April 13, 2026

বিভিন্ন তামাকজাত দ্রব্য সেবনের বিধান বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া সহ

 বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দা, শীশা, হুক্কা ইত্যাদি সেবনের বিধান (বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়া সহ):

প্রশ্ন: বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দা, শীশা, হুক্কা ইত্যাদি গ্রহণের বিধান কী?
উত্তর: আমাদের সমাজে ধূমপানের বিভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে, যেমন: বিড়ি, সিগারেট, শীশা, হুক্কা ইত্যাদি। অনুরূপভাবে মানুষ বিভিন্নভাবে গুল, জর্দা ও তামাক সেবন করে থাকে। এগুলো সবই ক্ষতিকর ও নেশাজাতীয় বস্তুর অন্তর্ভুক্ত। নিম্নে এসব বস্তুর ক্ষতিকর দিক সমূত তুলে ধরার পর কুরআন-সুন্নাহ দলিল ও বিজ্ঞ আলেমদের ফতওয়ার আলোকে এ বিষয়টি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল:
❑ ধূমপানের ক্ষতিকর দিক সমূহ:
বৈজ্ঞানিকভাবে এগুলো মানবদেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক হিসেবে প্রমাণিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, একবার শীশা সেবন করলে তা প্রায় ২০০টি সিগারেট পানের সমান ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের মতে ”ধূমপান মানে বিষপান।” —এ কথাটি সম্পূর্ণ সত্য। কারণ তামাকের ধোঁয়ায় থাকা ক্ষতিকর উপাদান ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, এবং শ্বাসকষ্টের (COPD) মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে। এটি শরীরের প্রায় প্রতিটি অঙ্গের ক্ষতি করে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমায় এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়, যা Better Health Channel ও Cleveland Clinic এর মতো স্বাস্থ্যবিষয়ক সাইটগুলো নিশ্চিত করেছে।
❑ ধূমপানের ফলে সৃষ্ট প্রধান শারীরিক সমস্যা ও রোগসমূহ:
✦ ক্যানসার: ফুসফুস, মুখ, গলা, খাদ্যনালী, অগ্ন্যাশয়, মূত্রাশয় এবং কিডনিসহ শরীরের প্রায় সব অঙ্গের ক্যানসারের মূল কারণ ধূমপান।
✦ শ্বাসতন্ত্রের রোগ: ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এবং এমফিসেমা (COPD), যক্ষ্মা, এবং হাঁপানি বা অ্যাজমা।
✦ হৃদরোগ ও রক্ত সঞ্চালন: হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ, এবং রক্তনালীতে ব্লক।
✦ ডায়াবেটিস: টাইপ ২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বৃদ্ধি।
✦ অন্যান্য সমস্যা: চোখের সমস্যা (ছানি, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া), দাঁত ও মাড়ির রোগ, হাড় ক্ষয় (অস্টিওপোরোসিস), এবং প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস।
✦ পরোক্ষ ধূমপান (Second-hand smoke): যারা ধূমপান করেন না কিন্তু ধূমপায়ীর আশেপাশে থাকেন, তাদেরও ফুসফুসের ক্যানসার ও হৃদরোগের ঝুঁকি থাকে।
ধূমপান ত্যাগ করলে এই মারাত্মক রোগগুলোর ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায় এবং শরীর সুস্থ হতে শুরু করে।
❑ যে সব কারণে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য হারাম:
ইসলামে ধূমপান ও সকল প্রকার নেশাজাতীয় দ্রব্য হারাম। কারণ
১. ধূমপান মানে বিষপান। এটি মানুষের শরীরে নানা ধরণের রোগব্যাধী সৃষ্টি করে। সুতরাং ধূমপান মানে নিজেকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
“আর তোমরা নিজেদেরকে নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।” [সূরা বাকারা: ১৯৫]
২. অন্যের ক্ষতির কারণ। কারণ যারা ধূমপান করেন না কিন্তু ধূমপায়ীর আশেপাশে থাকেন, তাদেরও ফুসফুসের ক্যানসার ও হৃদরোগের ঝুঁকি থাকে। রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
“নিজের ক্ষতি করা যাবে না এবং অন্যের ক্ষতিও করা যাবে না।” [মুয়াত্তা মালিক, হাদিসটি সহিহ]
৩. ধূমপান যেভাবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর তেমনি এর উৎকট দুর্গন্ধে মানুষের জন্য কষ্টদায়ক। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا
“যারা ঈমানদার পুরুষ ও নারীদেরকে তাদের কৃত কোনো কাজ ছাড়াই কষ্ট দেয় তারা অবশ্যই অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করে।” [সূরা আহযাব: ৫৮]
৪. অর্থের অপচয়: আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ
“নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” [সূরা ইসরা: ২৭]
৫. অপবিত্র বস্তু সেবন: আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ
“তিনি তাদের জন্য অপবিত্র বস্তুসমূহ হারাম করেন।” [সূরা আরাফ: ১৫৭]
৬. পবিত্র বস্তু গ্রহণের নির্দেশ: আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ
“হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে আহার করো।” [সূরা বাকারা: ১৭২]
৭. নেশাজাতীয় দ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়া: রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,
مَا أَسْكَرَ كثيرُهُ فَقَلِيلُهُ حَرَامٌ
“যে জিনিসের বেশি পরিমাণ নেশা সৃষ্টি করে, তার কম পরিমাণও হারাম।” [তিরমিজি, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ। হাদিসটি সহিহ]
সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.
❑ শীশা ও ধূমপানের বিধান:
✪ প্রশ্ন: শীশা পান করার বিধান কী? এর বিধান কি ধূমপানের মতোই? আর শীশা ধূমপান কি হারাম মাদকদ্রব্যের অন্তর্ভুক্ত?
উত্তর: শীশা এবং সব ধরনের ধূমপান হারামের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এগুলোতে প্রচুর পরিমাণে ক্ষতিকর দিক রয়েছে। অভিজ্ঞ চিকিৎসকগণ এর বহুমুখী ক্ষতির কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। আর আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের জন্য এমন সব বস্তু ব্যবহার করা হারাম করেছেন যা তাদের ক্ষতি করে। তাই যারা এসব গ্রহণ করে, তাদের ওপর ওয়াজিব হলো এগুলো বর্জন করা এবং এ থেকে সতর্ক থাকা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা মায়িদায় তাঁর নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সম্বোধন করে বলেন:
يَسْأَلُونَكَ مَاذَا أُحِلَّ لَهُمْ قُلْ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ
“তারা আপনাকে জিজ্ঞাসা করে যে, তাদের জন্য কী কী বস্তু হালাল করা হয়েছে? আপনি বলে দিন, তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে।” [সূরা মায়িদা: ৪]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূরা আ’রাফে তাঁর নবি মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَآئِثَ
“তিনি তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেন এবং অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তুসমূহ হারাম করেন।” [সূরা আ’রাফ: ১৫৭]
ধূমপানের সকল মাধ্যম এবং শীশা—এগুলো মানুষের জন্য ক্ষতিকর ও অপবিত্র (খবাইস) জিনিসের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং এই দুই আয়াতের নস (সুস্পষ্ট বিধান) এবং এই অর্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অন্যান্য দলিলের ভিত্তিতে এগুলো হারাম।
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন মুসলিমদেরকে তাদের কল্যাণ ও নাজাতের পথে পরিচালিত করেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে যা তাদের ক্ষতি করে তা থেকে রক্ষা করেন। নিশ্চয়ই তিনি উত্তম প্রার্থিত সত্তা।
[সূত্র: ফাতাওয়া ইসলামিয়া, সংকলন: মুহাম্মদ মুসনাদ, খণ্ড: ৩, পৃষ্ঠা: ৪৪৩; মাজমু ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত আশ শাইখ ইবনে বায: ২৩/৫২]
❑ শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.-এর আরেকটি ফতওয়া:
প্রশ্ন: লিবিয়া থেকে মোস্তফা সাওয়াম নামক একজন শ্রোতা জানতে চেয়েছেন, ইসলামে ধূমপানকারীর বিধান কী? এই সমস্যাটি যেহেতু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এ বিষয়ে আমাদের দিকনির্দেশনা দিন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
উত্তর: সব ধরনের ধূমপানই নাজায়েজ। কারণ এতে মারাত্মক ক্ষতি রয়েছে। অনেক আলেম এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা ধূমপানের অসংখ্য ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। তাই এটি নিঃসন্দেহে হারাম। ধূমপান করা, এটি কেনা-বেচা করা বা এর ব্যবসা করা—কোনোটিই বৈধ নয়। ঠিক যেমন মদ্যপান এবং মদের ব্যবসা হারাম, তেমনি ধূমপান, তামাক বা এ জাতীয় ক্ষতিকর বস্তু যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, তা বর্জন করা ওয়াজিব। একজন মুসলিমের উচিত এগুলো থেকে অত্যন্ত সতর্ক থাকা এবং মদের মতোই তা পরিহার করা।
সুতরাং ধূমপান বা তামাকজাতীয় দ্রব্য সেবন করা যেমন নাজায়েজ, তেমনি এগুলোর ব্যবসা করাও হারাম। এসবের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।
[ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব]
❑ ধূমপান করা এবং এর ব্যবসা করা বিষয়ে শাইখ আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.-এর আরেকটি ফতওয়া:
প্রশ্ন: লিবিয়া থেকে মোস্তফা সাওয়াম নামক একজন শ্রোতা জানতে চেয়েছেন, ইসলামে ধূমপানকারীর বিধান কী? এই সমস্যাটি যেহেতু ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। তাই এ বিষয়ে আমাদের দিকনির্দেশনা দিন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
উত্তর:
التَّدْخِينُ بِأَنْوَاعِهِ لَا يَجُوزُ لِمَا فِيهِ مِنَ الْمَضَارِّ الْعَظِيمَةِ، وَقَدْ نَصَّ جَمْعٌ مِنْ أَهْلِ الْعِلْمِ الَّذِينَ أَلَّفُوا فِي ذَلِكَ عَلَى مَضَارِّهِ الْكَثِيرَةِ، وَنَصَّ عَلَيْهَا الْأَطِبَّاءُ الْعَارِفُونَ بِهِ، فَهُوَ مُحَرَّمٌ بِلَا شَكٍّ، وَلَا يَجُوزُ تَعَاطِيهِ، وَلَا بَيْعُهُ، وَلَا شِرَاؤُهُ، وَلَا التِّجَارَةُ فِيهِ، كَالْخَمْرِ كَمَا يَحْرُمُ بَيْعُ الْخَمْرِ وَالتِّجَارَةُ فِيهَا، فَهَكَذَا التَّدْخِينُ وَالْقَاتُ وَأَشْبَاهُهَا مِنَ الْمُضِرَّاتِ بِالْمُسْلِمِينَ وَبِالْعِبَادِ، الْوَاجِبُ الْحَذَرُ مِنْ ذَلِكَ، وَأَلَّا يُتَّجَرَ فِيهَا، وَأَلَّا يَتَعَاطَاهَا الْمُسْلِمُ، بَلْ يَحْذَرُهَا غَايَةَ الْحَذَرِ، كَمَا يَحْذَرُ الْخَمْرَ، وَيَبْتَعِدُ عَنْهَا، وَكَمَا أَنَّهُ لَا يَجُوزُ بَيْعُهَا وَلَا شِرَاؤُهَا وَلَا شُرْبُهَا كَذَا التَّدْخِينُ، وَهَكَذَا الْقَاتُ يَجِبُ الْحَذَرُ مِنْ هَاتَيْنِ الْمَادَّتَيْنِ لِمَا فِيهِمَا مِنَ الْمَضَارِّ الْعَظِيمَةِ.
“সব ধরনের ধূমপানই নাজায়েজ। কারণ এতে মারাত্মক ক্ষতি রয়েছে। অনেক আলেম এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা ধূমপানের অসংখ্য ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। তাই এটি নিঃসন্দেহে হারাম। ধূমপান করা, এটি কেনা-বেচা করা বা এর ব্যবসা করা—কোনোটিই বৈধ নয়। ঠিক যেমন মদ্যপান এবং মদের ব্যবসা হারাম, তেমনি ধূমপান, তামাক বা এ জাতীয় ক্ষতিকর বস্তু যা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তা বর্জন করা ওয়াজিব। একজন মুসলিমের উচিত, এগুলো থেকে অত্যন্ত সতর্ক থাকা এবং মদের মতোই তা পরিহার করা।
সুতরাং ধূমপান বা তামাকজাতীয় দ্রব্য সেবন করা যেমন নাজায়েজ, তেমনি এগুলোর ব্যবসা করাও হারাম। এসবের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বাঁচতে আমাদের অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে।”
[ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব]
✪ জর্দানের সাবেক প্রধান মুফতি ডা. শাইখ নূহ আলি সালমান (রাহ.)
প্রশ্ন: ধূমপান কি হারাম না কি হালাল?
উত্তর: তামাক গাছ পুড়িয়ে যে ধোঁয়া তৈরি হয়—যাকে সিগারেট বা আর্গিলা (শীশা বা হুক্কা) বলা হয়—তা ইচ্ছাকৃতভাবে শ্বাস ও খাবারের সাথে গ্রহণ করা হারাম হওয়ার পেছনে অনেক দলিল রয়েছে। নিচে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:
◈ ১. আল্লাহ তাআলার বাণী:
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوباً عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ
وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ
“যারা অনুসরণ করে এই রসুলের, যিনি উম্মি (নিরক্ষর) নবি, যার সম্পর্কে তারা নিজেদের কাছে রক্ষিত তওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়। তিনি তাদেরকে সৎকাজের নির্দেশ দেন ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করেন আর অপবিত্র ও ক্ষতিকর বস্তুসমূহ (খবাইস) তাদের জন্য হারাম করেন।” [সূরা আ’রাফ: ১৫৭]
নিঃসন্দেহে ধূমপান স্বাদ, গন্ধ এবং শরীরের ওপর এর প্রভাবের দিক থেকে অপবিত্র ও ক্ষতিকর (খবাইস) জিনিসের অন্তর্ভুক্ত; পবিত্র জিনিসের অন্তর্ভুক্ত নয়।
◈ ২. উম্মে সালামাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহা) থেকে বর্ণিত হাদিসে তিনি বলেন:
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم عَنْ كُلِّ مُسْكِرٍ وَمُفَتِّرٍ
“রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রত্যেক নেশাজাতীয় এবং শরীর অবসাদগ্রস্তকারী বস্তু সেবন করতে নিষেধ করেছেন।” [ইমাম আহমদ ও আবু দাউদ। এই হাদিসটিকে সুয়ূতি সহিহ বলেছেন। পক্ষান্তরে শাইখ আলবানি জয়িফ বলেছেন। অনুবাদ]
ধূমপান যে শরীরকে অবসাদগ্রস্ত ও দুর্বল করে দেয়-এ নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই।
◈ ৩. সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ عُقُوقَ الأُمَّهَاتِ، وَوَأْدَ الْبَنَاتِ، وَمَنْعًا وَهَاتِ، وَكَرِهَ لَكُمْ ثَلاَثًا: قِيلَ وَقَالَ، وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ، وَإِضَاعَةَ الْمَالِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা তোমাদের জন্য মায়েদের অবাধ্য হওয়া, কন্যা সন্তানদের জীবন্ত কবর দেওয়া এবং (পরের হক) না দেওয়া ও (নিজের যা প্রাপ্য নয় তা) চাওয়া হারাম করেছেন। আর তিনি তোমাদের জন্য তিনটি বিষয় অপছন্দ করেছেন: অনর্থক কথা বলা, অধিক প্রশ্ন করা এবং সম্পদ অপচয় করা।” [বুখারী ও মুসলিম]
ধূমপানের মাধ্যমে কোনো উপকার ছাড়াই প্রচুর অর্থ অপচয় ও ধ্বংস করা হয়।
◈ ৪. রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
لاَ ضَرَرَ وَلاَ ضِرَارَ
“ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও যাবে না।” [ইমাম আহমদ ও ইবনে মাজাহ-হাসান]
নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যে কোনো ধরনের ক্ষতি করতে নিষেধ করেছেন—তা শারীরিক, আর্থিক বা মানসিক যাই হোক না কেন। ধূমপান এই সবকিছুর জন্যই ক্ষতিকর।
◈ ৫. সহিহ বুখারি ও মুসলিমে জাবির (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
فَإِنَّ الْمَلاَئِكَةَ تَتَأَذَّى مِمَّا يَتَأَذَّى مِنْهُ بَنُو آدَمَ
“নিশ্চয়ই ফেরেশতারা সেই জিনিসে কষ্ট পায়, যা থেকে মানুষ কষ্ট পায়।” [মুসলিম]
অন্য হাদিসে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:
من آذى مسلما فقد آذاني ومن آذاني فقد آذى الله
“যে কোনো মুসলিমকে কষ্ট দিল, সে যেন আমাকেই কষ্ট দিল। আর যে আমাকে কষ্ট দিল, সে যেন আল্লাহকেই কষ্ট দিল।” [তবারানী ফিল আওসাত-হাসান ]
একজন ধূমপায়ী তার দুর্গন্ধের মাধ্যমে মানুষকে কষ্ট দেয় তা ধূমপানের সময় হোক বা পরবর্তী সময়ে।
◈ ৬. যদি কেউ ধূমপানকে কেবল ছোট গুনাহ (সগিরা গুনাহ) মনে করে তবে তার উত্তর হলো—নিচের বিষয়গুলোর কারণে ছোট গুনাহও বড় গুনাহে (কবিরা গুনাহ) পরিণত হয়:
ক. সেই গুনাহের ওপর অটল থাকা বা বারবার করা।
খ. গুনাহকে তুচ্ছ মনে করা এবং অবহেলার সাথে তা করা।
গ. গুনাহ করে আনন্দিত হওয়া।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে ধূমপান হারাম। যে ব্যক্তি এতে লিপ্ত হয়েছে, তার উচিত তা বর্জন করা এবং তওবা করা। নিজের ভুল স্বীকার করলে হয়তো আল্লাহ তওবার তৌফিক দেবেন। নিজের ভুলের সপক্ষে দলিলে প্রমাণিত হারামের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। আমাদের এক ভাই এতে লিপ্ত ছিলেন, তাকে যখনই এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হতো তিনি বলতেন: “এটি হারাম”। পরবর্তীতে আল্লাহ তাকে এটি ছেড়ে দেওয়ার তাওফিক দান করেছেন। [“ফাতাওয়া শাইখ নূহ আলী সালমান” (ফাতাওয়া আত’ইমাহ ওয়ায যাবায়িহ / ফতোয়া নং: ৯)]
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

নেতৃত্বের জন্য কে বেশি উপযুক্ত

নেতৃত্বের জন্য কে বেশি উপযুক্ত? এমন ব্যক্তি যে, দক্ষ ও শক্তিশালী কিন্তু পাপাচারী? নাকি এমন ব্যক্তি যে, সৎ ও আমানতদার কিন্তু অদক্ষ ও দুর্বল?
শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রাহ. বলেন,
(وَاجْتِمَاعُ الْقُوَّةِ وَالْأَمَانَةِ فِي النَّاسِ قَلِيلٌ، وَلِهَذَا كَانَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ يَقُولُ: اللَّهُمَّ أَشْكُو إِلَيْكَ جَلَدَ الْفَاجِرِ وَعَجْزَ الثِّقَةِ. فَالْوَاجِبُ فِي كُلِّ وِلَايَةٍ الْأَصْلَحُ بِحَسَبِهَا؛ فَإِذَا تَعَيَّنَ رَجُلَانِ أَحَدُهُمَا أَعْظَمُ أَمَانَةً وَالْآخَرُ أَعْظَمُ قُوَّةً، قُدِّمَ أَنْفَعُهُمَا لِتِلْكَ الْوِلَايَةِ وَأَقَلُّهُمَا ضَرَرًا فِيهَا؛ فَيُقَدَّمُ فِي إِمَارَةِ الْحُرُوبِ الرَّجُلُ الْقَوِيُّ الشُّجَاعُ وَإِنْ كَانَ فِيهِ فُجُورٌ عَلَى الرَّجُلِ الضَّعِيفِ الْعَاجِزِ وَإِنْ كَانَ أَمِينًا، كَمَا سُئِلَ الْإِمَامُ أَحْمَدُ عَنِ الرَّجُلَيْنِ يَكُونَانِ أَمِيرَيْنِ فِي الْغَزْوِ، وَأَحَدُهُمَا قَوِيٌّ فَاجِرٌ وَالْآخَرُ صَالِحٌ ضَعِيفٌ، مَعَ أَيِّهِمَا يُغْزَى؟ فَقَالَ: أَمَّا الْفَاجِرُ الْقَوِيُّ فَقُوَّتُهُ لِلْمُسْلِمِينَ وَفُجُورُهُ عَلَى نَفْسِهِ، وَأَمَّا الصَّالِحُ الضَّعِيفُ فَصَلَاحُهُ لِنَفْسِهِ وَضَعْفُهُ عَلَى الْمُسْلِمِينَ، فَيُغْزَى مَعَ الْقَوِيِّ الْفَاجِرِ. وَقَدْ قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: إِنَّ اللهَ يُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ. وَرُوِيَ: بِأَقْوَامٍ لَا خَلَاقَ لَهُمْ. وَإِنْ لَمْ يَكُنْ فَاجِرًا كَانَ أَوْلَى بِإِمَارَةِ الْحَرْبِ مِمَّنْ هُوَ أَصْلَحُ مِنْهُ فِي الدِّينِ إِذَا لَمْ يَسُدَّ مَسَدَّهُ).
“মানুষের মধ্যে শক্তি (দক্ষতা) ও আমানতদারিতার (সততা) সমন্বয় খুব কমই দেখা যায়। এজন্যই ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলতেন:
اللَّهُمَّ أَشْكُو إِلَيْكَ جَلَدَ الْفَاجِرِ وَعَجْزَ الثِّقَةِ
‘হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে পাপাচারী ব্যক্তির কর্মতৎপরতা এবং বিশ্বাসভাজন (সৎ) ব্যক্তির অক্ষমতা ও দুর্বলতা থেকে পানাহ চাই।’
সুতরাং নিয়ম হলো—প্রত্যেক পদের জন্য ঐ পদের প্রকৃতি অনুযায়ী যে সবচেয়ে বেশি যোগ্য তাকেই নিয়োগ দেওয়া। যদি কোনো পদের জন্য এমন দুজন ব্যক্তি সামনে আসে যাদের মধ্যে একজন অত্যন্ত আমানতদার কিন্তু দুর্বল। আর অন্যজন অত্যন্ত শক্তিশালী ও দক্ষ কিন্তু পাপাচারী। তবে তাদের মধ্যে যে ঐ পদের জন্য বেশি উপকারী এবং যার দ্বারা ক্ষতির সম্ভাবনা কম তাকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে। যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে একজন শক্তিশালী ও সাহসী ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে যদিও তার মধ্যে কিছু ব্যক্তিগত পাপাচার থাকে। এর বিপরীতে একজন সৎ কিন্তু দুর্বল ব্যক্তিকে সেখানে নিয়োগ দেওয়া হবে না। যেমন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহিমাহুল্লাহ)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: ‘যুদ্ধে সেনাপতি হওয়ার মতো দুজন ব্যক্তি আছেন। একজন শক্তিশালী কিন্তু পাপাচারী, অন্যজন নেককার কিন্তু দুর্বল। কার নেতৃত্বে যুদ্ধ করা হবে?’
তিনি উত্তর দিয়েছিলেন: ‘পাপাচারী শক্তিশালী ব্যক্তির শক্তি ও দক্ষতা মুসলিমদের উপকারে আসবে আর তার পাপের দায়ভার একান্তই তার নিজের। অন্যদিকে নেককার দুর্বল ব্যক্তির নেক আমল তার নিজের জন্য। কিন্তু তার দুর্বলতার কুফল ভোগ করতে হবে পুরো মুসলিম বাহিনীকে। তাই শক্তিশালী পাপাচারীর নেতৃত্বেই যুদ্ধ করা হবে।’
কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
إنَّ اللهَ يُؤَيِّدُ هَذَا الدِّينَ بِالرَّجُلِ الْفَاجِرِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ এই দ্বীনকে পাপাচারী লোক দ্বারাও সাহায্য করেন।” [সহিহ বুখারি: ৩০৬২]
অন্য বর্ণনায় এসেছে:
إنَّ اللهَ ليُؤيِّدُ هذا الدِّينَ بقومٍ لا خلاقَ لهم
“নিশ্চয়ই আল্লাহ এই দ্বীনকে এমন জাতি দ্বারা (সাহায্য করেন) যাদের পরকালে কোনো অংশ নেই।” [সুনানে নাসায়ি: ৩০৯১, ইরাকি তার ‘তাখরিজ এহিয়া উলুমিদ্দিন’ গ্রন্থে বলেন, إسناده جيد ”এর সনদ ভালো।]
যদি সেই শক্তিশালী ব্যক্তি পাপাচারী না হয়ে সৎ হতেন তবে তিনিই যুদ্ধের নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হতেন। কিন্তু যদি এমন কাউকে পাওয়া না যায় তবে যুদ্ধের ময়দানে কেবল দ্বীনদারির খাতিরে একজন অদক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার চেয়ে দক্ষ ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়াই উত্তম।” [মাজমুউল ফাতাওয়া, খণ্ড: ২৮, পৃষ্ঠা: ২৫৪]
উৎস: মাওসুআতুল আখলাকিল ইসলামিয়্যাহ (ইসলামি নীতি-নৈতিকতার বিশ্বকোষ)
মোটকথা, ইসলামি নীতি অনুসারে, নিখুঁত নেতা হলেন তিনি যিনি সৎ, আমানতদার, দক্ষ এবং শক্তিশালী। তবে যদি এই দুইটি গুণ একসাথে পাওয়া না যায় তবে জাতির নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা এবং বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষা করার লক্ষ্যে ‘শক্তিশালী কিন্তু পাপাচারী’ ব্যক্তিকে নির্বাচন করা যেতে পারে যতক্ষণ না তার পাপাচার জাতির মৌলিক ধর্ম বা স্বার্থকে ধ্বংস করে দেয়। কারণ তার ব্যক্তিগত পাপ আল্লাহর কাছে জবাবদিহির বিষয়। কিন্তু তার ক্ষমতা দিয়ে তিনি জাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেন। অন্যদিকে, একজন সৎ কিন্তু দুর্বল নেতার অধীনে জাতির ক্ষতি অনেক বেশি হতে পারে। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনা: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।

জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব। 

খ্রিস্টানদের ইস্টার সানডে

 খ্রিস্টানদের ইস্টার সানডে কী? ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভ্রষ্টতার জবাব এবং খ্রিস্টান ও অন্যান্য অমুসলিমদের উৎসবে অংশগ্রহণের বিধান:

✪ ইস্টার সানডে (Easter Sunday) কী?
শাব্দিক অর্থে ‘ইস্টার’ হলো বসন্ত বা ঊষার দেবীর নাম থেকে আসা শব্দ আর ‘সানডে’ হলো রবিবার। অর্থাৎ “বসন্তকালীন রবিবারের পুনরুত্থান উৎসব”। খ্রিষ্টানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, যিশু খ্রিষ্টকে (ইসা আ.) ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করার তিন দিন পর তিনি অলৌকিকভাবে পুনরায় জীবিত হয়ে উঠেছিলেন। এই পুনরুত্থান দিবসটিকেই তারা ‘ইস্টার সানডে’ হিসেবে পালন করে। এটি তাদের কাছে পাপের বিরুদ্ধে জয় ও নতুন জীবনের প্রতীক।
✪ কখন পালন করা হয়?
প্রতি বছর ২১শে মার্চের পর যখন প্রথম পূর্ণিমা হয়। তার পরবর্তী রবিবার ইস্টার সানডে পালিত হয়। এই নিয়ম অনুযায়ী, ইস্টার সাধারণত ২২শে মার্চ থেকে ২৫শে এপ্রিলের মধ্যে যেকোনো একটি রবিবারে পড়ে।
❑ ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এই দিবসের ভ্রষ্টতা এবং তার জবাব:
ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী, ইস্টার সানডে মূল ভিত্তিটি কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এর প্রধান কারণগুলো নিচে দেওয়া হলো:
✪ ১. ইসা (আ.)-এর মৃত্যু ও ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দাবি খণ্ডন:
ইস্টার পালিত হয় ইসা (আ.)-এর মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকে কেন্দ্র করে। কিন্তু কুরআন স্পষ্ট জানিয়েছে যে তাঁকে হত্যা বা ক্রুশবিদ্ধ করাই হয়নি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا قَتَلُوهُ وَمَا صَلَبُوهُ وَلَٰكِن شُبِّهَ لَهُمْ ۚ
“অথচ তারা তাকে হত্যা করেনি এবং ক্রুশবিদ্ধও করেনি; বরং তাদের জন্য (এক ব্যক্তিকে) তাঁর সদৃশ করা হয়েছিল।” [সূরা নিসা: ১৫৭]
✪ ২. তাঁকে সশরীরে আসমানে তুলে নেওয়া:
ইস্টারের বিশ্বাসের বিপরীতে ইসলাম বলে যে, আল্লাহ তাঁকে জীবিত অবস্থায় আসমানে তুলে নিয়েছেন।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
بَل رَّفَعَهُ اللَّهُ إِلَيْهِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمًا
“বরং আল্লাহ তাকে নিজের দিকে তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা নিসা: ১৫৮]
তবে ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, ইসা (আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম) কেয়ামতের পূর্বে বিশ্বব্যাপী চরম অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলতাময় পরিবেশে আল্লাহর হুকুমে পৃথিবীতে পুনগমন করবেন এবং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদর্শের আলোকে বিশ্বব্যাপী ইসলামি শাসন ব্যবস্থা ও শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করবেন এবং ন্যায়-ইনসাফ ভিত্তিক বিশ্ব গড়ে তুলবেন। পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ফিতনা বাজ দজ্জাল কে ধ্বংস করবেন।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ইরশাদ করেছেন,
لَيَنْزِلَنَّ ابْنُ مَرْيَمَ حَكَمًا عَدْلاً…”
“অবশ্যই ইবনে মরিয়ম (ইসা আলাইহিস সালাম) একজন ন্যায়বিচারক শাসক হিসেবে অবতীর্ণ হবেন…।” [সহীহ বুখারি]
✪ ৩. আল্লাহর সন্তান ও অংশীদারিত্বের প্রতিবাদ:
ইস্টারের আকিদায় যিশুকে ‘ঈশ্বরের পুত্র’ (নাউযুবিল্লাহ) মনে করা হয়, যা ইসলামের তৌহিদ বা একত্ববাদের পরিপন্থী। মহান আল্লাহ বলেন,
لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ * وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ
“তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং কেউ তাঁকে জন্ম দেয়নি। এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।” [সূরা ইখলাস: ৩-৪]
✪ ৪. অন্যের পাপের বোঝা বহন না করা:
খ্রিষ্টানদের ধারণা যিশু মানুষের ‘আদি পাপের’ প্রায়শ্চিত্ত করতে জীবন দিয়েছেন। ইসলাম এই ধারণা প্রত্যাখ্যান করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ
“কোনও বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝার ভার বহন করবে না।” [সূরা আনআম: ১৬৪]
✪ ৫. বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণ:
ধর্মীয় বিষয়ে অন্য জাতির স্বতন্ত্র ইবাদত বা আকিদাগত উৎসব পালন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُم
“যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।” [সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ৪০৩১]
সংক্ষেপে: ইসলামের দৃষ্টিতে ইস্টার সানডে একটি ভিত্তিহীন বিশ্বাস। যেহেতু ইসা (আ.) ক্রুশে মৃত্যুবরণই করেননি। তাই তাঁর পুনরুত্থানের বিষয়টি অবান্তর। একজন মুসলিমের জন্য ইসা (আ.)-কে আল্লাহর বান্দা ও রসুল হিসেবে বিশ্বাস করা অপরিহার্য কিন্তু তাঁর সাথে সম্পৃক্ত এই ধরণের বিজাতীয় ও আকিদা বিরোধী উৎসবে অংশ নেওয়া বা বিশ্বাস করা বৈধ নয়।
❑ খ্রিস্টান ও অন্যান্য অমুসলিমদের উৎসবে অংশগ্রহণের বিধান:
প্রশ্ন: জনৈক ভাই বলছেন: লক্ষ্য করা যায় যে, কিছু সংখ্যক মুসলমান খ্রিস্টানদের সাথে তাদের বড়দিন বা ‘ক্রিসমাস’-এ অংশগ্রহণ করে। এ বিষয়ে আপনার দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করছি।
উত্তর:
لَا يَجُوزُ لِلْمُسْلِمِ وَلَا لِلْمُسْلِمَةِ مُشَارَكَةُ النَّصَارَى أَوِ الْيَهُودِ أَوْ غَيْرِهِمْ مِنَ الْكُفَّارِ فِي أَعْيَادِهِمْ، بَلْ يَجِبُ تَرْكُ ذَلِكَ؛ لِأَنَّ (مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ)، وَالرَّسُولُ ﷺ حَذَّرَنَا مِنْ مُشَابَهَتِهِمْ وَالتَّخَلُّقِ بِأَخْلَاقِهِمْ.
فَعَلَى الْمُؤْمِنِ وَعَلَى الْمُؤْمِنَةِ الْحَذَرُ مِنْ ذَلِكَ، وَأَلَّا يُسَاعِدَ فِي إِقَامَةِ هَذِهِ الْأَعْيَادِ بِأَيِّ شَيْءٍ؛ لِأَنَّهَا أَعْيَادٌ مُخَالِفَةٌ لِشَرْعِ اللَّهِ، وَيُقِيمُهَا أَعْدَاءُ اللَّهِ، فَلَا يَجُوزُ الِاشْتِرَاكُ فِيهَا وَلَا التَّعَاوُنُ مَعَ أَهْلِهَا وَلَا مُسَاعَدَتُهُمْ بِأَيِّ شَيْءٍ، لَا بِالشَّايِ وَلَا بِالْقَهْوَةِ وَلَا بِأَيِّ شَيْءٍ مِنَ الْأُمُورِ كَالْأَوَانِي وَنَحْوِهَا.
وَأَيْضًا يَقُولُ اللَّهُ سُبْحَانَهُ: وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ [المائدة: 2].
فَالْمُشَارَكَةُ مَعَ الْكُفَّارِ فِي أَعْيَادِهِمْ نَوْعٌ مِنَ التَّعَاوُنِ عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ، فَالْوَاجِبُ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ وَعَلَى كُلِّ مُسْلِمَةٍ تَرْكُ ذَلِكَ، وَلَا يَنْبَغِي لِلْعَاقِلِ أَنْ يَغْتَرَّ بِالنَّاسِ فِي أَفْعَالِهِمْ، الْوَاجِبُ أَنْ يَنْظُرَ فِي الشَّرْعِ الْإِسْلَامِيِّ وَمَا جَاءَ بِهِ، وَأَنْ يَمْتَثِلَ أَمْرَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ، وَأَنْ لَا يَنْظُرَ إِلَى أُمُورِ النَّاسِ، فَإِنَّ أَكْثَرَ الْخَلْقِ لَا يُبَالِي بِمَا شَرَعَ اللَّهُ، كَمَا قَالَ اللَّهُ  فِي كِتَابِهِ الْعَظِيمِ: وَإِنْ تُطِعْ أَكْثَرَ مَنْ فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ [الأنعام: 116]، قَالَ سُبْحَانَهُ: وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ [يوسف: 103].
فَالْعَوَائِدُ الْمُخَالِفَةُ لِلشَّرْعِ لَا يَجُوزُ الْأَخْذُ بِهَا وَإِنْ فَعَلَهَا النَّاسُ.
وَالْمُؤْمِنُ يَزِنُ أَفْعَالَهُ وَأَقْوَالَهُ وَيَزِنُ أَفْعَالَ النَّاسِ وَأَقْوَالَ النَّاسِ بِالْكِتَابِ وَالسُّنَّةِ، بِكِتَابِ اللَّهِ وَسُنَّةِ رَسُولِهِ عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ، فَمَا وَافَقَهُمَا أَوْ أَحَدَهُمَا فَهُوَ الْمَقْبُولُ وَإِنْ تَرَكَهُ النَّاسُ، وَمَا خَالَفَهُمَا أَوْ أَحَدَهُمَا فَهُوَ الْمَرْدُودُ وَإِنْ فَعَلَهُ النَّاسُ، رَزَقَ اللَّهُ الْجَمِيعَ التَّوْفِيقَ وَالْهِدَايَةَ.
কোনো মুসলিম পুরুষ বা নারীর জন্য খ্রিস্টান, ইহুদি বা অন্য কোনো কাফিরদের ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়; বরং তা বর্জন করা ওয়াজিব। কারণ, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা এবং তাদের স্বভাব-চরিত্রে প্রভাবিত হওয়া থেকে সতর্ক করেছেন। হাদিসে এসেছে:
مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ
“যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবে।” [সহিহ আবু দাউদ-আলবানি, হাদিস নং ৪০৩১]
অতএব, মুমিন পুরুষ ও নারীদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত। এসব উৎসব উদযাপনে কোনোভাবেই সহযোগিতা করা যাবে না। কারণ এগুলো আল্লাহর শরিয়ত বিরোধী উৎসব এবং আল্লাহর শত্রুরা তা পালন করে। সুতরাং এতে অংশ নেওয়া, তাদের সাথে একাত্ম হওয়া বা কোনো প্রকার সাহায্য—যেমন চা, কফি বা থালাবাসন দিয়ে সহযোগিতা করাও জায়েজ নয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরও বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা নেকি ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো এবং গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।” [সূরা মায়িদা: ২]
কাফিরদের উৎসবে অংশগ্রহণ করা এক ধরনের গুনাহ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা করা। সুতরাং প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর কর্তব্য হলো এটি ত্যাগ করা। কোনো বুদ্ধিমান ব্যক্তির উচিত নয় মানুষের কাজ দেখে বিভ্রান্ত হওয়া। বরং কর্তব্য হলো, ইসলামি শরিয়ত ও এর বিধিবিধানের দিকে তাকানো এবং আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদেশ পালন করা। অধিকাংশ মানুষ কী করছে সেদিকে তাকানো যাবে না। কারণ অধিকাংশ মানুষই আল্লাহর শরিয়তের পরোয়া করে না। যেমনটি মহান আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন:
وَإِن تُطِعْ أَكْثَرَ مَن فِي الْأَرْضِ يُضِلُّوكَ عَن سَبِيلِ اللَّهِ
“আর যদি আপনি জমিনের অধিকাংশ মানুষের আনুগত্য করেন তবে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।” [সূরা আনআম: ১১৬]
তিনি আরও বলেন:
وَمَا أَكْثَرُ النَّاسِ وَلَوْ حَرَصْتَ بِمُؤْمِنِينَ
“আপনি যতই চান না কেন, অধিকাংশ মানুষই ইমান আনয়নকারী নয়।” [সূরা ইউসুফ: ১০৩]
অতএব, শরিয়ত বিরোধী কোনো প্রথা বা অভ্যাস গ্রহণ করা জায়েজ নয় যদিও মানুষ তা ব্যাপকভাবে করে থাকে। একজন মুমিন তার নিজের এবং মানুষের কথা ও কাজকে কুরআন এবং সুন্নাহর মানদণ্ডে পরিমাপ করবে। যা এই দুটির (বা যেকোনো একটির) অনুকূলে হবে তা গ্রহণ করা হবে—চাই মানুষ তা বর্জন করুক না কেন। আর যা এই দুটির পরিপন্থী হবে তা বর্জনীয়—চাই মানুষ তা পালন করুক না কেন। আল্লাহ সকলকে সঠিক পথ ও হিদায়েত দান করুন। আমিন। আল্লাহ সবচেয়ে জ্ঞানী।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
ফতওয়া প্রদানে: ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. (সাবেক প্রধান মুফতি, সৌদি আরব)।
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

ইসলামের দৃষ্টিতে ভ্যাক্সিন বা টিকা গ্রহণ করার বিধান

 প্রশ্ন: অনেক মানুষ রোগ প্রতিরোধক ভ্যাক্সিন গ্রহণ করাকে পশ্চিমাদের ষড়যন্ত্র মনে করে থাকেন। এটি কতটুকু সঠিক? কোনো ঔষধ বা ভ্যাক্সিনে ক্ষতিকর উপাদান আছে বলে প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও এমন অভিযোগ তোলা কি সংগত?

উত্তর: রোগ-ব্যাধির আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য আগাম ভ্যাক্সিন বা টিকা গ্রহণ করা জায়েজ। এতে শরিয়তের কোনো বাধা নেই। বরং রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে রোগ হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা অধিক উত্তম। (prevention is better than cure) কোনো বিপর্যয় ঘটার পর তার ক্ষয়ক্ষতি সামলানোর চেয়ে তা থেকে বাঁচার জন্য আগাম সতর্কতা অবলম্বন করা যে শ্রেয়—এ বিষয়ে কোনো বিবেকবান মানুষের দ্বিমত থাকার কথা নয়। আমরা এই শিক্ষা স্বয়ং রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর জীবন থেকে লাভ করি। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে:
عَامِرِ بْنِ سَعْدِ بْنِ أَبِي وَقَّاصٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ ‏ “‏ مَنْ تَصَبَّحَ سَبْعَ تَمَرَاتِ عَجْوَةٍ مْ يَضُرُّهُ ذَلِكَ الْيَوْمَ سَمٌّ وَلاَ سِحْرٌ ‏”
“যে ব্যক্তি সকালে সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন বিষ এবং যাদু তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।” [সহীহ বুখারী ও মুসলিম]। এই হাদিস এ তিনি আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া তিনি সকাল-সন্ধ্যা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এর পর এবং ঘুমানোর পূর্বে বিভিন্ন দোয়া ও জিকির শিক্ষা দিয়েছেন, যেন মানুষ জিন-শয়তান, যাদু এবং বদনজর থেকে রক্ষা পায়। এগুলোও মূলত আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এমনকি রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুদ্ধে যাওয়ার পূর্বে শিরস্ত্রাণ ও বর্ম পরিধান করতেন যেন শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়। এটি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার আগাম প্রস্তুতি। সীরাত বা নববী জীবনী অধ্যয়ন করলে আমরা এমন শত শত উদাহরণ খুঁজে পাব, যেখানে তিনি অসুখ-বিসুখ, দুর্ঘটনা ও বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা দিয়েছেন। সুতরাং যারা টিকা গ্রহণ করাকে তাকওয়া (আল্লাহভীতি), তাওয়াককুল (আল্লাহর ওপর ভরসা) কিংবা সবরের পরিপন্থী মনে করেন অথবা স্রেফ ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করেন তারা মূলত ভুলের মধ্যে আছেন। তারা ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী বুঝতে সক্ষম হননি।
রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেছেন:
مَا أَنْزَلَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ دَاءً، إِلَّا أَنْزَلَ لَهُ دَوَاءً، عَلِمَهُ مَنْ عَلِمَهُ، وَجَهِلَهُ مَنْ جَهِلَهُ
“আল্লাহ তাআলা এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি যার প্রতিষেধক তিনি সৃষ্টি করেননি। কেউ তা জানতে পেরেছে, আবার কেউ জানে না।” [মুসনাদ আহমাদ; ইমাম আলবানী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন]। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন সৃষ্টিজগতের শ্রেষ্ঠ মুত্তাকী ও তাওয়াককুলকারী। অথচ তিনি নিজে অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিয়েছেন, অন্যদের উৎসাহিত করেছেন এবং আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে উম্মতকে হাতে-কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। তবে হ্যাঁ, যদি নির্দিষ্ট কোনো ঔষধ বা ভ্যাক্সিন সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত, বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে এটি প্রমাণিত হয় যে, তা শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর—তবে তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। কারণ, জেনে-বুঝে নিজের ধ্বংস বা ক্ষতি ডেকে আনা ইসলামে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মসজিদে চেয়ারে বসে সালাত আদায় করলে কাতারের মধ্যে চেয়ার রাখার সঠিক নিয়ম

 সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য এবং সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল, তাঁর পরিবারবর্গ এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীদের ওপর। অতঃপর━যে ব্যক্তি চেয়ারে বসে সালাত আদায় করেন তাকে সালাতের কাতার সোজা ও সুসংগত রাখার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে, যেন অন্য মুসল্লিদের কষ্ট না হয়। যদি তিনি কাতার সমান রাখতে পুরোপুরি সক্ষম না হন তবে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কারণ তিনি অক্ষম হিসেবে ওজরগ্রস্ত।

আল্লাহ তাআলা বলেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“তোমরা আল্লাহকে যথাসাধ্য ভয় করো।” [আত-তাগাবুন: ১৬]
তিনি আরও বলেন:
لاَ يُكَلِّفُ اللّهُ نَفْسًا إِلاَّ وُسْعَهَا
“আল্লাহ কারো ওপর তার সাধ্যের বাইরে কোনো বোঝা চাপিয়ে দেন না।” [বাকারা: ২৮৬]
চেয়ার এমনভাবে রাখা উচিত নয় যাতে পেছনের মুসল্লিদের কষ্ট হয়। কারণ এতে অন্যের ক্ষতি হয় এবং এর কোনো প্রয়োজনও নেই। আসলে বসে সালাত আদায়কারীর পা দাঁড়ানো মুসল্লিদের পায়ের সমান্তরালে থাকা জরুরি নয়। বরং বসা অবস্থায় তার নিতম্বই পায়ের স্থলাভিষিক্ত হবে। তাই সঠিক নিয়ম হলো, চেয়ারের পেছনের দুই পা কাতারের লাইনের ওপর রাখা। এর ফলে বসা অবস্থায় মুসল্লি অন্যদের চেয়ে কিছুটা সামনে এগিয়ে থাকলেও সেটিই সঠিক পদ্ধতি, যদি তিনি পুরো সালাত বসেই আদায় করেন। আর যদি তিনি দাঁড়িয়ে সালাত শুরু করেন এবং কেবল বসা ও সিজদার সময় চেয়ার ব্যবহার করেন তবে সেটির সমাধান ফাতাওয়া নম্বর ১০৭৯০০-তে দেওয়া হয়েছে। যদি এতে অন্য মুসল্লিদের সমস্যা হয় তবে তিনি কাতারের এক প্রান্তে দাঁড়াতে পারেন।
❑ চেয়ারে বসে সালাত আদায়ের বিষয়ে ‘লাজনা দায়িমা’ (সৌদি আরব ফাতাওয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি)-এর ফাতাওয়াতে বলা হয়েছে:
الْمَرِيضُ يُصَلِّي عَلَى حَسَبِ اسْتِطَاعَتِهِ، قَائِمًا أَوْ قَاعِدًا أَوْ عَلَى جَنْبٍ، أَوْ مُسْتَلْقِيًا وَرِجْلَاهُ إِلَى الْقِبْلَةِ، وَيُومِئُ بِرُكُوعِهِ وَسُجُودِهِ، وَيَجْعَلُ سُجُودَهُ أَخْفَضَ مِنْ رُكُوعِهِ، وَلَا بَأْسَ أَنْ يُصَلِّيَ عَلَى الْكُرْسِيِّ إِذَا شَقَّ عَلَيْهِ الْجُلُوسُ عَلَى الْأَرْضِ، وَلَا بَأْسَ أَنْ يُوضَعَ فِي الصَّفِّ الْأَوَّلِ، وَلَا يُؤَثِّرُ ذَلِكَ عَلَى اتِّصَالِ الصَّفِّ، وَيَنْبَغِي لِإِخْوَانِهِ الْمُسْلِمِينَ أَنْ يَرْفُقُوا بِهِ وَيَفْسَحُوا لَهُ الْمَكَانَ الْمُنَاسِبَ، وَإِذَا لَمْ يَجِدْ مَكَانًا مُنَاسِبًا فَلْيَكُنْ فِي طَرَفِ الصَّفِّ دَفْعًا لِلشِّقَاقِ. اِنْتَهَى
“অসুস্থ ব্যক্তি তার সামর্থ্য অনুযায়ী দাঁড়িয়ে, বসে, কাত হয়ে কিংবা কিবলার দিকে পা দিয়ে শুয়ে সালাত আদায় করবেন। তিনি রুকু ও সিজদার জন্য ইশারা করবেন এবং সিজদার ইশারা রুকুর চেয়ে বেশি নিচু করবেন। জমিনে বসতে কষ্ট হলে চেয়ারে বসে সালাত আদায়ে কোনো বাধা নেই। চেয়ার প্রথম কাতারে রাখলেও কাতারের ধারাবাহিকতায় কোনো সমস্যা হয় না।
অন্য মুসলিম ভাইদের উচিত, তার প্রতি সহমর্মিতা দেখানো এবং তার জন্য উপযুক্ত জায়গা করে দেওয়া। যদি তিনি উপযুক্ত জায়গা না পান তবে বিবাদ এড়াতে কাতারের এক প্রান্তে দাঁড়াবেন।”
❑ লাজনা দায়িমার অন্য একটি ফাতাওয়াতে এক প্রশ্নের জবাবে বলা হয়েছে (প্রশ্নটি ছিল: জনৈক ব্যক্তি তাশাহহুদ এবং দুই সিজদাহর মাঝে বসতে পারেন না বলে চেয়ার ব্যবহার করেন):
جُلُوسُكَ عَلَى الْكُرْسِيِّ حَالَ التَّشَهُّدِ وَبَيْنَ السَّجْدَتَيْنِ لَا حَرَجَ فِيهِ؛ لِلْعُذْرِ الْمَذْكُورِ. وَبِاللهِ التَّوْفِيقُ، وَصَلَّى اللهُ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَصَحْبِهِ. انْتَهَى।
“আপনার ওজরের কারণে তাশাহহুদ ও দুই সিজদাহর মাঝখানের বৈঠকে চেয়ার ব্যবহার করায় কোনো দোষ নেই।” আল্লাহর কাছেই তাওফিক কাম্য এবং আমাদের নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর পরিবারবর্গ ও সঙ্গী-সাথীদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক।” (উৎস: ইসলাম ওয়েব)।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব।

Translate