February 28, 2024

শাবান মাসে নফল রোজা সম্পর্কিত কয়েকটি সহিহ হাদিস

 শাবান মাসে নফল রোজা রাখা সম্পর্কে অনেক সহিহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে। নিন্মে এ সম্পর্কিত ৪টি গুরুত্বপূর্ণ হাদিস তুলে ধরা হল:

❖ ১. আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

كان رسول الله صلَّى الله عليه وسلَّم يصوم حتى نقولَ: لا يُفطر، ويُفطر حتى نقول: لا يَصوم، فما رأيتُ رسول الله صلَّى الله عليه وسلَّم استكملَ صِيامَ شهرٍ إلاَّ رمضان، وما رأيتُه أكثرَ صيامًا منه في شعبان” (متفق عليه)

রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন (নফল) রোজা রাখতে শুরু করতেন তখন আমরা বলতাম যে তিনি রোজা রাখা আর বাদ দিবেন না। আবার যখন রোজা বাদ দিতেন তখন আমরা বলতাম তিনি আর রোজা করবেন না। তবে তাঁকে রমজান ছাড়া পরিপূর্ণভাবে অন্য কোন মাসে রোজা রাখতে দেখিনি এবং শাবান মাসের চেয়ে অন্য কোন মাসে এত বেশি রোজা রাখতে দেখিনি।” [1]

❖ ২. আয়েশা রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,

« لَمْ يَكُنْ النَّبِيُّ -صلى الله عليه وسلم- يَصُومُ شَهْرًا أَكْثَرَ مِنْ شَعْبَانَ، فَإِنَّهُ كَانَ يَصُومُ شَعْبَانَ كُلَّهُ، وَكَانَ يَقُولُ: خُذُوا مِنْ الْعَمَلِ مَا تُطِيقُونَ فَإِنَّ اللَّهَ لا يَمَلُّ حَتَّى تَمَلُّوا، وَأَحَبُّ الصَّلاةِ إِلَى النَّبِيِّ -صلى الله عليه وسلم- مَا دُووِمَ عَلَيْهِ وَإِنْ قَلَّتْ، وَكَانَ إِذَا صَلَّى صَلاةً دَاوَمَ عَلَيْهَا»

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাবান মাসের চেয়ে অধিক রোজা আর কোন মাসে রাখতেন না। তিনি (প্রায়) পুরো শাবান মাস রোজা রাখতেন। তিনি বলতেন, “তোমরা এমন আমল গ্রহণ কর যা তোমাদের সাধ্যের মধ্যে থাকে। কারণ, আল্লাহ তাআলা বিরক্ত হন না যতক্ষণ না তোমরা বিরক্ত হও। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট এমন নামাজই পছন্দনীয় যা নিয়মিতভাবে আদায় করা হয় যদিও তা স্বল্প হয়। তাঁর নিয়ম ছিল, যখন তিনি কোন নামাজ পড়তেন নিয়মিতভাবে তা পড়তেন। [2]

❖ ৩. উসামা বিন যায়দ রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসুল, আপনাকে শাবান মাসে যে পরিমাণ রোজা পালন করতে দেখি অন্য মাসে তা দেখি না। এর কারণ কী? তিনি বললেন,
ذاكَ شهرٌ يغفلُ الناسُ عنهُ بينَ رجبَ ورمضانَ وهو شهرٌ يُرفعُ فيهِ الأعمالُ إلى ربِّ العالمينَ فأُحِبُّ أن يُرفعَ عملي وأنا صائمٌ
“রজব এবং রমজানে মধ্যবর্তী এ মাস (শাবান মাস) সম্পর্কে মানুষ উদাসীন থাকে। অথচ (এটি এত গুরুত্বপূর্ণ মাস যে,) এ মাসে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে মানুষের আমল সমূহ উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমি চাই, রোজা অবস্থায় আমার আমল উঠানো হোক।” [3]

❖ ৪. কারো যদি রমজানের রোজা ছুটে যায় তবে সে তা শাবান মাসে কাজা করে নিতে পারে। যেমন: আবু সালামা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আয়েশা রা. কে বলতে শুনেছি,

كَانَ يَكُونُ عَلَيَّ الصَّوْمُ مِنْ رَمَضَانَ ، فَمَا أَسْتَطِيعُ أَنْ أَقْضِيَهُ إِلا فِي شَعْبَانَ
“আমার রমজানের কিছু রোজা বাকি থাকত। সেগুলো আমি শাবান ছাড়া কাযা করতে পারতাম না।”[4] অর্থাৎ আয়েশা রা. গত রমজানের ছুটে যাওয়া ফরজ রোজাগুলো শাবান মাসে কাজা করতেন।

টিকা:
[1] বুখারি, কিতাবুস্‌ সাওম। মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম।
[2] বুখারি, কিতাবুস্‌ সাওম। মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম।
[3] মুসনাদ আহমদ ৫ম খণ্ড ২০১ পৃষ্ঠা। সুনান নাসাঈ, কিতাবুস সিয়াম। আলবানী রা. বলেন, এ সনদটি হাসান। দ্র: সিলসিলাতুল আহাদীস আস সাহীহাহ্‌। হাদিস নং ১৮৯৮।
[4] বুখারি, কিতাবুস্‌ সাওম। মুসলিম, কিতাবুস সিয়াম। ইয়াহয়া বলেন, এর কারণ ছিল তিনি রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেবায় ব্যস্ত থাকতেন।
[আল বিদা’ আল হাওলিয়া গ্রন্থ থেকে সংগৃহীত]
মহান আল্লাহ আমাদেরকে শাবান মাসে অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখার তওফিক দান করুন। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
অনুবাদ ও গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে সকল প্রকার অনুষ্ঠান করা হারাম

 সৌদি আরবের সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদের ফতোয়া।

▬▬▬▬◈♡◈▬▬▬▬
সর্বোচ্চ ওলামা পরিষদে বিশ্লেষণের পর এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে, কুরআন-সুন্নাহর স্পষ্ট প্রমাণাদি দ্বারা এ কথা অকাট্য ভাবে প্রমাণিত যে, ইসলামে ঈদ বা উৎসবের দিন মাত্র দুটি। সালাফে সালেহীনগণও এ বিষয়ে একমত হয়েছেন। ইসলামে স্বীকৃত ঈদ দুটির একটি হল ঈদুল ফিতর, অপরটি হল ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদ।

উল্লিখিত ঈদ দুটি ব্যতীত যত ঈদ বা উৎসব আছে, হোক না তা কোন ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত বা কোন গোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত বা কোন ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত তা বিদআত। মুসলমানদের তা পালন করা বা পালন করতে বলা বৈধ নয় এবং এ উপলক্ষে আনন্দ প্রকাশ করা ও এ ব্যাপারে কিছু দিয়ে সাহায্য করাও নিষেধ। কেননা এ ধরণের কাজ আল্লাহ তা’আলার সীমা লঙ্ঘন বৈ অন্য কিছু হবে না। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সীমা লঙ্ঘন করবে সে নিজের উপর অত্যাচার করবে। এ ধরণের কালচার বিধর্মীদের অনুসরণের কল্পে গ্রহণ করা হলে অপরাধ আরও মারাত্মক হবে। কারণ এর মাধ্যমে তাদের সদৃশ্যতা গ্রহণ করা এবং তাদেরকে এক ধরণের বন্ধু বানানো হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে এ থেকে বারণ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
من تشبه بقوم فهو منهم
“যে ব্যক্তি কোনও সম্প্রদায়ের সাথে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করল সে তাদের দলভুক্ত বলে গণ্য। ভালোবাসা দিবস পালন করাও এ নিষেধের অন্তর্ভুক্ত। কেননা এটি খৃষ্টানদের উৎসব। যে মুসলমান আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে তার জন্য এ কাজ করা বা এই দিনে কাউকে ফুল বা অন্যকোনো উপহার দেয়া বৈধ নয়। বরং তার কর্তব্য হল আল্লাহ এবং তার রাসূলের হুকুম পালন করা এবং আল্লাহর শাস্তি ও গযব আসে এমন কাজ থেকে নিজে দূরে থাকা ও অন্যদের দূরে রাখা।

অতএব এ দিবসকে কেন্দ্র করে পানাহার করা, ক্রয়-বিক্রয় করা, কোন কিছু প্রস্তুত করা বা উপঢৌকন দেয়া, চিঠি-পত্র চালাচালি করা ও প্রচার-পত্র বিলি করা অবৈধ। এ সমস্ত কাজের মাধ্যমে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানি করা হয়। আল্লাহ তা’আলা বলেন,

وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَاب

“সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর। পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না।” [সূরা মায়িদাহ: ২]
▬▬▬▬◈♡◈▬▬▬▬
সৌদি আরবের গবেষণা ও ফতোয়া প্রদান বিষয়ক স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ও সদস্যবৃন্দ:
১. চেয়ারম্যান: আব্দুল আযিয বিন আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ আলে শেখ
২. সদস্য: সালেহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান
৩. সদস্য: আব্দুল্লাহ বিন আব্দুর রহমান আল-গুদাইয়ান
৪. সদস্য: বকর বিন আব্দুল্লাহ আবু জায়েদ
[ফতোয়া নং ২১২০৩ তারিখ: ২৩-১১- ১৪২০ হি.]

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

February 10, 2024

মেয়েদের পায়ে নূপুর পরা জায়েজ কি

 উত্তর: ইসলামে নারীদের সাজসজ্জা এবং অলংকার পরার ব্যাপারে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে ইসলাম নির্ধারিত শর্তাবলী মেনে তা করতে হবে। যেমন: পর পুরুষের সামনে সাজসজ্জা, অলংকারাদি, শরীর বা পোশাকের সৌন্দর্য প্রকাশ করা যাবে না এবং এতে শরিয়া বিরোধী বা হারাম এর মিশ্রণ থাকা চলবে না। সুতরাং একজন মুসলিম নারী পায়ের নূপুর পরিধান করতে পারে‌। তবে শর্ত হল, তাতে বাজনা থাকা যাবে না এবং তা পর পুরুষদের সামনে প্রকাশ করা যাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,

ولا يَضْرِبْنَ بأرجُلِهِنّ لِيُعْلَمَ ما يُخْفِين من زِينَتِهِنّ
“আর তাদের পা দিয়ে যেন তারা আঘাত না করে যাতে তাদের অলংকারের যা লুকিয়ে আছে তা জানানো যায়।” [সূরা নূর এর ৩১ নং আয়াত] তবে স্বামী, মাহরাম পুরুষ অথবা মহিলা অঙ্গনে; পরলে তাতে কোন সমস্যা নেই।

◍ বাজনাদার নূপুর পড়া বৈধ নয়:

🔰 একদিন মা আয়েশা রা. এর নিকট কোনও এক বালিকা বাজনাদার নূপুর পরে আসলে তিনি তাকে বললেন, “খবরদার! তা কেটে না ফেলা পর্যন্ত আমার ঘরে প্রবেশ করবে না।” অতঃপর তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ঘরে ঘণ্টি থাকে সে ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” [সুনানে আবু দাউদ হাদিস : ৪২৩১; সুনানে নাসাঈ হাদিস : ৫২৩৭]

🔰 সহীহ মুসলিমে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ঘণ্টি, বাজা, ঘুঙুর হল,‌ শয়তানের বাদ্যযন্ত্র।” [সহীহ মুসলিম হাদিস : ২১১৪] আল্লাহু আলাম
▬▬▬🔹♦🔹▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ফরজ গোসলের বিধান

 প্রশ্ন: রাতে স্বপ্নদোষ হলে এই শীতের সকালে গোসল সম্ভব নয়। তাহলে এ ক্ষেত্রে নামাজ পড়তে চাইলে কী করা উচিত?

উত্তর: স্বপ্নদোষ হওয়া বড় নাপাকির অন্তর্ভুক্ত। এ থেকে পবিত্রতার জন্য গোসল করা ফরজ। সুতরাং এমনটি ঘটলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার সময় পানি গরম করে গোসল করতে হবে। কিন্তু যদি এমন পরিস্থিতির মধ্যে থাকেন যে, সেখানে পানি গরমের কোনো ব্যবস্থা নেই এবং ঠাণ্ডা পানিতে গোসলের কারণে অসুস্থ হওয়ার কিংবা রোগ-ব্যাধি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা আছে তাহলে এক্ষেত্রে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করা জায়েজ। কিন্তু পানি গরমের ব্যবস্থা থাকলে তায়াম্মুম করা জায়েজ হবে না।

◆ আল্লাহ তাআলা বলেন,

فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُم

“তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।” [সূরা তাগাবুন: ১৬]

◆ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ

“আমি যদি তোমাদেরকে কোন বিষয়ে আদেশ করি তাহলে সাধ্য অনুসারে তা পালন করবে।” [সহিহ বুখারি]

◆ হাদিসে আরও এসেছে, প্রখ্যাত সাহাবী আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

احتَلمتُ في ليلةٍ باردةٍ في غزوةِ ذاتِ السُّلاسلِ فأشفَقتُ إنِ اغتَسَلتُ أن أَهْلِكَ فتيمَّمتُ، ثمَّ صلَّيتُ بأصحابي الصُّبحَ فذَكَروا ذلِكَ للنَّبيِّ صلَّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ فقالَ: يا عَمرو صلَّيتَ بأصحابِكَ وأنتَ جنُبٌ ؟ فأخبرتُهُ بالَّذي مَنعَني منَ الاغتِسالِ وقُلتُ إنِّي سَمِعْتُ اللَّهَ يقولُ:( وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا ) فضحِكَ رسولُ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ ولم يَقُلْ شيئًا

“যাতুস সালাসিল যুদ্ধের সময় এক প্রচণ্ড শীতের রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়। আমার ভয় হল, আমি যদি গোসল করি তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হব। তাই আমি তায়াম্মুম করে লোকজনকে নিয়ে সালাত আদায় করলাম। পরে তারা বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালে তিনি বললেন, “হে আমর, তুমি নাকি জুনুবি (নাপাক) অবস্থায় তোমার সাথীদের নিয়ে সালাত আদায় করেছো?”
তখন আমি গোসল না করার কারণ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করলাম এবং বললাম, আমি আল্লাহর এই বাণী শুনেছি, (আল্লাহ বলেছেন,)

وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا

“আর তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি বড়ই দয়াবান’’ (সূরা নিসা: ২৯)। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন এবং কিছুই বললেন না।” [আবু দাউদ-সহিহ]

এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মতির মাধ্যমে এমন পরিস্থিতিতে তায়াম্মুম করার বৈধতা প্রমাণিত হয়।

❑ শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. বলেন,

إذا كان في محل لا يستطيع فيه تدفئة الماء وليس هناك كن يستكن به للغسل بالماء الدافي وخاف على نفسه فإنه يصلي بالتيمم
ولا حرج عليه

“যদি সে এমন জায়গায় থাকে যেখানে সে পানি গরম করতে পারে না এবং গরম পানি দিয়ে গোসল করার জন্য সেখানে এমন কোনো ঘর না থাকে যেখানে (ঠাণ্ডা থেকে) আত্মরক্ষা করবে এবং (ঠাণ্ডা পানি ব্যবহারের কারণে) শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তাহলে তাকে তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করবে। এতে কোনও আপত্তি নেই।” [binbaz]

🔸উল্লেখ্য যে, এই বিধান স্বপ্নদোষের পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রী মিলন কিংবা জাগ্রত অবস্থায় বীর্যপাতের মাধ্যমে জুনুবি (নাপাক) হওয়ার ক্ষেত্রে, মহিলাদের ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হওয়া ও প্রসূতি নারীর পবিত্রতার জন্য গোসলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

তায়াম্মুমের বিধি-বিধান ও পদ্ধতি

 শরিয়তের অন্যতম বৈশিষ্ট হল, ইসলামের বিধি-বিধানগুলো সহজে পালনীয়। মানুষের কষ্ট লাঘবের বিষয়টি এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। এর একটি উদাহরণ হল, তায়াম্মুমের বিধান। অর্থাৎ পানি সমস্যার কারণে পবিত্র মাটিকে পবিত্রতা অর্জনের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা।

আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেন,

وَإنْ كُنْتُمْ مَرْضىَ أوْ عَلىَ سَفَرٍ أوْ جَاءَ أحَدٌ مِنْكُمْ مِنَ الْغَائِطِ أوْ لاَمَسْتُمُ النِّسَاءَ فَلَمْ تَجِدُوْا مَاءً فَتيمموْا صَعِيْدًا طَيِّبًا فَامْسَحُوْا بِوُجُوْهِكُمْ وَ أيْدِيَكُمْ مِنْهُ مَا جَعَلَ اللهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُمْ مِنْ حَرَجٍ وَلَكِنَّ يُرِيْدُ لِيُطَهِّرُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ
“যদি তোমরা অসুস্থ হও অথবা সফরে থাক অথবা তোমাদের কেউ পেশাব-পায়খানা সেরে আসে অথবা তোমরা স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর অতঃপর পানি না পাও তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও। (অর্থাৎ মুখ মণ্ডল ও হস্তদ্বয় মাটি দ্বারা মাসেহ কর।) আল্লাহ্‌ তোমাদেরকে অসুবিধায় ফেলতে চান না; কিন্তু তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান- যাতে তোমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” [সূরা মায়েদা: ৬]

রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
جُعِلَتْ لِيَ الأَرْضُ مَسْجِدًا وَ طَهُوْرًا، فَأَيُّمَا رَجُلٍ أدْرَكَتْهُ الصَّلاَةُ فَلْيُصَلِّ
“জমিন আমার জন্য পবিত্রতা অর্জনের উপকরণ এবং সেজদা করার স্থান বানানো হয়েছে। অতএব করো নামাযের সময় হলে সে যেন তা আদায় করে নেয়। (অর্থাৎ সে যে স্থানেই থাকুক না কেন সেখানেই যথাসময়ে সালাত আদায় করে করবে এবং পানি না পেলে মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে পবিত্রতা অর্জন করবে।”” [বুখারি ও মুসলিম]

🔸কখন তায়াম্মুম বৈধ?

নিম্নলিখিত অবস্থায় তায়াম্মুম বৈধ:

▪️ ১. যদি মোটেও পানি না পাওয়া যায় অথবা যদি এত অল্প পরিমাণ পানি থাকে যে, তা দ্বারা ওযু বা গোসল করলে পান করার জন্য পানি সঙ্কট দেখা দিবে।
▪️ ২. পানি বিদ্যমান থাকার পরও যদি অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা হওয়ার কারণে তা ব্যবহারের অনুপুক্ত হয় (আর ঠাণ্ডা পানি গরম করারও ব্যবস্থা না থাকে)
▪️ ৩. পানি ব্যবহার করার কারণে যদি রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার বা সুস্থতায় বিলম্ব হওয়ার বা শারীরে বড় ধরণের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে
অথবা দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে যাওয়ার কারণে যদি সফর সঙ্গী, স্ত্রী-সন্তান বা অর্থ-সম্পদের ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে অথবা রাস্তায় শত্রুর ভয় থাকে তাহলে তায়াম্মুম করা বৈধ।
– তায়াম্মুম করে সালাত আদায়ের পর যদি পানি ব্যবহার করা সম্ভব হয় বা পানি পাওয়া যায় তাহলে উক্ত সালাত পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নাই।
– তায়াম্মুমের এই বিধান ছোট-বড় যে কোন নাপাকি থেকে পবিত্রতা অর্জনের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ ওজু বা ফরজ গোসল উভয়ের বিকল্প হিসেবে তায়াম্মুম করা বৈধ হবে।

🔸তায়াম্মুমের পদ্ধতি:

প্রথমে মনে মনে পবিত্রতা অর্জনের নিয়ত করার পর বিসমিল্লাহ্‌ বলে উভয় হাতের তালু দ্বারা পবিত্র মাটি বা মাটি জাতীয় বস্তুত (ধুলা-বালি ইত্যাদি) এর উপর মারতে হবে। অতঃপর দু হাত ঝেড়ে বা তাতে ফুঁ দিয়ে মুখমণ্ডল এবং বাম হাতের তালু দিয়ে ডান হাতের কব্জি পর্যন্ত ও ডান তালু দিয়ে বাম হাতের কব্জি পর্যন্ত মাসেহ করতে হবে।

রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আম্মার ইবনে ইয়াসের রা. কে তায়াম্মুমের পদ্ধতি শিখাতে গিয়ে বলেন,
إِنَّمَا كَانَ يَكْفِيكَ أَنْ تَقُولَ هَكَذَا : وَضَرَبَ بِيَدَيْهِ إِلَى الأَرْضِ فَنَفَضَ يَدَيْهِ فَمَسَحَ وَجْهَهُ وَكَفَّيْهِ
“তোমার জন্য এরূপ করাই যথেষ্ট ছিল। এই বলে তিনি তার উভয় হাত মাটিতে মারলেন। অতঃপর তা ঝেড়ে মুখমণ্ডল এবং উভয় হাতের কব্জি মাসেহ করলেন।” [সহীহ মুসলিম: ৭০৬ ]

আরেকটি বর্ণনায় হাত ঝাড়ার পরিবর্তে দু হাতে ফুঁ দেয়ার কথা এসেছে:
ثُمَّ تَنْفُخَ ثُمَّ تَمْسَحَ بِهِمَا وَجْهَكَ وَكَفَّيْكَ
[সহীহ মুসলিম: ৭০৭ ]

উল্লেখ্য যে, তায়াম্মুমের ক্ষেত্রে দু বার মাটিতে হাত মারা এবং উভয় হাত কনুই পর্যন্ত মাসেহ করা সম্পর্কে সুনানে দারাকুত্বনীতে যে হাদিস রয়েছে তা অত্যন্ত দুর্বল। তাই তা আমলযোগ্য নয়।

🔸তায়াম্মুমের শর্তাবলী:
▪ ১. নিয়ত করা।
▪ ২. পানি অপর্যাপ্ত হওয়ার কারণে অথবা ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় তা ব্যবহার করতে অক্ষম হওয়া।
▪ ৩.তায়াম্মুমের মাটি পবিত্র হওয়া।
▪ ৪. বৈধ মাটি থেকে তায়াম্মুম করা। অর্থাৎ অবৈধভাবে দখলকৃত জমিনের মাটি দ্বারা তায়াম্মুম বিশুদ্ধ নয়।

🔸যে সকল কারণে তায়াম্মুম নষ্ট হয়:

▪ ১. পানি ব্যবহারে সক্ষম হলে অথবা পানি ব্যবহারের প্রতিবন্ধকতা দূর হলেই তায়াম্মুম ভঙ্গ হয়ে যাবে যদিও তায়াম্মুমকারী ব্যক্তি নামাজের মধ্যে থাকে অর্থাৎ নামাজরত অবস্থায় যদি পানি সমস্যা দূর হয়ে যায় তাহলে তৎক্ষণাৎ নামাজ ভঙ্গ করে ওজু বা গোসলের মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করবে তারপর পুনরায় তা আদায় করবে। তবে নামাজ শেষ করার পর যদি পানি সমস্যা দুর হলে পুনরায় আদায় করার প্রয়োজন নাই।

উল্লেখ্য যে, উক্ত নামাজ পূণরায় পড়া জরুরি না হলেও উক্ত তায়াম্মুম দ্বারা অন্য কোন নামাজ পড়া বা যে সকল কাজের জন্য পবিত্রতা অর্জন করা আবশ্যক সেগুলো করা যাবে না বরং পানি দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করতে হবে। কারণ যে সমস্যার কারণে তায়াম্মুমের বৈধতা দেয়া হয়েছিলো তা ইতোমধ্যে তা দূর হয়েছে।
▪২. অনুরূপভাবে যে সব কারণে ওযু নষ্ট হয় (যেমন: পেশাব, পায়খানা, বায়ু নির্গত, ঘুম ইত্যাদি) বা যে সব কারণে গোসল ফরজ হয় সেগুলোর কোন একটি সংঘটিত হলে (স্ত্রী মিলন, বীর্যপাত, হায়েজ-নেফাস ইত্যাদি) তায়াম্মুম বিনষ্ট হয়ে যাবে। আল্লাহু আলাম।

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
সংকলনে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

রজব মাস সম্পর্কে কতিপয় জাল ও যঈফ হাদিস

 রজব মাস সম্পর্কে আমাদের সমাজে লোকমুখে, ইন্টারনেটে বা বিভিন্ন ইসলামিক বই -পুস্তকে অনেক হাদিস প্রচলিত রয়েছে। সেগুলোর মধ্যে কিছু হাদিস মুহাদ্দিসদের মানদণ্ডে সহিহ নয় আর কিছু হাদিস এমন রয়েছে যেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট।

এ ধরণের কতিপয় হাদিস সম্পর্কে নিম্নে পর্যালোচনা পেশ করা হলো:

🚫 ক. রজব মাস সম্পর্কে কয়েকটি দুর্বল হাদীস:

● ১) “জান্নাতে একটি নহর আছে যাকে বলা হয় রজব। যার পানি দুধের চেয়ে সাদা, মধুর চেয়েও মিষ্টি। যে ব্যক্তি রজব মাসে একদিন রোযা রাখবে তাকে সেই নহরের পানি পান করতে দেয়া হবে।”

ইবনে হাজার রহ. বলেন: হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, আবুল কাসেম আত তাইমী তার আত তারগীব ওয়াত তারহীব কিতাবে, হাফেয আসপাহানী ফাযলুস সিয়াম কিতাবে, বাইহাকী, ফাযায়েলুল আওকাত কিতাবে, ইবনু শাহীন আত তারগীব ওয়াত তারহীব কিতাবে।

এ হাদীসটি দুর্বল। ইবনুল জাওযী ইলালুল মুতানাহিয়া গ্রন্থে বলেন: এ হাদীসের বর্ণনা সূত্রে একাধিক অজ্ঞাত রাবী রয়েছে। তাই এ হাদীসের সনদ দুর্বল। তবে বানোয়াট বলার মত পরিস্থিতি নেই। এর আরও কয়েকটি সূত্র রয়েছে কিন্তু সেগুলোতেও একাধিক অজ্ঞাত বর্ণনাকারী রয়েছে। [দ্রষ্টব্য: তাবয়ীনুল আজাব (পৃষ্ঠা নং ৯, ১০ ও ১১), আল ইলালুল মুতানাহিয়া, (২য় খণ্ড, ৬৫ পৃষ্ঠা)।]

● ২) “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শাবানা ও বাল্লিগনা রামাযান।”

“হে আল্লাহ তুমি রজব ও শাবানে আমাদেরকে বরকত দাও। আর আমাদেরকে রামাযান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও।” (মুসনাদ আহমাদ ১/২৫৯)

হাদীসটি দুর্বল।

এ হাদীসের সনদে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে যার নাম যায়েদাহ বিন আবুর রিকাদ। তার ব্যাপারে ইমাম বুখারী রহ. বলেন: মুনকারুল হাদীস। ইমাম নাসাঈ তার সুনান গ্রন্থে তার নিকট থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করার পর বলেন: চিনি না এই ব্যক্তি কে? আর তিনি তার যুয়াফা কিতাবে বলেন: মুনকারুল হাদীস। কুনা গ্রন্থে বলেন: “তিনি নির্ভরযোগ্য নন। ইবনে হিব্বান বলেন: তার বর্ণিত কোন হাদীসকে দলীল হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না। দ্রষ্টব্য: তাবয়ীনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফী ফযলি রাজাব, ১২ পৃষ্ঠা। আয যুয়াফাউল কাবীর (২/৮১) তাহযীবুত তাহযীব (৩/৩০)

● ৩) “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রামাযানের পরে রজব ও শাবান ছাড়া অন্য কোন মাসে রোযা রাখেন নি।” (বাইহাকী)

হাফেয ইবনে হাজার বলেন: উক্ত হাদীসটি মুনকার। কারণে, এর সনদের ইউসুফ বিন আতিয়া নামক একজন রাবী রয়েছে। সে খুব দূর্বল। (তাবয়ীনুল আজাব ১২ পৃষ্ঠা)

🚫 খ. রজব মাস সম্পর্কে কয়েকটি জাল হাদীস:

● ১) রজব আল্লাহর মাস, শাবান আমার মাস এবং রামাযান আমার উম্মতের মাস।”

এটি জাল হাদীস।

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, উক্ত হাদীসটি বর্ণনাকারীদের মধ্যে আবু বকর আন নাক্কাশ নামে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে। সে কুরআনের মুফাসসির। কিন্তু লোকটি জাল হাদীস রচনাকারী এবং চরম মিথ্যাবাদী দাজ্জাল। ইবনে দেহিয়া বলেন: এই হাদীসটি জাল। (তাবয়ীনুল আজব, ১৩-১৫ পৃষ্ঠা) এছাড়াও উক্ত হাদীসকে জাল বলে চিহ্নিত করেছেন ইবনু জাওযী তার আল মাওযূয়াত কিতাবে (২/২০৫-২০৬) এবং ইমাম সানয়ানী মাওযূআত কিতাবে (৬১ পৃষ্ঠা) এবং সূয়ূতী তার আল লাআলী আল মাসনূআহ কিতাবে (২/১১৪)।

● ২) কুরআনের মর্যাদা সকল যিকির-আযকারের উপর যেমন রজব মাসের মর্যাদা অন্যান্য মাসের উপর তেমন।”

হাদীসটি বানোয়াট।

ইবনে হাজার আসকালানী উক্ত হাদীসটি বর্ণনা করার পর বলেন, এই হাদীসটি সনদের রাবীগণ সবাই নির্ভরযোগ্য একজন ছাড়া। তার নাম হল, সিকতী। আর এ লোকটিই হল বিপদ। কেননা, সে একজন বিখ্যাত জাল হাদীস রচনাকারী। (তাবয়ীনুল আজাব: ১৭ পৃষ্ঠা)

● ৩) রজব মাসে যে ব্যক্তি তিনটি রোযা রাখবে আল্লাহ তায়ালা তার আমলনামায় একমাস রোযা রাখার সওয়াব লিপিবদ্ধ করবেন, আর যে ব্যক্তি সাতটি রোযা রাখবে আল্লাহ তায়ালা তার জন্য জাহান্নামের সাতটি দরজা বন্ধ করে দিবেন।”

হাদীসটি জাল।

এটিকে জাল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন ইবনু জাওযী আল মাওযূয়াত কিতাবে (২/২০৬), সূয়ূতী আল লাআলী আল মাসনূআহ কিতাবে (২/১১৫), শাওকানী আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ কিতাবে (১০০ পৃষ্ঠা, হাদীস নং ২২৮) এবং তাবয়ীনুল আজাব কিতাবে (১৮ পৃষ্ঠা)।

● ৪) “যে ব্যক্তি রজবের প্রথম তারিখে মাগরিব নামায আদায় করত: বিশ রাকায়াত নামায পড়বে, প্রতি রাকায়াতে সূরা ফাতিহা এবং সূরা ইখলাস একবার করে পড়বে এবং প্রতি দু রাকায়াত পরপর সালাম ফিরিয়ে মোট দশ সালামে বিশ রাকায়াত পূর্ণ করবে তোমরা কি জানেন তার সওয়াব কি?…তিনি বলেন: আল্লাহ তায়ালা তাকে হেফাজত করবেন এবং তার পরিবার, সম্পত্তি ও সন্তান-সন্ততীকে হেফাজত করবেন, কবরের আযাব থেকে রক্ষা করবেন এবং বিনা হিসেব ও বিনা শাস্তিতে বিদ্যুৎ গতিতে পুলসিরাত পার করাবেন।”

এটি একটি বানোয়াট হাদীস।

(দ্রষ্টব্য: ইবনুল জাউযী তার মাওযূয়াত (২/১২৩), তাবয়ীনুল আজাব (২০ পৃষ্ঠা), আল ফাওয়াইদুল মাজমূয়াহ (৪৭পৃষ্ঠা, জাল হাদীস নং ১৪৪)।)

● ৫) “যে ব্যক্তি রজব মাসে রোযা রাখবে এবং চার রাকায়াত নামায পড়বে সে জান্নাতে তার নির্ধারিত আসন না দেখে মৃত্যু বরণ করবে না।”

হাদীসটিকে জাল বলে আখ্যায়িত করেছেন ইবনু জাওযী আল মাওযূয়াত কিতাবে (২/১২৪), শাওকানী আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ কিতাবে (৪৭ পৃষ্ঠা) এবং তাবয়ীনুল আজাব, (২১ পৃষ্ঠা)।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
مأخوذ من كتاب البدع الحولية
‘আলবিদা আল হাউলিয়া’ গ্রন্থ থেকে সংকলিত
অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল (লিসান্স, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়)
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব।

আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা দুআর হাদিসটি জয়ীফ

 প্রশ্ন: “আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শা’বানা ওয়া বাল্লিগনা রামাযান।” দুআর এ হাদিসটি কি জয়ীফ? এ দুআটি কি পাঠ করা যাবে?

উত্তর:
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي رَجَبٍ، وَشَعْبَانَ، وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ
উচ্চারণ: “আল্লা-হুম্মা বা-রিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শাবা-না ও বাল্লিগনা রামাযা-ন।”
অর্থ: “হে আল্লাহ তুমি রজব ও শাবানে আমাদেরকে বরকত দাও। আর আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দাও।” [মুসনাদ আহমাদ ১/২৫৯, হিলইয়াতুল আওলিয়া, তবাকাতুল আছফিয়া]

হাদিসটি জয়ীফ বা দুর্বল।

● এ হাদিসের সনদে একজন বর্ণনাকারী রয়েছে যার নাম যায়েদাহ বিন আবুর রিকাদ। তার ব্যাপারে ইমাম বুখারি রহ. বলেন, মুনকারুল হাদিস।

● ইমাম নাসাঈ তার সুনান গ্রন্থে তার নিকট থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করার পর বলেন, “চিনি না এই ব্যক্তি কে?”
– আর তিনি তার যুয়াফা কিতাবে বলেন, “মুনকারুল হাদিস।”
– কুনা গ্রন্থে বলেন, “তিনি নির্ভরযোগ্য নন।”

● ইবনে হিব্বান বলেন, “তার বর্ণিত কোন হাদিসকে দলিল হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।”
[দ্রষ্টব্য: তাবয়ীনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফী ফযলি রাজাব, পৃষ্ঠা: ১২, আয যুয়াফাউল কাবীর ২/৮১, তাহযীবুত তাহযীব ৩/৩০]

➧ জয়ীফ সনদে বর্ণিত এ দুআটি কি পাঠ করা যাবে?

দুআর ক্ষেত্রে জঈফ হাদিস অনুযায়ী আমল করা যায় যদি তার অর্থের মধ্যে কোন সমস্যা না থাকে। যাহোক, উক্ত দুআর ব্যাপারে কথা হল, আমরা রমজান পর্যন্ত পৌছার জন্য দুআ করতে পারি। এতে সমস্যা নাই। সালাফ বা পূর্বসুরীগণ এই দুআ করতেন।

মুআল্লা ইবনুল ফযল বলেন,

كانوا يدعون الله تعالى ستة أشهر أن يبلغهم رمضان ، ويدعونه ستة أشهر أن يتقبل منهم

“তারা (সালাফগণ) আল্লাহর কাছে ছয় মাস দুয়া করতেন, তিনি যেন তাদেরকে রমজান পর্যন্ত উপনীত করেন এবং বাকি ছয় মাস দুআ করতেন যেন, (রমজানের ইবাদত-বন্দেগি) কবুল করেন।”

আর বারো মাসের মধ্যে কেবল রজব ও শাবান মাস নয় বরং সারা বছরই আমাদের বরকত প্রয়োজন।

সুতরাং কেবল এই দু মাস নির্দিষ্ট না করে সারা বছরের প্রতিটি দিন বরকত মণ্ডিত হওয়ার জন্য আমরা আল্লাহর দরবারে দুআ করতে পারি।

❑ শাইখ আব্দুল করিম আল খুযাইয়ের (হাফিযাহুল্লাহ) কে প্রশ্ন করা হয়:

“আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফী রাজাবা ওয়া শাবানা ও বাল্লিগনা রামাযান।” এ হাদিসটি কি সহিহ?

তিনি বলেন,

” هذا حديث لا يثبت ، لكن إن دعا المسلم بأن يبلغه الله عز وجل رمضان، وأن يوفقه لصيامه وقيامه، وأن يوفقه لإدراك ليلة القدر ، أي بأن يدعو أدعية مطلقة فهذا إن شاء الله لا بأس به

“এটি সহিহ হিসেবে সাব্যস্ত নয়। কিন্তু কোনও মুসলিম যদি এই দুআ করে যে, আল্লাহ যেন তাকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছিয়ে দেন এবং সে মাসে সিয়াম ও কিয়াম (রোজা ও তারাবিহ সালাত) এর তাওফিক দান করেন, লাইলাতুল কদর পাওয়ার তাওফিক দেন অর্থাৎ সাধারণভাবে দুআ করে তাহলে ইনশাল্লাহ এতে কোনও সমস্যা নেই।” আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate