September 12, 2026

প্যারালাইজড রোগীর ইবাদতের বিধান

 প্যারালাইজড (অবশ বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত) ও সংজ্ঞাহীন রোগীর ইবাদতের বিধান:

প্রশ্ন: প্যারালাইজড রোগীর ইবাদত-বন্দেগি করার পদ্ধতি কী? তার হাত-পা অচল, ব্রেইনও ঠিকমতো কাজ করে না। আবার প্রস্রাব-পায়খানা অনবরত বের হতে থাকে। এমন অবস্থায় তার নামাজ, অজু ও অন্যান্য ইবাদতের বিধান কী?
উত্তর: ইসলামের প্রতিটি বিধানই অত্যন্ত সহজ ও মানবিক। মহান আল্লাহ মানুষের সাধ্যের অতিরিক্ত কোনো বোঝা তার ওপর চাপিয়ে দেন না। তাই অসুস্থতার প্রেক্ষাপটে রোগীর শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা বিবেচনা করে ইবাদতের নিয়মেও এনে দেওয়া হয়েছে অসাধারণ নমনীয়তা ও সহজতা। তাই প্যারালাইজড বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীর ক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষ্য করা জরুরি—তাঁর মানসিক সুস্থতা (অর্থাৎ হুঁশ-জ্ঞান বা বোধশক্তি থাকা) এবং শারীরিক সক্ষমতা। নিম্নে এমন রোগীর পাক-পবিত্রতা, নামাজ ইত্যাদির বিধান সংক্সেপে আলোকপাত করা হলো:
❑ ১. প্যারালাজড রোগীর আকল (মস্তিষ্ক) সচল না থাকলে:
(ক) যদি মস্তিষ্ক সচল না থাকে তাহলে সুস্থ হওয়া পর্যন্ত তার জন্য নামাজ, রোজা ইত্যাদি ইসলামের কোনও বিধান ফরজ নয়। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثَةٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ، وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ، وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ»
“তিন শ্রেণির মানুষের ওপর থেকে কলম উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে: ঘুমন্ত ব্যক্তি—যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়; শিশু—যতক্ষণ না সে বালেগ হয়; এবং পাগল বা আকলহীন ব্যক্তি—যতক্ষণ না তার আকল ফিরে আসে।”
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নম্বর ৪৪০৩-ইমাম আলবানী রহ. সহিহ আবু দাউদে হাদিসটিকে ‘সহিহ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।]
অতএব যদি কোনও রোগীর মস্তিষ্ক এমনভাবে অচল হয়ে যায় যে, তার চেতনা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত, সে কী করছে বা বলছে তা বুঝতে পারে না এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য করার সক্ষমতা থাকে না তাহলে তার ওপর নামাজ, রোজা ইত্যাদি শরিয়তের বিধান কার্যকর থাকবে না।
(খ) তবে শুধু স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া, কথা বলতে কষ্ট হওয়া, শরীরের কোনও অংশ অবশ হয়ে যাওয়া বা মস্তিষ্কে কিছু সমস্যা দেখা দেওয়ার কারণে নামাজের দায়িত্ব উঠে যাবে না। যতক্ষণ আকল ও চেতনা বিদ্যমান থাকবে ততক্ষণ সাধ্যানুযায়ী ইবাদত করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
«لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا»
“আল্লাহ কোনও ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬]
তিনি আরও বলেন,
«فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ»
“অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।” [সূরা তাগাবুন: ১৬]
❑ ২. মস্তিষ্ক সচল থাকলে প্যারালাইজড রোগীকেও নামাজ আদায় করতে হবে:
রোগীর হাত-পা অচল হলেও যদি তার মস্তিষ্ক সচল থাকে তাহলে তার ওপর নামাজ আদায় করা ফরজ। এক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে সক্ষম না হলে বসে পড়বেন। বসাও সম্ভব না হলে শুয়ে পড়বেন। তারপরও নামাজ পরিত্যাগ করার সুযোগ নাই। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবি ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.)-কে বলেন:
«صَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ»
“দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ো। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে বসে। তাও সম্ভব না হলে কাত হয়ে শুয়ে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ১১১৭]
অতএব প্রয়োজন অনুযায়ী দাঁড়িয়ে, চেয়ারে, খাটে, বিছানায় বা মাটিতে বসে অথবা শুয়ে নামাজ আদায় করবেন। রুকু-সেজদা করা সম্ভব না হলে মাথার ইশারায় রুকু ও সিজদা করবেন। সেজদার ইশারা রুকুর চেয়ে বেশি নিচু করবেন।
❑ ৩. শরীর ও কাপড়ে প্রস্রাব-পায়খানা লেগে থাকলে:
– রোগীর শরীর বা কাপড়ে প্রস্রাব-পায়খানা ইত্যাদি নাপাকি লেগে থাকলে নামাজের আগে যতটুকু সম্ভব তা পরিষ্কার করে দিতে হবে।
– সম্ভব হলে নাপাকি ধুয়ে দিতে হবে।
– নোংরা কাপড় পরিবর্তন করে দিতে হবে।
– এবং রোগীকে অজু করিয়ে দিতে হবে।
– পানি ব্যবহার করলে যদি রোগীর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে অথবা বাস্তবিকভাবে পানি ব্যবহার করা সম্ভব না হয় তাহলে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তায়াম্মুম করাতে হবে।
সম্ভব না হলে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করিয়ে দিতে হবে। রোগী নিজে অজু বা তায়াম্মুম করতে না পারলে পরিবারের কোনও সদস্য বা সেবাকারী তাকে সাহায্য করবেন।
কিন্তু রোগীর অবস্থা যদি এমন হয় যে, বারবার পরিষ্কার করা অত্যন্ত কষ্টকর বা বাস্তবে সম্ভব নয় তাহলে তার সাধ্যের বাইরে কোনও কিছু করতে হবে না। কারণ আল্লাহ বলেন,
«لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا»
“আল্লাহ কোনও ব্যক্তিকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” [সূরা বাকারা: ২৮৬]
❑ ৪. অনবরত প্রস্রাব, পায়খানা বা বায়ু নির্গত হলে:
কিছু রোগীর এমন সমস্যা হয় যে প্রস্রাব, পায়খানা বা বায়ু অনবরত বের হতে থাকে এবং তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ ধরনের ব্যক্তির জন্য ইসলামি ফিকহে বিশেষ বিধান রয়েছে।
ইস্তিহাজাগ্রস্ত বা রক্তপ্রদর রোগে আক্রান্ত এক নারী রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন:
«إِنِّي امْرَأَةٌ أُسْتَحَاضُ فَلَا أَطْهُرُ، أَفَأَدَعُ الصَّلَاةَ؟ فَقَالَ: لَا، إِنَّ ذَلِكِ عِرْقٌ وَلَيْسَ بِالْحَيْضَةِ، فَإِذَا أَقْبَلَتِ الْحَيْضَةُ فَدَعِي الصَّلَاةَ، وَإِذَا أَدْبَرَتْ فَاغْسِلِي عَنْكِ الدَّمَ وَصَلِّي»
“আমি এমন একজন নারী, যার ইস্তিহাজার রক্তস্রাব বন্ধ হয় না। আমি কি নামাজ ছেড়ে দেব?
তিনি বললেন, “না। এটি একটি শিরার রক্ত; হায়েজ নয়। যখন হায়েজ শুরু হবে তখন নামাজ ছেড়ে দেবে আর যখন হায়েজ শেষ হবে তখন রক্ত ধুয়ে নামাজ পড়বে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ২২৮]
এই ধরনের দলিলের ভিত্তিতে ফকিহগণ অনিয়ন্ত্রিত নাপাকির সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য (যেমন: যাদের অনবরত পেশাব ঝরে বা বায়ু নিষ্কাশিত হয়) বিশেষ বিধান আলোচনা করেছেন।
যেমন:
কোনও ব্যক্তির প্রস্রাব, পায়খানা বা বায়ু এমনভাবে অনবরত বের হতে থাকে যে একটি পূর্ণ নামাজের ওয়াক্তের মধ্যে অজু করে ফরজ নামাজ আদায় করার মতো নাপাকিমুক্ত সময়ও পাওয়া না যায় তাহলে তিনি যা করবেন তা হলো:
◈ ক. প্রতি নামাজের ওয়াক্ত শুরু হলে নতুন করে অজু করবে। এরপর সেই ওয়াক্তের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত কারণে প্রস্রাব-পায়খানা বের হলেও তার অজু নষ্ট হবে না। তবে অন্য কোনও কারণে অজু নষ্ট হলে নতুন করে অজু করতে হবে। পরবর্তী নামাজের ওয়াক্ত শুরু হলে আবার নতুন অজু করতে হবে।
এই অবস্থায় এক অজুতে একাধিক ওয়াক্তের নামাজ আদায় করা যাবে না।
◈ খ. আর নাপাক কাপড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নিয়ম হলো,
– যদি তিনি জানেন যে কাপড় পরিবর্তন বা ধৌত করার পরও নামাজ পড়া অবস্থায় আবার কাপড় নাপাক হয়ে যাবে তবে প্রতি ওয়াক্তে কাপড় পরিবর্তন করা বা ধোয়া জরুরি নয়। ওই অবস্থাতেই তিনি নামাজ আদায় করতে পারবেন।
– আর যদি পেশাব এত ঘন ঘন না ঝরে—বরং কিছুটা বিরতি থাকে এবং ধোয়া বা পরিবর্তন করার পর অন্তত এতটুকু সময় পাওয়া যায় যাতে পবিত্র অবস্থায় নামাজ শেষ করা সম্ভব তবে সাধ্যানুসারে কাপড় ধুয়ে নেওয়া বা পরিবর্তন করে নেওয়া উত্তম।
তবে এতে অতিরিক্ত কষ্টকর মনে হলে ওই কাপড় পরেই নামাজ আদায় করা যাবে এবং এতে নামাজ আদায় হয়ে যাবে। কারণ সাধ্যের অতিরিক্ত বিষয়ে দয়াময় আল্লাহ তাআলা ছাড় দিয়েছেন।
❑ ৫. চেতনা কখনো থাকে, কখনো থাকে না—তাহলে কী করণীয়?
যদি রোগীর চেতনা কখনো থাকে, আবার কখনো সম্পূর্ণ চলে যায় তাহলে যে সময় তিনি সুস্থ ও স্বাভাবিক থাকবেন সে সময়ের নামাজ তার ওপর ফরজ হবে। আর যে সময় তার আকল ও চেতনা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকবে সে সময় তার উপর শরিয়তের বিধান প্রযোজ্য হবে না। তাই পরিবারের সদস্যদের উচিত, রোগীর অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখা এবং যখন তিনি সচেতন থাকেন তখন সাধ্যানুযায়ী নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া।
✪✪ রোগীর সেবা করা বিরাট সোয়াবের কাজ:
এমন রোগীর সেবা-শুশ্রূষা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হতে পারে। বারবার শরীর ও কাপড় পরিষ্কার করা, অজু করানো, খাবার দেওয়া, ওষুধ দেওয়া এবং রাত-দিন পাশে থাকা—এসব কাজ ধৈর্যের সঙ্গে করা পরিবারের জন্য অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তাই পরিবারের সদস্যদের উচিত, রোগীকে বোঝা মনে না করে আল্লাহর পক্ষ থেকে অর্পিত আমানত মনে করে তার সেবা করা। তার সেবা-শুশ্রূষা, যত্ন ও প্রয়োজন পূরণ করার মাধ্যমে পরিবারের সদস্যরা ইনশাআল্লাহ আল্লাহর কাছে সওয়াবের অধিকারী হবেন।
❑ সারাংশ:
(ক) প্যারালাইজড (অবশ বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত) হলেও সালাত মাফ নয়। তবে তার জন্য যেভাবে সহজ ও সম্ভব হয় সেভাবে আদায় করতে হবে।
(খ) আকল ও চেতনা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে গেলে সুস্থ ও স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত তার উপর নামাজ, রোজা ইত্যাদি শরিয়তের বিধান বর্তাবে না।
অতএব এ ধরণের রোগীর ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো—
– যদি মস্তিষ্ক সচল থাকে তাহলে সাধ্যানুযায়ী নামাজ পড়বে; অন্যথায় নয়।
– শারীরিক দুর্বলতা বা অক্ষমতার কারণে দাঁড়ানো সম্ভব না হলে বসে, না হলে শুয়ে ইশারায় নামাজ আদায় করতে হবে।
– অনিয়ন্ত্রিত নাপাকির ক্ষেত্রে মাজুর বা অপারগের বিধান প্রযোজ্য হবে। (যার বিবরণ পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে)
আল্লাহ তাআলা অসুস্থ সকল মুসলিমকে শিফায়ে কামিলা ও আজিলা দান করুন এবং তাদের পরিবার-পরিজনকে ধৈর্য ও উত্তম সেবার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

কবিরা গুনাহ বারবার হয়ে যায় তওবাতেও বিলম্ব হয় কীভাবে মুক্তি পাওয়া সম্ভব

 প্রশ্ন: বারবার কবিরা গুনাহ হয়ে গেলে করণীয় কী? আর তওবা করব করব বলে করা হয় না; বিলম্ব হয়ে যায়—এমন অবস্থায় করণীয় কী?

উত্তর: একই গুনাহ তওবা করার পর আবারো ঘটে গেলে প্রতিবারই নতুন করে তওবা করতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে, তওবা কবুল হওয়ার জন্য কিছু মূল শর্ত রয়েছে, যা পূরণ করা আবশ্যক।
❑ তওবার শর্তাবলী:
১. যে গুনাহ থেকে তওবা করা হচ্ছে তা পরিপূর্ণভাবে পরিত্যাগ করা এবং যে কারণে সেই গুনাহে লিপ্ত হতে হয় তা থেকে নিজেকে পুরোপুরি নিবৃত্ত রাখা।
২. অতীতে ঘটে যাওয়া পাপাচারের জন্য অন্তরে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হওয়া।
৩. ভবিষ্যতে সজ্ঞানে ও স্বেচ্ছায় পুনরায় সেই পাপে লিপ্ত না হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দৃঢ় অঙ্গীকার করা।
৪. কোনও মানুষের হক বা অধিকার নষ্ট করা হয়ে থাকলে তা ফেরত দেওয়া বা তার কাছে ক্ষমা চেয়ে সমঝোতা করা। উক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে না পেলে তার নামে সেই সম্পদ বা সমপরিমাণ অর্থ আল্লাহর ওয়াস্তে দান করে দেওয়া।
এই শর্তগুলো পূরণ না করে শুধু মুখে মুখে তওবা করলে তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না।
❑ আবারও পাপকর্ম ঘটে গেলে:
শয়তানের প্ররোচনায় বা কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় এভাবে শর্ত মেনে তওবা করার পরেও যদি আবারো পাপ সংঘটিত হয়ে যায় তবুও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। বরং আবারো লজ্জিত অন্তরে তওবা করতে হবে। কারণ আল্লাহ ছাড়া পাপ ক্ষমা করার আর কেউ নেই।
মূলতঃ তওবা দরজা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত তওবা করার সুযোগ আছে।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ تَابَ قَبْلَ أَنْ تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا تَابَ اللَّهُ عَلَيْهِ
“যে ব্যক্তি সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হওয়ার পূর্বে তওবা করবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন।” [সহিহ মুসলিম: ২৭০৩]
অন্য হাদিসে এসেছে,
إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ تَوْبَةَ العَبْدِ مَا لَمْ يُغَرْغِرْ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা বান্দার তওবা কবুল করেন, যতক্ষণ না তার প্রাণ কণ্ঠাগত হয় (মৃত্যুর গড়গড়া শুরু হয়)।” [সুনান তিরমিজি, সহীহুল জামে: ১৯০৩]
বুখারি ও মুসলিমের অপর বর্ণনায় এ বিষয়টি আরও স্পষ্ট করে হাদিসে কুদসিতে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
«أَذْنَبَ عَبْدٌ ذَنْبًا، فَقَالَ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، فَقَالَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَذْنَبَ عَبْدِي ذَنْبًا، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ، وَيَأْخُذُ بِالذَّنْبِ. ثُمَّ عَادَ فَأَذْنَبَ، فَقَالَ: أَيْ رَبِّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، فَقَالَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: عَبْدِي أَذْنَبَ ذَنْبًا، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ، وَيَأْخُذُ بِالذَّنْبِ. ثُمَّ عَادَ فَأَذْنَبَ فَقَالَ: أَيْ رَبِّ اغْفِرْ لِي ذَنْبِي، فَقَالَ تَبَارَكَ وَتَعَالَى: أَذْنَبَ عَبْدِي ذَنْبًا، فَعَلِمَ أَنَّ لَهُ رَبًّا يَغْفِرُ الذَّنْبَ، وَيَأْخُذُ بِالذَّنْبِ، اعْمَلْ مَا شِئْتَ فَقَدْ غَفَرْتُ لَكَ».
“এক বান্দা গুনাহ করার পর বলল: ‘হে আল্লাহ! আপনি আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন।’ তখন মহান আল্লাহ বলেন: ‘আমার বান্দা গুনাহ করেছে, আবার সে জেনেছে ও বিশ্বাস রেখেছে যে তার একজন রব আছেন যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং গুনাহের কারণে পাকড়াও করেন।’
এরপর সে পুনরায় গুনাহ করে বসল এবং বলল: ‘হে আমার রব! আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন।’ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা বললেন: ‘আমার বান্দা গুনাহ করেছে এবং জেনেছে যে তার একজন রব আছেন যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং গুনাহের জন্য শাস্তিও দেন।’
এরপর সে আবারও গুনাহ করল এবং বলল: ‘হে আমার রব! আপনি আমার গুনাহ ক্ষমা করে দিন।’ আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা বললেন: ‘আমার বান্দা গুনাহ করেছে এবং সে জেনেছে যে তার একজন রব আছেন যিনি গুনাহ ক্ষমা করেন এবং গুনাহের জন্য পাকড়াও করেন। (যেহেতু সে অনুতপ্ত হয়ে বারবার আমার কাছেই ফিরে আসছে) তুমি যা ইচ্ছা আমল করো, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম।'”
[সহীহ বুখারী: ৭৫০৭, সহীহ মুসলিম: ২৭৫৮]
মহান আল্লাহ তওবা কুবলের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন,
إِنَّ اللَّهَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন এবং দান-সদকা গ্রহণ করেন।” [সূরা তাওবাহ: ১০৪]
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেন,
اللَّهُ أَفْرَحُ بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ حِينَ يَتُوبُ إِلَيْهِ مِنْ أَحَدِكُمْ كَانَ عَلَى رَاحِلَتِهِ بِأَرْضِ فَلاَةٍ، فَانْبَلَتَتْ مِنْهُ وَعَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ…”
“তোমাদের কেউ মরুভূমিতে তার সওয়ারি হারিয়ে ফেলার পর (এবং মৃত্যু নিশ্চিত জেনে নিরাশ হয়ে পড়ার পর) তা ফিরে পেলে যতটা আনন্দিত হয়, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার তওবায় তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন—যখন সে তাঁর কাছে তওবা করে।” [সহীহ মুসলিম]
❑ পাপ করার পর তওবায় বিলম্ব করা আরেকটি পাপ:
পাপ সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই তওবা করা আমাদের ওপর ওয়াজিব। ইচ্ছাকৃতভাবে তওবায় বিলম্ব করা আরেকটি স্বতন্ত্র পাপ যার জন্য পৃথকভাবে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা জরুরি।
তওবার ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ না করে অনতিবিলম্বে তওবার কথা বলেছেন:
إِنَّمَا التَّوْبَةُ عَلَى اللَّهِ لِلَّذِينَ يَعْمَلُونَ السُّوءَ بِجَهَالَةٍ ثُمَّ يَتُوبُونَ مِن قَرِيبٍ فَأُولَٰئِكَ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَيْهِمْ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا
“অবশ্যই আল্লাহ তাদের তওবা কবুল করেন যারা অজ্ঞতাবশত মন্দ কাজ করে এবং অনতিবিলম্বে তওবা করে। সুতরাং আল্লাহ এদের তওবা কবুল করেন এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা নিসা: ১৭]
তওবা করার পরে যদি আবারও একই গুনাহের পূণাবৃত্তি ঘটে তাহলে পুনরায় তওবা করতে হবে—তা যতবারই হোক না কেন। কারণ শয়তানের মূল লক্ষ্যই থাকে মানুষকে হতাশ করে তওবার পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।অথচ আল্লাহ বান্দাকে নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন।
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا
“বলুন, হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি (পাপ) করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হইয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেন।” [সূরা যুমার: ৫৩]
মনে রাখতে হবে যে, পাপ যত বড়ই হোক, আল্লাহর রহমতের কাছে তা অত্যন্ত ছোট। দয়াময় আল্লাহ অতিশয় দয়ালু এবং পরম ক্ষমাশীল ।
তাছাড়া আমরা যদি পরে তওবা করব বলে তওবায় বিলম্ব করি বা অলসতা করি তাহলে এমনও হতে পারে যে, তার আগেই মৃত্যু দূত এসে হাজির হবে, হতে পারে স্বাভাবিক মৃত্যু অথবা দুর্ঘটনা কবলিত হয়ে মৃত্যু। তখন পাপের বোঝা কাঁধে নিয়েই হাশরের ময়দানে উঠে দাঁড়াতে হবে। তাই অনতিবিলম্বে তওবা করে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা অপরিহার্য। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
◈ সংক্ষেপে যা করণীয়:
১. গুনাহ হওয়ার সাথে সাথে ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা আবশ্যক। ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা জায়েজ নেই। অন্যথায় এটি স্বতন্ত্র গুনাহ হিসেবে গণ্য হবে যার জন্য আলাদা ইস্তিগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) করা আবশ্যক।
২. যে পরিবেশ বা সঙ্গ মানুষের ভেতরে পাপে জড়ানোর সুযোগ তৈরি করে, তা থেকে পুরোপুরি দূরে থাকা আবশ্যক। পাপ প্রবণ পরিবেশ ছেড়ে যথাসম্ভব দ্রুত এমন স্থানে গিয়ে বসবাস করা উচিত, যেখানে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ ও ভালো মানুষের সান্নিধ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি, যেসব মাধ্যম বা উপকরণের কারণে পাপে লিপ্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়—সেগুলো বাড়ি থেকে সরিয়ে ফেলে কিংবা পুরোপুরি বিনষ্ট করে নিজেকে মুক্ত রাখা জরুরি।
৩. বেশি বেশি নেক আমল কররা। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
– اتَّقِ اللهَ حيثُما كنتَ ، وأتبِعِ السَّيِّئةَ الحسَنةَ تَمْحُهَا ، وخالِقِ النَّاسَ بخُلُقٍ حَسنٍ
“তুমি যেখানেই থাকো আল্লাহকে ভয় করো, মন্দ কাজের পর ভালো কাজ করো যা মন্দকে মুছে দেবে এবং মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করো।” [জামে তিরমিজি: ১৯৮৭, সহিহুত তারগিব ২৬৫৫]
৪. সৎ ও দ্বীনদার মানুষের সাথে ওঠবস রাখুন। আল্লাহর রহমতে তারা আপনাকে পাপাচার থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করবে।
৫. আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখুন। নিরাশ হবেন না। আল্লাহর রহমতের ওপর পূর্ণ আস্থা ও সুধারণা রাখা ইমানের দাবী। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল এবং দয়ালু।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পাপাচার থেকে হেফাজত করুন এবং পাপাচার ঘটে গেলে অনতিবিলম্বে তওবা করে নিজেকে সংশোধন করার এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

বারবার সংঘটিত গুনাহ থেকে তওবার বিধান

 প্রশ্ন: এক বোন জানতে চেয়েছেন: শাইখ, শরিয়তের দৃষ্টিতে এমন এক নারীর বিধান জানতে চাই, যিনি আল্লাহর সাথে ওয়াদা করেছিলেন যে, আর কখনো গুনাহ করবেন না। কিন্তু পরবর্তীতে সেই ওয়াদা ভেঙে তিনি পুনরায় গুনাহে লিপ্ত হন। এরপর তিনি আবারও আল্লাহর কাছে অনুতপ্ত হয়ে তওবা ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এ ধরনের তওবা কি আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, মানুষ যদি তওবা করে তবে তা গ্রহণযোগ্য হবে—চাই সেই গুনাহ বারবারই সংঘটিত হয়ে থাকুক না কেন। মানুষ যদি গুনাহ করার পর তওবা করে, আবার গুনাহে লিপ্ত হয়ে পুনরায় তওবা করে—যখনই সে তার তওবায় সত্যনিষ্ঠ ও একনিষ্ঠ হবে, আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করবেন।
❑ তওবাতুন নাসূহ (একনিষ্ঠ তওবা)-এর শর্ত হলো:
১. অতীতের গুনাহের জন্য অন্তরে অনুশোচনা ও অনুতাপ থাকা।
২. ভবিষ্যতে তা পুনরায় না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
৩. আল্লাহর ভয় ও তাঁর মহত্ত্বের প্রতি সম্মান রেখে সেই গুনাহ সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা।
এভাবে তওবা করলে তা অবশ্যই শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হবে, তা সে পূর্বে যতবারই একই গুনাহ করে তওবা করে থাকুক না কেন। কেননা মানুষ (গুনাহে পতিত হওয়ার) ঝুঁকিপ্রবণ সত্তা—সে হয়তো কোনো গুনাহে জড়িয়ে পড়বে, এরপর তওবা করবে; আবার প্রলোভনে পড়ে গুনাহ করে পুনরায় অনুতপ্ত হয়ে তওবা করবে। যেমন: কেউ হয়তো ব্যভিচারের মতো পাপে জড়িয়ে পড়ার পর আল্লাহর কাছে তওবা করল, কিন্তু পরবর্তীতে আবারও সেই পরীক্ষায় পতিত হয়ে গুনাহ করে ফেলল এবং পুনরায় তওবা করল—সত্যিকার অর্থে তওবা করলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। মদ্যপান, গীবত বা অন্য যেকোনো গুনাহের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
সারকথা হলো, তওবা যদি বারবারও করতে হয় এবং তাতে যদি আন্তরিকতা ও সত্যনিষ্ঠতা থাকে, তবে আল্লাহ তাআলা অবশ্যই তা কবুল করেন। এ বিষয়ে সহীহ হাদিসসমূহ প্রমাণিত রয়েছে এবং পবিত্র কুরআনও এর স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
✪ আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَا الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ
“আর হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” [সূরা নূর: ৩১]
✪ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও ইরশাদ করেন:
أَفَلا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ
“তবুও কি তারা আল্লাহর কাছে তওবা করবে না এবং তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না?” [সূরা মায়েদাহ: ৭৪]
✪ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে একনিষ্ঠ তওবা করো।” [সূরা তাহরীম: ৮]
✪ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে হাদিসে কুদসিতে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার বিষয়ে বলেন:
«إِنَّ اللَّهَ جَلَّ وَعَلَا يَقُولُ لِعَبْدِهِ: إِذَا أَذْنَبَ عَبْدِي ثُمَّ اسْتَغْفَرَنِي غَفَرْتُ ذُنُوبَهُ، ثُمَّ عَادَ فَاسْتَغْفَرَنِي غَفَرْتُ لَهُ»
“আমার বান্দা গুনাহ করার পর যখন আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আমি তাকে ক্ষমা করে দিই। এরপর সে যদি পুনরায় গুনাহে লিপ্ত হয়ে আবার আমার কাছে ক্ষমা চায়, আমি আবারও তাকে ক্ষমা করে দিই।” [সহীহ বুখারী: ৭৫০৭; সহীহ মুসলিম: ২৭৫৮]
সুতরাং তওবায় যদি আন্তরিকতা ও সততা থাকে, তবে তা বারবার হওয়াটা কোনো বাধা নয়।
তবে তওবা নিয়ে প্রতারণা বা ভণ্ডামি করা অত্যন্ত মারাত্মক অপরাধ। যদি মুখে তওবার কথা বলে অন্তরে গুনাহ ত্যাগের সত্যিকারের ইচ্ছা না থাকে, তবে তা এক মহা মুনকার ও মারাত্মক বিপদের কারণ। কিন্তু বান্দা যদি প্রকৃতপক্ষে সত্যনিষ্ঠ হয়—অর্থাৎ আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয়ে গুনাহ ছেড়ে দেয় কিন্তু পরবর্তীতে দুর্বলতার কারণে পুনরায় সেই পাপে জড়িয়ে পড়ার পর আবারও খাঁটি মনে তওবা করে তা বর্জন করে—তবে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা অবশ্যই তার তওবা কবুল করবেন।
উপস্থাপক: শাইখ, আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
ফতোয়া প্রদানে: আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহ.)। (সৌদি আরবের প্রাক্তন প্রধান মুফতি)।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
(দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব)।

ছুটে যাওয়া সালাত কাজা করার সঠিক নিয়ম

 প্রশ্ন: আবু আলি নামের একজন প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন: কারো যদি কাজা সালাত থাকে এবং তার সঠিক সংখ্যা জানা না থাকে, তবে সে যদি প্রতিটি ফরজের সাথে একটি করে কাজা সালাত আদায় করে তাহলে সে কি প্রথমে বর্তমান ওয়াক্তের ফরজটি পড়বে, নাকি কাজা সালাতটি আগে পড়বে?

উত্তর: আপনার ওপর আবশ্যক হলো, সালাত দ্রুত কাজা আদায় করে নেওয়া। বর্তমান ফরজের সাথে একটি করে কাজা মিলিয়ে পড়ার অপেক্ষায় থাকবেন না। বরং দিন-রাত যখনই সুযোগ পান—যেমন: চাশতের সময়, জোহরের সময় বা রাতে—ধারাবাহিকভাবে পড়তে থাকুন, যতক্ষণ না আপনার মন সায় দেয় যে কাজা শেষ হয়েছে। এভাবে দীর্ঘায়িত করা আপনার জন্য জায়েজ নয়।
আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
«مَنْ نَسِيَ صَلَاةً أَوْ نَامَ عَنْهَا فَكَفَّارَتُهَا أَنْ يُصَلِّيَهَا إِذَا ذَكَرَهَا»
“যে ব্যক্তি কোনো সালাত ভুলে যায় অথবা ঘুমিয়ে পড়ার কারণে তা ছুটে যায়, সে যেন তা স্মরণ হওয়া মাত্রই আদায় করে নেয়; এটিই তার একমাত্র কাফফারা।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৭০]
অতএব, প্রবল ধারণার ভিত্তিতে আপনার যত ওয়াক্ত সালাত বাকি আছে মনে হয়—হোক তা পাঁচ ওয়াক্ত, দশ ওয়াক্ত কিংবা বিশ ওয়াক্ত—তা দ্রুত কাজা আদায় করে ফেলুন। বর্তমান সালাতের জন্য অপেক্ষা না করে চাশত, জোহর বা রাতের বেলা ধারাবাহিকভাবে পড়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দায়মুক্ত হোন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
ফতোয়া প্রদানে: আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহ.) (সৌদি আরবের প্রাক্তন প্রধান মুফতি)।
অনুবাদে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

অসুস্থতার কারণে সালাত পরিত্যাগের বিধান এবং এ অবস্থায় তা আদায়ের সঠিক পদ্ধতি

 প্রশ্ন: রিয়াদ-সৌদি আরব থেকে শ্রোতা হাসান বিন হাদি প্রশ্ন করেছেন যে, কিছু রোগী অসুস্থতার সময় ফরজ সালাত আদায় করে না—হয় তা আদায়ের সামর্থ্য না থাকার কারণে অথবা এই আশা রাখার কারণে যে, সুস্থ হওয়ার পর তা কাজা করে নিবে। যে রোগী বিছানা থেকে উঠতে সক্ষম নয়, ওজু ছাড়া এবং বিছানায় শুয়ে যেদিকেই মুখ ফিরে থাকুক না কেন তার সালাত কি সহীহ হবে? অনুগ্রহপূর্বক জানাবেন, আল্লাহ আপনাদের উত্তম প্রতিদান দিন।

উত্তর: রোগীর জন্য সালাত আদায় করা ফরজ। জোহর, আসর, মাগরিব, ইশা ও ফজর—এই পাঁচ ওয়াক্তের ফরজ সালাত আদায় করা রোগীর সাধ্যানুযায়ী তার ওপর অপরিহার্য। এগুলো পরিত্যাগ করা জায়েজ নয়। বরং তাকে তার অবস্থা অনুযায়ী সালাত আদায় করতেই হবে। কেননা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) একজন রোগীকে তার জিজ্ঞাসার জবাবে বলেছিলেন,
صَلِّ قَائِمًا فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ
“তুমি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় কর, যদি সামর্থ্য না থাকে তবে বসে, আর যদি তাও সামর্থ্য না থাকে তবে কাত হয়ে (এক পাশে শুয়ে)।” [সহীহ বুখারি, হাদিস নং ১১১৭, ইমরান ইবনে হুসাইন (রা.) থেকে বর্ণিত]
সুনানে নাসাইর বর্ণনায় এর সাথে অতিরিক্ত এসেছে—
فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَمُسْتَلْقِيًا
“আর যদি তাও সামর্থ্য না থাকে তবে চিত হয়ে (সালাত আদায় করবেন)।”
❑ যদি দাঁড়িয়ে সালাত সালাত আদায় করতে সক্ষম না হয় তবে:
রোগীর জন্য আবশ্যক হলো—তিনি দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করবেন যদি সামর্থ্য থাকে। সামর্থ্য না থাকলে বসে সালাত আদায় করবেন এবং রুকু-সিজদা করবেন।
বসেও যদি সালাত আদায় করতে অক্ষম হন তবে কাত হয়ে (একপাশে শুয়ে) সালাত আদায় করবেন। তখন তিনি কিরাত ও মৌখিক দোয়া ও জিকিরগুলো পড়বেন এবং শারীরিক কাজগুলো নিয়তের মাধ্যমে বা মনে মনে আদায় করবেন—যেমন: মনে মনে রুকুর নিয়ত, সিজদার নিয়ত, রুকু থেকে ওঠার নিয়ত এবং সিজদা থেকে ওঠার নিয়ত করবেন, সাথে শরিয়তসম্মত দোয়া ও জিকিরগুলোও পাঠ করবেন।
❑ আর যদি তিনি (কাত হয়ে শুয়েও) অক্ষম হন তবে:
– চিত হয়ে শুয়ে সালাত আদায় করবেন এবং তাঁর পা দুটি কিবলার দিকে থাকবে। তিনি তাকবির বলবেন ও কিরাত পড়বেন।
– এরপর তাকবির বলে মনে মনে নিয়তের মাধ্যমে রুকু করবেন।
– এরপর রুকু থেকে ওঠার সময় নিয়ত করে বলবেন: “সামি‘আল্লাহু লিমান হামিদাহ্”।
– তারপর তাকবির বলে সিজদার নিয়ত করবেন এবং বলবেন: “সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা, সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা”।
– এরপর তাকবির বলে সিজদা থেকে ওঠার নিয়ত করবেন এবং নিয়তের মাধ্যমেই দুই সিজদার মাঝে বসবেন এবং বলবেন: “রাব্বিগফির লী, রাব্বিগফির লী”।
-এরপর তাকবির বলে দ্বিতীয় সিজদার নিয়ত করবেন।
– এরপর তাকবির বলে দ্বিতীয় সিজদার নিয়ত করবে।
এভাবেই সালাত চালিয়ে যাবেন। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“সুতরাং তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর” [সূরা তাগাবুন: ১৬]।
আর এটিই হলো তার সামর্থ্য অনুযায়ী করণীয়। তাই তার জন্য সালাত পরিত্যাগ করার কোনো সুযোগ নেই।
❑ পানি ব্যবহারে অক্ষম হলে:
যদি তিনি পানি ব্যবহার করতে অক্ষম হন কিংবা তাকে ওজু করিয়ে দেওয়ার মতো কেউ না থাকে তবে তিনি পবিত্র মাটি বা জমিনের ধূলিবালি দিয়ে তায়াম্মুম করবেন এবং মুখমণ্ডল ও দুই হাত মাসাহ করবেন।”
উপস্থাপক: জাযাকাল্লাহু খাইরান ওয়া আহসানা ইলাইকুম (আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং আপনাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
ফতোয়া প্রদানে: আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রাহ.) (সৌদি আরবের প্রাক্তন প্রধান মুফতি)।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
(দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব)।

শিশুদের রুকিয়া করার সহজ ও সঠিক পদ্ধতি

 শিশুদের রুকিয়া (ঝাড়ফুঁক) করার সহজ ও সঠিক পদ্ধতি:

সন্তান আমাদের জীবনের অমূল্য আমানত। তাদের সুস্থতা ও নিরাপত্তার জন্য পার্থিব চেষ্টার পাশাপাশি পরম করুণাময়ের ওপর ভরসা রাখা এবং সুন্নাহসম্মত উপায় অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুদের বিভিন্ন বালা-মুসিবত, বদনজর ও অসুস্থতা থেকে সুরক্ষায় কুরআনের আয়াত ও হাদিসে বর্ণিত দোয়ার মাধ্যমে রুকিয়া বা ঝাড়ফুঁক একটি পরীক্ষিত ও কার্যকর মাধ্যম। তাই এ বিষয়ে আমাদের সঠিক জ্ঞান থাকা উচিত।
নিচে শিশুদের সুরক্ষায় রুকিয়ার শরিয়তসম্মত সহজ ও সঠিক পদ্ধতি ও প্রয়োজনীয় দোয়া (উচ্চারণ ও অর্থ সহ) উপাস্থাপন করা হলো:
❑ প্রতিরক্ষামূলক দোয়া: (ইবরাহিম আ. এর রুকিয়া)
«أُعِيذُكَ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ، مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ، وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍ لَامَّةٍ»
উচ্চারণ: উঈযুকা বিকালিমাতিল্লাহিত তা-ম্মাহ, মিন কুল্লি শাইতানিওঁ ওয়া হা-ম্মাহ, ওয়া মিন কুল্লি আ’ইনিন লা-ম্মাহ।
অর্থ: আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমা দ্বারা তোমাকে আশ্রয় দিচ্ছি সব ধরনের শয়তান, বিষাক্ত জীবজন্তু এবং ক্ষতিকর নজর থেকে।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাসান ও হুসাইন (রা.) এই দোয়া দিয়ে আশ্রয় দিতেন এবং বলতেন: “তোমাদের পিতা (ইবরাহিম) তার দুই সন্তান ইসমাইল ও ইসহাককে এই কালিমা দিয়ে আশ্রয় দিতেন। ” [সহিহ বুখারি]
এই দুয়াটি সকাল-সন্ধ্যা ও ঘুমানোর আগে পড়া যায়। এর জন্য নির্দিষ্ট কোনও সংখ্যা আবশ্যক নয়। শুধু পড়াই যথেষ্ট; ফুঁ দেওয়ারও প্রয়োজন নেই।
❑ রোগ ও নজর থেকে আরোগ্যের দোয়া: (জিরাইল আ. এর রুকিয়া)
«بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللهُ يَشْفِيكَ، بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ»
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি আরক্বীকা, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ’যিকা, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আ’ইনি হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফীকা, বিসমিল্লাহি আরক্বীকা।
অর্থ: “আল্লাহর নামে তোমাকে রুকিয়া করছি সেসব জিনিস থেকে যা তোমাকে কষ্ট দেয় সব অনিষ্টকারী আত্মা বা হিংসুকের নজর থেকে। আল্লাহ তোমাকে সুস্থতা দিন। আল্লাহর নামে তোমাকে রুকিয়া করছি।”
জিবরাইল (আ.) নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে এই দোয়া দিয়ে রুকিয়া করেছিলেন। [সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৬]
এটি রুকিয়ার দোয়া। তাই পড়ার পর সাধারণ রুকিয়ার নিয়মে বাচ্চার শরীরে হালকা ফুঁ দিতে পারেন।
❑ বালা-মসিবত, বদনজর, জাদু-টোনা, জিনের আক্রমণ ইত্যাদি থেকে বাঁচার দোয়া:
«بِسْمِ اللهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ»
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মা’আসমিহি শাইয়ুন ফিল আরদি ওয়া লা ফিস সামা-ই, ওয়া হুওয়াস সামি’উল আ’লীম।
অর্থ: “আল্লাহর নামে, যাঁর নামের বরকতে আসমান ও জমিনের কোনও কিছুই কোনও ক্ষতি করতে পারে না। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (৩ বার পড়বেন)
প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় এটি ৩ বার পড়লে কোনও কিছু ক্ষতি করতে পারে না বলে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন। [সুনানে আবু দাউদ, তিরমিজি; হাসান সহিহ]
শুধু পড়াই যথেষ্ট; ফুঁ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
❑ শরীরে ব্যথা থাকলে:
বাচ্চার ব্যথার জায়গায় হাত রেখে ৩ বার বলুন “বিসমিল্লাহ”। এরপর ৭ বার বলুন:
«أَعُوذُ بِاللهِ وَقُدْرَتِهِ مِنْ شَرِّ مَا أَجِدُ وَأُحَاذِرُ»
উচ্চারণ: আউযু বিল্লাহি ওয়া ক্বুদরাতিহি মিন শাররি মা আজিদু ওয়া উহাযিরু।
অর্থ: “আমি আল্লাহর সত্তা ও তাঁর কুদরতের আশ্রয় চাচ্ছি, যে কষ্ট আমি অনুভব করছি এবং যা আমি ভয় করছি তা থেকে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২০২]
ব্যথার জায়গায় হাত রেখে এই দোয়াটি পাঠ করবেন; ফুঁ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
❑ দোয়ায়ে শিফা বা রোগমুক্তির বিশেষ দোয়া:
«اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَاسَ، اشْفِهِ وَأَنْتَ الشَّافِي، لَا شِفَاءَ إِلَّا شِفَاؤُكَ، شِفَاءً لَا يُغَادِرُ سَقَمًا»
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা রব্বান নাস, আযহিবিল বা’স, ইশফিহি ওয়া আনতাশ শাফি, লা শিফাআ ইল্লা শিফাউকা, শিফাআন লা ইউগাদিরু সাক্বামা।
অর্থ: হে আল্লাহ, মানুষের রব! কষ্ট দূর করুন, একে সুস্থ করে দিন, আপনিই একমাত্র আরোগ্য দানকারী। আপনার আরোগ্য দান ছাড়া অন্য কোনও আরোগ্য নেই। এমন আরোগ্য দিন যা কোনও রোগ অবশিষ্ট রাখে না।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, “নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে ডান হাত দিয়ে মুছে দিতে দিতে এই দোয়া পড়তেন।” [সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৭৪৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৯১]
❑ শিশুদের রুকিয়া করার সঠিক নিয়ম ও প্রয়োগ পদ্ধতি:
✪ ১. প্রথমে একবার সূরা ফাতিহা পড়ুন।
✪ ২. আয়াতুল কুরসি এবং সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত (আমানার রসূলু…) পড়ুন। এগুলো শুধু পড়াই যথেষ্ট; এক্ষেত্রে ফুঁ দেওয়ার কথা হাদিসে আসেনি।
✪ ৩. সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস — প্রতিটি সূরা ৩ বার করে পড়ুন।
অতঃপর শেষে নিচের যেকোনো পদ্ধতিতে রুকিয়া প্রয়োগ করুন:
– ক. নিজের দুই হাতের তালুতে ফুঁ দিন (হালকা বাতাস ও সামান্য থুথুর ছিটাসহ; মুখের গরম বাতাস সহ ফুঁ নয়), এরপর হাত দুটি দিয়ে বাচ্চার মাথা, মুখমণ্ডল ও পুরো শরীরে আলতো করে মুছে দিন। এই নিয়মটি নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রমাণিত সুন্নাহ। তবে এটি নির্দিষ্টভাবে তিন কুলের (ইখলাস, ফালাক, নাস) ক্ষেত্রে বর্ণিত। [সহিহ বুখারি, হাদিস ৫০১৭]
– খ. পড়ার সময় বাচ্চার মাথায় বা বুকের ওপর নিজের ডান হাত রেখে দিন।
– গ. পরিষ্কার পানিতে উপরের সূরা ও দোয়াগুলো পড়ে ফুঁ দিয়ে (মুখের হালকা বাতাস ও সামান্য থুথুর ছিটাসহ; মুখের গরম বাতাস সহ ফুঁ নয়) সেই পানি বাচ্চাকে পান করান এবং শরীরে হালকা মুছে দিন বা প্রয়োজনে গোসল করান।
✪ ৪. প্রতিদিন সকাল-বিকেল দুই বেলা নিয়মিত রুকিয়া চালিয়ে যান, যাতে বাচ্চা সার্বক্ষণিক মহান আল্লাহর সুরক্ষায় থাকে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: সকালে রুকিয়া করার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হলো, ফজরের পর থেকে সূর্য ওঠা পর্যন্ত, আর বিকেলের জন্য আসরের পর থেকে সূর্য ডোবা পর্যন্ত। তবে কোনও কারণে এই নির্দিষ্ট সময়ে করা সম্ভব না হলে, ফজর বা সন্ধ্যার পরেও তা করা যেতে পারে।
✪ ৫. মনে সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখুন যে, একমাত্র আল্লাহই প্রকৃত রক্ষাকারী ও আরোগ্য দানকারী; দোয়া, রুকিয়া বা ঝাড়ফুঁক ইত্যাদি মাধ্যম মাত্র।
❑ কিছু জরুরি কথা:
◈ ১. শুধু অসুস্থতার সময়ই নয় বরং সন্তানকে সুস্থ রাখতে এবং জাদু-টোনা, বদনজর ও জিনের আক্রমণসহ সব ধরনের অদৃশ্য ক্ষতি থেকে নিরাপদ রাখতে নিয়মিত রুকিয়া করা উচিত।
◈ ২. রুকিয়া কেবল পবিত্র কুরআনের আয়াত এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত সহিহ দোয়া দ্বারাই জায়েজ বা শরিয়তসম্মত। এর বাইরে অর্থহীন শব্দ, অপরিচিত নাম বা কুসংস্কারে ভরা মন্ত্র দিয়ে রুকিয়া করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই।
◈ ৩. সন্তানের সুরক্ষার নামে গলায় বা হাতে তাবিজ-কবজ, রিং, বালা, তামা-লোহার সুতা কিংবা সুতা বা কড়ি ঝোলানো সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও হারাম। অনেক সময় না বুঝে অনেকে এগুলোকে রোগবালাই বা বদনজর থেকে বাঁচার উপায় মনে করেন, যা মারাত্মক শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কারণ উপকার বা অপকার করার মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা; কোনও বস্তু, সুতা বা তাবিজ মানুষের কোনও ক্ষতি বা কল্যাণ করতে পারে না। নবিজি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঝুলিয়ে রাখল, তাকে সেটার সাথেই সঁপে দেওয়া হয় (অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ওপর ভরসা করলে আল্লাহ তাকে রক্ষা করেন না)।
তাই কুসংস্কার ও শিরক সকল উপায়-উপকরণ থেকেে দূরে থাকা অপরিহার্য।
◈ ৪. ওঝা, বৈদ্য, কবিরাজ, জ্যোতিষী, গণক, ভবিষ্যৎ বক্তা কিংবা অমুসলিম কোনও তন্ত্র-মন্ত্র বা ঝাড়ফুঁক কারী—যারা শয়তানের সাহায্য নেয় বা অবৈজ্ঞানিক ও শরিয়াবহির্ভূত পন্থায় চিকিৎসা করেন—তাদের কাছে রোগব্যাধির চিকিৎসার জন্য যাওয়া সম্পূর্ণ নাজায়েজ ও নিষিদ্ধ। কারণ এসব পন্থায় শিরক ও কুসংস্কারের সংমিশ্রণ থাকে, যা মানুষের ইমান ও আকিদাকে ধ্বংস করে দেয়। চিকিৎসা নিতে হবে কেবল কুরআন-সুন্নাহসম্মত রুকিয়া, অভিজ্ঞ মুসলিম চিকিৎসক এবং হালাল ও প্রমাণিত উপায় অবলম্বন করে।
◈ ৫. মা-বাবা বা পরিবারের যে কেউ এই দোয়াগুলো শিখে সন্তানের জন্য রুকিয়া করতে পারেন। এর জন্য আলাদা কোনও রাক্বি বা রুকিয়া বিশেষজ্ঞ-এর কাছে যাওয়া জরুরি নয়।
◈ ৬. এই সকল দোয়া মুখস্ত না থাকলে দেখে দেখে পড়াও জায়েজ।
◈ ৭. ইসলামে শরিয়তসম্মত রুকিয়ার পাশাপাশি আধুনিক বা প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি গ্রহণ করায় কোনও দোষ নেই। বরং অসুস্থতার সুচিকিৎসা নেওয়া শরিয়তে সম্পূর্ণ অনুমোদিত এবং এটি তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী নয়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজে যেমন বিভিন্ন অসুস্থতায় চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন, তেমনি তাঁর উম্মতকেও রোগব্যাধির চিকিৎসাসেবা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
হাদিসে এসেছে, “আল্লাহ তাআলা এমন কোনও রোগ সৃষ্টি করেননি যার প্রতিকার বা ওষুধ তিনি রাখেননি।” তাই রুকিয়া বা দোয়া-কালামের পাশাপাশি প্রয়োজনে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং ওষুধ সেবন করা সুন্নাহসম্মত ও বাস্তবসম্মত উপায়।
◈ ৮. সন্তানকে ছোট থেকেই এই বিশ্বাসে বড় করা উচিত যে, বিপদ-আপদ বা রোগ-ব্যাধি থেকে প্রকৃত রক্ষাকারী একমাত্র আল্লাহ তাআলা। দোয়া, রুকিয়া বা চিকিৎসা কেবল বাহ্যিক মাধ্যম মাত্র; প্রকৃত শেফা ও হেফাজত তাঁরই হাতে। তাই জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে সব ধরনের শঙ্কা ও নির্ভরতা ঝেড়ে ফেলে একমাত্র তাঁরই ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখতে হবে। আল্লাহ তওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate