September 16, 2026

পিতামাতার কাছে পাওনা জন্ম থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সন্তানের ১৯ টি হক যা উল্লেখ করা হলো এগুলো পালন করা প্রত্যেক পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ

 

পিতামাতার কাছে পাওনা জন্ম থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত সন্তানের ১৯ টি হক যা উল্লেখ করা হলো এগুলো পালন করা প্রত্যেক পিতামাতার দায়িত্ব ও কর্তব্যঃ আল্লাহ তা‘আলা মানব জীবনকে সন্তান-সন্তুতির মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় করেছেন। পারিবারিক জীবনে সন্তান-সন্ততি কতবড় নিয়ামত তা যার সন্তান হয়নি তিনি সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করে থাকেন। যাদেরকে আল্লাহ রাববুল আলামীন সন্তান দান করেছেন তাদের উপর এক মহান দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে। পিতা-মাতার জন্য সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হবে যদি সন্তানকে আদর্শবান রূপে গড়ে না তুলতে পারেন। কেননা আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
«مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلاَّ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ ، أَوْ يُنَصِّرَانِهِ ، أَوْ يُمَجِّسَانِهِ»
প্রতিটি নবজাতক তার স্বভাবজাত দ্বীন ইসলামের ওপর জন্ম গ্রহণ করে। অতঃপর তার মা-বাবা তাকে ইয়াহূদী, নাসারা অথবা অগ্নিপূজক হিসেবে গড়ে তোলে [সহীহ বুখারী: ১৩৫৮]।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থা দিন দিন যেভাবে অপসংস্কৃতি, অনৈতিকতা এবং চরিত্র বিধ্বংসী কাজের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেখানে আমাদের সন্তানের উপর যেসব দায়িত্ব আছে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পালন করতে হবে। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত পন্থায় সন্তানকে লালন-পালন করা ঈমানের অন্যতম দাবী। আমাদের উপর সন্তানদের যে হকগুলো রয়েছে তা এখানে আলোচনা করা হলো :
 
১. কানে আযান দেয়া : সন্তান দুনিয়াতে আসার পর গোসল দিয়ে পরিষ্কার করে তার ডান কানে আযান দেয়া, তা ছেলে হোক বা মেয়ে হোক। এটি পিতা-মাতার উপর এজন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বযে, শিশুর কানে সর্বপ্রথম আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের আওয়াজ পৌঁছে দেয়া এবং ওত পেতে থাকা শয়তান যাতে তার কোন ক্ষতি না করতে পারে। হাদিসে এসেছে,
 
عَنْ عُبَيْدِ اللهِ بْنِ أَبِي رَافِعٍ ، عَنْ أَبِيهِ ، قَالَ : رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم «أَذَّنَ فِي أُذُنِ الْحَسَنِ بْنِ عَلِيٍّ حِينَ وَلَدَتْهُ فَاطِمَةُ بِالصَّلاَةِ».
আবূ রাফে রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হাসান ইবনে আলীর কানে আযান দিতে দেখেছি [সুনান আবূ দাউদ:৫১০৫]
 
২. সুন্দর নাম রাখা : বাচ্চার জন্য সুন্দর নাম নির্বাচন করা পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য। নাম অর্থবহ হওয়া নামের সৌন্দর্য। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন অনেক অসুন্দর নাম পরিবর্তন করে দিয়েছিলেন। [আবু দাউদ ৪৯৫২-৪৯৬১]
 
৩. আক্বিকা করা : ইসলামী সংস্কৃতির অন্যতম বিষয় হলো সন্তানের আকীকা করা। ছেলের পক্ষ থেকে ২টি ছাগল এবং মেয়ের পক্ষ থেকে ১টি ছাগল আল্লাহর নামে যবেহ করা। হাদীসে এসেছে,
عَنْ سَمُرَةَ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «كُلُّ غُلَامٍ رَهِينَةٌ بِعَقِيقَتِهِ تُذْبَحُ عَنْهُ يَوْمَ السَّابِعِ وَيُحْلَقُ رَأْسُهُ»
সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সকল নবজাতক তার আক্বিকার সাথে আবদ্ধ। জন্মের সপ্তম দিন তার পক্ষ থেকে জবেহ করা হবে। ঐ দিন তার নাম রাখা হবে। আর তার মাথার চুল কামানো হবে। [সুনান আবূ দাউদ: ২৮৩৮]
 
৪. সদকাহ করা : ছেলে হোক বা মেয়ে হোক সপ্তম দিবসে চুল কাটা এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ করা সুন্নাত। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান রা. এর পক্ষ থেকে ১টি বকরী আকীকা দিয়েছেন এবং বলেছেন, হে ফাতেমা ! তার মাথা মুণ্ডন কর এবং চুল পরিমাণ রৌপ্য সদকাহ কর। [সুনান আত-তিরমিযী: ১৫১৯] এছাড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদেরকে খেজুর দিয়ে তাহনীক এবং বরকতের জন্য দো‘আ করতেন। [সহীহ বুখারী: ৩৯০৯; মুসলিম: ২১৪৬]
 
৫. খাতনা করা : ছেলেদের খাতনা করানো একটি অন্যতম সুন্নাত। হাদীসে এসেছে,
عَنْ جَابِرٍ قَالَ : «عَقَّ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم عَنِ الْحَسَنِ وَالْحُسَيْنِ وَخَتَنَهُمَا لِسَبْعَةِ أَيَّامٍ».
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান এবং হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহুমার সপ্তম দিবসে আকীকা এবং খাতনা করিয়েছেন। [আল-মু‘জামুল আওসাত: ৬৭০৮]
 
৬. তাওহীদ শিক্ষা দেয়া : শিশু যখন কথা বলা আরম্ভ করবে তখন থেকেই আল্লাহর তাওহীদ শিক্ষা দতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে বলেন,
‘হে বৎস! আমি তোমাকে কয়েকটি বাক্য শিখাতে চাই। তুমি আল্লাহর অধিকারের হেফাযত করবে, আল্লাহও তোমার হেফাযত করবেন। তুমি আল্লাহর অধিকারের হেফাযত করবে, তুমি তাঁকে সর্বদা সামনে পাবে। যখন কোন কিছু চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন সহযোগিতা চাইবে তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর জেনে রাখ! যদি পুরো জাতি যদি তোমার কোন উপকার করার জন্য একতাবদ্ধ হয়, তবে তোমার কোন উপকার করতে সমর্থ হবে না, শুধু ততটুকুই করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর যদি পুরো জাতি যদি তোমার কোন ক্ষতি করার জন্য একতাবদ্ধ হয়, তবে তোমার কোন ক্ষতি করতে সমর্থ হবে না, শুধু ততটুকুই করতে পারবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। কলমের লিখা শেষ হয়েছে এবং কাগজসমূহ শুকিয়ে গেছে। [তিরমিযী: ২৫১৬]
 
৭. কুরআন শিক্ষা দান : ছোট বেলা থেকেই সন্তানকে কুরআন শিক্ষা দিতে হবে। কেননা কুরআন শিক্ষা করা ফরয। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের তিনটি বিষয় শিক্ষা দাও। তন্মধ্যে রয়েছে তাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা ও কুরআনের জ্ঞান দাও। [জামিউল কাবীর]
কুরআন শিক্ষা দেয়ার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই। উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:
«خَيْرُكُمْ مَنْ تَعَلَّمَ الْقُرْآنَ وَعَلَّمَهُ»
‘‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সেই যে নিজে কুরআন শিক্ষা করে ও অপরকে শিক্ষা দেয়।’’ [সহীহ বুখারী:৫০২৭]
 
৮. সলাত শিক্ষা দেয়া ও সলাত আদায়ে অভ্যস্ত করা : এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার যে পিতা-মাতা তার সন্তানকে সলাত শিক্ষা দিবেন এবং সলাত আদায়ে অভ্যস্ত করাবেন। হাদীসে এসেছে,
আমর ইবনে শূয়াইব রাদিয়াল্লাহু আনহু তার বাবা তিনি তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা তোমাদের সন্তানদের সলাতের নির্দেশ দাও সাত বছর বয়সে। আর দশ বছর বয়সে সলাতের জন্য মৃদু প্রহার কর এবং শোয়ার স্থানে ভিন্নতা আনো। [সুনান আবূ দাউদ: ৪৯৫]
 
৯. আদব বা শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়া : সন্তানদের আচরণ শিক্ষা দেয়া পিতামাতার উপর দায়িত্ব ও কর্তব্যের অন্তর্ভূক্ত। লুকমান আলাইহিস সালাম তার সন্তানকে বললেন, ‘আর তুমি মানুষের দিক থেকে তোমার মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না। আর যমীনে দম্ভভরে চলাফেরা করো না; নিশ্চয় আল্লাহ কোন দাম্ভিক, অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না। আর তোমার চলার ক্ষেত্রে মধ্যমপন্থা অবলম্বন কর, তোমার আওয়াজ নীচু কর; নিশ্চয় সবচাইতে নিকৃষ্ট আওয়াজ হল গাধার আওয়াজ।’ [ সূরা লুকমান ১৮,১৯]
 
১০.আদর স্নেহ ও ভালবাসা দেয়া : সন্তানদেরকে স্নেহ করা এবং তাদেরকে আন্তরিকভাবে ভালবাসতে হবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ইবনে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে চুম্বন দিলেন এবং আদর করলেন। সে সময় আকরা ইবনে হাবিস রাদিয়াল্লাহু আনহুও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বলতে লাগলেন, আমারতো দশটি সন্তান কিন্তু আমিতো কখনো আমার সন্তানদেরকে আদর স্নেহ করিনি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকালেন এবং বললেন, যে অন্যের প্রতি রহম করে না আল্লাহও তার প্রতি রহম করেন না। [সহীহ বুখারী: ৫৯৯৭]
 
১১. দ্বীনি ইলম শিক্ষা দেয়া : সন্তানকে দীনি ইলম শিক্ষা দেয়া ফরজ করা হয়েছে। কারণ দ্বীনি ইলম না জানা থাকলে সে বিভ্রান্ত এবং ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত হবে। হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى الله عَليْهِ وسَلَّمَ : «طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ»
আনাস বিন মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক মুসলিমের উপর জ্ঞানার্জন করা ফরয। [সুনান ইবন মাজাহ: ২২৪]
 
১২. প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন-পালন করা : সন্তানদেরকে প্রাপ্ত বয়স্ক পর্যন্ত লালন-পালন করতে হবে এবং তাদের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ করতে হবে।
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ هَلْ لِي مِنْ أَجْرٍ فِي بَنِي أَبِي سَلَمَةَ أَنْ أُنْفِقَ عَلَيْهِمْ وَلَسْتُ بِتَارِكَتِهِمْ هَكَذَا وَهَكَذَا إِنَّمَا هُمْ بَنِيَّ قَالَ: «نَعَمْ لَكِ أَجْرُ مَا أَنْفَقْتِ عَلَيْهِمْ»
উম্মে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমি জিজ্ঞাসা করলাম আবূ সালামার সন্তানদের জন্য আমি যদি খরচ করি এতে কি আমার জন্য প্রতিদান রয়েছে? নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ যতদিন তুমি খরচ করবে ততদিন তোমার জন্য প্রতিদান থাকবে। [সহীহ বুখারী: ৫৩৬৯]
 
১৩. সক্ষম করে তোলা : সন্তানদেরকে এমনভাবে সক্ষম করে গড়ে তোলা,তারা যেন উপার্জন করার মত যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। সা‘দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে এভাবে বলেছেন,
«إِنَّكَ أَنْ تَدَعَ وَرَثَتَكَ أَغْنِيَاءَ خَيْرٌ مِنْ أَنْ تَدَعَهُمْ عَالَةً يَتَكَفَّفُونَ النَّاسَ فِي أَيْدِيهِمْ»
তোমাদের সন্তান সন্ততিদেরকে সক্ষম ও সাবলম্বি রেখে যাওয়া, তাদেরকে অভাবী ও মানুষের কাছে হাত পাতা অবস্থায় রেখে যাওয়ার চেয়ে উত্তম। [সহীহ বুখারী:১২৯৫]
 
১৪. বিবাহ দেয়া : সুন্নাহ পদ্ধতিতে বিবাহ দেয়া এবং বিবাহর যাবতীয় কাজ সম্পাদন করা এবং উপযুক্ত সময়ে বিবাহর ব্যবস্থা করা। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে এভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, নিশ্চয়ই পিতার উপর সন্তানের হকের মধ্যে রয়েছে, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাকে বিবাহ দেবে। [জামিউল কাবীর]
 
১৫. দ্বীনের পথে পরিচালিত করা : পিতা-মাতার অন্যতম দায়িত্ব হলো সন্তানদেরকে দ্বীনের পথে, কুরআন-সুন্নাহর পথে পরিচালনা করা, দ্বীনের বিধান পালনের ক্ষেত্রে অভ্যস্ত করে তোলা। কুরআনে এসেছে,
﴿قُلۡ هَٰذِهِۦ سَبِيلِيٓ أَدۡعُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِۚ عَلَىٰ بَصِيرَةٍ أَنَا۠ وَمَنِ ٱتَّبَعَنِيۖ وَسُبۡحَٰنَ ٱللَّهِ وَمَآ أَنَا۠ مِنَ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ١٠٨﴾ [يوسف:108]
‘ বল, ‘এটা আমার পথ। আমি জেনে-বুঝে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত নই’। [সূরা ইউসুফ : ১০৮]
সন্তানকে দ্বীনের পথে পরিচালনার মাধ্যমে সওয়াব অর্জন করার এক বিরাট সুযোগ রয়েছে। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন,
«فَوَاللَّهِ لَأَنْ يُهْدَى بِكَ رَجُلٌ وَاحِدٌ خَيْرٌ لَكَ مِنْ حُمْرِ النَّعَمِ»
তোমার মাধ্যমে একজনও যদি হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়, তবে তা হবে তোমার জন্য লালবর্ণের অতি মূল্যবান উট থেকেও উত্তম। [সহীহ বুখারী]
 
১৬. সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করা : সন্তানগণ পিতামাতার কাছ থেকে ইনসাফ আশা করে এবং তাদের মাঝে ইনসাফ করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ে বিশেষভাবে সতর্ক করে বলেছেন, ‘তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তাদের মাঝে ইনসাফ করো’। [সহীহ বুখারী: ২৫৮৭]
 
১৭. ইসলাম অনুমোদন করে না এমন কাজ থেকে বিরত রাখা : ইসলাম অনুমোদন করে না এমন কাজ থেকে তাদেরকে বিরত না রাখলে এই সন্তানগনই কিয়ামাতে পিতামাতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। কুরআনে এসেছে,
﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا ﴾ [التحريم:6]
হে ইমানদারগণ! তোমরা তোমাদের নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। [সূরা আত-তাহরীম-৬]
আর কাফিররা বলবে, ‘হে আমাদের রব, জ্বিন ও মানুষের মধ্যে যারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে তাদেরকে আমাদের দেখিয়ে দিন। আমরা তাদের উভয়কে আমাদের পায়ের নীচে রাখব, যাতে তারা নিকৃষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়। [সূরা হা-মীম আসসিজদাহ-২৯ ]
 
১৮. পাপকাজ, অশ্লিলতা, বেহায়াপনা, অপসংস্কৃতি থেকে বিরত রাখা : সন্তান দুনিয়ার আসার সাথে সাথে শয়তান তার পেছনে লেগে যায় এবং বিভিন্নভাবে, ভিন্ন ভিন্ন রুপে,পোশাক-পরিচ্ছেদের মাধ্যমে, বিভিন্ন ফ্যাশনে, বিভিন্ন ডিজাইনে, বিভিন্ন শিক্ষার নামে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র করে। তাই পিতা-মাতাকে অবশ্যই এ বিষয়ে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন,
হে মুমিনগণ, তোমাদের স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিদের কেউ কেউ তোমাদের দুশমন। অতএব তোমরা তাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন কর। আর যদি তোমরা মার্জনা কর, এড়িয়ে যাও এবং মাফ করে দাও তবে নিশ্চয় আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল, অসীম দয়ালু। [সূরা তাগাবুন-১৪]
হাদীসে এসেছে,
ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী ও নারীর বেশ ধারণকারী পুরুষকে অভিসম্পাত করেছেন। [সহীহ বুখারী:৫৮৮৫]
আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم « مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ».
‘যে ব্যক্তি অন্য জাতির সাথে সা-দৃশ্যতা রাখবে সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে। [সুনান আবূ দাউদ:৪০৩১]
 
১৯. দো‘আ করা : আমাদের সন্তানদের জন্য দো‘আ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দো‘আ শিক্ষা দিয়েছেন এভাবে,
﴿ وَٱلَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبۡ لَنَا مِنۡ أَزۡوَٰجِنَا وَذُرِّيَّٰتِنَا قُرَّةَ أَعۡيُنٖ وَٱجۡعَلۡنَا لِلۡمُتَّقِينَ إِمَامًا ٧٤ ﴾ [الفرقان: 74]
আল্লাহর নেক বান্দা তারাই যারা বলে, হে আমাদের রব, আমাদেরকে এমন স্ত্রী ও সন্তানাদি দান করুন যারা আমাদের চক্ষু শীতল করবে। আর আপনি আমাদেরকে মুত্তাকীদের নেতা বানিয়ে দিন। [সূরা আলফুরকান-৭৪]
যাকারিয়্যা আলাইহিস সালাম আল্লাহর নিকট দো‘আ করেছিলেন,
﴿ هُنَالِكَ دَعَا زَكَرِيَّا رَبَّهُۥۖ قَالَ رَبِّ هَبۡ لِي مِن لَّدُنكَ ذُرِّيَّةٗ طَيِّبَةًۖ إِنَّكَ سَمِيعُ ٱلدُّعَآءِ ٣٨ ﴾ [ آل عمران:38]
‘হে আমার রব, আমাকে আপনার পক্ষ থেকে উত্তম সন্তান দান করুন। নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা শ্রবণকারী’। [সূরা আলে ইমরান ৩৮]
সম্মানিত পিতামাতাবৃন্দ, আমরা কি সন্তানের হকগুলো পালন করতে পেরেছি বা পারছি ? আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদেরকে নেকসন্তান হিসাবে গড়ে তুলি। যে সম্পর্কে হাদিসে এসেছে,
عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ « إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ»
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩ টি আমল বন্ধ হয় না-
১. সদকায়ে জারিয়া
২. এমন জ্ঞান-যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়
৩. এমন নেক সন্তান- যে তার জন্য দো‘আ করে [সহিহ মুসলিম:১৬৩১]
আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সন্তানদেরকে কবুল করুন,
তাদের হকসমূহ যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দিন। আমীন!
লেখক : হাবীবুল্লাহ মুহাম্মাদ ইকবাল
সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া
সূত্র : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ, সৌদিআরব

আকীদা বিষয়ক ৫০টি প্রশ্নোত্তর

 

আকীদা বিষয়ক ৫০টি প্রশ্নোত্তর
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
লিসান্স,মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সৌদি আরব
দাঈ ও গবেষক, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার,সৌদী আরব
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬

بِسْمِ اللَّـهِ الرَّحْمَـٰنِ الرَّحِيمِ
الحمد لله وحده والصلاة والسلام على من لانبي بعده
সুপ্রিয় দ্বীনী ভাই ও বোনেরা,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
অত:পর ‘আকীদা বিষয়ক ৫০টি প্রশ্নোত্তর’ শীর্ষক ছোট্ট এই পুস্তিকাটিতে ইসলামের অত্যন্ত মৌলিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে ৫০টি প্রশ্নোত্তর প্রস্তুত করা হয়েছে-যেগুলো সম্পর্কে প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।
এখানে যে সব বিষয় আলোচিত হয়েছে সেগুলো হল:
• মহান আল্লাহর পরিচয়
• ইসলাম এবং তার রোকন সমূহ
• ঈমান ও তার রোকন সমূহ
• তাওহীদ ও তার প্রকারভেদ
• শিরক ও তার প্রকারভেদ।
• কুফরী ও তার প্রকারভেদ
• মুনাফেকি এবং তার প্রকারভেদ
• কালিমার অর্থ এবং শর্তাবলী
• ইবাদতের পরিচয় এবং তা কবুলের শর্তাবলী
• তাগুতের পরিচয় ও তার প্রকারভেদ
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করে জ্ঞানের আলোকিত পথ ধরে জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
-বিনীত, আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬
❖ ১ম প্রশ্ন: আমার, আপনার এবং পৃথিবীর সব কিছুর স্রষ্টা ও পালনকর্তা কে?
উত্তর: আমার, আপনার এবং সারা জাহানের একমাত্র স্রষ্টা ও পালনকর্তা হলেন মহান আল্লাহ। তিনি দয়া করে আমাকে সহ পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু সৃষ্টি করেছেন এবং সবকিছু লালন-পালন করছেন।

❖ ২য় প্রশ্ন: আমাদের দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থার নাম কি?
উত্তর: আমাদের দ্বীন বা জীবন ব্যবস্থার নাম হল ইসলাম। ইসলাম মানে হল, আল্লাহকে ভয় করে, তাঁর প্রতি ভালবাসা রেখে এবং তাঁর কাছেই আশা ও আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পরিপূর্ণভাবে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা।

❖ ৩য় প্রশ্ন: আমরা কিভাবে আল্লাহর পরিচয় লাভ করতে পারি?
উত্তর: আমরা এ বিশাল সৃষ্টি জগতের দিকে তাকালে আল্লাহর পরিচয় পাই। ঐ সুবিশাল আকাশ,এই বিস্তীর্ণ পৃথিবী, চাঁদ, সুরুজ, দিন ও রাতের আবর্তন ইত্যাদির দিকে গভীরভাবে তাকালে বুঝতে পারি এ বিশ্বচরাচর একাকী সৃষ্টি হয়ে যায়নি। বরং এসবের পেছনে রয়েছে একজন সুনিপুণ স্রষ্টার হাত। আর তিনি হলেন,মহান আল্লাহ তা’আলা।

❖ ৪র্থ প্রশ্ন: আল্লাহ কোথায় আছেন?
উত্তর: আল্লাহ তা’আলা সাত আসমানের উপর আরশে আযীমে অবস্থান করেন। তিনি তাঁর সব সৃষ্টি থেকে আলাদা।

❖ ৫ম প্রশ্ন: আল্লাহ কি স্বত্বাগতভাবে আমাদের সাথে থাকেন?
উত্তর: আল্লাহ স্বীয় স্বত্বায় আরশে আযীমের উপর অবস্থান করেন। কিন্তু তাঁর জ্ঞান আমাদেরকে পরিবেষ্টন করে আছে। তিনি সব কিছু দেখছেন। সব কিছু শুনছেন। তার শক্তি এবং ক্ষমতা সব জায়গায় বিরাজমান। আল্লাহ তা’আলা মূসা ও হারুন (আলাইহিমাস সালাম)কে লক্ষ্য করে বলেন, “তোমরা ভয় পেও না। আমি তোমদের সাথে আছি। সব কিছু দেখছি এবং শুনছি।” (সূরা ত্ব-হাঃ ৪৬)

❖ ৬ষ্ঠ প্রশ্ন: আল্লাহর অলি কারা?
উত্তর: অলি শব্দের অর্থ, আল্লাহর প্রিয়পাত্র বা বন্ধু। তারাই আল্লাহর প্রিয়পাত্র হন যারা সত্যিকার ভাবে আল্লাহকে ভয় করে জীবন পরিচালনা করেন, সৎ আমল করেন, তাঁর আদেশগুলো বাস-বায়ন করেন এবং নিষেধ কৃত বিষয়গুলো থেকে নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখেন এবং কুরআন ও হাদিসকে দৃঢ়ভাবে ধরে রাখেন।

❖ ৭ম প্রশ্ন: কি পদ্ধতিতে আমাদের আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করা উচিৎ?
উত্তর: আমাদের কর্তব্য হল, এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করব যাতে সবটুকু ইবাদত শুধু তাঁর জন্যই নিবেদিত হয়। অন্য কোন সৃষ্টিকে তাঁর সাথে শরীক বা অংশীদার করা না হয়।

❖ ৮ম প্রশ্ন: কি দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ তা’আলা যুগে যুগে নবীদেরকে প্রেরণ করেছিলেন?
উত্তর: যুগে যুগে সকল নবী ও রসূলগণকে প্রেরণের উদ্দেশ্য হল, তারা মানুষকে এ আহবান করবেন যে, মানুষ যেন কেবল আল্লাহর ইবাদত করে এবং তার সাথে অন্য কাউকে শরীক না করে।
আরও উদ্দেশ্য হল, কিয়ামতের দিন আল্লাহর নিকট অজ্ঞতার অজুহাত পেশ করতে না পারে।

❖ ৯ম প্রশ্ন: ইসলাম কাকে বলে?
উত্তর: আল্লাহর একত্ববাদকে মেনে নিয়ে পরিপূর্ণভাবে তার আনুগত্য করা এবং শিরক ও শিরক পন্থীদের থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করাকেই ইসলাম বলে।

❖ ১০ম প্রশ্ন: ইসলামের মূল স্তম্ভ কয়টি ও কি কি?
উত্তর: ইসলামের মূল স্তম্ভ ৫টি। সেগুলো হল:
• ১) ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল- এ কথার স্বীকৃতি প্রদান করা।
• ২) নামায প্রতিষ্ঠা করা।
• ৩) যাকাত আদায় করা।
• ৪) রামাযান মাসে রোযা পালন করা।
• ৫) যে ব্যক্তি পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম তার জন্য হজ্জ সম্পাদন করা।

❖ ১১তম প্রশ্ন: ঈমান কাকে বলে?
উত্তর: অন্তরে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি এবং কাজে বাস্তবায়নকে ঈমান বলে।
❖১২তম প্রশ্ন: ঈমান কি বাড়ে ও কমে?
উত্তর: হ্যাঁ, কথা ও কাজ অনুযায়ী ঈমান বাড়ে ও কমে।

❖১৩তম প্রশ্ন: ঈমান বাড়ে ও কমে এ কথার অর্থ কি?
উত্তর: একথার অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি যত বেশী আল্লাহর আনুগত্য করবে এবং ভাল কাজ করবে তার ঈমান তত বৃদ্ধি পাবে। আর যে যত পাপ ও অন্যায় কাজে জড়িয়ে পড়বে তার ঈমান তত কমবে।

❖ ১৪তম প্রশ্ন: ঈমানের মূল স্তম্ভ কয়টি ও কি কি?
উত্তর: ঈমানের মূল স্তম্ভ ৬টি। যথা:
• ১) আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস
• ২) ফেরেশতাগণের প্রতি বিশ্বাস
• ৩) আসমানি কিতাব সমূহের প্রতি বিশ্বাস
• ৪) নবী ও রসূলগণের প্রতি বিশ্বাস
• ৫) পরকালের প্রতি বিশ্বাস
• ৬) ভাগ্যের ভাল মন্দের প্রতি বিশ্বাস।

❖ ১৫তম প্রশ্ন: আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অর্থ কি?
উত্তর: আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের অর্থ হচ্ছে, এ বিশ্বাস করা যে আল্লাহ তা’আলা রিজিক দাতা, সৃষ্টিকর্তা, সব কিছুর পরিচালক, আসমান ও জমিনের সমস্ত রাজত্ব এবং কর্তৃত্ব তাঁর হাতে। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি যাবতীয় ইবাদত পাওয়ার একমাত্র অধিকারী; অন্য কেউ নয়। তাঁর রয়েছে অনেক সুন্দর সুন্দর নাম এবং তিনি অসংখ্য পরিপূর্ণগুণের অধিকারী।

❖ ১৬তম প্রশ্ন: ফেরেশতা কারা?
উত্তর: তাঁরা আল্লাহর এমন এক সৃষ্টি যাদেরকে তিনি নূর (আলো) দ্বারা সৃষ্টি করেছে। আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে যে কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন বা যে সব কাজ করতে আদেশ করেছেন তা পরিপূর্ণভাবে পালন করেন। তাতে বিন্দুমাত্র অবাধ্যতা করেন না।
❖ ১৭তম প্রশ্ন: আসমানি গ্রন্থসমূহের প্রতি এবং নবী-রসূলগণের প্রতি বিশ্বাসের অর্থ কি?
উত্তর: নবী রসূলগণের প্রতি বিশ্বাসের অর্থ হল, আল্লাহ তা’আলা যুগে যুগে অনেক নবী প্রেরণ করেছেন যেমন, নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা, (আলাইহিমুস সালাম) প্রমুখ । তাদের প্রতি আল্লাহ তা’আলা মানবজাতির দিকনির্দেশনার জন্য আসমানি গ্রন্থ নাজিল করেছেন। যেমন, তাওরাত, ইনজিল, জবুর,ইত্যাদি। নবীগণ তাদের সমসাময়িক মানবগোষ্ঠীকে এক আল্লাহর দাসত্ব করার জন্য আহবান করেছেন এবং শিরক করা থেকে নিষেধ করেছেন।
নবী-রাসূলদের ধারাবাহিকতার সব শেষে আগমন করেছেন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তাঁর প্রতি আল্লাহ তা’আলা অবতীর্ণ করেছেন আল কুরআন। এ কুরআনের মাধ্যমে পূর্ববর্তী সকল আসমানি গ্রন্থকে বিলুপ্ত করা হয়েছে। তিনি এ কুরআনকে পরিপূর্ণভাবে বাস্ববায়ন করে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন তাঁর দীর্ঘ ২৩ বছরের নবুওয়তী যিন্দেগীতে। তাই যে কোন ইবাদত অবশ্যই হতে হবে কুরআনের শিক্ষা এবং নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাহ তথা তাঁর নির্দেশিত পদ্ধতি অনুসারে।

❖ ১৮তম প্রশ্ন: পরকালে বিশ্বাসের অর্থ?
উত্তর: পরকালে বিশ্বাসের অর্থ হল, একথা বিশ্বাস করা যে, মহান স্রষ্টা আল্লাহ তা’আলা প্রতিটি জিনিসের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ দিয়েছেন। সে মেয়াদ শেষ হলে সবাইকে অবশ্যই মৃত্যু বরণ করতে হবে। এরপর আল্লাহ সকলকে কবর থেকে পুনরুত্থিত করবেন এবং কৃতকর্মের হিসাব-নিকাশ নেয়ার পর প্রত্যেককে তাদের কাজের যথোপযুক্ত প্রতিদান দিবেন। ভাল কাজের বিনিময়ে তাদেরকে দেয়া হবে ভাল প্রতিদান। আর পাপ ও অন্যায়ের বিনিময়ে প্রদান করবেন কঠিন শাস্তি।
আমাদেরকে এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, যে মহান স্রষ্টা এ সুন্দর দেহাবয়বকে যেমনিভাবে প্রথমবার সৃজন করেছেন তিনি পুণরায় তাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।

❖ ১৯তমঃ ভাগ্যের ভাল-মন্দের প্রাত বিশ্বাসের অর্থ কী?
এর অর্থ হল, এ জীবনে ভাল-মন্দ যাই ঘটুক না কেন এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, তা অবশ্যই আল্লাহ তা’আলার ইচ্ছা ও পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়েছে। কারণ, মহাপ্রজ্ঞাবান আল্লাহ তা’আলা প্রতিটি বিষয় অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে অনেক পূর্বেই নির্ধারণ করে রেখেছেন।

❖ ২০তম প্রশ্ন: “লা-ইলাহা ইল্লালাহ” এর ব্যাখ্যা কী?
উত্তর: ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’ অর্থ হল, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নাই। বরং যাবতীয় ইবাদত ও উপাসনা পাওয়ার একমাত্র হকদার তিনি। তিনি ব্যতিরেকে যত কিছুর ইবাদত করা হচ্ছে সবই মিথ্যা এবং ভ্রান্ত।

❖ ২১তম প্রশ্ন: ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ এর ব্যাখ্যা কি?
‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ এর ব্যাখ্যা হল, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশগুলো বাস্তবায়ন করা। তিনি যে সকল সংবাদ ও তথ্য দান করেছেন সেগুলোকে নির্ভুল ও সত্য বলে মেনে নেয়া। তিনি যেসকল বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন বা সতর্ক করেছেন সেগুলো থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর দেখানো পদ্ধতি ব্যতিরেকে ইবাদত না করা।

❖ ২২তম প্রশ্ন: ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’ এর কোন শর্ত আছে কি?
উত্তর: তাওহীদের স্বীকৃতি জ্ঞাপক এই মহান বাণীটির জন্য ৮টি শর্ত রয়েছে। সে শর্তগুলো হল:
• ১) ‘লা ইলাহা ইল্লালাহ’ এর অর্থ জেনে-বুঝে স্বীকৃতি দেয়া। এর অর্থ বা তাৎপর্য না বুঝে পাঠ করলে কোন লাভ হবে না।
• ২) দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে স্বীকৃতি দেয়া। এতে কোন সন্দেহ ও অস্পষ্টতা রাখা যাবে না।
• ৩) নির্ভেজাল মনে স্বীকৃতি দেয়া। কোন শিরকী ধ্যান-ধারণা নিয়ে পাঠ করলে কোন লাভ নেই।
• ৪) সত্য মনে করে স্বীকৃতি দেয়া। কপটতা থেকে মুক্ত থাকা অপরিহার্য।
• ৫) ভালবাসা সহকারে স্বীকৃতি দেয়া। মনের মধ্যে ঘৃণা বা ক্রোধ জমা রেখে স্বীকৃতি দিলে কোন উপকার হবে না।
• ৬) পূর্ণ আনুগত্যের মন-মানসিকতা নিয়ে স্বীকৃতি দেয়া। পরিত্যাগ করার বা অমান্য করার মানসিকতা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
• ৭) মনেপ্রাণে নিঃশর্ত ভাবে গ্রহণ করা। এ বিষয়ে কোন প্রতিবাদ করা বা প্রশ্ন তোলা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।
• ৮) আল্লাহ ছাড়া অন্য যত কিছুর ইবাদত করা হচ্ছে সব অস্বীকার করা।

❖ ২৩তম প্রশ্ন: আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে যে সব বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলোর মধ্যে কোন বিষয়টি সবচেয়ে বড়?
উত্তর: সে বিষয়টি হল তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদ।

❖২৪তম প্রশ্ন: তাওহীদ কি?
উত্তর: তাওহীদ হল, একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা, তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা এবং আল্লাহ তা’আলা নিজে কুরআনে বা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদিসে তার যে সকল নাম ও গুণাবলীর কথা উল্লেখ করেছেন সেগুলোকে কোনরূপ ব্যাখ্যার আশ্রয় না নিয়ে সহজভাবে মেনে নেয়া।

❖ ২৫তম প্রশ্ন: তাওহীদ কত প্রকার?
উত্তর: তাওহীদ তিন প্রকার। যথা:
• ১) প্রকার: রুবূবিয়া
• ২) তাওহীদুল উলূহিয়া
• ৩) তাওহীদুল আসমা ওয়াস্‌ সিফাত।

❖২৬ তম প্রশ্ন: ‘তাওহীদুর রুবূবিয়া’ কাকে বলে?
উত্তর: সৃষ্টি করা, রিজিক দান করা, বৃষ্টি বর্ষণ, জীবন দান, মৃত্যু দান ইত্যাদি কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আল্লাহকে এক মনে করাকে তাওহীদে রুবূবিয়া বলা হয়।

❖২৭তম প্রশ্ন: ‘তাওহীদুল উলূহিয়া’ কাকে বলে?
উত্তর: নামায, রোযা, যাকাত, হজ্জ, দু’আ, মানত ইত্যাদি বান্দার যত প্রকার ইবাদত-বন্দেগী হতে পারে সবকিছুর একমাত্র অধিকারী আল্লাহকে মনে করাকে তাওহীদে উলূহিয়া বলা হয়।

❖ ২৮তম প্রশ্ন: ‘তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত’ কাকে বলে?
উত্তর: আল্লাহ তা’আলা নিজে কুরআনে অথবা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদিসে আল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে যে সব কথা বলেছেন সেগুলো মনে প্রাণে মেনে নেয়া। এ ক্ষেত্রে আল্লাহর কোন গুণকে অস্বীকার করা যাবে না বা তাতে কোন শব্দগত বা অর্থগত বিকৃতি সাধন করা যাবে না। কিংবা সেগুলোর কোন ধরণ বা আকৃতি কল্পনা করা যাবেনা। বরং এ বিশ্বাস পোষণ করতে হবে যে, এ সমস্ত গুণাবলী অবশ্যই সত্য কিন্তু তা মহান আল্লাহর জন্য যেমন হওয়া উচিৎ তেমনই।

❖ ২৯তম প্রশ্ন: ইবাদত বলতে কী বুঝায়?
উত্তর: আল্লাহ তা’আলা যে সমস্ত কথা বা কাজে খুশী হন চাই তা প্রকাশ্য হোক বা অপ্রকাশ্য হোক তাকে ইবাদত বলে।

❖৩০তম প্রশ্ন: ইবাদতের কোন শর্ত আছে কি?
উত্তর: ইবাদতের কয়েকটি শর্ত রয়েছে। সেগুলো হল:
• ১) ইখলাস থাকা অর্থাৎ যে কোন কাজ নির্ভেজাল চিত্তে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় কাজ করা।
• ২) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দেখানো পদ্ধতি অনুসারে সে কাজটি করা।

❖ ৩১তম প্রশ্ন: ইবাদতের কতিপয় উদাহরণ দিন।
উত্তর: নামায রোযা, হজ্জ, যাকাত, ভয়, আশা, সাহায্য চাওয়া, বিপদ থেকে উদ্ধার কামনা ইত্যাদি যে সব কাজ আল্লাহ তা’আলা আমদেরকে করার জন্য আদেশ প্রদান করেছেন সবই আল্লাহর ইবাদত।

❖ ৩২তম প্রশ্ন: আল্লাহ তা’আলা আমদেরকে যে সব কাজ থেকে নিষেধ করেছেন সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ কোনটি?
উত্তর: সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ এবং মারাত্মক হচ্ছে আল্লাহর সাথে শিরক করা।

❖৩৩তম প্রশ্ন: শিরক কী?
উত্তর: কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা শিরক। যেহেতু মহান আল্লাহ তো আমাকে, আপনাকে তথা সমগ্র বিশ্বকে একাই সৃষ্টি করেছেন।
❖ ৩৪তম প্রশ্ন: শিরক কত প্রকার ও কী কী?
উত্তর: শিরক তিন প্রকার। যথা:
• ১) বড় শিরক
• ২) ছোট শিরক
• ৩) গোপন শিরক।

❖ ৩৫তম প্রশ্ন: বড় শিরক বলতে কী বুঝায়?
উত্তর: কোন ইবাদত যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কোন কিছুর নামে করা হয় তবে সেটা হল বড় শিরক। কোন মুসলমান এ শিরক করলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যায় এবং তার পূর্বের সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যায়। এমনকি তওবা না করে এ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

❖ ৩৬তম প্রশ্ন: বড় শিরক কত প্রকার ও কী কী?
উত্তর: বড় শিরক চার প্রকার। তা হল:
• ১) দু’আর ক্ষেত্রে শিরক করা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নিকট কিছু চাওয়া বা বিপদাপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য দুআ করা বড় শিরক।
• ২) নিয়তের ক্ষেত্রে শিরক করা। ইবাদত করতে গিয়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়ত করা।
• ৩) ইবাদতের ক্ষেত্রে শিরক। আল্লাহর আদেশ বাস্তবায়ন করার পরিবর্তে কোন পীর, অলী-আউলিয়া বা অন্য কোন সৃষ্টির উপাসনা করা।
• ৪) ভালোবাসার ক্ষেত্রে শিরক। যে ক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ তা’আলা ভালবাসা পাওয়ার উপযুক্ত সে ক্ষেত্রে তাকে বাদ দিয়ে অন্য কারো প্রতি ভালবাসা প্রকাশ করা।

❖ ৩৭তম প্রশ্ন: ছোট শিরক কি?
উত্তর: যে কাজ করলে বড় শিরকে পতিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে সেটাই ছোট শিরক। যেমন, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে বা মানুষের প্রশংসা পাওয়ার জন্যে কিংবা দুনিয়াবি কোন স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে কোন নেক কাজ করা হলে তা ছোট শিরকে রূপান্তরিত হয়।
এ জাতীয় কাজ করলে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হবে না বটে কিন্তু সে অবশ্যই একটি বড় ধরণের পাপ সম্পাদন করল। এ জন্য যে কোন ভাল কাজ করার আগে নিয়তকে পরিশুদ্ধ করার ব্যাপারে ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে।

❖ ৩৮তম প্রশ্ন: গোপন শিরক কি?
উত্তর: আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত তকদীরের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করাই হল গোপন শিরক।

❖ ৩৯তম প্রশ্ন: গোপন শিরকের প্রমাণ কি?
উত্তর: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “গভীর রাতে একখণ্ড কালো পাথরের উপর দিয়ে একটি কালো পিঁপড়া হেঁটে গেলে তার পায়ের যে আওয়াজ হয় তার চেয়ে আরও বেশী নীরবে আমার উম্মতের মধ্যে গোপন শিরক প্রবেশ করবে।”

❖ ৩৮তম প্রশ্ন: গোপন শিরক কি?
উত্তর: আল্লাহ তা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত তকদীরের ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করাই হল গোপন শিরক।

❖ ৩৯তম প্রশ্ন: গোপন শিরকের প্রমাণ কি?
উত্তর: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “গভীর রাতে একখণ্ড কালো পাথরের উপর দিয়ে একটি কালো পিঁপড়া হেঁটে গেলে তার পায়ের যে আওয়াজ হয় তার চেয়ে আরও বেশী নীরবে আমার উম্মতের মধ্যে গোপন শিরক প্রবেশ করবে।”

❖ ৪০তম প্রশ্ন: কুফরী কয় প্রকার ও কি কি?
উত্তর: কুফরী দু প্রকার। যথা:
• ১) বড় কুফরী। যেমন, কেউ আল্লাহ অসি-ত্বকে অস্বীকার করলে বা ইসলামী আদর্শকে ঘৃণা করলে সে ইসলাম থেকে বের হয়ে যাবে। এ জাতীয় কুফুরী করার কারণে মানুষ ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে কাফের হয়ে যায়।
• ২) ছোট কুফরী। যেমন, কেউ আল্লাহকে অস্বীকার করল না কিন্তু সে আল্লাহর কোন অবদানকে অস্বীকার করল। এ ক্ষেত্রে সে ইসলাম থেকে বের হবে না কিন্তু তা অবশ্যই বিরাট গুনাহের কাজ করল।

❖ ৪১তম প্রশ্ন: বড় কুফরি কয় প্রকার?
উত্তর: বড় কুফরি পাঁচ প্রকার। যথা:
• ১) অস্বীকার করার মাধ্যমে কুফরি করা। আল্লাহ, রাসূল, ফেরেশতা, ইসলামী কোন বিধান যেমন, নামায, পর্দা ইত্যাদি বিষয়কে সরাসরি অস্বীকার করা বড় কুফুরী। যার কারণে একজন মানুষ নিজেকে মুসলিম হিসেবে দাবী করার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলে।
• ২) অহংকারের মাধ্যমে কুফুরী করা। যেমন, ইসলাম একটি ‘চিরন্তন সত্য জীবন ব্যবস্থা’ এ কথা জানার পরও অহংকার বশত: ইসলাম বা ইসলামের রীতি-নীতিকে এড়িয়ে চলা।
• ৩) সন্দেহ পোষণ করা।
• ৪) অবাধ্যতা করার মাধ্যমে কুফরি করা।
• ৫) মুনাফেকি করা তথা মনের মধ্যে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষ লুকিয়ে রেখে বাহ্যিক ভাবে ইসলাম প্রকাশ করা। এটা জঘন্যতম কুফর।

❖ ৪২তম প্রশ্ন: মুনাফেকি কয় প্রকার?
উত্তর: দু প্রকার। যথা: ১) বিশ্বাসগত ও ২) কর্মগত।

❖ ৪৩তম প্রশ্ন: বিশ্বাসগত মুনাফেকির অর্থ কি? তা কয় প্রকার ও কি কি?
উত্তর: বিশ্বাসগত মুনাফেকির অর্থ হল, মূলত সে ইসলামকে বিশ্বাসই করেনা। বরং বাহ্যিক ভাবে ইসলামকে মেনে চলে মনে হলেও বিশ্বাসগতভাবে সে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষী। ইসলামের ক্ষতি করার জন্য সে এ বেশ ধারণ করেছে।
বিশ্বাসগত মুনাফেকি ৬ প্রকার। যথা:
• ১) আল্লাহ ও রাসূলকে অস্বীকার করা।
• ২) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনিত জীবনাদর্শ ইসলাম এবং ইসলামের মৌলগ্রন্থ কুরআনকে অস্বীকার করা।
• ৩) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ঘৃণা করা।
• ৪) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনিত জীবনাদর্শকে ঘৃণা করা।
• ৫) ইসলামকে অপমান করা হলে বা ইসলামের পতন হলে মনে মনে আনন্দিত হওয়া।
• ৬) ইসলামের বিজয় বা ইসলামের বিস্তার লাভ করাকে অপছন্দ করা।

❖ ৪৪তম প্রশ্নঃ কর্মগত মুনাফেকীর বৈশিষ্টগুলো কী কী?
উত্তর: কর্মগত মুনাফেকীর চারটি বৈশিষ্ট রয়েছে। সেগুলো হলঃ
• ১) কথায় কথায় মিথ্যা বলা।
• ২) ওয়াদা ভঙ্গ করা বা কথা দিয়ে কথা না রাখা।
• ৩) আমানতের খেয়ানত করা।
• ৪) ঝগড়া করলে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করা।

❖ ৪৫তম প্রশ্ন: শিরকে লিপ্ত থাকা অবস্থায় কি কোন আমল গ্রহণযোগ্য হবে?
উত্তর: শিরকে লিপ্ত থাকা অবস্থায় আল্লাহ তা’আলার কাছে কোন আমল গ্রহণযোগ্য হবে না। আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন: “তারা যদি শিরক করত তবে তারা যত আমল করেছিল সব বরবাদ হয়ে যেত।” (সূরা আন’আমঃ ৮৮)
আল্লাহ আরও বলেন, “আল্লাহ তা’আলা তাঁর সাথে শিরক করাকে অবশ্যই ক্ষমা করবেন না এবং এর নিন্মোস্তরের যে কোন অপরাধ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করবেন। যে শিরক করল সে (হেদায়েতের পথ থেকে) অনেক দূরে ছিটকে পড়ল।” (সূরা নিসা: ১১৬)

❖ ৪৬তম প্রশ্ন: ইসলাম ভঙ্গকারী বিষয় কয়টি ও কি কি?
উত্তর: ইসলাম ভঙ্গকারী বিষয় দশটি। যথা:
• ১) ইবাদতে ক্ষেত্রে শিরক করা।
• ২) মুশরিকদেরকে মুশরিক মনে না করা বা তাদের কুফরির ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা কিংবা তাদেরকে সঠিক পথের অনুসারী মনে করা।
• ৩) আল্লাহ তা’আলার নিকট পৌঁছার উদ্দেশ্যে কোন ‘মাধ্যম’ ধরে তার নিকট দুআ করা বা তার নিকট সুপারিশ প্রার্থনা করা অথবা তার উপর পরকালে নাজাত পাওয়ার ভরসা করা।
• ৪) এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদর্শের চেয়ে অন্য কোন ব্যক্তির মতাদর্শ উত্তম বা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আনিত জীবন ব্যবস্থার চেয়ে অন্য কোন ধর্ম বা মতবাদ শ্রেয়।
• ৫) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশিত কোন বিষয়কে মনে মনে ঘৃণা করা যদিও সে তা পালন করে।
• ৬) দ্বীন-ইসলামের কোন বিষয়কে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা বা হেয় মনে করা।
• ৭) যাদু করা অথবা যাদু-তাবিজ ইত্যাদির মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী বা প্রেমিক-প্রেমিকার মনের মিলন কিংবা বিচ্ছেদ ঘটানো।
• ৮) মুসলমানদের বিরুদ্ধে অমুসলিমদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করা।
• ৯) এ বিশ্বাস করা যে, বিশেষ কিছু ব্যক্তি রয়েছে যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শরীয়ত মেনে চলতে বাধ্য নন।
• ১০) ইসলাম থেকে মুখ ফিরিয়ে চলা, ইসলাম শিক্ষা না করা এবং ইসলাম অনুযায়ী আমল না করা।

❖ ৪৭তম প্রশ্ন: এমন তিনটি বিষয় রয়েছে যেগুলো সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য আবশ্যক। সে বিষয় তিনটি কি?
উত্তর: সে তিনটি বিষয় হল:
• ১) আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা
• ২) দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা
• ৩) নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করা।

❖ ৪৮তম প্রশ্ন: তাগুত কাকে বলে?
উত্তর: আল্লাহ ছাড়া যত কিছুর ইবাদত করা হয় সবই তাগুতের অন্তর্ভুক্ত।
৪৯তম প্রশ্ন: তাগুত কতটি এবং মূল তাগুতগুলো কি কি?
উত্তর: তাগুতের সংখ্যা অনেক। তবে সেগুলোর মধ্যে প্রধান হল ৫টি।

❖ ৫০তম প্রশ্ন: প্রধান প্রধান তাগুতগুলো কি কি?
উত্তর: সেগুলো হল:
• ১) শয়তান।
• ২) যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করা হলেও তার কোন প্রতিবাদ করেনা বা তাকে ঘৃণা করেনা বরং তাতে রাজি থাকে।
• ৩) যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদতের দিকে মানুষকে আহবান করে এবং এজন্য কাজ করে।
• ৪) যে ব্যক্তি ইলমে গায়ব তথা অদৃশ্যের খবর দিতে পারে বলে দাবি করে ।
• ৫) যে শাসক আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করেন না।

সমাপ্ত

ইমান ও আকিদাহ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ 12 টি প্রশ্ন ও তার উত্তর :

 ইমান ও আকিদাহ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তরঃ প্রশ্ন-১: আল্লাহ্ ছাড়া অন্য  কারো নামে কি কসম বা শপথ করা যায়?  উত্তর: আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো নাম  নিয়ে শপথ করা জায়েজ নয়।  নবী সাল্লাল্লাহু বলেন, সাবধান, নিশ্চয়  আল্লাহ্ পাক তোমাদেরকে তোমাদের  বাপ-দাদাদের নাম নিয়ে কসম  করতে নিষেধ করছেন। কেউ যদি কসম  করতে চায় তবে সে যেন আল্লাহ্র নাম  নিয়ে করে অন্যথা যেন নীরব থাকে।  (বুখারী ও মুসলিম)  আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত হয়েছে,  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলেন, তোমরা স্বীয় বাপ-দাদা বা মা-  দাদী-নানী প্রভৃতির নামে কসম  করবে না। আর সত্য বিষয় ছাড়া আল্লাহ্র  নামে কসম করবে না। (আবূ দাঊদ, নাসাঈ)  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  আরও বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্  ছাড়া অন্যের নামে শপথ  করবে সে কুফরী করবে অথবা শিরক করবে।  (মুসনাদ আহমাদ)  প্রশ্ন-২: মৃত বা অনুপস্থিত কোন ব্যক্তির  নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা তাদের  থেকে উদ্ধার কামনা করা কি বড় ধরণের  কুফরী বিষয়?  উত্তর: নিশ্চয়। মৃত বা অনুপস্থিত কোন  ব্যক্তির নিকট সাহায্য প্রার্থনা করা-  তাদের থেকে উদ্ধার কামনা করা বড়  ধরণের শির্কী কাজ। যে ব্যক্তি এরূপ  করবে সে ইসলাম ধর্ম থেকে বহিষ্কৃত  হয়ে যাবে। কেননা আল্লাহ্  তাআলা বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্র  সাথে অন্য কাউকে মবূদ হিসেবে আহ্বান  করে যে ব্যাপারে তার কাছে কোন  প্রমাণ নেই। তার হিসাব তার পালনকর্তার  কাছে আছে। নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম  হবে না। (সূরা মুমিনূন-১১৭) আল্লাহ্ আরও  বলেন, ইনি তোমাদের প্রভু, রাজত্ব তাঁরই।  তাঁকে ছেড়ে তোমরা যাদেরকে আহ্বান  কর, তারা খেজুরের আঁটির উপর  পাতলা আবরণেরও অধিকারী নয়। যখন  তোমরা তাদেরকে ডাক তখন  তারা তোমাদের ডাক শুনে না। শুনলেও  তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না।  কিয়ামত দিবসে তারা তোমাদের শিরক  অস্বীকার করবে। বস্তুত: আল্লাহ্র ন্যায়  তোমাকে কেউ অবহিত করতে পারে না।  (সূরা ফাতের ১৩- ১৪)  প্রশ্ন-৩: জ্যোতির্বিদ, গণক, হস্তরেখা বিদ,  যাদুকর প্রভৃতির কাছে যাওয়া বা তাদের  কথা বিশ্বাস করার বিধান কি?  উত্তর: কোন জ্যোতির্বিদ, গণক,  হস্তরেখা বিদ, যাদুকর প্রভৃতির  কাছে যাওয়া বা তাদের কথা বিশ্বাস  করা বৈধ নয়। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,  যে ব্যক্তি কোন গণৎকারের  কাছে গিয়ে কোন কিছু  সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, তার চল্লিশ  দিনের ছালাত কবুল করা হবে না। (ছয়  শতাধিক মুসলিম) গণৎকার বলতে ভাগ্য  গণনাকারী দৈবজ্ঞ, জ্যোতিষী, যাদুকর  সকলেই উদ্দেশ্য। রাসূল (সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেন,  যে ব্যক্তি কোন জ্যোতির্বিদের  কাছে যাবে, অত:পর  সে যা বলে তা বিশ্বাস করবে,  সে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বীনের  সাথে কুফরী করবে। (মুসনাদ আহমাদ ও সুনান  গ্রন্থ সমূহ)  প্রশ্ন-৪: যদি কোন ব্যক্তি এরূপ বিশ্বাস  করে যে আল্লাহ্ তাআলা আকাশ-  পৃথিবী সর্বাস্থানে সবকিছুতে বিরাজমান।  এ লোকের পিছনে কি ছালাত আদায়  করা যাবে?  উ: আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের  আক্বীদাহ্ বিশ্বাস হল, আল্লাহ্  তাআলা সমগ্র সৃষ্টি জগতের  ঊর্ধ্বে সর্বোচ্চ স্থান  আরশে অবস্থা করেন। তিনি স্বীয় সত্বার  সাথে সামঞ্জস্য শীল অবস্থায় সুমহান  আরশে উন্নীত। একথার দীলল হচ্ছে,  আল্লাহ্ বলেন, ( ﺍﻟﺮﺣﻤﻦ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻌﺮﺵ ﺍﺳﺘﻮﻯ )দয়াময়  আল্লাহ্ আরশে সমাসীন। (সূরা ত্বাহা- ৫)  তিনি আরও বলেন, তিনি সর্বোচ্চ সুমহান।  (বাক্বারা-২৫৫) তিনি ঈসা (আ:) সম্পর্কে  বলেন, তিনি তাকে নিজের  কাছে উঠিয়ে নিয়েছেন। (নিসা-১৫৮)  তিনি আরও এরশাদ করেন, তিনি আকাশের  অধিবাসীদের মাবূদ এবং জমিনের  অধিবাসীদের মাবুদ। (যুখরুফ-৮৪)  তিনি সপ্তাকাশের উপর  আরশে আযীমে অবস্থান করা সত্বেও তাঁর  জ্ঞান, দৃষ্টি, তত্বাবধান প্রভৃতি আমাদের  সাথেই রয়েছে। তিনি এরশাদ করেন,  তোমরা যেখানেই থাকনা কেন  তিনি তোমাদের সাথেই রয়েছেন।  (হাদীদ-৪) এরপরও কেউ যদি বিশ্বাস  করে যে আল্লাহ্ স্বসত্বায়  জমিনে বা সর্বাস্থানে বিরাজমান,  তবে তা হবে কুরআন-সুন্নাহ্ ও এজমার  বিরোধী। অজ্ঞতার কারণে কেউ  যদি এরূপ বিশ্বাস করে তবে তাকে সঠিক  জ্ঞান দান করতে হবে। তারপরও যদি ঐ  বিশ্বাস রাখে তবে সে কাফের  হয়ে যাবে- যার পিছনে ছালাত আদায়  করা জায়েজ হবে না। -(সঊদী আরব  স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড)  প্রশ্ন-৫: কোন নবী বা ওলী বা সৎ  লোকের কবর যিয়ারতের নিয়তে সফর  করার হুকুম কি? এধরণের যিয়ারত কি শরীয়ত  সম্মত হবে?  উত্তর: কোন নবী বা ওলী বা সৎ লোকের  কবর যিয়ারতের নিয়তে সফর করা জায়েজ  নয়। বরং তা বিদআত। একথার দলীল  হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এ হাদীছ।  তিনি বলেন, (ইবাদতের উদ্দেশ্যে)  তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও সফর  করা যাবেনা। মসজিদে হারাম, আমার  মসজিদ এবং মসজিদে আক্বছা। (বুখারী ও  মুসলিম) তিনি ৎ আরও বলেন, যে ব্যক্তি এমন  আমল করবে, যে ব্যাপারে আমাদের কোন  নির্দেশনা নেই, তবে তা প্রত্যাখ্যাত।  (বুখারী ও মুসলিম) তবে সফর  না করে তাদের কবর যিয়ারত করা সুন্নাত।  রাসূল ৎ বলেন, তোমরা কবর যিয়ারত  করতে পার,  কেননা উহা তোমাদেরকে আখেরাতের  কথা স্মরণ করাবে। (মুসলিম)  প্রশ্ন-৬: ওলীদের কবর দ্বারা সাহায্য  প্রার্থনা করার বিধান কি?  অনুরূপভাবে তাদের কবর তওয়াফ করা,  তাদের নামে নযর-মানত করা, কবরের উপর  ঘর উঠানো এবং আল্লাহ্র নৈকট্য লাভের  জন্য তাদেরকে অসীলা বা মাধ্যম  নির্ধারণ করার বিধান কি?  উত্তর: কোন নবী বা ওলীর কবর  দ্বারা সাহায্য প্রার্থনা করা, তাদের  নামে নযর-মানত করা, আল্লাহ্র নৈকট্য  লাভের জন্য তাদেরকে অসীলা বা মাধ্যম  নির্ধারণ করা হচ্ছে বড় ধরণের শিরক।  একারণে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত  হয়ে যাবে। আর এ অবস্থায় তার মৃত্যু  হলে সে চিরকাল জাহান্নাম বাসী হবে।  কিন্তু কবরের তওয়াফ তার উপর ঘর  উঠানো প্রভৃতি কাজ হচ্ছে বিদআত।  যা গাইরুল্লাহ্র ইবাদত করার একটি অন্যতম  মাধ্যম। অবশ্য একাজের  মাধ্যমে ব্যক্তি যদি কবর  বাসী থেকে কোন উপকার  পাওয়া বা বিপদ দূরীভূত হওয়ার  কামনা করে বা তওয়াফের মাধ্যমে মৃত  ব্যক্তির নৈকট্য উদ্দেশ্য  করে তবে তা হবে বড় শিরক। -(সঊদী আরব  স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড)  প্রশ্ন-৭: কবরের পরিচয়ের জন্য কোন ন্যাম  প্লেট বোর্ড লটকানো যাতে তার নাম  মৃত্যু তারিখ প্রভৃতি লিখা থাকবে। বা এমন  কোন বোর্ড লটকানো যাতে কুরআনের  কোন আয়াত লিখা থাকে.. তবে তার  বিধান কি?  উত্তর: কবরের উপর কোন কিছু  লিখা জায়েজ নয়- না কোন কুরআনের  আয়াত না নাম পরিচয়- না কোন বোর্ডের  উপর না কোন পাথরের উপর আর না কবর  বাঁধাই করে তার দেয়ালে। জাবের (রা:)  থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  নিষেধ করেছেন, কবরকে চুনকাম করতে,  তার উপর বসতে এবং তার উপর ঘর উঠাতে।  (মুসলিম) তিরমিযী এবং নাসাঈর অপর বিশুদ্ধ  বর্ণনায় রয়েছে, এবং তার উপর কোন কিছু  লিখতেও নিষেধ করেছেন। (আবূ দাঊদ,  নাসাঈ,) তিরমিযীর অপর বর্ণনায়:  সেখানে মসজিদ তৈরি করতে এবং কোন  বাতি জ্বালাতে নিষেধ করেছেন।  প্রশ্ন-৮: মৃত ব্যক্তিকে দাফন করে কবরের  কাছে কুরআন পাঠ করার বিধান কি?  বা ইছালে ছওয়াবের উদ্দেশ্যে মৃতের  গৃহে কুরআন পাঠ করার জন্য হাফেয-  কারীদের ভাড়া করে নিয়ে আসার হুকুম  কি?  উত্তর: মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার  কবরের কাছে কুরআন পাঠ  করা একটি বিদআতী কাজ।  কেননা এধরণের কাজ রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে ছিল না।  তিনি এরূপ করেন নি করার আদেশও করেন  নি। বরং দাফনের পর কি করতে হয়  তা বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে।  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  কোন ব্যক্তিকে দাফন করার পর  সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াতেন এবং বলতেন,  তোমাদের মৃত ভায়ের জন্য  ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার দৃঢ়তার জন্য দুআ  কর, কেননা এখনই সে জিজ্ঞাসিত হবে।  (আবু দাঊদ)  কবরের কাছে কুরআন পাঠ করা যদি শরীয়ত  সম্মত হত বা তাতে কোন কল্যাণ থাকত  তবে অবশ্যই নবী সাল্লাল্লাহু  আলাহি ওয়া সাল্লাম সে নির্দেশ দিতেন  এবং দলীল পাওয়া যেত। অনুরূপভাবে কোন  গৃহে হাফেয-কারীদেরকে একত্রিত  করে কুরআন পাঠ করে তা মৃতের  রূহে বখশে দেয়াও একটি বড় ধরনের  বিদআতী কাজ। শরীয়তে যার কোন দলীল  নেই। সালাফে ছালেহীন  তথা ছাহাবায়ে কেরামের কেউ একাজ  করেননি। একজন মুসলিম ব্যক্তি যখন কোন  বিপদে পড়বে বা কোন দুর্ঘটনায় পতিত  হবে তখন সে ধৈর্য ধারণ  করবে এবং আল্লাহ্র কাছে এর প্রতিদান  আশা করবে। আর ধৈর্য ধারণকারীদের মত  দুআ করবে,  ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেঊন,  আল্লাহুম্মা আজুরনী ফী মুসীবাতী ওয়াখলুফলী খাইরান্  মিনহা। (শায়খ ইবনু ঊছাইমীন)  প্রশ্ন-৯: মীলাদুন্নবী উপলক্ষে বা কোন  পীর-ওলীর উরূস উপলক্ষে যদি কোন  প্রাণী যবেহ করা হয়,  তবে তা খাওয়া কি জায়েজ?  উত্তর: কোন  নবী বা ওলী বা যে কারো জন্মদিন  উপলক্ষে যদি তার সম্মানের  উদ্দেশ্যে প্রাণী যবেহ করা হয়,  তবে তা গাইরুল্লাহ্র উদ্দেশ্যে যবেহ  করার অন্তর্ভুক্ত হবে- যা সুস্পষ্ট শিরক। আর  সে প্রাণীর মাংস খাওয়া জায়েজ নয়।  কেননা নবী সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,  যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহ্র  নামে প্রাণী যবেহ করে আল্লাহ্ তার  প্রতি লানত (অভিশাপ) করেন। (মুসলিম)  প্রশ্ন-১০: বিদআত এবং কুসংস্কারে লিপ্ত  ব্যক্তির জানাযায় শরীক হওয়া বা তাদের  মৃতদের জানাযা ছালাত আদায়  করা কি বৈধ?  উত্তর: ঐ লোকের বিদআত ও কুসংস্কার  যদি শিরকের পর্যায়ভুক্ত হয়, যেমন মৃত  বা অনুপস্থিত বা অদৃশ্য কোন ব্যক্তি বা জিন  বা ফেরেশতা বা যে কোন সৃষ্টির নিকট  থেকে সাহায্য প্রার্থনা করা,  বিপদাপদে উদ্ধার কামনা করা,  তবে তাদের জানাযায় অংশ  নেয়া বা তাদের মৃতদের উপর  ছালাতে জানাযা আদায় করা জায়েজ নয়।  কিন্তু যাদের কর্মকাণ্ড শিরকের  পর্যায়ে পৌঁছে না যেমন সাধারণ  বিদআতিগণ- যারা শির্কমুক্ত  মীলাদুন্নবী পালন করে, ইসরা-মেরাজ  উদ্যাপন করে, মুখে নিয়ত উচ্চারণ করে..  প্রভৃতি, তারা হচ্ছে পাপী-গুনাহগার।  তাদের জানাযায় শরীক  হওয়া যাবে এবং তাদের মৃতদের উপর  ছালাতে জানাযাও আদায় করা যাবে।  তাওহীদপন্থী পাপীদের  ব্যাপারে যা আশা করা যায় তাদের জন্যও  তা আশা করা যায়। কেননা আল্লাহ্ বলেন,  নিশ্চয় আল্লাহ্ ক্ষমা করেন না যে তার  সাথে শিরক করে, এবং তিনি এর নিম্ন  পর্যায়ের পাপ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।  (সূরা নিসা- ৪৮) -(সঊদী আরব  স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড)  প্রশ্ন-১১: মাজারে পশু যবেহ করার হুকুম কি?  বা মাজারে কোন উপকার-অপকারের  ক্ষেত্রে সাহায্য বা উদ্ধার  প্রার্থনা করার বিধান কি?  উত্তর: মাজারে পশু যবেহ করা বড় শিরক।  যে এরূপ করবে সে অভিশপ্ত। আলী (রা:)  কর্তৃক বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,  যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহ্র  নামে প্রাণী যবেহ করে আল্লাহ্ তার  প্রতি লানত (অভিশাপ) করেন। (মুসলিম)  প্রশ্ন-১২: আল্লাহ্র নেক ওলী-  আউলিয়াদের কবরে মসজিদ নির্মাণের  বিধান কি? এধরণের মসজিদে ছালাত  আদায় করা কি বৈধ?  উ: কোন ওলীর কবরে মসজিদ নির্মাণ  করা জায়েজ নয়। এবং সেখানে ছালাতও  আদায় করা বিধিসম্মত নয়।  কেননা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ্  অভিশাপ করেছেন ইহুদী খৃষ্টানদের উপর।  কেননা তারা তাদের নবীদের  কবরগুলোকে কেন্দ্র করে মসজিদ নির্মাণ  করেছে। (বুখারী ও মুসলিম) তিনি আরও  বলেন, সাবধান, তোমাদের পূর্ববর্তীগণ  তাদের নবী এবং নেক লোকদের কবর  সমূহে মসজিদ নির্মাণ করেছে। সাবধান,  তোমরা কবরে মসজিদ নির্মাণ করবে না।  কেননা আমি তোমাদেরকে এরূপ  করতে নিষেধ করছি। (মুসলিম) জাবের  (রা:) কর্তৃক আরও বর্ণিত হয়েছে।  তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিষেধ করেছেন,  কবরকে চুনকাম করতে, তার উপর  বসতে এবং তার উপর ঘর উঠাতে। (মুসলিম)  আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে ঈমান  রক্ষা করে শিরক মুক্ত জীবন গড়ার  তাওফীক দিন।  ================   সংকলক:শাইখ মুহা:আব্দুল্লাহ আল কাফী

মৃতের বাড়ীতে কুরআন খানী অনুষ্ঠান করার বিধান কি?

 

মৃতের বাড়ীতে কুরআন খানী অনুষ্ঠান করার বিধান কি?


মৃতের বাড়ীতে কুরআন খানী অনুষ্ঠান করার বিধান কি?


নিঃসন্দেহে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে কোরানখানী মাহফিল করা একটি বিদআত। কেননা ইহা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা তাঁর ছাহাবায়ে কেরামের যুগে প্রচলিত ছিল না। কুরআন দ্বারা দুঃখণ্ডচিন্তা হালকা হয়- যদি কোন ব্যক্তি উহা নীচু স্বরে তেলাওয়াত করে থাকে। জোরে চিৎকার করে বা মাইক্রোফোনের মাধ্যমে পাঠ করলে এরূপ হয় না। কেননা উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করলে সমস্ত মানুষ তা শুনে থাকে এমনকি খেলা-ধুলায় লিপ্ত লোকদের কানেও তা পৌঁছে কিন্তু তারা তার প্রতি গুরুত্বারোপ করে না। এমনকি আপনি দেখবেন যারা গান্তবাদ্য শুনে তাদের কাছেও ঐ কুরআনের আওয়াজ পৌঁছে। তারা গানও শুনছে কুরআনও শুনছে। ফলে তারা যেন এই কুরআনকে ঠাট্টা ও তাচ্ছিল্যের বিষয়ে পরিণত করেছে। কুরআনের অবমাননা করছে।

আর শোক-সমবেদনা জানাতে ও আগত লোকদের স্বাগত জানানোর জন্য মৃতের পরিবারের নিকট সমবেত হওয়া একটি বিদআত। অনুরূপভাবে মৃতের বাড়ীতে ভোজের আয়োজন করাও একটি বিদআত। কেননা বিষয়টি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর যুগে পরিচিত ছিল না। তবে চলতে ফিরতে, মসজিদে বাজারে মৃতের পরিবারকে শোক জানানোতে কোন অসুবিধা নেই। মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে তার বাড়িতে সমবেত লোকদের জন্য খাদ্য প্রস্তত করাকে ছাহাবায়ে কেরাম নিষিদ্ধ নিয়াহা বা ‘মৃতের জন্য বিলাপ’ এর অন্তর্ভুক্ত বলেছেন। আর মৃতের জন্য বিলাপ করা কাবীরা গুনাহ। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিলাপকারীনী ও বিলাপ শ্রবণকারীনীকে লা‘নত করেছেন। তিনি বলেন,

النَّائِحَةُ إِذَا لَمْ تَتُبْ قَبْلَ مَوْتِهَا تُقَامُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَعَلَيْهَا سِرْبَالٌ مِنْ قَطِرَانٍ وَدِرْعٌ مِنْ جَرَبٍ

“উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করে ক্রন্দনকারীনী যদি মৃত্যুর পূর্বে তওবা না করে, তবে ক্বিয়ামত দিবসে এমনভাবে উত্থিত করা হবে যে, তার গায়ে আলকাতরার একটি পায়জামা পরানো হবে এবং পরানো হবে খুঁজলী যুক্ত চাদর।” (আমরা আল্লাহ্‌র কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি)

মুসলিম ভাইদের প্রতি আমার নসীহত, তারা যেন এরকম সবধরণের বিদআত থেকে সাবধান হয়। কেননা বিদআত পরিত্যাগে তাদের যেমন কল্যাণ আছে, তেমনি উপকার আছে মৃত ব্যক্তির। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, إِنَّ الْمَيِّتَ يُعَذَّبُ بِبُكَاءِ أَهْلِهِ عَلَيْهِ “নিশ্চয় মৃত ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া হবে তার পরিবারের লোকদের ক্রন্দন ও বিলাপের কারণে।”  এখানে ‘শাস্তি দেয়া হবে’ একথার অর্থ হচ্ছে, মৃত ব্যক্তি এই ক্রন্দন ও বিলাপের কারণে ব্যথিত হয় কষ্ট পায়। যদিও বিলাপকারীর শাস্তি তাকে দেয়া হবে না। কেননা আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন, وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَى “একজন অন্যজনের পাপের বোঝা বহণ করবে না।” (সূরা আনআমঃ ১৬৪) আর শাস্তি মানেই দন্ডিত হওয়া নয়। কেননা হাদীছে বলা হয়েছেঃ “সফর  শাস্তির একটি অংশ।” অথচ এখানে কোন দন্ড নেই; বরং এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে, দুঃখ, চিন্তা, মনোকষ্ট প্রভৃতি।

সারকথা মুসলিম ভাইদেরকে আমি নসীহত করি, তারা যেন শরীয়ত বহির্ভূত এই কুসংস্কার পরিত্যাগ করে যা তাদেরকে আল্লাহ্‌ থেকে দূরে সরিয়ে দিবে এবং মৃতদের শাস্তি বৃদ্ধি করবে।

Translate