প্রশ্ন: ইসলামি রাষ্ট্র তার কার্যক্রম কীভাবে পরিচালনা করত এবং প্রথম যুগে শাসনব্যবস্থা কেমন ছিল?
September 26, 2026
ইসলামি রাষ্ট্রে খলিফা নির্বাচন ও শাসন পরিচালনার পদ্ধতি
উত্তর: যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহর জন্য, এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর। এরপর—মুসলিম শাসকের দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া। পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে পারদর্শী ও বিশেষজ্ঞ আলেমদের সমন্বয়ে একটি পরামর্শ সভা (মজলিসে শূরা) গঠন করা। সাধারণ বা আমজনতার ওপর এই নির্বাচনের ভার ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়—যাতে প্রত্যেকে তার আত্মীয়কে, নিজ দলের কোনো সদস্যকে কিংবা যে বেশি টাকা দেবে তাকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার সুযোগ না পায়।
শাইখ সালেহ ইবন ফাওজান আল-ফাওজান (হাফিযাহুল্লাহ) বলেন:
“الْوِلَايَاتُ الَّتِي هِيَ دُونَ الْوِلَايَةِ الْعَامَّةِ : فَإِنَّ التَّعْيِينَ فِيهَا مِنْ صَلَاحِيَّاتِ وَلِيِّ الْأَمْرِ ، بِأَنْ يَخْتَارَ لَهَا الْأَكْفَاءَ الْأُمَنَاءَ ، وَيُعَيِّنَهُمْ فِيهَا ، قَالَ اللَّهُ تَعَالَى : ( إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ ) ، وَهَذَا خِطَابٌ لِوُلَاةِ الْأُمُورِ ، وَالْأَمَانَاتُ هِيَ الْوِلَايَاتُ ، وَالْمَنَاصِبُ فِي الدَّوْلَةِ ، جَعَلَهَا اللَّهُ أَمَانَةً فِي حَقِّ وَلِيِّ الْأَمْرِ ، وَأَدَاؤُهَا : اخْتِيَارُ الْكَفْءِ الْأَمِينِ لَهَا ، وَكَمَا كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَخُلَفَاؤُهُ وَوُلَاةُ أُمُورِ الْمُسْلِمِينَ مِنْ بَعْدِهِمْ يَخْتَارُونَ لِلْمَنَاصِبِ مَنْ يَصْلُحُ لَهَا ، وَيَقُومُ بِهَا عَلَى الْوَجْهِ الْمَشْرُوعِ . وَأَمَّا الِانْتِخَابَاتُ الْمَعْرُوفَةُ الْيَوْمَ عِنْدَ الدُّوَلِ : فَلَيْسَتْ مِنْ نِظَامِ الْإِسْلَامِ ، وَتَدْخُلُهَا الْفَوْضَى ، وَالرَّغَبَاتُ الشَّخْصِيَّةُ ، وَتَدْخُلُهَا الْمُحَابَاةُ ، وَالْأَطْمَاعُ ، وَيَحْصُلُ فِيهَا فِتَنٌ ، وَسَفْكُ دِمَاءٍ ، وَلَا يَتِمُّ بِهَا الْمَقْصُودُ ، بَلْ تَصْبَحُ مَجَالًا لِلْمُزَايَدَاتِ ، وَالْبَيْعِ وَالشِّرَاءِ ، وَالدِّعَايَاتِ الْكَاذِبَةِ”
“সাধারণ শাসনভারের নিচে থাকা পদগুলোতে নিয়োগদান রাষ্ট্রনায়কের (ওলিউল আমর) এখতিয়ারভুক্ত—তিনি সেসব পদের জন্য যোগ্য ও বিশ্বস্ত ব্যক্তি বেছে নিয়ে নিয়োগ দেবেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন:
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যেন তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারদের নিকট পৌঁছে দাও, আর যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে তখন ন্যায়সঙ্গতভাবে বিচার করবে।” [সূরা নিসা: ৫৮]
এটি শাসকদের প্রতি সম্বোধন; আর ‘আমানত’ বলতে বোঝানো হয়েছে বিভিন্ন পদ ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে, যেগুলোকে আল্লাহ শাসকের ওপর আমানত হিসেবে অর্পণ করেছেন। আর তা আদায় করার অর্থ হলো, সেই পদের উপযুক্ত ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে নির্বাচন করা। যেমনিভাবে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরবর্তী খলিফাগণ ও মুসলিম শাসকগণ পদের উপযুক্ত ব্যক্তিকে বেছে নিতেন এবং তা শরিয়তসম্মত পন্থায় পরিচালনা করতেন। পক্ষান্তরে আজকের দিনে বিভিন্ন দেশে প্রচলিত যে নির্বাচন পদ্ধতি দেখা যায়, তা ইসলামি শাসনব্যবস্থার অংশ নয়। এতে বিশৃঙ্খলা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রবেশ করে; স্থান পায় স্বজনপ্রীতি ও লোভ-লালসা। এর ফলে সৃষ্টি হয় গৃহবিবাদ (ফিতনা) ও রক্তপাত আর নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্যও অর্জিত হয় না। বরং তা পরিণত হয় দর-কষাকষি, ভোট কেনাবেচা আর মিথ্যা প্রচারণার এক প্রতিযোগিতায়।” [আল-জাজিরা পত্রিকা, সংখ্যা: ১১৩৫৮]
❑ ইসলামি রাষ্ট্র ইমাম বা খলিফা প্রধানত তিনটি উপায়ের যেকোনো একটির মাধ্যমে শাসনভার গ্রহণ করতেন:
◈ প্রথম পদ্ধতি: আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ (নীতি নির্ধারণী বিজ্ঞ অভিভাবক পরিষদ)-এর মাধ্যমে মনোনয়ন ও নির্বাচন:
উদাহরণস্বরূপ: আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফত লাভ। তাঁর খিলাফত আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ-এর মনোনয়ন ও নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হয়েছিল। এরপর সকল সাহাবি এতে ঐক্যমত পোষণ করেন তাঁর হাতে বায়আত গ্রহণ করেন এবং তাঁর খিলাফতকে সানন্দে মেনে নেন। একইভাবে উসমান ইবন আফফান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতও এভাবে নির্ধারিত হয়। উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব জ্যেষ্ঠ ছয়জন সাহাবির এক পরামর্শ সভার ওপর ন্যস্ত করেছিলেন। তখন আব্দুর রহমান ইবন আউফ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মুহাজির ও আনসার সাহাবিদের মতামত গ্রহণ করেন। যখন তিনি দেখলেন যে সবার ঝোঁক উসমান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর দিকেই তখন তিনি প্রথমে তাঁর হাতে বায়আত নেন। এরপর বাকি পাঁচজন এবং পরবর্তীতে সকল মুহাজির ও আনসার সাহাবি বায়আত গ্রহণ করেন। এভাবে আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ-এর মনোনয়ন ও নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। ঠিক একইভাবে আলি ইবনে আবু তালিব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতও আহলুল হাল্লি ওয়াল আকদ-এর অধিকাংশের মনোনয়ন ও নির্বাচনের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
◈ দ্বিতীয় পদ্ধতি: পূর্ববর্তী খলিফা কর্তৃক পরবর্তী খলিফা মনোনয়ন (উত্তরাধিকার মনোনয়ন):
তা হলো, বিদ্যমান শাসক তাঁর পরে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে খলিফা হিসেবে মনোনীত করে যাবেন।
উদাহরণস্বরূপ: উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফত লাভ। আবু বকর সিদ্দিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে যাওয়ার মাধ্যমেই তাঁর খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
◈ তৃতীয় পদ্ধতি: জোরজবরদস্তি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল:
তা হলো, কোনো খলিফা যদি তরবারি ও ক্ষমতাবলে জনগণের ওপর জয়ী হন এবং তাঁর শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে তাঁর কথা শোনা ও আনুগত্য করা ওয়াজিব হয়ে যায় এবং তিনি মুসলিমদের ইমাম হিসেবে গণ্য হন।
উদাহরণস্বরূপ: বনু উমাইয়া ও বনু আব্বাসের কিছু খলিফা এবং পরবর্তীকালের অনেক শাসকের ক্ষমতা গ্রহণ। যদিও এই পদ্ধতিটি শরিয়তবিরোধী। কেননা তা জবরদখল ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গৃহীত হয়েছে। তবুও জাতির শাসক থাকার মহান কল্যাণের কথা বিবেচনা করে এবং দেশ থেকে নিরাপত্তা উঠে যাওয়ার বিশাল ক্ষতির কথা ভেবে—জোর ও তরবারির বলে ক্ষমতা দখলকারী ব্যক্তি যদি আল্লাহ তা’আলার শরিয়ত অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করেন তাহলে তাঁর কথা শোনা ও আনুগত্য করা ওয়াজিব।
শাইখ মুহাম্মদ ইবন সালেহ আল-উসাইমিন (রাহ.) বলেন:
“لَوْ خَرَجَ رَجُلٌ وَاسْتَوْلَى عَلَى الْحُكْمِ : وَجَبَ عَلَى النَّاسِ أَنْ يَدِينُوا لَهُ ، حَتَّى وَلَوْ كَانَ قَهْرًا بِلَا رِضًى مِنْهُمْ ؛ لِأَنَّهُ اسْتَوْلَى عَلَى السُّلْطَةِ . وَوَجْهُ ذَلِكَ : أَنَّهُ لَوْ نُوزِعَ هَذَا الَّذِي وَصَلَ إِلَى سُدَّةِ الْحُكْمِ : لَحَصَلَ بِذَلِكَ شَرٌّ كَثِيرٌ ، وَهَذَا كَمَا جَرَى فِي دَوْلَةِ بَنِي أُمَيَّةَ ، فَإِنَّ مِنْهُمْ مَنْ اسْتَوْلَى بِالْقَهْرِ وَالْغَلَبَةِ وَصَارَ خَلِيفَةً يُنَادَى بِاسْمِ الْخَلِيفَةِ ، وَيُدَانُ لَهُ بِالطَّاعَةِ ، امْتِثَالًا لِأَمْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ”
“যদি কোনো ব্যক্তি শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করে নেয় তবে জনগণের জন্য তার আনুগত্য করা ওয়াজিব হয়ে যায়—যদিও তা জনগণের সম্মতি ছাড়া জোরপূর্বক হয়ে থাকে। কেননা সে ইতোমধ্যে ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। এর কারণ হলো, ক্ষমতার আসনে পৌঁছে যাওয়া এই ব্যক্তির সাথে যদি বিরোধ করা হয় তাহলে তাতে অনেক অকল্যাণ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। যেমনটি বনু উমাইয়ার শাসনামলে ঘটেছিল—তাদের মধ্যে কেউ কেউ জোরজবরদস্তি ও প্রবল ক্ষমতাবলে ক্ষমতা দখল করে খলিফা হয়ে যান।তাঁকে ‘খলিফা’ নামেই অভিহিত করা হতো এবং আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ পালনের অংশ হিসেবে তাঁর আনুগত্য করা হতো।” [শারহু আল-আকীদাহ আস-সাফফারীনিয়্যাহ, পৃষ্ঠা: ৬৮৮] এই বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে এবং ইসলামি রাষ্ট্রের কার্যাবলি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগ সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য আপনি আবু হাসান আল-মাওয়ার্দী শাফেঈ লিখিত “আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ”, আবু ইয়ালা আল-ফাররা হাম্বলী লিখিত “আল-আহকামুস সুলতানিয়্যাহ” এবং আল-কাত্তানী লিখিত “আত-তারাতীবুল ইদারিয়্যাহ” বইগুলো পড়তে পারেন। এগুলোতে আরও প্রভূত জ্ঞান ও তথ্য রয়েছে। আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। [সোর্স: islamqa info]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম কী এবং এটি পালন করা কি শরিয়ত সম্মত
প্রশ্ন: ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম কী? এটি পালন করা কি শরিয়ত সম্মত?
উত্তর: ফাতিহা একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ: মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে কুরআনখানি, শবিনাখানি, দোয়া মাহফিল, মিলাদ মাহফিল কিংবা ইসালে সওয়াব বা সওয়াব রেসানির মতো কার্যক্রম।
আর ইয়াজদহম একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ এগারো (১১)। ফাতেহা-ই-ইয়াজদহম বলতে বোঝানো হয়, হিজরি ১১ রবিউস সানি তারিখে সংঘটিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠান, যা আব্দুল কাদের জিলানি রাহ.-এর মৃত্যু বা ওফাত দিবস উপলক্ষে পালন করা হয়। একে ‘গেয়ারভি শরিফ’ও বলা হয়ে থাকে। এটি পালনের জন্য বিশেষ কিছু পদ্ধতিও বর্ণনা করা হয়। যেমন:
– আল্লাহ ১১ বার
– হু ১১ বার
– আরও ১১ বার পড়বে:
“ইয়া শায়খ সুলতান সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানি শাইআঁন লিল্লাহ।” (হে শায়খ সুলতান সৈয়দ আব্দুল কাদের জিলানি, আল্লাহর ওয়াস্তে আমাকে কিছু দান করুন বা সাহায্য করুন)
উল্লেখ্য যে, এ কথা বলা সরাসরি মহান আল্লাহর সাথে বড় শিরক। কেউ এর অর্থ জেনেবুঝে তা বললে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুশরিকে রূপান্তরিত হবে। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।
– কাসিদায়ে গাউসিয়া শরিফ (একবার)
– শাজরা শরিফ (পীরদের সিলসিলা বা ধারাবাহিকতা অনুযায়ী যে নামগুলো আছে সেগুলো পাঠ করা) (একবার)।
এছাড়াও বিশেষ কিছু সূরা, দুআ ও দুরুদ পাঠের প্রচলন রয়েছে। [সূত্র: ইসলামি বিশ্বকোষ]
এইসব কাসিদা বা গজলে প্রচুর পরিমাণ শরিয়ত বহির্ভূত বিদআতি কথাবার্তা রয়েছে।
মোটকথা, এই সকল অজিফা বা আমলগুলো বেশিরভাগ শিরক এবং বিদআতে পরিপূর্ণ।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে এই দিনটি বিশেষ জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়।
এ উপলক্ষে দেশের সব সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি থাকে।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকেও গ্রহণ করা হয় নানা ধরনের কর্মসূচি।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদসহ বিভিন্ন স্থানে বিশেষ ওয়াজ মাহফিল, আলোচনা সভা, কুরআনখানি ও দোয়ার আয়োজন করা হয়।
সরকারি গণমাধ্যম বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-তে দিবসটি উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ, হামদ-নাত ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানমালা সম্প্রচার করা হয় ইত্যাদি।
তবে আশ্চর্য হলেও সত্য যে, আব্দুল কাদের জিলানি রাহ. একজন আরব হওয়া সত্ত্বেও আরব বিশ্বে (আমাদের তথ্য মতে) এই অনুষ্ঠান পালনের কোনো তথ্য পাওয়া যায় না। এটি মূলত উপমহাদেশীয় সুফি-ঘরানার, বিশেষ করে কাদেরিয়া তরিকার অনুসারীদের একটি বিশেষ প্রথা।
কুরআন-সুন্নাহ এবং বিশুদ্ধ আকিদার আলোকে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু দিবস পালন, লোকসমাগম করা বা এই উপলক্ষে বিশেষ কোনো আয়োজন-অনুষ্ঠান করা শরিয়ত সম্মত নয়। তিনি যত বড় মাপের কেউ হন না কেন।
কেননা এসব বিষয় দলিল দ্বারা সাব্যস্ত নয়। আর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে বলেছেন,
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে এমন কিছু নতুন সৃষ্টি করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”
[বুখারি, হাদিস নং ২৬৯৭; মুসলিম, হাদিস নং ১৭১৮]
তাছাড়া রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), আবু বকর, উমর, উসমান ও আলি (রা.)-এর মৃত্যু দিবস কোনোদিন পালিত হয়েছে এমন কোনো দলিল ইসলামের সোনালি যুগ তথা সাহাবি ও তাবেয়িদের যুগে পাওয়া যায় না। অথচ তাঁরাই ছিলেন উম্মতের মধ্যে সর্বাধিক আল্লাহভীরু এবং দ্বীনের প্রতি সর্বাধিক অনুগত।
এই মৃত্যু দিবস পালন করা যদি শরিয়ত সম্মত হতো, তাহলে তাঁরাই সবার আগে তা পালন করতেন।
কোনো নেক আমল যদি তাঁদের যুগে দ্বীনের অংশ হিসেবে পালিত না হয়ে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে তা পালনের কোনো সুযোগ নেই; বরং তা দ্বীনের মধ্যে নব-আবিষ্কৃত বিদআত হিসেবে গণ্য হয়।
এ কারণেই আমাদের সমাজে প্রচলিত মৃত ব্যক্তির উদ্দেশ্যে কুরআনখানি, শবিনাখানি, ফাতিহাখানি, মিলাদ মাহফিল, দোয়া মাহফিল, হালকায়ে জিকির ইত্যাদির আয়োজন করাও বিদআত। কেননা এসবের পক্ষেও কোনো শরয়ি দলিল নেই।
আর আমাদের অজানা নয় যে, ইসলামে দলিল বহির্ভূত বিদআতের ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ভয়ানক পরিণতির কথা বলা হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এ ধরনের অনুষ্ঠানে কোনো কোনো ব্যক্তির প্রতি অতিরঞ্জিত প্রশংসা ও অতিভক্তি প্রদর্শিত হয়, যা থেকে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন,
لَا تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ، إِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ
“তোমরা আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না, যেমন খ্রিস্টানরা ঈসা ইবনে মারয়ামের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে। আমি তো কেবল আল্লাহর একজন বান্দা, তাই তোমরা বলো, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসুল।”
[বুখারি, হাদিস নং ৩৪৪৫]
যখন রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ব্যাপারেই বাড়াবাড়ি নিষিদ্ধ, তখন উম্মতের অন্য কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে অতিভক্তি প্রদর্শন নিঃসন্দেহে আরও বেশি আপত্তিকর।
জন্ম: ৪৭১ হিজরি, তাবারিস্তানের (বর্তমান ইরানের মাজানদারান প্রদেশ) জিলান অঞ্চলে।
মৃত্যু: ৫৬১ হিজরি, বাগদাদ, ইরাকে।
আব্দুল কাদের জিলানি রাহ. ছিলেন সমসাময়িক হাম্বলি মাজহাবের অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ও উঁচু মাপের একজন ফকিহ। অনেক বিজ্ঞ আলেম তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও উচ্চ মর্যাদার প্রশংসা করেছেন।
তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. আল গুনিয়াহ (الغنية لطالب طريق الحق)
২. আল ফাতহুর রব্বানি (الفتح الرباني)
৩. ফুতুহুল গায়েব (فتوح الغيب)
উল্লেখ্য যে, মুহাক্কিক আলিমদের মতে, তাঁর এসব কিতাবে প্রচুর জাল এবং জঈফ হাদিস রয়েছে। তাই এসব বই পড়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি।
আমাদের সমাজে বিদআতি সুফি-ঘরানার লোকজনের মাঝে, বিশেষ করে তাঁকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কাদেরিয়া তরিকার লোকজনের মাঝে তাঁকে ঘিরে বহু কাল্পনিক কাহিনী ও ভিত্তিহীন কারামতের গল্প প্রচলিত রয়েছে।
তাঁকে নিয়ে প্রশংসার নামে যে অতিভক্তি ও বাড়াবাড়ি করা হয়, শরিয়তের দৃষ্টিতে তা কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়। বস্তুত তাঁর সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ পরিচয় হলো—তিনি ছিলেন হাম্বলি মাজহাবের একজন প্রাজ্ঞ ফকিহ এবং জ্ঞানতাপস বিজ্ঞ আলেম। তাঁকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে যেসব অতিরঞ্জন ও বিদআতি প্রথার জন্ম হয়েছে, সেসব থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। সুতরাং তাঁর প্রতি আমাদের কর্তব্য, তাঁর রেখে যাওয়া অমূল্য সম্পদ গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করা এবং দলিলভিত্তিক নির্ভুল কথাবার্তাগুলো প্রচার করা, তাঁর সুন্নাহভিত্তিক জীবনী থেকে অনুপ্রাণিত হওয়া এবং তাঁর জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা। কিন্তু তাঁর প্রশংসায় অতিরঞ্জন করা, তাঁর নামে মিথ্যা, কাল্পনিক এবং আজগুবি কেচ্ছা-কাহিনী এবং কারামত ইত্যাদি বর্ণনা, প্রচার-প্রসার, এমনকি শোনা থেকেও বিরত থাকা অপরিহার্য। মহান আল্লাহ শায়খ আব্দুল কাদের জিলানি রাহ.-এর ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করে তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন এবং আমাদেরকেও সর্বপ্রকার অতিভক্তি, অতিরঞ্জন এবং বিদআতি কার্যক্রম থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
শরিয়তের দৃষ্টিতে নারীদের চুল বেচাকেনার বিধান
প্রশ্ন: শরিয়তের দৃষ্টিতে নারীদের চুল বেচাকেনার বিধান: ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের চুল ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান কী?
উত্তর: বর্তমানে নারীদের মাথার চুল বিক্রির প্রবণতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। অনলাইন-অফলাইন সর্বত্র এগুলো বেচাকেনা হচ্ছে। কেউ স্বাভাবিকভাবে ঝরে পড়া চুল জমিয়ে বিক্রি করেন, আবার কেউ অর্থের লোভে চুল কেটে বিক্রি করেন। এসব চুল ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হয় এবং উইগ, হেয়ার-এক্সটেনশন, প্রসাধনী ব্রাশ তৈরিসহ নানা কাজে ব্যবহৃত হয়।
❑ ১. ইসলামের দৃষ্টিতে এই চুল বিক্রয়ের বিধান কী?
মানুষের শরীরের কোনো অংশ—যেমন কিডনি, রক্ত, চুল ইত্যাদি—বিক্রি করা জায়েজ নয়। কারণ তা মানুষের মর্যাদার পরিপন্থী। আল্লাহ তাআলা মানুষের শরীরকে তার কাছে আমানত হিসেবে দিয়েছেন। সুতরাং অর্থের লোভে এসব বিক্রি করা বৈধ হবে না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَى كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا
“আমি তো আদমসন্তানকে মর্যাদা দিয়েছি, স্থলে ও সাগরে তাদের বাহন দিয়েছি, উত্তম রিযিক দিয়েছি এবং আমার সৃষ্টির অনেকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [সূরা ইসরা: ৭০]
এই মর্যাদার দাবি হলো, মানুষের অঙ্গ বা শরীরের কোনো অংশ পণ্য হতে পারে না।
◆ মিসরের দারুল ইফতা বলেছে—
«مِنْ مُقْتَضَيَاتِ تَكْرِيمِ الْإِنْسَانِ وَاحْتِرَامِ بُنْيَانِ جَسَدِهِ حُرْمَةُ بَيْعِ جُزْءٍ مِنْهُ أَوْ عُضْوٍ مِنْ أَعْضَائِهِ، وَيَشْمَلُ ذَلِكَ الشَّعْرَ عِنْدَ جُمْهُورِ الْفُقَهَاءِ، فَالتَّعَامُلُ فِي شَعْرِ الْآدَمِيِّ بَيْعًا وَشِرَاءً حَرَامٌ شَرْعًا؛ سَوَاءٌ فِي ذَلِكَ الْمَقْصُوصُ عَنْ رَأْسِهِ أَوِ الْمُتَسَاقِطُ عَنْهُ»
“মানুষকে সম্মানিত করা এবং তার দেহকাঠামোর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আবশ্যিক দাবি হলো—তার শরীরের কোনো অংশ বা অঙ্গ বিক্রি করা হারাম। অধিকাংশ ফকিহের মতে চুলও এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং মানুষের চুল কেনাবেচা শরিয়তে হারাম, তা মাথা থেকে কাটা হোক বা আপনাআপনি ঝরে পড়া হোক।” [দারুল ইফতা মিসরিয়া, ফতোয়া নং ৪৩২৫, ৩ এপ্রিল ২০১৮]
◆ শাফেয়ি আলেম খতিব শিরবিনি (রাহ.) বলেন—
«وَالْآدَمِيُّ يَحْرُمُ الِانْتِفَاعُ بِهِ وَبِسَائِرِ أَجْزَائِهِ لِكَرَامَتِهِ»
“মানুষের মর্যাদা ও সম্মানের কারণে তার শরীর বা এর কোনো অংশ থেকে উপকার নেওয়া হারাম।” [মুগনিল মুহতাজ: ১/৪০৬]
◆ হাম্বলি মাজহাবের প্রসিদ্ধ আলেম বুহুতি (রাহ.) বলেন—
«وَلَا يَجُوزُ اسْتِعْمَالُ شَعْرِ الْآدَمِيِّ مَعَ الْحُكْمِ بِطَهَارَتِهِ لِحُرْمَتِهِ»
“মানুষের চুল পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও তার সম্মানের কারণে তা ব্যবহার করা জায়েজ নয়।” [কাশশাফুল কিনা: ১/৫৭]
শরিয়তের একটি সাধারণ নীতি হলো—যা ব্যবহার করা হারাম তা বেচাকেনা করাও হারাম।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন—
«إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ إِذَا حَرَّمَ عَلَى قَوْمٍ أَكْلَ شَيْءٍ حَرَّمَ عَلَيْهِمْ ثَمَنَهُ»
“আল্লাহ যখন কোনো জাতির জন্য কোনো কিছু খাওয়া বা ভোগ করা হারাম করেন তখন তার মূল্য বা বিনিময় গ্রহণ করাও হারাম করে দেন।” [সুনানে আবু দাউদ: ৩৪৮৮; মুসনাদে আহমদ: ২২২১, গায়াতুল মারাম লিল আলবানি: ৩১৮]
❑ ২. হেয়ার-এক্সটেনশন বা চুল দিয়ে অতিরিক্ত চুল জোড়া লাগানো প্রসঙ্গে:
এসব চুল সাধারণত হেয়ার-এক্সটেনশন বা পরচুলা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। অথচ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন—
«لَعَنَ اللَّهُ الْوَاصِلَةَ وَالْمُسْتَوْصِلَةَ، وَالْوَاشِمَةَ وَالْمُسْتَوْشِمَةَ»
“আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন সেই নারীকে, যে চুলে অতিরিক্ত চুল জোড়া লাগায় এবং যে জোড়া লাগিয়ে নেয়; আর যে উল্কি আঁকে এবং যে আঁকিয়ে নেয়।” [সহিহ বুখারি: ৫৯৩৩, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে; ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকেও—সহিহ বুখারি: ৫৯৪২, সহিহ মুসলিম: ২১২৪]
মুআবিয়া [রাদিয়াল্লাহু আনহু] মদিনায় মিম্বরে দাঁড়িয়ে এক গুচ্ছ চুল হাতে নিয়ে বলেছিলেন—
«يَا أَهْلَ الْمَدِينَةِ، أَيْنَ عُلَمَاؤُكُمْ؟! سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْهَى عَنْ مِثْلِ هَذِهِ، وَيَقُولُ: إِنَّمَا هَلَكَتْ بَنُو إِسْرَائِيلَ حِينَ اتَّخَذَهَا نِسَاؤُهُمْ»
“হে মদিনাবাসী, তোমাদের আলেমরা কোথায়? আমি নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে এ ধরনের জিনিস থেকে নিষেধ করতে শুনেছি। তিনি বলতেন, বনি ইসরাইল তখনই ধ্বংস হয়েছে, যখন তাদের নারীরা এটা গ্রহণ করেছে।” [সহিহ বুখারি: ৩৪৬৮; সহিহ মুসলিম: ২১২৪]
◆ শায়খ ইবনে বায (রাহ.) বলেন—
«وَصْلُ الشَّعْرِ لَا يَجُوزُ، وَلَا فَرْقَ بَيْنَ شَعْرِ بَنِي آدَمَ وَغَيْرِهِ مِمَّا يُوصَلُ بِهِ الشَّعْرُ؛ لِعُمُومِ الْأَحَادِيثِ الصَّحِيحَةِ الْوَارِدَةِ فِي النَّهْيِ عَنْ ذَلِكَ»
“চুলে অতিরিক্ত চুল জোড়া দেওয়া জায়েজ নয়; তা মানুষের চুল হোক বা অন্য কিছু—এতে কোনো পার্থক্য নেই। কারণ এই নিষেধ সম্পর্কে বর্ণিত সহিহ হাদিসগুলো সাধারণ (ব্যাপক অর্থবোধক)।” [মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায: ১০/৫২]
◆ শায়খ ইবনে উসাইমিন (রাহ.) বলেন—
«وَصْلُ الشَّعْرِ – شَعْرِ الرَّأْسِ – بِالشَّعْرِ، مُحَرَّمٌ، بَلْ هُوَ مِنَ الْكَبَائِرِ؛ لِأَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَعَنَ مَنْ فَعَلَهُ»
“মাথার চুলের সাথে বাড়তি চুল জোড়া লাগানো হারাম, বরং তা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। কারণ নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এ কাজের সম্পাদনকারীর ওপর অভিশাপ দিয়েছেন।” [ফাতাওয়া নুরুন আলাদ-দারব: ২/৫৮২]
উইগ বা হেয়ার-এক্সটেনশন তৈরির জন্য যে চুল বিক্রি হয় তা মূলত এই নিষিদ্ধ কাজেই ব্যবহৃত হয়। ফলে বিক্রেতা এক্ষেত্রে গুনাহের কাজে সহযোগিতাকারী হয়ে যান। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো; পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করো না।” [সূরা মায়িদা: ২]
❑ ৩. কাটা ও ঝরে পড়া চুলের ব্যাপারে সতর্কতা:
চুল ও নখ জাদুর কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। আয়েশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জাদু করা হলে ফেরেশতা জানিয়েছিলেন, লাবিদ ইবনুল আসাম কোন জিনিসে জাদু করেছিল—
«قَالَ: فِيمَا ذَا؟ قَالَ: فِي مُشُطٍ وَمُشَاطَةٍ وَجُفِّ طَلْعَةٍ ذَكَرٍ»
“জিজ্ঞাসা করা হলো, কীসে? [ফেরেশতা] বললেন, চিরুনি, চিরুনিতে ওঠা চুল এবং পুরুষ খেজুরগাছের মোচার আবরণে।” [সহিহ বুখারি: ৩১৭৫, ৬৩৯১; সহিহ মুসলিম: ২১৮৯]
এখানে “মুশাতা” [مُشَاطَة] অর্থ চুল আঁচড়ানোর সময় যে চুল উঠে আসে। এ কারণে চুল-নখ যেখানে-সেখানে না ফেলে মাটিতে পুঁতে ফেলা উত্তম। তবে এটি মুস্তাহাব; ওয়াজিব নয়।
মিসরের দারুল ইফতা বলেছে—
«فَإِنَّ دَفْنَ مَا يُقْلَمُ مِنَ الْأَظْفَارِ أَوْ يُزَالُ مِنَ الشَّعْرِ مُسْتَحَبٌّ لِحُرْمَةِ الْإِنْسَانِ وَسَائِرِ أَجْزَائِهِ، وَلَيْسَ ذَلِكَ مِنْ قَبِيلِ الْوَاجِبَاتِ الَّتِي يَأْثَمُ الْإِنْسَانُ بِتَرْكِهَا»
“কাটা নখ বা মাথার চুল মাটিতে পুঁতে রাখা মুস্তাহাব; কারণ মানুষের সম্পূর্ণ সত্তা ও তার প্রতিটি অংশ সম্মানের যোগ্য। তবে এটি এমন কোনো ওয়াজিব বিষয় নয় যে তা ছেড়ে দিলে মানুষ গুনাহগার হবে।” [দারুল ইফতা মিসরিয়া, ফতোয়া নং ৮১৫৮, ২৯ নভেম্বর ২০২৩]
➧ দৃষ্টি আকর্ষণ: কেউ না জেনে বা না বুঝে আগে কখনো চুল বিক্রি করে থাকলে তার করণীয় হলো—তাৎক্ষণিকভাবে অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা করা। আর যদি এই চুল বিক্রির মাধ্যমে উপার্জিত কোনো অর্থ কাছে গচ্ছিত থাকে তবে সওয়াবের আশা না রেখে সেই টাকা দরিদ্র-অসহায় মানুষের মাঝে অথবা জনকল্যাণমূলক কাজে দান করে দেওয়া আবশ্যক।
উপসংহার:
মোটকথা, চুল কাটা হোক বা এমনিতে ঝরে পড়া হোক—তা বিক্রি করা জায়েজ নয়; এটি মানুষের মর্যাদার পরিপন্থী। তাই কাটা বা ঝরে পড়া চুল মাটিতে পুঁতে রাখাই উত্তম। যেখানে-সেখানে ফেলা রাখা একদিকে যেমন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অন্যদিকে এর মাধ্যমে শত্রুদের দ্বারা জাদু আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আল্লাহু আলাম-আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
(দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব)।
ফজরের সালাতের পর সূরা ইয়াসিন পাঠ করলে কি মনের আশা পূরণ হয়
প্রশ্ন: ফজরের সালাতের পর সূরা ইয়াসিন পাঠ করা একটি প্রচলিত আমল। বলা হয়, এটি একটি “পরীক্ষিত আমল” এবং এর মাধ্যমে মনের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়। আবার অনেকে একে বিদআত বলে থাকেন। এই আমল সম্পর্কে এবং হাজত পূরণের বিশুদ্ধ পন্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।
উত্তর: জানা জরুরি যে, “পরীক্ষিত আমল” কোনও শরয়ি মানদণ্ড নয়। কোনও আমল দ্বীনে গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত হতে হবে। কারও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় ফল পাওয়া গেছে বলেই কোনও আমলকে দ্বীনি বিধান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায় না।
◈ ফজরের সালাতের পর সূরা ইয়াসিন পড়ার হাদিসটি কি সহিহ?
সুনানে দারিমিতে (হাদিস নং ৩৪৬১, ফাযায়িলুল কুরআন অধ্যায়) বর্ণিত আছে—
عَنْ عَطَاءِ بْنِ أَبِي رَبَاحٍ قَالَ: بَلَغَنِي أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «مَنْ قَرَأَ يس فِي صَدْرِ النَّهَارِ قُضِيَتْ حَوَائِجُهُ»
“আতা ইবনে আবি রাবাহ (রাহ.) বলেন, আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে যে রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দিনের শুরুতে সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে, তার প্রয়োজনসমূহ পূরণ করা হবে।'” [সুনানে দারিমি: ৩৪৬১]
এই হাদিসটি সনদগতভাবে জইফ (দুর্বল) ও মুরসাল। বর্ণনাকারী আতা ইবনে আবি রাবাহ (রহ.) একজন তাবেয়ি, সাহাবি নন। তিনি নিজেই “بَلَغَنِي” (আমার কাছে সংবাদ পৌঁছেছে) বলেছেন—অর্থাৎ মধ্যবর্তী বর্ণনাকারী কে ছিলেন (কোনও সাহাবি নাকি অন্য কোনও তাবেয়ি) তা উল্লেখ না করেই সরাসরি রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দিকে সম্বন্ধ করেছেন। ফলে সনদে বিচ্ছিন্নতা (انقطاع) সৃষ্টি হয়েছে। অথচ হাদিস বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য সনদে অবিচ্ছিন্নতা (اتصال) হওয়া আবশ্যক। এ কারণে মুহাদ্দিসগণ একে “إسناده ضعيف مرسل” (সনদ দুর্বল ও মুরসাল) বলে চিহ্নিত করেছেন।
আল্লামা আলবানি (রহ.) এ হাদিস প্রসঙ্গে বলেন—
«وَهَذَا أَثَرٌ مُرْسَلٌ -كَمَا رَأَيْتَ- لِأَنَّ عَطَاءً لَيْسَ مِنَ الصَّحَابَةِ قَطْعًا، فَالْأَثَرُ إِذَنْ ضَعِيفٌ. رِجَالُهُ ثِقَاتٌ فَهُوَ قَوِيٌّ لَوْلَا الْإِرْسَالُ»
“এটি একটি মুরসাল বর্ণনা—যেমনটি আপনি দেখলেন। কারণ আতা নিশ্চিতভাবেই সাহাবিদের অন্তর্ভুক্ত নন। সুতরাং বর্ণনাটি দুর্বল। এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য (সিকাহ); সনদ বিচ্ছিন্ন না হলে এটি শক্তিশালী হতো।” [হিদায়াতুর রুওয়াত: ২/১১৮]
অর্থাৎ এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য হলেও সনদ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণেই এটি জইফ (দুর্বল) বলে গণ্য। কিছু আলেমের মতে, যেহেতু আতা ইবনে আবি রাবাহ একজন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন তাবেয়ি ছিলেন তাই তাঁর তার বর্ণনা মুরসাল হলেও গ্রহণযোগ্যতা পায়। তবে অধিকাংশ মুহাদ্দিসের মতে, যেকোনো মুরসাল বর্ণনাই মূলনীতিগতভাবে জইফ হাদিসের অন্তর্ভুক্ত, যতক্ষণ না অন্য সনদে তা সমর্থিত হয়। এখানে যেহেতু এই মতনের কোনও সমর্থক সনদ পাওয়া যায় না তাই সতর্কতা হলো একে দুর্বল হিসেবেই গণ্য করা।
◈ এটি কি আমলযোগ্য?
সাধারণ কুরআন তিলাওয়াতের অংশ হিসেবে ফজরের পর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সূরা ইয়াসিন পড়া সওয়াবের কাজ। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা (যেমন: ৪১ বার), নির্দিষ্ট আয়াত বারবার পড়া বা দলবদ্ধভাবে বিশেষ পদ্ধতি আবিষ্কার করলে তা বিদআত হবে। কারণ শরিয়তে এর কোনও ভিত্তি নেই। অনুরূপভাবে যেহেতু “হাজত পূরণ হবে” মর্মে বর্ণিত হাদিসটি দুর্বল। তাই একে নিশ্চিত ফলদায়ক হিসেবে আমল না করাই উত্তম। এর পরিবর্তে হাজত পূরণের জন্য বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত পন্থাগুলো অবলম্বন করা কর্তব্য। যেমন:
১. আল্লাহর নাম ও গুণাবলির ওসিলায় এবং বিশেষ করে ইসমে আজমের মাধ্যমে দোয়া করা।
২. অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার পাঠ করা।
৩. অধিক পরিমাণে দরুদ পাঠ করা।
৪. সিজদা ও শেষ তাশাহহুদে বেশি বেশি দোয়া করা।
৫. একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সম্পাদিত নেক আমলের ওসিলা ধরে দোয়া করা।
৬. দোয়া কবুলের নির্ধারিত সময় ও সুযোগগুলো কাজে লাগানো (যেমন: রাতের শেষ প্রহর, আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময় এবং জুমার দিনের বিশেষ মুহূর্ত ইত্যাদি)।
আল্লাহু আলাম-আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
মুসলিমের মৃত্যুতে শুধু ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন পড়াই কি যথেষ্ট
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ এটি কি দোয়া, কোনো মুসলিমের মৃত্যুতে শুধু এটা পড়াই কি যথেষ্ট? নাকি আলাদাভাবে দোয়া করতে হবে?
প্রশ্ন: কোনো মুসলিম মারা গেলে আমাদের সমাজে অনেকেই কেবল ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘উন’ পড়ে ক্ষান্ত হন। আমার জানার বিষয় হলো—
১. এই আয়াতটি পাঠ করা কি আদৌ মাইয়েতের জন্য কোনো দোয়া?
২. মৃত ব্যক্তির জন্য কেবল এই বাক্যটি পাঠ করাই কি যথেষ্ট, নাকি তাঁর মাগফিরাতের জন্য আলাদাভাবে দোয়া করা জরুরি?
এ বিষয়ে সঠিক শরিয়তের নির্দেশনা জানিয়ে উপকৃত করবেন।
উত্তর: আল্লাহ তাআলা বলেন,
الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
“যাদের ওপর কোনো বিপদ আপতিত হলে তারা বলে, ‘নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই এবং নিশ্চয় আমরা তাঁরই কাছে ফিরে যাব।’” [সূরা বাকারা: ১৫৬]
‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘উন’ মূলত কোনো দোয়া বা ক্ষমা প্রার্থনার বাক্য নয়; বরং এটি আল্লাহর কাছে বান্দার স্বীকারোক্তিমূলক বাক্য। এর সাধারণ অর্থ হলো—‘আমরা তো আল্লাহরই এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।’
যেহেতু এখানে নির্দিষ্ট কারো জন্য রহমত বা মাগফিরাত চাওয়া হচ্ছে না বরং আল্লাহর মালিকানা ও তাঁর সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত থাকা প্রকাশ পাচ্ছে সেহেতু জীবনের কোনো প্রাণহানি, বিপদ-মসিবত, গবাদি পশুর মৃত্যু, ফল-ফসল কিংবা সম্পদের ক্ষতি—এমনকি কোনো অমুসলিমের মৃত্যুর সংবাদ শুনলেও এই বাক্যটি বলা জায়েজ। ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি‘উন’ পাঠ করার মাধ্যমে বিপদে ধৈর্য প্রকাশ পায় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। কিন্তু এটি নিজে মৃত ব্যক্তির জন্য মাগফিরাতের দোয়া নয়।
উম্মে সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি—
مَا مِنْ مُسْلِمٍ تُصِيبُهُ مُصِيبَةٌ فَيَقُولُ مَا أَمَرَهُ اللَّهُ: إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللَّهُمَّ أْجُرْنِي فِي مُصِيبَتِي، وَأَخْلِفْ لِي خَيْرًا مِنْهَا، إِلَّا أَخْلَفَ اللَّهُ لَهُ خَيْرًا مِنْهَا
উচ্চারণ: মা মিন মুসলিমিন তুসিবুহু মুসিবাতুন ফাইয়াকুলু মা আমারাহুল্লাহ: ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, আল্লাহুম্মাজুরনি ফি মুসিবাতি, ওয়া আখলিফ লি খাইরান মিনহা, ইল্লা আখলাফাল্লাহু লাহু খাইরান মিনহা
অর্থ: “যে মুসলিমের ওপর কোনো বিপদ আসে, আর সে আল্লাহর নির্দেশমতো বলে—ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, হে আল্লাহ! আমার এই বিপদে আমাকে সওয়াব দাও এবং এর চেয়ে উত্তম কিছু দিয়ে এর ক্ষতিপূরণ করো—আল্লাহ তাকে অবশ্যই এর চেয়ে উত্তম কিছু দান করবেন।” [সহিহ মুসলিম, ৯১৮] তাই কোনো মুসলিমের মৃত্যুতে শুধু এই আয়াত পড়ে চুপ থাকা যথেষ্ট নয়; বরং তাঁর জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দোয়া করা উচিত। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃতের জন্য বিশেষ দোয়া শিখিয়েছেন। যেমন—
মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষ দোয়া:
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ، وَعَافِهِ، وَاعْفُ عَنْهُ، وَأَكْرِمْ نُزُلَهُ، وَوَسِّعْ مُدْخَلَهُ، وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَالثَّلْجِ وَالْبَرَدِ، وَنَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الْأَبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ، وَأَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِنْ دَارِهِ، وَأَهْلًا خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ، وَزَوْجًا خَيْرًا مِنْ زَوْجِهِ، وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ، وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ وَعَذَابِ النَّارِ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু, ওয়া আফিহি, ওয়া’ফু আনহু, ওয়া আকরিম নুজুলাহু, ওয়া ওয়াসসি মুদখালাহু, ওয়াগসিলহু বিল মায়ি ওয়াস সালজি ওয়াল বারাদ, ওয়া নাক্কিহি মিনাল খাতায়া কামা নাক্কাইতাস সাওবাল আবইয়াদা মিনাদ দানাস, ওয়া আবদিলহু দারান খাইরান মিন দারিহি, ওয়া আহলান খাইরান মিন আহলিহি, ওয়া জাওজান খাইরান মিন জাওজিহি, ওয়া আদখিলহুল জান্নাহ, ওয়া আইজহু মিন আজাবিল কাবরি ওয়া আজাবিন নার
অর্থ: “হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করো, তার ওপর রহম করো, তাকে আফিয়াত দাও এবং তার গুনাহ মাফ করে দাও। তার মেহমানদারি উন্নত করো। তার কবর প্রশস্ত করো এবং তাকে পানি, বরফ ও শিশির দিয়ে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করো। তাকে গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করে দাও যেমন সাদা কাপড়কে ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। তাকে তার বর্তমান ঘরের চেয়ে উত্তম ঘর দাও, তার পরিবারের চেয়ে উত্তম পরিবার দাও এবং তার স্ত্রীর চেয়ে উত্তম স্ত্রী দাও। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও এবং কবরের আজাব ও জাহান্নামের আজাব থেকে তাকে রক্ষা করো।” [সহিহ মুসলিম, ৯৬৩] অথবা রহমত ও মাগফিরাতের অন্য যেকোনো দোয়া পড়া যায়। এমনকি যদি কারো আরবি দোয়া মুখস্থ না থাকে তবে নিজ ভাষায়ও আল্লাহ তাআলার দরবারে মৃত ব্যক্তির পাপমোচন ও জান্নাত কামনায় দোয়া করলেও তা কবুল হবে, ইনশাআল্লাহ। এর পাশাপাশি, শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া ও তাদের প্রতি সমবেদনা জানানো সুন্নত। এতে বিয়োগব্যথায় কাতর স্বজনদের মনে সাহস জাগে এবং তাদের ধৈর্য ধারণে উৎসাহিত করা যায়।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।
অধিক সওয়াবের আশায় দূর দিয়ে ঘুরে মসজিদে যাওয়া কি শরিয়তসম্মত
প্রশ্ন: যাদের বাড়ি মসজিদের নিকটবর্তী তারা কি বেশি নেকি লাভের আশায় (জুমার দিন অথবা অন্য যেকোনো দিন) রাস্তা পরিবর্তন করে দূর দিয়ে ঘুরে মসজিদে যেতে পারবেন কিনা?
উত্তর: ইসলাম ইবাদত ও দৈনন্দিন জীবন যাপনের সর্বক্ষেত্রে সহজ ও স্বাভাবিক পন্থা অবলম্বন করতে উৎসাহিত করে। কৃত্রিম উপায়ে নিজেকে কষ্টে ফেলা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে কঠিন পথ বেছে নেওয়াকে ইসলাম পছন্দ করে না। তাই অযথা নিজের ওপর বাড়তি কষ্ট চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত। এই কারণে অধিক সওয়াবের আশায় নিকটস্থ মসজিদ এড়িয়ে দূরের মসজিদে যাওয়া কিংবা অনর্থক দীর্ঘ পথ ঘুরে মসজিদে যাওয়া সমীচীন নয়।
আল্লাহর নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
«يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا»
“তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, বিতৃষ্ণা ছড়িও না।” [সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম]
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.) বলেন:
فَاخْتَرِ الْأَيْسَرَ لَكَ فِي كُلِّ أَحْوَالِكَ: فِي الْعِبَادَاتِ، وَفِي الْمُعَامَلَاتِ مَعَ النَّاسِ، وَفِي كُلِّ شَيْءٍ؛ لِأَنَّ الْيُسْرَ هُوَ الَّذِي يُرِيدُهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنَّا وَيُرِيدُهُ بِنَا: ﴿يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ﴾. فَمَثَلًا إِذَا كَانَ لَكَ طَرِيقَانِ إِلَى الْمَسْجِدِ، أَحَدُهُمَا صَعْبٌ فِيهِ حَصًى وَأَحْجَارٌ وَأَشْوَاكٌ، وَالثَّانِي سَهْلٌ، فَالْأَفْضَلُ أَنْ تَسْلُكَ الْأَسْهَلَ. وَإِذَا كَانَ هُنَاكَ مَاءَانِ وَأَنْتَ فِي الشِّتَاءِ، وَكَانَ أَحَدُهُمَا بَارِدًا يُؤْلِمُكَ، وَالثَّانِي سَاخِنًا تَرْتَاحُ لَهُ، فَالْأَفْضَلُ أَنْ تَسْتَعْمِلَ السَّاخِنَ؛ لِأَنَّهُ أَيْسَرُ وَأَسْهَلُ.
“সব অবস্থায় তোমার জন্য যা সবচেয়ে সহজ তা-ই বেছে নাও—চাই তা ইবাদতে হোক, মানুষের সাথে লেনদেনে হোক, কিংবা যেকোনো বিষয়ে। কারণ সহজতাই আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে চান এবং আমাদের জন্য চান: ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না।’ যেমন:
মসজিদে যাওয়ার দুটি পথ আছে; একটি কঠিন, কাঁকর, পাথর ও কাঁটায় ভরা, অন্যটি সহজ। তাহলে উত্তম হলো সহজ পথটি বেছে নেওয়া। আবার শীতকালে যদি দুই ধরনের পানি থাকে, একটি এত ঠাণ্ডা যে কষ্ট দেয়, অন্যটি গরম যা আরাম দেয়, তাহলে গরম পানি ব্যবহার করাই উত্তম, কারণ তা অধিক সহজ।” [ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব]
❑ মসজিদের দিকে বেশি পদক্ষেপ ফেলা সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যা:
হাদিসে এসেছে, আল্লাহর নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন:
«أَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى مَا يَمْحُو اللهُ بِهِ الْخَطَايَا، وَيَرْفَعُ بِهِ الدَّرَجَاتِ؟ قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ. قَالَ: إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عَلَى الْمَكَارِهِ، وَكَثْرَةُ الْخُطَا إِلَى الْمَسَاجِدِ، وَانْتِظَارُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الصَّلَاةِ، فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ»
“আমি কি তোমাদের এমন আমলের কথা বলব না, যার মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহ মিটিয়ে দেন এবং মর্যাদা বাড়িয়ে দেন?”
সাহাবিগণ বললেন, “অবশ্যই, হে আল্লাহর রসুল!”
তিনি বললেন: “কষ্টের সময়ও পূর্ণাঙ্গভাবে অজু করা, মসজিদের দিকে বেশি পদক্ষেপ ফেলা এবং এক নামাজের পর অন্য নামাজের অপেক্ষা করা। এটিই হলো রিবাত (আল্লাহর পথে সীমান্ত প্রহরা)।” [সহীহ মুসলিম]
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় শাইখ উসাইমিন (রাহ.) বলেন, “কিন্তু সহজ পথ সম্ভব থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি কঠিনটির দিকে যায়, তবে তা উত্তমের খেলাফ। উত্তম হলো সব বিষয়ে সহজটি অনুসরণ করা… মোটকথা, যা-ই অধিক সহজ, তা-ই উত্তম, যতক্ষণ তা গুনাহ না হয়। কারণ উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) (রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে বলেন:
«مَا خُيِّرَ بَيْنَ شَيْئَيْنِ إِلَّا اخْتَارَ أَيْسَرَهُمَا مَا لَمْ يَكُنْ إِثْمًا»
‘দুটি বিষয়ের মধ্যে এখতিয়ার দেওয়া হলে তিনি সহজটিই বেছে নিতেন, যতক্ষণ তা গুনাহ না হতো।’ তবে যদি কোনও ইবাদত কষ্ট ছাড়া আদায় করা সম্ভব না হয় এবং সেই কষ্ট ইবাদতকে রহিত করে না আর তুমি কষ্ট সহ্য করে তা আদায় করো তাহলে এতে তোমার সওয়াব বৃদ্ধি পায়।” [ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব]
অতএব ইবাদতে বেশি সওয়াব বা নামাজের দিকে বেশি পদক্ষেপের যে ফজিলত এসেছে, তার উদ্দেশ্য এটি নয় যে, সহজ পথ থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছা করে কঠিন পথ বেছে নিতে হবে, কিংবা কাছের পথ থাকতে দূরের পথে যেতে হবে। আপনি যে হাদিসটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তা সুনান গ্রন্থকারগণ বর্ণনা করেছেন এবং আলবানি সেটিকে সহিহ বলেছেন। এটি মসজিদে পায়ে হেঁটে যাওয়ার অধিক সওয়াব প্রমাণ কর; দূরের বা কঠিন পথ বেছে নেওয়ার ফজিলত প্রমাণ করে না। আল্লাহু আলাম। (উৎস: ইসলাম ওয়েব)।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Subscribe to:
Posts (Atom)