October 13, 2026

সোশ্যাল মিডিয়ায় ইমোজি বা স্টিকার ব্যবহারের শরয়ি বিধান

 সোশ্যাল মিডিয়ায় ইমোজি বা স্টিকার ব্যবহারের শরয়ি বিধান, শিষ্টাচার এবং কিছু ইমোজির ব্যাপারে বিশেষ সতর্কবার্তা:

প্রশ্ন: সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখালেখি বা পোস্টে বিভিন্ন ধরনের ইমোজি ব্যবহার করার শরয়ি হুকুম কী?
উত্তর: সোশ্যাল মিডিয়ায় (যেমন ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার) লেখালেখি বা চ্যাটিংয়ের সময় ইমোজি ব্যবহারের বৈধতা মূলত এর ধরন ও ব্যবহারের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে।
ইমোজি ব্যবহারের হুকুমকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:
❑ ১. সাধারণ বা প্রতীকী ইমোজি:
যেসব ইমোজিতে মানুষের স্পষ্ট বা পূর্ণাঙ্গ চেহারা থাকে না বরং কেবল কিছু রেখা বা চিহ্নের মাধ্যমে হাসিমুখ, কান্নামুখ বা অন্যান্য অনুভূতি প্রকাশ করা হয় (যেমন ☺️, 😉, 😭, 👍), সেগুলো ব্যবহারের সাধারণ অনুমতি রয়েছে। কারণ ইসলামে প্রাণীর ছবি বা ভাস্কর্য তৈরি ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ হলেও ফকিহদের মতে এই প্রতীকী ইমোজিগুলো কোনো বাস্তবসম্মত প্রাণীর ছবি বা পূর্ণাঙ্গ অবয়বের অন্তর্ভুক্ত নয়। এগুলো মূলত মানুষের মনের ভাব প্রকাশের সংক্ষিপ্ত আধুনিক রূপ বা সংকেতমাত্র। সমসাময়িক অনেক আলেমের মতে, এগুলো ডিজিটাল চিহ্ন হওয়ায় নিষিদ্ধ ছবির অন্তর্ভুক্ত হবে না। অনুরূপভাবে যেসব ইমোজিতে অশ্লীলতার ইঙ্গিত, বিধর্মীদের ধর্মীয় প্রতীক বা ইসলামের নৈতিকতা ও যেগুলো মূল্যবোধের সাথে সাংঘর্ষিক নয় সেগুলো ব্যবহারে কোনও বাধা নেই ইনশাআল্লাহ।
❑ ২. স্পষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বা প্রাণীর পূর্ণাঙ্গ অবয়ববিশিষ্ট ইমোজি:
যেসব ইমোজি বা স্টিকারে মানুষের পূর্ণাঙ্গ শরীর, হাত-পা বা জীবন্ত কোনো প্রাণীর স্পষ্ট ছবি ফুটিয়ে তোলা হয় (যেমন মানুষের নাচ বা দৌড়ানোর স্টিকার, বিড়াল, কুকুর বা অন্যান্য জীবন্ত প্রাণীর ইমোজি), সেগুলো বর্জন করা জরুরি। কেননা হাদিসে স্পষ্ট চেহারা বা অবয়ববিশিষ্ট প্রাণীর ছবি আঁকা বা প্রদর্শনের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ أَشَدَّ أَهْلِ النَّارِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ
“কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হবে ছবি প্রস্তুতকারীরা।” [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৫২]
অন্য হাদিসে এসেছে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لاَ تَدْخُلُ الْمَلاَئِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلاَ تَصَاوِيرُ
“ফেরেশতারা সেই ঘরে প্রবেশ করেন না, যে ঘরে কোনো কুকুর বা (প্রাণীর) ছবি থাকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩২২৫)
❑ ৩. ভিন্ন ধর্মের প্রতীক, অশ্লীল বা নিষিদ্ধ বিষয়ের ইমোজি:
দৈনন্দিন যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইমোজি বহুল ব্যবহৃত হলেও এমন কিছু ইমোজি রয়েছে, যেগুলো সরাসরি শিরক, কুফর, হারাম বস্তু কিংবা অকল্যাণকর বিশ্বাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। এগুলো ব্যবহার করা হারাম।
ক. শিরক ও অন্য ধর্মের উপাসনা বা উপাস্য সম্পর্কিত ইমোজি:
যেসব প্রতীক অন্য ধর্মের উপাস্য, তাদের ধর্মীয় রীতিনীতি বা পৌত্তলিক বিশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে সেগুলো ব্যবহার জায়েজ নেই। যেমন:
● ওম (🕉️): হিন্দু ধর্মের পবিত্র ও প্রধান প্রতীক, যা তাদের উপাসনার সঙ্গে সম্পৃক্ত।
● অন্যান্য ধর্মীয় প্রতীক (☸️, ☯️, 🕎, 🔯, ⛩️): বৌদ্ধ ধর্মের ধর্মচক্র, তাওবাদের ইয়িন-ইয়াং, ইহুদি ধর্মের মেনোরাহ বা স্টার অব ডেভিড এবং শিন্তো ধর্মের তোরি তোরণ। এসব ইমোজি ভিন্ন ধর্মের স্থান বা বিশ্বাসের রূপক সুতরাং মুসলিম হিসেবে এগুলো ব্যবহার থেকে দূরে থাকা অপরিহার্য।
● প্রতিমা বা মূর্তিসদৃশ প্রতীক (🗿): প্রাচীন পৌত্তলিক মোয়াই মূর্তি, যা মূর্তিপূজার প্রতীকী রূপ তুলে ধরে।
খ. ভাগ্যগণনা, জ্যোতিষশাস্ত্র ও গায়েবি বিশ্বাসের ইমোজি:
ইসলামে হাত দেখা, রাশিফল বা ভবিষ্যৎ গণনার মতো বিষয় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন,
«مَنْ أَتَى عَرَّافًا فَسَأَلَهُ عَنْ شَيْءٍ، لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً»
“যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গেল এবং তাকে কোনো বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল তার চল্লিশ দিন তার সালাত কবুল হবে না।” [সহিহ মুসলিম: ২২৩]
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন,
«مَنْ أَتَى كَاهِنًا، أَوْ عَرَّافًا، فَصَدَّقَهُ بِمَا يَقُولُ، فَقَدْ كَفَرَ بِمَا أُنْزِلَ عَلَى مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ»
“যে ব্যক্তি কোনো গণক বা ভবিষ্যৎবক্তার কাছে গেল এবং সে যা বলে তা সত্য বলে বিশ্বাস করল, সে যেন মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওপর যা অবতীর্ণ হয়েছে, তার সঙ্গে কুফরি করল।” [মুসনাদে আহমাদ: ৯৫৩৬]
● রাশিচক্রের প্রতীকসমূহ (♈, ♉, ♊, ♋, ♌, ♍, ♎, ♏, 🏹, ♑, ♒, ♓): বারোটি রাশিফল ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় বিশ্বাস প্রকাশ করে, যা ইসলামি আকিদা পরিপন্থী।
● জাদুকরি ও ভাগ্যগণনার সরঞ্জাম (🔮): স্ফটিক বল বা ক্রিস্টাল বল, যা জাদুটোনা, গায়েবি খবর জানার দাবি ও ভবিষ্যৎ গণনায় ব্যবহৃত হয়।
গ. হারাম পানীয়, খাদ্য ও নিষিদ্ধ বস্তু:
যেসব বস্তু ইসলামে স্পষ্টভাবে হারাম সেগুলোর কোনো রূপক ব্যবহার বা প্রচার করা জায়েজ নাই। যেমন:
● মদের বোতল ও ককটেল (🍾, 🍷, 🍸, 🍹): যেকোনো ধরনের মদ বা নেশাজাতীয় পানীয়ের প্রতীক।
● শূকর বা শূকরের মুখ (🐖, 🐷, 🥓): শূকর ও শূকরের গোশত (বেকন) সংক্রান্ত প্রতীক।
◈ ঘ. গায়েব, জাদু ও অশুভ লোকবিশ্বাস সম্পর্কিত ইমোজি:
● জাদুকরি ক্ষমতার প্রতীক (🧙, 🧙‍♂️, 🧙‍♀️): জাদুবিদ্যা ও জাদুকর সম্পর্কিত ইমোজি, যা ইসলামি আকিদার পরিপন্থী।
● অশুভ চোখ বা বদনজর থেকে বাঁচার প্রতীক নজর তাবিজ (🧿): ইসলামে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর মাধ্যমে ক্ষতি থেকে বাঁচার বিশ্বাস করা বা এ জাতীয় কুসংস্কারমূলক জিনিস ব্যবহার নিষিদ্ধ।
ঙ. অনৈতিক ও শালীনতাবিরোধী আচরণ বা অঙ্গভঙ্গি:
● মধ্যমা আঙুল বা অশালীন হাত (🖕): অশ্লীল ও অনৈতিক অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শনকারী প্রতীক।
● সমকামিতা বা সমকামী সম্পর্কের প্রতীক (🏳️‍🌈, 🏳️‍⚧️, 👨‍❤️‍👨, 👩‍❤️‍👩): ইসলামে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ ও কবিরা গুনাহ হিসেবে ঘোষিত আচার-আচরণ ও জীবনরীতির প্রতিনিধিত্বকারী পতাকা ও প্রতীকসমূহের ইমোজি ব্যবহার জায়েজ নেই। মুসলিম হিসেবে নিজের কথা, বার্তা ও প্রকাশের ক্ষেত্রে সচেতন থাকা আবশ্যক, যাতে অজান্তেও কোনো শিরকি, হারাম বা অশালীন বিষয় ব্যবহার না করি।
◈ চ. জুয়া, অনৈতিক ইঙ্গিত ও অশ্লীলতাসূচক ইমোজি।
কিছু উদাহরণ:
১. জুয়া ও হারাম কাজের প্রচারমূলক ইমোজি। অনলাইন ক্যাসিনো, বেটিং বা জুয়ার বিজ্ঞাপনে সাধারণত এই ইমোজিগুলো দেখা যায়:
🎰 ক্যাসিনো/স্লট মেশিন: জুয়া বা স্লট গেম বোঝাতে সর্বাধিক ব্যবহৃত।
🎲 পাশা/ডাইস: যেকোনো ধরনের বাজি বা ভাগ্যের খেলার প্রচারণায় ব্যবহৃত।
🃏 জোকার/তাসের কার্ড: তাস খেলা বা জুয়ার বোর্ড গেমের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত।
🎴 ফ্লাওয়ার কার্ড: জাপানি বা এশীয় ঐতিহ্যবাহী বেটিং গেমে দেখা যায়।
💸 / 🤑 / 💰 উড়ন্ত টাকা বা টাকার থলি: সহজে অর্থ আয় বা জুয়ায় জয়ের লোভ দেখানোর প্রতীক।
২. অশ্লীল ইশারা বা অঙ্গভঙ্গিসূচক ইমোজি সরাসরি অভদ্র বা অশালীন ইঙ্গিত দিতে ডিজিটাল যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়:
🖕 মধ্যমা অঙ্গুলি: সরাসরি অভদ্র ও অশ্লীল অঙ্গভঙ্গির প্রতীক।
🍑 পিচ/ফল: নিতম্ব নির্দেশক হিসেবে ব্যবহৃত।
🍆 বেগুন: পুরুষের যৌনাঙ্গ বোঝাতে অশালীন ইঙ্গিতে ব্যবহৃত।
🍌 কলা: অনৈতিক বা সস্তা ইঙ্গিতে ব্যবহৃত আরেকটি ফলভিত্তিক ইমোজি।
💦 পানির ফোঁটা: শারীরিক সম্পর্কের অশালীন ইঙ্গিত প্রকাশে ব্যবহৃত।
এগুলো হারাম উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা জায়েজ নয়।
৩. অশালীন অনুভূতি প্রকাশক ইমোজির সংমিশ্রণ একক ইমোজির পাশাপাশি একাধিক ইমোজি একত্রে ব্যবহার করেও অশালীন বার্তা বা প্ররোচনা প্রকাশ করা হয়:
🍆💦 — অশালীন শারীরিক ইঙ্গিত বোঝাতে।
👈👌 — অনৈতিক শারীরিক সম্পর্কের সংকেত হিসেবে ব্যবহৃত অশালীন হাতের ইঙ্গিত।
🍑👋 — অশালীন অঙ্গভঙ্গি বা অনৈতিক আচরণের প্রকাশ।
🎰💸 — “জুয়া খেলে কোটিপতি হওয়া যায়” জাতীয় লোভনীয় বিজ্ঞাপনী বার্তা।
এ জাতীয় যেকোনো অশ্লীল ইশারা বা অশালীন অনুভূতিসূচক ইমোজি এড়িয়ে চলা কর্তব্য।
❑ ইমোজি ব্যবহারের ক্ষেত্রে জরুরি শিষ্টাচার ও সতর্কতা:
জায়েজ ইমোজি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একজন মুসলিমকে সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে:
১) কাউকে অপমান, উপহাস বা হেয় করার উদ্দেশ্যে ইমোজি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ; যেমন কারও গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট বা যৌক্তিক মন্তব্যে অবজ্ঞাসূচক হাসির ইমোজি দেওয়া।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে কাউকে উপহাস করতে নিষেধ করেছেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ
“হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অপর কোনো পুরুষকে উপহাস না করে…।” [সুরা হুজুরাত: ১১]
২) ফিতনা এড়াতে গায়রে মাহরাম নারী-পুরুষের পারস্পরিক চ্যাটিং বা মন্তব্যের ঘরে আবেগঘন বা ভালোবাসাসূচক ইমোজি (যেমন: ❤️, 😘, 😍) ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে ফিতনা ও অনৈতিকতার পথ সুগম হয়।
৩) অকারণে অতিরিক্ত ইমোজি ব্যবহার করা অনুচিত; একজন মুমিনের কথাবার্তা ও লেখায় গাম্ভীর্য ও শালীনতা বজায় থাকা বাঞ্ছনীয়।
সারকথা, যেসব ইমোজিতে ফিতনা, অশ্লীলতা, অন্য ধর্মের প্রতীক বা মানুষের স্পষ্ট অবয়ব নেই সাধারণ যোগাযোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে সেসব প্রতীকী ইমোজি ব্যবহার করা জায়েজ। তবে তাকওয়ার খাতিরে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইমোজি বা স্টিকারের অতিরিক্ত ব্যবহার এড়িয়ে চলাই উত্তম। আল্লাহু আলাম।
◯ শাইখ আব্দুল আজিজ ফারহান:
হোয়াটসঅ্যাপের ইমোজি ও ফেরেশতা নির্দেশক প্রতীকের ব্যবহার সংক্রান্ত বিধান:
প্রশ্ন: হোয়াটসঅ্যাপে যেসব ইমোজি বা প্রতীক ব্যবহার করা হয় যেমন বিভিন্ন ধরণের মুখাবয়ব, কিংবা ফেরেশতা বোঝাতে ডানাওয়ালা কোনো মেয়ের ছবি…এগুলো আদান-প্রদান করার বিষয়ে শরিয়তের বিধান কী?
উত্তর: প্রিয় বোন, বারাকাল্লাহ ফীক (আল্লাহ আপনাকে বরকত দান করুন)। হোয়াটসঅ্যাপ বা অন্যান্য অনলাইন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেসেজ কিংবা অনুভূতির ভাব প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত সাধারণ ইমোজি বা প্রতীকী মুখাবয়ব পাঠাতে কোনো সমস্যা নেই। যদিও কিছু আলেম এটিকে নিষিদ্ধ মনে করেন তবে অধিকতর স্পষ্ট ও সঠিক মত হলো, এটি ব্যবহারে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ এসব ইমোজি কোনো প্রাণী বা মানুষের প্রকৃত ছবি বা প্রতিচ্ছবি নয়। এগুলো মূলত কয়েকটি সাধারণ রেখা ও বিন্দুর সমষ্টি, যার মাধ্যমে সংক্ষিপ্তভাবে চোখ, নাক বা মুখের ইঙ্গিত করা হয় মাত্র। বাস্তবে মানুষের চেহারা যেভাবে গঠিত হয়, এটি মোটেও সেরকম নয়। তাই সাধারণ অনুভূতির প্রতীক হিসেবে ইমোজি ব্যবহারে কোনো বাধা নেই। তবে ফেরেশতাদের প্রসঙ্গ বোঝাতে দুই ডানাওয়ালা কোনো মেয়ের ছবি বা ইমোজি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েজ।
ফেরেশতাদেরকে নারী রূপ দেওয়া বা আল্লাহর কন্যা মনে করা মুশরিকদের ভ্রান্ত আকিদা। কাফের-মুশরিকদের এই অসত্য ধারণাকে সমর্থন করে ফেরেশতা বোঝাতে ডানাওয়ালা নারীর ছবি ব্যবহার করা কোনো মুসলিমের জন্য জায়েজ হতে পারে না। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ সেইসব মুশরিকদের চরম নিন্দা করেছেন, যারা ফেরেশতাদেরকে নারী হিসেবে গণ্য করত এবং আল্লাহর সাথে কন্যাসন্তান সম্পর্কিত করত।
তাছাড়া ফেরেশতাদের প্রকৃত গঠন আমাদের অজানা নয়। আল্লাহ তাআলা তাদের দুই, তিন, চার বা ততোধিক ডানা দান করেছেন; এমনকি হযরত জিবরিল (আলাইহিস সালাম)-এর ছয়শত ডানা রয়েছে। কাজেই কাল্পনিক কোনো নারীর ছবি দিয়ে ফেরেশতা রূপায়ন করা একাধারে মিথ্যাচার ও আকিদাগত অপরাধ। তাই সাধারণ ইমোজি ব্যবহারে শিথিলতা থাকলেও, ফেরেশতাদের প্রতীক হিসেবে ডানাওয়ালা নারীর ছবি ব্যবহার করা থেকে সম্পূর্ণ সতর্ক ও বিরত থাকা আবশ্যক।” [সোর্স: ইউটিউব চ্যানেল: قناة منهج الحق]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

পুরুষ শিক্ষক কর্তৃক মেয়েদের অনলাইনে কিংবা অফলাইনে পাঠদান করার বিধান

 পুরুষ শিক্ষক কর্তৃক মেয়েদের (অনলাইনে কিংবা অফলাইনে) পাঠদান করার বিধান। সৌদি আরবের দাওয়াহ, গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি।

প্রশ্ন: সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটির ফতওয়ায় বলা হয়েছে: “কোনো পুরুষের জন্য মেয়েদেরকে সরাসরি (সামনাসামনি) পাঠদান করা বৈধ নয়। কারণ এতে রয়েছে বিশাল বিপদ ও ভয়াবহ পরিণতি।” [ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমাহ, ১২/১৮২] এই লেখাটা বা এমন কিছু লেখা কিছু বোন অনলাইনে প্রচার করছে। এই কথার প্রকৃত অর্থ কী? মেয়েরা কি কোনো পুরুষ আলেমের কাছে ইলম নিতে পারবে যদি পর্দার ব্যবস্থা থাকে বা ফেতনার আশঙ্কা না করে? দয়া করে এর সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে দিয়ে সবাইকে উপকৃত করবেন।
উত্তর: সৌদি আরবের সৌদি আরবের দাওয়াহ, গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ)-এর উপরোক্ত ফতওয়াটির মর্মার্থ পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝা যায় তাদের বিস্তারিত ফতওয়ায়।
তাই এই সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ ফতওয়াটি প্রদান করা হলো:
ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমাহ-তে এসেছে:
لَا يَجُوزُ لِلرَّجُلِ تَدْرِيسُ الْبَنَاتِ مُبَاشَرَةً؛ لِمَا فِي ذَلِكَ مِنَ الْخَطَرِ الْعَظِيمِ وَالْعَوَاقِبِ الْوَخِيمَةِ
“কোনো পুরুষের জন্য মেয়েদেরকে সরাসরি পাঠদান করা জায়েজ নয়। কেননা এতে রয়েছে বিরাট বিপদ ও ভয়াবহ পরিণতি।” [ফাতাওয়া লাজনা দায়েমা: ১২/১৪۹]
◈ أَوَّلًا: الِاخْتِلَاطُ بَيْنَ الرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ فِي الْمَدَارِسِ أَوْ غَيْرِهَا مِنَ الْمُنْكَرَاتِ الْعَظِيمَةِ، وَالْمَفَاسِدِ الْكَبِيرَةِ فِي الدِّينِ وَالدُّنْيَا، فَلَا يَجُوزُ لِلْمَرْأَةِ أَنْ تُدَرِّسَ أَوْ تَعْمَلَ فِي مَكَانٍ مُخْتَلَطٍ بِالرِّجَالِ وَالنِّسَاءِ، وَلَا يَجُوزُ لِوَلِيِّهَا أَنْ يَأْذَنَ لَهَا بِذَلِكَ.
▪️“প্রথমত: স্কুল/মাদ্রাসা বা অন্য যেকোনো স্থানে পুরুষ ও নারীর অবাধ মেলামেশা একটি গুরুতর গর্হিত কাজ এবং দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ের জন্যই চরম ক্ষতির কারণ। সুতরাং কোনো নারীর জন্য পুরুষ-নারীর সহবাস্থান রয়েছে এমন জায়গায় পড়ানো বা কাজ করা জায়েজ নয় এবং তার অভিভাবকের জন্যও তাকে এ ব্যাপারে অনুমতি দেওয়া জায়েজ নয়।”
◈ ثَانِيًا: لَا يَجُوزُ لِلرَّجُلِ أَنْ يُعَلِّمَ الْمَرْأَةَ وَهِيَ لَيْسَتْ مُتَحَجِّبَةً، وَلَا يَجُوزُ أَنْ يُعَلِّمَهَا خَالِيًا بِهَا وَلَوْ كَانَتْ بِحِجَابٍ شَرْعِيٍّ، وَالْمَرْأَةُ عِنْدَ الرَّجُلِ الْأَجْنَبِيِّ عَنْهَا كُلُّهَا عَوْرَةٌ، أَمَّا سَتْرُ الرَّأْسِ وَإِظْهَارُ الْوَجْهِ فَلَيْسَ بِحِجَابٍ كَامِلٍ.
▪️“দ্বিতীয়ত: কোনো পুরুষের জন্য বেপর্দা নারীকে শিক্ষা দেওয়া জায়েজ নয় এবং শরয়ি পর্দা থাকা সত্ত্বেও তার সাথে নির্জনে থেকে শিক্ষা দেওয়াও জায়েজ নয়। কেননা গায়রে মাহরাম পুরুষের সামনে নারীর সমগ্র শরীরই গোপনীয় (আওরাহ); শুধু মাথা ঢেকে মুখ প্রকাশ করা পূর্ণাঙ্গ পর্দা নয়।”
◈ ثَالِثًا: لَا حَرَجَ فِي تَعْلِيمِ الرَّجُلِ الْمَرْأَةَ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ فِي مَدَارِسَ خَاصَّةٍ بِالنِّسَاءِ، لَا اخْتِلَاطَ فِيهَا بَيْنَ الطُّلَّابِ وَالطَّالِبَاتِ، وَلَا الْمُعَلِّمِ وَالْمُتَعَلِّمَاتِ. وَإِنِ احْتَجْنَ لِلتَّفَاهُمِ مَعَهُ؛ فَيَكُونُ عَبْرَ شَبَكَاتِ الِاتِّصَالِ الْمُغْلَقَةِ، وَهِيَ مَعْرُوفَةٌ وَمُتَيَسِّرَةٌ، أَوْ عَبْرَ الْهَاتِفِ، لَكِنْ يَجِبُ أَنْ يُحَذَّرَ الطَّالِبَاتُ مِنَ الْخُضُوعِ بِالْقَوْلِ بِتَحْسِينِ الْكَلَامِ وَتَلْيِينِهِ.
▪️“তৃতীয়ত: নারীদের জন্য নির্ধারিত এমন স্কুল/মাদ্রাসা যেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে বা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মাঝে কোনো মিশ্রণ নেই সেখানে পর্দার আড়াল থেকে পুরুষ কর্তৃক নারীকে শিক্ষা দেওয়াতে কোনো অসুবিধা নেই।
🔹 প্রয়োজনে শিক্ষকের সাথে যোগাযোগের জন্য সুপরিচিত ও সহজলভ্য ক্লোজড-সার্কিট নেটওয়ার্ক বা ইন্টারকম অথবা টেলিফোন ব্যবহার করা যাবে। তবে ছাত্রীদের অবশ্যই কণ্ঠস্বর কোমল ও আকর্ষণীয় করে কথা বলা থেকে সতর্ক থাকতে হবে।” (ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমাহ: ১২/১৫৬) [সোর্স: islamqa info]
❑ উপরোক্ত ফতওয়ার সারাংশ হল:
১. আড়াল বা পর্দা ছাড়া পুরুষ শিক্ষক কর্তৃক মেয়েদের সরাসরি পাঠদান করা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী-পুরুষের অবাধ মিশ্রণ শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। এমনকি পূর্ণাঙ্গ শরয়ী পর্দা থাকা সত্ত্বেও কোনো নারীর সাথে একান্তে বা নির্জনে অবস্থান করে পড়ানো জায়েজ নয়।
২. শুধু নারীরা আছে এমন পরিবেশে পর্দার আড়াল থেকে কিংবা ইন্টারকম ও ফোনে (বর্তমান যুগে বিভিন্ন মেসেজিং প্লাটফর্ম) পুরুষ শিক্ষক পাঠদান করতে পারবেন। তবে এ ক্ষেত্রে ছাত্রীদের কথা বলার সময় কণ্ঠস্বর কোমল বা আকর্ষণীয় করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে এবং কেবল প্রয়োজন সাপেক্ষেই যোগাযোগ করা যাবে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

মুসলিম যুবক অবৈধভাবে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে অন্য দেশে যাওয়ার জন্য সমুদ্রপথে যাত্রা করার সময় পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করলে কি তাকে শহীদ হিসেবে গণ্য করা হবে

 প্রশ্ন: কোনো মুসলিম যুবক অবৈধভাবে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে ইতালিতে যাওয়ার জন্য সমুদ্রপথে যাত্রা করার সময় পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করলে, শরিয়তের দৃষ্টিতে কি তাকে শহীদ হিসেবে গণ্য করা হবে?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর, ইসলামী শরিয়তে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী মুসলিম ব্যক্তিকে শহীদদের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়েছে। তবে শুধু পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার কারণে আমরা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ‘শহীদ’ বলে ঘোষণা করব না; কারণ তার প্রকৃত পরিণতি সম্পর্কে আমরা অবগত নই। কিন্তু সাধারণভাবে বলা যায়, যে মুসলিম ব্যক্তি পানিতে ডুবে মারা যায়, সে শহীদ।ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুমাল্লাহ) আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «الشُّهَدَاءُ خَمْسَةٌ: الْمَطْعُونُ، وَالْمَبْطُونُ، وَالْغَرِيقُ، وَصَاحِبُ الْهَدْمِ، وَالشَّهِيدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ» অর্থাৎ, “শহীদ পাঁচ প্রকার: মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী, পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী এবং আল্লাহর পথে নিহত ব্যক্তি।”(সহীহ বুখারি, হাদীস নং ২৮২৯; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৯১৪)। সুতরাং, হাদীসের বাহ্যিক অর্থ অনুযায়ী, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী মুসলিম ব্যক্তি শহীদের মর্যাদা লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত। এ মর্যাদা লাভের জন্য তার সমুদ্রযাত্রা জিহাদ কিংবা শরিয়তসম্মত হিজরতের উদ্দেশ্যে হওয়া শর্ত নয়।তবে কোনো মুসলিম যুবক অবৈধভাবে অভিবাসনের উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা করার সময় পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করলে, তার ক্ষেত্রে ডুবে মৃত্যুবরণকারীর জন্য শহীদের মর্যাদা-সংক্রান্ত বিধান প্রযোজ্য হবে কি না,তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট শরয়ি নীতিমালা ও আলেমদের বক্তব্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।কেননা, এ ক্ষেত্রে একদিকে রয়েছে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীর জন্য হাদীসে বর্ণিত শহীদের মর্যাদা, অন্যদিকে রয়েছে সফরের উদ্দেশ্য, সমুদ্রযাত্রার নিরাপত্তা এবং যাত্রাকালে শরিয়তবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত হওয়ার বিষয়। এসব দিক বিবেচনায় নিয়ে আলেমদের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে এ বিষয়ে মূলত দুটি মত পাওয়া যায়।
.
প্রথম মত: একদল আলেমের মতে, গুনাহপূর্ণ উদ্দেশ্যে সফরে বের হওয়ার কারণে ওই ব্যক্তির জন্য শহীদের মর্যাদা প্রযোজ্য হবে না।
.
দ্বিতীয় মত: অন্য একদল আলেমের মতে, কেবল গুনাহপূর্ণ উদ্দেশ্যে সফরে বের হওয়া পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করার কারণে অর্জিত শহীদের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়; বরং মৃত্যুর সময় সে সরাসরি কোনো গুনাহে লিপ্ত ছিল কি না, তা বিবেচ্য।
.
শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃত্যু: ৭২৮ হি.)-কে এমন এক ব্যক্তি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, যিনি ব্যবসার উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা করেছিলেন এবং পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি কি শহীদ হিসেবে গণ্য হবেন? উত্তরে তিনি বলেন:
نعم، مات شهيدًا، إذا لم يكن عاصيًا بركوبه، فإنَّه قد صحَّ عن النَّبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: (الغريق شهيدٌ، والمبطون شهيدٌ، والحريق شهيدٌ، والميت بالطاعون شهيدٌ، والمرأة تموت في نفاسها شهيدةٌ، وصاحب الهدم شهيدٌ)، وجاء ذكر غير هؤلاء. وركوب البحر للتجارة جائزٌ إذا غلب على الظن السلامة، وأما بدون ذلك فليس له أن يركبه للتجارة، فإن فعل فقد أعان على قتل نفسه، ومثل هذا لا يقال: إنه شهيد، والله أعلم
“হ্যাঁ, তিনি শহীদ হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন—যদি সমুদ্রযাত্রা করার কারণে তিনি অবাধ্য (গুনাহগার) না হয়ে থাকেন। কেননা নবী (ﷺ) থেকে সহীহভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন:”পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, পেটের রোগে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, মহামারিতে মৃত্যুবরণকারী শহীদ, প্রসবকালীন অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী নারী শহীদ এবং ধসে পড়া স্থাপনার নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ।”এ ছাড়া আরও কয়েক শ্রেণির শহীদের কথাও বর্ণিত হয়েছে।ব্যবসার উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা করা জায়েয, যদি নিরাপদে যাত্রা সম্পন্ন হওয়ার প্রবল ধারণা থাকে। কিন্তু নিরাপদে যাত্রা সম্পন্ন হওয়ার এমন প্রবল ধারণা না থাকলে ব্যবসার উদ্দেশ্যে তার সমুদ্রপথে যাত্রা করা জায়েয নয়। সে যদি তা সত্ত্বেও যাত্রা করে, তবে সে নিজেকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার কাজে সহায়তা করেছে। এমন ব্যক্তিকে শহীদ বলা যায় না। আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।”—ইবনু তাইমিয়্যাহ, আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ২২)
.
খতীব আশ-শিরবীনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:
واستثنى بعضهم من الغريق العاصي بركوبه البحر ، كأن كان الغالب فيه عدم السلامة ، أو استوى الأمران ، أو ركبه لشرب خمر , ومن الميتة بالطلق الحامل بزنا , والظاهر كما قال الزركشي فيما عدا الأخيرة , وفي الأخيرة أيضا أن ما ذكر لا يمنع الشهادة
“কিছু আলিম পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীদের মধ্য থেকে এমন ব্যক্তিকে ব্যতিক্রম করেছেন, যে পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করেছে। যেমন—এমন সমুদ্রপথে যাত্রা করা, যেখানে সাধারণত নিরাপদে ফিরে আসার সম্ভাবনা থাকে না, অথবা যেখানে নিরাপদে ফিরে আসা ও ধ্বংসের আশঙ্কা সমান; কিংবা মদপানের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রা করা। অনুরূপভাবে, ব্যভিচারের ফলে গর্ভবতী হওয়া কোনো নারীর প্রসববেদনার সময় মৃত্যুবরণকেও ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আল-জারকাশী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বক্তব্যের আলোকে, শেষোক্ত বিষয়টি ছাড়াও অন্যান্য ক্ষেত্রে এবং এমনকি শেষোক্ত ক্ষেত্রেও সঠিক অভিমত হলো—উল্লিখিত বিষয়গুলোর কোনোটিই শাহাদাতের মর্যাদা লাভের অন্তরায় নয়।”(খতীব আশ-শিরবীনী (রাহিমাহুল্লাহ), মুগনিল মুহতাজ, ২/৩৪)
.
হাশিয়াতুল বুজাইরিমি ‘আলাল-খতীব’-এ এসেছে:
قوله : (كالغريق) أي ولو كان عاصيا بركوب البحر ، كأن ركب سفينة لا يسير مثلها في ذلك البحر لصغرها أو ثقلها . والعصيان بالتعدي بالركوب في هذه الحالة لا ينافي حصول الشهادة . ثم نقل عن بعض علماء الشافعية قوله : (كالغريق) ما لم يسيّر السفينة في وقت الغرق , ولا يمنع من شهادته ركوبها لشرب الخمر إن لم يمت بشرق ب
“তাঁর এই বাণী: ‘(পানিতে ডুবে মারা যাওয়া ব্যক্তির মতো)’— অর্থাৎ, সমুদ্রযাত্রার কারণে সে পাপিষ্ঠ হয়ে থাকলেও (শহীদের মর্যাদা লাভ করবে)।যেমন,কেউ এমন কোনো নৌযানে আরোহণ করল, যা আকারে ছোট হওয়া কিংবা অতিরিক্ত ভারী হওয়ার কারণে ওই সমুদ্রে চলাচলের উপযোগী নয়। এ অবস্থায় (নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে) এমন নৌযানে আরোহণের মাধ্যমে সীমালঙ্ঘন করে গুনাহগার হওয়া তার শাহাদাতের মর্যাদা লাভের পরিপন্থী নয়।এরপর তিনি শাফেয়ী মাজহাবের কোনো কোনো আলেমের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন: “(ডুবে মারা যাওয়া ব্যক্তি’র হুকুম প্রযোজ্য হবে)— যতক্ষণ না সে ডুবির ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে নিজেই নৌকাটি পরিচালনা করে। আর আর মদ পান করার উদ্দেশ্যে নৌযানে আরোহণ করাও তার শাহাদাতের মর্যাদা লাভের প্রতিবন্ধক নয়, যদি না সে মদ পানের কারণে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়।”(সূত্র: হাশিয়াতুল বুজাইরিমি ‘আলাল-খতীব, ২/২৮১)
.
পরিশেষে বলা যায়, পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী মুসলিম ব্যক্তির জন্য হাদীসে শহীদের মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে অবৈধ অভিবাসনের উদ্দেশ্যে সমুদ্রপথে যাত্রা করার সময় কেউ ডুবে মারা গেলে, তার ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে কি না, তা এককথায় নির্ধারণ করা যায় না; বরং এ ক্ষেত্রে যাত্রার প্রকৃতি, নিরাপত্তার অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট শরয়ি বিধান বিবেচনা করা জরুরি। আলেমদের বক্তব্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গুনাহপূর্ণ বা শরিয়তবিরোধী পরিস্থিতিতে সমুদ্রযাত্রা করার কারণে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীর শহীদের মর্যাদা লাভের বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম এ ধরনের পরিস্থিতিকে শহীদের মর্যাদা লাভের প্রতিবন্ধক মনে করেছেন; অন্যদিকে, কোনো কোনো আলেমের বক্তব্য অনুযায়ী, সমুদ্রযাত্রায় গুনাহ সংঘটিত হওয়ামাত্রই পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারীর জন্য বর্ণিত শহীদের মর্যাদা নাকচ হয়ে যায় না। সুতরাং, শুধু অবৈধ অভিবাসনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার কারণে কোনো ব্যক্তির জন্য শহীদের মর্যাদা নিশ্চিতভাবে অস্বীকার করা যেমন সমীচীন নয়, তেমনি কেবল পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণ করার কারণে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিশ্চিতভাবে শহীদ ঘোষণা করাও সমীচীন নয়। বরং এ বিষয়ে আলেমদের মতভেদ ও সংশ্লিষ্ট শরয়ি নীতিমালা বিবেচনায় নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে বক্তব্য দেওয়া উচিত। আর নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থা ও পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহই সর্বাধিক অবগত।(আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৩৪০৪০)
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

আল্লাহকে রব ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট থাকা সংক্রান্ত দুআটি কখন পাঠ করা সুন্নাহ

 প্রশ্ন: আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে নবী হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট থাকা ব্যক্তির জন্য জান্নাত ওয়াজিব সংক্রান্ত দুআটি কখন পাঠ করা সুন্নাহ?

▬▬▬▬▬▬▬▬◖◉◗▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময়, অসীম দয়ালু মহান আল্লাহর নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহর জন্য এবং অগণিত দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি। অতঃপর— রাসূল (ﷺ) এর বানী:“رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا/رَسُولًا”অর্থ: “আমি আল্লাহকে রব হিসেবে, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে এবং মুহাম্মাদ ﷺ-কে নবী/রাসূল হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট।”এটি অত্যন্ত মহান, তাৎপর্যপূর্ণ ও ঈমানবর্ধক একটি বাক্য। এর মাধ্যমে বান্দা আল্লাহকে রব হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট থাকা, অর্থাৎ- তাঁর রবূবিয়্যাতের সকল বিষয়ের উপর সন্তুষ্ট থাকা। আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিষয়কে নিজের জন্য কল্যাণকর হিসেবে মেনে নেয়া। ইসলামকে তার দ্বীন হিসেবে মেনে নেওয়ার অর্থ হলো ইসলামের সকল আদেশ-নিষেধ ও বিধি-বিধানকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়া ও এসবের বিরুদ্ধাচরণ না করা। এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রসূল হিসেবে মেনে নেয়ার অর্থ তিনি বিশ্বাসগত এবং ‘আমলগত যেসব বিষয় নিয়ে আগমন করেছেন তার সব কিছুকেই মেনে নেয়া তার প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য প্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে এই বাক্যটি বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সব হাদিসে এই বাক্যটি একই প্রসঙ্গে, একই উদ্দেশ্যে কিংবা একই সময় পাঠ করার জন্য বর্ণিত হয়নি। কোনো বর্ণনায় এটি ঈমানের স্বাদ লাভের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়েছে; কোনো বর্ণনায় এর মাধ্যমে জান্নাত লাভের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে; আবার কোনো বর্ণনায় নির্দিষ্ট যিকির হিসেবে সকালে পাঠ করার কথা এসেছে। অনুরূপভাবে, আযানের পরও এ বাক্য পাঠের একটি স্বতন্ত্র হাদিস রয়েছে। সুতরাং, এ বিষয়ে সঠিক সুন্নাহ জানার জন্য প্রতিটি হাদিসের প্রসঙ্গ, শব্দরূপ ও পাঠের সময় পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
.
প্রথমত: “আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ ﷺ-কে নবী হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট”— এই মহান বাক্যটি রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে একাধিক সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তবে বিভিন্ন হাদিসে এর প্রসঙ্গ ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য এক নয়। কোনো কোনো বর্ণনায় এটি আল্লাহকে রব হিসেবে গ্রহণ করা, ইসলামকে দ্বীন হিসেবে মেনে নেওয়া এবং মুহাম্মাদ ﷺ-কে নবী হিসেবে স্বীকার করার প্রতি বান্দার সন্তুষ্টি ও ঈমানের প্রকাশ হিসেবে এসেছে। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় এটি নির্দিষ্ট যিকির হিসেবে পাঠ করার ফযীলত ও সময় বর্ণনা করতে এসেছে। এই প্রথম ধরনের বর্ণনাগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হাদিস রয়েছে।
.
(১).আব্বাস ইবনু আব্দুল মুত্তালিব (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:ذَاقَ طَعْمَ الإِيْمَانِ مَنْ رَضِىَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالإِسْلَامِ دِينًْا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا”যে ব্যক্তি আল্লাহকে রব হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) হিসাবে এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে রাসূল হিসাবে সন্তুষ্ট হয়েছে, সে ব্যক্তিই ঈমানের প্রকৃত স্বাদ পেয়েছে”।(সহীহ মুসলিম, হা/৩৪; তিরমিযী, হা/২৬২৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৭৭৮; সহীহ ইবনু হিব্বান, হা/১৬৯৪)
.
(২).আবূ সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন:قَالَ يَا أَبَا سَعِيْدٍ مَنْ رَضِىَ بِاللهِ رَبًّا وَبِالإِسْلَامِ دِيْنًا وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ”হে আবূ সাঈদ! যে ব্যক্তি এই বলে ঘোষণা করবে যে, আল্লাহকে রব হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে নবী হিসাবে পেয়ে আমি সন্তুষ্টি আছি, তাহলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব।”(সহীহ মুসলিম, হা/১৮৮৪; নাসাঈ, হা/৩১৩১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১১১৭; ইবনু হিব্বান, হা/৪৬১২)
.
লক্ষণীয় যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম হাদিসে বলেছেন: «وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا»—“এবং মুহাম্মাদকে রাসূল হিসেবে”, আর দ্বিতীয় হাদিসে বলেছেন: «وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا»—“এবং মুহাম্মাদকে নবী হিসেবে।” সুতরাং, কেউ যখন এই বাক্যটি উল্লেখ, উপস্থাপন বা সাব্যস্ত করতে চাইবে, তখন সে «وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولًا» অথবা «وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا»—উভয়ের যেকোনো একটি বলতে পারে; এতে কোনো আপত্তি নেই। কারণ ‘নবী’ ও ‘রাসূল’—উভয় শব্দই এখানে একই ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে ব্যবহৃত হয়েছে এবং উভয় শব্দের মাধ্যমেই হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে, যা উপরোক্ত আলোচনা থেকে সুস্পষ্ট।
.
দ্বিতীয়ত: এটি এমন একটি মাসনূন যিকির, যার শব্দ ও শব্দরূপ হাদিসে নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাই সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি হলো—যিকিরকারী হাদিসে বর্ণিত শব্দরূপেরই যথাযথ অনুসরণ করবেন এবং নিজের পক্ষ থেকে এর শব্দ পরিবর্তন করবেন না। এই যিকিরটি একাধিক স্থানে বর্ণিত হয়েছে; এর মধ্যে তিনটি স্থান সহিহ সূত্রে প্রমাণিত।
.
প্রথম স্থান: কোনো নির্দিষ্ট সময় বা স্থান নির্ধারণ না করে সাধারণভাবে এটি যিকির হিসেবে পাঠ করা। এ প্রসঙ্গে আবু দাউদ তাঁর সুনানে প্রখ্যাত সাহাবী আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:مَنْ قَالَ رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالإِسْلاَمِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولاً وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ ‏”‏ ‏ “যে ব্যক্তি বলে, আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মদ (ﷺ)-কে রাসূল হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছি, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে গেছে।”(সুনানে আবূ দাউদ, হাদিস নং ১৫২৯; শাইখ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) সহিহ আবু দাউদ (১৩৬৮)-এ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন। অতএব, এই বর্ণনায় ব্যবহৃত নির্দিষ্ট শব্দ হলো:وبمحمد رسولاً—‘মুহাম্মদকে রাসুল হিসেবে’; সুতরাং সুন্নাহসম্মত যিকির হিসেবে এই শব্দরূপটিই অনুসরণ করা উচিত।
.
দ্বিতীয় স্থান: মুআযযিনের আযান শোনার সময়। এ বিষয়ে ইমাম মুসলিম তাঁর সহীহ মুসলিমে সা’দ বিন আবূ ওয়াক্কাস (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত:তিনি বলেন, কোন ব্যক্তি মুয়াজ্জিনের আজান শোনার পর নিম্নোক্ত দোয়া পড়লে তার গুনাহ ক্ষমা করা হবে: ‏ “‏ مَنْ قَالَ حِينَ يَسْمَعُ الْمُؤَذِّنَ وَأَنَا أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُولُهُ رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالإِسْلاَمِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا غُفِرَ لَهُ ذَنْبُهُ ‏”‏ ‏ “আমি সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ ছাড়া কোন হক ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দেই যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে নবী হিসাবে পেয়ে সন্তুষ্ট”।(সহীহ মুসলিম হা/৩৮৬; ইবনে মাজাহ হা/৭২১)
.
তৃতীয় স্থান: সকালে উপনীত হলে এই যিকিরটি পাঠ করা। এ বিষয়ে ইমাম তবারানি তাঁর আল-মু‘জামুল কাবীর গ্রন্থে নবী ﷺ-এর সাহাবি মুনাইযির (রাদিয়াল্লাহু আনহু)—যিনি ইফরীকিয়ায় অবস্থান করতেন—এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে বলতে শুনেছি: «مَنْ قَالَ إِذَا أَصْبَحَ: رَضِيتُ بِاللَّهِ رَبًّا، وَبِالْإِسْلَامِ دِينًا، وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا، فَأَنَا الزَّعِيمُ لِأَخْذِ بِيَدِهِ حَتَّى أُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ» — “যে ব্যক্তি সকালে বলবে: ‘আমি আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মদ ﷺ-কে নবী হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে গ্রহণ করলাম’, আমি তার হাত ধরে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর দায়িত্ব গ্রহণ করলাম।”(আল-মু‘জামুল কাবীর (২০/৩৫৫) শায়খ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) সিলসিলাতুস সহিহাহ হা/২৬৮৬)-এ এই শব্দসহ হাদিসটিকে হাসান বলেছেন। সুতরাং এখানে বর্ণিত শব্দরূপটি হলো:وَبِمُحَمَّدٍ نَبِيًّا—অর্থাৎ, “মুহাম্মদ ﷺ-কে নবী হিসেবে।”
.
পরিশেষে জেনে রাখা উচিত—সকাল ও সন্ধ্যায় এটি পাঠ করার বিষয়ে কিছু বর্ণনা পাওয়া গেলেও সেগুলোর সনদে দুর্বলতা রয়েছে; এ কারণেই শায়খ আলবানী (রহিমাহুল্লাহ) সিলসিলাতুয-দঈফাহ (হাদিস নং ৫০২০)-এ সেগুলোকে দুর্বল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একইভাবে, অনেকের মুখে দু’আ হিসেবে «وبمحمد نبيًّا ورسولًا»—অর্থাৎ ‘মুহাম্মদকে নবী ও রাসূল হিসেবে’—এই শব্দদ্বয় একত্রে উচ্চারণ করতে দেখা যায়। কিন্তু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত কোনো সহিহ হাদিসে, দ্বীনের কোনো বিধান সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে কিংবা যিকির-আযকার ও অজিফার ক্ষেত্রে, «نبيًّا ورسولًا» শব্দদ্বয় একত্রে বলার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাই আমল ও যিকিরের ক্ষেত্রে আমাদের উচিত সহিহ ও প্রমাণিত বর্ণনার ওপরই নির্ভর করা এবং প্রমাণহীন শব্দ বা পদ্ধতি থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তা‘আলাই সর্বাধিক জ্ঞানী।
▬▬▬▬▬◄❖►▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

September 28, 2026

আমার নানা মৃত্যু October 25, 2025

"ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন"
আমার নানা মারা গিয়েছেন
October 25, 2025
এই পিকটা ২০২১ সালে আমাদের বাড়ি থেকে তোলা। মা' মারা যাওয়ার পর নানা এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে। তখনই আমি নানার ছবিটা তুলে রেখেছিলাম। আজ নানা আমাদের সবাইকে ছেড়ে মহান আল্লাহতালার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেলেন।
কর্মজীবনে আমার নানা পুরোটা সময়েই মসজিদের ইমামতির কাজে ব্যয় করেছেন।
মহান আল্লাহ তা'আলা এই মানুষটার জীবনের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিন এবং তাকে জান্নাতের সুউচ্চ মাকামে অধিষ্ঠিত করুন।




Translate