April 21, 2025

সময় ও স্থানভেদে ফাতওয়া কি পরিবর্তিত হতে পারে

 প্রশ্ন: সময় ও স্থানভেদে ফাতওয়া কি পরিবর্তিত হতে পারে? কুরআন ও সহিহ হাদিসে কি এর কোনো প্রমাণ আছে? দয়া করে আমাদের এ বিষয়ে জানান।

▬▬▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর-সময় ও স্থানভেদে ফাতওয়া পরিবর্তিত হওয়া নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক:
.
(১).সর্বপ্রথম আমাদের এটি বুঝতে হবে যে, নিশ্চয়ই কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে নির্ধারিত ইসলামী শরীয়তের বিধানসমূহ চিরন্তন ও অপরিবর্তনীয়। সময়, যুগ,পরিবেশ স্থান ও কালের পরিবর্তন যেমনই হোক না কেন, মদপান, ব্যভিচার, সুদগ্রহণ, পিতামাতার অবাধ্যতা ইত্যাদি কখনো বৈধ হতে পারে না। কেননা, এসব বিধান আল্লাহ তাআলার ওহির মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত হয়েছে এবং ইসলামী শরিয়ত ইতোমধ্যেই পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। মহান আল্লাহ বলেছেন:اَلۡیَوۡمَ اَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِیۡنَكُمۡ وَ اَتۡمَمۡتُ عَلَیۡكُمۡ نِعۡمَتِیۡ আজ তোমাদের জন্য তোমাদের ধর্ম (ইসলাম) পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম..”(সূরা মায়েদাহ: ৩) দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দেবার অর্থই হচ্ছে এর মধ্যে জীবনের সমস্ত প্রশ্নের নীতিগত ও বিস্তারিত জবাব এখানে রয়েছে। হেদায়াত ও পথনির্দেশ লাভ করার জন্য এখন আর কোনো অবস্থায়ই তার বাইরে যাবার প্রয়োজন নাই। সুতরাং এ নবীর পরে কোনো নবী নেই। এ শরীআতের পরে কোন শরীআত নেই। এ শরীআতে যা যা নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে সত্য ও ইনসাফপূর্ণ। আল্লাহ বলেন, “সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে আপনার রব-এর বাণী পরিপূর্ণ। তার বাক্য পরিবর্তন করার কেউ নেই।”(সূরা আল-আন’আম: ১১৫)
.
(২).কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি এই নীতির ভুল ব্যাখ্যা করে শরিয়তের সুস্পষ্ট দলিল দ্বারা সাব্যস্ত বিধানগুলোতে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করে। তারা ইসলামকে নমনীয় করার নামে এমন বিষয়েও ছাড় দিতে চায়, যার উপর ধর্মীয় বিশেষজ্ঞগণ প্রাচীনকাল থেকেই (ইজমা) একমত আছেন। কিন্তু তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে মূলত “ফাতওয়ার” পরিবর্তন সম্পর্কে বলা হয়েছে, “শরিয়তের স্থায়ী বিধান” সম্পর্কে নয়। এই দুইয়ের মধ্যে বিশাল পার্থক্য রয়েছে। প্রথমটি তথা ফাতওয়া এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে ইজতিহাদের সুযোগ থাকে এবং বাস্তবতার নিরিখে কিছু পরিবর্তন সম্ভব হয়। তাই, যুগ ও পরিবেশভেদে ফাতওয়া ভিন্ন হতে পারে, তবে ইসলামের মৌলিক বিধান কখনো পরিবর্তন হবে না।
.
সৌদি আরবের প্রথম গ্র্যান্ড মুফতি, ইমাম মুহাম্মাদ বিন ইবরাহীম আলুশ শাইখ (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৩৮৯ হি.] বলেন:
وحكم الله ورسوله لا يختلف في ذاته باختلاف الأزمان ، وتطور الأحوال ، وتجدد الحوادث ؛ فإنه ما من قضية ، كائنة ما كانت ، إلا وحكمها في كتاب الله تعالى ، وسنَّة رسوله صلى الله عليه وسلم ، نصّاً أو ظاهراً أو استنباطاً أو غير ذلك ، علِم ذلك مَن علمهُ ، وجهله من جهله ، وليس معنى ما ذكره العلماء من ” تغير الفتوى بتغير الأحوال ” : ما ظنه من قَلَّ نصيبهم – أو عُدم – من معرفة مدارك الأحكام وعِلَلها ، حيث ظنوا أن معنى ذلك بحسب ما يلائم إراداتهم الشهوانية البهيمية ، وأغراضهم الدنيوية ، وتصوراتهم الخاطئة الوبية ، ولهذا تجدهم يحامون عليها ، ويجعلون النصوص تابعة لها ، منقادة إليها ، مهما أمكنهم ، فيحرفون لذلك الكلِم عن مواضعه ، وحينئذ معنى ” تغير الفتوى بتغير الأحوال والأزمان ” : مراد العلماء منه : ما كان مستصْحَبة فيه الأصول الشرعية ، والعلل المرعية ، والمصالح التي جنسها مراد لله تعالى ، ورسوله صلى الله عليه وسلم .
“আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ)-এর বিধান কোনো যুগের পরিবর্তনে বা নতুন কোনো ঘটনার আবির্ভাবে অথবা পরিস্থিতি জটিলতার কারণে নিজ মূলনীতি থেকে বিচ্যুত হয় না। প্রতিটি বিষয়ের বিধান কুরআন ও সুন্নাহতে কোনো না কোনোভাবে বিদ্যমান তা সরাসরি হোক, সুস্পষ্ট ইঙ্গিতে হোক, অথবা বিশ্লেষণ ও গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারিত হোক। কেউ এ জ্ঞান অর্জন করলে তা উপলব্ধি করতে পারে, আর যে তা জানে না, সে অজ্ঞতার মধ্যেই থেকে যায়। তবে কিছু লোক, যারা শরিয়তের গভীর জ্ঞান রাখে না বা একেবারেই জানে না, তারা মনে করে যে, “ফতোয়ার পরিবর্তন পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ঘটে” মানে হলো, শরিয়তের বিধানকে তাদের ব্যক্তিগত প্রবৃত্তি ও ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে। তারা ধর্মকে তাদের দুনিয়াবি স্বার্থ ও ভুল ধারণার সাথে মানানসই করতে চাই এবং কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্যকে ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করতে চাই। তারা যতটা সম্ভব ধর্মের বক্তব্যকে নিজেদের মত অনুযায়ী টেনে নেয়, ফলে তারা আল্লাহর বাণীকে তার যথাযথ স্থান থেকে সরিয়ে দেয়। সুতরাং, “ফতোয়ার পরিবর্তন স্থান ও কালের ভিন্নতার কারণে হয়” এই কথার প্রকৃত অর্থ হলো, এটি কেবল তখনই গ্রহণযোগ্য যখন তা শরিয়তের মূলনীতি, যথাযথ কারণ ও ইসলামের স্বীকৃত কল্যাণমূলক উদ্দেশ্যগুলোর ভিত্তিতে করা হয় যেসব কল্যাণমূলক উদ্দেশ্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর দ্বারা নির্ধারিত।”(শাইখ মুহাম্মাদ ইবনে ইবরাহীমের ফতোয়া সংকলন”খণ্ড: ১২; পৃষ্ঠা: ২৮৮-২৮৯) ।
.
(৩).ওহী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত শরয়ী বিধানগুলোর পরিবর্তন সম্ভব বলে দাবি করা মূলত দ্বীনকে বিকৃত করার নামান্তর। এটি আল্লাহর বিধানকে পরিবর্তন করার দরজা খুলে দেয় এবং নবী করিম (ﷺ)-এর মৃত্যুর পর যেখানে শরিয়তের বিধান পূর্ণতা পেয়েছে, সেখানে নতুন করে ‘নাসখ’ (রহিতকরণ) এর ধারণাকে বৈধতা দেওয়ার শামিল। এটা মনে রাখা জরুরি যে ইজমা (সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত) নিজেও শরিয়তের সুস্পষ্ট কোনো বিধানকে রদ করতে পারে না, যদি না তা কুরআন-সুন্নাহর সুদৃঢ় দলিলের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাস্তবে এমনটি ঘটেনি। সুতরাং এ ধরনের মতবাদ গ্রহণ করা আসলে শরিয়তকে নিজ খেয়াল-খুশির মত পরিবর্তন করার অপচেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়।
.
হিজরী ৮ম শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শাইখুল ইসলাম ইমাম তাক্বিউদ্দীন আবুল ‘আব্বাস আহমাদ বিন ‘আব্দুল হালীম বিন তাইমিয়্যাহ আল-হার্রানী আন-নুমাইরি, (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭২৮ হি.] বলেন:
وكنا نتأول كلام هؤلاء على أن مرادهم أن ” الإجماع ” يدل على نص ناسخ ، فوجدنا من ذُكر عنهم : أنهم يجعلون الإجماع نفسه ناسخاً ! فإن كانوا أرادوا ذلك : فهذا قول يجوِّز تبديل المسلمين دينَهم بعد نبيِّهم ، كما تقول النصارى مِن : أن المسيح سوَّغ لعلمائهم أن يحرِّموا ما رأوا تحريمه مصلحة ، ويحلوا ما رأوا تحليله مصلحة ، وليس هذا دين المسلمين ، ولا كان الصحابة يسوِّغون ذلك لأنفسهم ، ومَن اعتقد في الصحابة أنهم كانوا يستحلون ذلك : فإنه يستتاب ، كما يستتاب أمثاله ، ولكن يجوز أن يجتهد الحاكم ، والمفتي ، فيصيب ، فيكون له أجران ، ويخطئ ، فيكون له أجر واحد .
“আমরা প্রথমে ধারণা করেছিলাম যে এসব লোক যখন “ইজমা” (ঐক্যমত্য) সম্পর্কে কথা বলে তখন তারা বোঝাতে চায় যে, এটি কোন পূর্ববর্তী বিধানকে রহিত করার জন্য কুরআন বা সুন্নাহর কোনো স্পষ্ট দলিলের ইঙ্গিত বহন করে। কিন্তু পরে আমরা দেখলাম যে তারা আসলে “ইজমা”কেই সরাসরি পূর্ববর্তী বিধান বাতিলকারী (নাসিখ) হিসেবে গ্রহণ করে! যদি তারা সত্যিই এ কথা বলে থাকে তাহলে এটি এমন এক মতবাদ, যা মুসলমানদের জন্য তাদের নবী (ﷺ)-এর পরে দ্বীন পরিবর্তন করার সুযোগ সৃষ্টি করে, ঠিক যেমন খ্রিস্টানরা বিশ্বাস করে যে, ঈসা (আ.) তাদের ধর্মীয় পণ্ডিতদের এমন ক্ষমতা দিয়েছেন যে, তারা যখন যা কল্যাণকর মনে করবে, তা বৈধ বা নিষিদ্ধ করতে পারবে। কিন্তু এটা মুসলমানদের ধর্ম নয়! সাহাবিরাও কখনো এ ধরনের ক্ষমতা নিজেদের জন্য বৈধ মনে করেননি।যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, সাহাবিরা তাদের ইচ্ছামতো বিধান পরিবর্তন করতেন, তাকে অবশ্যই তওবা করতে বলা হবে, ঠিক যেমন এ ধরনের অন্যদেরও তওবা করতে বলা হয়। তবে, বিচারক ও মুজতাহিদ ইজতিহাদের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন যদি তারা সঠিক হন, তবে দ্বিগুণ সওয়াব পাবেন; আর যদি ভুল করেন, তবে অন্তত এক সওয়াব পাবেন।”[মাজমু আল-ফাতাওয়া, খণ্ড: ৩৩; পৃষ্ঠা: ৯৪] এটি ইসলামী শরিয়তের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈশিষ্ট্য ও তার চূড়ান্ত বিধানের একটি অনন্য দিক।
.
ইমাম আশ-শাতিবি (রাহিমাহুল্লাহ) শরিয়তের চূড়ান্ত বিধানের বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন:الثبوت من غير زوال ، فلذلك لا تجد فيها بعد كمالها نسخاً ، ولا تخصيصاً لعمومها ، ولا تقييداً لإطلاقها ، ولا رفعاً لحكم من أحكامها ، لا بحسب عموم المكلفين ، ولا بحسب خصوص بعضهم ، ولا بحسب زمان دون زمان ، ولا حال دون حال ، بل ما أثبت سبباً : فهو سبب أبداً لا يرتفع ، وما كان شرطاً : فهو أبداً شرط ، وما كان واجباً : فهو واجب أبداً ، أو مندوباً : فمندوب ، وهكذا جميع الأحكام ، فلا زوال لها ، ولا تبدل ، ولو فُرض بقاء التكليف إلى غير نهاية : لكانت أحكامها كذلك “শরিয়তের বিধান স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়। একবার পরিপূর্ণ হওয়ার পর এতে আর কোনো রহিতকরণ (নাসখ), সাধারণ বিধানের কোনো বিশেষীকরণ (তাখসিস), মুক্ত বিধানের কোনো সীমাবদ্ধতা (তাকইদ) বা কোনো বিধান বাতিল হওয়া সম্ভব নয়। তা কোন নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য হোক, কোন নির্দিষ্ট জাতির জন্য হোক কিংবা কোন নির্দিষ্ট সময় বা অবস্থার জন্য হোক সব ক্ষেত্রেই এটি চিরস্থায়ী। যা কোন বিষয়ে কারণ হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে, তা চিরকাল কারণই থাকবে; যা কোন বিষয়ে শর্ত হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে, তা চিরকাল শর্তই থাকবে। যা কোন সময়ে বাধ্যতামূলক (ওয়াজিব) ছিল, তা চিরকাল ওয়াজিব থাকবে; যা সুপারিশকৃত (মুস্তাহাব) ছিল, তা চিরকাল মুস্তাহাব থাকবে। শরিয়তের সব বিধান এমনই স্থায়ী, কোনো পরিবর্তন বা বিলোপের সুযোগ নেই। যদি কল্পনা করা হয় যে, মানুষের ওপর চিরকাল শরিয়তের দায়িত্ব (তাকলিফ) থাকবে, তবে শরিয়তের বিধানও সেই একইভাবে চিরকাল অপরিবর্তিত থাকবে।”(আল-মাওয়াফাকাত, খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ১০৯-১১০)
.
(৪).এই বক্তব্যের মূলত দুটি দিক রয়েছে:
.
(ক) পরিবর্তন কেবল ফাতওয়ার ক্ষেত্রে হয়, কিন্তু দলিল দ্বারা সাব্যস্ত শরিয়তের বিধানে কোনো পরিবর্তন আসে না।
.
(খ) ফাতওয়ার এই পরিবর্তনের মূল কারণ হলো সময়, স্থান ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রীতি ও সংস্কৃতির পার্থক্য।
.
আশ-শাইখ, আল-‘আল্লামাহ, আল-মুহাদ্দিস, আল-মুফাসসির, আল-ফাক্বীহ,আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়্যা,(রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ৭৫১ হি.] এই দু’টি বিষয় তার বক্তব্যে চমৎকারভাবে বলেছেন: “ফতোয়ার পরিবর্তন ও ভিন্নতা সময়, স্থান,পরিস্থিতি, উদ্দেশ্য এবং প্রথাগত রীতির পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে।” তিনি তাঁর মূল্যবান গ্রন্থ “ই’লামুল মুওয়াক্কিইন”৩/৩-এর পর) অংশে এ বিষয়ে বহু দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করেছেন।
.
আমরা এর কিছু উদাহরণ উপস্থাপন করছি:
(১).হারানো জিনিস (লুকাতা): এক দেশ থেকে অন্য দেশে বা এক সময় থেকে অন্য সময়ে এর বিধান পরিবর্তিত হতে পারে। কী পরিমাণ মূল্যবান হলে তা তুলে নেওয়া এবং মালিকানা গ্রহণ করা যাবে, তা নির্ধারণে পার্থক্য হয়। এমনকি একই দেশের ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় যেমন শহর ও গ্রামে, এর বিধান আলাদা হতে পারে। আর বিভিন্ন যুগ ও অঞ্চলে এর বিধান পরিবর্তিত হতে পারে।
.
(২).যাকাতুল ফিতর: নবী (ﷺ) এটি নির্ধারণ করেছিলেন খাদ্যসামগ্রী হিসেবে, যা এক সা’ দেওয়া হবে। হাদিসে “যব”, “খেজুর” এবং “শুষ্ক দুধ” (ইক্বিত) উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে অনেক দেশে এগুলো সাধারণ খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। যব এখন পশুখাদ্য, খেজুর বিলাসিতার অংশ, আর ইক্বিত খুব কম মানুষ খায়। তাই উলামারা প্রতিটি দেশের প্রচলিত প্রধান খাদ্যের ভিত্তিতে ফিতরা নির্ধারণ করেন কোথাও চাল, কোথাও ভুট্টা, আবার কোথাও অন্য কিছু। এখানে শরিয়তের মূল বিধান স্থির ও অপরিবর্তনীয়। যেমন যাকাতুল ফিতর প্রদান করা অবশ্যই ফরজ এবং এর নির্ধারিত পরিমাণও নির্দিষ্ট। তবে এর মধ্যে পরিবর্তন আসে মূলত প্রদানযোগ্য খাদ্যের ধরনে, যা স্থান ও সময়ভেদে বিভিন্ন হতে পারে। এ ধরনের উদাহরণ প্রচুর পাওয়া যায় তালাক, বিবাহ, শপথ, এছাড়াও শরিয়তের বিভিন্ন বিধানের ক্ষেত্রে। এই প্রসঙ্গে
.
ইমাম আল-কারাফী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন:فمهما تجدد في العُرف : اعتبره ، ومهما سقط : أسقطه ، ولا تجمد على المسطور في الكتب طول عمرك ، بل إذا جاءك رجل من غير أهل إقليمك يستفتيك : لا تُجْرِه على عرف بلدك ، واسأله عن عرف بلده ، وأَجْرِه عليه ، وأفته به دون عرف بلدك ، ودون المقرر في كتبك ، فهذا هو الحق الواضح .“সামাজিক রীতিনীতিতে যা কিছু নতুনভাবে চালু হয়, তা গ্রহণ করতে হবে। আর যা কিছু অচল বা বিলুপ্ত হয়ে যায়, তা পরিত্যাগ করতে হবে। কিতাবসমূহে যা লেখা আছে,তাতে স্থির হয়ে থাকা কোনো সমাধান নয়। যদি অন্য এলাকার কেউ ফাতওয়ার জন্য আসে, তাহলে তাকে তোমার নিজের এলাকার রীতি অনুসারে বা কিতাবের বর্ণিত তথ্যের ভিত্তিতে ফাতওয়া দেওয়া উচিত নয়। বরং তার এলাকার রীতি নীতির ব্যাপারে জেনে নিয়ে সে অনুযায়ী ফতোয়া দিতে হবে।এটিই সঠিক পথ।” তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) আরও বলেছেন ; والجمود على المنقولات أبداً : ضلال في الدِّين ، وجهل بمقاصد علماء المسلمين ، والسلف الماضين ، وعلى هذه القاعدة تتخرج أيمان الطلاق ، والعتاق ، وجميع الصرائح والكنايات ، فقد يصير الصريح كناية فيفتقر إلى النية ، وقد تصير الكناية صريحا فتستغني عن النية “চিরকাল শুধু পূর্ববর্তী মনীষীদের লেখা অনুসরণ করাই যথেষ্ট নয়। এভাবে চললে দ্বীনের ব্যাপারে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হবে এবং মুসলিম স্কলারদের ও সালাফদের মৌলিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ পাবে। এই মূলনীতির ভিত্তিতেই তালাকের শপথ, দাসমুক্তি এবং সকল স্পষ্ট ও অস্পষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দের অর্থ নির্ধারিত হয়। কারণ, কখনো কোনো স্পষ্ট শব্দ অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে, ফলে নিয়তের প্রয়োজন হয়। আবার কখনো কোনো অস্পষ্ট শব্দ স্পষ্ট হয়ে যেতে পারে, ফলে নিয়তের প্রয়োজন পড়ে না।”(আল-ফুরুক; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩২১)
.
আমাদের ইমাম ইবনু কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) এই সূক্ষ্ম ও গভীর ফিকহের প্রশংসা করে বলেন উপরোক্ত বক্তব্য উল্লেখ করার পর:وهذا محض الفقه ، ومَن أفتى الناس بمجرد المنقول في الكتب على اختلاف عُرفهم ، وعوائدهم ، وأزمنتهم ، وأحوالهم ، وقرائن أحوالهم : فقد ضلَّ ، وأضل ، وكانت جنايته على الدِّين أعظم من جناية مَن طبَّب الناس كلهم على اختلاف بلادهم ، وعوائدهم ، وأزمنتهم ، وطبائعهم ، بما في كتابٍ من كتب الطب على أبدانهم ، بل هذا الطبيب الجاهل ، وهذا المفتي الجاهل : أضر ما يكونان على أديان الناس ، وأبدانهم ، والله المستعان “এটাই খাঁটি ও পরিপূর্ণ ফিকহ। যে ব্যক্তি শুধু কিতাবের বর্ণিত বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে মানুষের মাঝে ফাতওয়া প্রদান করে, অথচ তাদের সামাজিক রীতি, অভ্যাস,যুগের পরিবর্তন, পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও বাস্তব প্রেক্ষাপটকে বিবেচনা করে না, সে নিজেই পথভ্রষ্ট এবং অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করছে। তার এই গাফিলতির কারণে দ্বীনের ওপর যে ক্ষতি হয়, তা এমন এক অজ্ঞ চিকিৎসকের ক্ষতির চেয়েও ভয়ংকর, যে একটি সাধারণ চিকিৎসা বই দেখে সবার জন্য একই চিকিৎসা নির্ধারণ করে, অথচ তাদের দেশ, অভ্যাস, সময় ও শারীরিক প্রকৃতি বিবেচনা করে না। বরং এ ধরনের অজ্ঞ চিকিৎসক ও অজ্ঞ মুফতি উভয়ে মানুষের ধর্ম ও স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। “আল্লাহই সহায়ক।”( ইবনু কাইয়ুম; ই’লামুল মুওয়াক্কিইন; খণ্ড: ৩; পৃষ্ঠা: ৭৮)
.
কিছু বিদ্বান এই মূলনীতিটি এইভাবে প্রকাশ করেন: “সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে কিছু বিধানও পরিবর্তিত হয়।” এটি মাজাল্লাতুল আহকামিল আদলিয়্যাহ-এর ৩৯ নাম্বার ধারায় এবং ইমাম আল-জারকা’র শরহুল কাওয়াইদুল ফিকহিয়্যাহ’র ২২৭ পৃ.-তেও উল্লেখ আছে। এই মূলনীতি মূলত (আল আ’দাতু মুহকামাহ অর্থাৎ প্রচলিত রীতি (উরফ) নির্ধারক হয়) এই বৃহৎ মূলনীতির একটি শাখা। তবে এখানে “বিধান” বলতে শুধুমাত্র সেই বিধান বোঝানো হয়েছে যা عرف (প্রচলিত রীতি) এবং عادات (প্রথা)-এর ওপর নির্ভরশীল। স্থান, কাল ও পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে শুধুমাত্র এই বিধানগুলো পরিবর্তিত হতে পারে। মাজাল্লাতুল আহকাম এর ব্যাখ্যা দুরারুল হুক্কাম” গ্রন্থে বলা হয়েছে:
( إن الأحكام التي تتغير بتغير الأزمان هي الأحكام المستندة على العرف والعادة ; لأنه بتغير الأزمان تتغير احتياجات الناس , وبناء على هذا التغير يتبدل أيضا العرف والعادة وبتغير العرف والعادة تتغير الأحكام حسبما أوضحنا آنفا , بخلاف الأحكام المستندة على الأدلة الشرعية التي لم تبن على العرف والعادة فإنها لا تتغير . مثال ذلك : جزاء القاتل العمد القتل . فهذا الحكم الشرعي الذي لم يستند على العرف والعادة لا يتغير بتغير الأزمان , أما الذي يتغير بتغير الأزمان من الأحكام , فإنما هي المبنية على العرف والعادة , كما قلنا ,
وإليك الأمثلة : كان عند الفقهاء المتقدمين أنه إذا اشترى أحد دارا اكتفى برؤية بعض بيوتها[غرفها] , وعند المتأخرين لا بد من رؤية كل بيت منها على حدته , وهذا الاختلاف ليس مستندا إلى دليل , بل هو ناشئ عن اختلاف العرف والعادة – في أمر الإنشاء والبناء , وذلك أن العادة قديما في إنشاء الدور وبنائها أن تكون جميع بيوتها متساوية وعلى طراز واحد , فكانت على هذا رؤية بعض البيوت تغني عن رؤية سائرها , وأما في هذا العصر فإذ جرت العادة بأن الدار الواحدة تكون بيوتها مختلفة في الشكل والحجم لزم عند البيع رؤية كل منها على الانفراد)
“যে বিধানসমূহ সময়ের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয় তা মূলত عرف (প্রচলিত রীতি) ও عادات (প্রথা)-এর ওপর নির্ভরশীল। কারণ সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের প্রয়োজন বদলায়। সেই অনুযায়ী عرف ও عاداتও পরিবর্তিত হয়। ফলে এসব পরিবর্তনের কারণে কিছু বিধানও পরিবর্তিত হয়। তবে যে বিধানগুলো সরাসরি কুরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট দলিল দ্বারা সাব্যস্ত এবং عرف বা عادات এর ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়নি, সেগুলো কখনো পরিবর্তিত হয় না। উদাহরণ স্বরূপ: ইচ্ছাকৃত খুনের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এটি শরিয়তের একটি সাব্যস্ত বিধান, যা عرف বা عادات এর ওপর নির্ভর করে না। তাই এটি কখনো পরিবর্তিত হবে না। কিন্তু যে বিধান عرف ও عادات এর ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, তা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে।”(শাইখ আলী হায়দার; দুরারুল হুক্কাম; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৪৭; অনুরূপ বর্ণনা আছে ‘শরহুল মাজাল্লাতুল আহকামে; খণ্ড: ১; পৃষ্ঠা: ৩৬)
.
এখন চলুন একটি বাস্তব উদাহরণ দেখি: জারকা (রাহিমাহুল্লাহ) এই মূলনীতির উদাহরণ দিতে গিয়ে লিখেছেন: (لما ندرت العدالة وعزت في هذه الأزمان قالوا بقبول شهادة الأمثل فالأمثل والأقل فجورا فالأقل …وجوزوا تحليف الشهود عند إلحاح الخصم ، وإذا رأى الحاكم ذلك؛ لفساد الزمان) “যখন এই যুগে ন্যায়পরায়ণ সাক্ষীদের পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেছে, তখন ফকিহগণ মত দিয়েছেন যে, সাক্ষ্য গ্রহণে সর্বোত্তম চরিত্রের ব্যক্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। যদি এমন কেউ না পাওয়া যায়, তাহলে অপেক্ষাকৃত কম পাপী ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে এবং বিচারকের অনুমোদন সাপেক্ষে প্রতিপক্ষের জোরালো অনুরোধ থাকলে সাক্ষীদের শপথ করিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণের অনুমতি রয়েছে। কেননা সমাজের নৈতিকতা ও পরিবেশের অবনতি হয়েছে।”(শারহুল কাওয়াইদুল ফিকহিয়্যাহ,পৃষ্ঠা: ২২৯)
.
সময় ও স্থানভেদে ফাতওয়া পরিবর্তনের প্রসঙ্গে ড. মুহাম্মদ আল-যুহাইলি সতর্ক করে বলেন:“শরিয়তের মূলনীতি হলো, বিধানসমূহ স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয়। তাই এখানে ‘বিধান’ (أحكام) শব্দটি সর্বজনীন অর্থে ব্যবহৃত হয়নি।” তিনি আরও যোগ করেন:“এই মূলনীতি একটি ব্যতিক্রমী ও বিশেষত অবস্থা বোঝায়। তবে এটিও স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে:
1- إن الأحكام الأساسية الثابتة في القرآن والسنة والتي جاءت الشريعة لتأسيسها بنصوصها الأصلية : الآمرة والناهية، كحرمة الظلم ، وحرمة الزنى والربا، وشرب الخمر والسرقة، وكوجوب التراضي في العقد ، ووجوب قمع الجرائم وحماية الحقوق ، فهذه لا تتبدل بتبدل الزمان ، بل هي أصول جاءت بها الشريعة لإصلاح الزمان والأجيال ، وتتغير وسائلها فقط .
2- إن أركان الإسلام وما علم من الدين بالضرورة لا يتغير ولا يتبدل ، ويبقى ثابتا كما ورد ، وكما كان في العصر الأول لأنها لا تقبل التبديل والتغيير.
3- إن جميع الأحكام التعبدية التي لا مجال للرأي فيها ، ولا للاجتهاد، لا تقبل التغيير ولا التبديل بتبدل الأزمان والأماكن والبلدان والأشخاص.
4- إن أمور العقيدة أيضا ثابتة لا تتغير ولا تتبدل ولا تقبل الاجتهاد، وهي ثابتة منذ نزولها ومن عهد الأنبياء والرسل السابقين ، حتى تقوم الساعة ، ولا تتغير بتغير الأزمان)
(১).যেসব মৌলিক বিধানগুলো কুরআন ও সুন্নায় স্থায়ীভাবে নির্ধারিত রয়েছে এবং শরিয়ত যেগুলোকে স্পষ্ট আদেশ ও নিষেধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করেছে। যেমন: জুলুম নিষিদ্ধ করা, ব্যভিচার, সুদ, মদপান, চুরি হারাম হওয়া; চুক্তিতে পারস্পরিক সম্মতির আবশ্যকতা; অপরাধ দমন ও অধিকার সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা। এসব বিধান সময়ের পরিবর্তনে পরিবর্তিত হয় না। বরং এগুলো এমন মৌলিক নীতিমালা, যা যুগে যুগে সমাজকে সঠিক পথে পরিচালিত করার জন্য নির্ধারিত হয়েছে। শুধুমাত্র এগুলোর প্রয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু মূল বিধান অপরিবর্তনীয়।
.
(২).ইসলামের স্তম্ভসমূহ এবং দ্বীনের অপরিহার্য বিষয়সমূহ’ (ما عُلِمَ من الدين بالضرورة) যা প্রতিটি মুসলিমের জন্য জানা জরুরি সেগুলো অপরিবর্তনীয়। প্রথম যুগে যেমন ছিল, তেমনই থাকবে, এবং এগুলোর পরিবর্তন বা বিকৃতির কোনো সুযোগ নেই।
.
(৩).যেসব বিধান সরাসরি ইবাদতের সাথে সম্পর্কিত এবং যেখানে মতামত বা ইজতিহাদের অবকাশ/সুযোগ নেই সেগুলো সময়, স্থান, সমাজ বা ব্যক্তিভেদে পরিবর্তন হবে না।
.
(৪).আক্বীদা বা বিশ্বাস সম্পর্কিত বিষয়সমূহও চিরস্থায়ী, এগুলোর কোনো পরিবর্তন নেই এবং এগুলোর ব্যাপারে ইজতিহাদেরও সুযোগ নেই। এগুলো প্রথম নবীদের যুগ থেকে শুরু হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত অপরিবর্তনীয় থাকবে। সময়ের পরিবর্তন এগুলোকে পরিবর্তন করতে পারে না।”(ড. মুহাম্মদ আল-যুহাইলি; আল-কাওয়ায়েদ আল-ফিকহিয়্যাহ আলা আল-মাযহাব আল-হানাফী ওয়া আশ-শাফি’ই” পৃষ্ঠা ৩১৯; আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন ইসলামি সওয়াল-জবাব ফাতাওয়া নং-১৩০৬৮৯)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.]-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল প্রশ্ন: সময়, স্থান এবং ব্যক্তির অবস্থার পার্থক্যের কারণে কি ফাতওয়া ভিন্ন হতে পারে? একই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলেও, জিজ্ঞাসাকারীর অবস্থার ভিন্নতার কারণে কি ফাতওয়া ভিন্ন হতে পারে?
উত্তরে শাইখ বলেন:
مثل ما تقدم، تختلف بحسب أحوال البلد، وظروفها، واصطلاحاتها، وأعرافها، حكم الله واحد، حكم الله واحد لا يتغير الحكم، لا يكون الشيء محرمًا في زمان، ومباحًا في زمان، لا، الحكم واحد، المحرم محرم، والمباح مباح، والواجب واجب، والسنة سنة، والمكروه مكروه، لكن يتغير ظروف الفتوى، وما ينبغي أن تطبق عليه. فقد يكون اصطلاح قوم غير اصطلاح الآخرين، فيظن اصطلاحهم مثل اصطلاح الآخرين الذين في مصر، أو في الشام، وهو في بلد أخرى ليست أعرافهم، ولا اصطلاحاتهم في كلماتهم مثل أولئك، فليس عرف أهل الرياض مثلًا، أو أهل بيشة، أو أهل أبها مثل عرف أهل مصر، وأهل الشام في مسائل متعددة، فقد يخطؤون في فهم الكلام؛ فيظن أن مراد هؤلاء هو مراد هؤلاء، وليس الأمر كذلك، فيخطئ من جهة عدم فهم المراد، وعدم معرفة قصد هؤلاء، وقصد هؤلاء، فلا ينطبق الحكم على الوجه الشرعي.فالبصيرة في أحوال الناس، وأعرافهم، واصطلاحاتهم، وما يريدون بكلامهم أمر لا بد منه في حق المفتي كما تقدم، ومثل إنكار المنكر، إنكار المنكر واجب، والأمر بالمعروف واجب، لكن تختلف الأحوال في إنكار المنكر بالنسبة إلى ما يترتب عليه، فقد يكون في بعض الأحيان، أو بالنسبة إلى بعض الناس إذا أنكرت عليه المنكر؛ قد يترتب عليه منكر أكبر، وشر أعظم، فحينئذ تترك إنكاره، لا لأنه غير منكر، بل هو منكر، لكن تترك إنكاره لما قد يترتب عليه مما هو أنكر، وأشد، وقد يترتب على إنكار المنكر منكر مثله؛ فيحار الآمر، والناهي، هل ينكره، أو لا ينكره؟! لأنه يترتب عليه مثله، فينظر، ويتأمل كيف ينكر المنكر هذا.
فالحاصل: أن الأشياء قد يترتب عليها أمور لا لأن إنكار المنكر ليس بواجب، بل هو واجب، لكن قد يتوقف عن إنكاره لما يترتب عليه من شر أكبر، أو شر مماثل، ومما يقرب هذا ما جرى للنبي ﷺ وإن كان غير منكر، لكن مما يقرب هذا المعنى، النبي ﷺ قال لعائشة -رضي الله عنها-: لولا أن قومك حديثو عهد بكفر؛ لنقضت الكعبة، وجعلتها على قواعد إبراهيم، وجعلت لها بابين.فترك نقضها، وتنفيذ ما قال -عليه الصلاة والسلام- خوفًا من أن تنكر قلوب الناس ذلك، فترك هذا الخير، وهذه المصلحة؛ خوفًا من شر أكبر، يربو على هذه المصلحة، وهذا يقع كثيرًا في مسائل متعددة.
“ফাতওয়া পরিবর্তনের এই নীতির মূল ব্যাখ্যা আগেও দেওয়া হয়েছে। এটি নির্ভর করে দেশের অবস্থা, সামাজিক ও পরিবেশগত পরিস্থিতি, পরিভাষা ও প্রথা/রীতিনীতির ভিন্নতা ও সংস্কৃতির ওপর। তবে মনে রাখতে হবে,আল্লাহর বিধান অপরিবর্তনীয়, তা পরিবর্তন হয় না।”কোন বিধান এক যুগে হারাম আর অন্য যুগে হালাল হতে পারে না। হারাম সর্বদা হারাম, হালাল সর্বদা হালাল। যা ফরজ, তা চিরকাল ফরজ; যা সুন্নত, তা সুন্নতই থাকে। অপছন্দনীয় বা মাকরূহ বিষয়গুলোও পরিবর্তিত হয় না। তবে ফাতওয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব পরিস্থিতির বিবেচনা করা হয় এবং সে অনুযায়ী এর প্রয়োগ নির্ধারিত হয়। এক জাতির প্রচলিত পরিভাষা (অর্থ বা ব্যবহার) অন্য জাতির পরিভাষার মতো নাও হতে পারে। কেউ যদি মনে করে যে, এক দেশের প্রচলিত শব্দের অর্থ অন্য দেশের মতোই, তবে এটি ভুল হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, রিয়াদ, বিশাহ বা আভা অঞ্চলের মানুষের রীতি ও পরিভাষা মিসর ও শামের মানুষের মতো নয়। ফলে, কোনো বিষয়ে ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কা থাকে। মানুষ কথা বলার সময় কী বোঝাতে চায়, তা বুঝতে ব্যর্থ হলে, ফাতওয়ার প্রয়োগেও ভুল হতে পারে।সঠিক ফাতওয়া দেওয়ার জন্য, মানুষের অবস্থা, সামাজিক রীতিনীতি ও পরিভাষা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। একইভাবে, খারাপ কাজ প্রতিহত করাও জরুরি আর ভালো কাজের আদেশ করাও ফরজ। তবে, কিছু ক্ষেত্রে অসৎ কাজ প্রতিরোধ করতে গিয়ে আরও বড় ক্ষতি হতে পারে। যদি কোনো ভুল কাজের প্রতিবাদ করলে তা আরও ভয়ানক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সেই অবস্থায় প্রতিবাদ না করাই উত্তম। এর অর্থ এই নয় যে, সেই কাজ ভুল নয়; বরং বৃহত্তর ক্ষতি এড়ানোর জন্য সেটি সাময়িকভাবে উপেক্ষা করা হয়।কিছু ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি আসে, যেখানে কোনো ভুল কাজের প্রতিবাদ করলে ততটাই বড় আরেকটি ভুল ঘটতে পারে। তখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সংশয়ে পড়ে। তিনি কি প্রতিবাদ করবেন, নাকি করবেন না? এ অবস্থায় ভালোভাবে চিন্তা করা দরকার, কীভাবে সেই ভুল কাজের প্রতিবাদ করা উচিত, যাতে ক্ষতির পরিবর্তে উপকারই হয়।
ফলকথা: কোনো খারাপ কাজ প্রতিহত করা ইসলামের মৌলিক দায়িত্ব। তবে এমন পরিস্থিতি আসতে পারে, যেখানে অসৎ কাজের প্রতিবাদ করলে আরও ভয়াবহ বিপদ বা সমপরিমাণ ক্ষতি হতে পারে। তখন সাময়িকভাবে সেই প্রতিবাদ থেকে বিরত থাকা হয়, যদিও এটি মূলত একটি বাধ্যতামূলক কর্তব্য। এ প্রসঙ্গে রাসূল (ﷺ)-এর একটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়, যা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। যদিও এটি সরাসরি অসৎ কাজের উদাহরণ নয়, তবে বিষয়টি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একদিন তিনি আয়েশা (রাযি.)-কে বলেছিলেন: “যদি তোমার সম্প্রদায় কেবল নতুন ইসলাম গ্রহণকারী না হতো, তাহলে আমি কাবা ধ্বংস করে একে ইবরাহীম (আ.)-এর মূল ভিত্তির ওপর পুনর্নির্মাণ করতাম এবং এতে দুটি দরজা সংযুক্ত করতাম।” অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাবা পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেননি। কারণ তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে, মানুষ এটি মেনে নিতে পারবে না এবং তাদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। তিনি এই কল্যাণকর কাজ থেকে বিরত থাকেন, যাতে বড় কোনো ক্ষতি না হয়, যা এই উপকারের চেয়ে বেশি হতে পারে। এ ধরনের পরিস্থিতি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখা যায়, যেখানে কোনো ভালো কাজ করা হলেও তার ফলে আরও বড় অনিষ্ট হতে পারে।”(বিন বায, অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, ফাতওয়া নং২৭২২)
.
পরিশেষে প্রিয় পাঠক! উপরোক্ত আলোচনার আলোকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, শরিয়তের বিধিনিষেধের মহান মূলনীতিগুলোতে কোন ধরনের বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। কেউ যদি যুগের পরিবর্তনের অজুহাতে এ মূলনীতিকে বিকৃতভাবে ব্যাখ্যা করে হারাম কোন কর্মকে হালাল করতে চায় যেমন বিকৃত ব্যাখ্যা করে সুদকে বৈধতা দিতে চায়, নারীদের অবাধ মেলামেশাকে অনুমোদন দিতে চায় কিংবা শরিয়তের নির্ধারিত শাস্তিসমূহ বাতিল করার প্রয়াস চালায় তবে তা হবে সম্পূর্ণভাবে ভুল ও ভ্রান্ত চেষ্টার নামান্তর। এর কারণ এ বিধানগুলো কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট ও অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত এবং তা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। যে ব্যক্তি এগুলোর পরিবর্তনের চিন্তা করে সে মূলত ইসলামের মূলভিত্তি ও মৌলিক স্বরূপকেই অস্বীকার করতে চায় যা একজন মুসলিমের পক্ষে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ আমাদের সিরাতুল মুস্তাকিমের পথে অটল থাকার তৌফিক দান করুন। (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
▬▬▬▬▬▬❂▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি।
সম্পাদনায়: শাইখ নাসরুল্লাহ আল মাদানী (হাফি.)।
লিসান্স মাদীনা বিশ্ববিদ্যালয়,সৌদি আরব।

কখন ও কোন ধরনের ঘুমের জন্য অযু ভঙ্গ হবে

 ভূমিকা: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। যাবতীয় প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক মহান আল্লাহ’র জন্য। শতসহস্র দয়া ও শান্তি বর্ষিত হোক প্রাণাধিক প্রিয় নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’র প্রতি। অতঃপর ঘুম ওজু ভঙ্গ করে কি না এই বিষয়ে আহলুল ইলমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে এ বিষয়ে একাধিক অভিমত পরিলক্ষিত হয়, যার মধ্যে তিনটি মত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:

(১).একদল আলেমদের মতে ঘুমের পরিমাণ ও অবস্থান যেমনই হোক না কেন সকল প্রকার ঘুমই ওযু ভঙ্গ করে। সুতরাং কেউ শুয়ে থেকে কিংবা কোনোকিছুতে হেলান দিয়ে ঘুমালে অথবা রুকুরত বা সিজদারত অবস্থায় ঘুমালে তার ওজু নষ্ট হয়ে যাবে; সেক্ষেত্রে ঘুম কম হোক, চাই বেশি হোক, সেটা ধর্তব্য হবে না, বরং ঘুমালেই ওজু নষ্ট হয়ে গেছে বলে বিবেচনা করা হবে। এ মতামতের পক্ষে ইসহাক, আল-মুজানি, হাসান বসরী এবং ইবনুল মুনযির (রাহিমাহুল্লাহ) প্রমুখ আলেমগণ অবস্থান করেছেন।”এই মতের পক্ষে দলিল হচ্ছে: সফওয়ান ইবনু ‘আসসাল (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমরা যখন সফরে থাকতাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিতেন, আমরা যেন নাপাকির গোসল ছাড়া তিন দিন তিন রাত আমাদের মোজা না খুলি; এমনকি মলত্যাগ-পেশাব ও ঘুম হতে ওঠার পর ওযু করার সময়ও (মোজা না খুলি)। তিরমিজি হা/৯৫; ইবনু মাজাহ হা/৪৭৮ সনদ হাসান) ।
.
(২).আরেক দল আলেমদের মতে ঘুম সব অবস্থায় ওযু ভঙ্গের কারণ নয়। তাদের দলিল আনাস ইবনু মালিক (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বর্ণিত হাদীস, যেখানে বলা হয়েছে, كَانَ أَصْحَابُ رَسُولِ اللهِ صلي الله عليه وسلم يَنْتَظِرُونَ الْعِشَاءَ الآخِرَةَ حَتَّى تَخْفِقَ رُءُوسُهُمْ ثُمَّ يُصَلُّونَ وَلَا يَتَوَضَّئُونَ».“রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিগণ এশার নামাজের জন্য এতক্ষণ অপেক্ষা করতেন যে, (ঘুমে) তাঁদের মাথা ঢলে পড়ত। এরপর তাঁরা নামাজ আদায় করতেন অথচ (নামাজের জন্য পুনরায়) ওজু করতেন না।”(আবু দাউদ, হা ২০০, বর্ণনার মান: সহিহ) এছাড়া ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা নবিজির সাথে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ার সময় তন্দ্রাচ্ছন্ন হলে নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কান ধরে তাঁকে জাগিয়ে দিতেন। তিনি নামাজের মধ্যে কৃত সামান্য ঘুমকে ওজু নষ্টের কারণ মনে করতেন না।(দ্রষ্টব্য: সহিহ মুসলিম, হা/৭৬৩) এ থেকে বোঝা যায়, ঘুম সব সময় ওযু ভঙ্গ করে না বরং পরিস্থিতিভেদে এর ব্যতিক্রম রয়েছে। এই বক্তব্যের পক্ষে ছিলেন আবু মূসা আল-আশ’আরী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ও তাবেঈ সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যিব (রাহিমাহুল্লাহ)।
.
(৩).উপরোক্ত দুটি মত পর্যালোচনার ভিত্তিতে জমহুর (বেশিরভাগ) আলেমগণের মাঝে যে ভারসাম্যপূর্ণ তৃতীয় মতটি গৃহীত হয়েছে, তা হলো ঘুম সব অবস্থায় ওযূ ভঙ্গকারী নয়; বরং নির্দিষ্ট কিছু পরিস্থিতিতে ঘুম ওযূ ভঙ্গ করে, আবার কিছু পরিস্থিতিতে ওযু ভঙ্গ করে না।দলিল ও প্রমাণের আলোকে এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও বিশুদ্ধ মত। কারণ সহীহ হাদীসসমূহ থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে ঘুম অবস্থায় ওযূ ভঙ্গ হয় তখনই যখন ঘুম গভীর হয় এবং ঘুমন্ত ব্যক্তি নিজের শরীর থেকে বায়ু নিঃসরণের অনুভব হারিয়ে ফেলে। অর্থাৎ এমন ঘুম যেখানে বায়ু নিঃসরণ হলে সে তা অনুভব করতে পারে না তখন ওযূ ভেঙে যাবে। অন্যদিকে যদি ঘুম হালকা হয় যেমন বসা অবস্থায় সামান্য তন্দ্রা যার মধ্যে ঘুমন্ত ব্যক্তি এখনও নিজের শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন থাকে এবং বায়ু নিঃসরণ হলে তা উপলব্ধি করতে পারে তাহলে এই ধরনের ঘুম দ্বারা ওযূ ভঙ্গ হবে না। এই মতটি শরীয়তের উদ্দেশ্য সহীহ হাদীস ও যুক্তির সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ এটি ঘুমের প্রকৃতি ও মানুষের শারীরিক সচেতনতার পার্থক্যকে ভিত্তি করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রদান করে।
.
আরেকটি বিষয়ে জেনে রাখা ভাল আর তা হচ্ছে ঘুম বা জ্ঞানশূন্যতা দু ধরনের:
.
(ক) অস্থায়ী জ্ঞান হারানো যা ঘুম, অসুস্থতা এবং নেশাগ্রস্তের কারণে হয়ে থাকে এর ফলে কিছু ক্ষেত্রে অযু ভঙ্গ হয় আবার কিছু ক্ষেত্রে হয় না।
.
যেমন- রাসূল (ﷺ) নির্দেশ দিতেন, أَنْ لاَ نَنْزِعَ خِفَافَنَا ثَلاَثَةَ أَيَّامٍ إِلاَّ مِنْ جَنَابَةٍ لَكِنْ مِنْ غَائِطٍ وَبَوْلٍ وَنَوْمٍ. ‘আমরা যেন (সফর অবস্থায়) তিন দিন যাবৎ পেশাব-পায়খানা এবং ঘুমের কারণে আমাদের মোজা না খুলি। তবে জানাবাতের অবস্থা ব্যতীত’।(সুনানু ইবনে মাজাহ, হা/৪৭৮) অন্য হাদীসে এসেছে, আলী ইবনু আবু তালেব (রাঃ) হ’তে বর্ণিত, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ : الْعَيْنُ وِكَاءُ السَّهِ، فَمَنْ نَامَ فَلْيَتَوَضَّأْ. ‘চক্ষু হ’ল গুহ্যদ্বারের ঢাকনা। অতএব যে ব্যক্তি ঘুমাবে সে যেন ওযূ করে’।(সুনানু আবু দাউদ, হা/২০৩, সুনানু ইবনু মাজাহ, হা/৪৭৭, হাদীসটি হাসান; দ্রঃ ইরওয়াউল গালীল; ১/১৪৮) এ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ওযূ অবস্থায় ঘুমিয়ে গেলে ওযূ ভঙ্গ হয়ে যায়। তবে তা এমন ঘুম যে, ঘুমের মধ্যে বায়ু নিঃসরণ হ’লে তা উপলব্ধি করা যায় না। পক্ষান্তরে যদি এমন ঘুম হয় যে ঘুমে বায়ু নিঃসরণ উপলব্ধি করা যায় সে ঘুমের কারণে ওযূ ভঙ্গ হবে না।(মাজমূ‘ ফাতাওয়া, খণ্ড: ২১; পৃষ্ঠা: ২৩০) এ প্রসঙ্গে আনাস (রাঃ) বলেন,كَانَ أَصْحَابُ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَنْتَظِرُوْنَ الْعِشَاءَ الآخِرَةَ حَتَّى تَخْفِقَ رُءُوْسُهُمْ ثُمَّ يُصَلُّوْنَ وَلاَ يَتَوَضَّئُوْنَ. রাসূল (ﷺ)-এর সাহাবীগণ এশার সালাতের শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন। এমনকি (ঘুমের কারণে) তাদের মাথা আন্দোলিত হচ্ছিল। অতঃপর তারা সালাত আদায় করলেন। কিন্তু ওযূ করলেন না।(মুসলিম, হা/৩৭৬, আবূদাঊদ, হা/২০০)
.
(খ) স্থায়ীভাবে জ্ঞান হারানো: যখন কেউ স্থায়ীভাবে জ্ঞান হারায়, যেমন পাগল হয়ে গেলে তখন তার ওযূ ভঙ্গ হয়ে যায়। কেননা অস্থায়ীভাবে জ্ঞান হারানো (যেমন গভীর ঘুম বা অজ্ঞান হওয়া) অবস্থায় যদি ওযূ নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে স্থায়ীভাবে জ্ঞান হারানো অবস্থায় তো তা আরও আগে থেকেই নষ্ট বলে বিবেচিত হবে। এতে বুঝা যায়, জ্ঞান হারানোই মূল কারণ; তা অস্থায়ী হোক বা স্থায়ী, বেশি হোক, চাই কম হোক উভয় অবস্থাতেই ব্যক্তির ওযূ ভঙ্গ হয়ে যায়। এ বিষয়ে শরিয়তের সকল বিদ্বান একমত পোষণ করেছেন।(দ্রষ্টব্য: ইবনু কুদামা, আল-মুগনি, খণ্ড: ১,পৃষ্ঠা: ২৩৪)
.
কখন এবং কোন ধরনের ঘুম ওযু ভঙ্গ করে এ বিষয়ে সর্বোচ্চ ‘উলামা পরিষদের সম্মানিত সদস্য, বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ, মুহাদ্দিস, মুফাসসির ও উসূলবিদ, আশ-শাইখুল ‘আল্লামাহ, ইমাম মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-‘উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২১ হি./২০০১ খ্রি.] তার উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল গ্রন্থে ওযূ ভঙ্গের কারণসমূহ তালিকা করার সময় বলেছেন: ” النوم إذا كان كثيراً بحيث لا يشعر النائم لو أحدث، فأما إذا كان النوم يسيراً يشعر النائم بنفسه لو أحدث فإنه لا ينقض الوضوء، ولا فرق في ذلك أن يكون نائماً مضطجعاً أو قاعداً معتمداً أو قاعداً غير معتمد، فالمهم حالة حضور القلب، فإذا كان بحيث لو أحْدث لأحسَّ بنفسه فإن وضوءه لا ينتقض، وإن كان في حال لو أحْدث لم يحسّ بنفسه، فإنه يجب عليه الوضوء، وذلك لأن النوم نفسه ليس بناقض وإنما مظنة الحدث، فإذا كان الحدثُ مُنتفياً لكون الإنسان يشعر به لو حصل منه، فإنه لا ينتقض الوضوء. والدليل على أن النوم نفسه ليس بناقض أن يسيره لا ينقض الوضوء، ولو كان ناقضاً لنقض يسيرهُ وكثيرهُ كما ينقض البولُ يسيرهُ وكثيره “যদি ঘুম দীর্ঘ সময়ের জন্য হয়, এমনভাবে যে ঘুমন্ত ব্যক্তি তার ওযূ ভঙ্গ হয়ে গেলে তা অনুভব করতে পারে না, তাহলে তার ওযূ ভেঙে যাবে। কিন্তু যদি ঘুম স্বল্প হয়, এমনভাবে যে ঘুমন্ত ব্যক্তি তার ওযূ ভঙ্গ হয়ে গেলে তা অনুভব করতে পারে, তাহলে তার ওযূ ভাঙবে না। এখানে কোনো পার্থক্য নেই যে ঘুমন্ত ব্যক্তি শুয়ে আছে নাকি বসে ঘুমাচ্ছে নাকি আধা শুয়ে ঘুমাচ্ছে। মূল কথা হলো অন্তরের উপস্থিতি। কারণ স্বয়ং ঘুম উযু ভঙ্গের কারণ নয়। বরং এটি উযু ভঙ্গের সম্ভাবনার কারণ। যদি ওযূ ভঙ্গের সম্ভাবনা বিদ্যমান না থাকে, অর্থাৎ ব্যক্তি যদি ঘুমন্ত অবস্থায় ওযূ ভঙ্গ হলে তা বুঝতে পারত, তাহলে ওযূ ভাঙবে না। এর প্রমাণ হলো ঘুম যদি নিজেই ওযূ ভঙ্গকারী হতো, তাহলে অল্প ঘুমেও ওযূ ভেঙে যেত, যেমন মূত্রের ক্ষেত্রে হয়।মূত্র অল্প বা বেশি পরিমাণ উভয়ই ওজু ভঙ্গ করে।”(ইবনু উসাইমীন, মাজমূঊ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইল, খণ্ড: ১১; আশ শারহুল মুমতি; খণ্ড; ১/২২৫-২২৭;ইসলামি সাওয়াল জবাব ফাতাওয়া নং-৩৬৮৮৯)।
.
বিগত শতাব্দীর সৌদি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফাক্বীহ শাইখুল ইসলাম ইমাম ‘আব্দুল ‘আযীয বিন ‘আব্দুল্লাহ বিন বায আন-নাজদী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৪২০ হি./১৯৯৯ খ্রি.] বলেছেন:النوم ينقض الوضوء إذا كان مستغرقا قد أزال الشعور؛ لما روى الصحابي الجليل صفوان بن عسال المرادي رضي الله عنه قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم يأمرنا إذا كنا مسافرين أن لا ننزع خفافنا ثلاثة أيام ولياليهن إلا من جنابة ولكن من غائط وبول ونوم أخرجه النسائي والترمذي واللفظ له، وصححه ابن خزيمة.ولما روى معاوية رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: العين وكاء السه، فإذا نامت العينان استطلق الوكاء رواه أحمد والطبراني، وفي سنده ضعف، لكن له شواهد تعضده، كحديث صفوان المذكور، وبذلك يكون حديثا حسنا……..، أما النعاس فلا ينقض الوضوء، لأنه لا يذهب معه الشعور، وبذلك تجتمع الأحاديث الواردة في هذا الباب

“যদি ঘুম সম্পূর্ণরূপে অচেতন করে ফেলে এবং অনুভূতি বিলুপ্ত করে দেয়, তাহলে তা ওযু ভঙ্গ করে। কারণ,মহান সাহাবী সাফওয়ান ইবনু আসসাল আল-মুরাদী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিতেন যে, সফরে আমরা যেন তিন দিন ও তিন রাত জুনুবি ছাড়া মোজা না খুলি। তবে শৌচ, প্রস্রাব, বা ঘুমের কারণে এটি খুলতে হবে।” এই হাদীসটি নাসায়ী এবং তিরমিজি বর্ণনা করেছেন এবং এটি ইবনু খুযাইমাহ সহিহ বলেছেন। এছাড়াও, মুয়াবিয়া (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) থেকে বর্ণনা করেন:চোখ হলো পিছন দ্বারের বন্ধন, আর যখন দুটি চোখ ঘুমিয়ে যায়, তখন বন্ধন খুলে যায়’। এটি আহমদ ও তাবারানি বর্ণনা করেছেন,যদিও এর সনদে কিছু দুর্বলতা রয়েছে, তবে এটিকে সমর্থনকারী কিছু অন্যান্য হাদীস রয়েছে, যেমন সফওয়ান (রাদিয়াল্লাহু আনহু)-এর বর্ণিত হাদীস। সুতরাং, এই হাদীসটি ‘হাসান’ (গৃহীতযোগ্য) হিসেবে গণ্য হয়।কিন্তু শুধুমাত্র তন্দ্রা (নিমগ্ন না হওয়া সামান্য ঘুম) ওযু ভঙ্গ করে না, কারণ এতে অনুভূতি সম্পূর্ণরূপে চলে যায় না। এভাবেই এই বিষয়ে বর্ণিত হাদীসগুলো একে অপরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।”(মাজমূ‘উ ফাতাওয়া ওয়া মাক্বালাতুম মুতানাওয়্যা‘আহ, খণ্ড; ১০; পৃষ্ঠা: ১৪৪) ।
.
সৌদি আরবের ‘ইলমী গবেষণা ও ফাতাওয়া প্রদানের স্থায়ী কমিটির (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ লিল বুহূসিল ‘ইলমিয়্যাহ ওয়াল ইফতা) ‘আলিমগণ বলেছেন:النوم المستغرق مظنة لنقض الوضوء فمن نام نوماً مستغرقاً في المسجد أو غيره وجب عليه إعادة وضوئه، سواء كان قائماً أو قاعداً أو مضطجعاً، وسواء كان في يده سبحة أم لا، أما إن كان غير مستغرق كالنعاس الذي لا يفقد معه الشعور فلا تجب عليه إعادة الوضوء لما ورد في ذلك من الأحاديث الصحيحة عن النبي صلى الله عليه وسلم الدالة على التفصيل المذكور ”
“গভীর নিদ্রা ওজু ভঙ্গের সম্ভাবনাময় কারণ হতে পারে। সুতরাং কেউ যদি মসজিদে বা অন্য কোথাও গভীরভাবে ঘুমিয়ে পড়ে, তাহলে তার উপর পুনরায় ওজু করা আবশ্যক সে দাঁড়িয়ে থাকুক, বসে থাকুক বা শুয়ে থাকুক, এবং তার হাতে তাসবীহ থাকুক বা না থাকুক। তবে,যদি ঘুম গভীর না হয়, যেমন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থা, যাতে তার অনুভূতি/চেতনা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়নি তাহলে পুনরায় ওজু করা আবশ্যক নয়। এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে, যা উল্লেখিত পার্থক্যের প্রমাণ প্রদান করে।”(ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ; খণ্ড: ৫; পৃষ্ঠা: ২৬২) (আল্লাহই সবচেয়ে জ্ঞানী)।
___________________________
উপস্থাপনায়: জুয়েল মাহমুদ সালাফি
সম্পাদনায়: ওস্তায ইব্রাহিম বিন হাসান (হাফিযাহুল্লাহ)।
অধ্যয়নরত, কিং খালিদ ইউনিভার্সিটি,সৌদি আরব।

অমুসলিম দ্বারা জুলুম নির্যাতনে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিম ভাই-বোনদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য

 প্রশ্ন: ফি-লি-স্তি-নে ই-হু-দি দ্বারা জুলুম নির্যাতনে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিম ভাই-বোনদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কী?”

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: পরম করুণাময় অসীম দয়ালু মহান আল্লাহ’র নামে শুরু করছি। সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজাহানের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। আমাদের নবী মুহাম্মদের প্রতি, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। অতঃপর ইসলামের দৃষ্টিতে ফি-লি-স্তী-নে-র মর্যাদা অপরিসীম। মসজিদুল আকসা মুসলিমদের তৃতীয় পবিত্র ও সম্মানিত স্থান। এটি হাজার হাজার নবী-রাসূল [আলাইহিমুস সালাম]-এর আগমনের পুণ্যভূমি। সকল মুসলিমের প্রাণের কেন্দ্রস্থল বাইতুল মাকদিস। আল্লাহ তা‘আলা এই স্থানকে বিশেষভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। প্রতিটি মুসলিমের সাথে এই মসজিদের রয়েছে এক গভীর সম্পর্ক, যা আমাদের আধ্যাত্মিক ঐক্য ও বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু। ফি-লি-স্তী-নে-র সাথে প্রতিটি মুসলিমের সম্পর্ক হচ্ছে ঈমানী সম্পর্ক, ইসলামী সম্পর্ক ও আক্বীদা-বিশ্বাসের সম্পর্ক। এক কথায় ধর্মীয় বা দ্বীনি সম্পর্ক। ফি-লি-স্তী-ন সম্পর্কে অধিকাংশ মুসলিম জানেন না। অথচ এ বিষয়টি জানা প্রত্যেক মুসলিমের ঈমানী দায়িত্ব ও ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তাই এ সম্পর্কে যদি জ্ঞান না থাকে তাহলে জ্ঞান অর্জন করা উচিত। অনেকেই মনে করেন যে, ফি-লি-স্তী-নে-র যে সমস্যা নিতান্তই কেবল তাদেরই সমস্যা কিন্তু এই ধারণা ভুল বরং ফি-লি-স্তি-নি-দে-র বর্তমান সংকট শুধু তাদের একার নয়; এটি পুরো মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ের রক্তক্ষরণ। এ সংকটের ভার বহনের দায়িত্ব সকল মুসলিম রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত দায়িত্ব। সুতরাং ফি-লি-স্তি-নে-র মুসলিমদের জন্য আমাদের বিভিন্ন ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব, যা তাদের সাহায্য করতে এবং তাদের সংগ্রামে সমর্থন প্রদান করতে সাহায্য করতে পারে। কিছু সম্ভাব্য পদক্ষেপ হতে পারে:
.
(১). সর্বপ্রথম কাজ হচ্ছে নিজেকে পরিশুদ্ধ করা। দুঃখজনক হলেও সত্যি আজকের এই সময়ে মানুষের মধ্যে আল্লাহভীতির বড়ই অভাব। অথচ পরকালীন সফলতা অর্জন করার জন্য দু’টি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, নিজের আত্মা ও চরিত্রকে পরিশুদ্ধ করা এবং দ্বিতীয়ত, আল্লাহ পাককে যথাযথভাবে ভয় করা (সূরা বাকারাহ: ১৮৯, সূরা আ‘লা: ১৪; সূরা শামস: ৯)। নিজের আত্মশুদ্ধি লাভের জন্য অন্তরে আল্লাহভীতির উপস্থিতি অপরিহার্য। আসলে এই দুই বিষয় একে অপরের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। যখন অন্তরে আল্লাহভীতি থাকে তখন মানুষ যাবতীয় পাপাচার থেকে বিরত থাকে এবং এই বিরতির পরিণতিই তাকে আত্মিক পরিশুদ্ধতার দিকে নিয়ে যায়।
.
(২). প্রত্যেক মুসলিমের জানা উচিত যে ফি-লি-স্তি-নি-দে-র বর্তমান সংকট শুধু তাদের একার নয়; এটি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ। এই সংকটের সমাধান ও তার ভার বহনের দায়িত্ব আমাদের সকলের, ঠিক যেমন এক দেহের কোনো অঙ্গ আঘাতপ্রাপ্ত হলে সারা দেহে যন্ত্রণার অনুভূতি হয়। তাই ফি-লি-স্তি-নে-র পক্ষে আমাদের ঐক্যবদ্ধ ও আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি।”
.
(৩). জুলুম নির্যাতনে ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিম ভাই-বোনদের জন্য দু’আ এবং তাতে মনোযোগী হওয়া। দু’আর অন্যতম শ্রেষ্ঠ রূপ হলো সালাতের সিজদায়, দোয়া কবুলের সময় গুলোতে দু’আ করা, কুনুত পাঠ করা। দু’আ এমন এক শক্তিশালী মাধ্যম যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে শত্রুদের উপর বিজয় দান করেন।” হাদিসে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:”তোমাদের দুর্বলদের কারণেই তোমাদেরকে সাহায্য করা হয় এবং রুযী দেওয়া হয়।’’(তিরমিযী হা/১৭০২, আবূ দাউদ হা/২৫৯৪: রিয়াদুস সলেহিন হা/২৭৭) অপর বর্ননায় আল্লাহ্‌র নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আল্লাহ্ তা‘আলা এ উম্মতকে সাহায্য করেন তার দুর্বলদের দ্বারা, তাদের দু‘আ, সালাত এবং ইখলাসের কারণে।”(সুনানে নাসাঈ হা/৩১৭৮)
.
(৪). নির্যাতিত অসহায় মুসলিম ভাই-বোনদের জন্য যাকাতের অর্থ সাধারণ দান সদকা সংগ্রহ করুন এবং বিশ্বস্ত মাধ্যমে তাদের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থা করা। অভাবীদেরকে সাহায্য করা, গরীব-মিসকীনকে দান করা উত্তম নেক আমল ও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “সর্বোত্তম আমল হচ্ছে একজন মুমিনের মনে খুশি প্রবেশ করানো: আপনি তার লজ্জাস্থান আবৃত করলেন, তার ক্ষুধা দূর করলেন কিংবা তার কোন প্রয়োজন পূরণ করলেন।”(আল-মুজাম আত্‌-তাবারানী; ৫/২০২: ইমাম আলবানী ‘সহিহুত তারগীব’ হা/২০৯০)
.
(৫). ইসলামী দাতব্য সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত, কার্যকর ও টেকসই করে গড়ে তোলা প্রয়োজন যাতে তারা দরিদ্র-নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে এবং মানবতার কল্যাণে বাস্তব ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।”
.
(৬). দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবতা নয় বরং এটি ঈমানের দাবিও। এই সাহায্য এবং দুর্বলদের পাশে দাঁড়ানোর উপায়ের মধ্যে গণমাধ্যম একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম, যার মাধ্যমে সত্যকে তুলে ধরা যায় এবং বিশ্ববাসীর সামনে ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিমদের ওপর চলমান জুলুম, নিপীড়ন ও আগ্রাসনের নির্মম চিত্র স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা যায়। এই চেতনা জাগ্রত করাই আজকের সময়ের এক অপরিহার্য দায়িত্ব।”
.
(৭). কুরআন সুন্নাহ সম্পর্কে জ্ঞানী, দাঈ, খতীব ও লেখকদের প্রতি আমাদের আহ্বান তারা যেন সাহসিকতার সঙ্গে বর্তমান সময়ের জুলুম ও অবিচারের চিত্র তুলে ধরেন, আমাদের দায়িত্বে গাফিলতির বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন এবং উম্মতকে পবিত্র স্থানসমূহ রক্ষা ও পুনরুদ্ধারের জন্য জাগ্রত ও উজ্জীবিত করেন।”
.
(৮). মুমিনের অন্তরে সর্বদা জিহাদের প্রতি এক গভীর আকাঙ্ক্ষা ও প্রস্তুতি থাকা আবশ্যক যেন মুসলিম শাসকের পক্ষ থেকে আহ্বান এলেই সে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আল্লাহর রাস্তায়। কেননা জিহাদে অংশগ্রহণের বাস্তব সামর্থ্য না থাকলেও অন্তরে তার প্রতি আকাঙ্ক্ষা থাকা আবশ্যক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:”যে ব্যক্তি মারা গেল অথচ সে কখনো জিহাদে অংশগ্রহণ করেনি এবং অন্তরেও জিহাদের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেনি, সে এক প্রকার নিফাকের (কপটতার) মধ্যে মৃত্যুবরণ করল।”(সহীহ মুসলিম হা/৩৫৩৩)
.
(৯). মুসলিম সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তোলা যেন তারা দ্বীন-বিদ্বেষী ও ই-হু-দি শত্রুদের চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য ঈমানি চেতনা ও বীরত্বের সাথে প্রস্তুত থাকে।”
.
(১০). ইন্টারনেটের মাধ্যমে ই-হু-দি-দে-র বিরুদ্ধে চলমান মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের জবাবে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা, তাদের সংঘটিত অপরাধের বাস্তবতা বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা এবং মিথ্যা ও অপপ্রচারের বিপরীতে সত্যের দীপ্ত কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা।”
.
(১১). সম্মানিত সাংবাদিক ও মিডিয়া কর্মীদের সাথে যোগাযোগ রাখা এবং তাদের উৎসাহিত করা যেন তারা ন্যায় ও সত্যের পক্ষে দৃঢ়ভাবে কথা বলেন এবং অন্যদেরকে সেই পথে পরিচালিত করতে পারেন।
.
(১২). ই-স-রা-ই-লে-র তৈরী যাবতীয় পণ্য বয়কট করা। কেননা ই-স-রা-ই-লি পণ্যের বয়কট একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। এর মাধ্যমে আমরা নিপীড়িত ফি-লি-স্তি-নি-দে-র প্রতি আমাদের সংহতি জানাতে পারি এবং দখলদারিত্ব ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে অবস্থান নিতে পারি। প্রতিটি বর্জনই একটি বার্তা অন্যায়ের সাথে কোনও আপস নয়।”
.
(১৩). আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফি-লি-স্তি-নে-র অধিকার ও স্বাধীনতার পক্ষে সক্রিয়ভাবে সমর্থন জানানো। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, যেমন জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আঞ্চলিক সংগঠনগুলির মাঝে চিঠি পাঠিয়ে বর্বর ই-হু-দি-দে-র অপরাধ উন্মোচন করা।এবং
ফিলিস্তিনের অধিকার ও স্বাধীনতার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে উত্থাপন করা।”
.
(১৪). পশ্চিমা দেশে বসবাসরত সকল মুসলিম ভাই ও বোনদের প্রতি আমাদের আহ্বান আপনারা নিজ নিজ দেশের নীতিনির্ধারকদের কাছে ন্যায়বিচারের দাবি তুলুন যেন তারা ই-হু-দি-বা-দী নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা গ্রহণ করে এবং ফি-লি-স্তি-ন-সহ বিশ্বের কোথাও যেন মানবাধিকারের লঙ্ঘন না ঘটে, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।”
.
(১৫). ফি-লি-স্তি-নে-র পরিস্থিতি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা: সামাজিক মাধ্যম, সংবাদ মাধ্যম, এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মাধ্যমে বিশ্ববাসীর মধ্যে ফিলিস্তিনের সমস্যাগুলো তুলে ধরা এবং যুদ্ধবিরোধী প্রচারণাকে শক্তিশালী করা।
.
পরিশেষে,”হে বিশ্ব মুসলিম সম্প্রদায়! আপনারা কেন চুপ রয়েছেন? কতদিন পর্যন্ত আপনারা এই পৃথিবীজুড়ে হায়েনা রূপী কিছু পশুর দ্বৈত আচরণ সহ্য করবেন? কোথায় সেই বিশ্বশান্তি সংস্থা? কোথায় মানবাধিকার সংস্থা? কোথায় জাতিসংঘ? তারা কি নিজেদের প্রতিশ্রুতি ভুলে গেছে যা জাতিসংঘ সনদে দেওয়া হয়েছিল, যাতে প্রতিটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং সীমানা সম্পর্কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে? অথচ, ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত অবৈধ ই-হু-দি রাষ্ট্র যার সীমানা এখনও আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত হয়নি, অবৈধভাবে ফি-লি-স্তি-নি-দে-র জমি দখল করে এবং নিরীহ মানুষদের হত্যা করে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করছে। এটি একটি চরম অমানবিকতা, যা শুধু ফি-লি-স্তি-ন নয় বরং পুরো আরব বিশ্বের প্রতি একটি ভয়াবহ আক্রমণ। জা-য়-ন-বা-দী ই-স-রা-ই-লে-র উদ্দেশ্য হল একসময় ইউফ্রেতিস থেকে নীলনদ, লোহিত সাগর থেকে তুর্কির সীমান্ত পর্যন্ত বিশাল অঞ্চল দখল করে বৃহত্তর ই-স-রা-ই-ল প্রতিষ্ঠা করা। তারা এখনো তাদের পরিকল্পনার চূড়ান্ত রূপ দেয়নি, কিন্তু যা কিছু হচ্ছে তা একটি ভয়ানক বাস্তবতা। জাতিসংঘ, ইউরোপ, এবং অন্যান্য পরাশক্তির দেশগুলো তাদের চুপ থাকতে বললেও, ইতিহাস সাক্ষী থাকবে তাদের এই নীরবতা কখনও ক্ষমা করবে না। ধিক, জাতিসংঘ! ধিক, ইউরোপ!” মহান আল্লাহ আমাদের নির্যাতিত ভাই-বোনদের সাহায্য করুন। আমীন!!
▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬
উপস্থাপনায়:
জুয়েল মাহমুদ সালাফি।

April 16, 2025

কুনুতে নাজেলার পরিচয় ও পদ্ধতি এবং মাসায়েল

 নিম্নে কুনুতে নাজেলার পরিচয়, পদ্ধতি এবং এ সংক্রান্ত জরুরি কিছু মাসায়েল সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

১. শব্দের অর্থ ও উদ্দেশ্য
নাজেলা অর্থ: সংকট বা বিপদ।
কুনুত অর্থ: সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে উপযুক্ত দোয়া।
কুনুতে নাজেলা: মুসলিম জাতির উপরে কোনো মারাত্মক বিপদ, দুর্যোগ বা সংকটপূর্ণ পরিস্থিতি যেমন: শত্রুর আক্রমণ, দুর্ভিক্ষ বা মহামারী ইত্যাদি ঘটলে, মুমিনদের নিরাপত্তা ও মঙ্গলের জন্য ফরজ সালাতের মধ্যে বিশেষ পদ্ধতিতে আল্লাহর কাছে দোয়া করা।

২. বিধান: কুনুতে নাজেলা পড়া সুন্নত।

৩. কুনুতে নাজেলা পড়ার পদ্ধতি:

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতে (ফজর, জোহর, আসর, মাগরিব, ইশার) ফরজ সালাতের শেষ রাকাতে রুকু থেকে দাঁড়িয়ে “সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ” বলার পর দুই হাত তুলে কুনুতে নাজেলা পাঠ করা। ফজরের শেষ রাকাতে তা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
৪. ইমাম উঁচু আওয়াজে দোয়া পড়বেন আর মুক্তাদিগণ উঁচু আওয়াজে “আমিন, আমিন” বলবেন। এটি যে কোন নামাজেই হোক।
৫.জুমা নামাজে কুনুতে নাজেলা পড়া যায় কিনা তা দ্বিমতপূর্ণ, তবে অধিক নির্ভরযোগ্য মতে পড়া যায়, ইনশাআল্লাহ।

৬. সুন্নত বা নফল সালাতে কুনুতে নাজেলা পড়া শরিয়তসম্মত নয়।
৭. একাকী নামাজ পড়ার ক্ষেত্রেও উক্ত পদ্ধতিতে কুনুতে নাজেলা পাঠ করা যাবে।
মহিলাও বাড়িতে একাকী সালাতের সময় তা করতে পারেন।
৮. দোয়ার পরে মুখমণ্ডলে হাত না মোছাই ভালো। কারণ দোয়া শেষে হাত মোছার হাদিস অনেক আলেমের মতে জইফ।

৯. পরিস্থিতি অনুযায়ী দোয়া নির্বাচন:

যেসব বিপদ, মুসিবত বা সমস্যা সৃষ্টি হবে, পরিস্থিতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেই ধরণের দোয়া করবেন। এ ক্ষেত্রে একান্ত বিনয়, একাগ্রতা ও কান্না বিজড়িত কন্ঠে, মুমিন-মুসলিমদের কল্যাণের জন্য দোয়া, শত্রু বাহিনী তথা মুসলিমদের উপরে আক্রমণকারী কা***ফিরদের বিরুদ্ধে বদ দোয়া এবং বিপদ-মুসিবত থেকে আল্লাহর কাছে পরিত্রাণ প্রার্থনা করবে।

১০. কুরআন-হাদিসে বর্ণিত দুয়াগুলোর পাশাপাশি নিজের ভাষাতেও দোয়া করা যাবে।
১১.প্রয়োজন বোধে কয়েকদিন যাবত অব্যাহতভাবে দোয়া করা যাবে।
১২. জামাতে সালাতে অতিরিক্ত দীর্ঘ দোয়া করা উচিত নয়, যাতে সাধারণ মুসল্লিদের কষ্ট হয়।
আল্লাহু আলাম।
– আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল –

নবীদের ১০টি দুআ

নবীদের (আলাইহিমুস সালাম)-এর ১০টি দুআ
নিম্নে কুরআনে বর্ণিত ১০ জন নবীর ১০টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুআ উল্লেখ করা হলো:
❂ ১. আদম (আলাইহিস সালাম)-এর দুআ:
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমরা আমাদের নিজেদের প্রতি জুলুম করেছি। আপনি যদি আমাদের ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন, তাহলে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।” [সূরা আরাফ: ২৩]
❂ ২. নুহ (আলাইহিস সালাম)-এর দুআ:
رَبِّ اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيْتِيَ مُؤْمِنًا وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
অর্থ: “হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতামাতাকে, আমার ঘরে প্রবেশকারী মুমিনদের এবং সমস্ত মুমিন পুরুষ ও নারীদের ক্ষমা করুন।” [সূরা নূহ: ২৮]
❂ ৩. আইয়ুব (আলাইহিস সালাম)-এর দুআ:
رَبِّ إِنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
অর্থ: “হে আমার রব! আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি দয়ালুদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।” [সূরা আম্বিয়া: ৮৩]
❂ ৪. শুয়াইব (আলাইহিস সালাম)-এর দুআ:
رَبَّنَا افْتَحْ بَيْنَنَا وَبَيْنَ قَوْمِنَا بِالْحَقِّ وَأَنتَ خَيْرُ الْفَاتِحِينَ
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদের ও আমাদের কওমের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত ফয়সালা করে দিন, আর আপনিই শ্রেষ্ঠ ফায়সালা কারী।” [সূরা আরাফ: ৮৯]
❂ ৫. মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর দুআ:
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
অর্থ: “হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণ নাজিল করেন, আমি তার প্রতি অতীব অভাবগ্রস্ত।” [সূরা কাসাস: ২৪]
❂ ৬. ইউনুস (আলাইহিস সালাম)-এর দুআ:
لَا إِلَهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
অর্থ: “আপনি ছাড়া প্রকৃত কোনও ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র; নিঃসন্দেহে আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।” [সূরা আম্বিয়া: ৮৭]
❂ ৭. ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর দুআ:
أَنتَ وَلِيِّي فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ تَوَفَّنِي مُسْلِمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ
অর্থ: “আপনি আমার অভিভাবক দুনিয়াতে ও আখিরাতে। আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুন।” [সূরা ইউসুফ: ১০১]
❂ ৮. ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম)-এর দুআ:
رَبِّ اجْعَلْنِي مُقِيمَ الصَّلَاةِ وَمِن ذُرِّيَّتِي رَبَّنَا وَتَقَبَّلْ دُعَاءِ
অর্থ: “হে আমার রব! আমাকে ও আমার বংশধরদের সালাত কায়েম কারী বানান। হে আমাদের রব! আপনি আমার দুআ কবুল করুন।” [সূরা ইবরাহিম: ৪০]
❂ ৯. ইসা আলাইহিস সালাম-এর দুআ:
رَبَّنَا أَنزِلْ عَلَيْنَا مَائِدَةً مِّنَ السَّمَاءِ تَكُونُ لَنَا عِيدًا لِّأَوَّلِنَا وَآخِرِنَا وَآيَةً مِّنكَ ۖ وَارْزُقْنَا وَأَنتَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ
“হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের প্রতি আকাশ থেকে খাদ্য ভর্তি খাঞ্চা অবতরণ করুন। তা আমাদের জন্য হবে ঈদ-আমাদের অগ্রগামীদের জন্য ও পশ্চাদগামীদের জন্য এবং তা হবে আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন। আপনি আমাদের রিজিক দান করুন। আপনিই শ্রেষ্ঠ রিজিক দানকারী।” [সূরা মায়িদা: ১১৪]
❂ ১০. মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দুআ:
رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থ: “হে আমাদের রব! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দিন, আখিরাতে কল্যাণ দিন এবং আমাদের জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা করুন।” [সূরা বাকারা: ২০১]

(সংগৃহীত ও পরিমার্জিত) আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল। 

ওয়াজ-নসিহত, বক্তব্য ও আলোচনার পরে দোয়া করার বিধান

 প্রশ্ন: কখনও কখনও বক্তা বক্তব্য বা দারস (শিক্ষামূলক আলোচনা) শেষ করার পর হাত তুলে দোয়া করেন। এমন ক্ষেত্রে আমরা কি ঐ দোয়ার আসরে উপস্থিত থাকব নাকি দোয়া শুরু হওয়ার আগেই অনুষ্ঠান ত্যাগ করব? অনুগ্রহ করে আমাদের দিকনির্দেশনা দিন। আল্লাহ আপনাকে উত্তম বিনিময় দান করুন।

উত্তর:

لا بأس بالدعاء بعد المحاضرة، أو بعد الموعظة والذكرى؛ لا بأس بالدعاء، يدعو الله للحاضرين بالتوفيق والهداية، وصلاح النية والعمل، لكن رفع اليدين في مثل هذا لا أعلم فيه دليلًا، ولا أعلم أنه ورد عن النبي ﷺ إلا العموم، عموم رفع اليدين بالدعاء، وأنه من أسباب الإجابة، لكن لم أحفظ عنه ﷺ أنه كان بعدما يعظ الناس ويذكرهم كان يرفع يديه ويدعو، ولو كان هذا يفعله؛ لنقل، لنقله الصحابة -رضي الله عنهم- فإنهم ما تركوا شيئًا إلا نقلوه -رضي الله عنهم
فالأولى والأحوط عدم الرفع في مثل هذا، إلا إذا وجد دليلًا يدل على ذلك، أما كونه يدعو لهم بعدما يفرغ يقول: غفر الله لنا ولكم، أو وفقنا الله وإياكم، أو نفعنا الله وإياكم بما سمعنا، أو ما أشبه هذا؛ هذا لا بأس به، وإذا أمنوا فلا بأس بذلك

“বক্তব্য বা শিক্ষামূলক আলোচনার পরে দোয়া করা জায়েজ। বক্তা আল্লাহর কাছে উপস্থিত শ্রোতাদের জন্য তাওফিক, হেদায়েত, সৎ উদ্দেশ্য ও সৎকর্মের জন্য দোয়া করতে পারেন। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে হাত তোলা সংক্রান্ত কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ আমি জানি না। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর থেকে এরকম কোনো প্রচলন পাওয়া যায়নি, যদিও দোয়ার জন্য হাত তোলা সাধারণভাবে অনুমোদিত এবং তা দোয়া কবুলের অন্যতম উপায়।

তবে আমি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষ থেকে এমনটি সংরক্ষণ করিনি যে, তিনি মানুষকে উপদেশ দেওয়ার পরে হাত তুলে দোয়া করতেন। যদি তিনি এমনটি করতেন তবে সাহাবায়ে কেরাম তা বর্ণনা করতেন। কেননা তারা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কোনো বিষয়ই বাদ দেননি।

তাই এই ক্ষেত্রে হাত না তোলা উত্তম এবং সতর্কতামূলক। তবে যদি এ ব্যাপারে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হবে। আলোচনার শেষে বক্তা যদি বলেন, “আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের জন্য ক্ষমা করুন” অথবা “আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের তাওফিক দিন” কিংবা “আল্লাহ আমাদের এবং আপনাদের শোনা কথার দ্বারা উপকৃত করুন” ইত্যাদি। এতে কোনো সমস্যা নেই। শ্রোতারা যদি আমিন বলেন তাতেও কোনো অসুবিধা নেই।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ.
অনুবাদ: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ইতিকাফ কী এবং এর নির্দিষ্ট কোনো সময় আছে কি

 প্রশ্ন: ইতিকাফ কী? এর নির্দিষ্ট কোনো সময় আছে কি?

উত্তর: ইতিকাফ একটি সুন্নত ইবাদত। এটি মূলত আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করে ইবাদতে মনোযোগী হওয়া, তা রাত হোক বা দিন, এক ঘণ্টা হোক বা এক দিন, এক রাত বা একাধিক দিন-রাত হোক।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

وَلا تُبَاشِرُوهُنَّ وَأَنْتُمْ عَاكِفُونَ فِي الْمَسَاجِدِ

“তোমরা স্ত্রীদের সঙ্গে মিলিত হয়ো না, যখন তোমরা মসজিদে ইতিকাফরত থাকবে।”
[সূরা বাকারা: ১৮৭]

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণত রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। তবে কোনো বছর কিছু কারণে তা করতে না পারলে তিনি শাওয়ালের প্রথম দশকে ইতিকাফ করতেন।

ইতিকাফ সুন্নত এবং এটি রমজানে করা উত্তম, বিশেষত শেষ দশকে।

রমজান ব্যতীত অন্য মাসেও (যেমন শাওয়াল, জিলকদ, জিলহজ, মহররম ইত্যাদি) ইতিকাফ করা জায়েজ। তবে ইতিকাফ অবশ্যই মসজিদে হতে হবে, যেখানে জামাতের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়।

যদি ইতিকাফের সময় এক সপ্তাহের বেশি হয় এবং তার মাঝে জুমার দিন আসে, তাহলে উত্তম হলো এমন মসজিদে ইতিকাফ করা যেখানে জুমার নামাজ হয়, যাতে জুমার জন্য বের হতে না হয়। তবে যদি এমন মসজিদে ইতিকাফ করা হয় যেখানে জুমা হয় না, তাহলে জুমার দিন বাইরে গিয়ে নামাজ আদায় করা জায়েজ।

ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য হলো, একাগ্রচিত্তে ইবাদত করা, আল্লাহর ধ্যান-জিকিরে মনোযোগী হওয়া এবং আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা।
কেউ কেউ বলেছেন: “ইতিকাফ মানে হলো সকল সৃষ্টি থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে স্রষ্টার ইবাদতে নিজেকে নিয়োজিত করা।”

🟢 সারসংক্ষেপ হলো, ইতিকাফের সময় মূলত নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া এবং অন্যান্য ইবাদতে মনোযোগী হওয়া। তবে পরিবারের সদস্যরা বা বন্ধু-বান্ধব কেউ ইতিকাফকারীর সাথে সাক্ষাৎ করতে এলে কোনো সমস্যা নেই। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীগণ সাক্ষাৎ করতেন।

✅ এতেকাফের নির্দিষ্ট কোন সময়সীমা নেই:

ইতিকাফের নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। এমনকি এক ঘণ্টার জন্যও করা যায়। এটির জন্য রোজা রাখা শর্ত নয়। কেউ যদি রোজা ছাড়া ইতিকাফ করে, তাতেও কোনো সমস্যা নেই। যদিও কিছু আলিম বলেছেন, ইতিকাফের জন্য রোজা থাকা আবশ্যক, তবে এটি সঠিক মত নয়। আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে: “রোজা ছাড়া ইতিকাফ নেই।” তবে ইবন আব্বাস (রা.) বলেছেন: “ইতিকাফকারীর জন্য রোজা রাখা আবশ্যক নয়, যদি না সে নিজে তা নিজের ওপর বাধ্যতামূলক করে নেয়।”

মূল কথা হলো, ইতিকাফের জন্য রোজা শর্ত নয়, কারণ ইবাদতগুলো শরিয়তের বিধানের ওপর নির্ভরশীল, আর কোরআন-হাদিসে ইতিকাফের জন্য রোজাকে আবশ্যক করার কোনো প্রমাণ নেই।

সুতরাং কেউ রোজা রেখেও ইতিকাফ করতে পারে, আবার রোজা ছাড়া করলেও সমস্যা নেই। ইতিকাফ দিনের বেলা বা রাতেও করা যায়। এর প্রমাণ হলো, উমর (রা.) একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন:
إني نذرت في الجاهلية أن أعتكف ليلة في المسجد الحرام، فقال له: أوف بنذرك، قال له النبي ﷺ أوف بنذرك،
“আমি জাহেলি যুগে মানত করেছিলাম যে, মসজিদুল হারামে এক রাত ইতিকাফ করব।”
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: “তাহলে তোমার মানত পূরণ করো।” অথচ রাত রোজার সময় নয়।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
মূল: ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ)।
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

Translate