৪৭) এ ছাড়াও বহু কুরআনি আয়াত ও সহীহ হাদীস প্রমাণ করে যে, কোনো পাপীকে তার পাপে সহযোগিতা করা নিজেও একটি পাপ।
.
দ্বিতীয়ত: জেনেশুনে চুরিকৃত পণ্য ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত বিষয়ে পূর্ববর্তী আলেমদের ফতোয়াসমূহ নিম্নরূপ:
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেন:
الأموال المغصوبة والمقبوضة بعقود لا تباح بالقبض إن عرفه المسلم : اجتنبه ، فمن علمتُ أنه سرق مالاً ، أو خانه في أمانته ، أو غصبه فأخذه من المغصوب قهراً بغير حق : لم يجز لي أن آخذه منه ، لا بطريق الهبة ، و لا بطريق المعاوضة ، و لا وفاء عن أجرة ، ولا ثمن مبيع ، و لا وفاء عن قرض ، فإن هذا عين مال ذلك المظلوم “
“জবরদখলকৃত সম্পদ এবং অগ্রহণযোগ্য চুক্তির মাধ্যমে গ্রহণ করা সম্পদ দখলে নেওয়ার মাধ্যমে বৈধ হয় না। যদি মুসলিম তা জানতে পারে, তাহলে সে এর থেকে বিরত থাকবে। যে ব্যক্তি সম্পর্কে আমি জানি যে সে কারো সম্পদ চুরি করেছে বা আমানতের খিয়ানত করেছে বা অন্যায়ভাবে জোর করে কারো সম্পদ দখল করেছে: আমার জন্য তার কাছ থেকে তা নেওয়া জায়েয নয় — না হেবা বা উপহারের মাধ্যমে, না বিনিময় হিসেবে, না মজুরির পরিশোধ হিসেবে, না বিক্রয়মূল্য হিসেবে, আর না ঋণ পরিশোধ হিসেবে। কেননা এটি সেই মজলুমের নিজের সম্পদ।”[ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ৩২৩]
.
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ আরও বলেন:وإن كان الذي معهم – أي : التتار – أو مع غيرهم أموال يعرف أنهم غصبوها من معصوم : فتلك لا يجوز اشتراؤها لمن يتملكها ، لكن إذا اشتُريت على طريق الاستنقاذ لتصرف في مصارفها الشرعية فتعاد إلى أصحابها إن أمكن ، وإلا صرفت في مصالح المسلمين : جاز هذا “তাদের (অর্থাৎ তাতারদের) কাছে বা অন্য কারো কাছে যদি এমন সম্পদ থাকে যা তারা কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির কাছ থেকে জোরপূর্বক নিয়েছে বলে জানা যায়, তাহলে যে ব্যক্তি তা নিজের অধিকারে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ক্রয় করতে চায় তার জন্য তা ক্রয় করা জায়েয নয়। তবে যদি উদ্ধার করার লক্ষ্যে ক্রয় করা হয় যাতে শরীয়তসম্মত খাতে ব্যয় করা যায়, তাহলে সম্ভব হলে মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিবে। নতুবা মুসলিমদের কল্যাণে ব্যয় করা জায়েয হবে।”[ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমুউ ফাতাওয়া; খণ্ড: ২৯; পৃষ্ঠা: ২৭৬]
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন:
إذا تيقن الإنسان من كون السلعة المعروضة للبيع أنها مسروقة ، أو مغصوبة ، أو أن مَن يعرضها لا يملكها ملكاً شرعيّاً ، وليس وكيلاً في بيعها : فإنه يحرم عليه أن يشتريها ؛ لما في شرائها من التعاون على الإثم والعدوان ، وتفويت السلعة على صاحبها الحقيقي ؛ ولما في ذلك من ظلم الناس ، وإقرار المنكر ، ومشاركة صاحبها في الإثم ، قال الله تعالى : ( وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ) المائدة/2 .
وعلى ذلك ينبغي لمن يعلم أن هذه السلعة مسروقة أو مغصوبة أن يقوم بمناصحة من سرقها برفق ولين وحكمة ليرجع عن سرقته ، فإن لم يرجع وأصر على جرمه : فعليه أن يبلغ الجهات المختصة بذلك ليأخذ الفاعل الجزاء المناسب لجرمه ، ولرد الحق إلى صاحبه ، وذلك من باب التعاون على البر والتقوى ؛ ولأن في ذلك ردعا للظالم عن ظلمه ، ونصرة له وللمظلوم .
ولذلك ثبت في الحديث الذي رواه أنس رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : ( انصر أخاك ظالما أو مظلوما ) قالوا : يا رسول الله : هذا ننصره مظلوماً ، فكيف ننصره ظالماً ؟ قال : ( تأخذ فوق يديه ) أخرجه البخاري في صحيحه وأخرج الإمام أحمد في ” المسند ” نحوه ، وفي رواية أخرى : فقال رجل : يا رسول الله : أنصره إذا كان مظلوماً ، أفرأيت إذا كان ظالما كيف أنصره ؟ قال : ( تحجزه عن الظلم ، فإن ذلك نصره ) .وعلى ذلك : فإن نصر الظالم بردعه عن ظلمه ، واعتدائه ، ونصر المظلوم بالسعي في رد حقه عليه ، ومنع الظالم من تمكينه من إيذائه هو فرض كفاية ، فإذا لم يوجد من يقوم بذلك بصفة رسمية ، أو من هو أقوى منه في الأخذ على يد الظالم والعاصي لله ، وردعه عن ظلمه وجرمه : تعين الأمر عليه حسب قدرته واستطاعته ، مع الرفق واللين ، وله الأجر والثواب على ذلك ، إن شاء الله تعالى”
“যদি কোনো ব্যক্তি নিশ্চিত হয় যে বিক্রয়ের জন্য উপস্থাপিত পণ্যটি চুরি বা ছিনতাই করা অথবা যে ব্যক্তি তা উপস্থাপন করছে সে শরীয়তসম্মতভাবে এর মালিক নয় এবং তা বিক্রয়ে অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যক্তি নয়, তাহলে তা ক্রয় করা তার জন্য হারাম। কারণ এই ক্রয়ের মধ্যে রয়েছে পাপ ও সীমালঙ্ঘনে পারস্পরিক সহযোগিতা, প্রকৃত মালিকের কাছ থেকে পণ্য ছিনিয়ে নেওয়া, মানুষের উপর যুলুম করা, অন্যায়কে স্বীকৃতি দেওয়া এবং পাপে তার অংশীদার হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন:وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ“সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পরস্পর সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহযোগিতা করো না।”[সূরা আল-মায়িদাহ: ২] সুতরাং যে ব্যক্তি জানে যে এই পণ্যটি চুরি করা বা ছিনতাই করা, তার উচিত নম্রতা, কোমলতা ও প্রজ্ঞার সাথে চোরকে উপদেশ দেওয়া যাতে সে চুরি থেকে ফিরে আসে। যদি সে না ফেরে এবং তার অপরাধে অটল থাকে, তাহলে তার উপর দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো, যাতে অপরাধী তার অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি পায় এবং অধিকার তার মালিকের কাছে ফিরে আসে। আর এটি সৎকর্ম ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতার অন্তর্ভুক্ত। কেননা এতে যালিমকে তার যুলুম থেকে বিরত রাখা এবং যালিম ও মযলুম উভয়কে সাহায্য করা হয়।এ কারণেই হাদীসে এসেছে, আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে যালিম হোক বা মযলুম।” সাহাবীরা বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল! এই মযলুমকে সাহায্য করব, তা তো বুঝলাম, কিন্তু যালিমকে কীভাবে সাহায্য করব?” তিনি বললেন: ‘তার হাত ধরে রাখবে (অর্থাৎ তাকে যুলুম থেকে বিরত রাখবে)।’[বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে এটি বর্ণনা করেছেন, এবং ইমাম আহমাদ মুসনাদে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন।] আরেকটি বর্ণনায় রয়েছে: এক ব্যক্তি বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! মযলুম হলে সাহায্য করব, কিন্তু জালিম হলে কীভাবে সাহায্য করব?’ তিনি বললেন: “তাকে যুলুম থেকে বিরত রাখবে, কেননা এটিই তার সাহায্য।”সুতরাং, যালিমকে সাহায্য করার অর্থ তাকে তার যুলুম ও সীমালঙ্ঘন থেকে বিরত রাখা এবং মযলুমকে সাহায্য করার অর্থ তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা এবং যালিমকে তাকে কষ্ট দেওয়া থেকে বাধা দেওয়া। এটি ফরযে কিফায়া। যদি সরকারিভাবে বা অধিক শক্তিমানের পক্ষ থেকে এ কাজ করার কেউ না পাওয়া যায়, তাহলে তার সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী নম্রতা ও কোমলতার সাথে এটি করা তার উপর কর্তব্য হয়ে পড়ে। আর এর জন্য সে ইনশাআল্লাহ সওয়াব ও পুরস্কার পাবে।”[শাইখ আব্দুল আযীয ইবনে বায, শাইখ আব্দুল আযীয আলুশ শাইখ, শাইখ সালেহ আল-ফাউযান, শাইখ বকর আবু যাইদ।”[ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ১৩; পৃষ্ঠা: ৮২, ৮৩]
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল:“আমার কাছে এমন একটি পণ্য উপস্থাপন করা হয়েছে যা চুরি করা বলে আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে। তবে যে তা উপস্থাপন করেছে সে চোর নয়, বরং সে তা এমন একজনের কাছ থেকে কিনেছে যে চোরের কাছ থেকে কিনেছিল। আমি যদি এটা জেনেও তা কিনি তাহলে কি আমি গুনাহগার হব, যদিও আমি সেই মালিককে চিনি না যার কাছ থেকে চুরি করা হয়েছে?”
তিনি উত্তরে বলেন:الذي يظهر من الأدلة الشرعية : أنه لا يجوز لك شراؤها إذا اتضح لك أو غلب على ظنك أنها مسروقة ؛ لقول الله سبحانه : ( وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ) ؛ ولأنك تعلم أو يغلب على ظنك أن البائع ليس مالكاً لها شرعاً ، ولا مأذوناً له شرعاً في بيعها ، فكيف تعينه على ظلمه فتأخذ مال غيرك بغير حق ، نعم إذا أمكن شراؤها للاستنقاذ وردها إلى مالكها : فلا بأس ، إذا لم يتيسر أخذها بالقوة ، وعقوبة الظالم ، أما إذا أمكن أخذها بالقوة وعقوبة الظالم بعقوبته الشرعية : فهذا هو الواجب للأدلة المعلومة من الحديث ( انصر أخاك ظالما أو مظلوماً … ) الحديث”“শরীয়তের দলিলসমূহ থেকে যা স্পষ্ট হয়: যদি তোমার কাছে স্পষ্ট হয় বা প্রবল ধারণা হয় যে এটি চুরি করা, তাহলে তা ক্রয় করা তোমার জন্য জায়েয নয়। কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার বাণী:وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ “পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সহায়তা করো না।” আর এ কারণে যে, তুমি জানো বা তোমার প্রবল ধারণা হয় যে বিক্রেতা শরীয়ত অনুসারে এর মালিক নয় এবং তা বিক্রয়ে তাকে শরীয়ত অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাহলে তুমি কীভাবে তার যুলুমে তাকে সহায়তা করবে এবং অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করবে? হ্যাঁ, যদি উদ্ধারের উদ্দেশ্যে এবং মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তা ক্রয় করা সম্ভব হয়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই, যদি জোর করে তা নেওয়া সম্ভবপর না হয় এবং যালিমকে শাস্তি দেওয়া সম্ভবপর না হয়। তবে যদি জোর করে তা নেওয়া এবং তাকে শরীয়তসম্মত শাস্তি দেওয়া সম্ভবপর হয়, তাহলে সেটি করাই ওয়াজিব হবে। উক্ত হুকুম এই হাদীসের উপর ভিত্তি করে: “তোমার ভাইকে সাহায্য করো, সে যালিম হোক বা মযলুম।”[মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ; খণ্ড: ১৯; পৃষ্ঠা: ৯১, ৯২]
.
অতএব, উল্লেখিত কুরআন, সুন্নাহ এবং পূর্ববর্তী ও সমকালীন আলেমদের বক্তব্য থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো ব্যক্তি যদি নিশ্চিতভাবে জানে বা প্রবল ধারণা হয় যে কোনো পণ্য চুরি করা, তবে তা ব্যক্তিগত ব্যবহার বা ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ক্রয় করা তার জন্য বৈধ নয়। তবে অনেক সময় এমনও হয় যে, কোনো পণ্য স্বাভাবিক মূল্যের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করা হচ্ছে। তখন প্রশ্ন দেখা দেয়—শুধু কম দাম দেখেই কি সেটিকে চুরি করা বলে ধরে নেওয়া হবে? নাকি এ ক্ষেত্রে শরীয়তের নির্ধারিত কোনো নীতিমালা রয়েছে? এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ও ফাক্বীহ, ফাদ্বীলাতুশ শাইখ, ইমাম মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী আদ-দিমাশক্বী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও নীতিগত একটি দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। ইমাম (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: এমন কোনো পণ্য কেনা কি জায়েজ আছে, যার দাম স্বাভাবিকের তুলনায় কম হওয়ায় সেটি চুরি হওয়া আশঙ্কা করা হয়?
​উত্তরে শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেনهذا احتمال له درجات، والأحكام لا تُبنى على الظنون والأوهام ؛ فإذا كان الاحتمال قائما على غلبة الظن ؛ حينئذ لا يجوز شراء البضاعة هذه ، وجُلّ الأحكام الشرعية إنما تُبنى على ما يغلب على ظن المكلف ، أما مجرد خاطر خطر : فهذا لا يجوز الانسياق والتجاوب معه؛ لأنه يؤدّي إلى الوسوسة وإلى الأوهام”এই আশঙ্কার বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে। আর শরিয়তের বিধান কোনো ধারণ বা অমূলক কল্পনার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয় না। সুতরাং, যদি সম্ভাবনাটি প্রবল ধারণার স্তরে উন্নীত হয়, তবে সে ক্ষেত্রে সেই পণ্য কেনা জায়েজ নয়। মূলত অধিকাংশ শরিয়তসম্মত বিধানই দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির (মুকাল্লিফ) প্রবল ধারণার ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, মনে উদিত হওয়া কেবল ক্ষণস্থায়ী কোনো খটকার পেছনে চলা এবং তাতে সাড়া দেওয়া জায়েজ নয়; কারণ এটি মানুষকে কুমন্ত্রণা (ওয়াসওয়াসা) ও অমূলক কল্পনার দিকে নিয়ে যায়।”(ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৬৯০০৭) অর্থাৎ শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই ফতোয়া থেকে বোঝা যায় যে, শরীয়তের বিধান নিছক সন্দেহ, কল্পনা বা ওয়াসওয়াসার ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। বরং যখন কোনো পণ্য চুরি হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত জ্ঞান বা প্রবল ধারণা (غلبة الظن) সৃষ্টি হয়, তখন তা ক্রয় করা হারাম। পক্ষান্তরে, কেবলমাত্র অমূলক সন্দেহ বা ভিত্তিহীন ধারণার কারণে কোনো মুসলিমের সম্পদকে চুরিকৃত বলে ধরে নেওয়া কিংবা তার সঙ্গে লেনদেন বর্জন করা শরীয়তের ন্যায়বিচার ও ভারসাম্যের পরিপন্থী। তাই একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো—একদিকে চুরি ও পাপের কাজে কোনো ধরনের সহযোগিতা না করা, অন্যদিকে আবার প্রমাণহীন সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা থেকেও নিজেকে রক্ষা করা।(গৃহীত: ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৯৩০৩১; ২৬৯০০৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও রুটিওয়ালার গল্পটি বানোয়াট

 আমরা প্রায়ই বক্তাদের মুখে একটি সুন্দর কাহিনি শুনি এবং তা সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেট জগতে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে আছে। তা হলো, জগৎ বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং এক রুটিওয়ালার গল্প। এটি মূলত ইস্তেগফার বা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনার ফজিলতে বর্ণনা করা হয়।

🔹ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপ:
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ইলম অন্বেষণের উদ্দেশ্যে সফরে থাকাকালীন কোন এক দূরের শহরে একটি মসজিদে রাত কাটানোর মনস্থ করলেন। কিন্তু দারোয়ান তাঁকে চিনতে না পেরে মসজিদ থেকে বের করে দেন। পরে এক রুটিওয়ালা তাঁকে আশ্রয় দেন। সম্মানিত ইমাম গভীরভাবে লক্ষ্য করলেন যে, উক্ত রুটিওয়ালা কাজের ফাঁকে ফাঁকে সারারাত ইস্তিগফার করছেন। সকালে ইমাম আহমদ এর কারণ জানতে চাইলে রুটিওয়ালা বলেন, এই ইস্তিগফারের বদৌলতে তাঁর জীবনের সব দোয়া কবুল হয়েছে—শুধু একটি বাদে। আর তা হল, এই যুগের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস এবং ফকিহ ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে এক নজর দেখার দোয়া। তখন ইমাম নিজের পরিচয় দেন। এতে ইস্তিগফারের ফলাফল হিসেবে তার সারা জীবনের লালিত স্বপ্নটি বাস্তবায়িত হওয়ায় তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন। কাহিনিটি প্রায়ই ইবনুল জাওযি (রহ.)-এর নামে বলা হয় এবং একজন প্রসিদ্ধ ওয়ায়েজের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পেয়েছে। (তিনি হলেন, সৌদি আরবের বিখ্যাত বক্তা মুহাম্মদ বিন আব্দুর রহমান আল আরিফি।যিনি বর্তমানে সৌদি জেলে বন্দি রয়েছেন) কিন্তু বাস্তবে যাচাই করলে দেখা যায়, এই কাহিনি ইবনুল জাওযি (রহ.)-এর কোনো গ্রন্থে পাওয়া যায় না।
▪️আরেকটি গল্প:
রুটিওয়ালার গল্পের কাছাকাছি একটি বর্ণনা ইবনুন নাজ্জার (রহ.) তাঁর ‘যাইলু তারিখি বাগদাদ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে সেখানে রুটিওয়ালা নয়; ইমাম আহমদ (রহ.) ও ইসহাক ইবনে রাহাওয়াইহ (রহ.)-এর মধ্যকার একটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে।
🔹গল্পটির সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নরূপ:
আব্বাসিয় খলিফা আল মামুনের শাসনামলে ‘মিহনাহ’ (কুরআন সৃষ্টি বিতর্ক)-এর সেই কঠিন ও সংকটময় সময়ে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) যখন সফরে বের হন তখন তিনি ভাবলেন, তাঁর এই কঠিন বিপদের খবর পেয়ে খুরাসানের বিখ্যাত মুহাদ্দিস বন্ধুবর ইমাম ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ (রহ.) হয়তো সুদূর সফর অতিক্রম করে তাঁর সাথে দেখা করতে চলে আসবেন। পরম শ্রদ্ধেয় ও প্রিয় বন্ধুকে এত বড় সফরের কষ্ট থেকে বাঁচাতে ইমাম আহমদ (রহ.) নিজেই তাঁর সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। ইমাম ইসহাক বিন রাহওয়াইহ (রহ.)-ও বন্ধু ইমাম আহমদের বিপদের কথা শুনে তাঁকে সাহায্য করা বা তাঁর সাথে দেখা করার জন্য খুরাসান থেকে বাগদাদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন! কিন্তু সফরকালে ‘রেই’ শহরে পৌঁছে ইমাম আহমদ এক মসজিদে প্রবেশ করেন। এমন সময় তীব্র মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়। ইশার সালাতের পরে মসজিদের পাহারাদার বা দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা তাঁকে মসজিদ থেকে বের হয়ে যেতে বলে। কারণ তারা মসজিদ বন্ধ করে দেবে। ইমাম আহমদ রহ. বলেন, “এটি আল্লাহর ঘর এবং আমি আল্লাহর বান্দা।” কিন্তু তারা কড়া ভাষায় সাফ জানিয়ে দেয় যে, তাঁকে বের হতেই হবে। অন্যথায় পা ধরে টেনে বের করা হবে। পরিস্থিতি বুঝে ইমাম শান্তভাবে সালাম জানিয়ে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসেন। বাইরে তখন প্রচণ্ড বৃষ্টি, বজ্রপাত ও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। ঘোর অন্ধকারে তিনি বুঝতে পারছিলেন না কোথায় যাবেন। এমন সময় এক ব্যক্তি একটি বাড়ি থেকে বের হয়ে তাঁকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে ভাই, এই অসময়ে আপনি কোথায় যাচ্ছেন?” ইমাম বললেন, “আমি জানি না কোথায় যাচ্ছি।”
লোকটি তাঁকে নিজ ঘরে ডেকে নেন। তাঁর ভেজা কাপড় বদলে শুকনা পোশাক পরতে দেন এবং নামাজের জন্য পবিত্র হওয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এরপর একটি ঘরে বসিয়ে, যেখানে আগুনের উষ্ণতা ও খাবারের সুন্দর আয়োজন ছিল, তাঁকে আপ্যায়ন করেন।
আহারের পর লোকটি জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বাড়ি কোথায়?” ইমাম উত্তর দিলেন, “বাগদাদে।” লোকটি পুনরায় প্রশ্ন করলেন, “আপনি কি আহমদ ইবনে হাম্বল নামের কাউকে চেনেন?” ইমাম আহমাদ রহ. জবাব দিলেন, “আমিই আহমদ ইবনে হাম্বল।”
তখন লোকটি আনন্দে ও বিস্ময়ে বলে উঠলেন, “আর আমিই ইসহাক ইবনে রাহওয়াইহ!” ইমাম যাহাবী (রহ.) তাঁর ‘সিয়ারু আ’লামিন নুবালা’ গ্রন্থে এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত করে ইবনুল জাওযির দিকে সম্পর্কিত করেছেন। কিন্তু পরক্ষণেই একে মাউদু (জাল বা বানোয়াট) বলে মন্তব্য করেছেন। [সূত্র: ajurry com]
সুতরাং ‘ইমাম আহমদ বিন হাম্বল ও রুটিওয়ালার কাহিনি’ নামে যা ছড়িয়ে আছে তা ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। আর এর কাছাকাছি ‘ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং ইমাম ইসহাক বিন রাহাওয়াইহ : এর নামে যে বর্ণনাটি বাস্তবে পাওয়া যায় তাও সহিহ সনদে প্রমাণিত নয় বরং জাল বা বানোয়াট বলে প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
​يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَكُونُوا مَعَ الصَّادِقِينَ
​”হে ইমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যবাদীদের সঙ্গে থাকো।” [সুরা তাওবা:১১৯]
​রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
​كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
​”শোনা প্রতিটি কথা বলে বেড়ানোই একজন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।” [সহিহ মুসলিম, মুকাদ্দিমা]
তাই কোনো কাহিনি বা কোন কিছুর ফজিলত ছড়ানোর আগে তার সত্যতা যাচাই করা আমাদের অপরিহার্য দায়িত্ব। শুধু শোনা কথায় বিশ্বাস করে তা ছড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তৌফিক দান করুন ।আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

সদকা নাকি উমরা কোনটা বেশি উত্তম

 প্রশ্ন: যদি একই সাথে দুটি কাজ করা সম্ভব না হয় তবে উমরা করা উত্তম নাকি গরিব-অসহায়দের মাঝে দান-সদকা করা বেশি ভালো?

উত্তর: সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পরিবারবর্গ ও সহচরদের ওপর। অতঃপর-
▪️ সদকা যদি ফরজ হয় (যেমন: জাকাত, মানত, মানত ভঙ্গের কাফফারা, কসম ভঙ্গের কাফফারা ইত্যাদি) তবে তা আদায় করা নফল উমরার চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি উত্তম। তবে সাধারণ নিয়মে নফল সদকার চেয়ে নফল হজ ও উমরা করা উত্তম। কারণ উমরার মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি শারীরিক ইবাদত—যেমন: তাওয়াফ, সাঈ, জিকির, সালাত ও তালবিয়ার মতো একাধিক ইবাদত একসাথে পালনের সুযোগ হয়।
▪️তবে যদি আপনার আশেপাশে এমন সমস্যাগ্রস্থ মানুষ থাকে যাদের‌ নিকট বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ বা অবলম্বন নেই কিংবা আপনার নিজের নিকটাত্মীয়রা অভাব-অনটনে ভুগছে অথচ তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি উমরা আদায় করবেন -এমন সমন্বয় করাও আপনার দ্বারা সম্ভব না হয়—তবে এই অবস্থায় অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বেশি উত্তম।
– হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কানজুদ দাকায়িক’-এ রয়েছে:
«حَجُّ النَّفْلِ أَفْضَلُ مِنَ الصَّدَقَةِ»
“সাধারণ দানের চেয়ে নফল হজ করা বেশি উত্তম।”[কানযুদ দাকায়িক]
– ইমাম মালেক (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, নফল হজ নাকি সদকা—কোনটি আপনার কাছে বেশি প্রিয়? তিনি জবাবে বলেন:
«الْحَجُّ، إِلَّا أَنْ تَكُونَ سَنَةُ مَجَاعَةٍ»
“হজ করাই উত্তম। তবে দেশ যদি দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে যায় তবে দান করা উত্তম।”[মওয়াহিবুল জলীল]
– শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তার ‘আল ইখতিয়ারাত’ গ্রন্থে বলেছেন:
«وَأَمَّا إِذَا كَانَ لَهُ أَقَارِبُ مَحَاوِيجُ، فَالصَّدَقَةُ عَلَيْهِمْ أَفْضَلُ، وَكَذَا إِذَا كَانَ هُنَاكَ قَوْمٌ مُضْطَرُّونَ إِلَى نَفَقَتِهِ، فَأَمَّا إِذَا كَانَ كِلَاهُمَا تَطَوُّعًا، فَالْحَجُّ أَفْضَلُ، لِأَنَّهُ عِبَادَةٌ بَدَنِيَّةٌ مَالِيَّةٌ، وَكَذَا الْأُضْحِيَةُ وَالْعَقِيقَةُ أَفْضَلُ مِنَ الصَّدَقَةِ بِقِيمَةِ ذَلِكَ»
“কিন্তু কারও যদি অভাবগ্রস্ত আত্মীয়স্বজন থাকে তবে তাদের সাহায্য করাই বেশি উত্তম। একইভাবে যদি এমন লোকজন থাকে যে তারা তার আর্থিক সাহায্যের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল তাহলেও তাদের দান করা উত্তম। আর যদি দুটিই সাধারণ নফল কাজ হয় (অর্থাৎ কেউ চরম বিপদে নেই) তবে হজ করাই উত্তম। কারণ এটি একই সাথে শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। ঠিক যেমন কুরবানি ও আকিকা করা অধিক উত্তম সেগুলোর মূল্য দান করে দেওয়ার চেয়ে।”[আল ইখতিয়ারাত]
– ইমাম শাওকানি (রহ.) ‘নাইলুল আওতার’ গ্রন্থে
«أَيُّ الأَعْمَالِ أَفْضَلُ؟ فَذَكَرَ الإِيمَانَ، ثُمَّ الْجِهَادَ، ثُمَّ الْحَجَّ»
“কোন আমলটি সবচেয়ে উত্তম? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইমানের কথা উল্লেখ করলেন, তারপর জিহাদ, এরপর হজের কথা।” [সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম] এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
«هُوَ حُجَّةٌ لِمَنْ فَضَّلَ حَجَّ النَّفْلِ عَلَى الصَّدَقَةِ»
“এটি সেই আলেমদের পক্ষে দলিল, যারা সাধারণ দানের চেয়ে নফল হজকে অগ্রাধিকার দেন।” [নাইলুল আওতার]
বর্তমান যুগে মুসলিম উম্মাহর বাস্তব পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, তীব্র সংকট ও অভাবের মুখে থাকা মানুষের সংখ্যা অগুনতি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বহু মুসলমান আজ খাদ্য, পানি ও বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে বারবার নফল উমরা বা হজ না করে সেই অর্থ বিপন্ন মানুষের সেবায় ব্যয় করা নিঃসন্দেহে বেশি সওয়াব ও অগ্রগণ্য।
والله أعلم
(আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন)
🔶 ইসলাম ওয়েব-এর আরেকটি ফতওয়ায় বলা হয়েছে, “ইসলামে বারবার হজ ও উমরা করার এবং একটির পর আরেকটি আদায় করার বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। হাদিসে এসেছে, এটি মানুষের দারিদ্র্য দূর করে এবং গুনাহ মিটিয়ে দেয়। তিরমিজি, নাসায়ি ও ইবনে মাজাহ-তে বর্ণিত হাদিসে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«تَابِعُوا بَيْنَ الحَجِّ وَالعُمْرَةِ، فَإِنَّهُمَا يَنْفِيَانِ الفَقْرَ وَالذُّنُوبَ كَمَا يَنْفِي الكِيرُ خَبَثَ الحَدِيدِ وَالذَّهَبِ وَالفِضَّةِ، وَلَيْسَ لِلحَجَّةِ المَبْرُورَةِ ثَوَابٌ إِلاَّ الجَنَّةُ»
“তোমরা বারবার হজ ও উমরা পরপর আদায় করো। কারণ এ দুটো দারিদ্র্য ও গুনাহকে এমনভাবে দূর করে দেয়, যেভাবে কামারের হাপর লোহা, সোনা ও রুপার ময়লা দূর করে পরিষ্কার করে দেয়। আর কবুল হজের প্রতিদান তো জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।” [সহিহুল জামে]
এ ছাড়া আরও অনেক দলিল রয়েছে, যা হজের মর্যাদা, গুনাহ মাফের শক্তি এবং মর্যাদা বৃদ্ধির কথা প্রমাণ করে। সাধারণ নফল দান-সদকার চেয়ে হজ ও ওমরা আদায় করা বেশি উত্তম। তবে নিকটাত্মীয়দের মধ্যে যদি কেউ আর্থিক সংকটে থাকে তাহলে ভিন্ন কথা।” (অর্থাৎ সেক্ষেত্রে বারবার নফল হজ বা উমরা আদায় করার থেকে আর্থিক সংকটে নিপতিত ও বিপদগ্রস্ত এই মানুষগুলোর জন্য সাহায্য-সহযোগিতা করা অধিক উত্তম এবং এতে বেশি সওয়াব রয়েছে।)
💢 সারাংশ: সাধারণ ও স্বাভাবিক অবস্থায় নফল উমরা বা হজ করাই বেশি উত্তম। তবে যদি নিকটাত্মীয় বা আশেপাশের মানুষ চরম অভাব-অনটন বা সংকটে থাকে তখন উমরার চেয়ে তাদের মাঝে দান-সদকা করাই অধিক উত্তম। মহান আল্লাহ আমাদেরকে যথাসাধ্য গরিব-অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি অধিক পরিমাণে নফল ওমরা ও হজ আদায়ের তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

ইমাম রুকুতে চলে গেছেন অথচ আপনার সূরা ফাতিহা শেষ হয়নি তখন কী করবেন

 অনেক সময় কিছু ইমাম (আল্লাহ তাদেরকে হেদায়েত করুন) সিররি বা নিচুস্বরে কিরাত পড়ার সালাতে এত দ্রুত সূরা ফাতিহা পাঠ করে রুকুতে চলে যান যে, পেছনে যে সব মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পাঠ করে তারা তা শেষ করতে পারে না। এমতবস্থায় সে মুক্তাদি কী করবে?

— সে কি একা একা সূরা ফাতিহা পাঠ করে তারপর রুকুতে যাবে ইমাম রুকু থেকে উঠে গেলেও? অতঃপর পরে সে রাকাতটা ইমামের সালাম ফেরানোর পর একাকী উঠে কাজা পড়ে নিবে? (যেহেতু অধিক বিশুদ্ধ মতে ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পড়া সালাতের রোকন। তা ছাড়া সালাত শুদ্ধ হবে না।)
— নাকি যতটুকু পড়া হয়েছে ততটুকু পড়েই ইমামের সাথে রুকুতে শরিক হবে?
— আর এমনটি করলে কি তার ঐ রাকাতটি শুদ্ধ বলে গণ্য হবে নাকি হবে না?
এসব বিষয়ে অনেক মুসল্লি দ্বিধান্বিত থাকে। তাই এই বহুল জিজ্ঞাসিত সমস্যার সঠিক সমাধান উপস্থাপন করা হলো, যুগের তিন শ্রেষ্ঠ আলেম তথা শাইখ উসাইমিন (রাহ.), শাইখ বিন বায (রাহ.) এবং শাইখ আলবানি (রাহ.)-এর দলিল ভিত্তিক ফতওয়ার আলোকে:
তার আগে আমাদের জানা কর্তব্য যে, সূরা ফাতিহা পাঠ করা ইমাম, মুক্তাদি ও একাকী সালাত আদায়কারী—প্রত্যেক ব্যক্তির জন্যই প্রতি রাকাতেই একটি রোকন (অপরিহার্য অংশ)। ফকিহগণের নিকট এটিই সর্বাধিক অগ্রগণ্য মত। এর সপক্ষে প্রমাণ হলো, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিম্নোক্ত হাদিসটি:
“مَنْ صَلَّى صَلَاةً لَمْ يَقْرَأْ فِيهَا بِأُمِّ الْقُرْآنِ فَهِيَ خِدَاجٌ -ثَلَاثًا- غَيْرُ تَمَامٍ”
“যে ব্যক্তি এমন সালাত আদায় করল যাতে সে উম্মুল কুরআন (সূরা ফাতিহা) পাঠ করল না তার সেই সালাত ত্রুটিপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ, ত্রুটিপূর্ণ—অসম্পূর্ণ।” [সহিহ মুসলিম: ৩৯৫, আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত]
এ ছাড়াও এ মর্মে আরও বহু হাদিস রয়েছে। তবে এই বিধান থেকে কেবল একটি ক্ষেত্র ব্যতিক্রম আর তা হলো ‘মাসবুক’ (দেরিতে জামাতে আসা মুক্তাদি), যদি সে ইমামকে রুকু অবস্থায় পায়।
❒ শাইখ ইবনে উসাইমিন (রাহ.) বলেন:
«هَذَا الَّذِي ذَكَرْنَاهُ ـ وَهُوَ أَنَّ قِرَاءَةَ الْفَاتِحَةِ رُكْنٌ فِي حَقِّ كُلِّ مُصَلٍّ: الْإِمَامِ، وَالْمَأْمُومِ، وَالْمُنْفَرِدِ. وَلَا يُسْتَثْنَى مِنْهَا إِلَّا مَسْأَلَةٌ وَاحِدَةٌ، وَهِيَ الْمَسْبُوقُ إِذَا أَدْرَكَ إِمَامَهُ رَاكِعاً، أَوْ قَائِماً وَلَمْ يَتَمَكَّنْ مِنْ قِرَاءَةِ الْفَاتِحَةِ ـ هَذَا هُوَ الَّذِي دَلَّتْ عَلَيْهِ الْأَدِلَّةُ الشَّرْعِيَّةُ.
فَإِذَا قَالَ قَائِلٌ: مَا الدَّلِيلُ عَلَى اسْتِثْنَاءِ هَذِهِ الصُّورَةِ؟
فَالْجَوَابُ: الدَّلِيلُ عَلَى ذَلِكَ حَدِيثُ أَبِي بَكْرَةَ الثَّابِتُ فِي صَحِيحِ الْبُخَارِيِّ حَيْثُ أَدْرَكَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ رَاكِعٌ، فَأَسْرَعَ وَرَكَعَ قَبْلَ أَنْ يَصِلَ إِلَى الصَّفِّ، ثُمَّ دَخَلَ فِي الصَّفِّ، فَلَمَّا انْصَرَفَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ الصَّلَاةِ سَأَلَ مَنِ الْفَاعِلُ؟ فَقَالَ أَبُو بَكْرَةَ: أَنَا، فَقَالَ: زَادَكَ اللَّهُ حِرْصاً وَلَا تَعُدْ، وَلَمْ يَأْمُرْهُ بِقَضَاءِ الرَّكْعَةِ الَّتِي أَدْرَكَ رُكُوعَهَا، دُونَ قِرَاءَتِهَا، وَلَوْ كَانَ لَمْ يُدْرِكْهَا لَكَانَتْ قَدْ فَاتَتْهُ، وَلَأَمَرَهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِقَضَائِهَا، كَمَا أَمَرَ الْمُسِيءَ فِي صَلَاتِهِ أَنْ يُعِيدَهَا، فَلَمَّا لَمْ يَأْمُرْهُ بِقَضَائِهَا عُلِمَ أَنَّهُ قَدْ أَدْرَكَ الرَّكْعَةَ، وَسَقَطَتْ عَنْهُ قِرَاءَةُ الْفَاتِحَةِ، فَهَذَا دَلِيلٌ مِنَ النَّصِّ.
وَالْمَعْنَى يَقْتَضِي ذَلِكَ: لِأَنَّ هَذَا الْمَأْمُومَ لَمْ يُدْرِكِ الْقِيَامَ الَّذِي هُوَ مَحَلُّ الْقِرَاءَةِ، فَإِذَا سَقَطَ الْقِيَامُ سَقَطَ الذِّكْرُ الْوَاجِبُ فِيهِ وَهُوَ الْقِرَاءَةُ» انْتَهَى مِنْ “الشَّرْحِ الْمُمْتِعِ” (٣/ ٢٩٨).
“আমরা যা উল্লেখ করেছি—অর্থাৎ সূরা ফাতিহা পাঠ করা ইমাম, মুক্তাদি ও একাকী সালাত আদায়কারী প্রতিটি মুসল্লির জন্যই একটি রোকন। এ নিয়ম থেকে কেবল একটি মাসআলাই ব্যতিক্রম। তা হলো, মাসবুক ব্যক্তি যদি ইমামকে রুকু অবস্থায় পায় কিংবা এমন অবস্থায় পায় যে ফাতিহা পড়ার সুযোগ পায়নি। (অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে সূরা ফাতিহা না পড়লেও সালাত শুদ্ধ হবে) শরয়ি দলিলগুলো মূলত এই বিধানটিই নির্দেশ করে।
কেউ যদি প্রশ্ন করেন: এই ব্যতিক্রমী বিধানের দলিল কী?
এর উত্তর হলো: এর দলিল হলো সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু বাকরা (রা.)-এর প্রসিদ্ধ হাদিস। তিনি এসে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে রুকু অবস্থায় পেয়েছিলেন। তাই তিনি তাড়াহুড়ো করে নামাজের কাতারে পৌঁছার আগেই রুকু করে ফেলেন এবং পরে কাতারে গিয়ে শামিল হন।
সালাত শেষে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এমন করেছ?’
আবু বাকরা (রা.) বললেন, ‘আমি।’
তখন তিনি বললেন:
«زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا، وَلَا تَعُدْ»
“আল্লাহ তোমার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিন। তবে আর এমন করো না।”
নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে সেই রাকাতটি পুনরায় আদায় করার নির্দেশ দেননি। অথচ তিনি কেবল রুকু পেয়েছিলেন; ফাতিহা পড়ার সুযোগ পাননি। যদি তিনি সেই রাকাত না পেতেন তবে তা তাঁর ছুটে যেত এবং নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে তা কাজা করার নির্দেশ দিতেন—যেমন সালাতে ভুল কারী ব্যক্তিকে (মুসিউস সালাত) তিনি সালাত পুনরায় পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেহেতু তিনি তাঁকে কাজা করার নির্দেশ দেননি তাই প্রমাণিত হলো যে, তিনি রাকাতটি পেয়ে গেছেন এবং তাঁর ওপর থেকে সূরা ফাতিহা মাফ হয়ে গেছে। এটি একটি স্পষ্ট নস বা শরয়ি দলিল।
আর অর্থের দিক থেকেও বিষয়টি যৌক্তিক। কারণ এই মুক্তাদি কিয়াম বা দাঁড়ানোর অবস্থাটাই পায়নি, যা মূলত কিরাত বা পাঠ করার মূল স্থান। সুতরাং যখন কিয়ামই রহিত হয়ে গেল তখন তার সাথে সম্পৃক্ত ওয়াজিব জিকির তথা কিরাতও রহিত হয়ে গেল।” — সমাপ্ত, “আশ শারহুল মুমতি” (৩/২৯৮) থেকে সংগৃহীত [Islamqa info]
শাইখকে আরও প্রশ্ন করা হয়—
এক ব্যক্তি জামাতে এমন সময় শরিক হলো, যখন ইমাম তাকবিরে তাহরিমা শেষ করে সূরা ফাতিহা পাঠ সম্পন্ন করেছেন। এরপর সে নিজে ফাতিহা পড়া শুরু করল। কিন্তু মাঝপথে ইমাম রুকুতে চলে গেলেন—তাহলে এই মুক্তাদি কি ইমামের সাথে রুকুতে চলে যাবে, নাকি নিজের মতো করে ফাতিহা পাঠ শেষ করবে?
উত্তরে তিনি বলেন, কোনও মুক্তাদি যখন জামাতে এমন সময় প্রবেশ করল যখন ইমাম রুকুতে যাওয়ার উপক্রম করেছেন, আর ওই মুক্তাদি তখনও পূর্ণ ফাতিহা পড়ার সুযোগ পায়নি—তখন দেখতে হবে যে তার কতটুকু বাকি আছে। যদি মাত্র এক বা দুই আয়াত বাকি থাকে, যা দ্রুত পড়ে নিয়ে ইমামকে রুকুতে ধরে ফেলা সম্ভব তবে সে তা-ই করবে (অর্থাৎ ফাতিহা শেষ করে রুকুতে যাবে)।
আর যদি এর চেয়ে বেশি অংশ বাকি থাকে, যা পড়তে গেলে ইমামকে রুকুতে পাওয়া যাবে না তবে সে ফাতিহা অসমাপ্ত রেখেই ইমামের সাথে রুকুতে শরিক হয়ে যাবে। [al-eman]
❒ আল্লামা শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.):
ইমাম রুকুতে চলে গেছেন অথচ মুসল্লি সূরা ফাতিহা শেষ করতে পারেননি—এখন মুক্তাদির কী করণীয়?
প্রশ্ন: আমাদের এক ভাই জানতে চেয়েছেন: ইমাম রুকুতে চলে গেলেন অথচ আমি তখনও সূরা ফাতিহা সম্পূর্ণ করতে পারিনি। এই অবস্থায় আমি কি ইমামের সাথে রুকুতে চলে যাব, নাকি ফাতিহা শেষ করব? আর মুক্তাদির ওপর থেকে কখন সূরা ফাতিহা মাফ হয়ে যায়?
উত্তর:
إِذَا كَانَ لَمْ يَبْقَ إِلَّا شَيْءٌ يَسِيرٌ، كَالْآيَةِ وَالْآيَتَيْنِ يُكْمِلُ، وَإِذَا كُنْتَ تَخْشَى أَنْ يَرْفَعَ؛ فَارْكَعْ، وَيَسْقُطْ عَنْكَ مَا بَقِيَ، كَمَا لَوْ جِئْتَ وَالْإِمَامُ قَدْ رَكَعَ؛ تَرْكَعُ وَتَسْقُطُ عَنْكَ الْفَاتِحَةُ، لَوْ جَاءَ الْمَأْمُومُ وَالْإِمَامُ رَاكِعٌ؛ رَكَعَ مَعَهُ، وَأَجْزَأَهُ، أَجْزَأَتْهُ الرَّكْعَةُ كَمَا فِي صَحِيحِ الْبُخَارِيِّ مِنْ حَدِيثِ أَبِي بَكْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّهُ جَاءَ وَالنَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَاكِعٌ؛ فَرَكَعَ دُونَ الصَّفِّ، ثُمَّ دَخَلَ فِي الصَّفِّ، فَلَمَّا سَلَّمَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَهُ: «زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا، وَلَا تَعُدْ» وَلَمْ يَأْمُرْهُ بِقَضَاءِ الرَّكْعَةِ.
وَهَذَا قَوْلُ الْأَئِمَّةِ الْأَرْبَعَةِ جَمِيعًا، أَنَّ مَنْ أَدْرَكَ الْإِمَامَ رَاكِعًا أَجْزَأَتْهُ الرَّكْعَةُ، وَسَقَطَتْ عَنْهُ الْفَاتِحَةُ، فَهَكَذَا إِذَا قَرَأَ أَوَّلَهَا، ثُمَّ خَافَ مِنْ فَوَاتِ الرَّكْعَةِ؛ يَرْكَعُ، وَلَا يَضُرُّهُ ذَلِكَ، وَهَكَذَا لَوْ نَسِيَهَا الْمَأْمُومُ، أَوْ كَانَ جَاهِلًا؛ سَقَطَتْ عَنْهُ، وَأَجْزَأَتْهُ صَلَاتُهُ مَعَ الْإِمَامِ.
بِخِلَافِ الْمُفْرِدِ وَالْإِمَامِ فَإِنَّهَا لَا تُجْزِئُهُ، لَوْ سَهَا عَنْهَا، أَوْ جَهِلَهَا؛ لَابُدَّ مِنْ قِرَاءَتِهَا؛ لِأَنَّهَا رُكْنُ صَلَاتِهِ، أَمَّا الْمَأْمُومُ فَهِيَ فِي حَقِّهِ وَاجِبَةٌ مَعَ الذِّكْرِ، وَمَعَ الْعِلْمِ، بِدَلِيلِ أَنَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يَأْمُرْ أَبَا بَكْرَةَ الثَّقَفِيَّ بِالْإِعَادَةِ لَمَّا جَاءَ وَالْإِمَامُ رَاكِعٌ، نَعَمْ
“সূরা ফাতিহা থেকে যদি মাত্র এক বা দুই আয়াত বাকি থাকে তবে তা পড়ে নেওয়া ভালো। তবে যদি আশঙ্কা হয় যে, ইমাম রুকু থেকে মাথা তুলে ফেলবেন তবে দেরি না করে সাথে সাথে রুকুতে চলে যাবে; বাকি অংশটুকু মাফ হয়ে যাবে। যেমন—কোনও মুসল্লি মসজিদে এসে পেলেন যে ইমাম রুকুতে চলে গেছেন। তখন তিনি ইমামের সাথেই রুকুতে শরিক হয়ে যাবেন এবং তাঁর ওপর থেকে ফাতিহা মাফ হয়ে যাবে। এর পক্ষে দলিল রয়েছে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু বাকরা (রা.)-এর ঘটনা। তিনি এসে দেখলেন যে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন রুকুতে আছেন তখন তিনি কাতারে পৌঁছানোর আগেই পেছনের দিকে রুকু করে ফেলেন। এরপর কাতারে গিয়ে যোগ দেন। সালাত শেষে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেন,
«زَادَكَ اللَّهُ حِرْصًا، وَلَا تَعُدْ»
“আল্লাহ তোমার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিন, তবে আর এমন করো না।” [সহিহ বুখারি] নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে সেই রাকাত পুনরায় পড়ার নির্দেশ দেননি। চার মাজহাবের ইমামগণের সর্বসম্মত অভিমত হলো:
—যে ব্যক্তি ইমামকে রুকু অবস্থায় পেল তার ওই রাকাত আদায় হয়ে গেল এবং তার থেকে সূরা ফাতিহা মাফ হয়ে গেল।
– ঠিক তেমনিভাবে, কেউ যদি ফাতিহার কিঞ্চিৎ অংশ পড়ার পর রাকাত ছুটে যাওয়ার ভয়ে রুকুতে চলে যায় তাতে তার কোনও সমস্যা নেই।
– একইভাবে কোনও মুক্তাদি যদি ভুলবশত ফাতিহা না পড়ে অথবা এ বিধান না জানার কারণে না পড়ে তবে তার থেকেও তা মাফ হয়ে যাবে এবং ইমামের সাথে তার সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে।
➧ তবে একা সালাত আদায়কারী (মুনফারিদ) এবং ইমামের হুকুম ভিন্ন। তারা যদি ভুলে যান কিংবা না জেনে ছেড়ে দেন তবুও তাঁদের জন্য ফাতিহা পড়া জরুরি। কারণ এটি তাঁদের সালাতের রোকন (অপরিহার্য অংশ)। পক্ষান্তরে মুক্তাদির ক্ষেত্রে তা স্মরণ থাকা ও জানার শর্তে ওয়াজিব। এর বড় প্রমাণ তো সেটাই, যেখানে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবু বাকরা সাকাফি (রা.)-কে রাকাত পুনরায় পড়ার হুকুম দেননি। অথচ তিনি ইমামকে রুকু অবস্থায় পেয়েছিলেন।”
ফতওয়া প্রদানে: আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.)।
সাবেক প্রধান মুফতি এবং সভাপতি, সিনিয়র স্কলার পরিষদ, সৌদি আরব।
❒ আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন আলবানি (রাহ.):
আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন আলবানি রাহ.-এর ফতওয়ার সারাংশ নিম্নরূপ:
কোনও মুক্তাদির যদি প্রবল ধারণা হয় যে, একটু দ্রুত পড়লে সে সূরা ফাতিহা সম্পূর্ণ করতে পারবে এবং ইমাম রুকু থেকে ওঠার আগেই তাকে রুকুতে গিয়ে ধরে ফেলতে পারবে তবে সে ফাতিহা শেষ করেই রুকুতে যাবে।
আর যদি তার প্রবল ধারণা হয় যে, ফাতিহা সম্পূর্ণ করতে গেলে ইমামের রুকু ছুটে যাবে তবে সে আর অপেক্ষা করবে না; যতটুকু পড়তে পেরেছে ততটুকুই থামিয়ে দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে ইমামের সাথে রুকুতে শরিক হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে ফাতিহা অসম্পূর্ণ থাকলেও তার সালাতে কোনও সমস্যা হবে না। শাইখ আলবানি (রাহ.) এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন যে, সালাতে রুকু পাওয়া নিয়ে সকল মুসলিম আলেম একমত যে এটি সালাতের একটি অপরিহার্য রোকন; রুকু না করলে রাকাতই আদায় হবে না। এর বিপরীতে, মুক্তাদির ওপর সূরা ফাতিহা পাঠ করা ওয়াজিব কি না—এ নিয়ে আলেমদের মধ্যে বেশ মতভেদ রয়েছে। যেমন—হানাফি মাজহাবের মতে, মুক্তাদি ইমামের পেছনে চুপ থাকবে এবং কোনও কিছুই (না ফাতিহা, না অন্য কিছু) পড়বে না। যদিও শাইখ আলবানি হানাফিদের এই মতটিকে দুর্বল (মারজুহ) মনে করেন এবং “যে ব্যক্তি ফাতিহা পড়েনি তার সালাত হয়নি”—এই হাদিসটিকেই সঠিক মনে করেন তবুও তিনি মনে করেন এই হাদিসটি একেবারে ব্যতিক্রমহীন নয়। কারণ একাধিক সাহাবি থেকে প্রমাণিত আছে যে, দেরিতে জামাতে আসা মুক্তাদি (মাসবুক) যদি ইমামকে রুকু অবস্থায় পায় তবে সে ফাতিহা পড়তে না পারলেও ওই রাকাত তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। এ কারণেই এই হাদিসটিকে “আম মাখসুস” العامِّ المخصوص বা এমন একটি সাধারণ হুকুম বলা হয় যার নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম রয়েছে। অর্থাৎ নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিস—”যে ব্যক্তি ফাতিহা পড়েনি, তার সালাত হয়নি”—এটি মূলত সাধারণ একটি নিয়ম। তবে মাসবুক বা দেরিতে আসা ব্যক্তি যখন ইমামকে রুকুতে পান তখন তিনি ফাতিহা পড়ার সুযোগ না পেলেও তাঁর রাকাত আদায় হয়ে যায়। সাহাবিদের আমল দ্বারা প্রমাণিত এই ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ নিয়মের ভেতর এটি একটি নির্দিষ্ট ছাড়। তাই আপনার যদি মনে হয় যে ফাতিহা শেষ করতে গেলে ইমাম রুকু থেকে মাথা তুলে ফেলবেন, তবে আর দেরি না করে সাথে সাথে রুকুতে চলে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে; অসম্পূর্ণ ফাতিহা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার কিছু নেই।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

লোবানের পরিচয় ও স্বাস্থ্যগত উপকারিতা এবং লোবান খাওয়ার ব্যাপারে কতিপয় হাদিস

 নিম্নে লোবানের পরিচয় এবং তার স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন উপকারিতা উল্লেখ করার পর এ সংক্রান্ত বর্ণিত হাদিস ও আসার সমূহের সংক্ষিপ্ত তাহকিক পেশ করা হল:

❑ লোবান বা কন্দুর পরিচয়:
লোবান হলো, এক ধরণের সুগন্ধযুক্ত প্রাকৃতিক আঠা বা রজন, যা প্রধানত ‘বোসওয়েলিয়া’ (Boswellia) প্রজাতির গাছের ছাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। এটি দেখতে কিছুটা স্বচ্ছ পাথরের টুকরো বা স্ফটিকের মতো এটি অতি প্রাচীন একটি ঔষধি উপাদান। সাধারণত লোবান পুড়িয়ে সুগন্ধি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ঘরবাড়িতে লোবান পোড়ালে এর সুগন্ধি ধোঁয়া বাতাসের দুর্গন্ধ দূর করার পাশাপাশি পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। এটি আগরবাতি এবং আতরেও ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ওমান, ইয়েমেন, সোমালিয়া ও ভারতে ভালো জাতের লোবান পাওয়া যায়।
❑ লোবানের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা:
• কফ ও সর্দি-কাশি উপশম: লোবানের বাষ্প বা নির্যাস বুক ও গলার জমে থাকা কফ পরিষ্কার করতে এবং হাঁপানি বা সর্দির অস্বস্তি কমাতে বেশ কার্যকর।
• বাতের ব্যথা ও প্রদাহ কমানো: এতে শক্তিশালী প্রদাহ রোধী (anti-inflammatory) উপাদান রয়েছে, যা হাড়ের জোড়ায় বাত বা প্রদাহজনিত ব্যথা উপশমে সাহায্য করে।
• মানসিক প্রশান্তি ও চাপ হ্রাস: এর প্রাকৃতিক সুগন্ধ মস্তিষ্কের স্নায়ুকে শিথিল করে, যা মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও অনিদ্রা দূর করতে বেশ সহায়ক।
• মুখের স্বাস্থ্য রক্ষা: লোবান চিবানোর অভ্যাস মুখের ভেতরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে, দুর্গন্ধ দূর করে এবং মাড়ি মজবুত রাখে।
• ত্বকের বার্ধক্য রোধ: লোবানের তেল বা নির্যাস ত্বকের বলিরেখা ও বয়সের ছাপ দূর করে ত্বককে সতেজ ও উজ্জ্বল রাখতে ব্যবহৃত হয়।
• পরিবেশ বিশুদ্ধিকরণ: ঘরবাড়িতে লোবান পোড়ালে এর সুগন্ধি ধোঁয়া বাতাসের দুর্গন্ধ দূর করার পাশাপাশি পরিবেশ জীবাণুমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
➧ উল্লেখ্য যে, লোবান ও ধূপ এক নয়। লোবান হলো নির্দিষ্ট গাছের প্রাকৃতিক সুগন্ধি আঠা, যা পোড়ালে ধূপের মতো সুগন্ধি ধোঁয়া দেয়। তাই সবাই একে ধূপ বললেও, বাজারের সাধারণ সব ধূপ খাঁটি লোবান নয়।
❑ লোবান খাওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত হাদিস কি শুদ্ধ?
প্রশ্ন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি কখনো বলেছেন:
أَكْلُ اللَّبَانِ يُورِثُ الْحِفْظَ وَيُذْهِبُ النِّسْيَانَ وَيَقْطَعُ الْبَلْغَمَ
“লোবান বা কন্দুর খাওয়া স্মরণশক্তি বাড়ায়, ভুলে যাওয়ার সমস্যা দূর করে এবং কফ বিনাশ করে”? এ কথাটি কি তাঁর থেকে সহিহ সূত্রে প্রমাণিত?
উত্তর: সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য, আর দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর। এরপর বক্তব্য হলো━ “আল মুজামুল ওয়াসিত” (২/৮১৪) গ্রন্থে লোবানের পরিচয় দিতে গিয়ে বলা হয়েছে: “এটি সুগন্ধযুক্ত উদ্ভিদের একটি প্রজাতি, যা থেকে আঠা বা রজন নির্গত হয় এবং একে ‘কন্দুর’ বলা হয়।” আর আল্লামা ইবনে মুফলিহ আল হাম্বলি “আল আদাব আশ শারইয়্যাহ” (২/৪০৩) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, একে “হাসা লুবান” বা লোবানের কঙ্কর বা দানা’ও বলা হয়।
(লোবান বা কন্দুর যখন গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয় তখন এটি শুকিয়ে ছোট ছোট স্বচ্ছ দানা, পাথর বা স্ফটিকের টুকরোর মতো আকার ধারণ করে। দেখতে অনেকটা ছোট নুড়ি পাথরের মতো লাগার কারণেই একে আরবিতে “হাসা লোবান” বা লোবানের দানা বলা হয়ে থাকে।) হাদিসে এই গাছ বা উপাদানের কোনও উল্লেখ পাওয়া যায়নি। কোনও মুহাদ্দিস এর কোনও সনদ বর্ণনা করেননি এবং হাদিসের কোনও প্রামাণ্য গ্রন্থেই এর কোনও মূল বা সনদ আমাদের নজরে আসেনি। অবশ্য আব্দুল মালিক ইবনে হাবিব আল কুরতুবি (মৃত্যু: ২৩৮ হিজরি) খাদ্য ও চিকিৎসা ভিত্তিক তাঁর একটি ছোট গ্রন্থে (পৃষ্ঠা: ৪১) কোনও ধরনের সনদ বা সূত্র ছাড়াই এটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন:
রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“أكل اللبان يُورث الْحِفْظ وَيذْهب النسْيَان وَيقطع البلغم”
“লোবান খাওয়া স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে, ভুলে যাওয়া দূর করে এবং কফ দূর করে।” অতঃপর তিনি নিজেই এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: “লোবান খাওয়া কফ দূর করে আর যে জিনিসই কফ দূর করে সেটিই ভুলে যাওয়া দূর করে এবং স্মরণশক্তি বাড়ায়।”
তবে হাদিস শাস্ত্রের মূলনীতি অনুযায়ী, কোনও বর্ণনাকে সহিহ বা গ্রহণযোগ্য প্রমাণ করার জন্য এ ধরনের বক্তব্য যথেষ্ট নয়। বরং এর সঠিক সনদ ও উৎস খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এটি ঝুলন্ত বা ভিত্তিহীন কথাই থেকে যায়। যেহেতু কথাটি প্রমাণিত নয় তাই কারো পক্ষ থেকেই এটি হাদিস হিসেবে বর্ণনা করা বা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর চালিয়ে দেওয়া কিছুতেই জায়েজ নয়। কারণ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন:
“مَنْ يَقُلْ عَلَيَّ مَا لَمْ أَقُلْ فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ”
“যে ব্যক্তি আমার পক্ষ থেকে এমন কোনও কথা বলে যা আমি বলিনি, সে যেন তার ঠিকানা জাহান্নামে বানিয়ে নেয়।” [সহিহ বুখারি: ১০৯]
আল্লাহু আলাম। (সবকিছু ভালো জানেন একমাত্র আল্লাহ)। [Islamqa info]
❑ লোবান সংক্রান্ত অন্যান্য হাদিসগুলো সংক্ষিপ্ত তাহকিক:
উপরে লোবানের ব্যাপারে একটি হাদিসের ব্যাপারে মুহাদ্দিসগণের মতামত দেওয়া হয়েছে। নিম্নে আরও কয়েকটি হাদিস ও আসারের সংক্ষিপ্ত তাহকিক পেশ করা হলো:
✪ ১. ইবনে আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর আসার:
“عليكم باللبانِ فإنه يمسحُ الحزنَ من القلبِ كما يمسحُ الأصبعُ العرَقَ عن الجبينِ وإنه يشدُّ القلبَ ويزيدُ في العقلِ ويُذَكِّي الذهنَ ويجلو البصرَ ويُذهبُ النسيانَ”
“তোমরা লোবান ব্যবহার করো; কেননা তা হৃদয় থেকে দুশ্চিন্তা দূর করে, যেভাবে আঙুল কপাল থেকে ঘাম মুছে ফেলে। এটি হৃদয়কে মজবুত করে, বুদ্ধিমত্তা বাড়ায়, মেধা তীক্ষ্ণ করে, দৃষ্টিশক্তি পরিষ্কার করে এবং ভুলে যাওয়া দূর করে।”
➧ এ হাদিসটি দুর্বল। কারণ এর সনদে মুহাম্মদ ইরাহিম ইবনে আমর ইবনে ইউসুফ রয়েছেন। মুহাদ্দিস ইবনে মানদাহ বলেছেন, “তিনি মুনকার বা আপত্তিকর হাদিস বর্ণনা করতেন।”
আর আলি ইবনে যানজওয়াইহ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, “আমি তাঁকে চিনি না।” [ইবনে ইরাক আল কিনানি, তানজিহুশ শারিয়াহ ২/২৬২]
✪ ২. আলি রা.)-এর উক্তি: (জইফ বা দুর্বল)
“عليكم باللبان فإنه يشجع القلب ويذهب بالنسيان”
“তোমরা লোবান ব্যবহার করো; কেননা তা হৃৎপিণ্ডকে সবল করে এবং বিস্মৃতি বা ভুলে যাওয়ার সমস্যা দূর করে।”
➧ এটিও দুর্বল। এই উক্তটি আবু নুয়াইম তার আত ত্বিব্বুন নব্বীতে দু জায়গায় বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তার উল্লেখিত সনদও দুর্বল (মুনকার)। এতে সুলাইমান ইবনে সালমাহ ও ইয়াহইয়া বিন সাঈদ আল আত্তার-এর মতো দুর্বল ও মাতরূক রাবি (মুহাদ্দিসগণের নিকট পরিত্যক্ত ও অগ্রহণযোগ্য বর্ণনাকারী) রয়েছেন। এর আরেকটি সনদও রয়েছে। কিন্তু সেটাও দুর্বল।
৪. আলি (রা.) এর নামে লুবানের তেল মালিশ সংক্রান্ত বর্ণনা: (জাল বা বানোয়াট)
“ادَّهِنوا بالِّلبانِ فإنه أحظى لكم عند نسائِكم”
“তোমরা লোবান দ্বারা তেল মালিশ করো। কেননা এটি স্ত্রীদের কাছে তোমাদের আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।”
➧ এই বর্ণনাটি মউজু বা জাল। এটি আহলে বাইত (আলি রা. এর) নামে মিথ্যাচার। এর শায়েখ বা বর্ণনাকারীগণ অপরিচিত। এর আদভী একজন কাযযাব বা মিথ্যুক বর্ণনাকারী। [ইবনুল কায়সারানি, যখিরাতুল হুফফাজ (১/২৬০]
সারাংশ: লোবান ঔষধি গুণ সম্পন্ন ও অত্যন্ত উপকারী বস্তু। কিন্তু এর উপকারিতা সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে কোনও হাদিস বা কোনও সাহাবি থেকে এর সংক্রান্ত বিশুদ্ধ সূত্রে আসার সাব্যস্ত হয়নি।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

Translate