October 26, 2026

নিজেকে ও অন্যকে গালি দেওয়ার বিধান

 নিজেকে ও অন্যকে গালি দেওয়ার বিধান: মুখে না বলে মনে মনে গালি দিলেও কি গুনাহ হবে?

প্রশ্ন: আমি কোনো ভুল করলে নিজেকে তিরস্কার করে “পাগল”, “মূর্খ”, “অপদার্থ” বলে গালি দিই। ইসলামের দৃষ্টিতে এর বিধান কী? আমি কাউকে সামনাসামনি বা মুখের ওপর গালি দেই না। কিন্তু কয়েক মাস আগে আমার একজন বিশ্বস্ত মানুষ আমার আমানতের খেয়ানত করেছে এবং আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তার কথা মনে পড়লে আমার প্রচণ্ড রাগ হয় এবং আমি তাকে মনে মনে গালি দিই। এটা কি আমার জন্য বৈধ হবে?
উত্তর: নিম্নে সংক্ষেপে আপনার দুটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
▪️১. নিজেকে গালি দেওয়া:
নিজেকে “মূর্খ”, “পাগল” বা “অপদার্থ” বলা ইসলামি শিষ্টাচারের পরিপন্থী, তাই এটি বর্জন করা জরুরি। আল্লাহ তাআলা মানুষকে সম্মানিত করেছেন এবং সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। নিজের প্রতি কটু ভাষা ব্যবহার করলে এই মর্যাদার প্রতি অবহেলা প্রকাশ পায়। নবী করিম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিজের সম্পর্কেও অশোভন শব্দ বলতে নিষেধ করেছেন:
«لَا يَقُولَنَّ أَحَدُكُمْ: خَبُثَتْ نَفْسِي، وَلَكِنْ لِيَقُلْ: لَقِسَتْ نَفْسِي»
“তোমাদের কেউ যেন না বলে, ‘আমার আত্মা খবিস (নিকৃষ্ট) হয়ে গেছে’; বরং সে বলুক, ‘আমার মন বিষণ্ন হয়ে গেছে’।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৫০]
ভুল হয়ে গেলে নিজেকে তিরস্কার না করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, তারপর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যান।
চাইলে নিচের এই কথাটি বলতে পারেন, যা সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে:
«قَدَرُ اللَّهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ»
“আল্লাহর নির্ধারণই হয়েছে, আর তিনি যা চেয়েছেন তা-ই করেছেন।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬৬৪]
এটি নিজের সম্পর্কে করা একধরনের নেতিবাচক ভাবনা, যা মানুষের আত্মবিশ্বাস ও মনের ভেতরের শক্তি কমিয়ে দেয়।
▪️২. অন্যকে মনে মনে গালি দেওয়া:
কোনো মুসলিমকে গালি দেওয়া গর্হিত কাজ। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
«سِبَابُ الْمُسْلِمِ فُسُوقٌ، وَقِتَالُهُ كُفْرٌ»
“মুসলিমকে গালি দেওয়া ফিসক (গুনাহ) আর তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরি।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৬৪]
তবে এখানে গালি বলতে মুখে উচ্চারিত গালিই বোঝানো হয়েছে। যে কথা কেবল মনের ভেতরে আসে তার বিষয়ে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতকে ছাড় দিয়েছেন:
«إِنَّ اللَّهَ تَجَاوَزَ لِأُمَّتِي عَمَّا وَسْوَسَتْ أَوْ حَدَّثَتْ بِهِ أَنْفُسَهَا، مَا لَمْ تَعْمَلْ بِهِ أَوْ تَتَكَلَّمْ»
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের মনে আসা ওয়াসওয়াসা ও মনের কথা ক্ষমা করে দিয়েছেন যতক্ষণ না তারা তা কাজে পরিণত করে অথবা মুখে উচ্চারণ করে।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১২৭]
সুতরাং বিশ্বাসঘাতকের কথা মনে পড়লে অনিচ্ছায় যে রাগ বা কটু চিন্তা আসে তার জন্য গুনাহ লেখা হবে না যতক্ষণ তা মুখে বা কাজে প্রকাশ না পায়। আপনার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে। তাই এই ক্ষোভ স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতি।
আল্লাহ তাআলা মজলুমকে অন্যায়ের কথা বলার অনুমতিও দিয়েছেন:
﴿لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنَ الْقَوْلِ إِلَّا مَنْ ظُلِمَ﴾
“আল্লাহ মন্দ কথার প্রকাশ্য উচ্চারণ পছন্দ করেন না তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে (সে ছাড়া)।” [সুরা নিসা: ১৪৮]
এর অর্থ হলো, আপনি আইনি ও শরিয়তসম্মত পথে নিজের অধিকার আদায় করতে পারেন আর আল্লাহর কাছে বিচারও চাইতে পারেন। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার মনে মনে গালি দেওয়াকে অভ্যাসে পরিণত করা ঠিক নয়। এতে অন্তরে ঘৃণা ও অস্থিরতা জমে থাকে আর কখনো অসতর্কভাবে মুখেও বেরিয়ে যেতে পারে।
রাগের মুহূর্তে বিষয়টি আল্লাহর ওপর সঁপে দিয়ে বলুন:
﴿حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ﴾
“আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, আর তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।” [সুরা আলে ইমরান: ১৭৩]
সম্ভব হলে ক্ষমা করে দেওয়া সর্বোত্তম এবং এর প্রতিদান আল্লাহর কাছে আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
﴿فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ﴾
“অতএব যে ক্ষমা করে দেয় ও সংশোধন করে তার প্রতিদান আল্লাহর কাছে।” [সুরা শুরা: ৪০]
নিজেকে গালি দেওয়া পরিহার করা উচিত। অন্যকে মুখে গালি দেওয়া নাজায়েজ। মনের ভেতরে অনিচ্ছাকৃতভাবে আসা কথার জন্য পাকড়াও হবে না, তবে তা অভ্যাসে পরিণত না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করা ও সম্ভব হলে ক্ষমা করাই উত্তম। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

খাবারে মসলা হিসেবে জায়ফল বা জয়ত্রী ব্যবহারের শরয়ি বিধান

 খাবারে মসলা হিসেবে জায়ফল বা জয়ত্রী ব্যবহারের বিধান নিয়ে ফকিহ ও আলেমদের মধ্যে দুটি মত রয়েছে। একদল আলেমের মতে স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধির জন্য সামান্য পরিমাণ ব্যবহার জায়েজ। অন্য একদল আলেমের মতে তা জায়েজ নয়। মূল বিতর্কটি গড়ে উঠেছে এই হাদিসের প্রয়োগক্ষেত্র নিয়ে, যা বেশি খেলে নেশা হয় তার অল্প পরিমাণও হারাম কি না।

উল্লেখ্য, জয়ত্রী জায়ফল গাছেরই ফলের বীজাবরণ। নেশা বা অবশতার ইল্লতও উভয়ের ক্ষেত্রে একই। তাই এখানে আলোচিত বিধান জায়ফল বা জয়ত্রী দুটির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
🔹১. জায়েজ বলার পক্ষের মত:
যাঁরা স্বাদ ও সুগন্ধ বৃদ্ধির জন্য সামান্য জায়ফল বা জয়ত্রী ব্যবহার জায়েজ বলেছেন, তাঁদের যুক্তি হলো:
এটি মূলত কোনো নাপাক বস্তু নয়। তবে অতিমাত্রায় গ্রহণ করলে শরীরে অবসাদ বা হালকা মাদকতা তৈরি হতে পারে। তাই যতটুকু খেলে নেশা বা তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব তৈরি হয় ততটুকু বা তার চেয়ে বেশি খাওয়া হারাম।
সাধারণ রান্নায় যে সামান্য পরিমাণ ব্যবহার করা হয় তাতে শরিয়তের কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
▪️ সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (লাজনা দাইমাহ):
إِذَا كَانَ اسْتِعْمَالُ جَوْزَةِ الطِّيبِ فِي الطَّعَامِ بِكَمِّيَّةٍ قَلِيلَةٍ لَا تُؤَدِّي إِلَى السُّكْرِ أَوْ الْفُتُورِ؛ فَلَا حَرَجَ فِي ذَلِكَ، أَمَّا إِذَا كَانَتْ تُؤَدِّي إِلَى السُّكْرِ أَوْ الْفُتُورِ؛ فَلَا يَجُوزُ اسْتِعْمَالُهَا.
“খাবারে যদি অত্যন্ত কম পরিমাণে জায়ফল ব্যবহার করা হয়, যা কোনো নেশা বা নিস্তেজ ভাব তৈরি করে না তবে তাতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু যদি তা নেশা বা নিস্তেজতার দিকে নিয়ে যায় তবে তার ব্যবহার জায়েজ হবে না।” [ফতোয়া নম্বর: ২৩৫৩৮]
▪️ ইসলামিক অর্গানাইজেশন ফর মেডিকেল সায়েন্সেস (কুয়েত):
অষ্টম ফিকহি-চিকিৎসা সেমিনারের (২২–২৪ জিলহজ ১৪১৫ হি./২২–২৪ মে ১৯৯৫ খ্রি.) সুপারিশে বলা হয়:
وَلَا حَرَجَ فِي اسْتِعْمَالِ جَوْزَةِ الطِّيبِ وَنَحْوِهَا فِي إِصْلَاحِ نَكْهَةِ الطَّعَامِ بِمَقَادِيرَ قَلِيلَةٍ لَا تُؤَدِّي إِلَى التَّفْتِيرِ أَوِ التَّخْدِيرِ.
“খাবারের স্বাদ ও ঘ্রাণ ঠিক করার জন্য জায়ফল ও এর অনুরূপ বস্তু স্বল্প পরিমাণে ব্যবহারে কোনো বাধা নেই, যতক্ষণ তা অবশতা বা নেশার দিকে না নিয়ে যায়।”
🔹 ২. হারাম বলার পক্ষের মত:
যে আলেমগণ নাজায়েজ বলেছেন, তাঁরা এই হাদিস দিয়ে দলিল দেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَا أَسْكَرَ كَثِيرُهُ فَقَلِيلُهُ حَرَامٌ
“যা অধিক পরিমাণে সেবন করলে নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।”
হাদিসটি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। [সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৮৬৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬৮১; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ৩৩৯৩; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১৪৭০৩, হাদিসটি সহিহ-শাইখ আলবানি] এই হাদিসের মূলনীতির আলোকে জায়ফল বা জয়ত্রীতে যেহেতু মাদকতা সৃষ্টির উপাদান রয়েছে তাই সামান্য পরিমাণে হলেও তা ব্যবহার জায়েজ নয়।
এই মতের পক্ষে যাঁরা আছেন:
▪️ ইমাম ইবনে হাজার আল-হাইতামি (রাহিমাহুল্লাহ): তিনি শাফেয়ি ও মালেকি আলেমদের মধ্যে ইবনে দাকিকিল ঈদের (রাহ.) মত উদ্ধৃত করেন যে জায়ফল “মুসকির” বা নেশা সৃষ্টিকারী।
তিনি আরও বলেন, মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলিরা এটিকে মুসকির হিসেবে একমত। (হাম্বলিদের পক্ষে তিনি ইবনে তাইমিয়ার নাম উল্লেখ করেছেন।)
সবশেষে তিনি লেখেন:
تَعْلَمُ أَنَّهُ لَا مِرْيَةَ فِي تَحْرِيمِ الْجَوْزَةِ لِإِسْكَارِهَا أَوْ تَخْدِيرِهَا
“তুমি জানতে পারবে যে, জায়ফল হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ তা নেশা বা অবশতা সৃষ্টি করে।” [আল-ফাতাওয়া আল-ফিকহিয়্যা আল-কুবরা; ইসলামওয়েব ফতোয়া নং ১৬৪৪০-এ উদ্ধৃত]
▪️ ইসলামওয়েব ফতোয়া কেন্দ্র:
فَإِنَّهَا حَرَامٌ عَلَى الرَّاجِحِ مِنْ أَقْوَالِ أَهْلِ الْعِلْمِ؛ لِأَنَّهَا مُسْكِرَةٌ وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ
“আলেমদের মতগুলোর মধ্যে অগ্রগণ্য মত অনুযায়ী এটি হারাম। কারণ এটি নেশা সৃষ্টি করে আর প্রতিটি নেশাদ্রব্য হারাম।” [ইসলামওয়েব, ফতোয়া নং ৫০৮০৭]
▪️ ইসলাম প্রশ্নোত্তর (islamqa.info):
وَالْأَحْوَطُ: هُوَ الْقَوْلُ بِمَنْعِهَا وَلَوْ كَانَتْ مَخْلُوطَةً مَعَ غَيْرِهَا وَبِنِسْبَةٍ قَلِيلَةٍ
“অধিক সতর্কতামূলক মত হলো, অন্য উপাদানের সঙ্গে মিশ্রিত ও সামান্য অনুপাতে হলেও তা বর্জন করা।” [ফতোয়া নম্বর: ৩৯৪০৮]
🔸 ৩. উভয় পক্ষের যুক্তি:
▪️ স্বল্প পরিমাণ জায়েজ মনে করা আলেমদের যুক্তি:
উক্ত হাদিসের মূলনীতিটি মূলত সেসব বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেগুলোর মৌলিক প্রকৃতিই নেশাদ্রব্য (যেমন মদ)। এসব ক্ষেত্রে অল্প সেবন করলেও বস্তুটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নেশাদ্রব্য হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু জায়ফল বা জয়ত্রী ভিন্ন জিনিস। এগুলো স্বভাবজাতভাবে মদ বা নেশাদ্রব্য নয়। এর ক্ষতিকর প্রভাব পুরোপুরি মাত্রানির্ভর (dose-dependent)।
উসুলে ফিকহের একটি সাধারণ নিয়ম হলো, বিধান তার ইল্লতের ওপর নির্ভর করে:
الْحُكْمُ يَدُورُ مَعَ عِلَّتِهِ وُجُودًا وَعَدَمًا
যেহেতু সামান্য পরিমাণে নেশা বা অবশতার কোনো প্রভাবই বাস্তবে থাকে না, তাই সামান্য ব্যবহারে হারামের হুকুমও প্রযোজ্য হয় না। যেমন কিছু ওষুধ মাত্রাতিরিক্ত সেবনে ক্ষতির কারণ হয়; এটিও অনেকটা সেরকম।
▪️ সম্পূর্ণ হারাম মনে করা আলেমদের যুক্তি: এই পক্ষের ফকিহগণ হাদিসের সাধারণ ও ব্যাপক অর্থকে অগ্রাধিকার দেন। তাঁদের মতে, অতিরিক্ত জায়ফল বা জয়ত্রী খেলে যেহেতু নেশা বা মতিভ্রম ঘটে, তাই এটি “নেশাদ্রব্য”-এর সংজ্ঞায় পড়ে। ফলে হাদিসের বিধান অনুযায়ী এর অল্প পরিমাণও হারাম, বাস্তবে প্রভাব প্রকাশ পাক বা না পাক। উপরন্তু হারামের পথ বন্ধ করা এবং সর্বোচ্চ সতর্কতার দৃষ্টিকোণ থেকেও তাঁরা এটি পুরোপুরি বর্জনের পক্ষে।
🔸 ৪. আমাদের করণীয়:
যেহেতু বিষয়টি নিয়ে ফকিহদের মধ্যে সূক্ষ্ম মতভেদ রয়েছে, তাই সন্দেহমুক্ত থাকার জন্য জায়ফল বা জয়ত্রী পুরোপুরি বর্জন করা উত্তম। এটাই অধিক সতর্কতামূলক অবস্থান। তবে কেউ যদি খাবারের স্বাদ বা সুগন্ধির জন্য রান্নায় অতি সামান্য পরিমাণ জায়ফল বা জয়ত্রী ব্যবহার করে তাকে সরাসরি হারামকারী বা গুনাহগার বলা যাবে না। আল্লাহু আলাম-আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক অবগত।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে চুম্বন করার বিধান

 প্রশ্ন: শিক্ষক কর্তৃক ছাত্রীকে চুম্বন করার বিধান কী?

▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য। অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রাণপ্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর, শিক্ষক কর্তৃক তাঁর গাইরে মাহরাম ছাত্রীকে চুম্বন করার বিধান নির্ধারণের ক্ষেত্রে ছাত্রীর বয়স, তার প্রতি কামভাব সৃষ্টির আশঙ্কা এবং এ আচরণের সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করা জরুরি। আলেমদের বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ছাত্রী বালেগা হলে তাকে চুম্বন করা কোনভাবেই জায়েজ নয়। অনুরূপভাবে, সে বালেগা না হলেও যদি এমন বয়সে উপনীত হয়, যে বয়সে সাধারণত তার প্রতি কামভাব সৃষ্টি হতে পারে, তাহলে সে শিক্ষকের গাইরে মাহরাম হলে তাকে চুম্বন করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।আর কামভাব নিয়ে চুম্বন করা নিঃসন্দেহে নিষিদ্ধ। কেননা, শিক্ষক ও ছাত্রীর সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো শিক্ষা, উত্তম চরিত্র গঠন, শিষ্টাচার ও পারস্পরিক সম্মান—শারীরিক ঘনিষ্ঠতা নয়। বিশেষত,গাইরে মাহরাম ছাত্রীর সঙ্গে এমন আচরণ করা, যা ফিতনা, কুপ্রবৃত্তি কিংবা অনৈতিক সম্পর্কের দিকে পরিচালিত করতে পারে, তা থেকে বিরত থাকা শরিয়তের নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত।তবে একেবারে ছোট শিশুর প্রতি স্বাভাবিক স্নেহ-মমতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে তার কপাল বা মাথায় চুম্বন করা এবং একই শিশুকে কামভাব বা শারীরিক উপভোগের উদ্দেশ্যে চুম্বন করা এক বিষয় নয়; বরং এ দুটির বিধান ভিন্ন। আলেমগণও এ পার্থক্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
.
আহলুল ইলমের ঐকমত্য অনুযায়ী, কামভাব বা শারীরিক উপভোগের উদ্দেশ্যে ছোট মেয়ের দিকে তাকানো, তাকে স্পর্শ করা কিংবা চুম্বন করা হারাম। তবে কোনো মেয়ের প্রতি কামভাব সৃষ্টি হতে পারে—এমন বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে ফকিহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে মালিকি মাযহাবের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আল-ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানী-তে বলা হয়েছে:وَاخْتُلِفَ فِيهَا) أَيْ الصَّبِيَّةِ (إنْ كَانَتْ مِمَّنْ لَمْ تَبْلُغْ أَنْ تُشْتَهَى) كَبِنْتِ أَرْبَعٍ أَوْ خَمْسٍ অর্থাৎ, “ছোট মেয়েটি এমন বয়সে উপনীত হয়েছে কি না, যে বয়সে সাধারণত তার প্রতি কামভাব সৃষ্টি হতে পারে—এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। যেমন, চার বা পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে।” এ ছাড়া মালিকি মাযহাবের কোনো কোনো বক্তব্যে তিন বা চার বছর বয়সী মেয়েকে স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও তার দিকে তাকানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে। (বিস্তারিত দেখুন: আন-নাফরাবী, আল-ফাওয়াকিহ আদ-দাওয়ানী আলা রিসালাতি ইবনি আবী যায়েদ আল-কায়রাওয়ানী, ১/৩০১)।
.
আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ (কুয়েতি ফিকহ বিশ্বকোষে) এসেছে, وَاتَّفَقُوا –أَي الْفُقَهَاء- عَلَى أَنَّهُ يَجُوزُ لِلرَّجُل أَنْ يَنْظُرَ بِغَيْرِ شَهْوَةٍ إِلَى جَمِيعِ بَدَنِ الصَّغِيرَةِ الَّتِي لَمْ تَبْلُغْ حَدَّ الشَّهْوَةِ سِوَى الْفَرْجِ مِنْهَا অর্থাৎ, “ফকীহগণ একমত হয়েছেন যে, একজন পুরুষের জন্য কামভাব ছাড়া এমন ছোট বালিকার পুরো শরীরের দিকে তাকানো জায়েয, যাকে দেখে কামভাব হতে পারে এমন বয়স পর্যন্ত সে পৌঁছেনি। তবে তার যোনির দিকে তাকানো যাবে না” (আল-মাওসূ‘আতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ, ৪০/৩৪৭)। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: সাধারণত কোনো বালিকাকে দেখে কামভাব জাগ্রত হওয়ার উপযোগী বয়সে পৌঁছানোর অর্থ হলো, স্বাভাবিক ও সুস্থ প্রকৃতির মানুষের মধ্যে তাকে দেখে কামভাব জাগ্রত হওয়ার আশঙ্কা থাকা। কারণ, বিকৃত মানসিকতার কোনো ব্যক্তি যেকোনো বয়সের শিশুর প্রতিও যৌন আকর্ষণ অনুভব করতে পারে; তাই এমন ব্যক্তির অস্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে এ ক্ষেত্রে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। সুতরাং, এ ক্ষেত্রে বয়সের কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ করাই মূল বিষয় নয়; বরং সাধারণত ওই বালিকাকে দেখে কামভাব জাগ্রত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না, সেটিই বিবেচ্য।
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:إِذَا بَلَغَتِ الْبِنْتُ حَدًّا تَتَعَلَّقُ بِهَا نُفُوسُ الرِّجَالِ وَشَهْوَاتُهُمْ فَإِنَّهَا تَحْتَجِبُ دَفْعًا لِلْفِتْنَةِ وَالشَّرِّ، وَيَخْتَلِفُ هَذَا بِاخْتِلَافِ النِّسَاءِ، فَإِنَّ مِنْهُنَّ مَنْ تَكُونُ سَرِيعَةَ النُّمُوِّ جَيِّدَةَ الشَّبَابِ، وَمِنْهُنَّ مَنْ تَكُونُ بِالْعَكْسِ.”যখন মেয়ে এমন এক বয়সে উপনীত হয়, যে সময় পুরুষদের মন ও আকাঙ্ক্ষা তার সাথে যুক্ত হতে পারে, তখন ফেতনা ও অকল্যাণ প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে তাকে পর্দা করতে হবে। এটি বিভিন্ন মেয়ের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রকম হতে পারে। কারণ তাদের মধ্যে কেউ কেউ দ্রুত বড় হয় ও তরুণী হয়, আবার কেউ কেউ হয় এর উল্টো”(ইবনু উসাইমীন; মাজমূ‘আতু আসইলাতিন তাহুম্মুল উসরাহ আল-মুসলিমাহ, পৃষ্ঠা: ৪৩-৪৪)
.
ইবনুল মুফলিহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:قال ابن منصور لأبي عبد الله [يعني : الإمام أحمد] : يقبل الرجل ذات محرم منه ؟ قال : إذا قدم من سفر ولم يَخَفْ على نفسه , ولكن لا يفعله على الفم أبدا , الجبهة أو الرأس.وقال بكر بن محمد عن أبيه عن أبي عبد الله وسئل عن الرجل يقبل أخته ؟ قال : قد قبل خالد بن الوليد أخته”ইবনে মানসুর আবু আব্দুল্লাহ অর্থাৎ ইমাম আহমাদকে বলেন,কোন ব্যক্তি তার মাহরামদেরকে চুমু খেতে পারবে কি? তিনি উত্তরে বলেন: যদি সফর থেকে আসে এবং নিজের প্রতি ভয় বা ফিতনার আশঙ্কা না থাকে (অর্থাৎ মনে খারাপ কিছু না জাগে) তাহলে চুমু খাওয়া যাবে তবে মুখের ওপরে কখনোই চুমু দিবে না বরং কপালে বা মাথায় দিবে।বকর ইবনু মোহাম্মদকে ওই ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেন যে ব্যক্তি তার বোনকে চুমু দিয়েছিল এটা কি সঠিক? উত্তর তিনি বলেন হ্যাঁ এটা সঠিক খলিদ ইবনে ওয়ালিদ তার বোনকে চুমু দিয়েছিল।(আল আদাবুস শরয়ী; ২/২৬৬ আরও দেখুন আল-মাওসুআহ আল-ফিকহিয়াহ: ১৩/১৩০)
.
হাম্বালী মাযহাবের প্রখ্যাত ফাক্বীহ, শাইখুল ইসলাম, ইমাম ‘আব্দুল্লাহ বিন আহমাদ বিন কুদামাহ আল-মাক্বদিসী আল-হাম্বালী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৬২০ হি.] বলেছেন,قَالَ أَحْمَدُ، فِي رِوَايَةِ الْأَثْرَمِ فِي رَجُلٍ يَأْخُذُ الصَّغِيرَةَ فَيَضَعُهَا فِي حِجْرِهِ، وَيُقَبِّلُهَا: فَإِنْ كَانَ يَجِدُ شَهْوَةً فَلَا، وَإِنْ كَانَ لِغَيْرِ شَهْوَةٍ، فَلَا بَأْسَ “একজন পুরুষ একটি ছোট মেয়েকে তার কোলে নিলে এবং তাকে চুম্বন করলে বিধান কী হবে? সে ব্যাপারে ইমাম আহমাদ বলেন, যদি সে কামনা অনুভব করে, তাহলে এভাবে কোলে নিতে ও চুমু দিতে পারবে না। কিন্তু যদি তা কামনার জন্য না হয়, তাহলে তাতে কোনো সমস্যা নেই”।(ইবনু কুদামা, আল-মুগনী: ৭/১০৩)
.
ইমাম ইবনুল জাওযী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন,وَتَقْبِيلُ الصَّبِيَّةِ الَّتِي لَهَا مِنَ الْعُمْرِ ثَلَاثُ سِنِينَ جَائِزٌ إِذْ لَا شَهْوَةَ تَقَعُ هُنَاكَ فِي الْأَغْلَبِ فَإِنْ وُجِدَ شَهْوَةٌ حُرِّمَ ذَلِكَ وَكَذَلِكَ الْخَلْوَةُ بِذَوَاتِ الْمَحَارِمِ فَإِنْ خِيفَ مِنْ ذَلِكَ حُرِّمَ فَتَأَمَّلْ هَذِهِ الْقَاعِدَةَ
“তিন বছর বয়সী ছোট মেয়েকে চুম্বন করা জায়েয; কেননা সাধারণত এ ক্ষেত্রে কামভাব সৃষ্টি হয় না। তবে যদি কামভাব সৃষ্টি হয়, তাহলে তা হারাম হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে, মাহরাম নারীদের সঙ্গে নির্জনে অবস্থান করার ক্ষেত্রেও একই বিধান প্রযোজ্য। সুতরাং, এ ক্ষেত্রে যদি (কামভাব সৃষ্টি হওয়ার বা নিষিদ্ধ কিছু ঘটার) আশঙ্কা থাকে, তাহলে তা হারাম হয়ে যাবে। অতএব, এই মূলনীতিটি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করো।”
(তালবীসু ইবলীস, পৃষ্ঠা: ১৯৯)
.
সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] বলেছেন:
“تقبيل المحارم فإن كانت الأم، أو الأخت الكبيرة أو الجدة ، أو البنت ، فهذا لا بأس به ، وقد قبل أبو بكر ابنته عائشة رضي الله عنها على خدها .وأما غيرهن من المحارم غير الأصول والفروع ، فالأولى ألا يقبلها إلا إذا كانت أختاً كبيرة ، فهنا يقبلها على جبهتها ، أو على رأسها ، أما يقبل أخته الشابة ، فالشيطان يجري من ابن آدم مجرى الدم، فليتجنب هذا ، لا يقبلها، وأبلغ من ذلك في التحذير منه : أن يقبل محارمه من الرضاع ؛ لأن المحارم من الرضاع أقل هيبة عند الإنسان من المحارم من النسب ، ولهذا يجب الحذر من أختك من الرضاع أن تقبلها ، لاسيما إن كانت شابة جميلة ، فإن الشيطان يجري من ابن آدم مجرى الدم .الخلاصة : تقبيل الزوجة مطلوب ، وتقبيل غيرها من المحارم إن كان من الأصول أو الفروع فلا بأس به ، وإن كان من غيرهن فالحذر من ذلك أولى
“মাহরাম নারীদের চুম্বনের বিষয়টি হলো—যদি তিনি মা, বড় বোন, দাদি-নানি কিংবা মেয়ে হন, তবে এতে কোনো সমস্যা নেই। আবূ বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) তাঁর মেয়ে ‘আয়িশা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)-এর গালে চুম্বন করেছিলেন। আর এঁদের বাহিরে অন্যান্য মাহরাম নারীদের ক্ষেত্রে—যাঁরা ঊর্ধ্বতন বংশধর (মা, দাদি-নানি প্রমুখ) কিংবা অধস্তন বংশধর (মেয়ে, নাতনি প্রমুখ) নন—তাঁদের চুম্বন না করাই উত্তম। তবে তিনি যদি বড় বোন হন, তাহলে তাঁর কপালে অথবা মাথায় চুম্বন করতে পারেন।কিন্তু নিজের যুবতী বোনকে চুম্বন করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা উচিত। কেননা, শয়তান আদমসন্তানের মধ্যে রক্তপ্রবাহের মতো চলাচল করে। সুতরাং এ ধরনের চুম্বন থেকে বিরত থাকা উচিত। এর চেয়েও অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন দুধ-সম্পর্কীয় মাহরাম নারীদের চুম্বনের ক্ষেত্রে। কারণ, রক্তসম্পর্কীয় মাহরামদের তুলনায় দুধ-সম্পর্কীয় মাহরামদের প্রতি মানুষের মনে স্বাভাবিক সংকোচ ও শ্রদ্ধাবোধ তুলনামূলকভাবে কম থাকতে পারে। এ কারণে দুধ-বোনকে চুম্বন করার ব্যাপারে সতর্ক থাকা আবশ্যক। বিশেষত, সে যদি যুবতী ও সুন্দরী হয়। কেননা, শয়তান আদমসন্তানের মধ্যে রক্তপ্রবাহের মতো চলাচল করে।
সারসংক্ষেপ: স্ত্রীকে চুম্বন করা কাম্য (বা কাঙ্ক্ষিত)। আর তাঁর বাইরে অন্যান্য মাহরাম নারীদের মধ্যে যাঁরা ঊর্ধ্বতন কিংবা অধস্তন বংশধর (যেমন—মা, দাদি, মেয়ে, নাতনি), তাঁদের চুম্বন করায় কোনো অসুবিধা নেই। তবে এঁরা ছাড়া অন্য মাহরাম নারীদের ক্ষেত্রে তা থেকে বিরত থাকাই নিরাপদ ।”(ইবনু উসাইমীন; লিক্বাউ আল-বাবিল মাফতুহ: ১৪৬, প্রশ্ন নং-৬)
.
পরিশেষে, উপরোক্ত দলিল ও আলেমদের বক্তব্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, কোনো মেয়েকে চুম্বন করার বিধান নির্ধারণের ক্ষেত্রে তার বয়স, শারীরিক বিকাশ, কামভাব সৃষ্টির আশঙ্কা এবং এ আচরণের সম্ভাব্য পরিণতি বিবেচনা করা জরুরি। তবে একজন শিক্ষকের জন্য তাঁর গাইরে মাহরাম ছাত্রীর সঙ্গে শারীরিক ঘনিষ্ঠতা পরিহার করা এবং শরিয়তের সীমারেখা, শালীনতা ও পেশাগত শিষ্টাচার বজায় রাখা অপরিহার্য। ছাত্রী বালেগা হলে তাকে চুম্বন করা জায়েজ নয়; অনুরূপভাবে, সে বালেগা না হলেও তার প্রতি কামভাব সৃষ্টির আশঙ্কা থাকলে তাকে চুম্বন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। আর কামভাব বা শারীরিক উপভোগের উদ্দেশ্যে চুম্বন করা হারাম। মনে রাখতে হবে, শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল জ্ঞান দান করা নয়; বরং ছাত্রীর মর্যাদা, নিরাপত্তা ও শালীনতা রক্ষা করাও তাঁর দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত। তাই স্নেহ-মমতা প্রকাশের ক্ষেত্রেও এমন পন্থা অবলম্বন করা উচিত, যাতে শরিয়তের সীমালঙ্ঘন, ফিতনা কিংবা কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির আশঙ্কা না থাকে। একজন আদর্শ শিক্ষকের পরিচয় শারীরিক ঘনিষ্ঠতায় নয়; বরং তাঁর আমানতদারিতা, উত্তম চরিত্র, সংযম ও শিক্ষার্থীর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণে। আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

সৌদি আরবকে কেন তাওহিদের দেশ বলা হয়

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর প্রতি।অতঃপর, পৃথিবীর মানচিত্রে সৌদি আরব কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ডের নাম নয়; বরং এটি ইসলামের পবিত্র ভূমি, মক্কা-মদিনার দেশ এবং মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি ভূখণ্ড। অষ্টাদশ শতকে সৌদি শাসকগোষ্ঠী ও সংস্কারক ইমাম মুহাম্মদ ইবনু আবদুল ওয়াহহাব (রাহিমাহুল্লাহ)-এর তাওহিদভিত্তিক দাওয়াতের সমন্বিত প্রচেষ্টায় এ অঞ্চলে শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে ব্যাপক সংস্কারমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরবর্তী সময়েও তাওহিদের শিক্ষা প্রচার, কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ, মসজিদ ও ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং শিরক ও বিদআত থেকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে সৌদি আরব বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। এসব ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের কারণে সৌদি আরবকে অনেকেই ‘তাওহিদের দেশ’ হিসেবে অভিহিত করেন। আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামের দুই পবিত্রতম মসজিদের আবাসভূমি হিসেবে দেশটির ধর্মীয় গুরুত্ব মুসলিম বিশ্বের কাছে অনন্য।

.
বর্তমান সৌদি আরব সম্পর্কে বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম ইমাম ইবনু উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, “আমি যা বলছি তা আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি- প্রকৃতপক্ষে, আমি বর্তমান পৃথিবীতে এমন কোন দেশকে জানি না, যেখানে আল্লাহর আইন প্রয়োগ করা হয়, যেভাবে এই পবিত্র ভূমিতে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। আমি বলতে চাচ্ছি সঊদী আরবের আরব সাম্রাজ্যের কথা। আর এতে কোন সন্দেহ নেই যে, এটা আমাদের উপর আল্লাহ তা‘আলার অনুগ্রহ, যে আমরা এই দেশের অধিবাসী। তাই আসুন আমরা আজ যে অবস্থায় আছি তা সংরক্ষণ করি, বরং আসুন আমরা আজকে যা করছি তার চেয়ে বেশী আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করি। আমি পরিপূর্ণতার দাবি করছি না, তবে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরাই শীর্ষে আছি। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আমাদের অনেক কিছুই বর্জিত, তবে আমরা আরও ভাল করতে পারি। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, কারণ আমরা অন্যান্য দেশ সম্পর্কে যা জানি তার তুলনায় আমরা অনেকটাই এগিয়ে। আমরা দরিদ্রদের পাশে থাকি, ভীতিগ্রস্থ মানুষদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করি, অজ্ঞদের জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করি এবং এই ইসলামী রাষ্ট্রে সকলেই সম্মানের সহিত বসবাস করি। বিশুদ্ধ ইসলাম ধর্মকে আঁকড়ে ধরার কারণে আজ আমরা অনেকেরই চক্ষুশূল। বিদ্বেষপূর্ণ লোকদের অন্তরে আমাদের প্রতি ক্রোধ জেগে ওঠে। তারা চায় আমরা যে অবস্থায় আছি তার অস্তিত্ব বন্ধ হয়ে যাক…!(শাইখ আহমদ বাযমূল, দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃ. ১১)
.
শাইখ আহমাদ ইবনু উমার ইবনু সালিম বাযমূল (রাহিমাহুল্লাহ) ও শাইখ সালিহ আল-লুহাইদান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,”এই দেশ ইসলামের প্রাণকেন্দ্র এবং পবিত্র স্থান। এটি শান্তি ও নিরাপত্তার অনেক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে যার মিল বিশ্বে খুঁজে পাওয়া যায় না। এতে কোন সন্দেহ নেই যে, বর্তমান বিশ্বের সরকারগুলোর মধ্যে এটিই সেরা। এর অর্থ এই নয় যে, এটি নিখুঁত, এ কথা কেউ বলে না যে এটি নিখুঁত, বরং এর মধ্যেও ভুল রয়েছে, তবে তা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। সে কারণে, দেশের মধ্যে ও বাহিরে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য ফরয, সে যেন দৃঢ়তার সহিত সত্যের উপর অটল থাকে এবং নির্যাতিতদের সাহায্য করে। তাওহীদের বিশুদ্ধ আক্বীদাহ গ্রহণ করে এবং নির্ধারিত ইসলামী আইন প্রণয়ন করে।(দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা: ১৪)
.
শাইখ আব্দুল আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘আল্লাহ্ তা‘আলা বাদশাহ আব্দুল আযীযের জন্মের মাধ্যমে মুসলিমদের সীমাহীন উপকার করেছেন। তিনি ঐক্য এনেছেন, সত্যকে উত্থাপন করেছেন, তাঁর দ্বীনকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর পথে সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধের দায়িত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। যার ফলে প্রচুর জ্ঞান, প্রচুর বরকত, ন্যায় প্রতিষ্ঠা, সত্যকে সাহায্য করা, সত্যের প্রচার করা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। আল্লাহর দিকে ডাকা অর্থাৎ তাওহীদ, সুন্নাহ ও সালাফদের পথে আহ্বান জানিয়েছেন। অতঃপর তাঁর পরে তাঁর সন্তানরাও এই পথেই হাঁটতে থাকে। তাঁরাও সত্য প্রতিষ্ঠায়, ন্যায়বিচারের প্রচারে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। এই সঊদী রাষ্ট্র একটি বরকতময় রাষ্ট্র। আল্লাহ সত্য ধর্মকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর মাধ্যমে ঐক্য এনেছেন এবং দুর্নীতির পথ বন্ধ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মাধ্যমে যমীনে নিরাপত্তা আনয়ন করেন এবং সেখানে মহান নে‘মত সংঘটিত হয়, যা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ গণনা করতে পারে না’।(দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা: ৯-১০)
.
বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,”আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আরব উপদ্বীপে এবং সমস্ত মুসলিম ভূখণ্ডে নিরাপত্তা ও বরকত রক্ষা করেন এবং তিনি তাওহীদের রাষ্ট্র অর্থাৎ সঊদী আরবের সাম্রাজ্যকে সংরক্ষণ করেন”।(দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা: ১২)
.
সঊদী বাদশাহ সাউদ ইবনু আব্দিল আযীয (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন,”সর্বপ্রথম আমাদের যে বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দেয়া উচিত তা হল- আমরা সকলেই আল্লাহর রজ্জু অর্থাৎ কিতাব ও সুন্নাহকে দৃঢ়তার সহিত আঁকড়ে ধরি এবং আমরা আমাদের দেশের মধ্যে সেই উপায়গুলোকে কাজে লাগাই, যা সমাজের সমস্ত ব্যক্তির হৃদয়ে বিশুদ্ধ তাওহীদের চেতনাকে প্রতিষ্ঠিত করবে এবং যাতে সবাই আন্তরিকভাবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে”।(দাওলাতুত তাওহীদ ওয়াস-সুন্নাহ, পৃষ্ঠা: ৪১)
.
❑ নিম্নে সৌদি আরবকে ‘তাওহিদের দেশ’ বলার পেছনে উল্লেখযোগ্য ১৬টি কারণ তুলে ধরা হলো:
.
​১. জাতীয় পতাকায় কালিমাতুত তাওহিদের চিরন্তন ও প্রকাশ্য ঘোষণা: সৌদি আরবের জাতীয় পতাকা কেবল একটি ভূখণ্ডের ভৌগোলিক প্রতীক নয়; বরং এটি পুরো বিশ্বে তাওহিদ ও রিসালাতের রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকারনামা। পতাকার সবুজ পটভূমিতে সুবিন্যস্ত অক্ষরে শোভা পাচ্ছে কালিমাতুত তাওহিদ— ‘لَا إِلٰهَ إِلَّا اللَّهُ مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ’ (আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল)। আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্র তার জাতীয় পরিচয়ে ও পতাকায় তাওহিদকে এভাবে প্রকাশ্য ও সর্বোচ্চ স্থান দেয়নি, যা দেশের প্রতিটি নাগরিক ও বিশ্ববাসীর মনে প্রতিনিয়ত তাওহিদের চেতনাকে জাগ্রত রাখে।
.
​২. শিরক ও কুসংস্কারমুক্ত পবিত্র ধর্মীয় পরিবেশের সুরক্ষা: তাওহিদের মূল দাবি হলো যাবতীয় ইবাদত একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা। ‘তাওহিদের দেশ’ হিসেবে পরিচিত সৌদি আরবে ইবাদতের এই মৌলিক ভিত্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে পিরপূজা, মাজারপূজা, কবরকে কেন্দ্র করে সেজদা বা মানত করা কিংবা গাছ, পাথর বা খুঁটি ঘিরে প্রচলিত তাবৎ শিরক ও কুসংস্কারমূলক আচার-অনুষ্ঠানের প্রকাশ্য চর্চা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। রাসূল (ﷺ)-এর নির্দেশিত ও সালাফে সালেহীনের অনুসৃত আকীদা মানহাজের আলোকে একটি শিরকমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ এবং তাওহিদের সুমহান চেতনাকে জিইয়ে রাখাই এ দেশের রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
.
​৩. ইসলামের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা ও অমুসলিমদের প্রকাশ্য উপাসনালয় নিষিদ্ধকরণ: রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর পবিত্র নির্দেশনার আলোকে আল-জাজিরাতুল আরাব বা হিজাজ ভূখণ্ডকে শিরক ও কুফর থেকে মুক্ত রেখে তাওহিদের মূল চেতনাকে সুরক্ষার লক্ষ্যে সৌদি আরবে অমুসলিমদের কোনো প্রকাশ্য গির্জা, মন্দির বা উপাসনালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হয় না। একই সাথে মূর্তিপূজা, ক্রুশ প্রদর্শন কিংবা অন্যান্য ধর্মের যাবতীয় প্রকাশ্য ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান উদযাপনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা হয়েছে, যা ভূখণ্ডটির ঐতিহাসিক ইসলামী পরিচয়, স্বাতন্ত্র্য এবং তাওহিদের নিশান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
.
​৪. কবরকেন্দ্রিক অতিরঞ্জন ও বিজাতীয় রীতিনীতি দমন: বিভিন্ন সমাজ ও সুফি ভাবধারার প্রভাবে কবরকে কেন্দ্র করে শিরক ও বিদআতের যে বিস্তার ঘটেছে, তা থেকে উম্মাহর আকিদা ও তাওহিদ সুরক্ষায় রাসুলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহ হুবহু বাস্তবায়ন করা হয়। এ লক্ষ্যে সৌদি আরবে কবর পাকা করা, কবরের ওপর গম্বুজ বা সুরম্য স্থাপনা নির্মাণ, চুনকাম, আলোকসজ্জা এবং কবরবাসীর নিকট কোনো প্রকার প্রার্থনা বা সাহায্য চাওয়া রাষ্ট্রীয় আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে; যাতে মুসলিম উম্মাহ সর্বপ্রকার শিরক ও অনৈসলামিক সংস্কৃতি থেকে মুক্ত থেকে একত্ববাদের বিশুদ্ধ ধারায় অবিচল থাকতে পারে।
.
৫. যাদুবিদ্যা, গণকগিরি ও প্রতারণামূলক অপকর্ম দমন: খাঁটি তাওহিদের মূল ভিত্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং সমাজকে সকল প্রকার কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্ত করতে সৌদি আরবে যাদুবিদ্যা, গণকগিরি ও প্রতারণামূলক অপকর্ম কঠোরভাবে দমন করা হয়। দেশটিতে তাবিজ-কবচের রমরমা ব্যবসা, হাত বা চেহারা দেখে ভাগ্য গণনা, টিয়াপাখি দিয়ে ভবিষ্যৎ বলা এবং অলৌকিকতার ভণ্ড দাবিদার সাধুবাবাদের সমস্ত কার্যক্রমকে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
.
৬. আকিদাবিরোধী সাহিত্য, বইপত্র ও তন্ত্রমন্ত্রের প্রসার রোধ: নতুন প্রজন্ম ও সাধারণ মুসলিমদের খাঁটি আকিদা এবং বিশুদ্ধ তাওহিদের ওপর অবিচল রাখতে সৌদি আরব বিভ্রান্তিকর দর্শন ও বাতিল মতবাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। দেশটিতে যাদুবিদ্যা, তন্ত্রমন্ত্র, শিরকি ঝাড়ফুঁক এবং সালাফি আকিদাবিরোধী যেকোনো ধরনের বইপুস্তক, লিফলেট, প্রিন্ট ও ডিজিটাল মিডিয়ার প্রচারণা এবং কেনাবেচা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ; রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব অপসংস্কৃতি ও অনৈসলামিক উপাদানের বিস্তার কঠোরহস্তে দমন করা হয়।
.
​৭. পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সংবিধান ও শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ: সৌদি রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনো মানব রচিত মতবাদ বা ধর্মনিরপেক্ষ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত নয়। ১৯৯২ সালে প্রণীত দেশের ‘মৌলিক শাসনব্যবস্থা আইন’ (Basic Law of Governance)-এর প্রথম অনুচ্ছেদেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর সুন্নাহই দেশের সর্বোচ্চ সংবিধান ও শাসনব্যবস্থার মূল ভিত্তি। পাশাপাশি, সমাজকে পাপমুক্ত রাখতে ‘আমর বিল মারুফ ওয়া নাহি আনিল মুনকার’ (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) বিভাগকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে।
.
​​৮. ইসলামি শরিয়তের পূর্ণাঙ্গ প্রয়োগ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা: সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থা বিশ্বের বুকে তাওহিদভিত্তিক শাসন ও ন্যায়বিচারের এক অনন্য বাস্তব দৃষ্টান্ত, যেখানে প্রচলিত মানব রচিত আইনের পরিবর্তে সরাসরি কুরআন ও সুন্নাহ থেকে উৎসারিত বিশুদ্ধ ইসলামি শরিয়তের ভিত্তিতে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়; আর এই বিচারিক স্বচ্ছতা ও সুবিচার নিশ্চিতকরণ এবং যেকোনো ভুল রায়ের সম্ভাবনা চিরতরে বন্ধ করতে সৌদিতে মৃত্যুদণ্ড বা কিসাসের মতো চরম শাস্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিখুঁত ও কঠোর ৫টি ধাপ অনুসরণ করা হয়—যেখানে প্রথমে পুলিশ ও পাবলিক প্রসিকিউশনের (النيابة العامة) মাধ্যমে গ্রেপ্তার ও তদন্ত সম্পন্ন হয়, দ্বিতীয় ধাপে প্রাথমিক আদালতে (المحكمة الجزائية) চুলচেরা বিচারিক বিশ্লেষণের পর রায় দেওয়া হয়, তৃতীয় ধাপে আসামি আপিল না করলেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপিল কোর্টে (محكمة الاستئناف) ফাইল যাচাই করা হয়, চতুর্থ ধাপে সুপ্রিম কোর্ট (المحكمة العليا) সম্পূর্ণ নথি শরীয়ত অনুযায়ী পরীক্ষা করে চূড়ান্ত করে এবং পঞ্চম ও শেষ ধাপে বাদশাহ বা ক্রাউন প্রিন্সের স্বাক্ষরে “আমর মালাকি” (রাজকীয় আদেশ) জারি হওয়ার পরেই কেবল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা কার্যকরের তারিখ ঘোষণা করে; ফলে কমপক্ষে তিনটি উচ্চ আদালত এবং স্বয়ং বাদশাহর অনুমোদন সাপেক্ষে সর্বনিম্ন ৩ থেকে ৪ বছর বা তার চেয়েও বেশি দীর্ঘমেয়াদী এই সুশৃঙ্খল আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই কেবল সৌদিতে চূড়ান্ত বিচার সম্পন্ন হয়ে থাকে।
.
৯. প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত তাওহিদ ও সালাফি আক্বীদার বাধ্যতামূলক শিক্ষাদান: শিক্ষা হলো আকিদা সংরক্ষণের প্রধান হাতিয়ার, আর তাই সৌদি আরবের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে তাওহিদ, ফিকহ, সুন্নাহ ও সালাফদের বিশুদ্ধ আকিদা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা শৈশব থেকেই ইসলামের মৌলিক ও বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন করে গড়ে ওঠে, যা তাদের সামাজিক ও দ্বীনি জীবনে যাবতীয় বিদআত ও বিভ্রান্তি থেকে সুরক্ষিত রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
.
​১০. মসজিদ, মিম্বর ও দাওয়াহ ব্যবস্থার রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণ ও সুন্নাহর প্রচার: সৌদি আরবের সমস্ত মসজিদ ও মিম্বর ‘মন্ত্রণালয় অব ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স’-এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়, যেখানে জুমার খুতবা, ওয়াজ ও নিয়মিত পাঠ্যসূচিতে সর্বদা তাওহিদের গুরুত্ব তুলে ধরা হয় এবং বিদআত, কুসংস্কার ও চরমপন্থা থেকে সতর্ক করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। কেবল সঠিক দ্বীনি জ্ঞানে সমৃদ্ধ ও যোগ্য আলেম-ইমামগণই মিম্বরে দাঁড়িয়ে তাওহিদ ও সুন্নাহর খাঁটি বাণী প্রচারের সুযোগ পেয়ে থাকেন।
.
১১. বিশ্বমানের আলেম ও দাঈদের সম্পৃক্ততায় আন্তর্জাতিক দাওয়াহ কার্যক্রম ও প্রশিক্ষণ:সৌদি আরব কেবল নিজস্ব সীমানার মধ্যে দ্বীনি প্রচার সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং বিশ্বজুড়ে বিশুদ্ধ তাওহিদ ও সুন্নাহর বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দেশটি আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে প্রখ্যাত আলেম, মুফতি, দাঈ ও ইসলামী চিন্তাবিদদের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ স্থাপন করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইসলামিক কনফারেন্স, কর্মশালা ও সিম্পোজিয়ামে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্ঞানতাপস ও গবেষকদের আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের মূল্যবান পরামর্শ ও খুতবার মাধ্যমে স্থানীয় নাগরিক ও প্রবাসী মুসলিমদের ইসলামি জ্ঞানের আলোয় সমৃদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে, দেশের অভ্যন্তরে অবস্থিত বিভিন্ন দাওয়াহ সেন্টার (যেমন: মাকতাতুদ দা’ওয়াহ বা ইসলামিক গাইডেন্স অফিসসমূহ) ও মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বহুভাষিক দক্ষ দাঈ ও আলেমদের মাধ্যমে অ্যারাবিক ও নন-অ্যারাবিকভাষী বিশাল প্রবাসীকুল ও নওমুসলিমদের মাঝে তাদের মাতৃভাষায় বিশুদ্ধ আকীদা, মাসআলা-মাসায়েল এবং কোরআন-সুন্নাহর শিক্ষা প্রচারের এক অনন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু রেখেছে, যা বিশ্ব মুসলিম ঐক্যে ও দাওয়াতি ময়দানে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পালন করে আসছে।
.
১২. বিশ্বব্যাপী পবিত্র কুরআন ও ইসলামি প্রামাণ্য সাহিত্য বিতরণ: সৌদি আরবের মদিনাতুল মুনাওয়ারায় ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘কিং ফাহদ কমপ্লেক্স ফর দ্য প্রিন্টিং অব দ্য হোলি কুরআন’ (King Fahd Complex for the Printing of the Holy Quran) বিশ্বের বৃহত্তম ও সর্বাধুনিক কুরআন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত এ প্রতিষ্ঠান থেকে শত শত কোটি কপি পবিত্র কুরআনুল কারিম এবং এর বিশ্বখ্যাত অনুবাদ ও তাফসির সাথে গুরুত্বপূর্ণ আক্বীদার কিতাবাদী বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের হাতে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। বাংলাসহ বিশ্বের ৭০টিরও বেশি ভাষায় পবিত্র কুরআনের অনুবাদ এবং খাঁটি আকিদাসংক্রান্ত প্রামাণ্য ইসলামি কিতাবাদী বিশ্বজুড়ে বিলি করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি নজিরবিহীন ভূমিকা পালন করে আসছে।
.
​১৩. দাওয়া সেন্টার ও আন্তর্জাতিক দাঈ প্রেরণের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দাওয়া কার্যক্রম: সৌদি আরব বিশ্বজুড়ে বিশুদ্ধ তাওহিদ, সুন্নাহ ও খাঁটি ইসলামি জ্ঞান প্রচার ও প্রসারের লক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইসলামিক অ্যাফেয়ার্স মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘সউদী ইসলামিক দাওয়া সেন্টার’, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র এবং মসজিদ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করতে লক্ষ লক্ষ রিয়াল খরচ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যোগ্য, দক্ষ ও শরিয়তসম্মত ইলমে সমৃদ্ধ দাঈ (প্রচারক) ও আলেমদেরকে বিভিন্ন রাষ্ট্রে প্রেরণ করা হয়। তাঁরা স্থানীয় আলেম ও সাধারণ মানুষের সাথে সমন্বয় করে মানবজাতিকে শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করে সঠিক কুরআন ও সুন্নাহর পথে আহ্বান করার কাজে নিরলসভাবে নিয়োজিত রয়েছেন।
.
​১৪. আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলন ও গবেষকদের পৃষ্ঠপোষকতা: বিশ্বের নানা প্রান্তের শীর্ষস্থানীয় আলেম, মুফতি, ফকিহ ও গবেষকদের সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলন, সিম্পোজিয়াম ও সেমিনার আয়োজনে সৌদি আরব সর্বদা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। মুসলিম উম্মাহর সমসাময়িক জটিল সমস্যাবলির সমাধান, ইসলামের মূল শিক্ষা সংরক্ষণ এবং উগ্রবাদ ও নানা মতবাদ বা বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে সঠিক জ্ঞানচর্চা প্রসারে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী’ (Muslim World League)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য ও মধ্যপন্থী আদর্শ প্রচারের কাজ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে।
.
​১৫. আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাবৃত্তি ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ (মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য): সৌদি আরবের বিভিন্ন বিশ্বখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়—বিশেষ করে ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিখ্যাত ‘মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ (Islamic University of Madinah), রিয়াদের ‘ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাউদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি’ এবং মক্কার ‘উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়’-এ বিশ্বের শতাধিক দেশ থেকে আগত হাজার হাজার মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা, খাওয়া, চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়।এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁরা দীর্ঘ মেয়াদে বিশুদ্ধ কুরআন-সুন্নাহ, আরবি ভাষা ও সালাফদের খাঁটি আকিদার সুগভীর শিক্ষা অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সমাজে তাওহিদের বার্তা ও সুন্নাহর প্রচার-প্রসার ঘটিয়ে থাকেন।
.
​১৬. বিশ্বজুড়ে মসজিদ নির্মাণ, ইসলামিক ইনস্টিটিউট ও বহুমুখী মানবিক সহায়তা: বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ইবাদত-বন্দেগী ও সামাজিক কর্মকাণ্ড সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য সৌদি সরকার ও বিভিন্ন দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে হাজার হাজার মসজিদ, ইসলামিক স্কুল, মাদরাসা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য নিয়মিত আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়। এছাড়া ‘কিং সালমান হিউম্যানিটারিয়ান এইড অ্যান্ড রিলিফ সেন্টার’ (KSrelief)-এর মাধ্যমে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যুদ্ধ বা সংকটে নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জরুরি মানবিক সহায়তা ও ত্রাণ বিতরণের ক্ষেত্রেও দেশটির ভূমিকা আজ বিশ্বজুড়ে সর্বমহলে স্বীকৃত ও প্রশংসিত।
.
তবে এর অর্থ এই নয় যে, তাওহিদের এই পবিত্র ভূমিতে কোনো ধরনের পাপাচার বা ভুলত্রুটি সংঘটিত হয় না; বরং মানুষের স্বভাবসুলভ দুর্বলতার কারণে অন্যান্য মানববসতির মতো এখানেও ছোট-বড় বিভিন্ন পাপ সংঘটিত হয়। পার্থক্য হলো, এসব পাপ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আলেম-উলামা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেন না; বরং সাধ্যমতো সংশোধনের চেষ্টা চালিয়ে যান। তাঁরা শাসকদের কাছে গিয়ে, বাদশাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং আলেম ও শাসকদের যৌথ বৈঠকে সুস্পষ্ট ও জোরালো নসিহত পেশ করার মাধ্যমে সমাজের অনিষ্ট দূর করা, পাপাচার প্রতিরোধ করা এবং মানুষকে দ্বীনের পথে পরিচালিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। তাঁরা নিজেদের সাধ্যানুযায়ী সমাজকে পাপমুক্ত রাখতে ও মানুষকে সঠিক দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত করতে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন আলহামদুলিল্লাহ। পরিশেষে,মহান আল্লাহর দরবারে বিনীত প্রার্থনা—তিনি যেন এই দেশটিকে বিশুদ্ধ তাওহিদ ও সুন্নাহর ওপর অটল রাখেন এবং সব ধরনের ষড়যন্ত্র, বিপদাপদ ও ফিতনা-ফাসাদের হাত থেকে চিরকাল নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখেন।আমীন।(আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

October 13, 2026

জয়িফ বা দুর্বল হাদিসের পরিচয়

 জয়িফ বা দুর্বল হাদিসের পরিচয়, চেনার সহজ উপায় এবং হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মতভেদ হলে করণীয়:

প্রশ্ন: দুর্বল হাদিস কাকে বলে? দুর্বল হাদিস চেনার সহজ উপায় কী? আর কোনো হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাক্কিক আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলে করণীয় কী?
উত্তর:
🔸জঈফ হাদিস কাকে বলে?
উত্তর: কোন হাদিসে সহিহ বা হাসান হাদিসের এক বা একাধিক শর্ত না পাওয়া গেলে তাকে জঈফ বা দুর্বল হাদিস বলে।
ইবনুস সালাহ বলেন,
الحَدِيثُ الضَّعِيفُ: مَا فَقَدَ أَحَدَ شُرُوطِ الحَدِيثِ الصَّحِيحِ: أَيْ: كُلُّ حَدِيثٍ لَمْ تَجْتَمِعْ فِيهِ شُرُوطُ الحَدِيثِ الصَّحِيحِ، وَكَذَا لَمْ تَجْتَمِعْ فِيهِ شُرُوطُ الحَدِيثِ الحَسَنِ، فَهُوَ ضَعِيفٌ، وَهُوَ أَنْوَاعٌ تَزِيدُ عَنِ الخَمْسِينَ نَوْعًا
“যে হাদিসে সহিহ হাদিসের সব শর্ত পাওয়া যায়নি এবং হাসান হাদিসের শর্তও পূর্ণ হয়নি, সেটিই জয়িফ। জয়িফ হাদিসের প্রকার পঞ্চাশের বেশি।” [মুকাদ্দিমা ইবনিস সালাহ, পৃ. ৪১]
🔸জইফ হাদিস চেনার উপায়:
জঈফ বা দুর্বল হাদিস (اَلْحَدِيثُ الضَّعِيفُ) চেনার মূল চাবিকাঠি হলো দুটি বিষয় দেখা: সনদের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হওয়া অথবা বর্ণনাকারীর (রাবির) মধ্যে এমন ত্রুটি থাকা, যার কারণে হাদিসটি বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না।
কোনো হাদিস সহিহ হতে পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হয়:
১. সনদের ধারাবাহিকতা
২. বর্ণনাকারীর ন্যায়পরায়ণতা (আদালত)
৩. বর্ণনাকারীর সংরক্ষণক্ষমতা (জবত)
৪. শায (شَاذٌّ) না হওয়া, অর্থাৎ অধিক নির্ভরযোগ্য রাবির বিপরীত না হওয়া
৫. গোপন ত্রুটি (عِلَّةٌ) না থাকা
এই শর্তগুলোর এক বা একাধিক শর্ত লঙ্ঘিত হলে হাদিসটি সাধারণত জঈফ হিসেবে গণ্য হয়।
▪️জঈফ হওয়ার প্রধান দুটি কারণ:
ক. সনদের ত্রুটি (اِنْقِطَاعُ السَّنَدِ)
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে হাদিস-সংকলক পর্যন্ত বর্ণনাকারীদের যে ধারা, তার মাঝখান থেকে এক বা একাধিক রাবি বাদ পড়লে হাদিসটি দুর্বল হয়।
উদাহরণ: কোনো তাবেয়ি যদি মাঝের সাহাবির নাম উল্লেখ না করে সরাসরি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বরাতে হাদিস বর্ণনা করেন, তবে তাকে মুরসাল (اَلْمُرْسَلُ) হাদিস বলে।
মুরসাল সম্পর্কে আলেমদের মতভেদ আছে। জমহুর মুহাদ্দিসের মতে মুরসাল দুর্বল। তবে হানাফি ও মালিকি ফকিহগণ নির্ভরযোগ্য তাবিঈর মুরসাল গ্রহণ করেন আর ইমাম শাফিঈ (রাহ.) কিছু শর্তসাপেক্ষে গ্রহণ করেন।
খ. বর্ণনাকারীর ত্রুটি (طَعْنٌ فِي الرَّاوِي):
১. স্মৃতিশক্তি ও সংরক্ষণে দুর্বলতা: রাবির স্মৃতিশক্তি প্রখর না হলে, কিংবা তিনি হাদিস ওলটপালট করে ফেললে বা অতিমাত্রায় ভুল করলে।
২. চরিত্রগত ত্রুটি: রাবি মিথ্যাবাদী, মিথ্যায় অভিযুক্ত বা পাপাচারী (ফাসিক) হলে। এর স্তরভেদ আছে:
– প্রমাণিত মিথ্যাবাদীর হাদিস মাওযূ (اَلْمَوْضُوعُ) বা জাল।
– মিথ্যায় অভিযুক্ত রাবির হাদিস মাতরূক (اَلْمَتْرُوكُ) বা পরিত্যক্ত।
৩. অজ্ঞাত রাবি: রাবির পরিচয় বা অবস্থা জানা না থাকলে (اَلْمَجْهُولُ)।
৪. কিতাব বা পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণে ত্রুটি: রাবি নিজের লিখিত কিতাব বা পাণ্ডুলিপি ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে না পারলে।
▪️আধুনিক যুগে সাধারণ মানুষ কীভাবে চিনবে?
সাধারণ মুসলিমদের পক্ষে মূল আরবি সনদ যাচাই করা কঠিন। তাই সহজ উপায় হলো মুহাদ্দিসদের রায় দেখা:
– হাদিসের কিছু কিতাবের সংস্করণে বর্তমান যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণের (যেমন আল্লামা আলবানি, শায়খ শুআইব আরনাউত) হুকুম বা তাহকিক পাওয়া যায়। সেখানে হাদিসের পাশে “জঈফ” (ضَعِيفٌ) লেখা থাকলে সহজেই চেনা যায়।
– সুনানে তিরমিজিতে ইমাম তিরমিজি নিজেও অনেক হাদিসের মান উল্লেখ করেছেন।
▪️জঈফ মানেই কি সর্বদা প্রত্যাখ্যাত?
না, হালকা দুর্বলতার কোনো হাদিস যদি একাধিক সনদে সমর্থিত হয় তবে তা হাসান লিগাইরিহি (حَسَنٌ لِغَيْرِهِ) স্তরে উন্নীত হতে পারে। তবে মারাত্মক দুর্বলতার হাদিস (যেমন মিথ্যাবাদী রাবির) একাধিক সনদেও শক্তিশালী হয় না।
▪️আলেমদের মতভেদ থাকলে করণীয়:
কোনো হাদিসের মান নিয়ে মুহাদ্দিসগণের মতভেদ থাকলে একজন সাধারণ মুসলিমের করণীয়:
১. নির্ভরযোগ্য বিশেষজ্ঞের মত গ্রহণ:
হাদিসের মান সংখ্যার ভিত্তিতে নির্ণীত হয় না, হয় ইলমের গভীরতা ও দলিলের শক্তির ভিত্তিতে। তাই যে মুহাদ্দিসের তাহকিক অধিক নির্ভরযোগ্য ও উম্মাহর কাছে সমাদৃত, তাঁর মতকে অগ্রাধিকার দিন।
২. ইমান-আকিদা ও হালাল-হারামের ক্ষেত্রে সতর্কতা: এসব বিষয়ে কোনো হাদিস নিয়ে জোরালো মতভেদ থাকলে সেটির ওপর নির্ভর না করাই উত্তম। কারণ ইবাদত ও আকিদার ভিত্তি গ্রহণযোগ্য ও প্রমাণিত উৎসের ওপর হওয়া উচিত।
৩. ফাজায়েলের ক্ষেত্রে জঈফ হাদিস:
একদল আলেমের মতে কিছু শর্তে ফাজায়েলে (ভালো কাজের ফজিলতে) জঈফ হাদিস আমলযোগ্য। হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বর্ণনা অনুযায়ী শর্ত তিনটি:
– (ক) দুর্বলতা মারাত্মক না হওয়া।
– (খ) হাদিসটি কোনো প্রতিষ্ঠিত মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত হওয়া।
– (গ) আমলের সময় এটিকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে প্রমাণিত বলে বিশ্বাস না করা।
তবে অনেক মুহাদ্দিস ফাজায়েলের ক্ষেত্রেও জঈফ হাদিস অনুযায়ী আমল না করার পক্ষে মত দিয়েছেন, আর তাঁদের মতকেই অনেক মুহাদ্দিস অগ্রগণ্য মনে করেন। সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ফজিলতপূর্ণ আমলগুলোই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
৪. উদার মনোভাব: এটি ইজতিহাদি (গবেষণামূলক) বিষয়। কোনো আলেম একটি হাদিসকে সহিহ বললে আর অন্যজন জঈফ বললে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতর্ক বা কাদা ছোড়াছুড়ি করা উচিত নয়। উভয় পক্ষের আলেমদের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সঠিক ইলম অর্জনের এবং সুন্নাহর ওপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

Translate