February 23, 2023

দুআ কবুলের শর্ত

 প্রশ্ন: দুআ কবুলের শর্তগুলো কী কী? কার দুআ কবুল হয় না?

••••••••••••••••••••••
উত্তর: দুআ কবুলের শর্ত তিনটি:
১. খালিস ভাবে একমাত্র আল্লাহর নিকট দুআ করা।
২. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পদ্ধতির আলোকে দুআ করা।
৩. হালাল উপার্জন ও হালাল খাদ্য গ্রহণ করা।

❑ কাদের দুআ কবুল হয় না?
উপরে বর্ণিত শর্তগুলো যার মধ্যে পাওয়া যাবে না তার দুআ আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না। এ ছাড়াও আরও তিনজন ব্যক্তির কথা হাদিসে বিশেষভাবে বর্ণিত হয়েছে যাদের দুআ কবুল করা হবে না। তারা হল: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
” ثلاثة يدعون فلا يستجاب لهم : رجل كانت تحته امرأة سيئة الخلق فلم يطلقها , و رجل كان له على رجل مال فلم يشهد عليه ، و رجل آتى سفيها ماله و قد قال الله: وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ
“তিন ব্যক্তি এমন যে তাদের দুআ কবুল করা হয় না। যথা:
– এক. যে ব্যক্তির অধীনে দুশ্চরিত্রা নারী আছে কিন্তু সে তাকে তালাক দেয় না।
– দুই. যে ব্যক্তি অন্য লোকের কাছে তার পাওনা আছে কিন্তু সে তার সাক্ষী রাখেনি।
– তিন. যে ব্যক্তি নির্বোধ ব্যক্তিকে সম্পদ দিয়ে দেয়। অথচ আল্লাহ বলেন,
وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ
“তোমরা নির্বোধদেরকে তোমাদের সম্পদ দিও না।”
হাদিসটি ইমাম হাকিম তার মুস্তাদরাক কিতাবে উল্লেখ করে তাকে ইমাম বুখারি ও মুসলিমের শর্ত মোতাবেক সহিহ বলেছেন, আর ইমাম যাহাবি তাতে ঐকমত্য প্রকাশ করেছেন। তবে তিনি বলেন, এটি মাউকুফ বা সাহাবির উক্তি। আর ইমাম আলবানি বলেন, হাদিসটি সহিহ-মারফু বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উক্তি। [সিলসিলা সহীহা ৪/৪২০]

◈ হাদিসটির ব্যাখ্যা:

◆ এই হাদিসের অর্থ হল, কেউ যদি নিজের দুশ্চরিত্রা স্ত্রীর বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদুআ করে তাহলে তা গৃহীত হবে না। কারণ তার ক্ষমতা ছিল, তাকে তালাক দেওয়ার কিন্তু সে তা করেনি।
◆ কেউ যদি সাক্ষী এবং প্রমাণ ছাড়া কাউকে ঋণ দেয় এবং সে ঋণগ্রহীতা তা অস্বীকার করে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে ঋণদাতা যদি আল্লাহর কাছে বদদুআ করে তাহলে গৃহীত হবে না। কারণ আল্লাহ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু সে তা পালন করেনি।
◆ অনুরূপভাবে, কেউ যদি নির্বোধের হাতে তার অর্থ-সম্পদ তুলে দেয় ফলে সে তা আত্মসাৎ করে বা নষ্ট করে তাহলে সে ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে বদদুআ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। কারণ আল্লাহ নিজেদের হাতে সম্পদ তুলে দেওয়া বারণ করেছেন।
মোটকথা এই ব্যক্তি আল্লাহর বিধান উপেক্ষা করে নিজের উপরে নিজেই শাস্তি চাপিয়ে নিয়েছে। যার ফলে এই সকল ক্ষেত্রে তার দুআ আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। [ইমাম মুনাবি]
এই হাদিস দ্বারা এটা বোঝায় না যে, তার অন্য কোন দুআ কবুল হবে না। অন্যান্য দু্আ ক্ষেত্রে এই হাদিস প্রয়োগ করা ঠিক নয়।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

সালাত রত অবস্থায় ভয়াবহ ভূমিকম্প শুরু হলে সালাত ভঙ্গ করা এবং মানুষের জীবন রক্ষার জন্য সালাত ভঙ্গ বা কাজা করার বিধান

 প্রশ্ন: ভূমিকম্পের সময় সালাতের বিধান কী? এ সময় সালাত চলমান রাখা জরুরি নাকি সালাত ছেড়ে দেওয়া জায়েজ? অনুরূপভাবে ভয়াবহ বিপদের সময় জানমাল রক্ষা জন্য সালাত পরিত্যাগ করা কি বৈধ? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর: শরিয়ত সম্মত কারণ ব্যতিরেকে সালাত শুরু করার পর তা ভঙ্গ করা জায়েজ নাই। এ ব্যাপারে সকল আলেম একমত। কারণ

✪ আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ

“তোমরা তোমাদের আমলগুলো নষ্ট করো না।” [সূরা মুহাম্মদ: ৩৩]

তবে ভূমিকম্প, ভূমিধ্বস, অগ্নিকাণ্ড, প্রচণ্ড ঝড়, হিংস্রপ্রাণীর আক্রমণ ইত্যাদিতে জানমালের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে ফরজ অথবা নফল যে কোনও সালাত পরিত্যাগ করে জীবন বাঁচানো জায়েজ। এটি শরিয়ত সম্মত বৈধ কারণ। কেননা ইসলামের দৃষ্টিতে জীবনকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করা জায়েজ নাই।

✪ মহান আল্লাহ বলেন,

وَلا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

“তোমারা নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ কর না।” [সূরা বাকরা: ১৯৫]

হাদিসে সালাত রত অবস্থায় যদি সাপ-বিচ্ছুর আগমন ঘটে তাহলে সালাত পরিত্যাগ করে তাকে হত্যা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন:

✪ আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন,

أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِقَتْلِ الأَسْوَدَيْنِ فِي الصَّلاَةِ الْحَيَّةُ وَالْعَقْرَبُ ‏

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতরত অবস্থায়ও সাপ-বিচ্ছু হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছেন।” [সুনান আত তিরমিজী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ২/ সালাত, পরিচ্ছেদ: সালাতে সাপ-বিচ্ছু হত্যা করা]

وجاء في كشاف القناع ويجب إنقاذ غريق ونحوه كحريق فيقطع الصلاة لذلك فرضاً كانت أو نفلاً، وظاهره ولو ضاق وقتها لأنه يمكن تداركها بالقضاء بخلاف الغريق ونحوه

❑ মানুষকে ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষা করতে গিয়ে সালাত ছেড়ে দেওয়া বা সালাত কাজা করার বিধান:

মানুষকে ভয়াবহ বিপদ থেকে রক্ষার জন্য সালাত পরিত্যাগ করা, এমনকি উদ্ধার কাজে নিয়োজিত থাকার কারণে সালাতের সময় অতিবাহিত হয়ে গেলেও সমস্যা নাই। কেননা ইসলামে মানুষের প্রাণ রক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

✪ আল্লাহ তাআলা বলেন,

مَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَآ أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا

“আর যে মানুষের প্রাণ বাঁচালো, সে যেন সকল মানুষকে বাঁচালো।” [সূরা মায়িদাহ: ৩২]

✪ ইসলামের দৃষ্টিতে যদি কেউ খাদ্যাভাবে মারা যাওয়ার আশঙ্কা করে তাহলে তার জন্য বেঁচে থাকার জন্য যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু হারাম খাবারকেও সাময়িকভাবে হালাল করে দেওয়া হয়েছে। [সূরা আনআম: ১৪৫]

◆ ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রাহ. বলেন,
إذَا رَأَى صَبِيَّيْنِ يَقْتَتِلَانِ ، يَتَخَوَّفُ أَنْ يُلْقِيَ أَحَدُهُمَا صَاحِبَهُ فِي الْبِئْرِ ، فَإِنَّهُ يَذْهَبُ
إلَيْهِمَا فَيُخَلِّصُهُمَا ، وَيَعُودُ فِي صَلَاتِهِ .
“(সালাতরত ব্যক্তি) যদি দেখে যে, দু জন শিশু মারামরিতে লিপ্ত হয়েছে এবং এ আশঙ্কা হয় যে, একজন অন্যজনকে কুপে নিক্ষেপ করবে তাহলে (সালাত পরিত্যাগ করে) তাদের নিকটে গিয়ে তাদেরকে রক্ষা করে পূণরায় সালাতে ফিরে আসবে।” [ আল মুগনি ৩/৯৭]

◆ ইমাম শাওকানি বলেন,

لا شك أن إنقاذ الغريق من أهم الواجبات على كل قادر على إنقاذه ، فإذا أخذ في إنقاذه ، فتعلق به حتى خشي على نفسه أن يغرق مثله : فليس عليه في هذه الحالة وجوب ، لا شرعا ، ولا عقلا، فيخلص نفسه منه ، ويدعه، سواء كان قد أشرف على النجاة أم لا، بل ظاهر قوله تعالى: ( وَلا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ ) [البقرة: 195]، أنه يجب عليه تخليص نفسه-(.. السيل الجرار المتدفق على حدائق الأزهار (ص: 892))
“নিঃসন্দেহে ডুবন্ত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব (অবশ্যপালনীয়) এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু উদ্ধার করতে গিয়ে যদি আশঙ্কা থাকে যে, ডুবন্ত ব্যক্তি তাকে জাপটে ধরবে এবং সেও তার মতোই ডুবে মরবে তাহলে এই অবস্থায় তার জন্য এটি ওয়াজিব নয়। শরিয়তের দৃষ্টিকোণ থেকেও নয় বা জ্ঞান-বুদ্ধির বিচারেও নয়। এই অবস্থায় সে তাকে ছেড়ে নিজেকে রক্ষা করবে। চাই তার বাঁচার সম্ভাবনা থাকুক অথবা না থাকুক। বরং মহান আল্লাহর বাণী:

وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ

“আর তোমরা নিজেরকে ধ্বংসের দিকে নিক্ষেপ করো না।” [সূরা বাকরা: ১৯৫]-এর প্রকাশ্য অর্থ এটাই যে, ডুবন্ত ব্যক্তিকে ছেড়ে নিজেকে রক্ষা করা তার জন্য ওয়াজিব।” [আস সাইলুল জাররার,পৃষ্ঠা নং ৮৯২]
আল্লাহু আলাম।

◆ শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. বলেন,

إذا وجد حادثًا، غرقًا أو حرقًا؛ تخشى منه على أولادك أو على المسلمين تقطعها وتساهم في إنقاذ المسلمين أو إنقاذ أهلك، ثم تعود إلى الصلاة تصلي تبدأ فيها من جديد

“যদি কোনও দুর্ঘটনা, ডুবে যাওয়া বা অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে যাতে আপনি আপনার সন্তান-সন্তুতি বা মুসলিমদের ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা করেন তাহলে সালাত ভঙ্গ করে মুসলিমদেরকে বা আপনার পরিবারকে রক্ষার কাজে অংশ গ্রহণ করুন। তারপর আপনি সালাতে ফিরে যান এবং নতুন করে শুরু করুন।” [binbaz]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

কোন বিশিষ্ট জন বা কোন বড় নেতাকে মহান বলা কি জায়েজ

 প্রশ্ন: কোন বিশিষ্ট জন বা কোন বড় নেতাকে ‘মহান’ বলা কি জায়েজ? এতে কি গুনাহ হবে?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: না, শরিয়তের দৃষ্টিতে এতে কোনও সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ। কারণ মহান শব্দের আভিধানিক অর্থ হল,
১. উন্নতমনা, মহত্প্রাণ। যেমন: মহান ব্যক্তি।
২. উন্নত, উচ্চ। যেমন: মহান আদর্শ। [bangladict]
৩. গুরু, কঠিন। যেমন: মহান দায়িত্ব [বানান আন্দোলন]
৪. great, বিশিষ্ট ইত্যাদি।
সুতরাং উন্নতমনা মানুষ বা বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ-যেমন: রাজা-বাদশা, বড় দানশীল, বড় নেতা প্রমুখকে মহান নেতা, মহান বাদশা, মহান ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি বলায় দোষ নেই ইনশাআল্লাহ। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোমের শাসকের উদ্দেশ্যে লিখিত চিঠিতে তাকে ‘মহান’ বলে সম্বোধন করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন,
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ . مِنْ مُحَمَّدٍ عَبْدِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى هِرَقْلَ عَظِيمِ الرُّومِ
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম-পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ এবং আল্লাহর রসুলের পক্ষ থেকে রোমের মহান সম্রাট হিরাক্লিয়াস [Heraclius]-এর প্রতি।” [বুখারি ও মুসলিম]

◈ উল্লেখ্য যে, আল আযীম- الْعَظِيمُ (সুমহান) আল্লাহর অন্যতম একটি সুন্দর ও মহিমান্বিত গুনবাচক নাম। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا يَئُودُهُ حِفْظُهُمَا وَهُوَ الْعَلِيُّ الْعَظِيمُ
“আর সেগুলোকে (আসমান সমূহ ও জমিন) হেফাজত করা তাঁর পক্ষে কঠিন নয়। তিনিই সর্বোচ্চ ও সুমহান।” [সূরা বাকারা: ২৫৫] কুরআনে এ নামটি মোট ৯ বার উল্লেখিত হয়েছে। আর নিশ্চয় তিনি সুমহান। মর্যাদা, অহংকার ও মহত্ত্বের সব বৈশিষ্ট্য তাঁর মধ্যে রয়েছে। তিনি নামে, গুণে ও কর্মে মহৎ-যার কোনও তুলনা নেই। তাই আজিম বা মহান শব্দটি বান্দার ক্ষেত্রে ব্যবহার বৈধ হলেও সৃষ্টি জগতের অন্য কেউ তাঁর অনুরূপ নয়। হতে পারে না। কারণ আল্লাহ তাআলা অনন্য ও অতুলনীয়। আল্লাহ বলেন,
ۚ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ
“কিছুই তাঁর সদৃশ নয়।” [সূরা শুরা: ১১]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

শরিফ শব্দের সঠিক ও ভুল ব্যবহার এবং এ ব্যাপারে বিভ্রান্তি নিরসন

 শরিফ (شريف) শব্দের অর্থ: সম্মানিত, ‌উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন, মর্যাদাবান, সম্ভ্রান্ত, অভিজাত ইত্যাদি। যেমন: আরবি অভিধানে বলা হয়েছে:

شريف: نبيل، عالي المنزلة، سامي المكانة، رفيع الدّرجة [almaany]
সাধারণত আমাদের সমাজের মানুষ মক্কা, মদিনা, কাবা, কুরআন, হাদিস ইত্যাদির প্রতি সম্মান ও সমীহ প্রকাশের উদ্দেশ্যেই এগুলোর সাথে ‘শরিফ’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। যেমন: বলা হয়: মক্কা শরিফ, মদিনা শরিফ, কাবা শরিফ, কুরআন শরিফ, হাদিস শরিফ ইত্যাদি। একে নাজায়েজ বা বিদআত বলার কোন সুযোগ নেই। কেননা মানুষ ইবাদতের নিয়তে বা বিশেষ কোনো সওয়াবের উদ্দেশ্যে এটি ব্যবহার করে না। বরং তা নেহায়েত সম্মান সূচক সম্বোধন মাত্র। তাছাড়া অর্থগতভাবেও এতে কোন সমস্যা নেই। অবশ্যই এসকল বিষয় অত্যন্ত সন্মান ও মর্যাদার অধিকারী।
মনে রাখতে হবে, কোন নামের ক্ষেত্রে বিশেষণ ব্যবহার ততক্ষণ পর্যন্ত নাজায়েজ হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তাতে শরিয়ত বিরোধী বা অতিরঞ্জন মূলক কোন কিছু না পাওয়া যাবে। এটি নিতান্তই দুনিয়াবি বিষয়। যেভাবে মক্কা শব্দের সাথে ‘মুকাররমা’ (সম্মানিত) এবং মদিনা শব্দের সাথে ‘মুনাওয়ারা’ (আলোকিত) বিশেষণদ্বয় ব্যবহারের বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবিদের যুগে প্রচলিত ছিল না। কিন্তু পরবর্তীতে সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশের উদ্দেশ্যে মানুষ এই শব্দগুলো যুক্ত করেছে। (এ বিষয়ে স্বতন্ত্র পোস্টে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি আলহামদুলিল্লাহ)।

যুগে যুগে আলেমদের নামের সাথে ইমাম, শাইখুল ইসলাম, আল্লামা, শাইখ, মাওলানা, হযরত ইত্যাদি শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়। এগুলোর উদ্দেশ্য কেবল সম্মান সূচক সম্বোধন। যদিও আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবিদের নামের সাথে এই ধরনের বিশেষণ ব্যবহারের রীতি প্রচলিত ছিল না।

– তদ্রুপ কুরআনের ক্ষেত্রে শরিফ শব্দের ব্যবহারও নাজায়েজ নয়। কারণ অর্থগতভাবে কোন সমস্যা নেই। কুরআন শরিফ অর্থ, মর্যাদাবান কুরআন। এটি মূলত কুরআন মাজীদ বা কুরআন কারীম-এর সমার্থক বোধক। অর্থাৎ শব্দ ভিন্ন হলেও অর্থ প্রায় এক। ‌তবে নিঃসন্দেহে কুরআনের সাথে মাজিদ (মর্যাদাবান), কারিম (সম্মানিত), হাকিম (প্রজ্ঞার আধার), মুবিন (সুস্পষ্ট) ইত্যাদি কুরআনে ব্যবহৃত আল্লাহর দেওয়া ‌বিশেষণ ব্যবহার করা উত্তম।

– একইভাবে অর্থগত দৃষ্টিকোণ থেকে হাদিস এবং হাদিসের কিতাবাদী তথা বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, নাসাঈ ইত্যাদির সাথে শরিফ শব্দযুক্ত করতে কোন আপত্তি নেই। যেমন: হাদিস শরিফ, বুখারি শরিফ, মুসলিম শরিফ ইত্যাদি। তবে আমাদের সালাফ বা পূর্বসূরীগণ এ সকল ক্ষেত্রে ‘শরিফ’ শব্দটি ব্যবহার করতেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই ব্যবহার না করাই ভালো। কিন্তু কেউ ব্যবহার করলেও তাকে হারাম বা বিদআত বলার সুযোগ নাই। কারণ এটি ইবাদতের বিষয় নয় এবং অর্থগতভাবেও এতে কোন সমস্যা নেই।

– মিলাদ, কিয়াম, মাজার, ওরশ, পীরের খানকা ও দরবার ইত্যাদি শব্দের সাথে শরিফ শব্দের ব্যবহার জায়েজ নয়। কারণ এগুলো বিদআতি কার্যক্রম এবং বিদআত চর্চা কেন্দ্র। আর বিদআত কখনো শরিফ হতে পারে না। পথভ্রষ্ট লোকেরা এই সকল বিদায়াতি কার্যক্রমের আবরণ হিসেবে এবং মানুষের সামনে এগুলোকে মহিমান্বিত করার উদ্দেশ্যে এগুলোতে শরিফ শব্দ ব্যবহার করে থাকে।

– শব্দের অর্থ বিবেচনায়, মানুষের নামের ক্ষেত্রে শরিফ বা শরিফা শব্দের ব্যবহারও আপত্তিজনক নয়। আল্লাহু আলম।

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

মক্কার সাথে মুকাররামা এবং মদিনার সাথে মুনাওয়ারা বিশেষণ ব্যবহারের বিধান

 মক্বা শব্দের সাথে ‘মুকাররমা” (সম্মানিত) আর মদিনা শব্দের সাথে ‘মুনাওয়ারা‌’ (আলোকিত) শব্দের ব্যবহার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সাহাবিদের যুগে পরিচিত ছিল না। পরবর্তীতে মানুষ মুসলিম জাতির সবচেয়ে সম্মান ও আবেগের এই দুই জায়গার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এই শব্দগুলো যুক্ত করেছে। ফলে মক্কা মুকাররামা বা মক্কাতুল মুকাররমা (مكة المكرمة) এবং মদিনা মুনাওয়ারা (المدينة المنورة) নামগুলো সর্বত্র ব্যাপক ভাবে প্রচলিত হয়ে গেছে। কিন্তু যুগ পরম্পরায় আলিমগণ কখনো এই শব্দগুলোর ব্যাপারে শক্ত আপত্তি করেননি বা এগুলোকে বিদআত হিসাবে আখ্যায়িত করেননি।

অবশ্য কোন কোন আলেম বলেছেন, ‘মদিনা মুনাওয়ারা’-এর পরিবর্তে ‘মদিনাতুন‌ নবী’ (مدينة النبي صلى الله عليه وسلم নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর), বা (المدينة النبوية) মদিনাহ নববিয়াহ ব্যবহার করা উত্তম। কারণ মদিনা মুনোয়ারা (আলোকিত শহর)-এর মধ্যে ভ্রান্ত অর্থ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তা হল, বিদআতিরা বিশ্বাস করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূরের সৃষ্টি এবং তার কবর থেকে নূর বা আলো বিচ্ছূরিত হয়ে এই শহরকে আলোকিত করেছে। তবে আমরা বলব, আল্লাহর নবীর কবরের নূর নয় বরং মক্কা এবং মদিনা উভয়টি আল্লাহর নবীর উপরে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ইলমে ওহি তথা ঐশী জ্ঞানের আলোয় আলোকিত শহর। আসমানি জ্ঞানের আলোর বিচ্ছুরণে এই শহরদ্বয় থেকে অজ্ঞতার অমানিশা বিদূরিত হওয়ার পাশাপাশি সেই আলো আলোকিত করেছে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমগ্র পৃথিবীকে।

🔸আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ.-কে প্রশ্ন করা হয় যে, মক্কার বিশেষণ হিসেবে ‘মুকাররামা’ (সম্মানিত) এবং মদিনার বিশেষণ হিসেবে ‘মুনাওয়ারা’ (আলোকিত) শব্দ ব্যবহার কি বিদআতের অন্তর্ভূক্ত? ‘মক্কা মুকাররামা মুহাররামা’ এবং ‘মদিনা নববিয়া’ বলা কি অধিক উত্তম? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

উত্তরে তিনি বলেন,

لا أعلم أن مكة توصف بـ مكة المكرمة في كلام السلف، وإنما يقال: مكة فقط، وكذلك المدينة لا توصف بأنها منورة في كلام السلف وإنما يسمونها المدينة، لكن حدث أخيراً بأن يقال في مكة: المكرمة، ويقال في المدينة: المنورة، ومكة سماها الله سبحانه وتعالى بلداً آمناً، وسماها بلداً محرماً، كما قال سبحانه {إِنَّمَا أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ رَبَّ هَذِهِ الْبَلْدَةِ الَّذِي حَرَّمَهَا} [النمل:٩١]، وكذلك مباركة، وأما المدينة فهي لا شك المدينة النبوية وأنها طيبة كما سماها النبي صلى الله عليه وسلم بـ طيبة، لكن الناس اتخذوها عادة أن يقولوا: المدينة المنورة ومكة المكرمة، وليتهم يقولون: مكة فقط والمدينة فقط؛ لأننا لسنا أشد تعظيماً لهذين البلدين ممن سلفنا
“সালাফদের কথাবার্তায় মক্কা ‘মক্কাতুল মুকাররামা’ নামে পরিচিত ছিল বলে জানা নেই। অনুরূপভাবে সালাফদের কথাবার্তায় মদিনাকে ‘মদিনাতুল মুনাওয়ারা’ নামেও বিশেষিত করা হতো না। তারা শুধু ‘মদিনা’ বলতেন। কিন্তু পরবর্তীতে ‘মক্কা মুকাররামা’ এবং ‘মদিনা মুনাওয়ারা’ বলার বিষয়টি ঘটেছে।
আল্লাহ তাআলা মক্কাকে আল বালাদুল আমিন বা ‘নিরাপদ শহর’ বলে নামকরণ করেছেন। ‘আল বালাদুল হারাম বা ‘সম্মানিত শহর’ বলে নামকরণ করেছেন। যেমন: আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ رَبَّ هَٰذِهِ الْبَلْدَةِ الَّذِي حَرَّمَهَا
“আমি তো কেবল এই নগরীর প্রভুর এবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি, যিনি একে হারাম (সম্মানিত) করেছেন।” [সূরা নামল: ৯১] অনুরূপভাবে তা মুবারাকাহ বা বরকতমণ্ডিত।
আর নিঃসন্দেহে মদিনা হল, ‘মদিনাতুন নববিয়াহ’, এটি ‘তাইয়েবাহ’ (পবিত্র)। যেমন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটিকে ‘তাইয়েবা’ (পবিত্র) বলে নামকরণ করেছেন। কিন্তু মানুষ ‘মদিনা মুনাওয়ারা’ ও‌ ‘মক্কা মুকাররামা’ বলাকে অভ্যাস বানিয়ে নিয়েছে। মানুষ যদি শুধু মক্কা বলতো, শুধু মদিনা বলতো তাহলে কতই না ভালো হতো! কারণ আমরা তো এই দুই শহরকে আমাদের সালাফদের থেকে বেশি সম্মান করি না।” [মাজমু ফাতাওয়া-শাইখ উসাইমিন, ২২/২৪০-প্রশ্ন নাম্বার ৭৫৭]

তিনি অন্যত্র বলেছেন,
لا أعرف أصلاً من الشرع لوصف مكة بالمكرمة، ووصف المدينة بالمنورة، وكلتاهما في الحقيقة مكرمتان معظمتان محرمتان، وكلتاهما منورتان بالوحي مكة بابتدائه، والمدينة بانتهائه، وتلك مكان ولادة النبي – صلى الله عليه وسلم – وابتداء دعوته، وهذه مكان وفاته وكمال رسالته، والله لطيف خبير
“শরিয়তে মক্কাকে ‘মুকাররামা’ বিশেষণ বা মদিনাকে ‘মুনাওয়ারা’ বিশেষণে বিশেষিত কোনো ভিত্তি আছে বলে জানি না। প্রকৃতপক্ষে এ দুটি শহরই সম্মানিত, মর্যাদাবান এবং হারাম।
দুটি শহরই আল্লাহর ওহির মাধ্যমে আলোকিত। মক্কা আলোকিত ওহির সূচনার মাধ্যমে এবং মদিনা আলোকিত ওহির সমাপ্তির মাধ্যমে। মক্কা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মভূমি এবং তার দাওয়াতের সুতিকা গৃহ আর মদিনা তাঁর অন্তিম শয্যা এবং রিসালাতের পূর্ণতার কেন্দ্র ভূমি।” [মাজমু ফাতাওয়া-শাইখ উসাইমিন, ২২/২৪০-প্রশ্ন নাম্বার ৭৫৮]

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

কেমন আছেন বনাম আল্লাহ আপনাকে কেমন রেখেছেন এবং ভালো আছি বনাম আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন বিষয়ে বিভ্রান্তি নিরসন

 বর্তমানে কাউকে কাউকে বলতে শুনা যাচ্ছে যে, “কেমন আছেন/কেমন আছো” বলা যাবে না এবং এর উত্তরে “ভালো আছি” বলা যাবে না। বরং বলতে হবে যে, “আল্লাহ আপনাকে কেমন রেখেছেন?” আর উত্তরে বলতে হবে, “আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন।” “কেমন আছেন” বলা নাকি নাকি আশআরি আকিদা (!), আবার কেউ বলে, এতে নাকি মানুষ আল্লাহর সমকক্ষ হয়ে যায়! কারণ মানুষ নিজে নিজে ভালো থাকে না ইত্যাদি।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ইসলাম সম্পর্কে সঠিক গবেষণা না থাকা কিংবা ইসলাম সম্পর্কে ভুল বুঝের কারণে কিংবা বিজ্ঞ আলেমদের সংস্পর্শ থেকে ইলম অর্জন না কারণে বর্তমানে অনেক মানুষ, এমনকি আমাদের দেশীয় কোনও কোনও আলেম/বক্তাও এ সব নতুন নতুন দর্শনের আবির্ভাব ঘটিয়ে যুগযুগ ধরে চলে আসা বৈধ বিষয়ে মানুষের মাঝে অযথা বিভ্রান্তি তৈরি করছে- যা কোনও কোনভাবেই কাম্য নয়।

যাহোক, আমরা দেখি, মানুষকে “কেমন আছেন/কেমন আছো” বলে প্রশ্ন করা এবং উত্তরে “ভালো আছি” বলার ব্যাপারে শরিয়তের কোনও আপত্তি আছে কি না।

মূলত: “কেমন আছেন/কেমন আছো?” “ভালো আছি” এই সকল বাক্য ব্যবহারে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনও সমস্যা নেই। কেননা হাদিসে এই বাক্যগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিকে প্রশ্ন করেছেন, “কেমন আছেন? কী অবস্থা আপনাদের?” আর সাহাবি উত্তর দিয়েছেন, “ভালো আছি!”

সাহাবিদের মাঝেও এ জাতীয় বাক্য ব্যবহারের প্রচলন ছিল। (তবে “ভালো আছি” বলার পর “আলহামদুলিল্লাহ’ বলা বা আল্লাহর প্রশংসা করা উচিত)

নিম্নে এ বিষয়ে কয়েকটি হাদিস পেশ করা হল:

◆ ১. আয়েশা রা. বলেন,
جاءت عجُوزٌ إلى النبيِّ صلى الله عليه وسلم وهو عندي، فقال: لها رسول الله صلى الله عليه وسلم: ((مَن أنتِ؟))، قالت: أنا جثَّامةُ المُزنيَّة، فقال: ((بل أنت حسَّانةُ المُزنيَّةُ، كيف أنتُم؟ كيف حالُكم؟ كيف كنتُم بعدنا؟))، قالت: بخيرٍ بأبي أنت وأُمِّي يا رسول الله، فلمَّا خرجَتْ قلتُ: يا رسول الله، تُقبِلُ على هذه العجوز هذا الإقبال؟ فقال: ((إنَّها كانت تَأتينا زمن خديجة، وإنَّ حُسن العهد من الإيمان

“একবার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এক বৃদ্ধা আসলেন। তিনি তখন আমার নিকট ছিলেন। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৃদ্ধা মহিলাটিকে বললেন, কে আপনি?
তিনি উত্তরে বললেন, আমি জাসসামা আল মুযানিয়া (মুযানী গোত্রের নির্বোধ বা কুৎসিত মহিলা)। তিনি বললেন, “না, বরং আপনি হলেন, হাসসানা আল মুযানিয়া (মুযানি গোত্রের সুদর্শন নারী)। তো আপনারা কেমন আছেন? আপনাদের কী অবস্থা? আমাদের পরে আপনারা কেমন ছিলেন? বৃদ্ধা মহিলা উত্তরে বললেন, ভালো আছি, হে আল্লাহর রসুল আমার মা-বাবা আপনার উপর কুরবান হোক।
অতঃপর বৃদ্ধা মহিলা বিদায় নিলে আমি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললাম, “হে আল্লাহর রসুল, আপনি এত গুরুত্বের সাথে এ বৃদ্ধার খোঁজ-খবর নিলেন!” (এর কারণ কী?) তিনি বললেন, খদিজা রা.-এর সময় (খাদিজা রা. বেঁচে থাকা অবস্থায়) এ মহিলা আমাদের নিকট আসতেন। আর “অতীত সম্পর্ক ও পুরনো ভালবাসার যত্ন নেওয়া ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।” [মুসতাদরাকে হাকেম, হা/৪০, সিলসিলা সহীহা-১/৪২৪-শাইখ আলবানি]

উল্লেখ্য যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর সাথে তো সুন্দর আচরণ করতেনই, স্ত্রীর পরিবার ও স্বজনদের প্রতিও সুন্দর ও উত্তম আচরণ করতেন। এমনকি তার স্ত্রীর বয়োবৃদ্ধ সঙ্গিনীদের প্রতিও সদয় ও যত্নবান ছিলেন৷ তাদের খোঁজখবর নিতেন৷ প্রয়োজনে সাহায্য করতেন৷ উপরোক্ত হাদিসটি তার একটি উদাহরণ।

◆ ২. অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

عن عبد الله بن عمرو قال: قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم- لرجل: “كيف أصبحت يا فلان؟”. قال: أحمد الله إليك، يا رسول الله. فقال رسول الله -صلى الله عليه وسلم-: “ذلك الذي أردت منك”

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করলেন, হে অমুক, তুমি কীভাবে সকাল করলে? (অর্থাৎ তোমরা রাত কেমন কেটেছে?)
তিনি বললেন, আলহামদু লিল্লাহি ইলাইকা (আমি আপনার নিকট (বা সাথে) আল্লাহর প্রশংসা করছি) হে আল্লাহর রসুল!
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি তোমার এটাই প্রত্যাশা করেছি।” [হায়সামি বলেন, হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ত্ববারানি। এর সনদ হাসান। শাইখ আলাবানি বলেন, হাদিসটি সহিহ। সহিহ-সিলসিলা সহীহা ৬/১০৯৭, হা/২৯৫২]
এখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিকে বলেন নি যে, “আল্লাহ তোমার রাত কেমন কাটিয়েছেন?”

◆ ৩. অন্য একটি হাদিসে এসেছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ: أَنَّهُ سَمِعَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ رَجُلٌ فَرَدَّ السَّلَامَ، ثُمَّ سَأَلَ عُمَرُ الرَّجُلَ: كَيْفَ أَنْتَ؟ فَقَالَ: أَحْمَدُ اللَّهَ إِلَيْكَ، فَقَالَ عُمَرُ: “هَذَا الَّذِي أَرَدْتُ مِنْكَ”.

আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি শুনেছেন যে, এক ব্যক্তি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. কে সালাম দিলে তিনি সালামের উত্তর দেওয়ার পর লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কেমন আছো?”
তিনি বললেন, “আলহামদু লিল্লাহি ইলাইকা।” (আমি আপনার নিকট (বা সাথে) আল্লাহর প্রশংসা করছি)। উমর রা. বললেন, আমি তোমার এমনটাই প্রত্যাশা করেছি।” [শাইখ আলাবানি বলেন, হাদিসটি সহিহ-সিলসিলা সহীহা ৬/১০৯৯, ও সহীহুল আদাবুল মুফরাদ ১/৪৩৭, হা/৮৬৬]
তাছাড়া যুগে যুগে মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুসলিম মনিষী, আরবি কবি, সাহিত্যিক ও সাধারণ মুসলিমগণ এই বাক্যগুলো ব্যবহার করেছেন। এর ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু পূর্ববর্তী কোনও বিজ্ঞ আলেম এগুলোকে হারাম, নাজায়েজ, বিদআত, আশআরি আকিদা ইত্যাদি বলেছেন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

সুতরাং মানুষকে দীন সম্পর্কে নতুন কিছু শেখানোর নামে অথবা সব কিছুর মধ্যে শিরক-বিদআত খোঁজার নামে সম্পূর্ণ বৈধ একটি বিষয়ে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছাড়ানো মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরনের ভ্রান্ত কথাবার্তা এবং দীন সম্পর্কে ভুল বুঝ ও ভুল ব্যাখ্যা থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহু আলম।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ এর মধ্যে লা অক্ষরটি টেনে না পড়লে কি তা সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ প্রকাশ করবে

 প্রশ্ন: ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ এর মধ্যে ‘লা’ অক্ষরটি টেনে না পড়লে কি অর্থ পরিবর্তন হয়ে যাবে? কারণ ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখা যায়, যেখানে বলা হচ্ছে যে, ‘লা’ টেনে না পড়লে তার অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যাবে। তা হল, “অবশ্যই আল্লাহ ছাড়া উপাস্য আছে।” এ কথা কি সঠিক? আর লাম অক্ষরটি কি তিন আলিফ পরিমাণ টেনে পড়তে হবে?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: “লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ” (আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই) হল, বিশ্ব চরাচরের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ বাক্য। এটি সর্বোত্তম জিকির এবং জান্নাতের চাবি। কারণ তা আল্লাহর তাওহিদ বা একত্ববাদের স্বীকৃতি জ্ঞাপক বাক্য। তাই আমাদের উচিত, এটিকে সঠিক নিয়মে নির্ভুলভাবে পাঠ করা এবং এর মর্মার্থ উপলব্ধি করে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।

🔸’লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’-এর প্রথম লামের মধ্যে সামান্য টান (মাদ্দ) সহকারে পড়াটাই বিশুদ্ধ। তবে আরবি ভাষা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার কারণে অথবা তাড়াতাড়ি পড়ার কারণে কেউ যদি তা টান ছাড়া পরে তাহলে তা নিঃসন্দেহে আরবি ব্যাকরণগত ভুল বলে গণ্য হবে। কিন্তু এই ভুলের কারণে তার অর্থের মধ্যে কোনও পরিবর্তন হবে না। কেননা আরবি গ্রামার অনুযায়ী الجملة الإسمية (জুমলাহ ইসমিয়্যাহ)-এর শুরুতে (মুবতাদায়) কখনো লামে তাকিদ (لام تاكيد বা নিশ্চয়তা জ্ঞাপক লাম) আসে না। অতএব আরবি ব্যাকরণের দৃষ্টিতে উপরোক্ত ব্যাখ্যা নিতান্তই অজ্ঞতাপ্রসূত।
মোটকথা, ‘লা ইলা-হা’-এর শুরুতে লাম অক্ষরে সামান্য টান (মাদ্দ) সহকারে পড়তে হবে। এটাই আরবি ভাষার নিয়ম অনুযায়ী সঠিক উচ্চারণ। তবে টান ছাড়া পড়লে উচ্চারণগত ভুল হলেও বাক্যের অর্থ বিকৃত হবে না‌।

সুতরাং যেমনটি বলা হচ্ছে যে, ‘লা’ অক্ষরটি টান ছাড়া পড়লে অর্থ হবে, “অবশ্যই আল্লাহ ছাড়া উপাস্য আছে”-এ কথা সঠিক নয়। কেউ কেউ আরও একধাপ বাড়িয়ে বলে যে, লাম অক্ষর টেনে না পড়লে কাফের হয়ে যাবে! এটা নিতান্তই বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছু নয়।

🔸আর ‘লা’ অক্ষরটি তিন আলিফ টেনে পড়া জরুরি নয়। কেননা তাজবিদের নিয়মাবলী শুধু কুরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; অন্য কোন দুআ, তাসবিহ, জিকির, হাদিস বা সাধারণ আরবি ভাষার ক্ষেত্রে নয়।
আল্লাহু আলম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate