April 03, 2024

রমজানের শেষ দশক এবং হাজার মাসের চেয়েও সেরা একটি রাত

 সুপ্রিয় ভাই ও বোন, দেখতে দেখতে মাহে রমজান আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে। আমরা এসে পৌঁছেছি শেষ দশকে। সৌভাগ্যবান লোকেরা এ মাসে আঁচল ভরে পাথেয় সংগ্রহ করছে আর হতভাগারা এখনো অন্ধকারের অলি-গলিতে উদভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কল্যাণের বারি বর্ষণ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। বন্ধ হয়ে যায়নি তওবার দরজা বরং আরও বেশি সুযোগ নিয়ে মাহে রমজানের শেষ দশক আমাদের মাঝে সমাগত। আজকের এই পোস্টে দেখব, আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য এতে কী উপহার সাজিয়ে রেখেছেন এবং আমরা কীভাবে তা সংগ্রহ করতে পারব।

প্রিয় পাঠক, আসুন, আমরা আল্লাহর দেওয়া উপহারগুলো দুহাত ভরে কুড়িয়ে রমজানকে আরও অর্থবহ করে তুলি। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দান করুন। আমিন।

❑ রমজানের শেষ দশকে ইবদের ক্ষেত্রে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কঠোর পরিশ্রম:

◆ ১. রমজানের শেষ দশকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্ত্রী-পরিবার সহ সারা রাত জেগে ইবাদত করতেন:

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ شَدَّ مِئْزَرَهُ ، وَأَحْيَا لَيْلَهُ ، وَأَيْقَظَ أَهْلَهُ

“রমজানের শেষ দশক প্রবেশ করলে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোমর বেঁধে নিতেন, নিজে সারা রাত জাগতেন এবং পরিবারকেও জাগাতেন।”[1]

কোমর বাধার অর্থ হল: পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়ে চেষ্টা-সাধনায় লিপ্ত হওয়া। কোন কোন আলেম এর ব্যাখ্যায় বলেন, স্ত্রী সহবাস থেকে দূরে থাকা।

◆ ২. রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশকে যত বেশি পরিশ্রম করতেন অন্য কখনো করতেন না:

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَجْتَهِدُ فِى الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مَا لاَ يَجْتَهِدُ فِى غَيْرِهِ

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমজানের শেষ দশকে (ইবাদত-বন্দেগিতে) যে পরিমাণ পরিশ্রম করতেন অন্য কখনো করতেন না।” [2]

❑ শবে কদর:

◆ ১. শবে কদরে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে: আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ

“আমি একে (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি শবে কদরে।” [সূরা কদর: ১]

◆২. শবে কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম:

আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ

“শবে কদর এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” [সূরা কদর: ৩]

◆৩. আল্লাহ তাআলা শবে কদরকে বরকতময় রাত বলে উল্লেখ করেছেন:

আল্লাহ তাআলা বলেন,

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ

“নিশ্চয় আমি ইহা (কুরআন)কে অবতীর্ণ করেছি একটি বরকতময় রাতে।” [সূরা দুখান: ৩] (আর এ রাত হল শবে কদর।)

◆. শবে কদরে রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি করলে পূর্বের সকল ছোট গুনাহ মোচন হয়ে যায়:

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَنْ قَامَ لَيْلَةَ الْقَدْرِ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ

“যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সোয়াবের আশায় শবে কদরে রাত জাগরণ করে নফল নামাজ ও ইবাদত বন্দেগি করবে তার পূর্বের সকল (ছোট) গুনাহ মোচন করে দেয়া হবে।” [3]

❑ শবে কদর কখন হবে?

শবে কদর হবে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে:

◈ ক. আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

« تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِى الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ »

“তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে শবে কদর অনুসন্ধান কর।” [4]

◈ খ. আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

« أُرِيتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ ثُمَّ أَيْقَظَنِى بَعْضُ أَهْلِى فَنُسِّيتُهَا فَالْتَمِسُوهَا فِى الْعَشْرِ الْغَوَابِرِ

স্বপ্নে আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হল। কিন্তু আমার এক স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়ায় আমি তা ভুলে গিয়েছি। অতএব তোমরা তা রমজানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর।” [5]
কোন কোন বর্ণনায় রয়েছে, দু ব্যক্তির বিবাদের কারণে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা ভুলে গেছেন।

❑ শবে কদর কি শুধু রমজানের সাতাইশ রাতের জন্য নির্দিষ্ট?

আমাদের দেশে সাধারণত: মানুষ শুধু রমজানের সাতাইশ তারিখে রাত জেগে ইবাদত বন্দেগি করে এবং ধারণা করে এ রাতেই শবে কদর অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু এ ধারণা, সুন্নতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কারণ আয়েশা রা. হতে বর্ণিত রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

« تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِى الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ

“তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।” [6]

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

«أُرِيتُ لَيْلَةَ الْقَدْرِ ثُمَّ أَيْقَظَنِى بَعْضُ أَهْلِى فَنُسِّيتُهَا فَالْتَمِسُوهَا فِى الْعَشْرِ الْغَوَابِرِ»

স্বপ্নে আমাকে লাইলাতুল কদর দেখানো হল। কিন্তু আমার এক স্ত্রী আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়ায় আমি তা ভুলে গিয়েছি। অতএব, তোমরা তা রমজানের শেষ দশকে অনুসন্ধান কর।” [7]

❑ শেষ সাত দিনের বেজোড় রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি:
যেমন: নিম্নোক্ত হাদিসটি-

ابْنِ عُمَرَ – رضى الله عنهما – أَنَّ رِجَالاً مِنْ أَصْحَابِ النَّبِىِّ – صلى الله عليه وسلم – أُرُوا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِى الْمَنَامِ فِى السَّبْعِ الأَوَاخِرِ ، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ – صلى الله عليه وسلم – « أَرَى رُؤْيَاكُمْ قَدْ تَوَاطَأَتْ فِى السَّبْعِ الأَوَاخِرِ ، فَمَنْ كَانَ مُتَحَرِّيَهَا فَلْيَتَحَرَّهَا فِى السَّبْعِ الأَوَاخِرِ »

ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত যে, কয়েকজন সাহাবি রমজানের শেষ সাত রাত্রিতে স্বপ্ন মারফত শবে কদর হতে দেখেছেন। সাহাবিদের এ স্বপ্নের কথা জানতে পেরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমি দেখছি তোমাদের স্বপ্নগুলো মিলে যাচ্ছে শেষ সাত রাত্রিতে। অত:এব কেউ চাইলে শেষ সাত রাত্রিতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করতে পারে।” [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]। এ মর্মে আরও হাদিস রয়েছে।
কোন কোন সালাফে-সালেহীন সাতাইশ রাত শবে কদর হওয়ার অধিক সম্ভাবনাময় বলে উল্লেখ করেছেন। সাহাবিগণের মধ্যে ইবনে আব্বাস রা., মুয়াবিয়া, উবাই ইবনে কা’ব রা. এর মতামত থেকে এটাই বুঝা যায়।

কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এভাবে নির্দিষ্ট করে লাইলাতুল কদর হওয়ার কোন হাদিস নাই। তাই উপরোক্ত সাহাবিদের কথার উপর ভিত্তি করে বড় জোর সাতাইশে রাতে শবে কদর হওয়াকে অধিক সম্ভাবনাময় বলা যেতে পারে। নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। সঠিক কথা হল, শবে কদর কখনো ২১, কখনো ২৩, কখনো ২৫, কখনো ২৭ আবার কখনো ২৯ রাতে হতে পারে।

সুতরাং শুধু সাতাইশ তারিখ নয় বরং কোন ব্যক্তি যদি রমজানের শেষ দশকের উপরোক্ত পাঁচটি রাত জাগ্রত হয়ে ইবাদত-বন্দেগি করে তবে নিশ্চিতভাবে শবে কদর পাবে। কিন্তু শুধু সাতাইশ রাত জাগলে শবে কদর পাবে তার কোন নিশ্চয়তা নাই। বরং অন্যান্য রাত বাদ দিয়ে শুধু সাতাইশ রাত উদযাপন করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। বিশেষ করে আমাদের দেশে যেভাবে শুধু সাতাইশ তারিখ নির্দিষ্ট করে নেয়া হয়েছে সেটা বিদআত ছাড়া অন্য কিছু নয়। তাই বিদআত বর্জন করে সুন্নতি পন্থায় আমল করা আমাদের জন্য অপরিহার্য।

❑ শবে কদরের বিশেষ দুআ:

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, হে আল্লাহর রসুল, আমি যদি জানতে পারি যে, কোন রাতটি লাইলাতুল কদর তাহলে তখন কোন দুআটি পাঠ করব? তিনি বললেন, তুমি বল:

اللَّهمَّ إنَّك عفُوٌّ تُحِبُّ العفْوَ، فاعْفُ عنِّي

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নী।

“হে আল্লাহ, আপনি মহানুভব ক্ষমাশীল। আপনি ক্ষমা করা পছন্দ করেন। অত:এব আপনি আমাকে ক্ষমা করুন।” [তিরমিযী, অনুচ্ছেদ, কোন দুআটি শ্রেষ্ঠ। তিনি বলেন, হাদিসটি হাসান-সহীহ। শাইখ আলবানী রহ. এ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। দ্র: সহীহুত তিরমিযী, হা/৩৫১৩]

❑ ইতিকাফ:

▪ ক) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত:

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। আল্লাহ তাআলা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মৃত্যু দেয়া পর্যন্ত রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। তাঁর ওফাতের পর তাঁর স্ত্রীগণ ইতিকাফ করেছেন।”[সহীহ বুখারী]

আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি রমজানে দশ দিন ইতিকাফ করতেন। এক বছর সফরে যাওয়ায় ইতিকাফ করতে পারেন নি। তাই যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন সে বছর বিশ দিন ইতিকাফ করেন। [8]

▪ খ) ইতিকাফ সংক্রান্ত ভুল ধারণা:

আমাদের দেশে মনে করা হয় যে সমাজের পক্ষ থেকে এক ব্যক্তিকে অবশ্যই ইতিকাফে বসতে হবে তা না হলে সবাই গুনাহগার হবে। কিন্তু এ ধারণা মোটেই ঠিক নয়। কারণ, ইতিকাফ হল একটি সুন্নত ইবাদত। যে কোন মুসলমান তা পালন করতে পারে। যে ব্যক্তি তা পালন করবে সে অগণিত সোওয়াবের অধিকারী হবে। সবার পক্ষ থেকে একজনকে ইতিকাফে বসতেই হবে এমন কোন কথা শরীয়তে নেই।

আল্লাহ তাআলা সকল ক্ষেত্রে তার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নতকে যথাযথভাবে পালন করার তাওফিক দান করুন এবং সকল বিদআত ও সুন্নত বিরোধী কার্যকলাপ থেকে হেফাজত করুন। আমিন।

রেফারেন্স:

[1] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: শবে কদরের ফজিলত। সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ইতিকাফ।
[2] সহীহ মুসলিম: রমজানের শেষ দশকে (ইবাদত-বন্দেগিতে) বেশি বেশি পরিশ্রম করা।
[3] সহীহ বুখারী, অনুচ্ছেদ: যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সোয়াবের আশায় রোজা রাখে।
[4] সহীহ বুখারী, অনুচ্ছেদ: রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে শবে কদর অনুসন্ধান করা।
[5] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: লাইলাতুল কদরের ফজিলত।
[6] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: লাইলাতুল কদরের ফজিলত। সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: রোজা।
[7] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: লাইলাতুল কদরের ফজিলত।
[8] মুসনাদ আহমাদ, সুনান আবু দাউদ, অধ্যায়: রোজা, তিরমিযী, অধ্যায়: রোজা অনুচ্ছেদ। আল্লামা আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

সেজদার ক্ষেত্রে মহিলাদের পেছনের অংশ মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদিসটি জইফ বা দুর্বল

 প্রশ্ন: নিচের হাদিসটি মান অথবা গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? ইমাম আবু দাউদ রাহ. তাঁর কিতাবুস সুনানের কিতাবুল মারাসীলে বিখ্যাত ইমাম ইয়াযিদ ইবনে আবি হাবিব রাহ.-এর সূত্রে হাদিস বর্ণনা করেন যে,

أن النبى مر على امرأتين تصليان فقال : اذا سجدتما فضما بعض اللحم الى الأرض، فان المرأة ليست فى ذلك كالرجل.

“আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুইজন মহিলার পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন। তারা নামাজ পড়ছিল। তিনি তাদের বললেন, “যখন তোমরা সিজদা করবে তোমাদের শরীরের কিছু অংশ, (অর্থাৎ পিছনের অংশ) মাটির সাথে মিলিয়ে রাখবে। কারণ নারী এই ক্ষেত্রে পুরুষের মত নয়।”

[সূত্র: মারাসিলে আবু দাউদ, হাদিস ৮৭; সুনানে কুবরা, বায়হাকি, হাদিস ৩২০১; মারিফাতুস সুনানি ওয়াল আসার, বায়হাকি, হাদিস ৪০৫৪]

উত্তর: প্রায় সকল মুহাদ্দিস একমত যে, এ হাদিসটি জইফ বা দুর্বল।

নিচে এ বিষয়ে কয়েকজন মুহাদ্দিসের অভিমত দেওয়া হল:

১. বাইহাকি বলেন, মুনকাতি (বিচ্ছিন্ন সনদ) [এটি দুর্বল হাদিসের অন্তর্ভুক্ত]। [সুনানে কুবরা ২/২২৩]

الراوي:يزيد بن أبي حبيب المحدث:البيهقي المصدر:السنن الكبرى للبيهقي الجزء أو الصفحة:2/223 حكم المحدث:منقطع، وهو أحسن من الموصولين قبله

২) ইবনে হাজার আসকালানী বলেন, মুরসাল [এটিও দুর্বল হাদিসের অন্তর্ভুক্ত]। তবে অন্য অবিচ্ছিন্ন আরও দুনটি সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর উভয়টির মধ্যেই متروك ّপরিত্যক্ত বর্ণনাকারী” রয়েছে। [আত তালখিসুল হাবির, ১/৩৯৪]

الراوي:يزيد بن أبي حبيب المحدث:ابن حجر العسقلاني المصدر:التلخيص الحبير الجزء أو الصفحة:1/394 حكم المحدث:مرسل ومن طريقين موصولين، لكن في كل منهما متروك
‘‘
৩) যাহাবী বলেন, মুরসাল হাদিস সমূহের মধ্যে এটি সর্বাধিক দুর্বল।

الراوي:يزيد بن أبي حبيب المحدث:الذهبي المصدر:المهذب الجزء أو الصفحة:2/662 حكم المحدث:من أضعف المراسيل

তিনি আরও বলেছেন, এর সনদে ইসহাক বিন ওয়াসেল নামক একজন বর্ণনাকারী আছে, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত (অর্থাৎ সে চরম ভাবে
প্রত্যাখ্যান যোগ্য)। [মিযানুল ইতিদাল ১/২০২]

الراوي:- المحدث:الذهبي المصدر:ميزان الاعتدال الجزء أو الصفحة:1/202 حكم المحدث:[فيه] إسحاق بن واصل من الهلكى

৪) ইবনে আসাকির বলেন, এর সনদে একজন বর্ণনাকারী আছে যার নাম: সাঈদ বিন আব্দুল্লাহ বিন দিনার। আবু হাতিম তাকে মাজহুল বা অজ্ঞাত পরিচয় বলে উল্লেখ করেছেন। [তারিখে দিমাশক, ২১/১৭১]

الراوي:الحسن البصري المحدث:ابن عساكر المصدر:تاريخ دمشق الجزء أو الصفحة:21/171 حكم المحدث:مرسل [وفيه] سعيد بن عبد الله بن دينار قال أبو حاتم مجهول

৫) ইবনে আদি বলেন, غير محفوظ “হাদিসটি যথাযথভাবে সংরক্ষিত হয়নি।” [আল কামিল ফিয যুয়াফা, ৬/৪৫১]

الراوي:أبو سعيد الخدري المحدث:ابن عدي المصدر:الكامل في الضعفاء الجزء أو الصفحة:6/451 حكم المحدث:غير محفوظ

৬) ইবনুল কায়সারানী বলেন, এর সনদে ঈসা বিন সুলাইমান নামক যে বর্ণনাকারী আছে সে দুর্বল। [যাখীরাতুল হুফফায, ৪/২০৯১]

الراوي:أبو سعيد الخدري المحدث:ابن القيسراني المصدر:ذخيرة الحفاظ الجزء أو الصفحة:4/2091 حكم المحدث:[فيه] عيسى بن سليمان ضعيف

৭) আলবানি বলেন, জইফ বা দুর্বল। [যঈফুল জামে, ৫৪৪]
إذا سَجَدْتُما فضُمَّا بعضَ اللحمِ إلى الأرضِ ، فإنَّ المرأةَ لَيْسَتْ في ذلك كالرجلِ
الراوي:يزيد بن أبي حبيب المحدث:الألباني المصدر:ضعيف الجامع الجزء أو الصفحة:544 حكم المحدث:ضعيف

সুতরাং আমাদের দেশে মহিলারা যেভাবে সেজদার সময় তার পেছনের অংশ মাটিতে মিশিয়ে দেয় তা সঠিক নয়। কেননা এ বিষয়ে কোনও সহিহ হাদিস সাব্যস্ত হয়নি। সুতরাং যথারীতি তারাও পুরুষদের অনুরূপ সেজদা প্রদান করবেন। আল্লাহু আলাম। ▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

মুসলমান শব্দ ব্যবহারে কোনও আপত্তি আছে কি নাকি মুসলিম শব্দ ব্যবহার করা জরুরি

 প্রশ্ন: আমরা নিজেদের ‘মুসলিম’ বা ‘মুসলমান’ বলে থাকি। কিন্তু ‘মুসলমান’ শব্দটির ব্যাবহার কুরআন ও হাদিস কতটুকু সমর্থন করে? একজন আলিম থেকে শুনলাম যে, ‘মুসলিম’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে; ‘মুসলমান’ শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না। এটি কতটুকু সঠিক?

উত্তর: মূলত: ‘মুসলিম’ আরবি আর ‘মুসলমান’ ফারসি শব্দ। দুটির অর্থ একই। আত্মসমর্পণ কারী বা ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। ফারসি ভাষায় এভাবে শব্দের শেষে ‘আন’ (আলিফ+নূন) যুক্ত প্রচুর শব্দ রয়েছে। যেমন: মেহমান, মেজবান, মেহেরবান ইত্যাদি। পাক-ভারত উপমহাদেশ এক সময় ফারসি ভাষী মুসলিমগণ বহু বছর শাসন করার ফলে অত্র অঞ্চলে প্রচুর ফারসি শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। একই কারণে বাংলা ভাষায় এ জাতীয় বহু আরবি, ফারসি, উর্দু ইত্যাদি শব্দের আত্তীকরণ ঘটেছে।

ইতিহাস বলে, ষোড়শ শতকের শেষদিকে সম্রাট আকবরের সময়ে বঙ্গদেশ মোগল সাম্রাজ্যভুক্ত হলে ফারসি শব্দ বাংলায় প্রবেশ করতে থাকে। বাংলা ভাষায় আরবি-ফারসি-তুর্কি শব্দের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। যেমনটি পরবর্তীতে ইংরেজ শাসনের কারণে বহু ইংরেজি শব্দ এ সব অঞ্চলের মানুষের ভাষার মধ্যে স্থান দখল করে নিয়েছে।

এভাবে বিভিন্ন ভাষার সমন্বয়ে আমাদের নিজস্ব ভাষার শব্দ ভাণ্ডার বৃদ্ধি পেয়েছে, হয়েছে উন্নত, সমৃদ্ধ ও গতিশীল।

সুতরাং কোন বিদেশী শব্দ যখন অন্য ভাষায় একাকার হয়ে প্রাত্যহিক জীবনে সাধারণ মানুষের ভাষায় রূপান্তরিত হয় এবং অভিধান ও ভাষা সাহিত্যে তার স্থান দখল করে নেয় তখন তাকে সে দেশের ভাষার অংশ হিসেবে গণ্য করতে হয়। আলাদাভাবে ভাবার কোনও সুযোগ থাকে না বরং তা পরিবর্তন করাকেই ভাষা বিকৃতির শামিল বলে গণ্য হয়।

সুতরাং বাংলা, উর্দু, হিন্দি, ফারসি ইত্যাদি ভাষায় যখন ‘মুসলমান’ শব্দটি আরবি ‘মুসলিম’ শব্দকেই নির্দেশ করে এবং একই অর্থ বহন করে তখন তা ব্যবহারে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনও আপত্তি থাকে না-যদি না তার মধ্যে শরিয়ার সাথে সাংঘষির্ক কোন কিছু থাকে। এমন অনেক ফারসি ইসলামি শব্দ আমাদের মুসলিম সমাজে প্রচলিত রয়েছে। যেমন: নামাজ, রোজা, বেহেশত, ফেরেশতা, পয়গম্বর, জায়নামায, মুর্দা,নেকি, গোনাহ, নেককার, বদকার, পরহেজগার ইত্যাদি। এগুলোর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

অনুরূপভাবে দুনিয়াবি বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বাংলা ভাষায় অসংখ্যা ফাসরি শব্দের প্রচল আছে। যেমন: কারখানা, চশমা, জবানবন্দি, দরবার, দস্তখত, বাদশাহ, বান্দা, আওয়াজ, আন্দাজ, পর্দা, বাগান, রাস্তা বেহায়া, বেশরম, বেহাল, বেগম ইত্যাদি।

সুতরাং “মুসলমান’ শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না এ বক্তব্য সঠিক নয়।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

March 29, 2024

ইহুদিদের লাল গাভীর রহস্য এবং ইসলামের দৃষ্টিতে কিয়ামতের আলামতের সাথে এর সম্পর্ক

 প্রশ্ন: ফেসবুকে লাল গাভী নিয়ে খুব পোস্ট হচ্ছে। এটা নাকি দজ্জাল আগমনের আলামত। এ কথাটার সত্যতা কতটুকু?

উত্তর: ইহুদিদের বিকৃত ধর্মগ্রন্থের ভাষ্যমতে, কিয়ামত সংঘটিত সময় ঘনিয়ে এলে পৃথিবীতে একটি লাল গাভী জন্ম নিবে। সেই লাল গাভী জন্ম হওয়ার পর মাঝ বয়সে উপনীত হলে তারা সেটিকে আগুনে পুড়িয়ে ছাই করে সেই ছাই মেখে ইহুদি সম্প্রদায় পবিত্র হবে। এই ছাই মাখা ছাড়া ইহুদিরা পবিত্র হবে না।

তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী লাল গাভী বের হওয়ার পরই বর্তমান বায়তুল মাকদিস মসজিদ এবং The Dome of the Rock (القبة الصخراء) ভেঙ্গে সেখানে তারা একটি হায়কাল বা উপাসনালয় নির্মাণ করবে বা মাটির নিচের প্রথিত অবস্থায় আছে তা মাটি খুঁড়ে উত্তোলন করবে। এটি হবে তৃতীয় হায়কাল।
তাদের বিশ্বাস মতে, এই হায়কাল বা উপাসনালয়ে কেবল পবিত্র ইহুদিরাই ঢোকার সুযোগ পাবে; অন্যরা নয়।

উল্লেখ্য যে, এর পূর্বে আরও দু বার হায়কাল নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রথমবার নির্মাণ করেছিলেন নবী সুলাইমান আলাইহিস সালাম। কিন্তু পরবর্তীতে সেগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়।

◈ কী সেই লাল গাভী?

তাওরাতে বলা আছে, কোনো ব্যক্তি লাশ স্পর্শ করলে সে সাতদিন পর্যন্ত অপবিত্র থাকে। তাকে পবিত্র করতে হলে লাশ স্পর্শ করার তৃতীয় ও সপ্তম দিনে একধরনের বিশেষ শুদ্ধকরণ পানিতে তাকে গোসল করিয়ে পবিত্র করতে হবে। তা না হলে সে অপবিত্রই থেকে যাবে। সেই বিশেষ পবিত্রকরণ পানি তৈরি করতে লাগবে বিশেষ একটি গরু। যেহেতু সেই লাল গরুর সন্ধান এতদিন পাওয়া যায়নি, তাই পুরো ইহুদি জাতি তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী ‘অপবিত্র’ হয়ে আছে। তাই তারা বিশ্বের সর্বত্র এই লাল গাভী খুঁজে বেড়াচ্ছে!

তাওরাতের ভাষ্য অনুযায়ী, গরুটির প্রতিটি পশমকে লাল রঙের হতে হবে। একটি পশমও লাল ছাড়া অন্য রঙের হলে হবে না। গরুটির গায়ে কোনো কাটাছেঁড়া বা খুঁত থাকতে পারবে না। গরুটিকে একেবারে কম বয়সী হলেও হবে না, আবার বুড়ো হলেও হবে না; সেটিকে হতে হবে মাঝারি বয়সের। সেটির কাঁধে কখনো পানি সেচার কিংবা জমি চাষের জোয়াল পড়লে চলবে না। তার ঘাড়ের পশমকে খাড়া হতে হবে। এই গরুকে বিশেষ প্রার্থনা সহযোগে জবাই করার পর পুরো দেহটি পুড়িয়ে ফেলতে হবে। সেই ছাই পানিতে মিশিয়ে শুচিকরণ পানি তৈরি করতে হবে। সেই পানি দিয়ে যাজকেরা পবিত্র হবে। এর মধ্য দিয়ে পুরো ইহুদি জাতি পবিত্র হবে। ‘রেড কাউ’ শব্দবন্ধটি এই লাল গরুকে বোঝাতে পশ্চিমা সমাজে ব্যবহৃত হয়।

হয়তো এই বিবলিক্যাল ভাষ্যের কারণেই লাল রংয়ের গরুকে অনেক সমাজে বিশুদ্ধতার প্রতীক ভাবা হয়।

যাহোক, বহু খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে আমেরিকার টেক্সাসে অবস্থিত একটি গো খামারে এক লাল গাভীর সন্ধান পাওয়া গেছে।
কিন্তু গাভীর মালিক সেটি ইহুদিদের কাছে কোন মতেই মিলিয়ন ডলার দিয়ে ও বিক্রয় করতে রাজি নয়। উক্ত লাল গাভীকে কেন্দ্র করে ইহুদিদের ধর্মীয় উন্মাদনা নতুন ভাবে সৃষ্টি হয়েছে। এখন যে কোনও মূল্যে উক্ত লাল গাভী সংগ্রহ করে সেটিকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছাই বানিয়ে গায়ে মেখে দুনিয়ার নাপাক ইহুদিরা পাক হতে চায়। কিন্তু তাদের ভুলে গেলে চলবে না, এ সকল বানোয়াট গল্প দিয়ে মসজিদে আকসা ভেঙ্গে ফেলার গভীর ষড়যন্ত্র হলে মুসলিম বিশ্বে যুদ্ধের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠতে পারে। তখন ইনশাআল্লাহ উড়ে আসা জুড়ে বসা এই অভিশপ্ত ইহুদিদের অস্তিত্ব পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যাবে ইনশাআল্লাহ।

◈ লাল গাভীর সাথে ইসলামের সম্পর্ক কী? এটি কি কিয়ামতের আলামত?

প্রকৃতপক্ষে লাল গাভীর এই ভ্রান্ত বিশ্বাসের সাথে ইসলামের দূরতম কোনও সম্পর্ক নেই। এটি ইহুদিদের নিতান্তই ভিত্তিহীন ও অবান্তর বিশ্বাস। এটি তাদের ধর্মগুরুদের তৈরি করা মতবাদ বা বিকৃত তাওরাতে তাদের নিজেদের সংযোজন। আল্লাহ তাআলা কুরআনে তাদের তাওরাত বিকৃতির বিষয়টি ফাঁস করে দিয়েছেন। তারা ধর্মের নামে মিথ্যাচার করে মানুূষকে ধোঁকা দেয়। [দেখুন: সূরা মায়েদা-এর ১৩ ও ৪১ নম্বর আয়াত]

হে আল্লাহ, তুমি ইহুদিদের সকল ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করে মসজিদুল আকসা কে পুনরায় মুসলিমদের হাতে ফিরিয়ে দাও। নিশ্চয় তুমি দুআ কবুল কারী। আল্লাহু আলাম
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

March 28, 2024

রমজানে কবরের আজাব মাফ থাকে অথবা রমজানে মারা গেলে কবরের আজাব হয় না এ কথা কি সঠিক

 উত্তর: ‘রমজানে কবরের আজাব মাফ থাকে’ অথবা ‘রমজানে মারা গেলে কবরের আজাব হয় না’ ইত্যাদি কথাবার্তা হাদিস সম্মত নয়। বরং হাদিস সম্মত কথা হল, যদি কেউ দ্বীনদার ও সৎকর্ম শীল অবস্থায় মারা যায় তাহলে সে কবরে ফেরেশতাদের তিনটি প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত সেখানে শান্তি ও নিরাপদে অবস্থান করবে। আর কেউ যদি দুষ্কৃতিকারী ও পাপিষ্ঠ হয় তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। চাই সে রমজানে মারা যাক অথবা অন্য কোন সময়।

আর “যে ব্যক্তির কবরে শাস্তি হচ্ছে রমজান মাস শুরু হলে তার শাস্তি স্থগিত হয়” এমন কোন কথাও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। (আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমিন)

তবে হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রোজা রাখার পর সে অবস্থায় মৃত্যু বরণ করা জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম একটি কারণ।
নিম্নে এ সংক্রান্ত দুটি হাদিস ও শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বাজ রহ. এর দুটি ফতোয়া তুলে ধরা হল:

◈ কবরের আজাব সংক্রান্ত হাদিস:

আনাস রা. হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
الْعَبْدُ إِذَا وُضِعَ فِي قَبْرِهِ وَتُوُلِّيَ وَذَهَبَ أَصْحَابُهُ حَتَّى إِنَّهُ لَيَسْمَعُ قَرْعَ نِعَالِهِمْ أَتَاهُ مَلَكَانِ فَأَقْعَدَاهُ فَيَقُولاَنِ لَهُ مَا كُنْتَ تَقُولُ فِي هَذَا الرَّجُلِ مُحَمَّدٍ فَيَقُولُ أَشْهَدُ أَنَّهُ عَبْدُ اللهِ وَرَسُولُهُ فَيُقَالُ انْظُرْ إِلَى مَقْعَدِكَ مِنْ النَّارِ أَبْدَلَكَ اللهُ بِهِ مَقْعَدًا مِنْ الْجَنَّةِ قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَيَرَاهُمَا جَمِيعًا وَأَمَّا الْكَافِرُ أَوْ الْمُنَافِقُ فَيَقُولُ لاَ أَدْرِي كُنْتُ أَقُولُ مَا يَقُولُ النَّاسُ فَيُقَالُ لاَ دَرَيْتَ وَلاَ تَلَيْتَ ثُمَّ يُضْرَبُ بِمِطْرَقَةٍ مِنْ حَدِيدٍ ضَرْبَةً بَيْنَ أُذُنَيْهِ فَيَصِيحُ صَيْحَةً يَسْمَعُهَا مَنْ يَلِيهِ إِلاَّ الثَّقَلَيْنِ

“বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তাকে পেছনে রেখে তার সাথীরা চলে যায় (এতটুকু দূরে যে,) তখনও সে তাদের জুতার শব্দ শুনতে পায়। এমন সময় তার নিকট দু জন ফেরেশতা এসে তাকে বসিয়ে দেন।

অতঃপর তাঁরা প্রশ্ন করেন: এই ব্যক্তি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)। তাঁর সম্পর্কে তুমি কী বলতে?
তখন সে বলবে: আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রসুল।

তখন তাঁকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থানের জায়গাটি দেখে নাও, যার পরিবর্তে আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য জান্নাতে একটি স্থান নির্ধারিত করেছেন।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তখন সে দু’টি স্থান একই সময় দেখতে পাবে।

আর কাফির বা মুনাফিক বলবে, আমি জানি না। অন্য লোকেরা যা বলত আমিও তাই বলতাম।
তখন তাকে বলা হবে: না, তুমি নিজে জেনেছ, না কুরআন পড়ে শিখেছ।

অতঃপর তার দু কানের মাঝখানে লোহার মুগুর দিয়ে এমন জোরে আঘাত করা হবে, যাতে সে চিৎকার করে উঠবে। তার আশেপাশের সবাই তা শুনতে পাবে মানুষ ও জিন ছাড়া।
[সহিহ বুখারী (তাওহীদ) ২৩/ জানাজা, হা/১৩৩৮-সহিহ মুসলিম ৫১/১৭, হা/২৮৭০, আধুনিক প্রকাশনী: ১২৫০, ইসলামিক ফাউন্ডেশন: ১২৫৭]

উল্লেখ্য যে, এটি সংক্ষিপ্ত হাদিস। অন্যান্য বর্ণনায়, আরও দুটি প্রশ্ন করার কথা এসেছে। সে দুটি হল:
তোমার রব (প্রতিপালক ও সৃষ্টিকর্তা) কে? তোমার দ্বীন (ধর্ম/জীবন ব্যবস্থা) কী?
যাহোক, উক্ত হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয় যে, কবরের আজাব সত্য এবং তা রমজান কিংবা রমজান ছাড়া অন্য যে কোন সময়ের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ কবরের আজাব রমজানে বন্ধ থাকবে তা উক্ত হাদিসে বলা হয়নি। আর এ বিষয়ে অন্য কোন হাদিসও আসেনি।

◈ আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রোজা রাখার পর সে অবস্থায় মৃত্যু সংঘটিত হওয়া জান্নাতে প্রবেশের একটি কারণ:

“কোন ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য রোজা রাখার পর তার অবস্থায় জীবনাবসান হলে সে জান্নাতে যাবে” এ কথা সহিহ হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে।

যেমন: হুযাইফা রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার বুকে হেলান দিয়ে ছিলেন। তখন তিনি বললেন,

مَنْ قَالَ لا إِلَهَ إِلا اللَّهُ ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ خُتِمَ لَهُ بِهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ ، وَمَنْ صَامَ يَوْمًا ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ خُتِمَ لَهُ بِهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ ، وَمَنْ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ ابْتِغَاءَ وَجْهِ اللَّهِ خُتِمَ لَهُ بِهَا دَخَلَ الْجَنَّةَ

“লা ইলা হা ইল্লাল্লা হ’ বলার পর যে ব্যক্তির জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
– আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে একদিন সিয়াম রাখার পর যে ব্যক্তির জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।
– আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় কিছু দান-সদকা করার পর যে ব্যক্তির জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটবে সেও জান্নাত প্রবেশ করবে।”
[মুসনাদে আহমদ/২২৮১৩, সহীহ তারগীব/৯৮৫, আলাবানি রহ. তার আহকামুল জানাইয গ্রন্থে বলেন, “এর সনদ সহিহ”]

● রমজানে মারা গেলে কবরের আজাব মাফ প্রসঙ্গে সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি শাইখ আব্দুল্ আজিজ বিন বায রহ. বলেন,

وأما أنه إذا مات في رمضان أو مات في الجمعة، ينجو من العذاب، لا، بل هذا إلى الله ، إن مات على استقامة فله الجنة والكرامة، وإن مات على معاصي فهو على خطر، ويدعى له بالمغفرة و الرحمة

“‘আর যদি রমজান অথবা জুমার দিন মৃত্যুবরণ করে তাহলে কবরে আজাব থেকে মুক্তি পাবে’ এ ব্যাপারে কথা হল, না (এ কথা সঠিক নয়) বরং এটি আল্লাহর উপর সমর্পিত। যদি সে দীনদারীর উপরে মৃত্যুবরণ করে তাহলে তার জন্য রয়েছে জান্নাত এবং সম্মান। আর যদি আল্লাহর অবাধ্যতার উপরে মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে বিপদের মুখে রয়েছে। তার জন্য আল্লাহর কাছে মাগফেরাত ও রহমতের দুআ করতে হবে।” [শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট]

● তিনি ‘নূরুন আলাদ দারব’ শীর্ষক সৌদি আরবের এক রেডিও অনুষ্ঠানে আরও বলেন,
عذاب القبر ثابت لكل من يستحقه سواء مات في يوم الجمعة أو في رمضان أو في أي وقت أخر
“ঐ ব্যক্তির জন্য কবরের আজাব সাব্যস্ত যে তার উপযুক্ত চাই সে শুক্রবারে মারা যাক অথবা রমজান মাসে অথবা অন্য যেকোনো সময়।”

পরিশেষে অসীম দয়াময় ও করুণার আধার আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকট দুআ করি, তিনি যেন আমাদেরকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করেন। বিশেষ করে যেন রমজান মাসে আমাদেরকে সিয়াম, কিয়াম, তিলাওয়াতুল কুরআন, তওবা-ইস্তিগফার সহ আল্লাহর সন্তুষ্টি মূলক সৎকর্ম বেশি করে সম্পাদন করার তাওফিক দান করেন এবং এগুলোর মাধ্যমে আমাদের গুনাহগুলো মোচন করেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল ও অসীম দয়ালু।
▬▬▬▬ ◐◑ ▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল অফিসিয়াল (লিসান্স, মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)। দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদি আরব।

ইফতারের সুন্নতি পদ্ধতি এবং এ সংক্রান্ত ১০টি নির্দেশনা

 সারাদিন রোজা থাকার পরে ইফতার করা মুমিনদের জন্য একটি বিরাট আনন্দের বিষয় তো বটেই বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও। কিন্তু অনেক মুসলিম ইফতারের সঠিক নিয়ম-পদ্ধতি না জানার কারণে বিভিন্ন ধরণের সুন্নত পরিপন্থী কার্যক্রম করে থাকে।

তাই নিম্নে ইফতারের সুন্নাহ সম্মত পদ্ধতি এবং এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করা হলো:

◈ ১) সূর্য ডোবার সাথে সাথে ইফতার করা। ইচ্ছাকৃত ভাবে বিলম্ব না করা।
কিছু মানুষ সূর্য ডোবার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পরও অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য ৪/৫ মিনিট বিলম্ব করে। কিছু মানুষ আজান শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে। নি:সন্দেহে এগুলো সুন্নত পরিপন্থী ও দীনের মধ্যে বাড়াবাড়ি।

◈ ২) ইফতারের পূর্বে আল্লাহর কাছে দুআ করা। সহিহ হাদিস দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে যে, রোজা অবস্থায় দুআ কবুল হয়। তাছাড়াও সহিহ হাদিসে ইফতারের আগে দুআ কবুলে বিষয়টিও প্রমাণিত। সে সময় মানুষ এক দিকে রোজা অবস্থায় থাকে অন্য দিকে রোজার কারণে ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ও ক্লান্ত-শ্রান্ত থাকে। তাই এ অবস্থায় দুআ কবুলের অধিক আশা করা যায়। তবে প্রত্যেক রোজাদার নিজে নিজে দুআ করবে। এ ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে দুআ করা বিদআত।

◈ ৩) আধা পাকা নরম খেজুর দ্বারা ইফতার করা। তা সম্ভব না হলে শুকনা খেজুর। তাও সম্ভব না হলে পানি দ্বারা ইফতার। এ তিনটির কোনটি না পেলে অন্য যে কোন হালাল খাদ্য-পানীয় দ্বারা ইফতার করা।

উল্লেখ্য যে, বাঙ্গালীর ইফতারে বুট-মুড়ি না থাকলেই নয়। এ ক্ষেত্রে অনেকে মুড়ির সাথে কাঁচা পিয়াজ মেশান। কিন্তু হাদিসে কাঁচা পেঁয়াজের দুর্গন্ধ সহকারে মসজিদে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাই হয় কাঁচা পেয়াজ খাওয়া বাদ দিতে হবে অথবা আগুনে সিদ্ধ করে তার দুর্গন্ধ দূর করতে হবে অথবা সালাতে যাওয়ার পূর্বে ভালভাবে ব্রাশ করে মুখ পরিষ্কার করতে হবে।

◈ ৪) ইফতারের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ (আল্লাহর নামে শুরু করছি) পাঠ করা (পরিপূর্ণ ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম’ নয়)।
উল্লেখ্য যে, আমাদের সমাজে ইফতারের জন্য বিশেষ একটি দুআ প্রচলিত রয়েছে। তাহলো, “আল্লাহুম্মা লাকা সুমতু ওয়ালা রিযক্বিকা আফত্বারতু”।
অর্থ: হে আল্লাহ্, আমি আপনার জন্য রোজা রেখেছি এবং আপনার দেওয়া রিজিক দিয়ে ইফতার করছি।) কিন্তু এ হাদিসটি সনদ গতভাবে জঈফ (দুর্বল)[দ্র: জঈফ আবু দাউদ, হা/২৩৫৮]। তাই তা না পড়াই ভালো। বরং অন্যান্য খাবার গ্রহণের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ পাঠ করা বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। তাই এখানেও তাই যথেষ্ট। তবে কেউ উক্ত দুআ পাঠ করলে তাকে বিদআত বলা ঠিক নয়।

◈ ৫) ইফতারের সময় সাধারণত মাগরিবের আজান হয়। তাই খাওয়া-দাওয়া চলাকালীন সময়েও আজানের জবাব দেওয়া ও আজানের পরের দরুদ ও দুআ পড়া।

◈ ৬) ইফতারের সময় বা ইফতার শেষে “যাহাবায যামাউ, ওয়াব তাল্লাতিল উরূক্বু ও ছাবাতাল আজরু ইনশাআল্লাহ্‌।” (অর্থ: তৃষ্ণা দূর হয়ে গেল, শিরা-উপশিরা সিক্ত হল এবং ইনশাআল্লাহ্‌, সওয়াব সাব্যস্ত হল)” [শাইখ আলবানী সহিহ আবু দাউদ গ্রন্থে হাদিসটিকে হাসান আখ্যায়িত করেছেন]। (আল্লামা উসাইয়মীন রহ. এ দুআটি ইফতারের পরে পড়ার কথা বলেছেন)

◈ ৭) পেট পুরে কিংবা মাত্রাতিরিক্ত না খাওয়া। হাদিসে পেট ভরে খাওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সুতরাং সেহেরি, ইফতার বা অন্য কখনোই পেট ভরে বা মাত্রাতিরিক্ত খাবার খাওয়া উচিৎ নয়। এটাই আধুনিক স্বাস্থ্য সম্মত খাদ্যনীতি।

◈ ৮) পানাহারে অপচয় রোধ করা জরুরি। কিছু মানুষ ইফতারে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে খাদ্য ও পানীয়ের পসরা সাজায়। কিন্তু সামান্য কিছু খেয়ে বাকি খাবার ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করে। এটি নি:সন্দেহে নিন্দনীয় ও গর্হিত কাজ।

◈ ৯) অন্য রোজাদারকে ইফতারি করানো। এতে উক্ত রোজাদারের সমপরিমাণ সওয়াব হবে। অর্থাৎ এক সাথে দুটি রোজার সওয়াব পেতে চাইলে আরেকজন রোজাদারকে ইফতার করান। এভাবে যত বেশি রোজদারকে ইফতার করানো হবে ততটি সওয়াব আপনার আমলনামায় লেখা হবে। কিন্তু যারা ইফতার করবে তাদের সওয়াব হ্রাস করা হবে না।

◈ ১০) প্রতিবেশি ও গরিব-অসহায় মানুষের বাড়িতে ইফতার পাঠানো।
প্রতিবেশির বাড়িতে ইফতার পাঠালে পারস্পারিক ভালবাসা ও সুসম্পর্ক বৃদ্ধি পায়। আর গরীব-অসহায় মানুষের বাড়িতে ইফতার পাঠানোর মাধ্যমে তাদের মুখে হাসি ফোটানো হয়। যা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সুন্নাহ মোতাবেক রোজা পালনের তওফিক দান করুন। আমীন।
▬▬▬▬ ◐◑ ▬▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

রোজা ভঙ্গের ভয়াবহ শাস্তি এবং এর কাজা ও কাফফারা আদায়ের পদ্ধতি

 বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ

▬▬▬▬◆◯◆ ▬▬▬▬
প্রশ্ন: ইচ্ছাকৃত রোজা ভঙ্গ করার শাস্তি ও বিধান কি? কেউ যদি কোন কারণ ছাড়া রোজা ভঙ্গ করে তাহলে তার করণীয় কী?
উত্তর: নিম্নে রোজা ভঙ্গের ভয়াবহ শাস্তি এবং এর কাজা ও কাফফারার পদ্ধতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল:
◍◍ ক. শরিয়ত অনুমোদিত কারণ ছাড়া রোজা না রাখার বা রোজা ভেঙ্গে ফেলার ভয়াবহ শাস্তি:

রমজান মাসে রোজা রাখা প্রত্যেক সুস্থ, মুকিম (আবাসে অবস্থানকারী/সফরকারী নয়) প্রাপ্ত বয়স্ক ও সক্ষম ব্যক্তির উপর ফরজ। এটি ইসলামের ৫টি স্তম্ভের মধ্যে ৪র্থ। শরিয়ত অনুমোদিত ওজর ছাড়া (যেমন: অসুস্থতা, সফর, ক্ষুধা-পিপাসায় প্রাণনাশ বা অঙ্গহানির আশংকা ইত্যাদি) রোজা ভঙ্গ করা কবিরা গুনাহ ও কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। হাদিসে বিনা কারণে রোজা ভঙ্গের ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে। (আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন)
হাদিসে এসেছে: আবু উমামা বাহিলি রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছি, ‎

بينَا أنَا نَائِمٌ إذْ أَتَاني رَجُلانِ فأخَذَا بضَبْعِي -أي: عَضُدِي- فَأَتَيَا بي جَبَلاً وَعْراً فَقَالَا لي: اصْعَدْ، فقلت: إني لا أُطِيقُه، فقَالَ: إنا سَنُسَهِّلُه لك،فَصَعَدتُ حتى إذا كُنتُ في سَواءِ الجَبَل إذا أنا بِأصْواتٍ شدِيدَةٍ،فَقُلْتُ: مَا هَذهِ الأَصْواتُ؟ قَالَوا: هَذا عِوى أَهْلِ النَّارِ، ثمَّ انْطُلِقَ بي فَإِذا أَنا بِقَومٍ مُعَلَّقِين بِعَرَاقِيبهِم، مُشَقَّقَةٍ أَشْدَاقُهُم تَسِيلُ أشْداقُهُم دَماً، قَالَ: قُلتُ: مَن هَؤُلاءِ؟ قَالَ: هؤُلاءِ الَّذين يُفطِرُون قَبلَ تَحِلَّة صَوْمِهِم

“আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। সহসা দু জন লোক এসে আমার বাহু ধরে আমাকেসহ তারা এক দুর্গম পাহাড়ে গমন করল।
তারা আমাকে বলল: পাহাড়ে উঠো।
আমি বললাম: এ পাহাড়ে উঠা আমার দ্বারা সম্ভব নয়।
তারা ‎বলল: আমরা তোমাকে সাহায্য করব।
যাহোক আমি ওপরে উঠতে শুরু করলাম। যখন পাহাড়ের চূড়ায় ‎‎পৌঁছলাম তখন বিকট আওয়াজের সম্মুখীন হলাম।
জিজ্ঞাসা করলাম: এগুলো কিসের আওয়াজ?
তারা ‎বলল: এগুলো জাহান্নামীদের আর্তনাদ।
অতঃপর তারা আমাকে নিয়ে রওনা করার পর আমি এমন লোকদের সম্মুখীন হলাম, যাদেরকে হাঁটুতে বেধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। তাদের চোয়াল ‎‎ক্ষতবিক্ষত। সেখান থেকে অনবরত রক্ত ঝরছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: আমি জিজ্ঞাসা করলাম: এরা কারা?
তারা বলল: এরা ‎হল সেসব লোক যারা রোজা পূর্ণ করার আগে ভেঙ্গে ফেলত।” [নাসাঈ ফিল কুবরা: ৩২৮৬, তাবরানি ফিল কাবির: ৭৬৬৭-শাইখ আলাবানী হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। দ্রষ্টব্য: সিলসিলা সহিহা, হা/৩৯৫১]
আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমীন উক্ত হাদিস উল্লেখ করার পর বলেন: “এই হল যারা রোজা ভঙ্গ করত তাদের শাস্তি। তাহলে যারা আদতেই রোজা রাখে না তাদের কী পরিণতি হতে পারে?! আল্লাহর নিকট দুনিয়া ও আখিরাতের নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।” (মাজমু ফতোয়া ওয়া রাসায়েল ১৯/৮৯)

সুতরাং কেউ শরিয়ত সম্মত ওজর ছাড়া শয়তানের প্ররোচনা বা কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় রোজা ভঙ্গ করে বা আদতেই রোজা না রাখে তাহলে তার জন্য আবশ্যক হল, অনতিবিলম্বে লজ্জিত অন্তরে খাঁটি ভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করা এবং ভবিষ্যতে আর কখনো জেনে-বুঝে এমনটি না করার অঙ্গীকার করা। অত:পর নিম্নে বর্ণিত শরিয়তের বিধান অনুযায়ী কাজা বা কাফফারা আদায় করা।

◍◍ খ. রোজা ভঙ্গের কাজা ও কাফফারা আদায়ের পদ্ধতি:

রোজা ভঙ্গের কারণের উপর কাজা বা কাফফারার বিষয়টি নির্ভর করছে। যেমন:
(১) স্ত্রী সহবাস ছাড়া অন্য কোন উপায়ে রোজা ভঙ্গ করলে তওবার পাশাপাশি উক্ত রোজাটি কাজা করাই যথেষ্ট (কাফফারা নেই):

কেউ যদি স্ত্রী সহবাস ছাড়া অন্য কোন উপায়ে (যেমন: ইচ্ছাকৃত পানাহার, হস্তমৈথুন, ইচ্ছাকৃত বমি ইত্যাদি) রোজা ভঙ্গ করে তাহলে খাঁটি অন্তরে তওবা করার পাশাপাশি যে রোজাটা ভেঙ্গেছে সেটা কাজা করাই যথেষ্ট। এভাবে যে কয়টা রোজা ভঙ্গ করবে সে কয়টা কাজা করতে হবে।
তবে এতে কাফফারা দিতে হবে কি না এ বিষয়ে সম্মানিত ফকিহদের মাঝে দ্বিমত থাকলেও অধিক বিশুদ্ধ মতে এর জন্য কাফফারা নেই। কেননা হাদিসে কেবল স্ত্রী সহবাসের ক্ষেত্রে কাফফারা দেয়ার কথা এসেছে। অন্য কোন ক্ষেত্রে কাফফারা দেয়ার ব্যাপারে কোন সহিহ হাদিস নেই। যে হাদিস দ্বারা কাফফারার দলিল পেশ করা হয় সেটার কোন ভিত্তি নাই।

সুতরাং এটিই অধিক বিশুদ্ধ অভিমত যে, এতে অন্তরে খাঁটি ভাবে তওবার পাশাপাশি কাজা করাই যথেষ্ট।

এ পক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমদ বিন হাম্বল, সাঈদ বিন জুবাইর, নাখঈ, ইবনে শিরীন রহ. প্রমুখ।
শাইখ বিন বায এ প্রসঙ্গে বলেন:
والصواب أن عليه التوبة ولا يلزمه إلا قضاء اليوم الذي أفطره فقط، هذا هو الصواب، وعليه التوبة
“সঠিক কথা হল, তার জন্য তওবা করা এবং যে দিনের রোজা ভেঙ্গেছে কেবল সে দিন রোজাটা কাজা করা আবশ্যক।” (শাইখের অফিসিয়াল ওয়েব সাইট)

(২) সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করলে তওবার পাশাপাশি যে রোজাটি ভেঙ্গেছে সেটি কাজা করার পাশাপাশি কাফফারা আদায় করা আবশ্যক:

স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভঙ্গ করলে তাতে অনুতপ্ত হয়ে খাঁটি অন্তরে তওবার পাশাপাশি যে রোজাটি ভেঙ্গেছে সেটি কাজা করা তারপর তার কাফফারা দেয়াও আবশ্যক। ।

হাদিসে একমাত্র এই কারণে রোজা ভঙ্গ করলে কাফফারা দেয়ার কথা এসেছে। অন্য ক্ষেত্রে আসে নি।
লক্ষণীয় হল, রোজা অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করলে-বীর্যপাত হোক না হোক-তাতে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে।

➧ কাফফারা:
কাফফারার বিষয়গুলোর ধারাক্রম নিম্নরূপ। (অর্থাৎ একটি আদায় করতে সক্ষম না হলে অপরটি করতে হবে।)
● ১. একটি রোজার বিনিময়ে একটি দাস মুক্ত করা। (বর্তমান যুগে যেহেতু দাস-দাসীর প্রথা নেই তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।)
● ২. একটানা (বিরতি হীনভাবে) ৬০টি রোজা রাখা।
● ৩. তাও সম্ভব না হলে ৬০জন মিসকিন তথা গরিব-অসহায় মানুষকে একবেলা পেট পুরে খাবার খাওয়ানো অথবা প্রতিটি রোজার বিনিময়ে অর্ধ সা তথা সোয়া বা দেড় কিলোগ্রাম চাল দেয়া।
– টাকা দেয়া ঠিক সুন্নাহ পরিপন্থী।
– একজন মিসকিনকে ৬০ বেলা খাবার‌ খাওয়ানো যেমন জায়েজ তেমনি ৬০ জন মিসকিনকে এক বেলা খাওয়ানোও জায়েজ।
[কাফফারা প্রসঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ লম্বা হাদিস সহিহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে। পোস্টের কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় তা উল্লেখ করা হল না]
সারাংশ:
– শরিয়ত সম্মত কারণ ছাড়া রোজা ভঙ্গ করা বা রোজা না রাখা কবিরা গুনাহ এবং ভয়ানক শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
– কেউ শয়তানের প্ররোচনা বা কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় রোজা নষ্ট করে তাহলে তার জন্য অনুতপ্ত হৃদয়ে তওবা করা আবশ্যক।
– স্ত্রী সহবাস ছাড়া অন্যভাবে রোজা ভাঙলে তওবার পাশাপাশি যে রোজাটা ভেঙ্গেছে তা কাজা করাই যথেষ্ট। কিন্তু স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে রোজা ভাঙলে তওবার পাশাপাশি যে রোজাটি ভেঙেছে সেটি কাজা করতে হবে। সেই সাথে কাফফারা দেওয়াও ওয়াজিব।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬◆◯◆ ▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate