December 15, 2021

বদলী হজ্বের মাসায়েল

 মাওলানা মুহাম্মাদ ইমদাদুল্লাহ

হজ্ব একটি কঠিন ইবাদত। একে জিহাদের সাথেও তুলনা করা হয়েছে। এ কারণে এতে ছওয়াবও বেশি এবং উপকারিতাও অনেক। বিধানগত দিক থেকে হজ্ব আদায় করা সহজ, কিন্তু যেহেতু এর জন্য সফর করতে হয় এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জমায়েত বিশেষ বিশেষ স্থানে একসাথে এই ইবাদত আদায় করে থাকে তাই তা কঠিন ও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে অনেক মানুষের আর্থিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও শারীরিক অক্ষমতার কারণে তা আদায়ের সামর্থ্য থাকে না। এ ধরনের মাজুরদের প্রতি মেহেরবানী করে আল্লাহ তাআলা বদলী হজ্বের অবকাশ দান করেছেন।

বদলী হজ্বের নাম শুনলেই অনেকে মনে করতে পারেন তা আদায়ের জন্য বোধ হয় আলাদা কোনো নিয়ম আছে। তা ঠিক নয়। যেভাবে নিজের হজ্ব আদায় করা হয় সেভাবেই বদলী হজ্বও আদায় করা হয়। পার্থক্য শুধু এইটুকু যে, নিয়ত ও তালবিয়ার সময় বদলী হজ্বে প্রেরণকারীর পক্ষ থেকে হজ্বের নিয়ত করা হয়। এরপর হজ্বের সকল কাজ এক ও অভিন্ন।

হজ্বের নিয়ম এক হলেও বদলী হজ্ব সংক্রান্ত কিছু বিষয় এমন আছে, যা বদলী হজ্বে প্রেরণকারী ও প্রেরিত উভয়েরই জানা থাকা জরুরি। বর্তমান নিবন্ধে ঐ মাসআলাগুলোই উল্লেখ করা হয়েছে।

বদলী হজ্বের জরুরি মাসায়েল

মাসআলা : যার উপর হজ্ব ফরয হয়েছে এবং হজ্ব আদায়ের শারীরিক সক্ষমতাও আছে তার নিজে হজ্ব করা জরুরি। এক্ষেত্রে অন্যকে দিয়ে বদলী হজ্ব করানো জায়েয নয়। বদলী করালে এর দ্বারা তার ফরয হজ্ব আদায় হবে না।-হিদায়া ১/২৯৬; আলবাহরুল আমীক ৪/২২৩৯; বাদায়েউস সানায়ে ২/৪৫৪

মাসআলা : যার উপর হজ্ব ফরয হয়েছে এবং হজ্ব আদায়ের সক্ষমতাও ছিল, কিন্তু শক্তি-সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও হজ্ব করেনি। অতপর হজ্ব আদায়ের সক্ষমতা হারিয়ে মাজুর হয়ে পড়েছে এমন ব্যক্তির উপর ফরয নিজের পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করানো অথবা মৃত্যুর সময় তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করানোর অসিয়ত করে যাওয়া।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, বিদায় হজ্বে খাছআম গোত্রের একজন নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার বাবার উপর হজ্ব ফরয হয়েছে, কিন্তু তিনি এত বৃদ্ধ যে, বাহনের উপর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারেন না। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারব?’ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ। (তার পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারবে)।’-সহীহ বুখারী ১/২০৫; সহীহ মুসলিম ১/৪৩১

হযরত আলী রা. অতিশয় বৃদ্ধ লোক সম্পর্কে বলেছেন-

يُجَهِّزُ رَجُلاً بَنَفَقَتِهِ فَيَحُجُّ عَنْهُ

সে তার পক্ষ থেকে হজ্ব করাবে এবং এর খরচ বহন করবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮/৫৯৯

দেখুন : আলবাহরুল আমীক ৪/২২৬১; মানাসিক, মোল্লা আলী কারী ৪৩৪

মাসআলা : কারো উপর হজ্ব ফরয হয়েছে এবং সে হজ্বের উদ্দেশ্যে মক্কা শরীফে পৌঁছেছে, কিন্তু হজ্বের মূল সময়ের আগেই তার মৃত্যু এসে গেছে-এই ব্যক্তির জন্য মৃত্যুর সময় তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্বের অসিয়ত করার প্রয়োজন নেই। এক্ষেত্রে তার উপর থেকে হজ্ব রহিত হয়ে যায়। কেননা, সে হজ্ব আদায়ের সুযোগ পায়নি।-ফাতহুল কাদীর ২/৩২৭; আদ্দুররুল মুখতার ২/৬০৪; গুনইয়াতুন নাসিক ৩৩

যেসব কারণে নিজে হজ্ব আদায়ে অক্ষম গণ্য হয়

১. ফরয হওয়ার পর আদায়ের সুযোগ পাওয়ার আগেই মৃত্যু এসে গেলে। এ ক্ষেত্রে ঐ ব্যক্তি থেকে হজ্ব রহিত হয়ে যায়। সুতরাং তার জন্য মৃত্যুর সময় হজ্বের অসিয়ত করে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।

২. কেউ জোরপূর্বক আটকে রাখলে বা হজ্বের সফরে যেতে না দিলে।

৩. এমন কোনো রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়লে, যা থেকে সুস্থতা লাভের আশা নেই। যেমন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলে, অন্ধ বা খোড়া হয়ে গেলে কিংবা বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা এত বেশি হলে যে, নিজে বাহনের উপর আরোহন করতে

পারে না।

৪. রাস্তা অনিরাপদ হলে। অর্থাৎ সফর করতে গেলে যদি জান-মালের ক্ষতির আশঙ্কা থাকে।

৫. নারী তার হজ্বের সফরে স্বামী বা উপযুক্ত মাহরাম পুরুষ সঙ্গী না পেলে।

এসব কারণে ঐ ব্যক্তিকে মাজুর বা অক্ষম গণ্য করা হবে এবং সে নিজের পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করাতে পারবে।-মানাসিক, মোল্লা আলী কারী ৪৩৫; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২১

মাসআলা : যার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করা হবে বদলী করানোর সময় তার উপর হজ্ব ফরয হতে হবে। হজ্ব ফরয না হওয়া অবস্থায় নিজের পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করালে তা নফল হজ্ব বলে গণ্য হবে এবং এর দ্বারা ফরয হজ্ব আদায় হবে না। সুতরাং পরবর্তীতে হজ্বের সামর্থ্য হলে তাকে নিজের ফরয হজ্ব আদায় করতে হবে। আর নিজে আদায় করতে না পারলে পুনরায় অন্যকে দিয়ে বদলী করাতে হবে।-মানাসিক, ৪৩৫

মাসআলা : যেসব ওজরে বদলী হজ্বের অনুমতি আছে সেগুলো দেখা দেওয়ার আগে বদলী হজ্ব করানোর যাবে না। ওজরহীন অবস্থায় বদলী হজ্ব করালে তা হবে নফল হজ্ব। এর দ্বারা তার ফরয হজ্ব আদায় হবে না। যেমন কারো উপর হজ্ব ফরয হয়েছে এবং তার নিজে হজ্ব আদায়ের শারীরিক সক্ষমতাও আছে, কিন্তু সে এ অবস্থায় নিজে আদায় না করে অন্যের দ্বারা বদলী করিয়েছে তাহলে এর দ্বারা তার ফরয হজ্ব আদায় হবে না। সুতরাং তাকে ঐ হজ্ব নিজে আদায় করতে হবে। যদি নিজে আদায় না করে এবং  পরে অক্ষম হয়ে পড়ে তাহলে পুনরায় অন্যের দ্বারা বদলী হজ্ব করাতে হবে, আগের বদলী যথেষ্ট হবে না।-বাদায়েউস সানায়ে ২/৪৫৫; মানাসিক ৪৩৬; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২

মাসআলা : হজ্ব আদায়ে অক্ষমতার ওজর দুই ধরনের হতে পারে : ক) যা দূর হওয়ার সম্ভাবনা আছে। খ) স্বাভাবিক অবস্থায় যা দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

যে ওজর দূর হওয়ার সম্ভাবনা আছে যেমন অসুস্থ, পাগল বা কারাবন্দি হওয়া; স্বামী বা মাহরাম পুরুষের ব্যবস্থা না থাকা ইত্যাদি ক্ষেত্রে বদলী হজ্ব জায়েয হওয়ার জন্য শর্ত হল, ওজরটি মৃত্যু পর্যন্ত স্থায়ী হতে হবে। সুতরাং এ ধরনের ওজরে বদলী হজ্ব করানোর পর যদি ঐ ওজর অবস্থায়ই তার মৃত্যু হয় তাহলে তার ফরয হজ্ব আদায় হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে বদলী হজ্ব করানোর পর মৃত্যুর আগে ওজর দূর হয়ে গেলে ঐ হজ্বটি নফল হয়ে যাবে এবং তাকে নিজের ফরয হজ্ব আদায় করতে হবে।

আর দ্বিতীয় প্রকারের ওজর, অর্থাৎ যা দূর হওয়ার সম্ভাবনা নেই, যেমন অন্ধ বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত হওয়া। এক্ষেত্রে বদলী হজ্ব জায়েয হওয়ার জন্য তা মৃত্যু পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া শর্ত নয়। অর্থাৎ এ জাতীয় ওজরের কারণে অন্যের দ্বারা বদলী হজ্ব করানোর পর আল্লাহ তাআলার খাছ কুদরতে যদি দৃষ্টিশক্তি বা চলৎশক্তি ফিরে পায় তাহলে তাকে পুনরায় ফরয হজ্ব করতে হবে না। পূর্বের বদলী হজ্বের মাধ্যমে তার ফরয হজ্ব আদায় হয়ে গেছে।-আলবাহরুর রায়েক ৩/৬১; রদ্দুল মুহতার ২/৫৯৯; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২১; যুবদাতুল মানাসিক ৪৪৮

মাসআলা : মাহরাম পুরুষ ছাড়া মহিলাদের হজ্বের সফরে যাওয়া জায়েয নয়। অন্য মহিলাদের সঙ্গী হয়েও হজ্বে যাওয়া নাজায়েয। তারা স্বামী বা মাহরাম পুরুষের ব্যবস্থা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন। যদি মাহরাম পুরুষের ব্যবস্থা না হয় আর এভাবেই এমন বার্ধক্য এসে যায় যে, নিজে হজ্ব করার শক্তি না থাকে তাহলে ঐ সময় কাউকে পাঠিয়ে বদলী হজ্ব করিয়ে নিবে বা বদলী হজ্বের অসিয়ত করে যাবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো নারী মাহরাম ছাড়া সফর করবে না।’ জনৈক ব্যক্তি আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমি অমুক অমুক বাহিনীর সাথে জিহাদে যাওয়ার ইরাদা করেছি। এ দিকে আমার স্ত্রীও হজ্বে যাওয়ার ইচ্ছা করেছে (আমি এখন কী করতে পারি?) রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমিও তার সাথে (হজ্বে) যাও।’-সহীহ বুখারী ১/২৫০; সহীহ মুসলিম ১/৪৩৪

বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী রাহ. বলেছেন, ‘নারী মাহরাম ছাড়া হজ্ব করবে না।’

রাই-এর অধিবাসিনী একজন নারী ইবরাহীম নাখায়ী রাহ.-এর নিকট পত্র লিখলেন যে, তিনি একজন বিত্তবান নারী। কিন্তু তার স্বামী নেই এবং কোনো মাহরাম পুরুষও নেই। আর ইতিপূর্বে তিনি হজ্ব করেননি। (এখন তিনি কি স্বামী বা মাহরাম ছাড়া হজ্বে যেতে পারবেন?) উত্তরে ইবরাহীম নাখায়ী রাহ. লিখেছেন-

إِنَّ هَذَا مِنْ أَمْنِ السَّبِيْلِ الَّذِيْ قَالَ اللهُ، وَلَيْسَ لَكِ مَحْرَمٌ فَلاَ تَحُجِّيْ إِلَّا مَعَ بَعْلٍ أَوْ مَحْرَمٍ.

‘মহিলাদের জন্য স্বামী বা মাহরাম পুরুষের ব্যবস্থা হওয়া হজ্বের সামর্থ্যের অন্তর্ভুক্ত, যা আল্লাহ তাআলা কুরআন মজীদের এই আয়াতে বলেছেন-

وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا

অর্থাৎ মানুষের মধ্যে যারা সেখানে (কাবা ঘরে) পৌঁছার সামর্থ্য রাখে তাদের উপর আল্লাহর জন্য এ ঘরের হজ্ব করা ফরয। (সূরা আলে ইমরান : ৯৭) আপনার তো মাহরাম পুরুষ নেই। স্বামী বা মাহরাম ছাড়া আপনি হজ্বে

যাবেন না।’

অনুরূপ সিদ্ধান্ত তাউস, আমের, ইকরামা ও উমর ইবনে আবদুল আযীয রাহ. প্রমুখ বিখ্যাত মনীষী তাবেয়ীদের থেকেও বর্ণিত আছে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮/৬৩৬-৬৪১)

-ফাতহুল কাদীর ২/৩৩০; মানাসিক ৪৩৬; আলবাহরুর রায়েক ২/৩১৪; আদ্দুররুল মুখতার ২/৪৬৫

মাসআলা : যার বদলী হজ্ব আদায় করা হবে তার পক্ষ থেকে আদেশ বা অনুমতি থাকতে হবে। তার আদেশ বা অনুমতি ছাড়া কেউ তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করলে এটি তার নফল হজ্ব গণ্য হবে। এর দ্বারা তার ফরয হজ্ব আদায় হবে না।-মানাসিক ৪৩৬; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫৯৯

মাসআলা : কোনো ব্যক্তির উপর হজ্ব ফরয ছিল, কিন্তু সে তা আদায় করেনি এবং তার পক্ষ থেকে আদায়ের অসিয়তও করেনি। এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে। তার পক্ষ থেকে ওয়ারিশদের বদলী হজ্ব করা বা করানো জরুরি নয়। তবে কোনো ওয়ারিশ বা অন্য কেউ স্বেচ্ছায় তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করলে এর দ্বারা ঐ মৃত ব্যক্তির ফরয হজ্ব আদায় হয়ে যাওয়ার আশা করা যায়।

হযরত বুরাইদাহ রা. বলেন, জনৈক মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার মা ইন্তিকাল করেছেন। তিনি হজ্ব করেননি। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারি?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি তার পক্ষ থেকে হজ্ব করো।’ (সহীহ মুসলিম ১/৩৬২)

হযরত আতা রাহ. বলেছেন, ‘অসিয়ত না করলেও মৃতের পক্ষ থেকে হজ্ব করানো যাবে।’

উল্লেখ্য, উপরোক্ত ক্ষেত্রে ওয়ারিশগণ যদি মাইয়্যেতের অবণ্টিত পরিত্যক্ত সম্পদ দ্বারা বদলী হজ্ব করাতে চান তাহলে দুটি শর্ত অবশ্যপালনীয় : ক) বদলী হজ্বের অসিয়ত না করার কারণে মৃতের সকল সম্পদের বর্তমান মালিক যেহেতু ওয়ারিশগণ তাই উক্ত সম্পদ দ্বারা বদলী হজ্ব করাতে হলে সকল ওয়ারিশের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি থাকতে হবে। খ) ওয়ারিশদের কেউ যদি নাবালেগ হয় কিংবা কোনো ওয়ারিশের যদি সম্মতি না থাকে তাহলে তার অংশ থেকে বদলী হজ্বের জন্য কিছুই নেওয়া যাবে না।

দেখুন : মানাসিক ৪৩৬; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫৯৯; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২২, ৩২৮

মাসআলা : বদলী হজ্ব করার জন্য কোনো প্রকার বিনিময় বা পারিশ্রমিক লেনদেন করা যাবে না। কেননা হজ্ব একটি ইবাদত। আর ইবাদতের বিনিময় নেওয়া ও দেওয়া দুটোই নাজায়েয। তাই বদলী হজ্বের জন্য পারিশ্রমিক দেওয়া হলে প্রদানকারী ও গ্রহণকারী দুজনই গুনাহগার হবে। এ ধরনের ক্ষেত্রে প্রেরণকারীর হজ্ব আদায় হয়ে যাবে বটে তবে হজ্ব আদায়কারী পারিশ্রমিকরূপে যা কিছু নিয়েছে তা ফেরত দেওয়া ওয়াজিব। সে শুধু হজ্বের খরচ নিতে পারবে। অতিরিক্ত কিছুই নিতে পারবে না।-আলবাহরুল আমীক ৪/২২৬৯; মানাসিক ৪৩৭; আদ্দুররুল মুখতার ২/৬০০

মাসআলা : মহিলাকে দিয়েও বদলী হজ্ব করানো জায়েয যদি তার সাথে স্বামী বা মাহরাম পুরুষ থাকে। আর বিশেষভাবে খেয়াল রাখা দরকার, যার মাধ্যমে বদলী হজ্ব করানো হচ্ছে তিনি হজ্বের মাসায়েল সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত কি না।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, বিদায় হজ্বে খাছআম গোত্রের একজন নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার বাবার উপর হজ্ব ফরয হয়েছে, কিন্তু তিনি এত বৃদ্ধ যে, সওয়ারীর উপর স্থির হয়ে বসে থাকতে পারেন না। সুতরাং আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারব? রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ।’ (সহীহ বুখারী ১/২৫০; সহীহ মুসলিম ১/৪৩১)

দেখুন : আলবাহরুল আমীক ৪/২২৬৮; মানাসিক ৪৫৩; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৫৭; আদ্দুররুল মুখতার ২/৬০৩; আলমুগনী, ইবনে কুদামা ৫/২৭

মাসআলা : যার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করা হচ্ছে হজ্বের অধিকাংশ খরচ তাকেই বহন করতে হবে। যদি কেউ সম্পূর্ণ নিজের খরচে কারো পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করে তাহলে এর দ্বারা প্রেরণকারীর ফরয হজ্ব আদায় হবে না। তবে প্রেরিত ব্যক্তি কিছু খরচ নিজের পক্ষ থেকে বহন করলে অসুবিধা নেই।

হযরত আলী রা. অতিশয় বৃদ্ধ লোকের সম্পর্কে বলেছেন, সে কাউকে তার পক্ষ থেকে হজ্বে পাঠাবে এবং হজ্বের খরচ বহন করবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮/৫৯৯; সুনানে বায়হাকী ৫/২৬; মানাসিক ৪৩৮; আদ্দুররুল মুখতার ২/৬০০

মাসআলা : বদলী হজ্বে প্রেরণকারী যদি এই বলে টাকা দেয় যে, ‘আপনি এ টাকা স্বাচ্ছন্দের সঙ্গে খরচ করতে পারবেন, কিছু বেঁচে গেলে তা ফেরত দিতে হবে না’ তাহলে হজ্ব আদায়ের পর হজ্বের প্রয়োজনে কেনা কাপড়-চোপড়, সামানপত্র ও উদ্বৃত্ত টাকা-পয়সা প্রেরণকারীকে ফেরত দিতে হবে না। এসব বস্ত্ত সে নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারবে।

তবে যদি প্রেরণকারী টাকা দেওয়ার সময় এ রকম কিছু না বলে এবং তার কথাবার্তা বা অবস্থা দেখে বোঝা যায়, উদ্বৃত্ত টাকা-পয়সা ও হজ্বের প্রয়োজনে কেনা বস্ত্তসামগ্রী প্রেরণকারীকে ফেরত দিতে হবে তাহলে প্রেরিত ব্যক্তির উদ্বৃত্ত টাকা ও অন্যান্য সামানপত্র রেখে দেওয়া জায়েয হবে না। অবশ্যই তা প্রেরণকারীকে ফেরত দিতে হবে। হ্যাঁ, ফেরত দেওয়ার পর তিনি যদি খুশি মনে তা দিয়ে দেন তাহলে সেগুলো গ্রহণ করতে অসুবিধা নেই।

বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী রাহ. বলেন, ‘কারো পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করার পর যদি প্রেরিতের নিকট প্রেরকের দেওয়া কিছু অর্থ অবশিষ্ট থাকে তাহলে সে প্রেরণকারীকে বিষয়টি জানাবে। সে দিয়ে দিলে প্রেরিতের গ্রহণ করতে বাধা নেই। অন্যথায় প্রেরণকারীকে তা ফেরত দিতে হবে।’ (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮/৫৪১) -শরহু মুখতাছারিত তহাবী ২/৪৯৫; মাবসূত, সারাখসী ২৭/১৭২; ফাতাওয়া খানিয়া ১/৩০৭; মানাসিক ৪৫৯; আলবাহরুল আমীক ৪/২৩৭৮, ২৩৮১

মাসআলা : বদলী হজ্বে প্রেরণকারী যদি বদলী আদায়কারীকে টাকা-পয়সার হিসাব-নিকাশের ঝামেলা থেকে মুক্ত রাখার জন্য বলে, ‘আমি আপনাকে হজ্বের জন্য প্রদত্ত টাকার মালিক বানিয়ে দিলাম বা আপনাকে হাদিয়া দিলাম তাহলে ঐ টাকায় আদায়কৃত হজ্ব দ্বারা প্রেরকের ফরয হজ্ব আদায় হবে না। কারণ হাদিয়া করার কারণে বা মালিক বানিয়ে দেওয়ার কারণে সে ঐ টাকার মালিক হয়ে গিয়েছে এবং হজ্বটি তার নিজের টাকায় সম্পন্ন হয়েছে। এ কারণে বদলী হজ্বের জন্য টাকাটা প্রেরকের মালিকানায় রেখেই প্রেরিত ব্যক্তিকে হজ্বের খরচ হিসাবে প্রদান করতে হবে। আর হিসাবের ঝামেলা এড়ানোর জন্য পূর্বোক্ত পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। অর্থাৎ প্রেরণকারী টাকা দিয়ে একথা বলে দিবে যে, কিছু অবশিষ্ট থাকলে তা আমাকে ফেরত দিতে হবে না বা কোনো হিসাবও আমাকে দিতে হবে না।-যুবদাতুল মানাসিক ৪৫৯

মাসআলা : বদলী হজ্বের জন্য নিজ দেশ থেকেই কাউকে পাঠাতে হবে। নিজ দেশ থেকে কাউকে পাঠানোর সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অন্য দেশে অবস্থানরত কাউকে দিয়ে বদলী হজ্ব করানো হলে প্রেরণকারীর ফরয হজ্ব আদায় হবে না। এক্ষেত্রে নিজ দেশ থেকে পুনরায় বদলী হজ্ব করাতে হবে।-মানাসিক ৪৪০; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২৯; রদ্দুল মুহতার ২/৬০৫

মাসআলা : মৃত ব্যক্তি তার পক্ষ থেকে বদলী হজ্বের অসিয়ত করে গেলে নিয়ম হল, তার কোনো ঋণ থাকলে প্রথমে তার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে তা আদায় করা। এরপর অবশিষ্ট সম্পদের এক তৃতীয়াংশ থেকে বদলী হজ্বের অসিয়ত কার্যকর করা। এক তৃতীয়াংশ সম্পদ দ্বারা মৃতের আবাসস্থল থেকে হজ্বের জন্য পাঠানো সম্ভব হলে তার এলাকা থেকেই কাউকে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশ থেকে কাউকে দিয়ে হজ্ব করালে মৃতের অসিয়ত ও ফরয হজ্ব আদায় হবে না। কিন্তু এক তৃতীয়াংশ  সম্পদ দ্বারা যদি মৃতের এলাকা থেকে হজ্ব করানো সম্ভব না হয় তাহলে ঐ টাকা দিয়ে যেখান থেকে হজ্ব করানো যায় সেখান থেকেই করাবে। অবশ্য ওয়ারিশগণ চাইলে নিজ সম্পদ থেকে কিছু দিয়ে মৃতের এলাকা থেকে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পারবে। (প্রাগুক্ত)

মাসআলা : মাইয়েত যদি বদলী হজ্বের অসিয়ত করে না যায় আর ওয়ারিশগণ স্বেচ্ছায় তার বদলী হজ্ব করাতে চায় সেক্ষেত্রে মৃতের এলাকা থেকে বদলী করানো জরুরি নয়। তারা অন্য দেশ যেমন- সৌদি আরব বা তার কাছাকাছি কোনো দেশ থেকেও মাইয়েতের পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করাতে পারবে। তবে এক্ষেত্রেও তার দেশ থেকে কাউকে পাঠিয়ে হজ্ব করানো উত্তম। কারণ এভাবে করলে মাইয়েতের উপর যেভাবে হজ্ব ফরয হয়েছিল সেভাবে আদায় করা হয়।-আলবাহরুল আমীক ৪/২৩৪৮; মাআরিফুস সুনান ৬/৩১৬; মানাসিক ৪৩৬; আলমুগনী, ইবনে কুদামা ৫/৪১

মাসআলা : বদলী হজ্বের ইহরাম বাঁধার সময় প্রেরণকারীর পক্ষ থেকে নিয়ত করতে হবে। এর জন্য উত্তম হল, মুখে এভাবে বলা যে, আমি অমুকের পক্ষ থেকে হজ্বের ইহরাম করছি বা নিয়ত করছি, এমনকি তালবিয়া বলার সময়ও তার নাম যুক্ত করে দেওয়া যেতে পারে। যেমন এভাবে বলবে, লাববাইক আন ফুলান (ব্যক্তির নাম)।

যদি তার নাম জানা না থাকে বা স্মরণ না থাকে তাহলে এভাবে বলবে যে, যিনি আমাকে বদলী হজ্বের জন্য প্রেরণ করছেন বা যার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করছি তার পক্ষ থেকে হজ্বের নিয়ত করলাম। ইহরামের সময় একবার এই নিয়ত করা যথেষ্ট। হজ্বের প্রতিটি কাজে ভিন্ন ভিন্নভাবে প্রেরণকারীর পক্ষ থেকে নিয়ত করতে হবে না।

বিখ্যাত তাবেয়ী হযরত হাসান বসরী রাহ. বলেন, কারো পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করলে তালবিয়া পড়ার সময় তার নাম নিয়ে একবার এভাবে বলাই যথেষ্ট যে,

لَبَّيْكَ عَنْ فُلَانٍ

(অমুকের পক্ষ থেকে লাববাইক।)

অনুরূপ বক্তব্য হযরত আতা রাহ. থেকেও বর্ণিত আছে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮/২৩৪)

দেখুন : মানাসিক ৪৪২; আলবাহরুল আমীক ৪/২২৬৩

মাসআলা : যদি মুখে প্রেরণকারীর নাম উল্লেখ করতে ভুলে যায়, কিন্তু মনে মনে তার পক্ষ থেকে নিয়ত করেছে, তাহলেও কোনো অসুবিধা নেই।

অন্তরের নিয়তই যথেষ্ট।

হযরত হাসান বসরী ও আতা রাহ. বলেছেন-

إِذَا حَجَّ الرَّجُلُ عَنِ الرَّجُلِ فَنَسِيَ أَنْ يُسَمِّيَهُ فَقَدْ أَجْزَأَ عَنْهُ الْحَجُّ، فَإِنَّ اللهَ قَدْ عَلِمَ عَمَّنْ حَجَّ.

যদি কেউ কারো পক্ষ থেকে (বদলী) হজ্ব করে আর সে (ইহরামের সময়) প্রেরকের নাম উচ্চারণ করতে ভুলে যায় তাহলেও তার হজ্ব আদায় হবে যাবে। কারণ আল্লাহ তাআলা জানেন, সে কার পক্ষ থেকে হজ্ব করেছে। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮-/২৩৫)

দেখুন : আলবাহরুল আমীক ৪/২২৬৩; মানাসিক ৪৪২; আদ্দুররুল মুখতার ২/৫৯৯

মাসআলা : বদলী হজ্ব আদায়কারী যদি ইহরাম বাঁধার সময় প্রেরণকারীর পক্ষ থেকে নিয়ত করতে ভুলে যায় তাহলে হজ্বের কাজ শুরু করার আগেই প্রেরকের পক্ষ থেকে নিয়ত করে নিবে। যদি নতুন করে প্রেরকের পক্ষ থেকে নিয়ত না করে হজ্বের আমলসমূহ করতে শুরু করে দেয় তাহলে তখন আর নিয়ত করার সুযোগ থাকে না। তখন এই হজ্ব হবে আদায়কারীর নিজের হজ্ব। প্রেরণকারীর টাকা ফেরত দেওয়া তার জন্য অপরিহার্য।-মানাসিক ৪৪২; রদ্দুল মুহতার ২/৫৯৯; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২৫

মাসআলা : মৃত ব্যক্তি যদি নির্দিষ্ট কাউকে দিয়ে তার বদলী হজ্ব করানোর অসিয়ত করে থাকে যে, অমুক আমার বদলী হজ্ব করবে, অন্য কেউ করতে পারবে না, তাহলে অন্য কাউকে দিয়ে তার বদলী হজ্ব করানো জায়েয নয়। আর যদি অসিয়তের সময় কারো নাম বললেও অন্য কাউকে দিয়ে করাতে নিষেধ না করে থাকে অর্থাৎ শুধু এতটুকু বলেছে যে, অমুককে দিয়ে আমার বদলী হজ্ব করাবে, এক্ষেত্রে উত্তম হল ঐ নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে দিয়েই হজ্ব করানো। তবে ঐ ব্যক্তি যদি রাজি না হয় বা কোনো কারণে করতে সক্ষম না হয় তাহলে অন্য কাউকে দিয়েও করাতে পারবে।

তদ্রূপ ঐ ব্যক্তির অসম্মতি বা অক্ষমতা ছাড়াও যদি তাকে না পাঠিয়ে অন্য কাউকে পাঠায় তাহলেও মৃতের ফরয হজ্ব আদায় হয়ে যাবে।-আলবাহরুল আমীক ৪/২৩৮৭; মানাসিক ৪৫১; আদ্দুররুল মুখতার ২/৬০০; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২৮

মাসআলা : মৃত ব্যক্তি যদি শুধু এটুকু অসিয়ত করে যে, আমার পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করাবে, কিন্তু কোনো প্রতিনিধি নিয়োগ করেনি তাহলে সকল ওয়ারিশ একত্র হয়ে পরামর্শক্রমে যেকোনো ব্যক্তিকে বদলী হজ্বের জন্য পাঠাতে পারবে। এতে মৃতের ফরয হজ্ব আদায় হয়ে যাবে।-মানাসিক ৫৫১; গুনইয়াতুন নাসিক ৩২৮

মাসআলা : যদি কোনো বদলী হজ্বকারী তাওয়াফে যিয়ারত না করেই দেশে চলে আসে তাহলে এ কারণে হজ্ব বাতিল হবে না। তবে তাকে নিজের খরচে মক্কা মুকাররমায় গিয়ে অবশ্যই তাওয়াফে যিয়ারত করতে হবে। অন্য কাউকে দিয়ে তা করানোর সুযোগ নেই।-মানাসিক ৪৫১

মাসআলা : বদলী হজ্বকারী শুধু এক হজ্বের ইহরাম করবে। তার জন্য একত্রে দুই হজ্বের নিয়তে ইহরাম করা-একটি প্রেরণকারীর পক্ষ থেকে আর অপরটি নিজের জন্য-এটি জায়েয নয় এবং এর দ্বারা প্রেরণকারীর হজ্ব আদায় হবে না। তবে নিজের নিয়তে যে হজ্বের ইহরাম করেছে তা যদি ছেড়ে দেয় তাহলে প্রেরকের বদলী হজ্ব আদায় হবে।

মাসআলা : বদলী হজ্বকারী নির্দিষ্ট এক ব্যক্তির পক্ষ থেকে ইহরাম করবে। একই হজ্বের ইহরাম দুই ব্যক্তির পক্ষ থেকে করা জায়েয নয়। যদি এমনটি করে তাহলে দু’জনের কারো হজ্ব আদায় হবে না। এটি আদায়কারীর নিজের হজ্ব হবে। সুতরাং ঐ দুই ব্যক্তি যদি তাদের পক্ষ থেকে হজ্ব করার জন্য তাকে টাকা দিয়ে থাকে তাহলে তাদের টাকা ফেরত দিতে হবে।-মানাসিক ৪৪৬; আদ্দুররুল মুখতার ২/৬০৭, ৬০১; গুনয়াইতুন নাসিক ৩২৫, ৩২৭

মাসআলা : বদলী হজ্ব আদায়কারী ইহরাম করবে প্রেরণকারীর মীকাত থেকে। অর্থাৎ প্রেরণকারীর দেশ থেকে মক্কা মুকাররমা যেতে যে মীকাত পরে সেখান থেকে বদলী হজ্বের ইহরাম করবে। যেমন-বাংলাদেশ থেকে সরাসরি মক্কাগামী হজ্বযাত্রীদের জন্য মীকাত হল ‘কারনুল মানাযিল’ ও ‘যাতু ইরক’। এই স্থানদ্বয় অতিক্রমের আগেই ইহরাম করতে হবে। সতর্কতার জন্য বিমানে ওঠার আগে কিংবা বিমানে উঠেই ইহরাম করে নেওয়া ভালো।-মানাসিক ৪৪২; রদ্দুল মুহতার ২/৬০০; গুনইয়াতুন নাসিক ৩৩২

মাসআলা : প্রেরিত ব্যক্তি প্রেরণকারীর আদেশের উল্টো করবে না। যেমন-প্রেরক হজ্বে ইফরাদ করার আদেশ করেছে, কিন্তু আদায়কারী প্রথমে নিজের জন্য উমরাহ করেছে। তারপর প্রেরকের পক্ষ থেকে হজ্ব করেছে। এমনটি করলে প্রেরকের হজ্ব আদায় হবে না। আর আদায়কারীকে অবশ্যই প্রেরকের টাকা ফেরত দিতে হবে।-মানাসিক ৪৪৪; রদ্দুল মুহতার ২/৬০০; গুনইয়াতুন নাসিক ৩৩৩

মাসআলা : কেউ কেউ ঈসালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে করা হজ্বকেও বদলী হজ্ব বলে থাকে। স্মরণ রাখতে হবে, এটি পারিভাষিক বদলী হজ্ব নয়। বদলী হজ্ব শরীয়তের একটি বিশেষ পরিভাষা।

ঈসালে ছওয়াবের হজ্ব আর বদলী হজ্ব দুটো এক নয়। বদলী হজ্ব হল নিজে হজ্ব আদায়ে অক্ষম কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় কাউকে হজ্বের খরচ দিয়ে তার পক্ষ থেকে ফরয হজ্ব আদায়ের জন্য প্রেরণ করা বা মৃত্যুর সময় তার ফরয হজ্ব আদায়ের অসিয়ত করে যাওয়ার ফলে তার পক্ষ থেকে আদায়কৃত হজ্ব।

আর নিজ খরচে কারো পক্ষ থেকে হজ্ব করলে বা করালে সেটিকে পারিভাষিক অর্থে বদলী হজ্ব বলা হয় না। এতে বদলী হজ্বের বিশেষ বিধানগুলো লক্ষণীয় নয়। এটি হল মুলত ঈসালে ছওয়াবের হজ্ব। এক্ষেত্রে হজ্ব আদায়ের সময়ই ঐ ব্যক্তির নিয়তে আদায় করা যায়। আবার আদায়ের পরও তাকে ছওয়াব পৌঁছানোর নিয়ত করা যায়। উভয় ক্ষেত্রেই ঐ ব্যক্তি এর ছওয়াব পেয়ে যাবেন।

মাসআলা : প্রেরক অনুমতি দিলে বদলীকারীর জন্য তামাত্তু বা কিরান হজ্ব করাও জায়েয। তদ্রূপ বিশেষভাবে ইফরাদ হজ্ব করার নির্দেশ না দিলে; সে ক্ষেত্রেও কিরান ও তামাত্তু যে কোনোটি করা জায়েয। হানাফী মুতাআখখিরীন ফকীহগণের অনেকে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, প্রেরকের অনুমতি থাকলে বদলীকারী কিরান ও তামাত্তু যে কোনোটি করতে পারবে, ইফরাদ হজ্ব করা জরুরি নয়। যেমন-আল্লামা ফখরুদ্দীন হাসান ইবনে মানসুর আলউযজান্দী রাহ. (মৃত্যু : ৫৯২ হি.), আল্লামা রহমতুল্লাহ সিন্ধী রাহ. (মৃত্যু : ৯৯৩ হি.), আল্লামা আলাউদ্দীন হাসকাফী রাহ. (মৃত্যু : ১০৮৮ হি.), আল্লামা কাযী হুসাইন ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল গনী হানাফী রাহ. (মৃত্যু : ১৩৬৬ হি.) প্রমুখ। এছাড়া উপমহাদেশের বড় বড় অনেক মুফতী ছাহেব এই ফতোয়া দিয়েছেন। যেমন-মুফতী কেফায়েতুল্লাহ দেহলভী রাহ., মুফতী মুহাম্মাদ শফী রাহ., মুফতী যফর আহমদ উছমানী রাহ., মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানবী রাহ., শাইখুল ইসলাম মুফতী তকী উছমানী দা.বা. প্রমুখ।

এছাড়াও রিয়াদস্থ গবেষণা ও ইফতাবোর্ড এবং ভারতের ইসলামী ফিকহ একাডেমীর সিদ্ধান্তও অনুরূপ। দেখুন : ফাতাওয়া খানিয়া ১/৩০৭; লুবাবুল মানাসিক ৪৫৯; আদ্দুররুল মুখতার ২/৬১১; ইরশাদুস সারী ৬৪৭; কেফায়েতুল মুফতী ৪/৩৪৫; জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/৫০৮; ইমদাদুল আহকাম ২/৫২৩; ফাতাওয়া উছমানী ২/২২২; ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ্দাইমাহ ১১/৮২

মাসআলা : বদলী হজ্ব এমন লোককে দিয়ে করানো উচিত, যিনি নিজের ফরয হজ্ব আদায় করেছেন। যে ব্যক্তি নিজের হজ্ব আদায় করেনি সে যদি এমন হয় যে, তার উপর হজ্ব ফরয নয় তাহলে তাকে দিয়েও বদলী করানো জায়েয আছে। তবে তা মাকরূহ তানযীহি। আর যদি তার উপর হজ্ব ফরয হয়ে থাকে, কিন্তু সে এখনও তা আদায় করেনি তাহলে তার জন্য বদলী হজ্ব করা মাকরূহ তাহরীমী তথা নাজায়েয। তবে কেউ এমন ব্যক্তির দ্বারা বদলী হজ্ব করালে প্রেরণকারীর হজ্ব আদায় হয়ে যাবে। পুনরায় তাকে বদলী করাতে হবে না।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে হজ্বের ইহরাম করার সময়-

لَبَّيْكَ عَنْ شُبْرُمَةَ

(শুবরুমার পক্ষ থেকে লাববাইক) এভাবে বলতে শুনে বললেন, ‘শুবরুমা কে?’ লোকটি বলল, ‘আমার ভাই (বর্ণনাকারী বলেন) অথবা বলল, আমার নিকটাত্মীয় এক লোক।’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি কি নিজের হজ্ব করেছ?’সে বলল, ‘না।’ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আগে তোমার নিজের হজ্ব কর তারপর শুবরুমার পক্ষ থেকে কর।-সুনানে আবু দাউদ ১/২৫২

হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত আছে-

كان لا يرى بأسا أن يحج الصرورة عن الرجل.

যে ব্যক্তি নিজের হজ্ব করেনি যে অন্যের পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করাকে তিনি দোষের বিষয় মনে করতেন না।

বিশিষ্ট তাবেয়ী হযরত মুজাহিদ, হাসান বসরী ও সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব রাহ.ও এমনই মনে করতেন। (মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮/১৮৯) দেখুন : মাবসূত, সারাখসী ৪/১৫১; আলবাহরুল আমীক ৪/২২৬৩; ফাতহুল কাদীর ৩/৭৯; রদ্দুল মুহতার ২/৬০৩

মাসআলা : কাউকে এমনিই নেক কাজের নিয়তে হজ্ব করাতে চাইলে বা হজ্ব আদায়ে আর্থিক সহায়তা করতে চাইলে এমন ব্যক্তিকে করানো উত্তম, যিনি এখনও হজ্ব করেননি।-মাবসূত, সারাখসী ৪/১৫২; আলবাহরুল আমীক ৪/২২৬৮; গুনইয়াতুন নাসিক ৩৩৯

মাসআলা : কোনো কোনো কিতাবে আছে যার উপর হজ্ব ফরয হয়নি এমন ব্যক্তি বদলী হজ্বে গেলে কাবা শরীফ দেখার দ্বারা তার নিজের উপর হজ্ব ফরয হয়ে যায়। যদিও সে গরীব হোক না কেন। সুতরাং তার জন্য জরুরি, হজ্বের পর পরবর্তী বছর হজ্বের সময় পর্যন্ত মক্কায় অবস্থান করা এবং হজ্বের নির্দিষ্ট সময় নিজের ফরয হজ্ব আদায় করা। যদি দেশে চলে আসে তাহলে পুনরায় নিজের ফরয হজ্ব আদায়ের উদ্দেশে মক্কা মুকাররমা যাওয়া জরুরি।

এ বক্তব্য ঠিক নয়। বিশুদ্ধ মতানুসারে এমন গরীব ব্যক্তি বদলী হজ্ব করতে গিয়ে বাইতুল্লাহ শরীফ দেখার দ্বারা তার উপর হজ্ব ফরয হয় না। কেননা, সে অন্যের পক্ষ থেকে হজ্বের ইহরাম বাঁধার কারণে তৎক্ষণাৎ নিজের জন্য হজ্ব করতে সক্ষম নয়। আর পরবর্তী বছর হজ্বের সময় আসা পর্যন্ত তার পক্ষে সেখানে অবস্থান করা সম্ভব নয়। আবার স্বদেশে চলে আসার পর পুনরায় হজ্বের জন্য যাওয়ারও তার আর্থিক সামর্থ্য নেই।

এইজন্য মুহাক্কিক উলামায়ে কেরাম উক্ত বক্তব্যটি প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং এ ধরনের গরীব বদলীকারীর উপর বাইতুল্লাহ শরীফ দেখার দ্বারা হজ্ব ফরয না হওয়ার ফতোয়া দিয়েছেন।-রদ্দুল মুহতার ২/৬০৪; গুনইয়াতুন নাসিক ৩৩৮; জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/৫০৭; ফাতাওয়া উছমানী ২/২২২

মাসআলা : অন্যের বদলী হজ্ব করার দ্বারা নিজের ফরয হজ্ব আদায় হয় না। সুতরাং বদলী আদায়কারীর উপর হজ্ব ফরয হলে তাকে পৃথকভাবে নিজের ফরয হজ্ব আদায় করতে হবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তিকে ইহরাম করার সময়-

لَبَّيْكَ عَنْ شُبْرُمَةَ

(শুবরুমার পক্ষ থেকে লাববাইক) এভাবে বলতে শুনলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, শুবরুমা কে? সে বলল, আমার ভাই বা (বলেছে) আমার এক আত্মীয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, তুমি কি নিজের হজ্ব করেছ? সে বলল না। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, আগে তোমার নিজের হজ্ব কর। তারপর শুবরুমার পক্ষ থেকে হজ্ব কর। (সুনানে আবু দাউদ ১/২৫২)

যদি অন্যের পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করার দ্বারা নিজের ফরয হজ্বও আদায় হয়ে যেত তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকটিকে আগে নিজের হজ্ব করতে বলতেন না। আরো দেখুন : মাবসূত, সারাখসী ৪/১৪৭; ফাতহুল কাদীর ৩/৬৮; খুলাসাতুল ফাতাওয়া ১/২৭৮; আলবাহরুল আমীক ৪/২২৫২

মাসআলা : উমরাহর বদলী করাও জায়েয আছে।

হযরত আবু রাযীন আলউকায়লী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার বাবা অতিশয় বৃদ্ধ মানুষ। তিনি হজ্ব ও উমরাহ করতে সক্ষম নয়। (আমি কী করতে পারি?)’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমার বাবার পক্ষ থেকে তুমি হজ্ব ও উমরাহ আদায় কর।’ (জামে তিরমিযী ১/১১২) দেখুন : গুনইয়াতুন নাসিক ৩২০

মাসআলা : মান্নত হজ্বের বদলী করা জায়েয। অর্থাৎ কেউ হজ্ব বা উমরার মান্নত করেছে, কিন্তু স্বয়ং তা আদায় করতে সক্ষম নয় বা আদায়ের আগেই তার মৃত্যু এসে গেছে তাহলে সে কারো দ্বারা এর বদলী করিয়ে নিবে বা বদলী করানোর অসিয়ত করে যাবে।

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আববাস রা. বলেন, ‘জুহাইনা গোত্রের এক নারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, ‘আমার মা হজ্বের মান্নত করেছিলেন। কিন্তু হজ্ব আদায়ের আগেই তিনি মারা গেছেন। এখন আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্ব করতে পারব?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি তার পক্ষ থেকে হজ্ব কর। যদি তোমার মায়ের কোনো অনাদায়ী ঋণ থাকত তাহলে তুমি কি তা পরিশোধ করতে না? আল্লাহর ঋণও আদায় কর। আল্লাহর ঋণ আরো বেশি আদায়যোগ্য।’ (সহীহ বুখারী ১/২৫০)

মাসআলা : যে ব্যক্তি নিজের ফরয হজ্ব আদায় করে ফেলেছে তার জন্য নফল হজ্ব করার চেয়ে উত্তম হল, অন্য কারো ফরয হজ্বের বদলী করা।

হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মৃতের পক্ষ থেকে বদলী  হজ্ব করলে সেও মৃতের সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।’ (মাজমাউয যাওয়াইদ ৩/৬১৪; আলমুজামুল আওসাতের বরাতে)

হযরত হাসান বসরী রাহ. বলেন, ‘যে ব্যক্তি কারো পক্ষ থেকে বদলী হজ্ব করবে তার জন্যও ঐ ব্যক্তির সমপরিমাণ সওয়াবের আশা করা যায়।’

হযরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব রাহ. বলেন-

إن الله لواسع لهما جميعا

(মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা ৮/৭১১) দেখুন : আলবাহরুল আমীক ৪/২২৫৭; গুনইয়াতুন নাসিক ৩৩৭

 

***********************************সৌজন্যেঃ- মাসিক আলকাউসার***********************************

হজ্ব বিষয়ক ভুল-ভ্রান্তি

 মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া

হজ্বই একমাত্র ইবাদত, যার নিয়ত করার সময়ই আল্লাহ তাআলার নিকট সহজতা ও কবুলের দুআ করা হয়। অন্যান্য ইবাদত থেকে হজ্বের আমলটি যে কঠিন তা এ থেকেই স্পষ্ট। হজ্বের সঠিক মাসআলার জ্ঞান যেমন জরুরি, তেমনি তা আদায়ের কৌশল এবং পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকে করণীয় বিষয়গুলোর প্রতি পূর্ণ খেয়াল রাখাও জরুরি। হজ্বে যে সকল ভুল হতে দেখা যায় তা সাধারণত উদাসীনতার কারণেই হয়ে থাকে। তাই নিম্নে সচরাচর ঘটে থাকে এমন কিছু ভুল উল্লেখ করা হচ্ছে। যেন হাজ্বীগণ এ সকল ভুল-ভ্রান্তি- থেকে বেঁচে সুষ্ঠুরূপে হজ্ব আদায়ে সক্ষম হন। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন।

ইহরামের দুই রাকাত নামাযের জন্য ইহরাম বিলম্বিত করা

ইহরাম বাঁধার আগে দুই রাকাত নামায পড়ার নিয়ম আছে। তাই অনেককে দেখা যায়, এই দুই রাকাত নামাযের সুযোগ না পাওয়ার কারণে ইহরাম বিলম্বিত করতে থাকে। এমনকি এ নামায পড়তে না পারার কারণে কেউ কেউ ইহরাম ছাড়াই মীকাতে র ভেতরে পর্যন- চলে যায় অথচ ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করা জায়েয নয়। তারা যেহেতু ইহরামের আগে দুই রাকাত নামায আদায়কে জরুরি মনে করে তাই তারা এমনটি করে থাকে। অথচ ইহরামের আগে নামায পড়া সকল মাযহাবেই মুস্তাহাব; জরুরি কিছু নয়। পক্ষান-রে ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করা নাজায়েয। সুতরাং ইহরামের আগে নামাযের সুযোগ পেলে তো তা আদায় করা চাই, কিন্তু সুযোগ না পেলে সে কারণে ইহরাম বাঁধাকে বিলম্ব করবে না।-সহীহ মুসলিম ১/৩৭৬; মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১২৯০০; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ৯৮; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/৮১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৩; রদ্দুল মুহতার ২/৪৮১-৪৮২

ইহরাম বাঁধার নিয়ম সংক্রান্ত- ভ্রান্তি-সমূহ

অনেকে মনে করে থাকে যে, ইহরামের কাপড় পরে নামায পড়ার পর নিয়ত করলেই ইহরাম সম্পন্ন হয়ে যায়। এ ধারণা ভুল। এগুলো দ্বারা ইহরাম সম্পন্ন হয় না। নিয়ত আরবীতে করা হোক বা বাংলাতে, সশব্দে করা হোক বা মনে মনে এর দ্বারা ইহরাম সম্পন্ন হয় না; বরং নিয়তের পর তালবিয়া পড়লে ইহরাম পূর্ণ হয়। অতএব বোঝা গেল, ইহরাম সম্পন্ন হয় দুই বস’র সমন্বয়ে : ১. হজ্ব বা উমরার নিয়ত করা ও ২. তালবিয়া পড়া।-জামে তিরমিযী ১/১০২; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৬৫; মানাকি মোল্লা আলী কারী পৃ. ৮৯

মক্কাগামীদের জন্য জিদ্দায় ইহরাম বাঁধা

কেউ কেউ আগে থেকেই ইহরাম বাঁধা ঝামেলা মনে করে এবং ভাবে যে, ইহরাম বেঁধে নিলেই তো ইহরামের নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়ে যাবে। বিমান যেহেতু জিদ্দায় অবতরণ করবে তাই জিদ্দায় ইহরাম বাঁধার ইচ্ছায় ইহরামকে বিলম্বিত করে। অথচ মীকাতের বাইরের হাজ্বীদের জন্য ইহরাম ব্যতীত মীকাত অতিক্রম করা জায়েয নেই। উপমহাদেশ থেকে গমনকারী হাজ্বীদের জন্য মীকাত হল কারনুল-মানাযিল ও যাতু ইরক যা অতিক্রম করেই জেদ্দায় যেতে হয়। যদি কেউ বিনা ইহরামে মীকাত অতিক্রম করে তবে তার জন্য পুনরায় মীকাতে ফিরে এসে ইহরাম বেঁধে যাওয়া জরুরি। যদি তা না করে তবে দম ওয়াজিব হবে। যেহেতু বিমানে থাকা অবস্থায় মীকাতের জায়গা নির্ধারণ করা কঠিন বা ঐ সময় ঘুমিয়ে পড়া, অন্যমনষ্ক থাকা ইত্যাদি হতে পারে। তাই বিমানে চড়ার আগে কিংবা বিমানে উঠেই ইহরাম বেঁধে নেওয়ার কথা বলা হয়।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫৭০২; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ৮৪; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৬০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২১; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/৭৬; রদ্দুল মুহতার ২/৪৭৭

সেলাইবিহীন কাপড় বা চপ্পলের জন্য ইহরাম বিলম্বে বাঁধা

কেউ কেউ ইহরামের কাপড় না পরে বিমানে উঠে যায়। অথবা মদীনা থেকে গাড়িতে উঠে পড়ে। এরপর যখন গাড়ি বা বিমানের মধ্যে পরিধানের কাপড় বদলিয়ে ইহরামের কাপড় পরা কষ্টকর হয় কিংবা কাপড় লাগেজে থেকে যায়। তখন তারা সেলাইবিহীন কাপড় পরতে না পারার কারণে ইহরাম বিলম্বিত করতে থাকে। এমনকি ইহরাম ছাড়া মীকাত অতিক্রম করে ফেলে। ফলে দম ওয়াজিব হয়ে যায়। অথচ মীকাত অতিক্রমের আগে সেলাইযুক্ত কাপড়ের অবস্থায়ই যদি ইহরাম বেঁধে নিত এবং গাড়ি বা বিমান থেকে অবতরণের পরেই ইহরামের কাপড় পরে নিত তবে তার অন্যায়টা দম ওয়াজিব হওয়ার মতো বড় হত না। ইহরাম অবস্থায় এ কয়েক ঘণ্টা (১২ ঘণ্টার কম) সেলাই করা কাপড় পরে থাকার কারণে একটি পূর্ণ সদকা ফিতর আদায় করে দিলেই চলত।-জামে তিরমিযী ১/১৭১; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ৩০০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২৪২; রদ্দুল মুহতার ২/৫৪৭

ইহরামের কাপড় পরিবর্তন করা যাবে না

কেউ কেউ মনে করে, যে কাপড়ে ইহরাম বাঁধা হয়েছে সে কাপড় হালাল (ইহরাম শেষ) হওয়ার আগ পর্যন- বদলানো যাবে না। এটা একটা ভুল ধারণা। ওই কাপড় নাপাক না হলেও বদলানো যাবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা হাদীস : ১৫০১০, ১৫০১১; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ৯৮; গুনইয়াতুন নাসিক পৃ. ৭১

তাওয়াফের সময় ছাড়াও ইযতিবা করা

অনেককে দেখা যায়, ইহরামের প্রথম থেকেই ইযতিবা (বাম কাঁধের উপর চাদর রেখে ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে পরিধান করা) করে থাকে এবং হালাল হওয়া পর্যন- এ অবস্থায় থাকাকে শরয়ী হুকুম মনে করে। এটি ভুল। এভাবে নামায পড়লে নামায মাকরূহ হবে। আবার কেউ কেউ তাওয়াফের সময় ইযতিবা করে এবং এ অবস্থায় সায়ীও করে থাকে এবং তাওয়াফের মতো সাঈতেও তা করা শরয়ী বিধান মনে করে। অথচ সাঈতে ইযতিবা’র বিধান নেই। এমনকি সকল তাওয়াফেও এটি সুন্নত নয়; বরং যে তাওয়াফের পর সাঈ করতে হয় শুধু সেই তাওয়াফেই ইযতিবা করতে হয়। সুতরাং নফল তাওয়াফে ইযতিবা নেই। কেননা নফল তাওয়াফের পর সাঈ নেই।-ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/২২৫; মানাসিক মোল্লা আলী কারী পৃ. ১২৯; আলমুগনী ইবনে কুদামা ৫/২১৭

***********************************সৌজন্যেঃ- মাসিক আলকাউসার***********************************

হজ্ব পরবর্তী জীবন কেমন হওয়া উচিত

 মাওলানা আব্দুল্লাহ ফাহাদ

হজ্ব ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যে পাঁচটি বিষয়ের উপর ইসলামের মূল ভিত্তি, তার পঞ্চমটি হল হজ্ব। তবে নামায, রোযা থেকে হজ্বের বিধানটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেননা, এটি মুসলমানের উপর প্রতিদিন অথবা প্রতি বছর ফরয হয় না; বরং জীবনে মাত্র এক বারই ফরয হয়ে থাকে। আর বস্ত্তত হজ্ব পালন আল্লাহর প্রতি বান্দার অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। হজ্বের পুরো ব্যাপারটিই মূলত আল্লাহর এক অনুগত বান্দা নবী হযরত ইবরাহীম আ.-এর স্মৃতিচারণ। যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বিভিন্ন কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন পূর্ণ সফলতার সঙ্গে। পবিত্র কুরআন মজীদে যার বর্ণনা এসেছে। আল্লাহর প্রতি তাঁর এই অকৃত্রিম ভালোবাসা আর মহা ত্যাগ আল্লাহর দরবারে এতই কবুল হয়েছিল যে, পরবর্তী নবীর উম্মতের জন্যও সে পাগলপারা বান্দার রূপ ও বেশ-ভূষা ধারণ করা ইবাদতের অংশ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর তাই বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ থেকে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ধর্মপ্রাণ মানুষ ভালোবাসার টানে, যিয়ারতে বাইতুল্লাহর ঈমানী আকর্ষণে ছুটে আসে হজ্ব পালনে। ইযার পরনে গায়ে চাদর জড়িয়ে ফকীরের বেশে লাববাইক আল্লাহুম্মা লাববাইক … ধ্বনিতে মুখরিত থাকে সবখানে। যাদের অন্তর পবিত্র, যাদের অর্ন্তদৃষ্টি আছে, তারা দেখেন আল্লাহর কুদরত, তাঁর অপার মহিমা, তাদের মনে জাগে বার বার হাযিরীর সাধ। আর যাদের তা নেই, যাদের হৃদয় কলুষিত, তাদেরও হয় অনুভূতি, তারাও পায় অভাবিত স্বাদ। এ সময়ে যেন বয়ে বেড়ায় খোদার করুণার ফল্গুধারা, যার পরশে সৌভাগ্যবানরা হয়ে ওঠেন আত্মহারা।

কিন্তু এই সৌভাগ্য তো তাদেরই নসীব হয়, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন, যাদেরকে তিনি দিয়েছেন তাঁর ঘর যিয়ারত করার সামর্থ্য। নামায-রোযার মতো এই ইবাদতটি সাধারণ মুসলমানের উপর আবশ্যকীয় নয়। এর জন্য রয়েছে বিশেষ কিছু শর্তাবলি। এ প্রসঙ্গে কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে- ‘মানুষের জন্য আল্লাহর (সন্তুষ্টির) উদ্দেশ্যে বাইতুল্লাহর হজ্ব করা অপরিহার্য, যারা সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে।’ -সূরা আল ইমরান ৯৭

এই আয়াতের আলোকে ফকীহগণ বলেছেন যে, কোনো বালেগ মুসলমান দৈহিক ও মানসিকভাবে সুস্থ হলেই তার উপর হজ্ব ফরয হবে না; বরং হজ্ব ফরয হওয়ার প্রধান শর্ত হচ্ছে সামর্থ্য। অর্থাৎ নিজ দেশ বা অঞ্চল থেকে মক্কা-মদীনায় যাওয়া-আসার খরচ, সেখানে অবস্থানকালীন খরচ এমনকি এ পূর্ণ সফরে নিজের পরিবার-পরিজনের খরচ বহন করার সামর্থ্য থাকা। আর যে ব্যক্তি উক্ত শর্তে উন্নীত হয় তার জীবনে কেবল এক বার হজ্ব করা ফরয। আর মূলত এই একটি বারের হজ্বই একজন মুসলমানের সতর্ক হওয়া, জীবনের ভুলগুলো শুধরিয়ে নতুন পথে চলা ও জীবনে আমূল পরিবর্তন আনার পক্ষে যথেষ্ট। কেননা হজ্ব মানুষের অন্তরে দুনিয়ার সবকিছুকে ভুলিয়ে একমাত্র মহান রাববুল আলামীনের ভালোবাসাকে বদ্ধমূল করে দেয়। আর তাই হজ্বের সময় মানুষ স্ত্রী-পুত্র, পরিবার-পরিজন ছেড়ে খোদার ভালোবাসায় ডুবে থাকে। মহা শক্তিধর, পরাক্রমশালী রবের দরবারে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে ঐশী করুণায় হৃদয়-মন সিক্ত করে। বান্দা আর রবের সেই সময়কার অবস্থা বলে বোঝানোর নয়। এটা শুধু স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে অনুভব ও অভিজ্ঞতা অর্জনের বিষয়। হজ্বের লক্ষণীয় যে, নামায, রোযা ইত্যাদি ইবাদতের ফায়দা কুরআন মজীদে স্পষ্ট করেই বর্ণনা করা হয়েছে। নামাযের ফায়দা হল, নামায মানুষকে সকল অশ্লীল ও খারাপ কার্যকলাপ থেকে বিরত রাখে। আর রোযা মানুষের মধ্যে তাকওয়া-খোদাভীতি সৃষ্টি করে, মানুষের হৃদয়ে এই অনুভূতি জাগ্রত করে যে, মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ আমাকে দেখছেন। তেমনিভাবে যাকাতের ফায়দা হল, যাকাত মানুষের সম্পদকে পবিত্র রাখে। এর মাধ্যমে ধন-সম্পদে বরকত হয় ও গরীব-অসহায়দের প্রয়োজন মিটে।

কিন্তু হজ্বের ফায়দা বর্ণনা করতে গিয়ে শুধু বলা হয়েছে- অর্থ : ‘যাতে তারা তাদের কল্যাণের স্থানসমূহে উপস্থিত হয়।’’ -সূরা হজ্ব ২৮

এখানে নামায-রোযার মতো হজ্বের কোনো নির্দিষ্ট ফায়দা উল্লেখ করা হয়নি; বরং শুধুমাত্র সশরীরে সেখানে উপস্থিত হয়ে তা সরাসরি উপলব্ধি করতে বলা হয়েছে। এতে বুঝা যায় যে, হজ্বের ফায়দা কাউকে বলে বোঝানোর মতো নয়। কারো থেকে শুনেও তা বোঝা যাবে না। এটি শুধু অনুভূতি দিয়ে বোঝার বিষয়। এজন্যই মানুষ এ সময়ে তার আভ্যন্তরীণ পরিবর্তন অনুভব করতে পারে। তার চিন্তা-ধারা, কার্যকলাপে সে পরিবর্তন লক্ষ করে। আর এর প্রতিফলন ঘটে তার বাস্তব জীবনে। এমনকি তার আগ্রহ-উদ্দীপনার ধারা পরিবর্তিত হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম হয়ে ওঠে। আর সে নিজেও অনুধাবন করতে পারে যে, এখন সে আর আগেকার সেই মানুষটি নেই, এখন সে সম্পূর্ণ ভিন্ন কেউ হয়ে গেছে।

এখানে একটি কথা জেনে নেওয়া উচিত যে, হজ্বের এত ব্যাপক ফায়দা থাকলেও প্রত্যেকে শুধু নিজের অবস্থা ও যোগ্যতা অনুযায়ী তা অনুভব করতে সক্ষম হয়। যার মধ্যে ইখলাস, তাকওয়া ও মুজাহাদা যত বেশি হবে, যে যত সতর্কতা ও সাবধানতার সঙ্গে হজ্বের কাজগুলো আঞ্জাম দিবে সে তত বেশি ফায়দা অনুভব করবে। হজ্ব তাকে ততটাই প্রভাবিত করবে। একাধিকবার হজ্ব করলেও প্রতিবারই নতুন নতুন ফায়দা তার অনুভূত হতে থাকবে। প্রতিবারই সে নতুনভাবে প্রভাবিত হবে। ঈমানে ও বিশ্বাসে আগের চেয়ে অধিক সতেজ হয়ে উঠবে।

আর যেহেতু এসময় মানুষ দুনিয়ার সবকিছু ভুলে এক মাওলার ভালোবাসায় নিজেকে সমর্পিত করে, আল্লাহ তাআলার সঙ্গে বান্দার বিশেষ সম্পর্ক স্থাপিত হয়, তাঁর করুণা, মহিমা সরাসরি উপভোগ করতে থাকে, তাছাড়া পবিত্র ভূমিতে, পূণ্যময় স্থানসমূহে নিজেকে সকল প্রকার গুনাহ থেকে মুক্ত রাখে, শয়তানের ধোঁকা ও গুনাহর যাবতীয় উপকরণ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে নিজের অতীত গুনাহর ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে তাই হজ্বই মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে যথেষ্ট। এ অল্প সময়ের মুজাহাদা তাকে বাকি জীবন গুনাহমুক্তভাবে বাঁচতে উৎসাহিত করে। ফলে আল্লাহর ভালোবাসায় উজ্জীবিত এ মানুষটির পক্ষে হজ্বপরবর্তী জীবনে যাবতীয় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা অতি সহজ হয়।

হজ্বের একটি ফযীলত হল, হজ্বের মাধ্যমে মানুষ অতীত জীবনের যাবতীয় গুনাহ থেকে মুক্তি লাভ করে। তবে বান্দার হক ব্যতীত। হাদীস শরীফে এসেছে-

অর্থ : ‘যে ব্যক্তির আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ্ব করে এবং সকল অশ্লীল ও গুনাহর কথা ও কাজ থেকে বিরত থাকে সে সদ্যজাদ শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়।’ (সহীহ বুখারী ১:২০৬)

অর্থাৎ হজ্ব মানুষের জীবনের সকল গুনাহ মুছে দেয়। তবে বান্দার কোনো হক অনাদায়ী থাকলে তা ব্যতীত। এজন্যই হজ্বে যাওয়ার আগে হজ্বের প্রধান প্রস্ত্ততি হচ্ছে মুরববীদের কাছ থেকে দুআ নেওয়া ও কারো হক অনাদায়ী থাকলে তা পরিশোধ করে দেওয়া। আর পরিশোধ করা সম্ভব না হলে তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া।

আর তাই কেউ যদি বান্দার যাবতীয় অনাদায়ী হক আদায় করে হজ্বের সফরে বের হয় এবং সকল বিধি-নিষেধ মেনে হজ্ব আদায়ে সক্ষম হয় তাহলে সে সদ্যভূমিষ্ট শিশুর মতোই নিষ্পাপ হয়ে যায়। আর এ নিষ্পাপ বান্দাটির সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক আরো গভীর হয়। সুতরাং হজ্বের পর দেশে ফিরেও যেন সে গুনাহ ও পঙ্কিলতামুক্ত থাকে, তার বাকিটা জীবন যেন নিষ্পাপ শিশুর মতোই কেটে যায় এজন্য সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি। আর এটিই হবে আল্লাহর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসার মূল দাবি ও একজন সাচ্চা আশেকের সতেজ ইশকের বহিঃপ্রকাশ।

দেশে ফিরে করণীয়

হজ্বের সফরের পূর্ণ সময়টা মূলত মানুষের জীবনে তাকওয়া ও খোদাভীতি অর্জনের এক মোক্ষম সময়। এ স্বল্প সময়ের প্রশিক্ষণে একজন মানুষ নিজেকে পরিপূর্ণ মুত্তাকী হিসেবে গড়ে তোলে। তাই দেশে ফিরেও যেন সেই তাকওয়া অটুট থাকে সেদিকে লক্ষ রাখা আবশ্যক। আর হজ্বের সফরের আগে থেকে পেশাগত অথবা অন্য কোনো কারণে কোনো প্রকার গুনাহর কাজে জড়িত থাকলে হজ্ব সফরের পূর্বেই তা থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক হয়ে যাওয়া এবং হজ্বের সময় জুড়ে আল্লাহর কাছে বারংবার কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকা জরুরি। আর হজ্ব শেষে দেশে ফিরে সব রকমের গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক।

এজন্য আল্লাহ ওয়ালাদের সংস্পর্শে থাকা উচিত। এ সম্পর্কে কুরআন মজীদে ইরশাদ হয়েছে- অর্থ ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যনিষ্ঠদের সঙ্গে থাক।’ (সূরা তাওবা : ১১৯)

এ আয়াতে প্রথমত মুমিনদেরকে সম্বোধন করে বলা হয়েছে যে, হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আর এই ভয় করার উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর অবাধ্যতা না করা ও গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।

তবে যেহেতু আমাদের পরিবেশে গুনাহ থেকে বাঁচা খুবই কঠিন, কেননা, আমাদের চারদিকে শুধু গুনাহ আর গুনাহ। তাই এ পরিবেশে তাকওয়া অবলম্বনের সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হল আল্লাহ ওয়ালাদের সোহবত ও সাহচর্যে থাকা। কারণ আল্লাহ তাআলা তাকওয়া অবলম্বনের আদেশ দেওয়ার পাশাপাশি আল্লাহ ওয়ালাদের সাহচর্যে থাকারও নির্দেশ করেছেন। আর কুরআনের একটি নীতি এই যে, যখনই আল্লাহ তাআলা এমন কোনো হুকুম প্রদান করেন, যা পালন করা কষ্টসাধ্য তখন পাশাপাশি অন্য এমন একটি আদেশ প্রদান করে থাকেন যার উপর আমল করলে প্রথম হুকুমের উপর আমল করা সহজ হয়ে যায়। আর তাই আল্লাহ ওয়ালাদের সাথে থাকা, তাদের সাথে সম্পর্ক গড়া, তাদের কথা মান্য করা ইত্যাদির মাধ্যমে গুনাহ থেকে সহজেই বেঁচে থাকা সম্ভব। কেননা, মানুষ স্বভাবগতভাবেই পরিবেশের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। ফলে গুনাহর পরিবেশ বর্জন করে নেক ও সৎ লোকদের পরিবেশে নিজেকে অভ্যস্ত করে বাকি জীবন গুনাহমুক্তভাবে কাটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা অপরিহার্য।

এছাড়া নিম্নোক্ত আমলগুলো নিয়মিতভাবে করে যাওয়া উচিত।

১। প্রতিদিন নিয়মিতভাবে কিছু পরিমাণ কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করা।

২। পাঁচ ওয়াক্ত নামায মসজিদে গিয়ে তাকবীরে উলার সাথে আদায়ের চেষ্টা করা।

৩। প্রতিদিনের ফরয ও সুন্নত নামাযের পাশাপাশি কিছু পরিমাণ নফল নামাযেরও অভ্যাস গড়ে তোলা।

৪। প্রত্যহ তাহাজ্জুদ নামায পড়তে চেষ্টা করা।

৫। প্রতিদিন ইস্তেগফার, দুরূদ শরীফ ও অন্যান্য দুআ-যিকির ইত্যাদি পাঠ করা।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমল করার তাওফীক দিন। আমীন।।

***********************************সৌজন্যেঃ- মাসিক আলকাউসার***********************************

December 12, 2021

স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো?

স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো? (হুমায়ুন আজাদের সাথে কথোপকথন!)

ল্যাম্পপোষ্টের অস্পষ্ট আলোয় একজন বয়স্ক লোকের ছায়ামূর্তি আমাদের দৃষ্টিগোচর হলো।গায়ে মোটা একটি শাল জড়ানো। পৌষের শীত। লোকটা হালকা কাঁপছেও।
–
আমরা খুলনা থেকে ফিরছিলাম। আমি আর সাজিদ।
ষ্টেশান মাষ্টারের রুমের পাশের একটি বেঞ্চিতে লোকটা আঁটসাঁট হয়ে বসে আছে।
ষ্টেশানে এরকম কতো লোকই তো বসে থাকে।তাই সেদিকে আমার বিশেষ কোন কৌতুহল ছিলো না।কিন্তু

সাজিদকে দেখলাম সেদিকে এগিয়ে গেলো।

লোকটার কাছে গিয়েই সাজিদ ধপাস করে বসে পড়লো।আমি দূর থেকে খেয়াল করলাম, লোকটার সাথে সাজিদ হেসে হেসে কথাও বলছে।
আশ্চর্য! খুলনার ষ্টেশান।এখানে সাজিদের পরিচিত লোক কোথা থেকে এলো? তাছাড়া, লোকটিকে দেখে বিশেষ কেউ বলেও মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোন বাদাম বিক্রেতা।বাদাম বিক্রি শেষে প্রতিদিন ওই জায়গায় বসেই রাত কাটিয়ে দেয়।
আমাদের রাতের ট্রেন। এখন বাজে রাত দু’টো।এই সময়ে সাজিদের সাথে কারো দেখা করার কথা থাকলে তা তো আমি জানতামই। অদ্ভুত!
–
আমি আরেকটু এগিয়ে গেলাম। একটু অগ্রসর হতেই দেখলাম, ভদ্রলোকের হাতে একটি বইও আছে।দূর থেকে আমি বুঝতে পারি নি।
সাজিদ আমাকে ইশারা দিয়ে ডাকলো। আমি গেলাম।
লোকটার চেহারাটা বেশ চেনা চেনা লাগছে,কিন্তু সঠিক মনে করতে পারছি না।
সাজিদ বললো,- ‘এইখানে বোস।ইনি হচ্ছেন হুমায়ুন স্যার।’
হুমায়ুন স্যার? এই নামে কোন হুমায়ুন স্যারকে তো আমি চিনি না।সাজিদকে জিজ্ঞেস করতে যাবো যে কোন হুমায়ুন স্যার, অমনি সাজিদ আবার বললো,- ‘হুমায়ুন আজাদকে চিনিস না? ইনি আর কি।’
এরপর সে লোকটার দিকে ফিরে বললো,- ‘স্যার, এ হলো আমার বন্ধু, আরিফ।’
লোকটা আমার দিকে তাকালো না। সাজিদের দিকে তাকিয়ে আছে।ঠোঁটে মৃদু হাসি।
আমার তখনো ঘোর কাটছেই না।কি হচ্ছে এসব? আমিও ধপাস করে সাজিদের পাশে বসে গেলাম।
–
সাজিদ আর হুমায়ুন আজাদ নামের লোকটার মধ্যে আলাপ হচ্ছে।এমনভাবে কথা বলছে, যেন তারা পরস্পর পরস্পরকে অনেক আগে থেকেই চিনে।
লোকটা সাজিদকে বলছে,- ‘তোকে কতো করে বলেছি, আমার লেখা ‘আমার অবিশ্বাস’ বইটা ভালোমতো পড়তে। পড়েছিলি?’
সাজিদ বললো,- ‘হ্যাঁ স্যার। পড়েছি তো।’
– ‘তাহলে আবার আস্তিক হয়ে গেলি কেনো? নিশ্চয় কোন ত্যাদড়ের ফাঁদে পড়েছিস? কে সে? নাম বল? পেছনে যে আছে, কি জানি নাম?’
– ‘আরিফ……’
– ‘হ্যাঁ, এই ত্যাদড়ের ফাঁদে পড়েছিস বুঝি? দাঁড়া, তাকে আমি মজা দেখাচ্ছি……..’
এই বলে লোকটা বসা থেকে উঠতে গেলো।
সাজিদ জোরে বলে উঠলো,- ‘না না স্যার। ও কিচ্ছু জানে না।’
– ‘তাহলে?’
– ‘আসলে স্যার, বলতে সংকোচ বোধ করলেও সত্য এটাই যে, নাস্তিকতার উপর আপনি যেসব লজিক দেখিয়েছেন, সেগুলো এতটাই দূর্বল যে, নাস্তিকতার উপর আমি বেশিদিন ঈমান রাখতে পারি নি।’
এইটুকু বলে সাজিদ মাথা নিঁচু করে ফেললো।
লোকটার চেহারাটা মূহুর্তেই রুক্ষ ভাব ধারন করলো। বললো,- ‘তার মানে বলতে চাইছিস, তুই এখন আমার চেয়েও বড় পন্ডিত হয়ে গেছিস? আমার চেয়েও বেশি পড়ে ফেলেছিস? বেশি বুঝে ফেলেছিস?’
সাজিদ তখনও মাথা নিঁচু করে আছে।
লোকটা বললো,- ‘যাক গে! একটা সিগারেট খাবো।ম্যাচ নেই। তোর কাছে আছে?’
– ‘জ্বি স্যার।’- এই বলে সাজিদ ব্যাগ খুলে একটি ম্যাচ বের করে লোকটার হাতে দিলো।সাজিদ সিগারেট খায় না।তবে, প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো তার ব্যাগে থাকে সবসময়।
–
লোকটা সিগারেট ধরালো।কয়েকটা জোরে জোরে টান দিয়ে ফুঁস করে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লো।ধোঁয়াগুলো মূহুর্তেই কুন্ডুলি আকারে ষ্টেশান মাষ্টারের ঘরের রেলিং বেয়ে উঠে যেতে লাগলো উপরের দিকে।আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি।
–
লোকটার কাশি উঠে গেলো। কাশতে কাশতে লোকটা বসা থাকে উঠে পড়লো। এই মূহুর্তে উনার সিগারেট খাওয়ার আর সম্ভবত ইচ্ছে নেই।লোকটা সিগারেটের টুকরোটিকে নিচে ফেলে পা দিয়ে একটি ঘষা দিলো।অমনি সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরোটি থেঁতলে গেলো।
সাজিদের দিকে ফিরে লোকটা বললো,- ‘তাহলে এখন বিশ্বাস করিস যে স্রষ্টা বলে কেউ আছে?’
সাজিদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
– ‘স্রষ্টা এই বিশ্বলোক, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছে বলে বিশ্বাস করিস তো?’
আবারো সাজিদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
এবার লোকটা একটা অদ্ভুত ভয়ঙ্কররকম হাসি দিলো।এই হাসি এতটাই বিদঘুটে ছিলো যে আমার গা ছমছম করতে লাগলো।
লোকটি বললো,- ‘তাহলে বল দেখি, স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো?’
এই প্রশ্নটি করে লোকটি আবার সেই বিদঘুটে হাসিটা হাসলো। গা ছমছমে।
সাজিদ বললো,- ‘স্যার, বাই ডেফিনিশন, স্রষ্টার কোন সৃষ্টিকর্তা থাকতে পারে না।যদি বলি X-ই সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টি করেছে, তৎক্ষণাৎ আবার প্রশ্ন উঠবে, তাহলে X- এর সৃষ্টিকর্তা কে? যদি বলি Y, তাহলে আবার প্রশ্ন উঠবে, Y এর সৃষ্টিকর্তা কে? এভাবেই চলতে থাকবে। কোন সমাধানে যাওয়া যাবে না।’
লোকটি বললো,- ‘সমাধান আছে।’
– ‘কি সেটা?’
– ‘মেনে নেওয়া যে- স্রষ্টা নাই,ব্যস!’- এইটুকু বলে লোকটি আবার হাসি দিলো। হা হা হা হা।
সাজিদ আপত্তি জানালো। বললো,- ‘আপনি ভুল, স্যার।’
লোকটি চোখ কপালে তুলে বললো,- ‘কি? আমি? আমি ভুল?’
– ‘জ্বি স্যার।’
– ‘তাহলে বল দেখি, স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো? উত্তর দে।দেখি কতো বড় জ্ঞানের জাহাজ হয়েছিস তুই।’
আমি বুঝতে পারলাম এই লোক সাজিদকে যুক্তির গ্যাড়াকলে ফেলার চেষ্টা করছে।
সাজিদ বললো,- ‘স্যার, গত শতাব্দীতেও বিজ্ঞানিরা ভাবতেন, এই মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে আছে।মানে, এটার কোন শুরু নেই।তারা আরো ভাবতো, এটার কোন শেষও নাই।তাই তারা বলতো- যেহেতু এটার শুরু-শেষ কিছুই নাই, সুতরাং, এটার জন্য একটা সৃষ্টিকর্তারও দরকার নাই।
কিন্তু থার্মোডাইনামিক্সের তাপ ও গতির সূত্রগুলো আবিষ্কার হওয়ার পর এই ধারনা তো পুরোপুরিভাবে ভ্যানিশ হয়ই,সাথে পদার্থবিজ্ঞানেও ঘটে যায় একটা বিপ্লব।থার্মোডাইনামিক্সের তাপ ও গতির দ্বিতীয় সূত্র বলছে- ‘এই মহাবিশ্ব ক্রমাগত ও নিরবচ্ছিন্ন উত্তাপ অস্তিত্ব থেকে পর্যায়ক্রমে উত্তাপহীন অস্তিত্বের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে।কিন্তু এই সূত্রটাকে উল্টোথেকে প্রয়োগ কখনোই সম্ভব নয়।অর্থাৎ, কম উত্তাপ অস্তিত্ব থেকে এটাকে বেশি উত্তাপ অস্তিত্বের দিকে নিয়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব নয়।এই ধারনা থেকে প্রমান হয়, মহাবিশ্ব চিরন্তন নয়।এটা অনন্তকাল ধরে এভাবে নেই।এটার একটা নির্দিষ্ট শুরু আছে।থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র আরো বলে, – এভাবে চলতে চলতে একসময় মহাবিশ্বের সকল শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে।আর মহাবিশ্ব ধ্বংস হবে।’
লোকটি বললো,- ‘উফফফফ! আসছেন বৈজ্ঞানিক লম্পু। সহজ করে বল ব্যাটা।’
সাজিদ বললো,- ‘স্যার, একটা গরম কফির কাপ টেবিলে রাখা হলে, সেটা সময়ের সাথে সাথে আস্তে আস্তে তাপ হারাতে হারাতে ঠান্ডা হতেই থাকবে।কিন্তু সেটা টেবিলে রাখার পর যে পরিমাণ গরম ছিলো, সময়ের সাথে সাথে সেটা আরো বেশি গরম হয়ে উঠবে- এটা অসম্ভব।এটা কেবল ঠান্ডাই হতে থাকবে। একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখা যাবে, কফির কাপটা সমস্ত তাপ হারিয়ে একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে। এটাই হচ্ছে থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র।’
– ‘হুম,তো?’
– ‘এর থেকে প্রমান হয়, মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে। মহাবিশ্বের যে একটা শুরু আছে- তারও প্রমান বিজ্ঞানিরা পেয়েছে। মহাবিশ্ব সৃষ্টি তত্বের উপর এ যাবৎ যতোগুলো থিওরি বিজ্ঞানিমহলে এসেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য, প্রমানের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী থিওরি হলো- বিগ ব্যাং থিওরি।বিগ ব্যাং থিওরি বলছে- মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে একটি বিস্ফোরণের ফলে।তাহলে স্যার, এটা এখন নিশ্চিত যে, মহাবিশ্বের একটি শুরু আছে।’
লোকটা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো।
সাজিদ আবার বলতে শুরু করলো,- স্যার, আমরা সহজ সমীকরণ পদ্ধতিতে দেখবো স্রষ্টাকে সৃষ্টির প্রয়োজন আছে কিনা, মানে স্রষ্টার সৃষ্টিকর্তা থাকতে পারে কিনা।
সকল সৃষ্টির একটা নির্দিষ্ট শুরু আছে এবং শেষ আছে………… ধরি, এটা সমীকরণ ১।
মহাবিশ্ব একটি সৃষ্টি……….. এটা সমীকরণ ২।
এখন সমীকরণ ১ আর ২ থেকে পাই-
সকল সৃষ্টির শুরু এবং শেষ আছে।মহাবিশ্ব একটি সৃষ্টি,তাই এটারও একটা শুরু এবং শেষ আছে।
তাহলে, আমরা দেখলাম- উপরের দুটি শর্ত পরস্পর মিলে গেলো,এবং তাতে থার্মোডাইনামিক্সের তাপ ও গতির সূত্রের কোন ব্যাঘাত ঘটে নি।
– ‘হু’
– ‘আমার তৃতীয় সমীকরণ হচ্ছে- ‘স্রষ্টা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।’
তাহলে খেয়াল করুন, আমার প্রথম শর্তের সাথে কিন্তু তৃতীয় শর্ত ম্যাচ হচ্ছে না।
আমার প্রথম শর্ত ছিলো- সকল সৃষ্টির শুরু আর শেষ আছে।কিন্তু তৃতীয় শর্তে কথা বলছি স্রষ্টা নিয়ে।তিনি সৃষ্টি নন, তিনি স্রষ্টা।তাই এখানে প্রথম শর্ত খাটে না।সাথে, তাপ ও গতির সূত্রটিও এখানে আর খাটছে না।তার মানে, স্রষ্টার শুরুও নেই, শেষও নাই।অর্থাৎ, তাকে নতুন করে সৃষ্টিরও প্রয়োজন নাই।তার মানে স্রষ্টার আরেকজন স্রষ্টা থাকারও প্রয়োজন নাই। তিনি অনাদি, অনন্ত।’
এইটুকু বলে সাজিদ থামলো। হুমায়ুন আজাদ নামের লোকটি কপালের ভাঁজ দীর্ঘ করে বললেন,- ‘কি ভংচং বুঝালি এগুলা? কিসব সমীকরণ টমীকরণ? এসব কি? সোজা সাপ্টা বল।আমাকে অঙ্ক শিখাচ্ছিস? Laws Of Causality সম্পর্কে ধারনা আছে? Laws Of Causality মতে, সবকিছুর পেছনে একটা Cause বা কারণ থাকে। সেই সূত্র মতে, স্রষ্টার পেছনেও একটা কারণ থাকতে হবে।’
সাজিদ বললো,- ‘স্যার, উত্তেজিত হবেন না প্লিজ।আমি আপনাকে অঙ্ক শিখাতে যাবো কোন সাহসে? আমি শুধু আমার মতো ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছি।’
– ‘কচু করেছিস তুই।Laws Of Causality দিয়ে ব্যাখ্যা কর। ‘- লোকটা উচ্চস্বরে বললো।
– ‘স্যার, Laws Of Causality বলবৎ হয় তখনই, যখন থেকে Time, Space এবং Matter জন্ম লাভ করে, ঠিক না? কারন, আইনষ্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটিও স্বীকার করে যে- Time জিনিসটা নিজেই Space আর Matter এর সাথে কানেক্টেড।Cause এর ধারনা তখনই আসবে, যখন Time-Space-Matter এই ব্যাপারগুলা তৈরি হবে।তাহলে, যিনিই এই Time-Space-Matter এর স্রষ্টা, তাকে কি করে আমরা Time-Space-Matter এর বাটখারাতে বসিয়ে Laws Of Causality দিয়ে বিচার করবো,স্যার? এটা তো লজিক বিরুদ্ধ, বিজ্ঞান বিরুদ্ধ।’
লোকটা চুপ করে আছে। কিছু হয়তো বলতে যাচ্ছিলো। এরমধ্যেই আবার সাজিদ বললো,- ‘স্যার, আপনি Laws Of Causality’র যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, সেটা ভুল।’
লোকটা আবার রেগে গেলো। রেগেমেগে অগ্নিশর্মা হয়ে বললো,- ‘এই ছোকরা! আমি ভুল বলেছি মানে কি? তুই কি বলতে চাস আমি বিজ্ঞান বুঝি না?’
সাজিদ বললো,- ‘না না স্যার, একদম তা বলিনি। আমার ভুল হয়েছে।আসলে, বলা উচিত ছিলো যে- Laws Of Causality’র সংজ্ঞা বলতে গিয়ে আপনি ছোট্ট একটা জিনিস মিস করেছেন।’
লোকটার চেহারা এবার একটু স্বাভাবিক হলো।বললো,- ‘কি মিস করেছি?’
– ‘আপনি বলেছেন, Laws Of Causality মতে, সবকিছুরই একটি Cause থাকে।আসলে এটা স্যার সেরকম নয়। Laws Of Causality হচ্ছে- Everything which has a beginning has a cause.. অর্থাৎ, এমন সবকিছু, যেগুলোর একটা নির্দিষ্ট শুরু আছে- কেবল তাদেরই Cause থাকে।স্রষ্টার কোন শুরু নেই, তাই স্রষ্টাকে Laws Of Causality দিয়ে মাপাটা যুক্তি এবং বিজ্ঞান বিরুদ্ধ।’
লোকটার মুখ কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেলো।বললো,- ‘তুই কি ভেবেছিস, এরকম ভারি ভারি কিছু শব্দ ব্যবহার করে কথা বললেই আমি তোর যুক্তি মেনে নিবো? অসম্ভব।’
সাজিদ এবার মুচকি হাসলো। হেসে বললো,- ‘স্যার, আপনার হাতে একটি বই দেখছি। অইটা কি বই?’
– ‘ এটা আমার লেখা বই- ‘আমার অবিশ্বাস।’
– ‘স্যার, অইটা আমাকে দিবেন একটু?’
– ‘এই নে,ধর।’
সাজিদ বইটা হাতে নিয়ে উল্টালো। উল্টাতে উল্টাতে বললো,- ‘স্যার, এই বইয়ের কোন লাইনে আপনি আছেন?’
লোকটা ভুরু কুঁচকে বললো,- ‘মানে?’
– ‘বলছি, এই বইয়ের কোন অধ্যায়ের, কোন পৃষ্টায়, কোন লাইনে আপনি আছেন?’
– ‘তুই অদ্ভুত কথা বলছিস। আমি বইয়ে থাকবো কেনো?’
– ‘কেনো থাকবেন না? আপনি এর স্রষ্টা না?’
– ‘হ্যাঁ।’
– ‘এই বইটা কালি আর কাগজ দিয়ে তৈরি। আপনিও কি কালি আর কাগজ দিয়ে তৈরি স্যার?’
– ‘খুবই ষ্টুপিডিটি টাইপ প্রশ্ন। আমি এই বইয়ের স্রষ্টা। এই বই তৈরির সংজ্ঞা দিয়ে কি আমাকে ব্যাখ্যা করা যাবে?’
সাজিদ আবার হেসে দিলো।বললো,- ‘না স্যার।এই বই তৈরির যে সংজ্ঞা, সে সংজ্ঞা দিয়ে মোটেও আপনাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ঠিক সেভাবে, এই মহাবিশ্ব যিনি তৈরি করেছেন, তাকেও তার সৃষ্টির Time-Space-Matter-Cause এসব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
আপনি কালি,কলম বা কাগজের তৈরি নন, তার উর্ধ্বে।কিন্তু আপনি Time-Space-Matter-Cause এর উর্ধ্বে নন।আপনাকে এগুলো দিয়ে ব্যাখ্যা করাই যায়।কিন্তু সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন এমন একজন,যিনি নিজেই Time-Space-Matter-Cause এর সৃষ্টিকর্তা।তাই তাকে Time-Space-Matter-Cause দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না।অর্থাৎ, তিনি এসবের উর্ধ্বে।অর্থাৎ, তার কোন Time-Space-Matter-Cause নাই।অর্থাৎ, তার কোন শুরু-শেষ নাই।অর্থাৎ, তার কোন সৃষ্টিকর্তা নাই।’
লোকটা উঠে দাঁড়ালো।উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো- ‘ভালো ব্রেইনওয়াশড! ভালো ব্রেইনওয়াশড! আমরা কি এমন তরুণ প্রজন্ম চেয়েছিলাম? হায়! আমরা কি এমন তরুণ প্রজন্ম চেয়েছিলাম?’
এটা বলতে বলতে লোকটা হাঁটা ধরলো। দেখতে দেখতেই উনি ষ্টেশানে মানুষের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলেন।
–
ঠিক সেই মূহুর্তেই আমার ঘুম ভেঙে গেলো। ঘুম ভাঙার পর আমি কিছুক্ষণ ঝিম মেরে ছিলাম।ঘড়িতে সময় দেখলাম।রাত দেড়টা বাজে।সাজিদের বিছানার দিকে তাকালাম।দেখলাম, সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়ছে।আমি উঠে তার কাছে গেলাম। গিয়ে দেখলাম সে যে বইটা পড়ছে, সেটার নাম- ‘আমার অবিশ্বাস। বইয়ের লেখক- হুমায়ুন আজাদ।
সাজিদ বই থেকে মুখ তুলে আমার দিকে তাকালো।তার ঠোঁটের কোণায় একটি অদ্ভুত হাসি।
আমি বিরাট একটা শক খেলাম। নাহ! এটা হতে পারে না। স্বপ্নের উপর কারো হাত নেই- আমি বিড় বিড় করে বলতে লাগলাম।
পোস্ট: আরিফ আজাদ
তারিখ: আগস্ট ৩০, ২০১৬
বিভাগ: ছোটগল্প/উপন্যাস
উৎসঃ i-onlinemedia

Translate