March 27, 2024

রাসূলুল্লাহ ﷺ অনেক গুলো বিয়ে করেছিলেন কেন?

 bohubibaho2

সাধারণ মুসলিমের মনে একটা প্রশ্ন প্রায়ই ঘুরপাক খায়, তা হলো – রাসূলুল্লাহ ﷺ এতগুলো বিয়ে করেছিলেন কেন? সাধারণ মুসলিম পুরুষ না ৪টার বেশী বিয়ে করতে পারে না? উনি তাহলে ১১টা বিয়ে করলেন কেন? –বর্তমান সময় যখন অনলাইনে ও অফলাইনে নাস্তিকতা ও ইসলাম-বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে তখন সাধারণ মুসলিমের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরী হয়ে পড়েছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আছে এবং এই লেখায় আমি সেই উত্তর দিব। কিন্তু সেই উত্তরে যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা ভূমিকার অবতারণা করতে হচ্ছে।

উত্তর বুঝার প্রি-রিকুইসিট জ্ঞান:

আমাদের উপমহাদেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে নিয়ে লেখা কিছু বইতে, এবং বিভিন্ন আলেমরা তাদের লেকচারে তাঁকে নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি রকমের কথা বলে থাকেন। যেমন – রাসূলুল্লাহ ﷺ  নূরের তৈরী, তাঁকে সৃষ্টি না করা হলে কিছুই সৃষ্টি হত না, তিনি সকল প্রকার মানবিক ও জৈবিক চাহিদার উর্ধ্বে ছিলেন – ইত্যাদি। এই কথাগুলো ভুল। অবশ্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ  সব মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং তিনি নিষ্পাপ, কিন্তু একথাও মনে রাখতে হবে তিনি আমাদের মতই রক্ত-মাংসের একজন মানুষ, যাকে তাঁর ঈমান ও আমলের কারণে আল্লাহ্‌ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।

বলুন, “আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ। যার উপর প্রত্যাদেশ হয়েছে যে তোমাদের উপাস্য একমাত্র আল্লাহ্‌, তাই তাঁরই পথ অবলম্বন করো এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো”। (সূরা ফুসসিলাত ৪১:৬)

আমাদের মধ্যে যেমন আশা-আকাংক্ষা, দু:খ-কষ্ট, অস্থিরতা-রাগ আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মধ্যেও এর সবই উপস্থিত ছিল। তাঁর সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তিনি এগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণের রাখতে পারতেন, আমরা কখনো পারি, কখনো পারি না। আমাদের মধ্যে যেমন কামনা-বাসনা আছে, স্বাভাবিকভাবে মানুষ হিসাবে তাঁর মধ্যেও এগুলো ছিল। আমরা যেমন সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট হই, তিনিও সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতেন। আমাদের সাথে তাঁর পার্থক্য হলো – আমরা আমাদের বাসনা পূরণের জন্য আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমা লঙ্ঘন করে ফেলি, যার দিকে তাকানো উচিত নয় তার দিকে তাকাই, যার সাথে সম্পর্ক করা আল্লাহর  ﷻ বিধানের বাইরে তার সাথেও সম্পর্ক করি। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর চাহিদা পূরণের জন্য কখনোই আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমাকে লঙ্ঘন করেননি, সর্বাবস্থায় আল্লাহর  ﷻ হুকুম মেনে চলেছেন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ (বা যে কোন মানুষের) যে কোন কাজ সম্পর্কে আমাদের আপত্তি থাকবে না যদি তা নিচের দুইটা (both) বিষয়কে মেনে চলে –

এক – যদি তা আল্লাহর  ﷻ  দেয়া সীমার মধ্যে থাকে। অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ যদি কোন কিছুকে হালাল করে থাকেন তাহলে সেটা করলে দোষের কিছু নেই।

দুই – যদি কাজটি ঐ সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। (নামাজ,রোজা তথা ইবাদতের ক্ষেত্রে এই ২য় শর্তটি পূরণ হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু পার্থিব কাজ যেমন বিয়ে, যুদ্ধ ইত্যাদির (worldly affairs) ক্ষেত্রে এই শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ)

উদাহরণস্বরূপ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বহুবিবাহের কথা ধরা যাক। আমরা জানি – রাসূলুল্লাহ ﷺ বহু বিবাহ করেছেন – এটার অনুমতি আল্লাহর  ﷻ কাছ থেকেও আছে, আবার তৎকালীন সমাজেও এটা গ্রহণযোগ্য প্র্যাক্টিস ছিল – কাজেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বহুবিবাহ নিয়ে কোন মুসলিমের আপত্তি থাকবে না।  আবার বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় সাধারণভাবে বহু বিবাহ গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই কোন মুসলিম যদি সক্ষমতা থাকার পরেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কথা বিবেচনা করে বহুবিবাহ না করে – তাহলেও আমরা বলব সে ঠিক করেছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বে সমকামিতা একটি গ্রহণযোগ্য আচরণ, কিন্তু একজন মুসলিম হিসাবে আমরা এই আচরণের পক্ষে নই কারণ এটা আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমার বাইরে।

এখানে বলে রাখা ভাল যে, ইসলামিক আইন যদিও কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা’ (Consensus) ও কিয়াসের (Analogy) উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু এর প্রয়োগ আরো কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে যার মধ্যে আছে –  মাসলাহা মুরসালা (Consideration of Public Welfare/জনতার বৃহত্তর স্বার্থ) ও উরফ (Social norm /সামাজিক রীতি)।

উপরের প্রি-রিকুইসিট জ্ঞানকে মাথায় রেখে এবার আসুন সরাসরি প্রশ্নে চলে যাওয়া যাক।

bohubibaho1

প্রশ্ন – ইসলামের যেখানে ১জন পুরুষের জন্য ৪জন স্ত্রী রাখার অনুমতি আছে, সেখানে মুহাম্মাদ ﷺ কিভাবে ১১টা বিয়ে করলেন? তাঁর বৈবাহিক জীবন কি অস্বাভাবিক নয়?

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর  ১১জন স্ত্রী ছিল, যার মধ্যে ৯ জন একসাথে স্ত্রী হিসাবে ছিল (বাকী ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল)।  তাঁর স্ত্রীদেরকে আমরা সম্মানের সাথে উম্মাহাতুল মু’মিনীন (ঈমানদারদের মাতা) বলে থাকি।

যদিও একজন মুসলিমের জন্য চারজনের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি নেই, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আল্লাহ্‌ চার এর বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। আর এই অনুমতি দেয়া হয়েছে নিচের আয়াতের মাধ্যমে।

হে নবী, আমি আপনার জন্য বৈধ করেছি আপনার স্ত্রীদেরকে যাদের আপনি দেনমোহর দিয়েছেন … আর কোন ঈমানদার নারী নবীর কাছে নিবেদন করলে আর নবী তাকে বিয়ে করতে চাইলে সে বৈধ। আর এ শুধু আপনারই জন্য, বাকী মুমিনদের জন্য নয়। [সূরা আহযাব ৩৩:৫০]

কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সুবিধা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেয়ার কারণ কি? আসুন এর কয়েকটা কারণ দেখা যাক –

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শারিয়াহ কিছুটা ভিন্ন ছিল

রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শারিয়াহর কিছু অংশ সাধারণ মুসলিমদের থেকে ভিন্ন ছিল। এই ভিন্ন শারিয়াহ তাকে সুবিধা কিছু দিয়েছিল, কিন্তু দায়িত্ব দিয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশী। যেমন – রাসূলুল্লাহ  ﷺ এর জন্য প্রতিরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া ওয়াজিব ছিল, একবার যুদ্ধের সরঞ্জাম পড়ে ফেলার পর যুদ্ধে না যাওয়া তাঁর জন্য হারাম ছিল, দান গ্রহণ করা তাঁর জন্য হারাম ছিল, মৃত্যুর সময় পরিবারের জন্য একটা পয়সা সম্পদ রেখে যাওয়াও তাঁর জন্য হারাম ছিল, এমন কি আজ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বংশধরের কেউ যতই দরিদ্র হোক না কেন যাকাত নিতে পারবে না।  এত কঠিন কঠিন নিয়মের বিপরীতে আল্লাহ্‌ তাঁকে খুব অল্প কিছু বিধানে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি হলো চারটির বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি।

রাসূলুল্লাহ ﷺ চাইলে আরো বেশী বিয়ে করতে পারতেন

রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর যৌবনের প্রাইম টাইম একজন মাত্র স্ত্রীর সাথেই কাটিয়েছিলেন – ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর একজন মাত্র স্ত্রী ছিল। অথচ বহুবিবাহ করা আরব সমাজে একটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল এবং তিনি চাইলেই তখন একাধিক বিয়ে করতে পারতেন।  আমাদের সমাজে যেমন বিয়ের সময় ছেলেদের যোগ্যতা দেখা হয় – তার পড়াশুনা, চাকরি-বাকরি, আয়-রোজগার দেখা হয়, তৎকালীন আরব সমাজে বিয়ের সময় একটা ছেলে বা মেয়ের একটা বৈশিষ্ট্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ছিল – তা হলো বংশমর্যাদা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন আরবের সবচাইতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের সবচাইতে সম্মানিত ও লিজেন্ডারি ব্যক্তিত্ব আব্দুল মুত্তালিব এর সবচেয়ে প্রিয় নাতি। তাই তিনি চাইলে যৌবনে ও নবুয়তির আগে ১০-১২টা বিয়ে করা তার জন্য কোন ব্যাপারই ছিল না, কিন্তু তা তিনি করেন নি।

সেই সমাজে বিয়ে ছিল ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি অন্যতম উপায়

বর্তমানে আমরা যে সমাজে বাস করি তাতে বিয়ের উদ্দেশ্য একটাই থাকে – সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী একটা ছেলে / মেয়েকে তার জীবনসঙ্গীর সাথে মিলিয়ে দেয়া। কিন্তু, আরব সমাজে “রাষ্ট্র” বলে কিছু ছিল না এবং এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের ঝগড়া-যুদ্ধ লেগেই থাকত। সেকালে সামাজিকভাবে সুরক্ষিত থাকার একমাত্র উপায় ছিল গোত্রবদ্ধ হয়ে চলা, তাই সেই সমাজে বিয়ের আরেকটি অন্যতম কারণ ছিল অন্য পরিবার বা অন্য গোত্রের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন করা।  আর রাসূলুল্লাহ ﷺ যেহেতু আরবদের ৩ হাজার বছরের পুরনো রীতি-নীতিকে পরিবর্তন করে মাত্র ২৩ বছরে সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ইসলামের প্রবর্তন করছিলেন, কাজেই এটা তার জন্য খুব জরুরী ছিল যে তিনি বিয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করবেন। এই দিক থেকে চিন্তা করলে, বহুবিবাহের অনুমতি রাসূল্ললাহর ﷺ জন্য কোন সুবিধা ছিল না, বরং ছিল এক মহা দায়িত্ব।

নিচে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীদের তালিকা ও বিয়ের মূল কারণ উল্লেখ করা হল।

 স্ত্রীর নামবিয়ের মূল কারণবিয়ের সালমন্তব্য
১খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা)সাধারণ সামাজিক বিয়েনবুয়তের ১০ম বছরখাদিজার প্রস্তাবে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে। এটা ছিল খাদিজার ৩য় বিয়ে।

খাদিজা জীবিত থাকতে রাসূলুল্লাহ ﷺ আর কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি। খাদিজার মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ ﷺর বয়স ছিল ৫০ বছর।  তাঁরা দীর্ঘ ২৫ বছর সংসার করেছিলেন।

২সাওদা বিনতে জাম’আ (রা)সাধারণ সামাজিক বিয়েনবুয়তের ১০ম বছররাসূলুল্লাহ ﷺর খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে।
৩আইশা (রা) বিনতে আবু বকর (রা)সাধারণ সামাজিক বিয়ে ও বন্ধু আবু বকর (রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন।এছাড়াও এতে আল্লাহর  ﷻ  পরোক্ষ নির্দেশ ছিল। (বুখারি)বিয়ের প্রতিশ্রুতি: নবুয়তের ১১ তম বছর।

একসাথে বসবাস শুরু: ১ম হিজরী

রাসূলুল্লাহ ﷺর খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে।

আইশা জিনিয়াস ছিলেন। তিনি কুরআন, হাদিস, ইসলামি আইন, প্রাচীন কবিতা ও বংশ-জ্ঞান (Geneology) এ এক্সপার্ট ছিলেন। অন্যতম সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী।  তিনি রাসূলুল্লাহর ﷺ একমাত্র কুমারী স্ত্রী।

৪হাফসা (রা) বিনতে উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)বন্ধু উমার(রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন৩য় হিজরীএটা হাফসার দ্বিতীয় বিয়ে।  আগের বিয়ে তিনি ১১ বছর বয়সে করেছিলেন।
৫যাইনাব বিনতে খুযাইমা (রা)যাইনাবের দানশীলতার পুরষ্কার ও উত্তরের নাজদি অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন৪র্থ হিজরীএটা ছিল তাঁর তৃতীয় বিয়ে। যাইনাব তাঁর দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে তাঁর স্বামী শহিদ হওয়ার পর এরকম মহান নারীর জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺই ছিলেন একমাত্র যোগ্য স্বামী। বিয়ের ৮ মাস পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
৬উম্মে সালামা (রা)

অন্য নাম: হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া

উম্মে সালামার ঈমান ও আমলের পুরষ্কার৫ম হিজরীএটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে। তাঁর স্বামী উহুদের যুদ্ধের আঘাতে শহীদ হন। মৃত্যুর সময় তাঁর স্বামী দু’আ করেছিলেন তিনি যেন তার চাইতেও ভালো একজনকে স্বামী হিসাবে পান। আল্লাহ্‌ সেই দু’আ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাধ্যমে কবুল করেন। উম্মে সালামা বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন।
৭যাইনাব বিনতে জাহশ (রা)আল্লাহর  ﷻ নির্দেশ (সূরা আহযাব:৩৭) ও পালক পুত্র যে নিজের পুত্র নয় এই ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা৫ম হিজরীএটা তাঁর ২য় বিয়ে। যাইনাব কুরাইশি ছিলেন ও রাসূলুল্লাহর ﷺ ফুপাত বোন ছিলেন। আরব সমাজে, কাযিনদের মধ্যে বিয়ে হওয়া খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিল। আনাস(রা) বলেন – রাসূলুল্লাহ ﷺ যদি কোরআনের কোন আয়াত লুকাতেন তাহলে যাইনাবের সাথে বিয়ের আয়াতটাকেই লুকাতে চাইতেন (বুখারী)। – শুধু আল্লাহর  ﷻ হুকুম পালনের জন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ এই বিয়েটা করেন।
৮যুয়াইরিয়াহ বিনতে আল-হারিস (রা)বানুল মুস্তালিকের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন৫ম হিজরীএটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন বানুল মুস্তালিক গোত্রপ্রধানের মেয়ে। যুয়াইরিয়াকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে মুক্ত করেন এবং বিয়ে করেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেন।  শত শত সাহাবী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি করে দেন।  এই বিয়ের ফলে সম্পূর্ন বানুল মুস্তালিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
৯উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান (রা)

অন্য নাম: রামলা

কুরাইশদের মধ্য থেকে শত্রুভাব অপসারণ৭ম হিজরীএটা তাঁর ২য় বিয়ে। তৎকালীন মুশরিক কুরাইশদের অবিসংবাদিত নেতা আবু সুফিয়ানের মেয়ে। কুরাইশদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে উম্মে হাবিবা আবিসিনিয়ায় চলে যান যেখানে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়, পরে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে অনেক মুশরিকের মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ইসলামের প্রতি ভালবাসা তৈরীতে সাহায্য করে।
১০সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা)ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন৭ম হিজরীএটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন ইহুদীদের বনু নাদির গোত্রের নেতার মেয়ে। তিনি প্রথম থেকেই বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মকে পছন্দ করতেন। খন্দকের যুদ্ধে তাঁকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে মুক্তি দেন ও বিয়ে করেন। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধবন্দি মুক্তিতে উৎসাহ দেন ও এটাও প্রমাণ করেন – ইহুদীদের প্রতি মুসলিমদের কোন জাতিগত বিদ্বেষ নেই।
১১মাইমুনাহ বিনতে আল-হারিস(রা)

ইসলাম-পূর্ব নাম: বাররাহ

চাচা আব্বাসের অনুরোধে ও কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন৮ম হিজরীএটা তাঁর ২য় বিয়ে। হুদায়বিয়ার সন্ধির পরের বছর রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন উমরা করতে মক্কা আসেন তখন চাচা আব্বাস (রা) তাঁকে অনুরোধ করেন মাইমুনাকে বিয়ে করতে।  এই বিয়ের পর রাসূল্ললাহ মক্কার কুরাইশদেরকে (যারা তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি) তাঁর ওয়ালিমায়  দাওয়াত দেন ও এভাবে তাদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের চেষ্টা করেন।

উপরের তথ্য থেকে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর বিয়েগুলো যে সব কারণে করেছিলেন তার মধ্যে আছে – স্বাভাবিক সামাজিক কারণ, কোন বন্ধুর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করণ, কোন গোত্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, অথবা যে গুণবতী নারীর স্বামী শহীদ হয়েছে তাঁকে সম্মানিত করার জন্য।  আর এই বিয়েগুলোর ক্ষেত্রে সেই নারীর সৌন্দর্যও যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আকর্ষণ করে থাকে তাতে দোষের কিছু নেই। একজন পুরুষ তো তাকেই বিয়ে করতে চাইবে যাকে তার সুন্দর লাগে – এটাই তো স্বাভাবিক বায়োলজিকাল ব্যাপার।

রাসূলুল্লাহ ﷺ জোর করে কাউকে বিয়ে করেন নাই

রাসূলুল্লাহ ﷺ কখনোই জোর করে কাউকে বিয়ে করেননি। তিনি ﷺ যাদেরকে বিয়ে করেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। যে তাঁর স্ত্রী হতে চায়নি, তাকে তিনি বিয়ে করেননি।

সাহিহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে আমরা একটি ঘটনা জানি যেখানে উমাইমাহ বিনতে শাহরিল নামক এক মহিলা প্রাথমিকভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর  স্ত্রী হতে সম্মতি জানায়। কিন্তু, বিয়ের রাতে সেই মহিলা তার মত পরিবর্তন করে ও স্ত্রী হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেখে সে বলে উঠে – “আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি”।  জবাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন – “তুমি সবচাইতে বড়র কাছেই আশ্রয় চেয়েছ। যাও, তুমি তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাও।”   এভাবে করে বিয়ে কনসুমেট (স্বামী-স্ত্রী হিসাবে একসাথে থাকা) করার আগেই রাসূলুল্লাহ উমাইমাহকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন। অন্য কিছু বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ কে অপদস্থ করার জন্য কাফেররা মহিলাটাকে দিয়ে এরকম করিয়েছিল। ইতিহাসের বইগুলোতে এরকমও পাওয়া যায় যে এই মহিলা তার বাকী জীবন রাসূলুল্লার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আফসোস করতে করতে কাটিয়েছিল।

রাসূলুল্লাহ ﷺ জোর করে কোন স্ত্রীকে ধরে রাখেন নাই

রাসূলুল্লাহ ﷺ তো জোর করে কাউকে বিয়ে করেন নাই, জোর করে কাউকে বিয়ের পরে ধরেও রাখেন নাই। বরং, তাঁর যে কোন স্ত্রী চাইলেই তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারতেন।

হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলুন, “তোমরা যদি পার্থিব জীবনের ভোগ ও বিলাসিতা কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদেরকে ভোগবিলাসের ব্যবস্থা করে দেই আর তোমাদেরকে ভদ্রতার সাথে বিদায় দেই। আর তোমরা যদি আল্লাহ্‌, তাঁর রাসূল ও পরকাল চাও, তবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎ কর্ম করে আল্লাহ্‌ তাদের জন্য মহাপ্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন”। (সূরা আহযাব ৩৩:২৮–২৯)

হাদিস থেকে আমরা বরং দেখি, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীরা তাঁর কাছে ডিভোর্স তো চানই নি বরং প্রত্যেকেই যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন প্রশংসা করেছিলেন যে স্বামী হিসাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ কতটা মহৎ ছিলেন।

ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর তিনি আর বিয়ে করেন নাই

আমরা লক্ষ্য করলে দেখব যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ৭টি বিয়েই হয়েছে ৩য় থেকে ৮ম হিজরীর সময়। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের সবচেয়ে আন্দোলিত সময়, যখন মুসলিমরা বিভিন্ন গোত্রের সাথে যুদ্ধে যাচ্ছে, আবার বিভিন্ন গোত্রের সাথে শান্তিচুক্তি করছে। কাজেই, এই সময় এই বিয়েগুলো ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের অংশ বিশেষ। তিনি যদি নারীলোভীই হয়ে থাকবেন তাহলে তো এর আগে-পরেও তাঁর অনেক বিয়ে করার কথা ছিল। শুধু তাই না, রাসূলুল্লাহ ﷺ বেঁচেছিলেন ১১ হিজরী পর্যন্ত। কিন্তু, ৭ম হিজরির হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হুনাইনের যুদ্ধে বিজয়ের পরে আরব ভূখন্ডে মুসলিমদের একচ্ছত্র আধিপত্য সময়ের ব্যাপারে হয়ে দাঁড়ায় – আল্লাহ্‌ নিজেই সূরা ফাতহ তে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে “পরিষ্কার বিজয়” হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আর তাই আমরা দেখতে পাই, ৯ম-১১তম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ গোত্রভিত্তিক সম্পর্ক উন্নয়নে আর কোন বিয়েও করেননি। তিনি যদি আসলেই শুধু নিজের চাহিদায় বিয়ে করে থাকতেন তাহলে তিনি ঐ শেষের ২ বছরেও বিয়ে করা করা থামাতেন না।

তথ্য সূত্র:

১) শেইখ ইয়াসির কাযীর সীরাহ লেকচার

২) ড. সাল্লাবির সীরাহ বই

৩) শেইখ সাফিউর রাহমান মুবারাকপুরীর সীরাহ বই

৪) দি কোড অফ স্কলারস – শেইখ ইয়াসির বিরজাস

মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের জন্য করণীয় আমলসূমহ

 

maxresdefault
লেখকঃ হাবিবুল্লাহ মুহাম্মাদ ইকবাল | অনুবাদক : আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া | প্রকাশনায় : ইসলাম প্রচার ব্যুরো, রাবওয়াহ, রিয়াদ

إن الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد

মা-বাবা ছোট শব্দ, কিন্তু এ দুটি শব্দের সাথে কত যে আদর, স্নেহ, ভালবাসা রয়েছে  তা পৃথিবীর কোন মাপযন্ত্র দিয়ে নির্ণয় করা যাবে না। মা-বাবা কত না কষ্ট করেছেন, না খেয়ে থেকেছেন, অনেক সময় ভাল পোষাকও পরিধান করতে পারেন নি, কত না সময় বসে থাকতেন সন্তানের অপেক্ষায়। সেই মা বাবা যাদের চলে গিয়েছেন, তারাই বুঝেন মা বাবা কত বড় সম্পদ। যেদিন থেকে মা বাবা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন সেদিন থেকে মনে হয় কী যেন হারিয়ে গেল,তখন বুক কেঁপে উঠে, চোখ থেকে বৃষ্টির মত পানি ঝরে, কী শান্তনাই বা তাদেরকে দেয়া যায়!  সেই মা বাবা যাদের চলে গিয়েছে তারা কি মা-বাবার জন্য কিছুই করবে না?। এত কষ্ট করে আমাদের কে যে মা-বাবা লালন পালন করেছেন তাদের জন্য আমাদের কি কিছুই করার নেই? অবশ্যই আছে। আলোচ্য প্রবন্ধে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মৃত মা-বাবা জন্য কী ধরনের আমল করা যাবে এবং যে আমলের সওয়াব তাদের নিকট পৌছবে তা উল্লেখ করা হলো:

১. বেশী বেশী দু‘আ করা 

মা-বাবা দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর সন্তান মা-বাবার জন্য বেশী বেশী দু‘আ করবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কী দু‘আ করবো তাও শিক্ষা দিয়েছেন । আল-কুরআনে এসেছে,

 رَبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا ٢٤ ﴾ [الاسراء: ٢٤]

‘‘হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন’’ [সূরা বানী ইসরাঈলঃ ২৪]

رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ يَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡحِسَابُ ٤١﴾ [ابراهيم: ٤١]

‘‘হে আমাদের রব, রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন’’ [সুরা ইবরাহীমঃ৪১]

এছাড়া আলস্নাহ রাববুল আলামীন পিতা-মাতার জন্য দূ‘আ করার বিশেষ নিয়ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ

 رَّبِّ ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيۡتِيَ مُؤۡمِنٗا وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِۖ وَلَا تَزِدِ ٱلظَّٰلِمِينَ إِلَّا تَبَارَۢا ٢٨ ﴾ [نوح: ٢٨

‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি যালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না ’[সূরা নুহ: ২৮] ।

 

মা-বাবা এমন সন্তান রেখে যাবেন যারা তাদের জন্য দোয়া করবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

« إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ ».

অর্থ: মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩ টি আমল বন্ধ হয় না-১.সদকায়ে জারিয়া  ২. এমন জ্ঞান-যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় ৩. এমন নেক সন্তান- যে তার জন্য দু‘আ করে [সহিহ মুসলিম: ৪৩১০]

মূলত: জানাযার নামায প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ স্বরূপ।

২. দান-ছাদকাহ করা, বিশেষ করে সাদাকায়ে জারিয়াহ প্রদান করাঃ

মা-বাবা বেচে থাকতে দান-সাদকাহ করে যেতে পারেন নি বা বেচে থাকলে আরো দান-সদকাহ করতেন, সেজন্য তাদের পক্ষ থেকে  সন্তান দান-সদকাহ করতে পারে। হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمِّىَ افْتُلِتَتْ نَفْسَهَا وَلَمْ تُوصِ وَأَظُنُّهَا لَوْ تَكَلَّمَتْ تَصَدَّقَتْ أَفَلَهَا أَجْرٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ عَنْهَا قَالَ « نَعَمْ »

অর্থ: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেনঃ ‘‘জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল আমার মা হঠাৎ মৃতু বরণ করেছেন। তাই কোন অছিয়ত করতে পারেন নি। আমার ধারণা তিনি যদি কথা বলার সুযোগ পেতেন তাহলে দান-ছাদকা করতেন। আমি তাঁর পক্ষ থেকে ছাদকা করলে তিনি কি এর ছাওয়াব পাবেন ? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন হ্যাঁ, অবশ্যই পাবেন।’’ [সহীহ মুসলিম:২৩৭৩]

তবে সবচেয়ে উত্তম হচ্ছে সাদাকায়ে জারিয়া বা প্রবাহমান ও চলমান সাদাকা প্রদান করা। যেমন পানির কুপ খনন করা, (নলকুপ বসানো, দ্বীনী মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, কুরআন শিক্ষার জন্য মক্তব ও প্রতিষ্ঠান তৈরী করা, স্থায়ী জনকল্যাণমূলক কাজ করা। ইত্যাদি।

৩. মা-বাবার পক্ষ থেকে সিয়াম  পালনঃ

মা-বাবা জীবিত থাকা অবস্থায় যদি তাদের কোন মানতের সিয়াম কাযা থাকে, সন্তান তাদের পক্ষ থেকে সিয়াম পালন করলে তাদের পক্ষ থেকে আদায় হয়ে যাবে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ

«مَنْ مَاتَ  وَعَلَيْهِ صِيَامٌ صَامَ عَنْهُ وَلِيُّهُ»

অর্থ: ‘‘যে ব্যক্তি মৃত্যু বরণ করল এমতাবস্থায় যে তার উপর রোজা ওয়াজিব ছিল। তবে তার পক্ষ থেকে তার ওয়ারিসগণ রোজা রাখবে’’ [সহীহ বুখারী:১৯৫২]।

অধিকাংশ আলেমগণ এ হাদীসটি শুধুমাত্র ওয়াজিব রোযা বা মানতের রোযার বিধান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। তাদের পক্ষ থেকে নফল সিয়াম রাখার পক্ষে দলীল নাই।

৪. হজ্জ বা উমরাহ করাঃ

মা-বাবার পক্ষ থেকে হজ্জ বা উমরাহ করলে তা আদায় হবে এবং তারা  উপকৃত হবে। ইবনে আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«أَنَّ امْرَأَةً مِنْ جُهَيْنَةَ جَاءَتْ إِلَى النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَتْ إِنَّ أُمِّي نَذَرَتْ أَنْ تَحُجَّ فَلَمْ تَحُجَّ حَتَّى مَاتَتْ أَفَأَحُجُّ عَنْهَا قَالَ نَعَمْ حُجِّي عَنْهَا أَرَأَيْتِ لَوْ كَانَ عَلَى أُمِّكِ دَيْنٌ أَكُنْتِ قَاضِيَةً اقْضُوا اللَّهَ فَاللَّهُ أَحَقُّ بِالْوَفَاءِ»

অর্থ: ‘‘ জুহাইনা গোত্রের একজন মহিলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আগমণ করে বলল, হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা হজ্জ করার মানত করেছিলেন কিন্তু তিনি হজ্জ সম্পাদন না করেই মারা গেছেন। এখন আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ্জ আদায় করতে পারি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘তুমি তোমার মায়ের পক্ষ থেকে হজ্জ কর। তোমার কি ধারণা যদি তোমার মার উপর ঋণ থাকতো তবে কি তুমি তা পরিশোধ করতে না ? সুতরাং আল্লাহর জন্য তা আদায় কর। কেননা আল্লাহর দাবী পরিশোধ করার অধিক উপযোগী’’ [সহীহ বুখারী: ১৮৫২]

তবে মা-বাবার পক্ষ থেকে যে লোক হজ্জ বা ওমরাহ করতে চায় তার জন্য শর্ত হলো সে আগে নিজের হজ্জ-ওমরাহ করতে হবে।

৫. মা-বাবার পক্ষ থেকে কুরবানী করাঃ

মা-বাবার পক্ষ থেকে কুরবানী করলে তার ছাওয়াব দ্বারা তারা উপকৃত হবে। এ বিষয়ে হাদীসে এসেছে,

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَمَرَ بِكَبْشٍ أَقْرَنَ يَطَأُ فِى سَوَادٍ وَيَبْرُكُ فِى سَوَادٍ وَيَنْظُرُ فِى سَوَادٍ فَأُتِىَ بِهِ لِيُضَحِّىَ بِهِ فَقَالَ لَهَا « يَا عَائِشَةُ هَلُمِّى الْمُدْيَةَ » ثُمَّ قَالَ « اشْحَذِيهَا بِحَجَرٍ ». فَفَعَلَتْ ثُمَّ أَخَذَهَا وَأَخَذَ الْكَبْشَ فَأَضْجَعَهُ ثُمَّ ذَبَحَهُ ثُمَّ قَالَ « بِاسْمِ اللَّهِ اللَّهُمَّ تَقَبَّلْ مِنْ مُحَمَّدٍ وَآلِ مُحَمَّدٍ وَمِنْ أُمَّةِ مُحَمَّدٍ ». ثُمَّ ضَحَّى بِهِ.

অর্থ: আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন একটি শিংযুক্ত দুম্বা উপস্থিত করতে নির্দেশ দিলেন, যার পা কালো, চোখের চতুর্দিক কালো এবং পেট কালো। অতঃপর তা কুরবানীর জন্য আনা হলো। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, হে আয়েশা! ছুরি নিয়ে আস, তারপর বললেন, তুমি একটি পাথর নিয়ে তা দ্বারা এটাকে ধারালো কর। তিনি তাই করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুরি হাতে নিয়ে দুম্বাটিকে শুইয়ে দিলেন। পশুটি যবেহ্ করার সময় বললেন, বিসমিল্লাহ, হে আল্লাহ তুমি এটি মুহাম্মাদ, তাঁর বংশধর এবং সকল উম্মাতে মুহাম্মাদীর পক্ষ থেকে কবুল কর”। এভাবে তিনি তা দ্বারা কুরবানী করলেন। [ সহীহ মুসলিম:৫২০৩]

৬. মা-বাবার ওসিয়ত পূর্ণ করা

মা-বাবা শরীয়াহ সম্মত কোন ওসিয়ত করে গেলে তা পূর্ণ করা সন্তানদের উপর দায়িত্ব। রাশীদ ইবন সুয়াইদ আসসাকাফী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

«قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، إِنَّ أُمِّي أَوْصَتْ أَنْ نُعْتِقُ عَنْهَا رَقَبَةً ، وَعِنْدِي جَارِيَةٌ سَوْدَاءُ ، قَالَ : ادْعُ بِهَا ، فَجَاءَتْ ، فَقَالَ : مَنْ رَبُّكِ ؟ قَالَتِ : اللَّهُ ، قَالَ : مَنْ أَنَا ؟ قَالَتْ : رَسُولُ اللَّهِ ، قَالَ : أَعْتِقْهَا ، فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ».

অর্থ: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম হে আল্লাহর রাসুল, আমার মা একজন দাসমুক্ত করার জন্য ওসিয়ত করে গেছেন। আর আমার নিকট কালো একজন দাসী আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে ডাকো, সে আসল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে প্রশ্ন করলেন, তোমার রব কে ? উত্তরে সে বলল, আমার রব আল্লাহ। আবার প্রশ্ন করলেন আমি কে ? উত্তরে সে বলল, আপনি আল্লাহর রাসুল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে মুক্ত করে দাও; কেন না সে মু’মিনা । [সহীহ ইবন হিববান :১৮৯]

৭. মা-বাবার বন্ধুদের সম্মান করা 

মা-বাবার বন্ধুদের সাথে ভাল ব্যবহার করা, সম্মান করা, তাদেরকে দেখতে যাওয়া,তাদেরকে হাদিয়া দেয়া। এ বিষয়ে হাদীসে উল্লেখ আছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ دِينَارٍ عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ رَجُلاً مِنَ الأَعْرَابِ لَقِيَهُ بِطَرِيقِ مَكَّةَ فَسَلَّمَ عَلَيْهِ عَبْدُ اللَّهِ وَحَمَلَهُ عَلَى حِمَارٍ كَانَ يَرْكَبُهُ وَأَعْطَاهُ عِمَامَةً كَانَتْ عَلَى رَأْسِهِ فَقَالَ ابْنُ دِينَارٍ فَقُلْنَا لَهُ أَصْلَحَكَ اللَّهُ إِنَّهُمُ الأَعْرَابُ وَإِنَّهُمْ يَرْضَوْنَ بِالْيَسِيرِ. فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ إِنَّ أَبَا هَذَا كَانَ وُدًّا لِعُمَرَ بْنِ الْخَطَّابِ وَإِنِّى سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- يَقُولُ « إِنَّ أَبَرَّ الْبِرِّ صِلَةُ الْوَلَدِ أَهْلَ وُدِّ أَبِيهِ ».

অর্থ: আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার রাদিয়াল্লাহু আনহু আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, একবার মক্কার পথে চলার সময় আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর এক বেদুঈন এর সাথে দেখা হলে তিনি তাকে সালাম দিলেন এবং তাকে সে গাধায় চড়ালেন যে গাধায় আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা উপবিষ্ট ছিলেন এবং তাঁর (আব্দুল্লাহ) মাথায় যে পাগড়িটি পরা ছিলো তা তাকে প্রদান করলেন। আব্দুল্লাহ ইবান দীনার রাহেমাহুল্লাহ বললেন, তখন আমরা আব্দুল্লাহকে বললাম: আল্লাহ তোমার মঙ্গল করুক! এরা গ্রাম্য মানুষ: সামান্য কিছু পেলেই এরা সন্তুষ্ট হয়ে যায়-(এতসব করার কি প্রয়োজন ছিলো?) উত্তরে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, তার পিতা, (আমার পিতা) উমার ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু এর বন্ধু ছিলেন। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি “পুত্রের জন্য পিতার বন্ধু-বান্ধবের সাথে ভাল ব্যবহার করা সবচেয়ে বড় সওয়াবের কাজ’’ [সহীহ মুসলিম:৬৬৭৭]।

মৃতদের বন্ধুদের সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমলও আমাদেরকে উৎসাহিত করে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«إِذَا ذَبَحَ الشَّاةَ فَيَقُولُ « أَرْسِلُوا بِهَا إِلَى أَصْدِقَاءِ خَدِيجَةَ »

অর্থ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখনই কোন বকরী যবেহ করতেন, তখনই তিনি বলতেন, এর কিছু অংশ খাদীজার বান্ধবীদের নিকট পাঠিয়ে দাও [সহীহ মুসলিম: ৬৪৩১]

৮. মা-বাবার আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা

সন্তান তার মা-বাবার আত্নীয়দের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখবে। আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«مَنْ أَحَبَّ أَنْ يَصِلَ أَبَاهُ فِي قَبْرِهِ ، فَلْيَصِلْ إِخْوَانَ أَبِيهِ بَعْدَهُ»

‘যে ব্যক্তি তার পিতার সাথে কবরে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে ভালবাসে, সে যেন পিতার মৃত্যুর পর তার ভাইদের সাথে সু-সম্পর্ক রাখে’ [সহীহ ইবন হিববান:৪৩২]

৯. ঋণ পরিশোধ করা

মা-বাবার কোন ঋণ থাকলে তা দ্রুত পরিশোধ করা সন্তানদের উপর বিশেষভাবে কর্তব্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণের পরিশোধ করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। আবু হুরায়রা  রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«نَفْسُ الْمُؤْمِنِ مُعَلَّقَةٌ بِدَيْنِهً حَتَّى يُقْضَى عَنْهُ».

অর্থ: ‘‘মুমিন ব্যক্তির আত্মা তার ঋণের সাথে সম্পৃক্ত থেকে যায়; যতক্ষণ তা তা তার পক্ষ থেকে পরিশোধ করা হয়”। [সুনান ইবন মাজাহ:২৪১৩]

ঋণ পরিশোধ না করার কারণে জান্নাতের যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়; এমনকি যদি আল্লাহর রাস্তায় শহীদও হয় । হাদীসে  আরো এসেছে,

«مَا دَخَلَ الْجَنَّةَ حَتَّى يُقْضَى دَيْنُهُ»

অর্থ: যতক্ষণ পর্যন্ত বান্দার ঋণ পরিশোধ না করা হবে ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। [নাসায়ী ৭/৩১৪; তাবরানী ফিল কাবীর ১৯/২৪৮; মুস্তাদরাকে হাকিম ২/২৯]

১০. কাফফারা আদায় করা   

মা-বাবার কোন শপথের কাফফারা,ভুলকৃত হত্যাসহ কোন কাফফারা বাকী থাকলে সন্তান তা পূরণ করবে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে,

﴿وَمَن قَتَلَ مُؤۡمِنًا خَطَ‍ٔٗا فَتَحۡرِيرُ رَقَبَةٖ مُّؤۡمِنَةٖ وَدِيَةٞ مُّسَلَّمَةٌ إِلَىٰٓ أَهۡلِهِۦٓ إِلَّآ أَن يَصَّدَّقُواْۚ ﴾ [النساء: ٩٢]

অর্থ: যে ব্যক্তি ভুলক্রমে কোন মুমিনকে হত্যা করবে, তাহলে একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করতে হবে এবং দিয়াত (রক্ত পণ দিতে হবে) যা হস্তান্তর করা হবে তার পরিজনদের কাছে। তবে তারা যদি সদাকা (ক্ষমা) করে দেয় (তাহলে সেটা ভিন্ন কথা) [ সূরা আন-নিসা:৯২]

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

« مَنْ حَلَفَ عَلَى يَمِينٍ فَرَأَى غَيْرَهَا خَيْرًا مِنْهَا فَلْيَأْتِهَا وَلْيُكَفِّرْ عَنْ يَمِينِهِ ».

অর্থ: ‘‘ যে ব্যক্তি কসম খেয়ে শপথ করার পর তার থেকে উত্তম কিছু করলেও তার কাফফারা অদায় করবে’’ [সহীহ মুসলিম: ৪৩৬০] ।

এ বিধান জীবিত ও মৃত সবার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য। দুনিয়ার বুকে কেউ অন্যায় করলে তার কাফফারা দিতে হবে। অনুরূপভাবে কেউ অন্যায় করে মারা গেলে তার পরিবার-পরিজন মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কাফফারা প্রদান করবেন।

১১. ক্ষমা প্রার্থনা করাঃ

মা-বাবার জন্য আল্লাহর নিকট বেশী বেশী ক্ষমা প্রার্থনা করা গুরুত্বপূর্ণ আমল। সন্তান মা-বাবার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় আল্লাহ তা‘আলা তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন। হাদীসে বলা হয়েছে,

«عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ : تُرْفَعُ لِلْمَيِّتِ بَعْدَ مَوْتِهِ دَرَجَتُهُ . فَيَقُولُ : أَيْ رَبِّ ، أَيُّ شَيْءٍ هَذِهِ ؟ فَيُقَالُ : وَلَدُكَ اسْتَغْفَرَ لَكَ»

অর্থ: আবু হুরায়রা  রাদিয়াল্লাহু আনহু  হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মৃত্যুর পর কোন বান্দাহর মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। তখন সে বলে হে আমার রব, আমি তো এতো মর্যাদার আমল করিনি, কীভাবে এ আমল আসলো ? তখন বলা হবে, তোমার সন্তান তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করায় এ মর্যাদা তুমি পেয়েছো’’ [আল-আদাবুল মুফরাদ:৩৬]।

মা-বাবা দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পর তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার বিষয়ে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«عَنْ عُثْمَانَ ، قَالَ : وَقَفَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى قَبْرِ رَجُلٍ وَهُوَ يُدْفَنُ فَلَمَّا فَرَغَ مِنْهُ قَالَ : اسْتَغْفِرُوا لأَخِيكُمْ وَسَلُوا اللَّهَ لَهُ بالثَّبَاتِ ؛ فَإِنَّهُ يُسْأَلُ الآنَ».

অর্থ: উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন এক মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর তার কবরের পার্শ্বে দাঁড়ালেন এবং বললেন ‘‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তার জন্য ঈমানের উপর অবিচলতা ও দৃঢ়তা কামনা কর, কেননা এখনই তাকে প্রশ্ন করা হবে’’ [মুসনাদুল বাজ্জার :৪৪৫]।

তাই সুন্নাত হচ্ছে, মৃত ব্যক্তিকে কবরে দেয়ার পর তার কবরের পার্শ্বে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে তার জন্য প্রশ্নোত্তর সহজ করে দেয়া, প্রশ্নোত্তর দিতে সমর্থ হওয়ার জন্য দো‘আ করা।

১২. মান্নত পূরণ করা 

মা-বাবা কোন মান্নত করে গেলে সন্তান তার পক্ষ থেকে পূরণ করবে। ইবন আববাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে,

«أَنَّ امْرَأَةً نَذَرَتْ أَنْ تَصُومَ شَهْرًا فَمَاتَتْ فَأَتَى أَخُوهَا النَّبِىَّ -صلى الله عليه وسلم- فَقَالَ :« صُمْ عَنْهَا ».

অর্থ: কোন মহিলা রোজা রাখার মান্নত করেছিল, কিন্তু সে তা পূরণ করার পূর্বেই মৃত্যুবরণ করল। এরপর তার ভাই এ বিষয়ে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলে তিনি বলরেন, তার পক্ষ থেকে সিয়াম পালন কর। [সহীহ ইবন হিববান:২৮০]

১৩. মা-বাবার ভাল কাজসমূহ জারী রাখা 

মা-বাবা যেসব ভাল কাজ অর্থাৎ মসজিদ তৈরী করা, মাদরাসা তৈরী করা, দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরীসহ যে কাজগুলো করে গিয়েছেন সন্তান হিসাবে তা যাতে অব্যাহত থাকে তার ব্যবস্থা করা। কেননা এসব ভাল কাজের সওয়াব তাদের আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে। হাদীসে এসেছে,

«مَنْ دَلَّ عَلَى خَيْرٍ فَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ فَاعِلِهِ »

‘‘ভাল কাজের পথপ্রদর্শনকারী এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে’’। [সুনান আততিরমীযি : ২৬৭০]

«مَنْ سَنَّ فِى الإِسْلاَمِ سُنَّةً حَسَنَةً فَلَهُ أَجْرُهَا وَأَجْرُ مَنْ عَمِلَ بِهَا بَعْدَهُ مِنْ غَيْرِ أَنْ يَنْقُصَ مِنْ أُجُورِهِمْ شَىْءٌ»

যে ব্যক্তির ইসলামের ভাল কাজ শুরু করল, সে এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ সাওয়াব পাবে। অথচ তাদেও সওয়াব থেকে কোন কমতি হবে না’’ [সহীহ মুসলিম:২৩৯৮]।

১৪. কবর যিয়ারত করা  

সন্তান তার মা-বাবার কবর যিয়ারত করবে। এর মাধ্যমে সন্তান এবং মা-বাবা উভয়ই উপকৃত হবে। এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُورِ فَقَدْ أُذِنَ لِمُحَمَّدٍ فِى زِيَارَةِ قَبْرِ أُمِّهِ فَزُورُوهَا فَإِنَّهَا تُذَكِّرُ الآخِرَةَ»

অর্থ: আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম,অত:পর মুহাম্মাদের মায়ের কবর যিয়ারতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। এখন তোমরা কবর যিয়রাত কর, কেননা তা আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় [সুনান তিরমীযি :১০৫৪]।

যিয়রাত কর, কেননা তা আখেরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয় [সুনান তিরমীযি :১০৫৪]।

কবর যিয়ারত কোন দিনকে নির্দিষ্ট করে করা যাবে না। কবর যিযারত করার সময় বলবে,

«السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ ، وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللَّهُ بِكُمْ لاَحِقُونَ ، نَسْأَلُ اللَّهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ».

অর্থ: কবরবাসী মুমিন-মুসলিম আপনাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক । নিশ্চয় আমরা আপনাদের সাথে মিলিত হবো। আমরা আল্লাহর কাছে আপনাদের এবং আমাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছি। [সুনান ইবন মাজাহ :১৫৪৭]

১৫. ওয়াদা করে গেলে তা বাস্তবায়ন করা    

মা-বাবা কারো সাথে কোন ভাল কাজের ওয়াদা করে গেলে বা এমন ওয়াদা যা তারা বেচে থাকলে করে যেতেন, সন্তান যথাসম্ভব তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে। কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে,

وَأَوۡفُواْ بِٱلۡعَهۡدِۖ إِنَّ ٱلۡعَهۡدَ كَانَ مَسۡ‍ُٔولٗا ٣٤ ﴾ [الاسراء: ٣٤]

অর্থ: আর তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর, নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। [ সূরা বনী ইসরাঈল:৩৪]

১৬.কোন গুনাহের কাজ করে গেলে তা বন্ধ করা

মা-বাবা বেচে থাকতে কোন গুনাহের কাজের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকলে তা বন্ধ করবে বা শরীয়াহ সম্মতভাবে সংশোধন করে দিবে। কেননা আবু হুরায়রা  রাদিয়াল্লাহু আনহু  হতে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

«وَمَنْ دَعَا إِلَى ضَلاَلَةٍ كَانَ عَلَيْهِ مِنَ الإِثْمِ مِثْلُ آثَامِ مَنْ تَبِعَهُ لاَ يَنْقُصُ ذَلِكَ مِنْ آثَامِهِمْ شَيْئًا ».

এবং যে মানুষকে গুনাহের দিকে আহবান করবে, এ কাজ সম্পাদনকারীর অনুরূপ গুনাহ তার আমলনামায় যুক্ত হতে থাকবে। অথচ তাদের গুনাহ থেকে কোন কমতি হবে না’’ [সহীহ মুসলিম:৬৯৮০]।

১৭.মা-বাবার পক্ষ থেকে মাফ চাওয়া 

মা-বাবা বেচে থাকতে কারো সাথে খারাপ আচরণ করে থাকলে বা কারো উপর যুলুম করে থাকলে বা কাওকে কষ্ট দিয়ে থাকলে মা-বাবার পক্ষ থেকে তার কাছ থেকে মাফ মাফ চেয়ে নিবে অথবা ক্ষতি পূরণ দিয়ে দিবে।  কেননা হাদীসে এসেছে,

«عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ : أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، قَالَ : أَتَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسُ ؟ قَالُوا : الْمُفْلِسُ فِينَا يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ لاَ دِرْهَمَ لَهُ ، وَلاَ مَتَاعَ لَهُ ، فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : الْمُفْلِسُ مِنْ أُمَّتِي يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصَلاَتِهِ وَصِيَامِهِ وَزَكَاتِهِ ، فَيَأْتِي وَقَدْ شَتَمَ هَذَا ، وَأَكَلَ مَالَ هَذَا ، وَسَفَكَ دَمَ هَذَا وَضَرَبَ هَذَا ، فَيَقْعُدُ ، فَيُعْطَى هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ ، وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ ، فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يُعْطِيَ مَا عَلَيْهِ أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ ، فَطُرِحَ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ».

আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা কি জান নিঃস্ব ব্যক্তি কে? সাহাবীগণ বললেন, আমাদের মধ্যে যার সম্পদ নাই সে হলো গরীব লোক। তখন তিনি বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সে হলো গরীব যে, কিয়ামতের দিন নামায, রোযা ও যাকাত নিয়ে আসবে অথচ সে অমুককে গালি দিয়েছে, অমুককে অপবাদ দিয়েছে, অন্যায়ভাবে লোকের মাল খেয়েছে, সে লোকের রক্ত প্রবাহিত করেছে এবং কাউকে প্রহার করেছে। কাজেই এসব নির্যাতিত ব্যক্তিদেরকে সেদিন তার নেক আমল নামা দিয়ে দেয়া হবে। এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। [সুনান আততিরমিযি :২৪২৮]

সুতরাং এ ধরনের নিঃস্ব ব্যক্তিকে মুক্ত করার জন্য তার হকদারদের কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নেয়া সন্তানের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

অল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে মা বাবার জন্য আমলগুলো করার তাওফীক দিন। আমীন!

وصلى الله على نبينا محمد وعلي اله وأصحابه ومن تبعهم بإحسان إلى يوم الدين- وأخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين

 

Collected From quraneralo.com

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই — আল-বাক্বারাহ ১৫৫

 

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই — আল-বাক্বারাহ ১৫৫

কু’রআনে এমন  কিছু আয়াত রয়েছে যেগুলো আমাদেরকে জীবনের বাস্তবতা মনে করিয়ে দেয়। কিছু আয়াত রয়েছে যা আমাদেরকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়: আমরা কীভাবে নিজেরাই নিজেদের জীবনটাকে কষ্টের মধ্যে ফেলে দিই। আর কিছু আয়াত রয়েছে যা আমাদেরকে জীবনের সব দুঃখ, কষ্ট, ভয় হাসিমুখে পার করার শক্তি যোগায়। এরকম একটি আয়াত হলো—

2_155_title

2_155

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই: মাঝে মধ্যে তোমাদেরকে বিপদের আতঙ্ক, ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে, সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। আর যারা কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, তাদেরকে সুখবর দাও। [আল-বাক্বারাহ ১৫৫]

আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষায় ফেলবোই

আল্লাহ ﷻ শুরু করছেন: وَلَنَبْلُوَنَّكُم بِشَىْءٍ — আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে এই দুনিয়াতে কিছু না কিছু দিয়ে পরীক্ষা নেবেনই, নেবেন। এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তিনি আরবিতে দুই বার জোর দিয়ে এ কথা বলেছেন। কারো বেলায় সেই পরীক্ষা হয়তো চাকরি হারিয়ে ফেলে অভাবে, কষ্টে জীবন পার করা। কারো বেলায় হয়তো বাবা-মা, স্বামী, স্ত্রী, সন্তানদের জটিল অসুখের চিকিৎসায় দিনরাত সংগ্রাম করা। কারো বেলায় হয়তো নিজেরই নানা ধরনের জটিল অসুখ। কারো বেলায় আবার জমি-জমা, সম্পত্তি নিয়ে আত্মীয়স্বজনদের সাথে শত্রুতা, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার, দুশ্চরিত্র স্বামী, পরপুরুষে আসক্ত স্ত্রী, ড্রাগে আসক্ত ছেলে, পরিবারের মুখে কালিমা লেপে দেওয়া মেয়ে —কোনো না কোনো সমস্যায় আমরা পড়বোই। এই সমস্যাগুলো হচ্ছে আমাদের জন্য পরীক্ষা।

পৃথিবীতে আমরা এসেছি পরীক্ষা দিতে —এটা হচ্ছে জীবনের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। হিন্দি সিরিয়াল, মিউজিক, ভিডিও গেম, রংবেরঙের পানীয়, হাজারো বিনোদন সবসময় আমাদেরকে চেষ্টা করে এই বাস্তবতাকে ভুলিয়ে দিতে। আমরা নিজেদেরকে প্রতিদিন নানা ধরনের বিনোদনে বুঁদ করে রেখে জীবনের কষ্ট ভুলে থাকার চেষ্টা করি। আমরা বিনোদনে যতই গা ভাসাই, ততই বিনোদনের প্রতি আসক্ত হয়ে যাই। যতক্ষণ বিনোদনে ডুবে থাকি, ততক্ষণ জীবনটা আনন্দময় মনে হয়। তারপর বিনোদন শেষ হয়ে গেলেই অবসাদ, বিরক্তি, একঘেয়েমি ঘিরে ধরে। ধীরে ধীরে একসময় আমরা জীবনের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে উঠি। “কেন আমার নেই, কিন্তু ওর আছে?” “কেন আমারই বেলায় এরকম হয়, অন্যের কেন এরকম হয় না?” —এই সব অসুস্থ প্রশ্ন করে আমরা আমাদের মানসিক অশান্তিকে জ্বালানী যোগাই। এত যে অশান্তি, তার মূল কারণ হলো: আমরা যে এই জীবনে শুধু পরীক্ষা দিতে এসেছি —এই কঠিন বাস্তবতাটা ভুলে যাওয়া।

মাঝে মধ্যে তোমাদেরকে বিপদের আতঙ্ক, ক্ষুধার কষ্ট দিয়ে, জান, মাল, ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে

আল্লাহ ﷻ আমাদের কীভাবে পরীক্ষা নেবেন, তার কিছু উদাহরণ তিনি আমাদেরকে দিয়ে দিয়েছেন। আমরা যদি ভালো করে বুঝে নিই পরীক্ষাগুলো কেমন হবে, তাহলে সেই পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আগে থেকেই আমরা তৈরি থাকবো। তারপর যখন পরীক্ষা শুরু হবে, তখন পরীক্ষা পার করা সহজ হয়ে যাবে। যারা জীবনে অনেকবার কঠিন বিপদে পড়েছেন, তারা হয়তো লক্ষ্য করেছেন যে, যদি চিন্তা করে বের করা যায় কেন বিপদটা হয়েছে, কতদিন তা চলতে পারে এবং বিপদটা কীভাবে একসময় শেষ হয়ে যেতে পারে — তখন সেই বিপদটা ধৈর্য ধরে পার করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। একারণে পূর্বপ্রস্তুতি থাকলে জীবনটা সহজ হয়ে যায়।

ভয়

এই আয়াতে আল্লাহ ﷻ ভয়ের জন্য خَوْف (খাউফ) ব্যবহার করেছেন। কু’রআনে বিভিন্ন ধরনের ভয়ের জন্য বারোটি আলাদা আলাদা শব্দ রয়েছে: خاف, خشي, خشع, اتقى, حذر, راع, اوجس, وجف, وجل, رهب, رعب, اشفق —যার মধ্যে এই আয়াতে বিশেষভাবে খাউফ ব্যবহার করা হয়েছে, যা একটি বিশেষ ধরনের ভয়: আমাদের জীবনে কোনো একটা বিপদ এগিয়ে আসছে বা এসে গেছে, এবং আমরা তা নিয়ে ভয়ে, আতঙ্কে আছি —এটা হচ্ছে খাউফ।

এই ভয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রাকৃতিক, পারিবারিক যে কোনো বিপদের ভয় হতে পারে। দেশের সরকার মুসলিমদের ধরে ধরে মেরে ফেলছে। কেউ মুখ খুলতে পারছে না। সত্য কথা বললে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেই মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ভরা হচ্ছে, গুম করে ফেলা হচ্ছে। মুসলিমরা সবাই ভয়ে আছে। —এই ভয় হচ্ছে খাউফ। এটা একটা পরীক্ষা।

দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ উজাড় হয়ে যাচ্ছে। মহামারি, দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ছে। চারিদিকে মানুষের অভাব, অনটন, যে কোনো সময় গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। খাবারের দাম বাড়তে বাড়তে কেনার সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে। এরকম চলতে থাকলে সামনেই অচিরেই পরিবার নিয়ে এক বেলা না খেয়ে দিন পার করতে হবে। —এই ভয় হচ্ছে খাউফ। এটা একটা পরীক্ষা।

ছেলে রাতের বেলা ঘরের দরজা বন্ধ করে কী জানি করে। মাঝে মধ্যে কোনো মেয়ের গলা শোনা যায়। দিনের বেলা বখাটে দেখতে কিছু বন্ধুর সাথে ঘোরাঘুরি করে। ছেলেটা নিশ্চয়ই একটা বাজে কিছুতে জড়িয়ে যাচ্ছে। কোনদিন না অসামাজিক কিছু করে ফেলে। লজ্জায় আর ঘরের বাইরে বের হওয়া যাবে না। মানুষ থু থু দেবে। —এই ভয় হচ্ছে খাউফ। এটা একটা পরীক্ষা।

ক্ষুধার কষ্ট

আরেকটি পরীক্ষা হচ্ছে ক্ষুধার কষ্ট। ক্ষুধার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য মানুষ এমন কিছু নেই যা করে না। একজন দিনমজুরের মাথায় সারাদিন একটা চিন্তাই ঘুরে, কালকে সে খাবার কেনার মতো যথেষ্ট টাকা অর্জন করতে পারবে কি? একজন চাকুরীজীবী সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকে: আমি মারা গেলে আমারা ছেলেমেয়েরা খেয়ে-পরে বাঁচতে পারবে তো? একজন ব্যবসায়ীর মাথায় সবসময় হিসেব ঘুরতে থাকে: ব্যবসায় কতটা পর্যন্ত লোকসান হলে না-খেয়ে পথে বসতে হবে না। সকালে ঘুমের থেকে উঠে মাথায় চিন্তা আসে নাস্তায় কী খাবো, যা খেয়ে দুপুর পর্যন্ত ক্ষুধার কষ্ট লাগবে না। দুপুরে খাওয়ার সময় মাথায় চিন্তা আসে কত খেলে আর বিকেলে ক্ষুধার কষ্ট করতে হবে না, একবারে রাত পর্যন্ত থাকা যাবে। রাতে খাওয়ার সময় হিসেব চলে ফজরের সময় উঠলে আবার ক্ষুধা লেগে যাবে না তো?

খাবার কেনার মতো যথেষ্ট টাকা থাকবে কিনা –এই ভয়টা এতই কঠিন ভয় যে, ১৩-১৭ বছর বয়সীদের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে যে, ক্ষুধার কষ্টের ভয় তাদের মধ্যে মানসিক সমস্যা জন্ম দেওয়ার একটি অন্যতম কারণ। যে সমস্ত পরিবারের উঠতিবয়সী যুবক-যুবতীরা ক্ষুধার কষ্ট করে, তিন বেলা খাবার জোগাড় করতে গিয়ে বাবা-মার কঠিন সংগ্রাম দেখে, মাঝে মধ্যেই এক-দুই বেলা না খেয়ে ক্ষুধার কষ্টে দিন বা রাত পার করে, তাদের মনের মধ্যে ক্ষুধার কষ্টের ভয় ঢুকে যায়। এই ভয় থেকে এক সময় তাদের মধ্যে অস্থিরতা এবং নানা ধরনের মানসিক ব্যাধি দেখা দেয়।[২৯৭]

যারা জীবনে এক সময় অনেক অভাবে পার করেছেন, প্রতিটি দিন সংগ্রাম করতেন কীভাবে মাস চলবে, কীভাবে বাচ্চাদের খাওয়াবেন, তারা যখন একসময় গিয়ে স্বচ্ছল হন, তারপরেও তাদের অনেকের ভেতরে আবার অভাবের জীবনে ফিরে যাওয়ার আতঙ্ক চলে যায় না। ব্যাংক ব্যালেন্সে একটা শূন্য কমে গেলে বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যায়। কোনো একমাসে আয় একটু কম হলে আতঙ্ক শুরু হয়ে যায়। যদিও তাদের খাওয়া, পড়ার কোনোই সমস্যা নেই, আল্লাহ ﷻ তাদেরকে কয়েক মাস বা বছর স্বচ্ছন্দে চলার মতো যথেষ্ট সম্পদ দিয়ে রেখেছেন, তারপরেও তাদের ভেতরে আগের সেই অভাবী জীবনের দুঃস্বপ্ন কাটে না। তারা চেষ্টা করলেও আল্লাহর ﷻ প্রতি পুরোপুরি কৃতজ্ঞ হয়ে, মন থেকে অশান্তি দূর করে, শান্তির সাথে জীবন পার করতে পারেন না। ক্ষুধার কষ্ট, অভাবের জীবনের ভয় তাদেরকে সারাজীবন তাড়িয়ে বেড়ায়।

 

অনিশ্চয়তা

ভয় এবং ক্ষুধা — এই দুটির মধ্যে একটি সাধারণ ব্যাপার রয়েছে, তা হলো অনিশ্চয়তা। মানুষ নিশ্চয়তা অর্জনের জন্য পাগল, অনিশ্চয়তাকে তার কাছে অসহ্য। সবসময় চেষ্টা করে কীভাবে বেতনের নিশ্চয়তা, সমাজে স্ট্যাটাসের নিশ্চয়তা, ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজের বাড়ির নিশ্চয়তা, নিরাপদে রাস্তায় চলার জন্য গাড়ির নিশ্চয়তা, লোন শোধ করার জন্য নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা —এই সব অনিশ্চয়তাকে সবসময় নিশ্চিত করে রাখার জন্য বাবা-মা, সন্তান, আত্মীয়, বন্ধু, যে কোনো সম্পর্ককে উপেক্ষা করে হলেও মানুষ দিনরাত খাটতে রাজি আছে। কিন্তু তার জীবনে নিশ্চয়তা চাই-ই চাই।

মানুষের মস্তিষ্ক এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে, তা অনিশ্চয়তা সহ্য করতে পারে না। যখনি মস্তিষ্ক কোনো অনিশ্চয়তা হতে যাচ্ছে এই উপলব্ধি করে বসে, সাথে সাথে সেটি সতর্ক অবস্থায় চলে যায়। তখন অন্য সব চিন্তা বাদ দিয়ে সেই অনিশ্চয়তা কীভাবে দূর করা যায়, তা নিয়ে মস্তিষ্ক ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মানুষের মস্তিষ্ক হচ্ছে একটা বিরাট জটিল যন্ত্র, যার একটা মূল কাজ হচ্ছে সামনে কী হতে যাচ্ছে, তা আগে থেকেই ঠিক করে রাখা।[২৯১]

আমরা শুধু শুনি না, আমরা শুনি এবং একইসাথে চিন্তা করি সামনে কী শুনতে যাচ্ছি। আমরা শুধু দেখি না, আমরা দেখি এবং একইসাথে চিন্তা করি সামনে কী দেখতে যাচ্ছি। আমরা শুধুই পঞ্চ ইন্দ্রিয় দিয়ে ভবিষ্যৎ বোঝার চেষ্টা করি না। আমাদের দেহ প্রায় ৪০টি পারিপার্শ্বিক উৎস থেকে সবসময় সিগনাল প্রসেস করে। অবচেতনভাবে প্রায় ২০ লক্ষ ব্যাপার নিয়ে আমরা সবসময় ভাবছি ভবিষ্যৎ আগে থেকেই নিশ্চিত করার জন্য। কল্পনাতিত পরিমাণের তথ্য আমাদের মস্তিষ্ক প্রতি মুহূর্তে প্রক্রিয়া করছে, কারণ আমাদের মস্তিষ্ক সবসময় চেষ্টা করে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার। এটি অনিশ্চয়তা একেবারেই পছন্দ করে না।[২৯১]

তথ্য আসক্তি

আধুনিক যুগে এক নতুন সমস্যা শুরু হয়েছে — তথ্য-আসক্তি। মানুষ প্রতিনিয়ত শত শত তথ্য গোগ্রাসে গিলছে, যদিও তার সেগুলোর কোনোই দরকার নেই। এর মূল কারণ: মানুষ এভাবে অনিশ্চয়তা দূর করে।[২৯২]ফেইসবুকে কেউ আমাকে নিয়ে কিছু বলল কিনা, কেউ আমার পোস্টে কমেন্ট করলো কিনা, কেউ আমার ছবিতে লাইক দিল কিনা —এই অনিশ্চয়তা দূর করার জন্য সে দিনের মধ্যে বহুবার ফেইসবুকে গিয়ে দেখে কিছু হলো না।

একইভাবে শেয়ার বাজারের দালাল, তথ্য প্রণেতারা ব্যাপক ব্যবসা করে নেয় আমাদের শেয়ার সম্পর্কে অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়ে। একটার পর একটা সংবাদ চ্যানেল, পত্রিকা চালু হচ্ছে কারণ আমরা অলিতে গলিতে, দেশে, বিদেশে, ডানপন্থী, বামপন্থী, শাসকদল, বিরোধী দল, নিরপেক্ষ দল সব দিকের সব রকম তথ্য জানতে চাই। অনেকে একটা পত্রিকা না রেখে দুটো-তিনটে পত্রিকা রাখেন, তিন-চারটা সংবাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে খবর পড়েন, পাছে কোনো একদিকের মত, কোনো একটা খবর তার অগোচরে থেকে যায়। একদিন রাতের খবর না দেখলে বুক ধড়ফড় শুরু হয়ে যায়, কী জানি হারিয়ে ফেললাম? এই তথ্য-আসক্তির মূল কারণ হলো অনিশ্চয়তা।

অনিশ্চয়তার নিশ্চয়তা

মানুষের এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হাজারো ব্যবসা শুরু হয়েছে মানুষকে নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য। লাইফ ইনস্যুরেন্স, বাড়ির লোন, গাড়ির লোন, মোবাইল ফোনের প্যাকেজ, ব্রডব্যান্ড কানেকশন, ওয়ারান্টি, গ্যারান্টি —এরকম হাজারো ভাবে মানুষকে নিশ্চয়তার লোভ দেখানো হচ্ছে। মার্কেটিং কোম্পানিগুলো শিখে গেছে কীভাবে এই অনিশ্চয়তাকে কাজে লাগিয়ে তাদের পণ্যের বিক্রি বাড়ানো যায়। তাদের বিজ্ঞাপনে প্রথমে মানুষকে এক অজানা, অনিশ্চয়তার ভয় দেখানো হয়। তারপর বেশি দামে, চড়া সুদে নিশ্চয়তা বিক্রি করা হয়। বোকা মানুষ নিশ্চয়তার এই মিথ্যা ফাঁদে পা দিয়ে জীবন দুর্বিষহ করে ফেলে। নিশ্চয়তা কিনতে গিয়ে স্বাস্থ্য, সংসার, সন্তান, সুখ সব বিসর্জন দিয়ে দেয়।

আল্লাহ ﷻ মানুষকে এই আয়াতে সাবধান করে দিচ্ছে যে, তিনি মানুষকে অনিশ্চয়তা দিয়ে পরীক্ষা নেবেনই। সুতরাং অনিশ্চয়তাকে জয় করার জন্য হারাম পথে পা দিয়ে কোনো লাভ নেই। এক দিকে অনিশ্চয়তা দূর করলে আরেক দিকে আসবে। মাঝখান থেকে সব অনিশ্চয়তাকে জয় করার মিথ্যা স্বপ্ন যেন মানুষকে শেষ করে না দেয়।

সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানো

এরপর আল্লাহ ﷻ পরীক্ষা নেবেন সম্পদ, জীবন, পণ্য-ফল-ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। আমাদের পরিবার, আত্মীয়, বন্ধু ইত্যাদি নানা সম্পর্কের ভেতরে মৃত্যু আসবেই। এটাই স্বাভাবিক। মাঝে মাঝে কারো মৃত্যু হয়তো অল্প বয়সে হয়ে যায়। কারো হয়তো দুর্ঘটনা থেকে মৃত্যু হয়। আমরা তখন বলি ‘কপাল খারাপ’, ‘অকালে মৃত্যু’, ‘অপমৃত্যু’, ‘আহারে, বেচারা অল্প বয়সে মারা গেল’ ইত্যাদি —এগুলো সব ভীষণ রকমের ভুল কথা। মুসলিমদের কাছে কোনো ‘কপাল খারাপ’ নেই, ‘অকালে মৃত্যু’, ‘অপমৃত্যু’, ‘কম বয়সে’ মৃত্যু বলে কিছু নেই। এগুলো বিধর্মী এবং নাস্তিকদের ডিকশনারির শব্দ।

কারো কপাল কখনো খারাপ হয় না, আল্লাহ ﷻ তার জন্য ঠিক যে সব সমস্যা হওয়ার কথা নির্ধারণ করে রেখেছিলেন, তার জীবনে ঠিক তাই ঘটে। কারো অকালে মৃত্যু হয় না, তার ঠিক যে সময় মৃত্যু হওয়ার কথা, ঠিক তখনি মৃত্যু হয়। কারো অপমৃত্যু হয় না, বরং মু’মিন অবস্থায় দুর্ঘটনায় মারা গেলে সে শহীদ হয়ে মরে। তখন এর চেয়ে বড় প্রাপ্য তার জন্য আর কিছু হতে পারে না। কারো অল্প বয়সে মৃত্যু হয় না, পৃথিবীতে তার আয়ু সেটুকুই নির্ধারণ করা ছিল। সে ঠিক সময়মতো মারা গেছে, আগেও না, পরেও না। —এই সত্যগুলো আমরা যদি উপলব্ধি করি, তাহলে আমরা নিজেদেরকে অপেক্ষাকৃত কম কষ্ট দেবো, অন্যের মাঝেও অপেক্ষাকৃত কম কষ্ট ছড়াবো।

এরপর আসবে সম্পদ, ফল, ফসল হারানোর মধ্য দিয়ে। স্টক মার্কেট ধ্বসে যাবে। কেউ লোনে জর্জরিত হয়ে যাবে। কেউ দেউলিয়া হয়ে যাবে। অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, খরা, বন্যায় ফসল ধ্বংস হয়ে যাবে। নদীর পাড় ভেঙ্গে বাড়ি, জমি নদীতে বিলীন হয়ে যাবে। —এই হচ্ছে জীবন। এগুলো সবই আল্লাহর ﷻ পক্ষ থেকে পরীক্ষা। আমরা যদি উপলব্ধি করতে পারি যে, আমাদের জীবনের কঠিন সময়গুলো আসলে এক একটা পরীক্ষা এবং আমাদের কাজ হচ্ছে এই পরীক্ষায় ঈমান বজায় রেখে পাশ করা, তাহলে জীবনের কঠিন সময়গুলো পার করা যেমন সহজ হবে, তেমনি আমরা পরীক্ষায় পাশ করে বিরাট প্রতিদান পাবো।

আর যদি তা না করি, তাহলে জীবনটা অসহ্য হয়ে যাবে। ডিপ্রেশনের ওষুধ খেয়ে দিন পার করতে হবে। ঘুমের ওষুধ খেয়ে রাতে ঘুমাতে হবে। হাজার হাজার ওষুধ খেয়ে নষ্ট করা কিডনি নিয়ে ডায়ালাইসিস করতে করতে ধুঁকে ধুঁকে মারা যেতে হবে। আর আখিরাতে থাকবে অপমান এবং শাস্তি।

 

আর যারা কষ্টের মধ্যেও ধৈর্য-নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা করে, তাদেরকে সুখবর দাও

প্রশ্ন আসে: কীসের সুখবর? মুমিনদের জন্য সুখবর একটাই: জান্নাতের নিশ্চয়তা। আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে এই আয়াতে বলে দিলেন: কী করলে আমাদের আর জান্নাত পাওয়া নিয়ে কোনো চিন্তা করতে হবে না। আসুন আমরা আমাদের জীবনে ঘটে চলা পরীক্ষাগুলো বোঝার চেষ্টা করি। এই পরীক্ষাগুলো কীভাবে দিলে আমরা পরীক্ষায় পাশ করবো, তা চিন্তা করে বের করি। তারপর যথাসাধ্য চেষ্টা করি নিজেদের মধ্যে যা কিছু পরিবর্তন করতে হবে, তা করার। ঈমান বজায় রেখে প্রতিটি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে শেষ করি।

আল্লাহ ﷻ তখন আমাদেরকে কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বড় সুখবর দিয়ে দেবেন। সেদিন সেই সুখবর পেয়ে আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে যাবো। পৃথিবীর জীবনটা তখন কয়েক মুহূর্তের দুঃস্বপ্ন মনে হবে। জান্নাতের সুখবর পেয়ে মুহূর্তের মধ্যেই আমরা ভুলে যাবো পৃথিবীতে কত কষ্ট, কত সংগ্রাম করেছিলাম, কত দুঃখ পেয়েছিলাম। সামনে যে এক নতুন অনন্ত জীবন শুরু হবে, শুধুই আনন্দ, সুখ, হাসি, তৃপ্তির জীবন, সেই জীবন নিয়ে আমরা তখন পুরোপুরি ব্যস্ত হয়ে যাবো। কখন জান্নাতে গিয়ে আল্লাহর ﷻ সাথে দেখা হবে, তাঁর কথা প্রথম বারের মতো নিজের কানে শুনতে পাবো, তাঁর সাথে মন উজাড় করে কথা বলতে পারবো –সেই তীব্র আনন্দে আমরা বাকি সবকিছু ভুলে যাবো।

এর পরের আয়াতে আল্লাহ ﷻ আমাদেরকে জানাবেন এই সুখবর যারা পাবে, তারা কেমন মানুষ। তারা কোনো সাধারণ মানুষ নন। তারা প্রচণ্ড রকমের ধৈর্যশীল। কু’রআনের শিক্ষাকে তারা তাদের কথা, কাজ, চিন্তায় আত্মস্থ করে ফেলেছেন। জীবনের বাস্তবতা কী, বিপদ কেন আসে, কীভাবে আসে, তারা তা খুব ভালভাবে উপলব্ধি করেন। কোনো ধরনের বিপদ তাদেরকে তাদের ইস্পাত দৃঢ় ঈমান থেকে টলাতে পারে না।

সূত্র:

  • [১] নওমান আলি খানের সূরা আল-বাকারাহ এর উপর লেকচার এবং বাইয়িনাহ এর কু’রআনের তাফসীর।
  • [২] ম্যাসেজ অফ দা কু’রআন — মুহাম্মাদ আসাদ।
  • [৩] তাফহিমুল কু’রআন — মাওলানা মাওদুদি।
  • [৪] মা’রিফুল কু’রআন — মুফতি শাফি উসমানী।
  • [৫] মুহাম্মাদ মোহার আলি — A Word for Word Meaning of The Quran
  • [৬] সৈয়দ কুতব — In the Shade of the Quran
  • [৭] তাদাব্বুরে কু’রআন – আমিন আহসান ইসলাহি।
  • [৮] তাফসিরে তাওযীহুল কু’রআন — মুফতি তাক্বি উসমানী।
  • [৯] বায়ান আল কু’রআন — ড: ইসরার আহমেদ।
  • [১০] তাফসীর উল কু’রআন — মাওলানা আব্দুল মাজিদ দারিয়াবাদি
  • [১১] কু’রআন তাফসীর — আব্দুর রাহিম আস-সারানবি
  • [১২] আত-তাবারি-এর তাফসীরের অনুবাদ।
  • [১৩] তাফসির ইবন আব্বাস।
  • [১৪] তাফসির আল কুরতুবি।
  • [১৫] তাফসির আল জালালাইন।
  • collected from http://quranerkotha.com/

March 16, 2024

স্বামী বা মাহরাম পুরুষ ছাড়া মহিলাদের হজ বা উমরা আদায়

 প্রশ্ন: আমি উমরা ও হজ আদায় করতে চাই। আমার মনে বারবার আল্লাহর ঘর দেখার তাড়না হচ্ছে। কিন্তু আমার মাহরাম কেউ রাজি নয়। আমার বাবা, ভাই, স্বামী কেউ যেতে চান না। আমার বোনের স্বামী ও বোন যাবে। বোন জীবিত অবস্থায় কি তার স্বামী আমার মাহরাম হিসেবে গণ্য হবে? আমার জন্য দুআ করবেন যাতে আমার স্বামী রাজি হয়ে যান।

উত্তর: দুআ করি, আল্লাহ তাআলা আপনার বায়তুল্লাহর জিয়ারতের স্বপ্ন পূরণ করুন। অতঃপর, ইসলামে স্বামী অথবা মাহরাম পুরুষ ব্যতিরেকে মহিলাদের জন্য দূরের সফর নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং স্বামী অথবা মাহরাম পুরুষ ব্যতিরেকে হজ/ওমরা সফরেও যাওয়া জায়েজ নয়।

এ মর্মে হাদিস হল:

◈ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

– لا يَحِلُّ لاِمْرَأَةٍ تُؤْمِنُ باللَّهِ وَالْيَومِ الآخِرِ، تُسَافِرُ مَسِيرَةَ يَومٍ وَلَيْلَةٍ إلَّا مع ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا
“যে নারী আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে জেনে রাখ! তার জন্য অনুমতি নেই যে, সে আপন স্বামী অথবা মাহরাম পুরুষ ছাড়া সফর সমান দূরত্বে একাকী ভ্রমণ করবে।” [সহীহ মুসলিম]

◈ কোন নারী হজের উদ্দেশ্যেও মক্কাতেও একাকী যেতে পারে না:
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بامْرَأَةٍ إلَّا وَمعهَا ذُو مَحْرَمٍ، وَلَا تُسَافِرِ المَرْأَةُ إلَّا مع ذِي مَحْرَمٍ، فَقَامَ رَجُلٌ، فَقالَ: يا رَسولَ اللهِ، إنَّ امْرَأَتي خَرَجَتْ حَاجَّةً، وإنِّي اكْتُتِبْتُ في غَزْوَةِ كَذَا وَكَذَا، قالَ: انْطَلِقْ فَحُجَّ مع امْرَأَتِكَ

“কোন নারী নিজ মাহরাম সঙ্গী ছাড়া একাকী সফর করবে না। ”
তখন উপস্থিত এক সাহাবি আরজ করলেন, “আমি তো অমুক জিহাদে যাচ্ছি। আর এ দিকে আমার স্ত্রী হজে যেতে যাচ্ছে। (আমি কি করবো)?
জিহাদে বের হবো, নাকি স্ত্রীর সাথে হজের সফরে বের হব? কারণ আমি ছাড়া তার অন্য কোন মাহরারম সঙ্গী নেই।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তুমি জিহাদে না গিয়ে তোমার স্ত্রীর সাথে হজের সফরে যাও।” [সহীহ বুখারী]

❑ সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রাহ. বলেন,
لا يجوز للمسلمة أن تحج بدون محرم، النبي ﷺ قال: لا تسافر امرأة إلا مع ذي محرم وقد ذهب بعض العلماء إلى جواز الحج مع ثقات النساء بدون محرم ولكنه قول مرجوح، والصواب: ما قاله النبي ﷺ: لا تسافر امرأة إلا مع ذي محرم لكن لو حجت مع النساء صح حجها، وعليها التوبة إلى الله؛ لأنها أخطأت وأثمت فعليها التوبة إلى الله والندم وأن لا تعود إلى مثل هذا وحجها صحيح إن شاء الله؛ لأنها.. أدت مناسك الحج، فصح مع الإثم في مخالفتها السنة، في حجها بدون محرم، والله ولي التوفيق، وله سبحانه وتعالى الحكمة البالغة وعليها التوبة من ذلك.
“কোনও মুসলিম নারীর জন্য মাহরাম পুরুষ (যাদের সাথে স্থায়ীভাবে বিয়ে হারাম) ছাড়া হজ করা জায়েজ নাই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
لَا تُسَافِرِ المَرْأَةُ إلَّا مع ذِي مَحْرَمٍ
“কোন মহিলা মাহরাম পুরুষ ছাড়া সফর করবে না।” [সহিহ মুসলিম]
কতিপয় আলেম মাহরাম পুরষ ছাড়া বিশ্বস্ত মহিলাদের সাথে হজ করা বৈধ বললেও তা গ্রাধিকারযোগ্য মত নয়। বরং সঠিক কথা হল, যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কোন মহিলা মাহরাম পুরষ ছাড়া সফর করবে না।” তবে কেউ যদি একদল মহিলার সাথে হজ করে তাহলে তার হজ সহিহ হয়ে যাবে। কিন্তু সে ভুল কাজ করবে। এতে সে গুনাহগার হবে। তাই তার জন্য লজ্জিত অন্তরে তওবা করা আবশ্যক এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এমনটি করবে না। কিন্তু ইনশাআল্লাহ তার হজ বিশুদ্ধ হবে। কারণ সে হজের কার্যাবলী আদায় করেছে। সুতরাং মাহরাম পুরুষ ছাড়া হজ করার কারণে গুনাহ এবং সুন্নতের বিরুদ্ধাচরণ সহকারে তার হজ সঠিক হবে। আল্লাহ তওফিক দানকারী এবং সুনিপুণ কৌশলের অধিকারী। ওই মহিলার কর্তব্য, এ কাজের জন্য তওবা করা।” [সূত্র: binbaz. অর্গ]
◈ বোনের স্বামী আপনার জন্য মাহরাম নয়। কেননা আপনার বোন বেঁচে থাকা অবস্থায়ও তাকে তালাক দিয়ে আপনাকে বিয়ে করা তার জন্য জায়েয রয়েছে। সুতরাং আপনার বোন বেঁচে থাকা অবস্থায়ও সে আপনার জন্য মাহরাম নয়। অত:এব আপনার বোন ও তার স্বামীর সাথে আপনার সফর করা বৈধ হবে না। দুআ করি, আল্লাহ যেন আপনার স্বামীর অন্তরে আল্লাহর ঘর জিয়ারতের আগ্রহ সৃষ্টি করে দেন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate