February 10, 2024

চোখের পাতা লাফানো শারীরিক সমস্যা নাকি শুভ-অশুভের আলামত এবং প্রতিকার কী

 মাঝেমধ্যেই আমাদের চোখের পাতা লাফায় বা চোখ নাচে। এ ক্ষেত্রে কেউ মনে করে, চোখের পাতা লাফানো মানেই সর্বনাশ আবার কেউ মনে করে ভালো কিছুর পূর্বাভাস। অনেকের মতে, বাম চোখের পাতা লাফালে কোনও না কোনও বিপদ আসন্ন। এমনটা হলে বাড়ির লোকজন যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় থাকেন। আবার কেউ মনে করে, চোখ কাঁপলে তার শুভ-অশুভ ইঙ্গিত নির্ভর করে ব্যক্তির উপর। যদি মহিলাদের ডান চোখ কাঁপে, তবে তা অশুভ বলে ধরা হয় আর পুরুষদের ক্ষেত্রে ডান চোখ কাঁপার অর্থ তার মনের ইচ্ছে পূরণ হওয়ার সময় এসেছে। চোখের পাতা লাফানো নিয়ে এ রকম নানা বিশ্বাস সমাজৈ প্রচলিত আছে। এ সব বিশ্বাসের কারণ হল, জ্যোতিষ শাস্ত্রে এ জাতীয় ব্যাখ্যা দেওয়া হয়।

এখন আমরা জানব, এই চোখের পাতা লাফানো কি কোনও শারীরিক সমস্যা নাকি শুভ-অশুভের আলামত?

প্রকৃত বিচারে, চোখের পাতা লাফানোকে অশুভ বা শুভ আলামত মনে করা একটি ভ্রান্ত কুসংস্কার ছাড়া অন্য কিছু নয়। ডান কিংবা বাঁ কোনও চোখ লাফানোর সঙ্গেই শুভ-অশুভ বা কল্যাণ-অকল্যাণের কোনও সম্পর্ক নেই।
এটি ইসলামের দৃষ্টিতে যেমন ভ্রান্ত বিশ্বাস তেমনি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যার আলোকেও ভিত্তিহীন।

❂ চোখের পাতা কেন লাফায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঝেমধ্যে মানুষের চোখের পাতা লাফায়। এটা কিছু কারণে ঘটে থাকে। যেমন: চোখের উপর অতিরিক্ত চাপ, (একটানা দীর্ঘক্ষণ মোবাইল, টিভি বা কম্পিউটারের দিকে গভীর মনোযোগ সহকারে তাকিয়ে থাকা ইত্যাদি কারণে) ঘুম কম হওয়া,‌ অ্যালার্জি ইত্যাদি। বাতাসের ধুলাবালি, ময়লা, রাসায়নিক পদার্থ প্রভৃতির সংস্পর্শে আসার কারণে চোখ লাফাতে পারে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহনুর শারমিন বলেন, “চোখের কোনও পেশির হঠাৎ নড়ে ওঠাকেই আমরা চোখ লাফানো বলে থাকি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাধারণ কিছু শারীরবৃত্তীয় কারণেই চোখ লাফানোর মতো অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি হয়ে থাকে। চোখের কিছু সাধারণ রোগবালাইয়েও চোখ লাফাতে পারে। কিছু স্নায়বিক সমস্যাতেও চোখ লাফাতে পারে, তবে সে ক্ষেত্রে রোগের অন্যান্য উপসর্গও দেখা দেয়। আদতে ডান কিংবা বাঁ কোনও চোখ লাফানোর সঙ্গেই শুভ-অশুভ বা কল্যাণ-অকল্যাণের কোনও সম্পর্ক নেই।” [প্রথম আলো]

এটিকে কল্যাণ-অকল্যাণ বা শুভ-অশুভর ইঙ্গিত বাহী হিসেবে মনে করা হিন্দুদের মধ্যে বেশি প্রচলিত। কোনও মুসলিমের জন্য এমন কুসংস্কারে বিশ্বাস করা জায়েজ নয়।কেননা:

❑ কুলক্ষণে বিশ্বাস করার বিধান:

◈ ইসলামের দৃষ্টিতে কল্যাণ-অকল্যাণ একমাত্র আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন:

মহান আল্লাহ বলেন,

إِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ ۖ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ ۚ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ

“আর আল্লাহ যদি তোমার উপর কোন কষ্ট আরোপ করেন তাহলে কেউ নেই তা খণ্ডাবার মত তাঁকে ছাড়া। পক্ষান্তরে যদি তিনি কিছু কল্যাণ দান করেন, তবে তার অনুগ্রহকে প্রতিহত করার মতও কেউ নেই। তিনি যার প্রতি অনুগ্রহ দান করতে চান স্বীয় বান্দাদের মধ্যে তাকেই দান করেন।” [সূরা ইউনুস: ১০৭]

◈ ইসলামে কুলক্ষণের বিশ্বাস করা শিরক:

– আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لا عَدْوَى وَلا طِيَرَةَ وَلا هَامَةَ وَلا صَفَرَ

“রোগ সংক্রমণ, কুলক্ষণ, পেঁচা এবং সফর মাস বলতে কিছু নাই।” [সহীহু বুখারী, হা/৫৭০৭]

– আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, আল্লাহর রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

الطِّيَرَةُ شِرْكٌ الطِّيَرَةُ شِرْكٌ ثَلاَثًا وَمَا مِنَّا إِلاَّ وَلَكِنَّ اللهَ يُذْهِبُهُ بِالتَّوَكُّلِ

“কোনও কিছুকে অশুভ লক্ষণ বলে মনে করা শিরক। কোনও কিছুকে অশুভ লক্ষণ বলে মনে করা শিরক। এ কথা তিনি তিন বার বললেন। কিন্তু আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই যার মনে কু ধারণা জন্মে না। তবে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল বা ভরসা তা (আমাদের মন থেকে) দূর করে দেন।” [আহমদ, ১/৩৮৯, ৪৪০, আবু দাউদ ৩৯১২, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম প্রমুখ। সনদ সহিহ-সিলসিলাহ সহীহাহ, ৪৩০]

– ইমরান বিন হুসাইন রা. থেকে বর্ণিত, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَطَيَّرَ، أَوْ تُطُيِّرَ لَهُ أَوْ تَكَهَّنَ، أَوْ تُكُهِّنَ لَهُ أَوْ سَحَرَ، أَوْ سُحِرَ لَهُ

“যে ব্যক্তি নিজে কুলক্ষণে বিশ্বাস করে ও যার কারণে অন্যের মাঝে কুলক্ষণের প্রতি বিশ্বাসের প্রবণতা সৃষ্টি হয় এবং যে ব্যক্তি ভাগ্য গণনা করে ও যার জন্য ভাগ্য গণনা করা হয় (বর্ণনাকারী মনে করেন যে, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ সম্পর্কেও বলেছিলেন) এবং যে জাদু করে ও যার কারণে জাদু করা হয় সেই ব্যক্তি আমাদের দলভুক্ত নয়।” [তাবারানী, সিলসিলা সহীহাহ, হা/২১৯৫।]

– আব্দুল্লাহ বিন আমর বর্ণিত হাদিসে এসেছে। তিনি বলেন, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদা বললেন, কুলক্ষণ যে ব্যক্তিকে কোন কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে, নিশ্চয়ই সে শিরক করে। সহাবিগণ আরজ করলেন, ইয়া রসুলুল্লাহ, উহার কাফফারা কী হবে?

তিনি বললেন, ঐ ব্যক্তি বলবে,

اَللَّهُمَّ لاَ خَيْرَ إِلاَّ خَيْرُكَ وَلاَ طَيْرَ إِلاَّ طَيْرُكَ وَلاَ إِلَهَ غَيْرُكَ

উচ্চারণ: আল্লা-হুম্মা লা খায়রা ইল্লা খায়রুকা ওয়ালা ত্বায়রা ইল্লা ত্বায়রুকা ওয়ালা ইলা-হা গায়রুকা।

“হে আল্লাহ! আপনার কল্যাণ ছাড়া কোন কল্যাণ নেই। আপনার সৃষ্ট কুলক্ষণ ছাড়া কোন কুলক্ষণ নেই। আর আপনি ছাড়া কোন (হক) মাবুদও নেই।” [আহমদ, হা/৭০৪৫; সিলসিলা সহীহাহ হা/১০৬৫]

– ইবনে আব্বাস রা. হতে বর্ণিত। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مِنْ أُمَّتِي سَبْعُونَ أَلْفًا بِغَيْرِ حِسَابٍ هُمْ الَّذِينَ لاَ يَسْتَرْقُونَ وَلاَ يَتَطَيَّرُونَ وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ

“আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবেই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা হবে এমন লোক, যারা শরিয়তে নিষিদ্ধ ঝাড়ফুঁকের আশ্রয় নেয় না, কোনও বস্তুর শুভ-অশুভ মানে না। একমাত্র প্রতিপালকের ওপরই ভরসা রাখে।” [বুখারি, অধ্যায়: ৮১/ সদয় হওয়া, পরিচ্ছেদ: ৮১/২১. “যে কেউ আল্লাহর উপর ভরসা করে তবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” [সূরা তালাক ৬৫/৩]

◈ প্রতিকার:

চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে কমানোর ব্যবস্থা করুন। মুঠোফোন, টেলিভিশন এবং অন্যান্য ডিজিটাল পর্দায় সময় কম ব্যয় করুন। কম আলোতে চোখের কাজ করবেন না। মানসিক চাপ কমাতে চেষ্টা করুন। চা-কফির পরিমাণও কমিয়ে দিন। দূষিত বাতাসের কারণে সমস্যা হচ্ছে বলে মনে হলে রোদ-চশমা ব্যবহার করতে পারেন। ঘুম কম হলে পর্যাপ্ত ঘুমান। চোখকে বিশ্রাম দিন।
চোখের পাতা লাফালে প্রাথমিকভাবে বাড়িয়ে দিন পানি খাওয়ার পরিমাণ। নিশ্চিত করুন ৮ ঘণ্টার গভীর ঘুমের। ম্যাগনেসিয়াম ও ভিটামিনের ঘাটতি ও চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে খেতে পারেন ডাব, দুধ, ডিম, বাদাম ও মৌসুমি ফলমূল।

◈ কখন যাবেন চিকিৎসকের কাছে:

ডাক্তারি পরিভাষায় চোখের পাতা লাফানোকে ‘মায়োকেমিয়া’ (Myokemia) বলা হয়। চিকিৎসকদের মতে, দিনে দু বার ঘটা স্বাভাবিক। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত হলে চিকিৎসা করানো দরকার। চোখ ছাড়া শরীরের অন্য কোনও অংশের পেশি লাফাচ্ছে মনে হলে কিংবা কোনও অংশ দুর্বল হয়ে পড়ছে মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। চোখ লাফানো ছাড়া চোখে ব্যথা, লাল হয়ে যাওয়া, চুলকানি বা চোখের অন্য কোনও উপসর্গ দেখা দিলে চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হোন।
তা ছাড়া জেনে রাখা ভালো যে, পুষ্টির ভারসাম্যের অভাবে চোখ কাঁপা শুরু করলে চিকিৎসকরা ধরে নেন, শরীরে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি রয়েছে। যে কারণে সঠিক ডায়েট প্ল্যান আর ওষুধ এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, যা একজন চিকিৎসক ছাড়া মোটেও সম্ভব নয়।

যদি অ্যালার্জির কারণে চোখ কাঁপা সমস্যার শুরু হয় তবে আপনার চোখের পানির সঙ্গে হিস্টামিন নির্গত হচ্ছে বলে ধরে নেয়া হয়, যা সঠিক সময়ে রোগী চিকিৎসা না নিলে বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। [প্রথম আলো, সময় নিউজ ইত্যাদি]

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

বিকাশ বিষয়ক একগুচ্ছ ইসলামি প্রশ্নোত্তর

 ❑ ক. বিকাশ বয়কট ও ব্যবহার প্রসঙ্গ:

◈ প্রশ্ন-১: হয়ত অবগত আছেন যে, ট্র্যান্স জেন্ডার নিয়ে প্রতিবাদ করায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ মাহতাব স্যারকে চাকরি চ্যুত করা হয়েছে। আমাদের মোটামুটি পরিসরের একটা সদকা ফান্ড আছে। খাবার বিতরণ, এতিমদের নিয়ে কাজ করা এবং অন্যান্য দরিদ্র-অসহায়দের নিয়ে কাজ করি এই ফান্ড থেকে।
ফান্ডে অনেক প্র্যাক্টিসিং নন প্র্যাক্টিসিং মুসলিম দান করেন। সবাই হয়ত বিকাশ বয়কটের বিষয়টা আমলে নিবে না। ফলে ফান্ডে টাকা আসার পরিমাণ কমে যেতে পারে। এমতাবস্থায় আমাদের করণীয় কী বুঝতে পারছি না। পার্সনালি বয়কট করেছি। কিন্তু ফান্ডের ক্ষেত্রেও বয়কট করব কিনা সে বিষয়ে আপনার থেকে উত্তর আশা করছি।
উত্তর:
বিকল্প পন্থা থাকলে তাই ব্যবহার করা উচিত। অন্যথায় প্রয়োজনে বিকাশ ব্যবহার করা যাবে ইনশাআল্লাহ। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সম্মিলিতভাবে ব্র্যাক এবং বিকাশ সহ ব্র্যাকের সকল অঙ্গ প্রতিষ্ঠান বয়কট করা উচিত। কারণ ট্রা**ন্স জে***ন্ডার-এর মত বিকৃত এবং শরিয়ত বিরোধী মতবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপারে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়-এর উক্ত শিক্ষক এক সেমিনারে ট্রান্স জেন্ডার বিষয়ক পাঠ্যপুস্তক থেকে দুটি পৃষ্ঠা ছিঁড়ে প্রতিবাদ করায় তাকে চাকরি চ্যুত করেছে। বিষয়টি ধৃষ্টতা পূর্ণ এবং উদ্বেগ জনক। (যদিও কর্তৃপক্ষ চাকরি চ্যুত করার ভিন্ন কারণ দেখিয়েছে)।

◈ প্রশ্ন-২: বিকাশ তো সবাই বয়কট করতে বলছে। তো বিকাশ কি বন্ধ করে দিতে হবে? বন্ধ না করলে কি গুনাহ হবে?
উত্তর:
প্রয়োজনে বিকাশ ব্যবহার করলে গুনাহ হবে না। তবে বিকল্প থাকলে বিকাশ ব্যবহার না করাই ভালো। কারণ তা ব্র্যাক সুদি ব্যাংক-এর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া ব্র্যাক ট্র্যা***ন্স জে***ন্ডার নামক নিকৃষ্ট মতবাদের সমর্থক-যা প্রমাণিত হয়েছে, সম্প্রতি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়-এর এক শিক্ষক এ বিষয়ে বই ছিঁড়ে প্রতিবাদ করায় তাকে বহিষ্কার করার মাধ্যমে।

❑ খ. বিকাশ থেকে টাকা উঠানোর পর উক্ত টাকা পুনরায় একাউন্টে জমা হয়েছে

◈ প্রশ্ন-৩: একদিন বোন তার বিকাশ থেকে টাকা উঠানোর পর আবার দেখে যে পুনরায় সেই টাকাগুলোই যত টাকা উঠানো হয়েছে সেই টাকাগুলো তার বিকাশে পুনরায় ফিরে এসেছে। তখন তিনি দোকানদারকে বললে দোকানদার বলে এই টাকাগুলো তার না। এ অবস্থায় দ্বীনী বোনের প্রশ্ন, তিনি এই টাকাগুলা উঠিয়ে কী করবেন? তাছাড়া তিনিও অনেকদিন যাবত কিছু ঋণগ্রস্ত অবস্থায় আছেন। এখন তিনি কি টাকাগুলো ঋণ পরিশোধ করবেন না কাউকে দান করে দিবেন?
উত্তর:
বিকাশ একাউন্ট থেকে টাকা উত্তোলনের পরেও পুনরায় উক্ত টাকা ফিরে আসা এটা হয়তো বিকাশের কোন টেকনিক্যাল ভুলের কারণে হতে পারে। এইজন্যে প্রথমত করণীয় হল, বিকাশ কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে এই সমস্যার কথা জানানো এবং তাদের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করা।

কিন্তু তারা কোন সমাধান দিতে না পারলে আপনি উক্ত টাকা ক্যাশ আউট করে নিজে ব্যবহার করতে পারেন। কেননা আপনার পক্ষ থেকে কোন ধরনের দুর্নীতি ও অসৎ কলাকৌশল ব্যতিরেকে এই টাকা আপনার একাউন্টে জমা হয়েছে এবং আপনি নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা জানিয়েছেনও। কিন্তু তারা তার কোন সমাধান দিতে পারেনি। অতএব আপনার জন্য তা ব্যবহার করা বৈধ।

অথবা চাইলে কোন মাদরাসা, মসজিদ, জনকল্যাণ খাত বা গরিব মানুষকে দান করে দিতে পারেন। তবে বিকাশ কর্তৃপক্ষ থেকে যদি পরবর্তীতে এর কোন সমাধান আসে তাহলে উক্ত টাকা ফেরত দিতে হবে বা তারা কেটে নেবে তখন আপনার আপত্তি করার সুযোগ থাকবে না।

❑ গ. বিকাশের ক্যাশ ব্যাক কি সুদের অন্তর্ভূক্ত?

◈ প্রশ্ন-৪: ক্যাশ ব্যাক-এ যে টাকা টা সেটা কি সুদের অন্তর্ভুক্ত? এটা খরচ করা জায়েজ হবে?
উত্তর:
বিকাশ এবং তাদের পার্টনার (যারা বিকাশের সাথে পার্টনারশিপে চুক্তিবদ্ধ) বিভিন্ন ব্র্যান্ড, দোকান বা প্রতিষ্ঠানে বিকাশের মাধ্যমে পে করা হলে তারা তৎক্ষণাৎ নির্ধারিত মূল্য থেকে কিছু টাকা ফেরত দেয়। এটাই ক্যাশ ব্যাক।
যেমন: আপনি যদি বিকাশের সাথে চুক্তিবদ্ধ কোন দোকান বা প্রতিষ্ঠান থেকে ১০০০ টাকার পণ্য ক্রয় করেন এবং সেই টাকাটা বিকাশের মাধ্যমে পে করেন তাহলে আপনি ২০ টাকা ফেরত পাবেন। অর্থাৎ আপনি বিকাশে মাধ্যমে পে করার কারণে উক্ত পণ্যটা পেলেন ৯৮০ টাকায়।
এটা মূলত বিকাশ এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত গ্রাহক আকৃষ্ট করার পদ্ধতি। এতে একদিকে বিকাশের প্রচার-প্রচারণা এবং গ্রাহক বৃদ্ধি হয়, অপরদিকে উক্ত প্রতিষ্ঠানেরও প্রচার-প্রচারণা এবং বিক্রয় বৃদ্ধি পায়।
সুতরাং আপনি যদি ন্যায্য মূল্যে কোন পণ্য ক্রয় করেন বা সেবা গ্রহণ করেন কিন্তু এতে যদি কিছু টাকা ছাড় পাওয়া যায় তাহলে তা গ্রহণ করতে কোন দোষ নেই। কারণ পণ্যের মালিক আপনাকে ছাড় দিয়েছে।
এক্ষেত্রে বিকাশ এবং উক্ত প্রতিষ্ঠানের মাঝে চুক্তি থাকে এবং পরবর্তীতে তারা গ্রাহককে দেওয়া এই ছাড়টা নিজেদের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী ভাগাভাগি করে নেয়-যা তাদের উভয়ের প্রচার প্রসারের খরচ হিসেবে গণ্য করা হয়।
তবে আমরা জানি, বিকাশ ব্র্যাক ব্যাংকের অঙ্গীভূত একটি সুদ ভিত্তিক আর্থিক পরিষেবা। তাই একান্ত জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিকাশ ব্যবহার করা উচিত নয়। কেননা এতে প্রকারান্তরে তাদেরকে সহায়তা করা হয়।
সুতরাং ক্যাশ ব্যাক পাওয়ার আশায় কোন দোকান থেকে পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে বিকাশ ব্যবহার না করাই ভালো। বরং সরাসরি দোকানদারকে নির্দিষ্ট মূল্য পরিশোধ করেই পণ্য ক্রয় করবেন। এটাই সবচেয়ে নিরাপদ। আল্লাহু আলম।

❑ ঘ. বিকাশ বা নগদের মাধ্যমে জাকাতের টাকা পাঠালে খরচের টাকা কি আলাদা দিতে হবে?

◈ প্রশ্ন-৫: বিকাশ, নগদ বা রকেট-এ জাকাতের টাকা পাঠালে টাকা উঠাতে গেলে খরচ কেটে নিবে। সেই খরচও কি জাকাতের মধ্যেই পড়বে? নাকি আলাদা করে উক্ত জাকাতের টাকার খরচ পাঠিয়ে দিতে হবে?
উত্তর:
খরচের টাকা আলাদা দিতে হবে।

❑ ঙ. বিকাশের বার্ড গেম খেলা থেকে প্রাপ্ত পুরস্কারের টাকা কি হালাল?

প্রশ্ন-৬: বিকাশে বার্ড (পাখি) গেম খেলে পুরস্কারের টাকা কি হালাল হবে? গেমের মধ্যে তেমন কোন হারাম আমি দেখি না!
উত্তর:
ব্র্যাক ব্যাংক হল, একটি সুপরিচিত সুদি ব্যাংক। এরই একটি শাখা হল বিকাশ। সুতরাং বিকাশ সরাসরি সুদি ব্যাংকের সাথে রিলেটেড।
অতএব এতে এজেন্ট হিসেবে কাজ করা বা তার কাস্টমার কেয়ারে চাকরি করা সুদি ব্যাংকে চাকরি করার নামান্তর। এটা যেমন হারাম তেমনি তার প্রচার-প্রসার বা এ্যাড দেওয়া, এর জন্য ঘর ভাড়া দেওয়া, অ্যাপ রেফার করে অর্থ উপার্জন করা, বিকাশ ওয়াপ-এ বার্ড নামক গেম খেলে অর্থ উপার্জন ইত্যাদি জায়েজ নাই। কারণ এর মাধ্যমে তাদের সুদি কার্যক্রমকে সমৃদ্ধ ও ব্যাপ্তিতে সহায়তা করা হয়। আর এ কথা অজানা নয় যে, ইসলামের দৃষ্টিতে সুদ ভয়ানক হারাম, ধ্বংসাত্মক কবিরা গুনাহ এবং অভিশাপ যোগ্য কাজ হিসেবে পরিগণিত।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে সুদকে হারাম ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন,
أَحَلَّ اللهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا
“আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল এবং সুদকে হারাম করেছেন।” [বাকারা: ২৭৫]
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

শবে মিরাজ পালন করা বিদআত

 মিরাজ দিবস কিংবা শবে মিরাজ উদযাপন করা রজব মাসের অন্যতম বিদআত। জাহেলরা এই বিদআতকে ইসলামের উপর চাপিয়ে দিয়ে প্রতি বছর তা পালন করে যাচ্ছে! এরা রজব মাসের সাতাইশ তারিখকে শবে মিরাজ পালনের জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছে। এ উপলক্ষে এরা একটি নয় একাধিক বিদআত তৈরি করেছে। যেমন:

– শবে মিরাজ উপলক্ষে মসজিদে মসজিদে একত্রিত হওয়া।
– মসজিদে কিংবা মসজিদের মিনারে মোমবাতি-আগরবাতি জ্বালানো বা আলোকসজ্জা করা।
– এ উপলক্ষে অর্থ অপচয় করা।
– কুরআন তিলাওয়াত বা জিকিরের জন্য একত্রিত হওয়া।
– ‘মিরাজ দিবস’ উপলক্ষে মসজিদে বা বাইরে সভা-সেমিনার আয়োজন করে তাতে মিরাজের ঘটনা বয়ান করা ইত্যাদি।
এগুলো সবই গোমরাহি এবং বাতিল কর্মকাণ্ড। এ প্রসঙ্গে কুরআন-সুন্নাহতে ন্যূনতম কিছু বর্ণিত হয় নি।
তবে এ এভাবে দিবস পালন না করে যে কোন সময় মিরাজের ঘটনা বা শিক্ষা নিয়ে আলোচনা করা দোষণীয় নয়।

♻ ক) কোন রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল?

যে রাতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইসরা ও মিরাজ সংঘটিত হয়েছিল সেটি নির্ধারণের ক্ষেত্রে পূর্ব যুগ থেকেই ওলামাগণের মাঝে মত পার্থক্য রয়েছে। অর্থাৎ এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট কোন হাদীস না থাকায় আলেমগণ বিভিন্ন জন বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন।

▪ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, মিরাজের সময় নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।

কেউ বলেছেন, নবুওয়তের আগে। কিন্তু এটা একটি অপ্রচলিত মত। তবে যদি উদ্দেশ্য হয়, যে সেটা স্বপ্ন মারফত হয়েছিল সেটা ভিন্ন কথা।

অধিকাংশ আলেমগণের মত হল, তা হয়েছিল নবুওয়তের পরে। তবে নবুওয়তের পরে কখন সেটা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।

কেউ বলেছেন: হিজরতের এক বছর আগে। ইবনে সা’দ প্রমুখ এ মতের পক্ষে। ইমাম নওবী রহ. এই মতটির পক্ষে জোর দিয়ে বলেছেন। তবে ইবনে হাজাম এর পক্ষে আরও শক্ত অবস্থান নিয়ে বলেন, এটাই সর্ব সম্মত মত। এই মতের আলোকে বলতে হয় মিরাজ হয়েছিল রবিউল আওয়াল মাসে।

কিন্তু তার কথা অগ্রহণ যোগ্য। কারণ, এটা সর্ব সম্মত মত নয়। বরং এক্ষেত্রে প্রচুর মতবিরোধ রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিশটির অধিক মত পাওয়া যায়।

-ইবনুল জাওযী বলেন, হিজরতের আট মাস আগে মিরাজ হয়েছিল। এ মতানুসারে সেটা ছিল রজব মাসে।

-কেউ বলেন, হিজরতের ছয় মাস আগে। এ মত অনুযায়ী সেটা ছিল রমাযানে। এ পক্ষে মত দেন আবুর রাবী বিন সালেম।

-আরেকটি মত হল, হিজরতের এগার মাস আগে। এ পক্ষে দৃঢ়তার সাথে মত ব্যক্ত করেন, ইবরাহীম আল হারবী। তিনি বলেন, হিজরতের এক বছর আগে রবিউস সানীতে মিরাজ সংঘটিত হয়।

-কারো মতে, হিজরতের এক বছর তিন মাস আগে। ইবনে ফারিস এ মত পোষণ করেন।

এভাবে আরও অনেক মতামত পাওয়া যায়। কোন কোন মতে রবিউল আওয়াল মাসে, কোন মতে শাওয়াল মাসে, কোন মতে রমাযান মাসে, কোন মতে রজব মাসে।

▪ আর তাই শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

“ইবনে রজব বলেন, রজব মাসে বড় বড় ঘটনা ঘটেছে মর্মে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায় কিন্তু কোনটির পক্ষেই সহীহ দলীল নাই। বর্ণিত হয়েছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রজবের প্রথম রাতে ভূমিষ্ঠ হয়েছেন, সাতাইশ বা পঁচিশ তারিখে নবুওয়ত প্রাপ্ত হয়েছেন অথচ এ সব ব্যাপারে কোন সহীহ দলীল পাওয়া যায় না।” [লাতাইফুল মায়ারেফ, ১৬৮ পৃষ্ঠা]

▪ আবু শামাহ বলেন, গল্পকারেরা বলে থাকে যে, ইসরা ও মিরাজের ঘটনা ঘটেছিল রজব মাসে। কিন্তু ইলমে জারহ ওয়াত তাদীল সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ আলেমগণের মতে এটা ডাহা মিথ্যা। (আল বায়িস: ১৭১)

♻ খ) শবে মিরাজ পালন করার বিধান:

সালফে সালেহীনগণ এ মর্মে একমত যে, ইসলামী শরীয়তে অনুমোদিত দিন ছাড়া অন্য কোন দিবস উদযাপন করা বা আনন্দ-উৎসব পালন করা বিদআত। কারণ, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

(( من أحدث في ديننا ما ليس منه فهو رد))

“যে ব্যক্তি দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন নতুন জিনিষ চালু করল তা পরিত্যাজ্য। [বুখারী, অধ্যায়: সন্ধি-চুক্তি।]

আর সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে:

(( من عمل عملاً ليس عليه أمرنا فهو رد ))

“যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার ব্যাপারে আমার নির্দেশ নাই তা প্রত্যাখ্যাত। [মুসলিম, অধ্যায়: বিচার-ফয়সালা]

সুতরাং মিরাজ দিবস অথবা শবে মিরাজ পালন করা দ্বীনের মধ্যে সৃষ্ট বিদআতের অন্তর্ভুক্ত সাহাবীগণ, তাবেঈনগণ বা তাদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী সালফে সালেহীনগণ তা পালন করেন নি। অথচ সকল ভাল কাজে তারা ছিলেন আমাদের চেয়ে অনেক বেশি অগ্রগামী।

▪ ইবনুল কাইয়েম জাওযিয়া রহ. বলেন,

ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, পূর্ববর্তী যুগে এমন কোন মুসলমান পাওয়া যাবে না যে শবে মিরাজকে অন্য কোন রাতের উপর মর্যাদা দিয়েছে। বিশেষ করে শবে কদরের চেয়ে উত্তম মনে করেছে এমন কেউ ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের একনিষ্ঠ অনুগামী তাবেঈনগণ এ রাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোন কিছু করতেন না এমনকি তা আলাদাভাবে স্মরণও করতেন না। যার কারণে জানাও যায় না যে, সে রাতটি কোনটি।

নি:সন্দেহে ইসরা ও মিরাজ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার প্রমাণ বহন করে। কিন্তু এজন্য এর মিরাজের স্থান-কালকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোন ইবাদত করার বৈধ নয়। এমনকি যে হেরা পর্বতে ওহী নাযিলের সূচনা হয়েছিল এবং নবুওয়তের আগে সেখানে তিনি নিয়মিত যেতেন নবুওয়ত লাভের পর মক্কায় অবস্থান কালে তিনি কিংবা তাঁর কোন সাহাবী সেখানে কোন দিন যান নি। তারা ওহী নাজিলের দিনকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোন ইবাদত-বন্দেগী করেন নি বা সেই স্থান বা দিন উপলক্ষে বিশেষ কিছুই করেন নি।

যারা এ জাতীয় দিন বা সময়ে বিশেষ কিছু ইবাদত করতে চায় তারা ঐ আহলে কিতাবদের মত যারা ঈসা আলাইহিস সালাম এর জন্ম দিবস (Chisthomas) বা তাদের দীক্ষাদান অনুষ্ঠান (Baptism) পালন ইত্যাদি পালন করে।

💠 উমর ইবনুল খাত্তাব রা. দেখলেন, কিছু লোক একটা জায়গায় নামাজ পড়ার জন্য হুড়াহুড়ি করছে। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এটা কী? তারা বলল, এখানে আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাজ পড়েছিলেন। তিনি বললেন, তোমরা কি তোমাদের নবীদের স্মৃতি স্থলগুলোকে সাজদার স্থান বানাতে চাও? তোমাদের পূর্ববর্তী জমানার লোকেরা এ সব করতে গিয়েই ধ্বংস হয়ে গেছে। এখানে এসে যদি তোমাদের কারো নামাযের সময় হয় তবে সে যেন নামাজ পড়ে অন্যথায় সামনে অগ্রসর হয়। [মুসান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, ২য় খণ্ড, ৩৭৬, ৩৭৭]

▪ ইবনুল হাজ্জ বলেন,

“রজব মাসে যে সকল বিদআত আবিষ্কৃত হয়েছে সবগুলোর মধ্যে সাতাইশ তারিখের লাইলাতুল মিরাজের রাত অন্যতম।”[আল মাদখাল, ১ম খণ্ড, ২৯৪পৃষ্ঠা]

পরিশেষে বলব, যেহেতু রজব মাসে নফল নামায, রোযা করা, মসজিদ, ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট দোকান-পাট ইত্যাদি সাজানো, সেগুলোকে আলোক সজ্জা করা কিংবা ছাব্বিশ তারিখের দিবাগত রাত তথা সাতাইশে রজবকে শবে মিরাজ নির্ধারণ করে তাতে রাত জেগে ইবাদত করার ব্যাপারে কোন গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নাই। তাই আমাদের কর্তব্য হবে সেগুলো থেকে দূরে থাকা। অন্যথায় আমরা বিদআত করার অপরাধে আল্লাহ তায়ালার দরবারে গুনাহগার হিসেবে বিবেচিত হব। অবশ্য কোন ব্যক্তি যদি প্রতি মাসে কিছু নফল রোযা রাখে সে এমাসেও সেই ধারাবাহিকতা অনুযায়ী এ মাসে রোযা রাখতে পারে, শেষ রাতে উঠে যদি নফল নামাযের অভ্যাস থাকে তবে তবে এ মাসের রাতগুলিতেও নামাজ পড়তে পারে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সকল অবস্থায় তাওহীদ ও সুন্নাহর উপর আমল করার তাওফিক দান করুন এবং শিরক ও বিদয়াত থেকে হেফাজত করুন। আমীন।
▬▬▬◄❖►▬▬▬
উৎস: আল বিদা’ আল হাওলিয়াহ।
লেখক: শাইখ আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আযীয আত তুওয়াইজিরী।
অনুবাদ ও সংক্ষেপায়ন: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানী।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডন্সে সেন্টার, সৌদি আরব।

ইসলামি শরিয়তে শবে মেরাজ উপলক্ষে বিশেষ নামাজ-রোজা ও ইবাদত-বন্দেগির ভিত্তি কতটুকু

 প্রশ্ন: ‘শবে মেরাজ’ এর জন্য নির্দিষ্ট কোনও নামাজ-রোজা আছে কি? এ উপলক্ষে আমাদের সমাজে যে সব কার্যক্রম করা হয় শরিয়তে সেগুলোর ভিত্তি কতটুকু?

উত্তর: নিম্নে এ বিষয়ে অতিসংক্ষপে আলোকপাত করা হল। তৎসঙ্গে এ সময়ের সাড়া জাগানো কয়েকজন বাংলাভাষী শাইখদের বক্তব্যও উপস্থাপন করা হল।
শবে মেরাজ উপলক্ষে বিশেষ কোন নামাজ, রোজা, মিলাদ মাহফিল, আলোচনা সভা, লোকজন জমায়েত, ভোজ অনুষ্ঠান, কুরআন তিলাওয়াত, কুরআন খতম, শব বেদারি (নিশী জাগরণ), দুআ মাহফিল, হালকায়ে জিকির, নাতে রাসূল ও ইসলামি গজল সন্ধ্যা, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, মসজিদ ইত্যাদি আলোকসজ্জা করা ইত্যাদি কোন কিছুই করা শরিয়ত সম্মত নয়। কারণ হাদিসে এ মর্মে কোন কিছুই আসেনি। সাহাবায়ে কেরাম কখনো এ উপলক্ষে কোনও আয়োজন-অনুষ্ঠান, রাত জেগে ইবাদত-বন্দেগি ইত্যাদি করেছেন বলে হাদিসের কিতাবগুলো প্রমাণ করছে না।
➧ ইবনুল কাইয়েম জাওযিয়া রহ. বলেন,
قال شيخ الإسلام ابن تيمية – رحمه الله -: ولا يعرف عن أحد من المسلمين أن جعل لليلة الإسراء فضيلة على غيرها، لاسيما على ليلة القدر، ولا كان الصحابة والتابعون لهم بإحسان يقصدون تخصيص ليلة الإسراء بأمر من الأمور ولا يذكرونها، ولهذا لا يعرف أي ليلة كانت
“ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, পূর্ববর্তী যুগে এমন কোন মুসলিম পাওয়া যাবে না যে, শবে মেরাজকে অন্য কোন রাতের উপর মর্যাদা দিয়েছে। বিশেষ করে শবে কদরের চেয়ে উত্তম মনে করেছে এমন কেউ ছিল না। সাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের একনিষ্ঠ অনুগামী তাবেঈনগণ এ রাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোন কিছু করতেন না এমনকি তা আলাদাভাবে স্মরণও করতেন না। যার কারণে জানাও যায় না যে, সে রাতটি কোনটি।” [উৎস: আল বিদা’ আল হাওলিয়া পৃষ্ঠা ২৭৪]

➧ ইবনুল হাজ্জ বলেন,
ومن البدع التي أحدثوها فيه أعني في شهر رجب ليلة السابع والعشرين منه التي هي ليلة المعراج
“রজব মাসে যে সকল বিদআত আবিষ্কৃত হয়েছে সগুলোর মধ্যে সাতাইশ তারিখের লাইলাতুল মেরাজ (শবে মেরাজ) অন্যতম।” [আল মাদখাল, ১ম খণ্ড, ২৯৪পৃষ্ঠা]

◍ নিচের দেওয়া লিংকগুলোতে থেকে শাইখদের আলোচনা শুনুন:

◈ শবে মেরাজ পালন করা কেন বিদআত? শাইখ মতিউর রহমান মাদানি
https://youtu.be/6mJAZWFne-M

◈ প্রশ্ন: শবে মেরাজ উপলক্ষে কি রোজা রাখা যাবে? শায়খ মতিউর রহমান মাদানি
https://www.youtube.com/watch?v=NgxKEHQv4v0

◈ শবে মেরাজ শবে বরাতের বিশেষ কোন নামাজ আছে কি?‌ শাইখ ড. আবু বকর মোহাম্মাদ জাকারিয়া
https://www.youtube.com/watch?v=fqMNpyZdscQ

◈ শবে বরাতের নামাজ ও রোজা রাখলে অসুবিধা কি? শাইখ ড. আবু বকর মোহাম্মাদ জাকারিয়া
https://www.youtube.com/watch?v=17IYVX26a5o

◈ শবে মেরাজ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো কি? ড. ইমাম হোসেন।
https://www.youtube.com/watch?v=KMi3BIX3p8E

◈ শবে মিরাজ নিয়ে প্রচলিত কিছু জাল হাদিস: ড. ইমাম হোসেন।
https://www.youtube.com/watch?v=h6FuimpwwpI

মোটকথা, আমাদের দেশে কথিত শবে মেরাজ উপলক্ষে ঘটা করে যে সব কার্যক্রম করা হয় তা দীনের মধ্যে নবসৃষ্ট বিদআত। আর বিদআত মানেই ভ্রষ্টতা। ভ্রষ্টতা মানেই জাহান্নামের পথ। সুতরাং প্রতিটি মুসলিমের জন্য দীনের মধ্যে নব আবিস্কৃত সকল বিদআতি কার্যক্রম থেকে দূরে থাকা ফরজ। আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

December 30, 2023

সালাত শুরু করার পূর্বে সশব্দে নিয়ত ও জায়নামাজের দুআ পাঠের বিদআত

 সালাত শুরু করার পূর্বে সশব্দে ‘নিয়ত’ ও ‘জায়নামাজের দুআ’ পাঠের বিদআত: যে বিদআতে নিমজ্জিত অধিকাংশ নামাযী

▬▬▬◉◯◉▬▬▬
প্রশ্ন: সালাতে দাঁড়িয়ে জায়নামাজের দুআ “ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া…” ও নিয়ত “নাওয়াইতো আন…” পাঠ করার বিধান কি?

উত্তর: সালাতে দাঁড়িয়ে মুখে উচ্চারণ করে প্রচলিত গদ বাধা নিয়ত পাঠ করা বিদআত। চাই আরবিতে “নাওয়াইতু আন উসাল্লিয়া লিল্লাহি…” পাঠ করা হোক বা বাংলায় তার অনুবাদ পাঠ করা হোক। অনুরূপভাবে তথাকথিত ‘জায়নামাজের দুআ’ হিসেবে “ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া” অথবা আঊযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম, দরুদ শরিফ ইত্যাদি পাঠ করাও বিদআত। কেননা সালাত শুরু করার পূর্বে বিশেষ কোন দুআ, তাসবীহ বা অন্য কিছু পাঠ করার ব্যাপারে কুরআন-সুন্নায় কোনো নির্দেশনা নেই। সাহাবিগণও কখনো এমন আমল করেন নি। এমন কি চার মাজহাবের সম্মানিত ইমামগণ তথা ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেঈ, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল প্রমুখ মনিষীগণ কেউই তা পড়ার কথা বলেন নি।

◉◉ সশব্দে নিয়ত পাঠ করার ব্যাপারে বিশ্বখ্যাত আলেমদের বক্তব্য:

নিম্নে এ প্রসঙ্গে কতিপয় আলেমের বক্তব্য তুলে ধরা হল:

◖ক. মোল্লা আলী কারী হানাফি রহ. বলেন,

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ত্রিশ হাজার ওয়াক্ত নামায আদায় করেছেন। তথাপি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এই কথা বর্ণিত নেই যে, আমি অমুক অমুক ওয়াক্ত নামাযের নিয়ত করছি। সুতরাং মুখে নিয়ত উচ্চারণ না করাটাই সুন্নাত। জেনে রাখুন, শব্দ উচ্চারণ করে মুখে নিয়ত করা জায়েজ নয়। কারণ এটা বিদআত। সুতরাং যে কাজ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেন নি তা যে করে সে বিদআতি। [দেখুনঃ মিরকাত, ১/৩৬-৩৭]

◖খ. আল্লামা ইবনুল হুমাম হানাফি রহ. বলেন:

হাদিসের বিশেষজ্ঞরা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহীহ ও যঈফ কোন সনদেও এই কথা প্রমাণিত নেই যে, তিনি নামায আরম্ভ করার সময় বলতেন যে, আমি এই এই নামায আদায় করেছি। কোন সাহাবী এবং তাবেঈ থেকেও প্রমাণিত নেই। বরং এই কথা বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামায আরম্ভের সময় কেবল শুধু তাকবীর বলতেন। তাই মুখে নিয়ত পাঠ করা বিদআত। [ফাতহুল কাদীর, ১/৩৮৬, কাবীরী, পৃষ্ঠা ২৫২]
.
◖ গ. হাফিয ইবনুল ক্বাইয়্যিম রহ. বলেনঃ

মুখে নিয়ত পাঠ করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈ কারো হতেই কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। মুখে পাঠের এই পদ্ধতি শয়তানের একটি কুমন্ত্রণা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন নামাযে দাঁড়াতেন তখন শুধু “আল্লাহু আকবার” বলতেন। আর আগে কিছু বলতেন না। সুতরাং মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত পাঠ করা বিদআত। চার ইমামও এরূপ নিয়তনামা পড়াকে পছন্দ করেন নি। [ইগাসাতুল লাহফান, ১/১৩৬ ।। যাদুল মাআদ, ১/৫১]
.
◖ঘ. সৌদি আরবের সর্বোচ্চ উলামা পরিষদের সদস্য মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল উসাইমীন রাহ. বলেনঃ

“আরবি নিয়ত শব্দের অর্থ হল মনে ইচ্ছা পোষণ করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে এটা (মুখে নিয়ত উচ্চারণ করা) প্রমাণিত নেই। না প্রমাণিত আছে কোন সাহাবী এবং তাবেঈ থেকেও। তাই মুখে নিয়ত পাঠ করা বিদআত।” [ফাতাওয়া আরকানুল ইসলাম, ৩৩৯-৩৪০ পৃষ্ঠা]
(উপরোল্লিখিত আলেমদের বক্তব্যগুলো উমর ইবনুল খাত্তাব এর লেখা থেকে সংকলন করা হয়েছে।)

এছাড়াও এ প্রসঙ্গে বহু বিশ্ববরেণ্য আলেমদের বক্তব্য রয়েছে।

অত্র আলোচনা থেকে প্রমাণিত হল যে, মুখে নিয়ত উচ্চারণ করা দ্বীনের মধ্যে এটি নব আবিষ্কৃত বা নব সংযোজিত বিদআত। সুতরাং তা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। কেননা প্রতিটি বিদআতই গোমরাহি। আর গোমরাহির পরিণতি জাহান্নাম।

আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন। আমীন।

◉◉ সালাত শুরু করার সঠিক পদ্ধতি:

সালাত শুরু করার সঠিক পদ্ধতি হল, প্রথমে কোন সালাত পড়া হবে তা অন্তরে স্থির করা। (যেমন: ফরয, সুন্নত, নফল, কাযা ইত্যাদি) অত:পর মহান আল্লাহর সীমাহীন সম্মান-মর্যাদার কথা স্মরণ করে অন্তরে ভয়ভীতি, বিনয়-নম্রতা ও একাগ্রতা সহকারে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে সালাত শুরু করা।
তারপর হাদিসে বর্ণিত সানা বা দুআউল ইস্তিফতাহ (সালাত শুরুর দুআ) এর একাধিক দুআ থেকে যে কোনো একটি দুআ পাঠ করা।
তারপর “আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়ত্বানির রাজীম” পাঠ করার পর “বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম” সহকারে সূরা ফাতিহা পাঠ করা। এরপর যথারীতি সালাত শেষ করা।

◉◉ নিয়ত সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কথা:

মনে রাখতে হবে, নিয়ত ছাড়া কোন ইবাদতই আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় হয় না। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ، وَإِنَّمَا لِكُلِّ امْرِئٍ مَا نَوَى
“আমল সমূহ নিয়তের (ইচ্ছার) উপর নির্ভরশীল। আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যা সে নিয়ত করবে।” [সহিহ বুখারির প্রথম হাদিস]

এ হাদিসের আলোকে সালাত, সিয়াম, হজ, যাকাত, কুরবানি সহ যে কোন ইবাদতের শুরুতে নিয়তের গুরুত্ব ও অপরিহার্যতা প্রমাণিত হয়। কিন্তু তা হবে অন্তরে। কেননা নিয়তের নিয়ত আরবি শব্দ। এর বাংলা অর্থ: ইচ্ছা করা, মনস্থ করা, এরাদা করা, সংকল্প করা। [মুনজিদ, ৮৪৯/ ফতহুল বারী, ১/১৭]

ইবনুল কাইয়েম রাহ. বলেনঃ “নিয়ত হচ্ছে, কোন কিছু করার ইচ্ছা করা এবং সংকল্প করা। উহার স্থান হচ্ছে অন্তর জবানের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। এ কারণে না নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আর নাা কোন সাহাবী হতে নিয়তের শব্দ বর্ণিত হয়েছে”। [ইগাসাতুল্ লাহ্ফান, ১/২১৪]

সুতরাং সালাত শুরু করার পূর্বে কোন সালাত, কয় রাকআত, তা ফরয, সুন্নত না কি নফল এ বিষয়গুলো অন্তরে জাগ্রত থাকলে তাই নিয়তের জন্য যথেষ্ট।
আসুন, আমরা সুন্নাত অনুযায়ী সালাত আদায় করি এবং বিদআত বর্জন করি। সুন্নতে রয়েছে মুক্তি আর বিদআতে রয়েছে ধ্বংস। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমিন।
▬▬▬◉◯◉▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
জুবাইল, সৌদি আরব।

December 16, 2023

গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চ আওয়াজে মাইক বাজিয়ে ওয়াজ শরিয়ত এবং আইনগত দৃষ্টিকোণ

 প্রশ্ন: গভীর রাত পর্যন্ত উচ্চ আওয়াজে মাইক বাজিয়ে ওয়াজ করা কি উচিৎ?

উত্তর: ওয়াজ মাহফিল বা সভা-সমাবেশে ব্যাপক পরিমাণে জনসমাগম হলে সভাস্থলে মাইক ব্যবহার করা জরুরি। কিন্তু আমাদের দেশে ওয়াজ মাহফিলগুলোতে গভীর রাত পর্যন্ত যেভাবে চতুর্দিকে মাইক লাগিয়ে উচ্চ আওয়াজে ওয়াজ ও বক্তৃতা প্রচার করা হয় তা উচিৎ নয়। তা ইসলামি শরিয়ত পরিপন্থী হওয়ার পাশাপাশি এতে নানাবিধ ক্ষয়-ক্ষতির কারণ রয়েছে (যেগুলো নিম্নে পেশ করা হয়েছে) বরং তা এতটুকু আওয়াজে হওয়া উচিৎ যেন, মাহফিলে উপস্থিত শ্রোতারা শুনতে পায়। এটাই যৌক্তিক এবং ইসলাম সম্মত।

সর্বোচ্চ রাত দশটা পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখা যেতে পারে। কারণ তা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য এবং দেশেরও আইন সম্মত (নিম্নে এ সংক্রান্ত আইন পেশ করা হয়েছে)।

সুতরাং ওয়াজ মাহফিলের আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য, গভীর রাত পর্যন্ত ওয়াজ মাহফিল অব্যাহত না রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় মাইক ব্যবহার বন্ধ করা। কেননা এতে নানা ধরণের ক্ষতি হয়। যেমন:

◍ ১. গভীর রাত পর্যন্ত ওয়াজ শুনে বাড়িতে ফিরে মানুষ ঘুমিয়ে পড়ে। ফলে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ যথাসময়ে ফজরের সালাত পড়তে পারে না।
◍ ২. বাড়িতে পর্যাপ্ত লোকজনের অনুপস্থিতির কারণে অনেক সময় বাড়ির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং চুরি-ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
◍ ৩. এটি অনস্বীকার্য নয় যে, অনেক যুবক-যুবতী ওয়াজের নামে রাত-বিরেতে বাড়ি থেকে বের হয়ে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন এবং পাপাচারের পথে ধাবিত হয়। এ সংক্রান্ত বহু ঘটনা যার সাক্ষ্য।
◍ ৪. রাতের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে ওয়াজ মাহফিলে ব্যবহৃত মাইকের উচ্চ আওয়াজ আশে-পাশের বহু মানুষের আরাম ও ঘুম কেড়ে নেয়। অনেক ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত মানুষ, ঘুমন্ত ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী, অসুস্থ, বৃদ্ধ, শিশু, গর্ভবতী নারী, বিভিন্ন ওজরের কারণে বাড়িতে অবস্থান কারী লোকজন, পরীক্ষার্থী, অধ্যয়নরত, গবেষক, নামাজ, দুআ ও জিকিরে নিমগ্ন ব্যক্তিদের ঘুম ও কার্যক্রমে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি করে এবং অন্য ধর্মের মানুষেরও ঘুমের মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়। আর ইসলামে এভাবে মানুষকে কষ্ট দেয়া অনুমোদিত নয়।

◍ ৫. এভাবে মানুষকে বাধ্য করে ওয়াজ শুনানোর কারণে হয়ত কারো মনে ইসলামের প্রতি বিরক্তি ও বিরূপ মনোভাবও সৃষ্টি হতে পারে- যার ক্ষতির পরিমাণ অপরিসীম।

ওয়াজ মাহফিল তো পরের কথা বরং হাদিসে পার্শ্ববর্তী ব্যক্তির সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, দুআ-তাসবিহ ইত্যাদি ইবাদতে যেন বিঘ্ন সৃষ্টি না হয় সে জন্য উচ্চ আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত করতে নিষেধ করা হয়েছে। যেমন:
عن أبي سعيدٍ قالَ اعتَكفَ رسولُ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ عليْهِ وسلَّمَ في المسجدِ فسمِعَهم يجْهَرونَ بالقراءةِ فَكشفَ السِّترَ وقالَ ألا إنَّ كلَّكم مُناجٍ ربَّهُ فلا يؤذِيَنَّ بعضُكم بعضًا ولا يرفعْ بعضُكم على بعضٍ في القراءةِ أو قالَ في الصَّلاةِ
আবু সাঈদ খুদরী রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে (মসজিদে নববী) ইতিকাফ করছিলেন। এমন সময় তিনি শুনতে পেলেন, লোকেরা উঁচু স্বরে কুরআন তিলাওয়াত করছে। তখন তিনি পর্দার কাপড় সরিয়ে তাদের লক্ষ্য করে বললেন, “মনে রাখবে, তোমাদের সবাই তার পালনকর্তার সঙ্গে একান্ত নিভৃত আলাপচারিতায় নিমগ্ন রয়েছ। অতএব তোমাদের একজন অপরজনকে কষ্ট দিবে না এবং তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে (অথবা তিনি বলেছেন: সালাতের ক্ষেত্রে) একজন অপরজনের উপর আওয়াজ উঁচু করবে না।”
[সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ১৩৩২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদিস: ১১৬৫; মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১১৮৯৬; মুস্তাদরাকে হাকেম ১/৩১০]

আবুল ওয়ালিদ আল বাজি বলেন, (উক্ত হাদিসে উচ্চ আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত করতে নিষেধ করা হয়েছে এ জন্য যে,) لأن في ذلك إيذاء بعضهم لبعض “এতে পরস্পরকে কষ্ট দেওয়া হয়।” [আল মুন্তাকা শরহুল মুওয়াত্তা]

قال الحافظ ابن رجب في فتح الباري: ما لا حاجة إلى الجهر فيه، إن كان فيه أذى لغيره ممن يشتغل بالطاعات، كمن يصلي لنفسه ويجهر بقراءته، حتى يغلط من يقرأ إلى جانبه أن يصلي، فإنه منهي عنه.

◍ ৬. সর্বোপরি এভাবে গভীর রাত পর্যন্ত ওয়াজ করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফদের রীতি ছিল না।

ওমর রা.-এর যুগে জনৈক ব্যক্তি মসজিদ-ই-নববীতে এসে প্রতিদিন বিকট আওয়াজে ওয়াজ শুরু করেন। এতে পাশেই হুজরায় অবস্থানরত হজরত আয়েশা রা.-এর কাজে ব্যাঘাত হতো। তাই তিনি ওমর রা.-কে বিষয়টি অবহিত করলে তিনি ওই লোককে নিষেধ করে দেন। লোকটি কিছুদিন পর আবার ওয়াজ শুরু করলে তিনি তাকে শাস্তি দেন। [আখবারু মদিনা, ওমর ইবনে শাব্বাহ : ১/১৫]

উল্লেখ্য যে, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের ক্ষেত্রেও একই কথা। একইভাবে আমাদের সমাজে গায়ে হলুদ, বিয়ে, বৌভাত অনুষ্ঠান, মিলাদ মাহফিল, ওরস মাহফিল, শবিনা খতম, কনসার্ট, ডিজে পার্টি, যাত্রা পার্টি, হিন্দুদের পূজা ইত্যাদিতে যেভাবে মাইক ও হাই ভলিউমে মিউজিক বা গান চালানো হয় তা এক দিকে আল্লাহর নাফরমানি, প্রকাশ্য পাপাচার অন্য দিকে শব্দ দূষণ ও চারপাশের মানুষদেরকে কষ্ট দেয়ার নামান্তর। এগুলো সভ্য সমাজে চলতে পারে না। তবে আজানের বিষয়টি ভিন্ন। কারণ তা খুব অল্প সময়ের জন্য হয় এবং এটি আল্লাহর বিধান।

সুতরাং অপ্রয়োজনীয় মাইক ব্যবহারে সমাজ সচেতনতা সৃষ্টি করার পাশাপাশি আইনের প্রয়োগ হওয়া উচিত।

◆ উচ্চ আওয়াজে মাইক ব্যবহার এবং শব্দ দূষণ বিষয়ে আইন কী বলে?

বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫-এর ক্ষমতাবলে শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ প্রণয়ন করা হয়৷ বিধিমালার আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা চিহ্নিত করে শব্দের মান-মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে৷ আইন অমান্য করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য এক মাস কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড এবং পরবর্তী অপরাধের জন্য ছয় মাস কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে৷ কিন্তু বাস্তবে এই আইনের তেমন প্রয়োগ দেখা যায় না৷ ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মারুফ হাসান জানান, ‘‘আইনে ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ আরো কিছু বিষয়ে ব্যতিক্রম আছে৷ তবে সর্বোচ্চ পাঁচ ঘণ্টা এবং রাত ১০টার পর কোনোভাবেই উচ্চ শব্দের কোনও অনুষ্ঠান করা যাবে না৷ পুলিশের স্ব প্রণোদিত হয়ে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অধিকার আছে৷ আর পাবলিক প্লেসে অনুষ্ঠানের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগাম অনুমতি নেয়ার বিধান রয়েছে৷” [উৎস: dw]
আল্লাহ আমাদেরকে নববী সুন্নতের আলোকে আমাদের জীবনের প্রতিটি কর্ম বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন এবং সব ধরণের অকল্যাণের হাত থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

মৃত্যুর পূর্বে কাউকে জানাজা বা কাফন-দাফনে অংশ গ্রহণ করতে নিষেধ করা এবং এমন‌ ওসিয়ত পালন করার বিধান

 প্রশ্ন: কোন ব্যক্তি যদি মৃত্যুর পূর্বে কাউকে তার জানাজা বা কাফন-দাফনে অংশগ্রহণ করতে বারণ করে যায় তাহলে সে ক্ষেত্রে‌ ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে কী করণীয়?

উত্তর: কোন ব্যক্তি মারা যাওয়ার পূর্বে যদি তার উত্তরাধিকারী বা পরিবার-পরিজনকে ওসিয়ত (অন্তিম নির্দেশনা) দিয়ে যায় যে, উমুক ব্যক্তি যেন তার জানাজায় না আসে বা তার কাফন-দাফনে অংশগ্রহণ না করে বা কবরে মাটি না দেয় তাহলে তা বাস্তবায়ন করা জরুরি নয়। বরং এ ধরনের ওসিয়ত করাই হারাম। কেননা এটি সম্পর্কচ্ছেদ, শত্রুতা ও বিদ্বেষ মূলক ওসিয়ত। আর মৃত ব্যক্তির হারাম ওসিয়ত বাস্তবায়ন করা জায়েজ নাই। অর্থাৎ এই ধরনের ওসিয়ত করা যেমন হারাম তেমনি তা বাস্তবায়ন করাও হারাম।

▪️ইবনে রুশদ (স্পেনের বিখ্যাত ফকিহ। মৃত্যু: ১১৯৮ খ্রিষ্টাব্দ) বলেন,

” لا يلزم أن يُنفَّذ من الوصايا إلا ما فيه قربة وبر”
“যে ওসিয়তে আল্লাহর নৈকট্য এবং সৎকর্ম আছে তাছাড়া অন্য কোনো ওসিয়ত বাস্তবায়ন করা অবশ্যক নয়।” [আল বায়ানু ওয়াত তাহসিল ২/২৮৭]
▪️কুয়েতের ফিকহ বিশ্বকোষ-এ বলা হয়েছে যে, ওসিয়ত বৈধ হওয়ার একটি শর্ত হলো,

أَلا يَكُونَ الْمُوصَى بِهِ مَعْصِيَةً أَوْ مُحَرَّمًا شَرْعًا
“ওসিয়ত কৃত বিষয়টি আল্লাহর নাফরমানি মূলক বা শরিয়তের দৃষ্টিতে হারাম না হওয়া।” [আল মাওসুয়াতুল‌ ফিকহিয়া ৪৩/২৫৮]

আরো বলা হয়েছে,

الْقَصْدُ مِنَ الْوَصِيَّةِ تَدَارُكُ مَا فَاتَ فِي حَالِ الْحَيَاةِ مِنَ الإِحْسَانِ ، فَلا يَجُوزُ أَنْ يَكُونَ الْمُوصَى بِهِ مَعْصِيَةً ” انتهى .
“ওসিয়ত দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, জীবনে যে জনকল্যাণমূলক বা ভালো কাজ করা হয়নি তা পূরণ করা। তাই আল্লাহর নাফরমানি মূলক কাজের অসিয়ত করা জায়েজ নেই।”

অর্থাৎ অসিয়ত হলো, একজন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি বা অন্যান্য জিনিসপত্র কীভাবে ব্যবহার করা হবে সে সম্পর্কে উত্তরাধিকারী বা আত্মীয়-স্বজনের নিকট তার ইচ্ছা প্রকাশ করা। আর অসিয়তের উদ্দেশ্য হলো, ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার পক্ষ থেকে জনকল্যাণমূলক বা সৎকর্ম সম্পাদন করা। তাই এমন কোনো কাজের অসিয়ত করা যাবে না যা ইসলামে নিষিদ্ধ।
উদাহরণস্বরূপ: একজন ব্যক্তি অসিয়ত করতে পারেন যে, তার সম্পত্তি অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করা হবে কিংবা মসজিদ, মাদরাসা বা এতিমখানায় দান করা হবে ইত্যাদি। কিন্তু তিনি অসিয়ত করতে পারেন না যে, তার সম্পত্তি দিয়ে মন্দ কাজ করা হবে।
মোটকথা, কারো প্রতি দুঃখ, কষ্ট বা রাগ ক্ষোভের কারণে মৃত্যুর পূর্বে তাকে তার জানাজা বা কাফন-দাফনে অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করা জায়েজ নাই। কেউ তা করে গেলেও তা পালন করা আবশ্যক নয়।
🔸তবে এখানে যে বিষয়ে‌ আমাদের সতর্ক হওয়া জরুরি তা হলো, একজন মানুষের সাথে কোন ধরনের মনোমালিন্য বা ঝগড়াঝাঁটি হয়ে থাকলে বিষয়টি যথাসম্ভব দ্রুত নিষ্পত্তি করে নেওয়া, কোন মানসিক দুঃখ, কষ্ট, রাগ বা ক্ষোভ থেকে থাকলে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া বা যেকোনো ভাবে তার সুরাহা করা আবশ্যক। অনুরূপভাবে মানুষর প্রাপ্য হক আদায়ের ব্যাপারে সবোর্চ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কেননা আমরা কেউ জানি না, কার দুয়ারে কখন মৃত্যু দূত এসে করাঘাত করবে। তখন হয়তো কারো প্রতি বুক ভরা ক্ষোভ বা কষ্ট দিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যেতে হবে। এমন প্রেক্ষাপটেই সাধারণত মানুষ মৃত্যুর পূর্বে কাউকে তার কাফন-কাফন বা জানাজায় অংশগ্রহণ করতে নিষেধ করে যায়। তাই এমন প্রেক্ষাপট যেন‌ তৈরি না‌ হয় সে ব্যাপারে আমাদের সকলের সচেতন থাকা ও সতর্কতা অবলম্বন করা অপরিহার্য। আল্লাহ হেফাজত করুন।‌ আমিন। আল্লাহু আলাম।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate