May 17, 2026

জিন বা জাদু ইত্যাদি সমস্যায় সেলফ রুকিয়া করার পদ্ধতি ও করণীয়

 প্রশ্ন: একজন মহিলা গর্ভাবস্থায় জিন ও জাদু দ্বারা আক্রান্ত। জিনের আছরে খুব আগেই আক্রান্ত হয়েছেন। জিনটা তার ওপর খুব জুলুম করে। তিনি খুব দ্রুত রুকইয়াহ করতে চান। তার তিলাওয়াত কিছুটা শুদ্ধ। তিনি কোনও রাক্বির (রুকিয়া বা ঝাড়ফুঁক কারী) কাছে যেতে পারছেন না এবং পরিবারের মানুষের সাহায্যও পাচ্ছেন না। তিনি অনেক বিপদে আছেন। এমতাবস্থায় তিনি কি নিজে নিজে রুকইয়াহ করতে পারবেন? আর সেলফ রুকইয়াহ করার ক্ষেত্রে নিয়ত কেমন হবে?

উত্তর: গর্ভাবস্থায় একজন মহিলার জন্য জাদুর চিকিৎসা বা রুকইয়াহ করা কেবল বৈধই নয় বরং এটি তার এবং গর্ভস্থ সন্তানের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু তিনি কোনও রাকির কাছে যেতে পারছেন না বা পরিবারের সাহায্য পাচ্ছেন না তাই তিনি সেলফ রুকইয়াহ বা নিজের ওপর নিজে রুকইয়াহ অবশ্যই করতে পারবেন। নিচে তার করণীয় ও রুকিয়া করা পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হলো:
আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায (রাহ.)-কে নিজের ওপর রুকইয়াহ করার পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,
“নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে নির্দেশনা দিয়েছেন মানুষ সেটিই বলবে। তা হলো:
اللَّهُمَّ رَبَّ النَّاسِ أَذْهِبِ الْبَأْسَ، وَاشْفِ أَنْتَ الشَّافِي، لاَ شِفَاءَ إِلاَّ شِفَاؤُكَ
بِاسْمِ اللهِ أَرْقِي نَفْسِي، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِينِي، وَمن شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللهُ يَشْفِينِي
উচ্চারণ: “আল্ল-হুম্মা রব্বান-নাসি আজহিবিল বা’সা, ওয়াশফি আন্তাশ-শাফি, লা শিফায়া ইল্লা শিফাউকা। বিসমিল্লাহি আরক্বী নাফসী, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ’যীনী, ওয়া মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন, আল্লাহু ইয়াশফীনী।
অর্থ: “আল্লাহর নামে আমি নিজের ওপর ঝাড়ফুঁক করছি এমন প্রতিটি বিষয় থেকে যা আমাকে কষ্ট দেয়; আর প্রতিটি প্রাণীর অনিষ্ট কিংবা হিংসুক চোখের মন্দ দৃষ্টি থেকে। আল্লাহ আমাকে শিফা দান করুন।
হে মানুষের প্রতিপালক! আপনি কষ্ট দূর করে দিন এবং আরোগ্য দান করুন। আপনিই আরোগ্য দানকারী, আপনার শিফা ছাড়া আর কোনও শিফা নেই।” [সহিহ বুখারি ও মুসলিম]
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন অসুস্থতা অনুভব করতেন তখন ঘুমানোর সময় নিজের দুই হাতের তালুতে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস (তিনবার) পড়ে ফুঁ দিতেন। এরপর উভয় হাত দিয়ে তাঁর মাথা, মুখমণ্ডল এবং শরীরের যতটুকু অংশে সম্ভব হাত বুলিয়ে নিতেন—এভাবে তিনি তিনবার করতেন।” [মাজমু ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত শাইখ ইবনে বাজ (৮/৩৪৫)]
আরও কিছু করণীয়:
✪ পাশাপাশি ঘরে নিয়মিত সুরা বাকারা তিলাওয়াত করবেন। নিজে সম্ভব না হলে অন্তত অডিও ছেড়ে রাখবেন। তবে নিজে তেলাওয়াত করা অধিক উত্তম।
✪ রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ
“সুরা বাকারা তিলাওয়াত করলে শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায়।” [সহিহ মুসলিম: ৭৮০]]
✪ জিন ভয় দেখানোর চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু মনে রাখবেন, আল্লাহর জিকিরের সামনে শয়তানের চক্রান্ত অত্যন্ত দুর্বল। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বোত্তম সুরক্ষা দানকারী।
✪ সবসময় ওজু অবস্থায় থাকার চেষ্টা করা এবং সকাল-সন্ধ্যার মাসনুন দোয়াগুলো নিয়মিত পড়া।
✪ বাড়ি থেকে বের হওয়ার, বাড়িতে প্রবেশ, টয়লেট, ঘুমানো, স্বামী-স্ত্রী মিলন ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে হাদিস সম্মত দুআ ও জিকিরগুলো পাঠ করা।
✪ বেশি বেশি দরুদ ও ইস্তিগফার পড়া।
✪ ঘরে কোনও প্রাণীর ছবি বা কুসংস্কারমূলক কিছু থাকলে তা সরিয়ে ফেলা। কারণ এগুলো রহমতের ফেরেশতা আসার পথে বাধা সৃষ্টি করে।
আল্লাহ তাআলা তাকে এবং তার সন্তানকে দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা এবং নিরাপত্তা দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদ আরব।

অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাদের ধর্মীয় কিতাব পড়ার বিধান

 প্রশ্ন: এক মুসলিম যুবক অমুসলিম প্রধান একটি দেশে হিজরত করছেন যেখানে হিন্দু ও খ্রিস্টানদের সংখ্যা অনেক। তিনি দ্বীনের জন্য সামান্য কিছু কাজ করার অর্থাৎ তাদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়ার নিয়ত করেছেন। তিনি প্রখ্যাত দাঈদের নিকট শুনেছেন যে, যদি কেউ নিজ ধর্মের ওপর দৃঢ় বিশ্বাসী হয় এবং কাফিরদের সাথে বিতর্ক করতে চায় তবে যেন তাদের কিতাব থেকেই বিতর্ক করে। প্রশ্ন হল—তিনি কি অমুসলিমদের কিতাবগুলো দেখতে পারেন? তাঁর উদ্দেশ্য সেই ধর্ম শেখা নয় বরং সেখানের ভুলগুলো খুঁজে বের করা এবং তারা যে বাতিলের ওপর আছে তা শনাক্ত করা। আলহামদুলিল্লাহ, তিনি নিজের দ্বীনের ওপর অটল এবং এই কিতাবগুলো তাঁর বিশ্বাস পরিবর্তন করতে পারবে না।

উত্তর: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের ওপর। অতপর-
✪ ১. মুসলিম দেশ থেকে অমুসলিম দেশে হিজরত করা জায়েজ নয়। তবে ওই ব্যক্তির জন্য অনুমতি আছে যে, নিজের দ্বীনের আহকামগুলো পালন করতে সক্ষম হবে এবং ফিতনায় পড়ার ভয় থেকে নিরাপদ থাকে। যদিও সব অবস্থাতেই মুসলিমদের মাঝে বসবাস করা উত্তম। কারণ অমুসলিমদের দেশে বসবাস করার মাঝে অনেক ঝুঁকি ও সতর্কতা রয়েছে।
✪ ২. অমুসলিমদের ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়া এবং তাদের ধর্মের অসারতা ও বাতুলতা প্রমাণের উদ্দেশ্যে তাদের ধর্মীয় কিতাব পাঠ করার বিষয়টি শরিয়তসম্মত। তবে এটি কেবল ওই ব্যক্তির জন্য প্রযোজ্য যিনি এ কাজের যোগ্য এবং যার ইলম ও ইমানের কারণে কোনও ধরনের সংশয় বা ফিতনায় পড়ার আশঙ্কা নেই।
◈ সৌদি আরবের ‘ফাতাওয়ায়ে লাজনা দায়িমাহ’ (স্থায়ী ফতোয়া বোর্ড)-এ বলা হয়েছে:
لَا يَجُوزُ لِمُسْلِمٍ أَنْ يَدْرُسَ الْفَلْسَفَةَ وَالْقَوَانِينَ الْوَضْعِيَّةَ وَنَحْوَهُمَا، إِذَا كَانَ لَا يَقْوَى عَلَى تَمْيِيزِ حَقِّهَا مِنْ بَاطِلِهَا؛ خَشْيَةَ الْفِتْنَةِ وَالِانْحِرَافِ عَنِ الصِّرَاطِ الْمُسْتَقِيمِ، وَيَجُوزُ لِمَنْ يَهْضَمُهَا وَيَقْوَى عَلَى فَهْمِهَا بَعْدَ دِرَاسَةِ الْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ، لِيُمَيِّزَ خَبِيثَهَا مِنْ طَيِّبِهَا، وَلِيُحِقَّ الْحَقَّ وَيُبْطِلَ الْبَاطِلَ، مَا لَمْ يَشْغَلْهُ ذَلِكَ عَمَّا هُوَ أَوْجَبُ مِنْهُ شَرْعًا.
“কোনও মুসলিমের জন্য দর্শন বা মানবরচিত আইন ও এই জাতীয় বিষয়গুলো পড়া জায়েজ নয় যদি তার সত্য-মিথ্যা পার্থক্য করার ক্ষমতা না থাকে; যাতে সে ফিতনা বা সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে না পড়ে। তবে যারা কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়নের পর এই বিষয়গুলো বোঝার ও আয়ত্ত করার ক্ষমতা রাখেন, তাদের জন্য এটি জায়েজ—যাতে তারা ভালো ও মন্দের পার্থক্য করতে পারেন এবং সত্যকে প্রতিষ্ঠিত ও মিথ্যাকে বাতিল করতে পারেন। তবে শর্ত হল, এই কাজ যেন তাকে এর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোনও শারঈ দায়িত্ব থেকে বিমুখ না করে।” [ফাতাওয়ায়ে লাজনা দায়িমাহ]
✪ ৩. প্রশ্নকারীর জন্য আমাদের পরামর্শ হল—সরাসরি তাদের কিতাবগুলো না ধরে বরং মুসলিম আলেমদের লেখা ‘তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব’ (Comparative Religion) বিষয়ক বইগুলোর সাহায্য নেওয়া। এতে একদিকে যেমন সংশয় থেকে নিরাপদ থাকা যাবে, তেমনি সময় ও শ্রমের সাশ্রয় হবে এবং অভিজ্ঞ আলেমদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়া সহজ হবে। আল্লাহই ভালো জানেন। ফতোয়া নং: ৩০৬৮৫০ | তারিখ: ২৩ জিলকদ ১৪৩৬ হিজরি (০৬-০৯-২০১৫ ইং)
❑ আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. এর ফতওয়া: অন্য ধর্মের কিতাব পড়ার বিধান-
প্রশ্ন: এই প্রশ্নকারীর শেষ প্রশ্নটি হল— কৌতূহল বশত এবং অন্য ধর্ম সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের কিতাব পড়া কি জায়েজ?
উত্তর: না, এটা উচিত নয়। তাওরাত, ইনজিল বা অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থ পড়া উচিত নয়। কারণ এগুলো পড়লে মনে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি জন্ম নিতে পারে।
রসুলুল্লাহ ﷺ থেকে বর্ণিত আছে, তিনি একবার উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-কে তাওরাতের কিছু অংশ পড়তে দেখে বললেন:
«أَفِي شَكٍّ يَا ابْنَ الْخَطَّابِ؟ لَقَدْ جِئْتُكُمْ بِهَا بَيْضَاءَ نَقِيَّةً، لَوْ كَانَ مُوسَى حَيًّا مَا وَسِعَهُ إِلَّا اتِّبَاعِي»
“হে ইবনুল খাত্তাব! তুমি কি সন্দেহে পড়ে গেছ? আমি তোমাদের কাছে একটি পরিষ্কার ও নির্ভেজাল দ্বীন নিয়ে এসেছি। মুসা (আলাইহিস সালাম) যদি আজ জীবিত থাকতেন তাহলে তাঁর জন্যও আমার অনুসরণ করা ছাড়া কোনও উপায় থাকত না।”
মোটকথা হল, একজন মুসলিমের জন্য তাওরাত, ইনজিল বা অন্য কোনও ধর্মগ্রন্থ পড়া উচিত নয়—তবে যাদের প্রয়োজন আছে তারা ব্যতিক্রম। যেমন: এমন আলেমগণ, যারা ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের তাদের নিজেদের কিতাব থেকেই জবাব দিতে চান। এ ধরনের প্রয়োজনে, যে আলেম তাদের ভুল-ভ্রান্তি খণ্ডন করতে চান এবং তাদের কিতাব থেকেই দলিল দিতে চান, তাঁর জন্য প্রয়োজনের সময় এটি পড়তে কোনও অসুবিধা নেই — তবে এটি কেবল ইলম ও দূরদর্শিতা সম্পন্ন আলেমদের জন্য।” (শাইখ বিন বায রহ.) [binbaz org]
✪ হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন,
بِخِلَافِ الرَّاسِخِ؛ فَيَجُوزُ لَهُ النَّظَرُ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ، وَلَا سِيَّمَا عِنْدَ الِاحْتِيَاجِ إِلَى الرَّدِّ عَلَى الْمُخَالِفِ، وَيَدُلُّ عَلَى ذَلِكَ نَقْلُ الْأَئِمَّةِ قَدِيمًا وَحَدِيثًا مِنَ التَّوْرَاةِ، وَإِلْزَامُهُمُ الْيَهُودَ بِالتَّصْدِيقِ بِمُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِمَا يَسْتَخْرِجُونَهُ مِنْ كِتَابِهِمْ، وَلَوْلَا اعْتِقَادُهُمْ جَوَازَ النَّظَرِ فِيهِ، لَمَا فَعَلُوهُ وَتَوَارَدُوا عَلَيْهِ.
“তবে যার জ্ঞান সুগভীর, তার জন্য তাওরাত ও ইঞ্জিল পাঠ করা জায়েজ। বিশেষ করে যখন বিরোধীদের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইমামগণের তাওরাত থেকে উদ্ধৃতি প্রদান এবং ইহুদিদের কিতাব থেকেই প্রমাণ বের করে তাদেরকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়তের সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য করা—এ বিষয়টিকেই প্রমাণ করে। তারা যদি এটি দেখা বা পাঠ করাকে জায়েজ মনে না করতেন। তবে তারা এমনটি করতেন না এবং এ ব্যাপারে একমত হতেন না।” [ফাতহুল বারী: ১৩/৫২৫-৫২৬]
✪ শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন,
وَإِذَا حَصَلَ مِنْ مَسْلَمَةِ أَهْلِ الْكِتَابِ، الَّذِينَ عَلِمُوا مَا عِنْدَهُمْ بِلُغَتِهِمْ، وَتَرْجَمُوا لَنَا بِالْعَرَبِيَّةِ: انْتُفِعَ بِذَلِكَ فِي مُنَاظَرَتِهِمْ وَمُخَاطَبَتِهِمْ، كَمَا كَانَ عَبْدُ اللهِ بْنُ سَلَامٍ، وَسَلْمَانُ الْفَارِسِيُّ، وَكَعْبُ الْأَحْبَارِ، وَغَيْرُهُمْ، يُحَدِّثُونَ بِمَا عِنْدَهُمْ مِنَ الْعِلْمِ، وَحِينَئِذٍ يُسْتَشْهَدُ بِمَا عِنْدَهُمْ عَلَى مُوَافَقَةِ مَا جَاءَ بِهِ الرَّسُولُ، وَيَكُونُ حُجَّةً عَلَيْهِمْ مِنْ وَجْهٍ، وَعَلَى غَيْرِهِمْ مِنْ وَجْهٍ آخَرَ، كَمَا بَيَّنَّاهُ فِي مَوْضِعِهِ.
“আহলে কিতাবদের মধ্য থেকে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং নিজেদের ভাষায় তাদের কিতাব সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন তারা যখন আমাদের জন্য আরবিতে অনুবাদ করে দেন তখন তাদের সাথে বিতর্ক ও আলোচনায় তা থেকে উপকার গ্রহণ করা যায়। যেমন: আব্দুল্লাহ বিন সালাম, সালমান ফারসি, কাব আল আহবার (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) এবং অন্যান্যরা তাদের কাছে থাকা জ্ঞান থেকে বর্ণনা করতেন। এমতাবস্থায় রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা নিয়ে এসেছেন তার সত্যতার সপক্ষে তাদের কিতাবের উদ্ধৃতি সাক্ষ্য হিসেবে পেশ করা যায়। এটি একদিকে যেমন তাদের বিরুদ্ধে দলিল, তেমনি অন্য দিক থেকে অন্যদের জন্যও দলিল হিসেবে গণ্য হয় যা আমরা সংশ্লিষ্ট স্থানে বিস্তারিত বর্ণনা করেছি।” [মাজমুউল ফাতাওয়া: ৪/১০৯-১১০]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

May 12, 2026

এক নজরে তাওহিদ

 ❑ তাওহিদ কী?

তাওহিদ হলো, আল্লাহকে তাঁর রুবুবিয়্যাত (প্রভুত্ব), উলুহিয়্যাত (ইবাদত-বন্দেগি) এবং নাম ও গুণাবলিতে একক ও অদ্বিতীয় হিসেবে স্বীকার করা।
❑ তাওহিদের গুরুত্ব:
আল্লাহ তাআলা মানুষ ও জিনকে কেবল তাওহিদ বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
“আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” [সূরা যারিয়াত: ৫৬]
এটি দ্বীনের মূল ভিত্তি এবং সকল নবি ও রসুলদের দাওয়াতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
“(হে নবি) তোমার পূর্বে আমি যে রসুলই পাঠিয়েছি তাকে এই মর্মে প্রত্যাদেশ করেছি যে, আমি ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ বা উপাস্য নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো।”
[সূরা আম্বিয়া: ২৫]
❑ তাওহিদের প্রকারভেদ:
তাওহিদ তিন প্রকার। যথা:
◈ ১. তাওহিদুর রুবুবিয়্যাত (توحيد الربوبية):
আল্লাহকে একমাত্র রব অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা, রিজিক দাতা, জীবন-মৃত্যু দাতা এবং মহাবিশ্বের একমাত্র পরিচালক হিসেবে বিশ্বাস করা।
উদাহরণ: একমাত্র আল্লাহই আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাদের একমাত্র অন্নদাতা। একমাত্র তিনি আসমান থেকে বৃষ্টি দান করেন এবং জমিন থেকে ফসল উদ্গত করেন। একমাত্র তিনিই জীবন ও মৃত্যু দান করেন। এই মহাবিশ্বের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা কেবল তাঁর হাতেই রয়েছে…ইত্যাদি।
◈ ২. তাওহিদুল উলুহিয়্যাত (توحيد الألوهية):
বাহ্যিক ভাবে এবং গোপনে তথা চিন্তা-চেতনা এবং মন ও মননে ছোট-বড় সকল প্রকার ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদন করা।
উদাহরণ: একমাত্র আল্লাহর জন্যই নামাজ, রোজা, দুআ, মানত, কুরবানি, সাহায্য প্রার্থনা ইত্যাদি সম্পাদন করা। অনুরূপভাবে মনের সবটুকু আকুতি ও আরাধনা, ভয় ও ভরসা, আশা-আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি কেবল তাঁর নিকট সমর্পণ করা।
◈ ৩. তাওহিদুল আসমা ওয়াস সিফাত (توحيد الأسماء و الصفات):
কুরআন ও সুন্নাহর বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহর সুন্দর নাম ও সুমহান গুণাবলিকে কোনও প্রকার বিকৃতি, অস্বীকার, অপব্যাখ্যা কিংবা সৃষ্টির সাথে তুলনা, সাদৃশ্য বা উপমা বর্ণনা ছাড়াই একমাত্র আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা।
উদাহরণ:
আল্লাহ সর্বশ্রোতা (السَّمِيعُ), সর্বদ্রষ্টা (الْبَصِيرُ) ও পরম দয়ালু (الرحمن), ইত্যাদি গুণবাচক সকল সুন্দর নাম একমাত্র আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করা।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তাআলার সত্তাগতভাবে সৃষ্টি জগতের সর্ব ঊর্ধ্বে অবস্থান, নিচের আসমানে অবতরণ, কথা বলা, আনন্দিত হওয়া, ক্রোধান্বিত হওয়া, তাঁর তার চেহারা, হাত, চোখ ইত্যাদি সিফত বা গুণ-বৈশিষ্ট্যগুলো তাঁর জন্য সাব্যস্ত করা যেভাবে তাঁর সুমহান মর্যাদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। এগুলোকে অস্বীকার, বিকৃতি, অপব্যাখ্যা, রূপক অর্থে গ্রহণ থেকে বা সৃষ্টি জগতের কোনও কিছুর সাথে সাদৃশ্য ও উপমা বর্ণনা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ
“কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”
[সূরা শূরা: ১১]
❑ তাওহিদের রোকন বা স্তম্ভ দুটি:
◈ ১. নাফি (النفي—অস্বীকার করা): ইবাদত-বন্দেগি, সার্বভৌমত্ব, নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে আল্লাহর সাথে কোনও মখলুক বা সৃষ্টির অংশীদারিত্বকে মনে-প্রাণে অস্বীকার করা।
◈ ২. ইসবাত (الإثبات—সাব্যস্ত করা): আল্লাহ নিজের জন্য যে সব কর্ম, নাম ও গুণাবলী সাব্যস্ত করেছেন এবং তাঁর রসুল যা বর্ণনা করেছেন সেগুলো কেবল একমাত্র আল্লাহর জন্যই সাব্যস্ত করা।
তাওহিদের দুটি রোকন রয়েছে, কালিমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর মধ্যে। যেমন:
১) ‘লা ইলাহা’ (নেই কোনও সত্য উপাস্য) এটি হল, নাফি বা অস্বীকৃতি।
২) ‘ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া)। এটি হল, ইসবাত বা সাব্যস্ত করণ।
❑ তাওহিদ বিনষ্টকারী বিষয়: শিরক
◈ ১. শিরকে আকবর বা বড় শিরক: এটি মানুষকে ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ বের করে দেয়।
– উদাহরণ: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে প্রার্থনা করা, মাজারে মানত করা বা কাউকে আল্লাহর মতো ভয় করা বা ভালোবাসা, অলি-আউলিয়া বা নেককার কবর বাসীদের নিকট সন্তান চাওয়া, রোগ-ব্যাধি ও বিপদ মুক্তির জন্য প্রার্থনা করা কিংবা তাদের নিকট মনের ইচ্ছা ও কামনা-বাসনা পূরণের জন্য মানত করা, পশু জবাই করা বা দুআ-আরাধনায় প্রবৃত্ত হওয়া অথবা তাদেরকে ওসিলা বা মাধ্যম মনে করা ইত্যাদি।
– পরিণতি: এর মাধ্যমে একজন মানুষ ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফের ও মুরতাদ হয়ে যায়। তওবা ছাড়া মৃত্যু হলে আখিরাতে চিরতরে জান্নাত হারাম হয়ে যায় এবং চিরস্থায়ী ভাবে জাহান্নাম অবধারিত হয়ে যায়। কেননা তা শিরকে আকবার বা বড় শিরক।
◈ ২. শিরকে আসগর বা ছোট শিরক:
এটি ইসলাম থেকে বের করে না দিলেও তাওহিদকে ক্ষুণ্ণ করে এবং এটি কবিরা গুনাহের থেকেও ভয়াবহ।
– উদাহরণ: মানুষের প্রশংসা বা সুনাম ও সুখ্যাতির মোহে ইবাদত করা (এটাকে রিয়া বলা হয়)।
অথবা ইবাদতের উদ্দেশ্য হওয়া একমাত্র দুনিয়ার স্বার্থ হাসিল করা, আল্লাহর ওপর ভরসার পরিবর্তে কেবল বৈষয়িক উপকরণের ওপর নির্ভর করা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করা, তাবিজ-কবজ ব্যবহার করা ইত্যাদি।
– পরিণতি: যে আমলের মধ্যে এ ধরণের শিরক থাকে সে আমলটি বরবাদ হয়ে যায়। অর্থাৎ এর সওয়াব বাতিল হয়ে যায়।
আখেরাতে এর পরিণতি জাহান্নাম। তবে তা বড় শিরকের মত ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে না, সকল আমলকে বরবাদ করে না এবং স্থায়ীভাবে জাহান্নামকে অবধারিত করে না।
এ বিষয়ে আমাদের সর্বদা সতর্ক থাকা আবশ্যক।
❑ তাওহিদের উপকারিতা (فوائد التوحيد):
১. তাওহিদের ওপর অটল থাকলে আল্লাহর ভালোবাসা ও সন্তুষ্টি অর্জন সহজ হয়।
২. আখেরাতে প্রিয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর শাফায়াত বা সুপারিশ লাভে ধন্য হওয়া যায়।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ
“কিয়ামতের দিন আমার সুপারিশ লাভের মাধ্যমে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান ব্যক্তি হবে সেই, যে ব্যক্তি অন্তরের অন্তরস্থল থেকে একনিষ্ঠভাবে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই) বলবে।”
[সহিহ বুখারি: ৯৯]
৩. তাওহিদ বাস্তবায়নের মাধ্যমেই চির শান্তির নীড় জান্নাতে প্রবেশের নিশ্চয়তা লাভ করা যায়।
আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,
مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ
“যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল যে সে জানত ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।”
[সহীহ মুসলিম: ২৬]
৪. তাওহিদ বাস্তবায়ন করলে মানব জীবনের সকল পাপরাশি মোচন করা হয় তার পরিমাণ যাই হোক না কেন।
এক কথায় তাওহিদের বাস্তবায়নই, দুনিয়া ও আখেরাতে চূড়ান্ত সাফল্যের পথ প্রশস্ত করে।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে একনিষ্ঠ ভাবে তাওহিদ বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন এবং তাওহিদ পরিপন্থী সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

ভালবাসায় শিরক

 ভালবাসায় শিরক


[হাফিজ ইবনুল কায়্যিমের (রহ.) লেখা অবলম্বনে লিখেছেন শায়খ এনামুল হক, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ICD]
বড় (প্রধান) শিরক-কে চার ভাগে ভাগ করা যায়:
প্রথম প্রকার হচেছ “কামনা-প্রার্থনায় শিরক”,
তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আল্লাহ ব্যতীত
অন্য কারও নিকট প্রার্থনা করা ৷ গায়রুল্লাহকে
আনুকূল্য লাভের মাধ্যম, রোগমুক্তির অবলম্বন বা
দুঃসময়ে ত্রাণকর্তা রূপে গণ্য করা ৷
দ্বিতীয় প্রকার হল “নিয়তের ক্ষেত্রে শিরক”,
অর্থাৎ যে কার্যাবলী আদতে দূষণীয় নয়, তথাপি
বিশুদ্ধভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য না হওয়াতে
একান্তভাবে পার্থিব স্বার্থমগ্নতায় দূষণীয় ৷
তৃতীয় প্রকার হল “ভালবাসার ক্ষেত্রে শিরক” –
আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও প্রতি সমতুল্য বা সমধিক
ভালবাসা পোষণ করা ৷ আল্লাহ বলেন:
“আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা
অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে…” (সূরা আল বাক্বারাহ, ২:১৬৫) কোন কোন লোক আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী, প্রতিপালক জেনেও গায়রুল্লাহকে আল্লাহর চেয়ে অধিক ভালবাসে ৷ কতিপয় ব্যক্তি আল্লাহর চেয়ে অর্থকে বেশি ভালবাসে আর এ কারণেই এরা যাকাত আদায়ে বিরত
থাকে বা অনৈতিক পন্থায় অর্থ উপার্জন করে ৷ তারা
দিরহাম বা দিনারের দাস বা বর্তমান প্রেক্ষাপটে
ডলারের খরিদকৃত গোলাম ৷
চতুর্থ প্রকার হল “আনুগত্যের ক্ষেত্রে শিরক”,
যেমন মানব রচিত আইনকে বৈধ বলে মনে করা
যেখানে অনৈতিক বিষয়কে নৈতিক রূপ দান করা হয় ৷
এখানে আমরা তৃতীয় প্রকারের অংশীবাদ নিয়ে
আলোচনা করবো ৷
রাসূল (সা.) বলেন:
“যে দিনার বা দিরহামের দাসত্ব করবে সে
ক্ষতিগ্রস্ত ও ধবংস হবে…” (বুখারী শরীফে
উদ্ধৃত হাদীসের অংশ বিশেষ) কিছু লোক স্বীয়
প্রবৃত্তির তাড়নাকে তাদের রবের চেয়ে অধিক
ভালবাসে ৷ প্রবৃত্তির তাড়নায় গড্ডালিকা প্রবাহে গা
ভাসিয়ে দেয়ার পরিণতিতে আল্লাহর প্রতি অবাধ্যতায়
লিপ্ত হয় ৷ – “তুমি কি তাকে দেখেছ যে তার
প্রবৃত্তিকে ইলাহরূপে গণ্য করেছে?” (সূরা আল
ফুরক্বান, ২৫:৪৩)
সুতরাং আল্লহ এবং তাঁর রাসূলকে সর্বাধিক ভালবাসা হল
ঈমানের মাধুর্য আস্বাদনের পূর্বশর্ত ৷ রাসূলের
(সা.) একটি সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে, “তিনটি
গুণাবলী যার ভেতরে থাকবে সে ঈমানের
তৃপ্তি লাভ করবে: আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি
সর্বাধিক ভালবাসা পোষণ করা, শুধুমাত্র আল্লাহর
জন্যই কাউকে ভালবাসা এবং ঈমান লাভে ধন্য হওয়ার
পর কুফরে প্রত্যাবর্তনকে ঠিক সেভাবে ঘৃণা
করা যেভাবে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে
অপছন্দ করে” (আল বুখারী) ৷ আল্লহ্ দুই
প্রক্রিয়ায় যাচাই করেন তাঁর প্রতি বান্দার ভালবাসা অন্য
সবকিছু অপেক্ষা অধিক কিনা ৷ প্রথম প্রকার হল
রাসূলের (সা.) সুন্নাহর অনুবর্তী হওয়া ৷ আল্লাহ
বলেন,
“(হে মুহাম্মদ) আপনি বলুন, যদি তোমরা
আল্লাহকে ভালবাসো তবে আমার অনুসরণ কর,
তবে আল্লাহ তোমাদের ভালবাসবেন এবং
তোমাদের গুনাহসমূহ মাফ করে দেবেন ৷” (সূরা
আলে ইমরান, ৩:৩১)
অতএব, আমাদের জীবনে সকল ক্ষেত্রে
রাসূলের (সা.) সুন্নাহর অনুসরণ করা একান্ত
বাঞ্ছনীয় ৷
আল্লাহর প্রতি নিখাদ ভালবাসা যাচাইয়ের দ্বিতীয়
প্রকরণ হল জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ ৷ –
“বল, তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা,
তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই,
তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র,
তোমাদের অর্জিত ধন সম্পদ, তোমাদের
ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কর এবং
তোমাদের বাসস্থান যাকে তোমরা পছন্দ কর,
তা আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর পথে জিহাদ করা
থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা কর
আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত আর আল্লাহ ফাসেক
সম্প্রদায়কে হেদায়েত দান করেন না ৷” (সূরা
আত তাওবাহ, ৯:২৪)
চার ধরনের ভালবাসা:
এ প্রসঙ্গে ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন:
চার প্রকারের স্বতন্ত্র ভালবাসা রয়েছে ৷ অনেক
মানুষই ভালবাসার স্বতন্ত্র রূপ সম্পর্কে অবগত না
হওয়ায় সহসাই বিপথগামী হয় ৷ –
প্রথমত: আল্লাহর প্রতি ভালবাসা ৷ কিন্তু শুধু এই
ভালবাসা তার শাস্তি হতে পরিত্রাণ ও রবের সন্তুষ্টি
বিধানের জন্য যথেষ্ট নয় ৷ কারণ মুশরিক, খৃষ্টান,
ইহুদী এবং অন্যান্য ধর্মের সকলেই আল্লাহকে
ভালবাসে ৷
দ্বিতীয়ত: আল্লাহ যা কিছু ভালবাসেন, তা ভালবাসা ৷
এই ভালবাসা ব্যক্তিকে কুফরের গন্ডী থেকে
বের করে ইসলামের ছায়াতলে নিয়ে আসে ৷
যে ব্যক্তি এই দ্বিতীয় প্রকার ভালবাসার ক্ষেত্রে
সর্বাধিক সত্যাশ্রয়ী, সঠিক ও অনুগত সেই আল্লাহর
সবচেয়ে অধিক প্রিয়ভাজন ৷
তৃতীয়ত: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তেই
কোনকিছুকে ভালবাসা ৷ এটা মূলত আল্লাহ যা
ভালবাসেন তা ভালবাসারও একটা অপরিহার্য শর্ত ৷
আল্লাহ যা ভালবাসেন তাই স্বীয় ভালবাসা রূপে গণ্য
করা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গতা লাভ করবে না,
যতক্ষণ বিশুদ্ধভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তা না
করা হবে ৷
চতুর্থত: আল্লাহ ছাড়াও অন্য কিছু সমান্তরালভাবে
ভালবাসা এবং এই ভালবাসা অনেকক্ষেত্রে
শিরকের সাথে সংশ্লিষ্ট ৷ আল্লাহর সন্তুষ্টি
ভ্রুক্ষেপ না করে অন্য কিছুর প্রতি যুগপৎ ভালবাসা
তাঁর প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বী দাঁড় করানোর সমতুল্য ৷ এই
ধরনের ভালবাসা মুশরিকদের বৈশিষ্ট্য ৷
আরও একপ্রকার ভালবাসা রয়েছে যা আলোচনার
বিষয়বস্তু বহির্ভূত ৷ তা হচ্ছে প্রাকৃতিক ভালবাসা –
প্রাকৃতিক স্বাচছন্দ্যের প্রতি ব্যক্তির সহজাত স্বাভাবিক
ঝোঁক-প্রবণতা ৷ উদাহরণ: তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির পানির
প্রতি, ক্ষুৎপীড়িতের খাদ্যের প্রতি টান অনুভব কিংবা
স্বতঃর্স্ফূত নিদ্রার প্রবণতা বা আপন স্ত্রী-সন্তানের
প্রতি ভালবাসা ৷ এই ভালবাসা ততক্ষণ পর্যন্ত নিষ্কলুষ,
যতক্ষণ ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি স্মরণ ও ভালবাসা হতে
বিচ্যুত না হয় ৷ আল্লাহ বলেন,
“মুমিনগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি
যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে
গাফেল না করে…”। (সূরা আল মুনাফিকুন, ৬৩:৯)
“এমন লোকেরা যাদেরকে ব্যবসা- বাণিজ্য ও
ক্রয়- বিক্রয় আল্লাহর স্মরণ থেকে, নামায
কায়েম করা থেকে এবং যাকাত আদায় করা
থেকে বিরত রাখে না…” (সূরা আন-নূর, ২৪:৩৭)
ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন:
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালবাসা এবং আল্লাহ ছাড়াও
অন্য কিছুর প্রতি যুগপৎ ভালবাসা – এই দু’টোর মধ্যে
পার্থক্য বেশ স্পষ্ট ও গুরম্নত্বপূর্ণ ৷
প্রত্যেকেই এই পার্থক্য নিরূপণে দায়বদ্ধ,
একান্তভাবে বাধ্য ৷ আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে
ভালবাসা ঈমানের পূর্ণাঙ্গতার পরিচায়ক, অন্যথায় যুগপৎ
ভালবাসা শিরকের উদ্ভাবক ৷
উক্ত দ্বিবিধ ভালবাসার মাঝে পার্থক্য হল আল্লাহর
সন্তুষ্টির নিমিত্তে ভালবাসা আল্লাহর প্রতি ভালবাসার
সাথে নিবিড় ভাবে সম্পর্কযুক্ত ৷ আল্লাহর প্রতি
ভালবাসা হৃদয়ে গভীরভাবে প্রোথিত হলে তা
তাকে উদ্বুদ্ধ ও চালিত করবে আল্লাহ যা ভালবাসেন
তা ভালবাসতে – তখন এই ভালবাসাই হয় আল্লাহর
সন্তুষ্টি বিধানকারী ভালবাসা ৷ এমতাবস্থায় ঐ ব্যক্তি
ভালবাসে নবী, রাসূল, ফেরেশতা ও নিকটবর্তী
সৎকমশীলদের, যেহেতু আল্লাহ তাঁদের
ভালবাসেন ৷ আর ঘৃণা করে ঐ সব ব্যক্তিদের যারা
নবী, রাসূল ও সৎকর্মশীলদের ঘৃণা/অবজ্ঞা
করে, যেহেতু আল্লাহ ঐ সকল ব্যক্তিদের
ভালবাসেন না ৷ আল্লাহর জন্য ভালবাসা এবং ঘৃণার একটা
নিদর্শন হচ্ছে আল্লাহ যাকে ঘৃণা করেন [যেমন
কোন অবিশ্বাসী] সে মুমিন ব্যক্তির প্রতি সদ্ভাব
প্রকাশ বা সামান্য উপকার বা কিছু প্রয়োজন পূরণ
করলেই, তার প্রতি মুমিন ব্যক্তির ঘৃণাভাব তিরোহিত
হয়ে ভালবাসায় রূপান্তরিত হবে না ৷ তদ্রূপ আল্লাহ
যাকে ভালবাসেন [যেমন কোন মু’মিন], সে যদি
অজ্ঞাতসারে ভুলবশত বা সবিস্তারে তাকে বিব্রত বা
আহত করে, সেক্ষেত্রেও ঐ ব্যক্তির প্রতি তার
ভালবাসা চট করে ঘৃণায় বদলে যাবে না ৷ হতে পারে
যে, সে তা আনুগত্যে ও কর্তব্যজ্ঞানে
করেছে বা অন্য কোন কারণে হয়ে থাকবে ৷
অধিকন্তু সেই কাজকে ভুল বা অনৈতিক বলে গণ্য
করে ভবিষ্যতে সে হয়তো অনুতপ্ত হয়ে ফিরে
আসবে ৷
পুরো ধর্ম চারটি বিষয়কে কেন্দ্র করে
আবর্তিত: ভালবাসা, ঘৃণা এবং এতদুভয় হতে উদ্ভূত
কর্ম সম্পাদন ও পরিহার ৷ যে ব্যক্তির উপরোক্ত
চারটি বিষয় – ভালবাসা, ঘৃণা, কর্ম সম্পাদন ও পরিহার
আল্লাহর জন্যই নিবেদিত হয়, সে ঈমানের
পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে ৷ অর্থাৎ তখন সে তাই ভালবাসে
যা আল্লাহ ভালবাসেন, আল্লাহ যা ঘৃণা করেন তাই সে
ঘৃণা করে এবং আল্লাহ নির্দেশ মোতাবেক কর্ম
সম্পাদন ও পরিত্যাগের সীমা মেনে চলে ৷
উপরোক্ত চারটি ক্ষেত্রে যার যতখানি ঘাটতি দেখা
যাবে তার ঈমান ও ধর্মের প্রতি সংশ্লিষ্টতা ততই লঘু
বলে পরিগণিত হবে ৷
আল্লাহ ছাড়াও অন্য কিছুর প্রতি যুগপৎ ভালবাসা
দু’ধরনের, তন্মধ্যে একপ্রকার তাওহীদের
মূলনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত তথা শিরক ৷ অন্য প্রকার
ব্যক্তিকে ইসলাম হতে খারিজ করে দেয় না তবে
তা কতর্ব্যনিষ্ঠা ও আন্তরিকতার পূর্ণাঙ্গতা অর্জনের
পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় ৷
প্রথম প্রকারের উদাহরণ হল দেবতা ও মূর্তির প্রতি
মুশরিকদের ভালবাসা ৷ আল্লাহ বলেন,
“আর কোন লোক এমনও রয়েছে যারা
অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ গণ্য করে এবং
তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে,
যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে…” (সূরা
আল বাক্বারাহ, ২:১৬৫)
মুশরিকেরা আল্লাহর পাশাপাশি দেবদেবী ও
মূর্তিদের সমপরিমাণ ভালবাসে ৷ এই ভালবাসা এবং
শ্রদ্ধার সাথে যোগ হয় ভয়, আশা, উপাসনা এবং
প্রার্থনা ৷ এ ধরনের ভালবাসা স্পষ্টত শিরক যা
আল্লাহর নিকট ক্ষমার অযোগ্য ৷ কোন ব্যক্তির
ঈমান পূর্ণ হবে না, যতক্ষণ সে এই মূর্তিগুলোকে
শত্রুজ্ঞান করে তীব্র ঘৃণাবোধ না করবে এবং
মূর্তি উপাসকদের উপাসনাকে ঘৃণাকরত তাদের
সংশোধনের চেষ্টায় নিয়োজিত না হবে ৷ এই বাণী
প্রচারের উদ্দেশ্যেই আল্লাহ সকল নবীদের
প্রেরণ করেছিলেন ৷ তাদের উপরে সকল
আসমানী কিতাব নাযিল করেছিলেন ৷ মুশরিকদের
জন্য আল্লাহ জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন – যারা
তাঁর সমকক্ষ দাঁড় করায় ৷ আর জান্নাত তাদের জন্য
নির্ধারিত, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্তে মুশরিকদের
শত্রুজ্ঞান করে তাদের বিরুদ্ধে চেষ্টা-সংগ্রাম
অব্যাহত রাখে ৷ কেউ যদি আরশ হতে নিয়ে
পৃথিবীর গহীন অভ্যন্তরে আল্লাহ ব্যতীত
কোন কিছুকে সাহায্যকারী রূপে গণ্য করে
উপাসনা করে, তবে চরম প্রয়োজন মুহূর্ত শেষ
বিচার দিবসে সে তার কল্পিত উপাস্য দ্বারা প্রত্যাখ্যাত,
অস্বীকৃত হবে ৷
দ্বিতীয় প্রকারের ভালবাসা যা আল্লাহ মানুষের নিকট
আকর্ষণীয় করেছেন যেমন স্ত্রী, সন্তান,
স্বর্ণ, রৌপ্য, চিহ্নিত সুদৃশ্য অশ্ব [এখনকার দিনে
দামী গাড়ী], গৃহপালিত পশু এবং উর্বর কর্ষিত জমি –
এ সবের প্রতি মানুষের ভালবাসা আকাংঙ্খাতুল্য যেমন
খাবারের প্রতি ক্ষুধার্তের এবং পানির প্রতি
তৃষ্ণার্তের আকাংঙ্খা ৷ এই ভালবাসাকে আবার তিনভাবে
বিশ্লেষণ করা যায় ৷
কেউ যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়্যতে আনুগত্য
স্বরূপ উপরোক্ত ভালবাসা পোষণ করে, তবে তা
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের মাধ্যমে পরিণত
হয় এবং এর বিনিময়ে সে উত্তম প্রতিদান লাভ করবে
যদিও সে স্বাচছন্দ্যের উপকরণের মাঝে
উপভোগ খুঁজে পায় ৷ এ কারণেই আমরা দেখতে
পাই যে, সৃষ্টির সেরা রাসূল (সা.)-এঁর নিকট স্ত্রী ও
সুগন্ধী পার্থিব জীবনে প্রিয় ছিল, এ ভালবাসা
তাঁকে আল্লাহকে অধিক ভালবাসতে এবং তাঁর বাণী
প্রচারে ও আদেশ পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত করতে
সহায়তা করে ৷
যদি কোন ব্যক্তি প্রকৃতি ও আকাংঙ্খা হেতু উপর্যুক্ত
বিষয় সমূহ ভালবাসে, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের
উপরে অগ্রাধিকার না দিয়ে, কেবল ঝোঁক-
প্রবণতার বশবর্তী হয় – সেক্ষেত্রে তার জন্য
ব্যাপারটা বৈধ হবে, শাস্তিযোগ্য হবে না ৷ তবে
আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ভালবাসা অর্জনে কিছুটা ঘাটতি
রয়ে যাবে ৷
আর উপরোক্ত পার্থিব সুখ স্বাচছন্দ্য অর্জনই যদি
জীবনের মূল উপজীব্য হয় এবং তা আল্লাহর
ভালবাসার উপরে তা স্থান পায়, তবে সে অবশ্যই
গুনাহে লিপ্ত হয়, নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করার
মাধ্যমে ৷
পার্থিব উপকরণের প্রতি ভালবাসা পোষণকারীদের
ভেতর উপরোক্ত প্রথম দল হচেছ আল সাবিকুন
(ইসলামে আনুগত্যে সর্বপ্রথম ), দ্বিতীয় দল
আল-মুক্বতাসিদুন (যারা গড়পড়তায় মধ্যম), তৃতীয় দল
আল-জালিমুন (গুনাহগার)৷

Translate