December 15, 2024

আত্মহত্যা কারী ব্যক্তিকে কি সাধারণ মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা যাবে

 প্রশ্ন: আত্মহত্যা কারী ব্যক্তিকে কি সাধারণ মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করা যাবে?

উত্তর: নিঃসন্দেহে আত্মহত্যা করা কবিরা গুনাহ। তবে এ কারণে আত্মহত্যা কারী ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফির-মুরতাদ হয়ে যায় না। তাই তার গোসল, জানাজা এবং কাফন-দাফনে কোন বাধা নেই। অনুরূপভাবে তার লাশ মুসলিমদের সামাজিক গোরস্থানে দাফন করতেও কোনো সমস্যা নেই। তবে সমাজের মান্যগণ্য আলেম-ওলামা, ইমাম, উচ্চপদস্থ দায়িত্বশীল এবং সর্বগ্রাহ্য শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিবর্গ এ সব কাজ থেকে বিরত থাকাই ভালো। যেন সর্বসাধারণ আত্মহত্যাকে মারাত্মক অন্যায় এবং ঘৃণ্য কাজ হিসেবে বুঝাতে পারে।❑ সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি এবং বিশ্ববরেণ্য ফকিহ আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায-এর ফতোয়া:

প্রশ্ন: আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির কি গোসল এবং জানাজার নামাজ পড়া যাবে?
উত্তর:
قاتل نفسه يغسل، ويصلى عليه، ويدفن مع المسلمين؛ لأنه عاص ما هو كافر، قتل النفس معصية، ما كفر، فإذا قتل نفسه -والعياذ بالله- يغسل، ويصلى عليه، ويكفن، ويصلى عليه، ويدفن مع المسلمين، لكن ينبغي للإمام الأكبر، ولمن له أهمية أن يترك الصلاة عليه من باب الإنكار، لئلا يظن أنه راض عن عمله.
فالإمام الأكبر السلطان، أو القضاة، أو رئيس البلد، وقاضي البلد، أو أميرها إذا ترك ذلك من باب إنكار هذا الشيء، وإعلان أن هذا خطأ؛ فهذا حسن، ولكن يصلي عليه بعض المسلمين

“যে ব্যক্তি আত্মহত্যা করে তাকে গোসল দিতে হবে, তার জানাজা পড়তে হবে এবং তাকে মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করতে হবে। কারণ আত্মহত্যা একটি গুনাহ তবে কাফির হওয়ার মতো নয়। তাই আত্মহত্যা করলে (আল্লাহর নিকট এ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি) তাকে গোসল করাতে হবে, তাকে কাফন পরাতে হবে, তার জানাজা পরাতে হবে এবং মুসলিমদের কবরস্থানে দাফন করতে হবে। তবে বড় ইমাম বা অন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির উচিত, এই অন্যায়ের প্রতিবাদস্বরূপ তার জানাজায় অংশগ্রহণ না করা। যেন এই ধারণা সৃষ্টি না হয় যে, তিনি এতে সন্তুষ্ট।

সুতরাং বড় ইমাম, সুলতান, কাজি (বিচারক) বা দেশের প্রধান যদি এই কাজটির নিন্দা ও প্রতিবাদ হিসেবে এ থেকে বিরত থাকে এবং এটাকে অন্যায় বলে ঘোষণা করে তাহলে তা ভালো। তবে অন্য কিছু মুসলিম তার জন্য জানাজা পড়বে।” [উৎস শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায রহ. এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট]
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

শ্বশুর বাড়িতে যদি নানা ধরণের শিরক বিদআত ও পাপাচার সংঘটিত হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে একজন পুত্রবধূর করণীয়

 শ্বশুর বাড়িতে যদি নানা ধরণের শিরক, বিদআত, অনৈসলামিক ও হারাম কার্যক্রম এবং পাপাচার সংঘটিত হয় তাহলে সে ক্ষেত্রে একজন পুত্রবধূর করণীয়।

প্রশ্ন: আমার শ্বশুর বাড়ির ফ্যামিলির সবাই শিরক-বিদআতে লিপ্ত। তারা পীর ভক্ত। মাজারে যায়‌। এমনকি মৃত পীরের ছবি ফ্রেমে বেধে ঘরে ঝুলিয়ে রাখে। তাবিজ-সুতা ইত্যাদিতে বিশ্বাস করে। মিলাদ, কিয়াম, চল্লিশা সহ নানা রকম বিদআতি কাজ করে। আমি তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করি। কিন্তু তারা কিছুতেই বুঝতে চায় না‌। আমি এসব কাজে বাধা দিলে অনেক কথা শুনায় (আমার, আমার সন্তানদের ক্ষতি হবে এরকম বদ দুআর মতো কথা বলে)। নামাজ,পর্দার গুরুত্ব বুঝে না। আমার সামনে তারা এসব করলে আমি সইতে পারি না। কান্না আসে। এসব পরিবেশের কারণে মাঝে মাঝে নিজের ঈমান দুর্বল হয়ে যায়। কিচ্ছু ভালো লাগে না। আমলে স্বাদ পাই না। অস্থির লাগে। কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। আমার স্বামী ঢাকাতে ছোট্ট একটা জব করে। আমি আমার স্বামীর সাথে থাকতে চাই। কিন্তু বাড়িতে আমার শাশুড়ি চান, আমার সন্তানদের নিয়ে আমি তার কাছে থাকি। কাজে একটু হেল্প করি। কাছে না থাকলে তার মনে কষ্ট। যেহেতু উনার বয়স হয়ে যাচ্ছে। এখন আমি কী করতে পারি?
উত্তর: আপনার শ্বশুর বাড়িতে যদি নানা ধরনের শিরক, বিদআত, অনৈসলামিক ও হারাম কার্যক্রম এবং পাপাচার সংঘটিত হয় তাহলে যথাসম্ভব দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়া আবশ্যক যদি তাদেরকে সংশোধন করা সম্ভব না হয় বা তাদের কাছে থাকার কারণে নিজের ঈমান, আমল ও আখলাক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে আপনার মাধ্যমে যদি তাদের মধ্যে সংশোধনী ও পরিবর্তন আনা সম্ভব হয় তাহলে দাওয়াতের উদ্দেশ্যে সেখানে থাকা উত্তম। কারণ হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, আপনার মাধ্যমে যদি একটি মানুষও সঠিক পথ প্রাপ্ত হয় তাহলে তা হবে আপনার জন্য একটি লাল উট পাওয়ার থেকে উত্তম।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لَأَنْ يَهْدِيَ اللَّهُ بِكَ رَجُلًا وَاحِدًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ

“তোমার মাধ্যমে যদি আল্লাহ একজন লোককেও হেদায়েত দেন তবে তা তোমার জন্য একটি লাল উট পাওয়া থেকেও উত্তম।” [সহিহ বুখারী]

যাহোক, আপনার স্বামী যেহেতু দূরে থাকেন সেহেতু সম্ভব হলে আপনি আপনার স্বামীর কাছে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন। এক্ষেত্রে আপনার স্বামীর জন্য আবশ্যক হচ্ছে, আপনাকে এমন পাপ-পঙ্কিল পরিবেশ থেকে রক্ষা করা। তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবে তা না করলে গুনাহগার হবে। কারণ মহান আল্লাহ তাকে তার স্ত্রী পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল বানিয়েছেন এবং কিয়ামতের দিন তাকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।

◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,

الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ بِمَا فَضَّلَ اللَّـهُ بَعْضَهُمْ عَلَىٰ بَعْضٍ وَبِمَا أَنفَقُوا مِنْ أَمْوَالِهِمْ

“পুরুষেরা নারীদের উপর কর্তৃত্ব শীল (দায়িত্ববান) এ জন্য যে, আল্লাহ একের উপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে।” [সূরা নিসা: ৩৪]

◈ তাছাড়া আল্লাহ তাআলা পুরুষকে আদেশ করেছেন যেন, সে নিজে জাহান্নাম থেকে বাঁচার পাশাপাশি যেন তার স্ত্রী-পরিবারকেও বাঁচায়।

আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا

“হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা কর।” [সূরা তাহরীম: ৬]

◈ মহান আল্লাহ কেবল দায়িত্ব দিয়েই ক্ষান্ত হননি বরং তিনি তাকে কিয়ামতের দিন তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। যেমন: হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

ইবনে উমর রা.সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন,

أَلاَ كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ : وَالرَّجُلُ رَاعٍ عَلَى أَهْلِ بَيْتِهِ وَهُوَ مَسْئُولٌ عَنْهُمْ”‏ ‏

“জেনে রাখো, তোমাদের প্রত্যেকেই একেকজন দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার অধীনস্থদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। …একজন পুরুষ তার পরিবার (স্ত্রী-সন্তানদের) উপর দায়িত্বশীল। সে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” [সহিহ মুসলিম]

কিন্তু আপনার স্বামীর আর্থিক সংকট বা বিশেষ কোনও কারণে যদি আপনাকে তার সাথে রাখা সম্ভব না হয় তাহলে আপনার নিজের বাবার বাড়িতে অথবা আলাদা বাসা ভাড়া করে থাকার চেষ্টা করবেন।

উল্লেখ্য যে, আপনি সেখান থেকে চলে যাওয়ার কারণে আপনার স্বামীর বাবা-মা অসন্তুষ্ট হলেও এতে আপনি গুনাহগার হবেন না। কারণ সেখানে থাকা এবং তাদের সেবা করা আপনার জন্য ইসলাম আবশ্যক করেনি। উপরন্তু তাদের এমন পরিবেশে থাকার কারণে আপনার ঈমান-আকিদা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

যাহোক, এগুলোর কোনটাই সম্ভব না হলে তখন ধৈর্যের সাথে সেখানেই থাকবেন কিন্তু নিজেকে সর্বোচ্চ শিরক-বিদআত ও অন্যান্য পাপাচার থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করবেন।

এক্ষেত্রে আপনি নিরুপায়। আর لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا “আল্লাহ তায়ালা বান্দার উপরে সাধ্যাতীত কোনও দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না।” [সূরা বাকারা ২৮৬ নম্বর আয়াত]
আল্লাহ সব ধরনের অকল্যাণ থেকে আপনাকে হেফাজত করুন এবং তার দ্বীনের উপরে মৃত্যু অবধি অবিচল রাখুন এই দোয়া করি। আমিন।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

যুদ্ধ কামনা করা নিষেধ তবে যুদ্ধ বেধে গেলে শত্রুর মোকাবেলায় অবিচল থাকা আবশ্যক

 ◈ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

أَيُّهَا النَّاسُ، لاَ تَتَمَنَّوْا لِقَاءَ العَدُوِّ، وَسَلُوا اللَّهَ العَافِيَةَ، فَإِذَا لَقِيتُمُوهُمْ فَاصْبِرُوا، وَاعْلَمُوا أَنَّ الجَنَّةَ تَحْتَ ظِلاَلِ السُّيُوفِ

‘‘হে লোক সকল, তোমরা আল্লাহর দুশমনের সাথে যুদ্ধ কামনা করো না। বরং আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা প্রার্থনা করো। তবে যদি যুদ্ধের সম্মুখীন হয়ে যাও তবে ধৈর্য ধারণ করবে (অবিচল থাকবে।) আর জেনে রাখবে, জান্নাত হলো, তরবারির ছায়াতলে।’’
[সহীহ বুখারী/২৯৬৬,মাকতাবা শামেলা]

◈ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন,

لَا تَتَمَنَّوْا لِقَاءَ الْعَدُوِّ وَسَلُوْا اللهَ الْعَافِيَةَ فَإِذَا لَقِيْتُمُوْهُمْ فَاصْبِرُوْا وَاعْلَمُوْا أَنَّ الْجَنَّةَ تَحْتَ ظِلَالِ السُّيُوفِ ثُمَّ قَالَ اللَّهُمَّ مُنْزِلَ الْكِتَابِ وَمُجْرِيَ السَّحَابِ وَهَازِمَ الأَحْزَابِ اهْزِمْهُمْ وَانْصُرْنَا عَلَيْهِمْ

‘’তোমরা শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করো না। বরং আল্লাহর নিকট নিরাপত্তা প্রার্থনা করো। আর যদি তাদের সম্মুখীন হয়ে যাও, তাহলে ধৈর্যধারণ করবে (অবিচল থাকবে।) জেনে রেখো, তরবারির ছায়ার নিচে রয়েছে জান্নাত। এরপর তিনি বলেন, হে আল্লাহ, কুরআন অবতরণকারী, মেঘমালা পরিচালনাকারী, শত্রুদলকে পরাভূত কারী, আপনি শত্রুদের পরাভূত করে আমাদেরকে তাদের উপর বিজয় দান করুন।”[সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়: ৫৬/ জিহাদ ও যুদ্ধকালীন আচার-ব্যবহার, পরিচ্ছেদ: ৫৬/১১২. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিনের প্রথমাংশে যুদ্ধ শুরু না করলে সূর্য ঢলা পর্যন্ত বিলম্ব করতেন]

❑ হাদিসটির ব্যাখ্যা:

❂ সহিহ বুখারির ভাষ্যকার ইবনে বাত্তাল বলেছেন,

حكمة النهي أن المرء لا يعلم ما يئول إليه الأمر، وهو نظير سؤال العافية من الفتن.

“এই নিষেধের পিছনে যে হেকমত বা জ্ঞানগত কারণ রয়েছে তা হল, মানুষ জানে না যে, কোন বিষয়ের পরিণতি কী হবে। এটি এমন, যেমন কেউ ফিতনা বা বিপদ থেকে নিরাপত্তা কামনা করে।”
অর্থাৎ শত্রুর মুখোমুখি হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করতে নিষেধ করার কারণ হল, যুদ্ধের ফলাফল ভালো হবে নাকি মন্দ হবে, এতে বিজয় অর্জিত হবে নাকি পরাজয় ঘটবে সে সম্পর্কে তার ভবিষ্যৎ জ্ঞান নেই। এটা এটা ঠিক তেমন যেমন কেউ চায় যে, সে ফিতনা বা বিপদ থেকে নিরাপদ থাকুক।

❂ আবু বকর সিদ্দিক রা. বলেন,

لأن أعافى فأشكر أحب إلي من أن أبتلى فأصبر

“আমি সুস্থ ও নিরাপদ থেকে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব-এটা আমার কাছে বেশি পছন্দনীয় অসুস্থ বা বিপদের সম্মুখীন হওয়ার পর ধৈর্য ধরার চেয়ে।”

❂ কোনো কোনো মুহাদ্দিস উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,

إنما نهى عن تمني لقاء العدو لما فيه من صورة الإعجاب والاتكال على النفوس والوثوق بالقوة وقلة الاهتمام بالعدو ، وكل ذلك يباين الاحتياط والأخذ بالحزم.

“শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধ করার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে এজন্য যে, এতে আত্মতুষ্টি, নিজের শক্তির উপর নির্ভরশীলতা, শত্রুকে হালকা করে দেখা ইত্যাদি মনোভাব গোপন থাকে। আর এ সব কিছু সতর্কতা অবলম্বন ও ঝুঁকি এড়ানোর বিপরীত।” [islamweb]

❂ সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায কে “তোমরা আল্লাহর দুশমনের সাথে যুদ্ধ কামনা করো না” হাদিসটির ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি উত্তরে বলেন,

حمله العلماءُ على أنَّ المراد: على سبيل العجب بالنَّفس، على سبيل الثِّقة بالنفس، ونحو ذلك.

أما إذا تمنى لقاء العدو؛ رغبةً في الجهاد، أو رغبةً في الشَّهادة في سبيل الله، فهو يبدأ بالجهاد؛ لأنَّ الرسول حثَّ على الجهاد ورغَّب فيه: مَن مات ولم يغزُ، ولم يُحدِّث نفسه بالغزو؛ مات على شُعبةٍ من النِّفاق.

فالنَّهي عن التَّمني ليس على إطلاقه، وإنما المراد التَّمني الذي يصحبه فخر وخُيلاء، أو ثقة بالنفس، أما مَن يتمنى أن يحضر الجهاد، ويُجاهد في سبيل الله، وأن يلقى عدو الله؛ فلا بأس به، وليس داخلًا في النَّهي هذا

আলেমগণ বলেন যে, এ হাদিসের মূল অর্থ হল, আত্মতুষ্টি ও (আল্লাহর শক্তি এবং সাহায্যের পরিবর্তে) নিজের প্রতি আস্থা রাখা হলে শত্রুর সাথে যুদ্ধ কামনা করা নিষেধ। কিন্তু যদি কেউ শত্রুর সাথে যুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করে, জিহাদ করার জন্য বা আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হওয়ার জন্য তাহলে সে জিহাদ শুরু করতে পারে। কারণ রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিহাদের প্রতি উৎসাহিত করেছেন এবং এর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন,

مَن مات ولم يغزُ، ولم يُحدِّث نفسه بالغزو؛ مات على شُعبةٍ من النِّفاق

“যে ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করল অথচ (জীবদ্দশায়) জি**হাদে অংশগ্রহণ করেনি বা জিহাদ করার ইচ্ছা পোষণও করেনি সে নিফাকের (মুনাফেকির) একটি শাখায় মৃত্যুবরণ করল।”
সুতরাং যুদ্ধের আকাঙ্ক্ষা করা সাধারণভাবে নিষিদ্ধ নয়। বরং যে আকাঙ্ক্ষার সাথে অহংকার, দাম্ভিকতা বা আত্মতুষ্টি মিশে থাকে সেই আকাঙ্ক্ষা নিষিদ্ধ। কিন্তু যে ব্যক্তি এ আকাঙ্ক্ষা করবে যে, সে জি**হাদে অংশগ্রহণ করবে, আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধ করবে এবং আল্লাহর শত্রুর মুখোমুখি হবে তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই। এটা এই নিষেধের আওতাভুক্ত নয়।” [binbaz]

❑ কা**ফেরদের সাথে যুদ্ধ বেধে গেলে শত্রুর মোকাবেলায় সর্বশক্তি দিয়ে অবিচল থাকতে হবে। যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া হারাম ও কবিরা গুনাহ:

হাদিসে আগ বাড়িয়ে যুদ্ধ কামনা করতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে তারা যুদ্ধ বাধিয়ে দিলে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে হবে। প্রাণ ভয়ে পালানো হারাম ও কবিরা গুনাহ। (বিশেষ কিছু শর্ত ছাড়া)। কেননা রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানোকে ৭টি ধ্বংসাত্মক কাজের অন্তর্ভূক্ত বলে গণ্য করেছেন। তিনি বলেন,

আবু হুরাইরা রা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত। তিনি বলেছেন,

اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ ‏”‏‏.‏ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ قَالَ ‏”‏ الشِّرْكُ بِاللَّهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلاَتِ ‏”‏‏.‏

“তোমরা সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় হতে বেঁচে থাক। তারা বললেন, হে আল্লাহর রসুল, সেগুলো কী কী? তিনি বললেন,
১. আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা,
২. জাদু করা
৩. যথার্থ কারণ ছাড়া কাউকে হত্যা করা যা আল্লাহ হারাম করেছেন,
৪. সুদ খাওয়া,
৫. এতিম শিশুর অর্থ-সম্পদ আত্মসাৎ করা
৬. জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা
৭ সাধ্বী-সাধ্বী সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ দেওয়া।”
[সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়: ৮৬/ দণ্ডবিধি, পরিচ্ছেদ: ৮৬/৪৫. সাধ্বী নারীদের প্রতি অপবাদ দেওয়া]

মোটকথা, আল্লাহর দুশমনদের সাথে মুসলিমদের যুদ্ধ শুরু হলে স্পাত-কঠিন দৃঢ়তা এবং পরম ধৈর্যের সাথে সর্বশক্তি দিয়ে শত্রুকে প্রতিহত করত হবে। মহান আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকবেন-এটা তার প্রতিশ্রুতি। ‘হয় বিজয় না হয় শাহাদাত’-এ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। মনে রাখতে হবে, মুসলিম রাষ্ট্রকে শত্রু আগ্রাসন হাত থেকে রক্ষা, আল্লাহর দ্বীনকে হেফাজত বা বিজয়ী করার জন্য যুদ্ধ করার এবং এ পথে শহিদ হওয়ার মর্যাদা অপরিসীম। আল্লাহু আলাম।

মহান আল্লাহ মুসলিম জাতিকে জি*হাদি বলে বলিয়ান হওয়ার তওফিক দান করুন, তাদেরকে বিজয় দান করুন, শত্রুর মনোবল ভেঙ্গে দিন এবং তাদেরকে পরাভূত করুন। আমিন। নিশ্চয় তিনি মহাপরাক্রমশালী ও সাহায্যকারী।
▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

November 25, 2024

ইবাদত শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা এবং দুনিয়াবি কাজে কি সওয়াব পাওয়া যায়

 প্রশ্ন: ইবাদত শব্দের অর্থ ও ব্যাখ্যা কি? ব্যবসা, চাকুরী, সাংসারিক কাজ-কারবার ইত্যাদি দুনিয়াবি কাজে কি সওয়াব পাওয়া যায়?

▬▬▬◄✪✪► ▬▬▬
উত্তর: ইবাদত العبادة শব্দের অর্থ: গোলামী বা দাসত্ব করা, আনুগত্য করা, বিনয় প্রকাশ করা ইত্যাদি।

আর পারিভাষিক ব্যাপক অর্থে ইবাদত হল, সকল প্রকার প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য ঐ সকল কথা ও কাজ যেগুলো মহান আল্লাহ ভালবাসেন এবং সন্তুষ্ট হন। [শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.]। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ইবাদত তিনটি ক্ষেত্রে বিভক্ত। যথা: অন্তর, মুখের ভাষা এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।
🌀 উদাহরণ:
▪অন্তর দ্বারা ইবাদত: যেমন, আল্লাহর প্রতি ভয়, ভরসা, ভালবাসা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, আগ্রহ, সৎ নিয়ত, আল্লাহকে মনে মনে স্মরণ করা, সৃষ্টি জীব নিয়ে ভাবা ইত্যাদি।
▪ মুখের ভাষা ও অন্তর দ্বারা ইবাদত: যেমন, তাসবিহ, (সুবহানাল্লাহ), তাহলীল (লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ) ইত্যাদি দুআ ও জিকির পাঠ করা, আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা আদায় করা, কুরআন তিলাওয়াত করা ইত্যাদি।
▪ শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অন্তর দ্বারা ইবাদত: যেমন, সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ্জ, জিহাদ ইত্যাদি ।
এছাড়া আরও অনেক ধরণের ইবাদত রয়েছে যেগুলো আদায়ের মাধ্যম হল, অন্তর, ভাষা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।

🌀 ইবাদত এমন একটি বিষয়, যাকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ তা’আলা সকল বস্তু সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِي، مَا أُرِيدُ مِنْهُمْ مِنْ رِزْقٍ وَمَا أُرِيدُ أَنْ يُطْعِمُونِي، إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ
“একমাত্র আমার ইবাদত করার জন্যই আমি জিন ও মানব জাতি সৃষ্টি করেছি। আমি তাদের কাছে জীবিকা চাইনা এবং এটাও চাইনা যে, তারা আমার আহার্য যোগাবে। আল্লাহ্‌ তা’আলাই তো জীবিকা দাতা, মহাশক্তির আধার ও পরাক্রান্ত।” [সূরা যারিয়াত: ৫৬-৫৮]

🌀 দুনিয়াবি কাজকর্মে কি নেকি পাওয়া যায়?

মানুষ আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে ইবাদত-বন্দেগি করে যেমন সওয়াব অর্জন করে তেমনি দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম যেমন- ঘুমানো, পানাহার, বেচাকেনা, জীবিকার অনুসন্ধান, বিবাহ-শাদি ইত্যাদি- এগুলোর মাধ্যমেও সওয়াব অর্জন করবে যদি তার উদ্দেশ্য হয় যে, এ সকল বৈধ কাজ-কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের কাজে শক্তি অর্জন করবে অর্থাৎ এগুলোর মাধ্যমে সুস্থ ও ভালো থেকে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগি করবে।

এই সৎ নিয়তের কারণে মানুষ দুনিয়াবি কাজকর্মের মাধ্যমেও সওয়াব অর্জন করবে ইনশাআল্লাহ।

▪ এ ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত হাদিসটি প্রণিধানযোগ্য:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ أَيَأْتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُونُ لَهُ فِيهَا أَجْرٌ؟ قَالَ: أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِي حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ وِزْرٌ؟ فَكَذَلِكَ إذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ، كَانَ لَهُ أَجْرٌ”
“আর তোমাদের নিজ স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও সদকা। সাহাবীগণ জিজ্ঞাসা করেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে কেউ যখন যৌন আকাঙ্ক্ষা সহকারে স্ত্রীর সাথে সম্ভোগ করে, তাতেও কি সওয়াব হবে?

তিনি বলেন, “তোমরা জানো না যে, যখন কেউ হারাম পদ্ধতিতে যৌন সম্ভোগ করে তখন সে গুনাহগার হয়!?

সুতরাং অনুরূপভাবে যখন সে ঐ কাজটি হালাল পন্থায় সম্পন্ন করে তখন সে তার সওয়াব পায়।” [মুসলিম: ১০০৬]
সুতরাং প্রতিটি মুমিনের উচিত হবে, দুনিয়াবি সব ধরণের কাজ-কারবার যেমন, খাওয়া-দাওয়াহ, বিবাহ-শাদি, লেখাপড়া, কৃষিকাজ, চাকুরী, ব্যবসা ইত্যাদি দুনিয়াবি কাজকর্মে সৎ নিয়ত পোষণ করা। তাহলে এ সব দুনিয়াবি কাজ করেও সে অর্জন করবে অবারিত সওয়াব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহু আলাম। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমীন।
▬▬▬◄✪✪► ▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
(লিসান্স: মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

পিতার হারাম সম্পদে সন্তানের করণীয়

 প্রশ্ন: কারো বাবা সারাজীবন সুদি ব্যাংকে চাকরি করে ছেলে মেয়েদের ঐ বেতনের টাকা দিয়ে লালন পালন করেছেন। এখন তিনি অবসরপ্রাপ্ত। পেনশনের টাকা পান। এক্ষেত্রে ছেলেমেয়েদের কি গোনাহ হবে? বর্তমানে বাবার পেনশনের টাকায় কেনা খাবার খেতে বা পোশাক পড়তে পারবে কিনা? এতে কি ছেলে মেয়েরা গোনাহের ভাগীদার হবে? নিজের বাবাকে এই গোনাহ থেকে বাঁচাতে সন্তান হিসাবে কি করণীয় হবে?

উত্তর: বাবার জন্য ফরজ হচ্ছে, হালাল পন্থায় তার স্ত্রী-পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা। তিনি তা না করলে তিনি গুনাগার হবেন এবং কেয়ামতের দিন আল্লাহর কাঠগড়ায় তাকে জবাবদিহি করতে হবে; স্ত্রী বা সন্তানকে নয়।

সুতরাং পিতা যদি সুদি ব্যাংকে চাকরি করে অর্থ উপার্জন করে অথবা ব্যাংক থেকে অবসর গ্রহণের পরে সেখান থেকে প্রাপ্ত পেনশনের অর্থ দ্বারা সংসার পরিচালনা করে তাহলে এর দায়-দায়িত্ব তার উপরে বর্তাবে; স্ত্রী পরিবার ও সন্তান-সন্ততির উপরে নয়। কিন্তু তারা অন্তর থেকে হারাম কে ঘৃণা করবে এবং সম্ভব হলে তাকে হারাম উপার্জন পরিত্যাগ করার অনুরোধ জানাবে।

প্রশ্ন: শাইখ ইবনে উসাইমিন রাহ. কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: যদি কেউ ব্যক্তি যদি জানতে পারে যে, তার বাবার সম্পত্তির উৎস হারাম, তাহলে কি সে তার বাবার খাবার খাবে? আর যদি সে তার বাবার খাবার না খায়, তাহলে কি তা পিতার অবাধ্যতা হিসেবে গণ্য হবে?
উত্তর:
“الرجل الذي علم أن مال أبيه من الحرام إن كان حراماً بعينه، بمعنى: أنه يعلم أن أباه سرق هذا المال من شخص فلا يجوز أن يأكله، لو علمت أن أباك سرق هذه الشاة وذبحها فلا تأكل، ولا تُجِبْ دعوته ، أما إذا كان الحرام من كسبه يعني: أنه هو يرابي أو يعامل بالغش أو ما يشابه ذلك ، فكل ، والإثم عليه هو .
، ودليل هذا: أن النبي صلى الله عليه وعلى آله وسلم أكل من مال اليهود وهم معروفون بأخذ الربا وأكل السحت، أهدت إليه يهودية شاةً في خيبر مسمومة ليموت ، ولكن الله عصمه من ذلك إلى أجلٍ مسمى . ودعاه يهودي إلى خبز شعير وإهالة سنخة (أي : دهن متغير الرائحة) فأجابه وأكل ، واشترى من يهودي طعاماً لأهله وأكله هو وأهله ، فليأكل والإثم على والده ” انتهى من “لقاء الباب المفتوح” (188/13) .

“যে ব্যক্তি জানতে পারবে যে, তার বাবার সম্পত্তি হারাম, যদি সে মূল সম্পদটাই হারাম হয় অর্থাৎ যদি সে নিশ্চিতভাবে জানে যে তার বাবা কোনও ব্যক্তির কাছ থেকে চুরি করেছে, তাহলে সে তা খাবে না। যেমন: যদি তুমি জানতে পারো যে, তোমার বাবা কোনও ছাগল চুরি করেছে এবং তা জবাই করেছে, তাহলে তুমি তা খাবে না এবং তার দাওয়াতেও যাবে না। কিন্তু যদি হারাম উপার্জন তার ব্যবসায়িক কাজ থেকে আসে, অর্থাৎ সে সুদ খায়, প্রতারণা করে বা অনুরূপ অন্য কোনও কাজ করে, তাহলে তুমি খেতে পারো। এই ক্ষেত্রে গুনাহ তার উপরই থাকবে।

এর প্রমাণ হল, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ই/হুদিদের সম্পত্তি থেকে খেয়েছেন, যারা সুদ খাওয়া এবং হারাম উপার্জনের জন্য পরিচিত ছিল। এক ই/হুদি নারী নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বিষাক্ত খাবার দিয়েছিল কিন্তু আল্লাহ তাকে রক্ষা করেছিলেন। এক ই/হুদি তাকে জবের রুটি এবং রুটির সাথে মাখিয়ে খাওয়ার জন্য দ্রবীভূত মাখন বা চর্বি খাওয়ার জন্য দাওয়াত করেছিল। তিনি তা গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এক ই/হুদি থেকে তার পরিবারের জন্য খাবার কিনেছিলেন এবং নিজেও খেয়েছিলেন। অতএব, তুমি খেতে পারো। গুনাহ তোমার বাবার উপরই থাকবে।” [উৎস: বাবুল মাফতুহ, ১৮৮/১৩]
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার,
সৌদি আরব।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বক্তৃতার ধরণ কেমন ছিল এবং সুর দিয়ে ওয়াজ করার বিধান কী

 প্রশ্ন: রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওয়াজ বা বক্তৃতার ধরণ কী? সুর দিয়ে ওয়াজ বা ইসলামি আলোচনা করা কতটা বৈধ?

উত্তর: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাধারণতঃ বক্তব্যের ধরণ ছিল, তিনি সুস্পষ্ট উচ্চারণে বলিষ্ঠ কণ্ঠে বক্তব্য দিতেন। মনে হতো, তিনি সেনাবাহিনীকে সতর্ক করছেন। এতে তার গলার রগগুলো ফুলে উঠত, আওয়াজ উঁচু হতো ও চক্ষুদ্বয় লাল হয়ে যেত। যেমন: প্রখ্যাত সাহাবি জাবের বিন আব্দুল্লাহ হতে বর্ণিত,

كانَ رَسولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عليه وَسَلَّمَ إذَا خَطَبَ احْمَرَّتْ عَيْنَاهُ، وَعَلَا صَوْتُهُ، وَاشْتَدَّ غَضَبُهُ، حتَّى كَأنَّهُ مُنْذِرُ جَيْشٍ
‏
“যখন রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভাষণ দিতেন, তখন তাঁর চক্ষুদ্বয় লাল হয়ে যেত এবং তাঁর আওয়াজ উঁচু হত ও তাঁর ক্রোধ কঠিন রূপ ধারণ করত। যেন তিনি (শত্রু) সেনা থেকে ভীতি প্রদর্শন করছেন।” [সহিহ মুসলিম, হা/৮৬৭]

এর ব্যাখ্যায় আলেমগণ বলেছেন, এটা বক্তৃতার বিষয় এবং শ্রোতাদের অবস্থার উপর নির্ভরশীল হতো। যদি তিনি এমন বিষয়ে বক্তৃতা দিতেন যখন মানুষকে সতর্ক করার প্রয়োজন হতো অথবা শ্রোতাদের মধ্যে কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে জানতে পারতেন যে, সে আল্লাহ ও রসুলের অবাধ্যতা করেছে বা আদেশ-নিষেধ লঙ্ঘন করেছে তখন তার বক্তৃতার ধরণ এমন হতো।
আবার কখনো তিনি নরম ভাষায় অন্তর বিগলিত করার মত বক্তব্য দিতেন। এতে শ্রোতাদের দু চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ত। যেমন:

◈ ইরবাজ ইবনে সারিয়াহ রা. হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,

وعَظَنَا رسولُ اللهِ -صلى الله عليه وسلم- مَوْعِظَةً وجِلَتْ منها القلوبُ، وذَرَفَتْ منها العيونُ ، قال : فقلْنَا : يا رسولَ اللهِ، كأَنَّ هذه مَوْعِظَةُ مُودِّعٍ

“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এমনভাবে ওয়াজ করলেন যাতে আমাদের অন্তর ভীত হয়ে পড়লো ও আমাদের চোখ বেয়ে অশ্রু নির্গত হয়ে গেলো। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসুল, এটা মনে হচ্ছে, শেষ বিদায়ের উপদেশ বার্তা। তাই আপনি আমাদেরকে ওসিয়ত (অন্তিম উপদেশ) দান করুন…।” [আবু দাউদ(৪৬০৭) ও তিরমিজি, (২৬৬) হাদিসটি বর্ণনা করার পর বলেছেন যে, এটা সহিহ (হাসান)।]

তিনি তাড়াহুড়ো করে বা অতিরিক্ত টেনে লম্বা করে, সুর দিয়ে হেলে দুলে বক্তব্য দিতেন না। এগুলো তার আদর্শ পরিপন্থী কাজ।

◈ মা-জননী আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন,

إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم لَمْ يَكُنْ يَسْرُدُ الْحَدِيثَ كَسَرْدِكُمْ

“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের মত দ্রুত কথা বলতেন না (বরং তিনি ধীর স্থির ও স্পষ্টভাবে কথা বলতেন।” [সহীহ বুখারী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৫০/ আম্বিয়া কিরাম আ., পরিচ্ছেদ: ২০৭৩. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিবরণ]

◈ তিনি (আয়েশা রা.) আরও বলেন,

كَانَ يُحَدِّثُ حَدِيثًا لَوْ عَدَّهُ الْعَادُّ لَأَحْصَاهُ

“তিনি এমন ভঙ্গিমায় কথা বলতেন, যদি গণনাকারী চাইত তাহলে তা গণনা করতে পারত।” [বুখারী ৩৫৬৭, মুসলিম ৭৭০১]

◆ ইবনে হাজার আসকালানি বলেন,

المراد بذلك المبالغة في الترتيل والتفهيم

“এর অর্থ হলো, সুস্পষ্ট উচ্চারণ এবং বোঝানোর ক্ষেত্রে জোর দেওয়া।” অর্থাৎ আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া কথা বলার ক্ষেত্রে ধীর স্থিরতা অবলম্বন করতেন এবং প্রতিটি শব্দকে সুস্পষ্টভাবে উচ্চারণের ক্ষেত্রে জোর দিতেন।

তাই ওয়াজ, খুতবা বা বক্তৃতার ক্ষেত্রে গান বা কবিতার মতো করে সুর দিয়ে বক্তব্য দেওয়া উচিত নয়। কারণ তা শ্রেষ্ঠ আদর্শ মানব প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ পরিপন্থী। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ এসব শ্রুতি মধুর ও আকর্ষণীয় বক্তৃতা তৃপ্তি লাভের উদ্দেশ্যে শ্রবণ করে থাকে; হেদায়েত বা উপদেশ গ্রহণের উদ্দেশ্যে নয়। তাছাড়া এ ধরনের বক্তার মনে মানুষকে তার দিকে আকৃষ্ট করার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের মনোভাব বা রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। যা বক্তার আমল বিনষ্ট করার পাশাপাশি দাওয়াতের এ মর্যাদাপূর্ণ অঙ্গনকে কুলুষিত করে।

◆ মিসরের সিনিয়র স্কলার শাইখ আলী মাহফুজ বলেন [মৃত্যু: ১৯৪২]

الترنم في الخطيب من البدع المحدثة

“বক্তাদের সুর দিয়ে বক্তব্য দেওয়া নব আবিষ্কৃত বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।” [আল ইবদা ফি মাযাররিল ইবতিদা, পৃষ্ঠা নম্বর ৪৫]

◆ অনুরূপভাবে শাইখ বকর আবু জায়েদ একই কথা বলেছেন। [তাসহীহুদ দুআ, পৃষ্ঠা নম্বর: ৪৫৫]

এছাড়াও ইমাম ইবনুল জাওযি সুর করে বক্তব্য দেওয়াকে মুনকার বা গর্হিত কাজ হিসেবে এবং মোহাম্মদ রশিদ রেজা এটিকে মাকরুহ বা অ পছন্দনীয় কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়ে আরও বিভিন্ন ওলামাদের বক্তব্য রয়েছে।

✪ ইবনুল জাওযি-এর নিম্নোক্ত বক্তব্যটি বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন,

تأملت أشياء تجري في مجالس الوعظ ، يعتقدها العوام وجهال العلماء قربة ، وهي منكر وبعد . وذاك أن المقرئ يطرب ويخرج الألحان إلى الغناء ، والوعظ ينشد بتطريب أشعار المجنون وليلى ، فيصفق هذا ، ويخرق ثوبه هذا .. ومعلوم أن هذه الألحان كالموسيقى ، توجب طرباً للنفوس ونشوة ، والتعرض لما يوجب الفساد غلط عظيم .. ألا إن الواعظ مأمور بأن لا يتعدى الصواب ، ولا يتعرض لما يفسدهم

“আমি লক্ষ্য করেছি যে, অনেক ওয়াজ মাহফিলে এমন কিছু ঘটনা ঘটে যাকে সাধারণ মানুষ এবং স্বল্প জ্ঞানী বিদ্বানরা ভুল করে আল্লাহর কাছে নৈকট্য লাভের উপায় মনে করে। কিন্তু আসলে তা গর্হিত কাজ এবং আল্লাহর নৈকট্য থেকে দূরের বিষয়। যেমন: কুরআন তিলাওয়াত কারী গানের মতো সুরে তিলাওয়াত করে এবং বক্তা লায়লা-মজনুর মতো প্রেমিক কবিদের কবিতা গাইতে গাইতে উপদেশ দেন। কেউ হাত তালি দেয়। কেউ আবার নিজের জামা-কাপড় ছিঁড়ে ফেলে। এটা স্পষ্ট যে, এই ধরনের সুর ও গান মিউজিকের মত মনের মধ্যে আনন্দ ও উচ্ছ্বাস সৃষ্টি করে। অথচ এমন কিছু করা যা মানুষকে পথভ্রষ্ট করতে পারে তা বিশাল ভুল। স্মরণ রাখতে হবে যে, একজন বক্তা বা উপদেশ দাতার কাজ হল, নিজে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত না হওয়া এবং এমন কিছু না করা যা মানুষকে ভ্রষ্ট করে দেয়।” [সাইদুল খাতের, পৃষ্ঠা নং ১০৭]
অবশ্য বক্তব্যের মধ্যে কুরআনের আয়াতের অংশটুকু সুর করে তেলাওয়াত করতে কোন আপত্তি নেই। কেননা হাদিসে সুর করে কুরআন তেলাওয়াতের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।
আল্লাহু আলাম।
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

November 10, 2024

উপরে ওঠার সময় আল্লাহু আকবার এবং নিচে নামার সময় সুবহানাল্লাহ পাঠ করা

 একটি হারিয়ে যাওয়া সুন্নত: উপরে ওঠার সময় আল্লাহু আকবার এবং নিচে নামার সময় সুবহানাল্লাহ পাঠ করা:

প্রশ্ন: উঁচু স্থানে উঠার সময় ‘আল্লাহু আকবার’ এবং নিচু স্থানে নামার সময় ‘সুবহানাল্লাহ’ পাঠ করা সুন্নত। ঘরের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা বা নামার ক্ষেত্রেও কি তা সুন্নত?
উত্তর: উঁচু স্থানে উঠতে আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ স্বরূপ ‘আল্লাহু আকবার’ এবং নীচে নামতে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা সুন্নত। প্রখ্যাত সাহাবি জাবির রা. বলেন,

كُنَّا إِذَا صَعِدْنَا كَبَّرْنَا وَإِذَا نَزَلْنَا سَبَّحْنَا

“আমরা যখন উপরের দিকে উঠতাম, ‘আল্লাহু আকবার’ ও যখন নীচের দিকে নামতাম তখন ‘সুবহানাল্লাহ’ বলতাম।” [বুখারি, হা/২৯৯৩]

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

كَانَ النَّبِيُّ ﷺ وَجُيُوشُهُ إِذَا عَلَوا الثَّنَايَا كَبَّرُوا، وَإِذَا هَبَطُوا سَبَّحُوا

“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সেনা বাহিনী যখন উঁচু জায়গায় উঠতেন তখন আল্লাহু আকবার বলতেন। আর যখন নিচু জায়গায় নামতেন তখন সুবহানাল্লাহ’ বলতেন।” [আবু দাউদ, হা/২৫৯৯, সনদ সহীহ]

❒ আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ.-এর ফতোয়া:

বর্তমান শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ ও আলেমে দ্বীন আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ. কে প্রশ্ন করা হয় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হাদিসে এসেছে যে, তিনি কোনও উঁচু জায়গায় ওঠার সময় তাকবির বলতেন এবং কোনও নিচু জায়গায় নামার সময় তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) বলতেন। এখন প্রশ্ন হলো, এই তাকবির ও তাসবিহ কি শুধুমাত্র সফরের সময় পাঠ করতে হয় নাকি বাড়ির দ্বিতীয় তলায় বা তৃতীয় তলায় ওঠানামার সময়ও তাকবির ও তাসবিহ বলা যাবে? জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
উত্তরে তিনি বলেন,
” كان النبي صلى الله عليه وسلم في أسفاره إذا علا صَعداً كبر، وإذا نزل وادياً سبح، وذلك أن العالي على الشيء قد يتعاظم في نفسه، فيرى أنه كبير، فكان من المناسب أن يكبر الله عز وجل فيقول: الله أكبر، وأما إذا نزل فالنزول سفول فناسب أن يسبح الله عز وجل عند السفول، هذه هي المناسبة .
ولم ترد السنة بأن يفعل ذلك في الحضر، والعبادات مبنية على التوقيف، فيقتصر فيها على ما ورد، وعلى هذا فإذا صعد الإنسان الدرجة في البيت فإنه لا يكبر، وإذا نزل منها فإنه لا يسبح، وإنما يختص هذا في الأسفار” . انتهى من (لقاءات الباب المفتوح 3/102).

“নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফরের সময় কোনও উঁচু জায়গায় উঠলে তাকবির (আল্লাহু আকবার) বলতেন এবং নিচু জায়গায় নামলে তাসবিহ (সুবহানাল্লাহ) বলতেন। কারণ উঁচু জায়গায় উঠলে মানুষ নিজেকে মহান মনে করতে পারে। সে মনে করতে পারে, সে বড়। তাই সে সময় তাকবির তথা আল্লাহর বড়ত্বের ঘোষণা দেওয়াটা অধিক প্রাসঙ্গিক। আর অবতরণ মানে উপর থেকে নিচে চলে যাওয়া। এ সময় তাসবিহ পাঠ বা আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করাটা অধিক প্রাসঙ্গিক। এখানে এটাই তাকবির ও তাসবিহ পাঠের প্রাসঙ্গিকতা।
সুন্নতে এমন কোনও দলিল নেই যে, আবাসে থাকাকালীন এই আমল করতে হয়। আর ইবাদত শুধুমাত্র দলিলের উপর নির্ভরশীল। সুতরাং ঘরের দ্বিতীয় বা তৃতীয় তলায় ওঠানামার সময় তাকবির ও তাসবিহ বলা যাবে না। এই আমলটি কেবল সফরের সাথেই খাস। [সূত্র: লিকাউল বাবিল মাফতুহ, ৩/১০২]

❒ সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায.-এর ফতোয়া:

সৌদি আরবের সাবেক প্রধান মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায. কে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয় যে, কোনও উঁচু জায়গা থেকে নামার সময় তাসবিহ পাঠ করা এবং উপরে ওঠার সময় তাকবির পাঠ করা-এটা কি শুধু সফরের সময় করতে হয় নাকি আবাসেও করা যায়?

তিনি উত্তরে বলেন,

المعروف في السفر، أما في الحضر فإنَّه يُسبّح ويُكبّر في الصعود والنزول، يُكثر من الذكر، سواء في الحوش، أو في السطح، أو غير ذلك.

“সাধারণত সফরের সময় এটা করা হয়। এ বিষয়ে এটাই প্রসিদ্ধ কথা। তবে আবাসে থাকাকালীন উপরে উঠা, নিচে নামার সময় তাকবির পাঠ করবে, তসবিহ পাঠ করবে এবং অধিক পরিমাণে জিকির করবে। তা বাড়ির আঙ্গিনা, ছাদ বা অন্য যেকোনো জায়গায় হতে পারে।”

• প্রশ্ন: এ ক্ষেত্রে সবাই মিলে একসাথে তাকবির বলা কি জায়েজ?

জবাব: না, প্রত্যেকে নিজ নিজে তাকবির বলবে। অন্যের আওয়াজের দিকে খেয়াল করবে না। সবাই মিলে তাকবির বলার কোনও ভিত্তি নাই। এটা বিদআত। প্রত্যেকে নিজের অবস্থান অনুযায়ী আল্লাহর জিকির করবে; অন্যের আওয়াজের দিকে খেয়াল করবে না।

• প্রশ্ন: যখন কেউ সিঁড়ি বেয়ে ওঠে তখন কি তাকবির বলবে?

জবাব: হ্যাঁ, ওঠার সময় বা নামার সময় উভয়ক্ষেত্রেই তাকবির বলা যায়।

• প্রশ্ন: যখন কেউ সিঁড়ি বেয়ে নামে তখন তাসবিহ পড়ে?

জবাব: এটাও খুব ভালো। অথবা নামার সময় আন্যান্য জিকির-আজকার করতে পারে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ

“তারা দাঁড়িয়ে, বসে এবং পাশ ফিরে শুয়ে আল্লাহর জিকির করে।” [আল ইমরান: ১৯১] তবে পাহাড়ের উপত্যকা বা খাদে নামার সময় খেয়াল করে তাসবিহ পাঠ করবে সফর অবস্থায়।” [binbaz.org]

❂ তবে কতিপয় আলেমের মতে, সিঁড়ি ব্যবহারের সময়ও উক্ত আমল করা যায়। অর্থাৎ বাড়ি বা কোনও ভবনের সিঁড়ি বেয়ে বা লিফটের মাধ্যমে উপরে উঠার সময় বলবে, আল্লাহু আকবার এবং নিচে নামার সময় বলবে, সুবহানাল্লাহ। তবে এ ক্ষেত্রে প্রথম মতটি অধিক অগ্রাধিকারযোগ্য। কিন্তু এই উঠানামার সময় সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার ইত্যাদি যেকোনো জিকির ও দুআ তাসবিহ পাঠ করা যায়। আল্লাহু আলাম।

মোটকথা, কোনও উঁচু বিল্ডিং-এর সিঁড়ি বেয়ে বা লিফটের মাধ্যমে উপরে উঠার সময়, নামার সময়, পায়ে হেঁটে অথবা গাড়ি চালনা বা গাড়িতে অবস্থানকালে উপরে ওঠা এবং নিচে নামার সময় আমরা সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ, কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি নানা ধরণের জিকিরের মাধ্যমে আমাদের জিহ্বাকে সচল রাখার চেষ্টা করা উচিৎ। তবে বিশেষভাবে সফরে পথ চলার সময়, গাড়ি ড্রাইভ করার সময় বা বাহনে থাকা যখন আমরা পাহাড় বা অন্যান্য উঁচু স্থানে উঠব তখন খেয়াল করে এই সুন্নতটি প্রতি আমল করার চেষ্টা করব। অর্থাৎ উপরে ওঠার সময় আল্লাহু আকবার আর নিচে নামার সময় সুবহানাল্লাহ পাঠ করব। এতে আমাদের আমলনামায় জামা হবে অবারিত সওয়াব ইনশাআল্লাহ।
দুর্ভাগ্য হলেও সত্য যে, বর্তমানে এই সুন্নতটি আমাদের মাঝ থেকে প্রায় বিদায় নিয়েছে। তাই এটিকে পুনর্জীবিত করা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমীন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার। সৌদি আরব।

Translate