ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি।অতঃপর প্রিয় পাঠক ইসলামি শরিয়তে একাধিক বিবাহ কোনো বিলাসিতা বা নিছক শখের বিষয় নয়; বরং এটি এক মহান এবং কঠিন দায়িত্ব। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, যথাযথ শর্ত পূরণ করা এবং স্ত্রীদের মাঝে ইনসাফ কায়েম করা বর্তমান যুগের অধিকাংশ সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। তাই উপযুক্ত সামর্থ্য ও মানসিক প্রস্তুতি ছাড়া ঢালাওভাবে একে উৎসাহিত করার সুযোগ নেই। তবে মহান আল্লাহ যেহেতু বিশেষ প্রয়োজন ও প্রেক্ষাপটে একজন পুরুষের জন্য একই সাথে সর্বোচ্চ চারটি বিয়ে বৈধ রেখেছেন, সেহেতু মুমিন হিসেবে এর বিরোধিতা করার বা একে অপছন্দ করার কোনো অবকাশ নেই। বরং আল্লাহর প্রতিটি বিধানের প্রতি নিঃস্বার্থ আনুগত্য প্রদর্শন করাই প্রকৃত ইমানদারিত্বের পরিচয়। কারণ, এই বিধানের গভীরে লুকিয়ে আছে বহু সামাজিক, মানবিক ও চারিত্রিক কল্যাণ।আজকের নিবন্ধে আমরা ইসলামের এই বিশেষ বিধানের পেছনে থাকা নানাবিধ ইতিবাচক দিক নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করব। আজ আমরা একাধিক বিবাহের ১০০টি ইতিবাচক ও কল্যাণকর দিক তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।” আজকের পোষ্টের হেডলাইন হলো: “একাধিক বিবাহের ১০০ টি উপকারিতা”
May 17, 2026
একাধিক বিবাহের ১০০ টি উপকারিতা
.
(ক) জনতাত্ত্বিক দিক (জনসংখ্যা):
.
১. টেকসই জন্মহার নিশ্চিতকরণ।
২. লিঙ্গানুপাতের ভারসাম্য রক্ষা।
৩. নিরবচ্ছিন্ন যুবশক্তির জোগান।
৪. দুর্যোগকালীন জনক্ষয় দ্রুত পূরণ।
৫. বংশীয় ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি।
৬. বিবাহের আদর্শ বয়সকাঠামো বজায় রাখা।
৭. জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক বিন্যাসের উন্নয়ন।
৮. সামাজিক বার্ধক্য বা জনমিতিক স্থবিরতা রোধ।
৯. সীমান্ত অঞ্চলে জনবসতি ও নিরাপত্তা জোরদার।
১০. শক্তিশালী ও সুবিশাল মানবসম্পদ গঠন।
.
(খ) উম্মাহর শক্তি ও প্রাণচাঞ্চল্যের দিক:
.
১. নববী (ﷺ) আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী উম্মাহর সংখ্যাধিক্য অর্জন।
২. কৌশলগত মানবিক গভীরতা (Strategic Depth) বৃদ্ধি।
৩. নিজস্ব আত্মপরিচয় ও সংস্কৃতি সংরক্ষণ।
৪. সভ্যতার নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ।
৫. আদর্শিক ও ভাষাগত শ্রেষ্ঠত্ব সুদৃঢ়করণ।
৬. বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন।
৭. বিশ্বমঞ্চে উম্মাহর প্রভাব ও গুরুত্ব বৃদ্ধি।
৮. গৌরবময় বংশীয় সোপান সংরক্ষণ।
৯. শেকড় ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা।
১০. আন্তঃসীমান্ত সামাজিক সংহতি দৃঢ়করণ।
.
(গ) রাজনৈতিক দিক:
.
১. টেকসই সামাজিক স্থিতিশীলতা আনয়ন।
২. নেতৃত্বের গণভিত্তি ও জনসমর্থন সম্প্রসারণ।
৩. অবিবাহিত জনশক্তির ক্ষোভ ও অস্থিরতা নিরসন।
৪. রাষ্ট্রনায়কোচিত দক্ষ নেতৃত্বের বিকাশ।
৫. স্বনির্ভর ও দক্ষ কর্মীবাহিনী তৈরি।
৬. বৈবাহিক আত্মীয়তায় গোষ্ঠীগত বিবাদ মীমাংসা।
৭. প্রভাবশালী সামাজিক চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী গঠন।
৮. পারিবারিক ঐক্যের মাধ্যমে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।
৯. রাষ্ট্রীয় সমাজকল্যাণ খাতের ওপর চাপ হ্রাস।
১০. ইসলামী সামাজিক আইনের প্রায়োগিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শন।
.
(ঘ) অর্থনৈতিক দিক:
.
১. অভ্যন্তরীণ বাজার ও বাণিজ্যিক গতিশীলতা বৃদ্ধি।
২. আবাসন খাতের চাহিদা ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতকরণ।
৩. শিক্ষা ও মানবসম্পদ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
৪. অর্থপ্রবাহ ও তারল্যের বহুমুখী সঞ্চালন।
৫. শ্রমের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পুরুষকে উদ্বুদ্ধকরণ।
৬. পারিবারিক শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বিশ্বস্ত জনবল।
৭. ভোগ ও সেবা খাতের টেকসই সম্প্রসারণ।
৮. পরনির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বাবলম্বী সমাজ গঠন।
৯. সুসংহত ও বিস্তৃত পারিবারিক সম্পদ গড়ে তোলা।
১০. ভ্রাতৃপ্রতিম আর্থিক নিরাপত্তা বলয় তৈরি।
.
(ঙ) ধর্মীয় ও শরয়ি দিক:
.
১. সুন্নাহর বিলুপ্তপ্রায় বিধানের পুনর্জাগরণ।
২. অশ্লীলতামুক্ত নৈতিক সমাজ গঠন।
৩. পারিবারিক ব্যয়ে অবিরাম সাদাকার সওয়াব অর্জন।
৪. বিধবা ও অসহায় নারীদের মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন।
৫. উম্মাহর সংখ্যাগত শ্রেষ্ঠত্ব সুনিশ্চিতকরণ।
৬. ইনসাফ ও ন্যায়বিচারের ব্যবহারিক অনুশীলন।
৭. প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে মুজাহাদা ও নফস নিয়ন্ত্রণ।
৮. চারিত্রিক পবিত্রতা ও দৃষ্টির হিফাজত।
৯. উত্তরাধিকার ও আত্মীয়তার হকের সঠিক প্রয়োগ।
১০. দায়িত্বশীল কিওয়ামাহ বা অভিভাবকত্বের বিকাশ।
.
(চ) মনস্তাত্ত্বিক দিক:
.
১. একাকীত্ব ও নিঃসঙ্গতা দূরীকরণ।
২. পুরুষের মানসিক সজীবতা ও প্রাণচাঞ্চল্য বজায় রাখা।
৩. দাম্পত্য জীবনের একঘেয়েমি নিরসন।
৪. আত্মবিশ্বাস ও মানসিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি।
৫. আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা (EQ) ও সহনশীলতার বিকাশ।
৬. নারীর মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক নিরাপত্তা।
৭. বৃহৎ পরিবেশে শিশুদের ব্যক্তিত্বের সুষম গঠন।
৮. দলগত সাহচর্যে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ।
৯. স্বার্থহীনতা ও ত্যাগের মানসিকতা অর্জন।
১০. প্রশান্তি ও স্বস্তির বহুমুখী উৎস নিশ্চিতকরণ।
.
(ছ) সামাজিক দিক:
.
১. নারী ও পুরুষের অবিবাহিত থাকার সমস্যা নিরসন।
২. তালাকপ্রাপ্তা ও বিধবাদের সামাজিক একীভূতকরণ।
৩. সামাজিক ও নৈতিক অপরাধের হার হ্রাস।
৪. নারীদের পারস্পরিক সহায়তা ও সহমর্মিতা।
৫. আত্মীয়তার পরিধি ও সামাজিক নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি।
৬. পারিবারিক শৃঙ্খলা ও শিষ্টাচারের উন্নয়ন।
৭. এতিম ও অনাথ শিশুদের সুরক্ষাবলয় তৈরি।
৮. নারীর মর্যাদা ও হিজাবের সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ।
৯. আভিজাত্যপূর্ণ সামাজিক প্রভাব বলয় তৈরি।
১০. পারিবারিক শ্রমের সুষম বণ্টনে কলহ নিরসন।
.
(জ) সামরিক ও প্রতিরক্ষা দিক:
.
১. অফুরন্ত লড়াকু জনশক্তির জোগান।
২. যুদ্ধের জনতাত্ত্বিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা।
৩. শারীরিক ও মানসিক বলিষ্ঠ প্রজন্ম গঠন।
৪. প্রতিরক্ষা খাতে জনবলের বৈচিত্র্য নিশ্চিতকরণ।
৫. স্বজন ও ভূখণ্ড রক্ষায় সর্বোচ্চ অনুপ্রেরণা।
৬. বৃহৎ পরিবারের মাধ্যমে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ ফ্রন্ট।
৭. নজরদারি ও জননিরাপত্তা ব্যবস্থার দৃঢ়তা।
৮. জনসংখ্যাগত আগ্রাসন মোকাবিলায় শ্রেষ্ঠত্ব।
৯. শহীদের উত্তরসূরিদের সামাজিক ও পারিবারিক নিরাপত্তা।
১০. সংখ্যাতাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্বের মাধ্যমে মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরক্ষা (Deterrence)।
.
(ঝ) বংশগতি ও জৈবিক দিক:
.
১. প্রজন্মান্তরে জেনেটিক বৈচিত্র্য আনয়ন।
২. বংশগত ও জন্মগত রোগের ঝুঁকি হ্রাস।
৩. চারিত্রিক ও শারীরিক গুণাবলীর উৎকর্ষ সাধন।
৪. উন্নত জিনের শ্রেষ্ঠত্ব ও ধারাবাহিকতা রক্ষা।
৫. মেধা ও প্রতিভা বিকাশের অনুকূল পরিবেশ।
৬. বিপন্ন বংশধারা ও আভিজাত্য টিকিয়ে রাখা।
৭. সুঠাম ও শক্তিশালী জনসমষ্টির প্রসার।
৮. রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন ও স্বাস্থ্যবান উম্মাহ।
৯. পারিবারিক পর্যায়ে জৈবিক ভিন্নতার সমৃদ্ধি।
১০. বিশুদ্ধ বংশমর্যাদা ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ।
.
(ঞ) সাধারণ ও কৌশলগত সুবিধা:
.
১. খেলাফতের বিস্তার ও পৃথিবী আবাদের লক্ষ্য পূরণ।
২. সাম্রাজ্যবাদী জন্মনিয়ন্ত্রণ নীতির কার্যকর মোকাবিলা।
৩. শক্তিশালী পারিবারিক অর্থনৈতিক ভিত্তি স্থাপন।
৪. পুরুষের নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতার উন্নয়ন।
৫. বৈবাহিক বন্ধনে জাতীয় সংহতি সুদৃঢ়করণ।
৬. ইসলামী শরীয়াহর কালোত্তীর্ণ উপযোগিতা প্রমাণ।
৭. কর্মতৎপর ও প্রাণবন্ত সামাজিক কাঠামো।
৮. বিদেশি শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আত্মনির্ভরতা।
৯. মানবসম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ জাতি গঠন।
১০. অপসংস্কৃতি রুখতে ‘যৌথ পরিবার’ মডেলের পুনরুজ্জীবন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
____________________
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
মানত সম্পর্কে বিস্তারিত
প্রশ্ন: মানত কী? শরীয়তে মানতের বিধান কী? মানত কত প্রকার ও কি কি? মানত পূরণ করার বিধান কি?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর:মানত সংক্রান্ত পুরো বিষয়টি আমরা ধারাবাহিক ভাবে পয়েন্ট আকারে উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ।
.
মানত কী?
.
মানতের আরবি শব্দ হচ্ছে (نذر (নযর) যার বাংলা অর্থ হচ্ছে: নিজের দায়িত্বে নেয়া।অর্থাৎ যা নিজের দায়িত্ব নয় তা নিজের জন্য অপরিহার্য করে নেয়া। আসফাহানী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘মুফরাদাতু আলফাযিল কুরআন’ গ্রন্থে (পৃ. ৭৯৭) বলেন: মানত হচ্ছে— কোনো কিছু ঘটার সাথে আপনি নিজের উপর এমন কিছু করা আবশ্যক করে নেয়া; যা আবশ্যক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন:إِنِّي نَذَرْتُ لِلرَّحْمَنِ صَوْمًا “আমি আর-রহমানের (আল্লাহর) জন্য রোযা মানত করেছি।”(সূরা মারইয়াম: ২৬) সুতরাং মানত হচ্ছে শরীয়তের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজের উপর কোনো কিছু আবশ্যক করা, হোক সেটি (তৎক্ষণাৎ) কার্যকর কিংবা (কিছুর সাথে) শর্তযুক্ত। আল্লাহর কিতাবে মানতকে প্রশংসার স্থানে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাদের ব্যাপারে বলেন:إِنَّ الْأَبْرَارَ يَشْرَبُونَ مِن كَأْسٍ كَانَ مِزَاجُهَا كَافُورًا عَيْنًا يَشْرَبُ بِهَا عِبَادُ اللَّهِ يُفَجِّرُونَهَا تَفْجِيرًا يُوفُونَ بِالنَّذْرِ وَيَخَافُونَ يَوْمًا كَانَ شَرُّهُ مُسْتَطِيرًا “সৎকর্মশীলরা এমন এক পেয়ালা থেকে পান করবে (যার শরাবে) কাফূরের মিশ্রণ থাকবে। এমন একটি ঝরনা যা থেকে আল্লাহর বান্দারা পান করবে এবং তারাই একে যথাযথভাবে (নিজেদের সুবিধামত) প্রবাহিত করবে। তারা (তাদের) মানত পূরণ করে (কর্তব্য পালন করে) এবং এমন একটি দিনকে ভয় করে যার অনিষ্ট হবে ব্যাপক।”[সূরা দাহর: ৫-৭] কিয়ামতের দিনের ভয়াবহতার ব্যাপারে তাদের শঙ্কা এবং মানত পূরণ করাকে আল্লাহ তাআলা তাদের নাজাত লাভ ও জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ হিসেবে গণ্য করেছেন।
.
শরীয়তে মানতের বিধান:
.
ইসলামে (নযর) মানত করাকে নিরুৎসাহিত করেছে। আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআতের অধিকাংশ ইমাম ও ফিকহবিদের অভিমত অনুসারে (নযর) মানত করা মাকরূহ বা অপছন্দনীয় কাজ।কারন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানত করতে নিষেধ করেছেন। আর মানত আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যকে পরিবর্তন করতে পারে না।বরং এটি কৃপণের সম্পদ থেকে কিছু অংশ বের করে আনে মাত্র।যেমন: রাসূল (ﷺ) বলেছেন:لَا تَنْذُرُوا فَإِنَّ النَّذْرَ لَا يُغْنِي مِنَ الْقَدَرِ شَيْئًا وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ من الْبَخِيل”তোমরা মানৎ করো না। কেননা মানৎ তাকদীরের কোনই পরিবর্তন করতে পারে না। অবশ্য এর দ্বারা কৃপণের ব্যয়-নির্বাহ হয় মাত্র”।(সহীহ বুখারী হা/ ৬৬০৯,সহীহ মুসলিম হা/১৬৪০) অপর বর্ননায় তিনি (ﷺ) আরো বলেছেন:النَّذْرُ لاَ يُقَدِّمُ شَيْئًا وَلاَ يُؤَخِّرُهُ وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الْبَخِيلِ “মানত কোনো কিছুকে আগেও করে না, পিছেও করে না। বরং এর দ্বারা কেবল কৃপণ ব্যক্তি থেকে বের করা হয়।”(সহীহ মুসলিম হা/৪৩২৬)
.
তবে হা! ইসলাম মানত করার ব্যাপারে অনুৎসাহিত করা হলেও বৈধ কাজের মানত করা হলে তা পূরণ করা আবশ্যক। যেমন কেউ যদি কোন ইবাদত বা নেক আমল করার মানত করলে সেটা পূর্ণ করা ওয়াজিব। কারণ আল্লাহ তাআলা বলেন:ثُمَّ لْيَقْضُوا تَفَثَهُمْ وَلْيُوفُوا نُذُورَهُمْ“তারপর তারা যেন তাদের ময়লাগুলো দূর করে এবং মানতগুলো পূরণ করে।”[সূরা হজ্জ: ২৯] ইমাম শাওকানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: নির্দেশ ওয়াজিব সাব্যস্ত করে। পাশাপাশি শর্তযুক্ত মানতের উদাহরণ হলো: কেউ যদি বলে:কেউ একদিন বা দুইদিন রোযা রাখার মানত করল,আবার কোনও অসুস্থ ব্যক্তি মানত করে আমি যদি সুস্থ হই তাহলে একটি উমরাহ পালন করব।কিংবা কেউ যদি বলে: ‘আল্লাহ যদি আমার রোগীকে সুস্থ করে দেন, তাহলে আমি অমুক ব্যক্তিকে ওমরায় পাঠাবো।এখানে মানতের বিষয়টি শরিয়ত অনুমোদিত একটি ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্যের বিষয়।মানতের শর্ত পূরণ হলে এ মানত পূর্ণ করা ওয়াজিব।কারণ এটি একটি আনুগত্যের মানত। হাদিসে এসেছে: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: (مَن نذر أن يطيع الله فليطعه )”যে ব্যক্তি আল্লাহ্র কোন আনুগত্য করার মানত করল তাকে ঐ আনুগত্য পালন করতে হবে।”(সহিহ বুখারী হা/৬৩১৮) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া বলেছেন: لو نذر أن يأتي المسجد الحرام لحج أو عمرة؛ فإن هذا يلزمه بلا نزاع.”যদি কেউ মানত করে যে, সে হজ বা উমরার জন্য মসজিদুল হারামে যাবে, তবে এটি তার জন্য অবশ্যই পালনীয়—এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই।”(মাজমু’ আল-ফাতাওয়া” ২৭তম খণ্ড;পৃষ্ঠায়;৩৩৪)
.
প্রশংসনীয় ও নিষিদ্ধ মানতের মধ্যকার পার্থক্য:
কেউ যদি বলে: মানত পূরণকারীদের প্রশংসা করার পর আবার কীভাবে তা করতে নিষেধ করা হয়? তাহলে এর উত্তর হলো: প্রশংসনীয় মানত হচ্ছে কোনো কিছুর সাথে শর্তযুক্ত না করে নিছক আনুগত্যমূলক মানত। মানুষ নিজেকে আনুগত্যমূলক কাজে বাধ্য করতে এবং অলসতা থেকে নিবৃত করতে কিংবা নিয়ামতের শুকরিয়া হিসেবে এ ধরনের মানত করে থাকে।অন্যদিকে নিষিদ্ধ মানত কয়েক প্রকার। তন্মধ্যে রয়েছে: কোনো কিছুর বিনিময়মূলক মানত, যেখানে মানতকারী আনুগত্যকে কোনো কিছু প্রাপ্তি কিংবা প্রতিহত করার সাথে শর্তযুক্ত করে রাখে; ফলে সে ঐ বস্তু না পেলে সে আনুগত্যমূলক কাজটি করে না। এ ধরনের মানতের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য। সম্ভবতঃ এই নিষেধাজ্ঞায় নিহিত প্রজ্ঞা নিম্নরূপ:
.
(১).মানতকারী অনীহা নিয়ে মানত পূরণ করে; যেহেতু এটি হঠাৎ করে তার উপর আবশ্যক হয়ে গিয়েছে।
.
(২).মানতকারী যখন কোনো কিছু প্রাপ্তির শর্তে (আল্লাহর) নৈকট্যমূলক কাজ করার মানত করেছে, তখন তার এই মানত হয়ে পড়েছে বিনিময়; যা নৈকট্য অর্জনকারীর নিয়তে সমস্যা সৃষ্টি করে। যেমন: তার রোগী সুস্থ না হলে সুস্থতার সাথে সে যে পরিমাণ দান করাকে শর্তযুক্ত করেছিল সেটি সে করবে না। আর এটি কৃপণ ব্যক্তির অবস্থা। এই ব্যক্তি তাৎক্ষণিক বিনিময় ছাড়া নিজের সম্পদ থেকে কিছু দেয় না। সাধারণত সে যে পরিমাণ নিজ সম্পদ থেকে দান করে থাকে, তার থেকে অতিরিক্ত পরিমাণ কেবল সে এই বিনিময়ের কারণেই প্রদান করে থাকে।
.
(৩).কিছু মানুষের এ ধরনের জাহেলী বিশ্বাস আছে যে, সে যে উদ্দেশ্যে মানত করেছিল সেটি মানত করার কারণেই পূরণ হবে অথবা আল্লাহ মানতকারীকে তার মানতের জন্য উদ্দেশ্য পূরণ করে দিবেন।
.
(৪).কিছু অজ্ঞ ব্যক্তির মনে থাকা এক ধরনের বিশ্বাস নাকচ করা। সে বিশ্বাসটি হচ্ছে: মানত তাকদীরকে প্রতিহত করে অথবা তার জন্য তৎক্ষণাৎ ভালো কিছু নিয়ে আসে অথবা মন্দ কিছু দূর করে দেয়। অজ্ঞ ব্যক্তির এমন বিশ্বাসের আশঙ্কায় মানতকে নিষেধ করা হয়েছে। পাশাপাশি এ ধরনের বিশ্বাস আকীদার বিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে কতটা ভয়াবহ সেটির দিকে সতর্ক করাও এর উদ্দেশ্য।
.
পূরণ করা ওয়াজিব হওয়ার বিবেচনা থেকে মানতের প্রকারভেদ:
(১). যে মানত পূরণ করা আবশ্যক (আনুগত্যের মানত): যে মানত আল্লাহর আনুগত্যে হয়ে থাকে। যেমন: নামায, রোযা, উমরা, হজ্জ, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা, ইতিকাফ, জিহাদ, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ। যেমন: যদি সে বলে, আমার উপর আল্লাহর জন্য এই পরিমাণ রোযা রাখা বা এই পরিমাণ দান করা আবশ্যক। কিংবা যদি সে বলে, আমার উপর আল্লাহর জন্য এই বছর হজ্জ করা আবশ্যক অথবা আল্লাহ আমার রোগীকে সুস্থ করার যে নিয়ামত দিয়েছেন তার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এ বছর মসজিদে হারামে দুই রাকাত নামায পড়া আমার উপর আবশ্যক। অথবা শর্তযুক্ত মানত; যেমন: কেউ যদি আল্লাহর নৈকট্যমূলক কোনো নেকীর কাজ করার মানত করে, তবে সেটা কোনো উপকারপ্রাপ্তির সাথে শর্তযুক্ত করে; যদি উপকারটি লাভ হয় সে নেকীর কাজটি করবে। উদাহরণস্বরূপ কেউ এভাবে বলা: যদি আমার হারানো ব্যক্তি ফিরে আসে অথবা যদি আল্লাহ আমাকে আমার শত্রুর অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন তাহলে এতটি রোজা রাখা বা এ পরিমাণ সদকা করা আমার উপর আবশ্যক। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “কেউ যদি মানত করে যে সে আল্লাহর আনুগত্য করবে, সে যেন তার আনুগত্য করে। আর কেউ যদি মানত করে যে তার অবাধ্যতা করবে, সে যেন তার অবাধ্যতা না করে।”[হাদীসটি বুখারী (৬২০২) বর্ণনা করেন]
মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ আল-কুয়েতিয়াহ, কুয়েতি ফিক্বহ বিশ্বকোষ, গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে:” اتفق الفقهاء على جواز تعليق النذر بالشرط , ولا يجب الوفاء قبل حصول المعلق عليه ; لعدم وجود سبب الوفاء , فمتى وجد المعلق عليه وجد النذر ولزم الوفاء به “ফকিহগণ একমত যে, শর্তযুক্ত মান্নত করা জায়েজ। তবে, যে শর্তের ওপর মান্নত নির্ভরশীল, তা পূর্ণ হওয়ার আগে মান্নত আদায় করা আবশ্যক নয়; কেননা, তখনো মান্নত আদায়ের কারণ অস্তিত্বে আসেনি। ফলে, যখন শর্ত পূর্ণ হবে, তখনই মান্নত কার্যকর হবে এবং তা পূরণ করা ওয়াজিব হবে।”(আল মাওযূ‘আতুল ফিক্বহিয়াহ; খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ৩১৫) হানাফি মাযহাবের আলেম ইমাম কাসানি’ বলেন: ” وإن كان معلقاً – أي : النذر – بشرط نحو أن يقول : إن شفى الله مريضي ، أو إن قدم فلان الغائب ، فلله عليّ أن أصوم شهراً أو أصلي ركعتين أو أتصدق بدرهم ، ونحو ذلك فوقته وقت الشرط ، فما لم يوجد الشرط ، لا يجب ؛ بالإجماع “যদি নজর কোনো শর্তের সাথে সম্পৃক্ত হয়, যেমন কেউ বলে— ‘যদি আল্লাহ আমার রোগীকে সুস্থ করেন’ অথবা ‘আমার অমুক প্রবাসী ফিরে এলে, তাহলে আমার উপর এক মাস রোযা রাখা, দুই রাকাত নামাজ আদায় করা বা এক দিরহাম সদকা করা ওয়াজিব হবে’, তাহলে এই নজরের সময় সেই শর্ত পূরণের পরই শুরু হবে। তাই শর্ত পূরণের আগে এটি পালন করা বাধ্যতামূলক নয়; এ বিষয়ে সর্বসম্মত মত রয়েছে।”(বাদায়েউস সানায়ি; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ৯৪)
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] ব্যথা কমার শর্তে মানত করা হলে সেটি কখন পূরণ করতে হবে এমন প্রশ্ন করা হলে জবাবে শাইখ :বলেছেন” إذا وجد الشرط المذكور وهو خفة الألم، فالواجب عليك الوفاء بالنذر فور”যদি (মানতের) উল্লিখিত শর্তটি পূর্ণ হয়,অর্থাৎ ব্যথা কমে যায়,তাহলে মানতকারীর উপর তার মানত অবিলম্বে পালন করা বাধ্যতামূলক…”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড/২২; পৃষ্ঠা: ১৬৬)
.
আবার কেউ যদি আল্লাহর আনুগত্যমূলক কোনো মানত করে, তারপর এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যা তার মানত পূরণে প্রতিবন্ধক হয়; যেমন: সে যদি এক মাস রোযা রাখা অথবা হজ্জ করা অথবা উমরা করার মানত করে কিন্তু কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে রোযা রাখা, হজ্জ করা অথবা উমরা করতে অক্ষম হয় কিংবা দান করার মানত করে, কিন্তু দরিদ্র হয়ে যায় ফলে মানত পূরণ করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে, তাহলে সে মানতের কাফ্ফারা হিসেবে শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা দিবে। যেমনটি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেন: “কেউ যদি এমন কোনো মানত করে যা পূরণ করতে সে সক্ষম নয়, তাহলে এর কাফফারা হলো শপথ ভঙ্গের কাফ্ফারা।”[হাদীসটি আবু দাউদ বর্ণনা করেন। হাফেয ইবনে হাজার বুলুগুল মারাম গ্রন্থে বলেন: হাদীসটির সনদ সহীহ। হাদীসের হাফেযরা বর্ণনাটি মাওকূফ (সাহাবী থেকে বর্ণিত) হওয়ার মতটি প্রাধান্য দিয়েছেন] শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যা রাহিমাহুল্লাহ ‘আল-ফাতাওয়া’ গ্রন্থে বলেন: ‘কোনো ব্যক্তি যদি আল্লাহর কোনো আনুগত্য করার মানত করে তাহলে তার উচিত এই মানত পূরণ করা। কিন্তু, যদি আল্লাহর জন্য কৃত মানত পূরণ না করে তাহলে অধিকাংশ সালাফের মতে সে শপথভঙ্গের কাফফারা দিবে।”(আল-ফাতাওয়া: ৩৩/৪৯)
.
(২). যে মানত পূরণ করা জায়েয নেই, আর এতে রয়েছে শপথভঙ্গের কাফ্ফারা। এ প্রকার মানতে অন্তর্ভুক্ত হবে:
ইমাম আহমদ (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেন, যিয়াদ ইবনে জুবাইর বর্ণনা করেন: ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু মিনায় হেঁটে যাচ্ছিলেন এর মধ্যে এক ব্যক্তি তাকে জিজ্ঞেস করল: ‘আমি সারা জীবন প্রতি মঙ্গলবার বা বুধবার রোযা রাখার মানত করেছি। আজকের এই দিনটি কুরবানির দিনে পড়ে গেছে। এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী?’ তিনি বললেন: ‘আল্লাহ মানত পূরণের আদেশ দিয়েছেন, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন কিংবা (বলেছেন) আমাদেরকে কুরবানির দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ লোকটি মনে করল যে তিনি প্রশ্নটি শোনেননি। সে আবার জিজ্ঞেস করল: ‘আমি সারা জীবন প্রতি মঙ্গলবার বা বুধবার রোযা রাখার মানত করেছি। আজকের এই দিনটি কুরবানির দিনে পড়ে গেছে। তখন তিনি বললেন: ‘আল্লাহ মানত পূরণ করার আদেশ দিয়েছেন, আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন কিংবা (বলেছেন) আমাদেরকে কুরবানির দিনে রোযা রাখতে নিষেধ করা হয়েছে।’ পাহাড়ে ওঠার আগ পর্যন্ত তিনি অতিরিক্ত কিছু বলেননি। হাফেয ইবনে হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: ‘এ বিষয়ে ইজমা (সর্বসম্মত মত) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার দিনে নফল কিংবা মানত কোনো প্রকার রোযা রাখাই বৈধ নয়।’
.
.
১. জিদ বা রাগের মানত: এটি এমন প্রত্যেক মানত যা শপথের মতো কোনো কাজ করতে উৎসাহ দিতে বা বাধা দিতে, সত্যায়ন করতে বা অস্বীকার করতে করা হয়। মানতকারী মানতকে উদ্দেশ্য করে না বা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনকে উদ্দেশ্যে করে না। যেমন: রাগের সময় কেউ এভাবে বলা: ‘আমি যদি এটা করি তবে আমার ওপর হজ করা আবশ্যক’ বা ‘এক মাস রোযা রাখা আবশ্যক’ বা ‘এক হাজার দিনার সদকা করা আবশ্যক’ অথবা যদি বলে: ‘আমি যদি অমুকের সাথে কথা বলি তবে আমার এই দাসকে মুক্ত’ বা ‘আমার স্ত্রী তালাক’ ইত্যাদি। এরপর সে কাজটি করে ফেলে। অথচ এ কথাগুলো বলার পিছনে তার উদ্দেশ্য ছিল কেবল কাজটি না করার ব্যাপারে দৃঢ়তা প্রকাশ করা; অন্যকিছু নয়। তার প্রকৃত উদ্দেশ্য শর্তকৃত কাজটি না করা এবং ফলাফলও কার্যকর না করা। এ ধরনের মানতে মানতকারীকে দুইটির কোনো একটি করার অবকাশ দেওয়া হয়: (মানত পূরণ করা কিংবা শপথের কাফফারা আদায় করা)।
২. যে মানতের অবস্থা হচ্ছে তর্ক-বিতর্ক কিংবা যে মানতের উদ্দেশ্য কোনো কিছু করা বা না করার প্রতি উৎসাহ প্রকাশ করা (মানত পূরণ করা কিংবা মানতের বদলে শপথের কাফ্ফারা দেওয়া; বিষয়টিকে মূলতঃ মানত হিসেবে গণ্য করে)। ইবনে তাইমিয়া বলেন: ‘যদি মানতকে শপথের মত করে শর্তযুক্ত করে; যেমন এভাবে বলল: ‘আমি যদি তোমাদের সাথে সফর করি তাহলে আমার ওপর হজ করা অনিবার্য’ বা ‘আমার সম্পদ সদকা’ বা ‘দাস মুক্ত’, তবে এটি সাহাবায়ে কেরাম ও জমহুর আলেমের মতে মানতের শপথ; মানত নয়। তাই সে নিজের উপর যা অনিবার্য করেছে সেটা যদি পূরণ না করে; তবে শপথের কাফফারা দেয়াই যথেষ্ট।” তিনি অন্য স্থানে বলেন: “আমাদের মতে জিদ ও রাগের মানতের ক্ষেত্রে দুটো বিষয়ের কোনটি করতে পারবে: কাফফারা দেওয়া কিংবা শর্তযুক্ত কাজটি করা। যদি সে শর্তযুক্ত অনিবার্যকৃত কাজটি না করে, তাহলে কাফফারা ওয়াজিব হবে।”
৩. বৈধ বিষয়ে মানত করা: এটি এমন মানত যা বৈধ কাজের সাথে সম্পর্কিত। যেমন নির্দিষ্ট পোশাক পরা, নির্দিষ্ট খাবার খাওয়া, নির্দিষ্ট বাহনে চড়া, নির্দিষ্ট ঘরে প্রবেশ করা ইত্যাদি।সাবিত ইবনে দাহহাক থেকে বর্ণিত: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এক ব্যক্তি বুওয়ানাহ নামক স্থানে উট জবাই করার মানত করেছিল (এক বর্ণনায় আছে: তার পুত্র সন্তান জন্মানোর কারণে)। তখন সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বলল: ‘আমি বুওয়ানাহতে উট জবাই করার মানত করেছি।’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন: “সেখানে কি জাহেলিয়াতের কোনো মূর্তি পূজিত হতো?” তারা বলল: ‘না।’ তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন: “সেখানে কি তাদের কোনো উৎসব হতো?” তারা বলল: ‘না।’ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “তোমার মানত পূরণ করো; কারণ আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কোনো মানত পূরণ করা যায় না এবং এমন কোনো মানত পূরণ করা যায় না যা আদম সন্তানের মালিকানায় নেই।”(আবু দাউদ হা/২৮৮১) এই ব্যক্তি পুত্র সন্তান লাভের কারণে আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করে (ইয়াম্বুর পেছনে) বুওয়ানাহ নামক স্থানে উট জবাই করার মানত করেছিল। তাই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেখানে মানত পূরণের অনুমতি দিয়েছিলেন।
.
পরিশেষে, আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর পছন্দনীয় ও সন্তোষজনক কাজ করার তৌফিক দান করেন। নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক।গৃহীত ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-২৫৮৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
জীবনকে সুন্দর ও পরিপক্ব এবং শান্তিময় করার জন্য ২০টি মূল্যবান উপদেশ
১. নিজের মর্যাদা ও আত্মসম্মান অটুট রাখুন; কখনো কারও ওপর অযথা বোঝা হয়ে উঠবেন না।
.
২. ত্যাগের গল্প সবাই জানে, কিন্তু বাস্তবতা হলো—কেউ আপনার জন্য ত্যাগ স্বীকার করে, আর কেউ আপনাকেই ত্যাগ করে চলে যায়।
.
৩. প্রতিটি তর্কে জয়ী হওয়ার প্রয়োজন নেই, যদিও আপনি সত্যের ওপর থাকেন। কারণ অনেক সময় একটি হৃদয় জয় করা, একটি বিতর্ক জেতার চেয়েও বেশি মহৎ।
.
৪. অকৃতজ্ঞতা ও উপকার অস্বীকারের আঘাত অনেক সময় তলোয়ারের আঘাতের চেয়েও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে।
.
৫. কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বললে ব্যক্তিত্বের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, আর কিছু মানুষের ক্ষেত্রে নীরবতাই প্রজ্ঞা ও শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দেয়।
.
৬. তুচ্ছ বিষয় নিয়ে অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে হওয়া মানসিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়; তাই কখনো উপেক্ষা করুন, আর কখনো না বোঝার ভান করে পরিস্থিতিকে সহজ করে তুলুন।
.
৭. মহৎ মানুষ চিন্তা, আদর্শ ও লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা করেন; সাধারণ মানুষ ঘটনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আর সংকীর্ণ মানসিকতার মানুষ অন্যের সমালোচনায় নিজের মূল্যবান সময় নষ্ট করে।
.
৮. অনেক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়—কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কথার কারণে, আবার কিছু প্রয়োজনীয় কথা না বলার কারণেও।
.
৯. নীরবতা অনেক সময় এমন প্রভাব ফেলে, যা দীর্ঘ কথোপকথনেও সম্ভব হয় না; আবার দূরত্ব কখনো এমন সমস্যার সমাধান করে, যা অতিরিক্ত সান্নিধ্য করতে পারে না।
.
১০. মনে রাখবেন,প্রকৃত নৈকট্য উপস্থিতিতে নয়, অনুভূতি ও আন্তরিকতায় নিহিত।
.
১১. কখনো কখনো আপনার জীবনে আসা কোনো নেয়ামত বা আনন্দের কারণ হতে পারে—আপনি কারো জন্য তা আন্তরিকভাবে কামনা করেছিলেন।
.
১২. সুখী হওয়ার অন্যতম গোপন রহস্য হলো—দুশ্চিন্তায় ডুবে যাওয়ার আগে নিজের জীবনে থাকা মহান আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত নেয়ামত ও অর্জনগুলোর দিকে ফিরে তাকানো।
.
১৩. জীবনের প্রথম ধাক্কা বা ব্যর্থতা খুবই কষ্টদায়ক হয়; কিন্তু পরবর্তী ব্যর্থতাগুলো ধীরে ধীরে আমাদের অভিজ্ঞতা ও মানসিক দৃঢ়তার অংশ হয়ে যায়।
.
১৪. সুখ মূলত একটি অনুভূতি; আবার কখনো কখনো সেই সুখের নামই হয় একজন প্রিয় মানুষ।
.
১৫.মানুষের প্রতি কোনো প্রত্যাশা না রেখে সামনে এগিয়ে চলুন—তাহলে হতাশার ভারও আপনাকে বহন করতে হবে না।
.
১৬. সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো—আমাকে নিয়ে আমার কথাই আমার কাছ থেকে শুনুন, অন্য কারো মাধ্যমে নয়।
.
১৭. আপনি যদি রংধনুর সৌন্দর্য উপভোগ করতে চান, তবে বৃষ্টির কষ্টকেও গ্রহণ করতে শিখতে হবে।(অর্থাৎ, জীবনে ভালো কিছু পেতে হলে শুধু সহজ সময় চাইলে হবে না; কষ্ট ও ধৈর্যের মধ্য দিয়েই সেই সুন্দর ফল আসে)।
.
১৮. আপনি যখন নিজের সঙ্গ উপভোগ করতে শিখবেন, তখন মানুষের উপস্থিতি আপনার কাছে ভালো লাগবে, কিন্তু তাদের অনুপস্থিতি আপনার কোনো ক্ষতি করবে না।
.
১৯. যে কোনো সম্পর্কের শুরুতে থাকে আবেগের উচ্ছ্বাস,কিন্তু শেষ দিকে প্রকাশ পায় মানুষের চরিত্র ও নৈতিকতার আসল রূপ।
.
২০. যে মানুষ আপনার যত্ন নেয় এবং আপনাকে গুরুত্ব দেয়, তাকেই মূল্য দিন; আর বাকিদের সাথে সৌজন্যমূলক আচরণ ও সাধারণ কুশল বিনিময়ই যথেষ্ট। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)
একজন মুসলিমের উপর কী কী কারণে গোসল ওয়াজিব হয়
প্রশ্ন: শার’ঈ দৃষ্টিকোণ থেকে একজন মুসলিমের উপর কী কী কারণে গোসল ওয়াজিব হয়?
▬▬▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬▬▬
ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর গোসল ওয়াজিব হওয়ার কারণসমূহ নিয়ে আলেমদের মাঝে কিছু মতভেদ থাকলেও, প্রাধান্যপ্রাপ্ত ও গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী এর সংখ্যা ছয়টি। এ ছয়টির যেকোনো একটি সংঘটিত হলেই মুসলিম ব্যক্তির ওপর গোসল করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে।
.
(১). বীর্য নির্গত হওয়া: এমনকি সেটা সহবাস ছাড়া হলেও:পুরুষ বা নারীর বীর্যের নিজস্ব স্থান থেকে বীর্য বের হওয়া। এটি দুই অবস্থায় হতে পারে: জাগ্রত অবস্থায় অথবা ঘুমন্ত অবস্থায়। যদি জাগ্রত অবস্থায় বীর্য বের হয়, তবে গোসল ওয়াজিব হওয়ার জন্য ‘তৃপ্তি’ বা ‘কামভাব’ থাকা শর্ত। যদি কোনো অসুস্থতার কারণে তৃপ্তি ছাড়াই বীর্য বের হয়, তবে গোসল ওয়াজিব হবে না। আর ঘুমন্ত অবস্থায় বীর্য বের হলে এটাকে ‘ইহতিলাম’ বা স্বপ্নদোষ বলা হয়। এ অবস্থায় শর্তহীনভাবে (কামভাব অনুভূত হোক বা না হোক) গোসল ওয়াজিব হবে। যেহেতু ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের বোধশক্তি থাকে না, তাই তৃপ্তি অনুভূত না হতে পারে। সুতরাং, ঘুম থেকে উঠে যদি কাপড়ে বীর্যের চিহ্ন পাওয়া যায়, তবে গোসল করতে হবে। আর যদি কেউ স্বপ্নে সহবাস করতে দেখে, কিন্তু ঘুম ভাঙার পর বীর্যের কোনো চিহ্ন না পায়, তবে তার ওপর গোসল ওয়াজিব হবে না।ইবনে কুদামা (রাহিমাহুল্লাহ) ‘আল-মুগনি’ গ্রন্থে বলেন:”যে ব্যক্তির স্বপ্নদোষ হওয়াটা সে জেনেছে, কিন্তু (পোশাকে) বীর্য পায়নি তার উপরে গোসল ফরয নয়। ইবনুল মুনযির বলেন: যত জন আলেমের অভিমত আমার মুখস্ত আছে তারা সকলে এই মতের উপর ইজমা করেছেন।উম্মে সালামা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, উম্মে সুলাইম (রাঃ) বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ্! কোন মহিলার যদি স্বপ্নদোষ হয় তাহলে কি তার উপর গোসল ফরয হবে? তিনি বললেন: হ্যাঁ; যদি পানি (বীর্য) দেখে।[সহিহ বুখারী ও সহিহ মুসলিম] এ হাদিস নির্দেশ করছে যে, যদি পানি (বীর্য) না দেখে তাহলে তার উপর গোসল ফরয নয়।[আল মুগনী থেকে সমাপ্ত]
.
আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা-তে এসেছে:اتّفق الفقهاء على أنّ خروج المنيّ من موجبات الغسل، بل نقل النّوويّ الإجماع على ذلك، ولا فرق في ذلك بين الرّجل والمرأة في النّوم أو اليقظة، والأصل في ذلك حديث أبي سعيد الخدريّ رضي الله تعالى عنه أنّ النّبيّ صلى الله عليه وسلم قال: إنّما الماء من الماء رواه مسلم (343)، ومعناه – كما حكاه النّوويّ – يجب الغسل بالماء من إنزال الماء الدّافق وهو المنيّ “ফকীহরা একমত যে বীর্য নির্গত হওয়া গোসল ওয়াজিব হওয়ার অন্যতম কারণ। বরং ইমাম নববী এ ব্যাপারে ইজমা (ঐকমত্য) বর্ণনা করেছেন। এক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের মাঝে কিংবা ঘুমন্ত অবস্থা বা জাগ্রত অবস্থার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এর সপক্ষে দলীল হচ্ছে আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস, তিনি বর্ণনা করেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কেবল পানি (বীর্য) থেকে পানি (গোসল) (আবশ্যক) হয়।”[হাদীসটি মুসলিম হা/৩৪৩) বর্ণনা করেন] এর অর্থ হচ্ছে যেমনটি ইমাম নববী বর্ণনা করেছেন: সবেগে নির্গত পানি তথা বীর্যের কারণে গোসল আবশ্যক হয়।’(সমাপ্ত; আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা; খণ্ড: ৩১; পৃষ্ঠা: ১৯৫)
.
(২). লিঙ্গাগ্র যৌনাঙ্গে প্রবেশ করানো: নারী-পুরুষের দুই লজ্জাস্থান মিলিত হয়ে পুরুষের লিঙ্গের অগ্রভাগ নারীর লিঙ্গের ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেলেই গোসল আবশ্যক হবে; যদিও বীর্য নির্গত না হয়,তবুও স্ত্রী সহবাসের ক্ষেত্রে লিঙ্গাগ্র যোনিপথে প্রবেশ করালে গোসল ওয়াজিব হয়ে যায়। সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য কিতাবে বর্ণিত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন কেউ স্ত্রীর চার শাখার (হাত-পা) মাঝে বসলো এবং খতনা করা স্থান (লিঙ্গাগ্র) খতনা করা স্থানকে (যৌনিকে) স্পর্শ করলো, তখন গোসল ওয়াজিব হয়ে গেল।” অর্থাৎ প্রবেশ করানোর মাধ্যমেই স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ওপর গোসল ওয়াজিব হবে; বীর্যপাত হোক বা না হোক। এ বিষয়ে ওলামায়ে কেরামের ইজমা (ঐক্যমত) রয়েছে।
.
(৩) ও (৪). হায়েয (ঋতুস্রাব) ও নিফাস (প্রসবোত্তর রক্তস্রাব): হায়েয বা নিফাস বন্ধ হওয়ার পর গোসল করা ওয়াজিব। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন তোমার ঋতুস্রাব শেষ হবে, তখন গোসল করো এবং নামাজ পড়ো।” আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন: “অতঃপর যখন তারা প্রকৃষ্টভাবে পবিত্র হবে” [সূরা বাকারা: ২২২] অর্থাৎ রক্ত বন্ধ হওয়ার পর গোসল করবে…”আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা-তে এসেছে: ‘ফকীহরা একমত যে হায়েয ও নিফাস গোসল ওয়াজিবকারী বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্ত। ইবনুল মুনযির ও ইবনে জারীর আত-ত্বাবারী ও অন্যান্যরা এ প্রসঙ্গে ইজমা তথা ঐকমত্য বর্ণনা করেছেন। হায়েযের ফলে গোসল ওয়াজিব হওয়ার দলীল হচ্ছে আল্লাহর বাণী:وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الْمَحِيضِ قُلْ هُوَ أَذًى فَاعْتَزِلُواْ النِّسَاء فِي الْمَحِيضِ وَلاَ تَقْرَبُوهُنَّ حَتَّىَ يَطْهُرْنَ فَإِذَا تَطَهَّرْنَ فَأْتُوهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَمَرَكُمُ اللّهُ“তারা তোমার কাছে হায়েয (মহিলাদের ঋতুস্রাব) সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। তুমি বলো, সেটা কষ্টদায়ক (সঙ্গমের ক্ষেত্রে)। অতএব, হায়েযের সময়ে তোমরা নারীদেরকে পরিত্যাগ করো (হায়েযের স্থান পরিত্যাগ করো) এবং তারা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত তাদের কাছে যেয়ো না (তাদের সাথে সঙ্গম করো না)। যখন তারা পবিত্র হয়ে যাবে তখন আল্লাহ যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন সেভাবে তাদের কাছে যেতে পারবে (সঙ্গম করতে পারবে)।”[সূরা বাকারা: ২২২; আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা: ৩১/২০৪)
.
(৫). কাফিরের ইসলাম গ্রহণ: একদল উলামায়ে কেরামের মতে, কোনো অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করলে তার ওপর গোসল করা ওয়াজিব। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েকজন নও-মুসলিমকে গোসল করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে অনেক আলেম মনে করেন এটি মুস্তাহাব (উত্তম); ওয়াজিব নয়। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক নতুন মুসলমানকে গোসল করার নির্দেশ দিতেন বলে প্রমাণিত নয়। তাই যে হাদিসে নির্দেশসূচক ক্রিয়া উদ্ধৃত হয়েছে সেই নির্দেশকে ‘মুস্তাহাব’ (উত্তমতা) অর্থে ব্যাখ্যা করা হবে। যাতে সবগুলো দলিলের মধ্যে সমন্বয় করা যায়। ইমাম ইবনে উসাইমীন রাহিমাহুল্লাহ ‘আশ-শারহুল মুমতি’; ১/৩৯৭) গ্রন্থে বলেন: ‘নিরাপদ মত হচ্ছে গোসল করা।”
.
আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা-তে এসেছে:ذهب المالكيّة والحنابلة إلى أنّ إسلام الكافر موجب للغسل، فإذا أسلم الكافر وجب عليه أن يغتسل، لما روى أبو هريرة رضي الله عنه أنّ ثمامة بن أثال رضي الله عنه أسلم، فقال النّبيّ صلى الله عليه وسلم: اذهبوا به إلى حائط بني فلان فمروه أن يغتسل وعن ( قيس بن عاصم أنّه أسلم: فأمره النّبيّ صلى الله عليه وسلم أن يغتسل بماء وسدر)؛ ولأنّه لا يسلم غالباً من جنابة، فأقيمت المظنّة مقام الحقيقة كالنّوم والتقاء الختانين. وذهب الحنفية والشافعية إلى استحباب الغسل للكافر إذا أسلم وهو غير جنب؛ لأنه أسلم خلق كثير ولم يأمرهم النبي صلى الله عليه وسلم بالغسل، وإذا أسلم الكافر وهو جنب وجب عليه الغسل، قال النّوويّ: نصّ عليه الشّافعيّ، واتّفق عليه جماهير الأصحاب “
“মালেকী ও হাম্বলীরা মনে করেন যে কোন কাফেরের ইসলামগ্রহণ করা তার উপর গোসল করাকে ওয়াজিবকারী। তাই কোন কাফের ইসলাম গ্রহণ করলে তার উপর গোসল করা ওয়াজিব হয়ে যায়। এর দলীল হচ্ছে: আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: সুমামা ইবনে আসাল রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘তোমরা তাকে নিয়ে অমুকের বাগানে গিয়ে তাকে গোসল করতে বলো।”কাইস ইবনে আসেম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি ইসলাম গ্রহণ করার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পানি এবং বরই পাতা দিয়ে গোসল করার নির্দেশ দেন।তাছাড়া কাফের অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপবিত্র (জুনুবী) অবস্থায় থাকে। তাই উক্ত সম্ভাবনাকে প্রকৃত অবস্থার স্থলে স্থান দেওয়া হয়েছ। যেমনিভাবে ঘুমের কারণে এবং দুই লজ্জাস্থান মিলিত হওয়ার কারণে গোসল আবশ্যক হয়।হানাফী ও শাফেয়ীরা মনে করেন যে কাফের ইসলাম গ্রহণ করলে এবং জুনুবী অবস্থায় না থাকলে তার জন্য গোসল করা মুস্তাহাব। কারণ এমন বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেছে যাদেরকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোসলের নির্দেশ দেননি। তবে যদি কাফের জুনুবী অবস্থায় ইসলাম গ্রহণ করে তাহলে তার জন্য গোসল করা ওয়াজিব। ইমাম নববী বলেন: শাফেয়ী এমনটি বলেছেন আর তার অধিকাংশ সাথী এতে একমত পোষণ করেছেন।”(আল-মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যা: ৩১/২০৫-২০৬)
(৬). মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া: কোনো মুসলিম মারা গেলে তাকে গোসল করানো (জীবিতদের ওপর) ওয়াজিব। তবে জিহাদের ময়দানের শহীদকে গোসল করানো যাবে না। দলিল হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ে মারা যাওয়ার পরে তিনি বলেছেন: ‘তোমরা তাকে তিন বা পাঁচ বা এর চেয়ে বেশি বার গোসল করাও।’[হাদীসটি বুখারী হা/১২৫৩; ও মুসলিম হা/৯৩৯) বর্ণনা করেন; এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইমাম সালিহ আল-ফাওজান (হাফিযাহুল্লাহ) রচিত “আল-মুলাখখাস আল-ফিকহী” থেকে সংক্ষেপিত।
.
এছাড়াও জুমার দিন গোসল করা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে, কেউ মুস্তাহাব, কেউ সুন্নাতে মুওয়াক্কাদাহ, কেউ ওয়াজিব বলেছেন। ইবনু দাক্বীকুল ঈদ বলেন, অধিকাংশ বিদ্বান ‘মুস্তাহাব’ বলেছেন। সাইয়েদ সাবেক্ব একে মুস্তাহাব গোসল সমূহের মধ্যে শামিল করেছেন (ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৫৩-৫৫)। এ ব্যাপারে ইমাম নববী ‘আল-মাজমূ’গ্রন্থে বলেন: ‘অধিকাংশের মতে এটি সুন্নাহ। সালাফদের কারো কারো মতে, এটি ওয়াজিব।”(আল-মাজমূ’ (২/২৩২)
.
রাসূল (ﷺ) বলেন, জুম‘আর দিনে প্রত্যেক সাবালকের জন্য গোসল করা ওয়াজিব’ (বুখারী হা/৮৭৯; মিশকাত হা/৫৩৮)। তিনি আরো বলেন, যে ব্যক্তি জুম‘আয় যাবে সে যেন গোসল করে (বুখারী হা/৮৮২; মুসলিম হা/৮৪৫)। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুম‘আর দিন শুধু ওযূ করল সেটাই তার জন্য যথেষ্ট। আর যে ব্যক্তি গোসল করল, গোসল করাই উত্তম’ (তিরমিযী হা/৪৯৭; মিশকাত হা/৫৪০)। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, জুম‘আর দিন গোসল করা ওয়াজিব নয়; তবে উত্তম। তাতে গোসলকারীর অধিকতর পবিত্রতা অর্জিত হয়’ (আবু দাঊদ হা/৩৫৩; মিশকাত হা/৫৪৪)। উপরোক্ত হাদীছগুলি থেকে বুঝা যায় যে, জুম‘আর দিনে গোসল করা গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যে সকল হাদীছে ওয়াজিব শব্দটি এসেছে তার অর্থ ফরয নয় বরং গুরুত্ব বুঝানোর জন্য রাসূল (ﷺ) এরূপ শব্দ ব্যবহার করেছেন (শায়খ বিন বায, মাজমূ‘ ফাতাওয়া: ১০/১৭১)। এক্ষেত্রে সঠিক মত হচ্ছে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যার বাছাইকৃত মত। ‘আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা’ গ্রন্থে তার বক্তব্য: ‘যার শরীরের ঘাম অথবা দুর্গন্ধ থেকে অন্য কেউ কষ্ট পায় তার জন্য জুমার দিনে গোসল করা ওয়াজিব।”(আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা’: ৫/৩০৭) আরও বিস্তারিত জানতে দেখুন: ইসলাম সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-৯৩০২৭)। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
রাদিয়াল্লাহু আনহু বলার বিধান কি কেবল সাহাবিদের জন্য নির্দিষ্ট
‘’রাদিয়াল্লাহু আনহু’ (আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হন) বলার বিধান কি কেবল সাহাবিদের জন্য নির্দিষ্ট নাকি অন্যদের জন্যও তা বলা যাবে? বিজ্ঞ আলেমদের ফতোয়ার আলোকে এই বিষয়টি নিম্নে উপস্থাপন করা হলো। وبالله التوفيق
প্রশ্ন: ”রাদিয়াল্লাহু আনহু” (رضي الله عنه ‘আল্লাহ তার উপর সন্তুষ্ট হন’) বলা কি সবার জন্য প্রযোজ্য নাকি এটি বিশেষভাবে শুধু সাহাবিদের জন্য নির্দিষ্ট?
উত্তর:
لا ، هي عامة لكل أحد نسأل الله له الرضا قال الله عز وجل: ﴿والسابقون الأولون من المهاجرين والأنصار والذين اتبعوهم بإحسان رضي الله عنهم ورضوا عنه﴾. لكن جرى الاصطلاح العرفي بين العلماء أن الترضي يكون على الصحابة فقط، والترحم على من بعدهم فيقال عن عمر: رضي الله عنه ويقال لعمر بن عبد العزيز: رحمه الله ولا يقال: رضي الله عنه، هذا في الاصطلاح بين العلماء، وهو اصطلاحٌ عرفي ليس اصطلاحاً شرعياً، بمعنى أنه ليس من إرشاد النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم أن نقول للصحابة رضي الله عنهم ولغيرهم: رحمهم الله بل هذا شيء جرى عليه الناس فلا ينبغي أن يخرج الإنسان عن المألوف؛ لأنه لو قال مثلاً: عمر بن عبد العزيز رضي الله عنه لفهم السامع أنه صحابي بناءً على العرف المضطرد.
“না, এটি বিশেষভাবে শুধু সাহাবিদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। এটি সাধারণভাবে যেকোনো মুসলিমের জন্য বলা যেতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তির জন্য সন্তুষ্টি কামনা করি।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
”মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী এবং যারা সুন্দরভাবে তাদের অনুসরণ করেছে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।” [সূরা তাওবাহ: ১০০]
তবে আলিমদের মাঝে প্রচলিত একটি সুন্দর রীতি হলো, “তারাযযি” (রাদিয়াল্লাহু আনহু বলা) সাধারণত সাহাবিদের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। আর তাদের পরবর্তী যুগের সৎ ব্যক্তিদের জন্য “তারাহহুম” (রহিমাহুল্লাহ বা আল্লাহ তার উপর রহমত করুন) ব্যবহার করা হয়।
উদাহরণস্বরূপ:
সাহাবি উমর সম্পর্কে বলা হয়: উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু।
কিন্তু পরবর্তী যুগের খলিফা উমর ইবন আব্দুল আজিজ সম্পর্কে বলা হয়: উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাহিমাহুল্লাহ।
এখানে সাধারণত ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা হয় না। তবে এটি আলিমদের মাঝে একটি প্রচলিত রীতি বা পরিভাষা মাত্র; শরিয়তের নির্ধারিত কোনো বাধ্যতামূলক বিধান নয়। অর্থাৎ এটি এমন কিছু নয় যে, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, সাহাবিদের জন্য “রাদিয়াল্লাহু আনহু” আর অন্যদের জন্য “রহিমাহুল্লাহ” বলতে হবে। বরং এটি মানুষের মাঝে প্রচলিত একটি পরিভাষা। তাই সাধারণত এই প্রচলিত পদ্ধতি থেকে ভিন্ন হওয়া ঠিক নয়। কারণ কেউ যদি বলেন “উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রাদিয়াল্লাহু আনহু”, তাহলে প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী শ্রোতার মনে হতে পারে যে, তিনি হয়তো একজন সাহাবি। কারণ সাধারণভাবে এই শব্দটি সাহাবিদের ক্ষেত্রেই সর্বপ্রথম মাথায় আসে। আল্লাহই সবচেয়ে বেশি জানেন।
২. আল্লামা ইবনে বায (রহ.)-এর ফতোয়া (সৌদি আরবে ইসলামি প্রশ্ন-উত্তর মূলক রেডিও প্রোগ্রাম “নূরুন আলাদ দারব”):
সাহাবি ও তাবেয়িদের জন্য রাদিয়াল্লাহু আনহু বলার বৈধতা:
প্রশ্ন: পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ থেকে প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন: হে সম্মানিত শায়খ! আমাদের জানা মতে, যখনই সাহাবিদের (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) নাম আসে কিংবা পড়ার সময় তাদের উল্লেখ থাকে তখন আমাদের ‘রাদিয়াল্লাহু আনহুম’ বলা কর্তব্য। কিন্তু যদি কোনো তাবেয়ি কিংবা সালাফে-সালেহিনের কারও নাম আসে এবং আমরা তখনও ‘রাদিয়াল্লাহু আনহুম’ বলি তবে কি তাতে কোনো গুনাহ বা সমস্যা হবে?
উত্তর:
لَيْسَ فِي هَذَا حَرَجٌ إِذَا قَالَ: عَنِ الْمُؤْمِنِينَ وَلَوْ كَانُوا مِنَ التَّابِعِينَ أَوْ أَتْبَاعِ التَّابِعِينَ، وَلَكِنِ اشْتَهَرَ الْعُرْفُ بَيْنَ أَهْلِ الْعِلْمِ التَّرَضِّي عَنِ الصَّحَابَةِ، وَالتَّرَحُّمُ عَلَى مَنْ بَعْدَهُمْ وَالْأَمْرُ فِي هَذَا وَاسِعٌ، وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، فَإِذَا ذُكِرَ الصَّحَابِيُّ قَالَ: (رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ) وَإِذَا قِيلَ التَّابِعِيُّ وَغَيْرُهُ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ وَالْأَخْيَارِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ قِيلَ: رَحِمَهُ اللَّهُ، وَلَوْ قِيلَ: فَلَا حَرَجَ وَالْحَمْدُ لِلَّهِ، كُلُّهُ طَيِّبٌ
“মুমিনদের ক্ষেত্রে এমনটি বলাতে কোনো সমস্যা নেই তারা তাবেয়ি কিংবা তাবে-তাবেয়ি যে-ই হোন না কেন। তবে আলেমদের মাঝে প্রচলিত রীতি হলো—সাহাবিদের জন্য ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা এবং তাদের পরবর্তী যুগের মানুষদের জন্য আল্লাহর রহমত কামনা করা (রহিমাহুল্লাহ বলা)। এই বিষয়টি বেশ প্রশস্ত, আলহামদুলিল্লাহ। তাই সাহাবিদের কথা উল্লেখ হলে বলা হবে ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ এবং তাবেয়ি কিংবা অন্যান্য আলেম ও সৎ মুসলিমদের ক্ষেত্রে বলা হবে ‘রহিমাহুল্লাহ’। তবে যদি তাদের ক্ষেত্রেও ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা হয়, তাতে কোনো অসুবিধা নেই, আলহামদুলিল্লাহ, সবই উত্তম।
প্রশ্ন: আমরা সাহাবিদের ক্ষেত্রে কেন “রাদিয়াল্লাহু আনহুম (আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হন)” বলি?
উত্তর:
نَقُولُ: ذَلِكَ لِأَنَّ اللَّهَ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى أَخْبَرَنَا أَنَّهُ رَضِيَ عَنْهُمْ. قَالَ تَعَالَى: لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ [الفتح: ١٨]. وَكَانُوا أَلْفًا وَأَرْبَعَمِائَةٍ. وَقَالَ تَعَالَى: وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ [التوبة: ١٠٠].
وَأَمَّا غَيْرُ الصَّحَابَةِ، فَهَلْ يَجُوزُ أَنْ يُقَالُ فِي حَقِّهِمْ “رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ”؟ فَقَدِ اخْتَلَفَ الْعُلَمَاءُ فِي ذَلِكَ، وَالَّذِي عَلَيْهِ الْجُمْهُورُ اسْتِحْبَابُ التَّرَضِّي عَنْ غَيْرِ الصَّحَابَةِ أَيْضًا مِنَ الْعُلَمَاءِ وَالْعُبَّادِ وَالصَّالِحِينَ، وَيَكُونُ هَذَا مِنْ بَابِ الدُّعَاءِ، وَهَذَا اخْتِيَارُ النَّوَوِيِّ رَحِمَهُ اللَّهُ.
(يُسْتَحَبُّ التَّرَضِّي وَالتَّرَحُّمُ عَلَى الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِينَ فَمَنْ بَعْدَهُمْ مِنَ الْعُلَمَاءِ وَالْعُبَّادِ وَسَائِرِ الْأَخْيَارِ، فَيُقَالُ: رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، أَوْ رَحْمَةُ اللَّهِ عَلَيْهِ، أَوْ رَحِمَهُ اللَّهُ وَنَحْوُ ذَلِكَ. وَأَمَّا مَا قَالَهُ بَعْضُ الْعُلَمَاءِ: إِنَّ قَوْلَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ مَخْصُوصٌ بِالصَّحَابَةِ وَيُقَالُ فِي غَيْرِهِمْ رَحِمَهُ اللَّهُ فَقَطْ، فَلَيْسَ كَمَا قَالَ وَلَا يُوَافَقُ عَلَيْهِ، بَلِ الصَّحِيحُ الَّذِي عَلَيْهِ الْجُمْهُورُ اسْتِحْبَابُهُ، وَدَلَائِلُهُ أَكْثَرُ مِنْ أَنْ تُحْصَى).
“আমরা এটি বলি কারণ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজেই আমাদের জানিয়েছেন যে, তিনি তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
لَقَدْ رَضِيَ اللَّهُ عَنِ الْمُؤْمِنِينَ إِذْ يُبَايِعُونَكَ تَحْتَ الشَّجَرَةِ
”অবশ্যই আল্লাহ মুমিনদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন যখন তারা গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়াত (শপথ) গ্রহণ করছিল।” [সূরা ফাতহ: ১৮] তারা সংখ্যায় ছিলেন চৌদ্দশত।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ
”মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা অগ্রগামী এবং যারা সুন্দরভাবে তাদের অনুসরণ করেছে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন।” [সূরা তাওবা: ১০০]
সাহাবি ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে কি “রাদিয়াল্লাহু আনহুম” বলা জায়েজ? এ বিষয়ে ওলামাদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। তবে জুমহুর (অধিকাংশ) ওলামাদের মত হলো—সাহাবি ছাড়াও অন্যান্য আলেম, ইবাদতকারী ও নেককার বান্দাদের জন্য “তারাযযি” (রাদিয়াল্লাহু আনহু বলা) বলা মুস্তাহাব। এটি মূলত দোয়ার অংশ হিসেবে গণ্য হবে।” ইমাম নওয়াবি (রহ.) এই মতটিই পছন্দ করেছেন। তিনি বলেন:
সাহাবি, তাবেয়ি এবং তাদের পরবর্তী যুগের আলেম, ইবাদত গুজার ও অন্যান্য সৎ ব্যক্তিদের জন্য ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা এবং রহমত কামনা করা মুস্তাহাব।
সুতরাং বলা যাবে: ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বা ‘রহমাতুল্লাহি আলাইহি’ বা ‘রহিমাহুল্লাহ’ ইত্যাদি।
আর কোনো কোনো আলেম যে বলেছেন—’রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলাটা কেবল সাহাবিদের জন্যই নির্দিষ্ট এবং অন্যদের ক্ষেত্রে শুধু ‘রহিমাহুল্লাহ’ বলা যাবে—তাদের এই বক্তব্য সঠিক নয় এবং এর সাথে একমত হওয়া যায় না। বরং জুমহুর ওলামাদের সঠিক মত হলো এটি মুস্তাহাব, আর এর সপক্ষে এত প্রমাণ রয়েছে যা গণনা করে শেষ করা যাবে না।” [ইমাম নওয়াবির আল মাজমু ৬/১৭২]
মোটকথা, ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ বলা কেবল সাহাবিদের জন্য নির্দিষ্ট নয় বরং যেকোনো সাধারণ মুসলিম বা সৎ ব্যক্তির জন্য দোয়ার উদ্দেশ্যে বলা জায়েজ। তবে আলেমদের প্রচলিত পরিভাষা ও সামাজিক রীতির কারণে সাহাবিদের জন্য ‘রাদিয়াল্লাহু আনহু’ এবং পরবর্তী যুগের আলেম ও নেককারদের জন্য ‘রহিমাহুল্লাহ’ বলাই উত্তম, যেন সাধারণ শ্রোতার মনে কোনো বিভ্রান্তি তৈরি না হয়। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুমার দিন সূরা কাহফ পড়ার ফজিলত এবং তার সঠিক সময়
জুমার দিনের আমলগুলোর মধ্যে অত্যন্ত ফজিলত পূর্ণ ও সুন্নাহ সম্মত আমল হল, সূরা কাহফ তেলাওয়াত করা। হাদিসে জুমার রাত এবং দিন—উভয় সময়েই এই সূরা পড়ার বিশেষ ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
প্রখ্যাত সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ، أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ مَا بَيْنَهُ وَبَيْنِ الْبَيْتِ الْعَتِيقِ
“যে ব্যক্তি জুমার রাতে (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত) সূরা কাহাফ পাঠ করবে তার জন্য তার এবং বায়তুল আতিকের (কাবা ঘর) মধ্যবর্তী স্থান পর্যন্ত নূর বা আলো প্রজ্বলিত হবে।” [সহিহ আত তারগিব ওয়াত তারহিব: ৭৩৬, শাইখ আলবানি]
“আবু সাঈদ খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ فِي يَوْمِ الْجُمُعَةِ أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ مَا بَيْنِ الْجُمُعَتَيْنِ
“যে ব্যক্তি জুমার দিনে সূরা কাহফ পাঠ করবে তার জন্য এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত নূর বা আলোকবর্তিকা থাকবে।” [সহিহুল জামে: ৬৪৭, শাইখ আলবানি]
এ বিষয়ে আরো একাধিক হাদিস রয়েছে।
এই নুর বা আলো হল, দুনিয়াতে অন্তরে হেদায়েত বা ইমানের আলো যা তাকে আল্লাহর পথে টিকে থাকতে এবং পাপাচার থেকে বাঁচতে সাহায্য করবে এবং আখিরাতে হাশরের ময়দানের গাঢ় অন্ধকারে বিশেষ আলো যা তাকে পুলসিরাত পার হতে ও জান্নাত পর্যন্ত পৌঁছতে সাহায্য করবে।
জুমার দিন নাকি রাতে? কতিপয় আলেম শুধু দিনের বেলায় পড়ার কথা বললেও বিশুদ্ধ হাদিসের আলোকে জুমার রাতে কিংবা দিনে যে কোন সময় পড়লে এই মর্যাদা লাভ করা যাবে বলে প্রতিয়মান হয়। এবং এটাই অধিক বিশুদ্ধ মত ইনশাআল্লাহ। ইমাম মুনাভি রাহ. [মৃত্যু ১০৩১ হিজরি] বলেন,
قَالَ الْحَافِظُ ابْنُ حَجَرٍ فِي “أَمَالِيهِ”: كَذَا وَقَعَ فِي رِوَايَاتٍ “يَوْمَ الْجُمُعَةِ” وَفِي رِوَايَاتٍ “لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ”، وَيُجْمَعُ بِأَنَّ الْمُرَادَ الْيَوْمُ بِـلَيْلَتِهِ وَاللَّيْلَةُ بِـيَوْمِهَا.
“হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রাহ. [মৃত্যু ৮৫২ হিজরি] তাঁর ‘আমালি’ গ্রন্থে বলেছেন: কোনো কোনো বর্ণনায় ‘জুমার দিন’ এসেছে। আবার কোনো কোনো বর্ণনায় ‘জুমার রাত’ শব্দটিও এসেছে। এ দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় হলো—উভয় বর্ণনার উদ্দেশ্য মূলত পুরো ২৪ ঘণ্টা (অর্থাৎ রাতসহ দিন এবং দিনসহ রাত)।” [ফয়জুল কাদির: ৬/১৯৯]
মোটকথা, ইসলামি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী সূর্যাস্তের মাধ্যমেই পরবর্তী দিনের গণনা শুরু হয়। সেই হিসেবে বৃহস্পতিবার মাগরিবের পর থেকেই জুমার রাত শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত পুরো সময়টাই সূরা কাহফ পড়ার উপযুক্ত সময়। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে যেকোনো সময় এক বা একাধিক বৈঠকে বসে অর্থসহ কিংবা অর্থ ছাড়া সূরাটি তিলাওয়াত করলে ইনশাআল্লাহ এই বিশেষ মর্যাদা লাভ করা যাবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রত্যেককে এই সুন্নাহটি নিয়মিত পালন করার তৌফিক দান করুন। আমিন। আল্লাহু আলাম। মহান আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।
Subscribe to:
Posts (Atom)