June 16, 2022

কেউ যদি নারী পুরুষ সমতায় বিশ্বাস করে, এমন মহিলার সাথে স্কুল,কোচিং এ যাওয়া কি সেই মহিলার কুফরি কাজে সাহায্য হবে?

 ১) আমি যখন বাইরে প্রাইভেট পড়তে যাই, তখন মেয়েরা পড়াশুনা নিয়ে হেল্প চায়, বলে এটা কিভাবে করসিস, আবার আমাকে দেখে বলে তুই অনেক পড়িশ, হয়তবা কেউ কেউ আমাকে দেখে জিদ নিয়ে পড়ে পরীক্ষায় ভাল নাম্বারের জন্য। তারা অজ্ঞতাবশত ফেমিনিজম এ বিশ্বাসী হতে পারে।

আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমার কি তাদেরকে সাহায্য করা উচিত? আর আমাকে দেখে কোন ফেমিনিস্ট আরো উদ্যম নিয়ে পড়লে ( যা আমি জানি না), তাদের এভাবে পরোক্ষভাবে সাহায্য করলে কেমন গুনাহ হবে?

২) কেউ যদি নারী পুরুষ সমতায় বিশ্বাস করে, এমন মহিলার সাথে স্কুল,কোচিং এ যাওয়া কি সেই মহিলার কুফরি কাজে সাহায্য হবে?

উত্তর:

১) পড়ালেখার ব্যাপারে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করতে পারবেন। তবে মেয়ে মেয়েদেরকে সহযোগিতা করবেন এবং ছেলে ছেলেদেরকে সহযোগিতা করবেন। বিপরীত লিঙ্গকে সহযোগিতা করতে গিয়ে যেন ফিতনায় না পড়ে যায় সেদিকে খেয়াল করতে হবে। আর ফেমিনিস্ট এর ব্যাপারে যেহেতু আপনার জানা নাই সেই ক্ষেত্রে চুপ থাকাটাই ভাল। যেই বিষয়ে জানা নাই সেই বিষয়ে চুপ থাকাটাই উত্তম। তবে পড়ালেখার ব্যাপারে কেউ সাহায্য চাইলে তাদেরকে সাহায্য করতে কোন দোষ নাই ইন শাহ্ আল্লাহ।

২) না এমন মহিলার সাথে স্কুল, কোচিং এ যাওয়া তাকে কুফরি কাজে সাহায্য কলার পর্যায়ে পড়বে না। তার কুফরি কথা অনুযায়ী যদি কাউকে বলেন অথবা তা সমর্থন করেন তাহলে তার কুফরি কাজে সাহায্য করা হবে। তবে এধরনের ব্যক্তি থেকে বেঁচে থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই ধরনের ব্যক্তিদের থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর দিয়েছেন:

শাইখ সাইফুল ইসলাম মাদানী।

লেখকের লেখা পোস্টে তার নাম উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সেটা কেটে নিজের মতো করে প্রচার করা

 ▌প্রশ্ন: লেখকের লেখা পোস্টে তার নাম উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও সেটা কেটে নিজের মতো করে প্রচার করাটা কি ইনসাফ এর মধ্যে পড়ে? আর লেখকের নাম প্রকাশে কি রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে?

উত্তর:
অন্যের লেখা নিজের নামে প্রচার করা অথবা লেখকের নাম কেটে তা প্রচার করা নি:সন্দেহে মূল লেখকের প্রতি বেইনসাফি, ইলমি আমানতের খেয়ানত এবং অকৃতজ্ঞতা। আইনের দৃষ্টিতেও এ কাজটি মেধাস্বত্ব চুরির অন্তর্ভুক্ত-যা বৈধ নয়।

ইমাম সুয়ূতী বলেন,

من بركة العلم وشكره عزْوُه إلى قائله

‘ইলমের বরকত এবং শুকরিয়া তখন হবে, যখন এটা কোথা থেকে সংকলন করা হয়েছে, তার উৎস পেশ করা হবে।’

তিনি আরও বলেন, “আব্বাস বিন মুহাম্মাদ আ‌দ দূরী বলেন, “আমি আবু উবাইদকে একথা বলতে শুনেছি, ইলমের শুকরিয়া করা উচিত। তুমি যখন কারো নিকট থেকে উপকৃত হবে, তখন বলবে, আমি এটা জানতাম না, এটা আমার জ্ঞানে ছিল না। এ বিষয়ে উমুক ব্যক্তি বা উমুক কিতাব থেকে এই এই ফায়েদা লাভ করেছি.. এটা হচ্ছে ইলমের শুকরিয়া।” [আল মুযাহহার ২/২৭৩, মাকতাবা শামেলা]

এ ধরণের নিন্দনীয় কাজের ক্ষেত্রে ইমাম আলবানি রহ. নিম্নোক্ত হাদিসটি পেশ করে থাকেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

الْمُتَشَبِّعُ بِمَا لَمْ يُعْطَ كَلَابِسِ ثَوْبَيْ زُورٍ

“মানুষ যে বস্তুর মালিক নয়, তা নিজের বলে প্রকাশ করা, দুটি মিথ্যার চাদর পরিধানকারীর ন্যায়।” (বুখারী ও মুসলিম) [আল কালেমুত তাইয়্যেব- ইবনে তায়মিয়া, তাহকীক আলবানী ভূমিকা, পৃ: ১১]

উলামাগণ অন্য লেখকদের বক্তব্য নকল করাকে নিন্দা করেননি, নকল করার সময় বক্তব্যটি লেখকের দিকে নেসবত না করাটাকে তিনি নিন্দা করেছেন।
বিশেষভাবে আল্লামা নাসির উদ্দিন আলবানী রহ. বক্তব্য উদ্ধৃত করে তা লেখকের দিকে নেসবত না করার বিষয়টিকে কঠিনভাবে সমালোচনা করেছেন। [তাহকীক আল কালেমুত তাইয়্যেব, ইবনে তাইমিয়া বইয়ের তাহকীকের ভূমিকা]

তিনি বলেন, “ইলমের আমনত হচ্ছে, প্রত্যেকটি বক্তব্যকে মূল লেখকের দিকে নেসবত করা।” [সহীহ আবু দাউদ, ১/২২১]
(শাইখ আবদুল্লাহ আল কাফী (হাফিযাহুল্লাহ) রচিত প্রবন্ধ থেকে নেওয়া)

সুতরাং লেখক এর নাম কেটে নিজের নাম বসিয়ে দেওয়া কিংবা মূল লেখকের নাম সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে লেখা প্রকাশ করার এমন হীন মনোভাব থেকে আমাদের বের হয়ে আসা আবশ্যক।

🔶 ইসলামি লেখার সাথে লেখকের নাম উল্লেখ করা কি রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা)?

রিয়া বিষয়টি নিয়তের উপর নির্ভরশীল। কেউ যদি প্রসিদ্ধি অর্জন, প্রশংসা লাভ বা বাহবা কুড়ানোর নিয়তে এ কাজ করে তাহলে তা রিয়া (প্রদর্শনেচ্ছা) বলে গন্য হবে-যা হারাম বরং ছোট শিরক।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ قَالُوا وَمَا الشِّرْكُ الْأَصْغَرُ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ: الرِّيَاءُ، يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ لَهُمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ إِذَا جُزِيَ النَّاسُ بِأَعْمَالِهِمُ اذْهَبُوا إِلَى الَّذِينَ كُنْتُمْ تُرَاءُونَ فِي الدُّنْيَا فَانْظُرُوا هَلْ تَجِدُونَ عِنْدَهُمْ جَزَاءً

“তোমাদের উপর সবচেয়ে ভয়ানক যে বিষয়ের আমি আশংকা করছি তা হল শির্ক আসগার (ছোট শির্ক)।’’ তারা বললেনঃ ছোট শির্ক কী হে আল্লাহর রাসূল?

তিনি বললেন, রিয়া। সম্মানিত আল্লাহ যখন মানুষকে তাদের কর্মফল দান করবেন তখন বলবেন, দুনিয়ায় যাদেরকে দেখানোর উদ্দেশ্যে তোমরা আমল করতে তাদের কাছে যাও। দেখ, তাদের কাছে কোন প্রতিদান পাও কি না?’’

[জাইয়েদ (উত্তম) সনদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ। আরও বর্ণনা করেন, ইমাম বায়হাকি ও ইবনু আবিদ দুনিয়া]

কিন্তু যদি নিজের হক সংরক্ষণ, লেখার দায়-দায়িত্ব গ্রহণ, আমানতদারিতা, মানুষের কাছে লেখার গ্রহণযোগ্যতার উদ্দেশ্যে লেখক নিজের নাম-পরিচয় ইত্যাদি প্রকাশ করে তাহলে তা রিয়ার মধ্যে গণ্য হবে না। বরং অজ্ঞাত ও নাম পরিচয় হীন লেখকের লেখা না পড়াই নিরাপদ। কারণ অনেক বিদআতি ও ভ্রান্ত আকিদার অনুসারী লেখক সুন্দর ও আকর্ষণীয় ভাষায় বিদআত, বাতিল আকিদা ও বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা প্রচার করে থাকে যা সাধারণ মানুষ সহজে ধরতে পারে না। তাই লেখক পরিচিতি থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ-বিশেষ করে দীনী বিষয়ে।

মুহাম্মাদ ইবনু সীরীন (বিখ্যাত তাবিঈ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

إن هذا العلم دين، فانظروا عمن تأخذون دينكم

“নিশ্চয়ই এ ইলম হল, দীন। কাজেই কার কাছ থেকে তোমরা দীন গ্রহণ করছে তা যাচাই করে নাও।”

ইবনু সীরীন রহ. হতে আরও বর্ণিত। তিনি বলেন, “এমন এক সময় ছিল যখন লোকেরা সনদ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতো না। কিন্তু পরে যখন ফিতনা দেখা দিল তখন লোকেরা হাদিস বর্ণনাকারীদেরকে বলতো,

سَمُّوا لَنَا رِجَالَكُمْ فَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ السُّنَّةِ فَيُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ وَيُنْظَرُ إِلَى أَهْلِ الْبِدَعِ فَلاَ يُؤْخَذُ حَدِيثُهُمْ

“তোমরা যাদের নিকট থেকে হাদিস গ্রহণ করেছ, আমাদের কাছে তাদের নাম বল। তারা এ কথা এ কারণে জানতে চাইত, যাতে দেখা যায় তারা আহলে সুন্নাত কিনা? যদি তারা এর অন্তর্ভুক্ত হয় তাহলে তাদের হাদিস গ্রহণযোগ্য হবে। আর যদি দেখা যায় তারা বিদআতি তাহলে তাদের হাদিস গ্রহণ করা হবে না।” [সহীহ মুসলিম এর আল মুকাদ্দামাহ (ভূমিকা)]

এ মর্মে আরও অনেক সতর্কতামূলক বক্তব্য রয়েছে। যদিও এগুলো হাদিস গ্রহণ সম্পর্কে বলা হয়েছে কিন্তু তা মূলত দীনের সামগ্রিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে।

তাছাড়া অনেক সময় লেখকের নাম পরিচয় জানা থাকলে লেখা বিষয়ে তার সাথে যোগাযোগ করা সহজ হয় এবং কোন সংশোধনী বা সংযোজন থাকলে তাকে জানানো যায়। এতে লেখা আর সমৃদ্ধ ও ত্রুটিমুক্ত হয়-যা সকলের জন্য উপকারী।

🔶 অন্যের লেখা কপি করা করার বিধান:

প্রশ্ন: যদি কোনও বইয়ে লেখকের পক্ষ থেকে কপি করার কোনও নিষেধাজ্ঞার কথা লেখা না থাকে অথবা ‘স্বত্ব সংরক্ষিত’ এ ধরণের কোনও লেখা না থাকে,-যা লেখক চাইলে যুক্ত করতে পারতো-তাহলে কি তা কপি করা যাবে?

উত্তর:
কোন বই, আর্টিকেল ইত্যাদিতে ‘স্বত্ব সংরক্ষিত’ বা ‘কপি রাইট’ লেখা না থাকলে সেখান থেকে প্রয়োজনীয় অংশ কপি করা জায়েজ আছে। তবে শর্ত হল, কপি কৃত লেখাটুকু কোটেশন চিহ্ন ( ” – “) এর মধ্যে রেখে লেখকের নাম/পরিচয় উল্লেখ করতে হবে। অথবা কপিকৃত অংশটুকু বিশেষভাবে চিহ্নিত করতে হবে। কোনভাবেই তা নিজের লেখা বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। অন্যথায় তা মেধাস্বত্ব চুরি, আমানতের খেয়ানত এবং লেখকের প্রতি অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ হিসেবে গণ্য হবে। চাই তা অনলাইন থেকে হোক অথবা অফলাইন থেকে হোক।

🔶 বাংলাদেশে কপিরাইট আইন ২০২১ (খসড়া):

“কপিরাইট আইন ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা এবং চার বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী অপরাধী উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।” [BBC Bangla এর ওয়েবসাইট]
الله أعلم
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।।

ও নদীরে তুই ভাঙ্গলি আমার ঘর

 “ও নদীরে তুই ভাঙ্গলি আমার ঘর”

কোন ঈমানদার বা আল্লাহ বিশ্বাসী ব্যক্তি যদি একথা বলে‌ তাহলে এতে কোন সমস্যা নেই। কেননা সে মহান আল্লাহকে সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ কারী ও পরিচালক বলে মনে করে। সে বিশ্বাস করে যে, নদী, সাগর, বাতাস বা প্রকৃতির নিজস্ব কোন শক্তি নেই আল্লাহর শক্তি ছাড়া। এসব কোন কিছুই আল্লাহর নির্দেশ ছাড়া পরিচালিত হয় না।
প্রমাণ হল, তাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয় যে, নদী কি নিজস্ব ক্ষমতায় ঘরবাড়ি ভেঙেছে নাকি আল্লাহর হুকুমে? তাহলে সে অবশ্যই উত্তরে বলবে, একমাত্র আল্লাহর হুকুমেই তা হয়েছে।

প্রকৃত পক্ষে, এভাবে বাক্য ব্যবহার করা ভাষা সাহিত্যের একটি রীতি। আরবি, বাংলা সহ সব ভাষাতেই এমন রূপক বাক্য ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
شيبتني هود والواقعة والمرسلات، وعم يتساءلون، وإذا الشمس كورت
“সূরা হুদ, সূরা ওয়াকিয়াহ, সূরা মুরসালাত, সূরা নাবা ও সূরা কুব্বিরাত (সূরা সমূহের বর্ণিত কেয়ামতের বিভীষিকাময় বর্ণনা) আমাকে বৃদ্ধ বানিয়ে দিয়েছে।” [তিরমিযী, হা/ ৩২৯৭]

আরবি সাহিত্যে এ জাতীয় বাক্যের প্রচুর ব্যবহার রয়েছে। যেমন:
أنبت الربيع البقل…
أنبت البقل شباب الزمان، وأحيا الأرض الربيع

قال أبو العتاهية:
فيَا لَيتَ الشّبابَ يَعُودُ يَوْماً .. فأُخبرَهُ بمَا فَعَلَ المَشيبُ

এ ধরনের ভাষা ব্যবহারকে আরবি সাহিত্যে মাজায বা রূপক বলা হয়।

কবি নজরুল বলেছেন, “হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান।” (কবিতা: দারিদ্র)
আমরাও অনেক সময় বলে থাকি, “কালবোশেখীর ভয়াবহ তাণ্ডব সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে এবং হাজার হাজার মানুষকে ভিখারি তে পরিণত করেছে।”

আল্লাহতে বিশ্বাসী কোন মুমিন ব্যক্তি রূপক অর্থে এই জাতীয় বাক্য ব্যবহার করলে তাতে কোন দোষ নেই ইনশাআল্লাহ।
অবশ্য কোন নাস্তিক বা আল্লাহতে অবিশ্বাসী ব্যক্তি এমন কথা বললে অবশ্যই তা শিরক।

সুতরাং এমন বাক্যকে এককথায় শিরকি বাক্য বলা যাবে না।
তবে প্রাকৃতিক বিপর্যয় যথা ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদিতে আমাদের উচিত, আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, বেশি বেশি ইস্তেগফার করা এবং নিজেদের ভুল ত্রুটিগুলো সংশোধন করে আল্লাহর পথে ফিরে আসা। এ সব অভিমানী গান গেয়ে কোন লাভ নেই। আর তাতে যদি মিউজিকের মিশ্রণ ঘটে তাহলে তা নিঃসন্দেহে হারাম।

আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

হোমিওপ্যাথি ঔষধ ব্যবহারের শরঈ বিধান

 প্রশ্ন: হোমিওপ্যাথি মেডিসিন কি হারাম? কারণ এতে সামান্য পরিমাণ অ্যালকোহল মেশানো থাকে।

উত্তর:
হোমিওপ্যাথি (homeopathy) ওষুধে প্রিজারভেটিভ তথা তার পচন রোধ ও কার্যকারিতা হ্রাস না হওয়ার জন্য খুবই সামান্য মাত্রায় অ্যালকোহল ব্যবহার করা হয়-যা ওষুধ সেবনকারীর মধ্যে কোন প্রভাব ফেলে না।

সুতরাং তা ব্যবহারে কোন দোষ নেই ইনশাআল্লাহ। বিশেষ করে যখন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের নির্দেশনা ক্রমে রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচার জন্য তা ব্যবহার করা জরুরি হয়ে পড়ে।

অ্যালকোহল তখনই হারাম হবে যখন তা মানুষের মস্তিষ্কের বিকৃতি সাধন করে। বিশেষজ্ঞগণ বলেন, সামান্য পরিমাণ অ্যালকোহল (৫%) যদি পানি বা ঔষধে মেশানো হয় তাহলে তার কোনো প্রভাব অবশিষ্ট থাকে না। আর মদ হারাম হওয়ার মূল কারণ হলো, মস্তিষ্কের বিকৃতি সাধন। যখন এই কারণটিই অনুপস্থিত থাকবে তখন তার উপর মদের বিধান প্রযোজ্য হবে না।

তবে সংশয় থেকে বাঁচতে এর বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থা সহজলভ্য হলে তা ব্যবহার না করাই ভালো।

উল্লেখ্য যে, বর্তমান যুগে অ্যালকোহলমুক্ত ওষুধ পাওয়া এক কঠিন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশ্চাত্য দেশগুলোর প্রায় সব ওষুধেই অ্যালকোহল মেশানো হয়। কিন্তু বিষয়টি কেবল পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ওষুধের সঙ্গে অ্যালকোহল মেশানোর এ সমস্যা আজ প্রায় ইসলামি দুনিয়ার সব দেশেই বিদ্যমান।”

🔶 এ প্রসঙ্গে আল্লামা রমলি রহ. (তিনি জুনিয়র শাফেয়ী হিসেবে পরিচিত, মৃত্যু ১০০৪, মিশর) লিখেছেন: “এমন মাদকদ্রব্য, যা অন্য ওষুধের সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে তার প্রকৃত অস্তিত্ব নিঃশেষ হয়ে গেছে, এজাতীয় ওষুধের দ্বারা চিকিৎসা করা বৈধ। যেমন—অন্যান্য নাপাক বস্তুর ক্ষেত্রেও একই বিধান রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হলো, চিকিৎসাশাস্ত্রে ওই ওষুধের দ্বারা রোগ নিরাময় প্রমাণিত হতে হবে, কিংবা পরহেজগার কোনো ডাক্তারকে ওই ওষুধের উপকারিতা ও কার্যকারিতা সম্পর্কে অবগত করতে হবে। এরই সঙ্গে ওই ওষুধ ছাড়া রোগ নিরাময়ের আর কোনো বিকল্প পবিত্র ওষুধ না থাকতে হবে।” [নিহায়াতুল মুহতাজ : খণ্ড-৮, পৃষ্ঠা : ১২]
[উৎস: কালের কণ্ঠ-অনলাইন ভার্শন]

🔶 ওয়ার্ল্ড মুসলিম লীগ (রাবেতা) কর্তৃক পরিচালিত ইসলামি ফিকহ কাউন্সিলের সহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফতোয়া বোর্ড পরিমিত পরিমাণে অ্যালকোহল যুক্ত ওষুধ ব্যবহারের বৈধতার পক্ষে ফতোয়া প্রদান করেছে। যেমন: ইসলামি ফিকহ কাউন্সিলের এই সংক্রান্ত কয়েকটি সিদ্ধান্তের মধ্যে একটি হলো:
2- يجوز استعمال الأدوية المشتملة على الكحول بنسب مستهلكة تقتضيها الصناعة الدوائية التي لا بديل عنها ، بشرط أنب عدل ، كما يجوز استعمال الكحول مطهرًا خارجيًّا للجروح ، وقاتلاً للجراثيم ، وفي الكريمات والدهون الخارجية .
“২. ঔষধ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পরিমাণে অ্যালকোহল মেশানো হলে উক্ত ঔষধ ব্যবহার করা জায়েয যদি এ ছাড়া বিকল্প কিছু না থাকে। তবে শর্ত হলো, কোন বিশ্বস্ত ও ন্যায়-নীতিবান ডাক্তার কর্তৃক তা ব্যবহার করার নির্দেশনা (প্রেসক্রিপশন) থাকতে হবে। যেভাবে ক্ষত বা আহত স্থানের জন্য অ্যান্টিসেপটিক হিসাবে, জীবাণু নাশক হিসেবে এবং ক্রিম ও মলমে অ্যালকোহল ব্যবহার করা বৈধ।”
[২৬-১০-১৪২২ হি. মোতাবেক ৫-১০-২০০২ খ্রিস্টাব্দ তারিখে মক্কা মুকাররামায় অনুষ্ঠিত ইসলামি ফিকহ কাউন্সিলের ১৬তম অধিবেশন]
[কৃতজ্ঞতা: IslamQA]
আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

কনে দেখতে গিয়ে বরের পক্ষ থেকে তাকে কিছু টাকা বা উপহার সামগ্রী দেওয়ার বিধান

 প্রশ্ন: বিয়ের উদ্দেশ্যে কনে দেখতে গেলে তাকে হাদিয়া/উপহার হিসেবে কিছু টাকা বা কোনও উপহার সামগ্রী দেওয়া কি জায়েজ?

উত্তর:
কনে দেখার পর তাকে বরের পক্ষ থেকে তাকে কিছু টাকা বা উপহার সামগ্রী দেওয়া জায়েজ। এটিকে হারাম বলার কোন সুযোগ নাই। কেননা,

▪️ইসলামে উপহার লেনদেন করার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে। এতে পারস্পারিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি হয়। এটি উত্তম চরিত্রের বহিঃপ্রকাশও বটে।

উপহার লেনদেন প্রসঙ্গে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنِ أَبِـيْ هُرَيْرَةَ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ تَهَادُوا تَحَابُّوا
আবু হুরাইরা রা. কর্তৃক বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’’তোমরা উপহার বিনিময় করো তাহলে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতি সৃষ্টি হবে।’’ [বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ৫৯৪, আবু ইয়ালা, ৬১৪৮, সহীহুল জামে’ ৩০০৪]

সুতরাং বর-কনে যদি বিয়ের পূর্বে একে অপরকে দেখে এবং উপহার লেনদেন করে তাহলে তা বৈধ। তবে শর্ত হল, তা হতে হবে কনের পরিবারের মাধ্যমে। গোপনে বা কোনো নির্জন স্থানে তাদের কোথাও দেখা-সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে মিলিত হওয়া বা একে অপরকে উপহার লেনদেন করা জায়েজ নেই। কারণ তা উভয় কে ফিতনার দিকে ধাবিত করতে পারে।
মোটকথা, ফিতনা সৃষ্টির সম্ভাবনা না থাকলে শরিয়ত নিষেধ কৃত বা হারাম ক্ষেত্র ছাড়া যে কোন সময় যে কোন ব্যক্তিকে সৎ উদ্দেশ্যে উপহার দেওয়া জায়েজ।

▪️সম্মানিত ফকিহগণ কনেকে বিয়ের পূর্বে উপহার প্রদানকে বৈধ বলেছেন। যেমন: ইবনে তায়মিয়া রাহ. বলেন,
ولو كانت الهدية قبل العقد وقد وعدوه بالنكاح فزوجوا غيره رجع بها ” انتهى من “الفتاوى الكبرى” (5/472)
“যদি আকদ এর পূর্বে উপহার দেওয়া হয় এবং কনের পরিবার তার সাথে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরে অন্য কারও সাথে তার বিয়ে দেয় তাহলে তা ফেরত নিতে পারে।” [আল ফাতাওয়া আল কুবরা ৫/৪৭২]

বিয়ের পূর্বে কনেকে উপহার দেওয়ার ব্যাপারে পূর্ববর্তী ফিকহগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কিন্তু তারা কেউ হারাম বলেছেন বলে জানা নাই।

▪️তাছাড়া কনে দেখতে গিয়ে কনেকে কিছু টাকা বা উপহার দেওয়া এটা আমাদের সামাজিক রীতি ও দেশাচার। আর ইসলামের শরিয়তে দেশাচার ও সামাজিক প্রথা, ও আঞ্চলিক রীতিনীতিকে হারাম বলা হয় নি যতক্ষণ না তাতে শরিয়া বিরুদ্ধ কিছু থাকে। যদি সেগুলোতে ইসলামের নিষিদ্ধ ও হারাম কিছুর মিশ্রণ ঘটে তাহলে তখন অবশ্যই তা হারাম। এই কারণে ফকিহগণ বলেন,
العادة محكمة
“মানুষের রীতি-নীতি শরিয়তের বিধান সাব্যস্ত কারী হিসেবে গণ্য হবে।” (তবে শর্ত হল, তাতে শরিয়ত বিরুদ্ধ বা হারাম কোনও কিছু থাকতে পারবে না।) এই মূলনীতির ব্যাপারে ফকিহগণ সকলেই একমত।

▪️আমাদের সমাজে পাত্রী দেখতে গেলে পাত্রীর হাতে কিছু টাকা বা কোনও উপহার সামগ্রী দেওয়ার প্রথা চালু থাকার একটা কারণ হতে পারে যে, মানুষ যখন কোন মেয়েকে বিয়ের উদ্দেশ্যে দেখতে যায় তখন মেয়ে পক্ষ সাধারণত: তাদের কিছু আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে। সে ক্ষেত্রে তাদের বেশ কিছু খরচ হয়। কিন্তু যেহেতু এখনো তাদের মাঝে বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টি হয় নি তাই খাওয়া-দাওয়ার পর বর পক্ষ মেয়ের হাতে কিছু নগদ অর্থ দিয়ে থাকে। এটা আমাদের দেশের একটা সামাজিক রীতি। এতে দোষের কিছু নেই। কারণ যদি তারা খেয়েদেয়ে হাত ধুয়ে ফিরে চলে আসে-মেয়ে পক্ষকে কিছু টাকা-পয়সা না দেয়- তাহলে এটা অভদ্রতা বা অসামাজিকতা হিসেবে গণ্য হয়।

▪️এ টাকা দেওয়ার প্রথাটা চালু হওয়ার আরও একটা কারণ হতে পারে যে, যদি টাকা দেওয়ার প্রথা না থাকতো তাহলে কিছু বাটপার ও পেটুক টাইপের মানুষ কনে দেখার নাম দিয়ে শুধু মানুষের বাড়ি বাড়ি খেয়ে বেড়ানোর ধান্ধা করত। এ পথটা বন্ধ করার জন্যেও হয়ত খাওয়া-দাওয়ার পর টাকা দেওয়ার নিয়মটি চালু হয়েছে।
আল্লাহ ভালো জানেন।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

কখন “ইয়া রাসূলাল্লাহ” বলা শিরক আর কখন জায়েজ?

 প্রশ্ন: `ইয়া রাসুলুল্লাহ’ (হে আল্লাহর রাসূল) বলা জায়েজ কি?

উত্তর:
ইয়া রাসুলুল্লাহ অর্থ: হে আল্লাহর রাসূল! এটি উপস্থিত কাউকে উদ্দেশ্য করে সম্বোধন সূচক বাক্য।
যেমন: মানুষ জীবিত উপস্থিত কোনও ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে অথবা যাকে ডাকলে কথা শুনতে পায় এবং কথার উত্তর দেয় এমন ব্যক্তিকে সম্বোধন করে বলা হয়-ইয়া ফুলান (হে অমুক।)।

◈ রাসূল ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে উদ্দেশ্য করে এ কথা বলা জায়েজ হবে কি?

এ বাক্যটি কখনো কখনো বলা শিরক আর কখনো জায়েজ। নিম্নে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হল:

◍ যখন ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলা শিরক:

কেউ যদি এ বিশ্বাস থেকে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ (হে আল্লাহর রাসুল) বলে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আহ্বান করলে তিনি কবরে থেকেও তা শুনেন এবং বিপদাপদে সাহায্য করেন। তিনি সর্বত্র হাজির-নাজির, সর্ব শ্রোতা ও সর্ব দ্রষ্টা তাহলে তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এগুলো একমাত্র আল্লাহর বৈশিষ্ট্য। আর আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট কোনও বৈশিষ্ট্য তার মাখলুকের জন্য ব্যবহার করা হলে তাকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করার শামিল-যা শিরকে আকবর (বড় শিরক)।
বরং আমাদের বলা উচিৎ, ইয়া আল্লাহ, ইয়া রাহমান, ইয়া গাফুর, ইয়া কুদ্দুস ইত্যাদি। কারণ একমাত্র আল্লাহই সাত আসমানের উপর থেকে প্রতিটি মাখলুকের ডাক শুনেন এবং তাদেরকে সাহায্য করেন। এটি মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এর শান। কোনও মাখলুক সৃষ্টি জীবকে আল্লাহ এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করেন নি।

❑ ডাকতে হবে কেবল আল্লাহকে; কোনও নবী-রাসূল, ওলি-আউলিয়া, পীর-বুজুর্গ, জিন বা ফেরেশতাকে নয়:

◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَلِلَّهِ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَىٰ فَادْعُوهُ بِهَا ۖ
“আর আল্লাহর জন্য রয়েছে সব উত্তম নাম। কাজেই সে নাম ধরেই তাঁকে ডাক।” [সূরা আরাফ: ১৮০]

◈ তিনি আরও বলেন,
ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
“তোমরা আমাকে ডাক, আমি সাড়া দেব।” [সূরা গাফির/মুমিনুন: ৬০]

◈ তিনি আরও বলেন,
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
“(এবং এই প্রত্যাদেশ করা হয়েছে যে), মসজিদসমূহ আল্লাহ তাআলাকে স্মরণ করার জন্য। অতএব, তোমরা আল্লাহ তাআলার সাথে অন্য কাউকে ডেকো না।” [সূরা জিন: ১৮]

◈ তিনি আরও বলেন,
وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ ۖ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ
“আর নির্দেশ হয়েছে আল্লাহ ব্যতীত এমন কাউকে ডাকবে না, যে তোমার ভালো করবে না-মন্দও করবে না। বস্তুত: তুমি যদি এমন কাজ কর, তাহলে তখন তুমিও জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।” [সূরা ইউনুস: ১০৬]

◈ তিনি আরও বলেন,
وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ ‎﴿١٣﴾‏ إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَة
“তাঁর পরিবর্তে তোমরা যাদেরকে ডাক, তারা তুচ্ছ খেজুর আঁটিরও অধিকারী নয়। তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের সে ডাক শুনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না।” [সূরা ফাতির: ১৩ ও ১৪)

◈ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
إذَا سَأَلْت فَاسْأَلْ اللَّهَ، وَإِذَا اسْتَعَنْت فَاسْتَعِنْ بِاَللَّهِ
“যখন কিছু চাইবে তো আল্লাহর কাছেই চাইবে; যখন সাহায্য চাইবে তো আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইবে।” [তিরমিযী: ২৫১৬, হাদিসটি সহীহ (হাসান) বলেছেন।]

এ সকল আয়াও হাদিস থেকে প্রমাণিত হল যে, বিপদাপদে সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে একমাত্র আল্লাহকেই ডাকতে হবে। কোনও মৃত ব্যক্তি, নবী, ওলি, ফেরেশতা, জিন বা কোনও অদৃশ্য শক্তি ইত্যাদিকে ডাকা যাবে না। অন্যথায় তা বড় শিরকে পরিণত হবে। আর শিরক হল, আল্লাহর নিকট ক্ষমাহীন ইমান বিধ্বংসী সবচেয়ে বড় অপরাধ। কেউ জেনে বুঝে তাতে লিপ্ত হলে, তার জীবনের সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে যাবে, তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত এবং জান্নাত চিরকালের জন্য হারাম হয়ে যাবে। (আল্লাহ ক্ষমা করুন। আমিন।)

◈ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়া থেকে চিরবিদায় গ্রহণ করার পর কোনও বিপদাপদে বা সমস্যা-সংকটে সাহাবি বা তাবেয়িগন কখনও “ইয়া রাসূলাল্লাহ” (হে আল্লাহর রাসূল) বা “ইয়া নাবিয়াল্লাহ”(হে আল্লাহর নবী) বলে সম্বোধন করে তার নিকট সাহায্যের আবেদন করেছেন বলে প্রমাণিত হয় নি।

❑ কখন কখন ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলা জায়েজ?

নিম্নোক্ত ক্ষেত্র সমূহে “ইয়া রাসুলাল্লাহ” বলা দূষণীয় নয়। যেমন:

ক. হাদিসে বর্ণিত কোনও দুআর মধ্যে যদি এ বাক্যটি আসে তাহলে তা পাঠ করতে কোনও সমস্যা নাই। যেমন:
তাশাহুদের দুআয় আমরা বলি, “আসালামু আলাইকা আইয়্যুহান্নাবিয়্যু” (হে আল্লাহর নবী, আপনার উপর সালাম বর্ষিত হোক)।
হাদিসে যেহেতু এভাবেই বর্ণিত হয়েছে সেহেতু তাতে কোনও আপত্তি নাই।

খ. হাদিসের ইবারতে এ বাক্যটি থাকলে তা পাঠ করতে কোনও আপত্তি নাই। কারণ বহু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে সাহাবিগণ ইয়া রাসূলাল্লাহ (হে আল্লাহর রাসূল) বলে সম্বোধন করতেন।

গ. মদিনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কবরের সন্নিকটে উপস্থিতি হয়ে তার উপর প্রতি সালাত-সালাম পেশ করার সময়।

যেমন:
মদিনা জিয়ারাত কারীগণ, তাঁর কবরের সন্নিকটে উপস্থিত হয়ে তাঁকে এবং তার পার্শ্বে শায়িত তার দুই সহচর প্রথম খলিফা আবু বকর রা. এবং ২য় খলিফা উমর রা. এর কবরের উদ্দেশ্য বলে থাকেন,
“আস সালাতু আস সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ”,
“আস সালাতু আস সালামু আলাইকা ইয়া আবা বাকর রা.”,
“আস সালাতু আস সালামু আলাইকা ইয়া উমার রা.।”

এটা অবশ্যই জায়েজ। কারণ এখনে তারা তাদের কবরের সামনে উপস্থিত হয়ে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে সালাত ও সালাম পেশ করছেন।
মোটকথা, অন্তরের বিশ্বাস এবং পরিবেশ-পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ’ বলার বিধান বর্তাবে। কখনো তা শিরক হবে আর কখনো জায়েজ।
আল্লাহু আলাম।
▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

শেষ জামানা এবং সে সময় সুন্নত আঁকড়ে ধরার অতুলনীয় মর্যাদা

 প্রশ্ন: আমরা কি শেষ জামানায় আছি? আমরা কি এখন একটা সুন্নাত পালন করলে ৫০ জন সাহাবির সমপরিমাণ সাওয়াব পাব?

উত্তর:
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আগমন মানেই শেষ জামানা। তার মানে এর পরে কোন নবী রাসুল আসবে না বা কোন আসমানি গ্রন্থ নাজিল হবে না এবং এরপরে কেয়ামত সংঘটিত হবে। সুতরাং অবশ্যই আমরা শেষ জমানায় রয়েছি।

কিন্তু কখন কিয়ামত সংগঠিত হবে আমরা কেউ জানি না। এর নিশ্চিত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে। আল্লাহ বলেন,
{ يَسۡـَٔلُونَكَ عَنِ ٱلسَّاعَةِ أَيَّانَ مُرۡسَٰهَاۖ قُلۡ إِنَّمَا عِلۡمُهَا عِندَ رَبِّيۖ لَا يُجَلِّيهَا لِوَقۡتِهَآ إِلَّا هُوَۚ}
“তারা আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে (বলে) ‘তা কখন ঘটবে? বলুন, ‘এ বিষয়ের জ্ঞান শুধু আমার রবেরই নিকট। শুধু তিনিই যথাসময়ে সেটার প্রকাশ ঘটাবেন।” [Surah Al-A`râf: 187]

এ ক্ষেত্রে বিখ্যাত হাদিসে জিবরিলও উল্লেখযোগ্য।

🟢 শেষ জামানায় সুন্নত আঁকড়ে ধরার অপরিসীম মর্যাদা:

নিঃসন্দেহে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা তথা তাঁর নীতি ও আদর্শ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা, ফরজ ও ওয়াজিবগুলো সঠিকভাবে পালনের পাশাপাশি, সুন্নত ও নফল ইবাদতগুলো যথাসম্ভব সম্পাদন করা এবং হারাম ও বিদাআতি আচার-বিশ্বাস থেকে দূরে থাকা।‌ সেই সাথে তা প্রচার-প্রসার করা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ। হাদিসে এ ব্যাপারে পর্যাপ্ত মর্যাদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

▪️যেমন:

عَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ السَّاعِدِيِّ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِنَّ الإِسْلامَ بَدَا غَرِيبًا وَسَيَعُودُ غَرِيبًا كَمَا بَدَا فَطُوبَى لِلْغُرَبَاءِ قِيلَ : وَمَنِ الْغُرَبَاءُ يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : الَّذِينَ يُصْلِحُونَ إِذَا فَسَدَ النَّاسُ
সাহল বিন সা’দ সায়েদী বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অল্পসংখ্যক মানুষ সহকারে যেভাবে ইসলামের সূচনা হয়েছে ঠিক সেভাবে অচিরেই অল্প সংখ্যক মানুষের মধ্যে তা ফিরে-যেমন শুরুতে হয়েছিল।

সুতরাং শুভ সংবাদ (দুনিয়ায় সফলতা ও আখিরাতে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ ও জান্নাতে প্রবেশ) ঐ অল্প সংখ্যক লোকদের জন্য।’’
জিজ্ঞাসা করা হল, এই সুসংবাদ প্রাপ্ত অল্প সংখ্যক লোক কারা হে আল্লাহর রসূল?
তিনি বললেন, যারা সংস্কার ও সংশোধনী মূলক কাজ করে যখন মানুষের মাঝে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে বা মানুষ খারাপ হয়ে যায়।”
[আহমাদ ১৬৬৯০, ত্বাবারানীর কাবীর ৭৫৫৪, আওসাত্ব ৩০৫৬-সহিহ]

▪️এ প্রসঙ্গে আরেকটি হাদিস হল, আবু সা’লাবাহ খুশানী কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
إِنَّ مِنْ وَرَائِكُمْ أَيَّامَ الصَّبْرِ الصَّبْرُ فِيهِ مِثْلُ قَبْضٍ عَلَى الْجَمْرِ لِلْعَامِلِ فِيهِمْ مِثْلُ أَجْرِ خَمْسِينَ رَجُلاً يَعْمَلُونَ مِثْلَ عَمَلِهِ قَالَ يَا رَسُولَ اللهِ أَجْرُ خَمْسِينَ مِنْهُمْ قَالَ أَجْرُ خَمْسِينَ مِنْكُمْ
“তোমাদের পরবর্তীতে আছে ধৈর্যের যুগ। সে (যুগে) ধৈর্যশীল হবে মুষ্টিতে অঙ্গার ধারণকারীর মতো। সে যুগের আমলকারীর হবে পঞ্চাশ জন পুরুষের সমান সওয়াব।
জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহর রসূল! পঞ্চাশ জন পুরুষ আমাদের মধ্য হতে, নাকি তাদের মধ্য হতে?
তিনি বললেন, “তোমাদের মধ্য হতে।”
[আবু দাউদ ৪৩৪৩, তিরমিযী ৩০৫৮, ইবনে মাজাহ ৪০১৪, ত্বাবারানী ১৮০৩৩, সহীহুল জামে’ ২২৩৪]

🚫 “উম্মতের বিশৃংখলার সময় সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মর্যাদা ১০০ শহিদের সমান” সংক্রান্ত হাদিসটি সহিহ নয়:
এ সংক্রান্ত হাদিসটি আমাদের মাঝে বহুল প্রচলিত। বক্তাদের মুখেও আমরা তা অহরহ শুনতে পাই। কিন্তু‌ সম্মানিত মুহাদ্দেসিনের দৃষ্টিতে সনদের বিচারে উক্ত হাদিসটি সহীহ নয়।
নিম্নে উক্ত হাদিস এবং তৎপ্রসঙ্গে মুহাদ্দিসিনে কেরামের গবেষণালব্ধ সনদ বিশ্লেষণ পেশ করা হল:
من تمسك بسنتي عند فساد أمتي له أجر مائة شهيد
“যে ব্যক্তি আমার উম্মতের বিশৃঙ্খলার সময় আমার সুন্নতকে আঁকড়ে ধরবে তার জন্য রয়েছে একশ শহিদের সমপরিমাণ সওয়াব।”
[হাদিসটি যঈফ (দুর্বল)। দ্রষ্টব্য: সিলসিলা যইফা, হা/৩২৭]

সনদ বিশ্লেষণ:

عن ابن عباس رضي الله عنهما أن النبي صلى الله عليه وسلم قال :
( من تمسك بسنتي عند فساد أمتي فله أجر مائة شهيد )
أخرجه ابن عدي في “الكامل” (2/327) وسنده ضعيف جدا ، فيه الحسن بن قتيبة : متروك الحديث ، انظر ترجمته في “لسان الميزان” (2/246) ، وضعفه الألباني في “السلسلة الضعيفة” (326)

عن أبي هريرة رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال :
( المتمسك بسنتي عند فساد أمتي له أجر شهيد )
أخرجه الطبراني في “الأوسط” (2/31) وعنه أبو نعيم في “حلية الأولياء” (8/200)
وفي سنده علتان :
1- تفرد عبد المجيد بن عبد العزيز بن أبي رواد ، ومثله لا يحتمل تفرده .
2- جهالة محمد بن صالح العذري : قال الهيثمي في “مجمع الزوائد” (1/172) : لم أر من ترجمه .
ولذلك ضعفه الشيخ الألباني رحمه الله في “السلسلة الضعيفة” (327) .
পরিশেষে আমাদের কর্তব্য, চতুর্মুখী ফিতনা-ফাসাদের সয়লাবের মধ্যেও আল্লাহর দ্বীনকে শক্তভাবে ধারণ করা, চারদিকে অজ্ঞতার গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে জ্ঞানের মশাল জ্বেলে সত্যের পথ ধরে সামনে এগিয়ে যাওয়া এবং বিদআতের জয়জয়কারের মাঝেও রাসুলের সুন্নাহকে জীবনের ব্রত বানিয়ে নেওয়া। পাশাপাশি এই পথে চলতে গিয়ে সকল ঝড়ঝঞ্জা, অগ্নিপরীক্ষা, বিপদ-আপদ এবং অপবাদ ও অপপ্রচারের সামনে আল্লাহর কাছে প্রতিদানের আশায় পরম ধৈর্যের পরিচয় দেওয়া। তবেই মিলবে প্রতিশ্রুত সফলতা এবং জান্নাতের সুসংবাদ‌। সেই সাথে মিলবে সাহাবিদের ৫০ জন ব্যক্তির সমতুল্য সওয়াব ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ আমাদেরকে সত্যের পথে অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন।‌ আমিন।
আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল।
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব।

Translate