February 23, 2023

মক্কার সাথে মুকাররামা এবং মদিনার সাথে মুনাওয়ারা বিশেষণ ব্যবহারের বিধান

 মক্বা শব্দের সাথে ‘মুকাররমা” (সম্মানিত) আর মদিনা শব্দের সাথে ‘মুনাওয়ারা‌’ (আলোকিত) শব্দের ব্যবহার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা সাহাবিদের যুগে পরিচিত ছিল না। পরবর্তীতে মানুষ মুসলিম জাতির সবচেয়ে সম্মান ও আবেগের এই দুই জায়গার প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এই শব্দগুলো যুক্ত করেছে। ফলে মক্কা মুকাররামা বা মক্কাতুল মুকাররমা (مكة المكرمة) এবং মদিনা মুনাওয়ারা (المدينة المنورة) নামগুলো সর্বত্র ব্যাপক ভাবে প্রচলিত হয়ে গেছে। কিন্তু যুগ পরম্পরায় আলিমগণ কখনো এই শব্দগুলোর ব্যাপারে শক্ত আপত্তি করেননি বা এগুলোকে বিদআত হিসাবে আখ্যায়িত করেননি।

অবশ্য কোন কোন আলেম বলেছেন, ‘মদিনা মুনাওয়ারা’-এর পরিবর্তে ‘মদিনাতুন‌ নবী’ (مدينة النبي صلى الله عليه وسلم নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শহর), বা (المدينة النبوية) মদিনাহ নববিয়াহ ব্যবহার করা উত্তম। কারণ মদিনা মুনোয়ারা (আলোকিত শহর)-এর মধ্যে ভ্রান্ত অর্থ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর তা হল, বিদআতিরা বিশ্বাস করে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূরের সৃষ্টি এবং তার কবর থেকে নূর বা আলো বিচ্ছূরিত হয়ে এই শহরকে আলোকিত করেছে। তবে আমরা বলব, আল্লাহর নবীর কবরের নূর নয় বরং মক্কা এবং মদিনা উভয়টি আল্লাহর নবীর উপরে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ইলমে ওহি তথা ঐশী জ্ঞানের আলোয় আলোকিত শহর। আসমানি জ্ঞানের আলোর বিচ্ছুরণে এই শহরদ্বয় থেকে অজ্ঞতার অমানিশা বিদূরিত হওয়ার পাশাপাশি সেই আলো আলোকিত করেছে অন্ধকারাচ্ছন্ন সমগ্র পৃথিবীকে।

🔸আল্লামা শাইখ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন রাহ.-কে প্রশ্ন করা হয় যে, মক্কার বিশেষণ হিসেবে ‘মুকাররামা’ (সম্মানিত) এবং মদিনার বিশেষণ হিসেবে ‘মুনাওয়ারা’ (আলোকিত) শব্দ ব্যবহার কি বিদআতের অন্তর্ভূক্ত? ‘মক্কা মুকাররামা মুহাররামা’ এবং ‘মদিনা নববিয়া’ বলা কি অধিক উত্তম? দয়া করে জানিয়ে বাধিত করবেন। জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।

উত্তরে তিনি বলেন,

لا أعلم أن مكة توصف بـ مكة المكرمة في كلام السلف، وإنما يقال: مكة فقط، وكذلك المدينة لا توصف بأنها منورة في كلام السلف وإنما يسمونها المدينة، لكن حدث أخيراً بأن يقال في مكة: المكرمة، ويقال في المدينة: المنورة، ومكة سماها الله سبحانه وتعالى بلداً آمناً، وسماها بلداً محرماً، كما قال سبحانه {إِنَّمَا أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ رَبَّ هَذِهِ الْبَلْدَةِ الَّذِي حَرَّمَهَا} [النمل:٩١]، وكذلك مباركة، وأما المدينة فهي لا شك المدينة النبوية وأنها طيبة كما سماها النبي صلى الله عليه وسلم بـ طيبة، لكن الناس اتخذوها عادة أن يقولوا: المدينة المنورة ومكة المكرمة، وليتهم يقولون: مكة فقط والمدينة فقط؛ لأننا لسنا أشد تعظيماً لهذين البلدين ممن سلفنا
“সালাফদের কথাবার্তায় মক্কা ‘মক্কাতুল মুকাররামা’ নামে পরিচিত ছিল বলে জানা নেই। অনুরূপভাবে সালাফদের কথাবার্তায় মদিনাকে ‘মদিনাতুল মুনাওয়ারা’ নামেও বিশেষিত করা হতো না। তারা শুধু ‘মদিনা’ বলতেন। কিন্তু পরবর্তীতে ‘মক্কা মুকাররামা’ এবং ‘মদিনা মুনাওয়ারা’ বলার বিষয়টি ঘটেছে।
আল্লাহ তাআলা মক্কাকে আল বালাদুল আমিন বা ‘নিরাপদ শহর’ বলে নামকরণ করেছেন। ‘আল বালাদুল হারাম বা ‘সম্মানিত শহর’ বলে নামকরণ করেছেন। যেমন: আল্লাহ বলেন,
إِنَّمَا أُمِرْتُ أَنْ أَعْبُدَ رَبَّ هَٰذِهِ الْبَلْدَةِ الَّذِي حَرَّمَهَا
“আমি তো কেবল এই নগরীর প্রভুর এবাদত করতে আদিষ্ট হয়েছি, যিনি একে হারাম (সম্মানিত) করেছেন।” [সূরা নামল: ৯১] অনুরূপভাবে তা মুবারাকাহ বা বরকতমণ্ডিত।
আর নিঃসন্দেহে মদিনা হল, ‘মদিনাতুন নববিয়াহ’, এটি ‘তাইয়েবাহ’ (পবিত্র)। যেমন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটিকে ‘তাইয়েবা’ (পবিত্র) বলে নামকরণ করেছেন। কিন্তু মানুষ ‘মদিনা মুনাওয়ারা’ ও‌ ‘মক্কা মুকাররামা’ বলাকে অভ্যাস বানিয়ে নিয়েছে। মানুষ যদি শুধু মক্কা বলতো, শুধু মদিনা বলতো তাহলে কতই না ভালো হতো! কারণ আমরা তো এই দুই শহরকে আমাদের সালাফদের থেকে বেশি সম্মান করি না।” [মাজমু ফাতাওয়া-শাইখ উসাইমিন, ২২/২৪০-প্রশ্ন নাম্বার ৭৫৭]

তিনি অন্যত্র বলেছেন,
لا أعرف أصلاً من الشرع لوصف مكة بالمكرمة، ووصف المدينة بالمنورة، وكلتاهما في الحقيقة مكرمتان معظمتان محرمتان، وكلتاهما منورتان بالوحي مكة بابتدائه، والمدينة بانتهائه، وتلك مكان ولادة النبي – صلى الله عليه وسلم – وابتداء دعوته، وهذه مكان وفاته وكمال رسالته، والله لطيف خبير
“শরিয়তে মক্কাকে ‘মুকাররামা’ বিশেষণ বা মদিনাকে ‘মুনাওয়ারা’ বিশেষণে বিশেষিত কোনো ভিত্তি আছে বলে জানি না। প্রকৃতপক্ষে এ দুটি শহরই সম্মানিত, মর্যাদাবান এবং হারাম।
দুটি শহরই আল্লাহর ওহির মাধ্যমে আলোকিত। মক্কা আলোকিত ওহির সূচনার মাধ্যমে এবং মদিনা আলোকিত ওহির সমাপ্তির মাধ্যমে। মক্কা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মভূমি এবং তার দাওয়াতের সুতিকা গৃহ আর মদিনা তাঁর অন্তিম শয্যা এবং রিসালাতের পূর্ণতার কেন্দ্র ভূমি।” [মাজমু ফাতাওয়া-শাইখ উসাইমিন, ২২/২৪০-প্রশ্ন নাম্বার ৭৫৮]

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।

কেমন আছেন বনাম আল্লাহ আপনাকে কেমন রেখেছেন এবং ভালো আছি বনাম আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন বিষয়ে বিভ্রান্তি নিরসন

 বর্তমানে কাউকে কাউকে বলতে শুনা যাচ্ছে যে, “কেমন আছেন/কেমন আছো” বলা যাবে না এবং এর উত্তরে “ভালো আছি” বলা যাবে না। বরং বলতে হবে যে, “আল্লাহ আপনাকে কেমন রেখেছেন?” আর উত্তরে বলতে হবে, “আল্লাহ আমাকে ভালো রেখেছেন।” “কেমন আছেন” বলা নাকি নাকি আশআরি আকিদা (!), আবার কেউ বলে, এতে নাকি মানুষ আল্লাহর সমকক্ষ হয়ে যায়! কারণ মানুষ নিজে নিজে ভালো থাকে না ইত্যাদি।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: ইসলাম সম্পর্কে সঠিক গবেষণা না থাকা কিংবা ইসলাম সম্পর্কে ভুল বুঝের কারণে কিংবা বিজ্ঞ আলেমদের সংস্পর্শ থেকে ইলম অর্জন না কারণে বর্তমানে অনেক মানুষ, এমনকি আমাদের দেশীয় কোনও কোনও আলেম/বক্তাও এ সব নতুন নতুন দর্শনের আবির্ভাব ঘটিয়ে যুগযুগ ধরে চলে আসা বৈধ বিষয়ে মানুষের মাঝে অযথা বিভ্রান্তি তৈরি করছে- যা কোনও কোনভাবেই কাম্য নয়।

যাহোক, আমরা দেখি, মানুষকে “কেমন আছেন/কেমন আছো” বলে প্রশ্ন করা এবং উত্তরে “ভালো আছি” বলার ব্যাপারে শরিয়তের কোনও আপত্তি আছে কি না।

মূলত: “কেমন আছেন/কেমন আছো?” “ভালো আছি” এই সকল বাক্য ব্যবহারে শরিয়তের দৃষ্টিতে কোনও সমস্যা নেই। কেননা হাদিসে এই বাক্যগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিকে প্রশ্ন করেছেন, “কেমন আছেন? কী অবস্থা আপনাদের?” আর সাহাবি উত্তর দিয়েছেন, “ভালো আছি!”

সাহাবিদের মাঝেও এ জাতীয় বাক্য ব্যবহারের প্রচলন ছিল। (তবে “ভালো আছি” বলার পর “আলহামদুলিল্লাহ’ বলা বা আল্লাহর প্রশংসা করা উচিত)

নিম্নে এ বিষয়ে কয়েকটি হাদিস পেশ করা হল:

◆ ১. আয়েশা রা. বলেন,
جاءت عجُوزٌ إلى النبيِّ صلى الله عليه وسلم وهو عندي، فقال: لها رسول الله صلى الله عليه وسلم: ((مَن أنتِ؟))، قالت: أنا جثَّامةُ المُزنيَّة، فقال: ((بل أنت حسَّانةُ المُزنيَّةُ، كيف أنتُم؟ كيف حالُكم؟ كيف كنتُم بعدنا؟))، قالت: بخيرٍ بأبي أنت وأُمِّي يا رسول الله، فلمَّا خرجَتْ قلتُ: يا رسول الله، تُقبِلُ على هذه العجوز هذا الإقبال؟ فقال: ((إنَّها كانت تَأتينا زمن خديجة، وإنَّ حُسن العهد من الإيمان

“একবার রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এক বৃদ্ধা আসলেন। তিনি তখন আমার নিকট ছিলেন। রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বৃদ্ধা মহিলাটিকে বললেন, কে আপনি?
তিনি উত্তরে বললেন, আমি জাসসামা আল মুযানিয়া (মুযানী গোত্রের নির্বোধ বা কুৎসিত মহিলা)। তিনি বললেন, “না, বরং আপনি হলেন, হাসসানা আল মুযানিয়া (মুযানি গোত্রের সুদর্শন নারী)। তো আপনারা কেমন আছেন? আপনাদের কী অবস্থা? আমাদের পরে আপনারা কেমন ছিলেন? বৃদ্ধা মহিলা উত্তরে বললেন, ভালো আছি, হে আল্লাহর রসুল আমার মা-বাবা আপনার উপর কুরবান হোক।
অতঃপর বৃদ্ধা মহিলা বিদায় নিলে আমি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বললাম, “হে আল্লাহর রসুল, আপনি এত গুরুত্বের সাথে এ বৃদ্ধার খোঁজ-খবর নিলেন!” (এর কারণ কী?) তিনি বললেন, খদিজা রা.-এর সময় (খাদিজা রা. বেঁচে থাকা অবস্থায়) এ মহিলা আমাদের নিকট আসতেন। আর “অতীত সম্পর্ক ও পুরনো ভালবাসার যত্ন নেওয়া ঈমানের অন্তর্ভুক্ত।” [মুসতাদরাকে হাকেম, হা/৪০, সিলসিলা সহীহা-১/৪২৪-শাইখ আলবানি]

উল্লেখ্য যে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্ত্রীর সাথে তো সুন্দর আচরণ করতেনই, স্ত্রীর পরিবার ও স্বজনদের প্রতিও সুন্দর ও উত্তম আচরণ করতেন। এমনকি তার স্ত্রীর বয়োবৃদ্ধ সঙ্গিনীদের প্রতিও সদয় ও যত্নবান ছিলেন৷ তাদের খোঁজখবর নিতেন৷ প্রয়োজনে সাহায্য করতেন৷ উপরোক্ত হাদিসটি তার একটি উদাহরণ।

◆ ২. অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

عن عبد الله بن عمرو قال: قال رسول الله -صلى الله عليه وسلم- لرجل: “كيف أصبحت يا فلان؟”. قال: أحمد الله إليك، يا رسول الله. فقال رسول الله -صلى الله عليه وسلم-: “ذلك الذي أردت منك”

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক ব্যক্তিকে প্রশ্ন করলেন, হে অমুক, তুমি কীভাবে সকাল করলে? (অর্থাৎ তোমরা রাত কেমন কেটেছে?)
তিনি বললেন, আলহামদু লিল্লাহি ইলাইকা (আমি আপনার নিকট (বা সাথে) আল্লাহর প্রশংসা করছি) হে আল্লাহর রসুল!
রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “আমি তোমার এটাই প্রত্যাশা করেছি।” [হায়সামি বলেন, হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ত্ববারানি। এর সনদ হাসান। শাইখ আলাবানি বলেন, হাদিসটি সহিহ। সহিহ-সিলসিলা সহীহা ৬/১০৯৭, হা/২৯৫২]
এখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিকে বলেন নি যে, “আল্লাহ তোমার রাত কেমন কাটিয়েছেন?”

◆ ৩. অন্য একটি হাদিসে এসেছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ: أَنَّهُ سَمِعَ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ وَسَلَّمَ عَلَيْهِ رَجُلٌ فَرَدَّ السَّلَامَ، ثُمَّ سَأَلَ عُمَرُ الرَّجُلَ: كَيْفَ أَنْتَ؟ فَقَالَ: أَحْمَدُ اللَّهَ إِلَيْكَ، فَقَالَ عُمَرُ: “هَذَا الَّذِي أَرَدْتُ مِنْكَ”.

আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি শুনেছেন যে, এক ব্যক্তি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. কে সালাম দিলে তিনি সালামের উত্তর দেওয়ার পর লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কেমন আছো?”
তিনি বললেন, “আলহামদু লিল্লাহি ইলাইকা।” (আমি আপনার নিকট (বা সাথে) আল্লাহর প্রশংসা করছি)। উমর রা. বললেন, আমি তোমার এমনটাই প্রত্যাশা করেছি।” [শাইখ আলাবানি বলেন, হাদিসটি সহিহ-সিলসিলা সহীহা ৬/১০৯৯, ও সহীহুল আদাবুল মুফরাদ ১/৪৩৭, হা/৮৬৬]
তাছাড়া যুগে যুগে মুহাদ্দিস, মুফাসসির, মুসলিম মনিষী, আরবি কবি, সাহিত্যিক ও সাধারণ মুসলিমগণ এই বাক্যগুলো ব্যবহার করেছেন। এর ভূরি ভূরি প্রমাণ রয়েছে। কিন্তু পূর্ববর্তী কোনও বিজ্ঞ আলেম এগুলোকে হারাম, নাজায়েজ, বিদআত, আশআরি আকিদা ইত্যাদি বলেছেন প্রমাণ পাওয়া যায় না।

সুতরাং মানুষকে দীন সম্পর্কে নতুন কিছু শেখানোর নামে অথবা সব কিছুর মধ্যে শিরক-বিদআত খোঁজার নামে সম্পূর্ণ বৈধ একটি বিষয়ে মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছাড়ানো মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। আল্লাহ আমাদেরকে সব ধরনের ভ্রান্ত কথাবার্তা এবং দীন সম্পর্কে ভুল বুঝ ও ভুল ব্যাখ্যা থেকে হেফাজত করুন। আমিন। আল্লাহু আলম।▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
লেখক:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ এর মধ্যে লা অক্ষরটি টেনে না পড়লে কি তা সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ প্রকাশ করবে

 প্রশ্ন: ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’ এর মধ্যে ‘লা’ অক্ষরটি টেনে না পড়লে কি অর্থ পরিবর্তন হয়ে যাবে? কারণ ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখা যায়, যেখানে বলা হচ্ছে যে, ‘লা’ টেনে না পড়লে তার অর্থ সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে যাবে। তা হল, “অবশ্যই আল্লাহ ছাড়া উপাস্য আছে।” এ কথা কি সঠিক? আর লাম অক্ষরটি কি তিন আলিফ পরিমাণ টেনে পড়তে হবে?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: “লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ” (আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই) হল, বিশ্ব চরাচরের মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় এবং মর্যাদার দিক দিয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ বাক্য। এটি সর্বোত্তম জিকির এবং জান্নাতের চাবি। কারণ তা আল্লাহর তাওহিদ বা একত্ববাদের স্বীকৃতি জ্ঞাপক বাক্য। তাই আমাদের উচিত, এটিকে সঠিক নিয়মে নির্ভুলভাবে পাঠ করা এবং এর মর্মার্থ উপলব্ধি করে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।

🔸’লা ইলা-হা ইল্লাল্লাহ’-এর প্রথম লামের মধ্যে সামান্য টান (মাদ্দ) সহকারে পড়াটাই বিশুদ্ধ। তবে আরবি ভাষা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার কারণে অথবা তাড়াতাড়ি পড়ার কারণে কেউ যদি তা টান ছাড়া পরে তাহলে তা নিঃসন্দেহে আরবি ব্যাকরণগত ভুল বলে গণ্য হবে। কিন্তু এই ভুলের কারণে তার অর্থের মধ্যে কোনও পরিবর্তন হবে না। কেননা আরবি গ্রামার অনুযায়ী الجملة الإسمية (জুমলাহ ইসমিয়্যাহ)-এর শুরুতে (মুবতাদায়) কখনো লামে তাকিদ (لام تاكيد বা নিশ্চয়তা জ্ঞাপক লাম) আসে না। অতএব আরবি ব্যাকরণের দৃষ্টিতে উপরোক্ত ব্যাখ্যা নিতান্তই অজ্ঞতাপ্রসূত।
মোটকথা, ‘লা ইলা-হা’-এর শুরুতে লাম অক্ষরে সামান্য টান (মাদ্দ) সহকারে পড়তে হবে। এটাই আরবি ভাষার নিয়ম অনুযায়ী সঠিক উচ্চারণ। তবে টান ছাড়া পড়লে উচ্চারণগত ভুল হলেও বাক্যের অর্থ বিকৃত হবে না‌।

সুতরাং যেমনটি বলা হচ্ছে যে, ‘লা’ অক্ষরটি টান ছাড়া পড়লে অর্থ হবে, “অবশ্যই আল্লাহ ছাড়া উপাস্য আছে”-এ কথা সঠিক নয়। কেউ কেউ আরও একধাপ বাড়িয়ে বলে যে, লাম অক্ষর টেনে না পড়লে কাফের হয়ে যাবে! এটা নিতান্তই বাড়াবাড়ি ছাড়া কিছু নয়।

🔸আর ‘লা’ অক্ষরটি তিন আলিফ টেনে পড়া জরুরি নয়। কেননা তাজবিদের নিয়মাবলী শুধু কুরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; অন্য কোন দুআ, তাসবিহ, জিকির, হাদিস বা সাধারণ আরবি ভাষার ক্ষেত্রে নয়।
আল্লাহু আলম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমণ কিয়ামতের সর্বপ্রথম আলামত

 প্রশ্ন: আমি কোন এক ওয়াজে শুনেছিলাম যে, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আগমন’ কিয়ামতের একটি আলামত। এটা কি সঠিক?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: হ্যাঁ, এটি হাদিস সম্মত সঠিক কথা। নিঃসন্দেহে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বশেষ নবী। তারপরে কিয়ামতের পূর্বে আর কোন নবির আগমন ঘটবে না‌। অর্থাৎ এর পরেই কেয়ামত সংঘটিত হবে।
সুতরাং তাঁর আগমন নিশ্চিতভাবেই কিয়ামতের একটি আলামত। এটি সর্বপ্রথম আলামত যার মাধ্যমে কিয়ামত ঘনিয়ে আসার আলামতের সূচনা হয়েছে এবং হাদিসে বর্ণিত অন্যান্য আলামতগুলো একের পর এক ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।

◆ প্রখ্যাত সাহাবি সাহল রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةَ هَكَذَا وَيُشِيرُ بِإِصْبَعَيْهِ فَيَمُدُّ بِهِمَا

“আমাকে পাঠানো হয়েছে কিয়ামতের সঙ্গে এভাবে। এ কথা বলে তিনি তাঁর দু আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করে সে দুটোকে প্রসারিত করলেন।” [সহীহুল বুখারী, অধ্যায়: ৮১/ কোমল হওয়া, পরিচ্ছেদ: ২৭২১. নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী: “আমাকে পাঠানো হয়েছে কিয়ামতের সাথে এ দুটি আঙ্গুলের ন্যায়।” (আল্লাহ তাআলার বাণী:)
وَمَا أَمْرُ السَّاعَةِ إِلاَّ كَلَمْحِ الْبَصَرِ أَوْ هُوَ أَقْرَبُ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ

“আর কিয়ামতের ব্যাপার তো চোখের পলকের ন্যায় বরং তা অপেক্ষাও সত্ত্বর। আল্লাহ সর্ববিষয়ে সর্বশক্তিমান।” [সূরা নাহল: ৭৭]

◆ জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

إِذَا خَطَبَ احْمَرَّتْ عَيْنَاهُ وَعَلاَ صَوْتُهُ وَاشْتَدَّ غَضَبُهُ حَتَّى كَأَنَّهُ مُنْذِرُ جَيْشٍ يَقُولُ ‏”‏صَبَّحَكُمْ وَمَسَّاكُمْ”: وَيَقُولُ ‏”‏ بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةَ كَهَاتَيْنِ ‏”‏‏ وَيَقْرُنُ بَيْنَ إِصْبَعَيْهِ السَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى

“রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুতবা দিতেন তখন তার চক্ষুদ্বয় রক্তিম বর্ণ হতো, স্বর উঁচু হতো এবং কঠোর রাগ প্রকাশ পেত। মনে হতো, তিনি যেন আক্রমণকারী বাহিনী সম্পর্কে সতর্ক করেছেন আর বলছেন, তারা তোমাদের উপর সকালে আক্রমণ করবে এবং বিকেলে আক্রমণ করবে।
আর তিনি বলতেন, আমি প্রেরিত হয়েছি এমন অবস্থায় যে, আমি ও কিয়ামত এ দুটির ন্যায়: অতঃপর তিনি মধ্যমা ও তর্জনী (শাহাদত) অংগুলী মিলিয়ে দেখাতেন।” [সহিহ মুসলিম (ইসলামিক ফাউন্ডেশন), অধ্যায়: ৮/ জুমা, অনুচ্ছেদ: ৮. সালাত ও খুতবা সংক্ষিপ্তকরণ]
এই মমার্থবোধক আরও একাধিক হাদিস রয়েছে।

◍ ইমাম কুরতুবি বলেন,

أولها النبي ﷺ لأنه نبي آخر الزمان، وقد بُعِثَ ليس بينه وبين القيامة نبي

“কিয়ামতের প্রথম আলামত, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। কেননা, তিনি শেষ জমানার নবি। তিনি এমন সময় প্রেরীত হয়েছেন যে, তাঁর মাঝে এবং কিয়ামতের মাঝে আর কোনও নবি নেই।” [আত তাযকিরাহ ফী আলামাতিস সাআহ, (কিয়ামতের আলামত বার্তা) পৃষ্ঠা নম্বর: ১২১৯]

◍ সহিহ বুখারির ভাষ্যকার হাফেজুল হাদিস ইবনে হাজার আসকালানি বলেন,

قال الضحاك: أول أشراطها بعثة محمد صلى الله عليه وسلم. والحكمة في تقدم الأشراط إيقاظ الغافلين وحثهم على التوبة والاستعداد

“যাহহাক (বিশিষ্ট মুফাসসির এবং তাবেঈ-মৃত্যু:১০২, মতান্তরে ১০৫ বা ১০৬] বলেছেন, “কিয়ামতের প্রথম আলামত হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমন। আর কিয়ামতের পূর্বে তার আলামত সমূহ প্রকাশিত হওয়ার উদ্দেশ্য হল, অসচেতনদেরকে সচেতন করা এবং তাদেরকে তওবা ও কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণে উৎসাহ প্রদান।” [ফাতহুল বারী]
➤ আলেমগণ এটি কেয়ামতের ছোট আলামতসমূহের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ থেকে প্রতিয়মান হয় যে, কিয়ামতের সব আলামত খারাপ বা অকল্যাণকর নয়। বরং কিছু কিছু আলামত ভালো ও কল্যাণকর। হে আল্লাহ, কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে তুমি আমাদেরকে তওবা করে কিয়ামতের প্রস্তুতি গ্রহণের তাওফিক দান করো। আমিন।

▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

January 24, 2023

পরপুরুষ, পরমহিলা, অমুসলিম ইত্যাদির নিকট কাপড় ধৌত করা, ইস্ত্রি করা বা সেলাই করা সংক্রান্ত শরঈ মাসায়েল

 প্রশ্ন:

১. কাজের মহিলা যে বাসায় কাজ করে সেই বাসার পুরুষদের আন্ডারওয়্যার ধুতে পারবে কী?
২. কোনও মহিলা তার স্বামী-সন্তান ব্যতিরেকে তার শ্বশুর, দেবর-ভাসুর ইত্যাদি বাড়ির অন্যান্য পুরুষদের আন্ডারওয়্যার ধুতে পারবে কী?
৩: মহিলাদের জামা-কাপড়, শাড়ি, ব্লাউজ, বোরকা ইত্যাদি পোশাক আয়রন/ইস্ত্রি করার জন্য দোকানে দেওয়া জায়েজ হবে‌ কী?
৪. পাক অথবা নাপাক কাপড় বিধর্মী পরিচালিত লন্ড্রিতে ধৌত করতে দিলে তা কি পবিত্র হবে? অর্থাৎ সেই কাপড়ে নামাজ আদায় করা জায়েজ হবে কী?
▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
উত্তর: নিম্নে উপরোক্ত প্রশ্ন সমূহের সংক্ষিপ্ত উত্তর প্রদান করা হল:
وبالله التوفيق

◈ প্রশ্ন ১. কাজের মহিলা যে বাসায় কাজ করে সেই বাসার পুরুষদের আন্ডারওয়্যার ধুতে পারবে কী?
উত্তর: কাজের মহিলা যে বাড়িতে কাজ করে সে বাড়ির কর্তা ও ছেলেদের আন্ডারওয়্যার ধৌত করতে পারে। এতে কোনও বাধা নেই। তবে যদি আন্ডার ওয়্যারে বীর্য দৃশ্যমান থাকে তাহলে যারা তা ব্যবহার করে তাদের উচিৎ, সে অবস্থায় কাজের মহিলাকে ধোয়ার জন্য না দেয়া বরং তাদের উচিৎ, বীর্য লেগে শুকিয়ে গেলে তা আঙ্গুল দ্বারা ঘষে ফেলা বা ঐ অংশটুকু পানি দ্বারা পরিষ্কার করে নেওয়া। কারণ এটি স্বভাবত: একজন নারীর জন্য লজ্জাবোধের কারণ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হাম্মাম ইবনে হারিস রাহ. বর্ণনা করেন যে,
ضَافَ عَائِشَةَ ضَيْفٌ فَأَمَرَتْ لَهُ بِمِلْحَفَةٍ صَفْرَاءَ فَنَامَ فِيهَا فَاحْتَلَمَ فَاسْتَحْيَا أَنْ يُرْسِلَ بِهَا وَبِهَا أَثَرُ الاِحْتِلاَمِ فَغَمَسَهَا فِي الْمَاءِ ثُمَّ أَرْسَلَ بِهَا فَقَالَتْ عَائِشَةُ لِمَ أَفْسَدَ عَلَيْنَا ثَوْبَنَا إِنَّمَا كَانَ يَكْفِيهِ أَنْ يَفْرُكَهُ بِأَصَابِعِهِ وَرُبَّمَا فَرَكْتُهُ مِنْ ثَوْبِ رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم بِأَصَابِعِي ‏
একবার আয়েশা রা. এর কাছে একজন মেহমান আগমণ করলো। তিনি তাকে একটি হলুদ রঙ্গের চাদরে বিশ্রাম করতে দিলেন। উক্ত মেহমান তা গায়ে জাড়িয়ে ঘুমালেন। কিন্তু ঘুমের মধ্যে তার স্বপ্নদোষ হলে বীর্যের দাগসহ চাদরটি আয়েশা রা.-এর কাছে ফেরত পাঠাতে তার খুব লজ্জাবোধ হল। তাই এটি পানিতে চুবিয়ে ধুয়ে তিনি তা ফেরত পাঠালেন। আয়েশা রা. তা দেখে বললেন, সে আমাদের কাপড়টা নষ্ট করল কেন? আঙ্গুল দিয়ে তা ঘষে ফেললেই তো যথেষ্ট হতো। অনেক দিনই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাপড় থেকে আমি তা অঙ্গুল দিয়ে রগড়ে ঘষে সাফ করে দিয়েছি।” [ইবনে মাজাহ ৫৩৮, মুসলিম, তিরমিযি হা/১১৬-আল মাদানি প্রকাশনী]

◈ প্রশ্ন ২. কোনও মহিলা কি তার স্বামী-সন্তান ছাড়া শ্বশুর, দেবর, ভাসুর ইত্যাদি বাড়ির অন্যান্য পুরুষদের আন্ডারওয়্যার ধুতে পারবে কী?
উত্তর: ইসলামের দৃষ্টিতে একজন স্ত্রীর জন্য তার স্বামী ছাড়া স্বামীর বাবা (শ্বশুর), ভাই (দেবর-ভাসুর) ইত্যাদি লোকজনের বিভিন্ন ধরণের সেবা করা, কাপড় ধৌত করা ইত্যাদি আবশ্যক না হলেও এটি আমাদের সমাজের প্রচলিত রীতি। অর্থাৎ আমাদের সমাজে যৌথ পরিবারে সাধারণত বৌরাই বাড়ির সকল সদস্যের জামা-কাপড় ধৌত করে থাকে।
তাই স্বামী যদি এতে অনুমতি বা নির্দেশ দেয় তাহলে স্ত্রী তার স্বামী-সন্তান ছাড়া পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাপড়-চোপড়ও ধৌত করতে পারে। এ ক্ষেত্রে অন্য পুরুষদের আন্ডার ওয়্যারও ধৌত করতে পারে যদি ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকে। কিন্তু স্বামী ব্যতিরেকে অন্য কোন পুরুষের আন্ডারওয়ার ধৌত করার বিষয়টি সামাজিকভাবে ঘৃণিত এবং আত্মমর্যাদা পরিপন্থী কাজ। তাই কোন মহিলাকে এই দায়িত্ব দেওয়া অনুচিত। অবশ্য বর্তমান আধুনিক যুগে ওয়াশিং মেশিনের সাহায্যে কাপড় ধৌত করা হলে এ ক্ষেত্রে সমস্যা আরও কমে যায় আল হামদুলিল্লাহ।

◈ প্রশ্ন ৩. মহিলাদের জামা-কাপড়, শাড়ি, ব্লাউজ, বোরকা ইত্যাদি পোশাক আয়রন/ইস্ত্রি করার জন্য দোকানে দেওয়া জায়েজ হবে কী?
উত্তর: মহিলাদের ব্যবহৃত পোশাক প্রয়োজনবোধে ধৌত ও ইস্ত্রি করার উদ্দেশ্যে পুরুষ পরিচালিত লন্ড্রিতে বা ছেঁড়া-ফাটা কাপড় সেলাই করার উদ্দেশ্যে পুরুষ দর্জির দোকানে দিতে কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ। কেননা ইসলামি শরিয়তে এমন কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে কোনও নারী যদি ব্যক্তিগত আত্মমর্যাদার কারণে তার ব্যবহৃত পোশাক কোন পুরুষকে দেখাতে না চায় তাহলে তা‌ ধৌত করা, ইস্ত্রি/আইরন করা বা প্রয়োজনীয় সেলাইয়ের কাজ সম্ভব হলে কোন নারীর মাধ্যমে সম্পন্ন করবে অথবা নিজেই করবে।

◈ প্রশ্ন ৪. পাক অথবা নাপাক কাপড় বিধর্মী পরিচালিত লন্ড্রিতে ধৌত করতে দিলে কি তা পবিত্র হবে? অর্থাৎ সেই কাপড়ে নামাজ আদায় করা জায়েজ হবে কি?
উত্তর: কোন অমুসলিমও যদি পাক পানি দ্বারা ভালোভাবে কাপড় ধৌত করে তাহলে তা পাক হবে। পক্ষান্তরে কোন মুসলিমও যদি নাপাক পানি দ্বারা কাপড় ধৌত করে তাহলে তা পাক হবে না। মোটকথা, কোন পানি দ্বারা কাপড় ধৌত করা হয় সেটাই ধর্তব্য। যে ধৌত করল সে মুসলিম কি না তা ধর্তব্য নয়। উল্লেখ্য যে, অমুসলিমরা ঈমান না থাকার কারণে বিধানগতভাবে নাপাক হলেও বাহ্যিকভাবে তাদের শরীর নাপাক নয় যদি তারা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। সুতরাং তাদের সেলাই কৃত পোশাক-আশাক এবং তাদের তৈরি কৃত আসবাবপত্র ব্যবহার করা নাজায়েজ নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবিগণ তৎকালীন দামেশক (সিরিয়া) ও ইয়েমেন থেকে আমদানিকৃত অমুসলিমদের তৈরি কৃত পোশাক-আশাক এবং আসবাব সামগ্রী ব্যবহার করতেন। আল্লাহু আলাম।▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় ফরজ গোসলের বিধান

 প্রশ্ন: রাতে স্বপ্নদোষ হলে এই শীতের সকালে গোসল সম্ভব নয়। তাহলে এ ক্ষেত্রে নামাজ পড়তে চাইলে কী করা উচিত?▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬

উত্তর: স্বপ্নদোষ হওয়া বড় নাপাকির অন্তর্ভুক্ত। এ থেকে পবিত্রতার জন্য গোসল করা ফরজ। সুতরাং এমনটি ঘটলে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার সময় পানি গরম করে গোসল করতে হবে। কিন্তু যদি এমন পরিস্থিতির মধ্যে থাকেন যে, সেখানে পানি গরমের কোনো ব্যবস্থা নেই এবং ঠাণ্ডা পানিতে গোসলের কারণে অসুস্থ হওয়ার কিংবা রোগ-ব্যাধি বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা আছে তাহলে এক্ষেত্রে পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করা জায়েজ। কিন্তু পানি গরমের ব্যবস্থা থাকলে তায়াম্মুম করা জায়েজ হবে না।
◆ আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَاتَّقُوا اللَّهَ مَا اسْتَطَعْتُم
“তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করো।” [সূরা তাগাবুন: ১৬]
◆ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إِذَا أَمَرْتُكُمْ بِأَمْرٍ فَأْتُوا مِنْهُ مَا اسْتَطَعْتُمْ
“আমি যদি তোমাদেরকে কোন বিষয়ে আদেশ করি তাহলে সাধ্য অনুসারে তা পালন করবে।” [সহিহ বুখারি]

◆ হাদিসে আরও এসেছে, প্রখ্যাত সাহাবী আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,
احتَلمتُ في ليلةٍ باردةٍ في غزوةِ ذاتِ السُّلاسلِ فأشفَقتُ إنِ اغتَسَلتُ أن أَهْلِكَ فتيمَّمتُ، ثمَّ صلَّيتُ بأصحابي الصُّبحَ فذَكَروا ذلِكَ للنَّبيِّ صلَّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ فقالَ: يا عَمرو صلَّيتَ بأصحابِكَ وأنتَ جنُبٌ ؟ فأخبرتُهُ بالَّذي مَنعَني منَ الاغتِسالِ وقُلتُ إنِّي سَمِعْتُ اللَّهَ يقولُ:( وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا ) فضحِكَ رسولُ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ عليهِ وسلَّمَ ولم يَقُلْ شيئًا
“যাতুস সালাসিল যুদ্ধের সময় এক প্রচণ্ড শীতের রাতে আমার স্বপ্নদোষ হয়। আমার ভয় হল, আমি যদি গোসল করি তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হব। তাই আমি তায়াম্মুম করে লোকজনকে নিয়ে সালাত আদায় করলাম। পরে তারা বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানালে তিনি বললেন, “হে আমর, তুমি নাকি জুনুবি (নাপাক) অবস্থায় তোমার সাথীদের নিয়ে সালাত আদায় করেছো?” তখন আমি গোসল না করার কারণ সম্পর্কে তাঁকে অবহিত করলাম এবং বললাম, আমি আল্লাহর এই বাণী শুনেছি, (আল্লাহ বলেছেন,)
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
“আর তোমরা নিজেরা নিজেদের হত্যা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি বড়ই দয়াবান’’ (সূরা নিসা: ২৯)। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসলেন এবং কিছুই বললেন না।” [আবু দাউদ-সহিহ] এই হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্মতির মাধ্যমে এমন পরিস্থিতিতে তায়াম্মুম করার বৈধতা প্রমাণিত হয়।

❑ শাইখ আব্দুল্লাহ বিন বায রাহ. বলেন,
إذا كان في محل لا يستطيع فيه تدفئة الماء وليس هناك كن يستكن به للغسل بالماء الدافي وخاف على نفسه فإنه يصلي بالتيمم
ولا حرج عليه
“যদি সে এমন জায়গায় থাকে যেখানে সে পানি গরম করতে পারে না এবং গরম পানি দিয়ে গোসল করার জন্য সেখানে এমন কোনো ঘর না থাকে যেখানে (ঠাণ্ডা থেকে) আত্মরক্ষা করবে এবং (ঠাণ্ডা পানি ব্যবহারের কারণে) শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তাহলে তাকে তায়াম্মুম করে সালাত আদায় করবে। এতে কোনও আপত্তি নেই।” [binbaz]

🔸উল্লেখ্য যে, এই বিধান স্বপ্নদোষের পাশাপাশি স্বামী-স্ত্রী মিলন কিংবা জাগ্রত অবস্থায় বীর্যপাতের মাধ্যমে জুনুবি (নাপাক) হওয়ার ক্ষেত্রে, মহিলাদের ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হওয়া ও প্রসূতি নারীর পবিত্রতার জন্য গোসলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

তাবলিগ জামাতকে না বলার ১২টি কারণ

 الحمد لله و الصلاة و السلام على رسول الله -أما بعد:

নিম্নে তাবলিগ জামাতকে ‘না’ বলার বা প্রত্যাখ্যান করার অসংখ্য কারণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ও গুরুতর ১২টি কারণ উল্লেখ করা হল:

◈ ১. তাবলিগ জামাতের অবস্থা হল, ঘরের ফাউন্ডেশন মজবুত ভাবে তৈরি না করে ডেকোরেশন নিয়ে ব্যস্ত থাকার মত বা ভেঙ্গে পড়া ঘরকে মজবুত ভিত্তির উপরে নির্মাণ করার পরিবর্তে কোনমতে ঠেকা দিয়ে রাখার মত কিংবা যে গাছের শেকড়ে ঘুণ ধরেছে তার মূল সমস্যা বাদ দিয়ে গাছের আগায় পানি ঢালার মত। কেননা মানুষের আকিদা সংশোধন, শিরক, বিদআত, ইসলামবিরোধী নানা মতবাদ, ভ্রান্ত আকিদা-বিশ্বাস ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত করার থেকে এদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, লম্বা দাড়ি রাখা, মাথায় পাগড়ি পরা, লম্বা জুব্বা পরা, বোরকা পরা, মিসওয়াক করা, চিল্লায় বের হওয়া ইত্যাদি।

◈ ২. চতুর্দিকে শিরকের জমজমাট আসর, মানুষ কবর পূজায় লিপ্ত ও বিভিন্ন বাতিল দল ও ফিরকায় দিশেহারা। কিন্তু এসব ব্যাপারে তাদের কোন বক্তব্য নেই। কেননা এসব বিষয়ে কথা বললে নাকি সমাজে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে!

◈ ৩. মানুষ বিদআত, কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতির অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ এসব বিষয়ে কথা বললে নাকি ‘হাজার বছরের ঐক্য’ নষ্ট হবে এবং মানুষের মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ ও ঝগড়া সৃষ্টি হবে।

◈ ৪. এই জামাতের ভিত্তি জাহালত বা মূর্খতার উপরে প্রতিষ্ঠিত। ফলে মানুষকে দীনী ইলম বা ইসলামের বিশুদ্ধ জ্ঞানান্বেষণের দিকে উৎসাহিত করার চেয়ে তাদের কথিত ‘চিল্লা’য় বের হওয়ার জন্য উৎসাহিত করাই তাদের অন্যতম প্রধান কাজ। ফলশ্রুতিতে মূর্খরা মাথায় পাগড়ি বেঁধে ফাজায়েলের কিতাব নিয়ে জনগণের সামনে ওয়াজ করতে দাঁড়িয়ে যায়।তারপর স্বভাবতই ইসলাম সম্পর্কে উল্টাপাল্টা ও ভুলভাল ব্যাখ্যা দিতে শুরু করে।
অনুরূপভাবে দীন সম্পর্কে অজ্ঞ মহিলারাও পাড়ায়-মহল্লায় দ্বীন সম্পর্কে সাধারণ মহিলাদের মাঝে ইসলাম সম্পর্কে নানা ভ্রান্ত ও বিদআতি কথাবার্তা প্রচারে নিয়োজিত রয়েছে। অথচ ইসলাম সম্পর্কে কথা বলা এবং আমল করার পূর্বে ইলম (জ্ঞান) অর্জন করা ফরজ।

◈ ৫. দীনী ইলম অর্জনে অনীহা ও গুরুত্ব হীনতা:

যার কারণে আপনি দেখবেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাবলিগের একজন মুরুব্বি যে, ১০-১৫ বা ২০ বছর ধরে তাবলিগের মেহনতের সাথে জড়িত তাকে যদি ইসলামের প্রাথমিক এবং মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয় তাহলে তার উত্তর দিতে ব্যর্থ হবে। যেমন:
– ইসলাম ও ঈমান কাকে বলে?
– ইসলাম এবং ঈমানের রোকন কয়টি ও কী কী?
– দীনের স্তর কয়টি ও কী কী?
– ইবাদত কাকে বলে?
– ইবাদতের রোকন কয়টি ও কী কী?
– ইবাদত কবুলের শর্তাবলী কয়টি ও কী কী?
– ঈমান ভঙ্গের কারণগুলো কী কী?
– ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর সঠিক অর্থ এবং এর শর্তাবলী কয়টি ও কী কী?
– এছাড়াও শিরক, কুফর, নিফাক, উসিলা, শাফাআত ইত্যাদি। বিষয়টি আপনারা নিজেরাই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

◈ ৬. উদ্ভট কিচ্ছা-কাহিনী এবং জাল-জইফ হাদিস বর্ণনা:
এই মূর্খদের ওয়াজ বা বয়ানের মূল ভিত্তি হলো, বুজুর্গদের বুজুর্গির বর্ণনা, উদ্ভট স্বপ্ন, কিচ্ছা-কাহিনী, জাল-জইফ হাদিসের বয়ান এবং ভিত্তিহীন ফজিলতের ফুলঝুরি। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামে মিথ্যা হাদিস বর্ণনার পরিণতি জাহান্নাম।

◈ ৭. সংস্কার ও সংশোধনে অনীহা:

তাবলিগ জামাতের প্রধান সিলেবাস ফাজায়েল নামক কিতাবগুলো অসংখ্য ভ্রান্ত কথাবার্তা, জাল-জইফ হাদিস এবং ইসলামের অপব্যাখ্যা দিয়ে পরিপূর্ণ। এসব কিতাবের ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কে সচেতন করে এ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাষায় শত শত গ্রন্থ রচিত হলেও তারা মোটেও সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করে না‌। বরং তারা উল্টো সংস্কার প্রত্যাশীদেরকে গালাগালি, নানা অপবাদ ও তির্যক বাক্যবাণে জর্জরিত করে ছলে-বলে-কৌশলে ভুলগুলোকেই সঠিক প্রমাণের অপচেষ্টায় লিপ্ত!

◈ ৮. দলাদলি, কোন্দল ও রক্তপাত:

এই জামাতটি বর্তমানে দুই ভাগে (জুবায়ের পন্থী ও সাদ পন্থী) বিভক্ত হয়ে একে অপরের সাথে চরম কোন্দলে লিপ্ত হয়েছে। মসজিদ ভাগাভাগি, মসজিদে মারামারি, এক মসজিদে দু গ্রুপের আলাদা আলাদা জামাত, একই ময়দানে আলাদা আলাদা ইজতিমা। এমনকি একদল আরেক দলকে কাফের বা ইহুদি-খ্রিষ্টানের দালাল বলেও আখ্যায়িত করছে। সর্বোপরি টঙ্গীর ইজতেমা মাঠে দুই গ্রুপের লোমহর্ষক রক্তাক্ত মারামারি জাতিকে স্তম্ভিত করেছে।

◈ ৯. এদের মাধ্যমে কিছু মানুষ দাড়ি ছেড়েছে, মাথায় টুপি পরেছে, মহিলারা বোরকা পরেছে, নামাজি হয়েছে, নানা পাপকর্ম থেকে ফিরে এসেছে তা ঠিক। কিন্তু শিরক যুক্ত ঈমান এবং বিদআত যুক্ত আমল আল্লাহর কাছে কোনই কাজে লাগবে না সে ব্যাপারে তারা নিতান্তই বেখবর। তাই তো আল্লাহ বলেছেন,
قُلۡ هَلۡ نُنَبِّئُكُم بِٱلۡأَخۡسَرِینَ أَعۡمَـٰلًا
ٱلَّذِینَ ضَلَّ سَعۡیُهُمۡ فِی ٱلۡحَیَوٰةِ ٱلدُّنۡیَا وَهُمۡ یَحۡسَبُونَ أَنَّهُمۡ یُحۡسِنُونَ صُنۡعًا
“(হে নবী আপনি বলুন), আমি কি তোমাদেরকে সেসব মানুষের ব্যাপারে বলবো যারা আমলের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত? তারা হল, সে সব লোক, যাদের কর্ম প্রচেষ্টা দুনিয়ার জীবনেই বাতিল যায় অথচ তারা মনে করে যে, তারা ভালো কাজ করেছে!” [সূরা কাহফ: ১০৩ ও ১০৪]

◈ ১০. এই জামাতটি নিজেদের টাকায় দাওয়াতি কাজ করে বলে গর্ব করে। কিন্তু তারা নিজেদের টাকায় মূলত: বিদআত প্রচারে লিপ্ত। নিজে বিদআত করার চেয়ে বিদআত প্রচারের ভয়াবহতা বেশি। কারণ এর দ্বারা যত মানুষ বিদআতি কাজ করবে তাদের প্রত্যেকের সমপরিমাণ গুনাহ প্রচারকারীর আমলনামায় লিপিবদ্ধ করা হবে।

◈ ১১. কুরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা:

তাবলিগ জামাত জি/হাদের আয়াতগুলোকে তাদের কথিত চিল্লা ও গাশতের পক্ষে ব্যবহার করে, ‘চিল্লা’র জন্য নির্ধারিত ৩ দিন, ৪০ দিন (এক চিল্লা), ১২০ দিন (তিন চিল্লা) বা ১ সাল ইত্যাদির পক্ষে কুরআন-হাদিসের অপব্যাখ্যা করে এগুলোকে বৈধ প্রমাণের চেষ্টা, টঙ্গীর মাঠে এক ওয়াক্ত নামাজের ফজিলত ৪৯ কোটি গুণ সওয়াবের বর্ণনা, তিন বার টঙ্গীর ইজতিমায় শরিক হলে এক হজের সমপরিমাণ সওয়াব বা এটিকে ‘গরিবের হজ’ বলা। (সাধারণ কিছু মূর্খ এমন কথা বললেও তাবলিগ জামাতের কেন্দ্র থেকে এর প্রতিবাদ বা সংশোধনী মূলক বক্তব্য করা হয়েছে বলে জানা যায় না)।
টঙ্গী ইজতেমার বিশেষ আকর্ষণ হল, আখেরি মুনাজাত। মানুষ এখন ফরজ সালাত আদায়ের চাইতে আখেরি মুনাজাতে যোগদান করাকেই অধিক গুরুত্ব দেয়। আখেরি মুনাজাতে শরিক হওয়ার জন্য নামাজি, বেনামাজি, ঘুষখোর, সন্ত্রাসী, বিদআতি, দুষ্কৃতিকারী ইত্যাদি মানুষ দলে দলে টঙ্গীর ময়দানের দিকে ছুটতে থাকে। কেউ ট্রেনের ছাদে, কেউ বাসের হ্যান্ডেল ধরে, নৌকায় বসে, পিকআপ প্রভৃতির মাধ্যমে ইজতিমায় যোগদান করে। স্বয়ং রাষ্ট্রপতি বঙ্গভবনে, প্রধানমন্ত্রী গণভবনে, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীগণও সেখানে গিয়ে আঁচল পেতে প্রার্থনা করেন। টিভিতে সরাসরি এই মুনাজাত সম্প্রচারিত হয়। রেডিও শুনে রাস্তার ট্রাফিকগণও হাত তুলে আমিন আমিন বলতে থাকে। সে দিন ঢাকা শহরে অফিস-আদালতে অঘোষিত ছুটি পালিত হয়। কারণ তাদের বিশ্বাস, এই আখেরি মুনাজাতে অংশ গ্রহণ করতে পারলে জীবনের সব গুনাহ মোচন হয়ে যায়। অথচ এভাবে নিয়ম করে সম্মিলিত মুনাজাত করাই বিদআত (দীনের মধ্যে নব আবিষ্কৃত কাজ)। আল্লাহ আমাদেরকে ক্ষমা করুন। আমিন।

◈ ১২. উম্মতের শ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক সালাফি আলেমগণ (যেমন: শাইখ বিন বায, শাইখ উমাইমিন, শাইখ আলবানি, শাইখ সালেহ আল ফাওযান প্রমুখ) তাবলিগ জামাতের সাথে বের হওয়া, তাদের বই পড়া এবং তাদের ইজতিমায় শরিক হওয়াকে হারাম বলেছেন এবং উম্মতকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।

➤ তাবলিগ জামাতের কোথায় কী সমস্যা এবং সেগুলোর খণ্ডন বিষয়ে নিম্নোক্ত বইগুলো পড়া যেতে পারে:

■ ১. শাইখ হামুদ বিন আব্দুল্লাহ আত তুওয়াইজিরি কর্তৃক রচিত এবং শায়খ মুখলেসুর রহমান বিন মনসুর অনুদিত নিম্নোক্ত গ্রন্থটি:
القول البليغ في التحذير عن جماعه التبليغ
“প্রচলিত তাবলীগ জামাত •সংশয় •সতর্কতা •সমাধান”
বইটি ক্রয় করা যাবে এখান থেকে:
■ ২. তাবলীগ জামা’ য়াত ও দেওবন্দিগণ
সম্পাদনায়: শাইখ আকরামুজ্জামান বিন আব্দুস সালাম
বইটি ক্রয় করা যাবে এখান থেকে:
➣ অথবা এখান থেকে:
■ ৩. ডাউনলোড করুন: (PDF): ইলিয়াসী তাবলীগ ও দীনে ইসলামের তাবলীগ

▬▬▬▬▬▬▬✿◈✿▬▬▬▬▬▬▬
লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি। দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate