September 16, 2026

কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে স্ত্রীর প্রতি সদাচরণ এবং একজন আদর্শ স্বামীর বৈশিষ্ট্য

 প্রশ্ন: একজন স্বামী কি সবসময় স্ত্রীর সাথে কঠোরভাবে আচরণ করতে পারে? স্ত্রী যদি কোনও অবাধ্যতাই না করে বরং অনুগত থাকে সেক্ষেত্রে স্বামীর জন্য সবসময় কড়া বা শক্ত ভাষায় কথা বলা কি কোনোভাবে বৈধ হতে পারে? অনেকে মনে করে, পুরুষ মানেই স্ত্রীর সাথে কঠোর হতে হবে। একজন পুরুষের স্ত্রীর সাথে কেমন আচরণ তার উত্তম ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক হতে পারে?

উত্তর: দাম্পত্য জীবনের মূল ভিত্তি হলো স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, মায়া-মমতা ও সম্মান। তাই স্বামী বা স্ত্রী—কারও জন্যই একে অপরের সাথে সারাক্ষণ কর্কশ বা কঠোর মেজাজে কথা বলা ঠিক নয়। বিশেষ করে স্ত্রী যদি অনুগত হন এবং কোনও ভুল বা অবাধ্যতা না করেন তবে তার সাথে কঠোর আচরণ করা একেবারেই অনুচিত। “পুরুষ মানেই স্ত্রীর সাথে মেজাজ দেখিয়ে চলতে হবে”—এই চিন্তাটি একটি ভুল ধারণা, সামাজিক কুসংস্কার এবং ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। মহান আল্লাহ বলেন,
وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ
“তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) সাথে সৎ ও সুন্দরভাবে জীবনযাপন করো।” [সূরা নিসা: ১৯]
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي»
“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে উত্তম, যে তার পরিবারের (স্ত্রীর) কাছে উত্তম। আর আমি আমার পরিবারের কাছে তোমাদের চেয়েও বেশি উত্তম।” [সুনানে তিরমিজি: ৩৮৯৫-হাদিসটি সহীহ]
এই হাদিসে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন—তিনি পরিবারের সাথে সবচেয়ে চমৎকার আচরণ করতেন, যা প্রতিটি স্বামীর জন্যই অনুসরণীয়।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«لاَ يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ»
“কোনও মুমিন পুরুষ যেন কোনও মুমিন নারীকে (স্ত্রীকে) সম্পূর্ণভাবে অপছন্দ না করে। কারণ তার একটি আচরণ বা অভ্যাস খারাপ লাগলেও অন্য কোনও আচরণ বা গুণে সে অবশ্যই সন্তুষ্ট হবে।” [সহীহ মুসলিম: ১৪৬৮]
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন—
«اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا، فَإِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلَاهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ»
“তোমরা নারীদের সাথে ভালো ব্যবহারের উপদেশ গ্রহণ করো। কারণ নারীকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ হলো তার ওপরের দিক। তুমি যদি তা একবারে সোজা করতে যাও, তবে তা ভেঙে ফেলবে; আর যদি এমনি ছেড়ে দাও তবে তা বাঁকাই থেকে যাবে। তাই নারীদের সাথে ভালো আচরণ করার উপদেশ মেনে চলো।” [সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম]
এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, স্ত্রীর স্বভাবগত কিছু দুর্বলতা থাকতেই পারে—সেগুলো নিয়ে অনর্থক কঠোর না হয়ে ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তার সাথে সংসার পরিচালনা করাই একজন দায়িত্বশীল স্বামীর পরিচয়।
❑ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন উত্তম চরিত্রের আদর্শ স্বামীর কতিপয় বৈশিষ্ট্য:
একজন উত্তম চরিত্রের আদর্শ স্বামী তার স্ত্রীর সাথে যেমন আচরণ করবে:
১. কথায় কথায় রাগ না দেখিয়ে স্ত্রীর সাথে শান্ত, ভদ্র ও স্নেহমাখা ভাষায় কথা বলবে; কঠিন ভাষায় বকাঝকা ও গালাগালি করবে না এবং মেজাজ দেখিয়ে চড়া গলায় কথা বলবে না।
২. মানুষমাত্রই ভুল হয়। তাই স্ত্রীর ছোটখাটো ত্রুটিগুলোকে বড় করে না দেখে হাসিমুখে ও ধৈর্যের সাথে তা শুধরে দেওয়ার এবং সুন্দর আচার-ব্যবহারের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করবে।
৩. স্ত্রী সংসার ও পরিবারের জন্য যা কিছু করে তার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানানো এবং মন খুলে তার কাজের মূল্যায়ন ও প্রশংসা করবে।
৪. স্ত্রীর সুখ-দুঃখ ও আনন্দ-বেদনায় তার প্রকৃত সঙ্গী হবে। তার মনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে, যেকোনো কঠিন পরিস্থিতিতে তার পাশে থাকবে এবং তার মানসিক অবস্থা ও অনুভূতির দিকে বিশেষ মনোযোগ দিবে।
৫. স্ত্রীকে কেবল গৃহস্থালি কাজে সীমাবদ্ধ বা অধীনস্থ মনে না করে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে সমান অংশীদার (লাইফ পার্টনার) হিসেবে সম্মান করা।
৬. স্ত্রীর ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনও দুর্বলতা কিংবা পারিবারিক মনোমালিন্যের বিষয় অন্যের কাছে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ না করে নিজেদের মধ্যেই তা সমাধান করবে। কখনোই লোক সম্মুখে, বিশেষ করে তার মা-বাবা ও নিকটাত্মীয়দের কাছে তাকে কখনও অপমান বা ছোট না করবে না।
৭. সারাদিনের ব্যস্ততার ফাঁকেও স্ত্রীর জন্য কিছুটা সময় বের করা, মনোযোগ দিয়ে তার কথা শোনা এবং একান্তে সুন্দর কিছু মুহূর্ত (quality time) কাটানো।
৮. স্ত্রীর বাবা-মা, ভাইবোন ও নিকটাত্মীয়দের নিজের পরিবারের মতোই সম্মান ও ভালোবাসা দেওয়া।
৯. মাঝেমধ্যে তার পছন্দের ছোটখাটো উপহার দেওয়ার চেষ্টা করবে (যেমন: সুন্দর পোশাক, অলঙ্কার, তার বিশেষ কোনও চাহিদা পূরণ ইত্যাদি) এবং সম্ভব হলে গুনাহ মুক্ত পরিবেশে ঘুরতে যাওয়া বা তার পছন্দের খাবার খাওয়ানো।
১০. পরিবারের ছোট-বড় যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় স্ত্রীর মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া এবং তার সাথে আলোচনা করা।
❑ কঠোরতা কখন প্রযোজ্য?
স্ত্রী যদি স্পষ্ট কোনও অবাধ্যতা করে, শরিয়তের বিধান অমান্য করে বা পরিবারের কোনও ক্ষতি করে তবুও ইসলাম শুরুতেই কঠোর হতে বলে না। কুরআন আমাদের ধাপে ধাপে অগ্রসর হতে বলেছে—প্রথমে বুঝিয়ে বলা, তারপর শয্যা পৃথক করা, আর একদম শেষ উপায় হিসেবে সামান্য শাসন (যাতে কোনও আঘাত বা দাগ না লাগে)। [দেখুন: তবে তা-ও শুধু বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রযোজ্য, রাগের বশে বা প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়।
উপরের আয়াত ও হাদিসগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, স্ত্রীর সাথে সুন্দর আচরণ, নম্রতা ও ধৈর্য প্রদর্শনই ইসলামের শিক্ষা। আর আমাদের প্রিয় নবি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই এর সবচেয়ে বড় বাস্তব উদাহরণ। মহান আল্লাহ আমাদেরকে কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী আদর্শ দাম্পত্য জীবন গঠনের তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

পিতা ঋণগ্রস্ত থাকা অবস্থায় মারা গেলে সন্তানরা কি সেই ঋণ শোধ করতে বাধ্য

 প্রশ্ন: পিতা যদি কোনো কোম্পানির ঋণের ব্যক্তিগত জামিনদার (গ্যারান্টর) হয়ে মারা যান এবং চুক্তিপত্রে উত্তরাধিকারীদেরও দায়বদ্ধ রাখার শর্ত থাকে তাহলে কোম্পানি ঋণ শোধে ব্যর্থ হলে পিতার মৃত্যুর পর সন্তানরা কি তা পরিশোধ করতে বাধ্য? সন্তানরা শোধ না করলে আখিরাতে তারা কি পাকড়াও হবে?

উত্তর: শরিয়তের বিধান অনুযায়ী, কারো মৃত্যুর পর তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ধারাবাহিকভাবে চারটি বিষয় নিষ্পন্ন করা হয়:
১. দাফন-কাফনের খরচ।
২. তার নিজস্ব ঋণ ও জামিনদারির বকেয়া পরিশোধ।
৩. ওসিয়ত পূরণ (যদি কোনো ওসিয়ত করে থাকেন, তবে তা সর্বোচ্চ অবশিষ্ট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত কার্যকর হয়)।
৪. অবশিষ্ট সম্পত্তি ফারায়েজ অনুযায়ী উত্তরাধিকারীদের মাঝে বণ্টন।
আল্লাহ তাআলা মিরাসের আয়াতে ওসিয়ত ও ঋণ পরিশোধের এই ধারাবাহিকতার প্রতি ইঙ্গিত দিয়ে বলেন:
مِنْ بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ
“তার করা ওসিয়ত পূরণ অথবা ঋণ পরিশোধের পর।” [সূরা নিসা: ১১]
অর্থাৎ পিতার জামিনদারির দায় তার মৃত্যুর সাথে সাথেই তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির ওপর বর্তায় এবং সম্পত্তি বণ্টনের আগেই তা থেকে ঋণ পরিশোধ করা সন্তানদের জন্য শরয়ি কর্তব্য। কিন্তু পিতা যদি কোনো সম্পত্তি রেখে না যান তবে সন্তানরা নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ থেকে সেই ঋণ পরিশোধ করতে শরয়িভাবে বাধ্য নন। ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো—একজনের দায় অন্য নিরপরাধ ব্যক্তির ওপর বর্তায় না। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ
“মানুষ তা-ই পায়, যার জন্য সে চেষ্টা করে।” [সূরা নাজম: ৩৯] এই আয়াতের আলোকে ফকিহগণ উল্লেখ করেছেন যে, কারো কৃতকর্ম বা আর্থিক দায় অন্য কারো ওপর বর্তায় না—যদি না সে স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ করে।
▪️ঋণের জন্য সন্তানগণ আখিরাতে পাকড়াও হবে কি?
পিতা সম্পত্তি রেখে না গেলে এবং সন্তানরা অসচ্ছলতার কারণে জামিনদারির বকেয়া বা ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে এর জন্য সন্তানদের আখিরাতে কোনো পাকড়াও বা গুনাহ হবে না। তবে পিতা সম্পত্তি না রেখে গেলেও সন্তানরা সামর্থ্যবান হলে নিজেদের পক্ষ থেকে সেই ঋণ পরিশোধ করে দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ এবং পিতার প্রতি ইহসান (সদাচরণ) হিসেবে বিবেচিত হবে। হাদিসে এসেছে, ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মৃত ব্যক্তির আত্মা ঋণ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত ঝুলন্ত থাকে। তাই সম্ভব হলে স্বেচ্ছায় ঋণ পরিশোধ করে পিতাকে দায়মুক্ত করা উচিত।
সংক্ষেপে: সন্তানদের প্রথম করণীয় হলো—পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি বণ্টনের আগে সেখান থেকে জামিনদারির বকেয়া ঋণ পরিশোধ করা। পিতা কোনো সম্পত্তি না রাখলে সন্তানরা নিজ সম্পদ থেকে তা শোধ করতে শরয়িভাবে বাধ্য নন এবং পরিশোধ করতে না পারলে গুনাহগারও হবেন না। তবে সামর্থ্য থাকলে স্বেচ্ছায় ঋণ পরিশোধ করে পিতার আত্মাকে দায়মুক্ত করার চেষ্টা করা উত্তম ও অধিক সওয়াবের কাজ।
▪️দেশে প্রচলিত আইন:
বাংলাদেশের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (Muslim persona low) অনুযায়ী উত্তরাধিকার পরিচালিত হয়। সেখানেও সম্পত্তি বণ্টনের আগে কাফন-দাফনের খরচ, বাকি ঋণ ও বৈধ ওসিয়ত কার্যকর করার পরই অবশিষ্ট সম্পত্তি ওয়ারিশদের মাঝে বণ্টিত হওয়ার নিয়ম অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ শরিয়াহ ও প্রচলিত আইন—উভয় ক্ষেত্রেই ঋণ পরিশোধের স্থান সম্পত্তি বণ্টনের আগে; বণ্টনের পরে নয়। বাবার ঋণ যদি তার রেখে যাওয়া সম্পত্তির চেয়ে বেশি হয় তবে প্রচলিত আইনি চর্চায়ও সন্তানরা নিজেদের ব্যক্তিগত অর্থ থেকে বাকি ঋণ শোধ করতে বাধ্য নন। ঋণদাতা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কেবল মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পদ থেকেই পাওনা আদায় করতে পারে; ঋণ সম্পদের চেয়ে বেশি হলে উত্তরাধিকারীরা সম্পত্তি ত্যাগের নোটারি করে নিজেদের দায়মুক্তও রাখতে পারেন। অর্থাৎ এখানেও মূলনীতি একই: সন্তানরা কখনও তাদের নিজস্ব উপার্জিত সম্পদ থেকে বাবার ঋণ শোধ করতে আইনত বাধ্য নন; দায়বদ্ধতা মৃতের রেখে যাওয়া সম্পত্তির পরিমাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। (তবে বিশেষ চুক্তিতে ভিন্ন শর্ত থাকলে সে ক্ষেত্রে আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উত্তম।)
▪️ফতওয়ায়ে উসাইমিন: ওয়ারিশদের কি মৃতের ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব?
প্রশ্ন: কোনো ব্যক্তি মারা গেলে তার ওপর যদি ঋণ থাকে এবং সে এমন কোনো সম্পদ রেখে না যায় যা দিয়ে এই ঋণ পরিশোধ করা যায় তাহলে তার ওয়ারিশদের ওপর কি তার পক্ষ থেকে এই ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব, নাকি নয়?
উত্তর:
لَا يَجِبُ عَلَى وَرَثَتِهِ أَنْ يُؤَدُّوا هَذَا الدَّيْنَ عَنْهُ سَوَاءٌ كَانُوا مِنَ الْأَبَاعِدِ أَوْ مِنَ الْأَقَارِبِ، لَكِنْ إِنْ كَانَ هَذَا الْمَيِّتُ وَالِدًا فَيَنْبَغِي لِأَوْلَادِهِ أَنْ يُؤَفُّوا عَنْهُ؛ لِأَنَّ ذَلِكَ مِنْ بِرِّهِ، وَأَمَّا الْوُجُوبُ فَلَا يَجِبُ؛ لِأَنَّنَا لَوْ أَوْجَبْنَا هَذَا لَكُنَّا نُؤَثِّمُهُمْ بِتَرْكِ الْوَفَاءِ، وَهَذَا يُخَالِفُ قَوْلَهُ تَعَالَى: ﴿وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى﴾ وَلِأَنَّنَا لَوْ قُلْنَا بِوُجُوبِ وَفَاءِ الدَّيْنِ عَنِ الْمَيِّتِ الَّذِي لَمْ يَخْلُفْ تَرِكَةً لَكَانَ فِي هَذَا فَتْحُ بَابٍ لِهَؤُلَاءِ الَّذِينَ لَا يُبَالُونَ بِارْتِكَابِ الدُّيُونِ، فَيَقُولُ الْوَاحِدُ: أَنَا سَوْفَ أَتَدَيَّنُ، وَإِذَا مُتُّ فَإِنَّ أَهْلِي أَوْ وَرَثَتِي يَقْضُونَ عَنِّي الدَّيْنَ. فَلَا يُبَالِي بَعْدَ ذَلِكَ بِمَا اسْتَدَانَهُ وَأَلْحَقَهُ ذِمَّتَهُ. ثُمَّ إِنِّي أَقُولُ: إِنَّ الْمَيِّتَ إِذَا مَاتَ وَعَلَيْهِ دَيْنٌ فَإِنْ كَانَ قَدْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللَّهُ عَنْهُ، فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُؤَدِّي عَنْهُ مِنْ فَضْلِهِ وَكَرَمِهِ، فَيُرْضِي أَهْلَ الْحَقِّ.
“ওয়ারিশদের ওপর মৃতের ঋণ পরিশোধ করা ওয়াজিব নয়—চাই তারা দূরের আত্মীয় হোক বা নিকটাত্মীয়। তবে মৃত ব্যক্তি যদি বাবা হন তবে সমর্থ্য থাকলে সন্তানদের উচিত, তার ঋণ শোধ করে দেওয়া। কেননা এটি বাবার প্রতি সৎব্যবহার ও সদাচরণের অংশ। কিন্তু এটিকে বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) বলা যাবে না। কারণ, আমরা যদি একে ওয়াজিব সাব্যস্ত করি তবে ঋণ পরিশোধ না করার কারণে সন্তানদের গুনাহগার সাব্যস্ত করতে হয়; অথচ এটি আল্লাহ তাআলার এই বাণীর পরিপন্থী:
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى
“কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না” [সূরা আনআম: ১৬৪]।
তা ছাড়া, কোনো সম্পদ না রেখে যাওয়া মৃতের ঋণ পরিশোধ করাকে যদি আমরা ওয়াজিব বলে দিই তবে তা অকাতরে ঋণ নেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন লোকদের জন্য এক সুবিধার পথ খুলে দেবে। তখন যে কেউ ভাববে—”আমি ঋণ নিতেই থাকি। আমি মারা গেলে আমার পরিবার বা ওয়ারিশরা তো তা শোধ করেই দেবে!” ফলে নিজের কাঁধে কত ঋণ চাপাচ্ছে, সে বিষয়ে তার আর কোনো পরোয়া থাকবে না। এর পাশাপাশি আমি আরও বলতে চাই—কোনো ব্যক্তি যদি পরিশোধ করার সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে এবং তা পরিশোধ করার আগেই মারা যায় তবে আল্লাহ তাআলাই নিজ অনুগ্রহ ও মহানুভবতায় তার পক্ষ থেকে সেই ঋণ আদায় করে দেবেন এবং পাওনাদারদের সন্তুষ্ট করে দেবেন।”
ফতওয়া দাতা: আল্লামা মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল-উসাইমিন (রাহিমাহুল্লাহ)।
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
▪️ঋণ রেখে মৃত্যুবরণ করার ভয়াবহতা:
হাদিসে ঋণ পরিশোধ না করে মারা যাওয়ার পরিণতি নিয়ে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهِ حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ»
“মুমিনের আত্মা তার ঋণের সাথে ঝুলে থাকে, যতক্ষণ না তার পক্ষ থেকে তা পরিশোধ করা হয়।” [​সহিহ আল-জামে, হাদিস: ৬৭৭৯; সহিহ আত-তিরমিজি, হাদিস: ১০৭৮]
এমনকি আল্লাহর পথে নিহত শহিদেরও সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়, কিন্তু ঋণ ক্ষমা করা হয় না—এমনটিও হাদিসে এসেছে। [মুসলিম]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে ঋণ ও পাপের বোঝা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন এবং সাহাবিদেরও এই দোআ শিক্ষা দিতেন:
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْمَأْثَمِ وَالْمَغْرَمِ
“হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে গুনাহ ও ঋণের বোঝা থেকে আশ্রয় চাই।” [বুখারি]
একবার সাহাবিগণ জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রসুল! আপনি এত ঘন ঘন ঋণ থেকে আশ্রয় চান কেন?”
তিনি জবাবে বলেছিলেন: “মানুষ ঋণগ্রস্ত হলে কথা বলতে গিয়ে মিথ্যা বলে এবং ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে।”
এ কারণেই ইসলামে একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঋণ নেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। প্রকৃত অভাব, চিকিৎসা, ব্যবসার বৈধ প্রয়োজন বা এমন কোনো জরুরি অবস্থায় ঋণ নেওয়া জায়েজ।
তবে বিলাসিতা বা অপ্রয়োজনীয় খরচের জন্য ঋণের বোঝা নিজের কাঁধে চাপানো থেকে বিরত থাকা উচিত।
আর যদি কাউকে ঋণ নিতেই হয় তবে তার উচিত, পরিশোধের সৎ নিয়ত রাখা, সাধ্যমতো দ্রুত তা শোধ করার চেষ্টা করা এবং নিজের অবর্তমানে পরিবার যেন এই দায় থেকে বেকায়দায় না পড়ে সে বিষয়ে আগে থেকেই প্রস্তুতি রাখা—যেমন ঋণের হিসাব লিখে রাখা বা পরিবারকে তা অবহিত করে রাখা। মহান আল্লাহ তৌফিক দানকারী।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

বন্যা ভূমিধ্বস ও অন্যান্য ক্ষতি থেকে কবর রক্ষায় বেড়া ইট পাথর কাঠ বা লোহা ব্যবহারের বিধান

 ইসলামে কবরকে যথাসম্ভব স্বাভাবিক ও অনাড়ম্বর রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন—বন্যার পানি, ভূমিধ্বস, কিংবা হিংস্র প্রাণীর উপদ্রব থেকে কবর নষ্ট হওয়া বা ধসে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে, প্রয়োজনীয় সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া শরিয়তে বৈধ। ক্ষেত্র বিশেষে কবর রক্ষার্থে ইট, সিমেন্ট, কাঠ, লোহা বা অন্য কোনও প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করা জায়েজ, তবে তা অবশ্যই প্রয়োজনের সীমারেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। এ বিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া উপস্থাপন করা হলো:

❑ ১. কবর চিহ্নিত রাখা ও বন্যার হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তার চারপাশে বেড়া দেওয়ার বিধান:
প্রশ্ন: কবর চিহ্নিত রাখা ও তা বন্যা থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে তার চারপাশে এক বিঘত উচ্চতার লোহার বেড়া দেওয়া কি জায়েজ? বেড়াটি খাড়া খুঁটির সাথে আড়াআড়িভাবে চারটি লোহার রড জোড়া দিয়ে তৈরি।
উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, দরুদ ও সালাম রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি। সহিহ সুন্নাহয় কবরে চুন-সুরকি লাগানো, তা উঁচু করা, তার ওপর কাঠামো তৈরি করা ও নির্মাণকাজ করা নিষেধ করা হয়েছে। এর কারণ হলো, কবরবাসীর ব্যাপারে মানুষ যেন ফিতনায় না পড়ে এবং তাদের প্রতি বাড়াবাড়ি করে শিরকে লিপ্ত না হয় ও তাদের উদ্দেশ্যে ইবাদত না করে বসে—যেমনটি ইতিপূর্বে ইহুদি-খ্রিস্টানরা করেছিল এবং আমাদের যুগেও কিছু মুসলিমের মধ্যে ঘটেছে। পাশাপাশি এতে অনর্থক অর্থ অপচয়েরও বিষয় আছে।
প্রখ্যাত তাবেয়ি আবুল হায়্যাজ আল আসাদি (রাহ.) বর্ণনা করেন, আলি ইবনে আবি তালিব (রা.) তাঁকে বলেছিলেন:
«أَلَا أَبْعَثُكَ عَلَى مَا بَعَثَنِي عَلَيْهِ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَنْ لَا تَدَعَ تِمْثَالًا إِلَّا طَمَسْتَهُ، وَلَا قَبْرًا مُشْرِفًا إِلَّا سَوَّيْتَهُ»
“আমি কি তোমাকে সেই কাজের জন্য পাঠাব না, যে কাজের জন্য রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে পাঠিয়েছিলেন? তুমি কোনও মূর্তি (কোনও প্রাণীর, বিশেষত মানুষ বা জীবজন্তুর, ছবি বা আকৃতিতে তৈরি ভাস্কর্যজাতীয় বস্তু) দেখলে তা মুছে ফেলবে আর কোনও উঁচু কবর দেখলে তা সমান করে দেবে।” [সহিহ মুসলিম: ৯৬৯]
তবে কবরকে হিংস্র জীবজন্তু থেকে রক্ষা করার জন্য কিংবা বন্যা বা অন্য কোনও কারণে তা যেন বিলীন হয়ে না যায় সেজন্য বেড়া দেওয়ার প্রয়োজন হলে প্রয়োজনের পরিমাণে তা দিতে কোনও অসুবিধা নেই। কারণ প্রয়োজন যতটুকু অনুমতিও ততটুকু পর্যন্তই সীমিত থাকে। যদি এক বিঘত উচ্চতার বেড়া দিয়েই আশঙ্কিত ক্ষতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হয় তাহলে তার চেয়ে বেশি করা যাবে না। কেবল প্রয়োজনের সীমা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে।
আর শুধু কবর চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে তা উঁচু করা শরিয়তসম্মত নয়; বরং এটিও নির্মাণ-নিষেধের সাধারণ নির্দেশনার আওতায় পড়বে। কারণ কবর চিহ্নিত করার জন্য এর চেয়ে কম ব্যবস্থাতেই কাজ চলে।
তবে যদি মূল উদ্দেশ্য বন্যা প্রভৃতি থেকে কবর রক্ষা করা হয় এবং কবর চিহ্নিত হওয়াটা তার পাশাপাশি অতিরিক্ত ফায়দা হিসেবে আসে, তাহলে ইনশাআল্লাহ তাতে কোনও অসুবিধা নেই। কেননা যা স্বতন্ত্রভাবে জায়েজ নয় তা অন্য একটি বৈধ উদ্দেশ্যের অনুগামী হিসেবে জায়েজ হয়ে যায়।” আল্লাহই সর্বজ্ঞ। [সূত্র: ইসলাম ওয়েব]
❑ ২. কবর ধসে পড়ার আশঙ্কায় ইট দিয়ে কবর নির্মাণের বিধান:
শাইখ ইবনে বায (রহ.) বলেন:
«إِذَا دَعَتِ الْحَاجَةُ بِأَنْ يَضَعَ فِي الْقَبْرِ حِجَارَةً، أَوْ لَبِنًا، أَوْ خَشَبًا، أَوْ حَدِيدًا؛ لِأَنَّ الْأَرْضَ رَدِيئَةٌ، أَوْ تَعْلُوهَا الْمِيَاهُ؛ فَلَا بَأْسَ بِهَذَا. أَمَّا إِنْ كَانَتِ الْأَرْضُ قَوِيَّةً، يَحْفِرُ فِيهَا حَفْرًا إِلَى نِصْفِ طَرَفِ الرَّجُلِ فَوْقَ السُّرَّةِ، وَيُعَمِّقُ، وَيَجْعَلُ فِي اللَّحْدِ، وَيُوضَعُ فِيهِ الْمَيِّتُ، هَذِهِ السُّنَّةُ، أَمَّا إِنْ كَانَتِ الْأَرْضُ رَخْوَةً، ضَعِيفَةً؛ فَلَا مَانِعَ أَنْ يَكُونَ فِيهَا مَا يُثَبِّتُهَا مِنْ أَلْوَاحٍ، أَوْ حَدِيدٍ، أَوْ حَجَرٍ، أَوْ طُوبٍ حَتَّى لَا تَسْقُطَ، وَحَتَّى لَا يُرْقَى الْمَيِّتُ، لَا بَأْسَ بِهَذَا»
“প্রয়োজন দেখা দিলে কবরের মধ্যে পাথর, ইট, কাঠ বা লোহা ব্যবহার করা যেতে পারে; যেমন—মাটি যদি দুর্বল হয় অথবা সেখানে পানি উঠে যায়। এতে কোনও অসুবিধা নেই। তবে মাটি যদি শক্ত হয় তাহলে একজন মানুষের নাভির ওপর পর্যন্ত গভীর করে গর্ত খুঁড়তে হবে এবং লাহাদ (বগল-কবর) তৈরি করে তাতে মৃত ব্যক্তিকে রাখতে হবে। এটাই সুন্নত। আর মাটি যদি নরম ও দুর্বল হয় তবে তা ধসে পড়া ঠেকাতে এবং মৃতদেহ উন্মুক্ত হওয়া রোধ করতে তক্তা, লোহা, পাথর বা ইট দিয়ে তা মজবুত করায় কোনো বাধা নেই। এতে কোনো অসুবিধা নেই।”
ইবনে হাজার আল-হাইসামি (রহ.) বলেন:
«إِنْ خُشِيَ نَبْشُ أَوْ حَفْرُ سَبُعٍ أَوْ هَدْمُ سَيْلٍ، لَمْ يُكْرَهِ الْبِنَاءُ وَالتَّجْصِيصُ»
“যদি আশঙ্কা থাকে যে কোনও হিংস্র প্রাণী কবর খুঁড়ে ফেলবে অথবা বন্যার পানিতে কবর ধসে পড়বে তাহলে কবরের ওপর নির্মাণকাজ করা ও চুন-সুরকি লাগানো অপছন্দনীয় হবে না।” [তুহফাতুল মুহতাজ: ৩/১৯৬] (সূত্র: islamqa.info)
এসব ফতওয়ার ভিত্তি হলো, ইসলামে নিষিদ্ধ কাজ বিশেষ প্রয়োজনে নিষিদ্ধ বিষয়ও সীমিত পরিসরে বৈধ হওয়া, (الضرورة/الحاجة) ও ক্ষতি রোধের নীতি (الضرر يزال)। এসব মূলনীতির আলোকে কবর ধসে লাশ উন্মুক্ত হওয়া বা নষ্ট হওয়া ঠেকানো জরুরি। এ ছাড়াও জীবিত ব্যক্তির মতো মৃত ব্যক্তির সম্মান ও দেহ অক্ষত রাখা শরিয়তে আবশ্যক। তবে অনুমতি কেবল প্রয়োজন মেটানো পর্যন্তই সীমাবদ্ধ; সৌন্দর্যবর্ধন বা জাকজমকের উদ্দেশ্যে নির্মাণ করা যাবে না।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

পিতামাতার কাছে পাওনা জন্ম থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সন্তানের ১৯ টি হক যা উল্লেখ করা হলো এগুলো পালন করা প্রত্যেক পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ

 

পিতামাতার কাছে পাওনা জন্ম থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সন্তানের ১৯ টি হক যা উল্লেখ করা হলো এগুলো পালন করা প্রত্যেক পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ আল্লাহ তা‘আলা মানব জীবনকে সন্তান-সন্তুতির মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় করেছেন। পারিবারিক জীবনে সন্তান-সন্ততি কতবড় নিয়ামত তা যার সন্তান হয়নি তিনি সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করে থাকেন। যাদেরকে আল্লাহ রাববুল আলামীন সন্তান দান করেছেন তাদের উপর এক মহান দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। পিতা-মাতার জন্য সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হবে যদি সন্তানকে আদর্শবান রূপে গড়ে না তুলতে পারেন। কেননা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلاَّ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ ، أَوْ يُنَصِّرَانِهِ ، أَوْ يُمَجِّسَانِهِ»
প্রতিটি নবজাতক তার স্বভাবজাত দ্বীন ইসলামের ওপর জন্ম গ্রহণ করে। অতঃপর তার মা-বাবা তাকে ইয়াহূদী, নাসারা অথবা অগ্নিপূজক হিসেবে গড়ে তোলে [সহীহ বুখারী: ১৩৫৮]।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থা দিন দিন যেভাবে অপসংস্কৃতি, অনৈতিকতা এবং চরিত্র বিধ্বংসী কাজের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেখানে আমাদের সন্তানের উপর যেসব দায়িত্ব আছে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পন্থায় সন্তানকে লালন-পালন করা ঈমানের অন্যতম দাবী। আমাদের উপর সন্তানদের যে হকগুলো রয়েছে তা এখানে আলোচনা করা হলো :
 
১. কানে আযান দেয়া : সন্তান দুনিয়াতে আসার পর গোসল দিয়ে পরিষ্কার করে তার ডান কানে আযান দেয়া, তা ছেলে হোক বা মেয়ে হোক। এটি পিতা-মাতার উপর এজন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বযে, শিশুর কানে সর্বপ্রথম আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের আওয়াজ পৌঁছে দেয়া এবং ওত পেতে থাকা শয়তান যাতে তার কোন ক্ষতি না করতে পারে। হাদিসে এসেছে,
 
عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ : رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم «أَذَّنَ فِي أُذُنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ بِالصَّلاَةِ».
আবূ রাফে রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাসান ইবনে আলীর কানে আযান দিতে দেখেছি [সুনান আবূ দাউদ:৫১০৫]
 
২. সুন্দর নাম রাখা : বাচ্চার জন্য সুন্দর নাম নির্বাচন করা পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। নাম অর্থবহ হওয়া নামের সৌন্দর্য। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন অনেক অসুন্দর নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। [আবু দাউদ ৪৯৫২-৪৯৬১]
 
৩. আক্বিকা করা : ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম বিষয় হলো সন্তানের আকীকা করা। ছেলের পক্ষ থেকে ২টি ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে ১টি ছাগল আল্লাহর নামে যবেহ করা। হাদীসে এসেছে,
عَنْ سَمُرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كُلُّ غُلَامٍ رَهِينَةٌ بِعَقِيقَتِهِ تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ السَّابِعِ وَيُحْلَقُ رَأْسُهُ»
সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সকল নবজাতক তার আক্বিকার সাথে আবদ্ধ। জন্মের সপ্তম দিন তার পক্ষ থেকে জবেহ করা হবে। ঐ দিন তার নাম রাখা হবে। আর তার মাথার চুল কামানো হবে। [সুনান আবূ দাউদ: ২৮৩৮]
 
৪. সদকাহ করা : ছেলে হোক বা মেয়ে হোক সপ্তম দিবসে চুল কাটা এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ করা সুন্নাত। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান রা. এর পক্ষ থেকে ১টি বকরী আকীকা দিয়েছেন এবং বলেছেন, হে ফাতেমা ! তার মাথা মুণ্ডন কর এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ কর। [সুনান আত-তিরমিযী: ১৫১৯] এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদেরকে খেজুর দিয়ে তাহনীক এবং বরকতের জন্য দো‘আ করতেন। [সহীহ বুখারী: ৩৯০৯; মুসলিম: ২১৪৬]
 
৫. খাতনা করা : ছেলেদের খাতনা করানো একটি অন্যতম সুন্নাত। হাদীসে এসেছে,
عَنْ جَابِرٍ قَالَ : «عَقَّ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم عَنِ الْحَسَنِ وَالْحُسَيْنِ وَخَتَنَهُمَا لِسَبْعَةِ أَيَّامٍ».
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান এবং হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমার সপ্তম দিবসে আকীকা এবং খাতনা করিয়েছেন। [আল-মু‘জামুল আওসাত: ৬৭০৮]
 
৬. তাওহীদ শিক্ষা দেয়া : শিশু যখন কথা বলা আরম্ভ করবে তখন থেকেই আল্লাহর তাওহীদ শিক্ষা দতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে বলেন,
‘হে বৎস! আমি তোমাকে কয়েকটি বাক্য শিখাতে চাই। তুমি আল্লাহর অধিকারের হেফাযত করবে, আল্লাহও তোমার হেফাযত করবেন। তুমি আল্লাহর অধিকারের হেফাযত করবে, তুমি তাঁকে সর্বদা সামনে পাবে। যখন কোন কিছু চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন সহযোগিতা চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখ! যদি পুরো জাতি যদি তোমার কোন উপকার করার জন্য একতাবদ্ধ হয়, তবে তোমার কোন উপকার করতে সমর্থ হবে না, শুধু ততটুকুই করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর যদি পুরো জাতি যদি তোমার কোন ক্ষতি করার জন্য একতাবদ্ধ হয়, তবে তোমার কোন ক্ষতি করতে সমর্থ হবে না, শুধু ততটুকুই করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। কলমের লিখা শেষ হয়েছে এবং কাগজসমূহ শুকিয়ে গেছে। [তিরমিযী: ২৫১৬]
 
৭. কুরআন শিক্ষা দান : ছোট বেলা থেকেই সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দিতে হবে। কেননা কুরআন শিক্ষা করা ফরয। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের তিনটি বিষয় শিক্ষা দাও। তন্মধ্যে রয়েছে তাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা ও কুরআনের জ্ঞান দাও। [জামিউল কাবীর]
কুরআন শিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ»
‘‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে ও অপরকে শিক্ষা দেয়।’’ [সহীহ বুখারী:৫০২৭]
 
৮. সলাত শিক্ষা দেয়া ও সলাত আদায়ে অভ্যস্ত করা : এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার যে পিতা-মাতা তার সন্তানকে সলাত শিক্ষা দিবেন এবং সলাত আদায়ে অভ্যস্ত করাবেন। হাদীসে এসেছে,
আমর ইবনে শূয়াইব রাদিয়াল্লাহু আনহু তার বাবা তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের সলাতের নির্দেশ দাও সাত বছর বয়সে। আর দশ বছর বয়সে সলাতের জন্য মৃদু প্রহার কর এবং শোয়ার স্থানে ভিন্নতা আনো। [সুনান আবূ দাউদ: ৪৯৫]
 
৯. আদব বা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া : সন্তানদের আচরণ শিক্ষা দেয়া পিতামাতার উপর দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভূক্ত। লুকমান আলাইহিস সালাম তার সন্তানকে বললেন, ‘আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর যমীনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক, অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, তোমার আওয়াজ নীচু কর; নিশ্চয় সবচাইতে নিকৃষ্ট আওয়াজ হল গাধার আওয়াজ।’ [ সূরা লুকমান ১৮,১৯]
 
১০.আদর স্নেহ ও ভালবাসা দেয়া : সন্তানদেরকে স্নেহ করা এবং তাদেরকে আন্তরিকভাবে ভালবাসতে হবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ইবনে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে চুম্বন দিলেন এবং আদর করলেন। সে সময় আকরা ইবনে হাবিস রাদিয়াল্লাহু আনহুও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলতে লাগলেন, আমারতো দশটি সন্তান কিন্তু আমিতো কখনো আমার সন্তানদেরকে আদর স্নেহ করিনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, যে অন্যের প্রতি রহম করে না আল্লাহও তার প্রতি রহম করেন না। [সহীহ বুখারী: ৫৯৯৭]
 
১১. দ্বীনি ইলম শিক্ষা দেয়া : সন্তানকে দীনি ইলম শিক্ষা দেয়া ফরজ করা হয়েছে। কারণ দ্বীনি ইলম না জানা থাকলে সে বিভ্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে। হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ : «طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ»
আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞানার্জন করা ফরয। [সুনান ইবন মাজাহ: ২২৪]
 
১২. প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করা : সন্তানদেরকে প্রাপ্ত বয়স্ক পর্যন্ত লালন-পালন করতে হবে এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ করতে হবে।
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ لِي مِنْ أَجْرٍ فِي بَنِي أَبِي سَلَمَةَ أَنْ أُنْفِقَ عَلَيْهِمْ وَلَسْتُ بِتَارِكَتِهِمْ هَكَذَا وَهَكَذَا إِنَّمَا هُمْ بَنِيَّ قَالَ: «نَعَمْ لَكِ أَجْرُ مَا أَنْفَقْتِ عَلَيْهِمْ»
উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম আবূ সালামার সন্তানদের জন্য আমি যদি খরচ করি এতে কি আমার জন্য প্রতিদান রয়েছে? নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ যতদিন তুমি খরচ করবে ততদিন তোমার জন্য প্রতিদান থাকবে। [সহীহ বুখারী: ৫৩৬৯]
 
১৩. সক্ষম করে তোলা : সন্তানদেরকে এমনভাবে সক্ষম করে গড়ে তোলা,তারা যেন উপার্জন করার মত যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে এভাবে বলেছেন,
«إِنَّكَ أَنْ تَدَعَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَدَعَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ فِي أَيْدِيهِمْ»
তোমাদের সন্তান সন্ততিদেরকে সক্ষম ও সাবলম্বি রেখে যাওয়া, তাদেরকে অভাবী ও মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম। [সহীহ বুখারী:১২৯৫]
 
১৪. বিবাহ দেয়া : সুন্নাহ পদ্ধতিতে বিবাহ দেয়া এবং বিবাহর যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা এবং উপযুক্ত সময়ে বিবাহর ব্যবস্থা করা। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই পিতার উপর সন্তানের হকের মধ্যে রয়েছে, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে বিবাহ দেবে। [জামিউল কাবীর]
 
১৫. দ্বীনের পথে পরিচালিত করা : পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব হলো সন্তানদেরকে দ্বীনের পথে, কুরআন-সুন্নাহর পথে পরিচালনা করা, দ্বীনের বিধান পালনের ক্ষেত্রে অভ্যস্ত করে তোলা। কুরআনে এসেছে,
﴿قُلۡ هَٰذِهِۦ سَبِيلِيٓ أَدۡعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا۠ وَمَنِ ٱتَّبَعَنِيۖ وَسُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ وَمَآ أَنَا۠ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ١٠٨﴾ [يوسف:108]
‘ বল, ‘এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত নই’। [সূরা ইউসুফ : ১০৮]
সন্তানকে দ্বীনের পথে পরিচালনার মাধ্যমে সওয়াব অর্জন করার এক বিরাট সুযোগ রয়েছে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন,
«فَوَاللَّهِ لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ»
তোমার মাধ্যমে একজনও যদি হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তবে তা হবে তোমার জন্য লালবর্ণের অতি মূল্যবান উট থেকেও উত্তম। [সহীহ বুখারী]
 
১৬. সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করা : সন্তানগণ পিতামাতার কাছ থেকে ইনসাফ আশা করে এবং তাদের মাঝে ইনসাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তাদের মাঝে ইনসাফ করো’। [সহীহ বুখারী: ২৫৮৭]
 
১৭. ইসলাম অনুমোদন করে না এমন কাজ থেকে বিরত রাখা : ইসলাম অনুমোদন করে না এমন কাজ থেকে তাদেরকে বিরত না রাখলে এই সন্তানগনই কিয়ামাতে পিতামাতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। কুরআনে এসেছে,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا ﴾ [التحريم:6]
হে ইমানদারগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। [সূরা আত-তাহরীম-৬]
আর কাফিররা বলবে, ‘হে আমাদের রব, জ্বিন ও মানুষের মধ্যে যারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে তাদেরকে আমাদের দেখিয়ে দিন। আমরা তাদের উভয়কে আমাদের পায়ের নীচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়। [সূরা হা-মীম আসসিজদাহ-২৯ ]
 
১৮. পাপকাজ, অশ্লিলতা, বেহায়াপনা, অপসংস্কৃতি থেকে বিরত রাখা : সন্তান দুনিয়ার আসার সাথে সাথে শয়তান তার পেছনে লেগে যায় এবং বিভিন্নভাবে, ভিন্ন ভিন্ন রুপে,পোশাক-পরিচ্ছেদের মাধ্যমে, বিভিন্ন ফ্যাশনে, বিভিন্ন ডিজাইনে, বিভিন্ন শিক্ষার নামে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করে। তাই পিতা-মাতাকে অবশ্যই এ বিষয়ে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন,
হে মুমিনগণ, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের দুশমন। অতএব তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। আর যদি তোমরা মার্জনা কর, এড়িয়ে যাও এবং মাফ করে দাও তবে নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। [সূরা তাগাবুন-১৪]
হাদীসে এসেছে,
ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী ও নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন। [সহীহ বুখারী:৫৮৮৫]
আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم « مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ».
‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাথে সা-দৃশ্যতা রাখবে সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে। [সুনান আবূ দাউদ:৪০৩১]
 
১৯. দো‘আ করা : আমাদের সন্তানদের জন্য দো‘আ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দো‘আ শিক্ষা দিয়েছেন এভাবে,
﴿ وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ أَزۡوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعۡيُنٖ وَٱجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِينَ إِمَامًا ٧٤ ﴾ [الفرقان: 74]
আল্লাহর নেক বান্দা তারাই যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন। [সূরা আলফুরকান-৭৪]
যাকারিয়্যা আলাইহিস সালাম আল্লাহর নিকট দো‘আ করেছিলেন,
﴿ هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُۥۖ قَالَ رَبِّ هَبۡ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةٗ طَيِّبَةًۖ إِنَّكَ سَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ ٣٨ ﴾ [ آل عمران:38]
‘হে আমার রব, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী’। [সূরা আলে ইমরান ৩৮]
সম্মানিত পিতামাতাবৃন্দ, আমরা কি সন্তানের হকগুলো পালন করতে পেরেছি বা পারছি ? আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদেরকে নেকসন্তান হিসাবে গড়ে তুলি। যে সম্পর্কে হাদিসে এসেছে,
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ « إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ»
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩ টি আমল বন্ধ হয় না-
১. সদকায়ে জারিয়া
২. এমন জ্ঞান-যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়
৩. এমন নেক সন্তান- যে তার জন্য দো‘আ করে [সহিহ মুসলিম:১৬৩১]
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সন্তানদেরকে কবুল করুন,
তাদের হকসমূহ যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দিন। আমীন!
লেখক : হাবীবুল্লাহ মুহাম্মাদ ইকবাল
সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব

Translate