May 19, 2024

আসহাবে কাহাফ এর ঘটনা

 আসহাবে কাহাফ ও যুলকারনাইন সম্পর্কে আয়াত নাযিল হওয়ার পটভূমি সম্বন্ধে মুহাম্মদ ইবন ইসহাক ও অন্যান্য সীরাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কুরাইশগণ মদীনার ইয়াহুদীদের নিকট একটি প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেছিল। উদ্দেশ্য এই যে, ইয়াহুদীগণ তাদেরকে কতক প্রশ্ন শিখিয়ে দিবে। কুরাইশগণ সেগুলো রসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞেস করবে এবং এরদ্বারা তারা তাকে পরীক্ষা করবে৷ ইয়াহুদীগণ বলেছিল যে, তোমরা তাকে এমন এক সম্প্রদায় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে, যারা অতীতেই বিলীন হয়ে গিয়েছে। যার ফলে ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে জানা যায় না। আর প্রশ্ন করবে পৃথিবী প্রদক্ষিণকারী একজন লোক সম্পর্কে এবং জিজ্ঞেস করবে রূহ সম্পর্কে।



আর এরই প্রেক্ষিতে কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তা'আলা নাযীল করেন -

তুমি কি মনে কর যে, গুহা ও রাকীমের অধিবাসীরা আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ছিল? যখন যুবকরা পাহাড়ের গুহায় আশ্রয়গ্রহণ করল তখন তারা বলল, হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি আমাদেরকে নিজের কাছ থেকে রহমত দান করুন এবং আমাদের জন্যে আমাদের কাজ সঠিকভাবে পূর্ণ করুন। অতঃপর আমি তাদেরকে গুহায় ঘুমন্ত অবস্থায় কয়েক বছর রেখে দিলাম। অতঃপর আমি তাদেরকে জাগ্রত করি, একথা জানার জন্যে যে, দুই দলের মধ্যে কোন দল তাদের অবস্থানকাল সম্পর্কে অধিক নির্ণয় করতে পারে। তোমার কাছে তাদের ইতিবৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি। তারা ছিল কয়েকজন যুবক। তারা তাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছিল এবং আমি তাদের সৎপথে চলার শক্তি বাড়িয়ে দিয়েছিলাম।

আমি তাদের মন দৃঢ় করেছিলাম, যখন তারা উঠে দাঁড়িয়েছিল। অতঃপর তারা বলল, আমাদের পালনকর্তা তো তিনিই যিনি আসমান ও যমীনের পালনকর্তা। আমরা কখনো তার পরিবর্তে অন্য কোন উপাস্যকে আহবান করব না। যদি করি, তবে তা অত্যন্ত গর্হিত কাজ হবে। এরা আমাদেরই স্ব-জাতি, এরা তাঁর পরিবর্তে অনেক উপাস্য গ্রহণ করেছে। তারা এদের সম্পর্কে প্রকাশ্য প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? তার চেয়ে বড় জালিম আর কে হতে পারে যে আল্লাহ সম্পর্কে মিথ্যা রচনা করে?

তোমরা যখন তাদের থেকে পৃথক হলে এবং তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করে তাদের থেকেও, তখন তোমরা গুহায় আশ্রয়গ্রহণ কর। তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের জন্যে দয়া বিস্তার করবেন এবং তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ কর্মকে ফলপ্রসু করার ব্যবস্থা করবেন।

তুমি সূর্যকে দেখতে পেতে, যখন উদিত হত, তাদের গুহা থেকে পাশ কেটে ডান দিকে চলে যেত এবং যখন অস্তমিত হত, তাদের থেকে পাশ কেটে বামদিকে নেমে যেত, অথচ তারা ছিল গুহার প্রশস্ত চত্বরে অবস্থিত। এটা আল্লাহর নিদর্শনাবলীর অন্যতম। আল্লাহ যাকে সৎপথে চালান, সেই সৎপথপ্রাপ্ত এবং তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তুমি কখনও তার জন্যে পথপ্রদর্শনকারী ও সাহায্যকারী পাবে না। তুমি মনে করবে তারা জাগ্রত, অথচ তারা নিদ্রিত। আমি তাদেরকে পার্শ্ব পরিবর্তন করাই ডান দিকে ও বাম দিকে। তাদের কুকুরটি ছিল সামনের পা দুটি গুহাদ্বারে প্রসারিত করে। যদি তুমি উঁকি দিয়ে তাদেরকে দেখতে, তবে পেছন ফিরে পলায়ন করতে এবং তাদের ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়তে। আমি এই অবস্থায় তাদেরকে জাগ্রত করলাম, যাতে তারা পরস্পর জিজ্ঞাসাবাদ করে। তাদের একজন বলল, তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ? তাদের কেউ বলল, একদিন অথবা একদিনের কিছু অংশ অবস্থান করছি। (শেষে) তারা (সবাই) বলল, তোমাদের পালনকর্তাই ভাল জানেন তোমরা কতকাল অবস্থান করেছ।

এখন তোমাদের একজনকে তোমাদের এই মুদ্রাসহ শহরে প্রেরণ কর; সে যেন দেখে কোন খাদ্য পবিত্র। অতঃপর তা থেকে যেন কিছু খাদ্য নিয়ে আসে তোমাদের জন্য; সে যেন বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করে, আর কিছুতেই যেন তোমাদের খবর কাউকে না জানায়। তারা যদি তোমাদের খবর জানতে পারে, তবে পাথর মেরে তোমাদেরকে হত্যা করবে, অথবা তোমাদেরকে তাদের ধর্মে ফিরিয়ে নেবে। তাহলে তোমরা কখনই সাফল্য লাভ করবে না।

এমনিভাবে আমি তাদের খবর প্রকাশ করে দিলাম, যাতে তারা জ্ঞাত হয় যে, আল্লাহর ওয়াদা সত্য এবং কিয়ামতের দিন সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই।

যখন তারা নিজেদের কর্তব্য বিষয়ে পরস্পর বিতর্ক করছিল, তখন তারা বলল, তাদের উপর সৌধ নির্মাণ কর। তাদের পালনকর্তা তাদের বিষয়ে ভাল জানেন। তাদের কর্তব্য বিষয়ে যাদের মত প্রবল হল, তারা বলল, আমরা অবশ্যই তাদের স্থানে মসজিদ নির্মান করব। অজ্ঞাত বিষয়ে অনুমানের উপর ভিত্তি করে এখন তারা বলবে, তারা ছিল তিন জন; তাদের চতুর্থটি তাদের কুকুর। একথাও বলবে; তারা পাঁচ জন, তাদের ষষ্ঠটি ছিল তাদের কুকুর। আবার কতক লোক বলবে, তারা ছিল সাত জন, তাদের অষ্টমটি ছিল তাদের কুকুর। বল, আমার পালনকর্তা তাদের সংখ্যা ভাল জানেন। তাদের সম্পর্কে অল্প লোকই জানে। সাধারণ আলোচনা ছাড়া তুমি তাদের সম্পর্কে বিতর্ক করবে না এবং তাদের অবস্থা সম্পর্কে তাদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদও করবে না। তুমি কোন কাজের বিষয়ে বলবে না যে, সেটি আমি আগামী কাল করব। ‘আল্লাহ ইচ্ছা করলে’ বলা ব্যতিরেকে। যখন ভুলে যাও, তখন তোমার পালনকর্তাকে স্মরণ করু এবং বল, আশা করি আমার পালনকর্তা আমাকে এর চাইতেও নিকটতম সত্যের পথ নির্দেশ করবেন।


আর (কারো মতে) তারা তাদের গুহায় ছিলো তিনশ বছর, আর কিছু লোক আরও নয় বছর বাড়িয়ে নিয়েছে। বল, তারা কতকাল অবস্থান করেছে, তা আল্লাহই ভাল জানেন। নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের অদৃশ্য বিষয়ের জ্ঞান তাঁরই কাছে রয়েছে। তিনি কত চমৎকার দেখেন ও শোনেন। তিনি ব্যতীত তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। তিনি কাউকে নিজ কর্তৃত্বে শরীক করেন না। [সূরা কাহাফ, আয়াত: ৯-২৬]


আয়াতের বাচনভঙ্গি ও বহু তাফসিরকারকের মতে তাদের সম্প্রদায়ের লোকজন ছিল মুশরিক। তারা মূর্তিপূজা করত। বহু তাফসিরকার ও ইতিহাসবিদ অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, তারা (যুবকেরা) দাকরানূমের সময় অভিজাত বংশীয় লোক ছিলেন। কারো কারো অভিমত যে, তারা রাজপুত্র ছিলেন।


তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া

সুলায়মান (আ:) এর পক্ষ হতে বিলকীসের নিকট পত্র প্রেরণ

আল্লাহ্ তা'আলা বলেন,
 'সুলায়মান হয়েছিলো দাঊদের উত্তরাধিকারী এবং সে বলেছিল, হে মানুষ! আমাকে পক্ষীকূলের ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়েছে এবং আমাকে দেয়া হয়েছে সকল কিছু। এটা সুস্পষ্ট অনুগ্রহ'। (২৭: ১৭)

অর্থাৎ তিনি পিতা দাঊদের নবুওয়াত ও রাজত্বের উত্তরাধিকারী হন। সুলায়মান (আ:) পাখিদের ভাষা বুঝতেন, তারা শব্দ করে কি বুঝাতে চায় তিনি মানুষকে তার ব্যখ্যা বলতেন।

সুলায়মান পক্ষীদের খোঁজ খবর নিলেন, অতঃপর বললেন, কি হল, হুদহুদকে দেখছি না কেন? নাকি সে অনুপস্থিত? সে উপযুক্ত কারণ না দর্শালে আমি অবশ্যই তাকে কঠোর শাস্তি দেব কিংবা হত্যা করব। কিছুক্ষণের মধ্যেই হুদহুদ এসে বলল, আপনি যা অবগত নন, আমি তা অবগত হয়েছি। আমি আপনার কাছে সাবা থেকে নিশ্চিত সংবাদ নিয়ে আগমন করেছি। আমি এক নারীকে সাবাবাসীদের উপর রাজত্ব করতে দেখেছি। তাকে সবকিছুই দেয়া হয়েছে এবং তার একটা বিরাট সিংহাসন আছে। আমি তাকে ও তার সম্প্রদায়কে দেখলাম তারা আল্লাহর পরিবর্তে সূর্যকে সেজদা করছে। শয়তান তাদের দৃষ্টিতে তাদের কার্যাবলী সুশোভিত করে দিয়েছে। অতঃপর তাদেরকে সৎপথ থেকে নিবৃত্ত করেছে। অতএব তারা সৎপথ পায় না। (২৭: ২০-২৪)

সুলায়মান বললেন, এখন আমি দেখব তুমি সত্য বলছ, না তুমি মিথ্যবাদী। তুমি আমার এই পত্র নিয়ে যাও এবং এটা তাদের কাছে অর্পন কর। অতঃপর তাদের কাছ থেকে সরে পড় এবং দেখ, তারা কি জওয়াব দেয়। বিলকীস বলল, হে পরিষদবর্গ, আমাকে একটি সম্মানিত পত্র দেয়া হয়েছে। সেই পত্র সুলায়মানের পক্ষ থেকে এবং তা দয়াময়, পরম দয়ালু, আল্লাহর নামে শুরু; আমার মোকাবেলায় শক্তি প্রদর্শন করো না এবং বশ্যতা স্বীকার করে আমার কাছে উপস্থিত হও। (২৭: ২৭-৩১)

বিলকীস বলল, হে পরিষদবর্গ, আমাকে আমার কাজে পরামর্শ দাও। তোমাদের উপস্থিতি ব্যতিরেকে আমি কোন কাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি না। তারা বলল, আমরা শক্তিশালী এবং কঠোর যোদ্ধা। এখন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আপনারই। অতএব আপনি ভেবে দেখুন, আমাদেরকে কি আদেশ করবেন। সে বলল, রাজা বাদশারা যখন কোন জনপদে প্রবেশ করে, তখন তাকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং সেখানকার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গকে অপদস্থ করে। তারাও এরূপই করবে। আমি তাঁর কাছে কিছু উপঢৌকন পাঠাচ্ছি; দেখি প্রেরিত লোকেরা কি জওয়াব আনে। (২৭: ৩২-৩৫)

অতঃপর যখন দূত সুলায়মানের কাছে আগমন করল, তখন সুলায়মান বললেন, তোমরা কি ধনসম্পদ দ্বারা আমাকে সাহায্য করতে চাও? আল্লাহ আমাকে যা দিয়েছেন, তা তোমাদেরকে প্রদত্ত বস্তু থেকে উত্তম। বরং তোমরাই তোমাদের উপঢৌকন নিয়ে সুখে থাক। ফিরে যাও তাদের কাছে। এখন অবশ্যই আমি তাদের বিরুদ্ধে এক সৈন্যবাহিনী নিয়ে আসব, যার মোকাবেলা করার শক্তি তাদের নেই। আমি অবশ্যই তাদেরকে অপদস্থ করে সেখান থেকে বহিষ্কৃত করব এবং তারা হবে লাঞ্ছিত। সুলায়মান বললেন, হে পরিষদবর্গ, তারা আত্মসমর্পণ করে আমার কাছে আসার পূর্বে কে বিলকীসের সিংহাসন আমাকে এনে দেবে? জনৈক দৈত্য-জিন বলল, আপনি আপনার স্থান থেকে উঠার পূর্বে আমি তা এনে দেব এবং আমি একাজে শক্তিবান, বিশ্বস্ত। কিতাবের জ্ঞান যার ছিল, সে বলল, আপনার দিকে আপনার চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনাকে এনে দেব। অতঃপর সুলায়মান যখন তা সামনে রক্ষিত দেখলেন, তখন বললেন এটা আমার পালনকর্তার অনুগ্রহ, যাতে তিনি আমাকে পরীক্ষা করেন যে, আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি, না অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে, সে নিজের উপকারের জন্যেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে এবং যে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সে জানুক যে, আমার পালনকর্তা অভাবমুক্ত কৃপাশীল। (২৭: ৩৬-৪০)

(অতঃপর) সুলায়মান বললেন, বিলকীসের সামনে তার সিংহাসনের আকার-আকৃতি বদলিয়ে দাও, দেখব সে সঠিক বুঝতে পারে, না সে তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের দিশা নেই? অতঃপর যখন বিলকীস এসে গেল, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তোমার সিংহাসন কি এরূপই? সে বলল, মনে হয় এটা সেটাই। আমরা পূর্বেই সমস্ত অবগত হয়েছি এবং আমরা আজ্ঞাবহও হয়ে গেছি। আল্লাহর পরিবর্তে সে যার ইবাদাত করত, সেই তাকে ঈমান থেকে নিবৃত্ত করেছিল। নিশ্চয় সে কাফের সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাকে (বিলকিস কে) বলা হল, এই প্রাসাদে প্রবেশ কর। যখন সে তার প্রতি দৃষ্টিপাত করল সে ধারণা করল যে, এটা স্বচ্ছ গভীর জলাশয়। সে তার পায়ের গোছা খুলে ফেলল। সুলায়মান বলল, এটা তো স্বচ্ছ স্ফটিক নির্মিত প্রাসাদ। বিলকীস বলল, হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সুলায়মানের সাথে বিশ্ব জাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করলাম। (২৭: ৪১-৪৪)


তথ্যসূত্র: সূরা নামল

 

নবী ইবরাহীম (আ) এর সাথে খোদায়ী দাবিদার এক দুর্বল বান্দার বিতর্ক

 'তুমি কি সে লোককে দেখনি, যে পালনকর্তার ব্যাপারে বাদানুবাদ করেছিল ইব্রাহীমের সাথে এ কারণে যে, আল্লাহ সে ব্যাক্তিকে রাজ্য দান করেছিলেন? ইব্রাহীম যখন বলল, আমার পালনকর্তা হলেন তিনি, যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। সে বলল, আমি জীবন দান করি এবং মৃত্যু ঘটিয়ে থাকি। ইব্রাহীম বলল, নিশ্চয়ই তিনি সুর্যকে উদিত করেন পূর্ব দিক থেকে, এবার তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উদিত কর। তখন সে কাফির হতভম্ব হয়ে গেল। আর আল্লাহ সীমালংঘণকারী সম্প্রদায়কে সরলপথ প্রদর্শন করেন না। ' -[ক্বুরআন ২ : ২৫৮]

এ আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা ইবরাহীম (আ)- এর সাথে সেই সীমালংঘনকারী প্রতাপশালী রাজার বিতর্কের কথা উল্লেখ করেছেন, যে নিজে প্রতিপালক হওয়ার দাবি করেছিল। ইবরাহীম খলিল (আ) তার উপস্থাপিত যুক্তির অসারতা প্রমাণ করেন, তার মূর্খতা ও স্বল্পবুদ্ধিতা প্রকাশ করে দেন এবং নিজের দলীল দ্বারা তাকে নিরুত্তর করেন।

তাফসীরবিদ, ঐতিহাসিক ও বংশবিদদের মতে, এ রাজাটি ছিল ব্যবিলনের রাজা। মুজাহিদ (র) তার নাম নমরুদ ইবনে কিনআন বলে উল্লেখ করেছেন। মুজাহিদ (র) প্রমুখ বলেছেন, যেসব রাজা-বাদশাহ দুনিয়া জুড়ে রাজত্ব করেছেন, এ ছিল তাদেরই একজন। ঐতিহাসিকদের মতে, নমরুদ চারশ' বছরকালব্যাপী রাজত্ব করেছিল। ফলে সে জুলুম-অত্যাচার, দাম্ভিকতা ও সীমালংঘনের চরমে গিয়ে পৌঁছে এবং পার্থিব জীবনকেই সে চরম লক্ষ্য বলে বেছে নেয়।

ইবরাহীম খলীল (আ) যখন তাকে এক ও লা-শরীক আল্লাহর ইবাদাতের জন্যে আহ্বান জানালেন, তখন তার মূর্খতা ও পথ-ভ্রষ্টতা তাকে সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করতে প্ররোচিত করে। এ ব্যাপারে সে ইবরাহীম (আ) এর সাথে বিতর্কে লিপ্ত হয় এবং নিজেই প্রতিপালক হওয়ার দাবি করে। হযরত ইবরাহীম (আ) যখন বললেন, আমার প্রতিপালক তো তিনি, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। নমরুদ বলল, আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই।

কাতাদাহ, সুদ্দী ও মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (র) লিখেছেন, নমরুদ ঐ সময় মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত দু'ব্যক্তিকে ডেকে আনে। অতঃপর একজনকে হত্যা করে ও অপরজনকে ক্ষমা করে দেয়। এর দ্বারা সে বুঝাতে চেয়েছে যে, সে একজনকে জীবন দান করল এবং অন্যজনের মৃত্যু ঘটাল। এ কাজটি ইবরাহীম (আ) এর দলীলের কোন মোকাবিলাই ছিল না। বরং তা বিতর্কের সাথে সামঞ্জস্যহীন একটি উদ্ভট দুষ্কর্ম ছাড়া কিছুই না।

বাদশাহ্ নমরুদের এই যুক্তির অসারতা উপস্থিত অনেকের কাছে অস্পষ্ট হওয়ায় এবং অনুপস্থিতদের নিকট অস্পষ্ট হওয়ার প্রবল আশংকা থাকায় ইবরাহীম (আ) আর একটি যুক্তি পেশ করেন, যার দ্বারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব ও নমরুদের মিথ্যা দাবি স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। ইবরাহীম (আ) বলেন-
 আল্লাহ্ তো সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদিত করেন, তুমি একে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখাও।
কেননা, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটাতে পারেন, তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারেন। অতএব, নিজের দাবি অনুযায়ী তুমি যদি প্রতিপালক হয়ে থাক, তাহলে এটা করে দেখাও। এ যুক্তি প্রদর্শনের পরে নমরুদের ভ্রষ্টতা, মূর্খতা ও দাম্ভিকতা সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়।



তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড 

মূসা (আ:) এর সাথে খিজির (আ:) এর সাক্ষাতের ঘটনা

 আল্লাহ্ তা'আলা বলেন-


যখন মূসা তাঁর সঙ্গীকে কে বলছিলেন, দুই সমুদ্রের মিলনস্থলে না পৌঁছা পর্যন্ত আমি সফর শেষ করব না, অন্যথায় আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব। অতঃপর যখন তাঁরা দুই সুমুদ্রের মিলনস্থলে পৌছালেন, তখন তাঁরা নিজেদের মাছের কথা ভুলে গেলেন। অতঃপর মাছটি সমুদ্রে সুড়ঙ্গ পথ সৃষ্টি করে নেমে গেল। যখন তাঁরা সে স্থানটি অতিক্রম করে গেলেন, মূসা সঙ্গী কে বললেন, আমাদের নাশতা আন। আমরা এই সফরে পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েছি। সে বলল, আপনি কি লক্ষ্য করেছেন, আমরা যখন প্রস্তর খন্ডে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। আমি (আপনাকে) একথা বলতে শয়তানই আমাকে ভুলিয়ে দিয়েছিল। মাছটি আশ্চর্য জনক ভাবে সমুদ্রে নিজের পথ করে নিয়েছে। মূসা বললেন, আমরা তো এ স্থানটিই খুঁজছিলাম। অতঃপর তাঁরা নিজেদের পায়ের চিহ্ন ধরে ফিরে চললেন। (১৮: ৬০-৬৪)


অতঃপর তাঁরা আমার বান্দাদের মধ্যে এমন একজনের সাক্ষাত পেলেন, যাকে আমি আমার পক্ষ থেকে অনুগ্রহ করেছিলাম, আর আমার পক্ষ থেকে দিয়েছিলাম এক বিশেষ জ্ঞান। মূসা তাঁকে বললেন, আমি কি এ শর্তে আপনার অনুসরণ করতে পারি যে, যে বিশেষ জ্ঞান আপনাকে শেখানো হয়েছে, তা থেকে আমাকে কিছু শিক্ষা দেবেন? তিনি বললেন, আপনি আমার সাথে কিছুতেই ধৈর্য্যধারণ করে থাকতে পারবেন না। যে বিষয়ে আপনি কিছুই জানেন না সে ব্যাপারে আপনি সবর করবেনই বা কেমন করে? মূসা বললেন, আল্লাহ চাহেন তো আপনি আমাকে ধৈর্য্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোন আদেশ অমান্য করব না। তিনি বললেন, যদি আপনি আমার অনুসরণ করেনই তবে কোন বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করবেন না, যে পর্যন্ত না আমি নিজেই সে সম্পর্কে আপনাকে কিছু বলি। (১৮: ৬৫-৭০)


অতঃপর তারা চলতে লাগল, অবশেষে যখন তারা নৌকায় আরোহণ করল, তখন তিনি তাতে ছিদ্র করে দিলেন। মূসা বললেন, আপনি কি এর আরোহীদেরকে ডুবিয়ে দেয়ার জন্যে এতে ছিদ্র করে দিলেন? নিশ্চয়ই আপনি একটি বড়ই মারাত্মক কাজ করলেন। তিনি বললেন, 'আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে কিছুতেই ধৈর্য্য ধরতে পারবেন না?'মূসা বললেন, আমাকে আমার ভুলের জন্যে অপরাধী করবেন না এবং আমার কাজে আমার উপর কঠোরতা আরোপ করবেন না। (১৮: ৭১-৭৩)

অতঃপর তারা চলতে লাগল। চলতে চলতে যখন একটি বালকের সাক্ষাত পেলেন, তখন তিনি তাকে হত্যা করলেন। মূসা বললেন, আপনি কি একটি নিস্পাপ জীবন শেষ করে দিলেন কোন প্রকর হত্যার অপরাধ ছাড়াই? নিশ্চয়ই আপনি তো এক গুরুতর অন্যায় কাজ করলেন। তিনি বললেন, আমি কি বলিনি যে, আপনি আমার সাথে ধৈর্য্য ধরে থাকতে পারবেন না। মূসা বললেন, এরপর যদি আমি আপনাকে কোন বিষয়ে প্রশ্ন করি, তবে আপনি আমাকে আর সাথে রাখবেন না। আপনি আমার পক্ষ থেকে অভিযোগ মুক্ত হয়ে গেছেন। (১৮: ৭৪-৭৬)

অতঃপর তারা চলতে লাগল, চলতে চলতে যখন একটি জনপদের অধিবাসীদের কাছে পৌঁছে তাদের কাছে খাবার চাইল, তখন তারা তাদের অতিথেয়তা করতে অস্বীকার করল। অতঃপর সেখানে তারা একটি দেয়াল দেখলো, সেটি পড়ে যাবার উপক্রম হয়েছিল। সেটি তিনি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে দিলেন। মূসা বললেন, আপনি ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে এর পারিশ্রমিক নিতে পারতেন। তিনি বললেন, এখানেই আমার ও আপনার মধ্যে সম্পর্কচ্ছেদ হল। এখন যে বিষয়ে আপনি ধৈর্য্য ধরতে পারেননি, আমি তার তাৎপর্য বলে দিচ্ছি। (১৮: ৭৭-৭৮)

নৌকাটির ব্যাপারে-সেটি ছিল কয়েকজন দরিদ্র ব্যক্তির। তারা সমুদ্রে জীবিকা অন্বেষন করত। আমি ইচ্ছা করলাম যে, সেটিকে ক্রটিযুক্ত করে দেই। তাদের অপরদিকে ছিল এক বাদশাহ। সে বলপ্রয়োগে প্রত্যেকটি নৌকা ছিনিয়ে নিত। বালকটির ব্যাপার হলো- তার পিতা-মাতা ছিল ঈমানদার। আমাদের আশঙ্কা হলো, এ বালক তার বিদ্রোহাত্মক আচরণ ও কুফরীর মাধ্যমে তাদেরকে কষ্ট দেবে। তাই আমরা চাইলাম তাদের রব তার বদলে তাদেরকে যেন এমন একটি সন্তান দেন যে চরিত্রের দিক দিয়েও তার চেয়ে ভাল হবে এবং যার কাছ থেকে সদয় আচরণও বেশী আশা করা যাবে। প্রাচীরের ব্যাপারটি হল-সেটি ছিল ঐ শহরের দুজন পিতৃহীন বালকের। এর নীচে ছিল তাদের গুপ্তধন এবং তাদের পিতা ছিল সৎকর্মপরায়ন। তাই আপনার পালনকর্তা ইচ্ছা করলেন যে, তারা যৌবনে পদার্পন করুক এবং নিজেদের গুপ্তধন উদ্ধার করুক। আমি নিজ মতে এটা করিনি। আপনি যে বিষয়ে ধৈর্য্যধারণ করতে অক্ষম হয়েছিলেন, এই হল তার ব্যাখ্যা। (১৮: ৭৯-৮২)


তথ্যসূত্র: সূরা আল কাহফ

একজন ঈমানদার ও একজন কাফিরের বিবরণ

 আল্লাহ তা'আলা বলেন,

তুমি তাদের কাছে দু ব্যক্তির উদাহরণ বর্ণনা কর। আমি তাদের একজনকে দু'টি আঙ্গুরের বাগান দিয়েছিলাম এবং ওগুলোকে খেজুর গাছ দ্বারা পরিবেষ্টিত করেছিলাম এবং এ দু' এর মাঝখানে করেছিলাম শস্যক্ষেত্র। উভয় বাগানই ফলদান দিত এবং তা থেকে কিছুই হ্রাস করত না এবং উভয়ের ফাঁকে ফাঁকে আমি নহর প্রবাহিত করেছিলাম। লোকটির উৎপাদন ছিলো প্রচুর।

অতঃপর কথা প্রসঙ্গে সঙ্গীকে বলল, আমার ধন-সম্পদ তোমার চাইতে বেশী এবং জনবলে আমি অধিক শক্তিশালী। এভাবে নিজের প্রতি জুলুম করে সে তার বাগানে প্রবেশ করল। সে বলল, আমার মনে হয় না যে, এ বাগান কখনও ধ্বংস হয়ে যাবে। এবং আমি মনে করি না যে, কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে। যদি কখনও আমার পালনকর্তার কাছে আমাকে পৌঁছে দেয়া হয়, তবে সেখানে এর চাইতে উৎকৃষ্ট পাব। তার সঙ্গী তাকে কথা প্রসঙ্গে বলল, তুমি তাঁকে অস্বীকার করছ, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, অতঃপর বীর্য থেকে, অতঃপর র্পূনাঙ্গ করেছেন তোমাকে মানবাকৃতিতে? কিন্তু আমি তো একথাই বলি, আল্লাহই আমার পালনকর্তা এবং আমি কাউকে আমার পালনকর্তার শরীক করব না। তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে তখন একথা কেন বললে না; আল্লাহ যা চেয়েছেন (তাই হয়েছে), আল্লাহ ব্যতীত কারো কোন শক্তি নেই। যদিও তুমি আমাকে ধনে ও সন্তানে তোমার চাইতে কম দেখ, আশাকরি আমার পালকর্তা আমাকে তোমার বাগান অপেক্ষা উৎকৃষ্টতর কিছু দান করবেন এবং তার (তোমার বাগানের) উপর আসমান থেকে কোন বিপদ প্রেরণ করবেন। অতঃপর তা শূন্য ময়দানে পরিণত হবে।

অথবা তার পানি শুকিয়ে যাবে। অতঃপর তুমি কক্ষণো তার খোঁজ পাবে না। অতঃপর তার সব ফসলাদি ধ্বংস হয়ে গেল এবং সে তাতে যা ব্যয় করেছিল তার জন্য সকালে হাত কচলিয়ে আক্ষেপ করতে লাগল। তা ছিন্ন-ভিন্ন অবস্থায় ভূমিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। সে বলতে লাগল, হায়! আমি যদি কাউকে আমার পালনকর্তার সাথে শরীক না করতাম। আল্লাহ ছাড়া তাকে সাহায্য করার মতো কোন দলবলও ছিল না, আর সে নিজেও এ বিপদের মোকাবিলা করতে সক্ষম ছিল না। এরূপ ক্ষেত্রে কর্ম সম্পাদনের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতে ন্যস্ত, যিনি সত্য। তারই পুরস্কার উত্তম এবং তারই প্রদত্ত প্রতিদান শ্রেষ্ঠ। -[সূরা আল কাহাফ, আয়াত: ৩২-৪৪]

কতক তাফসীরকার বলেন, এটি একটি উদাহরণ মাত্র। বাস্তবে এমনটা ঘটেই ছিল তা নাও হতে পারে। তবে জমহুর তাফসীরকারের অভিমত এই যে, এটি একটি বাস্তব ঘটনা। -[আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ২য় খন্ড]

নবী ইবরাহীম (আ) এর অগ্নি পরীক্ষা

 

নবী ইবরাহীম (আ) এর অগ্নি পরীক্ষা

ইবরাহীম (আ) এর সাথে যখন যুক্তি ও বিতর্কে এঁটে উঠতে পারলো না, তাদের পক্ষে পেশ করার মত কোন দলীল-প্রমাণ থাকল না, তখন তারা বিতর্কের পথ এড়িয়ে শক্তি ও ক্ষমতা প্রয়োগের পথ অবলম্বন করে- যাতে করে নিজেদের নির্বুদ্ধিতা ও হঠকারিতা টিকিয়ে রাখতে পারে। অতঃপর আল্লাহ্ সুবাহানহুয়া তা'আলা তাদের চক্রান্তকে ব্যর্থ করে দেয়ার কৌশল গ্রহণ করেন।

'তারা বলল, একে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও। আমি বললাম, হে অগ্নি! তুমি ইব্রাহীমের উপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও। তারা ইব্রাহীমের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করল, অতঃপর আমি তাদেরকেই সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ করে দিলাম।' -[ক্বুরআন ২১ : ৬৮-৭০]

তারা বিভিন্ন স্থান থেকে সম্ভাব্য চেষ্টার মাধ্যমে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করতে থাকে। দীর্ঘদিন পর্যন্ত তারা এ সংগ্রহের কাজে রত থাকে। তাদের মধ্যে কোন মহিলা পীড়িত হলে মানত করত যে, যদি সে আরোগ্য লাভ করে তবে ইবরাহীম (আ) কে পোড়াবার লাকড়ি সংগ্রহ করে দেবে। এরপর তারা বিরাট এক গর্ত তৈরী করে তার মধ্যে লাকড়ি নিক্ষেপ করে অগ্নি সংযোগ করে। ফলে তীব্র দাহনে প্রজ্বলিত অগ্নিশিখা এত উর্ধে উঠতে থাকে, যার কোন তুলনা হয় না। তারপর ইবরাহীম (আ) কে মিনজানীক নামক নিক্ষেপণ যন্ত্রে বসিয়ে দেয়।

এ যন্ত্রটি কুর্দী সম্প্রদায়ের হাযান নামক এক ব্যক্তি তৈরী করে। মিনজানীক যন্ত্র সে-ই প্রথম আবিষ্কার করে। আল্লাহ্ তাকে মাটির মধ্যে ধসিয়ে দেন। কিয়ামত পর্যন্ত সে মাটির মধ্যে তলিয়ে যেতে থাকবে। তারপর তারা ইবরাহীম (আ) কে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যেতে থাকে। তখন তিনি বলতে থাকেন-
 'আপনি (আল্লাহ্) ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, আপনি মহা পবিত্র, বাদশাহীর মালিক কেবল আপনিই, আপনার কোন শরীক নেই।'

অতঃপর তারা ইবরাহীম (আ) কে মিনজানীকের পাল্লায় হাত-পা বাঁধা অবস্থায় রেখে আগুনে নিক্ষেপ করে। তখন তিনি বলেন-
 'আমার জন্য আল্লাহ্-ই যথেষ্ট, তিনি উত্তম অভিভাবক।'

আবু ইয়ালা (র)... আবু হুরায়রা (রা) সূত্রে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ইবরাহীম (আ) কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয় তখন তিনি এ দু'আটি পড়েন-
 'হে আল্লাহ্! আপনি আকাশ রাজ্যে একা আর এই যমীনে আমি একাই আপনার ইবাদাত করছি।'

পূর্ববর্তী যুগের কোন কোন আলিম বলেন, জিবরাঈল (আ) শূন্য থেকে ইবরাহীম (আ) কে বলেছিলেন- আপনার কোন সাহায্যের প্রয়োজন আছে কি? উত্তরে ইবরাহীম (আ) বলেছিলেন- সাহায্যের প্রয়োজন আছে, তবে আপনার কাছে নয় (আল্লাহর কাছে)।

আর আল্লাহর নির্দেশ বাণী অধিক দ্রুত গতিতেই পৌঁছে যায় -
 '(আল্লাহ্ বলেন) আমি বললাম, হে আগুন! তুমি ইবরাহীমের উপর শান্তিদায়ক হয়ে যাও।'

ইবরাহীম (আ) যখন প্রাচীর বেষ্টনীর মধ্যকার উক্ত গহ্বরে অবস্থান করছিলেন, তখন তার চতুষ্পার্শ্বে আগুনের লেলিহান শিখা দাউ দাউ করছিল, অথচ তিনি ছিলেন শান্তি ও নিরাপদে।

আবু হুরায়রা (রা) বলেন, ইবরাহীম (আ) এর পিতা আপন পুত্রের এ অবস্থা দেখে একটি উত্তম কথা বলেছিল, তা হল-
 'হে ইবরাহীম! তোমার প্রতিপালক কতই না উত্তম প্রতিপালক।'


তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড

নবী ইবরাহীম (আ) এর সাহসিকতা

 

নবী ইবরাহীম (আ) এর সাহসিকতা

নবী ইবরাহীম (আ) কে আল্লাহ্ সুবাহানহুয়া তা'আলা এমন জ্ঞান দিয়েছিলেন যে, তিনি ছোটবেলা থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন যে তার সম্প্রদায় যে মিথ্যা উপাস্যদের ইবাদাত করে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতাই রাখেনা। তার এই তাওহীদ শিক্ষা মানুষের কাছে প্রচার করতে গিয়ে তার সাহস ফুটে উঠে। আর এই সাহসিকতা এতই বেশি ছিল যে, তিনি অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ হওয়ার পরও আল্লাহর এককত্বের সাক্ষ্য দিয়েছেন।

 স্মরণ কর ইব্রাহীমকে। যখন তিনি তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিল; তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁকে ভয় কর। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা বোঝ। তোমরা তো আল্লাহর পরিবর্তে কেবল প্রতিমারই পূজা করছ এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছ। তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদের ইবাদত করছ, তারা তোমাদের রিযিকের মালিক নয়। কাজেই আল্লাহর কাছে রিযিক তালাশ কর, তাঁর ইবাদত কর এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে। -[ক্বুরআন ২৯ : ১৬-১৯]

 এ কিতাবে উল্লেখিত ইব্রাহীমের কথা স্মরণ কর। নিশ্চয়ই সে ছিল একজন সত্যবাদী, একজন নবী। যখন সে তার পিতাকে বলল, হে আমার পিতা! আপনি কেন এমন জিনিসের ইবাদাত করেন যে শুনে না, দেখে না এবং আপনার কোন উপকারে আসে না? হে আমার পিতা! আমার কাছে এমন জ্ঞান এসেছে; যা আপনার কাছে আসেনি, সুতরাং আমার অনুসরণ করুন, আমি আপনাকে সরল সঠিক পথ দেখাব। হে আমার পিতা! আপনি শয়তানের ইবাদত করবেন না, শয়তান হচ্ছে দয়াময়ের অবাধ্য। হে আমার পিতা! আমি আশঙ্কা করি, দয়াময়ের একটি আযাব আপনাকে স্পর্শ করবে, অতঃপর আপনি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবেন। পিতা বলল, হে ইব্রাহীম! তুমি কি আমার উপাস্যদের (দেবদেবীগুলো) থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছ? যদি তুমি বিরত না হও, তবে আমি অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে তোমার প্রাণনাশ করব। তুমি চিরতরে আমার কাছ থেকে দূর হয়ে যাও। ইব্রাহীম বলল, আপনার প্রতি সালাম, আমি আমার পালনকর্তার কাছে আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করব। তিনি আমার প্রতি বড়ই মেহেরবান। আমি পরিত্যাগ করছি আপনাদেরকে এবং আপনারা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত কর তাদেরকে; আমি আমার পালনকর্তাকে ডাকি। আশা করি, আমার পালনকর্তাকে ডেকে আমি বঞ্চিত হব না। -[ক্বুরআন ১৯ : ৪১-৪৮]

এখানে আল্লাহ্ ইবরাহীম (আ) ও তাঁর পিতার মধ্যে যে কথোপকথন ও বিতর্ক হয়েছিল তা উল্লেখ করেছেন। সত্যের দিকে পিতাকে যে কোমল ভাষায় ও উত্তম ভংগিতে আহ্বান করেছেন তা এখানে সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে। তিনি সৎসাহসের সাথে পিতার মূর্তি পূজার অসারতা তুলে ধরেছেন এভাবে যে, এগুলো তাদের উপাসনাকারীদের ডাক শুনতে পায় না, তাদের অবস্থানও দেখতে পায় না, তাহলে কিভাবে এরা উপাসকদের উপকার করবে?

 যখন তিনি তাঁর পিতা ও তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিল, এই মূর্তিগুলো কী, যাদের তোমরা পূজারী হয়ে বসে আছ? তারা বলল, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে এদের পুজা করতে দেখেছি। সে বলল, তোমরা প্রকাশ্য গোমরাহীতে আছ এবং তোমাদের বাপ-দাদারাও। তারা বলল, তুমি কি আমাদের কাছে সত্যসহ আগমন করেছ, না তুমি কৌতুক করছ? সে বলল, না, তিনিই তোমাদের পালনকর্তা যিনি নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলের পালনকর্তা, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন; আর আমি এই বিষয়েরই সাক্ষ্যদাতা। (ইবরাহীম বলল) আল্লাহর কসম, যখন তোমরা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে চলে যাবে, তখন আমি তোমাদের মূর্তিগুলোর ব্যাপারে একটা ব্যবস্থা অবলম্বন করব। অতঃপর সে সেগুলোকে চূর্ণ-বিচুর্ণ করে দিলেন ওদের প্রধানটি ব্যতীত, যাতে তারা তাঁর কাছে প্রত্যাবর্তন করে। তারা বলল, আমাদের উপাস্যদের সাথে এরূপ ব্যবহার কে করল? সে তো নিশ্চয়ই কোন জালিম। কতক লোকে বলল, আমরা এক যুবককে তাদের সম্পর্কে বিরূপ আলোচনা করতে শুনেছি; তাকে ইব্রাহীম বলা হয়। তারা বলল, তাকে জনসমক্ষে উপস্থিত কর, যাতে তারা দেখে। তারা বলল, হে ইব্রাহীম! তুমিই কি আমাদের উপাস্যদের সাথে এরূপ ব্যবহার করেছ? সে বলল, না, এদের এই প্রধানই তো একাজ করেছে। অতএব তাদেরকে জিজ্ঞেস কর, যদি তারা কথা বলতে পারে। অতঃপর মনে মনে চিন্তা করল এবং বলল, লোক সকল; তোমরাই বে-ইনসাফ। অতঃপর তারা ঝুঁকে গেল মস্তক নত করে, তুমি তো জান যে, এরা কথা বলে না। সে বলল, তোমরা কি আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদত কর, যা তোমাদের কোন উপকারও করতে পারে না এবং ক্ষতিও করতে পারে না? -[ক্বুরআন ২১ : ৫২-৬৬]

উপরোক্ত আয়াতগুলোতে ইবরাহীম (আ) সাহসিকতা ও দৃঢ়তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তিনি তাঁর জাতির মিথ্যা উপাস্যদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট যুক্তি উপস্থাপন করেছেন, যা তাদেরকে মাথা অবনত করতে বাধ্য করে। কিন্তু তাদের দাম্ভিকতা তাঁর বিরুদ্ধেই উদ্ধত করলো।


তথ্যসূত্র: আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খণ্ড

Translate