May 02, 2026

আজানের জবাব ও আজানের পরে দুআ এবং আজানের ফাঁকে ফাঁকে দুআর বিধান

 প্রশ্ন: আজান শুনলে কী কী করণীয়? আর আমরা জানি, আজান ও ইকামত এর মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া কবুল হয়। কিন্তু আজানের উত্তর দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে কি আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া চাওয়ার কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে কি? দয়া করে জানাবেন ইনশাআল্লাহ।

উত্তর: আজানের উত্তর দেওয়ার সময় মাঝপথে আলাদাভাবে দোয়া করার বিশেষ কোনো নির্দেশ বা আমল হাদিসে বর্ণিত হয়নি। সুন্নত সম্মত নিয়ম হলো, মুয়াজ্জিনের প্রতিটি বাক্যের উত্তর দেওয়া এবং আজান শেষ হলে প্রথমে দরুদ অতঃপর আজানের বিশেষ দোয়া পাঠ করা। আজান শুনলে যে সকল করণীয় সেগুলো ধারাবাহিকভাবে নিচে উল্লেখ করা হল:
◈ ১. আজানের জবাব:
আজান চলাকালীন মুয়াজ্জিন যা বলেন, শ্রোতার জন্য হুবহু তা-ই বলা সুন্নাত। তবে মুয়াজ্জিন যখন ‘হাইয়া আলাস সালাহ’ ও ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বলেন তখন উত্তরে বলতে হয়:
لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ
[সহিহ বুখারি, ৬১৩; সহিহ মুসলিম, ৩৮৫]
বিশেষ দ্রষ্টব্য: উপরোক্ত হাদিসের আলোকে ফজর নামাজে মুয়াজ্জিন যখন “হাইয়া আ’লাল ফালাহ” বলার পরে বলবে, ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’ তখন তার জবাবে তা-ই বলতে হবে। এক্ষেত্রে “সাদাকতা ওয়া বারাকাকতা বা বারারতা’ বলার হাদিসটি সনদগতভাবে দুর্বল।
◈ ২. আজান শেষে দরুদ পাঠ ও দোয়া:
আজান শেষ হওয়ার পর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর দরুদ পাঠ করতে হয় এবং এরপর আজানের বিশেষ দোয়াটি পড়তে হয়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ ثُمَّ صَلُّوا عَلَيَّ
“যখন তোমরা মুয়াজ্জিনের আজান শুনবে তখন সে যা বলে তোমরাও তা-ই বলো। এরপর আমার ওপর দরুদ পাঠ করো।” [সহিহ মুসলিম, ৩৮৪]
◈ ৩. আজানের বিশেষ দুআ পাঠ এবং তার ফজিলত:
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আজান শোনার পর বলে:
«اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ، وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ، آتِ مُحَمَّدًا الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ، وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُودًا الَّذِي وَعَدْتَهُ؛ حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ»
উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা রববা হা-যিহিদ দাওয়াতিত তা-ম্মাহ, ওয়াস সলা-তিল ক্ব-ইমাহ, আ-তি মুহাম্মাদানিল অসীলাতা ওয়াল ফাদীলাহ, ওয়াবআসহু মাক্ব-মাম মাহমূদানিল্লাযী ওয়াআত্তাহ।
অর্থ: “হে আল্লাহ! এই পরিপূর্ণ আহ্বান ও প্রতিষ্ঠিত সালাতের আপনিই মালিক। মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আপনি ‘অসীলা’ (জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থান) ও মর্যাদা দান করুন এবং তাঁকে সেই ‘মাক্বামে মাহমুদ’ (প্রশংসিত স্থান)-এ পৌঁছে দিন, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাঁকে দিয়েছেন।” কিয়ামতের দিন তার জন্য আমার সুপারিশ অবধারিত হয়ে যাবে।” [সহিহ বুখারি: ৬১৪]
◈ ৪. আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ে দোয়া:
আজানের উত্তর শেষ করার পর থেকে ইকামতের আগ পর্যন্ত সময়টি দোয়া কবুলের বিশেষ সময়। এ সময়ে আপনি আল্লাহর কাছে যা খুশি চাইতে পারেন। হাদিসে এসেছে:
«الدُّعَاءُ لَا يُرَدُّ بَيْنَ الْأَذَانِ وَالْإِقَامَةِ»
“আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।” [সুনানে আবু দাউদ, ৫২১; জামে তিরমিজি, ২১২]
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
“الدعاءُ لا يُرَدُّ بين الأذانِ والإقامةِ . قالوا : فماذا نقولُ يا رسولَ اللهِ ؟ قال : سَلُوا اللهَ العافيةَ في الدنيا والآخرةِ”
“আজান ও ইকামতের মধ্যবর্তী সময়ের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), আমরা তখন কী বলব? তিনি বললেন: তোমরা আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের ‘আফিয়াত’ (নিরাপত্তা) প্রার্থনা করো।” [সুনান তিরমিজি: ৩৫৯৪-হাসান]
মোটকহলো, আজানের উত্তর দেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে দোয়া নয় বরং আজান মনোযোগ দিয়ে শোনা ও আজানের জবাব দেওয়া সুন্নাত। আজান শেষ করে দরুদ ও আজানের দুআ পাঠের পর ইকামতের আগ পর্যন্ত সময়টি দোয়ার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

সালাতে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তোলনের ব্যাপারে সম্মানিত সাহাবি-তাবেয়ি ও ইমামগণের অবস্থান এবং দৃঢ়তা

 সালাতে ‘রফউল ইয়াদাইন’ না করার সপক্ষে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় মুহাদ্দিসগণের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণে সেগুলো ‘জয়িফ’ বা দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত। এমনকি একজন সাহাবি থেকেও এই মর্মে কোনো বিশুদ্ধ বর্ণনা পাওয়া যায় না। এর বিপরীতে, সহিহ বুখারি ও মুসলিমসহ হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে রফউল ইয়াদাইন সম্পর্কে অজস্র সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে—যা মূলত ‘মুতাওয়াতির’ বা অকাট্য পর্যায়ের। অর্থাৎ এত বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী এটি বর্ণনা করেছেন যে, এর সত্যতা নিয়ে ন্যূনতম সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। এ পর্যায়ে সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণের অভিমত এবং এ বিষয়ে তাঁদের সুদৃঢ় অবস্থান সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি তুলে ধরা হলো।

✪ ইবনে কুদামা আল মাকদেসি (রাহ.) বলেন, সালাতে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তোলন সম্পর্কে বলেন,
“وَبِهَذَا قَالَ ابْنُ عُمَرَ، وَابْنُ عَبَّاسٍ، وَجَابِرٌ، وَأَبُو هُرَيْرَةَ، وَابْنُ الزُّبَيْرِ، وَأَنَسٌ، وَالْحَسَنُ وَعَطَاءٌ، وَطَاوُسٌ، وَمُجَاهِدٌ، وَسَالِمٌ، وَسَعِيدُ بْنُ جُبَيْرٍ، وَغَيْرُهُمْ مِنَ التَّابِعِينَ، وَهُوَ مَذْهَبُ ابْنِ الْمُبَارَكِ، وَالشَّافِعِيِّ، وَإِسْحَاقَ، وَمَالِكٍ فِي إِحْدَى الرِّوايتَيْنِ عَنْه وَقَالَ الثَّوْرِيُّ، وَأَبُو حَنِيفَةَ: لَا يَرْفَعُ يَدَيْهِ إِلَّا فِي الِافْتِتَاحِ. وَهُوَ قَوْلُ إِبْرَاهِيمَ النَّخَعِيِّ.
“এবং এই মতই ব্যক্ত করেছেন (সাহাবিদের মধ্যে) ইবনে উমর, ইবনে আব্বাস, জাবির, আবু হুরায়রা, ইবনুয যুবাইর ও আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুম)। আর তাবেয়িদের মধ্যে হাসান (বসরি), আতা, তাউস, মুজাহিদ, সালিম, সাঈদ ইবনে জুবায়ের ও অন্যান্যগণ (রহ.)একই মত দিয়েছেন। আর এটিই হচ্ছে, ইমামদের মধ্যে ইবনুল মুবারক, শাফেয়ি, ইসহাক এবং (ইমাম) মালিকের এক বর্ণনা অনুযায়ী তাঁর মাজহাব।
এর বিপরীতে(সুফিয়ান) সাওরি এবং আবু হানিফা (রহ.) বলেছেন: (সালাত) শুরু করার সময় ছাড়া আর হাত তুলবে না। আর এটিই ইব্রাহিম নাখয়ি (রাহ.)-এর অভিমত।” [আল মুগনি: ১/২৯৫]
তিনি আরও বলেন,
قَالَ الْبُخَارِيُّ: قَالَ عَلِيُّ بْنُ الْمَدِينِيِّ – وَكَانَ أَعْلَمَ أَهْلِ زَمَانِهِ -: حَقٌّ عَلَى الْمُسْلِمِينَ أَنْ يَرْفَعُوا أَيْدِيَهُمْ لِهَذَا الْحَدِيثِ. وَحَدِيثُ أَبِي حُمَيْدٍ، الَّذِي ذَكَرْنَا فِي أَوَّلِ الْبَابِ وَقَدْ رَوَاهُ، فِي عَشَرَةٍ مِنَ الصَّحَابَةِ، مِنْهُمْ أَبُو قَتَادَةَ، فَصَدَّقُوهُ، وَقَالُوا: هَكَذَا كَانَ يُصَلِّي رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
وَرَوَاهُ سِوَى هَذَيْنِ عُمَرُ، وَعَلِيٌّ، وَوَائِلُ بْنُ حُجْرٍ، وَمَالِكُ بْنُ الْحُوَيْرِثِ، وَأَنَسٌ، وَأَبُو هُرَيْرَةَ، وَأَبُو أُسَيْدٍ، وَسَهْلُ بْنُ سَعْدٍ، وَمُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ، وَأَبُو مُوسَى، وَجَابِرُ بْنُ عُمَيْرٍ اللَّيْثِيُّ، فَصَارَ كَالْمُتَوَاتِرِ الَّذِي لَا يَتَطَرَّقُ إِلَيْهِ شَكٌّ مَعَ كَثْرَةِ رُوَاتِهِ، وَصِحَّةِ سَنَدِهِ، وَعَمِلَ بِهِ الصَّحَابَةُ وَالتَّابِعُونَ، وَأَنْكَرُوا عَلَى مَنْ لَمْ يَعْمَلْ بِهِ.
قَالَ الْحَسَنُ: رَأَيْتُ أَصْحَابَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَرْفَعُونَ أَيْدِيَهُمْ إِذَا كَبَّرُوا، وَإِذَا رَكَعُوا، وَإِذَا رَفَعُوا رُءُوسَهُمْ كَأَنَّهَا الْمَرَاوِحُ.
قَالَ أَحْمَدُ، وَقَدْ سُئِلَ عَنِ الرَّفْعِ فَقَالَ: إِي لَعَمْرِي. وَمَنْ يَشُكُّ فِي هَذَا، كَانَ ابْنُ عُمَرَ إِذَا رَأَى مَنْ لَا يَرْفَعُ، حَصَبَهُ وَأَمَرَهُ أَنْ يَرْفَعَ. فَأَمَّا حَدِيثَاهُمْ فَضَعِيفَانِ. فَأَمَّا حَدِيثُ ابْنِ مَسْعُودٍ، فَقَالَ ابْنُ الْمُبَارَكِ: لَمْ يَثْبُتْ.”
✪ “ইমাম বুখারি (রহ.)বলেন, আলি ইবনুল মাদিনি—যিনি তাঁর সময়ের সবচেয়ে বড় আলেম ছিলেন—বলেছেন: “এই হাদিসের ভিত্তিতে মুসলমানদের ওপর কর্তব্য হল, (সালাতে) হাত তোলা (রফউল ইয়াদাইন করা)।”
✪ আর আবু হুমাইদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিসটি, যা আমরা এই অধ্যায়ের শুরুতে উল্লেখ করেছি, দশজন সাহাবির উপস্থিতিতে বর্ণিত হয়েছে—যাদের মধ্যে আবু কাতাদা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)ও ছিলেন। তাঁরা সকলে এটিকে সমর্থন করেছেন এবং বলেছেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এভাবেই সালাত আদায় করতেন।
✪ এই দু জন (ইবনে উমর ও আবু হুমাইদ) ছাড়াও উমর, আলি, ওয়ায়েল ইবনে হুজর, মালিক ইবনুল হুওয়াইরিস, আনাস, আবু হুরায়রা, আবু উসাইদ, সাহল ইবনে সাদ, মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা, আবু মুসা এবং জাবির ইবনে উমাইর আল লাইসি (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এটি বর্ণনা করেছেন। ফলে এটি ‘মুতাওয়াতির’ (অকাট্য ভাবে প্রমাণিত) পর্যায়ের হয়ে গেছে, যার বর্ণনাকারীদের আধিক্য এবং সনদের বিশুদ্ধতার কারণে কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই।
✪ সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়িগণ এর ওপর আমল করতেন এবং যারা আমল করত না তাদের প্রতিবাদ জানাতেন।
✪ হাসান বসরি (রহ.) বলেন: “আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবিদের দেখেছি, তাঁরা তাকবির বলার সময়, রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে মাথা তোলার সময় হাত তুলতেন; যেন তাঁদের হাতগুলো ছিল হাতপাখা। (অর্থাৎ রুকু থেকে ওঠার সময় সাহাবিগণ অত্যন্ত তৎপরতা ও প্রাণচাঞ্চল্যের সাথে হাত তুলতেন। তাঁদের হাতের এই দ্রুত ও সাবলীল ভঙ্গিটি ছিল অনেকটা আগের যুগের হাতপাখার মতো গতিশীল। এটি মূলত নামাজে তাঁদের গভীর আগ্রহ, উদ্যম এবং সুন্নাহ পালনে তাঁদের চপলতা ও একাগ্রতাকেই ফুটিয়ে তোলে।)
✪ ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-কে সালাতে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তলোন সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন: “হ্যাঁ, অবশ্যই! এ ব্যাপারে আবার সন্দেহ পোষণ করে কে!”
✪ প্রখ্যাত সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) যখন সালাতে কাউকে রফউল ইয়াদাইন করতে তথা রুকুতে যাওয়া এবং রুকু হতে মাথা উঠানোর সময় হাত তুলতে দেখতেন না তখন তাকে ছোট পাথর ছুড়ে মারতেন এবং হাত তোলার নির্দেশ দিতেন।
যারা হাত তোলার বিপক্ষে তাদের পেশ কৃত দুটি হাদিসই দুর্বল। বিশেষ করে ইবনে মাসউদ (রা.)-এর হাদিস সম্পর্কে আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেছেন: “এটি প্রমাণিত নয়।” [আল মুগনি: ২/১২৩-১২৪]
ইমাম বায়হাকি এই বিষয়ের আলোচনা সমাপ্ত করেছেন ইমাম আবু বকর ইবনে ইসহাক আল ফকিহ-এর একটি উক্তি দিয়ে তিনি বলেন:
قد صح رفع اليدين عن النبي صلى الله عليه وسلم ثم عن الخلفاء الراشدين ، ثم عن الصحابة والتابعين
“নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে (এই স্থানগুলোতে) হাত তোলা সহিহভাবে প্রমাণিত, অতঃপর খোলাফায়ে রাশেদিন থেকে, এরপর সাহাবি ও তাবেয়িগণের থেকেও তা প্রমাণিত।” [সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি: ২/৭৭]
[আল আওসাত: ৩/২৯৯ ৩০৮, আল মাজমু’: ৩/৩৬৭ ৩৭৬, আল মুগনী: ২/১৭১ ১৭৪]
সারাংশ:
◆ ১. রুকুতে যাওয়া এবং ওঠার সময় হাত তোলা সংক্রান্ত হাদিসগুলো বুখারি ও মুসলিমসহ প্রায় সকল বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। এর বর্ণনাকারী সাহাবির সংখ্যা দশজনেরও বেশি।
◆ ২. হাত না তোলা সংক্রান্ত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর বর্ণনাটি প্রায় সকল মুহাদ্দিসের নিকট জঈফ বা ত্রুটিপূর্ণ। অন্যদিকে হাত তোলার হাদিসগুলো সর্বসম্মতিক্রমে সহিহ।
◆ ৩. অধিকাংশ মুহাদ্দিস ও ফকিহগণের মতে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শেষ আমল পর্যন্ত এই রাফউল ইয়াদাইন বা হাত তোলার বিধান বলবত ছিল। এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পরে সাহাবি ও তাবেয়িগণ আমল করেছেন। সুতরাং তা মনসুখ বা রহিত হওয়ার দাবী গ্রহণযোগ্য নয়।
➧ পরিশেষে বলা যায়, সালাতে রুকুতে যাওয়া এবং রুকু থেকে ওঠার সময় হাত তোলা বা রফউল ইয়াদাইন করা কেবল একটি সাধারণ আমল নয় বরং এটি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসার একটি অনন্য নিদর্শন। বিশুদ্ধ হাদিসসমূহ এবং সালাফে সালেহিনের আমল এই পদ্ধতির সত্যতাকে দিবালোকের মতো স্পষ্ট করে দেয়। তাই আমলটির বিশুদ্ধতা নিয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইমানের পরে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত সালাতকে রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর তরিকায় তথা সহিহ সুন্নাহ মোতাবেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে দাড়ি রাখার গুরুত্ব​ ও বিধান

 ইসলামের দৃষ্টিতে পুরুষদের জন্য দাড়ি রাখা আদর্শিক দৃষ্টিতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ। কিন্তু বিধানগত ভাবে তা ফরজ/ওয়াজিব এবং দাড়ি কাটা, ছাটা এবং মুণ্ডণ করা হারাম। এতে মহান আল্লাহর নাফরমানি এর পাশাপাশি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদেশ অমান্য করা হয় এবং তাঁর নিষেধ লঙ্ঘন করা হয়। তা ছাড়া আল্লাহর রাসুলের আদেশ-নিষেধকে অবমূল্যায়ন করা নি:সন্দেহে তার প্রতি ভালবাসার পরিপন্থী এবং রাসূল প্রেমের নামে কপটতা।

❑ দাড়ি সংক্রান্ত কতিপয় হাদিস:
● আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বলেন,
أَنَّهُ أَمَرَ بِإِحْفَاءِ الشَّوَارِبِ وَإِعْفَاءِ اللِّحْيَةِ. (مسلم ـ الطهارة ـ حديث 53)
“আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোচ কাটার ও দাড়ি লম্বা করার আদেশ করেছেন।” (সহিহ মুসলিম, অধ্যায়: পাক-পবিত্রতা)
● তিনি আরও বলেছেন,
خَالِفُوا المُشْرِكِينَ: وَفِّرُوا اللِّحَى، وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ
“মুশরিকদের বিরোধিতা কর, দাড়ি বাড়াও এবং মোচ কাট।” [আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা.-এর সূত্রে বুখারি ২/৮৭৫]
● অন্য হাদিসে এসেছে,
ﺧﺎﻟﻔﻮﺍ ﺍﻟﻤﺸﺮﻛﻴﻦ، ﻭﺍﺣﻔﻮﺍ ﺍﻟﺸﻮﺍﺭﺏ ﻭﺃﻭﻓﻮﺍ ﺍﻟﻠﺤﻰ
“মুশরিকদের বিরোধিতা কর- দাড়ি পূর্ণ কর এবং মোচ কাট।” [ইবনে ওমর রা.-এর সূত্রে মুসলিম ১/১২৯]
● তিনি আরও বলেন,
أنهِكوا الشوارِبَ، وأعفُوا اللِّحَى
“মোচ উত্তমরূপে কাট এবং দাড়ি ছেড়ে কর।” [ইবনে ওমর রা. থেকে মারফু সূত্রে সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
● হাদিসে আরও এসেছে:
جُزُّوا الشَّوَارِبَ وَأَرْخُوا اللِّحَى، خَالِفُوا الْمَجُوسَ
“তোমরা মোচ কাট ও দাড়ি ঝুলিয়ে দাও- অগ্নি পূজারীদের বিরোধিতা কর।” [আবু হুরায়রা রা.-এর সূত্রে মুসলিম ১/১২৯]
লক্ষণীয়: উপরের হাদিসগুলোতে চারটি শব্দ পাওয়া গেল :
وَفِّرُو- ﺃﻭﻓﻮﺍ – اعفُوا- أَرْخُوا
ইমাম নওবি রহঃ বলেন, “এ সকল শব্দের মর্মার্থ একই। তা হল, যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায় ছেড়ে দেয়া
❑ বিজ্ঞ আলেমদের অভিমত:
✪ ইবনে হাযম রহ. বলেন,
اتفق الفقهاء على أن حَلْق جميع اللحية مُثْلَة ، ٌلا تجوز” (مراتب الإجماع لابن جزم صـ 252)
“ফকিহগণ এ ব্যাপারে একমত যে, পুরো দাড়ি মুণ্ডণ করা ‘মুসলা’ যা নাজায়েজ।” [মারাতিবুল ইজমা, পৃষ্ঠা ২৫২]
✪ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহঃ বলেন,
“يحرمُ حَلْق اللحية” (الفتاوى الكبرى جـ 5 صـ 302)
“দাড়ি মুণ্ডন করা হারাম।” (আল ফাতাওয়া আল কুবরা ৫/৩০২)
✪ হানাফি মাযহাবের প্রখ্যাত আলেম যাইনুল আবেদিন রহঃ বলেন,
“يحرم على الرجل قطع لحيته.” (حاشية ابن عابدين على رد المحتارجـ5 صـ261)
“পুরুষের জন্য দাড়ি কর্তন করা করা হারাম।” [হাশিয়ায়ে আবেদিন আলা রাদ্দিল মুহতার ৫/২৬১
✪ ইবনুল কাইয়েম রহ. বলেন,
شعرُ اللحية فيه منافع: منها: الزينة والوقار والهيبة, ولهذا لا يُرى على الصبيان والنساء من الهيبة والوقار ما يُرى على ذوي اللحى, ومنها التميز بين الرجال والنساء. (التبيان في أقسام القرآن لابن القيم صـ 315)
“দাড়ি রাখার বেশ কিছু উপকারিতা আছে। যেমন: শোভন, ভাবগাম্ভীর্য এবং প্রতিপত্তি। কারণ একজন দাড়ি বিশিষ্ট মানুষের মধ্যে যে ভাবগাম্ভীর্য ও প্রতিপত্তি পরিলক্ষিত হয় নারী ও শিশুদের মধ্যে তা পরিলক্ষিত হয় না। এর আরেকটি উপকারিতা হল, পুরুষ ও নারীর মাঝে পার্থক্য নিরূপণ।” [আত তিবয়ান ফী আকসামিল কুরআন, পৃষ্ঠা ৩১৫]
❑ মুক্তি ও সাফল্যের পথ হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নি:শর্ত অনুসরণ করা এবং তাঁর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বিরত থাকা:
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ, সম্মানিত ও সুন্দরতম মানুষ ছিলেন রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি নিজে দাড়ি রাখতেন। মানব সভ্যতার ইতিহাসে নবীদের পরেই সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ সাহাবায়ে কেরাম। তারাও দাড়ি রাখতেন এবং কাল পরম্পরায় যত বড় বড় ফকিহ, ইমাম, আলেম, মুজতাহিদ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, আল্লাহর ওলি প্রমুখ ছিলেন তারা সকলেই দাড়ি রেখেছেন। তাদের একজনও দাড়ি মুণ্ডণ করেছেন বলে প্রমাণিত হয় নি।
আমরা যদি আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চাই তাহলে আমাদের জন্য আবশ্যক হল, নিঃস্বার্থভাবে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণ করা এবং তার বিরুদ্ধাচরণ থেকে দূরে থাকা।
◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّـهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّـهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّـهَ كَثِيرًا
“যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে।” (সূরা আহযাব ২১)
◈ তিনি আরও বলেন,
قُلْ إِن كُنتُمْ تُحِبُّونَ اللَّـهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّـهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ ۗ وَاللَّـهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“বলুন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমাকে অনুসরণ কর, তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ মোচন করবেন। আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাকারী দয়ালু।” (সূরা আলে ইমরান: ৩১)
◈ তিনি আরও বলেন,
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا ۚ وَاتَّقُوا اللَّـهَ
“রসূল তোমাদেরকে যা দেন, তা গ্রহণ কর এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাক এবং আল্লাহকে ভয় কর।” (সূরা আল হাশর: ৭)
❑ একটি প্রশ্নের উত্তর: অনেকেই বলে থাকে যে, দাড়ি রাখা ফরজ নয় বরং সুন্নত। এ কথা কি সঠিক?
উত্তর:
রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়ি রেখেছেন সে অর্থে এটি সুন্নত বা অনুকরণীয় আদর্শ। কিন্তু তা পালনের বাধ্য-বাধকতার ক্ষেত্রে বিধানগত ভাবে এটি ফরজ/ওয়াজিব। অর্থাৎ কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে তা পরিত্যাগ করলে গুনাহগার হবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন বিষয়ে আদেশ করেন তখন তা বাস্তবায়ন করা উম্মতের জন্য ফরজ হয়ে যায়। অনুরূপভাবে যখন তিনি কোন নিষেধ করেন তখন তা করা উম্মতের জন্য হারাম হয়ে যায় যতক্ষণ না সে বিষয়ে অনুমতি বা ছাড় সূচক ভিন্ন কোনও নির্দেশ থাকে।
তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে দাড়ি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, একাধিক হাদিসে দাড়ি কাটতে নিষেধ করেছেন এবং এর বিপরীতে অন্য কোনও নির্দেশনা তার পক্ষ থেকে পাওয়া যায় নি। সুতরাং এটি অবশ্যই ফরজ। (অবশ্য এক মুষ্টির পরে দাড়ি কাটা যাবে কিনা সে বিষয়টি দ্বিমত পূর্ণ, আমরা এখন সে বিষয়ে আলোচনা করছি না।)
এভাবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম যত আমল করেছেন বা করতে নির্দেশ দিয়েছেন সবই উম্মতের জন্য সুন্নত বা অনুকরণীয় আদর্শ (তার জন্য খাস বিধানগুলো ছাড়া)। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে বিধানগতভাবে কিছু আছে ফরজ বা ওয়াজিব আর কিছু মোস্তাহাব বা নফল। সবগুলোর বিধান এক নয়। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বের দিক দিয়ে তারতম্য আছে।
সুতরাং কথিত ফ্যাশন, স্মার্টনেস প্রমাণ, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলা, স্ত্রীকে খুশি করা, সমাজের কটু কথা ও বাঁকা দৃষ্টি থেকে বাঁচা ইত্যাদি কারণে দাড়ি কাটা, ছাটা বা মুণ্ডন করা নাজায়েজ বা হারাম।
আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান দীন বিমুখ সমাজে দীন নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে সকল ভ্রুকুটি ও ঝড়ঝঞ্জা উপেক্ষা করে দৃঢ়ভাবে দীনের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। অন্যথায় এই সমাজ আমাদেরকে দীন থেকে দূরে সরিয়ে জাহান্নামের ভয়াবহ অগ্নিগর্ভে নিক্ষেপ করবে। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমীন।
▬▬▬▬◢◯◣▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

দাড়ি রাখা ফরজ নয় বরং সুন্নত এ কথা কি সঠিক

 প্রশ্ন: অনেকেই বলে থাকে যে, দাড়ি রাখা ফরজ নয় বরং সুন্নত। এ কথা কি সঠিক?

উত্তর: রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়ি রেখেছেন সে অর্থে এটি সুন্নত বা অনুকরণীয় আদর্শ। কিন্তু তা পালনের বাধ্য-বাধকতার ক্ষেত্রে বিধানগত ভাবে এটি ফরজ/ওয়াজিব। অর্থাৎ কেউ ইচ্ছাকৃত ভাবে তা পরিত্যাগ করলে গুনাহগার হবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন বিষয়ে আদেশ করেন তখন তা বাস্তবায়ন করা উম্মতের জন্য ফরজ হয়ে যায়। অনুরূপভাবে যখন তিনি কোন নিষেধ করেন তখন তা করা উম্মতের জন্য হারাম হয়ে যায় যতক্ষণ না সে বিষয়ে অনুমতি বা ছাড় সূচক ভিন্ন কোনও নির্দেশ থাকে। তাহলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদিসে দাড়ি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন, একাধিক হাদিসে দাড়ি কাটতে নিষেধ করেছেন এবং এর বিপরীতে অন্য কোনও নির্দেশনা তার পক্ষ থেকে পাওয়া যায় নি। সুতরাং এটি অবশ্যই ফরজ। (অবশ্য এক মুষ্টির পরে দাড়ি কাটা যাবে কিনা সে বিষয়টি দ্বিমত পূর্ণ, আমরা এখন সে বিষয়ে আলোচনা করছি না।) এভাবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম যত আমল করেছেন বা করতে নির্দেশ দিয়েছেন সবই উম্মতের জন্য সুন্নত বা অনুকরণীয় আদর্শ (তার জন্য খাস বিধানগুলো ছাড়া)। কিন্তু সেগুলোর মধ্যে বিধানগতভাবে কিছু আছে ফরজ বা ওয়াজিব আর কিছু মোস্তাহাব বা নফল। সবগুলোর বিধান এক নয়। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বের দিক দিয়ে তারতম্য আছে।
সুতরাং কথিত ফ্যাশন, স্মার্টনেস প্রমাণ, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের সাথে তাল মিলিয়ে চলা, স্ত্রীকে খুশি করা, সমাজের কটু কথা ও বাঁকা দৃষ্টি থেকে বাঁচা ইত্যাদি কারণে দাড়ি কাটা, ছাটা বা মুণ্ডন করা নাজায়েজ বা হারাম।
আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বর্তমান দীন বিমুখ সমাজে দীন নিয়ে বেঁচে থাকতে হলে সকল ভ্রুকুটি ও ঝড়ঝঞ্জা উপেক্ষা করে দৃঢ়ভাবে দীনের উপর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। অন্যথায় এই সমাজ আমাদেরকে দীন থেকে দূরে সরিয়ে জাহান্নামের ভয়াবহ অগ্নিগর্ভে নিক্ষেপ করবে। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬◢◯◣▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য এবং দাড়ির যত্নে কতিপয় টিপস

 প্রশ্ন: দাড়িতে তেল মাখা যাবে কি? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি দাড়িতে তেল মাখতেন? গোসলের আগে না কি পরে তেল মাখা সুন্নত?

উত্তর: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নি:সন্দেহে সকল ক্ষেত্রে অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তিনি বলেন,
إنَّ اللهَ جميلٌ يحبُّ الجَمالَ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা সুন্দর এবং তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন।” (মুসলিম ১/৬৫)
ইবনুল কাইয়েম রহঃ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,
يدخل فيه الجمال في كلّ الأشياء بطريق العموم
“ব্যাপকার্থে সব কিছুর সৌন্দর্য এ হাদিসের অন্তর্গত।” (জামা-কাপড়, জুতা-স্যান্ডেল, চুল, দাড়ি, মোচ, বিছানা, ঘর-বাড়ি ইত্যাদি সব কিছু)। তাই তো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরিষ্কার ও পবিত্র পোশাক পরিধান করতেন। পাক-পবিত্রতাকে ঈমানের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে ঘোষণা করেছেন। খুব বেশি দাঁত পরিষ্কার করতেন। সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। দুর্গন্ধকে ঘৃণা করতেন। নখ, মোচ, বগল ও নাভির নিচের লোম পরিষ্কার ইত্যাদির ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি নিজে তেল ব্যবহার করতেন। মাথা আঁচড়াতেন। এবং তেল ব্যবহারের ব্যাপারে তিনি উম্মতকে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। যেমন: হাদিসে এসেছে,
كُلُوا الزَّيْتَ وَادَّهِنُوا بِهِ فَإِنَّهُ مِنْ شَجَرَةٍ مُبَارَكَةٍ
“তোমরা জয়তুনের তেল খাও এবং শরীরে মাখ। কেননা, তা বরকতময় গাছ থেকে আসে নি:সৃত।” (তিরমিযী, আহমদ, ইমাম আলবানী সহীহ বলেছেন)
আর তিনি যেহেতু স্বাস্থ্য সচেতন ও সৌন্দর্য প্রিয় পরিপাটি মানুষ ছিলেন সেহেতু শরীর ও পোশাকের পাশাপাশি দাড়ির যত্ন নিতেন তা সহজেই অনুমেয়। তেল ব্যবহার করতেন তাও হাদিস থেকে স্পষ্ট। (তা গোসলের আগে হোক বা পরে হোক তা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতে পারে। হাদিসে এ ব্যাপারে কোন বক্তব্য পাওয়া যায় না)।
◍◍ দাড়ির পরিচর্যায় কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা:
আমাদের অজানা নয় যে, ইসলামে দাড়ির গুরুত্ব অপরিসীম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাড়ি রেখেছেন সে অর্থে দাড়ি রাখা সুন্নত। কিন্তু তিনি উম্মতকে দাড়ি রাখার নির্দেশ দিয়েছেন সে দিক থেকে দাড়ি রাখা ফরজ এবং দাড়ি কাটতে বা মুণ্ডন করতে নিষেধ করেছেন সে কারণে দাড়ি কাটা, ছাঁটা বা মুণ্ডন করা হারাম। সঙ্গত কারণে দাড়ির প্রতি যত্ন নেয়াও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি তা আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের বহিঃপ্রকাশ তাতে কোনও সন্দেহ নাই। তাই মুসলিম হিসেবে আদর্শ ব্যক্তিত্ব, সুস্থতা ও সৌন্দর্য রক্ষার স্বার্থে দাড়ির প্রতি যত্ন নেয়ার ব্যাপারে আমাদের আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
নিম্নে দাড়ির প্রতি যত্ন নেয়ার ক্ষেত্রে কিছু আধুনিক টিপস প্রদান করা হল:
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ দাড়ির যত্নে কিছু আধুনিক দিক নির্দেশনা দিয়েছেন সেগুলো জেনে নেয়া যাক। তারা বলেছেন, “স্বাস্থ্য বজায় রাখতে চুলের মতো দাড়িরও যত্নের প্রয়োজন। দাড়িতে তেল দিন। পশ্চিমা দেশে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিয়ার্ড অয়েল পাওয়া যায়। যেমন:
◈ ইউক্যালিপটাস তেল:
বাজারে ইউক্যালিপটাস তেল সহজেই কিনতে পারবেন। এই তেল অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি-ফাঙ্গাস। দাড়ি দ্রুত বড় হতেও সাহায্য করে। ছয় চা চামচ অলিভ অয়েলের সঙ্গে ২-৩ ফোঁটা ইউক্যালিপটাস অয়েল ভাল করে মিশিয়ে নিন। তারপর সেটা দাড়িতে হালকা হাতে মাসাজ করে লাগিয়ে রাখুন ৩০ মিনিট। তারপর ঠাণ্ডা জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
◈ নারকেল তেল:
বাড়িতে যদি খাঁটি নারকেল তেল পাওয়া যায়, তার বিকল্প নেই। একটা ছোট বোতলে নারকেল তেল ভর্তি করুন। তাতে ১০ ফোঁটা রোজমেরি অয়েল মিশিয়ে রাখুন। রোজ রাতে শোয়ার সময় দাড়িতে প্রয়োজনমত লাগিয়ে নিন। পরদিন সকালে ধুয়ে ফেলুন।
◈ টি ট্রি অয়েল:
খুব ভাল ময়শ্চারাইজার। গন্ধটাও খুব সুন্দর। দু’ফোঁটা ইউক্যালিপটাস অয়েলের সঙ্গে দু’ফোঁটা টি ট্রি অয়েল মিশিয়ে রাখুন। রোজ স্নানের ১৫ মিনিট আগে ভাল করে দাড়িতে লাগিয়ে রাখুন।
◈ সাইট্রাস অয়েল:
২০ মিলিলিটার আমন্ড অয়েলের সঙ্গে, পাঁচ মিলিলিটার জোজোবা অয়েল মিশিয়ে নিন। তাতে ২-৩ ফোঁটা সাইট্রাস অয়েল ভাল করে মিশিয়ে নিন। দাড়ির জন্য এটাও খুব উপকারী। দিনের যে কোনও সময়ে ২০ মিনিট লাগিয়ে রাখুন। তারপর ঠাণ্ডা জল দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। দাড়ির পাশাপাশি ত্বককেও উজ্জ্বল করে এই তেলগুলো।
দাড়ি পরিষ্কারে শ্যাম্পু ব্যবহার করুন। সপ্তাহে ২-৩বার শ্যাম্পু করুন আপনার দাড়িতে। শুধু তাই না, কন্ডিশনারও দিতে পারেন। দাড়ি ধোয়ার পরে অবশ্যই ভালো করে মুছে নিন। দাড়ি নিয়মিত আঁচড়ে নিতেও ভুলবেন না।
[সূত্র: somoynews.tv]
▬▬▬▬◈◯◈▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

দাড়ি না রেখে মারা গেলে কি জান্নাতে যাওয়া যাবে

 প্রশ্ন: একজন মুসলিম নামাজী কিন্তু দাড়ি না রেখে মারা গেছে এবং টাখনুর উপরে ও প্যান্ট পরিধান করত না। এ ব্যক্তি কি জান্নাতি হতে পারবে?

উত্তর: দাড়ি কাটা, ছাটা বা মুণ্ডন করা, (পুরুষদের জন্য) টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে কাপড় পরিধান করা ইত্যাদি কবিরা গুনাহ। মুসলিম ব্যক্তির জন্য এ সব গুনাহ থেকে তৎক্ষণাৎ তওবা করা ফরজ।
কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি এ সকল কবিরা গুনাহে লিপ্ত থাকা অবস্থায় তওবা না করে মৃত্যু বরণ করে তাহলে সে গুনাহগার অবস্থায় মৃত্যু বরণ করল। আখিরাতে আল্লাহ চাইলে তাকে জাহান্নামে শাস্তি দিতে পারেন আবার দুনিয়ার জীবনে কোন নেক কাজ করার কারণে তাকে ক্ষমাও করতে পারেন। এটি সম্পূর্ণ মহান আল্লাহর ইচ্ছাধীন বিষয়। তবে ক্ষমা পাওয়ার জন্য শর্ত হল, দুনিয়ার জীবনে শিরক থেকে দূরে থাকা।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ اللَّـهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّـهِ فَقَدِ افْتَرَىٰ إِثْمًا عَظِيمًا
“নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক অংশীদার সাব্যস্ত করল আল্লাহর সাথে, সে যেন অপবাদ আরোপ করল।” [সূরা নিসা: ৪৮]
আল্লাহ যদি তার উক্ত গুনাহগুলো ক্ষমা না করেন তাহলে জাহান্নামে শাস্তি হওয়ার পর কালিমা পড়ার কারণে এক পর্যায়ে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (অর্থাৎ শিরক ছাড়া অন্য গুনাহের কারণে সে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে না।) এটিই আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাতের আকিদা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
«مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ صَادِقًا مِنْ قَلْبِهِ، دَخَلَ الْجَنَّةَ»
“যে ব্যক্তি মনে-প্রাণে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া প্রকৃত উপাস্য কেউ নাই) মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর প্রেরিত দূত) এই সাক্ষ্যের উপর অটল থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” [মুসনাদে আহমদ]
সুতরাং কালিমার সাক্ষ্যদানকারী প্রত্যেক মুসলিমের জন্য অনতিবিলম্বে শিরক, কুফরি, বিদআত সহ সকল প্রকার কবিরা (বড়) ও সগিরা (ছোট) গুনাহ থেকে তওবা করা ফরজ। কারণ আমরা কেউ জানি না কখন কার মৃত্যু এসে হাজির হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে মৃত্যুর পূর্বে সকল প্রকার গুনাহ থেকে তওবা করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদি আরব।

সালাতে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তোলনের ব্যাপারে সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত কতিপয় হাদিস

 সালাতের শুরুতে তকবিরে তাহরিমা ছাড়া অন্য কোথাও দু হাত উত্তোলন না করা সংক্রান্ত হাদিসগুলোকে অধিকাংশ মুহাদ্দিস দুর্বল বলেছেন। এর বিপরীতে রুকুতে যাওয়া, রুকুতে ওঠা এবং ১ম বৈঠক শেষে ৩য় রাকাতে উঠার সময় রফউ ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তোলন করা সংক্রান্ত হাদিসগুলো বিশুদ্ধ সনদে ‘মুতাওয়াতির’ পর্যায়ের অর্থাৎ তা এত বেশি সংখ্যক সাহাবি বর্ণনা করেছেন যে তা অকাট্য ভাবে প্রমাণিত-যাতে সন্দেহে কোনও অবকাশ নেই।

❑ সালাতে রফউল ইয়াদাইন বা দু হাত উত্তোলনের ব্যাপারে সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত কয়েকটি বিশুদ্ধ হাদিস:
বিভিন্ন হাদিসের কিতাবে সালাতে বিশুদ্ধ সনদে রফউল ইয়াদাইন সংক্রান্ত অসংখ্য হাদিস বর্ণিত হলেও নিম্নে কেবল হাদিসের জগতে সর্বস্মমতভাবে দুটি বিশুদ্ধতম হাদিস গ্রন্থ তথা সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত কয়েকটি হাদিস পেশ করা হল:
◈ ১. সাহাবি আবু হুমাইদ আস সায়েদি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) এর বর্ণনা:
عَنْ أَبِي حُمَيْدٍ السَّاعِدِيِّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، فِي صِفَةِ صَلَاةِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: “إِذَا كَبَّرَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِيَ بِهِمَا مَنْكِبَيْهِ، وَإِذَا رَكَعَ أَمْكَنَ يَدَيْهِ مِنْ رُكْبَتَيْهِ ثُمَّ هَصَرَ ظَهْرَهُ، فَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ اسْتَوَى حَتَّى يَعُودَ كُلُّ فَقَارٍ مَكَانَهُ.”
“আবু হুমাইদ আস সায়েদি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নামাজের বিবরণে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন: যখন তিনি (রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকবির বলতেন তখন তাঁর দুই হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন। যখন রুকু করতেন তখন দুই হাত দিয়ে দুই হাঁটু শক্ত করে ধরতেন এবং পিঠ সোজা রাখতেন। এরপর যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখন এমনভাবে সোজা হয়ে দাঁড়াতেন যে শরীরের প্রতিটি হাড় ও জোড়া আপন স্থানে ফিরে আসত।” [সহিহ বুখারি: ৮২৮]
◈ ২. সাহবি মালিক ইবনুল হুওয়াইরিস (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বর্ণনা:
عَنْ مَالِكِ بْنِ الْحُوَيْرِثِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ إِذَا كَبَّرَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِيَ بِهِمَا أُذُنَيْهِ، وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِيَ بِهِمَا أُذُنَيْهِ، وَإِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ فَقَالَ: سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، فَعَلَ مِثْلَ ذَلِكَ
“মালিক ইবনুল হুওয়াইরিস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন তাকবির (তাহরিমা) বলতেন তখন উভয় হাত কান বরাবর উঠাতেন। যখন রুকু করতেন তখনও উভয় হাত কান বরাবর উঠাতেন এবং যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন ও ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন তখনও এরূপ (হাত তোলা) করতেন।” [সহিহ মুসলিম: ৩৯১]
◈ ৩. ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) এর বর্ণনা:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا قَامَ فِي الصَّلَاةِ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يَكُونَا حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ، وَكَانَ يَفْعَلُ ذَلِكَ حِينَ يُكَبِّرُ لِلرُّكُوعِ، وَيَفْعَلُ ذَلِكَ إِذَا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوعِ، وَقَالَ: سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، وَلَا يَفْعَلُ ذَلِكَ فِي السُّجُودِ
“আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে দেখেছি, যখন তিনি নামাজে দাঁড়াতেন তখন তাঁর উভয় হাত কাঁধ বরাবর উঠাতেন। যখন তিনি রুকুর জন্য তাকবির বলতেন এবং যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখনও তিনি এরূপ (হাত তোলা) করতেন। রুকু থেকে ওঠার সময় তিনি ‘সামিআল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন। তবে সিজদার সময় তিনি এরূপ করতেন না।” [সহিহ বুখারি: ৭৩৫, সহিহ মুসলিম: ৩৯০]
◈ ৪. সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. কর্তৃক বর্ণিত আরেকটি হাদিস:
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ افْتَتَحَ التَّكْبِيرَ فِي الصَّلَاةِ، فَرَفَعَ يَدَيْهِ حِينَ يُكَبِّرُ حَتَّى يَجْعَلَهُمَا حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ، وَإِذَا كَبَّرَ لِلرُّكُوعِ فَعَلَ مِثْلَهُ، وَإِذَا قَالَ: سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، فَعَلَ مِثْلَهُ
“আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে দেখেছি, তিনি যখন সালাত শুরু করতেন তখন তাকবির বলতেন এবং হাত তুলতেন, এমনকি তা কাঁধ বরাবর করতেন। যখন রুকুর জন্য তাকবির বলতেন তখনও অনুরূপ করতেন এবং যখন ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন তখনও অনুরূপ করতেন।” [সহিহ বুখারি: ৭৩৫, সহিহ মুসলিম: ৩৯০]
◈ ৫. আরেকটি হাদিস:
عَنْ نَافِعٍ، أَنَّ ابْنَ عُمَرَ، كَانَ إِذَا دَخَلَ فِي الصَّلاَةِ كَبَّرَ وَرَفَعَ يَدَيْهِ، وَإِذَا رَكَعَ رَفَعَ يَدَيْهِ، وَإِذَا قَالَ سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ رَفَعَ يَدَيْهِ، وَإِذَا قَامَ مِنَ الرَّكْعَتَيْنِ رَفَعَ يَدَيْهِ، وَرَفَعَ ذَلِكَ ابْنُ عُمَرَ إِلَى نَبِيِّ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.
“নাফি (রাহ.) থেকে বর্ণিত যে, আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) যখন সালাত শুরু করতেন তখন তাকবির বলতেন ও দুই হাত তুলতেন, যখন রুকু করতেন তখন দুই হাত তুলতেন, যখন ‘সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ’ বলতেন তখন দুই হাত তুলতেন এবং যখন দুই রাকাত শেষ করে (তৃতীয় রাকাতের জন্য) দাঁড়াতেন তখনও দুই হাত তুলতেন। আর ইবনে উমর (রা.) এ আমলটিকে আল্লাহর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পর্যন্ত পৌঁছাতেন (অর্থাৎ মারফু হাদিস হিসেবে বর্ণনা করতেন)।” [সহিহ বুখারি: ৭৩৯]
এই হাদিসটি থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, সালাতে চারটি স্থানে হাত তোলা সুন্নাহ:
❶ সালাতের শুরুতে (তাকবিরে তাহরিমা)।
❷ রুকুতে যাওয়ার সময়।
❸ রুকু থেকে ওঠার সময়।
❹ দ্বিতীয় রাকাতের তাশাহহুদ শেষ করে তৃতীয় রাকাতের জন্য দাঁড়ানোর সময়।
এ ছাড়াও বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থে রফউল ইয়াদাইন সম্পর্কে বিপুল পরিমাণ বিশুদ্ধ হাদিস রয়েছে, আল হামদুলিল্লাহ।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate