March 14, 2023

আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের শানে ইশক, মোহাব্বত এবং প্রেম শব্দের ব্যবহার

 প্রশ্ন: বলা হয়, “দুনিয়ার বেশি গভীরে প্রবেশ করো না; বের হতে পারবে না। দুনিয়ার মোহে পড়ে গেলে আল্লাহ প্রেমের স্বাদ পাবে না।” প্রশ্ন হল, প্রেম শব্দটি কি আল্লাহর সাথে ব্যবহার করা জায়েজ আছে? তৎসঙ্গে এই ক্ষেত্রে ইশক এবং মহাব্বত শব্দের ব্যবহারের বিধান জানতে চাই।

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর:
❑ ১. ইশক/এশক শব্দের ব্যবহার:

আল্লাহ এবং তাঁর রাসুলের শানে ‌ইশক/এশক (عشق) শব্দ ব্যবহার করা জায়েজ নেই। কারণ বাড়াবাড়ি পর্যায়ের প্রবল আকর্ষণ ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা যুক্ত ভালোবাসাকে ‘ইশক’ বলা হয়।
ইবনুল মনজুর রহ. ‘লিসানুল আরব’ শীর্ষক আরবি অভিধানে বলেন,
العِشْقُ فرط الحب وقيل هو عُجْب المحب بالمحبوب يكون في عَفافٍ الحُبّ ودَعارته
“বাড়াবাড়ি পর্যায়ের ভালবাসাকে ইশক বলা হয়।” আরও বলা হয়েছে, ইশক হলো, প্রেয়সীর প্রতি প্রেমিকের অতিমাত্রায় আকৃষ্ট হওয়া-চাই প্রেম-ভালবাসা পবিত্র হোক অথবা অপবিত্র।’
আরও বলা হয়েছে,
عشِق الشَّيءَ :هوِيه وتعلّق قلبُه به وأحبَّه حبًّا شديدًا
“ইশক হলো, কোনও কিছুর প্রতি আবেগ সহকারে অন্তর লেগে থাকা এবং তাকে তীব্রভাবে ভালবাসা।” [kalimmat]

এ স্তরের ভালবাসা আল্লাহ তাআলার
‌ও‌ তাঁর রসূলের জন্য সাব্যস্ত করা বৈধ নয়। তাই বান্দার অন্তরে আল্লাহর প্রতি যে ভালোবাসা থাকে, তাকেও ইশক নাম দেওয়াও যাবে না।

এ শব্দটি কুরআন, হাদিস এবং সাহাবিদের মুখে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশার্থে এই শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি।

মূলত: ভ্রান্ত সুফি পন্থী ও বিদআতিরা আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের শানে এই শব্দটি ব্যবহার করে থাকে।‌ যেমন: তারা বলে থাকে, আশেকে রসুল, চরমোনাই পীর মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ এছহাক রচিত ‘আশেক-মাশুক বা এস্কে এলাহী’ নামে একটি বই রয়েছে। আমাদের সমাজে অনেক মানুষের নাম দেখা যায় ‘আশেকে এলাহি/আশেকে খোদা’। (এমন নাম রাখা নাজায়েজ।)

ইবনে তাইমিয়া ও ইবনুল কায়েম প্রমুখ মুহাক্বিক আলিমগণ এ ক্ষেত্রে উক্ত শব্দটি ব্যবহারের বিরোধিতা করেছেন। [মাদারিজুদ সালিকিন]

ইমাম ইবনুল কাইয়েম বলেন,

ولما كانت المحبة جنسا تحته أنواع متفاوتة في القدر والوصف، كان أغلب ما يذكر فيها في حق الله تعالى ما يختص به ويليق به، كالعبادة والإنابة والإخبات، ولهذا لا يذكر فيها العشق والغرام والصبابة والشغف والهوى.. وقد يذكر لفظ المحبة كقوله تعالى: يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَه [المائدة: 54]

“মোহাব্বত (ভালোবাসা) শব্দটি হল, একটি জাতিবাচক বিশেষ্য। এর অধীনে পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে নানা ধরণের ভিন্নতা রয়েছে। এই জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে আল্লাহর শানে তার জন্য যা নির্ধারিত এবং উপযুক্ত তাই ব্যবহৃত হয়। যেমন: দাসত্ব করা, অভিমুখী হওয়া, নত হওয়া। এ জন্য আল্লাহর শানে ইশক (চরম পর্যায়ের ভালবাসা), আসক্তি, তীব্র আকাঙ্ক্ষা, মোহ, কামনা-বাসনা…উল্লেখ করা হয় না। তবে (আল্লাহ শানে) কখনো মোহাব্বত (ভালবাসা) শব্দটিও উল্লেখ করা হয়। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন, يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ “তাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসবে।” (সূরা মায়িদা: ৫৪) [ইমাম ইবনুল কাইয়েম-ইগাসাতুল লাহফান]

❑ ২. মোহাব্বত (ভালবাসা) শব্দের ব্যবহার:

কুরআন-সুন্নায় মোহব্বত (ভালোবাসা) শব্দটি বারবার ব্যবহৃত হয়েছে। কখনো বান্দার পক্ষ থেকে আল্লাহর প্রতি, কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার প্রতি, আবার কখনো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে।

➧ কয়েকটি উদাহরণ:

◈ মহান আল্লাহ বলেন,

مِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّه
“আর কোন লোক এমনও রয়েছে, যারা অন্যান্যকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করে এবং তাদের প্রতি তেমনি ভালবাসা পোষণ করে, যেমন আল্লাহর প্রতি ভালবাসা হয়ে থাকে। কিন্তু যারা আল্লাহর প্রতি ইমানদার তাদের ভালবাসা ওদের তুলনায় বহুগুণ বেশি।” [সূরা বাকারা: ১৬৫]

◈ আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ

“হে মুমিনগণ, তোমাদের মধ্যে তা দিন থেকে ফিরে যাবে, অচিরেই আল্লাহ এমন সম্প্রদায় সৃষ্টি করবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসবে।” [সূরা মায়িদা: ৫৪]

◈ তিনি আরও বলেছেন,

قُلْ اِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّوْنَ اللهَ فَاتَّبِعُوْنِیْ یُحْبِبْكُمُ اللهُ

“(হে নবি) আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো তাহলে আমার অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন।” [সূরা আলে ইমরান: ৩১]

◈ প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّى أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ

“তোমাদের মধ্যে কেউ প্রকৃত ইমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ আমি তোমাদের নিকট তোমাদের পিতা, পুত্র ও অন্য সব মানুষের চেয়ে বেশি প্রিয় না হই।” [সহীহ বুখারি]

◈ তিনি আরও বলেন,

ثَلاَثٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ وَجَدَ حَلاَوَةَ الإِيمَانِ أَنْ يَكُونَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِمَّا سِوَاهُمَا، وَأَنْ يُحِبَّ الْمَرْءَ لاَ يُحِبُّهُ إِلاَّ لِلَّهِ

“তিনটি গুণ যার মধ্যে থাকে, সে ঈমানের স্বাদ পায়। আল্লাহ ও তাঁর রসুল তার কাছে অন্য সব কিছুর থেকে প্রিয় হওয়া, কাউকে কেবল আল্লাহর জন্যই ভালবাসা এবং কুফরিতে ফিরে যাওয়াকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার মত ঘৃণা করা।” [বুখারি ও মুসলিম]

এভাবে এই মোহাব্বত (ভালবাসা) শব্দটি কুরআন ও হাদিসে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু কোথাও ‘ইশক/এশক শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি। অথচ শরিয়ী শব্দাবলীর ব্যবহার কুরআন-সুন্নাহর মধ্যেই সীমিত থাকা জরুরি।

উল্লেখ্য যে, মোহাব্বত (ভালবাসা) শব্দটি স্বামী, স্ত্রী, পিতা, মাতা, সন্তান, আলেম, কুরআন, হাদিস ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রেই ব্যবহারযোগ্য। যদিও পরিমাণ ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে মোহাব্বত বা ভালবাসার বিভিন্ন প্রকারভেদ হয়ে থাকে। (যেমনটি ইমাম ইবনুল কাইয়েম রহ. উল্লেখ করেছেন।)

❑ ৩. আল্লাহর ও তাঁর রসুলের শানে ‘প্রেম’ শব্দের ব্যবহার:

কতিপয় আলেম বলেন যে, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের প্রতি ‘প্রেম’ শব্দ ব্যবহার করা যাবে না। কারণ তা নাকি যৌন চাহিদা বা যৌনাকাঙ্ক্ষা যুক্ত ভালবাসাকে বুঝায়। কিন্তু এ মতটি আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি। কারণ বাংলা অভিধানে ‌এই শব্দটি প্রণয় এবং সাধারণ ভালোবাসা, স্নেহ, ভক্তি ইত্যাদি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ এই ভালবাসায় যৌনাকাঙ্ক্ষা থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। যেভাবে শুধু ‘ভালোবাসা’ শব্দটিও উভয় ধরনের অর্থই প্রকাশ করে। ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে প্রেম শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে: ১ প্রণয়, ভালোবাসা, ২. প্রীতি (বন্ধুত্ব). ৩. স্নেহ [বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান-পরিমার্জিত সংস্করণ]

❑ যৌনাকাঙ্ক্ষা মুক্ত সাধারণ ভালোবাসা, অনুরাগ এবং স্নেহ অর্থে প্রেম শব্দ ব্যবহারের কিছু উদাহরণ:

◆ দেশপ্রেম: স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা ও অনুরাগ।
◆ দেশপ্রেমী: স্বদেশকে যে ভালোবাসে।
◆ প্রকৃতি প্রেমিক: প্রকৃতিকে ভালোবাসে এমন।
◆ বৃক্ষ প্রেমী: গাছ ভালোবাসে এমন।
◆ ভাতৃপ্রেম/: ভাইয়ের প্রতি মমতা ও ভালোবাসা।
◆ মাতৃ প্রেম: মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান বোধক ভালোবাসা।
◆ আত্ম প্রেম: নিজের প্রতি ভালোবাসা।
◆ ভাষা প্রেমিক: ভাষার প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ আছে এমন।
◆ গ্রন্থ প্রেমী: বই পড়তে ভালোবাসে এমন।
◆ সাহিত্য প্রেমিক: সাহিত্যকে ভালোবাসে এমন।
◆ ঈশ্বর প্রেম: বিধর্মীরা তাদের সৃষ্টিকর্তার প্রতি অগাধ ভালোবাসা প্রকাশে এই শব্দটি ব্যবহার করে। [বানান আন্দোলন ও অন্যান্য]

একইভাবে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি সম্মানসুলভ অগাধ ভালোবাসা বোঝাতে এ শব্দটি ব্যবহারে কোন দোষ নেই ইনশাআল্লাহ। তবে বলা যায়, বিতর্ক এড়াতে আল্লাহ ও তাঁর রসুলের ক্ষেত্রে এ শব্দটি পরিহার করাই ভালো।

হ্যাঁ, কেউ যদি যৌনাকাঙ্ক্ষা সুলভ ভালোবাসা ও প্রেমাসক্তি অর্থে মহান আল্লাহ ও‌ তাঁর রসুলের শানে এই শব্দটি ব্যবহার করে তাহলে তা অবশ্যই হারাম হবে। আল্লাহু আলম (আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন)।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা এবং আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে কাজ করার বিধান

 বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করা এবং আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে কাজ করার বিধান

নিম্নে এ বিষয়ে ৪টি প্রশ্নের উত্তর প্রদান করা হল: وبالله التوفيق

❑ ১. আইন বিষয়ে পড়াশোনা এবং বিচার কিংবা ওকালতি পেশায় চাকরি করার বিধান

প্রশ্ন: আমরা জানি, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় ইসলামি শরিয়ত পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয় না বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানব রচিত আইন-কানুন প্রচলিত রয়েছে। এমতবস্থায় ইউনিভার্সিটিতে আইন নিয়ে পড়াশোনা করা, অত:পর এডভোকেট, উকিল এবং বিচারক-এর পেশায় যাওয়া কি জায়েজ হবে?
উত্তর: ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এতে মানব জীবনের সকল সমস্যার সমাধান রয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। স্বভাবতই ইসলামে সমাজে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধ, জুলুম-নির্যাতন, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ, মতবিরোধ, অধিকার হরণ, দাবি-দাওয়া ইত্যাদি নিষ্পত্তির ব্যাপারে সুস্পষ্ট আইন-কানুন রয়েছে।
সুতরাং মুসলিম সরকারের জন্য ইসলামি শরিয়া অনুযায়ী বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা ও বিচারকার্য পরিচালনা করা ফরজ এবং ইসলামি আইনের বিপরীতে মানব রচিত আইন দ্বারা বিচার পরিচালনা করা হারাম। আল্লাহ তাআলা কুরআনে একাধিক স্থানে আল্লাহর আইন ব্যতিরেকে মানব রচিত আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা কারীদেরকে কাফের, ফাসেক এবং জালিম হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহর আইন ও বিধান ব্যতিরেকে বিচার-ফয়সালা করা কখনও কুফরি পর্যায়ের অপরাধ, আবার কখনো কবিরা গুনাহ (ফাসেকি ও জুলুম)। দেখুন: সূরা মায়িদা-এর ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা।

সঙ্গত কারণেই ইসলামি আইন-কানুন সম্পর্কে পড়াশোনা করা অপরিহার্য (ফরজে কেফায়া)। কেননা কোন বিষয়ে জ্ঞানার্জন ছাড়া তা বাস্তবে প্রয়োগ ঘটানো সম্ভব নয়। কিন্তু কোনও মুসলিম যদি ইসলামি আইনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ এবং তথাকথিত ইসলাম বিরোধী মানব রচিত আইনের অসারতা ও ক্ষতিকারক বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জানার উদ্দেশ্যে পড়াশোনা করে তাহলে এতে কোনও আপত্তি নেই। কিন্তু কর্মক্ষেত্রের এ সকল মানব রচিত আইন দ্বারা বিচারকার্য পরিচালনা করা, প্র্যাকটিস করা,‌ আইনি সহায়তা দেওয়া বা ওকালতি করা হারাম।

◈ আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রহ. বলেন,

وأما تعلم الإنسان للقوانين الوضعية، إذا كان يتعلمها من أجل أن يدفع الباطل بالحق ؛ فهذا لا بأس به ، وإذا كان يتعلمها من أجل أن يتبع ما فيها من القوانين المخالفة للشرع ؛ فهذا حرام. وفي هذا نقول : حتى المحاماة في بلد تحكم الشريعة فيه نقول: إذا كان المحامي يريد إيصال الحق إلى أهله ؛ فلا بأس أن يمارس هذه المهنة ، وإن كان يريد أن يغلب الناس في قوله ومحاماته بالحق أو بالباطل ؛ فهذا حرام ” انتهى باختصار من “لقاء الباب المفتوح” (33/6).

“আর কেউ যদি মানব রচিত আইন বিষয়ে শিক্ষার্জন করে সত্যে দ্বারা মিথ্যাকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে তাহলে এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু যদি জ্ঞানার্জন করে ততে যে সব শরিয়ত পরিপন্থী আইন-কানুন রয়েছে সেগুলোর অনুসরণ করার উদ্দেশ্যে তাহলে তা হারাম। এই বিষয়ে আমরা আরও বলি: শরিয়তের বিধান বাস্তবায়িত আছে এমন দেশেও যদি আইনজীবীর উদ্দেশ্য থাকে পাওনাদারের নিকট তার পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া তাহলে এই পেশায় প্র্যাকটিস করায় কোন সমস্যা নেই। কিন্তু যদি সে তার কথা ও ওকালতির মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা যে কোনও প্রকারে বিজয়ী হওয়ার মনোভাব রাখে তাহলে তা হারাম।”

❑ ২. মেয়েদের জন্য আইন নিয়ে পড়াশোনা করার বিধান:

প্রশ্ন: মেয়েরা কি আইন নিয়ে পড়াশোনা করতে পারবে? আমার ছোট বোন পড়তে চাচ্ছে। কিন্তু আমি এতে ইচ্ছুক নই। কারণ যতটুকু জানি, এখানে পরিপূর্ণ পর্দা মানা যায় না। কিন্তু সবাইকে বুঝানোর মতন রেফারেন্স/দলিল না থাকায় আমার নিষেধ টা জোরালো হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে সাহায্য করবেন।
উত্তর: বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইসলামি আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করা হয় না তারপরও কেউ যদি দুর্বল, অসহায়, মজলুম-নিপীড়িত মানুষকে আইনি সহায়তা দেওয়া, সত্যের পক্ষে কথা বলা, ইসলামবিরোধী কার্যক্রমকে রুখে দেওয়া অথবা সাধারণ মানুষকে বৈধ ক্ষেত্রে আইনি সহায়তা করার উদ্দেশ্যে এই পেশায় সৎ ভাবে কাজ করা হয় তাহলে এতে কোন সমস্যা নেই। তবে কোন ভাবে জেনে-বুঝে মিথ্যা-জালিয়াতি, শরিয়ত বিরোধী কর্মকাণ্ড অথবা জালিম বা অপরাধীর পক্ষে অবস্থান নেওয়া বৈধ নয়। আর এ পেশায় নারীর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কথা হল, ইসলামে নারীর জন্য পর্দা রক্ষা করা ফরজ। সুতরাং তার জন্য এমন পেশায় যুক্ত হওয়া বৈধ নয় যেখানে পর্দা লঙ্ঘিত হয় বা নারী-পুরুষ সহ অবস্থান করতে হয়। চাই তা আইন পেশা হোক অথবা অন্য কোনও পেশা।

❑ ৩. বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আইন পেশায় কাজ করা কি বৈধ?

প্রশ্ন: বাংলাদেশ তো মানব রচিত আইন বা কুফরি শাসন ব্যবস্থা দিয়ে চলে যা আপনার অজানা নয়। এমতাবস্থায় পেশা হিসেবে যদি কেউ যদি Lawyer/Advocate হিসেবে কাজ করে তাহলে কি তা বৈধ হবে? উল্লেখ্য যে, সে তার কাজে অসৎ, অন্যয়, মিথ্যা বা খারাপ কিছুর আশ্রয় না নিয়ে মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য লড়াই করার চেষ্টা করবে-এমনটাই তার নিয়ত।
উত্তর: মানুষ অনেক সময় জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়, অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় এবং অন্যের দ্বারা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু তারা বিভিন্ন কারণে ন্যায় বিচার পায় না। এক্ষেত্রে উকিল যদি তার পক্ষে কাজ করে তাকে জুলুম-নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করে বা আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে তার অধিকার ফিরিয়ে দেয় তাহলে নিঃসন্দেহে তা ভালো কাজ। বরং অসহায় মানুষকে সাহায্য করার নিয়ত থাকলে এতে সে সওয়াবের অধিকারী হবে। এটি পারস্পারিক সৎকর্মে সহায়তার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ
“সৎকর্ম ও আল্লাহ ভীতিতে একে অন্যের সাহায্য কর।” [সূরা মায়িদা: ২]

তবে এই পেশায় যারা কাজ করে তাদের জন্য মিথ্যা কথা বলা, অনৈতিক কাজ করা, ভুয়া ও জাল ডকুমেন্ট হাজির করা অথবা জেনেশুনে সত্য গোপন করা এবং জালিম ও অপরাধীর পক্ষে কাজ করা জায়েজ নেই- যা অনেক উকিল কেবল মামলায় জেতার উদ্দেশ্যে করে থাকে (নাউযুবিল্লাহ)। যে আইনজীবী এসব কাজ করবে সে গুনাহগার হবে এবং এর মাধ্যমে উপার্জিত অর্থ তার জন্য হারাম বলে গণ্য হবে। অনুরূপভাবে কোন উকিলের জন্য অন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করা, জালিম ও অপরাধীকে সাহায্য করা, আইনের মার-প্যাঁচে ফেলে কারো অধিকার হরণ করা অথবা শরিয়ত বহির্ভূত কোনও কাজে কাউকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে ওকালতি করা কোনোভাবেই বৈধ নয়। কেননা তা পাপকর্মে সহায়তার শামিল। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ

“তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের ব্যাপারে একে অন্যের সহায়তা করো না। আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ কঠোর শাস্তিদাতা।” [সূরা মায়িদা: ২]

◈ আল্লামা শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. কে আইন পেশা সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তরে বলেন,

فإذا كان المحامي يتقي الله، ولا يساعد صاحبه بالمنكر والكذب؛ فلا حرج عليه، الواجب عليه أن يتقي الله في محاماته، وأن يطالب بالحق، وألا يكذب، وألا يعين صاحبه على معصية الله، فإذا كان يطالب بالحق الذي يعلمه، أو يطلب من القاضي الحكم بالشرع الذي يعلمه القاضي، ولا يعلمه المحامي؛ فلا حرج عليه في ذلك.
أما أن يتعمد كذبًا، أو إعانة على كذب، أو على غش؛ فلا يجوز له، وهو آثم في ذلك وظالم،

“অতএব উকিল যদি আল্লাহকে ভয় করে এবং বিচার প্রার্থীকে অন্যায় ও মিথ্যা-জালিয়াতির মাধ্যমে সাহায্য না করে তাহলে ‌এতে কোন দোষ নেই। তার জন্য আবশ্যক হল, আইন পেশার ক্ষেত্রে আল্লাহকে ভয় করা। সে (আদালতে বিচারকের নিকট) পাওনা দাবি করবে। এ ক্ষেত্রে কোনও ধরণের জালিয়াতির আশ্রয় নিবে না এবং বিচার প্রার্থীকে ‌আল্লাহর অবাধ্যতার ক্ষেত্রে সহায়তা করবে না।
অত:এব সে যদি এমন পাওনা দাবি করে যা সে জানে অথবা সে বিচারকের নিকট আল্লাহর আইন অনুযায়ী ফয়সালা চায় যে বিষয়ে বিচারক জ্ঞান রাখে; আইনজীবী হয়ত সে বিষয়ে জ্ঞান রাখে না তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নেই। কিন্তু সে যদি ইচ্ছাকৃত ভাবে মিথ্যা কথা বলে অথবা অসত্য ও প্রতারণার ক্ষেত্রে সহায়তা করে তাহলে তা জায়েজ নাই। এতে সে জুলুমকারী ও গুনাহগার হবে।”

❑ ৪. প্রশ্ন: কোন মুসলিম কি কোন হিন্দু বা অন্য ধর্মের আইনজীবী দ্বারা মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা করা জায়েজ?
উত্তর: ন্যায় বিচার পাওয়ার স্বার্থে যদি কোন অমুসলিম আইনজীবীকে আইন ও মামলা পরিচালনায় অধিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন ও পারঙ্গম মনে হয় তাহলে তার মাধ্যমে মামলা-মোকদ্দমা পরিচালনা করা দূষণীয় নয় যদি সে এ ক্ষেত্রে শরিয়ত বিরোধী কোন কাজ না করে। যেমন: মিথ্যা ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া, মিথ্যা সাক্ষ্য হাজির করা, ডকুমেন্ট জাল করা, উৎকোচ প্রদান ইত্যাদি। এ সকল অন্যায় ও অসৎ উপায় অবলম্বন করা সর্বাবস্থায় সকলের জন্য গর্হিত কাজ ও নিষিদ্ধ-চাই সে মুসলিম হোক অথবা অমুসলিম হোক।

ইসলামের দৃষ্টিতে প্রয়োজনবোধে দুনিয়াবি প্রয়োজনীয় কাজে অর্থের বিনিময়ে বিশ্বস্ত এবং অভিজ্ঞ অমুসলিমকে নিয়োগ দেওয়া জায়েজ। যেমন: আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিজরতের প্রাক্কালে মক্কা থেকে মদিনার রাস্তা দেখানোর উদ্দেশ্যে আব্দুল্লাহ বিন উরাইকিতকে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দিয়েছিলেন যদিও সে সময় সে মুশরিক ছিল। [সিরাত গ্রন্থ সমূহ] আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

বরাত অর্থ এবং প্রকৃত ভাগ্য রজনী বা মুক্তি রজনী

 প্রশ্ন: বরাত অর্থ কী? এবং প্রকৃত ভাগ্য রজনী বা মুক্তি রজনী কোনটি?

উত্তর: বরাত শব্দটি শব্দের অর্থ: কপাল, ভাগ্য বা অদৃষ্ট। যেমন: বলা হয়, বরাত মন্দ (কপাল খারাপ), বদ-নসিবের বরাত খারাব।” [জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, কবিতা: কামাল পাশা] এর আরেকটি অর্থ, প্রতিনিধিত্ব বা দায়িত্বও কার্যভর। এখান থেকেই বলা হয়, বিয়ের বরাত অর্থাৎ বিয়ের ব্যাপারে কথাবার্তা বলার দায়িত্ব। আরেকটি অর্থ: বরযাত্রীদল। [বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান]

যাহোক, শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে আমাদের সমাজে “শবে বরাত” বা ভাগ্য রজনী বলে অভিহিত করা হয়। অর্থাৎ মানুষ মনে করে, শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে মানুষের ভাগ্য লেখা হয়। কিন্তু এ কথা ভুল। কেননা, মূলত ‘ভাগ্য রজনী’ হল, রমজান মাসের শেষ দশকের ‘শবে কদর’। কেননা, এ রাতেই মানুষের বাৎসরিক ভাগ্য বণ্টিত হয়। আর আমাদের অজানা নয় যে, তা রয়েছে রমজান মাসের শেষ দশকের কোন এক বেজোড় রাতে। মহাগ্রন্থ কুরআনে এই রাতকে ১০০০ মাসের থেকেও উত্তম বলা হয়েছে। [সূরাতুল কদরের ব্যাখ্যা পড়ুন]
আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ
“আমি ইহা (কুরআনুল কারিম) অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে। কেননা, আমি মানুষকে সতর্ক কারী। এ রাতে প্রতিটি প্রজ্ঞা পূর্ণ বিষয় স্থির করা হয়।”
◯ এ ‘বরতকময় রাত’ দ্বারা কোন রাত উদ্দেশ্য?
● অধিকাংশ তাফসির বিশারদগণ বলেন, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হল, শবে কদর/লাইলাতুল কদর-যা রমজান মাসে রয়েছে।
ইমাম ইবনে কাসির রহ. উক্ত আয়াতের তাফসিরে বলেন,
أي : في ليلة القدر يفصل من اللوح المحفوظ إلى الكتبة أمر السنة ، وما يكون فيها من الآجال والأرزاق ، وما يكون فيها إلى آخرها . وهكذا روي عن ابن عمر ، وأبي مالك ، ومجاهد ، والضحاك ، وغير واحد من السلف
“শবে কদর (কদরের রাতে) লাওহে মাহফুজ থেকে লেখক ফেরেশতাদের নিকট বছর ব্যাপী জীবন-মৃত্যু, রিজিক ইত্যাদি যা কিছু ঘটবে সেগুলো বণ্টন করা হয়। এমনটি বর্ণিত হয়েছে, ইবনে উমর, আবি মালিক, মুজাহিদ, যাহহাক প্রমূখ একাধিক সালাফ থেকে।” [তাফসিরে ইবনে কাসির] যারা বলেন, এর রাত দ্বারা উদ্দেশ্য, ’লাইলাতুন নিসফে শাবান’ বা অর্ধ শাবানের রাত তাদের কথা সঠিক নয়। নিম্নে এ ব্যাপারে পর্যালোচনা উপস্থাপন করা হল:
● ইবনে কাসির রহ. বলেন, “উক্ত আয়াতে আল্লাহ তাআলা এ মর্মে সংবাদ দিচ্ছেন যে, তিনি এ কুরআনকে এক বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছেন। আর সেটি হল কদরের রাত। যেমন: আল্লাহ বলেন,
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْر
“আমি তো ইহা (কুরআন) কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি।” [সূরা কাদর: ১] আর এ রাতটি ছিল রমজান মাসে। যেমন: আল্লাহ তাআলা বলেন,
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ
“রমজান মাস হল, সে মা যাতে আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি।” [ সূরা বাকারা: ১৮৫] এ প্রসঙ্গে হাদিসগুলো সূরা বাকারায় উল্লেখ করেছি যা পুণরোল্লেখ করার নিষ্প্রয়োজন মনে করছি। আর যারা বলে যে, উক্ত রাতটি হল, অর্ধ শাবানের রাত-যেমন ইকরিমা বর্ণনা করেছেন-তাদের এ মত অনেক দূরবর্তী। কারণ, তা কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধী। [তাফসিরে ইবনে কাসির, ৪র্থ খণ্ড ৫৭০ পৃষ্ঠা]

এ রাতটিকে ‘অর্ধ শাবানের রাত’ বলা কুরআন বিরোধী:

যারা বলে, উক্ত আয়াতে রবতমময় রাত দ্বারা অর্ধ শাবানের রাত বলে থাকে তারা উক্ত আয়াতের তাফসিরে ইকরিমা থেকে বর্ণিত বক্তব্যটি দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন। তিনি (ইকরামা) বলেন, “এ রাত হল, অর্ধ শাবানের রাত। এ রাতেই সারা বছরের সকল ফয়সালা চূড়ান্ত করা হয়…।” [আল জামিউল কুরতুবী ১৬/১২৬।] কিন্তু এ দাবী মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ তা সরাসরি কুরআন বিরোধী। আর এ সম্পর্কে বর্ণিত হাদিসগুলো সহিহ তো নই বরং সেগুলো ভিত্তিহীন। যেমনটি ইবনুল আরবি প্রমুখ গবেষক আলেমগণ দৃঢ়তার সাথে করেছেন। সেই সাথে সেগুলো কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক (যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে)।
সুতরাং অবাক হতে হয় সে সকল মুসলমানদের অবস্থা দেখে যারা কুরআন ও সহীহ হাদিসের দলিল ছাড়া কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধিতা করে!। [তাফসিরে আযওয়াউল বায়ান, ৭/৩১৯] সুতরাং শাবান মাসের ১৫ তারিখ রাতকে শবে বরাত বা ভাগ্য রজনী (অথবা মুক্তি রজনী) বলা নিতান্তই ভুল।
আর এই রাতে বিশেষ ফজিলতের আশায় বিশেষ কোন ধরনের ইবাদত-বন্দেগি করা বা হালুয়া-রুটি খাওয়া, দল বেঁধে কবর জিয়ারত করা, ঘরবাড়ি আলোক সজ্জা করা, এ রাতে গোসল করা, আতর সুগন্ধি মাখা, চোখে কাজল লাগানো ইত্যাদি সব বিদআত। অনুরূপভাবে এ রাতে ভালো খাবার খেলে সারা বছর ভালো খাওয়া যাবে এমন বিশ্বাস করা কুসংস্কার।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

শবে বরাত উপলক্ষে স্বামী যদি স্ত্রীকে হালুয়া-রুটি ইত্যাদি তৈরি করতে বাধ্য করে

 প্রশ্ন: স্বামী যদি স্ত্রীকে শবে বরাতের জন্য হালুয়া-রুটি তৈরি করতে বাধ্য করে এবং বিরোধিতা করায় স্বামী সংসারে অশান্তি সৃষ্টি করে তাহলে এ ক্ষেত্রে ওই স্ত্রীর করণীয় কী?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: কথিত ‘শবে বরাত’ উপলক্ষে হালুয়া-রুটি, গোস্ত-পোলাও অথবা অন্য কোন ধরনের বিশেষ খাবার-দাবারের আয়োজন করা শরিয়ত সম্মত নয়। কারণ শবে বরাত পালন করা এবং এই উপলক্ষে বিশেষ খাবার অথবা কোন ধরনের আয়োজন-অনুষ্ঠান করা বিদআত তথা দিনের মধ্যে নব আবিষ্কৃত বিষয়।
উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
যে আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কোন নতুন বিষয় সংযুক্ত করবে যা তার অংশ নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে (অর্থাৎ তা গ্রহণযোগ্য হবে না)। [বুখারী, হা/২৬৯৭, মুসলিম,হা/ ১৭১৮]

মুসলিমের বর্ণনার ভাষা হলো এই যে,
مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ”
“যে ব্যক্তি এমন কাজ করবে যা আমাদের দ্বীনে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।”
সুতরাং কথিত শবে বরাত পালন করা এবং এই উপলক্ষে স্বামীর জন্য তার স্ত্রীকে হালুয়া-রুটি অথবা বিশেষ কোনো খাবার প্রস্তুত করার নির্দেশ প্রদান করা হারাম। এমন নির্দেশ দিলেও স্ত্রী তা পালন করতে বাধ্য নয়।‌ কেননা ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো, আল্লাহর অসন্তুষ্টিতে সৃষ্টি জীবের কারও নির্দেশ মান্য করা জায়েজ নেই। আলী রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
لا طاعة لبشر في معصية الله، إنما الطاعة في المعروف
“আল্লাহর নাফরমানিতে কোন মানুষের আনুগত্য নেই। আনুগত্য শুধু ভাল কাজে।” [বুখারী ও মুসলিম] তাই স্ত্রী যথাসম্ভব তার স্বামীকে আগে থেকেই এ বিষয়ে সতর্ক করবে বা বুঝাবে। কিন্তু স্বামী একরোখা স্বভাবের হওয়ায় বা বিদআতে নিমজ্জিত থাকার কারণে যদি সত্য গ্রহণে নারাজ থাকে এবং তার স্ত্রীকে এই কাজে বাধ্য করতে চায় তাহলে স্ত্রী এক্ষেত্রে অপারগ।

সুতরাং এই পরিস্থিতিতে মনের মধ্যে এহেন বিদআতের প্রতি ঘৃণাবোধ বজায় রেখে হালুয়া-রুটি বা অন্যান্য খাবার তৈরি করতে পারে। বিদআতের প্রতি এই ঘৃণাবোধের কারণে সে ইনশাআল্লাহ গুনাহ থেকে বেঁচে যাবে কিন্তু এ নির্দেশ দেওয়ার কারণে স্বামী গুনাগার হবে।
আল্লাহ আমাদেরকে হক জানার, বুঝার তৌফিক দান করুন এবং সব ধরনের বাতিল, ভ্রান্ত ও বিদআতি কার্যক্রম থেকে রক্ষা করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

পরিবারের পক্ষ থেকে পর্দা করতে বাধা দিলে করণীয়

 প্রশ্ন: আমি কয়েক মাস আগেও পর্দা করতাম না। কিন্তু দু মাস ধরে আমি পুরোপুরি পর্দা করি। যেখানেই যাই বোরখা পরিধান করি। কিন্তু আমার পরিবারের কেউ কেউ সব জায়গায় বোরখা পরে না। কিন্তু আমি পরতে চাই। তবে আমার বড়রা বলে যে, সব জায়গায় সব কিছু মানায় না। সমাজের সাথেও চলতে হয়। একা যেখানে যাও পর্দা করো। তবে পরিবারের সাথে কোথাও বেড়াতে গেলে বা দাওয়াতে গেলে বোরখা পড়া মানানসই না। হিজাব পড়লেই যথেষ্ট। এখন আমি পরিবারের জন্য পুরোপুরি পর্দা করে যেতে পারি না। তাদের সাথে যাব নাও বলতে পারি না। এখন আমার কী করণীয়?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: আপনি পর্দা করতে শুরু করেছেন এ জন্য আপনাকে অভিনন্দন। দুয়া করি, আল্লাহ যেন আপনাকে আমরণ ইসলামের এই মহান বিধানের উপর অবিচল থাকার তাওফিক দান করেন আর আপনার জন্য এ পথে চলা সহজ করে দেন। আমিন।

আপনার পরিবার যেহেতু সঠিক নিয়মে পর্দা করে না তাই স্বাভাবিকভাবে তারা আপনার পর্দাকে স্বাগত জানাবে না বরং নানাভাবে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে। কিন্তু পর্দা যেহেতু মুসলিম নারীর প্রতি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অলঙ্ঘনীয় ফরজ ইবাদত সেহেতু কোনভাবেই মানুষের সমালোচনার সামনে হার মানা যাবে না। কে কী বলল বা ভাবল তার চেয়ে বড় কথা হল, এটি রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে নির্দেশ। তার নির্দেশ উপেক্ষা করলে তিনি হয়ত জাহান্নামের কঠিন আজাবে নিক্ষেপ করবেন। পক্ষান্তরে সকল সমালোচনা ও রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দৃঢ়তার পরিচয় দিলে তিনি জান্নাতে অভাবনীয় পুরস্কারে পুরস্কৃত করবেন।

তাই মানুষের কটুকথা, ভ্রুকুঞ্চন আর তথাকথিত সামাজিকতার ওজুহাত ইত্যাদিকে উপেক্ষা করে আল্লাহ বিধানের উপর অবিচল থাকুন। সেই সাথে তাদের হেদায়েতের জন্য দুআ করার পাশাপাশি যথাসম্ভব তাদেরকে আল্লাহর ভয় দেখান, জাহান্নামের শাস্তির কথা শুনান এবং তাদের কাছে পর্দার গুরুত্ব তুলে ধরুন।

আল্লাহ যদি তাদের কপালে হেদায়েত লিখে রাখেন ইনশাআল্লাহ তারাও বিষয়টি অনুধাবন করতে সক্ষম হবে। অন্যথায় তাদের সাথে ঝগড়া-ঝাড়ি ও খারাপ ব্যবহার থেকে দূরে থেকে নিজে পূর্ণ পর্দা করতে থাকুন। নিশ্চয় আল্লাহ আপনাকে আখিরাতে সীমাহীন পুরস্কারে ভূষিত করবেন। আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

February 23, 2023

জুয়া এবং প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত কতিপয় জরুরি বিধি-বিধান

 জুয়ার পরিচয় ও ভয়াবহতা, অর্থ প্রদানের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ এবং প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত কতিপয় জরুরি বিধি-বিধান।

নিম্নে জুয়ার পরিচয়, ইসলামে এর নিষিদ্ধতা, অর্থ প্রদানের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণ করার বিধান এবং প্রতিযোগিতা সংক্রান্ত কতিপয় জরুরি মাসআলা-মাসায়েল সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল। وبالله التوفيق

❑ জুয়া কাকে?

জুয়া খেলায় মূলত নির্দিষ্ট পরিমাণের অর্থ বা বস্তু (যা পুরস্কার হিসেবে ধার্য করা হয়) নির্ধারণ করা হয়। তারপর কোনও একটি বিষয়ে দুই পক্ষ চুক্তি করে হার-জিত নির্ধারণ করে। যে পক্ষ হেরে যায় সে অপর পক্ষকে সেই নির্ধারিত অর্থ বা বস্তু প্রদান করে।
এই খেলায় হেরে যাওয়া বা জিতে যাওয়াতে উভয় পক্ষেরই ঝুঁকি নিতে হয়। [ইউকিপিডিয়া বাংলা]

শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিরা রাহ. বলেন,

أن يؤخذ مال الإنسان وهو على مخاطرة : هل يحصل له عوضه أو لا يحصل

“জুয়া (قمار) বলা হয়, এমনভাবে মানুষের নিকট অর্থ গ্রহণ করা যে, সে তার বিনিময় পাবে নাকি না সে ব্যাপারে ঝুঁকিতে থাকে।” [মাজমুল ফাতাওয়া ১৯/২৮৩]

কোনও কোনও ফকিহের মতে, জুয়া হল,
كل لعب يشترط فيه أن يأخذ الغالب من المغلوب شيئا
“যে খেলায় এই শর্ত থাকে যে, বিজয়ী ব্যক্তি পরাজিত ব্যক্তি থেকে কোনও কিছু গ্রহণ করবে।” [almaany]

❑ জুয়া সম্পর্কে ইসলামের বিধান:

ইসলামে জুয়া জাহেলি কর্ম, কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ- إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ

“হে মুমিনগণ, এই যে মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য-নির্ধারক শরসমূহ এসব শয়তানের অপবিত্র কর্ম ছাড়া আর কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক-যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন ও কি নিবৃত্ত হবে?” [সূরা মায়িদা: ৯০]

❑ জুয়ার নেতীবাচক প্রভাব:

জরীপে জানা গেছে প্রাথমিকভাবে যারা কেবল বিনোদনের জন্য জুয়া খেলা শুরু করেছিল তাদের অনেকেই এটাতে আসক্ত হয়ে গেছে।এই আসক্তি তাদের বিভিন্ন কুকর্মের দিকে ঠেলে দেয়। জুয়ার অর্থ জোগারের জন্য তারা খারাপ কাজ করতে শুরু করে। জুয়ায় হারানো অর্থ ফেরত পাবার জন্য জুয়ারীরা বারবার জুয়া খেলে। জুয়া ব্রেইনে মারাত্মক প্রভাব পরে, জুয়ারীরা চিন্তাগ্রস্থ ও অসহায়ত্ব অনুভব করে অসুস্থ হয়ে যায়।

❑ তিনটি প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ জুয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়:

ইসলামে কোনও একপক্ষ বিজয়ী হলে পরাজিত পক্ষ থেকে অর্থ গ্রহণ করার পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতা করা হারাম। কারণ এটা হল, জুয়া। তবে তিনটি ক্ষেত্রে তা জায়েজ- যা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পৃথক উক্ত বিধান থেকে পৃথক করেছেন। তা হল,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لَا سَبَقَ إِلَّا فِي نَصْلٍ أَوْ حَافِرٍ أَوْ خُفٍّ

আবু হুরায়রা রা. সূত্রে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তীর, ঘোড়া এবং উট ব্যতীত অন্য কোনও কিছুতে বাজি ধরা যাবে না।” (অর্থাৎ এ তিনটি বিষয় ছাড়া অন্য কোনও কিছুতে দু পক্ষের বাজি ধরার মাধ্যমে বিনিময় (অর্থকড়ি) অর্জন করা জায়েজ নয়)।[সুনান আন-নাসায়ী (ইসলামিক ফাউন্ডেশন) ২৮/ ঘোড়া, পরিচ্ছেদ: ১৪. প্রতিযোগিতা]

শাইখ উসাইমিন রাহ. বলেন,

سَبَقَ : بالفتح، السَّبَق هو العوض الذي يؤخذ عن المسابقة

السَّبَق (এর মধ্যাক্ষরে ফাতহ/যবর সহকারে, উচ্চারণ: সাবাক) শব্দের অর্থ: প্রতিযোগিতায় যে বিনিময় (অর্থকড়ি বা পুরষ্কার ইত্যাদি) গ্রহণ করা হয়।
তিনি উক্ত হাদিসের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে বলেন,
المسابقة فيها بعوض وأمّا غيرها فلا يجوز، وهذا الإستثناء استثناء مِن شبه الميسر أو من الميسر نفسه، لأنّ المسابقة إذا أُخذ عليها عوض صارت من الميسر، إذ أنّ الدّاخل فيها بين غانم وغارم وهذا هو حقيقة الميسر.
“এই তিনটি ক্ষেত্রে বিনিময় ((অর্থকড়ি বা পুরষ্কার ইত্যাদি)এর মাধ্যমে প্রতিযোগিতা করা জায়েজ। কিন্তু এ তিনটি ছাড়া অন্য কোনও ক্ষেত্রে তা জায়েজ নয়। এটি হল, ব্যতিক্রম, এটি জুয়ার সদৃশ বা মূল জুয়া থেকে ব্যতিক্রম। কারণ প্রতিযোগিতায় যদি বিনিময় গ্রহণ করা হয় তাহলে তা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য হবে। কারণ এখানে প্রতিযোগী হয় আর্থিকভাবে লাভবান হবে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর এটাই হল, জুয়ার প্রকৃত রূপ।”

তিনি আরও বলেন,
أنّه أبيح أبيح لأنّ ذلك ممّا يعين على الجهاد في سبيل الله، فالإبل تحمل أمتعة المجاهدين وأسلحتهم وتحمل المجاهدين أيضا
والنّصل يرمي به المجاهد فيدافع عن نفسه ويهاجم عدوّه.
وأمّا الحافر فكذلك يكرّ عليه ويفرّ، فهو ممّا ينتفع به في الحرب في الجهاد في سبيل الله.
“এটা জায়েজ হওয়ার কারণ হল, এগুলোর মাধ্যমে মুজা/হিদগণ আল্লাহর পথে জিহাদে উপকৃত হয়। কারণ উট মু-জাহি/দদের আসবাব-সামগ্রী ও অস্ত্র-শস্ত্র বহন করে। মুজা/হিদদেরকেও বহন করে। তীরের সাহায্য মুা/জাহিদ তী/র নিক্ষেপের পাশাপাশি আত্মরক্ষা করে এবং শত্রুর উপর আ/ক্রমণ পরিচালনা করে। আর ঘোড়া শত্রুর উপর আঘাত হেনে পালিয়ে যায়। যার মাধ্যমে রণা/ঙ্গনে আল্লাহর পথে জিহা/দের ক্ষেত্রে লাভবান হওয়া যায়।”
[উৎস: alathar-শাইখ উসাইমিন রাহ. কর্তৃক বুলুগুল মারামের ব্যাখ্যা, কিতাবুল জি/হাদ (৮ম অধ্যায়)]

❑ অর্থ প্রদানের মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের বিধান এবং এ বিষয়ে কতিপয় ফতোয়া:

শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রাহ.-এর সংজ্ঞার আলোকে যদি কোনও প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের জন্য (রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ) নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানের শর্তারোপ করা হয় তাহলে সে অর্থ লেনদেন নিষিদ্ধ জুয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে। সুতরাং তা হারাম।
কারণ অংশগ্রহণকারীরা এখানে ঝুঁকিতে থাকবে যে, সে তার প্রদান কৃত অর্থের বিনিময় ফেরত পাবে কি না। কেননা এতে বিজয়ী হবে হাতে গোণা কয়েকজন। এতে তারা পুরস্কার প্রাপ্তির মাধ্যমে লাভবান হবে। কিন্তু অন্যান্য অর্থ প্রদানকারীরা নিশ্চিতভাবেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ বিষয়ে নিম্নে কতিপয় ফতোয়া প্রদান করা হল:

◈ ১. আহকামুল জাওয়ায়েয ওয়াল মুসাবাকাত (পুরস্কার ও প্রতিযোগিতার বিধিবিধান), লেখক: প্রফেসর ডক্টর খালিদ আল মুশাইকিহ বলেন,

النوع الأوَّل: أن تكون الجائزةُ عن طريق دفْع رسوم للدُّخول في المسابقة وهذا النَّوْع من الميسِر المحرَّم

“১ম প্রকার হল, প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের জন্য ফি প্রদানের মাধ্যমে পুরস্কার দেওয়া হলে এই প্রকার প্রতিযোগিতা নিষিদ্ধ জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।” [আহকামুল জাওয়ায়েয ওয়াল মুসাবাকাত, প্রথম প্রকাশ, প্রকাশকাল ১৪৩৪ হিজরি-দাম্মাম, সৌদি আরব]

◈ ২. সৌদি আরবের হাইয়াতুল কিবারিল ওলামা বা সিনিয়র স্কলারস এসোশিয়েশন-এর সদস্য ডক্টর শাইখ নাসের বিন সাদ আস শিসরি বলেন,

المسابقات التي يدفع جميع المتسابقين رسماً لدخولها وتكون الجائزة محددة سلفاً قبل الدخول وقبل العلم بعدد المتسابقين لا يجوز الدخول فيها بالإجماع

“যে প্রতিযোগিতায় সকল প্রতিযোগী অংশগ্রহণের জন্য একটা ফি প্রদান করে এবং প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ এবং প্রতিযোগীদের সংখ্যা জানার আগেই পুরস্কারটি পূর্ব-নির্ধারিত থাকে তাহলে ইজমা বা আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে তাতে অংশগ্রহণ করা জায়েজ নয়।” [উৎস: midad-৪ নম্বর প্রশ্নের উত্তর]

◈ ৩. কাতার ভিত্তিক ফতোয়া বিষয়ক ওয়েব সাইটের ফতোয়া:

প্রশ্ন: একটি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং শারীরিক কসরত মূলক প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হয় এবং এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়ে এই টাকা নেয়। এই অর্থ গ্রহণ কি জায়েজ নাকি হারাম?
উত্তর:
فإن صورة هذه المسابقة هي صورة القمار الذي عرَّفه أهل العلم بقولهم: “دخول شخص في أمر يتردد فيه بين الغرم والغنم “والداخل في هذه المسابقة إما أن يخسر ما دفعه إذا فشل وسُبق، أو يربح ما دفعه ودفعه غيره من المتسابقين إذا سَبق وعليه؛ فإن هذا المال المأخوذ بهذه الطريقة حرام

“এই প্রতিযোগিতার পদ্ধতিটি জুয়ার পদ্ধতি। জুয়ার ব্যাপারে আলেমগণ সংজ্ঞা প্রদান করেছেন এভাবে যে, জুয়া হল, একজন ব্যক্তি এমন বিষয়ে অংশ গ্রহণ করবে যেখানে সে প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হলে লাভবান হবে আর পরাজিত হলে লোকসানের শঙ্কার মধ্যে থাকে। এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী ব্যক্তি হয় যে অর্থ প্রদান করেছিলো তা হারাবে যদি সে পরাজিত হয়। অথবা সে তার এবং অন্যান্য প্রতিযোগীদের প্রদত্ত অর্থ পেয়ে লাভবান হবে যদি সে বিজয়ী হয়। সুতরাং এ পদ্ধতিতে গৃহীত অর্থ হারাম।

অন্যত্র বলা হয়েছে,
والحاصل أنه لا يجوز أن يدفع الإنسان شيئا مقابل اشتراكه في مسابقة قد يربح فيها وقد يخسر ، وهو آثم سواء ربح أم خسر، وننصح القائمين على مثل هذه المسابقات من المسلمين أن يتقوا الله في أنفسهم ، ويكفوا عن الترويج لمثل هذه المسابقات المحرمة، وأن يبحثوا عن أساب مشروعة لتنمية مواردهم
“উপসংহার হল যে, কোনও ব্যক্তির জন্য এমন কোনও প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের বিনিময়ে কোনও কিছু প্রদান করা জায়েজ নয় যাতে সে জিততে পারে বা হারতে পারে। সে জিতুক বা হারুক উভয় অবস্থায় সে গুনাহগার হবে।” [islamweb]

সুতরাং যদি কোনও প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীদের নিকট নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ গ্রহণের শর্তারোপ করা হয় (যাকে রেজি. ফি বলা হয়)-যা প্রদান ব্যতিরেকে কেউ তাতে অংশ গ্রহণ করতে পারবে না তাহলে এ জাতীয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা এবং সেগুলোতে অংশ গ্রহণ করা হারাম ও কবিরা গুনাহ। কারণ তা জুয়া। আর আল্লাহ তাআলা কুরআনের জুয়াকে মদের সাথে যুক্ত করে নাপাক এবং শয়তানের কর্ম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমিন।

❑ প্রতিযোগিতায় যে কোনও পক্ষের দান গ্রহণ করা জায়েজ:

কোনও প্রতিযোগিতায় যদি দান বা উপহার হিসেেব প্রতিযোগীদের মধ্যে থেকে কেউ বা তৃতীয় কোনও পক্ষ (স্পন্সর) বিজয়ীকে উৎসাহিত করার জন্য অর্থ বা পুরস্কার সামগ্রী প্রদান করে তাহলে তা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। সুতরাং তা জায়েজ। কারণ এখানে প্রতিযোগীদের কেউ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

শাইখ জিবরিন রাহ. কে প্রশ্ন করা হয়:

প্রশ্ন: সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় প্রতিযোগীদের একজনের পক্ষ থেকে অথবা সকলের পক্ষ থেকে অথবা বাইরের অন্য কোনও পক্ষ থেকে বিনিময় গ্রহণ করার বিধান কী?

তিনি উত্তরে বলেন,

اذا كانت هذه المسابقة مفيدة للمتسابقين يكتسبون منها علماً نافعاً وسعة اطلاع، وفوائد دينية أو ثقافية، جاز أخذ العوض فيها، سواء كان ذلك العوض من المتسابقين أو أحدهما أو من غيرهما. والله أعلم

“যদি এই প্রতিযোগিতা প্রতিযোগীদের জন্য উপকারী হয়-যাতে তারা উপকারী ইলম অর্জন, ব্যাপক জানাশোনা এবং দীন বা সংস্কৃতি ক্ষেত্রে লাভবান হয় তাহলে তাতে বিনিময় গ্রহণ করা জায়েজ। চাই তা প্রতিযোগীদের নিকট থেকে নেওয়া হোক অথবা তাদের কোনও একজন থেকে নেওয়া হোক অথবা অন্য কারও নিকট থেকে নেওয়া হোক।” [cms.ibn-jebreen]

➧ দৃষ্টি আকর্ষণী:

কেউ কেউ শাইখ জিবরিন রাহ.-এর উক্ত ফতোয়াটিকে প্রতিযোগীর নিকট থেকে প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের জন্য আবশ্যিকভাবে প্রদেয় ‘রেজিস্ট্রি ফি’ গ্রহণের পক্ষে উপস্থাপন করছে।
কিন্তু তা তাদের বুঝার ভুল। কারণ ফতোয়ার উদ্দেশ্য হল, কোন উপকারী বা দীনী ইলমি বিষয়ক প্রতিযোগিতায় যদি প্রতিযোগীদের একজন কিংবা সকলের পক্ষ থেকে অথবা তৃতীয় কোন পক্ষ থেকে প্রতিযোগিতার বিনিময় (পুরস্কার সামগ্রী বা পুরস্কার বাবদ অর্থ) নেওয়া হয় তাহলে তা জায়েজ। অর্থাৎ এক্ষেত্রে যদি প্রতিযোগীদের মধ্য থেকে কেউ একজন অথবা সকলে মিলে অথবা তৃতীয় কোনও পক্ষ (স্পন্সর) প্রতিযোগিতার বিনিময় বা পুরস্কার দান করে তাহলে সেটা গ্রহণ করা জায়েজ আছে।

এখানে ‘দান’ উদ্দেশ্য না হলে একজন ব্যক্তি ও তৃতীয় পক্ষের প্রসঙ্গ আসতো না।

মোটকথা, প্রতিযোগীদের মধ্য থেকে কেউ একজন অথবা তৃতীয় কোনও পক্ষ যদি প্রতিযোগীদের পুরস্কার বাবদ সমূদয় অর্থ ও ব্যয়ভার বহন করে তাহলে তাতে কোনও সমস্যা নেই। এমনকি সকল প্রতিযোগীও সম্মিলিতভাবে যদি এই ব্যয়ভার বহনের দায়িত্ব নেয় তাতেও কোনও সমস্যা নেই।

শাইখের ফতোয়ায় প্রতিযোগীর নিকট আবশ্যিকভাবে গৃহীত ফি (যা রেজিস্ট্রেশন বাবদ নেওয়া হয়) সম্পর্কে বক্তব্য নেই। এটা ফতোয়ার উদ্দেশ্য নয়। সুতরাং উক্ত ফতোয়া ভুল অর্থে গ্রহণ করার সুযোগ নাই।

➧ উল্লেখ্য যে, বর্তমানে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ইসলামি সংগঠন, সামাজিক ক্লাব ইত্যাদি কর্তৃক ছাত্র-ছাত্রী ও যুবকদের জন্য যে সব প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে এবং তারা নিজেদের পক্ষ থেকে পুরস্কারের আয়োজন করে এতে অংশ গ্রহণ করায় কোনও সমস্যা নেই। (যদি প্রতিযোগিতায় অন্য কোনও হারামের সংশ্লিষ্টতা না থাকে)। কারণ এখানে প্রতিযোগীদের নিকট থেকে কোনও অর্থকড়ি নেওয়া হয় না। ফলে বিজয়ী হলেও কোনও প্রতিযোগী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।

❑ পুরস্কার ছাড়া প্রতিযোগিতা আয়োজনে ব্যয়ভার উত্তোলনের উদ্দেশ্যে প্রতিযোগীদের নিকট থেকে অর্থ নেওয়া জায়েজ?

প্রশ্ন: রেজিস্ট্রেশন ফ্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই যদি পুরস্কারের ব্যবস্থা করা হয় সেটা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু এরকম একটি আয়োজন করতে পুরস্কারের অর্থ ছাড়াও একটা বড় ধরনের অর্থের প্রয়োজন হয়। যেমন: প্রচার-প্রচারণা, প্রশ্নপত্র তৈরি করা ইত্যাদি। তাছাড়া এসব কাজে বহু লোকবল খাটানোর প্রয়োজন পড়ে। সে দিক বিবেচনায় ন্যূনতম একটি রেজিস্ট্রেশন ফি ধরা হলে তাও কি হারামের মধ্যে গণ্য হবে?
উত্তর: কেউ যদি এহেন ইসলামি জ্ঞান চর্চা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তার উদ্দেশ্যে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে অংশ গ্রহণ করে (স্পন্সর করে) তাহলে তাতে কোন সমস্যা নেই। চাই তা পুরস্কারের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হোক অথবা প্রতিযোগিতার অন্যান্য খরচের ক্ষেত্রে ব্যাবহার করা হোক। কিন্তু নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদানকে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের ‘আবশ্যিক শর্ত’ হিসেবে রাখা জায়েজ নেই। এটাকে আলিমগণ ‘জুয়া’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। কারণ এক্ষেত্রে কেবল হাতেগোনা কতিপয় ব্যক্তি বিজয়ী হওয়ার মাধ্যমে লাভবান হবে আর বেশিরভাগ প্রতিযোগী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

❑ প্রশ্ন: রেজিস্ট্রেশন ফি না নিলে মানুষ অমনোযোগী হয়ে রেজিস্ট্রেশন করে এবং ঠিক মত স্টাডি না করেই এমনিতেই এক্সামে অংশগ্রহণ করবে। এ যুক্তিতে কি রেজি. ফি নেওয়া যাবে?
উত্তর: যার জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি ঘোষিত পুরস্কার অর্জন করতে চায় তারা অবশ্যই পড়াশোনা করে প্রস্তুতি নিয়েই অংশগ্রহণ করবে। কিছু মানুষ হয়তো এমনিতেই অংশগ্রহণ করবে। কিন্তু তা তাদের অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি আগামীতে যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য অনুপ্রেরণা হবে ইনশাআল্লাহ।
কিন্তু এ যুক্তিতে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য অর্থ প্রদানকে ‘আবশ্যিক শর্ত’ করা যাবে না। কেননা এটি নিষিদ্ধ জুয়ার অন্তর্ভুক্ত বলেই বিজ্ঞ আলেমগণ উল্লেখ করেছেন-যেমনটি আমরা ইতোপূর্বে আলোচনা করেছি।

❑ প্রতিযোগীদের কেউ যদি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তাহলে তা জায়েজ:

প্রশ্ন: কোন ব্যাডমিন্টন প্রতিযোগিতায় যদি সকলে মিলে সমান টাকা দেয় এবং ফাইনালে বিজয়ী প্রতিযোগীগণ সহ অংশগ্রহণকারী সবাই মিলে জমা কৃত টাকা দিয়ে সম্মিলিত খাবারের আয়োজন করে এবং উভয় পক্ষের সকলে মিলে সে খাবার খায় তাহলে এতে কি কোনও সমস্যা আছে?
বি.দ্র. কারো জন্য অতিরিক্ত কোন প্রাইজ মানি বা পুরস্কার নেই। শুধু সকলে মিলে প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করে খাবার খাওয়া হবে।
উত্তর: এটা নাজায়েজ নয়। কারণ এখানে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না। বরং যারা টাকা দিয়েছে তারা সকলেই (বিজয়ী এবং পরাজিত উভয় পক্ষ) নিজেদের টাকার বিনিময়ে খাবার খাচ্ছে। সুতরাং এটা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে না। তবে এই খেলার ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়ত যেন লঙ্ঘিত না হয় বা অন্য কোন হারাম কাজ সংগঠিত না হয় সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি।
জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

আলি রা. কে ঘুমানোর পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাম কর্তৃক পাঁচটি উপদেশ সংক্রান্ত হাদিসটি বানোয়াট

 প্রশ্ন: নিম্নোক্ত বর্ণনাটি সহিহ?

“একদিন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলি রা. কে বললেন, “প্রতি রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে ৫টি কাজ করবে। যথা:
১. ৪ হাজার দিনার (স্বর্ণমুদ্রা) সদকা করবে।
২. একবার কুরআন খতম করবে।
৩..জান্নাতের মূল্য পরিশোধ করবে।
৪..দু জন ব্যক্তি যদি দু জনের উপর রাগ করে থাকে তাইলে সেই রাগ ভাঙ্গিয়ে তাদেরকে খুশি করে তুলবে।
৫. একবার হজ করবে। তারপর ঘুমাতে যাবে।
আলি রা. তখন বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ, এটা তো মনে হচ্ছে অসম্ভব। আমি এই পাঁচটি কাজ কীভাবে করতে পারবো?
তখন নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

১. “সূরা ফাতিহা ৪ বার পড়লেই চার হাজার দিনার সদকা করার সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে।
২. সূরা ইখলাস ৩বার পড়লে একবার কুরআন খতমের সাওয়াব পাবে।
৩. তিনবার যেকোনো একটি দরুদ শরিফ পড়বে, তাহলে জান্নাতের মুল্য পরিশোধ করার সমপরিমাণ সাওয়াব পাওয়া যাবে। (যেমন: সবচেয়ে ছোট দরুদ শরীফ হচ্ছে, সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
৪. যেকোনো ইস্তাগফার বা আস্তাগফিরুল্লাহ ১০ বার পাঠ করলে দু জন অখুশি মানুষকে খুশি করার সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে।
৫. সর্বশেষ কালেমা শাহাদত চারবার পাঠ করলে একটি হজ সমপরিমাণ সাওয়াব পাওয়া যাবে।

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: এই জাতীয় একটা হাদিস (কিছু শব্দের কম-বেশি সহকারে) ফেসবুকে ব্যাপকভাবে প্রচারিত। তা বিভিন্ন ফজিলতের কিতাবেও পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় দীনের গভীর জ্ঞান নেই এমন কিছু মসজিদের ইমাম, খতিব ও বক্তার মুখেও তা শোনা যায়। এ কথাগুলো আমাদের দেশে রঙ্গিন পোস্টার আকারে বাজারে কিনে পাওয়া যায়। কোনো কোনো বাড়ির দেওয়ালেও তা ঝুলিয়ে রাখতে দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যাচার। অর্থাৎ এটি একটি বানোয়াট হাদিস।

◾সৌদি আরবের ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তারা বলেন:
هذا الحديث لا أصل له ، بل هو من الموضوعات ، من كذب بعض الشيعة كما نبَّه على ذلك أئمَّة الحديث .
” فتاوى اللجنة الدائمة ” ( 4 / 462 ، 463 )

“এই হাদিসটির কোন ভিত্তি নেই। বরং তা কতিপয় শিয়াদের মিথ্যাচার ও বানোয়াট হাদিসগুলোর অন্তর্ভুক্ত। যেমনটি এ ব্যাপারে হাদিসের ইমামগণ সতর্ক করেছেন।” [ফাতাওয়া লাজনাহ দায়িমাহ, ৪/৪৬২ ও ৪৬৩]

◾সৌদি আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতি আল্লামা আব্দুল আজিজ বিন বায রহ. বলেন,
هذا باطل، مكذوب على الرسول ﷺ قد نبهنا على هذا أكثر من مرة، مكذوب، ولكن هذه الأذكار طيبة، الإنسان يقولها، طيبة يذكر الله، ويقرأ القرآن طيب، لكن هذا مكذوب على الرسول ﷺ الكلام هذا.
“আমরা এ বিষয়ে একাধিকবার সতর্ক করেছি যে, এটি একটি ভ্রান্ত কথা এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যাচার। তবে এই সকল জিকির-আজকারগুলো ভালো। মানুষগুলো এসব জিকির পাঠ করবে। জিকির করা ভালো। কুরআন তেলাওয়াত করা ভালো। কিন্তু উপরোক্ত কথাগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে মিথ্যাচার।” [Binbaz]

◾ বর্তমান শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফকিহ আল্লামা মুহাম্মদ ইবনে সালেহ আল উসাইমিন রহ. বলেন,
هذا الحديث الذي ذكره أن النبي صلى الله عليه وسلم أوصى علي بن أبي طالب رضي الله عنه بهذه الوصايا : كذب موضوع على النبي صلى الله عليه وسلم ، لا يصح أن يُنسب إلى الرسول صلى الله عليه وسلم
“যে হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলিয রা.কে এ সকল উপদেশ দিয়েছেন তা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি মিথ্যাচার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম-এর দিকে তা সম্বন্ধ করা ঠিক নয়।” [ফাতাওয়া ইসলামিয়া ৪/১১১]
অথচ বহু হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নামে জেনে-বুঝে মিথ্যাচার করাকে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হিসেবে সতর্ক করা হয়েছে। [সহিহ বুখারি]
إنَّ كَذِبًا عَلَيَّ ليسَ كَكَذِبٍ علَى أَحَدٍ، مَن كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا، فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ

কেউ যদি এই বানোয়াট হাদিস অনুযায়ী আমল করে তাহলে তা বিদআত (দীনের মধ্যে নব আবিষ্কৃত বিষয়) হিসেবে পরিগণিত হবে। আর প্রতিটি বিদআতি আমল প্রত্যাখ্যাত হবে। [সহিহ বুখারী] শুধু তাই নয়, বিদআতি ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসারের পানি পান করা‌ থেকে বিতাড়িত করা হবে। [সহিহ বুখারি]

সুতরাং এই সকল ভ্রান্ত, বাতিল ও হাদিসের নামে মিথ্যা কথাবার্তা মুসলিম সমাজে প্রচার করা জায়েজ নেই।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে ধর্মের নামে সব ধরনের ভ্রান্ত, বাতিল এবং বিদআতি কথাবার্তা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate