May 25, 2026

জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফজিলত এবং কুরবানি ও ঈদের বিধি-বিধান

 জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফজিলত এবং কুরবানি ও ঈদের বিধি-বিধান:

فَضْلُ عَشْرِ ذِي الْحِجَّةِ وَأَحْكَامُ الْأُضْحِيَةِ وَعِيدِ الْأَضْحَى الْمُبَارَكِ
( بِاللُّغَةِ الْبَنْغَالِيَّةِ )
প্রণয়নে: অনুবাদ বিভাগ
আস সুলাই ইসলামি দাওয়াহ সেন্টার, রিয়াদ, সৌদি আরব।
প্রথম কথা:
اَلْحَمْدُ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِيْنَ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى أَشْرَفِ الْأَنْبِيَاءِ وَالْمُرْسَلِيْنَ نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ أَجْمَعِيْنَ وَمَنْ تَبِعَهُمْ بِإِحْسَانٍ إِلَى يَوْمِ الدِّيْنِ أَمَّا بَعْدُ.
প্রশংসা বলতে যা কিছু সব টুকুই বিশ্বজগতের মহান প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার পাওনা। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল — আমাদের নবী মুহাম্মাদ +সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর এবং তাঁর পরিবার-পরিজন ও সঙ্গী-সাথীদের উপরও অগণিত শান্তির ধারা বর্ষিত হোক। এরপর কথা হলো, মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে বিভিন্ন সময় নানাবিধ ভালো কাজের সুব্যবস্থা দিয়ে করুণা করে থাকেন। যাতে তারা ঐ সময়ের মধ্যে ভালো কাজ করে কল্যাণময় জীবনের পুঁজিভাগ বৃদ্ধি করতে পারে। এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা মানুষের জীবনে বারবার আসলেও তন্মধ্যে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ব্যাপারটা অন্যরকম। কেননা এ দিনগুলিতে নানা রকমের ভালো কাজের সমাবেশ ঘটেছে। এ দিনগুলির ফজিলত সম্পর্কে কুরআন ও হাদিসে ভূরি ভূরি প্রমাণ বিদ্যমান। তন্মধ্যে দুচারটি নিচে উল্লেখ করা হলো:
🔸জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের ফজিলত:
১. মহান আল্লাহর বাণী:
وَالْفَجْرِ ۝ وَلَيَالٍ عَشْرٍ
“কসম ভোরবেলার, আরও শপথ দশ রাতের” [সুরা ফাজর: ১-২]। ইবনে কাসির (রাহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, “এখানে দশ রাত বলতে জিলহজের প্রথম দশককে বোঝানো হয়েছে”।
২. মহান আল্লাহর বাণী:
وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ فِيْ أَيَّامٍ مَّعْلُوْمَاتٍ
“আর যাতে তারা মহান আল্লাহকে নির্দিষ্ট দিনগুলিতে বিশেষভাবে স্মরণ করে” [সুরা হজ: ২৮]। হজরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রাজিয়াল্লাহু আনহুমা) বলেন, “এখানে নির্দিষ্ট দিনগুলি বলতে জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনই ইঙ্গিত করা হয়েছে”।
৩. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন; রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ ফরমান:
«مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ؟ قَالَ: «وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ، إِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ»
“কোনো আমলই এ দশ দিনের আমলের সমকক্ষ নয়”। জিহাদও নয়? বলে সাহাবায়ে কেরাম প্রশ্ন করলে তিনি উত্তর দিলেন: “না, জিহাদও নয়। তবে হ্যাঁ যে ব্যক্তি জান-মাল নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে যাওয়ার পর তার কোনো কিছুই আর ফেরত আসেনি” (অর্থাৎ তিনি যুদ্ধের ময়দানে শহিদ হয়ে গেছেন। ঐ ব্যক্তির জিহাদ এ দশ দিনের আমলের সমকক্ষ হতে পারে) [বুখারি]।
৪. হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ ফরমান:
«مَا مِنْ أَيَّامٍ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ سُبْحَانَهُ وَلَا أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعَمَلُ فِيهِنَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ الْعَشْرِ، فَأَكْثِرُوا فِيهِنَّ مِنَ التَّهْلِيلِ وَالتَّكْبِيرِ وَالتَّحْمِيدِ»
“মহাপবিত্র মহান আল্লাহর নিকটে এই দশ দিনের নেক কাজের তুলনায় মহৎ ও প্রিয় কোনো কাজ নেই। সুতরাং তাতে তাকবির ধ্বনি, মহান আল্লাহর প্রশংসা বাণী ও তাঁর একত্ববাদের ঘোষণা করতে থাক” [ইমাম তাবরানি (রাহ.) মুজামুল কাবির গ্রন্থে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন]।
৫. হজরত সাঈদ বিন জুবায়র (রাহেমাহুল্লাহ) (যিনি হজরত ইবনে আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত পূর্বোল্লিখিত হাদিসের বর্ণনাকারী) জিলহজ মাসের প্রথম দশকে চূড়ান্ত পর্যায়ে ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকতেন। (ইমাম দারেমি (রাহ.) হাসান সনদে গ্রহণযোগ্য সূত্রে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন)।
৬. হাফেজ ইবনে হাজার আল-আসকালানি (রাহ.) স্বীয় ‘ফাতহুল বারি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন: “জিলহজ মাসের প্রথম দশকে সালাত (নামাজ), সিয়াম (রোজা), সদকা, হজ ইত্যাদি মৌলিক ইবাদতসমূহ একত্রিত হয়ে থাকে, যা অন্য কোনো সময় হয় না। বোধহয় এ কারণেই উহাকে এত মর্যাদাবান করা হয়েছে”।
৭. মুহাদ্দিক-গবেষণাকারী আলেমগণ বলেন: ‘দিন হিসাবে উত্তম দিন হলো জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন আর রাত হিসাবে উত্তম রাত হলো রমজান মাসের শেষ দশ রাত’।
🔸 এ দিনগুলিতে করণীয় কাজসমূহ:
১. সালাত (নামাজ): ফরজ নামাজের প্রতি যত্নশীল হওয়া আর নফলসমূহ বেশি বেশি আদায় করা। কেননা উহা মহান মালিকের নৈকট্য লাভের অতি উত্তম পন্থা। হজরত সাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন: আমি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি:
«عَلَيْكَ بِكَثْرَةِ السُّجُودِ لِلهِ، فَإِنَّكَ لَا تَسْجُدُ لِلهِ سَجْدَةً إِلَّا رَفَعَكَ اللهُ بِهَا دَرَجَةً وَحَطَّ عَنْكَ بِهَا خَطِيئَةً»
“তোমার উচিত মহান আল্লাহর জন্যে বেশি বেশি সিজদায় লুটিয়ে পড়া। কেননা তুমি সিজদা করামাত্রই উহার বিনিময়ে মহান আল্লাহ তোমার এক স্তর মর্যাদা বৃদ্ধি করেন আর একটি করে পাপ মাফ করেন” [মুসলিম]। বলাবাহুল্য এ সুযোগ সব সময়ের জন্যেই।
২. সিয়াম: হুনায়দাহ বিন খালেদ স্বীয় স্ত্রীর মাধ্যমে কোনো কোনো নবি-সহধর্মিণী হতে বর্ণনা করেন। তিনি (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন:
«كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ وَثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ»
“রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিলহজ মাসের ৯ তারিখ, আশুরার দিন আর প্রত্যেক চাঁদে (১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) তিন দিন রোজা পালন করতেন” [আহমাদ, আবু দাউদ ও নাসাঈ]।
ইমাম নাওয়াভি (রাহেমাহুল্লাহ) এ দশ দিনের মধ্যে রোজা পালন করা সম্পর্কে বলেন: ‘উহা অত্যন্ত ভালো কাজ’।
৩. তাকবির: (মহান আল্লাহর মহত্ব ধ্বনি), তাহলিল (তাঁর একত্ববাদের ঘোষণা) আর তাহমিদ (তাঁর প্রশংসা বাণী) পাঠ করা যা পূর্বোল্লিখিত ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
সুতরাং ‘ঐ দিনগুলিতে বেশি বেশি তাহলিল, তাকবির ও তাহমিদ পাঠ করতে থাকবে’। ইমাম বুখারি (রাহেমাহুল্লাহ) বলেন, ‘ইবনে উমর ও আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এ দিনগুলিতে বাজারে বের হয়ে তাকবির দিলে উপস্থিত জনতা তাদের দেখাদেখি তাকবির দিতেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মিনায় স্বীয় তাঁবুতে তাকবির দিলে তা শুনে মসজিদে অবস্থানরত জনতাও তাকবির দিতেন। যার ফলে বাজারের লোকেরাও তাকবির দিতেন। অবশেষে পুরো মিনা তাকবির ধ্বনিতে কেঁপে উঠত।’ ইবনে উমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) এ দিনগুলিতে মিনায় তাকবির দিতেন; প্রত্যেক নামাজান্তে, স্বীয় বিছানায়, তাঁবুতে, বৈঠকখানায় ও চলার পথে।
হজরত উমর, তাঁর ছেলে এবং আবু হুরায়রা (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) ফরজ তাকবির পাঠ করতেন বিদায় হজের পুণ্যময় মুহূর্ত বা স্থানগুলোতে। আমরা মুসলিম। আমাদের উচিত, আজকে এই পরিত্যক্ত সুন্নাতকে জীবিত করা; যা প্রায় ভুলতেই বসেছে মুসলিম মিল্লাতের অধিকাংশ জনতা।
৪. আরাফার দিনে রোজা পালন করা: হজ পালনের উদ্দেশ্যে আরাফার ময়দানে অবস্থানরত ব্যক্তি ছাড়া সকল মুসলমানকে ঐ দিন রোজা রাখার প্রতি বিশেষ তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কেননা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার ফজিলত সম্পর্কে বলেন:
«صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِي قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِي بَعْدَهُ»
“আমি আশা করি যে, উহা বিগত ও আগত বর্ষদ্বয়ের (ছোট) গুনাহসমূহের কাফফারাস্বরূপ” [মুসলিম]।
৫. কুরবানির দিনের ফজিলত: এ মহান দিবসের ফজিলত সম্পর্কে অনেক মুসলমান উদাসীন রয়েছেন। অথচ কিছুসংখ্যক ইসলামি বিদ্বান এ দিনকে সারা বছরের সকল দিনগুলির উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। এমনকি আরাফার দিনের উপরেও। ইমাম ইবনে কাইয়্যেম (রাহ.) বলেন, ‘মহান আল্লাহর নিকটে উত্তম দিন হলো কুরবানির দিন আর ওটাই হলো (হজে আকবার) অর্থাৎ মহান হজের দিন’। সুনানে আবু দাউদে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এ মর্মে হাদিস এসেছে — “মহান আল্লাহর নিকটে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হলো কুরবানির দিন। তারপর (আল কার) অর্থাৎ মিনায় অবস্থানের দিন। আর সেটা হলো একাদশ তারিখ”। কেউ কেউ বলেন, ‘আরাফার দিন এ দিনের চেয়ে উত্তম। কেননা ঐ দিনের রোজা দুই বছরের গুনাহ মোচনকারী এবং মহান আল্লাহ ঐ দিন অধিক পরিমাণ মানুষকে মুক্তি দান করে থাকেন।’ তবে প্রথম মতই যে বিশুদ্ধ এতে কোনো সন্দেহ নেই।
▪️এ সুযোগকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়?
একমাত্র পাপ-পঙ্কিলতাই হলো মহান আল্লাহর দয়া-মায়া ও বদান্যতা লাভের অন্যতম অসহায় বাধা এবং তার ও মহান মালিকের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টিকারী। সুতরাং মুসলমানদের উচিত সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতাকে ঝেড়ে ফেলে খালেস তওবা করতঃ মহান আল্লাহর দিকে ফেরত আসার মাধ্যমে কল্যাণময় মওসুমগুলিকে অভ্যর্থনা জানানো। মহান আল্লাহ বলেন,
وَالَّذِيْنَ جَاهَدُوْا فِيْنَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
“আর যারা আমার রাস্তায় জিহাদ করে আমি অবশ্যই তাদেরকে আমার বিভিন্নমুখি পথের সন্ধান দিয়ে থাকি” [সুরা আনকাবুত: ৬৯]।
তিনি আরও বলেন,
وَسَارِعُوْا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِيْنَ
“তোমরা তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা এবং জান্নাতের দিকে ছুটে যাও যার প্রশস্ততা আসমানসমূহ ও জমিন। যা তৈরি করা হয়েছে পরহেজগারদের জন্যে” [সুরা আলে ইমরান: ১৩৩]।
সুতরাং ওহে আমার মুসলিম ভাই! চলমান এ সুবর্ণ সুযোগ চলে যাওয়ার আগেই তাকে কাজে লাগান।
মহান মালিক তাঁর এ বাণীতে উল্লেখ করেছেন:
إِنَّهُمْ كَانُوْا يُسَارِعُوْنَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُوْنَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا وَكَانُوْا لَنَا خَاشِعِيْنَ
“নিশ্চয় তারা ভালো ভালো কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ত আর আমাকে ডাকত আশা ও ভীতি সহকারে এবং তারা ছিল আমার কাছে বিনীত” [সুরা আম্বিয়া: ৯০]।
▪️কুরবানির কতিপয় বিধান:
মহান আল্লাহ নিম্নলিখিত আয়াতে কুরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“হে নবি! আপনি আপনার প্রভুর জন্যে নামাজ আদায় করুন আর কুরবানি করুন” [সুরা কাওসার: ২]। তিনি আরও বলেন,
وَالْبُدْنَ جَعَلْنَاهَا لَكُمْ مِّنْ شَعَائِرِ اللهِ لَكُمْ فِيْهَا خَيْرٌ فَاذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَيْهَا صَوَافَّ
“উটকে আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন করেছি। এতে তোমাদের জন্যে মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় তাদের জবেহ করার সময়ে তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর” [সুরা হজ: ৩৬]।
কুরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও উহা পরিত্যাগ করা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ। কেননা সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত, হজরত আনাস (রাজিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে,
«ضَحَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ، ذَبَحَهُمَا بِيَدِهِ وَسَمَّى وَكَبَّرَ»
“নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উঁচু শিং বিশিষ্ট দুটি ধূসর বর্ণের দুম্বা কুরবানি করেছিলেন। তিনি ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে উহা নিজ হস্তেই জবেহ করেছিলেন”।
▪️কুরবানির উপযুক্ত পশুসমূহ:
উট, গরু-মহিষ ও ছাগল জাতীয় পশু ছাড়া অন্য কোনো পশুতে কুরবানি বৈধ নয়। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন:
لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِّنْ بَهِيْمَةِ الْأَنْعَامِ
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্যে কুরবানি নির্ধারণ করেছি যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করার সময়ে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে” [সুরা হজ: ৩৪]।
কুরবানির পশু দোষমুক্ত হওয়া শর্ত। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
«أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الْأَضَاحِيِّ: الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا، وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا، وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلْعُهَا، وَالْعَجْفَاءُ الَّتِي لَا تُنْقِي»
চার প্রকার পশু কুরবানির অযোগ্য: স্পষ্ট অন্ধ, স্পষ্ট রোগাক্রান্ত, স্পষ্ট খোঁড়া এবং অত্যন্ত দুর্বল জীর্ণশীর্ণ ও বোধশক্তিহীন [তিরমিজি]।
▪️জবেহ করার শরিয়তসম্মত সময়:
ঈদের নামাজের পর হতে ১৩ তারিখ সূর্য ডোবার আগ পর্যন্ত কুরবানির পশু জবেহ করার শরিয়তসম্মত সময়। কেননা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
«مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ الصَّلَاةِ فَإِنَّمَا يَذْبَحُ لِنَفْسِهِ، وَمَنْ ذَبَحَ بَعْدَ الصَّلَاةِ وَالْخُطْبَتَيْنِ فَقَدْ تَمَّ نُسُكُهُ وَأَصَابَ سُنَّةَ الْمُسْلِمِينَ»
“যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে যে জানোয়ার জবেহ করল সে কেবল তার নিজের নফসের খাতিরে জবেহ করল। আর যে ব্যক্তি ঈদের নামাজ ও খুতবাদ্বয়ের পরে জানোয়ার জবেহ করল সে তার কুরবানি পূর্ণ করল এবং সুন্নাতের অনুসরণ করল” [বুখারি ও মুসলিম]।
তিনি আরও বলেন:
«كُلُّ أَيَّامِ التَّشْرِيقِ ذَبْحٌ»
“তাশরিকের দিনগুলিতেও কুরবানির পশু জবেহ করা যায়” [সিলসিলা সহিহা: ২৪৭৩]। পারলে নিজের কুরবানি নিজ হাতে ‘বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার আল্লাহুম্মা হাযা আন…….’ বলে জবেহ করা সুন্নাত।
▪️কুরবানির গোশত বণ্টন:
কুরবানির গোশত নিজে খাওয়া, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবকে হাদিয়া দেওয়া এবং ফকির-মিসকিনকে দান করা সুন্নাত। মহান আল্লাহ বলেন,
فَكُلُوْا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيْرَ
“অতঃপর উহা হতে তোমরা আহার কর এবং দুঃস্থ ফকিরদেরকে আহার করাও” [সুরা হজ: ২৮]।
তিনি আরও বলেন,
فَكُلُوْا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْقَانِعَ وَالْمُعْتَرَّ
“— তখন উহা হতে তোমরা নিজেরা আহার কর এবং আহার করাও তাদেরকে যারা চায় না এবং তাদেরকেও যারা চায়” [সুরা হজ: ৩৬]। এ জন্যেই তো সালাফে সালেহিনের কতক মহামনীষী উহা তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজেদের জন্যে রাখতেন, এক ভাগ ধনী বন্ধুদের উপঢৌকন দিতেন, আর এক ভাগ গরিব-মিসকিনদেরকে দান করতেন। উল্লেখ্য যে, গোশত বানানোর মজুরি হিসাবে কসাইকে কুরবানির গোশত দেওয়া বৈধ নয়।
▪️কুরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের করণীয়:
কুরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তির জিলহজ মাসের চাঁদ ওঠার পর হতে কুরবানি জবেহ করার আগ পর্যন্ত নিজের পশম, নখ, চামড়া ও মাথার চুল না কাটা ভালো। কেননা হজরত উম্মে সালামা (রাজিয়াল্লাহু আনহা) বর্ণিত হাদিসে আছে যে, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ ফরমান:
«إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعْرِهِ وَلَا مِنْ بَشَرِهِ شَيْئًا»
“জিলহজ মাস শুরু হলে তোমাদের মধ্যকার কুরবানি করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি যেন তার চুল ও নখ না কাটে” [আহমাদ ও মুসলিম]। অন্য বর্ণনায় এসেছে: “কুরবানি না করা পর্যন্ত নিজের চুল এবং চামড়া কাটবে না” কুরবানিদাতার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপর এ সব বিধি-নিষেধ প্রযোজ্য নয়।
▪️ঈদের আদব এবং উহার বিধি-বিধান:
প্রিয় মুসলিম ভাই! মহান আল্লাহ আমাদেরকে এবারের ঈদেও বাঁচিয়ে রেখে বেশ ভালো ভালো কাজের সুযোগ করে দিয়ে পারলৌকিক জীবনের পাথেয় সংগ্রহ করার সময়সীমা বাড়িয়ে দিলেন সে জন্যে রিমঝিম ও সজল প্রশংসার হকদার তিনিই। এই তো সেদিনের কথা! গত ঈদ যারা আমাদের সাথে পালন করেছেন তাদের অনেকেই আজ আমাদের মাঝে নেই, আর আসবেনও না কোনো দিন। আজকের দিনের কিছুক্ষণ আগেও তো কত মানুষ চলে গেলেন, তারা এখন কোথায় আছেন কে জানে? সুতরাং হে ভাই আর দেরি নয়। অবহেলাও নয়। হেলায়-খেলায় সময় নষ্ট না করে ঈদের গুরুত্ব উপলব্ধি করি। প্রিয় ভাই!
ঈদের দিন মুসলমানদের অবৈধ কাজে সময় নষ্ট করার দিন নয় বরং উহা ইসলামের প্রকাশ্য নিদর্শনসমূহের অন্যতম, মুসলিম মিল্লাতের বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ বলেন,
ذَلِكَ وَمَنْ يُّعَظِّمْ شَعَائِرَ اللهِ فَإِنَّهَا مِنْ تَقْوَى الْقُلُوْبِ
“অর্থাৎ এটা শুনে রাখ যে, কেউ আল্লাহর নিদর্শনসমূহের প্রতি সম্মান দেখালে তা তো তার হৃদয়ের আল্লাহভীতির প্রসূত” [সুরা হজ: ৩২]। প্রিয় পাঠক/পাঠিকা! সংক্ষিপ্তাকারে আপনাদের সামনে ঈদের বিধানগুলি অর্থাৎ করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়গুলি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. তাকবির: কুরবানির দিনের আগের দিন ফজর হতে তের তারিখ আসর পর্যন্ত তাকবির পাঠ করা সুন্নাত। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন:
وَاذْكُرُوا اللهَ فِيْ أَيَّامٍ مَّعْدُوْدَاتٍ
“নির্দিষ্ট কতক দিনে আল্লাহকে বিশেষভাবে স্মরণ কর” [সুরা বাকারা: ২০৩]।
তাকবিরের বাক্যগুলি নিম্নরূপ:
اَللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، اَللهُ أَكْبَرُ، وَلِلهِ الْحَمْدُ
উচ্চারণ: “আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ”।
মহান আল্লাহর মহত্ব ঘোষণা এবং তাঁর ইবাদত ও শুকরিয়া প্রকাশার্থে পুরুষদের জন্যে হাটে-বাজারে, মসজিদে-বাড়িতে বিশেষ করে প্রত্যেক নামাজ শেষে উচ্চস্বরে এ তাকবির পড়া সুন্নাত।
২. গোসল করা এবং অপব্যয় না করে সম্ভাব্য ভালো পোশাক পরিধান করা:
পুরুষগণ পায়ের টাখনু থেকে কাপড় পরবেন না, দাড়ি কাটবেন না এবং স্বর্ণালংকার ব্যবহার করবেন না। কেননা এগুলি তাদের জন্যে হারাম। তারা সুগন্ধি ব্যবহার করবেন। কিন্তু মেহেদি লাগাবেন না। পক্ষান্তরে মহিলাগণ মেহেদি লাগাবেন, সুগন্ধি ব্যবহার করবেন না। তারা পর্দা ও শালীনতার সাথে ঈদগাহে যাবেন। যাদের নামাজ নেই তারা একটু ফাঁকে বসে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকবেন।
৩. সম্ভব হলে ঈদগাহে হেঁটে যাওয়া: ঈদের নামাজ ঈদগাহে আদায় করা সুন্নাত। বৃষ্টি বা ঐ জাতীয় শরিয়তসম্মত কোনো ওজর থাকলে মসজিদে আদায় করা যাবে। কেননা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরূপ করেছেন। তাকবির পড়তে পড়তে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত।
৪. দুই ঈদের নামাজ:
মুসলমানদের সাথে জামাআতে আদায় করা জরুরি: নামাজ শেষে খুতবা শোনা যুক্ত। শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহেমাহুল্লাহ) সহ কুরআন ও হাদিস বিশ্লেষণকারীগণের অধিকতর বিশুদ্ধ মত হিসাবে উল্লিখিত। শরিয়তসম্মত ওজর ছাড়া উহা পরিত্যাজ্য নয়। কেননা মহান আল্লাহ বলেন:
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“অতএব হে নবি! আপনার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে নামাজ পড়ুন এবং কুরবানি করুন” [সুরা কাওসার: ২]। মহিলাগণও মুসলিম মিল্লাতের ঈদগাহে হাজির হবেন। এমনকি অত্যন্ত পর্দানশিন যুবতী কুমারী ও ঋতুবতী মহিলারাও যাতে শরিক হবেন। ঋতুবতীগণ নামাজ না পড়ে একটু ফাঁকে বসে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকবেন।
৫. দুই ঈদের নামাজ সম্পর্কে কিছু জরুরি কথা:
(ক) ঈদের নামাজের কোনো আজান-ইকামত নেই।
(খ) ঈদের নামাজের আগে ও পরে কোনো নফল ও সুন্নাত নামাজ নেই।
(গ) ঈদের নামাজের প্রথম রাকাতে তাকবিরে তাহরিমা ছাড়াও অতিরিক্ত আরও ৭টি আর দ্বিতীয় রাকাতে দাঁড়িয়ে কেরাআতের আগে ৫টি অর্থাৎ সর্বমোট ১২টি অতিরিক্ত তাকবির দিতে হবে।
(ঘ) সূর্য দুই বল্লম পরিমাণ ওঠার পরে ঈদুল ফিতরের নামাজ আর এক বল্লম পরিমাণ ওঠার পরে ঈদুল আজহার নামাজ আদায় করা সুন্নাত।
৬. রাস্তা পরিবর্তন করা: ঈদগাহে যাওয়ার জন্য যে পথ ব্যবহার করা হয়েছে ফেরত আসার সময় ঐ পথে না এসে অন্য পথে ফেরত আসা মুস্তাহাব। কেননা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরূপ করেছেন।
৭. কুরবানির পশু জবেহ করা:
কুরবানির পশু ঈদের নামাজের পরে জবেহ করতে হবে। যারা নামাজের আগেই জবেহ করে ফেলেছে তাদেরকে পুনরায় কুরবানি করতে হবে। কেননা রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
«مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ أَنْ يُصَلِّيَ فَلْيُعِدْ مَكَانَهَا أُخْرَى»
“যে ব্যক্তি ঈদের নামাজ পড়ার আগেই জবেহ করল সে যেন এটার পরিবর্তে পুনরায় কুরবানি করে” [বুখারি ও মুসলিম]।
৮. ঈদের দিন কুরবানিকৃত পশুর গোশত দিয়ে নাশতা করা: রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঈদুল ফিতরের দিন বেজোড় খেজুর খেয়ে ঈদগাহে যেতেন। আর ঈদুল আজহার দিন কিছু না খেয়ে ঈদগাহে গিয়ে সকাল সকাল নামাজ আদায় করে ঘরে ফিরে এসে কুরবানি করে উহার গোশত দিয়ে নাশতা করতেন।
৯. ঈদের মুবারকবাদ: ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকুম সালেহাল আমাল’ অর্থাৎ ‘মহান আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের সকল নেক আমল কবুল করুন’ বলে পরস্পরের মুবারকবাদ দেওয়া ভালো।
▪️ঈদের সাথে জড়িত কতকগুলি অবাঞ্ছিত কাজ:
প্রিয় ভাই! অন্যান্যদের মতো আপনিও যেন অবৈধ কাজে জড়িয়ে না পড়েন সে জন্যে সতর্ক হোন:
অন্যের সাথে তাল মিলিয়ে দল বেঁধে তাকবির বলা, নামাজ শেষে কবর জিয়ারত করা এবং দীর্ঘদিন সাক্ষাৎ না হওয়া ব্যক্তি ও সফর থেকে প্রত্যাগত ব্যক্তি ছাড়া অন্যান্যদের সাথে কোলাকুলি করা বিদআত।
সুতরাং তা পরিহার করা দরকার। হারাম খেলাধুলা, গান-বাজনা শোনা, অশ্লীল ছবি দেখা এবং বেগানা নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ইত্যাদি কাজ পরিহার করা উচিত। চাঁদ ওঠার পর হতে কুরবানি জবেহ করা পর্যন্ত কুরবানিদাতা নিজের চুল, নখ ইত্যাদি কাটবে না। ছাগল-ভেড়া না পেয়ে গরুতে আকিকা দেওয়া বৈধ হলেও তাতে ভাগাভাগি চলবে না। অতএব আকিকা ও কুরবানি এক গরুতে ভাগে দেওয়া সুস্পষ্ট বিদআত।
পরিশেষে প্রিয় মুসলিম ভাই! সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা ছেড়ে দিয়ে খালেস তওবা করে ভালো কাজের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করুন। সেই সাথে সংকীর্ণতা ও হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে ঈদের ছুটিতেই আত্মীয়-স্বজন সবার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করে আত্মীয়তার বন্ধনকে সুদৃঢ় করুন। মনের গভীর ভালোবাসা নিয়ে অভাবগ্রস্ত ফকির-মিসকিন ও ইয়াতিমদেরকে সাহায্য করে তাদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করুন। মহান আল্লাহ আপনাদের এবং আমাদেরকে তাঁর পছন্দসই কাজ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
নবি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর পরিবারবর্গ ও সঙ্গী-সাথীদের উপর অনাবিল শান্তির ধারা বর্ষিত হোক।
إِعْدَادُ قِسْمِ الْجَالِيَاتِ, مَكْتَبُ الدَّعْوَةِ بِالسُّلَيِّ, الرياض، المملكة العربية السعودية
অনুবাদ: শায়েখ আমানুল্লাহ (পাবনা)।
সম্পাদনায়: শায়েখ আবুল কালাম আজাদ।
উপস্থাপনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পক্ষ থেকে কুরবানি করার বিধান কী এবং এ সংক্রান্ত হাদিসটির মান কী

 প্রশ্ন: কোনো মুসলিম কি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে কুরবানি দিতে পারেন? এ মাসআলায় উলামায়ে কিরামের মতামত কী? এবং নিম্নোক্ত হাদিসটির সনদগত মান কী এবং এর ব্যাখ্যা কী?

হানাশ (রাহ.) থেকে বর্ণিত, আলি (রা.) সম্পর্কে এসেছে:
«أَنَّهُ كَانَ يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ أَحَدُهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَالْآخَرُ عَنْ نَفْسِهِ، فَقِيلَ لَهُ، فَقَالَ: أَمَرَنِي بِهِ يَعْنِي النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَসَلَّمَ، فَلَا أَدَعُهُ أَبَدًا»
“তিনি দুটি ভেড়া দিয়ে কুরবানি দিতেন—একটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে, অপরটি নিজের পক্ষ থেকে। তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে এটি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আমি এটি কখনো ছাড়ব না।” [তিরমিজি ও আবু দাউদ]
উত্তর: আলহামদুলিল্লাহ। ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসুলিল্লাহ। আম্মা বাদ:
কারো জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়া জায়েজ নয়। কারণ ইবাদতের মূলনীতি হলো, নিষেধাজ্ঞা ও তাওকিফিয়াত (অর্থাৎ দলিল ছাড়া কিছু করা যাবে না)—যতক্ষণ না বিপরীত কোনো স্পষ্ট দলিল প্রমাণিত হয়।
প্রশ্নকারী যে হাদিসটির উল্লেখ করেছেন, সেটি ইমাম তিরমিজি বর্ণনা করেছেন এবং শায়খ আলবানি (রাহ.)সহ অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ সেটিকে দুর্বল সাব্যস্ত করেছেন, যা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
ইমাম তিরমিজি (রাহ.) বলেন:
حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ عُبَيْدٍ الْمُحَارِبِيُّ الْكُوفِيُّ، حَدَّثَنَا شَرِيكٌ عَنْ أَبِي الْحَسْنَاءِ، عَنِ الْحَكَمِ، عَنْ حَنَشٍ، عَنْ عَلِيٍّ: «أَنَّهُ كَانَ يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ أَحَدُهُمَا عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، وَالْآخَرُ عَنْ نَفْسِهِ، فَقِيلَ لَهُ، فَقَالَ: أَمَرَنِي بِهِ يَعْنِي النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَلَا أَدَعُهُ أَبَدًا»
“হানাশ বলেন, আলি (রা.) দুটি ভেড়া দিয়ে কুরবানি দিতেন—একটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর পক্ষ থেকে, অপরটি নিজের পক্ষ থেকে। তাঁকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে এটি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আমি এটি কখনো ছাড়ব না।” [তিরমিজি: ১৪৯৫]
হাদিসটি বর্ণনার পর ইমাম তিরমিজি বলেন: “এটি একটি গরিব (একক বর্ণনাকারী দ্বারা বর্ণিত) হাদিস। কেবল শারিকের সূত্রেই আমরা এটি জানি।”
ইমাম আহমদ ও আবু দাউদ, শারিক ইবনে আব্দুল্লাহ আল কাদি সূত্রে ‘অসিয়ত’ শব্দটি উল্লেখ করে বর্ণনা করেছেন:
حَدَّثَنَا عُثْمَانُ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، حَدَّثَنَا شَرِيكٌ، عَنْ أَبِي الْحَسْنَاءِ، عَنِ الْحَكَمِ، عَنْ حَنَشٍ، قَالَ: «رَأَيْتُ عَلِيًّا يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ، فَقُلْتُ لَهُ: مَا هَذَا؟ فَقَالَ: إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْصَانِي أَنْ أُضَحِّيَ عَنْهُ، فَأَنَا أُضَحِّي عَنْهُ»
হানাশ রাহ. বলেন, আমি আলি (রা.)-কে দুটি ভেড়া দিয়ে কুরবানি করতে দেখলাম। আমি তাঁকে বললাম: এটি কী? তিনি বললেন: রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানি করার অসিয়ত করেছেন। তাই আমি তাঁর পক্ষ থেকে কুরবানি করি।” [আবু দাউদ: ২৭৯০, আহমদ: ১২১৯]
❑ হাদিসটির সনদ পর্যালোচনা:
◈ মোবারকপুরি (রাহ.) বলেন, মুনযিরি উল্লেখ করেছেন—হানাশ হলেন, আবুল মু’তামির আল কানানি আস সান’আনি (أَبُو الْمُعْتَمِرِ الْكِنَانِيُّ الصَّنْعَانِيُّ)। একাধিক মুহাদ্দিস তাঁর সমালোচনা করেছেন।
ইবনে হিব্বান আল বুস্তি বলেছেন:
وَكَانَ كَثِيرَ الْوَهْمِ فِي الْأَخْبَارِ، يَنْفَرِدُ عَنْ عَلِيٍّ بِأَشْيَاءَ لَا يُشْبِهُ حَدِيثَ الثِّقَاتِ، حَتَّى صَارَ مِمَّنْ لَا يُحْتَجُّ بِهِ
“তিনি বর্ণনায় বহু ওহাম বা ভুলের শিকার হতেন। আলি (রা.) থেকে এমন অনেক কিছু এককভাবে বর্ণনা করতেন যা নির্ভরযোগ্য রাবিদের হাদিসের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়, ফলে তিনি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছেন যে, তাঁর দ্বারা দলিল গ্রহণযোগ্য নয়।”
আর শারিক অর্থাৎ ইবনে আব্দুল্লাহ আল কাদি সম্পর্কেও সমালোচনা রয়েছে; যদিও ইমাম মুসলিম তাঁকে মুতাবা’আত হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
মোবারকপুরি আরও বলেন: আবুল হাসনা—যিনি আব্দুল্লাহর শায়খ। তিনি মাজহুল (অপরিচিত)। সুতরাং হাদিসটি দুর্বল। [তুহফাতুল আহওয়াযি]
◈ শায়খ আলবানি (রাহ.) বলেন:
إِسْنَادُهُ ضَعِيفٌ؛ لِسُوءِ حِفْظِ شَرِيكٍ -وَهُوَ ابْنُ عَبْدِ اللَّهِ الْقَاضِي- وَحَنَشٌ -وَهُوَ ابْنُ الْمُعْتَمِرِ الصَّنْعَانِيُّ- ضَعَّفَهُ الْجُمْهُورُ وَأَبُو الْحَسْنَاءِ مَجْهُولٌ
“এর সনদ দুর্বল। কারণ শারিক—অর্থাৎ ইবনে আব্দুল্লাহ আল কাদি-এর স্মৃতিশক্তি দুর্বল। আর হানাশ অর্থাৎ ইবনুল মু’তামির আস সান’আনি—কে জুমহুর (সংখ্যা গরিষ্ঠ) মুহাদ্দিসগণ দুর্বল বলেছেন। এবং আবুল হাসনা মাজহুল।” [যঈফ আবু দাউদ]
শায়খ আব্দুল মুহসিন আল আব্বাদ (হাফি.)ও উপরোক্ত একই কারণগুলোর ভিত্তিতে সুনানে আবু দাউদের ব্যাখ্যায় হাদিসটিকে দুর্বল বলেছেন।
❑ সিদ্ধান্ত:
হাদিসটির দুর্বলতা প্রমাণিত হওয়ার পর মূলের দিকে ফিরে যাওয়া আবশ্যক। আর শরিয়তের মূল হল, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়া জায়েজ নয়। (কেননা তা দলিল দ্বারা সাবস্ত নয়)।
➧ শায়খ আব্দুল মুহসিন আল আব্বাদ (হাফি.) বলেন:
اَلْإِنْسَانُ عِنْدَمَا يُضَحِّي، يُضَحِّي عَنْ نَفْسِهِ وَأَهْلِ بَيْتِهِ، وَلَهُ أَنْ يُضَحِّيَ عَنِ الْأَحْيَاءِ وَالْأَمْوَاتِ مِنْ أَهْلِ بَيْتِهِ، وَإِذَا أَوْصَى رَجُلٌ بِأَنْ يُضَحَّى عَنْهُ فَلْيُضَحَّ عَنْهُ.
وَأَمَّا الْأُضْحِيَّةُ عَنِ الْمَيِّتِ اسْتِقْلَالًا عَلَى سَبِيلِ الِانْفِرَادِ، فَلَا نَعْلَمُ شَيْئًا ثَابِتًا يَدُلُّ عَلَيْهِ، وَلَكِنْ كَوْنُهُ يُضَحِّي عَنْ نَفْسِهِ وَعَنْ أَهْلِ بَيْتِهِ أَوْ أَقَارِبِهِ، أَحْيَاءً وَأَمْوَاتًا، فَلَا بَأْسَ بِذَلِكَ، وَقَدْ جَاءَ فِي السُّنَّةِ مَا يَدُلُّ عَلَى ذَلِكَ، فَيَدْخُلُ الْأَمْوَاتُ تَبَعًا، وَأَمَّا أَنْ يُضَحَّى عَنْهُمْ اسْتِقْلَالًا وَانْفِرَادًا، وَأَنْ يَكُونَ ذَلِكَ مِنْ غَيْرِ وَصِيَّةٍ مِنْهُمْ، فَلَا أَعْلَمُ شَيْئًا يَدُلُّ عَلَيْهِ.
وَالْحَدِيثُ الَّذِي أَوْرَدَهُ أَبُو دَاوُدَ عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ تَعَالَى عَنْهُ أَنَّهُ كَانَ يُضَحِّي بِكَبْشَيْنِ وَيَقُولُ: إِنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَوْصَاهُ بِذَلِكَ، غَيْرُ ثَابِتٍ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ؛ لِأَنَّ فِي إِسْنَادِهِ مَنْ هُوَ مَجْهُولٌ، وَفِيهِ مَنْ هُوَ مُتَكَلَّمٌ فِيهِ غَيْرُ الْمَجْهُولِ، وَالْإِنْسَانُ إِذَا أَرَادَ أَنْ يَصِلَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِسَبَبِهِ شَيْءٌ مِنْ رِفْعَةِ الدَّرَجَةِ وَعُلُوِّ الْمَنْزِلَةِ فَإِنَّ عَلَيْهِ أَنْ يَجْتَهِدَ فِي الْأَعْمَالِ الصَّالِحَةِ لِنَفْسِهِ، فَإِنَّ اللَّهَ تَعَالَى يُعْطِي نَبِيَّهُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِثْلَمَا أَعْطَاهُ؛ لِأَنَّ النَّبِيَّ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ هُوَ الَّذِي دَلَّ النَّاسَ عَلَى الْخَيْرِ: (وَمَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ).
” কেউ যখন কুরবানি দিবে তখন নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে দিবে। পরিবারের জীবিত ও মৃত সবার পক্ষ থেকে কুরবানি দেওয়া তার জন্য বৈধ। কেউ যদি কুরবানির অসিয়ত করে যান তবে তাঁর পক্ষ থেকেও কুরবানি দেওয়া যাবে।
তবে শুধু কোনো মৃত ব্যক্তির পক্ষে থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্রভাবে আলাদা কুরবানি দেওয়ার পক্ষে আমাদের কাছে কোনো প্রমাণিত দলিল নেই। কিন্তু নিজের ও পরিবারের জীবিত-মৃত সকলের পক্ষ থেকে একসাথে কুরবানি দিলে—তাতে কোনো অসুবিধা নেই। সুন্নায় এর প্রমাণ রয়েছে। ফলে মৃতরাও এর মধ্যে শামিল হবে । কিন্তু শুধু মৃতের পক্ষ কোনো অসিয়ত ছাড়া স্বতন্ত্রভাবে কুরবানি করার ব্যাপারে আমার জানা মতে কোনো দলিল নেই।
আবু দাউদ বর্ণিত আলি (রা.)-এর হাদিসটি—যেখানে তিনি দুটি ভেড়া দিয়ে কুরবানি দিতেন এবং বলতেন, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে এই অসিয়ত করেছেন—তা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে প্রমাণিত নয়। কারণ এর সনদে একজন মাজহুল রাবি (অজ্ঞাত পরিচয় বর্ণনাকারী) রয়েছেন এবং মাজহুল ছাড়াও আরেকজন সমালোচিত রাবি (বর্ণনাকারী) রয়েছেন।
মানুষ যদি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর মর্যাদা ও উচ্চ মাকামের কারণে তাঁর প্রতি কোনো কল্যাণ পৌঁছাতে চায় তবে তার উচিত, নিজের নেক আমলের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। কারণ আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীকে আমলকারীর সমপরিমাণ প্রতিদান দেবেন। কেননা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)ই মানুষকে কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন।
আর তিনি হাদিসে বলেছেন,
«مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ»
“যে ব্যক্তি কোনো কল্যাণের দিকে পথ দেখায় তার জন্য সেই কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ প্রতিদান রয়েছে।”” [শরহু সুনানি আবি দাউদ]
হাদিসটিকে যদি সাময়িকভাবে সহিহ ধরেও নেওয়া হয় তবুও এটি কেবল অসিয়তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—যেমনটি আবু দাউদের বর্ণনায় স্পষ্টভাবে এসেছে। আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আলি (রা.) ছাড়া অন্য কাউকে এরূপ অসিয়ত করেননি। সুতরাং শরিয়তের সুনির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকা এবং সীমা লঙ্ঘন না করাই আমাদের জন্য আবশ্যক। আল্লাহু আলাম। আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন। [source: islamqa info]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের সেরা ১০টি আমল

 ১. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতি যত্নবান হওয়া:

ঠিক সময়ে খুশূ-খুযূ বা মনোযোগের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা।
২. বেশি বেশি জিকির করা:
তাকবীর (আল্লাহু আকবার), তাহলিল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ), তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) এবং ইস্তিগফার (আস্তাগফিরুল্লাহ) ইত্যাদি বেশি বেশি পড়া।
৩. নফল রোজা রাখা:
বিশেষ করে যারা হজে যাননি তাদের জন্য আরাফার দিনের (৯ জিলহজ) রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
৪. কুরআন তিলাওয়াত:
প্রতিদিনের জন্য কুরআনের একটি নির্দিষ্ট অংশ ওয়াজিফা হিসেবে নির্ধারণ করে নেওয়া এবং অর্থ বুঝে আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করা।
৫. দোয়া করা:
সেজদায়, নামাজের পর এবং দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্তগুলোতে বেশি বেশি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা।
৬. সদকা বা দান-সদকা করা:
পরিমাণে কম হোক বা বেশি দান করা। এর সওয়াব ও প্রতিদান অনেক বিশাল।
৭. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ও পিতামাতার প্রতি সদয় হওয়া:
এটি আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম সেরা মাধ্যম এবং এর সুফল খুব দ্রুত পাওয়া যায়।
৮. তওবা করা ও গুনাহ বর্জন করা:
এই পবিত্র দিনগুলোতে সব ধরনের অন্যায় ও পাপকাজ পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া।
৯. কুরবানি করা:
সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের জন্য এই দিনগুলোর অন্যতম মহান একটি সুন্নত হল কুরবানি দেওয়া।
১০. কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ নামাজ:
রাতের শেষভাগে কিয়ামুল্লায়ল করা তা মাত্র কয়েক রাকাত হলেও। মনোযোগের সাথে পড়া দুই রাকাত নামাজও অলস সময় কাটানোর থেকে অনেক উত্তম।
▪️গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ:
এই বরকতময় দিনগুলোতে আপনার জীবনের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট সময়টুকু ব্যয় করুন এবং সব ধরনের অনর্থক কার্যক্রম থেকে দূরে থাকুন।

কুরবানির সংক্ষিপ্ত মাসায়েল

 ❑ কুরবানির শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ:

কুরবানি শব্দটি আরবি قُرْبَان (কুরবান) হতে উৎপন্ন, যার অর্থ হলো—নৈকট্য লাভ করা। শরিয়তের পরিভাষায় কুরবানি বলতে সেই পশুকে বোঝায় যা ঈদ ও কুরবানির দিন সমূহে জবাই করা হয়। একে আরবিতে أُضْحِيَّة (উযহিয়্যাহ) বলা হয়। ইমাম সানআনি বলেন, কুরবানিকে আরবি পরিভাষায় أَضَاحِي (আযাহী) বলা হয়। এটি যেন সেই সময়ের নাম থেকেই নেওয়া হয়েছে যে সময় কুরবানির পশুকে জবাই করা বিধেয় (অর্থাৎ অপরাহ্ণ)।
❑ কুরবানির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস:
কুরবানির বিধানটি অতি প্রাচীন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানির ব্যবস্থা করেছি।” [সূরা হজ: ৩৪]
আদম (আলাইহিস সালাম)-এর দুই পুত্র হবিল ও কাবিলের দেওয়া কুরবানি থেকেই কুরবানির ইতিহাসের গোড়াপত্তন হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ – لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لتقتلَنِي مَا أَنَا بِبَاسِطٍ يَدِيَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ – إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوءَ بِإِثْمِي وَإِثْمِكَ فَتَكُونَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ
“(হে রসুল!) আপনি তাদেরকে সঠিক ভাবে পড়ে শুনিয়ে দিন আদমের পুত্রদ্বয়ের সংবাদ। যখন তারা কুরবানি দিল কিন্তু তাদের একজনেরটা গৃহীত হলো অপরেরটা গৃহীত হলো না। তখন (যার কুরবানি গৃহীত হলো না সে যার কুরবান গৃহীত হলো তাকে লক্ষ্য করে) বলল, আমি তোমাকে হত্যা করব। (উত্তরে) সে বলল, আল্লাহ তো শুধু পরহেজগারদের থেকেই (কুরবানি) কবুল করেন। আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি হাত প্রসারিত করলেও আমি তোমাকে হত্যা করার জন্য আপন হাত প্রসার করব না। আমি রাব্বুল আলামীনকে ভয় করি। আমি চাই তুমি আমার গুনাহ এবং তোমার গুনাহ বহন করে জাহান্নামি-দের দলভুক্ত হও।” [সূরা মায়েদাহ: ২৭-২৯]
তবে বর্তমানে আমরা যেভাবে কুরবানি করি, তা ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর সুন্নাত থেকে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ
“আমি তাঁর (ইসমাইল) পরিবর্তে দিলাম জবাই করার জন্য এক মহান জন্তু।” [সূরা সাফফাত: ১০৭]
❑ কুরবানি শরিয়তসম্মত হওয়ার দলিল:
আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
“অতএব আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করুন এবং কুরবানি করুন।” [সূরা কাওসার: ২]
আনাস (রাদিআল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন:
ضَحَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ ذَبَحَهُمَا بِيَدِهِ وَسَمَّى وَكَبَّرَ وَوَضَعَ رِجْلَهُ عَلَى صِفَاحِهِمَا
“নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাদা-কালো রং মিশ্রিত দুটি শিং বিশিষ্ট ভেড়া কুরবানি করেছিলেন। নিজ হাতে উভয়টিকে জবাই করেছিলেন এবং জবাই করার সময় আল্লাহর নাম এবং তাকবির বলেছিলেন। জবাই করার সময় তিনি পশুদ্বয়ের কাঁধে পা রেখেছিলেন।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
ইবনে কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল মুগনী’ গ্রন্থে বলেন, “ইসলামি শরিয়তে কুরআন, সুন্নাহ ও ইজমার মাধ্যমে কুরবানির বিধান সাব্যস্ত হয়েছে।”
❑ কুরবানির গুরুত্ব এবং এর ফজিলত বিষয়ে বর্ণিত হাদিসগুলোর অবস্থা:
কুরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা স্বয়ং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আদায় করেছেন। সামর্থ্যবান ব্যক্তির কুরবানি ত্যাগ করার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা এসেছে। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
مَنْ كَانَ لَهُ سَعَةٌ، وَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا
“যার কুরবানি করার সামর্থ্য আছে অথচ সে কুরবানি দিল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটবর্তী না হয়।” [মুসনাদে আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, আলবানি এটিকে হাসান বলেছেন]
তবে কুরবানির সুনির্দিষ্ট সওয়াব ও ফজিলত সংক্রান্ত প্রচলিত হাদিসগুলোর সত্যতা নিয়ে মুহাদ্দিসগণের ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে।
– হাফেজ ইবনে হাজার বলেন, এই বিষয়ে বর্ণিত কোনো হাদিসই বিশুদ্ধ সনদে প্রমাণিত নয়।
– ইমাম ইবনুল আরাবি বলেন:
لَيْسَ فِي فَضْلِ الْأُضْحِيَّةِ حَدِيثٌ صَحِيحٌ، وَقَدْ رَوَى النَّاسُ فِيهَا عَجَائِبَ لَمْ تَصِحَّ مِنْهَا: إِنَّهَا مَطَايَاكُمْ إِلَى الْجَنَّةِ
“কুরবানির ফজিলতে একটিও সহিহ হাদিস নেই। মানুষ এ সম্পর্কে অনেক আজগুবি কথা বর্ণনা করে, যার মধ্যে অন্যতম হলো: ‘কুরবানির পশু জান্নাতে যাওয়ার বাহন স্বরূপ’—এটিও সহিহ নয়।” [আরেযাতুল আহওয়াযী: ৬/২৮৮]
❑ বহুল প্রচলিত কিছু জইফ হাদিসের উদাহরণ:
◈ ১. “পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর নিকট মর্যাদার স্থানে পতিত হয়…” — এই হাদিসটি জইফ। এর বর্ণনাকারী সুলাইমান বিন ইয়াজিদ অত্যন্ত দুর্বল।
◈ ২. “পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি…” — এই হাদিসটির বর্ণনাকারী নুফাই ইবনুল হারিস মুহাদ্দিসগণের নিকট পরিত্যক্ত।
◈ ৩. “কুরবানির পশু পুলসিরাত পার হওয়ার বাহন হবে…” — এটিও অত্যন্ত জইফ হাদিস।
তবে জিলহজ মাসের প্রথম দশদিনের সাধারণ ফজিলত সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত, যার অন্তর্ভুক্ত কুরবানিও একটি শ্রেষ্ঠ নেক আমল।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيهَا أَحَبُّ إِلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ – يَعْنِي أَيَّامَ الْعَشْرِ
“জিলহজ মাসের প্রথম দশকের নেক আমলের চেয়ে আল্লাহর কাছে অধিকতর প্রিয় কোনো আমল নেই।” [সহিহ বুখারি]
❑ কুরবানি করার বিধান:
কুরবানি করা ওয়াজিব নাকি সুন্নাত—এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের মধ্যে দুটি মত রয়েছে:
• ইমাম আবু হানিফা (রাহিমাহুল্লাহ): সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর কুরবানি করা ওয়াজিব। তার নিকট ধনী বলতে তাকে বুঝায়, যে জাকাতের নেসাবের মালিক।
• জমহুর বা সংখ্যা গরিষ্ট আলেমের মতে: কুরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ; ওয়াজিব নয়।
দলিল: উম্মে সালামা (রাদিআল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعَرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا
“জিলহজের (প্রথম) দশক প্রবেশ করলে তোমাদের মধ্যে যে কুরবানি দিতে ইচ্ছুক, সে যেন তার চুল এবং নখ না কাটে।” [সহিহ মুসলিম]
ইমাম শাফেয়ী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, এই হাদিসে “ইচ্ছুক” শব্দটি প্রমাণ করে যে কুরবানি ওয়াজিব নয়; কারণ ওয়াজিব হলে সেটি ইচ্ছা বা অনিচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হতো না।
আবু বকর (রা.), উমর (রা.), আবু সাঈদ (রা:), আবু মাসউদ বাদারি (রা.), বিলাল (রা.) প্রমুখ সাহাবিগণ এই মতই প্রকাশ করতেন। [তাফসির কুরতুব]
ইমাম তিরমিজি বলেন:
العمل على هذا من أهل العلم أن الأضحية ليست واجبة ولكنها سنة من سنن النبي صلى الله عليه وسلم يستحب أن يعمل بها وهو قول سفيان الثوري وابن المبارك
“এর উপরই আহলে ইলমদের আমল রয়েছে যে, কুরবানি দেয়া ওয়াজিব নয়। তবে উহা নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর অন্যতম সুন্নাত যার উপর আমল করা মুস্তাহাব। ইহা সুফিয়ান সাওরি ও আব্দুল্লাহ বিনুল মুবারক প্রমুখদের কথা অভিমত।” [সুনান তিরমিজি ৪/৯২]
❑ কুরবানিদাতার জন্য করণীয়:
জিলহজ মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত কুরবানিদাতার জন্য নখ-চুল ইত্যাদি কাটা হারাম। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِذَا رَأَيْتُمْ هِلَالَ ذِي الْحِجَّةِ، وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعْرِهِ وَأَظْفَارِهِ
“যখন তোমরা জিলহজের চাঁদ দেখবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানি করার ইচ্ছা করবে, সে যেন তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।” [সহিহ মুসলিম]
যে কুরবানি দিবে না তার জন্য এই নিষেধাজ্ঞা প্রযোজন্য নয়।
❑ যে ৮ প্রকার পশুর কুরবানি শুদ্ধ হবে:
কুরবানির জন্য শরিয়ত নির্ধারিত নির্দিষ্ট চতুষ্পদ জন্তু বা ‘বাহিমাতুল আনআম’ হওয়া আবশ্যক। পবিত্র কুরআন, সুন্নাহ ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত্যের (ইজমা) ভিত্তিতে কেবল নির্দিষ্ট আট প্রকার পশু দ্বারাই কুরবানি করা বৈধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:
لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ
“তারা যেন আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে ওই সমস্ত চতুষ্পদ জন্তুর ওপর (জবাই করার সময়) যা আল্লাহ তাদেরকে রিজিক হিসেবে প্রদান করেছেন।” [সূরা হজ: ৩]
সূরা আল আনআমের ১৪৩ ও ১৪৪ নম্বর আয়াতে এই চতুষ্পদ জন্তুর আটটি প্রকার (নর ও মাদি মিলিয়ে) স্পষ্ট করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী
❑ কুরবানির যোগ্য পশুগুলো হলো:
◈ ১. ভেড়া বা দুম্বা (নর ও মাদি)
◈ ২. ছাগল (নর ও মাদি)
◈ ৩. গরু (নর ও মাদি)
◈ ৪. উট (নর ও মাদি)
ইমাম ইবনে আব্দুল বার রাহ. বলেন: “মুসলিমদের ঐক্যমত্যে (ইজমা) কেবল আট প্রকার পশু দ্বারাই কুরবানি করা যাবে। তা হলো: ভেড়া বা দুম্বা, ছাগল, উট এবং গরু (এগুলোর নর ও মাদি)।” [তাফসিরে কুরতুবি]
ইমাম শিরাজি (রাহ.) বলেন: “নির্দিষ্ট চতুষ্পদ জন্তু (উট, গরু, ছাগল ও ভেড়া) ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে কুরবানি আদায় হবে না।” [আল মুহাযযাব: ৮/৩৯২]
দ্রষ্টব্য: ইমাম ইবনুল মুনযির উল্লেখ করেছেন যে, হাসান বিন সালেহ বন্য গাভী বা নীলগাই দ্বারাও সাতজনের পক্ষে কুরবানি জায়েজ হওয়ার মত দিয়েছেন। তবে জমহুর বা অধিকাংশ ওলামায়ে কেরামের নিকট গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তুই কুরবানির জন্য সুনির্দিষ্ট।
❑ কুরবানির পশুর বয়স:
কুরবানির পশু শরিয়ত নির্ধারিত বয়সের হওয়া আবশ্যক। জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রাদিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً، إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ، فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْنِ
“তোমরা ‘মুসিন্নাহ’ (দুধের দাঁত ভেঙে নতুন স্থায়ী দাঁত ওঠা পশু) ছাড়া জবাই করবে না। তবে তা জোগাড় করা যদি তোমাদের জন্য কষ্টকর হয়, তাহলে ছয় মাস বয়সী মেষ বা ভেড়া জবাই করতে পারো।” [সহিহ মুসলিম]
❑ বয়সভেদে কুরবানির পশুর তালিকা:
উক্ত হাদিসের আলোকে বিভিন্ন পশুর জন্য সর্বনিম্ন বয়সের যে মাপকাঠি নির্ধারিত হয়েছে তা নিচে দেওয়া হলো:
◈ উট: ৫ বছর পূর্ণ হতে হবে।
◈ গরু: ২ বছর পূর্ণ হতে হবে।
◈ ছাগল ও দুম্বা: ১ বছর পূর্ণ হতে হবে।
◈ ভেড়া ও মেষ: ১ বছর পূর্ণ হওয়া উত্তম। তবে বিশেষ কারণে বা কষ্টকর হলে অন্তত ৬ মাস বা তদূর্ধ্ব (যা দেখতে এক বছর বয়সীর মতো মনে হয়) হতে হবে।
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম নওয়াবি (রাহ.) বলেন, “অত্র হাদিসে সুস্পষ্ট যে, ভেড়া বা মেষ ছাড়া অন্য কোনো পশুর ‘জাযআ’ (যেমন: ছয় মাসের ছাগল বা এক বছরের গরু) দিয়ে কুরবানি করা কোনো অবস্থাতেই জায়েজ হবে না।” [শরহু সহিহ মুসলিম]
(উপরোক্ত লেখাটি শাইখ আখতারুল আমান বিন আব্দুস সালাম মাদানি (হাফিযাহুল্লাহ) রচিত ‘কুরবানির মাসায়েল’ শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে সংক্ষিপ্ত ও সামান্য পরিমার্জন সহকারে গ্রহণ করা হয়েছে)
❑ কুরবানির পশুতে যেসব ত্রুটি থাকলে কুরবানি শুদ্ধ হবে না:
কুরবানির পশু সুঠাম ও ত্রুটিমুক্ত হওয়া আবশ্যক। চারটি ত্রুটি থাকলে সেই পশু দিয়ে কুরবানি জায়েজ হবে না। হাদিসে এসেছে,
عَنْ بَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: قَامَ فِينَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الْأَضَاحِيِّ: الْعَوْرَاءُ الْبَيِّنُ عَوَرُهَا، وَالْمَرِيضَةُ الْبَيِّنُ مَرَضُهَا، وَالْعَرْجَاءُ الْبَيِّنُ ظَلْعُهَا، وَالْكَسِيرَةُ الَّتِي لَا تُنْقِي»
প্রখ্যাত সাহাবি বারা ইবনে আযিব (রাদিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন এবং বললেন,
“পশুতে চারটি ত্রুটি থাকলে তা দ্বারা কুরবানি করা জায়েজ নয়:
◈ ১. এমন স্পষ্ট অন্ধ, যার অন্ধত্ব প্রকাশ্য।
◈ ২. এমন স্পষ্ট রোগাক্রান্ত, যার অসুস্থতা প্রকাশ্য।
◈ ৩. এমন স্পষ্ট খোঁড়া, যার খোঁড়াত্ব প্রকাশ্য।
◈ ৪. এবং এমন হাড্ডিসার দুর্বল পশু, যার হাড়ে কোনও মজ্জা বা গোশত অবশিষ্ট নেই।” [সুনানে [তিরমিজি, হাদিস নং: ১৪৯৭, ইমাম তিরমিজি (রাহিমাহুল্লাহ): হাদিসটিকে “হাসান সহিহ” বলেছেন। মুহাদ্দিস আলবানি হাদিসটিকে “সহিহ” হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন]
সুতরাং এ চারটি ত্রুটির বাইরে যদি পশুর শিং ভাঙ্গা, কানকাটা বা শরীর আহত হয় কিংবা সামান্য খোঁড়া বা সামান্য দোষত্রুটি থাকে তাতে কুরবানি শুদ্ধ হতে কোনও সমস্যা নেই। যদিও উত্তম হল, ত্রুটিমুক্ত সুস্থ ও সবল পশু কুরবানি দেওয়া।
❑ কুরবানির সময়:
ঈদের নামাজের পর থেকে কুরবানির সময় শুরু হয়। এর আগে জবাই করলে তা কুরবানি হিসেবে গণ্য হবে না বরং তা সাধারণ গোশত হিসেবে গণ্য হবে। জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কুরবানি করা যায়। তবে উত্তম হলো ১০ই জিলহজ জবাই করা।
❑ জবাই করার নিয়ম ও দোয়া:
জবাই করার সময় পশুকে কিবলা মুখী করে শোয়ানো সুন্নত। অতঃপর জবাই কারী পশুর গলার ছুটি চালানোর পূর্বে বলবেন:
بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُمَّ هَذَا مِنْكَ وَلَكَ، اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنِّي
উচ্চারণ: বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার, আল্ল-হুম্মা হাযা মিনকা ওয়া লাকা, আল্ল-হুম্মা তাক্বাব্বাল মিন্নী।
অর্থ: “আল্লাহর নামে এবং আল্লাহ সবচেয়ে বড়। হে আল্লাহ, এটি তোমার পক্ষ থেকেই এবং তোমারই জন্য। হে আল্লাহ, তুমি আমার পক্ষ থেকে এটি কবুল করো।”
◈ অথবা বলবেন:
بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، اللَّهُمَّ هَذَا عَنِّي وَعَنْ أَهْلِ بَيْتِي
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা হাযা ‘আন্নী ওয়া ‘আন আহলি বাইতী।
অর্থ: “হে আল্লাহ, এটি আমার পক্ষ থেকে এবং আমার পরিবারের পক্ষ থেকে।”
◈ অথবা শুধু بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أَكْبَرُ، (বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার) বলাও যথেষ্ট। [সহিহ মুসলিম, হা/১৯৬৬]
❑ গোশত বণ্টন ও চামড়া:
কুরবানির গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনকে উপহার দেওয়া এবং অভাবগ্রস্তদের দান করা মুস্তাহাব। সাধারণ নিয়ম হলো গোশতকে তিন ভাগে ভাগ করা। তবে চামড়া বা গোশত কসাইকে তার পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নয়।
চামড়া নিজে ব্যবহার করা যায় অথবা এর মূল্য সদকা করে দিতে হয়।
❑ অংশীদারিতে কুরবানি:
গরু, মহিষ বা উটের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাতজন মিলে একটি পশু কুরবানি দেওয়া যায়। জাবির (রাদিআল্লাহু আনহু) বলেন:
نَحَرْنَا مَعَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْعَامَ الْحُدَيْبِيَةِ الْبَدَنَةَ عَنْ سَبْعَةٍ، وَالْبَقَرَةَ عَنْ سَبْعَةٍ
“আমরা হুদায়বিয়ার বছর রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে উট ও গরু সাতজনের পক্ষ থেকে জবাই করেছিলাম।” [সহিহ মুসলিম]
عَنْ عَلِيٍّ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: «الْبَقَرَةُ عَنْ سَبْعَةٍ». قُلْتُ: فَإِنْ وَلَدَتْ؟ قَالَ: «اذْبَحْ وَلَدَهَا مَعَهَا». قُلْتُ: فَالْعَرْجَاءُ؟ قَالَ: «إِذَا بَلَغَتِ الْمَنْسِكَ». قُلْتُ: فَمَكْسُورَةُ الْقَرْنِ؟ قَالَ: «لَا بَأْسَ، أُمِرْنَا – أَوْ أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – أَنْ نَسْتَشْرِفَ الْعَيْنَيْنِ وَالْأُذُنَيْنِ».
আলি (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একটি গরু সাতজনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট।”
আমি (বর্ণনাকারী) জিজ্ঞেস করলাম, “যদি পশুটি বাচ্চা প্রসব করে (তাহলে কী করণীয়)?” তিনি বললেন, “তার বাচ্চাকেও তার সাথেই জবাই করো।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “যদি খোঁড়া হয়?”
তিনি বললেন, “যদি তা কুরবানির স্থান পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে (তবে জবাই করো)।”
আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “যদি শিং ভাঙা হয়?”
তিনি বললেন, “এতে কোনও অসুবিধা নেই। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন—কিংবা (তিনি বলেছেন) আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—আমরা যেন (কুরবানির পশুর) চোখ ও কান ভালোভাবে পরীক্ষা করে নিই।”
[সহিহ ইবনে খুযাইমাহ, খণ্ড/পৃষ্ঠা: ২৯১৫, সহিহ-শাইখ আলবানি এটিকে সহিহ বলেছেন]
মোটকথা, সফর হোক বা আবাস হোক গরু বা উটে সর্বোচ্চ সাতভাগে কুরবানি করা জায়েজ।
অনুরূপভাবে এক ব্যক্তি হোক বা এক পরিবার হোক সর্বাবস্থায় তা জায়েজ।
❑ জবাহ করার কতিপয় আদব:
১. পশুর সামনে ছুরি ধার না দেওয়া।
২. এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই না করা।
৩. পশুকে আরামদায়ক ভাবে শোয়ানো এবং দ্রুত জবাই সম্পন্ন করা যাতে পশু বেশিক্ষণ কষ্ট না পায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ اللهَ كَتَبَ الْإِحْسَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ… وَإِذَا ذَبَحْتُمْ فَأَحْسِنُوا الذِّبْحَةَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، وَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে দয়া ও অনুগ্রহ (ইহসান) আবশ্যক করেছেন… সুতরাং যখন তোমরা জবাই করবে তখন উত্তম পদ্ধতিতে জবাই করো। তোমাদের প্রত্যেকে যেন তার ছুরি ধার করে নেয় এবং জবাইকৃত পশুকে আরাম দেয়।” [সহিহ মুসলিম]
❑ মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কুরবানি:
মৃত ব্যক্তির যদি কোনও অসিয়ত না থাকে তবে তার পক্ষ থেকে আলাদা কুরবানি করার চেয়ে জীবিত ব্যক্তি নিজের কুরবানির সওয়াবে তাকে শামিল করে নেওয়াই উত্তম। তবে অসিয়ত থাকলে বা বিশেষ প্রয়োজনে পৃথক কুরবানি করাও জায়েজ।
❑ পশুর গর্ভজাত বাচ্চা:
কুরবানির পশু জবাই করার পর যদি তার পেটে জীবিত বাচ্চা পাওয়া যায় তবে সেটিও জবাই করে খাওয়া যাবে। আর যদি মৃত পাওয়া যায় তবে সেটি ফেলে দিতে হবে। (পূর্বোল্লিখিত আলি (রা.)-এর হাদিস)
❑ কুরবানির গোশত ও কসাইয়ের পারিশ্রমিক:
কুরবানির পশুর কোনও অংশ—চাই তা গোশত হোক বা হাড় কিংবা চামড়া—কসাইকে তার কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া জায়েজ নাই।
আলি (রাদিআল্লাহু আনহু) বলেন:
أَمَرَنِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ… أَنْ لَا أُعْطِيَ فِي جِزَارَتِهَا مِنْهَا شَيْئًا
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন… আমি যেন কসাইকে কুরবানির পশুর কোনও অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে না দিই।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
পারিশ্রমিক হিসেবে কসাইকে পৃথকভাবে টাকা বা অন্য কিছু দিতে হবে। তবে উপহার হিসেবে তাকে গোশত দেওয়া যাবে।
❑ বিবিধ মাসায়েল:
◈ ঋণ করে কুরবানি: যদি কারো ঋণ পরিশোধ করার পর কুরবানি করার সামর্থ্য থাকে তবেই সে কুরবানি করবে। তবে ঋণের দায়ভার থাকলে আগে ঋণ পরিশোধ করা জরুরি।
◈ বিদেশে কুরবানি: কোনও ব্যক্তি যদি প্রবাসে থাকেন তবে তিনি চাইলে সেখানেও কুরবানি দিতে পারেন অথবা দেশে টাকা পাঠিয়ে নিজের পক্ষ থেকে কুরবানি করাতে পারেন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহিহ সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate